যক্ষিণী – মণীশ মুখোপাধ্যায়
সে প্রায় অনেক বছর আগের কথা। কাতারে কাতারে মানুষ তখন প্রাণের ভয়ে পালিয়ে আসছে ভারতে। আকাশে বাতাসে ভাসছে সর্বহারা মানুষদের হাহাকার। আমার পরিবারও সেই দলেই ছিল। খান সেনাদের তাড়া খেয়ে একরাতের মধ্যে সর্বস্ব ফেলে রেখে ভারতে পালিয়ে এসেছিলেন ঠাকুরদা। এখানে এসে উঠেছিলেন উদ্বাস্তু কলোনিতে। সেই কলোনি ছিল আস্ত রোগের ডিপো। ছোটপিসি মরতে বসেছিল প্রায়। তাকে বাঁচাতে গিয়ে ঠাকুরদার শেষ সম্বলটুকুও চলে গিয়েছিল। বাধ্য হয়ে রঙের কারখানায় কাজ নিয়েছিলেন তিনি। কয়েক বছরের মধ্যেই মারা গিয়েছিলেন ফুসফুসের অসুখে। সেই সময় বাবার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে শুরু হয়েছিল কঠিন পরিশ্রম আর মধ্যমগ্রামের দু’কামরার ভাড়াবাড়ির জীবন।
সমস্ত খরচ সামলে বাবা নিজের বাড়ি করতে পারেননি কখনও। সারাজীবন ভাড়াবাড়িতেই কাটিয়েছি আমরা। বাবার সেই স্বপ্নটুকু আমি আজ পূরণ করলাম, চাকরি পাওয়ার দু’বছর পরে।
উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রিট অঞ্চলে একটা বাড়ির খোঁজ দিলেন অফিসের দেবশঙ্করদা। উনি টুকটাক জমি-বাড়ির দালালি করেন। ওঁর সঙ্গে বাড়িটা দেখতে গিয়ে ভারি পছন্দ হয়ে গেল আমার। পুরোনো দিনের দোতলা বাড়ি।
ভেতরে ঢুকতেই একচিলতে উঠোন। উঠোনের দুদিকে দুটো বড় বড় ঘর। ঘরগুলোর মাঝখান দিয়ে একটা সরু গলির মতো প্যাসেজ চলে গেছে বাড়ির উত্তর দিকে। সেই প্যাসেজের শেষেও পরপর তিনটে ঘর। ঘরগুলো পার করে উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে একটা চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। সিঁড়িগুলোর অবস্থা যদিও বেশ কাহিল! মেনটেনেন্সের অভাবে সিঁড়ির কাঠের হাতলগুলো ভেঙে গেছে। ওগুলো একটু সারিয়ে নিলেই আপাতত চলে যাবে। দোতলার ঘরগুলো শুনলাম ব্যবহার হতো৷ কাজেই সেগুলো এখনও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রয়েছে।
দেবশঙ্করদা বাড়ির যা দাম বললেন, তা মোটামুটি আমার সাধ্যের মধ্যেই ছিল। বেশ কিছু জমানো টাকা আর ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে কিনে ফেললাম বাড়িটা। বাড়ি কেনার কথা বলতেই আনন্দে ঝলমল করে উঠল বাবার মুখ। কাঁপাকাঁপা হাতে তিনি আমায় আশীর্বাদ করে বললেন, ‘দীর্ঘজীবী হও বাবা!’ একবিন্দু জলও দেখতে পেলাম বাবার ক্ষয়াটে চোখের কোনায় ।
এক সপ্তাহের মধ্যেই ভাড়াবাড়ি ছেড়ে উঠে এলাম আমরা চার নম্বর ছেনু বসাক লেনে। অফিসের টুকটাক কয়েকজন আর পিসিদের ডেকে সেরে ফেলা হল ঘরোয়া গৃহপ্রবেশ।
ঠাকুরমশাই পুজোয় বসেছেন। মিনিট পনেরো পুজো চলার পর হঠাৎ তিনি
উসখুস করতে শুরু করলেন। নাক-মুখ কুঁচকে বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একটা বাজে গন্ধ পাচ্ছেন রতনদা?’ বাবা মাথা নাড়লেন। অর্থাৎ তিনি কোনও গন্ধ পাচ্ছেন না। আমরা বাকিরাও তেমন কোনও বাজে গন্ধ পেলাম না। ঠাকুরমশাই একসময় নিজের মনের ভুল ভেবে আর সে সবে মন না দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চললেন পুজোর কাজ।
বেশ কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই অন্য এক সমস্যা শুরু হল। যজ্ঞ করার জন্য যতবারই ঠাকুরমশাই আগুন ধরাতে যাচ্ছেন, ততবারই তা নিভে যাচ্ছে নিমেষের মধ্যে। ভ্রু কুঁচকে গেল তাঁর। তিনি বারবার বলতে লাগলেন, এমনটা নাকি হওয়ার কথা নয়। এ ভারি অশুভ ইঙ্গিত! অবশেষে কোনওমতে যজ্ঞের কাজ শেষ করলেন তিনি।
পুজো শেষ করে ঘরে ঘরে শান্তির জল ছেটাতে ছেটাতে ঠাকুরমশাই নীচের ঘরগুলোর কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সেগুলোর বাইরে তখনও তালা ঝুলছিল। আমরাও খোলার প্রয়োজন বোধ করিনি। তিনজন মানুষের জন্য দোতলার দুটো ঘরই যথেষ্ট। ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গে তখন আমিও দাঁড়িয়েছিলাম সেখানে। উনি আমার দিকে চেয়ে বললেন, ‘গন্ধটা এই ঘর থেকেই আসছে, বুঝলে দীপেন্দ্ৰ !
আমি হেসে বললাম, ‘হতে পারে, পুরোনো দিনের বাড়ি তো! তাছাড়া এই ঘরগুলো অনেকদিন ধরেই বন্ধ হয়ে পড়ে আছে বলে মনে হয়। ভেতরে হয়তো ইঁদুরটিদুর জাতীয় কোনও প্রাণী মরে পড়ে আছে!’
ঠাকুর মশাই মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘তাই হবে! তাই হবে হয়তো।”
সন্ধে হয়ে এসেছে। বাড়িতে যাঁরা এসেছিলেন, খাওয়াদাওয়া সেরে ফিরে গেছেন এক এক করে। শুধু পাড়ার দু’একজন লোক তখনও বাবার সঙ্গে বসে গল্প করছেন দোতলার ঘরসংলগ্ন বারান্দাটায়। বাবা তাঁদের বলছেন একটা বাড়ির জন্য, একটা মাথা গোঁজার ঠাইয়ের জন্য সারাজীবন কত সংগ্রাম করেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত নিজের একটা বাড়ি হওয়ায় এখন তিনি শান্তিতে চোখ বুজতে পারবেন।
পাড়ার বয়স্ক মানুষেরা মন দিয়ে বাবার কথা শুনছেন। আমার বেশ নিশ্চিন্ত লাগছিল এসব শুনে। যাক, শেষ বয়সে অন্তত মানুষটাকে কিছু একটা দিতে পেরেছি ছেলে হিসেবে এইটুকুই আমার শান্তি।
একটা সিগারেট নিয়ে পায়ে পায়ে উঠে গেলাম ছাদে। পশ্চিম দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া এসে নাকেমুখে ঝাপটা মারছে। পাশেই বিডন স্ট্রিট। সেখান থেকে গাড়ি চলাচলের শব্দ ভেসে আসছে। সিগারেটে একটা লম্বা সুখটান দিয়ে বড় আরাম হল। কাল থেকে আর ভাড়া বাড়ির জীবন নয়, একটা কমন বাথরুমের জন্য অন্য ভাড়াটেদের সঙ্গে ঝামেলা নয়। নিজেদের বাড়িতে ইচ্ছেমতো হাত-পা ছড়িয়ে থাকা যাবে।
হঠাৎ আমার ঘোর ভাঙল একটা শব্দে। মনে হল, ছাদের সিঁড়ি দিয়ে কেউ যেন ওপরে উঠে আসছে। মা বোধহয়। হাতের পাতার আড়ালে সিগারেটটা লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।
ছাদে ওঠার সিঁড়িতে আলো খুব কম। একটা তারের সাহায্যে একটা বাল্ব কোনওমতে ঝুলছে। তাতে আলো তো হয়ই না বরং আরও অন্ধকার হয়ে যায় সিঁড়িটা। চিন্তা হল, মা যদি উঠতে গিয়ে পড়ে যায়। সিঁড়ির কাছটায় এগিয়ে গিয়ে ভারি অবাক হয়ে গেলাম, কেউ তো কোথাও নেই। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে, এক্ষুনি কেউ যেন পায়ে পায়ে উঠে আসছিল। আমি পরিষ্কার শুনেছি। মনের ভুল নাকি। ব্যাপারটা আর আমল না দিয়ে সিগারেটে টান দিতে দিতে আবার ছাদের রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়ালাম।
সারাদিন বেশ খাটাখাটুনি হয়েছে। নিজের অজান্তেই দু’চোখ বুজে আসতে চাইল আমার। ঠিক তখনই মনে হল যেন পিঠে কারও হাতের ছোঁয়া পেলাম। এবার সত্যিসত্যিই কেউ ছাদে উঠেছে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে পিছনে ফিরলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতরটা ধক্ করে উঠল! এ কী! ছাদে তো আমি ছাড়া আর কেউ নেই, একেবারে ফাঁকা৷ অথচ আমি স্পষ্ট অনুভব করেছি কেউ এক্ষুনি আমার পিঠে হাত দিয়েছিল।
মনের ভুল একবার হতে পারে, কিন্তু বারবার হবে! শরীর ক্লান্ত হয়ে আছে, সেই কারণেই হয়তো এমনটা হচ্ছে। আর ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না, এই ভেবে নীচে নেমে এলাম।
নিজের ঘরে ঢুকতে যাব, মায়ের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। মা আমার দিকে তাকিয়ে রইল সরু চোখে। তারপর একটু সময় নিয়ে বলল, ‘বাবু একটু বিশ্রাম কর এবার। চোখমুখ কেমন যেন বসে গেছে তোর!’
রাতে কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম। তখন রাত ক’টা হবে জানি না। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। আর ঘুম ভাঙতেই পিচের মতো কালো অন্ধকার গ্রাস করল আমায়। প্রথমে বুঝতে পারলাম না কোথায় আছি! ধীরে ধীরে মনে পড়ল সব। এটা আমাদের নতুন বাড়ি, তারই একটা ঘরে আমি শুয়ে আছি।
কিন্তু মনের মধ্যে কেমন একটা চাপা অস্বস্তি হতে লাগল। কেন এমন হচ্ছে বুঝতে পারলাম না। নতুন জায়গা বলেই হয়তো চোখ সয়ে আসতে সময় লাগছে৷ এবার মনে হল, আমি ছাড়াও ঘরের মধ্যে আরেকজন কেউ আছে। কারও একটা চাপা নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। দরজা ভেজানো আছে, দরজা খুলে কেউ ঢুকলে তার শব্দ শুনতে পেতাম! এত গাঢ় ঘুম আমার নয় যে, ঘরে কেউ ঢুকলে বুঝতে পারব না৷
চাপা গলায় জিগ্যেস করলাম, ‘কে?’
নিঃশ্বাসের শব্দটা আরও একটু জোরালো হল বলে মনে হল। কেউ যেন ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে খাটের কাছাকাছি। ধুপ ধুপ করে পা ফেলার শব্দ শুনতে পেলাম আমি। ঘরের আলো জ্বালতে হলে আমাকে খাট থেকে নামতে হবে। সুইচবোর্ড খাটের থেকে অনেকটা দূরে। আমি দ্রুত উঠে পড়লাম। খাট থেকে নামার জন্য যেই একটা পা বাড়িয়েছি, তখনই হাঁটুর নীচে একটা হাতের স্পর্শ পেলাম। কোনও মহিলার নরম কোমল হাত। ভীষণ ঠান্ডা আর শীতল সেই স্পর্শ। সন্ধেবেলা ছাদে এই স্পর্শটাই অনুভব করেছিলাম। কেমন যেন ঘোর লেগে যাচ্ছে।
পা-টা সরানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। এবার একটা চাপা হাসির শব্দ কানে এল। বাইরের সামান্য আলো এসে ঘরের কালোকে ততক্ষণে কিছুটা হলেও দূর করেছে। চোখ সয়ে এসেছে, সেই আলো আঁধারিতে দেখলাম ঘরের মধ্যে কিচ্ছু নেই। অথচ একটা ঠান্ডা হাত আস্তে আস্তে উঠে আসছে পা থেকে হাঁটু পর্যন্ত। তার পরে আরও ওপরে। ঊরু ছুঁয়ে কেউ আমার শরীরটাকে জাগিয়ে তুলতে চাইছে। আমার শরীর বেয়ে উঠে আসছে সাপের মতো খসখসে আরেকটা শরীর। ভয়ে আমার সারা দেহ নিমেষের মধ্যে হিম হয়ে গেল।
আর থাকতে না পেরে চিৎকার করে উঠলাম, ‘মা!’
সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘর থেকে মা ছুটে এল। ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিল। আমি দেখলাম খাটে আমি একা শুয়ে আছি। মা আমার কাছে এসে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘কী হল বাবু? অমন করে চেঁচিয়ে উঠলি কেন?”
আমি খাটের পাশের টেবিলের ওপর থেকে জলের বোতলটা নিয়ে ঢকঢক করে বেশ কিছুটা জল খেয়ে ফেললাম। তারপর হাঁফাতে হাঁফাতে বললাম, ‘এই ঘরে কেউ একটা ছিল, জানো মা !’
মা বেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চারিদিক দেখে নিয়ে তারপর আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘স্বপ্ন দেখছিলি বোধহয়! নতুন জায়গা তো তাই হয়তো… ও কিছু না৷ এবার চোখটা বোজ দেখি, আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।’
অফিসে গিয়ে দেবশঙ্করদা-কে রাতের ঘটনাটা জানাতেই উনি হো হো করে হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘এবার একটা বিয়ে করো বুঝলে দীপুবাবু, না হলে এইসব স্বপ্ন রেগুলার দেখতে হবে!’
দেবশঙ্করদা আমার কথায় বিশ্বাস করলেন না দেখে আমিও আর কথা বাড়ালাম না। প্রচুর কাজ জমে ছিল, সেদিকেই মন দিলাম।
বেলা একটা নাগাদ মোবাইলটা বেজে উঠল। মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ পড়তেই দেখলাম, মানুদার নাম। মানুদা আমার পিসতুতো দাদা। এক নম্বরের মাতাল। পিসির শরীর খারাপের নাম করে বহুবার আমার কাছ থেকে ও টাকা ধার নিয়েছে। পরে শুনেছি সেই টাকা নিয়ে ও মদ খেয়েছে। গৃহপ্রবেশেও আসেনি। ধরা পড়ে যাওয়ার লজ্জায় হয়তো!
আজকাল ওর ফোন এলে আর ধরি না। এবারেও ধরলাম না। কিছুক্ষণ পরে আবার ফোন এল। আবার মানুদা। আশেপাশে যারা কাজ করছিল তারা এবার বেশ বিরক্ত হচ্ছে। বাধ্য হয়েই ফোনটা ধরলাম এবার।
মানুদাকে বেশ কড়া গলায় জিগ্যেস করলাম, ‘বলো কত চাই? পিসির নাম করে মিথ্যে কথা বোলো না। তার আগেই এসে তোমার মদের টাকা নিয়ে যেও।
মানুদা ওপাশ থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘সেসব কিছু না রে দীপু। মামা সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছেন। তোর ফোনে মামি ফোন করেছিলেন, পাচ্ছিলেন না তাই
আমায় ফোন করেছিলেন। রিকভারি নার্সিং হোমে নিয়ে এসেছি আমরা। তুই তাড়াতাড়ি আয়।’
আমার সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। বাবা সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে। চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘বাবার কিছু হয়নি তো?’ মানুদা উত্তর দিল, ‘মাথা ফেটে গেছে, অনেকটা রক্ত বেরিয়েছে। তুই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আয়।’
ফোনটা কেটে দিয়ে অফিসে ঘটনাটা সংক্ষেপে জানিয়েই ছুটে গিয়ে মেট্রো ধরলাম। ট্রেনের হিমশীতল কামরা আর মনের মধ্যে জমে থাকা দুর্ভাবনা কাঁপন ধরিয়ে দিল আমার সর্বাঙ্গে। ভাগ্যিস ছোটপিসির বাড়িটা কাছাকাছি। তাই মা কাউকে না পেয়ে মানুদাকে ডাকতে পেরেছে৷ ভগবানকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানালাম মনে মনে ।
নার্সিং হোমের ভিজিটরস এরিয়াতে গিয়ে মা-কে দেখতে পেলাম। বিষণ্ণ প্রতিমার মতো দেখাচ্ছে মা’কে৷ কাছে এগিয়ে যেতেই আমার সারা শরীর আতঙ্কে কেঁপে উঠল৷ মায়ের লাল পেড়ে সাদা শাড়ির ওপর কেউ যেন দুহাতে তাজা রক্ত লেপে দিয়েছে। আমাকে দেখেই মা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, ‘বাবু…বাবু রে…দ্যাখ তোর বাবার কী হয়ে গেল!’
নিজেকে কেমন যেন রিক্ত…নিঃস্ব মনে হল। মা-কে কীভাবে সান্ত্বনা দেব বুঝে উঠতে পারলাম না। তবুও মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম, ‘কিচ্ছু হবে না, বাবা দ্রুত সেরে উঠবে দেখো।’
আমাকে মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মানুদা ছুটে এল। ও বোধহয় রিসেপশনের দিকে ছিল। আমাকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘দীপু, মামার চোটটা বেশ গুরুতর বুঝলি! যদিও ডাক্তারবাবু এখনও বলতে পারছেন না ইন্টারনাল কোনও ইনজ্যুরি আছে কিনা! তবে বেশ কিছুটা ব্লাড লস্ হয়েছে, তাই মামাকে এখন আইসিইউ-তে রেখেছে। এক বোতল রক্ত দেওয়া হয়েছে আপাতত। যদি দরকার পড়ে আরও এক বোতল রক্ত দিতে হবে।’
মানুদার একটা হাত ধরে বললাম, ‘মানুদা, কিছু মনে কোরো না। ফোনে তখন তোমার সঙ্গে ওভাবে কথা বলা আমার উচিত হয়নি। ভাগ্যিস তুমি ছিলে তাই বাবা… মানুদা আমার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘ওসব কথা ছাড় ভাই। আমি কিছু মনে করিনি। এখন মামার ঠিক হওয়াটা বেশি জরুরি।’
সন্ধের মধ্যে অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠলেন বাবা। যতটা ভয় পাচ্ছিলাম তেমন কিছু হয়নি। আর রক্তও দিতে লাগেনি। ডাক্তারবাবুরা বললেন ইন্টারনাল কোনও ইনজ্যুরি হয়নি। তবে রক্তপাত বেশি হওয়ার কারণে বাবা বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছেন।
যদিও নার্সিং হোমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে রুগির বাড়ির কাউকে থাকার দরকার নেই, তবুও আমার মন সায় দিল না। সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে আমি একা থেকে গেলাম নার্সিং হোমে।
রাত ন’টার দিকে একজন নার্স এসে আমাকে ডাকলেন, ‘এই যে শুনছেন ? রতন সরকারের বাড়ির লোক কি আপনি ?
‘হ্যাঁ, আমি ওনার ছেলে।’
‘উনি বাচ্চাদের মতো বায়না করছেন বাড়ির কারও সঙ্গে দেখা করার জন্য। যান
একবার দেখা করে আসুন।’ বলে নার্স চলে গেলেন।
ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলাম আমি। আইসিইউ ওয়ার্ডের কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই বাতানুকূল যন্ত্রের অসম্ভব শীতলতা আমার হাড় অবধি কাঁপিয়ে দিল। ভীষণ শীত করতে লাগল হঠাৎ করে। হালকা নীলচে একটা আলো জ্বলছে ঘরটায়। বেশিরভাগ রুগিই ঘুমিয়ে পড়েছেন। বেডগুলো সাদা পর্দার আড়াল দিয়ে ঘেরা রয়েছে। বেশ কয়েকটা বেড পার করতেই দেখতে পেলাম বাবাকে। মাথা নিচু করে বসে আছেন। আমি কাছে গিয়ে খুব আস্তে করে ডাকলাম, ‘বাবা !’
বাবা চোখ তুলে তাকালেন। স্পেশাল কেয়ার ইউনিটের ওই ঘরে মায়াবী নীলচে আলোয় বাবাকে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। চোখের দৃষ্টিতে সীমাহীন শূন্যতা! বাবা ফিসফিস করে বললেন, ‘ঘর-বাসা আমাগো কপালে নাই বোঝলা! ঢাকার অত্তবড় বাড়িখান ছাইড়া যেদিন পথের ভিখারি হইছি, সেইদিনই ঈশ্বর আমার কপালে লিখ্যা দিছে বাস্তুহীন কথাডা। সারাডা জীবন বাসাবাড়িতে ভাড়া থাইক্যা তোমার কল্যাণে যেদিন বাড়িডা হইল সেদিন ভাবলাম, এবার শান্তিতে মরতে পারুম। কিন্তু সেই কপাল যে নাই! ওই বাড়িতে থাকলে পিশাচের হাতেই অপমৃত্যু হইব আমাগো।” বাবার কথা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে এল
কথাটা, ‘পিশাচ!’
বাবা মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘হ পিশাচ। ওই বাড়িতে পিশাচের বাস। সেই আমারে সিঁড়ি থেইক্যা ফেলায়ে দিছে। নীচের ওই বন্ধ ঘর থাইক্যা আমি কান্নার আওয়াজ শুইন্যা নামছি৷ দাঁড়ায় দাঁড়ায় অনেকক্ষণ শুনছি, আর কোনও শব্দ না পাইয়া ভাবলাম মনের ভুল হইতে পারে! তারপর যেই সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠতে গেছি আমারে পেছন থেইক্যা টান দিছে সে। সিঁড়ি দিয়া পড়বার সময় আমি পরিষ্কার শুনছি মাইয়াগো গহনার শব্দ হইতে আছে ঝমঝম কইরা। একজন মাইয়া মানুষ শব্দ কইরা হাসতে আছে। ভয়ে বুক শুকাইয়া যায় ওই হাসি শুনলে।’
বাবার কথা শুনে আতঙ্কে আমার গলা বুজে গেল। নাহ্, পিশাচের ভয় আমার নেই। তবে মনে হল মাথায় চোট লাগার কারণে বাবার মস্তিষ্কে বড়সড় কোনও গোলমাল হয়ে যায়নি তো! কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে গেল গতকাল রাতের কথা। সেই হিসহিসে হাসির শব্দ এখনও কানে লেগে আছে আমার।
বাবা গলার স্বর আরো নামিয়ে বললেন, ‘চলো মধ্যমগ্রামের বাসায় চইল্যা যাই।’ কী উত্তর দেব বুঝতে পারলাম না। বাবার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম, ‘আচ্ছা, তুমি এখন ঘুমিয়ে পড়ো। আমি দেখছি কী করা যায়।’
বাবা কিছুটা আশ্বস্ত হল বলে মনে হল। নীচে নেমে এলাম আমি। সঙ্গে সঙ্গে খিদেতে চনমন করে উঠল পেটটা। কিছু একটা না খেলেই নয়। এখান থেকে বাড়ি কতই বা দূর, তাও বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করল না। বাবার কথাগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল থেকে থেকে।
মধ্যমগ্রাম থেকে সবে এই তল্লাটে এসেছি। এখনও রাস্তাঘাট তেমনভাবে চিনি না। খাবারের দোকান খুঁজতে খুঁজতে একটা গলির সামনে এসে দাঁড়ালাম। একটু দূরে একটা রোল চাউমিনের দোকান চোখে পড়ল। পোড়া তেল, ডিম, পেঁয়াজ ভাজা ইত্যাদির একটা ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে আসছে সেদিক থেকে। এগিয়ে গেলাম সেদিকে।
দু’একজন দেহাতি খদ্দের বসে আছে দোকানের সামনের কাঠের বেঞ্চিতে। আর তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা মেয়ে। ভীষণ চড়া তাদের সাজপোশাক। মেয়েগুলোর চোখেমুখে কেমন যেন একটা অশ্লীল ইশারা খেলা করছে।
আমি দোকানিকে একটা এগরোল দিতে বলে দোকানের ধার ঘেঁষে একটু তফাতে দাঁড়ালাম, যাতে মেয়েগুলোর চোখে না পড়ি। মনে মনে বুঝতে পারলাম এরা কারা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাবার কথাই ভাবছি, তখনই একটা মেয়ে এসে আমার হাত ধরে টানল। টাল সামলাতে না পেরে আমি একেবারে মেয়েটার গায়ের ওপর পড়লাম। মেয়েটা জিগ্যেস করল, ‘যাবে না কি?’
কিছুটা অন্যমনস্ক ভাবে জিগ্যেস করলাম, ‘কোথায় যাব?”
মেয়েটা একটা খারাপ গালাগালি দিয়ে মুখ বেঁকাল। শুনতে অবাস্তব লাগলেও সেই খারাপ কথাটা শুনেই মেয়েটার প্রতি হঠাৎ একটা প্রবল আকর্ষণ অনুভব করলাম! ভুলে গেলাম আমার খিদে পেয়েছিল। ভুলে গেলাম আমার বাবা নার্সিং হোমে ভর্তি আছেন। যেন কেমন একটা নেশায় পেল আমাকে। মেয়েটার হাত ধরে বললাম, ‘চলো।’ মেয়েটার নাম রতি। ওর ঘরে বসেই জীবনে প্রথমবার মদ খেলাম আমি। তিক্ত ঝাঁঝালো তরল গলা দিয়ে নামতে নামতে বুক পর্যন্ত জ্বালিয়ে দিল। রতির নগ্নতাকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে করতে মনে হল এই সুখ এতদিন কোথায় ছিল! এই আনন্দের ভাগ আমি আগে কেন পাইনি !
কিছুক্ষণ পরে আমি ভুলেই গেলাম আমি কে, কোথায় আছি, কী করছি। ধীরে ধীরে স্নায়ুগুলো অকেজো হয়ে গেল। ঘোরের মধ্যে শুনতে পেলাম রতি খিলখিল করে হাসছে। ঠিক সেদিন রাতে স্বপ্নের মধ্যে মেয়েটা যেমন করে হাসছিল তেমন করে…। ‘যত্তসব শুয়োরের বাচ্চা মাতালের উৎপাত এখানে!’ কথাটা কানে আসতেই একঝটকায় ঘুম ভেঙে গেল আমার। তাকিয়ে দেখলাম একজন জমাদার হাতে ঝাঁটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। আর আমি শুয়ে আছি ফুটপাতের ওপর। আমার সারা শরীরে রাস্তার ময়লা লেগে আছে। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম, নাহ্, পার্স আর মোবাইলটা এখনও অক্ষত আছে।
আর নার্সিং হোমে না গিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম আমি। মা দরজা খুলে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর কাপড় দিয়ে নাক চাপা দিল। মানুদা কাল এ বাড়িতে রয়ে গেছিল, সে-ও এসে দাঁড়াল মায়ের পাশে। আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল মানুদা। আমি টলমল করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। জামা-কাপড় ছাড়ার কথাও মাথায় রইল না৷
একটা মেয়ে খুব ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে আমার খাটের দিকে। অসম্ভব সুন্দর তার দেহের প্রতিটা বিভাজিকা। তবে শরীরের তুলনায় মেয়েটার হাত-পাগুলো ভীষণ রকমের সরু সরু। সেই হাতে ভর্তি রুপোর বালা আর চুড়ি। কঙ্কালসার পায়ে নূপুরের রিনরিনে শব্দ হচ্ছে। তার কপালজোড়া কুমকুমের বড় টিপ। কিন্তু গায়ের রঙ অদ্ভুত রকমের সাদা। যেন রক্তের একটা কণাও তার শিরায় বইছে না ৷
সে আমার ওপরে উঠে বসল। ভীষণ শীতল তার শরীরের স্পর্শ। আমাকে জাগিয়ে তুলতে চাইল সে। আমার শরীরও জেগে উঠল নিমেষের মধ্যে। শুরু হল আদিম খেলা৷ শুধু খেলার আনন্দেই মেয়েটার সঙ্গে লিপ্ত হতে লাগলাম বারবার। রহস্যময়ী সেই মেয়ের গলা দিয়ে পরিতৃপ্তির শীৎকারের বদলে ভয়ংকর পাশবিক একটা গোঁঙানি শোনা যেতে লাগল।
খেলাটা ধীরে ধীরে কেমন যেন পৈশাচিক হয়ে উঠল। মেয়েটা তার তীক্ষ্ণ ধারালো নখগুলো বিধিয়ে দিল আমার বুকে। দলা দলা রক্ত আর মাংস মেখে নিতে লাগল নিজের গালে৷ আমি তার নীচ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইলাম। কিন্তু পারলাম না৷ আমি পেরে উঠলাম না মেয়েটার শক্তির সঙ্গে। চিৎকার করে উঠলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে ঘুমটা ভেঙে গেল আমার।
ওঃ, কী ভয়ংকর স্বপ্ন দেখছিলাম! ঘরের মধ্যে এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। ক’টা বাজে! খাট থেকে নেমে ঘরের আলো জ্বালাতেই দেওয়াল ঘড়ির দিকে চোখ পড়ল। আটটা কুড়ি! আমি তো অনেক সকালে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাস্তার সেই নোংরা লাগা জামা প্যান্ট এখনও আমার গায়ে। তার মানে আমি এতক্ষণ ঘুমাচ্ছিলাম ! প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বেজে উঠল মোবাইল ফোনটা। মানুদা ফোন করেছে। আমি ফোনটা তুলতেই ওপাশ থেকে মানুদা বলল, “কী রে দীপু, বিকেল থেকে প্রায় ছ’বার ফোন করেছি তোকে, ছিলি কোথায়? সেই কোন সকালে এসে সেই যে ঘরে ঢুকলি, আর তো বেরোলিই না! যাক বাদ দে, মামা নার্সিং হোম থেকে রিলিজ পেয়ে আমাদের বাড়িতে এসে উঠেছেন। মামিও সঙ্গে আছেন।
‘মামা আর ওই বাড়িতে যেতে চাইছেন না। উনি কোনও কারণে খুব ভয় পাচ্ছেন। হ্যাঁ রে, আর বাড়ি পেলি না দীপু? নিশ্চয়ই বাড়িটায় কোনও গোলমাল আছে। কাল রাতে আমারও খুব অস্বস্তি হচ্ছিল ঘুমোতে। বারবার মনে হচ্ছিল কেউ যেন ঝুঁকে আছে আমার মুখের দিকে !
‘মোড়ের সিগারেটের দোকানিকে ব্যাপারটা বলতেই সে বলল, ও বাড়িতে আগে দুই ভাই থাকত। পরিবারে পরপর তিনজনের মৃত্যু হওয়ায় বাকিরা তড়িঘড়ি এ বাড়ি ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। বাড়িটার কোনও সমস্যা আছে দীপু, ওটা বেচে দে। নাহলে তুই একবার ভাব না, তোর কি কখনও কোনও নেশা ছিল? তুই আজ সকালে বেহেড মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরেছিলি। মামি একটু রেগেও আছে এইজন্য।’
আমি কিছু না বলেই ফোনটা কেটে দিলাম। বাড়িটার নামে নিন্দা শুনতে আমার একটুও ভালো লাগছিল না। বাবার শরীর খারাপ, তাও বাবাকে একবার দেখতে যাওয়ার কথা মনে এল না। মায়ের রাগ হয়েছে শুনেও মা’কে ফোন করার কোনও তাগিদ অনুভব করলাম না৷
রাত পৌনে ন’টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতর অস্থির করতে শুরু করল। মনে হল ছুটে যাই রতি নামের মেয়েটার কাছে। এ নেশা এড়াবার নয়। ভূতে পাওয়া মানুষদের মতো আমি দ্রুত নামতে লাগলাম সিঁড়ি দিয়ে। বাড়ির দরজায় তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কালকের সেই গলিটার উদ্দেশে। আকাশে মেঘ
জমেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিও পড়তে শুরু হয়েছে। কোনও কিছু ভ্রুক্ষেপ না করে আমি এগিয়ে চললাম। তারপর একসময় রোলের দোকানটার সামনে এসে দাঁড়ালাম।
রাত দশটার দিকে বেশ জোরে বৃষ্টি নামল। মেয়েগুলো শেডের নীচে গিয়ে দাঁড়াল। আমি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে লাগলাম। স্বাভাবিক জ্ঞানবুদ্ধিটুকুও লোপ পেয়েছে আমার। হঠাৎ একটা ছেলে আমার পাশে এসে ফিসফিস করে জিগ্যেস করল, “ভালো আইটেম আছে, লাগবে নাকি স্যার?’
আমি মৃদু স্বরে বললাম, ‘আজ রতি নামের মেয়েটাকে দেখছি না। কাল ওর সঙ্গেই গেছিলাম ওর ঘরে। ও কোথায় ?
আমার কথা শুনে ছেলেটা কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে চেয়ে রইল। তারপর বলল, ‘আজ পাঁচ বছর ধরে এই লাইনে দালালি করছি স্যার, সোনাগাছির সব মালকেই আমি চিনি। তবে ওই নাম তো কখনও শুনিনি! আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে, বেশি নেশা-টেশা করে ফেলেছিলেন নাকি কাল?’
ছেলেটার কথার কোনও জবাব দিলাম না। ছেলেটা আবার বলল, ‘ঘরটা চিনতে পারবেন?”
আমি তার পিছু পিছু হাঁটতে লাগলাম। ভিজে চুপসে গেছে জামাকাপড়, সেদিকে আমার কোনও খেয়াল নেই। একসময় পৌঁছালাম ঘরটার সামনে। আঙুল তুলে ঘরটা দেখালাম।
ছেলেটা অবাক হয়ে বলল, ‘এটা তো রেশমীর ঘর গো!” সে ‘রেশমী’ বলে জোরে একটা হাঁক দিল। সঙ্গে সঙ্গে বছর বাইশের একটা মেয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। যার সঙ্গে রতির কোনও মিলই নেই! ছেলেটা রেশমী নামের মেয়েটাকে জিগ্যেস করল, ‘কাল রাতে কি তুই এই স্যারের সঙ্গে ছিলি, দ্যাখ তো? ‘
মেয়েটা আমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে নিয়ে বলল, ‘এটা কে রে ভটা? চিকনা মাল কিন্তু! কাল রাতে না থাকলেও আজ থাকতে পারি।’ রাগে আর লজ্জায় আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল। মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘তাহলে রতি কোথায়? কাল ওর সঙ্গে এই ঘরেই…’
ছেলেটা একটা নোংরা গালাগালি দিয়ে বলল, ‘যত্তসব পাগলাচোদার পাল্লায় আমিই পড়ি। ভাগ শালা শুয়োরের বাচ্চা।’
প্রচণ্ড রাগ হল ছেলেটার ওপর। কিন্তু কিছু করার নেই আমার। মন যেন কিছুতেই মানতে চাইল না। রতি নামের মেয়েটা কি তবে শুধুই আমার কল্পনা! না না, তা কী করে হয়! ছটফট করতে করতে এদিক-ওদিক দেখতে লাগলাম। মদ খেতে হবে৷ মদ না খেলে মন শান্ত হবে না। সোনাগাছির গলি ছেড়ে গ্রে স্ট্রিট মোড়ের দিকে হেঁটে গেলাম। বৃষ্টি বন্ধ না হলেও বেগ কিছুটা ধরেছে ততক্ষণে।
কিন্তু আজ বোধহয় আমার নিরাশ হওয়ারই দিন। মদের দোকানের দরজাও বন্ধ হয়ে গেছে।
মদের দোকানের আশেপাশে আমায় উঁকিঝুঁকি দিতে দেখে ফুটপাতে বসে থাকা একটা লোক খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘নিমতলা চলে যান দাদা, ব্ল্যাকে
মাল পেয়ে যাবেন।’
অটো সার্ভিস তখনও বন্ধ হয়ে যায়নি। নিমতলা যাওয়ার একটা অটোয় উঠে বসলাম আমি৷ অটোওয়ালা মদের ঠেকের আটঘাট সবই জানত। সে একটা গোপন ঠেকের সন্ধান দিল। এক বোতল মদ নিয়ে সেখান থেকে বেরোতে যাব এমন সময়ে হঠাৎ ধাক্কা লাগল একটা লোকের সঙ্গে।
লোকটার জামাকাপড় দেখে গা গুলিয়ে উঠল আমার। যেমন নোংরা তেমনই বিশ্রী গন্ধ বেরোচ্ছে সেই পোশাক থেকে। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। আমার কানের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘মেয়েছেলেটা বড্ড জ্বালাচ্ছে, তাই না?
আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম লোকটার দিকে। সে কী করে জানল রতির কথা! লোকটা আবার বলে উঠল, ‘বাজ পড়ায় ভয় আছে আপনার?’
আমি বোকার মতো মাথা নেড়ে বললাম, ‘না, ওসব ভয় আমার নেই। কিন্তু কোনও মেয়ে যে আমাকে জ্বালাচ্ছে সেটা আপনি জানলেন কীভাবে?’
লোকটা কালো কালো দাঁত বের করে হাসল এবার। কানে কানে কথা বলার সময়ই আমি বুঝতে পেরেছিলাম লোকটা আর যাই হোক, মাতাল নয়। তার মুখ থেকে জর্দা পানের গন্ধ ছাড়া অন্য কোনও গন্ধ আমি পাইনি।
সে বলল, ‘মানুষের বাস্তুভিটের প্রেত ঝাড়তে ঝাড়তে আমার জীবনটাই শ্মশান
হয়ে গেল। এখন এই কাশী মিত্র ঘাটই আমার ঠিকানা। আমি ওদের দেখতে পাই। যান, বাড়ি ফিরে যান। আর আধঘণ্টার মধ্যেই প্রবল বজ্রপাত হবে, তখন সাহস করে ছাদে উঠলেই ওর হাত থেকে রক্ষা পাবেন। ইন্দ্র যক্ষিণীদের শাপ দিয়েছিলেন, তাঁর বজ্রের দ্বারাই ওদের সংহার হবে। সেও এই শাপ থেকে মুক্ত হতে পারবে না।’ লোকটার কথার মাথামুন্ডু কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম সে রেললাইন পার
করে কাশী মিত্র ঘাটের দিকে অন্ধকার রাস্তায় মিলিয়ে গেল৷
আমি বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম। লোকটা কীসব জানি বলে গেল৷ যক্ষিণী কে? একটু ভয় ভয় করছিল আমার। বেশ কিছুটা নিট মদ গলায় ঢেলে ফেললাম। আশ্চর্য, এত মদের তেষ্টা কোথায় ছিল আমার !
বাড়ির সামনের গলিতে পা দিতেই মনে হল পেছনে কেউ একটা আসছে। কারও পায়ের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে মলের রিনরিন আওয়াজ। দ্রুত পেছন ঘুরলাম, কিন্তু কেউ কোথাও নেই।
গলির মধ্যে কতগুলো কুকুর দাঁড়িয়ে ছিল। অন্ধকারে তাদের চোখগুলো জ্বলছিল মশালের মতো। তারা আমায় দেখতে পেয়ে প্রবল আক্রোশে দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে এল আমার দিকে। ওদের ঘড়ঘড় গর্জনে কান ঝালাপালা হয়ে গেল৷
কোনওমতে বাড়িতে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে উঠে এলাম দোতলায়। হঠাৎ মনে হল কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে বারান্দার এককোণে। আমি চিৎকার করলাম, ‘কে?’
কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। বারান্দার আলোটা জ্বালতেই দেখলাম সব ফাঁকা। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে। ঘরে ঢুকে গলায় ঢকঢক করে ঢেলে দিলাম
তরল ঝাঁঝালো পানীয়। না, লোকটা ভুল কিছু বলেনি। লাল মেঘে ছেয়ে গেছে গোটা আকাশ। মাঝে-মাঝেই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মেঘের গুড়গুড় ডাক শোনা যাচ্ছে।
খানিক দ্বিধাভরেই ছাদের সিঁড়ির দিকে এগোলাম। প্রথম ধাপে পা দিতেই মনে হল কেউ যেন পিছন থেকে টেনে ধরেছে আমায়। ভয় লাগছে, তাও জোর করে এগিয়ে গেলাম।
ছাদে গিয়ে দাঁড়াতেই জমাট বাঁধা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বুকটা ধড়াস করে উঠল। আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম একজোড়া সরু সরু হাত আমার কণ্ঠনালী লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে৷ ধীরে ধীরে হাত দুটো আমার গলায় চেপে বসল। সাদা রক্তহীন সেই হাত দুটোয় আটটা আঙুল। আর তাতে ধারালো বেগুনিরঙা বড় বড় শিকারী পাখির মতো নখ। ভয়ে আমার সারা শরীর অবশ হয়ে গেল।
বুঝতে অসুবিধা হল না, আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুকের মধ্যের যন্ত্রটার গতি কমে আসছে। বাবার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। কল্পনায় মায়ের মুখটা মনে করতে চাইলাম। কিন্তু তখন আমার সমস্ত চেতনা দখল করেছে একটা ভয়ংকর পাশবিক মুখ। যে মুখ রক্তশূন্য, জটের মতো চুল নেমেছে মুখের দু’ধার দিয়ে। তাতেই দেখা যাচ্ছে একজোড়া কোটরগত কালো চোখ। সেই চোখে স্পষ্ট নরমাংসের লোভ।
ঠিক সেই সময়ই খুব শব্দ করে কাছেপিঠে কোথাও একটা বাজ পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে একজনের বিকট চিৎকার শুনতে পেলাম আমি৷ জ্ঞান হারানোর আগের মুহূর্তে শুধু অনুভব করলাম প্রবল ধারায় বৃষ্টি নেমেছে, আর তারই মাঝে জ্বলে উঠেছে একটা আগুনের পিণ্ড। দাউদাউ করে জ্বলছে সেটা। আর সেই সঙ্গে ভেসে আসছে নারী কণ্ঠের তীক্ষ্ণ চিৎকার।
চোখ খুলে দেখলাম আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মানুদা আর দেবশঙ্করদা। মা একটা চেয়ারে বসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একজন রোগা চেহারার অচেনা মহিলা। হাত নাড়তে গিয়ে প্রচণ্ড ব্যথা লাগল। দেখলাম, স্যালাইনের চ্যানেল লাগানো আছে আমার ডান হাতে।
মানুদা জিগ্যেস করল, ‘এখন কেমন লাগছে রে দীপু?’
কষ্ট করে উত্তর দিলাম, ‘ভালো। কিন্তু কী হয়েছিল আমার ?
‘খুব বাঁচা বেঁচে গেছ ব্রাদার। কঠিন নিউমোনিয়া বাঁধিয়ে বসেছিলে। সাত সাতটা দিন তোমার জ্ঞান ছিল না। এই নাক-কান মলছি, এই লাইন আমি ছেড়ে দেব। না জেনে দুটো টাকার জন্য মস্ত বড় ভুল করে বসেছি আমি। কত বড় বিপদটাই না হতে পারত। এই বাড়ির ছোটছেলের বউ আমাকে কিছুই বলেনি, শুধু বাড়ি বেচে টাকাটা গুনে নিয়ে চলে গেছে৷’ কথাগুলো বলে উত্তেজনায় কপালের ঘাম মুছলেন দেবশঙ্করদা । তারপর অচেনা মহিলাটির দিকে দেখিয়ে বললেন, ‘উনি এই বাড়ির বড়ছেলে
সুকান্ত বসাকের মেয়ে সোমা বসাক। উনি তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলবেন বলে ‘এসেছেন।’
‘এই বাড়ি ছেড়ে আপনারা চলে যান।’ কোনও ভূমিকা না করেই কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন সোমা বসাক।
মা আর মানুদা সোমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে চাইল। মানুদা বলল, ব্যাপার বলুন তো? সব খুলে বলুন আমাদের।’
মহিলা কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল, ‘লোভ আর প্রতিশোধের এক করুণ কাহিনি লুকিয়ে আছে এই বাড়িতে। শুরুটা আমার বাবা-ই করেছিলেন। যার জন্য শেষ হয়ে গেছে আমাদের গোটা সংসার। কাকিমা তো শুধু প্রতিশোধ নিয়েছেন মাত্র! যতই হোক তিনি তো একজন মা। মা হয়ে সন্তানদের মৃত্যু তিনি সহ্য করতেন কীভাবে!
‘আমার ঠাকুরদার বাবা ছিলেন ছেনু বসাক। যাঁর নামে এই এলাকার রাস্তা। কাঁসা পিতলের বাসনের ব্যবসা করে ছেনু বসাক অনেক টাকা করেছিলেন। মারা যাওয়ার সময় তিনি একটা উইল করে যান। সেই উইলে লেখা ছিল—এ বাড়িতে যাদের পুত্র সন্তান জন্মাবে তারাই কেবল সম্পত্তির ভাগ পাবে। পুত্র সন্তান ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যাবে। কারও যদি কন্যা সন্তান হয় সে চিরকালই থাকবে অন্যের দাসের মতো।
‘আমার যখন চার বছর বয়স তখন কাকার বিয়ে হয়। বাবা কখনোই কাকার বিয়ে দিতে চাননি। কাকাও ছিলেন বাউন্ডুলে স্বভাবের। সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো ছাড়া তেমন কিছুই করতেন না। মগড়ার পরে যে তালাভু স্টেশন আছে সেখানে কাকা একবার ঘুরতে গেছিলেন। ফেরার সময় কাকিমাকে বিয়ে করে নিয়ে আসেন। এই ঘটনার পরে বাবা বেশ গম্ভীর হয়ে যান। তিনি আশা করেননি তার ভাই এমনটাও করতে পারে!
‘গরিব পরিবারের মেয়ে ছিলেন কাকিমা। কিন্তু তিনি এ বাড়িতে এসে সব যেন কানায় কানায় ভরিয়ে দেন। কাকিমা কাকাকে দোকান যেতে বাধ্য করেন, সংসারে থিতু করেন। কাকাও কাকিমার কথা মেনে চলতেন খুব।
‘বিয়ের দু’বছরের মাথায় কাকিমার গর্ভে সন্তান আসে। আমার মা’ও দ্বিতীয়বারের জন্য সন্তানসম্ভবা হয় কাকিমার পরেই। কিন্তু দুঃখের ঘটনা হল, ঠিক আড়াই মাসের মধ্যেই কাকিমার গর্ভের সন্তান মারা যায়। মিসক্যারেজ! মায়ের ক্ষেত্রে তেমন কিছু হয়নি, ঠিক সময়ই আমার ভাইয়ের জন্ম হয়
‘বাবার চালচলন বদলে যায় ভাই হওয়ার পরেই। দোকানে তিনি নিজের ভাইয়ের সঙ্গে মালিকসুলভ হাবভাব শুরু করেন। এর কয়েক মাস পরেই কাকিমা আবার কনসিভ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই সন্তানও তিনি ধারণ করতে পারেননি। এক রাতে প্রচণ্ড পেটের যন্ত্রণা শুরু হয় কাকিমার, রিকশায় করে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সব শেষ হয়ে যায়। বাচ্চাটাকে বাঁচানো যায়নি।’
কথা থামিয়ে রুমাল দিয়ে চোখ মুছলেন সোমা বসাক
একটু থেমে আবার নিজে থেকেই সোমা বলতে শুরু করলেন, ‘এরপর কাকিমা আস্তে আস্তে ভেঙে পড়তে থাকেন। আর অন্যদিকে বাবা আরও খারাপ ব্যবহার শুরু
করেন কাকার ওপর। ওদের কোণঠাসা অবস্থা হয়েছিল সেই সময়ে। বাড়ির কাজের লোককে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কাকিমাকে রান্না থেকে ঘর মোছা সবকিছুর ভার নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। ওইরকম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাওয়া একজন মহিলার ওপর বাবা কেন অমন আচরণ করতেন আমরা কেউই তা বুঝতে পারতাম না ।
‘কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও সত্যকে চেপে রাখা যায় না। এরই মধ্যে হঠাৎ করে একদিন জানাজানি হয়ে যায় ছেনু বসাকের উইলের বিষয়টা। কাকা জেনে ফেলেন নিজের দাদার স্বরূপ। দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রচণ্ড অশান্তি শুরু হয় ওই উইল নিয়ে। এই যুগে ওইসব উইল অচল, কাকা কোর্টে যাওয়ার হুমকি দেন। ঝগড়ায় ঝগড়ায় হঠাৎ বাবার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে আসল সত্যিটা।
‘কাকিমা যাতে কখনও মা না হতে পারেন সেই ব্যবস্থা করেছিলেন বাবাই। তিনি প্রথম সন্তান ধারণ করার পরেই বাবা নিমতলা ঘাটের এক সাধুর কাছ থেকে এমন একটা জিনিস এনে কাকিমাকে খাইয়ে দিয়েছিলেন যার প্রভাবে তাঁর গর্ভে সন্তান ধারণ করার ক্ষমতা চলে যায় চিরজীবনের মতো।
‘মায়ের জাত যখন রেগে যায় তখন সত্যিই প্রলয় নেমে আসে! কাকিমা এর কঠিন প্রতিশোধ নিলেন। নিজের গর্ভের সন্তান রক্ষা করার জন্য তিনি এক তান্ত্রিকের সাহায্য নিয়ে বাড়িতে এনে তুললেন এক পিশাচীকে। এদের বলে যক্ষিণী! এই অপদেবীরা মাতৃগর্ভকে রক্ষা করে নানা আপদ-বিপদ থেকে। বিশেষত তান্ত্রিক ক্রিয়ার কারণে যেসব অপশক্তি মাতৃগর্ভের ক্ষতি করে তাদের সে হত্যা করে। তবে কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রেই সেই পিশাচী বেশি মায়া পোষণ করে বলে শুনেছি এক তান্ত্রিকের মুখে। সেই পিশাচীকে বাড়িতে আনার পরেই কাকিমা আবার সন্তানসম্ভবা হলেন। ঠিক
সময় কাকিমার মেয়ে হল।
‘কাকিমার সেই সন্তান জন্ম নেওয়ার পরেই ধীরে ধীরে বাড়ির পরিবেশ বদলে যেতে লাগল। মা উঠোন পরিষ্কার করে রাখার পরেও কেউ সারা উঠোন জুড়ে এঁটোকাঁটা ছড়িয়ে নোংরা করে দিত। সন্ধে হলেই গা ছমছম করত বাড়িটার মধ্যে। কার যেন পায়ের শব্দ শোনা যেত। কে যেন গয়নার শব্দ তুলে সন্ধে থেকে রাত পর্যন্ত গোটা বাড়িময় হেঁটে বেড়াত। কিন্তু কাউকে দেখা যেত না।
‘বাবার মধ্যে আস্তে আস্তে পাগলামির লক্ষণ দেখা দিতে লাগল। দোকানে গিয়ে চুপ করে বসে থাকতেন বাবা! কাকা সেই সুযোগে পুরো ব্যবসাটা নিজের হাতের মুঠোয় করে নিলেন। কাকা আর কাকিমা এরপর একটা বাচ্চা ছেলেকে দত্তক নিয়েছিলেন। ‘অন্যদিকে বাবাকে ভুলে যাওয়া রোগে পেল। ভাই যতদিন ছোট ছিল ততদিন কিছু হয়নি, কিন্তু তেরো বছর বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাইও উন্মাদের মতো আচরণ করতে শুরু করল। প্রথম প্রথম ও সারাক্ষণ নিজের মনে বিড়বিড় করত, মনে হতো কারও সঙ্গে কথা বলছে। তারপর আস্তে আস্তে কাউকে একটা ভয় পেতে শুরু করল। শুধু বলত, “দিদি ওই মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছিস?” আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম ওর দিকে। কারণ ততদিন অবধি আমি কাউকেই দেখতে পাইনি কখনও।
‘মহিলারা বোধহয় সেই যক্ষিণী না পিশাচিনী কী যেন নাম বললেন, তাকে দেখতে পায় না। তাই না!’ মানুদা সোমা বসাককে থামিয়ে কথাটা বলে উঠল।
আর তা শুনেই সোমার মুখে হঠাৎ করেই ঘনিয়ে এল কালো মেঘ। তিনি একটা ঢোঁক গিলে বললেন, ‘আমি তাকে দেখেছিলাম। আর তারপরেই আমার জীবনের সব সুখশান্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমি ছাদের ঘরে পড়াশোনা করতাম। সেটা ছিল মাস্টার্সের ফাইনাল ইয়ারের কিছু দিন আগে। রাত তখন ক’টা হবে আজ আর মনে নেই। খুব মন দিয়ে একটা নোটস পড়ছিলাম। হঠাৎ মনে হল কারও একটা ঠান্ডা নিঃশ্বাস পড়ছে আমার মুখের ওপর।
“চোখ তুলে তাকাতেই আমার সারা শরীর অবশ হয়ে গেল। দেখলাম, খুব শীর্ণকায় একজন নারী আমার মুখের কাছে ঝুঁকে আছে। তার গায়ের রং অসম্ভব সাদা। জটের মতো লম্বা চুল ঝুলে পড়েছে সামনের দিকে। আমি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠতে গেলাম, কিন্তু মুখ দিয়ে চুঁ শব্দটাও বেরোল না।
‘এরপর মাঝেমাঝেই তাকে দেখতে লাগলাম সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার সময়। কারও হাতের খুব ঠান্ডা স্পর্শ পেতাম বাথরুমে গেলেই। আমার ভাইটা ধীরে ধীরে উন্মাদ হয়ে গেল। সে যেখানে যে ঠাকুর দেবতার ছবি বা মূর্তি পেত, ঘরে এনে তুলত। সারাদিন পুজো পুজো খেলায় মেতে থাকত। বিড়বিড় করে কীসব মন্ত্র পড়ত। দোতলার ঘরগুলোও ও এক সময়ে দখল করে নিল। আমাকে আর মা-বাবাকে ঘরের বাইরে বের করে দিল। সিঁড়িতে থাকতাম আমরা।
‘ভাইয়ের উন্মাদনা এরপর একদিন ভয়ঙ্কর রূপ নিল। মায়ের কাছে ও একটা পুজোর বই চেয়েছিল, মা সেটা ওকে না দেওয়ায় ও মায়ের মাথায় বঁটি বসিয়ে দিয়েছিল। ভাগ্যিস পাশের বাড়ির কাকিমা এসে মা-কে ঠিক সময়ে হাসপাতাল নিয়ে গিয়েছিল সেদিন! নইলে কী যে হতো…’ সোমা বোধহয় সেই দিনটা মনে করে শিউরে উঠলেন একবার।
পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘যেদিন ভাইকে অ্যাসাইলামে নিয়ে গেল, ভাই কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, “দিদি ওই মেয়েটা আছে৷ ও আমাদের মেরে ফেলতে চাইছে। আমাকে নানারকম খারাপ কাজ করতে বলে, আমি করি না বলে ও আমায় শেষ করে ফেলতে চাইছে।” ভাইকে নাকি সেই নারী শারীরিক প্রলোভন দেখাত !
‘ভাইকে অ্যাসাইলামে পাঠানোর কয়েক দিন পরেই বাবা মারা যান। আমরাও এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাই খবদার দিকে। ভাই মারা যায় অ্যাসাইলামে থাকতে থাকতে। তারপর এই বাড়িতে অনেক ঘটনা ঘটে। কাকার সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়, কাকিমা যে ছেলেটাকে দত্তক নিয়েছিল তার মধ্যেও পাগলামি দেখা দেয়।
‘শুনেছি ওই নীচের ঘরগুলোর মধ্যে একটায় রয়েছে সেই যক্ষিণীর প্রাণভোমরা। তাই কাকিমা ওই ঘরগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। জানি না সেই পিশাচীর হাত থেকে মুক্তির কোনও উপায় আছে কিনা! তাই আপনারা এখান থেকে চলে গেলেই মঙ্গল।’ সোমা বসাক কথা থামিয়ে দ্বিতীয়বার চোখের জল মুছলেন। আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কোনও উপায়ই কি নেই?’
সোমা আমার দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করেছিলাম। তান্ত্রিক ডেকে আনা, জ্যোতিষীদের মতামত নেওয়া—কিছুতেই কিছু
হয়নি। তান্ত্রিক অনেক খুঁজেও পিশাচীর সেই প্রাণভোমরা খুঁজে পাননি। তিনি বলেছিলেন, শিকড় সুদ্ধ গাছ উপড়ে না ফেললে হবে না। শিকড়টাই না পাওয়া গেলে গাছ ওপড়াবে কী করে ?
‘কাকিমাও শেষে আর সহ্য করতে না পেরে বাড়ি বিক্রি করে চলে যান। কাকিমা বলেছিলেন, সেই যক্ষিণীর বীজ নাকি কাকুই নীচের ঘরে কোথাও পুঁতেছিল। আমরা এ বাড়িতে থাকাকালীন আমাদের জানানো হয়নি সেটা কোথায়। পরে কাকিমাও যখন বিপদে পড়েন, কাকু তো তখন কিছু মনে করার অবস্থাতেই ছিলেন না। কারণ, তিনি তখন পক্ষাঘাতে পঙ্গু।
‘নিজের ডেকে আনা বিপদে কেমন নিজেই জড়িয়ে গেলেন কাকিমা। ঠিক যেমন আমার বাবাও নিজের পাপের মাশুল গুনেছেন জীবনের শেষ দিন অবধি! তাই সাবধান করছি, এই অভিশপ্ত বাড়িটা ছেড়ে চলে যান।’ একটানা অনেকক্ষণ কথা বলার পর থামলেন সোমা বসাক। আমরাও সকলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলাম।
এই ঘটনার কয়েকদিন পরেই ওই বাড়ি ছেড়ে আমরা রাজবল্লভ পাড়ার একটা ভাড়া বাড়িতে উঠে গেলাম। উত্তর কলকাতার অমন জায়গায় বাড়ি পড়ে থাকে না৷ এক প্রোমোটার আশেপাশের বাড়ির সঙ্গে ওটাও কিনে নিলেন কিছুদিনের মধ্যে। যা দাম পেলাম তাতে ডানলপের দিকে একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেললাম আমি।
এরপর মাঝখানে অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। ছেনু বসাক লেনের সঙ্গে সব যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেছে বহুদিন। আজ অনেক বছর পর রাজবল্লভ পাড়ায় এসেছি পিসেমশাইয়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে! বিকেলের দিকে বাড়ি ফেরার পথে কী মনে
হতে বিডন স্ট্রিটের দিকে চলে গেলাম। এলাকাটার ভোল বদলে গেছে একেবারে। ছেনু বসাক লেনে একের পর এক বিশাল বিশাল অট্টালিকা গজিয়ে উঠেছে৷ সিগারেট ধরিয়ে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম। চা-দোকানির সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করলাম। লোকটা কথায় কথায় বলল, দশ এগারো বছর আগে আশেপাশের সব পুরোনো বাড়ি ভেঙে মস্ত হাউজিং কমপ্লেক্স হয়েছে। ভিত করার জন্য যেদিন মাটি খোঁড়া হচ্ছিল সেদিন ভিড় জমে গেছিল চার নম্বর বাড়িটার সামনে। পুলিশও এসেছিল। মাটির নীচ থেকে কালো একটা থলে পেয়েছিল মিস্ত্রিরা। সেই ছিঁড়েখুঁড়ে যাওয়া থলে থেকে বেরিয়ে এসেছিল রুপোর মল পরা একজোড়া কঙ্কালের পা। এলাকার ঠাকুরমশাই বলেছিলেন এ জিনিস দিয়ে নাকি গৃহ্য তন্ত্রমন্ত্রের কাজ করা হয়।
এতদিনে তাহলে এই অভিশাপের শেষ হল। অবশেষে পাওয়া গেল যক্ষিণীর প্রাণভোমরা! দোকান থেকে বেরিয়ে এসে মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম বড় রাস্তার দিকে।
