Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025

    মহাভারতের একশোটি দুর্লভ মুহূর্ত – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025

    যখন নায়ক ছিলাম – ধীরাজ ভট্টাচার্য

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কয়েদি – তিলোত্তমা মজুমদার

    তিলোত্তমা মজুমদার এক পাতা গল্প149 Mins Read0

    কয়েদি – ১

    ১

    এই ঘর তার জন্য। অন্য কতজনের ছিল ইতঃপূর্বে। কোনও অন্ধকারে পোকায় কাটা জাবদা খাতায় তাদের ঠিকুজি কুলুজি লেখা আছে এমনটাই স্বাভাবিক। মা কে, বাপ কে, বউ কোথায়, নাম কী, পেশা কী, বাচ্চাকাচ্চা কয়টি ও কী কী। বউ যদি না থাকে, কেন নেই? নাকি ছিল, ছেড়ে চলে গেছে? চোদ্দোপুরুষের প্রসঙ্গ ওই খাতায়। পরিবারে কারো অপরাধের ইতিহাস আছে? ঠিক এভাবে জিজ্ঞেস করে না, বলে, ফ্যামিলিতে কারো ক্রাইম হিষ্ট্রি আছে?

    উন্মাদের চিকিৎসালয়েও এবংবিধ প্রশ্ন করা হয়। বস্তুত, উন্মাদ আর অপরাধীর যে অণুপরিমাণ তফাত, তা নির্ণয় করা মহাশক্ত। উন্মাদের ক্ষেত্রে অবশ্য বংশ আসে। পরিবার না, ফ্যামিলি না, সোজা বংশ। বংশে কেউ পাগল ছিল?

    এই তথ্যসমূহ নিশ্চয় সভ্যতা, সমাজ ও সংস্কৃতির পক্ষে অপরিহার্য,নইলে এতসব জানতে চাইবে কেন? কিন্তু তথ্যসংগ্রাহকের ভাবখানা এমন যেন একজন অপরাধ করে ফেলেছে, তার অর্থ, এর মৃত পূর্বজনেরা সব পাপী, জাত অথবা অজাত ভবিষ্যের প্রজন্ম পাপ, অন্যায়, অপরাধের কাণ্ডারি। আরে, ঠাকুরদাদার বাবার নাম কেউ মনে রাখে না, বংশে পাগল ও পাপী ছিল কি না, তা কে বলবে? তদুপরি, পাপ ও পাগলামি, দুইই লুক্কায়িতভাবে করা যায়। বিশেষত, অন্যায়, অবিচার, অপরাধ, পাপ মনুষ্যে সাক্ষীসাবুদ ডেকে, ইতিহাস লিখে সম্পন্ন করতে কখনো আগ্রহী নয়। আর পাগলামির চেয়ে গোপনীয় আর কী আছে? যে উন্মাদনা প্রকাশ্য, তা ব্যক্তিক হলে লজ্জা। অসম্মান। ব্যঙ্গ। হতাশা। সেইসঙ্গে দুর্বহ বোঝাও বটে। অতএব, পূর্ণাঙ্গ পাগল ঘুরে বেড়ায় পথে পথে। কিংবা শেকল-বাঁধা দশায় কোনও ঠিকানাহারা ঘরে।

    আর যে উন্মাদনা সামষ্টিক, তার ক্ষমতা সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ। কে তাকে ধরে রাখবে? কে করবে নিরাময়ী শুশ্রূষা? কে রোধ করবে অবধারিত ভাঙন ও বিধ্বংস? কে তাকে বলবে শুদ্ধ মানবতাবিরোধী পাগলামি?

    ওঃ! বীভৎস তথ্যসমৃদ্ধ খাতা। আর ওই খাতা কখনো আলোয় থাকতে পারে না। অন্ধকার ভেদ করার শক্তি ধরে আলোকরশ্মি এবং কতিপয় অন্তর্ভেদী চোখ। এবং ভেদমাত্র বহু বিশুদ্ধ সত্য, মিথ্যের মিশ্রণে পুনর্গঠিত সত্য, আদৌ যা সত্য ছিল না, সেই সত্যাসত্য উন্মোচিত হয়। সে ভয়ানক ব্যাপার।

    বিশুদ্ধতা কী?

    বিশুদ্ধি কীভাবে নির্ণয় করা যায়?

    কে ঘটনার শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা নির্ধারণ করে?

    কী তার প্রক্রিয়া?

    বিশুদ্ধতা কি আদৌ অস্তিমান? শুদ্ধ সত্য। বিশুদ্ধ বায়ু। নির্মল সত্য। বিশুদ্ধ হৃদয়। অমল সত্য। অস্ত্রোপচারের বিশুদ্ধ উপকরণ। বিশুদ্ধ সত্য। বিশুদ্ধ জল। সত্য। সত্য। সত্য। এহ, তিন সত্য?

    সত্য? সত্যই বা কী? সত্য ঘটনা। সত্য বর্ণনা।

    সত্য কীভাবে গণনা করা যায়?

    সত্য আর মহাশূন্যতা কি একাকার নয়? এই দুইয়ের পক্ষে বিশেষণ কি অর্থহীন নয়?

    অন্তরীক্ষের ওই অন্তহীন মহাশূন্যতায় যত তারা জ্বলে, সকলই বিশুদ্ধ সত্য নয়। বহু মৃত নক্ষত্র কালের পথবাহী মিথ্যার অস্তিত্ব।

    সে কেমন? সে কী?

    সে হল জীবনের মরীচিকা। মৃত অতীতীভূত জ্যোতিষ্কের ছবি মাত্র। যেমন দর্পণে প্রতিবিম্বিত মুখ। তুমি দেখো, এক অন্য তুমি। কিন্তু সে অনস্তিত্ব। আলোর কৌতুকক্রীড়া। এক বারান্দায় একটি আয়না রাখা ছিল। ছোটো। ওই, দাড়ি কাটার জন্য এক কৃপণ আয়না। একটি মোরগ দাঁড়াল তার সামনে। অমনি দেখে, এইয়ো, আরও এক মুশকো মোরগ। দিল ঠুকরে। তৎক্ষণাৎ প্রতিবিম্বও দিল পালটা ঠোকর। ঠোঁটে ঠোঁট। চোখে চোখ। বুকে বুক। মুখে মুখ। এ ডানা ফাঁপায়, নিমেষে সে-ও। লেগে গেল মাংসরক্তহাড়চামড়া পালক ইত্যাদির সঙ্গে আলোকপিণ্ডের লড়াই। এর হাতে চাক্কু বেঁধে দিলে ওর হাতেও চাক্কু। দক্ষিণপন্থা আর বামপন্থার গোলমাল ছাড়া আর সব হুবহু।

    আলোর পিণ্ড কি সত্য সম্ভব?

    ওহ ওহ রিঙ্গণে সক্ষম শিশু মেয়ে, চতুষ্পদী ছুটে ছুটে গতিময়তায় বিভোর, হাসছে খলখল কলকল। গাছপালার ফাঁক দিয়ে ঢুকেছে রোদ্দুর, খণ্ড খণ্ড রোদ্দুরের পিণ্ড। মেয়ে সেগুলি তুলে নিচ্ছে করতলে। যতবার তোলে ততবার গড়িয়ে যায় যেমন ছিল তেমন। এক লিঙ্গবান, থাকত পাশের বাড়ি, রোদ্দুর-কুড়ানি শিশুমাংস দেখে লোলুপ কামুকতায় ধরল চেপে, নরম আর ফুটো, নরম আর ফুটো, নরম আর ফুটো, মাত্র একটা ফুটোর মধ্যে অধীর অসংযত শিশ্ন বিদ্ধ করার তীব্র তাড়নায় সেই কলকলে খলখলে শিশু মেয়েকে নারীকল্পে পরুষ হাত করে দিল রক্তাক্ত, ঘাড় ভেঙে লটকানো, মৃত্যুনীল, নরম নরম মাংসের পিণ্ড। তারপর…

    সত্য। সত্য। এই সত্য। নির্মম সত্য। কে বলে, কে বলে সত্যের বিশেষণ নেই?

    নেই।

    কারণ?

    কারণ সত্য মাত্রই নির্মম। সত্য মাত্রই বিশুদ্ধ, অবিমিশ্র। তাই সত্য বলে কিছু নেই।

    মোরগের গল্পটা সত্যি না?

    একেবারে নির্ভেজাল সত্যি।

    নির্ভেজাল। নির্মম লাগছে না তেমন।

    নির্মম। নিষ্ঠুর। মিথ্যে মোরগের সঙ্গে সত্যি মোরগের যুদ্ধটা সত্যি। ফলে মিথ্যের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে, যুঝতে যুঝতে, মোরগটা ধ্বস্ত, শ্রান্ত, বিভীষিকাগ্রস্ত।

    এর মধ্যে ভয় আসে কোত্থেকে?

    ভয় নয়, ত্রাস। কারণ যুদ্ধ শুরু হল কিন্তু সে জানলই না সে বিজয়ী, না পরাজিত। নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইয়ে ভীষণ ভয়। যখন তুমি জানোই না, তুমি সর্বস্ব দিয়ে লড়ছ আসলে তোমারই বিরুদ্ধে।

    মোরগটা বোকা।

    তা হতে পারে। মোরগের ওইটুকু মাথায় আর কত বুদ্ধি ধরা সম্ভব।

    মোরগের গল্পটা একটা সিংহের গল্পের মতো। সেই যে এক হরিণবাচ্চা খেতে চাইল সিংহ, তখন, কুয়োর মধ্যে আরও পরাক্রমশালী এক কেশরীর বাস, এই বলে পশুরাজকে হরিণ নিয়ে গেল কুয়োপাড়ে, আর জলে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে লড়াই করার জন্য পশুরাজ দিল লাফ ইত্যাদি ইত্যাদি।

    ওটা কি হরিণ ছিল, না খরগোশ?

    শেয়াল হলেই বা কী।

    গল্পটা কাঁচা।

    কেন?

    হরিণ বা খরগোশ, বা শেয়ালের প্রতিবিম্ব সম্পর্কে ধারণা আছে, আর সিংহ শুধু অজ্ঞ?

    যুক্তি আছে। তবে শোনা যায়, দেহবল বেশি হলে বুদ্ধিবল হ্রাস পায়।

    শোনা তো অনেক কিছুই যায়। যেমন, যুধিষ্ঠির নামে একজন রাজা ছিল, সে সবসময় সত্য বলত। যত্তসব।

    সে আবার কী! যুধিষ্ঠির যত্তসব কী করে হয়?

    এইজন্য হয়, সদা সত্য কেহ বলিতে পারে না। সদা সত্য বলিবে শেখাতে হয় কেন? কারণ, কেহ সদা সত্য বলে না।

    মোরগের গল্পটা?

    সম্পূর্ণ সত্য। নিজের চোখে দেখা।

    তুমি যা দেখিবে তাহাই সত্য।

    তুমি যা রচিবে তাহাই সত্য।

    ঘটনাই কি সত্য? নাকি সত্যই ঘটনা?

    ঘটনা, ঘটনা। সত্য, সত্য।

    সত্য ঘটনার তবে কী গতি? কিংবা ঘটনার সত্যতা?

    সত্য ঘটনা মায়া। ঘটনার সত্যতা বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের সমাহার।

    সত্য মায়া? এ কি সত্য?

    সত্য, সকলই সত্য। যাহা আমরা বিশ্বাস করিতে চাই তাহাই সত্য।

    মিথ্যাও কি আমরা বিশ্বাস করিতে চাই না?

    মিথ্যা আমরা বিশ্বাস করাতে চাই।

    তাহলে কি আমার মিথ্যা, তোমার সত্য?

    একটা বটবৃক্ষ বেশ বেড়ে উঠেছিল। চমৎকার সবুজ ডালপালা। কত পাখি আসে। বসে। গান গায়। কত পথিক, ফিরিওয়ালা, ফুচকাওয়ালা, রিকশাওয়ালা তার নীচে বিশ্রাম নেয়। সেই বটের ঠিক পিছনে একটা উঁচু বাড়ি। এক নারী সেখানে বন্দিনি। বাইরে বেরুবার অধিকার নেই কারণ স্বামীর সন্দেহবাতিক। সে স্বামী রাখে, না স্বাধীনতা? স্বামী খেতে-পরতে দেয়। আদর করে। বিবাহবার্ষিকী বা জন্মদিনে উপহার বরাদ্দ। মাঝে মাঝে নামকরা রেস্তরাঁ থেকে খাবার। শুধু, কোনও পুরুষের চোখে চোখ রাখলেই স্বামী হারামির মতো আচরণ করে। নারী একবার কাগজওয়ালার বিল মেটাতে গিয়ে অসাবধানে লোকটার চোখে চোখ রেখেছিল, কারণ বিলের পরিমাণ বিষয়ে তার মনে প্রশ্ন জাগে, সেই সঙ্গে, হিসেব বুঝে নেবার কালে, বুঝি-বা, কাগজওয়ালার সঙ্গে তার একটু হাত ছোঁয়াছুঁয়ি ঘটে। স্বামী সেই স্পর্শ কামমোহিত বলে বিশ্বস করল, তার কাছে সেই সত্য হল, ফলে, অপর এক সত্য, দামি চামড়ার জুতো দিয়ে পিটিয়ে নারীর চামড়া ফাটিয়ে রক্তাক্ত করে দিল স্বামী। তাহলে কি স্বামী যে তাকে আদর করে, তা মিথ্যা ভালোবাসা? ছদ্ম? ছদ্মের প্রতীকায়িত রূপ সত্য। আর ভালোবাসা ছদ্ম ছিল না। কারণ, প্রহৃত হতে হতে নারী ভাবছিল, এই সন্দেহ আসলে প্রেমের উন্মাদনা, প্রণয়ের অধিকার। তারপর যখন স্বামী নিজেই তার ক্ষতয় প্রলেপ, তখন ভালোবাসা সত্যি সত্যি সত্যি, তিন সত্যি।

    আসল কথায় আসা যাক।

    সব কথাই আসল কথা। তুমি কোন কথা আসল বলো?

    বটগাছ।

    না। আসল ছিল সত্য ও মিথ্যা।

    না। প্রকৃত বিষয়, নারী স্বামী রাখে, না স্বাধীনতা রাখে?

    ওঃ, নারী সত্য। বটগাছ সত্য। স্বামীর প্রেম সত্য। শুধু স্বাধীনতা বলে জগতে কিছু নেই, এই ভাবনাও সত্য হল। এই পৃথিবী আসলে এক বিপুল জেলখানা, বিশ্বাস করল সেই নারী। কিন্তু জেলখানা থেকে, খাঁচা থেকে, বন্ধন থেকে বেরুতে চাওয়া যে অপর এক সত্য। তাই, সেই নারী জানালার কাছে দাঁড়ায়। দেখে বটগাছ বাড়ছে। বেড়েই চলেছে। সে ভাবে, আর কয়েক বছর, তারপরেই গাছ জানালার কাছে এসে যাবে। তখন গাছ স্পর্শ করবে সে। আর কাউকে ছুঁতে খুব ইচ্ছে করে। আর কাউকে একেবারে কাছ থেকে দেখতেও খুব ইচ্ছে করে।

    তারপর?

    সে বটগাছের প্রতি তার কামনা নিবেদন করে। বলে এসো, আর-একটু কাছে এসো। আমার কাছে এসো। বিস্তার করো তোমার সবল শাখা। স্বাধীন পাখিরা এসে বসুক আমার জানালার কাছে, তোমার ডালে।

    বটগাছ কী বলত তাকে?

    বলত, আসছি। আমি আসছি। দু-দণ্ড দাঁড়াও। একদিন সক্কাল সক্কাল হল কী…

    কী হল? কী হল? স্বামী কিছু করল?

    বিদ্যুৎ দপ্তরের লোক এসে গাছের মগডাল থেকে শুরু করে ওপরের যত শাখা দিল কেটে।

    ওঃ।

    সেই নারী বৃক্ষচ্ছেদনের শব্দ পেয়ে জানালার কাছে এসে ওই ছিন্ন শাখা দেখে আর্তনাদ করে বলল, এ কী? এ কী? এই, এই, শুনছ? শুনতে পাচ্ছ? তোমরা গাছ কাটছ কেন? বিদ্যুতের তারে গাছ লাগছে বউদি। না কাটলে চলবে? অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যাবে তো।

    তারপর?

    স্বামী এল। বলল, ওরা ঠিক কাজই করছে। তুমি ফোপরদালালি করছ কেন? এক রিকশাচালক, বৃদ্ধ, জীবনের অনেকখানি দেখে নেওয়ার পর সে মদ্যপান করত হরদম এবং তখন সে হয়ে উঠত নির্ভীক, বলল, মাথার ওপর ছাতা হল বটবৃক্ষ, একটু বসতুম, গরমে ছায়া পেতুম, সইল না। এক পরিবেশপ্রেমী ছিল পাড়ায়। সে এসে বলল, বিদ্যুতের তার অন্যভাবেও আলাদা করে দেওয়া যায়। তার জন্য এভাবে গাছ কাটার কী দরকার? পুকুর বুজিয়ে ফেলা হচ্ছে, গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, প্লাস্টিকে অকেজো হয়ে যাচ্ছে নিকাশী ব্যবস্থা। এক চক্রান্তের বেষ্টনী সমাজকে খেয়ে ফেলছে। এর থেকে মুক্তির উপায় কী?

    সেই নারীর কী হল?

    কে জানে? কিন্তু একটা বটগাছের শাখাকর্তন কতগুলি সত্য ব্যাখ্যা করল? ওই নারীর কাছে বটগাছ মুক্তির আকর্ষণ ছিল, শাখার ছেদন তার পক্ষে মর্মঘাতী, বিদ্যুৎ দপ্তরের লোকের কাছে ওই কর্ম নীতিঋদ্ধ, দায়িত্বিক। রিকশাচালকের কাছে ওই কর্ম অন্যায়, অবিচার, বুঝি বা সর্বহারার ওপর ধনিকশ্রেণির হৃদয়হীন শোষণের মতো, যা কমিউনিস্ট সত্য। আবার ধনতান্ত্রিক সত্য এই যে, রিকশাওয়ালা হুকিং করে বিদ্যুৎ চুরি করছে, অন্যের প্রাণ বিপন্ন হতে পারে জেনেও নিজের ছায়া পাবার স্বার্থ তাকে তাড়িত করে, সে দিনে পরিশ্রম করার পরিবর্তে সুরাপান করে ঘুমোতে চায়, এরা সামাজিক সম্পদ বিকাশের অন্তরায়।

    আরও কিছু বলবে নাকি?

    ওই নারী, যে স্বামী বেছে নিয়ে স্বাধীনতা বিসর্জন শ্রেয় ভাবছে, যে মনে করে জগৎ এক অনন্ত অসীম কারাগার, এই গৃহ হতে বাইরে তার জীবিকা কী হবে? কে তাকে খাওয়াবে? যদি খাওয়ায়, তার বিনিময়ে সে কী চাইবে? যদি কোনও ব্যবস্থা করা না যায়, সে কি বিশ্বজোড়া ব্রথেল বা যৌনপল্লির বাসিন্দা হয়ে যাবে না? সেই ভয়ংকর শৃঙ্খল সে বইতে পারবে কি? সে অনুমান করেছে, স্বামী লোকটির শৃঙ্খল তুলনায় বহন করা সহজ। এর মধ্যে সমাজ ও আইনের জলছাপ আছে।

    আর?

    স্বামীর সন্দেহপ্রবণতা যে মানসিক অসুস্থতা, এই সত্য নারী গ্রহণ করে না। এই সত্য তার কাছে মিথ্যা হয়ে যায়। তাহলে বটবৃক্ষজনিত সত্য একেক দৃষ্টিকোণে একেক স্বরূপে সত্য, এক অসুস্থতা যুগপৎ সত্য ও মিথ্যা। তাহলে কি এই দাঁড়ায় না, তুমি যা রচিবে তাহাই সত্য। তুমি যা বিশ্বাস করিবে তাহাই সত্য।

    মাঝে মাঝে নিজেকে কেমন ধোঁয়া-ধোঁয়া মনে হয় না? সত্য কি তাহলে ধোঁয়া? শীতের বিকেলে মাটির কাছাকাছি জমাট হয়ে থাকে, সন্ধ্যার কুয়াশায় ভিজে ওঠে, রাত্রির শিশিরে ধুয়ে যায়। সব মিলে হয়ে ওঠে ঘটনা।

    সত্য নিরাকার। স্থানকালব্যক্তি নিরপেক্ষ। ঘটনা বিচ্ছিন্ন তথ্যের সমন্বয়। সত্য ঘটনা অর্থ অনেক নির্ভরযোগ্য তথ্যসমাহার।

    তা-ই হবে। বেশি ভাববার কী দরকার? ভাবনাচিন্তা হল অশেষ ও অসীম অন্ধকার গুহায় ঢুকে পড়ার মতো।

    ভাবনা আলোর মতো। যখন দেহ আছে, মন আছে, বুদ্ধিও বর্তমান, কিন্তু শুধু একটা কুঠুরিতে বসবাস, তখন চিন্তন আলো, চিন্তন উত্তাপ, চিন্তাই জীবন।

    অন্ধকার ঘরে সেই এক জাবদা হিসেবের খাতা কি এই জীবন ধারণ করে না? সেই জীবন কি সত্য নয়?

    সত্য ও মিথ্যা। শুদ্ধ ও ভ্রান্ত। রুপোলি পোকারা এবং বল্মীক কীট তা জানে।

    আর জানো তুমি।

    অনেক বছর আগে অগণিত সত্য, অর্থাৎ সত্য ঘটনা, যার আসল সংখ্যা কারো কারো জানা ছিল কিন্তু সেগুলি মিথ্যের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়, ফলে তথ্যের মর্ম অগুনতি কল্পসংখ্যায় রূপান্তরিত, সেই সমস্তই এক সুগভীর কুয়ো খনন করে, সেই কুয়োয় যখন তলানি ভূত্বকের কঙ্কাল দেখা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে, সেই গণনাতীত সত্যগুলি নিক্ষেপ করে অত্যন্ত ভারযুক্ত ও নির্ভরযোগ্য ধামা চাপা দেওয়া হয়। এই ঝুঁকিপূর্ণ বিরক্তিকর কর্ম সমাধা করার উদ্দেশ্য অচিরেই সফল হয়। সত্য সকলই সত্য স্মরণাতীত হয়ে গেল।

    সত্যে ভেজাল?

    দিন যায় দিন যায়। কত দিন, কারো হিসেব রাখার দরকার পড়েনি, ওই গভীর ভূস্তরে নানাবিধ গলিত, অর্ধগলিত, কঠিন বাস্তবের সঙ্গে থাকতে থাকতে সত্যগুলি বস্তুত অতি ক্ষমতাশালী ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে। ক্ষমতা যত বাড়ে ক্ষুধাও বাড়ে তত, এই নিয়ে সত্যজগতে কিছুমাত্র সংশয় ছিল না। সুতরাং ভেজাল ও নির্ভেজাল সত্যগণ কী খাই কী খাই করে হন্যে হয়ে বুভুক্ষু সব ওই কুয়ো থেকে গলগল করে পিলপিল করে বেরিয়ে পড়তে লাগল। কারণ সত্যকুল বলসংগ্রহ করলে অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ে, তাই ওই সেই ভারী ও নির্ভরযোগ্য ধামা টুকুস করে তুলে ফেলা কিছুই সমস্যা হল না। তারা বেরিয়ে পড়ল এবং নির্বিচারে চোখ খেতে লাগল। সে এক ঐতিহাসিকভাবে ঘটে-চলা জঘন্য ব্যাপার। জনগণ সব দৃষ্টিহীন হয়ে যাচ্ছে। সবাই পরস্পরকে সন্দেহ করছে। দায়ী করছে। যে মিথ্যাকে সত্য বলে চালাবে, তারও দৃষ্টি নেই। সে নিজেই মিথ্যা ও সত্যের হাতে লোফালুফি হয়ে যাচ্ছে। প্রতারকের এর চেয়ে বড়ো শাস্তি অথবা পরাজয় আর কী হতে পারে?

    যে প্রতারক, প্রাপ্ত শাস্তিকেও সে প্রতারিত করে নিজের অনুকূলে ব্যবহার করে।

    সুযোগ পেলেই ছোবল আর বিষদাঁত?

    নাহ। শুধু সাপের মতো কেন হবে? বেচারা নিরীহ প্রাণী।

    তাহলে মানুষই মানুষের উদাহরণ হয়ে থাক।

    আব্বার কী? দিব্য দেখা যায় কে কার চোখ খুবলে নিচ্ছে। গলগল করে সত্য অসত্য কুয়ো থেকে বেরিয়ে যাবার পরেই কলঙ্ক, কুৎসা, স্ক্যাম, কোজেনেজ, সোনার ইট, প্রতারণা, কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি, যড়যন্ত্র, আসাধুতা, ভ্যানসিপ্পু। একেবারে মহাকাণ্ড। পিলপিলপিলপিলপিলপিল।

    সেই মহাকাণ্ড ঘটে যাবার পর সব জাবদা খাতা অন্ধকারে রাখা থাকে। মানবজাতির প্রগতি ও সভ্যতার এ এক আহরণ বটে। কেউ জানতে চাইলেই বলা হয়, সব আছে, একদিন সব অন্ধকার সরে গিয়ে পরদা ফাঁস হয়ে যাবে। অথচ পরদা ফাঁস হওয়ার আগেই কত লোকের বেমালুম ফাঁসি হয়েছে। কত নতুন সত্য ও নতুনতর মিথ্যা গভীর কূপান্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। নবাবিষ্কৃত দুর্ভেদ্য ধাতু দ্বারা নির্মিত ধামা চাপা দিয়ে প্রবাহিণী নদীর মুখ ঘুরিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে এই অভিমুখ আদি ও অকৃত্রিম। জোর গলায় বলতে পারলে, যা বলা হল, কিছুদিনের জন্য হলেও তা-ই সত্য। একেই বলা হয় বিজ্ঞাপন। ঢাক ঢাক ঢাক ঢাক গুড় গুড় গুড় গুড়। আমি আমি আমাকে দেখো আমাকে কেন আমি সত্য আমি অবিমিশ্র আমি আসল সুতি আমি আসল রেশম আমি আসল জনদরদি আমি সেরা দেশপ্রেমিক। দেশ ছাড়া কিছুই বুঝি না।

    হুমম দেশপ্রেম একেবারে নির্ভেজাল জিনিস।

    নির্ভেজাল।

    খুব আকর্ষণীয়।

    খুব।

    বাজারদর দারুণ।

    সাংঘাতিক।

    তাই প্রতিযোগিতাও খুব।

    বাজার থাকলে হাড্ডাহাড্ডি তো হবেই।

    দেশপ্রেম খাঁটি। প্রেমিক কি খাঁটি?

    বলা কঠিন। খাঁটি মধু কি গাঁজিয়ে যায় না?

    কিন্তু, দেশপ্রেম খাঁটি হলে কি স্বাধীন দেশের পক্ষে চিন্তার বিষয় নয়?

    বুঝলাম না।

    পরাধীন দেশে দেশপ্রেম স্বাধীন ও ন্যায়িক, স্বাধীন দেশে তা শৃঙ্খলিত, সন্দেহের অন্তর্গত, ন্যায়ের পক্ষে অতি সূক্ষ্ম।

    সে কীরকম?

    পরাধীন দেশে ব্রিটিশ হত্যা করেছে বলে স্বাধীন দেশ মূর্তি গড়ে, মালা দেয়, ইতিহাসের পাতায় ছবি রাখে, ছোটোদের দেশপ্রেমে উদবুদ্ধ করতে জীবনী পড়ায়। স্বাধীন দেশে নেতা-মন্ত্রী হত্যা করো, ফাঁসি হবে, দেশদ্রোহী বলে দেগে দেবে, জাবদা খাতায় তোমার চোদ্দোপুরুষ অপরাধী ছিল লিখে রাখবে। তোমার সন্তানের হাতে উলকি করে দেবে—মেরা বাপ চোর হ্যায়। মেরা মা রেন্ডি।

    কারণ?

    পরাধীন দেশে দেশপ্রেম মানবিকতার সর্বোত্তম উৎকর্ষ। স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ামাত্র রাষ্ট্রপ্রেম পুরস্করণীয়। দলপ্রেম কাম্য ও ক্ষমতাপ্রণেয়। দেশপ্রেম ব্যাধি। অথবা নির্বোধি। অথবা দেশদ্রোহিতা। অথবা সবই।

    দেশ স্বাধীন হলে দেশপ্রেমের মৃত্যু ঘটে?

    না। সংজ্ঞা বদলে যায়। তবে আদিরূপের যে ক্ষীণ ধারা অমর অশ্বত্থামার মতো বেঁচে থাকে কোনও কোনও হৃদে, তা এক ব্যাধি যে, তাতে কোনও দ্বিমত থাকতে পারে না।

    অনেকেই এর বিরুদ্ধে আপত্তি ও অনাস্থা জ্ঞাপন করবে।

    কেউ আপত্তি করতে পারে। কিন্তু আপত্তি করা মানেই সে বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয়, তা প্রমাণ হয় না। আপত্তি বা সমর্থন, দুইই, না অবিমিশ্র, না নির্ভেজাল। এরা অবশ্যই শর্তাধীন ও স্বার্থযন্ত্রের প্ররোচনাসাপেক্ষ। বিশেষ দেশপ্রেম অত্যন্ত মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ অসুখ। তার পক্ষে-বিপক্ষে মিথ্যাচারের অলঙ্ঘ্য স্তূপ। সুতরাং প্রশ্ন উঠতেই পারে, গুচ্ছ মিথ্যাভাষণে দেশপ্রেমের কোন পরিচয়?

    যদি মিথ্যাচার করি, সে-ও দেশের ভালোর জন্য। বিশ্বাস রাখতে হবে।

    শুধুই মিথ্যাচার?

    যদি কাউকে নির্যাতন করি, বিশ্বাস রাখতে হবে, দেশের ভালোর জন্য।

    শুধু নির্যাতন?

    যদি হত্যা করি, বিশ্বাস, বিশ্বাস, দেশের ভালোর জন্য।

    ব্যক্তিহত্যা, না গণহত্যা?

    যেকোনও।

    কোনটি অধিক ন্যায়ধর্মী?

    যেকোনও।

    কী উপায়ে হত্যা নীতিসম্মত? একটা বুলেট? নাকি একটু একটু করে মারা? পীড়ন করে। সন্ত্রাসে। বহু পুরস্কারের সম্ভাবনা ঝুলিয়ে।

    হত্যার উদ্দেশ্য দ্বারা পদ্ধতির নির্বাচন করতে হয়।

    রাষ্ট্ররক্ষাকল্পে সমস্ত হত্যাই তবে ন্যায়িক?

    নিশ্চয়। কারণ রাষ্ট্র দেশপ্রেমিক, দেশহিতৈষী, দেশপরিচালক, আইন ও নীতিসম্মত সত্তা।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleগল্পসমগ্র – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    Next Article রাজপাট – তিলোত্তমা মজুমদার

    Related Articles

    তিলোত্তমা মজুমদার

    শামুকখোল – তিলোত্তমা মজুমদার

    August 25, 2025
    তিলোত্তমা মজুমদার

    অর্জুন ও চারকন্যা – তিলোত্তমা মজুমদার

    August 25, 2025
    তিলোত্তমা মজুমদার

    ঝুমরা – তিলোত্তমা মজুমদার

    August 25, 2025
    তিলোত্তমা মজুমদার

    নির্জন সরস্বতী – তিলোত্তমা মজুমদার

    August 25, 2025
    তিলোত্তমা মজুমদার

    বসুধারা – তিলোত্তমা মজুমদার

    August 25, 2025
    তিলোত্তমা মজুমদার

    রাজপাট – তিলোত্তমা মজুমদার

    August 23, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025

    মহাভারতের একশোটি দুর্লভ মুহূর্ত – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025

    যখন নায়ক ছিলাম – ধীরাজ ভট্টাচার্য

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.