Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    বউ – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

    মহাশ্বেতা দেবী এক পাতা গল্প308 Mins Read0
    ⤷

    সাঁঝ-সকালের মা – মহাশ্বেতা দেবী

    সাঁঝ-সকালের মা

    বৈশাখের তাতে মাঠের ছাতি ফাটে, সাধন কান্দোরীর মা জটি ঠাকুরনী মরে গেল।

    মরে যাবার আগে জটি ঠাকুরনীর পেট গলা ফুলে ঢাক হয়েছিল। বাঁশের দোলা বেঁধে সাধন কান্দোরীর মা—কে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিল।

    ‘মোকে আঁসপাতালে দিস না সাধন। আঁসপাতালে ডোমে লাড়ীভুড়ি টেনে ছিঁড়া করবে বাপ।’

    ‘ডাক্তারে বলে আঁসপাতালে লিয়া করতে।’

    ‘অ বাপ, মোর সাধন বাপ, ডোম দিঞে লাড়ী ছিঁড়া করাস না বাপ!’

    ‘লাড়ী ক্যাও ছিঁড়ে না মা।’

    ‘ছিঁড়ে বাপ! তু কি জানবি বল? দুধের ছেলা তুই। ডোমে লাড়ী ছিঁড়ে, আঁত ছিঁড়ে। ডাক্তারে বুতলে আঁত রেখে দেয় বাপ।’

    ‘কেন গো মা?’

    ‘তু কি জানবি বাপ? দুধের ছেলা তুই। এ মনিষ্য শরীর ই কলিকালে পুড়াবার লয়, গোর—গাড়ার নয়, জানলু?’

    ‘হেই মা! ই কি কথা?’

    ‘হক কথা বাপ! কিন্তু আত্মীয় বন্ধু মনিষ মরলে সামাজ দেয়, চিলুতে উঠায়, লা কি বল?’

    ‘হক কথা।’

    ‘উ ডাক্তার—বদ্যি—ডোম—ধাই সভে শুগুন পানা চিয়ে দেখে।’

    ‘মা।’

    চিয়ে চিয়ে দেখে। তা বাদে য্যাতক্ষণ বেওয়ারিশের মড়া পায় তখন উ—রা ভাগীদার হয় বাপ। ডোমে লাড়ী আঁত ডাক্তারকে দেয়। ধাই কাপড়—জামা ল্যায়। ডোম মড়াটি পচা করিয়ে হাড় বিচে পয়সা ল্যায়।’

    ‘ধ্যুর, তা আমি হতে দিই?’

    ‘দিস না বাপ। আমি তোর সাঁঝ—সকালের মা। মোকে তু আঁসপাতালে মারা করাস না।’

    ‘চুবো যা মা’।

    সাধন কান্দোরী ধমক দিয়ে উঠেছিল। জটি ঠাকুরনী ওকে পেটে ধরেছিল এক দিন। ওরা বড় প্রাচীন জাতি, জরা—ব্যাধের বংশধর। ওদের সম্প্রদায়ের নাম পাখ—মারা সম্প্রদায়। সেই বংশের মেয়ে জটেশ্বরী সাধনকে পেটে দশ মাস ধরে প্রসব করেছিল।

    কেমন করে গর্ভধারিণী মা সাঁঝ—সকালের মা হয়ে গেল সে এক আশ্চর্য বৃত্তান্ত। সাধনের দেড় বছর বয়স থেকে জটেশ্বরীর ওপর দেবতার ভর। সেই থেকে জটি দিনেমানে জটি ঠাকুরনী। সূর্য ওঠা থেকে সূর্য ডোবা অবধি ঠাকুরানীকে কেউ মা বউ—বোন ভাবতে নিষেধ। ডাকতে নিষেধ।

    সাধনকে জটি নিষেধ করেছিল।

    ‘মা বোলে ডাকো না বাপ, বাপো আমার।’

    ‘কখুনো লয়?’

    ‘লা বাপো, খুব বিয়েনবেলা, সূয্যি না উঠতে মা বোলে ডেকে লবি। সূয্যি ডুবতে মা বলে ডাকবি।’

    ‘শুধু সাঁঝে আর সকালে, তাই লয় গো মা?’

    ‘হ্যাঁ বাপো!’

    সাঁঝে আর সকালে তু মা। আর দিনেমানে তু ঠাকুরনী?’

    ‘হ্যাঁ বাপো। আমি তোর সাঁঝ—সকালের মা।’

    এই সাঁঝ—সকালের মা জটেশ্বরী কেমন করে যাদবপুরে লাইনের পারে এল, কেমন করে ওর ছেলেকে রিকশা করে দিল—সে অনেক কথা।

    মা ছাড়া সাধন কান্দোরী কিছু জানে না। সাধন নির্বোধ, তিরিশ বছর বয়সেও ওর বুদ্ধিসুদ্ধি অপরিণত। মোষের মতো শরীরে ওর পাকস্থলী ছাড়া আর কিছু নেই। ফুসফুস রক্তজবার পাপড়ির মতো হৃদযন্ত্র, সাপের মতো পিচ্ছিল নাড়ি, ভোরের দোপাটির মতো কুসুমকোমল জীবকোষ, কিছু নেই ওর শরীরে। শুধু একটা পাকস্থলী আছে।

    আর আছে খিদে। শুধু খেতে দেবার লোভ দেখিয়ে ওকে দিয়ে ওর মনিবের যুবতী বউ কাঠ চ্যালা করায়, টিউবকলের জল টানায়। মন মন কয়লা ভাঙিয়ে নেয়।

    মনিবের যুবতী ঘোমটা—টানা সুন্দরী বউ।

    ‘মনিবানীর দিকে চেয়ো না সাধন।’

    ‘লা মা।’

    ‘য্যাখন চাইবি, মাত্তিভাবে দেখবি, জানু বাপ।’

    ‘হ্যাঁ মা।’

    মা যা বলে সাধন তাতেই হ্যাঁ বলে। মা ওর জগৎ—সংসার, মা ওর চাঁদ—সূর্য। সেই মা যখন জ্বরে, আমাশয়, পিত্তরসে, কফে ভুগে ভুগে ফুলে গেল, তখন সাধন মনিবকে বলল, ”টাকা দেন মশায়, মোকে টাকা দেন।’

    ‘কেন সাধন?’

    ‘মোর মা মরে যায় মশায়।’

    ‘কি হয়েছে, অসুখ?’

    ‘হ্যাঁ মশায়। মা দিনেমানে ছেঁয়া দেখতে লেগেছে, লুন খেয়ে বলে বাতাসা খেলাম। আজ দুপুরে মশায় মা বলে মোকে ‘মা’ বলে ডাক সাধন।’

    ‘বললে!’

    ‘হ্যাঁ মশায়। ডাক্তার আনা করব আপনি টাকা দেন।’

    সাধন কান্দোরীর মনিব ওকে দশটি টাকা হাতে দিয়ে বলল, ‘মা—কে চিকিচ্ছে করা সাধন। শত হলেও গর্ভধারিণী।’

    ‘আমার মা মনিষ্য লয় গো মশায়। মা ঠাকুরনী।’

    ‘তুই ডাক্তার ডাক।’

    অনাদি ডাক্তার যাকে চিকিৎসা করে সে—ই মরে যায় বলে কলোনীর লোকেরা ওকে মেরে তাড়িয়েছিল। অনাদি ডাক্তার এখন রেলপারে খালধারে দোকান খুলেছে। বর্তমানে তার প্রচুর পসার। ইদানীং বহু খুনজখমের লাশকে ও মোটা টাকার বিনিময়ে ‘ডায়েড অফ হার্ট ফেলিওর’ লিখে শ্মশানে পাচার করে। শ্মশানের লোকদেরও আজকাল টাকা দিয়ে কেনা যায় এই যা সুবিধে।

    অনাদি ডাক্তারের যে বাড়বাড়ন্ত হবে তা জটি ঠাকুরনী বলেছিল। হয়তো সেই জন্যে, হয়তো বহু ভ্রূণহত্যা, গর্ভপাত, মিথ্যা সার্টিফিকেটের পাপের ভয়ে, ব্রাহ্মণ অনাদি ডাক্তার জটি ঠাকুরনীর পা ধরে তেল—নারকেল—চাল—লবণ দিয়ে প্রণাম করে।

    অনাদি ডাক্তার তাই তাড়াতাড়ি জটি ঠাকুরনীকে দেখতে গেল। ভয়ানক দুর্গন্ধ জটির ঘরে। তক্তপোশে টকটকে লাল রংয়ের ময়লা চেলি পরে জেটি ঠাকুরনী রূপকথার রাক্ষসীর মতো চিৎ হয়ে পড়ে ছিল। পেট ফুলে উঁচু, হাত পা চিতিয়ে ফেলে রাখা। জটি ঠাকুরনীর চোখে শুধু আশ্চর্য, অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি ছিল। পিচুটিভরা রক্তাভ চোখের দৃষ্টি এত সুন্দর হতে পারে তা অনাদি ডাক্তার জানত না।

    অনাদি ডাক্তারের টেবিলে মাঝে মাঝে যে—সব যুবতী মেয়েরা অসহায় বেদনায় শুয়ে থাকে, তাদের চোখের চেয়েও জটি ঠাকুরনীর চোখ সুন্দর। আসন্ন মৃত্যু ছাড়া আর কেউ এমন সৌন্দর্যে মানুষের চোখ রাঙিয়ে দিতে পারে না।

    অনাদি থমকে গেল। নাড়ী দেখে, পেট দেখে অনাদির চোখে জল এল।

    আহা, জটি ঠাকুরনীর কাছে সে বছরে পাপ স্খালন করতে দু—একবার আসত।

    ‘মা, পাপ হয়ে গেল মা।’

    দিনেমানে জটি ঠাকুরনীকে কেউ মা বলত না, ঠাকুরনী বলতে হত। অনাদি আসত রাতের কালোয় মুখ ঢেকে।

    ‘কি পাপ, অ আমার বাপ, কি পাপ?’

    ‘মেয়েটা মরে গেল মা।’

    জটি ঠাকুরনী নিশ্বাস ফেলে বলত ‘মহাপাপী ছিল যি উ। তুমি কি জানবে বাপ, উ—র আঁতাটা (আত্মা) লিয়ো এখন যমদূত ডাঙশমারা করবে। মহাপাপে বাপের মুখে কালি দেয় নাই উ? ভদ্দর ঘরের মিয়ে তু, তুর এমন বেভ্রম?’

    ‘কী হবে মা?’

    ‘এই লাও বাপ। গোসাপের কণ্ঠহাড়টি মাদুলিতে আছে। বালিশের তলে রেখে লিদ যাবে। আর তে—সন্ধে গঙ্গাজল দেবে ঘরে, কেমন?’

    অনাদির মতো পাপী—তাপীদের জন্যে আঁতুড়ের মরাছেলের নখ, গোসাপের কণ্ঠ—হাড়, ধনেশ পাখির তেল কে সংগ্রহে করবে? পয়সা নয়, কড়ি নয়, শুধু একপালি চাল নিত জটি ঠাকুরনী। সন্ধ্যে হলে ঠাকুরনী হয়ে যেত সাধনের মা। ঠাকুরনী হয়ে যে চাল পেত, মা হয়ে তার ভাত রেঁধে ওর হাবা ছেলেকে খাওয়াত।

    এখন অনাদিকে কে দেখবে? দুঃখে অনাদির চোখে জল এসে গেল। অনাদি বলল, ‘সাধন, হাঁসপাতালে লিয়ে যেয়ে দেখা। ঠাকুরনীর শরীল আমি ভালো বুঝি না।’

    অনাদি টাকা দিল। বলল, ‘ট্যাক্সি চাপিয়ে লিয়ে যাবি।’

    সাধনের মহাপ্রাণী ভয়ে উড়ে গেল। টাকা নিয়ে ও তাড়াতাড়ি মিঠাইয়ের দোকানে গেল। মনের দুঃখে মুড়ি—বাতাসা—গজা কিনে দোকানে বসে বসেই খেল সাধন। ঘটি ঘটি জল খেল।

    ট্যাক্সি—ড্রাইভার জটিকে নিল না। বলল, ‘মুর্দা হ্যায়। গাড়িমে মর যায়গা।’

    তখন সাধনের মনিব বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ দিল। খাটুলি তৈরি করে জটি ঠাকুরনীকে নিয়ে সাধন বাঙ্গুর হাসপাতালে গেল।

    হাসপাতাল বড় অচেনা জায়গা। এত বড় বাড়ি, এত মানুষ—জন, সাধন বলল, ‘ভাই বলরাম! ডরে মোর হাত পা পেটের লাড়ীতে সান্ধায়। ওই আঁসপাতালে এত দরজা, কিন্তুক কুন পথে ঠাকুরনীকে ভিতরে লিয়ো যাই তা বল?’

    ‘তুই এক জেতের মানুষ সাধন।’

    বলরাম, জগদীশ আর উদ্ধব ডাক্তারকে ডাকল। জটি ঠাকুরনীকে ওরা ভর্তি করবেই করবে। ডাক্তার যত বলে ‘বুড়ি এখনি মরবে’, সাধন তত কাঁদে ‘ঠাকুরনীকে বাঁচিয়ে দেন গো! ঠাকুরনী বিনে মোর জগৎ আন্ধার! আহা! ঠাকুরনী যি সাঁঝ হলে মা হয় গো! মোর মাথায় সাদা চুল, তবু মোকে লিয়্যে কত সুহাগ করে ঠাকুরনী! লিজে না খেয়্যে মোকে খাওয়ায় গো!’

    ‘কী বলছ তুমি? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না তোমার কথা।’

    ‘ডাক্তারবাবু গো’!

    সাধন মাথা—কাটা বলির মোষের মতো মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে ছটফট করতে লাগল।

    বলরাম এই কুতঘাটে বিয়ে করেছে। কলোনীর মানুষ ও, ভদ্রলোক দেখে ভয় পায় না। যতদিন বলরাম গরিব ছিল ততদিন ভদ্রলোক দেখে ওর রাগ হত না। তখনো ওর গায়ে ধলেশ্বরীর নদীর শীতলতা, স্বভাবে ধানখেতের নম্র শ্যামলিমা ছিল।

    এখন কলোনীতে বাড়ি, নিজের রিকশা ও বারুইপুরে ধানজমি করবার পর থেকে বলরাম বদলে গিয়েছে। ভদ্রলোক দেখলে, নম্র ব্যবহার পেলে, মিষ্টি কথা শুনলে ওর থুতু ছেটাতে ইচ্ছে করে। বলরাম জানে বর্তমানে এই বাংলা বাপের নয়, দাপের।

    বলরাম এগিয়ে এল। কাটা—কাটা কথায় বলল, ‘উনি সামান্য মানুষ নয়, জানলেন? উনি দেবাংশী মেয়েছেলে, আমরা ওঁকে মান্য করি, ধর্মপুজোয় ওঁকে ডালা দিই। সিট থাকলে ভর্তি করে নিন না সার। সিট আমার নয়, আপনারও নয়, সর্বসাধারণের, তাই না?’

    অবশেষে জটি ঠাকুরনী ভর্তি হল।

    সাধনের কান্নাকাটি দেখে ডাক্তারের কষ্ট হয়েছিল। লজ্জা পেয়েছিল ডাক্তার। এতবড় সা—জোয়ান পুরুষকে মায়ের জন্য এমন করে কাঁদতে দেখেনি ডাক্তার।

    ‘ঠাকুরনী বাঁচবে না ডাক্তারবাবু?’

    ‘দেখি সাধন। অস্থির হয়ো না।’

    ‘কুন ওগ উয়ার লাই মশাই! উনি মনিষ্য নয়, উনি দেবতা গো! ওগ উয়ার কাছে আসতে ডরায়।’

    ‘তা তো বটেই।’

    ‘এই তো উনি দিনেমানে ঠাকুরনী থাকে গো মশায়! সাঁঝে সকালে আমার মা হয়। গঙ্গাজলে চ্যান করলে, আঙা কাপড় পরলে উনি ঠাকুরনী। ত্যাখন আর সভার মতো আমিও উয়াকে মান্য দেই গো!’

    ‘তাই নাকি?’

    ‘কিন্তু মা বলবার লেগ্যে আমার জীউটা ফাট্যে গো মশায়! তাই! য্যাখন সাঁঝ হয়, আমি যেয়্যে উয়ার কোলে মাথা রাখব আর মা! মা! মা! বলে সাধ মিটয়্যে ডাকব।’

    ডাক্তার অবাক হয়ে সাধনকে দেখছিল। নার্স একটু হেসে বলল, ‘তোমার অতবড় মাথাটা ওঁর কোলে রাখ?

    সাধন গভীর আন্তরিকতায় বলল, ‘মাথা আখব, মা বলে ডাকব, তা বাদে কত অঙ্গ করব মোরা! উয়ার দিনেমানে ভক্তজনা আছে। কিন্তুক এতের বেলা আমি বিনা উয়ার ক্যাও নাই।’

    ‘দিনে কী খেত তোমার মা?’

    ‘আমি কি জানি মশায়? এই ধরেন গা, চা খাবে, গাঁজা খাবে, গঙ্গাজল খাবে। দেবাংশী শরীলে কি ভাত—জল চায়?’

    ‘সন্ধেবেলা?’

    ‘ভাত রান্ধবে, মোকে দেবে, লিজে খাবে ত্যাতটুকুন। য্যামন কচিছেলা খায়।’

    ‘সেই জন্যেই রোগটা হয়েছে সাধন।’

    ‘লা গো! ওগ উয়ার লাই। ওগ কি দেবাংশী শরীলে পশে? মোকে মনে হয় ক্যাও রিষ করে বাণমারা করল বুঝি?’

    ‘দেখি, আমরা দেখি।’

    ‘ডাক্তারবাবু!’

    ‘বল?’

    সাধন মাটিতে পা খুঁড়ে বলল, ‘আপোনাদের ঘরে তো লক্ষ্মী বান্ধা গো। ভাতের পাহাড়, ডালের সাগর। তা উয়ার ভাগের ভাতটা মোকে দিতে পার? উতো এখন খায় না!’

    ‘তা হয় না সাধন।’

    ডাক্তার অবাক হয়ে সাধনকে দেখতেই থাকল। মানুষের শরীরে পশুর মতো সরল প্রবৃত্তি এমন করে ডাক্তার আর কখনো দেখেনি।

    কিন্তু জটি ঠাকুরনীর চিকিৎসা হল না। ‘উয়ার কী হয়েছে, বলেন মাশায়,’ বলে ডাক্তারের মাথা খেয়ে ফেলল সাধন।

    ডাক্তার কী বলবে? জটি ঠাকুরনীকে ওরা গ্লুকোজ দিল, স্যালাইন দিল, গলার নলি শুকিয়ে গিয়েছে বলে নল চালিয়ে খাবার দিতে চেষ্টা করল। চেষ্টার ত্রুটি হল না।

    জটি ঠাকুরনীর অবস্থা ভালো হল না। মাঝে মাঝে যখনি ওর জ্ঞান হয় তখনি ও বলে, ‘আঁসপাতালে মোকে এখো না বাপ মোর। মোর সাধন বাপো। উ ডাক্তার মোর লাড়ী ছিঁড়বে, ডোমগুলান মোর খুলি—হাড় বিচে ফার্সা করবে। মোকে ঘরে লিয়া কর।’

    তিনদিনের দিন ডাক্তার জটির রোগ ধরতে পারল। জটির রোগ বড় ছোঁয়াচে। আজও ভারতভূমিতে তার চিকিৎসা বেরোয়নি কোন। এ রোগের নাম অনাহার। না খেয়ে না খেয়ে খুদকুঁড়ো সাধনকে খাইয়ে জটি ঠাকুরনীর নাড়ী শুকিয়ে গিয়েছিল।

    ‘এ দেব—রোগ সাধন, এর চিকিৎসা আমি জানি না।’

    ডাক্তার একটু ঠাট্টা করল।

    ‘তবে লিয়্যে যাই?

    ‘নিয়ে যা।’

    জটি ঠাকুরনীও চোখ চেয়ে বলল, ‘আরে মড়া, আরে বোকা সাধন! মোর জন্মবিত্তান্ত তু জানিস না? জানিস না আমি কুন সামাজের মিয়ে? মোকে ঘরে লে, ঘরে আমি শরীল রাখব।’

    বলরাম, জগদীশ, সাধন, আরও পাঁচজন সমারোহ করে জটি ঠাকুরনীকে ঘরে নিয়ে এল। জটির ঘরের সামনে একটা নিমগাছ। তার ছায়াতে জটিকে শোয়ানো হল।

    ‘নিমগাছের ছায়া ভালো সাধন। আমরা পাঁচজন আছি। তুই যেয়ে ওনার কাছে বস গা।’ বলরামের কথায় সাধন গিয়ে জটি ঠাকুরনীর কাছে বসল।

    ‘একোজনা বামুন ডাক গো!’

    আছে, বামুন আছে।’

    ‘কে গো?’

    ‘অনাদি ডাক্তার।’

    ‘উনিকে ডাক। ঠাকুরনীর কাছে বসাও।’

    অনাদি ডাক্তার জটি ঠাকুরনীর কাছে বসল। সাধন অভিভূত কাতর।

    ‘কথা বুলে যাও গো কিছু, ও আমার সাঁঝ—সকালের মা!’

    ‘বুলব।’

    জটি এখন শেষ সময়ে চেতনা ফিরে পেয়েছে।

    ‘বুল গো!’

    ‘তোমার বাপ কান্দোরী। তোমরা জেতে বেদিয়া। বনে ঘুর, বাদাড়ে ঘুর, আর আশ্চাজ্জা চিকনপাটি বুন।’

    ‘তুমি?’

    ‘আমি?’

    এখন আকাশে সূর্য, বেলা এখন দশটা। জটি যখন ভালো ছিল এই সময়ে ও ঠাকুরনী হয়ে ঘরে বসে থাকত, মানুষজনের পুজো নিত। এখন সাধনের খুব ইচ্ছে মা হয়ে যায় জটি, বলে—সাধন আমার কাছে আয়।

    জটিরও ইচ্ছে হল সাধনকে কাছে ডাকে। বলে অ সাধন, কাছে আয়।

    জটি তা বলতে পারত। জটি তা বলল না। এখন তার চারপাশে কত ভক্ত, কত মানুষ। এরা ওর কাছে আসে, প্রণাম করে, সম্মান জানায়। ওরাই তো বছরভোর নিত্য চাল যুগিয়ে সাধনকে বাঁচিয়ে রাখে। নিজের ইচ্ছেয় জটি একদিন ঠাকুরনী হয়েছিল। আজ ওকে ঠাকুরনী হয়েই মরে যেতে হবে।

    ‘তুমি কে গো?’

    সাধন সরল ভক্তিতে জিগ্যেস করল। মা কে? জটি কে? সাধনের বাবা যদি কান্দোরী হয়, জটি কি অন্য সমাজের মেয়ে? সাধন, বলরাম, জগদীশ সবাই কাছে ঘিরে ঘন হয়ে এল।

    ‘তুমরা ছুট নও বাপো! তুমরা জেতে বড়, অ্যানেক বড়।’

    ‘তুমি?’

    ‘আমাদের বেত্তান্ত বড় আশ্চাজ্জ গো! মোর আদি পুরুষ সেই জারা ব্যাধ। নাম জান?’

    ‘জরা ব্যাধ?’

    ‘মোরা বলি জারা ব্যাধ। মোদের জিহ্বায় তুমাদের সাড় লাই ডাক্তার।’

    ‘ঘোর বিকার।’

    অনাদি ডাক্তার সভয়ে বলল। এমন বিকারের রুগীকে হাসপাতাল ছেড়ে দিল কেন? এমন রুগীকে ঘিরে এত মানুষের ভিড় কেন? জারা ব্যাধ তো মহাভারতের মতোই পুরোনো, গল্প—কথা।

    ‘বিকার লয় ডাক্তার। মোর কথা সত্যি লা মিছা তা বলতে লারব। শুনেছি…’

    জটি এক আশ্চর্য কথা বলতে লাগরল।

    ‘কুন দেশে য্যান সাগর, কুথায় য্যান দ্বারকাপুরী। জারা ব্যাধ সি দেশে যেঞে বাণমারা করেছিল।’

    ‘কাকে?’

    ‘কিষ্ণকে। পুঁথি পড় নাই?’

    ‘সবাই জানে।’

    ‘ই তো পাপের রাজা মাহাপাপ! ভগমানকে বাপমারা করে ই হতে বড় পাপ লাই। সি বাদে জারার বংশ সি দেশ তেগে ই দেশে এল।’

    ‘কোথায়?’

    ‘হিজলী—কাঁথি—তমলুক—মেদিনীপুরে।’

    ‘তারপর?’

    ‘মোদের সামাজ বড় ছোট। মোরা শ্মশানে—মশানে ঘুরি, সাপ ধরি, শ্মশানের কলসীতে জল খাই।’

    ‘ছি!’

    ‘মোরা পাখপক্ষী ধরি, মোদের বলে পাখমারা।’

    ‘পাখমারা কোন জাতি গো? নাম তো শুনিনি।’

    ‘মোদের আনসামাজে সাঙা হয় না। কিন্তুক আমার মন যেয়ে উ সাধনের বাপে বসল। সামাজে কথা হত, তাই মোরা চলে যেয়ে সাঙা করি গো।’

    জটি গুছিয়ে বলতে পারল না। প্রথম বিয়ের নাম বিয়ে। দ্বিতীয় বিয়ের নাম সাঙা। পাখমারাদের জাতধর্ম অনুযায়ী জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিটি মেয়ের সঙ্গে ওদের দেবতার বিয়ে হয়। আগে দেবতাকে জল—নারকেল দিয়ে তবে ওরা মানুষের ঘর করতে আসে।

    ‘তারপর, অ্যানেক, অ্যানেক দিন বাদে আমি ঠাকুরনী হলাম গো। আমার পরে সাঁজ—সকালে দেবতার ভর।’

    ‘জটি ঠাকুরনী, জল খাবে, জল?’

    ‘না বাপো সকল। এখন আমি মাহানন্দে স্বর্গে যাব। কিন্তুক সাধন…’

    জটি হেঁচকি তুলল।

    ‘কী? মোকে কী বল তুমি?’

    ‘আমি ঠাকুরনী হয়্যেছিলাম। দেখ, মাথার ‘পরে সূর্য।’

    ‘এখন দিনমান।’

    ‘তুর মা লয় সাধন, ঠাকুরনী স্বর্গে যায়। তুকে অ্যানেক দেব্য দিতে হবে যি।’

    ‘কী দেব্য?’

    সকলের মনে মহা কৌতূহল। সাধনের মাটির উঠোনে পাড়া—পড়শীর ভিড়। যেন এক অন্ত্যজ, গরিব, হতভাগিনী মারা যাচ্ছে, যেন কোন মহামানী দামি মানুষ মারা যাচ্ছে তাই এত ভিড়।

    সবাই চুপ করল। নিশ্বাস টানল। কী চাইবে তাদের জটি ঠাকুরনী শেষ সময়ে।

    ‘সাঁঝে মরতাম বিয়েনে মরতাম, তুর কানাকড়ি লাগত না। এ্যাখুন তু মোকে হাতি দিবি। ছরাদে হাতি দিবি।’

    ‘কিরে কাড়লাম।’

    শোকে দুঃখে পাগল, ঘটনার অস্বাভাবিকতায় হতবুদ্ধি সাধন বলল, ‘সভে শুন, উনির ছরাদে আমি হাতি দান করব।’

    ‘ঘো…ঘো….ঘো….ঘোড়া দিবি।’

    ‘দিব।’

    ‘অন্ন—বস্ত—ভুঁই—সোনা—উপো অযচ্ছল দিবি।’

    ‘দিব।’

    সাধন ডুকুরে কেঁদে উঠল, ‘সব দিব গো! তুমি মোরে ছেড়ে যেয়ে না। মোর ক্যাও লাই!’

    ‘তুর বো…বো….বো…

    জটির গলায় কথা আটকে গেল। সাধনের যে বউটা পালিয়ে গিয়ে বাপের বাড়ি আছে তাকে নিয়ে আসবার কথাটা জটি বলে যেতে পারল না। তার আগেই ওর মাথা টলে পড়ল।

    কোরা কাপড়ে সাজিয়ে, ফুলচন্দনে মুড়ে, ঢাকঢোল বাজিয়ে ওরা জটি ঠাকুরনীকে পোড়াতে গেল। সব খরচ অনাদি ডাক্তার দিল। জটির মুখের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে অনাদি ডাক্তারের প্রথমেই মনে হল, যাক, আর নিত্য নিত্য চাল দেবার দায়—দায়িত্ব রইল না। চালের নাম যখন তালগাছের মাথায় ওঠে তখনো অনাদি জটি ঠাকুরনীকে চাল দিয়ে পেন্নাম করতে যেত। অনাদির বউ বড় রাগ করত, বলত, ‘দেবাংশী মানুষ, কিন্তু ভক্তজনের কষ্ট হয়, তা বোঝে না?’

    বড় দুঃখ হল অনাদির। বলরামের হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে অনাদি বলল, ‘তোরা যা খাবি খাস। কিন্তু ঠাকুরনীকে চন্নন কাঠে পোড়াবি। হ্যাঁ, কাঠ শুঁকে নিবি। ফুল দিস, খই ছেটাস, পয়সা ছেটাস, কেমন? তোর বোনাইয়ের না কেত্তন দল ছিল?’

    জটির মৃত্যু এখন বলরামদের কাছে একটা অলৌকিক ব্যাপার। মরণকালে, ঘোর বিকারে জ্বরাচ্ছন্ন মাথায় জটি যা যা বলেছে সব কিছু এখন বলরামদের কাছে দৈববাণী। তাই বলরাম বলল, ‘না আইলে মাথা ছিঁড়িয়া ফালামু।’

    ক্বচিৎ বললাম এ ধরনের কথা বলে। এই কথা শুনেই ওর ভগ্নীপতি এসে হাজির হল। নামে সদানন্দ, স্বভাবেও তাই। সরকারি আপিসে পিয়ন ও।

    ‘গুলি মার চাকরিতে। ক্যাজুয়াল লীভ নাই? কামাই করলে কখনো সরকারি আপিসে কাজ যায় না।’

    এই কথা বলে ও কোমরে গামছা বাঁধল। মাথার চুল আঁচড়ে, গলায় কাগজের বনমালা পরে সদানন্দ আর ওর সেথোরা ‘হরিনাম অঙ্গে লিখে হরিপদে যাও’ গাইতে গাইতে জটি ঠাকুরনীকে নিয়ে চলে গেল।

    দুই

    সাধনের সাঁঝ—সকালের মা কেমন করে মানবী থেকে দেবী হল সে বড় আশ্চর্য কথা

    ওরা মেদিনীপুরের পাখমারা, ওরা যাযাবর। ওরা বলে ওরা জরা ব্যাধের বংশধর। ঈশ্বরকে হত্যা করেছিল বলে ওরা অভিশপ্ত। সুদূর দ্বারকা থেকে ওদের চলে আসতে হয়েছিল।

    ওদের ঘর থাকতে নেই। ওরা পাখি ধরে, পাখি বেচে। শ্মশানের গাছে রান্নার হাঁড়ি টাঙিয়ে রেখে ওরা সংসার করে। শবশয্যায় ওদের বর—বউ অবহেলে ঘুমোয়, ভালোবাসে। চিতায় আগুন দেখে ওদের মনে দেহতত্ত্ব জাগে না। মা ছেলেকে সোহাগ করে, স্বামী—স্ত্রী বসে গান গায়।

    মেদিনীপুরে লবণ খালাড়িতে, কাজুবাদামের বাগানে, দক্ষিণ ভারতের এমন অনেক লোক আসে, যায়, কাজ করে।

    ওদের সমাজের বাইরে বিয়ে করতে নেই। কিন্তু জটির শরীরে আশ্চর্য রূপ ছিল। তামাটে রং, নীল চোখ, কটা চুল। চুল চুড়ো করে বেঁধে জটি তাতে লাল পাথরের মালা জড়াত। বড় ভালো লাগত জটির নদীর জলে মুখ দেখতে, গাঢ় নীল কাপড় পরে নিজের শরীরটি সাজাতে।

    শীতকালে জটিরা তখন সুবর্ণরেখার চরে। চরের বালিতে তখন যাযাবর পাখিদের ভিড়। শরবনে ফাঁদ পেতে জটি শিস দিয়ে দিয়ে পাখি ধরত।

    সেখানেই একদিন উৎসবের সঙ্গে ওর দেখা। উৎসব জাতিতে কান্দোরী। ওর জাতব্যবসা চিকনপাটি বোনা। উৎসবের তখন বছর তিরিশ বয়স। বেঁটে, বলিষ্ঠ, শ্যামল চেহারা। কাঁধ অবধি বাবরী চুল। উৎসব গান বাঁধত, গান গাইত।

    জটিকে দেখে ও গান বেঁধেছিল

    ‘ও নীল শাড়ি, আঙা মেয়ে

    দেখ চেয়ে

    তোর লেগে মোর পরাণ জ্বলে যায়।।’

    জটির হাতে তখন জালে জড়ানো নীলকণ্ঠ পাখিটা ছটফট করছিল।

    জটি ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। পিচ কেটে বলেছিল, ‘পরাণ জ্বলে যায়! খালভরার গান শুন। দিলে তো মোর পাখিগুলান উড়ায়ে?’

    ‘ও পাখি ধরে কি হবে সখী

    মোর প্রাণপাখি

    এনে ফেলে দিব তোর পায়ে

    হা তোর লেগে মোর পরাণ জ্বলে যায়।।’

    উৎসব গেয়ে উঠেছিল।

    খুব মজা লাগছিল ওর। ওদের সমাজের মেয়েগুলো তো এমন বন্য হয় না! এমন করে চোখ টানে না! মেয়েটার চোখ, ঠোঁট নাক যেন পাথর কেটে বের করা।

    ‘খালভরা!’

    জটি গাল দিয়ে চলতে শুরু করেছিল। উৎসব লাফিয়ে গিয়ে ওর হাত ধরেছিল।

    ‘তু আমায় গাল দিলি কেন?’

    ‘তু গান বাঁধলি কেন? আমার পাখি উড়ালি?’

    উৎসব হা হা করে হেসেছিল। তারপর অতর্কিতে ওর হাত থেকে জালটা কেড়ে নিয়ে নীলকণ্ঠ পাখিটাকে ছেড়ে দিয়েছিল। হতচকিত, ক্রুদ্ধ জটির ওপর জালটা ফেলে দিয়ে বলেছিল, ‘তু আমার পাখি। পালাবি? তু আমার প্রাণপাখি।’

    জটি কাঁদতে শুরু করেছিল। তারপর জাল ফেলে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল জটি। উৎসবের হাসি ওকে অনেকক্ষণ তাড়া করেছিল।

    পরদিন উৎসব চলে এসেছিল ওদের ডেরায়। জটির ঠাকুমাকে গড় করে বলেছিল, ‘টুকো ওষুদ দেন দেখি। বনেবাদাড়ে ঘুরি, বুকে আমার বেথা করে গো। আপোনারা তো গুণী মানুষ, ওষুদের কারবারী, তা টুকো ওষুদ দেন।’

    জটি ফোঁস করে বলেছিল, ‘উ খালভরাকে পেটন ওষুদ দিলে ভাল। উ মোর পাখি উড়ায়্যা দিল, তা জানু?’

    জটির ঠাকুমা হেসেছিল। জটিকে গাল দিয়ে বলেছিল নিজের কাজে যেতে। এ সমাজের ছেলেমেয়েকে বাইরের দিকে চাইতে নেই, নিজের সমাজে থাকতে হয়। জটির চনমনে ভাব দেখে ঠাকুমার ভয় হয়েছিল।

    উৎসব ওদের ডেরায় আর আসেনি। জটির পেছন পেছন ঘুরে ঘুরে ও জটিকে নতুন নতুন অচেনা সব স্বপ্ন দেখিয়েছিল।

    ঘরের স্বপ্ন, মাচায় ধানের ডোল, বেতের দোলায় শিশু—সন্তান। সে ঘরে জটি আয়নায় মুখ দেখে, রুপোর গয়না পরে, লাল—নীল নানা রঙের শাড়ি সে ঘরের উঠোনে মেলা থাকে।

    চিকনপাটির চেয়েও মনোহারী নকশায় স্বপ্নটার জাল বুনে বুনে উৎসব জটির ওপর জালটা ফেলে দিয়েছিল।

    জটি আর জাল ফেলে পালায়নি।

    ওরা পালিয়ে গিয়েছিল।

    খড়্গপুর থেকে দীঘা। কাজুবাদামের মরশুমে দিনমজুর, মাছের মরশুমে মাছ শুঁটকি করার কাজ।

    অনেকদূর না পালালে কাওয়ামারারা অভিশপ্তদের সমাজ ছেড়ে যাবার অপরাধে ওদের তির ফুঁড়ে ফেলত।

    উৎসব স্বপ্নটাকে ঠিক সত্যি করতে পারেনি। কিন্তু জটি বড় সুখী হয়েছিল। কি জীবন! শুধু দুটি রাঁধ আর খাও আর ভালোবাসো। হাতে টাকা পেলে কাপড় কেন। কুঁচের মালা, গালার চুড়ি, রুপোদস্তার গোটা। অন্যরকম করে চুল বাঁধ, অন্য ছাঁদে কাপড় পর। এখন তো আর তুমি কাওয়ামারা নও। এখন তুমি জাতে উঠেছ, শ্রেণী বদলিয়েছ।

    ‘মোদের জাত ফেলনা লয় জটি। মোরা পণ দিয়ে মেয়ে লিই, সমাজকে ভাত—খাসি দিই।’

    ‘উ কথা থাক!’

    জটি সভয়ে বলত, ওর শুধু মনে হত এই ঘর, এই ভালোবাসা থাকলে হয়! চির অভিশপ্ত ওরা, ঈশ্বরকে যারা হত্যা করে গোড়ালিতে বাণ মেরে, তাদের বুঝি ঘুরে ঘুরেই জীবন শেষ করতে হয়।

    জটি তো তা করেনি!

    যদি সেই রাগে ঠাকুমা বাণ মারে! মা জটি আর উৎসবের খড়ের পুতুল তৈরি করে শলা দিয়ে এ—ফোঁড় ও—ফোঁড় করে!

    বড় ভয় পেত জটি, গুন গুন করে বলত, ‘উদের কথা রাখ দেখি, মোর সাথে আন কথা বল।’

    ‘তু ভর খাস?’

    ‘খালভরা!’

    মৃদুস্বরে বলত জটি। পেছন ফিরে চুল বাঁধতে বসত। একেই কি বলে জাত হারানো, নিচু থেকে উঁচুতে ওঠা? কই, গলায় তো জোর খুঁজে পেত না জটি! বলতে তো পারত না ‘মর গা যা!’

    মাঝে মাঝে শুধু ডুম—ডুম, ডুম—ডুম ঢোলের শব্দ শুনলে জটি চমকে উঠত।

    পাখমারারা অমনি করে ঢোলে নরম চাঁটি মারতে মারতে আসে। দল বেঁধে ঘোরে ওরা, মৌমাছিদের মতো এক জায়গায় চাক বেঁধে থাকে।

    ওই একসঙ্গে থাকাটা ওদের কাছে সবচেয়ে বড় জিনিস।

    ওরা তো সামান্য নয়, ওরা যে জরা ব্যাধের বংশধর। ব্যাধ তো সামান্য নয়, সে যাকে মেরেছিল তিনি যে স্বয়ং কৃষ্ণ ভগবান। গাঁই—জ্ঞেয়াতি—সকল মানুষ এত পাপ করেছিল, এত শান্তি পাচ্ছিল যে মনের দুঃখে কৃষ্ণভগবান নির্জনে গিয়ে দুটো দণ্ড জিরোচ্ছিলেন। রাঙা টকটকে পদ্মফুলের মতো পা।

    ‘আঙা টকটকে, পদ্মফুলের মতো পা!’ জটির ঠাকুমা মাথা নেড়ে নেড়ে বলত, ‘সি শরঝোপ হতে দেখে উয়ার বুদ্ধি হরে গেল যেমন! দিলে টং করে বাণ মেরে! বাস! অমুনে কি হল জান?’

    আকাশ অন্ধকার হল, সূর্য মুখ ঢাকল। সমুদ্র মনের দুঃখ জলের প্রাণীগুলিকে উগরে দিল। মাছের ডোঙা মারা পড়ে যারা জলের নীচে গেছে তারা অবধি প্রাণ পেয়ে কেঁদে উঠল। গোয়ালারা গাই দুইতে গিয়ে দেখে দুধের বদলে রক্ত পড়ছে। ফটফটে সকাল। কিন্তু রাতের মতো কালো আকাশে তারা জ্বলতে লাগল।

    তখন সেই দৈববাণী হল।

    ভগবানকে যারা মারে তাদের ঘরদোর থাকতে নেই। তাই দৈববাণী বললে, ‘জারা হে জারা! ব্যাধ হে ব্যাধ! ই ভোবনে ভগবান বার বার আসে। তুমার মতো একেকটা কসাই ভগবানকে বাণফুঁড়া করে। যারা ই কাজ করে, তাদের ঘরে থাকতে মানা। তুমি এখন তোমার আঁতের লোক, গাঁতের লোক লিয়ে—বে—উদ্দিশা হও গা। জানলে?’

    ‘কুথা যাই?’

    ‘যেদিকে দু—চক্ষু যায়।’

    ‘সামাজ লিয়ে যাব?’

    ‘সামাজ লিয়ে যাবে লয় তো কি থুয়ে যাবে? তোমার সামাজ এখুন মাহাপাপীর সামাজ। উ সামাজে যে ছেলেমেয়েরা বিয়া দিবে তার মরণ। তা দেখ বিয়াসাদী যা হবে নিজেদের সামাজে। সামাজ ছেড় না। আর দেখ, জারা হে জারা! ব্যাঘ হে ব্যাধ! মোর কণ্ঠ কানে যায়?’

    ‘যায়।’

    ‘আর দেখ, তুমার সামাজের প্রতিটি ছেলা বল, মেয়া বল, যেন সামাজ না ছাড়ে। তুমার পাপে উরাও তো পাপী, তাই। জন্মকালে উদের সাথে দেবতার বিয়া দিবে।’

    ‘দিব।’

    জরা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল। আহা! দ্বারকা ছেড়ে যেতে কে চায় গো! কি সুন্দর দ্বারকাপুরী! নীল সমুদ্রের তীরে কি সুন্দর সোনার চুড়ো দেওয়া ঘরদোর। জরা অবশ্য বনেবাদাড়ে থাকে, দূর থেকে দেখে, কিন্তু পরের সুখ, পরের রমরমা, দেখেই কি সুখ কম?

    তারপর কি জরার কম শাস্তি হয়েছিল? গাঁতের লোক আতের লোক, পোঁটলাপুঁটলি, শিকারী কুকুর, সব নিয়ে কি কম ঘুরতে হয়েছিল?

    কোথায় সত্যপুত্র, কোথায় কেরলপুত্র, কোথায় চোল, কোথায় পাণ্ড্য, শুধু ঘুরে ঘুরেই মরল জরা। ঠাঁই আর পেল না।

    হ্যাঁ! ভগবানকে বাণমারা করে এলেন মোদের দেশকে সর্বনাশ করতে। ওরে আমার চালাক শিয়াল! দ্বারকাপুরী শ্মশান করেছ, এখন আমাদের মারবে?’

    জরা জায়গা আর পায় না। থিতোতে আর পারে না। এদিকে ওপরে বসে দেবাদিদেব নিশ্বাস ফেলেন। দ্বাপর যুগ যায়, কলি যুগ আসে। ঘুরে ঘুরে জরার বয়েস হল অযুত নিযুত। পায়ে গোদ হল। অঙ্গে ব্যথা। কে যেন একদিন দয়া করে বললে, ‘রাঢ় জান? বঙ্গ জান? গৌড় জান? যাও! গঙ্গা যেখানে সাগরে মিশে, সেই দেশে যাও। সে দেশে সকল পাপী—তাপী—লোভী—তঞ্চক—শয়তান আশ্রয় পায়। সে দেশ কারেও ফিরায় না। সেই দেশে যাও তুমি।’

    জরা এই দেশে এল।

    সমাজের মধ্যে বিয়ে, শ্মশানের শয্যায় ফুলশয্যা, শ্মশানের কলসিতে বউ ভাত রাঁধে, গাঁই—জ্ঞেয়াতির পাতে দেয়। খুব স্বাধীন ওদের মেয়েরা পুরুষরা। ওদের মেয়েদের রূপের শেষ নেই। তামাটে চুল চুড়ো করে বেঁধে ওরা পলাকাটির মালা দিয়ে জড়ায়। ওদের চেহারায় পাথরের মূর্তির মতো স্বচ্ছ সৌন্দর্য। বহু পুরুষ ওরা কুল ভাঙেনি। স্বজাতে বিয়ে করেছে। রক্তের পবিত্রতা ওদের মহাপ্রাচীন। তাই ওদের চেহারা এত সুন্দর।

    কমতে কমতে, মরতে মরতে, এখন ওরা মাত্রই শ—খানেক জন আছে। কখনো ওরা দল ছেড়ে সরে যায় না।

    শহরের রাস্তা ধরে, গ্রামের পথ ধরে ওরা চলে যায়, ডুম—ডুম—ডুম—ডুম ঢোলক—বাদ্য বাজিয়ে।

    পাখমারা যায়! পাখমারা যায়!

    শহরে ওরা পারতপক্ষে আসে না।

    মাঝে মাঝে, বছরে একবার দু—বার, ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার আপিসে ওরা নাম লেখাতে আসে। কেউ মরে গেলে নাম লিখিয়ে রেখে যায়।

    সরকারি খাতায় ওরা বুঝি সংরক্ষিত উপজাতি।

    জটি তাই, এক কানে, আধেক মনে উৎসবের কথা শুনত। আরেক কানে, আধেক মনে বাজনা শুনত ডুম—ডুম—ডুম—ডুম।

    ওরা যদি আসে?

    মা—বাবা, পিতামহী, গাই—গাঁতের মানুষ?

    যদি বলে, ‘চল মোদের সঙ্গে? বনে চল, সামাজে ফিরে চল?’

    জটি কী করবে?

    উৎসব ওর ভয় দেখে হাসত। গান বাঁধত।

    ‘ওরে তোর মিছে ভয়।

    পিরীত ফাঁদে ধরা দিতে কেন এত ভয়।’

    জটি বলত, ‘খালভরা!’

    উৎসব বলত, ‘আমার জান থাকতে তোকে ল্যায় কে? তোর উ বুনো বেটারা? তারা উৎসবকে চিনে? একবার দারোগাকে বলা করালে সব বেটাকে শায়েস্তা করে ছেড়ে দিবে।’

    তবু জটির ভয় যেত না। কিন্তু ক্রমে ক্রমে, উৎসব ওকে অনেক ভয় ভুলিয়ে দিল। জটির কোলে এল এই মোটাসোটা, একমাথা চুল এক কালোকোলো ছেলে। দেখে আর বলে দিতে হয় না এ ছেলে উৎসবের। বাপের মুখ যেন অবিকল বসানো। শুধু চোখ দুটি মায়ের মতো। স্বচ্ছ, নীলাভ, টলটলে।

    জাতে ওঠার আকাঙ্ক্ষা খুব বেড়ে গেল উৎসবের। জটিকে তো ও নিজের হাতে তুলেছিল। উৎসব মনে মনে জানে সে চিকনপাটি বোনে, সে পাখমারা—পাখধরাদের চেয়ে জাতে উঁচু। আবার এই যে এখন মজুর খাটা—এও আরেক ধাপ জাতে ওঠা।

    ছেলের বাপ হয়ে উৎসবের মনে হল সে আরো উঠতে চায় জাতে। সে আর গরিব—গুরবোর বৃহৎ সমাজে থাকতে চায় না। ভদ্রলোকের ছোট্ট সমাজের এক কোনায় আসন পেতে চায়।

    জটিকেও উৎসব তাই—ই বলল।

    ‘জটি লো জটি জটেশ্বরী! বিড্ডি আপিসে যেয়েছিলাম, তা বি—ডি—ও বাবুরা কী বললে জানিস?’

    ‘কী?’

    ‘একুন আর কুন বাধা নাই। আমি টাকা খর্চ করে কাছারিতে যেয়ে একুনি নাম পালটাতে পারি। কান্দোরী—মান্দোরী যে শুনে সেই বুঝে জেতে মোরা ছোট গো!’

    ‘নাম পালটাবি?’

    ‘কেন লয়?’ উৎসব কান্দোরী কেমন শুনতে? উৎসব দাশ, সাধনচন্দ্র দাশ কেমন শুনতে? তা বাদে অন্য কাজ লিয়ে বড় শওরে চলে যাস যদি, তাহলে তো কাজ সারা।’

    ‘কেন?’

    ‘বড় শওর জগন্নাথের ছিক্ষেত্তর। সেথা ক্যাও কারো খোঁজ ল্যায় না। নাম দেখলে চিন্তা করবে এ বেটা লিশ্চয় জেতে উঁচু, লইলে নামের পিছে দাশ কেন?’

    উৎসবের কথা শুনতে শুনতে হঠাৎ আনন্দ হয়েছিল জটির। কোমরে হাত দিয়ে ও নাচতে শুরু করেছিল। ‘চল, চল, তাই চল। এখুনি যেয়ে জেতে উঠি।’

    উৎসব সস্নেহে বলেছিল, ‘পাগলী! এখন কি? ছেলার বয়স হোক! মুখে অন্নপ্রসাদ দেই। দেব——ঠাঁইয়ে পুজো পাঠাই!’

    জটির একবার মনে হয়েছিল যার পূর্বপুরুষ একবার ভগবানকে হত্যা করে, সে কি নিজের সমাজের নির্দিষ্ট দেবতা ছাড়া অন্য কাউকে পুজো করতে পারে? যদি পাপ হয়? যদি ক্ষতি হয়?

    তারপর মনে হয়েছিল উৎসব ঠিকই বলেছে। সব ছেড়ে পালিয়ে গেল, সরকারের কাছারিতে লিখে—পড়ে জাত পালটালে তাহলে আর ওর মা—ঠাকুমা ওকে ধরতে ছুঁতে পারবে না।

    ‘তাই ভালো!’ জটি চোখ বুজে বলেছিল।

    পাখমারাদের পূর্বপুরুষ জরা ব্যাধকে যে দেবতা দৈববাণী করেছিলেন, তিনি হেসেছিলেন?

    হল, সাধনের মুখপ্রসাদ হল। উৎসব তখন খড়্গপুর স্টেশনে মোট বয়। কুলীদের সমাজকেও ও ভাত—খাসি দিল। তারপর চোরাই বিক্রির চোলাই মদ খেয়ে বমি করে হাসপাতালে মরে গেল।

    নিজের দেখানো স্বপ্ন, প্রাণভরা ভালবাসা, কণ্ঠভরা গান, সব নিয়ে চলে গেল উৎসব। জটি আবার একা। জটি এখন স্বাধীন। জটি এখন ইচ্ছে করলে যেখানে মন চায়, চলে যেতে পারে। কিন্তু দোলায় শুয়ে ওই যে ছেলেটা কাঁদে আর মিটিমিটি চায়?

    জটি বুঝতে পারল, এখন ওকে কি করতে হবে। চলে যেতে হবে ওদের সমাজে। পা ধরে কাঁদতে হবে পিতামহীর। জটি তো জানে উৎসব মরেছে পিতামহীর বাণে। ডাক্তার যা বলুক আর পুলিশ যা বলুক!

    ভয়—পাওয়া পাখির মতো ছেলেকে বুকে নিয়ে জটি চলে গেল ওদের সমাজে।

    হা ভগবান! কোথায় ওদের গাঁই—জ্ঞেয়াতি—আঁতের মানুষ? কোথায় সেই বিচিত্রবর্ণের পোশাক, কুকুর—ছাগল গাধার পিঠে জিনিসের বোঝা, পিতামহীর খলখল হাসি?

    শ্মশানে নেই, মশানে নেই, কোথাও নেই ওরা। জটি ছুটে ছুটে শহরের ট্রাইবাল বোর্ডের আপিসে গেল।

    ‘পাখমারাদের ঠিকানা দেন মহাশয়, আপোনার ব্যাগ্যতা করি’, জটি পিয়নের পা ধরতে গেল।

    শ্মশান—মশানে দেখগা যা! কোথা যেয়ে পড়ে আছে দেখ গা!’

    জটির চোখ ফেটে জল এল। এ সমাজ ছেড়ে ও সমাজে, এ জাত ছেড়ে ও জাত, কত লোভ দেখিয়ে উৎসব তো সব স্বপ্ন কেড়েকুড়ে নিয়ে চলে গেল।

    জটি এখন কী করে?

    অনেক রূপ, অনেক স্বাস্থ্য, অনেক যৌবন নিয়ে জটি গিয়ে স্টেশনে বসল। কোলের কাছে ছেলে। জটি গালে হাত দিয়ে আকাশ—পাতাল ভাবে আর ভাবে।

    জটি ভাবে ওর ছেলের কথা। আর পাঁচজন ভাবতে শুরু করল জটির কথা।

    জটি এখন কী করে, কোথায় যায়? জটি গিয়ে কুলী লাইনের হনুমানতলার সন্নেসীর কাছে পরামর্শ চাইল।

    ‘এখানে থাক।’

    সন্নেসী চোখ বুজেই বলল। প্রৌঢ় সন্নেসী। অনেক ঠাকুর—দেবতার পর এই হনুমানজীকে আঁকড়ে আছে বলে এখন ওর অবস্থা ফিরেছে খানিকটা।

    জটি এসে এখানে বসবার সঙ্গে সঙ্গে হনুমানতলার ভিড় বাড়তে লাগল। সন্নেসী মনে প্রমাদ গনল।

    কয়েকদিন বাদে তিন—চারজন লোক জটির কাছে এল। বলল, ‘ওই বুড়োর আশ্রয়ে থেকে কি হবে? চল আমাদের সঙ্গে। আমরা তোকে শহর দেখাব।’

    মিছেমিছি জটি শিরায় শিরায় বহু বছরের প্রাচীন রক্ত বয়ে বেড়ায়নি। বন—জঙ্গল, বনের প্রাণী তার যেমন চেনা, অচেনা মানুষে তেমনি ভয়—ওর।

    ‘দূর হ, খালভরা’, বলে জটি ওদের গালাগালি করেছিল।

    হয়তো তারাই গিয়ে নালিশ করে থাকবে।

    কয়েকদিন বাদে পুলিশ এসে সন্নেসীকে শাসিয়ে গেল কড়া গলায়। বলল, ‘সব খবর পাওয়া গেছে।’

    ‘খবর, খবর কি পাবেন বাবামশায়? আমি সন্নেসী মানুষ। ঠাকুর নিয়ে পড়ে থাকি।’

    ‘ঠাকুর নিয়ে পড়ে থাক না ঠাকুরনী নিয়ে?’

    ‘ছি ছি মুখ পচে যাবে তোমার…।’

    ‘এখানে মেয়েছেলে রাখ। এখানে বজ্জাতি, বদমায়েশি হয়। মদ চোলাই হয়, তাসের জুয়া খেলা হয়।’

    ‘সব ঝুট।’

    সন্নেসীর ফর্সা মুখ টকটকে লাল হয়ে গিয়েছিল।

    পুলিশের লোকটি গেরস্ত মানুষ। সে বলেছিল, ‘কথা যে মিছে তা তুমিও জানছ, আমিও জানছি। ওই মেয়েটার জন্যে যত গোলমাল! তা ওকে কেন সরিয়ে দাও না?’

    ‘সরিয়ে দিলে তো ওদের খপ্পরে যাবে। ওরা তো তাই চায়।’

    ‘তবে মরগা যা!’

    পুলিশের লোক রেগে চলে গিয়েছিল। যাবার সময় বলেছিল, ‘কেন ওসব গুন্ডা বজ্জাতকে চটাচ্ছ? গুড় যতক্ষণ রেখেছ, ততক্ষণ মাছি আসবে। ও মেয়েটা যতক্ষণ আছে ততক্ষণ মানুষ আসবে এখানে। ওদের তো রাজত্ব এখন। এসে যদি মেয়েটাকে টেনে নিয়ে যায় তখন কোন বাপের সুমুন্দি এসে ঠেকাবে শুনি?’

    সন্নেসী মহাচিন্তায় পড়েছিল। তবে জটি বুঝেছিল এখানে আরও থাকলে সন্নেসীর বিপদ, ওরও বিপদ।

    ‘লাও, আমার য্যাখন সোমসার ছিল, এই বাসনকুসন। সব গচ্ছিত রাখ ঠাকুর, আমায় টাকা দাও ক—টা!’

    ‘কোথা যাবি? ছেলেটা কোথা যাবে?’

    ‘জানি না।’

    ‘তোর কেউ নাই?’

    ‘জানি না।’

    সন্নেসী শেষে নিশ্বাস ফেলে ওকে একটা লাল চেলি কাপড় দিয়েছিল। এমন রাঙাচেলি দিয়ে বিহারের মানুষ মড়া ঢাকে।

    লালচেলি আর একটা ছোট ত্রিশূল দিয়েছিল সন্নেসী। বলেছিল ‘একদিন তোকে শেয়ালে—শকুনে ছিঁড়ে খাবে তা মনে জানতে পারছি। তবু তুই এই বস্তরে—অস্তরে চলে যা মা। এ ঘোর কলিতেও থাড় কেলাসে সাধুসন্নেসী চলে যেতে পারে, কেউ মাথায় পা দেয় না।

    ‘যদি শুধায় কিছু?’

    ‘বলবি আমি জটি ঠাকুরনী।’

    ‘ঠাকুরনী?’

    ‘আহা বলবি, বলতে মানা কি?’

    ‘ঠাকুরনী!’

    সত্যিই ট্রেনে কেউ কিছু বলেনি জটিকে। ওর রূপ, রাঙা কাপড়, পিঠের পোঁটলায় ছেলে, হাতে ত্রিশূল দেখে সবাই অবাক হয়ে যাচ্ছিল।

    জটি জানলা দিয়ে চেয়ে ছিল বাইরের দিকে। দুই চোখ জলে ভেসে যাচ্ছিল ওর। এই তো মানুষ ওকে মান্য দিল, সমীহ করল। এরই নাম কি জাতে ওঠা? আহা উৎসব যদি থাকত, তবে দেখতে পেত কাছারি নয়, আদালত নয়, শুধু একখানা কাপড় আর ত্রিশূলের জোরে জটি কেমন জাতে উঠে গিয়েছে।

    আরেকটি লোক ওকে লক্ষ্য করছিল। লোকটি ট্রেনে গান গায়, কখনো শ্যামা সংগীত, কখনো হরিনাম। লোকটি বয়স্ক, রোগা, সংসারে ওর কেউ নেই।

    জটিকে দেখে ও বলেছিল, ‘হাওড়া তো পৌঁছলে বাছা। এখন যাবে কোথা?’

    জটি কথা বলেনি।

    জটি চোখ বড় বড় করে হাওড়া স্টেশন, জনারণ্য দেখছিল। এই বুঝি সেই ছিক্ষেত্তর। যার কথা উৎসব বলেছিল! এত মানুষ এখানে, অসংখ্য, অগণন। জঙ্গলে বুঝি একটা গাছে এত পাতা নেই। এত মানুষের মধ্যে জটি কোথায় যাবে?

    ‘বলি যাবে কোথা?’

    লোকটি আবার জিজ্ঞেস করেছিল।

    জটি বলেছি, ‘তা তো জানি না।’

    লোকটি বলেছিল, ‘আমার সঙ্গে যাবে?’

    ‘কুথা?’

    জটি ওকে ভয় পায়নি। তখন জটির ভেতরে সেইসব আদিম সহজাত প্রবৃত্তি কাজ করছে। মানুষ দেখলে ও পলকে বোঝে কাকে ভয় করবার, কাকে ভয় করবার নয়। এই লোকটিকে দেখে ওর ভয় হয়নি। তা ছাড়া সামনের আশ্চর্য সব দৃশ্য ওর চোখ টেনে রাখছিল।

    ‘আমার সঙ্গে।’

    ‘কুথা গো কথা?’

    ‘আমার বাসা। আমি গাড়িতে গান গাই।’

    ‘গান গাও?’

    ‘হ্যাঁ গো!’

    লোকটি বুঝিয়ে দিয়েছিল সব। গান গেয়ে ও ভিক্ষে করে। যদি জটি সাধনকে কোলে নিয়ে ওর সাথে—সঙ্গে ঘোরে তাহলে ভিক্ষে পাওয়া সোজা হয় আরও।

    ‘তুর ঘর কুথা?’

    ‘তু মু বলিস না বাপু, যাবি তো চল।’

    বেশ চলল এক বছর। জটি সঙ্গে থাকে, লোকটি গান গায়। পয়সা দিয়ে বাসায় গিয়ে সন্ধেবেলা জটি চাল কিনে ভাত রাঁধে, লোকটি দাওয়ায় শোয়, জটি ঘরে ঘুমোয় দোর আটকে।

    ‘সাধন রে সাধন! বাপো রে বাপো!’

    জটি বন্য আদরে ছেলেটাকে অস্থির করে দেয়। তা ছাড়া স্টেশনের কাছাকাছি নেপালি ও ভোটবুড়িদের মালা—তাবিজ—শেকড়—পাখির পা—ব্যাঙের ছাল বেচতে দেখে ওরও শহুরে বুদ্ধি হয়েছে।

    যখন কেউ জিজ্ঞেস করে, ‘হ্যাঁ গো, তুমি সাধনী হয়েছ। তা গেঁটে বাতের টোটকা কিছু জান?’

    জটি মুখ ভেংচে গালি দেয় না। পিতামহীর কাছে দেখা টোটকাটুটকি মনে আনতে চেষ্টা করে, মাঝে মাঝে ওষুধ দেয়।

    বেশ চলছিল, বেশ চলে যেতে পারত, কিন্তু লোকটি একদিন দাওয়া ছেড়ে ঘরে এসে ঘুমোতে চাইল। কতদিন আর দাওয়ায় ঘুমোতে পারে ও? জটি কেমন করে জানবে দাওয়ায় ঘুমোবার কষ্ট কত?

    জটি ত্রিশূলটা তুলে ধরল। বলল, ‘জানু আমি কে? কুন সামাজের মিয়ে? জানু মোর বাপ কে, মা কে, গাঁতি—জ্ঞেয়াতি আঁতের মনিষ কে? তু আমায় কুপস্তাব করিস? বাণ মেরে মেরে ফেলাব না!’

    পরদিনই জটি চলে এল আশ্রয় ছেড়ে। অনেক ভেবে চিন্তে ও ঠাকুরনী হল। ঠাকুরনী না হলে জটি ওর হাবা ছেলেকে বাঁচাতে পারত না। নিজেকে বাঁচাতে পারত না মানুষের নজর থেকে।

    জটি বুঝেছিল অলৌকিকতা দিয়ে নিজের চারদিকে বর্ম না আঁটলে নিজেকে ও বাঁচাতে পারবে না।

    ‘সোন্দর মুখের মরণ!’ জটি অস্ফুটে বলল।

    তিন

    ‘সাধন! এখন তো তোমায় ছরাদ্দ করতে হবে বাপ।’

    পাঁচজন এসে বলল।

    ‘করব হে পাঁচজন। মা—কে আমি হাতি দিব, ঘোড়া দিব, ভুঁই দিব, সোনা দানা দিব। কিরে কেড়েছি।’

    সবাই মুখ চাওয়া—চাওয়ি করল। সাধনের কথা পাগলের প্রলাপ। কিন্তু সাধন যে কিরে কেড়েছে তাও তো মিথ্যে নয়।

    তা ছাড়া, জটি তো সামান্য মানুষ ছিল না। সে যে ঠাকুরনী, অলৌকিক, আধিভৌতিক জগতের দোরধরুনী।

    ‘কি যে করলি সাধন! তুই যে বললি তা কত টাকার খেলা তা জানিস?’ বলরাম গভীর আন্তরিকতায় বলল।

    ‘কিরে কাড়লাম যি।’

    ‘এখন যা, ভিখ মাঙতে যা। দোরে দোরে ভিখ মেগে আয়।’

    সাধন গলায় কাছা নিয়ে ভিক্ষে করতে বেরুল।

    মা নেই, এখন আর কেউ সন্ধে হলে তপ্ত ভাত রাঁধে না। শোলমাছ পুড়িয়ে ছাল ছাড়িয়ে, আদার রস, লেবুর রস, লংকা, লবণ, তেল দিয়ে মেখে বলে না ‘বাপো, মোর কুলের কাছে বসে যাও।’

    চোখে জল, গলায় কাছা, কোমরে ছেঁড়া কম্বল, সাধন ভিক্ষে করতে গেল।

    কেউ দিতে চায় না। ঘুরে ঘুরে, পায়ের নড়া খসিয়ে সাধন একুশটি টাকা পেল। আর এক পালি চাল। এক পালি চাল দিয়ে অনাদি ডাক্তার জটির সঙ্গে জন্মের সম্পর্ক কাটাল।

    অবশেষে বলরাম গেল কালীঘাট। সবচেয়ে দরিদ্র, সবচেয়ে হতভাগ্য চেহারার এক পুরুতকে সাষ্টাঙ্গ পেন্নাম ঠুকে বলল, ‘বড় বিপদ ঠাকুর। আমার নয়, আমার বন্ধুর। এমন একটা উপায় বাতলাও দেখি, সাপও মরে আবার লাঠিও না ভাঙে।’

    ‘কেমন করে? বলি বিপদটা কী?’

    বিপদের বহর শুনে তো বামুন হেসে বাঁচে না। বলরাম বললে, ‘আপনারা তো চিরটা কাল মধুর ঠাঁইয়ে গুড দেন। সোনার ঠাঁইয়ে পাঁচসিকা। দেখুন দেখি শাস্তরে কোনো বিধান আছে কিনা।’

    বামুন নাকে নস্যি টিপে বলল, ‘মূল্য ধরে দেবে, বলি তা পারবে তো?’

    ‘কত মূল্য?’

    ‘ধর গা একশো টাকা!’

    ‘একশো টাকার জোগাড় যদি থাকবে, তবে তোমার মতো পাঁচসিকের বামুনের কাছে আসি?’

    ‘আশি টাকা?’

    বামুন লোভাতুর চোখে চাইল। এই সময়ে ইস্কুরুপ আঁটলে ক—টা টাকা আসে। কিন্তু কোন সাহসে বামুন দর কষবে? কালীঘাটের বামুন এখন উপোসী ছারপোকা। পাঁচ টাকা হাতে পেলে সসাগরা ভারতভূমি দান করিয়ে দেবে। বলরাম একটু ভেবে নিল। যাওয়া—আসার খরচ, একটু নেশার খরচ, কত কাটবে, কত রাখবে। তারপর, কড়া গলায় বলল, ‘দেখ ঠাকুর, তোমার হাতে আমি আঠারোটি টাকা দেব। কাজটি তুমি করিয়ে দেবে। নচেৎ আমি অন্য ঠেঁয়ে চললাম। পয়সা ফেললে পুরুতের অভাব? গুড় ছড়ালে পিঁপড়ে আসে না? ‘হ্যাঁ’ বলবে না ‘না’ বলবে ভেবে দেখ। আমার হাতে টাইন কম। তোমার সঙ্গে কেজে—কোঁদল করতে আমার টাইন নেই।’

    ‘নিয়ে এস তোমার বন্ধুকে। তা বাবা, মার্কণ্ডের কাপড়, পিত্তিপুরুষের কাপড়, ঘি, ফুল, কাঠ, তিল, পঞ্চশস্য, পঞ্চগব্য—সব তোমরা আনবে তো?’

    ‘ও রে আমার চালাক মাধাই! তাই যদি আনব তবে আর তোমার ময়লা গামছার গন্ধ শুঙতে আসি?’

    বলরাম সাধনকে নিয়ে এল।

    সব জোগাড় করে রেখেছিল পুরুত। পুরুতের বাড়ির বারান্দায় বসেছিল সব জোগাড় করে।

    ‘দক্ষিণ মুখে বস বাপ!’

    পুরুত খনখনে গলায় বলল। ও পাশে ছাঁটা চুল, লাল চোখ, ছাতার মতো ভুয়োরঙের একটা লোক বসে আছে।

    ‘উটি অগ্রদানী। দান নেবে।’

    অগ্রদানী চোখ কুলে বলল, ‘লাও দেখি মামা! হাজার টাকার ছরাদ তো? দশ মিনিটে সেরে দাও দেখি, একবার চাকদা যেতে হবে।’

    ‘এই তো! নাও বাপু, আচমন কর।’

    আচমন হল। শ্রাদ্ধ শুরু হল। একেকটা জিনিস সাধনের হাতে ছোঁয়ায় পুরুত আর বিদ্যুৎবেগে কেড়ে নেয়। আঠারোখানা একটাকার নোট নিয়ে বলরাম বসে আছে, মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে।

    খুব তাড়াতাড়ি হয়ে গেল প্রেতক্রিয়া। একখানা চার আনার গামছার একেকটা সুতো ছিঁড়ে সাধন অজানা সব লোক ও লোকাতীতকে অজস্র বস্ত্র দান করল। তারপর পুরুত বলল, ‘বল, মা—কে কী দিতে চেয়েছিলে?

    ‘এঁগ্যে, হাতি!’

    ‘লাও বাপ, পাঁচসিকা ফেল। ইটিও তোমার হাতিদানের পুণ্য হল, জানলে? বিকল্পে মূল্য ধরলে, এইভাবে দান করা চলে, জানলে?’

    বলরাম কাগজে লিখলে হাতি, তার পাশে লিখলে পাঁচসিকে।

    সাধনের মুখ এখন বিহ্বল, বিমূঢ়। এ কি আশ্চর্য কথা! পাঁচসিকে মূল্য ধরে দিলে প্রতিশ্রুত গজদানের ফল হয়? এমন জানলে কি সাধন…

    ‘পাঁচসিকা ধর, অশ্বদান হল।’

    তখন অদ্ভুত এক প্রতিযোগিতা শুরু হল। সাধন বলে অশ্ব—ভুঁই—সোনা—ধান—বস্ত্র—তৈজস। পুরোহিত বলে পাঁচসিকা—পাঁচসিকা। বলরাম শুধু দেখে এই অপরিমিত দান—যজ্ঞ আঠারো টাকার মধ্যে থাকছে কিনা।

    ‘বামুনকে গো—দানটা পাঁচ আনায় সেরে দেন ঠাকুরমশায়,’ বলরাম হেঁকে বলল।

    প্যাঁকাটির ধোঁয়ায় চোখ কুঁচকে অগ্রদানী বলল, ‘পাঁচ আনায় গাই—গোরু হয়?’

    ‘না হলে মামা—ভাগ্নাকে আঙুল চুষে মরতে হবে। দক্ষিণা দিতে হবে না?’

    সাধনের পরনে মা—র একখানা ছেঁড়াখোঁড়া লাল চেলি। সাধনকে দেখতে এখন ক্ষ্যাপা মোষের মতো। প্যাঁকাটির আগুনে মাটির এতটুকু খুরিতে কয়েক দানা চাল সেদ্ধ করা হয়েছে, শ্রাদ্ধান্ন। ভাতের গন্ধ নাকে যাওয়াতে সাধন এখন ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠছে।

    ‘লেঃ সাধন, আচমন করে বামুনকে পেন্নাম ঠুকে উঠে পড়।’

    সাধন উঠে পড়ল। সাধনের চোখ মাটির দিকে। সাধনের গামছায় বাঁধা অনাদি ডাক্তারের দেওয়া এক পালি চাল। চালটা বামুন সবটা রাঁধল না কেন? চালটা তো মাকেই দেওয়া হল, তাহলে কয়েক দানা রাঁধবার অর্থ কী? সাধনের সন্দেহ হল। নাক দিয়ে ঘোঁত করে শব্দ করল ও।

    ‘তুই ব্যাটা আমার হাতে আঠারো টাকা ধরিয়ে দিয়ে হরিশ্চন্দোর হয়েছিলিস? রামচন্দোর হয়েছিলিস?’

    বলরাম হাসতে গিয়ে থেমে গেল। সাধন উপুড় হয়ে পড়েছে, চাল গামছায় বাঁধছে।

    ‘কর কী, কর কী বাপ? ও চাল যে আমার পাওনা।’

    ‘চুবো শালা!’

    সাধন বামুনকে গাল দিল। এই বামুন না ওকে দিয়ে জটি ঠাকুরনীকে অগাধ, অতুলন ঐশ্বর্য দান করিয়েছে? জটি ঠাকুরনী না এখন সোঁ সোঁ করে স্বর্গে যাচ্ছে? যে দেবতাকে ওর পূর্বপুরুষ মেরেছিল, তারই পায়ের কাছে? গোলকধামে? সাধন সব ভুলে গেল কেন?

    ‘সাধন, কী করিস?’

    ‘চাল লিয়ে যাই, ভাত আঁধব!’

    ‘আরে ও ছরাদের চাল, তোর খেতে নাই!’

    ‘চুবো বলরাম!’

    মত্ত হাতির মতো চেঁচিয়ে উঠল সাধন। বলল, ‘ঘরে কানাকড়ি লাই যে চাল কিনে আঁধব। ই চাল আমি হাতছাড়া করি!’

    ‘বেটা মূর্খ, গজমূর্খ!’

    ‘চাল আমার! বলরাম! আমার পাছু আসিস না।’

    পুরুত নিষ্ফল আক্রোশে বলল, ‘শ্রাদ্ধের চাল নিয়ে রেঁধে খাওয়া? এ শ্রাদ্ধ তোর নষ্ট হল ব্যাটা!’

    ‘কেন নষ্ট হবে, আমি হাতি দিই নাই? গোরু দিই নাই? সোনা—রুপা, বস্ত দিই নাই? কোন শালা আমার মায়ের ছরাদ নষ্ট করে শুনি?’

    বুকের কাছে চালের পোঁটলা, সাধন হেলে দুলে বাড়ি যায়। সাধন বাড়ি যাবে, উনোন ধরাবে, ভাত রাঁধবে।

    ভাতের গন্ধ বড় ভালো গন্ধ। ভাতের গন্ধে সাধন তার মাকে খুঁজে পায়। যতদিন ভাত রাঁধবে সাধন, তপ্ত ভাত খাবে, ততদিন ওর কাছে সাঁঝ—সকালের মা বাঁধা থাকবে।

    মায়ের কথা মনে করতে গিয়ে পুরুতের ওপর দুর্ব্যবহারের অনুতাপে সাধনের চোখ জলে ভেসে গেল। মা, তুমি যেমন তেমন করে স্বর্গে যাও। সাধন এখন ভাত রেঁধে খাবে। তুমি দোষ নিও না।

    ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleবদ্যিনাথের বড়ি – লীলা মজুমদার
    Next Article ন্যাদোশ – মহাশ্বেতা দেবী

    Related Articles

    মহাশ্বেতা দেবী

    হাজার চুরাশির মা – মহাশ্বেতা দেবী

    November 27, 2025
    মহাশ্বেতা দেবী

    মিলুর জন্য – মহাশ্বেতা দেবী

    November 27, 2025
    মহাশ্বেতা দেবী

    প্রস্থানপর্ব – মহাশ্বেতা দেবী

    November 27, 2025
    মহাশ্বেতা দেবী

    আই. পি. সি. ৩৭৫ – মহাশ্বেতা দেবী

    November 27, 2025
    মহাশ্বেতা দেবী

    প্রতি চুয়ান্ন মিনিটে – মহাশ্বেতা দেবী

    November 27, 2025
    মহাশ্বেতা দেবী

    পারিবারিক – মহাশ্বেতা দেবী

    November 27, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }