সোমনাথ সুন্দরী – ১
১
শেষ রাত। বিশাল মন্দির চত্বর ঘুমিয়ে আছে। গবাক্ষে বসানো পিলসুজ আর মন্দির প্রাকারের মশালগুলোর আলো ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে বহুক্ষণ আগেই নিভে গেছে। অপসৃয়মান চাঁদের আবছা আলোতে প্রায় অস্পষ্ট বাগিচাসম্মিলিত বিশাল মন্দির প্রাঙ্গণ। কোথাও কোনও মানুষের কোলাহলের শব্দ নেই। শেষ রাতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সবাই। শব্দ বলতে শুধু মন্দিরের পিছনে সমুদ্রর ঢেউ ভাঙার শব্দ। সে শব্দ অনেকটা শঙ্খধ্বনির মতো। কাছেই সমুদ্রতট। পূর্ণিমার রাতে কোনও কোনও সময় জোয়ারের জল এসে ছুঁয়ে যায় পশ্চাৎ ভাগের মন্দির প্রাকারকে।
সারাদিন অজস্র মানুষের, পূণ্যার্থীর কোলাহলে, মন্ত্রোচ্চারণে, ঘণ্টাধ্বনির শব্দে ঢাকা পরে থাকে উর্মিমালার শব্দ। কিন্তু সন্ধ্যারতি সাঙ্গ হবার পর যখন চারপাশ ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে তখন জেগে উঠতে শুরু করে ঢেউ ভাঙার শব্দ। বিশেষত এই শেষ রাতে যেন বেশ প্রকট হয়ে ওঠে উর্মিমালার এই শঙ্খনাদ। আর সেই শব্দে প্রতিদিনের মতো ঘুম থেকে উঠে গর্ভগৃহের ঠিক সামনের প্রশস্ত চত্বরে এসে দাঁড়ালেন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব।
প্রতিদিনের মতো এদিনও তিনি একবার অভ্যাস মতো তাকালেন নীচের দিকে। গর্ভগৃহের সামনে থেকে প্রশস্ত সোপানশ্রেণী তিন ধাপে নীচের বাগিচায় নেমেছে। ধাপগুলোর দু-পাশে পুরোহিত সেবকদের বাসস্থানগুলো এখনও গভীর নিদ্রামগ্ন। আর বিশাল বাগিচার প্রাকারের গায়ে ও মন্দিরের অন্য আবাসিকদের কক্ষগুলোও অন্ধকারে প্রায় অদৃশ্য হয়ে আছে। কে বলবে বিশাল এই প্রাচীন মন্দির তিন সহস্র মানুষের আবাসস্থল। এ মন্দিরকে নগরী বললেও অত্যুক্তি হয় না।
তবে তাদের জেগে উঠতে আর বেশি দেরি নেই। আর তাদের জাগিয়ে তোলার কর্তব্য সম্পাদন করেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। তাই এ সময় তাঁকে এখানে এসে দাঁড়াতে হয়। গর্ভগৃহকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকারে ষোলোটি স্তম্ভ ধরে রেখেছে মূল মন্দিরের মাথার ওপরের ছাদটাকে। নানা কক্ষ আর উপমন্দির সম্মিলিত মন্দিরের এই প্রধান চত্বর। তারাও বৃত্তাকারে ঘিরে রেখেছে গর্ভগৃহকে। তবে সন্ধ্যারতির পর এ স্থানে অন্য কারো থাকার অনুমতি নেই। একমাত্র প্রধান পুরোহিত ছাড়া। ত্রিপুরারিদেবের দুই প্রধান সহকারী পুরোহিত নন্দিবাহন আর মল্লিকার্জুনের কক্ষ সোপানশ্রেণীর পরবর্তী ধাপের দু-প্রান্তে। আর অন্য দুই শত পুরোহিত থাকেন বিশাল বাগিচার গায়ে প্রাকার সংলগ্ন ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ গুলোতে। কেউ কেউ আবার নগরীতে ফিরে গিয়ে রাত্রিবাস করেন। নগরীর নাম প্রভাস পত্তন।
মন্দিরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এ নগরী। তবে এ মন্দির আর এ নগরী যে কত প্রাচীন তা কারও জানা নেই। এমনকী পুরোহিতশ্রেষ্ঠ, চিরন্তন পীঠের প্রধান সেবক ত্রিপুরারিদেবেরও নয়। চারদিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ-উদ্যানের দিকে একবার তাকিয়ে নেবার পর তিনি তাকালেন আকাশের দিকে। চন্দ্রদেব প্রায় অন্তর্হিত চলেছেন আকাশের বুক থেকে। ওই চন্দ্রদেবের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই মন্দিরের। প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাস অনুসারে চন্দ্রদেবই নাকি এই প্রভাস তীর্থে শিবের আরাধনা করে তাঁর দ্বারা শাপমুক্ত হয়ে এ মন্দির নির্মাণ করান। তেমনই লেখা আছে হিন্দু পুরাণে। চন্দ্রদেবের নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত এ মন্দিরের নাম, শিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এই মন্দিরের নাম।
বেশ কিছুক্ষণ আকাশের দিকে চেয়ে রইলেন ত্রিপুরারি। সোমদেব এক সময় সত্যি অন্তর্হিত হলেন, তার পর পুব আকাশে ফুটে উঠল শুকতারা। ঠিক এই ক্ষণের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন প্রধান পুরোহিত। এবার নিদ্রাভঙ্গ করতে হবে মন্দিরবাসীদের। মন্দিরের অন্ধকার গর্ভগৃহর দারুকাঠ নির্মিত আর্গলের পার্শ্ববর্তী এক অনুচ্চ স্তম্ভর গা থেকে একটা মোটা শিকল চত্বর অতিক্রম করে সোপানশ্রেণীর দিকে এগিয়েছে। স্বর্ণ নির্মিত শৃঙ্খল।
সেই শিকলের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন ত্রিপুরারি। তিনি বৃদ্ধ হয়েছেন। আজকাল এ কাজটা করতে কষ্ট হয় তার। কিন্তু এ কাজের দায়িত্ব যেহেতু তারই, তাই তিনি প্রতিদিনের মতো তুলে নিলেন সেই স্বর্ণ শৃঙ্খল। তার পর মন্দিরবাসীদের ঘুম ভাঙাবার জন্য ঝনঝন শব্দে সেটা বাজাতে আরম্ভ করলেন। বার কয়েক সেটা বাজাবার পরই নীচ থেকে গর্ভগৃহর সামনের চত্বরে উঠে এলেন তাঁর দুই সহযোগী নন্দিবাহন আর মল্লিকার্জুন। তারা দুজনও হাত লাগালেন সে কাজে।
আধো অন্ধকারের মধ্যে মন্দিরের উপরিভাগ থেকে স্বর্ণ শৃঙ্খলের সেই ঝনঝন-ঝমঝম শব্দ ছড়িয়ে যেতে লাগল মন্দিরের নীচের প্রাঙ্গণে, বাগিচা অতিক্রম করে দূরবর্তী প্রাকার সংলগ্ন ঘুমন্ত প্রকোষ্ঠগুলোতে। ধীরে ধীরে জেগে উঠতে লাগল মন্দির। বেশ কিছুক্ষণ সময় ধরে শিকলটা বাজাবার পর থামলেন তারা। এবার সমুদ্র স্নানে যেতে হবে ত্রিপুরারিকে।
আজ অনেক কাজ প্রধান পুরোহিতের। কিছু কুমারী নারী আজকে দেবতার উদ্দেশ্যে নিজেদের সমর্পণ করবে। সে কাজে পৌরহিত্য করতে হবে ত্রিপুরারিদেবকে। গর্ভগৃহর সমুখস্থ চত্বর ছেড়ে প্রথমে নিজের কক্ষে প্রবেশ করলেন প্রধান পুরোহিত। তারপর সেখান থেকে পট্টবস্ত্র সংগ্রহ করে মন্দিরের পশ্চাদবর্তী সোপানশ্রেণী বেয়ে এগোলেন সমুদ্রর দিকে। জলোচ্ছ্বাসের শঙ্খধ্বনির মতো শব্দ ক্রমশ বাড়ছে। সমুদ্র যেন তার এই শঙ্খনাদের মাধ্যমে আহ্বান জানাচ্ছে সূর্যদেবকে উদিত হবার জন্য।
রঙ ধরতে শুরু করল সমুদ্রর বুকে পুব আকাশে। ইতিমধ্যেই জেগে উঠেছে আবাসিকরা। তারা নিয়োজিত হতে শুরু হয়েছে নিজেদের কাজে। চয়নিকার দল সাঁজি হাতে পুষ্প চয়নের জন্য, বাদ্যকার আর দেবদাসী নর্তকীর দল দেবতার সামনে প্রভাতী সঙ্গীত, নৃত্যগীত পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করেছে। প্রত্যহ তিনবার—প্রভাতে, দ্বিপ্রহরে আর সন্ধ্যায় নৃত্যগীত পরিবেশিত হয় দেবতার সামনে। পুরোহিত আর সেবকদের এক অংশ শুরু করেছে পূজার উপাচার সাজানোর কাজ। নানা ধরনের শব্দ ভেসে আসতে শুরু করেছে নানা প্রান্ত থেকে।
এক সময় প্রভাতী সূর্যকিরণ সত্যিই ছড়িয়ে পড়ল স্বর্ণখচিত মন্দির শীর্ষে। স্বর্ণ কলমে প্রোথিত সোনার জয়ধ্বজে, রৌপ্য মণ্ডিত দারুকাঠের স্তম্ভ শোভিত শ্বেত শুভ্র মন্দির প্রাঙ্গণে, মন্দিরের চারপাশে ঘিরে থাকা পুষ্প শোভিত বাগিচাতে। ভোর হল প্রভাসক্ষেত্রে, চিরন্তন পীঠ—সোমনাথ মন্দিরে। প্রাকার বেষ্টিত মন্দিরের প্রধান তোরণের বাইরে শুরু হল ভক্ত-দর্শনার্থীদের কোলাহল। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই দেবতা দর্শনের উদ্দেশ্যে মন্দির প্রাকারের বাইরে সমবেত হয়েছে তারা। দেবতার অলৌকিক বিগ্রহ দর্শন করে অক্ষয় স্বর্গলাভের আকাঙ্ক্ষায়।
তবে তাদের বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। যতক্ষণ না মন্দির প্রাঙ্গণ পরিষ্কৃত হয়, যতক্ষণ না প্রধান পুরোহিত গর্ভগৃহর স্বর্ণদ্বার উন্মুক্ত করে দেবতার নিদ্রাভঙ্গ করেন, প্রত্যুষের পূজাপাঠ, নৃত্যগীত দেবতার সামনে পরিবেশনার কাজ সম্পন্ন না হয় ততক্ষণ বাইরের জনস্রোতকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না মন্দির প্রাকারের অভ্যন্তরে।
তবে এসব কাজ যথাসম্ভব দ্রুত সম্পন্ন করে পুরোহিতকুল সেবায়েতের দল। তাই ভোরের প্রথম আলো মন্দিরশীর্ষে পড়ার সময় যখন সমুদ্রে অবগাহন করে নতুন পট্টবস্ত্র পরিহিত হয়ে মন্দিরের দিকে ত্রিপুরারিদেব এগোলেন, ততক্ষণে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে সমুদ্র পর্যন্ত মানব শৃঙ্খল রচনা করে ফেলেছে মুণ্ডিত মস্তক সেবায়েতরা। হাতে তাদের বড় বড় রুপোর কলস। সমুদ্রর জল এই মানব শৃঙ্খলের মাধ্যমে এগোচ্ছে মন্দিরের দিকে। এভাবেই প্রতিদিন প্রত্যুষে মন্দিরের ধৌতকার্য সম্পন্ন হয়। ক্ষৌরকারের দলও উপস্থিত হতে শুরু করেছে সমুদ্রতীরে পূণ্যার্থীদের নিয়ে। মন্দির প্রাকারের বহিঃদেশে কুটির তাদের। পাঁচ শত ক্ষৌরকার বসবাস করে সেখানে। সমুদ্র তীরে বসে তারা দেবতা দর্শন অভিলাসী তীর্থযাত্রীদের স্নানের আগে মস্তক মুণ্ডন করে।
সমুদ্র স্নান সেরে পবিত্র হয়ে ত্রিপুরারিদেব প্রথমে মন্দিরে নিজের কক্ষে ফিরে এলেন। কপালে চন্দনের প্রলেপ লেপন করে পট্ট উত্তরীয়তে নিজেকে আবৃত করে যখন তিনি গর্ভগৃহর স্বর্ণ মাণিক্য খচিত দারুকাঠের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ততক্ষণে মন্দির চত্বরের ধৌতকার্য সম্পন্ন হয়েছে।
গর্ভতোরণের দু-পাশে সার বেঁধে সমবেত হয়েছে স্বর্ণপাত্রে পূজার উপাচার শোভিত পট্টবস্ত্র পরিহিত সেবায়েতরা আর সালঙ্কারা, নিক্কন ফুলসাজ শোভিত দেবদাসীরা। আর কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে বাদ্যকার বাহকের দল। বন্ধ তোরণের দু-পাশে হীরকখচিত দুগ্ধভাণ্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছেন নন্দিবাহন আর মল্লিকার্জুন। তাদের পরনেও নতুন পট্টবস্ত্র, চন্দন চর্চিত কপাল। প্রধান পুরোহিতের মতো তাদেরও মুণ্ডিত মস্তক।
ত্রিপুরারিদেবের জন্যই প্রতীক্ষা করছিল সবাই। পুরোহিতশ্রেষ্ঠ গর্ভগৃহের তোরণের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই উপস্থিত জনতা মাথা নীচু করে প্রণাম জানাল তাকে। সোনায় মোড়া দারুকাঠের বিশাল দুই কপাট। তার মধ্যে খচিত আছে হীরক-চুণি-মকরতমণি ইত্যাদি বহুমূল্য রত্নরাজি। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের রাজন্যবর্গ দেবতার প্রতি উৎসর্গ করেছেন এসব রত্নমালা। কেউ কেউ বলেন যে, এই গর্ভগৃহর একটা কপাটের বিনিময়ে নাকি যে-কোনও বৃহৎ রাজ্য ক্রয় করা যায়। যদিও যুগ যুগ ধরে, শত শত বৎসর ধরে এই চিরন্তন পীঠে যে-সব সম্পদ সঞ্চিত হয়ে আছে তার তুলনায় এ তোরণ সামান্য কণা মাত্র।
ত্রিপুরারিদেব প্রথমে ভূমিষ্ঠ হয়ে চৌকাঠে মাথা ছুঁইয়ে দেবতার নিদ্রাভঙ্গ করার জন্য মার্জনা চেয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর ঠিক মাথার ওপরে সোনার শিকলে বিশালাকার ঘণ্টা ঝুলছে। প্রধান পুরোহিত তার দক্ষিণবাহু ঊর্ধ্বে তুলে একবার ঘণ্টাটা বাজালেন। আর সেই শব্দে বিশাল মন্দিরের বিভিন্ন প্রান্তে নন্দি মন্দির-সহ যত উপমন্দির আছে তার ঘণ্টাগুলো বাজানো শুরু হল।
এভাবেই রোজ ঘুম ভাঙানো হয় দেবতার। মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। এবার উন্মোচিত হবে গর্ভগৃহের দরজা। আর কিয়ৎকালের মধ্যেই ভক্তরা দর্শন করতে পারবে আরাধ্য দেবতাকে। ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে-সঙ্গেই মন্দির প্রাকারের শুরু হল ‘জয় সোমনাথ’ ধ্বনি। সমুদ্র-গর্জন হারিয়ে যেতে লাগল তার আড়ালে।
গম্ভীর অথচ শান্ত অনুচ্চ কণ্ঠে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে কপাট দুটো দু-পাশে সরালেন ত্রিপুরারিদেব। উন্মোচিত হল গর্ভগৃহ। কিন্তু ভিতরে কিছু দেখা যাচ্ছে না। গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন কষ্টি পাথরের দেওয়াল-সম্মিলিত গর্ভগৃহ।
মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশের অধিকার এ মন্দিরের সামান্য কয়েকজন মানুষ ব্যতীত অন্যদের নেই। বিগ্রহকে স্পর্শ করা তো অকল্পনীয় ব্যাপার। এমনকী মন্দিরে আগত দর্শনার্থী রাজারাও গর্ভগৃহে পা রাখতে পারেন না। সাধারণ পুণ্যার্থীদের মতো গর্ভগৃহের চৌকাঠের বাইরে থেকেই বিগ্রহ দর্শন করতে হয়। অবশ্য তাতেই পুলকিত হন তারা। ধনসম্পদ দান করেন মন্দিরে, নিজ রাজ্যে ফিরে গিয়ে প্রচার করেন অলৌকিক দেবমাহাত্ম্য।
কক্ষদ্বার উন্মোচিত হতেই একজন সেবায়েত বিশালাকৃতির এক জ্বলন্ত ঘিয়ের প্রদীপ এনে দাঁড়ালেন প্রধান পুরোহিতের সামনে। তার হাত থেকে সেই প্রদীপ নিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে ত্রিপুরারিদেব প্রবেশ করলেন গর্ভগৃহে। হীরকখচিত প্রদীপদণ্ডর ওপর তিনি স্থাপন করলেন সেই অগ্নিশিখা। মৃদু আলোকিত হয়ে উঠল কক্ষ।
এই মন্দির চত্বর রত্নরাজি, স্বর্ণশোভিত হলেও কিন্তু গর্ভগৃহে সে বৈভবের কোনও চিহ্ন নেই। একমাত্র ওই প্রদীপদণ্ড ছাড়া। কালো পাথরের তৈরি দেওয়াল, মাথার ওপরের ছাদ সবই আভরণহীন কৃষ্ণকায়। তবে দেবতার বিগ্রহটি বড় অলৌকিক দৃশ্য সম্পন্ন। যা যে-কোনও মন্দিরের মহামূল্য রত্নরাজি খচিত বিগ্রহর চেয়ে অনেক বেশি দেবমাহাত্ম্যর কথা জানান দেয়, ভক্তিভাব সঞ্চারিত করে দর্শনার্থীদের মনে।
তিন গজ দীর্ঘ কলো পাথরের তৈরি সোমনাথের বিগ্রহটি অর্থাৎ শিবলিঙ্গটি ভূমি প্রথিত নয়। মাটি থেকে এক গজ তফাতে শূন্যে ভেসে আছেন সোমনাথ! না, ওপর থেকে নেমে আসা কোনও শৃঙ্খলের সাহায্যে তিনি আবদ্ধ নন। সম্পূর্ণ বন্ধনহীন ভাবে শূন্যে ভাসমান কালো পাথরের তৈরি বিশালাকার বিগ্রহটি।
এই চিরন্তন পীঠে দেবতা যে সত্যিই অবস্থান করছেন এর চেয়ে বড় চাক্ষুষ প্রমাণ আর কী হতে পারে! এজন্যই তো এই প্রভাস ক্ষেত্রের মন্দিরকে শিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম মনে করা হয়। মহাদেব যে এখানে স্বয়ং বিরাজমান ওই শিবলিঙ্গ রূপে। যুগ যুগ ধরে এ মন্দিরে ওভাবেই শূন্যে ভাসমান হয়ে অবস্থান করছেন তিনি। এই সোমনাথ বিগ্রহকে ডাকা হয় নানা নামে। সত্য যুগে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘ভৈরবেশ্বর’ নামে, ত্রেতা যুগে তিনি ‘শ্রাবণীকেশ্বর’ আর দ্বাপর যুগে ‘শ্রীগণেশ্বর’ আর বর্তমানে পরিচিত ‘সোমেশ্বর মহাদেব’ নামে।
অতীব জাগ্রত এই সোমেশ্বর মহাদেব বিগ্রহ। এর করুণা, কৃপাদৃষ্টিতে জন্মান্ধ দৃষ্টি লাভ করে, খঞ্জ অক্লেশে গিরি লঙ্ঘন করে, বন্ধ্যা নারীর পুত্র-সন্তান লাভ হয়। ছিন্ন বস্ত্রের ভিক্ষু রাজ সিংহাসন লাভ করে, রাজা অভিষিক্ত হন সম্রাট রূপে। আর দেবতা যদি কুপিত হন তবে তার অভিসম্পাতে নেমে আসে মহামারী, মহাপ্রলয়। ভূতনাথের তাণ্ডব নৃত্যে ধ্বংস হয় সব কিছু। যে কারণে নটরাজকে তুষ্ট রাখতে দীনহীন ভিক্ষু থেকে রাজাধিরাজ, গণিকা থেকে ধর্মাচারী ব্রাহ্মণ, সবাই মাথা নত করে এই সোমেশ্বর মহাদেবের শূন্যে অবস্থানরত লিঙ্গ বিগ্রহের সম্মুখে।
ত্রিপুরারিদেব প্রদীপদণ্ডে আলোক শিখা প্রতিস্থাপনের পর দুগ্ধভাণ্ড হাতে গর্ভগৃহে প্রবেশ করলেন নন্দিবাহন ও মল্লিকার্জুন। আবার কিয়ৎক্ষণের জন্য গর্ভগৃহর দ্বার ভিতর থেকে বন্ধ করা হল। মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে দুগ্ধস্নান সমাপন করে স্বর্ণ বিল্বপত্র স্থাপন করা হল লিঙ্গের মস্তকে। তারপর আবার উন্মোচিত করা হল গর্ভগৃহর কপাট।
তার ঠিক সমুখেই সেবায়েতরা দাঁড়িয়ে ছিল পূজার নানা উপাচার—বিল্বপত্র, ফুলমালা, ধূপ ইত্যাদি নিয়ে। দুই সহ-প্রধান পুরোহিত তাদের থেকে সে সব গ্রহণ করে গর্ভগৃহর মাটিতে সাজিয়ে রাখলেন। বিগ্রহর সামনে মাটিতে আসন পিড়ে পেতে বসে প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব উপাচার সহযোগে শুরু করলেন প্রত্যুষকালীন পূজাপাঠ। মন্ত্রোচ্চারণ আর ধূপের ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল গর্ভগৃহ। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল এই পূজাপাঠ। তারপর তা সাঙ্গ করে বিগ্রহকে নীলকণ্ঠ ফুলের মালা নিবেদন করে সঙ্গীদের নিয়ে গর্ভগৃহের বাইরে এসে দাড়ালেন ত্রিপুরারিদেব। দেবদাসী আর বাদ্যকারের দল প্রস্তুত হয়েই ছিল, তাঁরা বাইরে এসে দাঁড়াতেই গর্ভগৃহর উন্মুক্ত তোরণের সামনে দেবতার উদ্দেশ্য শুরু হল নৃত্যগীত।
গর্ভগৃহর সমুখস্থ চত্বর থেকে দেবদাসীদের নূপুরের নিক্কন ধ্বনি ছড়িয়ে পড়তে লাগল মন্দিরের নানা অংশে। দুই সহযোগীকে নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে প্রধান পুরোহিত প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন সেই দৃশ্য। দেবতার প্রাত্যহিক মনোরঞ্জন পর্ব শেষ হল এক সময়। অনতিবিলম্বেই এবার ভক্তদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে মন্দিরের প্রবেশদ্বার। ত্রিপুরারিদেব তাঁর সঙ্গীদের কাছে জানতে চাইলেন, ‘যে নারীরা দেবতার কাছে নিজেদের সমর্পণ করবে তাদের অঙ্গসজ্জার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে তো?’
মল্লিকার্জুন জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, প্রভু। দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমার তত্ত্বাবধানে সে কাজ শুরু করা হয়েছে। আজ যারা নিজেদের সোমেশ্বর মহাদেবের চরণে সমর্পণ করবে তারা প্রত্যেকেই সম্ভ্রান্ত বংশীয়া। নৃত্যগীত, বাদ্য যন্ত্রের ব্যবহারে বিশেষ পারদর্শী। চালুক্য রাজপরিবারের এক দুহিতাও আছে তাদের মধ্যে।’
সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণের পর যেমন নতুন নাম গ্রহণ করা হয় পূর্ব জীবনের সঙ্গে সব সম্পর্ক মুছে ফেলার জন্য, ঠিক তেমনই দেবদাসীদের ক্ষেত্রেও এই পন্থা অবলম্বন করা হয়। দেবতার কাছে নিজেদের সমর্পণের মুহূর্তে নতুন নাম ধারণ করে পূর্ব পরিচয় মুছে ফেলে তারা। পূর্ব জীবনের সব সংস্রব ত্যাগ করতে হয় তাদের। দেবতার কাছে নিজেদের উৎসর্গ করার পর তারা আর কারো কন্যা, ভগ্নী বা প্রেয়সী থাকে না, ধনী-দরিদ্র বংশ পরিচয়ের প্রভেদও থাকে না। এখন তাদের একমাত্র পরিচয় তারা দেবদাসী। তাদের একমাত্র নাথ—সোমেশ্বর মহাদেব।
প্রধান পুরোহিত প্রশ্ন করলেন, ‘যে নামে তাদের দেবতার কাছে উৎসর্গ করা হবে সে তালিকা প্রস্তুত?’
নন্দিবাহন জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, সে তালিকা প্রস্তুত, কেবলমাত্র একটি নাম ছাড়া। যে চালুক্য দুহিতার কথা বললাম—নারীদলের মধ্যে রূপে, গুণে, নৃত্য-গীতে সর্বশ্রেষ্ঠা। অষ্টাদশী সে কন্যার মধ্যে ভবিষ্যতে প্রধানা নর্তকী তিলোত্তমার স্থলাভিষিক্তা হবার সম্ভাবনা আছে। তাই আমার মনে হয়েছে, প্রধান পুরোহিতই তার নাম স্থির করুন।’
কথাটা শুনে ত্রিপুরারিদেব মৃদু বিস্মিত ভাবে বললেন ‘তাই নাকি! সে কার্য তবে আমি সম্পাদন করব। মধ্যাহ্নের ঠিক দু-দণ্ড আগে সেই নারীদের সমর্পণের উপাচার সহ এখানে উপস্থিত করবে। আর তার আগেই যেন আজকের মতো দর্শনার্থীদের দর্শনকার্যের সমাপন ঘটে।’ এই বলে প্রধান পুরোহিত এগোলেন তার কক্ষের দিকে।
মন্দিরের প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হল এরপর। বন্যার স্রোতের মতো পুণ্যার্থীরা প্রবেশ করতে লাগল ভিতরে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থেকে যুবক-যুবতী-শিশু, খঞ্জ থেকে দৃষ্টিহীন, কে নেই এই উদ্বেলিত জনতার মধ্যে! আর এদের নিয়ন্ত্রণের জন্য পুরোহিত আর সেবায়েতের দলও হাজির যথাস্থানে। মন্দিরের নিরাপত্তা ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য এছাড়া রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথের নেতৃত্বে যে রক্ষীদল আছে তারাও নিয়োজিত হল দর্শনার্থীদের সামলানোর কাজে।
‘জয় সোমেশ্বর মহাদেবের জয়’ আর ঘণ্টাধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল মন্দির চত্বর। বিল্বর স্তূপ জমা হতে লাগল চত্বরের এক অংশে। তা ছাড়া গর্ভগৃহের ঠিক পাশেই দান গ্রহণের জন্য বিশালাকৃতির সার সার যে রূপোর জালাগুলো আছে তা পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে লাগল রৌপ্য খণ্ড, স্বর্ণ খণ্ড, মূল্যবান পাথর শোভিত নানা অলঙ্কারে।
ওই কলসগুলো যুগ যুগ ধরে এমন ভাবেই পূর্ণ হয়ে আসছে। সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরে দান করলে যে মনস্কাম পূর্ণ হয়। সে জন্য গরিব ভিক্ষু থেকে ধনী রাজপুরুষ, যারাই মন্দিরে আসেন তারাই তাদের সাধ্যমতো দান করেন ওই পাত্রগুলোতে। তবে সব থেকে বড় দান কিন্তু স্বর্ণ-রৌপ্য বা মণি-মাণিক্য নয়, সে দান হল কন্যা বা ক্ষেত্র বিশেষে পুত্র দান। এ দানে সর্ব পাপ থেকে মুক্তি ঘটে আর অক্ষয় স্বর্গলাভ হয় বলে ভক্তকূলের বিশ্বাস। যে কারণে রাজা-মহারাজারাও অনেক সময় নিজ সন্তানকে উৎসর্গ করেন প্রভাস তীর্থে সোমেশ্বর মহাদেবের পাদপদ্মে।
চত্বর ত্যাগ করে ফিরে নিজ কক্ষে প্রবেশ করলেন ত্রিপুরারিদেব। কয়েক বৎসর পূর্বে মন্দিরের অধ্যক্ষের দেহাবসানের পর রাজ নির্দেশে তাঁকেই বর্তমানে মন্দিরের অধ্যক্ষর দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। তাঁর কক্ষটা বিশাল হলেও বাহুল্য বর্জিত। কক্ষের কেন্দ্রস্থলে কাষ্ঠ নির্মিত একটা পালঙ্ক আছে। আর আছে সামান্য কিছু তৈজসপত্র। কিন্তু কক্ষের বাকি অংশ দখল করে আছে রেশম ও ভূর্জপত্রের নানা পুঁথি ও মন্দির পরিচালনা সংক্রান্ত দস্তাবেজ।
নির্দিষ্ট একটা কার্য সম্পাদনের অভিপ্রায় একটা ভূর্জপত্র নিয়ে বসলেন ত্রিপুরারিদেব। খাগের কলম দিয়ে তিনি আঁক কষতে যাচ্ছেন ঠিক সেই সময় মৃদু ঘণ্টাধ্বনি শুনে দেওয়ালের এক অংশে মাথার ওপর দিকে তাকালেন।
একটা ঘণ্টা আছে সেখানে, সেটা কেঁপে উঠছে। ছিদ্রপথ দিয়ে বেরিয়ে আসা একটা রজ্জু দ্বারা যুক্ত ক্ষুদ্রাকৃতির ঘণ্টাটা। রজ্জুতে টান পড়লে ঘণ্টাটা মৃদু শব্দে বেজে ওঠে। ওই রজ্জুর অপর প্রান্ত কোথায় তা অবশ্য একমাত্র ত্রিপুরারিদেব ছাড়া অন্য কারো জানা নেই।
বেশ কয়েকবার বেজে উঠে থেমে গেল ঘণ্টাটা। মৃদু অবাক হলেন ত্রিপুরারিদেব। নিতান্ত প্রয়োজন ব্যতীত এ ঘণ্টা বাজে না। অর্থাৎ সে প্রধান পুরোহিতের সাক্ষাৎ প্রার্থী। তবে রাত্রি না নামলে, গর্ভগৃহ চত্বর শূন্য না হয়ে গেলে তাঁর কাছে পৌঁছতে পারবেন না ত্রিপুরারিদেব। তবে মধ্য যামে তিনি অবশ্যই তার কাছে যাবেন একথা ভেবে নিয়ে কাজে মন দিলেন তিনি।
