জুজুমা – কৌশিক মজুমদার
জুজুমা
॥ ১॥
আপনাদের মনে আছে কি না জানি না, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে একটা খবর চারিদিকে বেশ আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। সাঁওতাল পরগনায় মাদাম মেরি মানসিক হাসপাতালে আগুন লেগে এক রাতে সবাই মারা যায়। দেহগুলো এতটাই পুড়ে গেছিল যে কাউকে আর আলাদা করে চেনা যায়নি বা সবার হাড়গোড় অবধি খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই বিধ্বংসী আগুনে হাসপাতাল সংলগ্ন গির্জাটাও পুড়ে একেবারে ঝামা হয়ে যায়।
এই গোটা ঘটনায় একজন মাত্র জীবিত ছিলেন। সেই হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তার। নাম সুদীপ্ত চৌধুরী। একমাত্র তাঁকেই অক্ষত পাওয়া গেছিল। অন্তত দৈহিকভাবে। হাসপাতাল যখন দাউদাউ করে জ্বলছে, তখন তিনি নাকি হাসপাতালের সামনের টিলায় বসে খিলখিল করে হাসছিলেন আর দুই হাতে তালি দিচ্ছিলেন। পুলিশের ধারণা নির্জন এই মানসিক হাসপাতালে থাকতে থাকতে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে সবাইকে মেরে তিনিই হাসপাতালে আগুন লাগিয়ে দেন। এই ঘটনা নিয়ে সামনের সাঁওতাল গাঁয়ের কেউ কিছু বলতে পারেনি। পুলিশ তাঁকে রাঁচির পাগলা গারদে ভরতি করে। তবে সেখানেও এক অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। একদিন সকালে দেখা যায় বন্ধ সলিটারি সেল থেকে তিনি আচমকা গায়েব হয়ে গেছেন। কিছুদিন টিভি, পত্রিকা ইত্যাদি এই নিয়ে হইচই করলেও তারপরেই দেশে করোনা এসে যাওয়ায় সেই ঘটনার কথা ধামাচাপা পড়ে যায়।
আমিও ভুলে গেছিলাম। গত সপ্তাহে অনলাইনে বেশ কিছু পুরোনো বইয়ের অর্ডার দিয়েছিলাম। বিরাট মোটা একটা লাভক্রাফটের বইয়ের মাঝে জার্নালটা লুকিয়ে থাকায় আমারও প্রথমে চোখে পড়েনি। একবারে পাতলা, লাল কাপড়ে মোড়া। হাতে নিয়ে উলটে পালটে দেখতে গিয়েই কৌতূহল বাড়ল। শুরুতে সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা “ডাক্তার সুদীপ্ত চৌধুরী, এম ডি”। পরের দুটো পাতা খালি। তৃতীয় পাতায় লাল কালিতে বড়ো বড়ো করে লেখা, “আমি জুজুমাকে দেখেছি”। তারপরের পাতা থেকে লাল ডট পেনে লেখা শুরু হয়েছে কোনও ভূমিকা ছাড়াই। দেখে মনে হয় চরম কোনও আতঙ্কে তিনি ঝড়ের গতিতে লিখে গেছেন। লেখার চাপে কাগজে দাগ পড়েছে, লেখা জড়িয়ে গেছে, পাতা ছিঁড়েও গেছে কোথাও কোথাও। কিন্তু লেখা থামেনি। যা লেখা আছে তা এতই অদ্ভুত, এতই অপার্থিব, এতই অলৌকিক, যে, আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এই কাহিনির সঙ্গে যে অভিশাপ যুক্ত আছে, জানি না আজ এই গল্প আপনাদের সামনে শোনাতে এলে তার করাল ছায়া আমার বা আপনাদের উপরে বর্তাবে কি না। দুর্বল হৃদয় বা শিশুদের উপযোগী এই গপ্পো নয়। তাই আবার বলি, এ কাহিনি শোনার আগে মনকে আরও একবার শক্ত করে নিন। গল্পের খাতিরে জার্নালের মূল ভাষা ও কথনে সামান্য কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। বাকিটা হুবহু এক।
আপনারা শুনতে প্রস্তুত তো?
.
।।২।।
এখন রাত দেড়টা। এই মানসিক হাসপাতালে আজ আমার ছয় মাস পূর্ণ হল। এর আগে কেউই নাকি এতদিন এখানে থাকতে পারেনি। আজ রাতটা কোনওমতে কাটলে কাল ভোরে আমি পালাব। জানি না পারব কি না। পালানোর সব পথ বন্ধ। তবু প্রাণে বাঁচলে আমাকে এই অভিশপ্ত জায়গা থেকে যত দূরে সম্ভব চলে যেতে হবে। তাতেও হয়তো জুজুমার হাত থেকে পরিত্রাণ পাব না। হাতে আর সময় বেশি নেই। তার মধ্যেই সব কথা লিখে যাওয়া প্রয়োজন, যাতে এই জার্নাল কারও হাতে পড়লে সে সতর্ক হয়। জুজুমা কোনও কল্পনা না। জুজুমা সত্যিই আছে। আর জুজুমার ক্রোধ মারাত্মক। তাকে খুঁজতে গিয়ে যে ভুল আমি করেছিলাম, ভবিষ্যতে কোনও দিন কেউ যেন তা না করে। গুছিয়ে লিখব, সেই মানসিক অবস্থা এই মুহূর্তে আমার নেই। তাই যা মনে পড়ছে, যেমনভাবে মনে পড়ছে, তেমনভাবেই লিখে রাখছি।
শুরু থেকেই শুরু করি।
সাইকিয়াট্রি নিয়ে ডাক্তারি পাশ করে কিছুদিন রেসিডেন্ট ডাক্তার হিসেবে কলকাতায় কাজ করলাম। কিন্তু শহরে মন টিকছিল না। বাবা তো অনেকদিন আগেই গেছেন, মা মারা যাবার পর পাকাপাকিভাবে শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। এ কথা আমার বন্ধু রূপমকে জানাতেই সে বলল, “আরে বাহ! দারুণ কার বলেছিস। গতকালই ডাক্তার বিশ্বাস তাঁর হাসপাতালের জন্য নতুন ছেলে খুঁজছিলেন। দেখ ভাই, আমি তো কলকাতা ছেড়ে এক পা নড়ব না। এখন তুই যদি রাজি থাকিস…”
ডাক্তার বিশ্বাসের পুরো নাম বেঞ্জামিন সুশীল বিশ্বাস। বাঙালি খ্রিস্টান, কিন্তু আমি এতদিনে তাঁকে সেভাবে ধর্মাচরণ করতে দেখিনি। মূলত তাঁর উদ্যোগেই সাঁওতাল পরগনার এমন এক নির্জন জায়গায় গির্জার পাশেই মাদাম মেরি হাসপাতাল আর পাগলা গারদ তৈরি হয়েছে। ডাক্তার বিশ্বাস সারাদিন এখানকার মানুষদের নিয়েই থাকেন। তিনিই একাধারে এই গির্জার ফাদার কাম হাসপাতালের হেড। অন্য ডাক্তার বলতে শুধু আমি। মহিলা নার্স অবশ্য আছে জনা তিনেক। এরা ছোটোনাগপুরের মিশন থেকে আসা সিস্টার। বাকি সব গির্জার নানা ফাইফরমাশের কাজ করে। ডাক্তারের চব্বিশ ঘণ্টা হেল্পার হিসেবে দুইজন ষন্ডামতো লোক আছে। উদয় আর শম্ভু। বেশিরভাগই আমার মতো অনাথ সংসারে রুচি নেই।
আমাদের হাসপাতালে রোগীর সংখ্যাও খুব বেশি না। জনা দশেক। এদের মধ্যে মহিলা ছয়জন। তবে তাদের কেউই এখানকার স্থানীয় লোক নয়। এদের নাম কেউ জানে না। পরিচয়ও না। এরা সবাই পরিবার পরিত্যক্ত। কাউকে রেলস্টেশনে, কাউকে বাস ডিপোতে, আবার কাউকে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেখে সহৃদয় কোনও মানুষ বা এনজিও এদের আমাদের হাসপাতালে নিয়ে এসে ভরতি করে দিয়েছে। এরা সবাই সাধারণ মানুষের ভাষায় উন্মাদ পাগল। নিজের নামটা অবধি বলতে পারে না। এখানে নিয়ে আসার পর সবাইকে স্নান করিয়ে, নতুন পোশাক পরিয়ে গির্জায় যিশুর মূর্তির সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার এদের মাথায় হোলি ওয়াটার ছেটান। তারপর বলেন-
“আজ থেকে তোমার নতুন জন্ম হল।”
হাসপাতালে ভরতি করার সময় এদের প্রত্যেকের একটা করে খ্রিস্টান নাম দেওয়া হয়। জর্জ, হ্যারি, মেরি, এলিজাবেথ, ম্যাগি, অ্যালিস… এমন সব। এই নামকরণের কাজটা ডাক্তার বিশ্বাসই করেন। ভদ্রলোক বেশ দিলখোলা। নেশা বলতে শিকারের নেশা। দুটো বোল্ট অ্যাকশন রাইফেল, আর দুটো সেমি অটোমেটিক রাইফেল আছে ডাক্তারের। মাঝে মাঝেই শম্ভু আর উদয়কে নিয়ে জিপগাড়ি চেপে বনে শিকার করতে যান। কোনও দিন খালি হাতে ফেরেন, আবার কোনও দিন সঙ্গে থাকে বনমুরগি, খরগোশ কিংবা বুনো হাঁস। হাসপাতালের থেকে কিছুটা দূরেই এক সরু নদী। ওপারে সুবিশাল অরণ্য। সেখানে স্তরে স্তরে বিরাট বিরাট সব গাছ সারি বেঁধে রয়েছে। এর পিছনেই দেওয়ালের মতো সুদূরবিস্তৃত পর্বতশ্রেণি, তাও স্তরে স্তরে সাজানো। পাশের সাঁওতাল গ্রামটিও নিরুপদ্রব। সরল, সাদাসিধে মানুষগুলো কারও সাতে থাকে পাঁচে থাকে না। সমভূমি থেকে একটু উঁচুতে চারিদিকে ঢালু এক জায়গায় এদের পল্লি। বেশিরভাগ বাড়িই কাঠ, মাটি আর পাতায় ছাওয়া। নিজেদের জমিতে চাষ করে যে শসা তৈরি হয়, তাতেই এদের চলে যায়। কেউ কেউ তিরধনুক নিয়ে বনে শজারু, বুনো মুরগি শিকার করে। অবসর সময়ে অনেকেই সামান্য মজুরিতে গির্জা আর হাসপাতালের নানা ফাইফরমাশ খাটে।
আমার এই হাসপাতালে দুই মাস পূর্ণ হবার দিন সকালে ডাক্তার বিশ্বাস নিজের চেম্বারে আমায় ডেকে পাঠালেন। সে চেম্বার দেখলে যে কেউ শিকারির ট্রোফি রুম বলে ভুল করবে। দেওয়ালে সারি সারি পশুর মাথা মাউন্ট করা। এদের মধ্যে হরিণ, চিতা, বুনো শুয়োর, বাইসন… কী নেই? প্রত্যেকটা মাউন্ট করা মাথার তলায় কত সালে, কোন বন থেকে এই শিকার তিনি করেছেন, তা তিলের প্লাকে খোদাই করে রাখা। সরকার আইন করে শিকার বন্ধ করায় এখন তিনি পাশেই একটা ঘরে পাখিদের স্টাফিং করে মন ভরান।
ডাক্তার বিশ্বাস হেসে বলছিলেন, “বুঝলে হে সুদীপ্ত, মনে হচ্ছে একমাত্র তুমিই এই জঙ্গলে টিকে গেলে। নইলে শহর থেকে এত দূরে এমন জনমানবশূন্য জায়গায় এই বুড়ো ডাক্তারের পাশে কেউই মাসখানেকের বেশি দাঁড়ায়নি।”
“আমি যাব না স্যার”, হেসে বললাম। “আর যাবই বা কোথায়? আমার তিন কুলে কেউ নেই। বন্ধুবান্ধবও হয়ে ওঠেনি তেমন। বরং এই নির্জনতাই আমার ভালো লাগে।”
“অবসর সময়ে কী করো?”
“সামনের জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই। সাঁওতাল গ্রামে ঘুরতে যাই মাঝেমধ্যে। ওদের সুন্দর রং করা, আয়নার কাচ আঁটা বাড়ি দেখলে সেই ছোটোবেলায় প্যাস্টেলে আঁকা ছবির কথা মনে পড়ে। এত কষ্টের মধ্যেও কীভাবে নিজেদের আনন্দ খুঁজে নিতে হয়, ওরা জানে। তবে যা বুঝলাম, এই জঙ্গলে কিছু সমস্যাও আছে।
“কী সমস্যা?”
“মাঝে মাঝেই ওদের মধ্যে কেউ কেউ নাকি হারিয়ে যায়। আর ফিরে আসে না। আমি নিজে দেখেছি, দুই বাচ্চার বাপ গায়েব, সদ্যবিবাহিত মহিলা গায়েব। গত দুই মাসে এমন দুটো ঘটনা ঘটেছে। এমনটা ঘটলে কিছুদিন খুব চিৎকার চেঁচামেচি হয়। তারপর আবার সব শান্ত।”
“আসলে কী জানো তো, তোমার যেমন শহরে মন টেকে না, এদের অনেকের এই জঙ্গলে আর ভালো লাগে না। শহরের জাঁকজমক তাদের টানে। আর এদের অনেকের মধ্যে তথাকথিত সভ্যদের মতো ছুঁতমার্গ থাকে না। তাই অবলীলায় অন্য কারও হাত ধরে চলে যেতে পারে।
“আপনি কারও হাত ধরলেন না কেন?”
হো হো করে হেসে ডাক্তার বিশ্বাস বললেন, “পাগল নাকি? আর কোন্ মেয়ে আমার মতো এমন ছন্নছাড়াকে বিয়ে করে এই গড ফরসেকন জায়গায় থাকবে? সেবার নেশা আর শিকারের নেশা। এই দুই নিয়েই দিব্যি আছি।” মৃদু হেসে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন ডাক্তার, “তবে দেখো বাবা, ভুলেও যেন বিয়ে-টিয়ে করে বোসো না। তাহলে এই সমস্ত স্বাধীনতা হারাবে।”
“প্রশ্নই ওঠে না।” আমিও হেমে জবাব দিলাম।
চারিদিকে গাঢ় সবুজ বন আর একাটোর সাঁওতাল গ্রামের উলটো দিকে মাঠের ঠিক মাঝখানে আমাদের গির্জা আর হাসপাতাল। একদিকে কুলকুল শব্দে বয়ে যাচ্ছে বীরঝোরা। মাঝে মাঝেই সামনের মাঠে ঢাক আর বাঁশি বাজিয়ে বিশ- তিরিশজন সাঁওতাল ছেলেমেয়ে পিতলের মোটা গয়না আর মাথায় বিচিত্র সুন্দর সব পালকের মুকুট পরে নাচগান করে। ঢাকের গম্ভীর আওয়াজ, নৃত্যরত মানুষের উদ্দাম চপলতা, তাদের প্রায় অনাবৃত শরীর মিলেমিশে এক আদিম, প্রাগৈতিহাসিক জীবনের সন্ধান দেয়।
কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই সব কিছু বদলে যেতে থাকে দ্রুত। অন্ধকার একটা পাতলা চাদরের মতো যেই এই প্রাচীন বনস্থলীকে ঢেকে ফেলে, অমনি ঢাকের আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। যেন দেরি করলেই ভয়ানক কিছু একটা ঘটে যাবে, এমনভাবে দুড়দাড় করে সবাই যে যার বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। এতক্ষণ যে শিশুরা হাসছিল, খেলা করছিল, তাদের মায়েরা হাত ধরে টেনে নিয়ে তাদের ঘরে ঢোকান। অন্ধকার হলেই এখানের বাতাস গাঢ় হয়ে আসে। দূরের শালবন থেকে ভেসে আসে ফিসফাস শব্দ। মনে হয় এক উপোসি হাওয়া যেন হা হা করতে করতে ঘুরে বেড়ায় চারপাশে। প্রথম যেদিন এসেছিলাম এসব দেখে বেশ ভয়ই পেয়ে গেছিলাম। ডাক্তার বিশ্বাস আমার ভয় ভাঙান।
“আসলে কী জানো তো, সাঁওতালদের জাতীয় গাছ হল এই শাল। তারা বিশ্বাস করে এই শালবনের দেবতা আর অপদেবতারাই তাদের জীবন চালায়। সবই এদের মনগড়া। কুসংস্কার বলতে পারো, কিন্তু এই সহজ সরল মানুষগুলো এই নিয়েই খুশি। ওরা দানবকে বলে বোঙ্গা। এদের সব কিছুর জন্যেই একজন করে বোঙ্গা আছেন। তবে এক জায়গার অপদেবতার সঙ্গে অন্য জায়গার অপদেবতার মিল পাওয়া যায় না প্রায়ই।”
“এখানকার অপদেবতার নাম কী?”
“জানি না। আমি বিজ্ঞানের মানুষ। এসব সুপারস্টিশন নিয়ে ভাবার সময় আমার নেই।” বেশ কড়াভাবেই বললেন ডাক্তার। আমিও আর কথা বাড়ালাম না।
রাত বাড়লে আমাদের এই হাসপাতালের রূপ বদলাতে থাকে। দিনের দুর্বিষহ তাপ কমে একটা শিরশিরে ঠান্ডা জানলার ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে একেবারে ভিতর অবধি নাড়িয়ে দেয়। আর তখনই চিৎকারটা শুরু হয়। প্রথম আওয়াজটা আসে অ্যালিসের বিছানা থেকে। ঘড়ি ধরা ঠিক সাড়ে এগারোটায়। একটা তীক্ষ্ণ বাঁশির মতো শব্দ। বছর কুড়ির অ্যালিসকে বিবস্ত্র অবস্থায় রেলস্টেশনে কুড়িয়ে পেয়েছিল কেউ। তার চিৎকারে অবিকল যেন সেই রেলের হুইসেলের ধ্বনি। সে শুরু করতেই ফিমেল ওয়ার্ডের আশেপাশের সব বিছানা থেকে বিচিত্র সব আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে। বৃদ্ধা এলিজাবেথ সারারাত ডুকরে কাঁদে, ম্যাগি বিছানায় উবু হয়ে বসে ক্রমাগত মাথা ঠুকতে থাকে, মেরি সারারাত হাততালি দিয়ে বিচিত্র খোনা স্বরে হাসে। পুরুষ ওয়ার্ডও চঞ্চল হয়ে ওঠে এই আওয়াজে। বন্দি সিংহের মতো নিষ্ফল গর্জনে কেঁপে কেঁপে ওঠে গোটা হাসপাতাল। কে বলবে দিনের বেলায় এই দুটো ওয়ার্ডে পিন ফেলার আওয়াজটুকুও পাওয়া যায়! তখন কেউ ঢুকলে ভাববে একদল তুলোর পুতুল নিঃসাড় শুয়ে আছে সাদা কাপড় জড়িয়ে। ডাক্তার বিশ্বাস আর আমি দুজনেই আমাদের জ্ঞানবুদ্ধিমতো চিকিৎসার চেষ্টা করেছি। আমাদের জানা সবচেয়ে কড়া ঘুমের ওষুধ প্রয়োগ করেও দেখেছি। কিন্তু কিছুতেই এই রাতের কনসার্ট থামাতে পারিনি।
রাতের কনসার্ট। এই নামই আমরা দিয়েছিলাম এই অজানা পাগলামোর। আমি কান চেপে ধরে শুয়ে থাকতাম। ভোরের দিকে সব ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে যেত। প্রথম মাস দু-এক এভাবেই কেটেছিল। তারপর একদিন আমি কুরন বইয়ের কথা শুনলাম।
কুরন বইয়ের কথা আমাকে প্রথম বলেছিল সোনাই হাঁসদা। সোনাই সামনের গ্রামে থাকে। হাসপাতালের স্টোরকিপার। এ ছাড়াও বাগান পরিচর্যা, খাটালের গোরুদের খেতে দেওয়া, দুধ দোয়ানোর কাজ করে। ছেলেটা বুদ্ধিমান, পরিশ্রমী, শিক্ষিত। ছোটোবেলায় মিশনারি স্কুলে পড়াশোনাও করেছে। একবার দেখি কাউকে কিছু না বলেই এক হপ্তা সোনাইয়ের দেখা নেই। এমন তো ও কোনও দিনও করে না! ডাক্তার বিশ্বাসের অনুরোধে এক সকালে আমি নিজেই সোনাইয়ের বাড়িতে দেখা করতে গেলাম। ওর বউ বেরিয়ে এল। সোনাই কোথায় জিজ্ঞেস করায় বউ বলল, “দেখা নেহি হবো বাবু। মোরক ওহ ঘরে বন্ধ কারি থা।
“সাতদিন ঘরে বন্ধ!! কিন্তু কেন? ওর সঙ্গে কথা বলা যাবে?”
“আও”, বলে সোনাইয়ের বউ আমাকে একটা বন্ধ কাঠের দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। আমি ডাকলাম, “সোনাই আছ নাকি?”
দরজার অপর দিক থেকে উত্তর পেলাম, “গুড মর্নিং ডাক্তার সাহেব। কেমন আছেন?”
“আরে আমি তো ভালোই আছি। তুমি হাসপাতালে যাচ্ছ না কেন? আর এসব কী?”
“সাহেব, ক-দিন ধরে রাত হলেই ধুম জ্বর আসছে। আর জ্বর এলেই অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি। দিনে মাথা ঝিমঝিম করে। গায়ে একদম তাগত পাই না…”
“সেটা তো আমাদের বলবে! আমি নিজে তোমার চিকিৎসা করতাম।”
খানিক চুপ থেকে সোনাই বলল, “সাহেব, এটা আপনার শহর না। জঙ্গল। এখানে জঙ্গলের কানুন চলে। আপনাদের সভা শহরে চিকিৎসা আমাকে সরাতে পারবে না।”
“তাহলে কে পারবে?”
“করন বই। আমাদের গাঁয়ের মহিলা পুরোহিত। কারও কোনও রোগ হলে আমরা তাঁকেই ডাকি। আপনারা তো মানবেন না ডাক্তারবাবু, কিন্তু এ রোগ আসলে আর কিছুই না। প্রেতের আক্রমণ। রাত হলেই প্রেত আসে। তার তাপে শরীরের রক্ত গরম হয়ে যায়। প্রেত শরীরে ঢুকে সেই গরম রক্ত চেটে চেটে খায়। কুরন বই আমায় দেখে গেছেন। বলেছেন পুজো না দিলে রোগ সারবে না।
“তা তোমার জন্য সেই পুজো হয়েছে?”
আমার গলায় একটা শ্লেষের ভাব ছিল। সোনাই সেটা বুঝতে না পেরেই দরজার ওপার থেকে বলল, “তাহলে তো রোগ সেরেই যেত। আমার পুজো আজ রাতে হবে। আজ পূর্ণিমা কিনা। মারাং বুরুর থানের মাঠে গোটা গাঁয়ের লোক জড়ো হবে। কুরন বই এই জ্বরবোঙ্গাকে তাড়াবেন। আমি সুস্থ হয়ে গেলে কাল থেকে আবার হাসপাতাল যাব। এই ক-দিন কারও মুখ দেখা বারণ। দেখলে আত্মা তাকেও গিয়ে ধরবে।
.
।।৩।।
মনে একরাশ বিরক্তি নিয়ে ফিরলাম। ডাক্তার বিশ্বাস এই গ্রামের এত কাছে এদের সাহায্যের জন্যই হাসপাতাল খুলেছেন, আর এরা এখনও ওঝা ডাকিয়ে রোগ সারাচ্ছে! তবে যাই হোক, এই কুরন বইকে নিয়ে মনে মনে একটা আগ্রহ তৈরি হল। অন্যদিন সন্ধের পর হাসপাতালের লাগোয়া কোয়ার্টারে বসে বই পড়ি আর শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবি। আজ বরং একবার মারাং বুরুর থানে গিয়ে দেখাই যাক না।
সন্ধে গাঢ় হতেই হাতে একটা টর্চ নিয়ে সাঁওতাল গ্রামের দিকে রওনা হলাম। অন্যদিনের মতো আজকে সাঁওতাল গ্রাম থমথম করছে না। বরং দূর থেকে একতালে একটা ঢোলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। দুম-দুম। ধুপ-ধুপ। একটা আড়বাঁশি একটানা কান্নার মতো আওয়াজ করে বাজছে। বলতে দ্বিধা নেই, আমার কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। মারাং বুরুর থানের সামনের মাঠে চারদিকে মশাল জ্বলছে দাউদাউ করে। আমি কাছেই বিরাট এক শালগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে সব কিছু দেখতে লাগলাম।
একটা খুঁটির নিচে ছোটো বাঁশের ঝুড়িতে কিছুটা ধান আর একটা ঝুড়িতে কিছুটা চাল দুইভাগে পাশাপাশি রেখে দেওয়া হয়েছে। এই ধান আর চালের ঝুড়ির পাশে আরও চার-পাঁচটা ছোটো ছোটো পূজার উপকরণ শালপাতায় সাজিয়ে রাখা। আচমকা বাঁশি বেজে উঠল দ্রুত লয়ে। দেখলাম মাথায় জটা, আনুমানিক বছর তিরিশের এক স্থূলকায়া মহিলা প্রায় টলতে টলতে সেই খুঁটির সামনে এল। আশেপাশের মহিলা পুরুষ সবাই তাকে প্রণাম করছে দেখে বুঝলাম এই সেই কুরন বই। সে খুঁটির পাশে বসে সামনের দিকে দুই পা ছড়িয়ে অচেনা ভাষায় গানের সুরে কী এক মন্ত্র আওড়াতে শুরু করল। গোটা মাঠ নিস্তব্ধ। শুধু ঢোলটা দ্রিম দ্রিম শব্দ করছে। সেই মন্ত্রে নেশা ধরে যায়। এই মন্ত্র আওড়াতে আওড়াতেই যে চোখদুটো নেশার ঘোরে প্রায় মুদে ছিল, তা খুলে গেল সম্পূর্ণ। মন্ত্ৰ বন্ধ হয়ে গেল। বদলে মুখ থেকে হিংস্র এক গোঙানির আওয়াজ বেরোতে লাগল। ঠিক এইখানে সোনাইয়ের বউ এসে একটা লাউয়ের খোল দিয়ে বানানো পানপাত্র থেকে অল্প অল্প মদ ঢালতে থাকল কুরন বইয়ের মাথায়। কুরন বইয়ের গোঙানি বন্ধ হল। মাথা থেকে গড়িয়ে পড়া মদ জিভ বার করে চেটে চেটে খেতে লাগল সে। তারপর আবার শুরু হল সেই একঘেয়ে মন্ত্রপাঠ।
এতক্ষণ খেয়াল করিনি, এবার দেখলাম থানের থেকে কিছু দূরে একটা মাঝারি আকারের শুয়োরকে চারপায়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। দুইজন জোয়ান পিছনের পা দুটো ধরে সামনের এক কাঠের পাটাতনে তাকে জোরে আছাড় মেরে ফেলল। এক ভয়ানক মৃত্যু আর্তনাদ করে ছটফট করতে লাগল শুয়োরটা। আরও একজন হাতের তীক্ষ্ণ ছুরি দিয়ে শুয়োরের মাথাকে ধড় থেকে আলাদা করে তার ভবযন্ত্রণা ঘুচিয়ে দিল।
এবার সেই মাথা শালপাতায় করে নিয়ে আসা হল পূজাস্থানে। মাথা থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তে ভরে নেওয়া হল একটা মাটির ভাঁড়। বাকি দেহকে ছোটো ছোটো টুকরো করে সেই মাঠে আগুন জ্বালিয়ে পোড়ানো হল। সঙ্গে মাটির হাঁড়িতে রান্না হল বেশ কিছুটা ভাত। এদিকে কুরন বই আবার মন্ত্র পড়া শুরু করেছে। সোনাইয়ের বউ এবার সাতখানা শালপাতায় ভাত, রক্ত আর শুয়োরের মাংস মিশিয়ে নিয়ে এল কুরন বইয়ের কাছে। এবার সোনাইয়ের আসার পালা। জ্বরের ঘোরে সোনাই পুরো অজ্ঞান। দুইজন কোনওমতে তাকে তুলে নিয়ে এসে শুইয়ে দিল পূজাস্থানে। কুরন বই এবার লাউয়ের পাত্রে কিছুটা মদ নিয়ে মাংস- ভাত মেশানো পাতায় ছিটিয়েই আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনবার চিৎকার করে বলল, “জুজুমা! জুজুমা! জুজুমা!”
জানি না এ কথা কেউ বিশ্বাস করবে কি না, কিন্তু আমি নিজের চোখে স্পষ্ট দেখলাম শালপাতাগুলো খড়খড় করে উঠল। আশেপাশের সবাই একেবারে পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও কোনও আওয়াজ নেই। শুধু সোনাই বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ফেলছে। তার সারা গা ঘামে ভেজা। মনে হল আশেপাশের পরিবেশের তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে দ্রুত। আমি শিউরে উঠলাম। আর তারপরেই শুনতে পেলাম সেই আওয়াজটা। একটা খনখনে কাশির মতো আওয়াজ। কোনও বৃদ্ধ মানুষ যেন কাশতে কাশতে এগিয়ে আসছে দূরের বনের ভিতর থেকে। সাঁওতালদের সবাই, এমনকি কুরন বই পর্যন্ত মাটিতে টানটান শুয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল। আমি কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু সেই কাশির আওয়াজটা খুব দ্রুত এগিয়ে আসছে। যেন বিরাট লম্বা লম্বা পা ফেলে এক অদৃশ্য দৈত্য ধেয়ে আসছে পূজাস্থানের দিকে। কুরন বই এবার উঠে একেবারে পদ্মাসনে বসে জটাভরা মাথাটাকে বনবন করে ঘোরাচ্ছে। সে আর কোনও মন্ত্র পড়ছে না। দুই হাত শক্ত মুঠি কার, দাঁতে দাঁতে ঘষছে আর তারপরেই কুরন বসা অবস্থা থেকে সোজা দাঁড়িয়ে পড়ল। অদ্ভুত মোটা পুরুষালি গলায় জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়ায়ে?”
বুঝলাম জুজুমা এবার করন বইয়ের মুখ দিয়ে কথা বলছে। সোনাইয়ের বউ আর একটাও কথা না বলে শুয়োরের মাংসভরা শালপাতাগুলো এগিয়ে দিল কুরনের দিকে। ঠিক যেমনভাবে একটা নেকড়ে বা কুকুর জাতীয় প্রাণী খাবার খায়, তেমন চার হাত পায়ে ভর দিয়ে হাম হাম করে কুরন মাংসভাত খেতে শুরু করল। গোটা পূজাস্থল জুড়ে মাংস চিবানোর কচমচ শব্দ। একে একে সাতখানা শালপাতার খাবার খেয়ে মুখ তুলল করন বই। তারপর ঘন ঘন জিভ বার করতে লাগল। খেয়াল করে দেখলাম কুরন বইয়ের জিভটা অস্বাভাবিক লম্বা আর টকটকে লাল। সোনাই তখন সম্পূর্ণ অচেতন। শ্বাস পড়ছে কি পড়ছে না। দুজন মিলে সোনাইকে ধরে কুরন বইয়ের পায়ের কাছে নিয়ে এল। কুরন নিজের পেট চেপে মাটিতে শুয়ে আছাড়িপিছাড়ি করে গোঙাতে শুরু করল।
বেশ খানিক এমন করার পর কুরনের মুখ থেকে কী যেন একটা ছিটকে পড়ল মাটিতে। সোনাইয়ের বউ দৌড়ে গিয়ে সেটা একটা কাপড়ে ভুলে সেই কাপড় নিয়ে বুলিয়ে দিতে লাগল সোনাইয়ের সারা গায়ে হাত পায়ে। চারিদিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী পুরুষরা তখন একসঙ্গে মন্ত্র উচ্চারণের মতো বলে চলেছে, “জুজুমা। জুজুমা। জুজুমা।”
যেন কোনও ম্যাজিক শো দেখছি, এমনভাবে সোনাইয়ের অচেতন দেহে সাড়া জাগল। সোনাই ধীরে ধীরে চোখ খুলে উঠে বসল। একজন কোথা থেকে একটা পেতলের ঘড়া ভর্তি জল নিয়ে এল। কুরন ততক্ষণে উঠে বসেছে। সে আবার গম্ভীর গলায় বলে উঠল, “এইটা নি”। সোনাই দাঁত দিয়ে অবলীলায় সেই জলভরা পিতলের ঘড়া উঠিয়ে নিয়ে হাঁটতে লাগল। ঠিক সাত পা হাঁটার পর সোনাই ঘড়া মাটিতে ফেলে দিল। কুরন-ও অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। বুঝলাম কুরনের ভর আর সোনাইয়ের জ্বর একইসঙ্গে সেরেছে।
ঘরে ফিরে কিছুতেই আমার ঘুম এল না। এতক্ষণ যা হল, আমাদের সাধারণ বুদ্ধি সেখানে হার মানে। ডাক্তারি শাস্ত্র আমাদের যা যা পড়িয়েছে, সবই ভুল বলে মনে হয়। শেষরাতে চোখ একটু বুজে এসেছিল। হঠাৎ একটা ভয়ানক অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল। প্রথমে কিছুক্ষণ বুঝতে পারলাম না। তারপর বুঝলাম। জানলার কাচে একটা অদ্ভুত বিকৃত মুখ। সে মুখ অপলক দৃষ্টিতে আমার দিয়ে চেয়ে আছে। আমি ধড়মড়িয়ে উঠে বসতেই মাথাটা গায়েব হয়ে গেল। দেখলাম এই ঠান্ডাতেও আমার সারা গা ঘামে ভিজে গেছে।
পরদিন সকালে দেখি মাঠ পেরিয়ে সোনাই আসছে। আমায় দেখে একগাল হেসে হাঁক পেড়ে ডাকল, “গুড মর্নিং ডাক্তারবাবু। ভালো আছেন?”
“আমি তো ভালো। তুমি কেমন?”
“যেমন দেখছেন। একেবারে সুস্থ। দুর্বলতাও নেই। কাল কুরন বই আমায় ঝাড়িয়ে দিয়েছেন।”
“হ্যাঁ, দেখলাম।”
বলা মাত্র সোনাইয়ের মুখে কেমন একটা ভয়ের ছায়া দেখতে পেলাম।
“কী দেখলেন ডাক্তারবাবু?”
“ওই তোমাদের জুজুমাকে।”
সোনাইয়ের চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠল। কথা জড়িয়ে গেল।
“আপনি… আপনি… জুজুমাকে দেখেছেন?”
“না, ঠিক দেখেছি বললে ভুল বলা হবে। তবে কুরন বই যে তার ভরে পড়েছিল সেটা দেখেছি।” ইচ্ছে করেই রাতের সেই প্রেতের কথাটা চেপে গেলাম।
“তাই বলুন। আসলে জুজুমাকে কেউ দেখতে পায় না। পায় একমাত্র কুরন বই। উনি ছাড়া অন্য কেউ দেখলে…” বলেই হঠাৎ চুপ করে গেল সোনাই।
“অন্য কেউ দেখলে কী হবে সোনাই?”
“বাদ দিন ডাক্তারবাবু। শুনলে আপনি হাসবেন। বিশ্বাস করবেন না।”
“কেন করব না? তুমি বলো।”
“আমি বলতেও পারব না ডাক্তারবাবু। জানলেও জুজুমাকে নিয়ে কথা বলার অধিকার আমাদের কারও নেই। বলতে পারে একমাত্র কুরন বই।”
আমার জেদ চেপে গেছিল। আমি বেশ জোর দিয়েই বললাম, “তবে যার থেকে জানা যায়, তার থেকেই জানব। তুমি কুরন বইয়ের সঙ্গে আমার আলাপ করাও।”
“ছেড়ে দিন সাহেব। অমন করে জোর করবেন না। আমরা পাহাড়ি জাতি। আপনারা শহুরে লোক। তেলে জলে মিশ খাবে না। আর একটা কথা বলি? ছোটো মুখে বড়ো কথা। আপনি কাল ওখানে না গেলেই ভালো হত।”
“ওসব বুঝি না। তুমি কুরন বইয়ের সঙ্গে দেখা করাবে কি না বলো।
“উনি আপনার ভাষা বুঝবেন না।”
“তুমি আছ কী করতে? তুমি বুঝিয়ে দেবে।”
সোনাই গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বুঝলাম আমাকে কুরন বইয়ের সঙ্গে আলাপ করানোর ওর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। এবার আমি তুরুপের শেষ তাস ফেললাম। বেশ কড়াভাবেই বললাম, “দ্যাখো সোনাই, আমি তোমাকে এমন কোনও অন্যায় কাজ করতে বলিনি যে তুমি রাজি হচ্ছ না। শেষবারের মতো বলছি, হয় রাজি হও, নয়তো ডাক্তার বিশ্বাসকে বলে তোমার এখানের কাজ আমি বন্ধ করব।”
আমি জানতাম এই গরিব সাঁওতালদের কাছে হাসপাতালের এই সামান্য মাইনে কতটা জরুরি। এ এমন প্রস্তাব, যাতে সোনাই না করতে পারবে না। উত্তর না দিয়ে গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সোনাই। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, “কি, রাজি তো?”
এবার উপরে নিচে মাথা নাড়ল। রাজি।
“কবে নিয়ে যাবে আমায়?”
“আজ সন্ধ্যায় চলুন।”
“ঠিক আছে। কিন্তু ওকে বলার দরকার নেই কাল আমি লুকিয়ে সব দেখেছি। বলবে আমি তোমাদের কালচার নিয়ে আগ্রহী, তাই প্রশ্ন করতে চাই!”
“যেমন আপনি বলেন।”
.
।।৪।।
দিনের আলো পড়তে না পড়তেই সোনাই আমাকে নিয়ে গ্রামের দিকে চল্ল। এর মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর। গ্রামের শুরুর দিকের বাড়িগুলো পেরিয়ে একেবারে শেষে বিরাট এক শিশুগাছের তলায় কুরন বইয়ের ঘর। অন্য ঘর থেকে এই ঘরটা একটু আলাদা। উপরে যথারীতি খাপড়ার চাল, কিন্তু বাড়ির দেওয়ালে উট, চিতাবাঘ, ময়ূর, কাঁটাচুয়া আর বিভিন্ন রংবেরঙের ফুলের ছবি সুন্দর করে আঁকা।
সোনাই ঘরের সামনে গিয়ে চাপা গলায় “দেওলা, দেওলা” করে ডাকতেই একটা বছর দশেকের অদ্ভুত সুন্দর মেয়ে বেরিয়ে এল। মেয়েটার একটা চোখের মণি কালো, অন্যটা ধূসর। সোনাইকে দেখে একগাল হেসেই আমাকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সোনাইয়ের দিকে তাকাল।
সোনাই জিজ্ঞেস করল, “মা কোথায়ে?”
“বোর কুড়ি।”
“চলুন, ঘরেই আছে।”
কুরন বইকে আজকে দেখে বেশ অবাকই হলাম। একেবারে সাদাসিধে আর দশটা সাঁওতাল বউয়ের থেকে কোনওভাবেই আলাদা করা সম্ভব না। কালকের সেই করন বই যেন অন্য কোনও মানুষ। আচ্ছা, কুরন বইয়ের আসল নাম তবে দেওলা। চোখদুটো ক্লান্ত। শরীরে তেমন জোর নেই। তবুও দেওলা আমাদের হাসিমুখে আপ্যায়ন করে তক্তপোশে বসতে বলল। দেওলার মেয়ে দুটো ঘটিতে জল এনে দিল। ওর নাম জোনাকি। আমি অবশ্য ওদের মুখের ভাষা কিছু বুঝতে পারছিলাম না। তবে এটা বুঝলাম দেওলা আমার প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। দুজন মিলে চিন্তিত মুখে কী একটা আলোচনাও করছিল। সোনাই আমার দিকে ফিরে বলল, “আজ সকাল থেকে আরও একজন নিখোঁজ ডাক্তারবাবু। এই গ্রামে কার যে অভিশাপ লাগল!”
“পুলিশে খবর দিচ্ছ না কেন?”
“কত আর দেব স্যার। পুলিশ তো আমাদের মানুষ বলেই মনে করে না। কুকুরের মতো তাড়িয়ে দেয়।”
“তবে উপায়?”
“সেটাই তো স্যার। কেন এমনটা হচ্ছে সেটা জানার উপায় একটাই…”
‘কী উপায়?”
সোনাই যেন আচমকা সংবিৎ ফিরে পেল।
“বাদ দিন স্যার। যা জানতে এসেছেন সেটা জিজ্ঞাসা করুন বরং।”
সোনাই আমাদের দুজনের মধ্যে ভাষান্তরিকের কাজ করল। আমার আর দেওলার মধ্যে যে কথা হল, তা এখানে হুবহু তুলে দিলাম।
“তোমার নাম দেওলা?”
“হ্যাঁ বাবু।”
“তোমার বর কী করে?”
“উড়িষ্যার কোরাপুটে কাজ করে। কাপড়ের কারখানায়। দুই-তিন মাসে একবার বাড়ি আসে।”
“তুমি কুরন বই হলে কী করে?”
“কুরন বই কেউ নিজের ইচ্ছেয় হয় না রে বাবু। উনিই ঠিক করে দেন গ্রামের কুরন বই কে হবে।”
“কে ঠিক করেন? গাঁয়ের মোড়ল?”
হা হা হা করে হেসে উঠল দেওলা। “মোড়লের সাধ্য আছে নাকি কুরন বই ঠিক করবে? উনিই করেন।” বলে মাথায় জোড় হাত ঠেকাল দেওলা।
“তাহলে কে ঠিক করেন? মারাং বুরু?”
আমার কথার হালকা ঠাট্টাটা সোনাই বা দেওলা কারও কানে গেল না। বরং মুখ গম্ভীর করে দেওলা বললে, “মারাং বুরুর অনেক কাজ। তিনি আমাদের গ্রামের এই ছোট্ট কাজটা করবেন কেন?”
“তবে কে করে?”
“জুজুমা।’
এই তো, না চাইতেই কুরন বই আমার পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে। এবার আসল কথায় আসা যাবে।
“এই জুজুমা কে?”
“জুজুমা কথার মানে ঠাকুরদা। আমাদের এই বন, এই গ্রাম, এই অঞ্চল যখন তৈরি হয়েছিল, সব তৈরি করে মারাং বুরু জুজুমাকে বলেছিলেন, এবার তুমি সামলাও। কিন্তু জুজুমা তো বুড়ো হয়েছেন। তিনি একা পারবেন কেন? তাই তিনি একজন করে কুরন বইকে বেছে নেন। গ্রামের প্রয়োজনে কুরন বই জুজুমাকে ডেকে আনে। জুজুমা নিজে আসেন না। তাঁর ছায়াকে পাঠান। সেই ছায়া করন বইয়ের উপরে ভর করে সব সমস্যা সমাধান করে দেয়।’
“জুজুমা কুরন বইকে বাছেন কেমন করে?”
“একজন কুরন বই মারা গেলে গ্রামের সবাই মিলে তার সারা গায়ে লাল তেল লাগিয়ে দেয়। তারপর নতুন সাদা কাপড়ে মুড়ে তাকে সুন্দরভাবে মাটিতে শুইয়ে রাখা হয়। দরজার সামনে রাখা হয় একটা চালের পাত্র আর একটা জলের পাত্র। জুজুমা ঘরে এলে সবাই বুঝতে পারে। গোটা ঘর ঠান্ডা হয়ে যায়। খক খক কাশির শব্দ শোনা যায়। মড়াটা নড়তে থাকে। আসলে মড়ার পরেও আত্মার দেহের উপর মায়া থেকে যায়। সেটা কাটাতে পারে না। জুজুমা তাকে জোর করে নিয়ে যান। যাবার ঠিক আগে সেই মড়া শেষবারের মতো উঠে বসে। তার গলা দিয়ে জুমা পরের কুরন বইয়ের নাম বলেন। যেমন গতবার আমার নাম বলেছিলেন… দেওলা।”
“তারপর থেকে তুমিই কুরন বই?”
“কোথায়? অত সহজে এসব হয় নাকি? নাম ঘোষণা হলে নতুন কুরন বইকে ঘরের ভিতরে বন্দি থাকতে হয়। কারও মুখ দেখা যায় না। যতদিন না জুজুমা নিজে এসে তাকে দেখা দেন। তাকে কাজ করার অধিকার দেন। দেখা দেবার পর সে বাইরে এসে জানায় জুজুমা এসেছিলেন। তারপর থেকেই সে গাঁয়ের কুরন বই হতে পারে।”
“জুজুমাকে দেখতে কেমন?”
“সেটা আমি বলতে পারব না রে বাবু। বলা পাপ। আর চাইলেই যে কেউ জুজুমাকে দেখতে পায় না। কুরন বই বাদে তিন ধরনের মানুষ জুজুমাকে দেখতে পায়। যারা নিষ্পাপ, যারা পাপী আর… আর যারা বদ্ধ পাগল।
‘কাল রাতে আমি পুজো দেখতে এসেছিলাম। লুকিয়ে দেখেওছি। শেষরাতে আমার ঘরের জানলায় কেউ এসেছিল। কে এসেছিল তবে? জুজুমা?”
প্রশ্ন শুনে সোনাইয়ের চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠল। ধীর গলায় দেওলাকে প্রশ্নটা করতেই তার চোখ মুখের ভাবের ভয়ানক পরিবর্তন হল। একটু আগেই যে মুখে মৃদু হাসি খেলা করছিল, তা পালটে গেল এক লহমায়। দেওলার চোখ দেখে মনে হল গোটা বিশ্বের ক্রোধ যেন জ্বলন্ত অগ্নির মতো ঠিকরে বেরোচ্ছে সেই চোখ থেকে। অমন টকটকে লাল জ্বলন্ত চোখ পৃথিবীর কোনও প্রাণীর হয় বলে আমার জানা নেই। চিৎকার করে সে যা বলল তার অর্থ—
“খুব খারাপ করেছিস বাবু। খুব খুব খারাপ কাজ। গাঁয়ের বাইরের কেউ জুজুমাকে দেখতে পায় না। কিন্তু জুজুমা সবাইকে দেখতে পায়। জুজুমা বুড়ো হয়েছে। নিজে থেকে চলাফেরা করতে পারে না। কারও ঘরের ভিতর ঢুকতে পারে না। কিন্তু যদি জোয়ান কোনও সারথি পায়… তুই এখুনি পালা বাবু। তুই আর এই গাঁয়ে আসিস না। তুই পালা।”
আমি তবুও বসে ছিলাম। দেওলা কোথা থেকে একটা লাঠি এনে কুকুর ভাগানোর মতো আমাদের “যাঃ যাঃ” করে ভাগাতে লাগল। যখন বেরোচ্ছি পিছন থেকে শুনছি তার আওয়াজ, “জুজুমা কিছুই নিজের জন্য রাখে না। সব উগরে দেয়। মনে রাখিস।”
আমি এই কথার অর্থ কিছুই বুঝলাম না। ভয়ানক এক অপরাধবোধ হচ্ছিল। মনে হল যে আদিম, প্রাচীন সংস্কার আমার পাশেই গোপনে লালিত হচ্ছে, তার অংশমাত্র দেখে ফেলে আমি ঘোরতর পাপ করেছি। আমরা পালালাম। কুটির, গাছ, মুরগির দল, কুকুরদের ফেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে আমরা পালালাম। যেন তীব্র বজ্রপাতে দিশাহারা দুটি জীব। কীভাবে সেই গ্রামের নানা গলির ভুলভুলাইয়া পেরিয়ে হাসপাতালে এলাম মনে নেই। দেওয়ালে ভর দিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে সোনাই শুধু বলল, “ডাক্তারবাবু, আমি তো আগেই বলেছিলাম!” বলেই দুদিকে জোরে জোরে মাথা নাড়তে থাকল।
.
॥ ৫॥
এরপর মাস চারেক কেটে গেছে। জুজুমাকে ভুলেই গেছি প্রায়। কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য একটা সমস্যা আমাদের হাসপাতালে এসে দেখা দিল। ডাক্তার বিশ্বাস হাসপাতালের কাজে রাঁচি গিয়েছিলেন। ফিরলেন বছর আটেকের একটা ফুটফুটে সুন্দর মেয়েকে নিয়ে।
“কী ব্যাপার ডাক্তার বিশ্বাস? বাচ্চাটা কে?”
“আমিও জানি না। রাঁচি পুলিশের সুপার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। মেয়েটিকে দুই মাস আগে রাঁচির এক বাড়িতে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। বাঙালি মেয়ে। নাম পিয়ালি। মা মারা গেছে। বাবা আর-একটা বিয়ে করে সংসার পেতেছে। তিন কুলে আর কেউ নেই। একদিন ওর কান্না শুনে পাড়ার লোকে গিয়ে দ্যাখে বদ্ধ ঘরে আটকানো। ঘরে আর কেউ নেই।”
“কিন্তু ওর বাবা আর সমা?”
“আজ অবধি কোনও পাত্তা পাওয়া যায়নি। যেন হাওয়ায় উবে গেছে। পুলিশ প্রথমে চাইল্ড কেয়ার হোমে দিয়েছিল। সেখানেই জানা যায় মেয়েটি ঠিক স্বাভাবিক না। চিকিৎসা অনেকরকম হয়েছে। কিন্তু ফল হয়নি। এখন পুলিশ সুপার সোমনাথ ঝা, আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। এই নির্জন পরিবেশে মেয়েটার যদি কিছু উন্নতি হয়।
“স্বাভাবিক না বলতে ঠিক কীরকম?”
“নানারকম আজব আজব কথা বলে। হ্যালুসিনেশন টাইপ। তবে… বলে ডাক্তার বিশ্বাস চুপ করে গেলেন।
“তবে কী?”
“দ্যাখো, আমি নিজে এসবে বিশ্বাস করি না। কিন্তু ফ্যাক্ট ইজ ফ্যাক্ট। ও আজ অবধি যে যে অ্যাসাইলামে গেছে, সব জায়গা থেকে কেউ না কেউ হারিয়ে গেছে কিংবা অদ্ভুতভাবে মারা গেছে। তাই কোনও অ্যাসাইলাম আর ওকে রাখতে চাইছে না। সোমনাথ আমার স্কুলের বন্ধু। ও পারসোনালি আমায় বলেছে একটু টেক কেয়ার করতে। ওর অনুরোধ ফেলা মুশকিল। আর আমিও ব্যাপারটায় ইন্টারেস্টেড। দেখি না একটু স্টাডি করে।
আমাদের নার্স সুলতা মান্ডি আর আমার উপরে দায়িত্ব পড়ল পিয়ালিকে প্রাইমারি স্টাডি করে ডাক্তারকে রিপোর্ট দেবার। সোনাইকেও থাকতে বলা হয়েছিল। কিন্তু জানি না কেন, ও শত অনুরোধেও মেয়েটার ধারে-কাছে যেতে রাজি হল না। পিয়ালির সম্পত্তি বলতে ভুলো ওঠা একটা লাল পুতুল। ওটাকেই সে সারাক্ষণ বুকের কাছে জড়িয়ে থাকে। হাস্পাতালের একেবারে শেষ ঘরটাতে পিয়ালির একা থাকার ব্যবস্থা করা হল। আমরা দরজায় সাগানো কাচ দিয়ে ওর উপরে নজর রাখতাম। ওর মতো শান্ত মেয়ে হয় না। কথা প্রায় বলেই না। খেতে দিলে খেয়ে নেয়। মাঝে মাঝে ড্রয়িং খাতায় ছবি আঁকে। পিয়ারি বুকের কাছে লাল ন্যাকড়ার ফালি জড়ানো রবারের মেয়ে পুতুলটার নাম বাহামনি। পুতুলের ডান চোখ উপড়ানো, বাঁ-হাতটা কাঁধের থেকে নেই, যেখানে চুল থাকার কথা, সেই মাথাভরা পেনের হিজিবিজি আর এদিক ওদিক ঝুলছে দুই-একটা সোনালি চিকচিকে সুতো। পিয়ালি যেখানেই যাক, একে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া চাইই চাই। একদিন ও যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, চুপিচুপি ওর ড্রয়িং খাতা নিয়ে উলটে পালটে দেখলাম। শুধু কয়েকটা হিজিবিজি ছবি। তবে সে ছবি কোনও মানুষের বলে মনে হয় না। আচমকা দেখলে কোনও প্রাগৈতিহাসিক বানরজাতীয় প্রাণী বলে ভ্রম হয়। তলায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা “জুজুমা”।
ভুলে যাওয়া দুঃস্বপ্নের মতো এই নামটা আবার ফিরে এসেছে। তাও এমন একজনের কাছ থেকে, যার থেকে শুনব বলে কোনও আশাই করিনি। ঠিক করলাম পিয়ালিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। আমি সুলতাকে ডেকে বল্লাম,
“পিয়ালিকে ঘুম থেকে ওঠাও। ওকে ইন্টারোগেট করব।”
এই জুজুমার ব্যাপারটা কিছুতেই মাথা থেকে নামানো যাচ্ছে না।
কাঁচা ঘুম ভেঙে উঠে পিয়ালি আমায় দেখে ভুরু কোঁচকাল। আমিও পিয়ালিকে কিছু বুঝতে দিলাম না। খুব স্বাভাবিক মুখ করেই প্রশ্ন করলাম,
“তোমাদের বাড়ি কোথায় পিয়ালি?”
“রাঁচিতে।”
“তোমার বাবা কী করেন?”
“বাবা বই পড়ে।”
“আর?”
“চাকরি করে।”
“জুজুমা কে?”
“একটা বুড়োমতো লোক।”
“তোমার সঙ্গে জুজুমার দেখা হল কোথায়?”
“ক্যাম্পিং থেকে ফিরে।”
“কোথায় গেছিলে ক্যাম্পিং-এ?”
“সেই যে বাবা আর মামণি আমাকে নিয়ে গেছিল ঝোরার ধারে। আমরা তাঁবুর মধ্যে রাত কাটালাম। সেইখানে।”
“কোন ঝোরা?”
“বীরঝোরা।”
এবার আমার চমকানোর পালা। এই ঝোরাই তো বয়ে যাচ্ছে অ্যাসাইলাম থেকে সামান্য দূরে গ্রামের পাশ দিয়ে। এখানে অনেকেই শহর থেকে ক্যাম্পিং করতে আসে। পিয়ালি কি তবে সত্যি কথাই বলছে?
“জুজুমা কোথায় থাকে?”
“দেওয়ালের ভিতরে থাকে।”
“তোমার বাবা আর মা কোথায় পিয়ালি?”
“আমার মা তো মরে গেছে। নতুন মা-কে আমি মামণি ডাকি।”
“ওরা কোথায়?”
“কেন, আমাদের বাড়িতেই আছে।”
“পুলিশ গোটা বাড়ি খুঁজেছে পিয়ালি। বাবা আর মামণি নেই। তুমি একটু চিন্তা করে দ্যাখো, কী হয়েছিল বাবা আর মামণির?”
পিয়ালি খানিক ভেবে উত্তর দিল, “জুজুমা ওদের ভালো করে দিয়েছে।”
“কেমন করে করল?”
“একদিন মামণির পোষা টিয়াপাখি মিঠুটা মরে গেল। জিমি মরে গেল। কে যেন ওর গলা কামড়ে ছিঁড়ে নিয়েছিল। মামণির টবের ফুলগাছগুলো মরে যেতে শুরু করল। মামণি বলল, ‘এই মেয়েটা ডাইনি। ওকে তাড়িয়ে দাও’। বাবা আর মামণির খুব ঝগড়া হল। একদিন বাবা অফিসে গেলে মামণি আমাকে খুব মারল। গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দিল।
বাবা ফেরার পর আমি বাবাকে বললাম, ‘তোমরা আমার বাজে বাবা মা। তোমরা একটুও ভালোবাসো না। জুজুমা তোমাদের মারবে।’ বাবা বলল, ‘জুজুমা কে?” আমি বললাম, ‘আমার বন্ধু।’ শুনে বাবা কিছুই না বলে মুখ গোমড়া করে বসে রইল। কয়েকদিন বাদে বসার ঘরে বসে বাবা একটা বই পড়ছিল। আমি সামনে বসে বাহামনিকে নিয়ে খেলছিলাম। আচমকা বইটা ফেলে বাবা আমায় জোরে জোরে ঝাঁকাতে লাগল। আর বলতে লাগল, ‘বল, বল, জুজুমা আসলে কে? তোকে বলতেই হবে। নইলে তোকে মেরেই ফেলব।’ বলে আমায় খুব মারল। মামণিটা বাজে। বাবাও ওর সঙ্গে থেকে থেকে বাজে হয়ে যাচ্ছিল। তাই জুজুমা ওদের ভালো করে দিয়েছে। ওরা আর আমায় মারে না।”
আমি আরও কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু পিয়ালির চোখ আবার ঘুমে ঢলে আসে।
“আজকের মতো ছেড়ে দিন স্যার। হাজার হোক বাচ্চা মেয়ে। কাল নাহয় আবার…” সুলতা বলে।
“ঠিক আছে। একবার ডাক্তার বিশ্বাসের সঙ্গে কনসাল্ট করে নিই বরং।”
“ওকে স্যার। আর স্যার, আর-একটা কথা…”
“হ্যাঁ বলো।”
একটু আমতা আমতা করে সুলতা বলল, “আপনি খেয়াল করেছেন, এই মেয়েটা হাসপাতালে আসার পর থেকে রাতের কনসার্ট একেবারে থেমে গেছে?”
.
।।৬।।
গাড়িতে চেপে পরদিন ভোরেই রাঁচির দিকে রওনা হলাম। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ডাক্তার বিশ্বাস রাজি হয়েছেন। তিনি নিজে তাঁর বন্ধু অফিসার সোমনাথ ঝায়ের সঙ্গে কথাও বলেছেন। পুলিশ স্টেশনে পৌঁছে দেখলাম ঝা-জি বেশ খানিকক্ষণ আমার অপেক্ষাতেই ছিলেন। আমাকে দেখে একগাল হেসে বললেন-
“আসুন, আসুন। আসতে কোনও অসুবিধা হয়নি তো?”
ভদ্রলোক ঝরঝরে বাংলা বলেন, যদিও তাতে সামান্য পশ্চিমা টান রয়ে গেছে।
হেসে বললাম, “না, গাড়িতেই এলাম তো। শুধু রাস্তা কয়েক জায়গায় বেশ খারাপ।”
“তারপর কী খাবেন বলুন।”
“খাবার কথা পরে ঝা সাহেব। আগে যে কাজে এসেছি, সেই ব্যাপারে কথা বলে নিই।”
“হ্যাঁ, বিশ্বাস আমায় বলেছে। ওই পিয়ালি নামের মেয়েটার ব্যাপারটা। বলুন কী জানতে চান?”
আমি নোটবুকে পয়েন্ট করে লিখে এনেছিলাম। পকেট থেকে সেটা বার করে এক-এক করে প্রশ্ন করলাম।
“পিয়ালিকে কীভাবে পাওয়া গেল?”
“পিয়ালিদের বাড়ি কাঁকের কাছে পত্রাতু ভ্যালিতে। ওদের বাড়ির আশেপাশে খুব বেশি বাড়ি নেই। বাবা আর সৎমায়ের সঙ্গে থাকত। ওর বাবা রাঁচির এক প্রাইভেট ফার্ম-এ কাজ করে। দিন তিনেক ফোনে না পেয়ে ওরা বাড়িতে লোক পাঠায়। দ্যাখে গোটা বাড়িতে শুধু পিয়ালি আছে। ওরাই পুলিশকে খবর দিয়ে রেস্কিউ করে।”
“আর ওর বাবা-মা?”
“বিশ্বাস আপনাকে বলেনি? ওর বাবা-মা পুরো উবে গেছে। খোঁজ চলছে। যাবে আর কোথায়?”
“আচ্ছা স্যার, একটা প্রশ্ন ছিল। পুলিশ দরজা ভাঙে কেন? তালা ভাঙলেই তো হত।”
“দরজা ভাঙতে হল, কারণ দরজায় বাইরে থেকে তালা মারা ছিল না।
“তার মানে ভিতরের দিক থেকে বন্ধ ছিল, কেমন? তাহলে সেটা তো পিয়ালিই খুলে দিতে পারত।”
ইনস্পেক্টর ঝা একটা ম্লান হাসি দিলেন।
“এখানে একটা প্যাঁচ আছে। পুলিশ বহুবার ঠেলেও দরজা কিছুতেই খুলতে পারেনি। পিয়ালিকেও পুলিশ বারবার অনুরোধ করে। সে শুধু বলতে থাকে, ‘তোমরা চলে যাও। দরজা খুলবে না।’ তখন পুলিশ বাধ্য হয়ে দরজা ভেঙে ফেলে। কিন্তু ভেঙে যা দ্যাখে, তার কোনও মানে হয় না।”
“কী দ্যাখে?”
“দরজার ভিতরের দিকের ছিটকিনি খোলা। কোনও তালাও লাগানো নেই। সোজা কথা, দরজা ভিতরদিক থেকেও বন্ধ ছিল না।”
“তাহলে খুলছিল না কেন?
“গড নোজ।”
“সে বাড়ি যাওয়া যায়?”
“কী করবেন গিয়ে? এমনিতে যেতে কোনও সমস্যা নেই। ক্রাইম সিন নয় যখন… কিন্তু আমরা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। কোনও ক্লু পাইনি। আপনি কি স্পেসিফিক কিছু খুঁজতে যাচ্ছেন?”
“কিছু না। আমি শুধু ওই বাড়ির দেওয়ালটা দেখতে যাচ্ছি।”
এই অদ্ভুত অনুরোধে ঝা-য়ের ভ্রূ দুটো এক মুহূর্তের জন্য কুঁচকে গেল। ডাক্তার বিশ্বাসের রেফারেন্স না থাকলে আমাকে হয়তো ভাগিয়েই দিতেন। খানিক কী যেন ভেবে বললেন, “ওকে… আমি একজন কনস্টেবলকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ও আপনাকে নিয়ে যাবে। ইনফ্যাক্ট সেদিন ও-ই গেছিল দরজা ভাঙতে।”
ঝা সাহেব বেল বাজাতেই বিরাট চেহারার এক কনস্টেবল এসে স্যালুট ঠুকে দাঁড়াল। ইনস্পেক্টর আমাকে বললেন, “এর নাম বনোয়ারিলাল চৌবে। ওই আপনাকে নিয়ে যাবে।” বলে বনোয়ারিকে বললেন, “ডাগতার সাব কো ওহ পিয়ালি কা মকান মে লেকে যাও।”
“পর স্যার, উহাঁ তো কোই নেহি হ্যায়।”
“মুঝে পতা হ্যায়।” ধমকে উঠলেন ঝা। “যো বোলা যায়ে ওহ করো। জ্যাদা সোচো মত।”
“জো হুকুম সাব।” বলে বনোয়ারি আমায় বলল, “চলিয়ে স্যার।
আমাদের হাসপাতালের গাড়ি চড়েই যাওয়া হল। বনোয়ারি কথা বলে টুথপেস্টের মতো। চাপ দিলে অল্প অল্প কথা বেরোয়।
“ঝা সাহাব নে বোলা কে দরওয়াজা অন্দর সে খুলা থা। ফিরভি তুমলোগ খোল কিঁউ নেহি পায়ে?”
“পতা নেহি সাব।”
“তুমহে ইয়ে দেখকে হয়রানি নেহি হুয়া?”
“হুয়া তো থা। পর হাম আনপড় আদমি হ্যায়। হামে থোড়ি হি কুছ পতা হ্যায়।”
“যব অন্দর ঘুসা, তো অন্দর কৌন থা?”
“কোই নেহি সাব। সির্ফ ওহ লেড়কি চিল্লা রহি খি অউর রো রো কে অনাপসনাপ বক রহি থি। পাগল হ্যায় বিলকুল।”
“কেয়া বক রহি থি?”
“বোল রহি থি কে তুমলোগ চলে যাও। নেহি তো জুম্মা তুমহে বা লেগা।”
“জুম্মা কহা থা ইয়া জুজুমা?”
“ওয়স্যা হি কুছ হোগা। ইয়াদ নেহি।”
“আচ্ছা, তুমহে পতা হ্যায় উসকা পাপা অউর সতেলা মাম্মি কে সাথ উনকা রিস্তা ক্যায়সা থা?”
“ঠিক নেহি থা সাব। পাপা তো আচ্ছে থে। পর মাম্মি উসে মারতি থি। উনকে শরীর পে মারনে কা নিশান থা।”
“নয়া ইয়া পুরানা?”
“নয়া।”
আরও খানিক বাদে গাড়ি এসে এক নির্জন রাস্তার ধারে থামল। রাস্তা থেকে কিছুটা পায়ে হাঁটা পথ বেয়ে একটা একতলা বাংলো টাইপ বাড়ি। বাড়ির সামনে ছোটো বারান্দা। কিছু জংলা গাছ ইতিউতি গজিয়ে আছে। গাড়ি থেকে নেমে বুঝলাম এদিকটায় ভ্যাপসা গরম পড়েছে। এতক্ষণ গাড়ির ভিতরে এসির জন্য বুঝতে পারিনি। সামনের দরজায় নতুন কপাট লাগানো। তাতে তালা দিয়ে পুলিশ সিল করে গেছে। বনোয়ারি সেই সিল ভেঙে, দরজা খুলে আমাকে বলল, “অন্দর যাইয়ে।”
ঘরে ঢুকতেই একটা তীব্র আঁশটে গন্ধে দম বন্ধ হয়ে এল। অনেকদিন ঘর বন্ধ থাকলে একটা চাপা সোঁদামতো গন্ধ আসে ঠিকই, কিন্তু এ গন্ধ সেরকম না। বরং তীব্র, ঝিম ধরানো। ঘরের ভিতরটা সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির মতোই সাজানো। এক কোণে একটা পাখির খাঁচা ঝুলছে। ফুলের টবের ফুল জল না পেয়ে মারা গেছে। দেওয়ালে একটা কুকুরের ছবি। কোঁকড়া লোম স্প্যানিয়েল। ছবির তলায় লেখা, “উই মিস ইউ জিমি”। বইয়ের র্যাকে বেশ কয়েক মাসের ধুলো। র্যাক দেখে বোঝা যায় পিয়ালির বাবা রীতিমতো সিরিয়াস পড়াশোনা করতেন। টেবিলের উপরে পুরোনো চামড়ায় বাঁধানো একটা বই দেখে হাতে তুলে নিলাম। বইটার নাম “প্রাচীন সাঁওতালি দেবতা ও অপদেবতা”। লেখক নীহাররঞ্জন দত্ত মজুমদার। আলগোছে ওলটাতে ওলটাতে একটা পাতায় নজর আটকে গেল। এখানে একটা বুক মার্ক গোঁজা। কয়েকটা লাইনে লাল আন্ডারলাইন করা আছে। তাতে লেখা, “এই আদিম জনজাতি নানা অপদেবতায় বিশ্বাস করে। তাহাদের নাম ভিন্ন। রূপও ভিন্নপ্রকার। তবে ইহাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন অপদেবতাকে ইহারা জুজুমা বলিয়া ডাকে। জুজুমা অর্থে পিতামহ। কেহ বিপদে পড়িলেই উনি সেই স্থানে উপস্থিত হন। তবে সভ্য দুনিয়ায় ইনি বিশেষ আসেন না। আসিলেও দেওয়াল, ছাদ, কুঠুরিতে লুকাইয়া সকল কিছু দেখিতে থাকেন। সাঁওতালদের মতে ইহার ক্রোধ ভয়ানক। কেহ তাঁহার অপছন্দের কিছু ঘটাইলে তিনি তাহাদের সর্বনাশ করেন।”
পিয়ালির বাবা জুজুমাকে নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু কেন? পিয়ালির মুখে শুনে? নাকি তিনি নিজেও কিছু অনুভব করেছিলেন? এই ঘরগুলো এমন অস্বাভাবিক ঠান্ডা কেন? একটা শিনশিনে ভাব হাড় অবধি কাঁপিয়ে দিচ্ছে। পায়ে পায়ে বসার ঘর পেরিয়ে শোবার ঘরে ঢুকলাম। ঘর একেবারে সাজানো গোছানো। খাটের নিচে ঘরে পরার চটি। দুই জোড়া। আলনায় কাপড়চোপড় পাট পাট করে সাজানো। যেন এইমাত্র কেউ আসবে। এভাবে কেউ চলে যায় নাকি? তখনই চোখে পড়ল সেই অদ্ভুত আলকাতরার মতো পদার্থটা। কঠিন আর তরলের মাঝামাঝি। শোবার ঘরে খাটের মাথার কাছে ছড়িয়ে আছে। যে আঁশটে গন্ধটা গোটা বাড়িতে ছড়িয়েছিল, সেটা এখন এতটাই তীব্র যে মাথা ঘোরাচ্ছে রীতিমতো।
বনোয়ারিকে ডাকতেই সে ঘরে ছুটে এল।
“ক্যায়া হুয়া ডাগতার সাব?”
আমি সেই অদ্ভুত বস্তুটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম, “ইয়ে কেয়া হ্যায় বনোয়ারি?”
“আরিব্বাপ! ইয়ে আভি ভি ইধারই হ্যায়?” বনোয়ারির কথায় যা জানা গেল যেদিন তারা দরজা ভেঙে ঢুকেছিল, সেদিন থেকেই এ জিনিস এখানে পড়ে আছে। এত দুর্গন্ধ আর এমন আঠালো যে কেউ পরিষ্কার করতে রাজি হয়নি। ফরেনসিকের জন্য সামান্য যা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাতে কাজের কাজ হয়নি কিছুই। এই জায়গায় বনোয়ারি একটা অদ্ভুত তথ্য দিল। পিয়ালির বাবা মা, দুজনের মোবাইলই নাকি শোবার ঘরে ছিল। আজকালকার দিনে কেউ যে মোবাইল ফেলে পালায় সেটা বনোয়ারির ধারণার বাইরে। ফলে পুলিশের বিশ্বাস, দুইজনে কোনও ঘোরতর অপরাধ করে গা ঢাকা দিয়েছে। তবে অপরাধটা কী, সেটা জানা যায়নি। আশা করা যাচ্ছে শিগগিরই জানা যাবে।
পাশের ঘরটাই পিয়ালির শোবার ঘর। মাঝে ছোটো একটা খাট। খাটে রকমারি সফট টয়, পান্ডা আর টেডি বিয়ার। একদিকের ছোটো টেবিল দেখে বোঝা যায় এখানে পড়াশোনা করত পিয়ালি। অন্যদিকে দেওয়াল আলমারি। পিয়ালির কথামতো এই ঘরের দেওয়ালেই জুজুমার থাকার কথা। আমি চারদিকে চেয়ে খুঁজতে লাগলাম। কিচ্ছু নেই। তাহলে কি একেবারে বুনো হাঁসের পিছনে তাড়া করে মিথ্যেই এতদূর এলাম? ভাবতে ভাবতেই দেওয়াল আলমারিটা খুললাম। আলমারির ভিতর হ্যাঙ্গারে পিয়ালির জামা, ফ্রক সারি সারি সাজানো। কিন্তু তার পিছনে দেওয়ালে অজস্র তীক্ষ্ণ নখের আঁচড়ের দাগের মতো দাগ। সে দাগ এতই গভীর যে দেওয়ালের চলকা উঠে গেছে জায়গায় জায়গায়। দেখে মনে হয় কেউ যেন ইস্পাতকঠিন নখ দিয়ে আঁচড়ে দেওয়াল ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। শুধু তার চেহারার ছাপটুকু দেওয়ালে রয়ে গেছে। আচমকা দেখলে কোনও আদিম মানুষের দেহের ছাপ বলে ভ্রম হয়। ছোটো, কুঁজো দেহ, পা দুটো বাঁকা, দুইদিকের দুই হাত দেহের তুলনায় অস্বাভাবিক লম্বা। ঠিক যেন একজন বৃদ্ধ মানুষ।
পিয়ালি মিথ্যে বলেনি। এই ঘরের দেওয়ালেই জুজুমা থাকত। কিন্তু এখন সে কোথায়?
.
।।৭।।
হাসপাতালে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। ভিতরে ঢোকার আগেই সদর দরজায় দেখি হাসপাতালের কর্মচারীরা ভিড় করে আছে। সেই ভিড়ের মধ্যে ডাক্তার বিশ্বাসকেও দেখতে পেলাম। সবার মুখে বেশ একটা উদ্বেগের ছাপ। আমাকে দেখতে পেয়েই ডাক্তার বিশ্বাস প্রায় দৌড়ে এগিয়ে এলেন।
“তোমার অপেক্ষাই করছিলাম। এসো এসো ভিতরে এসো।”
“কী হয়েছে?”
“সব বলছি। এসো তো আগে। আমার পিছনে পিছনে এসো।”
নিজের চেম্বারে না ঢুকে ডাক্তার সোজা এগিয়ে যেতে থাকলেন ফিমেল ওয়ার্ডের দিকে। ওদিকে আবার কী হল? ওয়ার্ডে ঢুকে চমকে গেলাম। রোগিণীদের কেউ বিছানায় শুয়ে নেই। সবাই একেবারে চুপ করে বসে স্থির দৃষ্টিতে একটা বেডের দিকে তাকিয়ে আছে। এই বেড অ্যালিসের। সেই মেয়েটা, যে রোজ রাতের কনসার্ট শুরু করে। কিন্তু এখন সে একেবারে নিশ্চুপ। অ্যালিস বিছানায় শুয়ে আছে। কিন্তু এ কেমন শুয়ে থাকা? তার দুই হাত আর দুই পা মুচড়ে উলটো দিকে বাঁকানো। ঠিক যেন একটা টেবিলের চারটে পায়া। ডান হাতটা ব্যান্ডেজে বাঁধা। তবু সেখান থেকে গলগলিয়ে রক্ত বেরিয়ে বেড ভিজিয়ে দিয়েছে। শুধু মাথাটা সোজা। অ্যালিসের মুখে অদ্ভুত একটা হাসি। এই প্রথমবার আমি ওকে হাসতে দেখছি। খোলা চোখে অপলক দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে। মরে কাঠ হয়ে গেছে অ্যালিস। ছাদে খুব হালকা জলছাপের মতো একটা ছাপ। মন দিয়ে দেখলে একটা বৃদ্ধ মানুষের অবয়ব বলে বোধ হয়। এই অবয়ব আমি চিনি।
এখন আমি জানি জুজুমা কোথায় আছে।
সুলতা এর মধ্যেই কখন আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারিনি। তার হাত বুকের ক্রসে।
“আপনি চলে যাবার পরপরই এই অবস্থা। সকালে সবাই ঘুমাচ্ছিল, যেমন ঘুমায়। কিন্তু তারই মধ্যে গলার আওয়াজ পেয়ে আমি এসে দেখলাম অ্যালিস জেগে আছে। শুধু জেগে নেই, সোজা ছাদের দিকে তাকিয়ে কার সঙ্গে কথা বলছে যেন।”
“কী বলছিল?”
“আজ সকাল থেকেই অ্যালিস বলে চলেছিল, ‘ওই দ্যাখো, ওই যে দেওয়ালের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তোমরা দেখতে পাচ্ছ না?’ তারপর বলল, ‘ও বলছে আমার চামড়াটা খুব সুন্দর। ওর পছন্দ হয়েছে।’ এমন চলল খানিকক্ষণ। বিকেল হতে না হতে ছাদের দিকে তাকিয়ে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল, ‘মুক্তি দাও, মুক্তি দাও’। বলেই চলল। না থেমে। একটানা। আমি ডাক্তার বিশ্বাসকে ডেকে নিয়ে এলাম। উনি কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ দিলেন। কিন্তু লাভ কিছুই হল না। ঠিক যখন সন্ধ্যা হব হব, অ্যালিসের কান্না হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। খানিক সব চুপ। আর তারপর…” বলে সুলতা চুপ করে গেল। আমি দেখলাম ওর সারা কপালে, মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হয়েছে। একবার যেন শিউরেও উঠল।
আমি ওকে একটু সামলে নেবার সময় দিলাম। তারপর বললাম, “ভয় পেয়ো না সুলতা, বলো। আমার জানা দরকার।”
“অদ্ভুত একটা হাসি হাসতে শুরু করল অ্যালিস। কোনও জীবন্ত মানুষ যে অমন বিকটভাবে হাসতে পারে, আমার জানা ছিল না স্যার। সেই হাসি শুনে বাকি পেশেন্টরাও ভয়ে শিঁটিয়ে গেল। তারপরেই চোয়ালটা ঝুলে পড়ল অ্যালিসের। চামড়া ফাটতে লাগল পটপট করে। অ্যালিস নিজের ডান হাতের চামড়া মাংস কামড়ে কামড়ে খুবলে নিতে শুরু করল। তখন ওর গায়ে এত জোর যে আমরা চারজন মিলে আটকে রাখতে পারি না। অতি কষ্টে ওকে বেডের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা গেল। দেখলাম সেই অবস্থাতেই ওর হাত পা সব উলটো দিকে বেঁকে যাচ্ছে। সঙ্গে সারা গায়ে লাল লাল ছোপ ছোপ দাগ ফুটে উঠল। ছোপগুলো থেকে রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। গোটা ঘর ভরে গেছে পচা এক গন্ধে। অ্যালিস কিন্তু হেসেই চলেছে একনাগাড়ে। হাসতে হাসতেই ওর ঘাড়টা মটকে গেল। এখনও দেখুন স্যার। মুখে হাসি লেগেই রয়েছে।”
এ দৃশ্য বেশিক্ষণ দেখা যায় না। ভাবলাম পুলিশে ফোন করি। ডাক্তার বিশ্বাস বললেন, “এতে পুলিশ কী করবে? বরং এলে হ্যারাসমেন্টের একশেষ।” কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়। সেই দোমড়ানো মোচড়ানো দেহটাকেই কোনওমতে গির্জার পিছনের বাগানে কবর দেওয়া হল। ডাক্তার বাইবেল থেকে পড়লেন, “I am the resurrection and the life. The one who believes in me will live, even though they die.”
সেই রাতে প্রথমবার আমি ভয় পেলাম। অ্যালিসের এমন ভয়ানক মৃত্যু দেখে ঘুম আসছিল না। খানিক বিছানায় ছটফট করে শেষে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেদিনও পূর্ণিমা। বাইরে ফটফটে জ্যোৎস্না। আমার কোয়ার্টার থেকে হাসপাতালের একদিকের দেওয়াল স্পষ্ট দেখা যায়। এদিকটাতেই ফিমেল ওয়ার্ড আর সলিটারি সেল। আচমকা একটা জানলা হাট করে খুলে গেল। আর তারপরে যা হল তা ভাবতে গেলে এখনও আমার গলা শুকিয়ে আসে। জানলায় মোটা লোহার গরাদ। তবু কী আশ্চর্য উপায়ে তা গলে বেরিয়ে এল সাদা পোশাক পরা একটা বাচ্চা মেয়ের দেহ। ঘাড়টা অদ্ভুত কোণে বাঁকানো। সরসর করে চারপায়ে সে মাকড়সার মতো উঠতে লাগল দেওয়াল বেয়ে। কিছুটা যায়, থামে, কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করে। আবার চলতে থাকে। এই গতি ধীর, মন্থর। এক-একটা জানলার সামনে যাচ্ছে আর উকি মেরে কী যেন দেখছে। প্রথমে হাসপাতালের দোতলা, সেখান থেকে গোটা উইংটা হামাগুড়ি দিয়ে সে চলে গেল গির্জার দিকে। হাসপাতাল আর গির্জার মধ্যে ফুট দশেকের দূরত্ব। মেয়েটা লাফ মারল। আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও চুপ করে গেলাম। ঠিক একটা বানরের মতো চার হাত পায়ে গির্জার বিরাট গথিক চূড়াটায় গিয়ে নামল সে। তারপর মিলিয়ে গেল চোখের সামনে থেকে।
ভয়ে আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন অবশ হয়ে গেছিল। কতক্ষণ কেটে গেছে জানি না। দেখলাম একইভাবে সে ফিরে আসছে। কিন্তু এবারের গতি অসম্ভব দ্রুত। গির্জা থেকে লাফ দিয়ে প্রায় সাপের মতো কিলবিল করতে করতে সে ঢুকে পড়ল খোলা জানালা দিয়ে। তারপরেই জানলা বন্ধ হয়ে গেল। আমি বুঝলাম আমার তেড়ে জ্বর এসেছে। কোনওমতে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালে আর হাসপাতালে যাইনি। ঘরেই ছিলাম। প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর একটু কমেছে। চা আর টোস্ট বানিয়ে খাচ্ছি, এমন সময় দরজায় কেউ নক করল। খুলে দেখি সুলতা।
“আরে, সুলতা যে! কী ব্যাপার বলো দেখি? হাসপাতালে আবার কী হল?”
“কিছু না স্যার। একটা কথা বলতে এসেছিলাম।” আমতা আমতা করে বলল সে।
“ভিতরে এসো। কী হয়েছে?”
ভিতরে ঢুকে খানিক দোনোমনো করে সুলতা বলল, “স্যার, আপনি ডাক্তার বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে আমার অন্য কোনও হাসপাতালে ব্যবস্থা করে দিন। এখানে থাকলে আমি বাঁচব না। অ্যালিসের মতো আমিও মরে যাব।” বলতে বলতে ওর দুই চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগল।
“সে কী! কেউ কি তোমার সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেছে? করলে আমায় বলো।”
“না স্যার। এই জায়গায় অভিশাপ লেগেছে। এখানে থাকলে আমরা কেউ বাঁচব না। কেউ না।” শেষের কথাটা প্রায় চেঁচিয়ে বলল সুলতা। “পরশু রাতের ঘটনা। ফিমেল ওয়ার্ডে ডিউটি দিতে দিতে শেষরাতে চোখটা লেগে এসেছিল, ঠিক এমন সময় ঠান্ডা একটা কাঁপুনিতে ঘুম ভেঙে গেল। আর ঠিক তখনই শব্দটা শুনতে পেলাম আমি। দেওয়ালের ভিতর থেকে আওয়াজটা আসছে। একটা ঘন তরল পদার্থ অল্প জায়গা দিয়ে বয়ে গেলে যেমন গলগল করে আওয়াজ হয়, অনেকটা তেমন। কিন্তু অনেক বেশি চাপা। প্রথমে কিছু দেখতে পেলাম না। তারপর আবছা অন্ধকারে তাকিয়ে মনে হল একটা জেলির মতো পদার্থ যেন তার বিরাট সব পা বার করে দেওয়ালের ভিতরে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে ঠায় বসে রইলাম যতক্ষণ না সেই অদ্ভুত জিনিসটা আমার ঘরের দেওয়াল বেয়ে ছাদে উঠল, তারপর ছাদ বেয়ে পাশের ঘরের দিকে পাড়ি দিল। পাশের ঘরে ডাক্তার বিশ্বাসের চেম্বার। আমি কান পেতে রইলাম, ও ঘর থেকে কোনও শব্দ আসে কি না। এল না। আর তার পরের দিনই অ্যালিসের এই ঘটনা।”
.
॥ ৮॥
ডাক্তার বিশ্বাস কিছুতেই আমাদের কথা মানতে রাজি হলেন না।
“ও তোমাদের মনের ভ্রম। তোমরা আগে থেকে একটা কিছু ভেবে নিচ্ছ, আর সেটাকেই দেখতে পাচ্ছ। এমন হয়। ইংরেজিতে একেই হ্যালুসিনেশন বলে।”
কিন্তু হাসপাতালে যে জুজুমা এসেছে, তা নিয়ে অন্তত আমার কোনও সন্দেহ নেই। কুরন বই বলেছিল জুজুমা নিজে নিজে কোনও ঘরের ভিতরে যেতে পারে না। সারথি লাগে। পিয়ালিই সেই সারথি। পিয়ালিই জুজুমাকে নিজের বাড়ি নিয়ে গেছিল আর পিয়ালিই ওকে এই হাসপাতালে ঢুকিয়েছে। এই মেয়েকে এখানে রাখা মানে নিজেদের বিপদ ডেকে আনা। সাধে কি অন্য কেউ একে নিজেদের কাছে রাখতে চায়নি!
সেই রাতেই একসঙ্গে আরও তিনজন পেশেন্ট মারা গেল। দুজন পুরুষ আর একজন মহিলা। জর্জ, হ্যারি আর এলিজাবেথ। জর্জ আর এলিজাবেথকে দেখলে মনে হবে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। মুখে অদ্ভুত একটা হাসি। গোটা দেহ রক্তশূন্য। হ্যারি-ও প্রথমে সেইভাবেই মারা গেছিল। মারা যাবার খানিক বাদে তার চোখ দুটো খুলে যায়। চোখের মণি নেই। যতটুকু দেখা যাচ্ছে তা ফ্যাকফ্যাকে সাদা। তিনজনের মৃত্যুর সঙ্গে অ্যালিসের মৃত্যুর একটাই মিল। সবার গায়ে সেই গোল গোল লাল লাল ছাপে ভরা।
“সিম্পল হার্ট ফেলিওর।” বললেন ডাক্তার বিশ্বাস।
“কিন্তু স্যার, পর পর এইরকম মৃত্যু। ব্যাপারটা কি এতটাই কাকতালীয়?”
আচমকা রেগে উঠলেন ডাক্তার। “তাহলে কি তুমি বলতে চাইছ ওই বাচ্চা মেয়েটার জন্যেই হাসপাতালে এমন হচ্ছে? তুমি একটা ইয়ং সায়েন্টিফিক মাইন্ড বলে আমি জানতাম। এসব সুপারস্টিশন তোমার মধ্যে ঢুকল কীভাবে?”
“আমি সেটা বলছি না। কিন্তু দুই দিনে চারটে মৃত্যু। একবার পুলিশকে খবর দিয়ে যদি…”
“নো!” বলে চেঁচিয়ে উঠলেন ডাক্তার বিশ্বাস। “পোলিস হ্যাজ নাথিং টু ডু ইন মাই প্রেমিসেস। এখানে আমি যা ভালো বুঝব, তাই হবে। আর কাদের মৃত্যুর কথা বলছ তুমি? এরা অনেক আগেই মারা যেত। ট্রেনের তলায় চাপা পড়ে, না খেতে পেয়ে কিংবা নানা রোগে। আমি এদের নতুন জীবন দিয়েছি। যে কটা দিন ওরা বেঁচেছে, দ্যাট ইজ দেয়ার এক্সটেন্ডেড লাইক। দে আর অঙ্গ ডেড মেন ওয়াকিং। এদের জন্য আমি হাসপাতালে পুলিশ ঢোকাব? আর ইউ ইনসেন?”
ডাক্তার বিশ্বাসের এই রূপ আমি আগে দেখিনি। জানি না, এই কারণেই আগের ডাক্তাররা পালিয়েছিল কি না। আমি আর কথা বাড়ালাম না। ঠিক করলাম যাই হয়ে যাক, আর-একবার কুরন বইয়ের কাছে যাব। যদি কেউ ভুজুমাকে ঠেকাতে পারে, তবে সেটা ওই কুরন বই।
গোটা হাসপাতালে খুঁজেও সোনাইকে পাওয়া গেল না। গ্রামের যে ক-জন কাজে আসে, তাদের কেউ আজকে আসেনি। নার্সরাও আর থাকতে রাজি হচ্ছে না। সূর্য পাটে বসতেই প্রায় লুকিয়ে সাঁওতাল গ্রামের দিকে পা বাড়ালাম। ডাক্তার বিশ্বাস শম্ভু আর উদয়কে নিয়ে সেই কোন ভোরে শিকারে গেছেন। এক হিসেবে ভালোই হল। মুখোমুখি হলে নানা জবাবদিহি করতে হত। গ্রামে ঢুকতেই দেখলাম আজ কোনও অজ্ঞাত কারণে গোটা গ্রাম কেমন ছমছম করছে। রাস্তা জনশূন্য। দুই-একটা কুকুর অকারণেই বেজায় চেঁচাচ্ছে। আমি শুরুতেই কুরন বইয়ের কুটিরের দিকে যাবার সাহস করলাম না। গ্রামে কিছু একটা হয়েছে ভেবে প্রথমে সোনাইয়ের ঘরেই গেলাম। গিয়ে দেখি সোনাই তার খাপরার ঘরের সামনে গোঁজ মেরে বসে আছে। মুখ থমথম করছে। আমাকে দেখে চমকে উঠে দাঁড়াল। ওর দুচোখে জল।
“কী হয়েছে সোনাই?”
সোনাই বেশ খানিক কান্না চাপার চেষ্টা করে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল।
“আপনি আমায় ক্ষমা করে দিন ডাক্তারবাবু। আমি বুঝিনি। আমি ভুল করেছি।”
“কী ভুল করেছ?”
“হাসপাতালের পেশেন্টদের মৃত্যুর জন্য এক অর্থে আমিই দায়ী।”
“কী ভুলভাল বকছ! তুমি তো ধারে-কাছে ছিলে না। তুমি কী করে দায়ী হবে?”
“ডাক্তারবাবু, আপনি শুধু জুজুমার নামটুকু শুনেছেন। আপনি জানেন না জুজুমা কতটা ভয়ানক। উফফ!”
আমি সোনাইয়ের দুই কাঁধে হাত রেখে বললাম “কী হয়েছে তোমার? আমায় বলো।”
কোনওমতে চোখের জল মুছে সোনাই সব কিছু উগরে দিল-
“ডাক্তার সাহেব, শুনে নিন, জুজুমা কোনও ভালো দেবতা না। অপদেবতা। যুগ যুগ ধরে জুজুমাকে খারাপ কাজেই লাগানো হয়। ধরুন কারও সঙ্গে আপনার শত্রুতা আছে, আপনি জুজুমাকে লেলিয়ে দিন। সে পৃথিবীর যেখানেই থাক, জুজুমা তার চরম ক্ষতি করে আসবে। আমাদের গ্রামে বেশ কয়েকমাস ধরে মানুষজন নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছিল। তাও স্বাভাবিক মানুষরা না, প্রত্যেকের কিছু না কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। হাঁদুর দুটো কান ছিল বিরাট বড়ো বড়ো, জিতুর সবকটা দাঁত বাইরে বার করা, চেঙ্গার নাক বাঁশির মতো টিকালো। সাঁওতালদের মধ্যে এমন দেখা যায় না। এরা সবাই একে একে হারিয়ে গেল। জঙ্গলে গেছিল। আর ফেরেনি। ওদের বাড়ির লোক ভাবত আজ ফিরবে, কাল ফিরবে, আর ফিরল না। প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম শহরে কোনও কাজে গেছে। তারপর একদিন চেঙ্গার রক্তমাখা জুতো জঙ্গলে পাওয়া গেল।”
“সে কী! তোমরা পুলিশে গেলে না কেন?”
“গেছিলাম সাহেব। পুলিশ আমাদের কুকুরের মতো ভাগিয়ে দিল। কুরন বই বলল, একটাই উপায়, জুজুমাকে এই কাজে লাগানো। কিন্তু জুজুমার কোনও দেহ নেই। ওকে প্রথমে একটা দেহ দিতে হয়। ও সেই দেহের উপরে ভর করে। সেই দেহই তার সারথি। সেই দেহতে ভর করেই জুজুমার খোঁজ চলতে থাকে। জুজুমাকে কেউ দেখতে পায় না। বড়োজোর তার ছায়াটা দেখতে পায়। সে ছায়া নড়েচড়ে। ওটা দেখলেই বোঝা যায় জুজুমা এসেছে। জুজুমা একদিকে গোয়েন্দা, আবার অন্যদিকে শিকারি। প্রথমে অপরাধীকে ধরে, তারপর নিজেই তাকে শাস্তি দেয়। হান্টার অ্যান্ড প্রিডেটর। কিন্তু কাজ শেষ হলে প্রথমেই সেই দেহের মালিকের আত্মাকে খেয়ে জুজুমা নিজের খিদে মেটায়।”
একটা ভয়ানক সম্ভাবনার কথা মনে পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছিল। কিন্তু বলার সাহস হচ্ছিল না। সোনাই যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই বলল, “হ্যাঁ স্যার। আমিই পাপটা করেছি। বাচ্চাটা বাবা মায়ের সঙ্গে ক্যাম্পিং-এ এসেছিল। প্রথমে আমারই নজরে পড়ে। আর তখনই বুদ্ধিটা আমার মাথায় আসে। রাতে তাঁবুতে তিনজনকেই অজ্ঞান করে বাচ্চাটাকে আমাদের গ্রামে নিয়ে যাই। কুরন বই মন্ত্র পড়ে জুজুমাকে ওর সঙ্গে জুড়ে দেন। আমি সেই রাতেই আবার মেয়েটাকে ওদের তাঁবুতে রেখে আসি।
“দাঁড়াও দাঁড়াও। অজ্ঞান করলে কী করে?”
“ক্লোরোফর্ম। হাসপাতালের স্টোরের চাবি আমার কাছেই থাকে স্যার। ভুলে গেলেন? তাই এতদিন বাদে সেই মেয়েকে আবার হাসপাতালে দেখে আমি সত্যিই চমকে গেছিলাম স্যার।”
“চমকানোর কী আছে? ওকে তো আমরাই নিয়ে এসেছি।”
“জুজুমার ইচ্ছে ছাড়া জুজুমাকে এক পা নড়ানো অসম্ভব। ও একটা কিছুর গন্ধ পেয়ে এই হাসপাতালে এসেছে। জুজুমার নাক কুকুরের থেকেও শক্তিশালী।
“কিন্তু হাসপাতালের সব রোগী মারা যাচ্ছে কেন?”
খানিক অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে সোনাই বলল, “আপনি জুজুমার জন্মকথা জানেন না তাই এমন বলছেন। জুজুমা আগে অন্য সব দেবতাদের সঙ্গেই ছিলেন। জুজুমার বাবা ছিলেন কিতুন বোঙ্গা। একবার রাগ করে কিতুন বোঙ্গা জুজুমার মাকে ছেড়ে চলে যান। শোকে মা পাগল হয়ে গেলেন। জুজুমা নাকি মায়ের কষ্ট দেখে সইতে না পেরে নিজের হাতে তাঁর মাকে খুন করেন। মাকে খুন করার পরেই মারাং বুরুর অভিশাপে জুজুমা অপদেবতায় পরিণত হন। সেই থেকে উন্মাদ দেখলেই তিনি তাদের মুক্তি দেন।”
“তুমি বলতে চাও পিয়ালির মধ্যে জুজুমা ভর করে ওকে দিয়েই এসব করাচ্ছে?”
“না স্যার, একটা ভুল হচ্ছে। পিয়ালির মধ্যে হুজুমা ভর করেছিল ঠিকই, কিন্তু এতদিনে ও পিয়ালিকে সম্পূর্ণ গ্রাস করেছে। কাজ শেষ হলেই শেষ করে ফেলবে।” খানিক থেমে আমার মনের কথাটাই বলল সোনাই-
“পিয়ালিই জুজুমা।”
“তুমি এখুনি আমাকে কুরন বইয়ের কাছে নিয়ে চলো। জুজুমাকে ঠেকাতেই হবে।”
“অসম্ভব স্যার। হাত থেকে তির বেরিয়ে গেলে কি আর ফেরত আনা যায়? আর গিয়েও লাভ নেই। ও দেখা করবে না। জোনাকিকে আজ সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।”
আমার এক লহমায় মনে পড়ে গেল সেই সুন্দর মুখের মেয়েটার কথা। অদ্ভুত সুন্দরী, যেন কোনও দেবশিশু। আর… আর যার একটা চোখের মণি কালো, অন্যটা ধূসর।
“তবে কি একেও জুজুমা…”
আমার কথা শেষ হবার আগেই সোনাই বলল, “স্যার, আপনি হাসপাতালে ফিরে যান। যা হবার ওখানেই হচ্ছে।”
.
॥ ৯॥
অন্ধকার রাস্তায় টর্চ জ্বালিয়ে ফিরছি। গোটা পরিবেশ কেমন যেন ভূতুড়ে সিনেমার মতো লাগছে। সাঁওতাল গ্রাম নিস্তব্ধ। রাতচরা পাখিরা তীব্র স্বরে ডাকছে, ঝোপেঝাড়ে ঝিঁঝিঁপোকার ডানা নাড়ানোর চিরচির শব্দ। আমি আপ্রাণ গোটা ঘটনাটা মনে মনে সাজিয়ে নেবার চেষ্টা চালাচ্ছিলাম। জুজুমার জ্বর সারানো, পিয়ালির মধ্যে জুজুমার ভর, পিয়ালির বাবা মা গায়েব হয়ে যাওয়া, পিয়ালির এই হাসপাতালে আসা, হাসপাতালে রোগীর মৃত্যু, দেওয়ালে সেই অদ্ভুত জলছাপ… প্রায় সবকিছুরই উত্তর পাচ্ছি। শুধু তিনটে ব্যাপার ছাড়া। জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া মানুষরা কোথায়? পিয়ালির বাড়ির সেই কালো আলকাতরার মতো জিনিসটা কী? আর যে প্রশ্নটা আগে জাগেনি, এখন জাগছে, আমার আগের ডাক্তাররা পালিয়ে গেছিল কেন?
কেন যেন মনে হচ্ছে এই সব উত্তর একজনের কাছেই আছে। ডাক্তার বেঞ্জামিন সুশীল বিশ্বাস। দ্রুত পায়ে হাসপাতালে ঢুকেই সুলতার সঙ্গে দেখা। আমাকে হাঁফাতে দেখে সুলতা জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে স্যার?”
“ডাক্তার বিশ্বাস কোথায়?”
“উনি তো জঙ্গলে শিকারে গেছিলেন। একটু আগেই ফিরলেন। নিজের রুমে আছেন। বলেছেন এখন কারও সঙ্গে দেখা করবেন না।”
“আর পিয়ালি?”
“নিজের ঘরেই তো থাকার কথা…” আমতা আমতা করে উত্তর দিল সুলতা। “তুমি সরো দেখি। আমাকে ডাক্তার বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করতেই হবে।” বলে সুলতাকে প্রায় ঠেলে আমি ডাক্তার বিশ্বাসের চেম্বারে ঢুকলাম। ঢুকতেই বড়ো চেম্বার। যতবার এসেছি, এই ঘরেই এসেছি। এখন এই ঘরে কেউ নেই। কিন্তু ঘরের পাশের দিকে যে দরজাটা সর্বদা বন্ধ থাকে, সেটা আধখোলা। ওই ঘরটা ডাক্তারের মাউন্টিং কাম স্টাফিং রুম। শিকার করা পশুদের মাথা এই ঘরেই স্টাফ করা হয়। আমি দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই ফরমালিনের একটা তীব্র গন্ধ এসে আমায় আচ্ছন্ন করে দিল। একটা জোরালো টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে আর ঘরে মৃদু নীলচে সাদা আলো নেচে বেড়াচ্ছে। দেওয়ালের একদিকে গাঢ় লাল পর্দা এই আলোতে কালো দেখাচ্ছে। ডাক্তার পিছন ফিরে কিছু একটা করছিলেন। আওয়াজ শুনে চমকে ফিরে তাকালেন। ডাক্তারের দুই হাতের গ্লাভস রক্তে মাখামাখি।
বেশ কর্কশ স্বরেই ডাক্তার বিশ্বাস জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার? তুমি এই ঘরে? তাও উইদাউট পারমিশন?”
“আপনাকে একটা ব্যাপার জানানো দরকার। আপনি মানুন না মানুন, জুজুমা আছে। আমাদের এই হাসপাতালেই আছে।”
“তাই নাকি? কোথায়?” ডাক্তারের গলায় ব্যঙ্গের ছাপ।
“পিয়ালি।”
“হ্যাঁ, কী হয়েছে পিয়ালির?”
“পিয়ালিই জুজুমা।”
হা হা করে হেসে উঠলেন ডাক্তার।
“চৌধুরী, শহর থেকে এতদূরে এসে এতদিন থাকাতে তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তুমি বরং কিছুদিন দেশের বাড়ি থেকে ঘুরে আস। কিংবা তেমন হলে এখানেই ভরতি হয়ে যাও। তোমার চিকিৎসা আমি করব। যতসব পাগলের মতো কথা। নাও গেট লস্ট। আমি এখন ব্যস্ত। আমার সময় নষ্ট কোরো না।”
এমন অপমানিত আমি জীবনে হইনি। ঠিক করলাম কাল সকালেই চলে যাব। কিন্তু দরজার দিকে ঘোরার আগেই ঘরের এক কোণে একটা আয়নার দিকে আমার চোখ পড়ল। আয়নাটা এমন করে রাখা যাতে ডাক্তারের সামনের টেবিলটা স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু টেবিলে রক্ত মাখামাখি ওটা কী? একটা মাথা। মানুষের সদ্য কাটা মাথা। মাথার উশকোখুশকো চুলগুলো জট পাকিয়ে রয়েছে। এই চুল আমি বাতাসে উড়তে দেখেছি। চিবুকের কাছে ওই লাল তিলটাও আমার চেনা। কোনও অদ্ভুত উপায়ে সেই কাটা মুণ্ডুর চোখ দুটো খুলে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। একটা মণি কালো, আর অন্যটা ধূসর।
অজান্তেই আমি চিৎকার করে উঠেছি। ডাক্তার বুঝতে পেরেই সঙ্গে সঙ্গে একটা বেল টিপলেন। কোথা থেকে দুই প্রেতাত্মার মতো তাঁর দুই ষন্ডা শাগরেদ শম্ভু আর উদয় এসে আমায় জাপটে ধরল। মৃদু হাসলেন ডাক্তার বিশ্বাস। আমি প্রাণপণে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু ওই দুজনের হাত যেন লোহার বেড়ি হয়ে আমার নড়াচড়া বন্ধ করে দিয়েছে। খানিক নিষ্ফল হাত পা ছুড়ে আমি ক্ষান্ত দিতে বাধ্য হলাম।
“কী করব বলো? হ্যাবিট ইজ দ্য সেকেন্ড নেচার।” একেবারে স্বাভাবিক গলায় বললেন ডাক্তার। “কেউ ডাকটিকিট জমায়, কেউ কয়েনস জমায়, আর আমি জমাই মাথা। হেড হান্টিং অনেক পুরোনো প্রথা। জানো নিশ্চয়ই। এর একটা নেশা আছে। প্রথমে পশুদের মাথাই সংগ্রহ করতাম, বুঝলে হে, সরকার এসব আইন করে বন্ধ করে দেওয়ায় বোর হয়ে গেলাম। এদিকে বনের পশুও কমতে লাগল। তখন আমার মাথায় একটা আইডিয়া এল। এই যে সাঁওতালরা, এরা তো নৃতাত্ত্বিকদের দারুণ আগ্রহের বিষয়। কেমন হয় যদি আমি এদের মধ্যে যারা একটু অন্যরকম, মানে যাদের কিছু না কিছু অ্যাবারেশন আছে তাদের মাথা নিজের কালেকশনে রাখি? যেই ভাবা সেই কাজ। অবশ্য শম্ভু আর উদয় না থাকলে আমার একার দ্বারা এই কাজ সম্ভব হত না। প্রথমদিকে একটু কেয়ারলেস হয়ে গেছিলাম। তোমার আগের ডাক্তাররা জেনে গেছিল। তাই তাদেরও… তোমাকে বলেছিলাম না, মনে হচ্ছে তুমি টিকে যাবে? কারণ তোমার কৌতূহল ওদের চেয়ে অনেক কম ছিল। ভালোই তো ছিলে। এমন করতেই বা গেলে কেন? যাই হোক, শেষবারের মতো দেখে নাও আজকের পর থেকে কোথায় তোমার স্থান হবে।”
বলেই দেওয়ালের সেই লাল পর্দাটা সরিয়ে দিলেন ডাক্তার। হেসে বললেন, “ফিল ইয়োরসেলফ লাকি। এমন কালেকশন দেখার সৌভাগ্য খুব কম লোকেরই হয়।” দেখলাম পর্দার পিছনে বিরাট একটা কাঠের র্যাক। তাতে থরে থরে বয়াম সাজানো। আর প্রতিটা বয়ামে ফরমালিনে চোবানো এক-একটা কাটা মাথা। কারও কান দুটো খাড়া খাড়া, কারও নাক বাঁশির মতো টিকালো, আবার একজনের দাঁতগুলো সব বাইরে বার করা।
ডাক্তার বিশ্বাস ওই মাথাটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, “একে জোগাড় করতে তো বিন্দুমাত্র পরিশ্রমও করতে হয়নি। এক রাতে হাসপাতালের বাইরে থেকে উঁকিঝুঁকি মারছিল। শম্ভু আর উদয় চোর ভেবে আমার কাছে ধরে আনে। দেখলাম না চাইতেই শিকার জালে ধরা দিয়েছে।”
আরে! একেই সেই পূর্ণিমার রাতে আমার জানলার বাইরে দেখেছিলাম। এর নামই তবে জিতু। হয়তো সে রাতে কুরন বইয়ের পুজো থেকে ফেরার সময় এ আমার পিছু নিয়েছিল। বোঝেনি তার দাম একে জীবন দিয়ে দিতে হবে।
এবার ডাক্তার একটা ধারালো স্ক্যালপেল হাতে নিয়ে নাচাতে নাচাতে আমার দিকে এগিয়ে এলেন।
“তোমাকে খুব বেশি কষ্ট দেব না। জাস্ট একটা লং কাট, ব্যস। খানিক ব্লাড লস হবে। তুমি আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়ে মরে যাবে। তারপর যা করার আমরা করব। তুমিও এই আলমারিতেই এদের সঙ্গে স্থান পাবে। আই থিঙ্ক ইটস অ্যান অনার ফর ইউ। আর তোমার তো তিন কুলে কেউ নেই বললে, তাই খোঁজ করার লোকও নেই। কী বলো?”
শম্ভু আমার চুল ধরে মাথাটা পিছনে নিতেই টুটিটা ডাক্তারের স্ক্যালপেলের সামনে একেবারে উন্মুক্ত হয়ে গেল। সব শেষ। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। স্ক্যালপেলটা আমার গলা থেকে ইঞ্চিখানেক দূরে, হঠাৎ ডাক্তার বেশ চমকে উঠে থেমে গেলেন।
উদয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “পিয়ালি এ ঘরে এল কীভাবে? ওর ঘরের দ্রজা তো বন্ধ ছিল।”
ততক্ষণে সেই দেওয়ালের র্যাক পিয়ালির চোখে পড়েছে। জুজুমাকে যে কাজে লাগানো হয়েছিল, এতদিনে জুজুমা তাতে সফল হয়েছে। সে তার অভীষ্ট খুঁজে পেয়েছে। কেউ না দেখলেও আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম পিয়ালির চোখের মণির রং বদলাচ্ছে দ্রুত। প্রথমে কালো থেকে বাদামি হয়ে শেষে টকটকে লাল। অদ্ভুত পুরুষালি গলায় পিয়ালি বলল-
“ওকে ছেড়ে দে।”
এ গলা আমার চেনা। সেই রাতে কুরন বইয়ের উপরে যে ভর করেছিল, তার অবিকল একইরকম গলা ছিল। এই গলা শুনে ডাক্তার আর তার সঙ্গীরাও একটু ঘাবড়ে গেল। কিন্তু আমায় ছাড়ল না।
“দে ছেড়ে বলছি!”
পিয়ালির চিৎকার গোটা হাসপাতালের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে বীভৎস এক অনুরণনে বাজতে লাগল। অবাক হয়ে দেখলাম ওর দেহটা আধাআধি দুই টুকরো হয়ে যাচ্ছে। হাড় ভাঙার মটমট শব্দ করে কচি আঙুলগুলো পিছন দিকে বেঁকে গেল। চামড়ার ঠিক তলা থেকে বিরাটাকায় এক কেঁচোর মতো কী একটা বাড়তে বাড়তে হাতের চামড়া ফাটিয়ে শেষ অবধি যেটা বেরিয়ে এল তা পৃথিবীর কোনও প্রাণীর অঙ্গ হতে পারে না। দেখলাম ছয়টা কোঁচকানো রুক্ষ আঙুল কিলবিল করছে। তাদের ডগায় ধারালো বাঁকানো নখ। চারিদিক ছিটকে পড়ছে কালচে লাল রক্ত। পিয়ালি একটানা চিৎকার করছে। কিন্তু সে চিৎকারে কোনও মানুষের আওয়াজ নেই, বরং এ যেন সদ্য নরক থেকে উঠে আসা কোনও শয়তানের গলার ঘড়ঘড়ে শব্দ। গম্ভীর, শ্লেষ্মা জড়ানো… পাশবিক।
ডাক্তার বিশ্বাসও ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর হাত থেকে স্ক্যালপেল পড়ে গেছে। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “পিয়ালি…?”
উত্তরে ফটাস আওয়াজ করে পিয়ালির চোয়ালটা খুলে মাটিতে পড়ে গেল। ছোটো ছোটো সুন্দর দাঁতগুলো মেঝেতে ঝরে পড়ল যেন একরাশ চালের দানা। বদলে তার রক্তাক্ত, ফুলে ওঠা মাড়ি ফুড়ে জেগে উঠল ইস্পাতের ছুরির মতো ধারালো শত শত তীক্ষ্ণ দাঁত। তখন পিয়ালির নাক, কান, চোখের কোনা দিয়ে রক্তের ধারা বয়ে সারা গা ভিজিয়ে দিচ্ছে। একগাদা মোটা নীলচে শিরা নেচে বেড়াচ্ছে ওর সুন্দর মুখখানিতে। সারা শরীরে ডুমো ডুমো বুদবুদ হয়ে চামড়া ফুলে উঠে ফেটে গিয়ে একসময় গোটা চামড়াটাই সাপের খোলসের মতো খসে পড়ল। ঘর জুড়ে ছিটকে পড়তে লাগল পিয়ালির কুচো কুচো মাংসের টুকরো। ভিতর থেকে যে জীবটা বেরিয়ে এল তার বাঁকানো মেরুদণ্ডে শক্ত কাঁটা, তার হলদে টিউমারের মতো ক্ষুধার্ত দুই চোখে ক্রোধের আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে। চোখের মণি টকটকে লাল। চেরা। প্রাণীটা নেকড়ের মতো চার পায়ে দাঁড়াল। হাঁটুর হাড়গুলো বাইরের দিকে ফেটে, হাঁটুর জয়েন্টগুলো উলটে গেছে ততক্ষণে। শেষ একবার গা ঝাড়া দিতেই পিয়ালির খুলির পিছনের অংশটা পাকা ফলের মতো গড়িয়ে পড়ল।
তারপরেই সে হাঁ করল। দুই গাল ভাগ হয়ে গেল সমান দুটো অংশে। সেই হাঁ বাড়তে বাড়তে গোটা মানুষ সমান হয়ে গেল। মনে হল প্রাণীটার গোটা দেহই যেন একটা বিরাট হাঁ হয়ে গিলে খেতে আসছে। এক তীব্র আঁশটে গন্ধে গোটা ঘর ভরে গেছে। এই গন্ধ আমি পিয়ালির বাড়িতেও পেয়েছিলাম। হাঁয়ের ভিতর থেকে বেরোচ্ছে গলগলে এক শব্দ। আর তারপরেই মুখের গহ্বর থেকে যেটা বেরিয়ে এল সেটাকে জিভই বলতে হয় হয়তো। কিন্তু সেই জিভ একটা নয়, অসংখ্য। আর প্রতিটা জিভে অক্টোপাসের চোষকের মতো চোষক লাগানো। প্রতিটা চোষক আবার তালে তালে সংকুচিত প্রসারিত হচ্ছে, যেন কোনও জীবন্ত প্রাণী। জিভের গা থেকে গড়িয়ে পড়ছে কালচে সবুজ লালা।
এই দৃশ্য দেখে ডাক্তার বিশ্বাস এতটাই স্তম্ভিত হয়ে গেছিলেন যে একেবারে পুতুলের মতো স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। শম্ভু আর উদয় বিপদ বুঝে আমায় ছেড়ে দৌড়ে পালাতে যেতেই সেই চোষকওয়ালা জিভের দুটো দুইজনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। তারপর গামছা যেভাবে নিংড়োয় ঠিক সেভাবে মুচড়াতে লাগল ওদের দেহ। দুই মোচড়েই দুজনের ভবলীলা সাঙ্গ হল। শুনেছি প্রবল ভয় পেলে নাকি মানুষের বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। দেখলাম ডাক্তার বিশ্বাস এক পা এক পা করে জুজুমার দিকে এগিয়ে আসছেন। জুজুমার হাঁ আরও বড়ো হচ্ছে। অবাক বিস্ময়ে ডাক্তার শুধু বললেন, “আরে এ তো আসলে…”
উত্তরে প্রাণীটা ডাক্তারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর ডাক্তারকে আর দেখতে পেলাম না। গোটা ঘর জুড়ে শুধু মাংস চিবানোর কচমচ আর হাড় ভাঙার মটাস মটাস শব্দ। আমি পালাতে চেয়েও পারছি না। কে যেন অলীক মন্ত্রবলে আমায় স্ট্যাচু বানিয়ে ফেলেছে। সেই অদ্ভুত প্রাণীটা তার শুঁড়ের মতো জিভ দিয়ে এক-একটা বয়াম তুলে ছুড়ে ছুড়ে মাটিতে ফেলে ভাঙছে। গরগর শব্দ বাড়ছে। এবার আবার সেই বমি করার মতো আওয়াজ। জুজুমার হাঁ থেকে বেরিয়ে আসছে কালো আলকাতরার মতো আঁশটে গন্ধযুক্ত এক সান্দ্র তরল। এখন আমি জানি এটা কী। পিয়ালির বাবা মায়ের মতো ডাক্তার বিশ্বাসকেও জুজুমা শুধরে দিয়েছে। “জুজুমা কিছুই নিজের জন্য রাখে না। সব উগরে দেয়।” বলেছিল কুরন বই।
আমার দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে বিরাটকায় সেই জুজুমা টলতে টলতে ঘরের বাইরে চলে গেল। জুজুমা পিয়ালিকে খেয়ে নিয়েছে। এবার তার অন্য সারথি লাগবে।
আমি যখন ঘরের ভিতরে এইসব লিখছি, বাইরে হাসপাতালে ভয়ানক চিৎকার চেঁচামেচি চলছিল। এই মুহূর্তে সব চুপ। খুব যদি ভুল না করি, তবে গোয়েন্দা তার শিকার শেষ করেছে। বাকি আছি শুধু আমি। জানি না আমাকে মারার পর জুজুমা কাকে নিজের সারথি হিসেবে বেছে নেবে। এই ডায়রির পাঠককে নয়তো? বাইরে একটা কাশির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। আমার আর রেহাই নেই। জুজুমা ডাকছে।
.
॥ ১০ ॥
ডাক্তার সুদীপ্ত চৌধুরীর ডায়রি এখানেই শেষ। সব প্রশ্নেরই উত্তর পেলাম, শুধু এটা বুঝলাম না, তিনি নিজে কেমন করে জুজুমাকে দেখতে পেলেন। তিনি পাপী? নিষ্পাপ? নাকি শেষ মুহূর্তে বদ্ধ পাগল হয়ে গেছিলেন? আমি তাহলে এতক্ষণ যা পড়লাম সবই কি পাগলের প্রলাপ? এই জার্নালের সত্য মিথ্যে নিরূপণ করা আমার কাজ নয়। আমার সাধ্যতেও নেই। শুধু এটুকু জানাই, জার্নালের শেষ পাতাগুলো আর ওলটানো যাচ্ছে না। অদ্ভুত একটা কালো কালি আঠার মতো পাতাগুলোকে জুড়ে রেখেছে। সে কালিতে ভয়ানক আঁশটে গন্ধ। আমি হাত বুলিয়ে দেখেছি সেই আশ্চর্য কালিটা এখনও পুরো শুকোয়নি। কেমন তলতলে জেলির মতো। কিন্তু আঙুলে লাগছে না বা ভিজিয়ে দিচ্ছে না। এই জার্নালটা সযত্নে আমার লাইব্রেরি রুমে রাখা আছে। কেউ আমাদের বাড়ি এলে তাঁকে এই জার্নাল দেখাতেও পারি।
তবে ওই ঘরটাকে খুব শিগগির মেরামত করতে হবে। কয়েকদিন ধরেই দেখছি রাতের বেলা ঘরের ভিতর থেকে কেমন একটা গরগর আওয়াজ শোনা যায়। গোটা ঘরের দেওয়াল জুড়ে একটা বিরাট কালো জলছাপ মতো দেখা দিয়েছে। আচমকা দেখলে একটা বুড়ো মানুষ বলে ভ্রম হয়।
.
লেখকের জবানি: হান্টার সাহেবের অ্যানালস অফ রুরাল বেঙ্গল আর আশুতোষ ভট্টাচার্য্যের ‘বাংলার লোকসাহিত্য’ পড়ে সাঁওতাল আর শবরদের বিচিত্র সব প্রথার কথা জানতে পারি। জুজুমার নাম সেখানেই প্রথম পাই। এদিকে লাভক্রাফটের থুলু মিথোস মাথায় ঘুরছিল। তাই গল্পো মীরের ঠেক থেকে অরিজিনাল হরর গল্প লেখার আহ্বান পেয়ে সব মিলিয়ে মিশিয়ে এই গল্পটা লিখি। ২৬ জুলাই, ২০২৫ সালে গল্পটা গপ্পো মীরের ঠেক চ্যানেলে প্রচারিত হয়।
