Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    বিদুর – মিহির সেনগুপ্ত

    মিহির সেনগুপ্ত এক পাতা গল্প296 Mins Read0
    ⤷

    বিদুর – ১

    ১

    অবশেষে আমি হস্তিনাপুর রাজপ্রাসাদ থেকে স্বেচ্ছানির্বাসন নিলাম। হায়! যদি জ্ঞানোদয়ের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত নিতাম, আজ তাহলে এই নিগ্রহের ভাগী হতে হত না। দুর্যোধন বলল, এই দাসীপুত্রটাকে কে এই রাজসভায় ডেকে এনেছে? এ যাঁর অন্নে প্রতিপালিত তাঁরই প্রতিকূল হয়ে শত্রুপক্ষের পক্ষপাতিত্ব করতে ব্যগ্র। সে আদেশ করল, ভৃত্যগণ যেন আমার সর্বস্ব দখল করে, হস্তিনাপুর থেকে আমাকে বের করে দেয়। আমি কুরুকুল-মহামন্ত্রী বিদুর। দীর্ঘকাল এই বংশের সেবা করে এই আমার পুরস্কার।

    বুঝতে পারছি, এই ভরতবংশ এক ক্রান্তিকালের সীমান্তে এসে উপস্থিত হয়েছে। কোনো সুপরামর্শই এখন এদের কানে সুখশ্রাব্য হবে না। ক্ষমতার মোহ এমনই অদ্ভুত বটে। ক্ষমতা মানুষকে উন্নত করে, আবার ক্ষমতাই তাকে নিমজ্জিত করে, এ এক আশ্চর্য। এখন আমি একজন পরিব্রাজক। এ আমার এক হরিষবিষাদ। আমি এখন ক্ষমতা, দ্বেষ, হিংসা আর পরশ্রীকাতরতার কেন্দ্র এই হস্তিনাপুর থেকে নিজেকে বিযুক্ত করে, অনন্ত সাধারণ্যে ভাসমান হলাম। পথই আমার পথ হোক। আমার এই ধনুঃশর, বর্ম-চর্ম, কবচ-এই ক্ষমতাকামুকা মহানগরীর দ্বারে অবস্থাপন করে, আমি চলি পথে। কাল নিরবধি, পৃথ্বী বিপুলা। তীর্থে তীর্থে ছড়িয়ে আছে জ্ঞান আহরণের অনন্ত স্বাধ্যায়াশ্রম। মনকে বলি-মন, জ্ঞানাৎ পরতরং নোহি। জ্ঞানের অন্বেষায় গতিবান হও, সহজ হও, ক্ষুদ্রতা তুচ্ছতা দূর হোক।

    তবে ক্ষুদ্রতা তুচ্ছতাকে জয় করা যায়, এমন তো নয়। এইসব নাগরিকপঙ্ক হৃদয়মনের উপর গাঢ় আস্তরণ ছড়িয়ে রেখেছে। অন্তরে জন্মকুণ্ডলীর নিহিত অহংকার আছে। আছে উচিত-অনুচিতের, ন্যায়ান্যায়ের বিচারবোধ। হাতে ক্ষমতা না থাকলেও, তারা তো থাকেই। তাই খেদ, ক্রোধ, অসূয়া ধেয়ে আসে পিছে পিছে, যতক্ষণ প্রজ্ঞা এসে পূর্ণভাবে মনকে নির্বেদে রিক্ত না করে। এ রকমই এক দর্শনে দীক্ষিত আমি। এখন সেই প্রজ্ঞার অন্বেষায় আমার এই প্রব্রজ্যা। অথবা, এই প্রব্রজ্যাই কি আমা হেন মনুষ্যের বিধিলিপি! কিংবা কোন মানুষের বিধিলিপি প্রব্রজ্যা নয়?

    বিধিলিপি কিনা জানি না। তবে প্রব্রজ্যা যে আমাকে একটা স্তরে উন্নীত করেছে, এ সত্য আমার প্রতিক্ষণের উপলব্ধি। এখন আমার অবস্থান এই প্রভাস তীর্থে এবং আমার চিত্তের যাবতীয় তরঙ্গভঙ্গগুলো বেশ সংহত। আমার চিত্ত এখন এমন এক নির্বেদে স্থায়ী, যা কোনো রাষ্ট্রদ্রোহ, ভ্রাতৃকলহ, বা একান্ত নিজস্ব শারীরমানস বিক্ষেপ থেকেও আমাকে অনেকটাই নিরুদ্বিগ্ন রেখেছে। এখন আমি সম্পূর্ণ পক্ষপাতশূন্য নিরাসক্ত, নৈর্ব্যক্তিক। এখন আমি তাবৎ ঘটনাসমূহের সামুদায়িক তাৎপর্য নিয়ে মতামত দিতে পারি। কৌরবসভায় মহামন্ত্রক হিসেবে যখন কার্যনির্বাহ করেছিলাম, তখন এ ক্ষমতা আমার ছিল না। তখন ক্ষমতাচক্রের আবর্তে, কখনো এ-পক্ষ, কখনো ও-পক্ষ অবলম্বন করতে হয়েছে। রাজশক্তির নিরন্তর চাপের কাছে নিজেকে অহরহ সংকুচিত রাখতে বাধ্য হয়েছি। যা অন্যায়, যা অনৈতিক, তা সম্যক উপলব্ধি করতে পারলেও প্রতিহত করতে পারিনি। জন্মসূত্রে এই পরিবারের একজন হওয়া সত্ত্বেও, এঁরা কোনোদিনই তা মেনে নেননি। আমি দাসীপুত্র। আমি এঁদের অন্নদাস। রাজমন্ত্রকে পরামর্শদাতার চাকুরি করি, আর মাসান্তে কৃপাভিক্ষা পাই গ্রাসাচ্ছাদনের।

    দুর্যোধনের ওই কথায়, তাই, আকস্মিকভাবে আহত হলেও, বিস্মিত হইনি। কিন্তু বিস্ময়কর লাগত অগ্রজের ব্যবহার। তিনি নিজ কানে এইসব কাটব্য শুনেও, তাকে কিছুই বললেন না। বললেন না, পুত্র, ইনি বিদুর, কৌরব মহামন্ত্রী। এঁকে অসম্মান কোরো না। ইনি আমার ভ্রাতা, আমার একান্ত সুহৃদ। আমরা একই পিতার পুত্র। এঁর মাতা, এঁর জন্মের পূর্বেই দাসীত্ব থেকে মুক্তা হয়েছিলেন। ইনি সেকারণে দাসীপুত্র নন। না এসব কিছুই সেই অন্ধরাজা বলেননি। পুত্রের ক্ষমতার অহংকার তাঁর অন্তরকেও বোধকরি তখন উত্তপ্ত করেছিল। তিনি সৌজন্যবশতও সামান্যতম অস্বস্তি পর্যন্ত প্রকাশ করলেন না। আমি বুঝলাম এ ব্যাপারে তাঁর কোনো বিকার তো নেই-ই, পরন্তু দুর্যোধনের আদেশে যদি ভৃত্যরা আমাকে নিরস্ত্র করে পুরীর বাইরে নিক্ষেপও করে, তাতেও তিনি কিছুমাত্র আপত্তি করবেন না। ক্ষমতার লোভ এই অন্ধ রাজাকে মানসিকভাবেও যেন অন্ধ করেছে।

    আমি কুরুরাজসভার মুখ্যমন্ত্রী। দুর্যোধনের প্রতি আমার ব্যক্তিগত কোনো বিদ্বেষ বা বিরোধ নেই। পরন্তু, আমি তার অনেক গুণই সবিশেষ প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখি। তবে ক্ষমতাকামুকেরা যে যে দোষকে আশ্রয় করে ক্ষমতালাভের চেষ্টা করে, সেও সেইসব দোষের অনুশীলনে যত্নশীল। এইসব দোষের অনুশীলন দেশাচার, লোকাচার এবং রাষ্ট্রনীতিতে বহুকালাবধি প্রচলিত। দুর্যোধন একা এ বিষয়ে দায়ী নয়। আমি তার রাজ্যকামুকতায় অস্বাভাবিক কিছু দেখি না। বর্তমান যুগে ক্ষত্রিয় মাত্রেই রাজ্যকামুক। কিন্তু দুর্যোধন রণনীতিতে আদৌ অভিজ্ঞ নয়। উপরন্তু, অস্বাভাবিক দম্ভী, আত্মশ্লাঘাকারী, মন্ত্রীদের পরামর্শে উদাসীন এবং অতিমাত্রায় উদ্ধত। বয়োবৃদ্ধগণকে সে সন্দেহকুটিল দৃষ্টিতে দেখে এবং তাঁদের সবাইকেই পাণ্ডবদের প্রতি পক্ষপাতী বলে মনে করে। তাঁদের কারওর প্রতি তার আন্তরিক শ্রদ্ধা নেই। তার ধারণা যুদ্ধই বর্তমান সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায়। আমি নিতান্তই যুদ্ধবিরোধী। যদি পাঁচখানা মাত্র গ্রাম প্রদান করে যুদ্ধ পরিহার করা যায়, তবে কোন মূর্খ ভ্রাতৃ-সংঘর্ষে উৎসাহী হয়? দুর্যোধন বলে, এই পাঁচখানা গ্রামের সাহায্যেই পাণ্ডবরা একদিন গোটা রাজত্ব দখল করে বসবে।

    এ সম্ভাবনা যে একেবারে নেই তা নয়। পাণ্ডবেরাও নিতান্ত কম ক্ষমতাকামুক বা রাজ্যলোভী নয়। তবে মিত্রভাবে থাকলে, সবাই সুবুদ্ধিপরায়ণ হলেও, এ সম্ভাবনাকে অতিক্রম করা দুঃসাধ্য নয়। যাদবরা যে রাষ্ট্রজোট গঠন করে পরস্পর মিত্রভাবে আছেন, সমৃদ্ধিলাভ করেছেন, সেটিও এ বিষয়ে একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত। তাঁদের মধ্যে যে কলহ বিসংবাদ নেই তা নয়, কিন্তু তা নিতান্তই পারিবারিক ক্ষুদ্র কলহ। অচ্যুতকৃষ্ণ নিজে প্রায়শই গোষ্ঠী সম্মেলন আহ্বান করে, সেইসব অসূয়া, উষ্মার কারণগুলিকে বিনষ্ট করে দেন শুধুমাত্র তাঁর সুকৌশলী বাগ্মিতার সাহায্যে। তিনি নিজে যাদব গোষ্ঠীগুলির প্রধান রাষ্ট্রপুরুষের কার্য সম্পাদন করেও কখনো ক্ষমতা বা স্বার্থের মোহে পা দেন না,-এরকমই আমার ধারণা। আমি খুবই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে যাদবদের শাসনতন্ত্র বিষয়ে অনুসন্ধান করেছি। আমার বিশ্বাস যতদিন যাদবরা অচ্যুতের এই নিঃস্বার্থ নেতৃত্বে আস্থাশীল থাকবে, ততদিন তাদের বিনাশ নেই।

    কুরুসভায় বিভিন্ন সময়ে অগ্রজকে, দুর্যোধন এবং তার অনুগামীদের আমি এই পন্থা অনুসরণ করতে পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু তারা তাতে কখনোই কর্ণপাত করেনি।

    যেদিন প্রাসাদ পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলাম, সেদিনও একথা বলেছিলাম। কিন্তু তার ফল হল এই যে দুর্যোধন এবং তার অনুচরেরা সমবেতভাবে আমাকে অত্যন্ত কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করল। আমাকে বলা হল, দাসীপুত্র, অন্নদাস, জারজ।

    আমি কোনোদিনই অগ্রজকে, তাঁর অপ্রিয় কোনো বাক্য বলিনি। বললেও, সুযুক্তি এবং আভাসে ইঙ্গিতেই তা বলেছি। যুদ্ধোদ্যোগ যখন চূড়ান্ত, কেউই যখন আর শান্তির বিষয়ে চিন্তামাত্রও করছে না, তখন শেষবারের মতো অগ্রজকে বলেছিলাম, মহারাজ আপনি যাকে পুত্রবোধে পোষণ করেছেন, সে মূর্তিমান দোষস্বরূপ। এই কুলরক্ষা যদি আপনার কাম্য হয়, অচিরে এই অমঙ্গলকে পরিত্যাগ করুন। একথায় অগ্রজ শুধু বিরক্তিই প্রকাশ করলেন আর দুর্যোধন করল চূড়ান্ত অপমান।

    আমি যে দাসীপুত্র একথা হস্তিনাপুরের সবাই জানে। আমার মাতা একসময় দাসী ছিলেন। গতাসু মহারাজ বিচিত্রবীর্যের পট্টমহারানির এক দাসী ছিলেন তিনি। আমার জন্মদাতা পিতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন, যিনি বাদরায়ণি নামেও খ্যাত। কিন্তু যেহেতু আমার মাতা একসময় দাসী ছিলেন, তাই আমি চিরকালের জন্যই দাসীপুত্রই রয়ে গেলাম। সুতরাং এই পরিবারে এর চেয়ে অধিক সম্মান আমার আর কিছু হতে পারে না। তবে এ বিষয়ে আমার অনেক কিছুই বলার আছে।

    আজ এই বিজন প্রবাসে বসে আমি সেইসব স্মৃতিচারণ করছি। বিগত দিনগুলির সব চিত্র আমার সামনে প্রতিভাত হচ্ছে। এই পবিত্র প্রভাস তীর্থে এখন আমার অবস্থান। হস্তিনাপুর থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার পর বহু তীর্থ, জনপথ পর্যটন করে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছি। আমি এখন বীতরাগভয়ক্রোঃধ। প্রব্রজ্যা এই সম্পদ আমায় দিয়েছে।

    জৈবিক অনুভূতির স্তর থেকে মানসিক চিন্তনের স্তরে পৌঁছোনো অবধি আমি জ্ঞানপথকেই সারাৎসার জেনেছি। ক্ষমতা, কুশলীর দক্ষতা, অকস্মাৎ সুযোগের উপযোগিতা এই সমস্ত কিছুকে আমি তুচ্ছ করতে শিখেছি। তপশ্চর্যায় যে জ্ঞান আহৃত হয় তাই-ই আমার একমাত্র অবলম্বন। এই তপস্যালব্ধ জ্ঞান থেকেই একসময় প্রজ্ঞার জন্ম হয়, এ আমার উপলব্ধ সত্য। কথায় বা শব্দে জানলেই জানা পূর্ণ হয় না। দর্শন, স্পর্শন, চিন্তন, গ্রহণ ইত্যাদির মাধ্যমে অভিজ্ঞতার জন্ম হয়। সেই অভিজ্ঞা যখন মজ্জায়, রক্তে জারিত হয়ে হৃৎকন্দরে সংস্থাপিত হয় তখনই তা প্রজ্ঞায় উত্তীর্ণ হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। উপনিষদ একেই বলেছেন, ভূমানন্দ। এ বিষয়ে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন আমার গুরু। আমার প্রজ্ঞা লাভ হয়েছে,-এরকম একটি বিশ্বাসে সম্প্রতি আমি উপনীত হয়েছি।

    অবশ্য আমি এখন যে স্মৃতিচারণা তথা বিশ্লেষণে বসেছি, সেখানে এই প্রজ্ঞা বা আমার দীর্ঘ তপস্যালব্ধ জ্ঞানের বিশেষ কোনো ভূমিকা নেই। এই জ্ঞান বা প্রজ্ঞার ভূমিকা ব্যক্তির জীবনে এইটুকুই যে এর দ্বারা সে নিজস্ব বিচারবুদ্ধিকে স্বচ্ছ এবং মুক্ত রাখতে পারে। জ্ঞান প্রজ্ঞায় উপনীত হলে মানুষের আত্মাভিমান লুপ্ত হয়, ফলে সত্যের প্রকৃত স্বরূপ তার কাছে প্রতিভাত হয়। সে কারণে প্রজ্ঞাই প্রাপ্তব্য, শুধুমাত্র জ্ঞান নয়। জ্ঞানকে সব মানুষ সমান সত্যে ব্যবহার করে না। সব জ্ঞানই মানবিকতার তপস্যায় ব্যবহৃত হয় না। প্রজ্ঞার স্বাভাবিক গতি মানবিকতার দিকে, তপশ্চরণের পথ ধরে।

    সব জ্ঞানই যদি মানবিকতার তপস্যাকাঙ্খী হত, তবে দুর্যোধন আমাকে দাসীপুত্র, জারজ এইসব অভিধায় অভিহিত করতে পারত কি? অথচ, ভিন্নতর পরিবেশে, আমার অগ্রজ ধৃতরাষ্ট্র বা তাঁর পুত্র দুর্যোধন ভিন্নতরভাবের ব্যাপারী। সেখানে কিন্তু দুর্যোধনের জ্ঞানের এক অসামান্য মানবিক পরিচয় পেয়েছিলাম। সেই সব কথাই আজ বিজন তীর্থবাসে বসে মনে পড়ছে আমার। মনে পড়ছে আরও অনেক কথা এবং ঘটনা। দিন দিন মানুষ কীভাবে নিজস্ব প্রকৃতিজ স্বাধীন সত্তা এবং শুদ্ধতাবোধ হারিয়ে, আরোপিত বিধির দাসত্ব করে মানবিক গুণ থেকে নির্বাসিত হচ্ছে, আজ এই নির্জন রোমন্থনে আমি তা সম্যক উপলব্ধি করেছি। সামনে রয়েছে স-লেখনী মসীভাণ্ড। পিতা দ্বৈপায়নের আদেশে আমার তাবৎ রোমন্থন লিপিবদ্ধ করে নৈমিষারণ্যের আশ্রমে তা প্রেরণ করতে হবে। পিতা আরও বহুজনকে একার্যে নিয়োগ করেছেন। মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে এমত শুনেছি। যুদ্ধ শুরুর আগেই আমি প্রব্রজ্যা নিয়েছিলাম। তাই পিতা সূতপুত্র সঞ্জয়কে আজ্ঞা করেছেন যুদ্ধসংক্রান্ত দৈনিক লিপিকা প্রস্তুত করতে। আরও কত পুত্র এবং শিষ্যকে তিনি এ কাজে নিয়োজিত করেছেন, তার কি সীমাসংখ্যা আছে? তিনি বলেছেন, শুভ, অশুভ, ভালো-মন্দের অথবা ন্যায়-অন্যায়ের বিচারসহ যাবতীয় ঘটনার পুঙ্খ পুঙ্খ বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে হবে। পিতার অভীপ্সা, এই সম্মিলিত ঘটনাপুঞ্জকে অবলম্বন করে তিনি ভরতবংশ তথা এই মহাযুদ্ধের উপর একটি বৃহৎ ইতিহাস সাহিত্য রচনা করেন।

    পিতার অভীষ্ট কর্মে, এই লেখনীকে নিয়োগ করার পূর্বে, তাই তাঁরই বন্দনা গান করি-

    ওঁ নমো স্তুতে ব্যাস বিশালবুদ্ধে

    ফুল্লারবিন্দায়ত-পদ্মনেত্র

    যেন ত্বয়া ভারত-তৈলপূর্ণঃ

    প্রজ্জ্বলিঃত জ্ঞানসমঃয় প্রদীপ।।-গীতা মঙ্গলাচরণ

    ‘জারজ’ কথাটা অধুনা খুব শোনা যাচ্ছে। আমার কাছে এখনও এর কোনো আত্যন্তিক অর্থ প্রকট হয় না। সম্ভবত জ্যেষ্ঠতাত ভীষ্ম বা অগ্রজও এই শব্দটির প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করেন না। ‘জার’ শব্দে আজকাল অর্থ করা হয় পতি ব্যতীত অন্য কোনো রমণকারী পুরুষকে। তাকে উপপতিও বলা যেতে পারে। পুরুষের যেমন উপপত্নী থাকে, নারীরও সেইমতো কেউ থাকলে তবে তাকে উপপতিই বলতে হবে। সমাজে পুরুষের ক্ষেত্রে উপপত্নী কিছু নিন্দার বিষয় নয়। একাধিক পত্নী তো নয়ই। কুরুকুলের প্রত্যেকেরই একাধিক পত্নী তথা উপপত্নী আছে। উপপত্নী বিবাহিতা নয়। উপপতিও বিবাহসূত্রে আবদ্ধ থাকে না। কিন্তু উপপতি বা জার কোনো নারীর গোপন নর্মসহচর হয়ে থাকে। তার প্রকাশ্যতা লজ্জা এবং নিন্দার বিষয় বলে অধুনা সমাজে এই শব্দ দুটি ‘জার’ কর্তৃক জাত যে, অর্থাৎ ‘জারজ’ শব্দটি নিয়ে খুব আলোড়ন। এগুলো এখন প্রায় গালিগালাজ অথবা কুৎসিত কথা হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

    কিন্তু নিয়োগপ্রথায় উৎপাদিত পুত্র যদি জারজ না হয়, তবে সকামা পুত্রাকাঙ্খিণী অধবা যুবতীর সন্তান কেন জারজ হবে, এ তত্ত্ব আমি বুঝতে অক্ষম। লোকপরম্পরাগত লব্ধজ্ঞানে এর তো কোনো সূত্র নেই। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন স্বয়ং এক কুমারী ধীবরযুবতীর গর্ভজাত, পিতা পরাশর। পরাশর, কুমারী কাণ্ডারিণীর প্রতি কামার্ত হলে দ্বৈপায়নের জন্ম। এই কাণ্ডারিণী সত্যবতী পরবর্তীকালে মহারাজ শান্তনুর পট্টমহিষী হিসাবে হস্তিনাপুরে আসেন। মহারাজ পাণ্ডুর লোকান্তরপ্রাপ্তির পরও বেশ কিছুকাল এই মহাজননী হস্তিনাপুরের কাণ্ডারিণীই যেন ছিলেন। তিনি হস্তিনাপুরের রাজ্ঞী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পিতৃকুলের মাতৃতান্ত্রিক প্রবণতা পরিত্যাগ করেননি। তাঁরই সূত্রে হস্তিনাপুরের আর্য রাজরক্তে অনার্য রক্তের স্রোত মেশে। এ যেন তাঁর আজীবনের এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিল। ঘটনা পরম্পরায় তেমনই বোধ হয়।

    এই হস্তিনাপুর, যা এখন কৌরবজনদের ভূমি বলে খ্যাত, তা তো একদা ধীবরদেরই ভূমি ছিল। মহারাজ কুরু কোথা থেকে এসে তাঁর কৃষিবিদ্যার অনুশীলন করে এই কুরুজাঙ্গালের পত্তন করেন। তার আগে এ স্থান ছিল ধীবরদের মৎস্যশিকারের কেন্দ্র। তারা কৃষিজীবী ছিল না। যমুনা তাদের আহার্য সঞ্চিত রেখেছিল তার বক্ষে। ক্রমশ মহারাজ হস্তি ‘হস্তিনাপুর’ নগরের পত্তন করলে, ধীবরদের অধিকার খর্ব হতে থাকে। মহাজননী সত্যবতীর পিতা দাসরাজের অভিজ্ঞতায় নিশ্চয় এ সত্য ছিল। নচেৎ শান্তনুর মতো সুপাত্রে কন্যাদান করার প্রাক্কালে কি অত শর্তের আদৌ প্রয়োজন ছিল?

    আমার বোধ হয়, মহারাজ শান্তনু যখন সত্যবতীকে বিবাহ করতে চাইলেন এবং আমার জ্যেষ্ঠতাত দেবব্রত যখন তাঁর সেই ভূ-বিখ্যাত প্রতিজ্ঞা করে ভীষ্ম হলেন, তখনও কুরুবংশ এ স্থানে তত শক্তিশালী হয়নি, যেমন এখন। যদি হত তবে দেবব্রতের ভীষ্ম হবার প্রয়োজন হত না। মহাজননী সত্যবতীর পিতা দাসরাজ তখন নিঃসন্দেহে যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী। নচেৎ দেবব্রত বাধ্য হতেন না ওই রকম অসম্ভব প্রতিজ্ঞা করে ভীষ্ম হিসাবে বিখ্যাত হতে। হস্তিনাপুরের ইতিহাসে, কুরুবংশীয়দের এমন জিতেন্দ্রিয় ব্রহ্মচারী হওয়ার আদৌ কোনো দৃষ্টান্ত আমার জানা নেই। এই ঘটনার পিছনে যে রাজনৈতিক কারণটি ছিল, তা আমার দৃষ্টি এড়ায়নি।

    যে প্রথা অনার্যসমাজে সহজ স্বাভাবিক ছিল, তাকেই আর্যরা নিজস্ব সমাজে নিয়োগপ্রথা হিসাবে গ্রহণ করেছে। এখন তো সমাজ ক্রমশই মিশ্র হচ্ছে। অবশ্য আর্যদের সমাজেও নারীরা পুরাকালে এরকমই যৌন স্বাধীনতা ভোগ করত। কিন্তু ক্রমশই তা লোপ পেয়েছে। নিয়োগপ্রথার ব্যাপারটিকেও তো আজকাল সামাজিকভাবে গোপনই রাখার চেষ্টা করা হয়।

    মহাজননী কুরুকুলে এই নিয়োগপ্রথা প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি নিয়মিতই তাঁর কানীন পুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়নের সঙ্গে সংযোগ রাখতেন। জ্যেষ্ঠতাত ভীষ্ম আর্যসন্তান এবং অসাধারণ শক্তিমান বলে খ্যাত। মহারাজ গতাসু হলে চিত্রাঙ্গদ এবং বিচিত্রবীর্যের রাজত্বকালে অবশ্যই তিনি প্রভূত রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু মহাজননীকে অতিক্রম করা কোনোদিনই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। সত্যবতী ধীবর কন্যা, অনার্য সংস্কৃতিতে মানুষ। তাঁর পিতার সমাজে নারীর যৌন অধিকার এবং স্বাধীনতা এখনও অবাধ। সে সমাজে পুরুষের আধিপত্য আর্য বা মিশ্র সমাজের মতো একচ্ছত্র নয়। সত্যবতী কুরুকুলে বধূ হয়ে আসায় যে অনার্য মিশ্রণের সূত্রপাত, তা কখনো বিবাহের মাধ্যমে, কখনো-বা অন্য প্রয়োজনের তাগিদে আবশ্যিক হয়েছে। দেবব্রত, এই মিশ্রণটিকে অন্তর থেকে মেনে নিতে পারেননি। পিতার ক্ষেত্রে বিরোধিতা করা সম্ভব হয়নি। অবশ্য তা অন্য একটি কারণেও তিনি করতে পারেননি বলে মনে হয়। অপর দুই ভাই-এর মতো তিনিও বোধহয় অক্ষমই ছিলেন। হস্তিনাপুরবাসীরা সবাই জানেন ধীবররাজ তাঁর সঙ্গেই সত্যবতীর বিবাহ দিতে চেয়েছিলেন। সত্যবতী তাঁর চাইতে বয়সে ছোটোই ছিলেন। পূর্বপুরুষ যযাতির মতোই শান্তনু ছিলেন একজন বিকৃতকাম প্রৌঢ় এবং যৌনরোগগ্রস্ত। সম্ভবত তাঁরই কারণে পুত্রদের এরকম অক্ষম হতে হয়েছে এবং দেবব্রতের পূর্ববর্তী সাতটি সন্তানই মৃতাবস্থায় জন্মেছে। কিন্তু সে যাই হোক, ভীষ্ম অসাধারণ বাস্তববাদী। তাই মহাজননীর সঙ্গে কোনোদিনই তিনি আর্যশুদ্ধতা বিষয়ে কোনো বিতণ্ডা তোলেননি। তবে রাজনীতিগত স্বার্থের খাতিরে তিনি যে এর ব্যবহার করেছেন, তার প্রমাণ আমি বহুবারই পেয়েছি। মহাজননীর প্রতি তাঁর ব্যবহারে কোনো ত্রুটি বা অভব্যতা কোনোদিন দেখা যায়নি। তবু বলব, তিনি যে সদাসর্বদা নিজেকে সমদর্শী বলে জাহির করতেন, তা নিতান্তই ভণ্ডামি। তিনি অবশ্যই রক্তের বিশুদ্ধতার বিষয়ে সচেষ্ট আর আকাঙ্খী ছিলেন। সে কথা যথাসময়ে আমি স-উদাহরণ বিবৃত করব।

    শান্তনু যখন সত্যবতীকে বিবাহ করেন, তখন তিনি প্রৌঢ়ত্ব অতিক্রম করেছেন এবং সত্যবতী তখন সবেমাত্র বিংশতিয়া যুবতী। মহর্ষি পরাশরের সঙ্গে তাঁর সংসর্গ ঘটেছিল যখন তিনি ষোড়শ বর্ষীয়া। বর্তমান সমাজবিধিতেও অনুমোদন আছে যে কন্যা রজস্বলা হবার পর তিন বছর অপেক্ষা করেও যদি অনূঢ়া থাকে, তবে তার অভীপ্সা মতো পুরুষের সঙ্গে সংসর্গে কোনো অপরাধ নেই। তাই পরাশরের সঙ্গে সহবাসে মহাজননী কিছুই অন্যায় করেননি। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন সেই সহবাসের সুফল।

    আমি আমার অভিজ্ঞতায় জেনেছি, কোনো যুবতী যদি একবার যৌন অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং তারপর যদি তার স্বাভাবিক অভিগমনের সুযোগ না ঘটে, তবে পুরুষ মাত্রেই একসময় তার কাম্য হতে পারে। বয়স সেখানে কোনো সমস্যা নয়। সত্যবতীর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। তবে সেখানে আর একটি কথা আছে, রুচি। পরাশর মহর্ষি বশিষ্ঠের পৌত্র, শক্ত্রির পুত্র। তাঁরা সবাই আর্য। সর্বশাস্ত্রে সুপণ্ডিত, সুদর্শন। পরাশরকে নির্বাচন তাঁর পক্ষে আদৌ রুচিহীনতা নয়। শান্তনুর ক্ষেত্রেও একই অভিমত। এক্ষেত্রে বয়স একটা ব্যাপার ছিল এবং দেবব্রতও যে তাঁর কাঙ্খিত পুরুষ ছিলেন না এমত ভাবারও কোনো কারণ নেই। কিন্তু দেবব্রত কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ভীষ্ম হলেন। এক্ষেত্রে পিতৃভক্তি ইত্যাদি বিষয়ে হস্তিনাপুরের ভাট ব্রাহ্মণেরা যাই বলুন, বিষয়টি আমার কাছে কোনোদিনই স্বাভাবিক বা যুক্তিগ্রাহ্য মনে হয়নি। আর্যাবর্তে তখন আর্য বা অন্যান্য জাতীয়া নারীর কিছু অপ্রতুলতাও ছিল না কিংবা শান্তনুও এমন কিছু একপত্নী-প্রাণ স্বামী ছিলেন না। একটি নারী সংগ্রহ করে পিতার কামনিবৃত্তিকরণ কী এমন অসম্ভব কার্য ছিল দেবব্রতের পক্ষে। এমন তো এতদ্দেশে নিত্যই ঘটছে। সেক্ষেত্রে শান্তনুরও কিছু আপত্তি হত বলে তো আমার মনে হয় না। এইসব কারণেই আমার ধারণা সত্যবতীর সঙ্গে বিবাহ ব্যাপারটির মধ্যে কিছু রাজনীতিগত এবং দেবব্রতের ব্যক্তিগত কারণ আছে। সে কারণ প্রলম্বিত হল পরবর্তী প্রজন্মেও। মহাজননী ভীষ্মকেই প্রথমে নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন কনিষ্ঠ ভ্রাতার ক্ষেত্রে। এবং এই বিধিটিই কুলাচার অনুযায়ী সংগত ছিল। কনিষ্ঠ ভ্রাতার ক্ষেত্রদ্বয় কুলেরই ক্ষেত্র এবং ভীষ্মও স্বয়ং সেই কুলের পুরুষ।

    আমার এরকম বোধ হওয়ার কারণ এই যে বাল্যে ধাত্রীদের কাছে শুনেছি আমাদের কুলপিতা মহারাজ বিচিত্রবীর্যের মহিষী অম্বিকা এবং কৌশল্যা বা অম্বালিকা পুত্রোৎকর্ষণকালে কুরুকুল জাত পুরুষদের রূপ চিন্তা করেছিলেন। তাঁরা বোধকরি জানতেন না যে-পুরুষটির রূপ রমণকালে তাঁদের চিত্ত আলোড়িত করছিল, তিনি এক অক্ষম পুঙ্গব। আমি এক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতাত ভীষ্মের কথাই বলছি। সেকথা পরে আরও বলব।

    মহাজননী যে এতৎসত্ত্বেও শান্তনুকেই বর হিসাবে গ্রহণ করলেন, তা শুধুমাত্র দাসরাজের বা কুমার দেবব্রতের অভীপ্সাই নয়। হস্তিনাপুরের পট্টমহাদেবীর পদ লাভ করা কিছু কম প্রলোভন বা সুযোগের ব্যাপার ছিল না। সুযোগ এ জন্যে বলছি যে, মহাজননীর একটি স্বকীয় চারিত্রিক বিশিষ্টতা ছিল। তিনি আর্যরক্তের সঙ্গে অনার্য রক্তের মিশ্রণের পক্ষপাতী ছিলেন। পক্ষপাতী ছিলেন একারণে যে আর্যদের অগ্রগতি এবং ভূমিদখল যখন শক্তির সাহায্যে ঠেকানো যাবে না, তখন রক্তে অন্তত নিজস্ব অধিকার বজায় থাকুক। মহাজননী এক অসামান্যা মানবী ছিলেন। তাঁর দূরদৃষ্টির তুলনা হয় না।

    মহাজননীর এই অভীপ্সার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ধীবররাজের কূটনীতি। ধীবররাজ, আর্যরাজাদের, প্রধানত হস্তিনাপুর নরেশদের বিষয়ে যথেষ্ট অবহিত ছিলেন। আর্যদের ক্রমশ বিবর্ধন এবং অনার্যদের অরণ্যাশ্রয়ী হওয়া তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। অনার্যরা তাদের জনপদ, নগর এবং গ্রামগুলো ক্রমশ হারাচ্ছিল। সেখানে আর্যরা এসে বসতি স্থাপন করছিল। তাই ধীবররাজও তাঁর কন্যার মতো অনার্য প্রতিপত্তি এবং শক্তির অধিকার কোনো-না-কোনোভাবে স্থায়ী রাখতে দৃঢ়চিত্ত হয়েছিলেন। এ জন্যই তিনি সত্যবতীর সঙ্গে শান্তনুর বিবাহে মোক্ষম দুটি শর্ত আরোপ করেছিলেন। এক, সত্যবতীর গর্ভজাত সন্তানকে রাজপদ দিতে হবে এবং দুই, দেবব্রত বিবাহ করতে পারবেন না। কী অসাধারণ কূটনীতি। আমি এই হস্তিনাপুর রাজবংশের মহামন্ত্রী বিদুর, ধীবররাজের এই কূটনীতিকে, আমিও প্রশংসা না করে পারি না।

    বিবাহ বা যৌন সম্পর্ককে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, আমার অভিজ্ঞতায় এই প্রথম। আমার পিতা দ্বৈপায়নও যে মিশ্র প্রজননের এত সুখ্যাতি আমার কাছে করতেন, তার কারণও যে ক্ষমতাবিস্তারের সূক্ষ্ম রাজনীতি, তা আমার কাছে এই দৃষ্টান্তে সম্যক প্রতিভাত হল। পরবর্তীকালে কুরুকুলে এর ব্যাপক প্রয়োগ দেখেছি। শুধু কুরুকুল নয়, এই তথাকথিত ক্ষত্রিয়দের ক্ষেত্রে গোটা আর্যাবর্তেই বিবাহ তথা যৌন সম্পর্ক রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারের প্রয়োজনেই সংঘটিত হয় এমত দেখেছি।

    আর্য সমাজে, ক্ষত্রিয় জাতির মধ্যে প্রধানত ভ্রাতা-ভগিনীর পারস্পরিক সম্পর্ক, ভগিনীর বিবাহোত্তরকালে তেমন দেখা যায় না। কিন্তু ভগিনীপতি যদি ক্ষমতাশালী নৃপতি হন তবে তাঁর সঙ্গে যথেষ্ট হৃদ্যতা দেখা যায়। এঁদের সব কিছুই নির্ধারিত হয় ক্ষমতা আর সম্পদ আহরণের মাপকাঠিতে। কিন্তু সাধারণ প্রকৃতিপুঞ্জের মধ্যে দেখেছি, ভ্রাতা-ভগিনী বা অন্যান্য সম্পর্কগুলোর মধ্যে প্রাথমিক যে ব্যাপারটা থাকে তা স্নেহ ভালোবাসার। তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়, বিবাদ হয়, মারামারি কাটাকাটিও যে কখনো হয় না এমন নয়। তবু সর্বোপরি থাকে একটা বন্ধন, সেটা ভালোবাসার। ক্ষত্রিয় নামধারী, বিশেষত, রাজন্যসমাজে তা আমি কদাপি দেখিনি। এমনকী যৌনসম্ভোগের ক্ষেত্রে ক্ষমতা, প্রয়োজন বা রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া অন্য কোনো সম্পর্ক দেখিনি। কোনো রাজা বা রাজকুমার যদি গণবনিতার নিকটেও যান, তার পিছনে থাকে কোনো নির্দিষ্ট একটা অভিসন্ধি।

    আবার এও লক্ষ করেছি, যৌন সম্পর্ক বিবাহ-বন্ধনের বাধ্যবাধকতার মধ্যে যেমন পরিণতি লাভ করছে, এই সব রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বিষয়টা ততই সুবিধেজনক হচ্ছে। আবার বিবাহ-বন্ধনের আনুষ্ঠানিক জটিলতা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততই যেন সন্তানের পরিচয়ের বৈধতা অবৈধতা নিয়ে সামাজিক কোলাহল বাড়ছে। ‘জারজ’ কথাটি এভাবেই জন্ম নিয়েছে। আজকাল আনুষ্ঠানিক বিবাহ বহির্ভূত সন্তানমাত্রেই জারজ। আমার কৈশোরকাল পর্যন্ত এই শব্দটি, আমার সম্পর্কে কেউ ব্যবহার করেনি। এখন কারণে, অকারণে, আমায় এ কথাটি শুনতে হচ্ছে।

    কিন্তু দুর্যোধনের যে আচরণটি আমাকে বিস্মিত করল, তা হচ্ছে তার বিচারের স্ব-বিরোধ। এরকম স্ব-বিরোধ অবশ্য হস্তিনাপুরের অভিভাবকবৃন্দের মধ্যে তথা সমগ্র ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়দের মধ্যে অহরহই দেখা যায়। আচার্য দ্রোণের অস্ত্র শিক্ষাদান সমাপন হলে যখন রাজকুমারদের কুশলতা পরীক্ষার আয়োজন হয়, তখন একটি ঘটনায় এই দুর্যোধনের ব্যবহার আমাকে চমৎকৃত করেছিল। অত্যন্ত সুরুচিসম্পন্ন বোধ হয়েছিল তার বাগ্মিতা এবং সিদ্ধান্ত। রঙ্গস্থলে বাহ্বাস্ফোটকারী প্রবেশোন্মুখ কর্ণ যখন অর্জুনকে স্পর্ধা জানাল, তখন তার কুলশীল নিয়ে একটি সমস্যার সৃষ্টি হয়। কর্ণ সম্পর্কে, জ্যেষ্ঠতাত এবং আমি, দুজনেই অবহিত ছিলাম। কুন্তীও আমাকে সব কথাই বলেছিলেন। পাণ্ডু স্বয়ংবর সভায়, তাঁর বরমাল্য পেলে, ভীষ্ম গূঢ় পুরুষের মাধ্যমে কুন্তী বিষয়ে আদ্যন্ত সংবাদ জেনেছিলেন। এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার আলোচনাও হয়েছে তখন। সেই আলোচনার প্রাক্কালেই বুঝেছিলাম ভীষ্ম রক্তের বিশুদ্ধতার বিষয়ে আকাঙ্খী। তিনি বলেছিলেন, বিদুর, কুন্তী যাদবকন্যা। তাঁর জন্মদাতা পিতাও যাদব এবং পালক পিতা কুন্তীভোজও। রক্তের দিক থেকে যাদবরা বড়ো বেশি মিশ্র, আর্য নন। যদিও ক্ষমতার দিক থেকে তাঁরা খুবই শক্তিশালী, তবু হস্তিনাপুরের পট্টমহাদেবী আর্যক্ষত্রিয়া হলেই ভালো হত। সত্যবতীর পর, আর কোনো অনার্য বা মিশ্র জাতীয়া বধূ কুরুকুলে আসুক, এ তাঁর অভিরুচি ছিল না। সত্যবতী এবং দ্বৈপায়নের মাধ্যমে কুরুকুলে ক্রমশ অনার্য তথা মিশ্ররক্তের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছিল। জ্যেষ্ঠতাত বোধহয় চেয়েছিলেন যে ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডু যদি এক পুরুষে ভঙ্গক্ষত্রিয় হন, তবে সেখানেই এই সংকরত্বের ইতি হোক।

    এ কারণেই কি তিনি বাহ্লীক ক্ষত্রিয়কন্যা মাদ্রীর সঙ্গে পাণ্ডুর পুনর্বার বিবাহ দিয়েছিলেন? কুন্তীর সঙ্গে পাণ্ডুর বিবাহে তিনি কর্তৃত্ব করতে পারেননি। মাদ্রীকে তিনি নিজে কন্যাপণ দিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। এই বিবাহে মদ্ররাজ শল্যের আপত্তি ছিল। মাদ্রীর অগ্রজ শল্যও ক্ষত্রিয় এবং আত্মাভিমানী। পাণ্ডুকে তিনি যথেষ্ট আর্য ক্ষত্রিয় মনে করেননি। তাই এই কন্যাপণ। কুরুবংশের বিক্রমের কথা চিন্তা করেই তিনি এই বিবাহে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু বংশকৌলীন্য রক্ষার খাতিরে পণ গ্রহণ করেছিলেন এবং ভীষ্মকে তা স্বীকারও করতে হয়েছিল। কিন্তু শল্য শেষপর্যন্ত পাণ্ডবদের মেনে নিতে পারেননি। মহাযুদ্ধে তাই তিনি কৌরব সেনাপতি হয়ে নিজের ভাগিনেয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। সে যা হোক, ভীষ্ম কিন্তু এই ব্যাপারেও হেরে গিয়েছিলেন। কুন্তীই পট্টমহাদেবীর সম্মান পেয়েছিলেন। সত্যবতীর পর কুন্তীই সেই অসামান্যা রমণী, যিনি নিজ ক্ষমতা এবং কর্তৃত্বের ব্যাপারে ভীষ্মের মুখাপেক্ষী ছিলেন না। সে প্রসঙ্গ ক্রমশ আলোচনা করব।

    কর্ণ সম্পর্কে অন্য কারওরই সবিশেষ জানা ছিল না। সে অধিরথ সারথির পুত্র, এটাই সবাই জানত। সূত বা সারথিপুত্র রথচালনা করবে, ক্ষত্রিয়দের সৈন্যবাহিনীতে নাম লিখিয়ে, তাদের জন্য যুদ্ধ করবে বা আমাদের সঞ্জয়ের মতো রাজবন্দনা, সংবাদ ব্যাখ্যা করবে এটাই নিয়ম। সর্বতোভাবে ক্ষত্রিয়বৃত্তি অবলম্বন করবে, এটা ক্ষত্রিয়দের সহ্যের বাইরে, ব্রাহ্মণদেরও। আগের দিনে এমনটি ছিল না। পিতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন, এ বিষয়ে আমাকে তাবৎ প্রাক্ বিধি নিয়ম জানিয়েছেন। আগেকার দিনে বৃত্তি নির্ধারণ ছিল মানুষের স্বাধিকার। এখন ক্রমশ তা বর্ণভিত্তিক হচ্ছে। এ কারণে সারথি বা সূতপুত্র সারথির কাজই করবে। সে কখনোই রথীর মর্যাদা পাবে না। তবে এখনও এ বিষয়ে ব্যতিক্রম ঘটে থাকে। সে ব্যতিক্রম অবশ্য বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রেই বেশি দেখা যায়। পরশুরাম, দ্রোণ, কৃপ বা অশ্বত্থামা, এঁরা ব্রাহ্মণ হয়েও শস্ত্রাচারী। ক্ষত্রিয়রা, প্রয়োজনানুসারে এই নিয়মের ব্যবহার করে থাকেন, অন্যান্য বিষয়ের মতোই। সে প্রয়োজন শাসনক্ষমতা নিজেদের কুক্ষিগত রাখার স্বার্থে। তাঁরা রাজন্য, তাঁরা প্রবল। সুতরাং সামাজিক বিধিনিষেধের কঠোরতা বা শৈথিল্য নিজ প্রয়োজন অনুযায়ীই তাঁরা করবেন। ব্রাহ্মণদের এ ব্যাপারে ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে অভিন্ন স্বার্থ। এই দুই বর্ণের মধ্যে একদা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এখন শেষ হয়েছে। তাঁরা নিজেদের মধ্যে তাবৎ ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। তাঁদের সামাজিক এবং আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থ এখন অভিন্ন।

    আচার্য কৃপের আচরণে আর কথায় এটা প্রকাশ পেল সেই রঙ্গস্থলে। তিনি কর্ণকে বললেন, কুন্তীগর্ভসম্ভূত, মহারাজ পাণ্ডুর তৃতীয় পুত্র অর্জুন তোমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ করবেন। হে মহাবাহু, তুমি সভাস্থলে জানাও, তোমার মাতা এবং পিতা কে? তোমার কুল কী? কোন রাজবংশই বা তুমি অলংকৃত করে আছ, তাও সবিশেষে বলো। অর্থাৎ রাজবংশোদ্ভূত না হলে, তার সঙ্গে অর্জুনের অস্ত্রক্রীড়া হতে পারে না। কৃপ নিশ্চিতই কর্ণের জন্ম সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। তখন রঙ্গস্থলে অধিরথ সারথির আগমনে বিষয়টির একপ্রকার নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু পাণ্ডবগণের মধ্য থেকে কুৎসিত ভাষায় কর্ণকে বিদ্ধ করা হতে থাকে। ভীম নিতান্ত অমার্জিত ভাষায় কর্ণকে শ্লেষ করতে থাকেন।

    ওইদিন কর্ণার্জুন দ্বন্দ্ব নিয়ে কুরুসভা স্পষ্টতই দুভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। দুর্যোধন এবং তার ভাইয়েরা কর্ণকে মর্যাদা দিতে তৎপর। ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ ইত্যাদিরা সবাই পাণ্ডবপক্ষে। আমি নিতান্ত ধর্মসংকটে পড়েছিলাম সেদিন। দুর্যোধন ভীমের অশিষ্ট আচরণে পাণ্ডবদের জন্মতত্ত্ব নিয়ে প্রকাশ্যেই সরব হয়েছিল সেদিন। আমিও তার বাগ্মিতায় মোহগ্রস্ত হয়েছিলাম। সে কর্ণকে অঙ্গ রাজ্যের রাজা হিসেবে অভিষেক করিয়েছিল, কেননা সেটা তার ক্ষমতা এবং অধিকারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমার এবং কুন্তীর কাছে সেই ঘটনাটি অসাধারণ প্রীতিপ্রদ বোধ হয়েছিল, যদিও ভিন্ন ভিন্ন কারণে। কুন্তী বিচলিতা হয়েছিলেন কর্ণের প্রতি তাঁর স্বাভাবিক স্নেহাকর্ষণবশত। আমি বর্ণগত লাঞ্ছনা এবং অপমানবশত। দ্বন্দ্ব যখন প্রায় নিশ্চিত তখন এক দাসী এসে আমার কাছে সংবাদ দিল, কুন্তী অসুস্থ এবং আমি যেন একবার অচিরেই অবরোধে যাই। আমি সভা ছেড়ে গেলে ক্রীড়া সাময়িক বন্ধ থাকবেই। ঘটনাটি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমি এই সুযোগ গ্রহণ করলাম। দ্রোণ এবং ভীষ্মকে জানালাম, বিশেষ প্রয়োজনে আমাকে একটু রাজাবরোধে যেতে হচ্ছে, ক্রীড়া যেন সাময়িক বন্ধ থাকে। অবরোধে গিয়ে কুন্তীকে সুস্থ করলাম। তিনি কাতরভাবে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ক্ষত্তা, তুমি কি সব ভুলে গিয়েছ? আমি তো তোমার দয়িতা। তুমি কি এই সঙ্কটে শুধু বর্ণধর্মানুসারীই থাকবে?

    এই সূত্রে বলে রাখি, আমি পত্নী এবং পুত্রবান। তৎসত্ত্বেও নানাবিধ কারণে কুন্তীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। দেবর হিসেবে আমি তার অধিকারীও বটে। কিন্তু বর্ণগত সমস্যার জন্য তা আমাদের একান্ত গোপন। যা হোক, তাঁকে বললাম, কল্যাণী, ভয় পেও না। আমি থাকতে কোনো অঘটন ঘটবে না। আর যা হোক, আমি কৌরব মহামন্ত্রী তো বটে। আমি ক্ষমতার কেন্দ্রের সন্নিকটেই অবস্থান করি।

    ইতোমধ্যে অধিরথ সারথির আগমনে সমস্যা সহজ হল। কিন্তু আমার চিত্ত শান্ত হল না। পাণ্ডবেরা এত নীচ ব্যবহার কেন করবে? ভীমের উক্তি সেদিন আমার সর্বাধিক কুৎসিত বোধ হয়েছিল। দুর্যোধনের বক্তব্য ছিল অসাধারণ যুক্তিপূর্ণ এবং উদার। সে ভীমের শ্লেষোক্তির উত্তরে বলেছিল, কার জন্ম কীরকম, এই নিয়ে প্রশ্ন তোলে মূর্খরা। যাঁরা বীর, তাঁদের প্রভাব নদীসমূহের স্রোতের মতোই দুর্জ্ঞেয়। কোথা থেকে তার উদ্ভব, এ প্রশ্ন অবান্তর। অগ্নি জল থেকে উদ্ভূত হয়ে জগৎ ব্যাপ্ত করে আছেন। অগ্নি, রুদ্র, গঙ্গা এবং কৃত্তিকা, এঁদের পুত্র কার্তিকেয়, দেবসেনাপতি, এবং অসাধারণ পরাক্রমশালী। প্রয়োজনে ক্ষত্রিয়ও ব্রাহ্মণ হয়, আবার ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় হয়। দ্রোণ, গৌতম, এঁদের জন্ম-কথা স্মরণ কর। সর্বোপরি নিজেরা কীভাবে জন্মেছ, তা কি আমরা জানি না? এরপর ভীম বা অপর পাণ্ডবভ্রাতারা আর কোনো বিতণ্ডা তোলেনি। মহারাজ পাণ্ডু যে অক্ষম ছিলেন, তা কারওরই অগোচর ছিল না। দুর্যোধন সেদিন অসাধারণ বাগ্মিতা দেখিয়েছিল।

    আজ বুঝতে পারছি, সে নেহাতই অর্জুনের সমকক্ষ একজন ধনুর্ধারীকে সংগ্রহ করার প্রয়োজনেই ঈদৃশ উদার এবং যুক্তিপূর্ণ বাক্য বলেছিল। নচেৎ আর্য বা অনার্য যাই হোক, যদি রাজবংশে জন্মে তবে তারা তাদের নিজস্ব প্রয়োজনের খাতিরেই সবকিছু করবে। প্রয়োজনের বাইরে নয়।

    সেই দুর্যোধন, নচেৎ, কীভাবে আমাকে দাসীপুত্র, জারজ এই সব আখ্যা দেয়? পিতা কৃষ্ণদ্বৈপায়নের পুত্র আমরা তিনজন, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু এবং আমি। প্রথম দুজনের মাতা রাজ্ঞী অম্বিকা এবং কৌশল্যা। আমার মাতা রাজ্ঞী অম্বিকার দাসী, বর্ণে শূদ্রা। সেকারণে, আমি পারশব অর্থাৎ ব্রাহ্মণের ঔরসে শূদ্রার গর্ভে জাত। আমার মাতা আমার জন্মকালে দাসী ছিলেন না। তিনি আমাকে বলেছিলেন, বৎস, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ভিন্ন অন্য কোনো পুরুষকে আমি কোনোদিন আশ্রয় করিনি। তিনি দুই রাজ্ঞীর চাইতে আমাকেই অধিক স্নেহ করতেন। কারণ ঋষি অত্যন্ত ঘোরবর্ণ বিকটদর্শন হওয়ায় এবং তাঁর গাত্রগন্ধের কটুতার জন্য রাজ্ঞীরা তাঁকে সাতিশয় ঘৃণা করতেন। বংশ রক্ষার জন্য, নিতান্ত আদেশপরতন্ত্র হয়েই তাঁরা ঋষির অঙ্কশায়িনী হয়েছিলেন। আমি তাঁদের নিভৃত-আলাপে বলতে শুনেছি যে ঋষির সঙ্গে রমণকালে তাঁরা নাকি ভীষ্ম ইত্যাদি কুরুবীরগণের রূপ চিন্তা করতেন। ঋষিও তা অনুমান করেছেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, কল্যাণী, তুমি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এবং সুশীলা। তুমি অবশ্যই এক পরমপ্রাজ্ঞ, নীতিশীল পুত্রের জননী হবে। আমাকে গর্ভভারে ক্লান্ত দেখে ঋষি মহাজননীকে বলেছিলেন, মাতঃ, আমি আপনার আদেশ পালন করেছি। বিনিময়ে আমারও একটি প্রার্থনা আছে। এই কল্যাণীকে দাসীত্ব থেকে মুক্তি দিতে হবে। আজ থেকে সে স্বতন্ত্রা এবং পৃথক গৃহে স্বেচ্ছাধীন বাস করবে। মহাজননী তাঁর প্রার্থনা পূরণ করেছিলেন। কিন্তু তথাপি আমি দাসীপুত্র।

    বস্তুত আমার মহামন্ত্রীত্বও সেই বাদরায়ণির ক্ষমতা-সঞ্জাত। কৌরববংশ এক অর্থে, অথবা প্রকৃত অর্থেও ঋষিরই বংশ। তাছাড়া মহাজননী স্বয়ং তাঁর গর্ভধারিণী। সুতরাং কৌরবসভায় এবং কুলে ঋষির প্রভাব ছিল অপ্রতিহত। সেই প্রভাববলেই আমার কুরুসভায় যেটুকু প্রতিষ্ঠা। আমার স্বকীয় জ্ঞান বা যোগ্যতায় তা অবশ্য অর্জিত হয়নি, অধিকারের তো প্রশ্নই ওঠে না। মহাজননী এবং তাঁর কানীনপুত্র পরাশর-নন্দন দ্বৈপায়নকে অতিক্রম করা জ্যেষ্ঠতাত ভীষ্মের পক্ষেও কোনোদিন সম্ভব হয়নি। আমার বরাবর মনে হয়েছে, মহাজননী যেন তাঁর নিজস্ব কোনো বিশেষ ইচ্ছাকেই অতি সুকৌশলে রূপ দিয়েছেন। আমার উরস পিতা কৃষ্ণদ্বৈপায়নও যেন সেই ইচ্ছার অংশী।

    যদিও আমাকে পারশব বলা হয়, কিন্তু বাদরায়ণি তো ব্রাহ্মণ সে অর্থে নন। তিনিও তো আমারই মতো পারশব। আমার জননীও শূদ্রা, তাঁর জননীও শূদ্রা, শুধু শূদ্রাই নন ধীবরকন্যা। আমি পারশব হলেও, ধৃতরাষ্ট্র কিংবা পাণ্ডুকে হতে হয় মূর্ধাভিষিক্ত। কিন্তু সেও, যদি বাদরায়ণি ব্রাহ্মণ হন, তবেই। বাদরায়ণি জন্মসূত্রে পারশব, সংকরবর্ণ এবং আমরা, তাঁর ঔরসজাত তিনজন সংকরস্য সংকর। বস্তুত, মনুর সংহিতায় এ জাতীয় সংকরের কোনো জাতিনাম নির্দিষ্ট নেই। তাই বলছিলাম, জাতি বা বর্ণনির্ণয় ক্ষমতাশালী মানুষেরা তাঁদের প্রয়োজন এবং সুবিধে অনুযায়ী করে থাকেন।

    সে সময়, জ্যেষ্ঠতাত ভীষ্ম মহাজননীকে বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ-নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছিলেন, তখন নিয়োগপ্রথায় কুলরক্ষা খুব একটা প্রশংসিত সমাজবিধি ছিল না, ধর্ম অর্থাৎ সমাজবিধি, যুগে যুগে ভিন্নতর হয়ে থাকে। বর্তমান সমাজবিধিতে প্রকাশ্যে নিয়োগপ্রথা অবলম্বন করতে কেউই সাহসী হন না। তাই ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডুর জন্মবৃত্তান্ত রাজাবরোধের বাইরে খুব কম মানুষই আনুষ্ঠানিকভাবে জানত। এখন তো নিয়োগপ্রথাই অচল। কিন্তু অচল বলেই কি তা ঘটে না? ঘটে কিন্তু তা নিয়োগপ্রথার নামে নয়। দেবতার ঔরসজাত, এই অভিধাই গ্রহণ করে থাকে বর্তমান নিয়োগ-জাতকেরা। যেমন পাণ্ডবভ্রাতাদের পরিচয় প্রচার করা হয়েছে। আমি নিশ্চিত ভাবেই জানি যে কুন্তীর ক্ষেত্রে নিয়োগীরা সকলেই আমার পিতা কৃষ্ণদ্বৈপায়নের দ্বারা নির্বাচিত এবং তাঁরা সকলেই কিন্তু ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় বর্ণের নন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন বর্ণ মিশ্রতা যে ঘটেছে তার সংবাদ সাধারণ্যে আদৌ প্রচারিত নয়।

    রাজাবরোধের খবর বাইরের মানুষ খুব কমই জানতে পারে। যুধিষ্ঠির কেন ধর্মপুত্র, আমি বিদুরই বা সাক্ষাৎ ধর্ম কেন, কর্ণ সূর্যসম্ভব কী কারণে, এইসব তত্ত্ব, সবই আমার জানা আছে। সুতরাং নিয়োগপ্রথা আছে, এবং তা থাকবেও বোধকরি অনন্তকাল। শুধু নাম ভিন্ন হবে। আমাদের তিনজনের জন্মকালে নিয়োগের তেমন প্রচলন না থাকলেও একেবারে বন্ধ ছিল না। তাকে তখনও ধর্ম হিসেবেই দেখা হত। কিন্তু কোনো প্রথা যদি ধর্মই হয়, তবে তার প্রকাশ্যতা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু ওই যে বললাম, এই প্রথা সামাজিকভাবে আর প্রশংসিত ছিল না, তাই তার গোপনীয়তা শুরু হল। ভীষ্ম জানতেন, এই সময়, এই বিধি সমাজে আলোড়নের সৃষ্টি করবে। তাই বর্ণসংকর হওয়া সত্ত্বেও কৃষ্ণদ্বৈপায়নকে নিয়োগ করার বিষয়ে তাঁর আপত্তি করার উপায় ছিল না। এ ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা খুবই সহজ ছিল। কারণ আমাদের পিতা শারীরিক ভাবে মাতৃবর্ণের অধিকারী হলেও পিতৃকুলের ‘ধী’ শক্তির আধার বিশেষ।

    পরবর্তীকালে পাণ্ডবদের যখন কুলে গ্রহণ করা হল, তখন প্রয়োজন হল কিংবদন্তির। কারণ, সমাজে ধর্মের স্বরূপ বদলে গেছে ততদিনে। এইসব কিংবদন্তির মূলে আছেন, হস্তিনাপুরবাসী ব্রাহ্মণ ঋষিবৃন্দ এবং তাঁদের সহায়ক কুরু পিতৃকুল। স্বয়ং বাদরায়ণিও এর প্রয়োজনীয়তা সমর্থন করেছেন তখন এবং তা তাঁর মাতা সত্যবতীর কূট পরামর্শক্রমেই। এসব কিংবদন্তি তাঁদের সবার স্বার্থেই প্রয়োজন, নচেৎ সাধারণ্যে আভিজাত্য বজায় থাকে না। এটাই আসল কথা। প্রকৃতিপুঞ্জের মধ্যে শাসন-শৃঙ্খলা আর আভিজাত্য বজায় রাখা, ক্ষমতায় থাকতে হলে নিতান্তই প্রয়োজন। রাজা দেবসম্ভূত। দেবসম্ভূতদের কত কীই না ঘটতে পারে। এই হল তাদের বিশ্বাস। তারা সরলরেখায় চলে, তাদের যা খুশি বুঝিয়ে দেওয়া যায়। সুতরাং প্রচার করো, বিদুর ধর্মের অবতার, যুধিষ্ঠির ধর্মপুত্র, ভীম পবনাত্মজ ইত্যাদি। কেন? না, যুধিষ্ঠির প্রকৃতিগতভাবে সত্যব্রত, ভীমের পবনতুল্য গতি। আমি কেন ধর্মের স্বরূপ এবং যুধিষ্ঠির কেন ধর্মপুত্র, একথা বুঝতে সাধারণের হাজার বছর লেগে যাবে। যারা বুঝবে, তারা মুখ খুলতে সাহসী হবে না। এইসব প্রচারে যুগের পর যুগ ধরে কিংবদন্তির পাহাড় জমা হবে। এইভাবে প্রকৃত ঘটনা আর ইতিহাস চাপা পড়ে শুধু কাহিনি আর কিংবদন্তি থাকবে। তারমধ্যে কিছু থাকবে সত্যের আভাস, বেশির ভাগই উপাখ্যান। প্রকৃতিপুঞ্জ সরল বিশ্বাসে কিংবদন্তির পরম্পরাবাহী হবে এবং পৃথিবীতে চন্দ্র বংশ, সূর্য বংশের খ্যাতি প্রতিষ্ঠার জন্য এই চারণেরা অনন্ত উপকথার ধূম্রজাল সৃষ্টি করবে। প্রকৃত ইতিহাস তার নীচে সেই চাপা পড়ে থাকবে।

    _____________________

    যুধিষ্ঠির যে বিদুরসঞ্জাত, এ বিষয়ে মহাভারত যথেষ্ট ইঙ্গিতবহ। সন্ধিৎসু পাঠক লক্ষ করবেন, আশ্রমবাসিক পর্বে ব্যাস ধৃতরাষ্ট্রকে কীভাবে এই সত্য জ্ঞাত করাচ্ছেন। উদ্ধৃতি : “মহর্ষি মাণ্ডব্য চিরসঞ্চিত তপোবল নষ্ট করিয়া ধর্মকে শাপে অভিভূত করাতেই ঐ মহাত্মার (বিদুরের) জন্ম হয়। আমি পূর্ব্বে ব্রহ্মার আদেশানুসারে বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্রে উঁহাকে উৎপাদন করিয়াছিলাম। ঐ মহামতি তোমার ভ্রাতা। উঁহার অসাধারণ ধ্যান ও মনের ধারণা নিবন্ধন, কবিগণ উঁহাকে ধর্ম বলিয়া কীর্তন করেন। ইনি জ্ঞান, সত্য, শান্তি, অহিংসা দান ও দমগুণ দ্বারা বিখ্যাত হইয়াছেন। ঐ অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন মহাত্মা ধর্ম যোগবলে কুরুরাজ যুধিষ্ঠিরকে উৎপাদন করিয়াছেন। অগ্নি, জল, বায়ু, আকাশ ও পৃথিবী যেমন ইহলোক ও পরলোকে বিদ্যমান আছেন, ধর্মও তেমনি উভয়লোকে বিদ্যমান রহিয়াছেন। উনি এই চরাচর বিশ্ব সংসারে ব্যাপ্ত হইয়া অবস্থান করিতেছেন। নিষ্পাপ কলেবর-সিদ্ধগণই উঁহার দর্শন লাভে সমর্থ হয়েন। যিনি ধর্ম তিনিই বিদুর এবং যিনি বিদুর তিনিই যুধিষ্ঠির।”

    (কালীপ্রসন্ন সিংহ সম্পাদিত বৈয়াসিকী মহাভারত, আশ্রমবাসিক পর্ব: অষ্টাবিংশতিতম অধ্যায়, তুলিকলম (প্রথম প্রকাশন, ১৯৮৩), পৃ. ১১৫৭।)

    পাঠক, ব্যাস বলেছেন, বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্রেই বিদুরকে উৎপাদন করেছেন তিনি। তাহলে অম্বিকা, কৌশল্যা এবং বিদুরজননী ঐ বৈশ্যাদাসী সবাইকে মহারাজ বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্র বলেই ঋষি উল্লেখ করেছেন এবং এই ত্রয়ীর কোনো পৃথক অবস্থান নির্দিষ্ট করছেন না। কিন্তু তথাপি বিদুর দাসীপুত্র।

    ধর্মই বর্তমানে আমাদের সমাজের ধারক। ধর্ম বলতে আমরা বুঝি, যা আমাদের ধারণ করে রাখে। সে কারণে ধর্মই আমাদের রাষ্ট্রীয় সংহিতা। এই সংহিতাকে যে অতিক্রম করে সে অধর্মাচারী। এই সংহিতা বৃহস্পতি, শুক্রাচার্য, ভৃগু নারদীয় গোষ্ঠীর ঋষিগণ, পরাশরীয় আচার্যগণ এবং অন্যান্যদের রচনা পরিবর্ধন, পরিমার্জন এবং পরিশোধন করেছেন। এই সংহিতা তাই আমাদের ধর্ম বলে কথিত ছিল এতকাল। কিন্তু এক্ষণে এর পরিধি এক ব্যাপক ব্যাপ্তি লাভ করেছে। এই ধর্ম যে কী আর কী নয়, তা নিয়ে বিতর্ক প্রতি মুহূর্তে চলছে। ধর্মস্য তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াম্ । রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিকক্ষেত্রে ধর্ম বড়ো বলবান। তার শতমূল বিস্তৃতি, সহস্রমূল সিদ্ধান্ত। বাদরায়ণি ব্যাস সমাজের এই জটিল প্রবাহকে চিন্তনে রেখেই তাঁর ইতিহাস, কাব্য আর সংহিতা রচনা করেছেন। তাঁর রচনা, আমি কিঞ্চিৎ অধ্যয়ন করেছি। তাতে আমার ধারণা হয়েছে যে তিনি যুগের নির্বন্ধগুলিকে তাঁর সংহিতায় উপস্থাপিত করতে প্রয়াসী হয়েছেন। যেমন ভার্যা ও পতির সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বিধান দিয়েছেন যে, এই সম্পর্ক অতি সূক্ষ্ম। কিন্তু রতি বিষয়ে তাঁর বিধান এই, যে, রতি স্ত্রী-পুরুষের সাধারণ ধর্ম। কিন্তু শুধুমাত্র রতির জন্য বিবাহকরণ তাঁর অনুজ্ঞা-বহির্ভূত। ব্যক্তি জীবনের বিষয়ে এই অনুজ্ঞা তিনি সাধারণের জন্য বিধান করেন।

    রতি স্ত্রী-পুরুষের সাধারণ ধর্ম। এই রতিফল কদাচিৎ নিষ্ফল হয়ে থাকে। পিতা, মানুষের স্বভাবজ প্রবণতাকে ধর্ম আখ্যা দিয়েছেন তাঁর সংহিতায়। কিন্তু এ বিষয়ে অমিতাচারের উদ্দণ্ডপনাকে ধর্ম বলেননি, বলেছেন যুগাচার।

    এই মতের সত্যাসত্য বিচারসাপেক্ষ। কিন্তু বাস্তবঘটনা এই যে হস্তিনাপুর তথা গোটা আর্যাবর্তের রাষ্ট্র এবং সমাজপিতারা এই সংহিতাকে ধর্ম জ্ঞান করেন। তাবৎ চাতুর্বর্ণ্য সমাজ এই সংহিতায় বিধৃত। রাষ্ট্রসমূহও তাই এই সংহিতাকে ধর্ম হিসেবে মেনে নিয়েছে। এই সংহিতাকে কেউই অতিক্রম করতে চান না। কিন্তু দেখা যায়, তবুও, বহু ক্ষেত্রেই নানাবিধ সংকটের উদ্ভব হয়। তখন এই সংহিতা সূত্রের কূটাভাষের মাধ্যমে এই সব সংকটমোচনের প্রচেষ্টা করা হয়।

    এরকম একটি ধর্মসংকট আমি দেখেছিলাম, কুরুসভায় যেদিন দ্যূতক্রীড়া হয় সেদিন। যুধিষ্ঠির অবশ্য প্রচার করেছেন যে জ্যেষ্ঠতাতের আজ্ঞায়ই তিনি এই ক্রীড়ায় আগ্রহী হয়েছিলেন এবং দ্যূতক্রীড়াটি আদ্যন্ত কপটক্রীড়া ছিল। কিন্তু আমি বিষয়টি সেভাবে বিচার করি না। যুধিষ্ঠির স্বেচ্ছায়ই এই ক্রীড়ায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। দ্যূতক্রীড়ার প্রতি তাঁর এক স্বাভাবিক আকর্ষণ ছিল। কিন্তু প্রসঙ্গ তা নয়। প্রসঙ্গ হচ্ছে যাজ্ঞসেনীর প্রতি বর্বরোচিত আচরণ এবং তার প্রতিক্রিয়া।

    দ্রৌপদী, রাজসূয় যজ্ঞের সময় দুর্যোধনকে উপহাস করেছিলেন। পাণ্ডবেরা সবাই মানী রাজা দুর্যোধনের বিড়ম্বনায় অশিষ্ট কৌতুক এবং শ্লেষ প্রকাশ করে দুর্যোধনকে উত্যক্ত করলে তাঁর ক্রোধ বর্ধিত হয়েছিল। দ্রৌপদী কর্তৃক ডিম্ব করার স্মৃতি দুর্যোধন কোনোদিন বিস্মৃত হতে পারেনি। তাই দ্যূত-সভায় দ্রৌপদীকে নিয়ে সেদিন চূড়ান্ত বর্বরতার আয়োজন হয়েছিল।

    সভায় বলপূর্বক নিগৃহীতা এবং বিধ্বস্তা পাণ্ডবমহিষী সেদিন ভুজঙ্গিণীর মতো ফণা তুলে যেন সমগ্র কুরুপাণ্ডবকেই দংশন করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। রাজসূয়সভায় দুর্যোধনের নিগ্রহের তবু একটা ভদ্র ব্যাখ্যা করা যায়, যে যতই বিরোধ থাকুক সে যাজ্ঞসেনীর দেবর, এবং দেবরকে ডিম্বকরণের অধিকার ভ্রাতৃবধূদের থাকেই। কিন্তু দ্যূতসভায় যাজ্ঞসেনীর যে লাঞ্ছনা, নারীত্বের যে অমর্যাদার অনুষ্ঠান দুর্যোধনেরা করেছিল তার কোনো ভদ্র অজুহাত থাকতে পারে না। সমগ্র কুরুকুলরমণীরাও সেদিন দ্রৌপদীর লাঞ্ছনায় আর্তনাদ এবং প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু হায়! ক্ষত্রিয় রমণীদের প্রতিবাদ কেই-বা শুনবে?

    ক্রুদ্ধা, অপমানিতা দ্রৌপদীর প্রশ্নের উত্তর কোনো কুরুবৃদ্ধ বা সভাসদ-সজ্জনেরা দিতে পারেননি। প্রচলিত ধর্মে তাঁর বা কোনো নারীরই বিশেষ কোনো রক্ষাকবচ তাঁরা খুঁজে পাননি। সংহিতায় আজও গবী, ভূমি, নারী সমার্থক। কিন্তু তা প্রাচীন অর্থে নয়। প্রাচীন অর্থে এই ত্রয়ী স্বাধীনা এবং স্বতন্ত্রা, তাই সমার্থক। এখন সবই সম্পত্তি, তাই সম্পত্তির প্রভু সম্পত্তি ভোগ করবেন, তাতে কারও কিছুই বলার নেই। দ্যূতে দুর্যোধন অন্যান্য সম্পত্তির সঙ্গে নারীকেও জয় করেছে। তার অধিকার আছে, তাঁকে নিয়ে যা খুশি করার। এক্ষেত্রে সবাই ধর্মসংকটে। ধর্মতত্ত্ব অর্থাৎ সমাজধর্ম প্রকৃতই গুহায় নিহিত। আমি আর বিকর্ণ ক্ষীণপ্রচেষ্টা করেছিলাম সংহিতার কূটভাষ অবলম্বন করে এই সংকট মোচনের, কিন্তু তা উন্মত্ত ক্ষমতাকামুকদের হৃদয় বা মস্তিষ্ক আদৌ স্পর্শ করল না। ফলত সভায় তখন নির্লজ্জ অত্যাচারীদের স্বেচ্ছাচার চলছে। কুরুবৃদ্ধজন, আচার্য এবং ব্রাহ্মণগণ অধোমুখ এবং নির্বাক। এই নির্বাক থাকার কারণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেকরকম। দ্রোণ এবং কৃপ প্রভৃতির ক্ষেত্রে কোনো কথা বলা সংগত নয় বলে তাঁরা নির্বাক। ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ। সভাস্থলে কী ঘটছে, তা দেখতে পাচ্ছেন না বলে নির্বাক। তাঁর কাছে যিনি সব দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে থাকেন, যিনি রাজার চক্ষু, সেই সঞ্জয়, স্বাভাবিক লজ্জাবশত অধোমুখ তাই নির্বাক। পিতামহ ভীষ্ম ধর্মসংকটের কারণে নির্বাক। আমরা সবাই নির্বাক এবং অধোমুখ, অধোমুখ যেন তাবৎ চরাচর। ক্ষমতাকামুক সানুচর দুর্যোধন ছাড়া সবাই লজ্জায়, ধর্মসংকটে, ঘটনার বীভৎসতায় অধোমুখ।

    এখানেই প্রথম আমি বাদরায়ণির সংহিতার সংকট প্রত্যক্ষ করি। স্ত্রী, ভূমি এবং গবী এই ত্রয়ী সম্পত্তির সবই বীর্যশুল্কা। দুর্যোধন অক্ষক্রীড়ায় বিজয়ী হয়ে, পাণ্ডবদের এই সমুদয় সম্পত্তির প্রভু। এই সিদ্ধান্ত সংহিতা-সম্মত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই, দুর্যোধনাদি দুর্বৃত্তরা পাণ্ডবগণের অপর স্ত্রীদিগের বিষয়ে কোনোরূপ উচ্চবাচ্য করল না, বা তাঁদের সভায় আনয়ন করার জন্য আদেশ করল না। আমি ভাবি, পাঞ্চালদের সঙ্গে কৌরবজনের চিরপোষিত শত্রুতার কারণেই কি পাঞ্চালীকে ধর্ষিতা-প্রায় হতে হল। কই যুধিষ্ঠির তো তাঁর নিজের পত্নীকে পণ রাখলেন না। আশ্চর্য এই ক্ষত্রিয়াচার!

    দ্রৌপদী সম্পর্কে কিংবদন্তি এই, তিনি যজ্ঞসম্ভবা। আবার এই আর্যক্ষত্রিয় নামধারীদের সমাজে কোনটা যে যজ্ঞ আর কোনটা জীবাচার বা কুলাচার তার কোনো নির্দিষ্ট ভেদরেখা নেই। এরা ভোজনকেও যজ্ঞ বলে, পশুমাংস দগ্ধ করাকেও যজ্ঞ বলে, অগ্নিতে হবিপ্রদানকেও যজ্ঞ বলে, আবার রতিক্রিয়াকেও বলে যজ্ঞ। আমি ম্লেচ্ছদের শাস্ত্রও অধ্যয়ন করেছি, তারা কিন্তু ভিন্নাচারী। তারা কোনো কিছুকেই যজ্ঞ নামে অভিহিত করে না। তারা রন্ধন, ভোজন, রতিক্রিয়া ইত্যাদি সমুদায় বিষয়কেই ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত করে। আমার বিশ্বাস, দ্রৌপদী দ্রুপদের পালিতা কন্যা। যেমন সীতা জনকের। একারণেই তাঁর ক্ষেত্রে পঞ্চস্বামীর বিধান এত সহজে হয়েছে। দ্রুপদের নিজস্ব ঔরসজাত সন্তান, পুত্রকন্যা নির্বিশেষে আরও ছিল। শুধুমাত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন এবং দ্রৌপদীই ছিলেন পালিত। তাই দ্রৌপদীর ক্ষেত্রে যা সম্ভব ছিল, পাণ্ডবেরা অন্য পত্নীদের ক্ষেত্রে তা চিন্তাও করতে পারেননি; সেখানে যথেষ্ট অসুবিধার সম্ভাবনা ছিল। কেননা সেইসব পত্নীরা তাঁদের রাজন্য পিতাদের ঔরসজাতা।

    আমি সঠিক জানি না, রাজা দ্রুপদ কী করে ধৃষ্টদ্যুম্ন এবং পাঞ্চালীকে লাভ করেছিলেন। অনুমান হয় তো কোনো দানযজ্ঞ। সে যা হোক, সে কারণেই কি দ্রৌপদীকে এত লাঞ্ছনার ভাগী হতে হল! কিন্তু পালিতা কন্যা হলেও দ্রুপদ যাজ্ঞসেনীর অপমান কিছুমাত্র তুচ্ছ করেননি।

    কিন্তু যাজ্ঞসেনী অসামান্য। কুরুসভা উত্তাল করে যে প্রশ্নবাণ তিনি নিক্ষেপ করেছেন, তার উত্তর কেউই দিতে পারেননি। শুধু বিকর্ণ একা এই প্রশ্নকে তুলে ধরলেন সভার সামনে। তিনি বললেন, পাঞ্চালী যা বললেন, আপনারা তার জবাব দিন, যদি সুবিচার না করেন তবে আমাদের নরকগতি হবে। কুরুগণের মধ্যে বৃদ্ধতম ভীষ্ম, ধৃতরাষ্ট্র, মহামতি বিদুর, আচার্য দ্রোণ ও কৃপ, এঁরা দ্রৌপদীর প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না কেন? যে সকল রাজা এখানে আছেন তাঁরাও বলুন। তখনও সবাই নিরুত্তর বসে থাকলে সদ্যযুবক বিকর্ণ অত্যন্ত ক্রুদ্ধভাবে বলতে লাগলেন, আপনারা কিছু বলুন বা না বলুন, আমি যা ন্যায্য মনে করি তা বলছি। মৃগয়া, মদ্যপান, অক্ষক্রীড়া এবং অধিক স্ত্রীসঙ্গ, এই চারটি রাজাদের ব্যসন। ব্যসনাসক্ত ব্যক্তি ধর্ম থেকে চ্যুত হয়, তার অনুষ্ঠিত ধর্মকে লোকে অকৃতকর্ম বলে মনে করে। যুধিষ্ঠির ব্যসনাসক্ত হয়ে দ্রৌপদীকে পণ রেখেছিলেন। কিন্তু সকল পাণ্ডবই দ্রৌপদীর স্বামী, আর যুধিষ্ঠির নিজে বিজিত হবার পর দ্রৌপদীকে পণ রেখেছিলেন, অতএব দ্রৌপদী বিজিতা হননি।

    বস্তুত যাজ্ঞসেনীর প্রশ্নও সভার নিকট এই ছিল। আমিও সভার নিকট এই প্রশ্নই তুলে সংহিতার কূটভাষ তৈরি করেছিলাম যে, যে ব্যক্তি স্বয়ং দাস হিসেবে পরিণত হয়েছে, সে কখনো অন্য ব্যক্তিকে পণ রাখতে পারে না। অবশ্য মস্তিষ্কে তখন এ বিচারও ছিল যে, যাজ্ঞসেনী একজন ব্যক্তি, তাঁর নিজস্ব সত্তার স্বামিত্ব একান্ত তাঁরই। যুধিষ্ঠির বা তাঁর ভ্রাতারা তাঁর বর বটেন, কিন্তু সে কারণে, যাজ্ঞসেনীর ব্যক্তিসত্তার উপর তাঁরা প্রভুত্ব করতে পারেন না। সভাস্থজনের কাছে, যাজ্ঞসেনীও এই মর্মে আবেদন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ, ধর্ম বা সংহিতায় তার কোনো নির্দেশ নেই। বিবাহপ্রথা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবার পর, এই সব কূটসমস্যার জন্ম হয়েছে। নারীর ক্ষেত্রে তার সমধর্মাচারী বর স্বামী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এবং নারী হয়েছে ব্যক্তিসত্তাহীনা দাসী।

    এক্ষেত্রে অনেকে যুধিষ্ঠিরের সত্যবৎসলতার কথা বলে থাকেন। কিন্তু আমার মনে সবসময়ই দুটি প্রশ্ন এ ব্যাপারে জাগরূক ছিল। যুধিষ্ঠিরের সত্যবৎসলতা একাধারে তাঁর নির্বুদ্ধিতা এবং অহংকার কিনা, আর দুর্যোধনের অধিকৃত রাজ্যখণ্ডের প্রতি তাঁর লোভ ছিল কিনা। এর নিশ্চিত উত্তর সুকঠিন। লোভ মনুষ্যপ্রকৃতিকে কখন কীভাবে প্রভাবিত করে তার নির্ধারণ খুবই দুরূহ। আমার বোধ হয়েছিল, যুধিষ্ঠির যেন মনে মনে, সেই দ্যূতক্রীড়ার সময় বেশ লোভীই হয়ে পড়েছিলেন। যদি দ্যূতক্রীড়ায় জিতে বাকি রাজত্বটুকু লাভ করা যায় এই ছিল তার অভিপ্রায়। সেক্ষেত্রে যুদ্ধের মতো একটা ভয়ানক কর্মে লিপ্ত হতে হয় না। এছাড়া তাঁর অক্ষক্রীড়াসক্তি তো সর্বজনবিদিত। শকুনি ক্রীড়ায় কপটতার আশ্রয় গ্রহণ করেছে কিনা, তা আদৌ কোনো প্রশ্ন নয় এক্ষেত্রে। সভাসদ দেখেছে এবং জেনেছে, সে জিতেছে এবং সেই জয়ের পণমূল্য যুধিষ্ঠির কর্তৃকই নির্ধারিত যাজ্ঞসেনী এবং অন্যান্য সম্পদাদি। সভাসদ এও দেখেছে যে, অপর চারজন পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের এই পণ রাখার সময় কোনো আপত্তি করেনি। আমার এমনও মনে হয়, যে এই ক্রীড়ায় যদি পাণ্ডবেরা জয়লাভ করত, তারাও যে দুর্যোধনাদির মতোই আচরণ করত না, তা নিশ্চয় করে বলা যায় না। ক্ষত্রিয় নামধারী এই লোভীদের পক্ষে সবই সম্ভব। যদি লোভই না থাকবে, তবে যুধিষ্ঠির দ্যূতক্রীড়ার মতো সর্বনিন্দিত কর্মে আদৌ লিপ্ত হবেন কেন?

    কিন্তু সবাই অধোমুখ থেকে বিষয়টির বীভৎসতা থেকে নিজেদের বিযুক্ত রাখতে পারেন, আমি তো তা পারি না। আমি যে মহামন্ত্রী। আমাকে তো উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত মন্ত্রণা দিতেই হবে, সে আমার ধর্ম।

    আমি একটি বিষয় কিছুতেই অনুধাবন করতে পারি না। ভীষ্ম কি সত্যই এই সভাকে শাসন করতে অপারগ ছিলেন? ধর্মসংকট বা দ্রোণের মতো তিনিও এঁদের অন্নদাস, এইসব যুক্তি তাঁর ছিল। কিন্তু তিনি তো কুরুকুলপিতামহও বটেন। সেই সুবাদে উভয়পক্ষকেই নানা সদুপদেশ তিনি দেবেন, দিয়েছেনও। শুধু এই ক্ষেত্রেই তিনি নির্বাক থাকলেন কেন? দ্রৌপদীকে কি তিনি তাহলে আদৌ শ্রদ্ধার আসনে বসাননি? দ্রৌপদীর পাণ্ডবদের সঙ্গে বিবাহ কুন্তী নিষ্পন্ন করেছেন। যদিও অর্জুন প্রথমে লক্ষ্যভেদ করে স্বয়ংবর-সভায় তাঁকে লাভ করেন। পঞ্চভ্রাতার বিবাহের ব্যবস্থাপনা কুন্তীর। এক্ষেত্রে জনশ্রুতি এই, যে ভিক্ষালব্ধ বস্তু পাঁচভাইকে সমান ভাগে গ্রহণ করতে তিনি অনুজ্ঞা করেছিলেন। কিন্তু আমি জানি, কুন্তী এ ব্যবস্থা সজ্ঞানেই করেছিলেন। পাঁচভাই-এর মধ্যে কোনোরকম ভেদ না জন্মাক, এ তাঁর কাম্য ছিল। দ্রৌপদী অসামান্যা রূপবতী। তিনি বিশেষ কোনো ভ্রাতার পত্নী হলে, ভেদের সম্ভাবনা থাকেই। সম্পদে দুঃস্থ পাণ্ডবভ্রাতাদের মধ্যে ভেদ উপস্থিত হলে, তারা কোনোদিন কুরুরাজ্যের অংশ পাবে না। কুন্তী এমত বিচার করেছিলেন। তাঁর আরও একটি কারণ ছিল এই অদ্ভুত অনুজ্ঞার পক্ষে। তাঁর গর্ভজাত চার পুত্রের জন্য চার-জনক। কুন্তী তাঁর বাল্যাবস্থা থেকেই স্বতন্ত্রতায় অভ্যস্ত। হয়তো তাঁর পিতৃকুলেই এই স্বতন্ত্র সংস্কৃতি তখনও বর্তমান ছিল, যেমন, এখনও কোনো কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে দেখা যায়। তিনি কি বধূর সম্ভাব্য কাটব্যের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্যও এই পঞ্চস্বামীর বিধান দিয়েছিলেন? তাঁর এইসব কর্তৃত্ব কি ভীষ্ম পছন্দ করেননি? কারণ, আমি জানি, কুন্তীকে তিনি আদপেই পছন্দ করতেন না। বোধহয়, তাঁর স্বতন্ত্রতা, পুরুষান্তর-গমন এবং ক্রমান্বয়ে পুত্রলাভ, নিজ সিদ্ধান্তের অনমনীয়তা ইত্যাদি ভীষ্ম অনুমোদন করতে পারেননি। অম্বিকা এবং কৌশল্যার বেলায় প্রয়োজনে যা তিনি অনুমোদন করেছেন, কুন্তীর বেলায় তার ব্যতিক্রম হল কেন, বোঝা দায়। অথচ, আমি তো জানি, কী পরিবস্থায় কুন্তী দুর্বাসা-প্রদত্ত মন্ত্রের ব্যবহার করেছিলেন।

    রাজাবরোধে সেদিন ছিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। মহারাজ পাণ্ডুর প্রাসাদের কক্ষগুলিতে বর্তিকা জ্বালানো হয়নি। তিনি অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ মনে প্রাসাদের নির্জন এক কক্ষে বিশ্রামরত। একটি ক্ষীণদীপ বস্ত্রান্তরালে গুপ্ত রেখে, আমার কুটিরে এসেছিল সেদিন কুন্তী। আমি তখনও অকৃতদার। বেদিকার উপর ভূর্জপত্র রেখে আমি তখন সংহিতার ভাষ্য রচনা করছি, যা পরবর্তীকালে বিদুরনীতি হিসেবে খ্যাত হয়েছে। তখন দ্বার-প্রান্তে কিঙ্কিণী-শব্দ এবং অচিরে কুন্তী কক্ষমধ্যে। আমি ত্বরিত গতিতে উঠে সংবর্ধনা করি-দেবি, আপনি? কুন্তী বলে, দেবী নয়, বলুন, কল্যাণী, ক্ষত্তা, অধিক কথার সময় নেই। মহারাজের আদেশ নিয়েই এসেছি। মহারাজ আজ তপোবন থেকে ফিরে এসেই জানালেন, তিনি দগ্ধবীর্য, অক্ষম। সেখানকার আয়ুর্বেদাচার্য তপোধনেরা তাঁকে জানিয়েছেন, তিনি কোনোদিনই সন্তানের জনক হতে পারবেন না। তিনি আমাকে শারীরমন্ত্রযোগে সন্তান বহন করতে অনুজ্ঞা করেছেন। ক্ষত্তা, আমি আপনার মতো গুণশীল পুত্র কাঙ্খা করি।

    সামাজিক রীতি এই যে কোনো ঋতুস্নাতা রমণী কোনো সক্ষম পুরুষের কাছে যদি সন্তান যাচ্ঞা করে, তবে তাকে নিরাশ করা অধর্ম। এই রীতি, যদ্যপি অধুনা যথেষ্ট প্রচলিত নয়, শুধু প্রয়োজনে গোপনীয়তা রক্ষা করে এই ধর্ম রক্ষা অদ্যাপি করা হয়। কারণ, নারীর ঋতুরক্ষা না হলে প্রজাবৃদ্ধি হয় না, এই সিদ্ধান্ত অতি প্রাচীন। অধুনা প্রজাবৃদ্ধিকরণ যেহেতু কোনো সামাজিক সমস্যা নয়, তাই এই রীতি সমাজে ক্রমশ ক্ষীয়মাণ। কোনো রীতি ক্ষীয়মাণ হতে থাকলেও, তার বিষয়ে ব্যক্তিমানুষের মানসিক কিছু দুর্বলতা থাকে, তাই আমি কুন্তীকে গ্রহণ করি এবং তাঁর গোটা ঋতুকাল ধরেই সে আমার দ্বারা রমিত হয়।

    বিষয়টি মহারাজ পাণ্ডুর অভিপ্রায়সম্মতই ছিল। কিছুদিন বাদে কুন্তী যখন অন্তঃসত্ত্বা হন তখন পাণ্ডু সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি তাঁর দুইপত্নীসহ বানপ্রস্থ গমন করবেন। রাজাবরোধে, পাণ্ডুর অক্ষমতা বিষয়ে কেউই তখনও জ্ঞাত ছিল না। নানা কারণে, বিশেষত নিজ অক্ষমতাজনিত মানসিক অবসাদে, তাঁর এক নির্বেদ উপস্থিত হয়ে থাকবে। তপোবন অঞ্চলে ভিষগাচার্যগণের সান্নিধ্যে থেকে চিকিৎসিত হবার আকাঙ্খাও বোধকরি তাঁর ছিল। সর্বোপরি, সমূহ- অন্তঃস্থাপত্নীর প্রসবাদি লোকচক্ষুর অন্তরালে হোক, এরকম চিন্তাও তাঁর বানপ্রস্থ প্রয়াণের অন্যতম কারণ। কুন্তী আমাকে এবিষয়ে সবই বলেছিলেন এবং তাঁর অভিমতও এই ছিল যে তাঁর সন্তান যেন লোকচক্ষুর অগোচরেই জন্মে।[ ক্ষেত্রজ রীতি গোপনীয় থাকাই এই সময়ে বাঞ্ছনীয় ছিল বলে মনে হয়। তাছাড়া বিদুর শূদ্রীপুত্র, দাসীর গর্ভজাত। তাঁর সামাজিক অধিকার নেই পাণ্ডুর ক্ষেত্রে পুত্র উৎপাদন করার শুধু বর্ণগত কারণে, বিদুর কোনো রাজকন্যার গর্ভজাত হলে এ ব্যাপারে অধিকারী হতেন, এমনকী রাজা হওয়াও তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল না। কিন্তু তাহলে তো গোটা মহাভারতই ভিন্নভাবে লেখা হত | -লেখক| ]

    ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleমহাদেবী – অভীক সরকার
    Next Article দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    Related Articles

    মিহির সেনগুপ্ত

    বিষাদবৃক্ষ – মিহির সেনগুপ্ত

    November 12, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Our Picks

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }