হাড় – সৌমিত্র বিশ্বাস
হাড়
‘বাবা ওই দুর্গম পাহাড়ে উঠব’ বলে রাজা, আমার সাত বছরের ছেলে, এমন চেঁচামেচি জুড়ল যে বাধ্য হয়েই গাড়ি থামাতে হল। নইলে খোলা মাঠের মাঝখানে একটা উঁচু মাটির ঢিবি দেখে কে আর সাধ করে নামতে যাবে?
অন্য সময় হলে হয়তো রাজাকে এক ধমকে থামিয়ে দেওয়া যেত, কিন্তু ওর ছোট্ট করুণ মুখটা দেখে বড্ড মায়া লাগল। মোটে তো এই পাঁচটা দিন আমার কাছে খোলামেলা পরিবেশের মধ্যে থাকবে। কাজেই যা ইচ্ছে করে করুক। তাছাড়া আমাদেরও তো ঘরে ফেরার তাড়া নেই। ঢিবির চুড়োয় বসে সূর্যাস্ত দেখে ফিরলেই বা ক্ষতি কী?
সরকারি চাকরির একটু উঁচু পদে থাকলে একটাই মুশকিল। গোটা পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও জায়গায় বদলি হবার জন্যে তৈরি থাকতে হয়। সেই রীতি অনুযায়ীই আমাকেও কলকাতার বাড়ি আর সংসার ছেড়ে আপাতত মালদাবাসী হতে হয়েছে। সানি পার্কে একটা একতলা ভাড়া নিয়ে একলাই থাকি। এদিকে বিশাখার অফিস আর রাজার স্কুল দুইই কলকাতায়। ফলে ওরা যে আমার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরবে সে উপায় নেই।
যদিও আমি চেষ্টা করি শুক্রবার রাত্তিরে গৌড় এক্সপ্রেস ধরার কিন্তু প্রতি সপ্তাহে তো আর হেড কোয়ার্টার ছেড়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। তাই ফাঁকফোকর পেলেই ওরাও চলে আসে। এখনই যেমন, স্কুলে খৃষ্টমাসের ছুটি পড়তেই দিন পাঁচেকের ছুটি ম্যানেজ করে বিশাখা রাজাকে নিয়ে চলে এসেছে। পরশু রাত্তিরে ওদের ফেরার ট্রেন। গত দুদিনে ওদের নিয়ে প্রচুর ঘুরেছি।
যাই হোক, বায়না শুনে ছোটু গাড়ি দাঁড় করাতেই একলাফে নিচে নেমে তীরের বেগে রাজা দৌড় দিল ঢিবিটার দিকে। পাছে পড়ে যায়, তাই পেছন পেছন আমিও দৌড়োলাম। বিশাখা ধীরেসুস্থে আসছে।
দূর থেকে যাইই মনে হোক, কাছে এসে দেখি ঢিবিটা একদম খাড়া নয়, বেশ হেলানো। ফলে ওপরে উঠতে অসুবিধে হবে না। তবে বেশ উঁচু, অন্তত আট দশ মিটার তো বটেই আর এমনভাবে মাঠটাকে দ্বিধাবিভক্ত করে উত্তর-দক্ষিণে চলে গিয়েছে যে ঠিক যেন একটা পাঁচিল।
আবাদ জমি নয়, এমনিই ফাঁকা মাঠ একটা। মাঝে মাঝে বিবর্ণ নেতানো ঘাসের গুচ্ছ আর শুকনো পাতা। একপাল ছাগল আর গোটা ছয়েক গোরু চরে বেড়াচ্ছে। বাড়িঘর তো দূরের কথা, ত্রিসীমানায় কোনও লোক নেই, এমনকি একটা পাখিও ডাকছে না। যেখান দিয়ে রাজা ওপরে উঠছে, তার খানিকটা আগে একটা বিশাল আমগাছ। মালদার আমবাগানগুলো ইতিমধ্যেই আমার ঘোরা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এত বড় একটা গাছ আমার চোখে পড়েনি আগে।
রাজা তো দৌড়ে উঠে গিয়েছে আর ওকে ধরার জন্যে পেছন পেছন উঠতে গিয়ে সম্পূর্ণ অকারণেই আমার মনে হল ঢিবিটার ওপরে ওঠা বোধ হয় ঠিক হচ্ছে না, নেমে আসি। জায়গাটা হয়তো ভালো নয়। কেমন যেন একটা ভ্যাপসা গন্ধ এসে দম বন্ধ করে দিচ্ছে। এই যে উঁচুতে উঠছি অথচ গায়ে একটুও হাওয়া লাগছে না, এরকম আবার হয় নাকি? হতে পারে যে ওঠার পরিশ্রমে বাতাস টের পাচ্ছি না, কিন্তু তাও কেমন যেন একটা লাগছে।
আর তারপরে ওপরে উঠে সামনে তাকাতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। ঢিবিটার অন্য দিকে একটা বিশাল সরোবর আর তাতে অজস্র অপার পরিযায়ী পাখি ভাসছে। তারও পেছনে আবার আমের বাগান। সেই সব বৃক্ষচূড়ার আড়ালে সূর্য তখন অস্ত যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমাকে ঘিরে চারপাশে সবুজ ঘাস। অথচ ভালোলাগার এই যে অনুভূতি, এটা মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্যেই। তার পরেই আমি বুঝতে পারলাম যে আমার জায়গাটা ভালো লাগছে না। গোটা ছবিটা কোথাও যেন একটু বেখাপ্পা। এমন কিছু যেন একটা রয়েছে এই দৃশ্যপটের মধ্যে, যার জন্যে পরিবেশটা অন্যরকম ঠেকছে, বড্ডই অস্বস্তি হচ্ছে। সেটা কি সারাদিনের পরিশ্রমে নাকি জায়গাটার জন্যে?
‘বা-আ বা-আ-আ’ একটু দূর থেকে রাজা হাতে একটা কী তুলে ডাকল, ‘এই দ্যাখো একটা প্যালিওলিথিক জিনিস পেয়েছি।’
ইতিহাসে প্রাচীন প্রস্তরযুগ পড়ার ফল আর কী। কিন্তু কাছে গিয়ে যেই দেখলাম যে ওর হাতে একটা হাড়ের টুকরো, আমি হাঁ হাঁ করে উঠলাম, ‘কীসের না কীসের হাড়, ফেলে দে, শীগগির ফেলে দে।’
হঠাৎ ধমক খেয়ে ও ঘাবড়ে গিয়ে হাড়টা ফেলে দিল। আর অমনি আমার মুখে কে যেন চাপড় মারল। চমকে উঠে দেখি কী একটা পাখি এত সামনে দিয়ে উড়ে গেল যে মুখে তার ডানার ঝাপট এসে লেগেছে। হয়তো কাকতালীয় কিন্তু আমার গা ছমছম করে উঠল। পা দিয়ে ঠেলে হাড়টা ঢিবি থেকে নিচে গড়িয়ে দিতে যাব, চোখ আটকে গেল তার ওপরে। ভারি আশ্চর্য তো!
নিচু হয়ে হাড়টা তুলে চোখের সামনে এনে ভালো করে দেখি খুদে খুদে লাল অক্ষরে খোদাই করে কী যেন লেখা রয়েছে তার ওপরে। হরফটা চিনতে না পারলেও একটা কিছু যে লেখা রয়েছে সেটা বুঝতে পারছি। কী লেখা? হাড়ের ওপরেই বা কে লিখল আর কেনই বা লিখল? কীসের হাড় এটা? কোনও জন্তু জানোয়ারের? জন্তুর হাড় কি এরকম হয়? নাকি—?
আর সেই সময়ে নিচ থেকে চিৎকার, ‘শীগগির ওখান থেকে নেমে এসো।’
চমকে তাকিয়ে দেখি বিশাখা মরিয়াভাবে হাতছানি দিয়ে ডাকছে আর ওর পাশে একটা বুড়ো। কে বুড়োটা? হাত নেড়ে নেড়ে নেমে যেতে বলছে কেন?
বিশাখা আবার চেঁচিয়ে বলল, ‘জুতো পরে ওখানে উঠতে উনি বারণ করছেন। শীগগির নেমে এসো।’
আমি চট করে হাড়টা পকেটে পুরে বিনা বাক্যব্যয়ে রাজার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামতে থাকলাম। এটা পরে ভালো করে দেখতে হবে।
‘নিচে যাব না আমি’ রাজা চেঁচিয়ে উঠল।
আমি ওকে সামলানোর জন্যে বললাম, ‘তাড়াতাড়ি চল। মাম্মাম জানতে পারলে হাড়টা ফেলে দিতে বলবে। কিছু যেন বলিস না।’
‘না না’ রাজার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল, ‘ওটা আদিম মানুষের হাড়, তাই না বাবা?’
‘হ্যাঁ। তুই খুঁজে বের না করলে কেউ জানতেই পারত না। মাম্মামকে যেন বলিস না।’
একগাল হেসে রাজা ঘাড় নাড়ল, ‘না না।’
নিচে এসে আমি থমকে গেলাম। আমগাছের নিচে বুড়োটা যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার পেছনে ওই ঝুপড়িঘরটা কোথা থেকে এল? যখন ওপরে উঠছিলাম তখন তো বটেই, এমনকি বিশাখা যখন নেমে আসতে বলল, তখনও তো চোখে পড়েনি। চোখের পলকে একটা ঝুপড়ি হঠাৎ গজিয়ে উঠল কী করে? নাকি ওটা গোড়া থেকেই ছিল, আমিই খেয়াল করিনি?
‘দুমদাম করে ওপরে যাবার কী ছিল?’ খুব ঠান্ডা গলায় বিশাখা বলল, ‘সন্ধে নেমে আসছে, ওরকম একটা অজানা জায়গায় না গেলেই নয়?’
আমি আমতা আমতা করে বলতে গেলাম যে রাজা দৌড়লো বলেই না—
কিন্তু কথা শেষ করতে না দিয়ে ও ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘তুমিও কি রাজার বয়েসী? ও দৌড়ে উঠে গেল তো তুমি নামিয়ে আনতে পারোনি? শীগগির চলো এখান থেকে। আমার জায়গাটা একদম ভালো লাগছে না।’
ইতিমধ্যে কখন যে রাজা জুতো খুলে ফেলেছে খেয়াল করিনি। আমাদের কথা চলছে এই ফাঁকে হঠাৎই আমার হাত ছাড়িয়ে আবার দৌড় দিল ঢিবির মাথায়।
‘রাজা, খবরদার ওদিকে যাবে না, রাজা’ বলে বিশাখা চেঁচিয়ে উঠলেও কে কার কথা শোনে! ফলে জুতো খুলে রেখে আমিও ছুটলাম ওপরে এবং রাজার হাতের নড়া ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিচে নামতে থাকলাম।
আর তখনই পায়ে খোঁচাটা লাগল। আর্তনাদ করে বসে পড়েই দেখি সামনে মাটিতে একটা ব্যাঁকানো লোহার মত কিছু গোঁজা রয়েছে যেটাতেই আচমকা পা লেগে কেটে গিয়েছে। ফোঁটা নয়, রক্তের ধারা বেরিয়ে আসতে শুরু করল। আমাকে ওভাবে বসে পড়তে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে বিশাখা জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে?’
ইশারায় ‘কিছু হয়নি’ বলে ক্ষতস্থানে রুমাল চেপে আছি আর সেই ফাঁকে রাজা চেঁচিয়ে ওর মায়ের কাছে চুকলিটা কাটল। ওর বিশ্বাসঘাতকতা দেখে আমি ব্যথিতচোখে একবার ওর দিকে তাকালাম তারপর কোনওরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নামতে থাকলাম।
নিচে নেমে দেখি বুড়োটা হাওয়া হয়ে গিয়েছে আর তার বদলে ঝুপড়ির সামনে একটা মেয়ে। বুড়োটার সঙ্গে মুখের এমন আশ্চর্য মিল যে বোঝাই যাচ্ছে ওই বুড়োরই মেয়ে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই আমি বুঝতে পারলাম যে মুখের মিল টিল নয়, বরং ওই বুড়োটা নিজেই কোনও বিচিত্র উপায়ে কমবয়সী মেয়ে সেজে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এটা কী করে সম্ভব আমি জানি না। কিন্তু আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল।
মেয়েটার গায়ের রং ময়লা হলেও চোখদুটো সাংঘাতিক রকমের উজ্বল। তাকালে মনে হয় শুধু যে ভেতর অবধি দেখে ফেলছে তাইই নয়, সেইসঙ্গে একদম পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে।
আমাদের দেখে রাগত গলায় বলল, ‘ওপরে কেন উঠেছিলেন? জানেন না এটা রাজার-মায়ের-ঢিবি?’
আমি কোনওরকমে বলতে গেলাম, ‘জানতাম না আমরা। ভুল হয়ে গিয়েছে। চলে—‘ কিন্তু মেয়েটা তার আগেই বিশাখার দিকে আঙুল তুলে একটা অদ্ভুত হিসহিস স্বরে বলল, ‘ওইটুকু রক্তে কী হবে? রাজার মায়ের খিদে কি অত সহজে মেটে?’
বিশাখা কোনও কথা না বলে রাজাকে ধরে হাঁটা দিল গাড়ির দিকে। পেছনে খোঁড়াতে খোঁড়াতে আমি। হাঁটছি আর কেবলই মনে হচ্ছে একবার পেছন ফিরে দেখি মেয়েটা কী করছে। দেখিই না একবার। কিন্তু একই সঙ্গে মনের গভীরে কেউ যেন বলতে থাকল, ‘ঢের হয়েছে। আর বোকামি কোরো না। চলে যাও। চলে যাও এই জায়গা ছেড়ে।’
গাড়িতে ওঠার মুখে অন্তরের বাণীকে উপেক্ষা করে আমি পেছনে ফিরে তাকালাম আর দেখলাম মেয়েটা তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকেই। ওর থেকে আমরা কিছু না হোক পঞ্চাশ ষাট মিটার দূরে। অথচ তাও ওর মুখে একটা অদ্ভুত হাসি আমি দেখতে পেলাম। এমনকি ওর দুই চোখে যে গনগন করছে রাগ, এতদূর থেকেও সেটা স্পষ্ট দেখতে পেলাম।
ফেরার পথে গোটা রাস্তা বিশাখার মুখ গম্ভীর। কথাবার্তাও বেশি হচ্ছে না। তার মধ্যে ছোটু ম্যাও ধরেছে, ‘ওখানে না গেলেই পারতেন স্যার। খারাপ হাওয়া লেগে গেলেই তো মুশকিল। নইলে আপনিই বলুন না আপনার পা-টা কাটল কেন?’
আমি বললাম, ‘একটা লোহার গোঁজ মত কিছু ছিল, তাইতে হঠাৎ লেগে গেল।’
‘কিন্তু আপনি একবার নেমে আসার পরেও আবার উঠলেন কেন? আর ঠিক ওই লোহার গোঁজেই পা পড়ল? আসলে খারাপ হাওয়া লেগে গিয়েছে মনে হয়।’
‘খারাপ হাওয়া মানে? বিশাখা প্রশ্ন করল।
ছোটু চুপ করে থাকল যেন শুনতেই পায়নি। আসলে দর বাড়াচ্ছে বা বানাচ্ছে যে কী বলবে। তারপর বলল, ‘শুনেছি ওটা নাকি পুরোনো দিনের কবরখানা।’
বিশাখা ভয়ের শ্বাস টেনে আমার উদ্দেশ্যে বলল, ‘শুনলে তো!’
‘এখনও মাটি খুঁড়লে হাড়গোড় পাওয়া যায়। তার ছোঁয়া লেগে অনেকের নাকি অনেক বিপদ হয়েছে।’
আমি বুঝতে পারলাম খুব ঠান্ডা একটা কিছু আমার শিরদাঁড়া বরাবর চলে যাচ্ছে।
ঝাঁঝিয়ে উঠে বললাম, ‘যদি জানোই তো প্রথমেই বারণ করলে না কেন?’
‘বারণ করার আগেই তো আপনি নেমে গেলেন স্যার’ খুবই বিনীতভাবে ছোটু বলল।
‘তুমি গাড়ি থামাতে গেলে কেন?’ আমি ধমকে উঠলাম, ‘গাড়ি না থামিয়ে তো বলতেই পারতে যে ওটা কবরখানা।’
এর মধ্যে রাজা কী একটা প্রশ্ন করতেই বিশাখা ঠাসঠাস করে চড়িয়ে দিল। আচমকা মার খেয়ে ছেলেটা কেমন থতমত হয়ে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে আর সেই মুহূর্তে আমার মনে পড়ল মেয়েটার কথাটা— ‘রাজার মায়ের খিদে কি অত সহজে মেটে?’
একহাতে রাজাকে জড়িয়ে ধরতেই ও আমার বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে শুরু করল। অন্য হাতে আমি পায়ে রুমাল চেপে আছি। রক্তটা কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না।
তারপর ডাক্তারখানায় গিয়ে ছোট্ট সেলাই, ব্যান্ডেজ আর টিটেনাসের পালা মিটিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন রাত নটা। আর ঠিক পনেরো মিনিট পরেই রাজা বলল যে ওর নাকি খুব শীত করছে এবং কিছু বোঝার আগেই থার্মোমিটার দেখিয়ে দিল টেম্পারেচার ১০২।
আমার তো হাঁটার ক্ষমতা নেই, কাজেই আবার ছোটুকে ফোন। ওর সঙ্গে রাজাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল বিশাখা। ফিরে এসে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে রাজার মাথায় জলপট্টি দিতে থাকল এবং মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে থাকল লাভা। আমি মাথা গুঁজে রেখেছি বালিশে। কোনও কথা বলার তো মুখ নেই।
তারপর জ্বরটা একটু কমতে ও গেল রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে। আমি আধশোয়া হয়ে ঘুমন্ত রাজার কপালে হাত বোলাচ্ছি। হঠাৎ রাজা চোখটা খুলে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, ওই হাড়টা কী করলে?’
জিভ কাটলাম আমি। একদম ভুলে গিয়েছিলাম ওটার কথা। পকেট থেকে বের করে অফিসের ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখতে হবে। এই পা নিয়ে তো আর কাল মিউজিয়াম যাওয়া যাবে না। পরে সময় করে মিউজিয়ামের কিউরেটর সাধনবাবুকে দেখাতে হবে।
রাজাকে বললাম, ‘আমার কাছে আছে। মাম্মামকে কিছু বলোনি তো?’
রাজা জড়ানো গলায় বলল, ‘বাবা ওটা কি মানুষের হাড় ছিল? ওই মাসিটা হাড়টা ফেরৎ চাইছে।’
আমার সর্বশরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। কোনওরকমে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন মাসির কথা বলছ?’
‘ওই যে মাসিটা আমাদের বকছিল’ রাজা আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেও ওর দৃষ্টি অন্য কাউকে দেখছে, ‘বলো না বাবা ওটা কি মানুষের হাড়?’
‘জানি না বাবা’ আমার গলা থেকে স্বর বেরোতে চাইছে না।
‘মাসিটা বলছে যে ওটা নাকি মানুষের হাড় ছিল। খুব বকছে আমাকে। বলছে আমার হাড় ফেরৎ দে, নইলে তোর হাড় নিয়ে নেব। ওটা ফেরৎ দিয়ে দাও, বাবা।’
শুধু গায়ে কাঁটা দেওয়া নয়, আমার বুক ঠেলে তখন কান্না আসছিল। কেন উঠতে গেলাম ওই ঢিবিতে? কী করব এবারে? কে ওই মেয়েটা? কোন অতৃপ্তি নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছে রাজার সামনে? দিব্যি তো খেলছিল, হঠাৎ এরকম জ্বর এল কেন? মেয়েটা কেন বলল যে রাজার মায়ের খিদে সহজে মেটে না? খিদে মেটে না বলে তো আসলে অন্য একটা ইঙ্গিত দেওয়া হয়। ও কি সেরকম কিছু বলতে চেয়েছে? আর ভাবতে পারছি না আমি। রাজার হাতটা টেনে নিজের গালে রেখে বললাম, ‘তুমি মাসিকে বলো যে বাবা বুঝতে পারেনি। তাই ভুল করে নিয়ে এসেছে। আবার ফেরৎ দিয়ে আসবে। আর শোনো, মাকে যেন কিছু বোলো না। মা ভয় পাবে। রাজা রাজা!’
কিন্তু সে আবার নেতিয়ে পড়েছে। আর সেইসঙ্গে আমার পায়ের ব্যথাটাও খুব বেড়েছে। সারারাত বিশাখা ঘুমোলো না। স্থির হয়ে বসে রইল রাজার মাথার কাছে। বুঝতে পারছি নিঃশব্দে কাঁদছে। একবার শুধু আমাকে বলল, ‘কী দরকার ছিল ওই সব জায়গায় যাবার? মেয়েটাই বা কে?’
রাজা অস্ফুটে ডাকল, ‘মা! মাগো, মা!’
ডাকের ভঙ্গিটা এমন যে শুনলেই ভয় করে। আর মাম্মাম ছেড়ে হঠাৎ ‘মাগো’ কেন? ডাকটা কে শেখালো ওকে? বিশাখা ঝুঁকে পড়ল ওর ওপরে,
‘কী বলছ সোনা?’
আমি কাঁটা হয়ে রয়েছি। এক্ষুণি হয়তো হাড়ের কথা বলে বসবে। কিন্তু তার বদলে যেটা বলল তাতে আমাদের দুজনেই একসঙ্গে কেঁপে উঠে পরস্পরের দিকে তাকালাম। বিশাখা ডুকরে কেঁদে উঠেই আমার চুল ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল, ‘কেন? কেন গেলে ওখানে? কেন আমার ছেলেটাকে ওখানে নিয়ে গিয়ে ফেললে?
আমার ততক্ষণে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে কেননা রাজা জিজ্ঞেস করছে, ‘মাগো তোমার খুব খিদে পেয়েছে, না?’
কিন্তু গলার স্বর একদম বয়স্ক মহিলার।
২
সারারাত বিশাখা ঠায় বসে রইল ওর মাথার কাছে। ব্যথা কমানোর জন্যে আমাকে কড়া ওষুধ দিয়েছে, ফলে মাথাটা খুবই ঝিমঝিম করছে। কিন্তু চোখ বন্ধ করে রাখলেও ঘুম আসছে না। আর যদিই বা তন্দ্রামত আসছে অমনি চোখের পাতায় দুটো রাগী গনগনে চোখ ভেসে উঠছে এবং আমি চমকে জেগে উঠছি। এই করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। হঠাৎ বিশাখার আর্তনাদ শুনে চমকে চোখ খুলে দেখি খাটের ওপরে বজ্রাসনে বসে রাজা বিছানায় হাতড়ে হাতড়ে কী যেন খুঁজছে আর বিড়বিড় করছে।
বিশাখা রাজাকে ধরে ঝাঁকুনি দিতে দিতে বলছে, ‘কী হয়েছে সোনা? কী হয়েছে?’
কিন্তু রাজার কোনও বিকার নেই। হাতড়েই চলেছে আর বিড়বিড় করে বলছে, ‘এইখানেই তো ছিল। কোথায় গেল?’
তারপর আবার ধুপ করে শুয়ে পড়ল। আমি উঠে জল খেলাম, তারপর আস্তে আস্তে খাট থেকে নেমে দাঁড়ালাম। উদ্বিগ্ন কন্ঠে বিশাখা বলল, ‘কী হল?’
‘বাথরুম থেকে আসছি।’
‘দাঁড়াও আমি ধরি তোমাকে।’
‘দরকার নেই, পারব। তুমি ছেলেটার কাছে থাকো’ বলে আমি বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে।
‘সাবধানে যেও। পায়ে যেন আবার না লাগে’ পেছন থেকে বিশাখা বলল।
বাথরুমের কাছে গিয়ে মনে হল ভেতরে যেন জলের শব্দ হচ্ছে। বিশাখা কি আসার সময়ে কল বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছে? আলোর সুইচটা দরজার ঠিক পাশে। সেটাতে আঙুল রাখতে যাচ্ছি, দরজাটা নিজেই খুলে গেল এবং মনে হল পাশ দিয়ে যেন কেউ বেরিয়ে গেল, একটা সুগন্ধ ছড়িয়ে। ভয়ের একটা স্রোত আমার শরীর বেয়ে নেমে গেল। একটু চুপ করে থেকে আমি যুক্তি দিয়ে ভাববার চেষ্টা করলাম। সুইচ টিপতে গিয়ে হয়তো অজান্তেই হাতটা দরজার ওপরে পড়ে গিয়ে দরজা খুলে গিয়েছে। নইলে কে আর খুলবে?
তারপর আলো জ্বেলে ভেতরে ঢুকলাম আর পা দুটো যেন জমে গেল। শাওয়ার থেকে ওভাবে জল পড়ছে কেন? ঠিক যেন খোলা শাওয়ার, আমাকে দেখেই বন্ধ করা হয়েছে। গোটা মেঝেতে এমনভাবে জল ছড়ানো যে মনে হচ্ছে যেন কেউ সদ্য চান করে বেরিয়েছে। সাবান এখনও ভিজে এবং তাতে ফেনা লেগে। বেসিনের ওপরের আয়নায় যে টিপটা লাগানো, সেটা কি বিশাখার? কিন্তু আয়নার কোণে না লাগিয়ে ঠিক মাঝখানে তো ও লাগাবে না। এরকম টুকটুকে লাল, চোখের মত দেখতে টিপ তো ও পরে না। সারা ঘরে অদ্ভুত একটা কর্পূরের গন্ধ। শুধু কর্পূর নয়, তার সঙ্গে আরও অনেক কিছু মিশে আছে। আমি নড়তে পারছিলাম না। হয়তো গোটা রাতই ওখানে কেটে যেত, কিন্তু সম্বিত ফিরল বিশাখার আর্তনাদে,
‘কে? ও কে? কে এসেছে আমাদের ঘরে?’
পায়ের ব্যথা ভুলে দৌড়ে গেলাম ঘরে আর সঙ্গে সঙ্গে সেই গন্ধটা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপরে। বিশাখা আলমারির দিকে তাকিয়ে বলে যাচ্ছে কথাটা আর আমার মাথার চুল খাড়া হয়ে যাচ্ছে। আলমারির পাল্লাটা ওরকম আধখোলা কেন? ওর মধ্যেই তো ভেতরের ড্রয়ারে অফিসের ব্যাগে হাড়খানা রাখা আছে।
আমাকে দেখেই বিশাখা কেমন আতঙ্কগ্রস্থের মত বলে উঠল, ‘ওগো কিছু একটা করো। কেউ ঢুকেছে ঘরে।’
আমার নিজের গা শিরশির করতে থাকলেও আমি জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললাম, ‘কে আবার ঢুকবে? কাউকে দেখতে পাচ্ছ?’
‘জানি না’ বিশাখার গলা কাঁপছে, ‘আমি এখানে বসে বসে দেখলাম আলমারির দরজাটা নিজে নিজেই খুলে গেল। ঠিক মনে হল যেন কেউ খুলছে।’
শুনে আমার সারা শরীর কেঁপে উঠল। পায়ে কোনও জোর নেই মনে হচ্ছে। তবুও ওকে সাহস দেওয়ার জন্যে বললাম, ‘নিশ্চয় ঠিকমত বন্ধ করা হয়নি, তাই খুলে গেছে। দাঁড়াও আলোটা জ্বালি।’
বিশাখা প্রবল আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আলো জ্বেলো না। আলো জ্বাললেই তাকে দেখতে পাই যদি!’
‘কাকে?’ আমি কম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
হেঁচকি তুলতে তুলতে বিশাখা বলল, ‘সেই মেয়েটাকে!’
আমি কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। কী করব ভাবছি। তারপর মনে হল যত ভয় তো অন্ধকারে, আলোতে তো আর কোনও ভয় নেই। সুইচ টেপার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যে যেন সূর্য ঝলসে উঠে তার ঝলকানিতে আমার চোখ অন্ধ করে দিল। প্রচণ্ড উত্তাপে গা যেন পুড়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ হবার আগে একঝলক দেখলাম সেই মেয়েটাকে। আলমারির সামনে থেকে সরে এসে দরজার দিকে যাচ্ছে। তার আঁচলের ঝাপটা হাতে লাগতেই সেখানটা যেন পুড়ে গেল।
একটু ধাতস্থ হয়ে যখন চোখ খুললাম তখন কেউ কোত্থাও নেই। মাথার ওপরে টিউব লাইট জ্বলছে। আলমারির দরজাটা এখনও খোলা। আর রাজা আবার উঠে বসেছে বিছানায়। চোখ বন্ধ, কিন্তু হা-হা করে হাসছে। আর আমাদের মাথার চুল খাড়া হয়ে গেল। কেননা ওর গলা দিয়ে একটা বুড়োটে খ্যানখেনে হাসি বেরিয়ে আসছে।
‘এসব কী অলক্ষুণে জিনিস হচ্ছে বাড়িতে’ বিশাখা ভালো করে কথা বলতে পারছে না, ‘তুমি ছোটুকে বলে ব্যবস্থা করো, আমি কালকেই জহুরা মায়ের কাছে পুজো দেব।’
জহুরা কালীর কাছে পুজো দিতে চাইছে দিক। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি যে তার আগে অন্য একটা কাজ আমাকে করতে হবে।
৩
‘আসুন’
বুড়োটা এমনভাবে বলল যেন ও জানত যে আমি আসব। অথচ আমি গোটা রাস্তা ভাবতে ভাবতে এসেছি যে গিয়ে হয়তো দেখব ঝুপড়ি সমেত সেই বুড়ো বা মেয়েটা উধাও। সবটাই হয়তো স্বপ্ন।
‘ছেলে কেমন আছে?’
আমি অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে। রাজার জ্বরের কথা ও কেমন করে জানল?
‘এবার সেরে যাবে’ খুব প্রত্যয় নিয়ে বলল, ‘আজ থেকেই সেরে যাবে।’
‘যদি দোষ হয়ে থাকে ক্ষমা করবেন! আমি জানতাম না যে এটা আসলে’ আমতা আমতা করে ঢিবিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম, ‘পুরোনো কবরখানা। আসলে আমি তো একদম নতুন, মানে—’
‘পুরোনো কবরখানা মানে?’ বুড়োটা অবাক হয়ে আমাকে থামিয়ে দিয়ে হা হা হা হা করে হেসে উঠল। কিছুক্ষণ হাসার পরে বলল, ‘ওটা তো রাজার-মায়ের ঢিবি।’
আমি চুপ করে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে।
‘নৈরাত্মা, বুঝলেন নৈরাত্মা। মানে বোঝেন?’
‘যাঁর আত্মা নেই। জগৎকারণ, নিঃস্বভাব স্বভাবশুদ্ধ অনাদি অনন্ত শূন্য,’ আমি নই, আমার মুখ দিয়ে যেন অন্য কেউ বলল। নইলে আমি আর এসবের কী জানি? কাল রাত্তিরে হাতের যেখানটা জ্বালা করে উঠছিল সেখানকার চামড়া পুড়ে কুঁচকে রয়েছে। যদিও কোনও ফোস্কা পড়েনি। সামনেই মাটিতে আমার আর বুড়ো দুজনেরই ছায়া মিলেমিশে রয়েছে।
‘এই সব জায়গা ছিল রাজা মহেন্দ্রপালের। তখন পাশ দিয়ে নদী বইত। ওই যে পেছনে সরোবর দেখছেন, ওটা আসলে নদীর অংশ। আর ওখানে ছিল—’ ঢিবির দিকে আঙুল দেখিয়ে বুড়ো বলল, ‘—দেবী নৈরাত্মার মন্দির। নীল বর্ণ, গলায় মুন্ডমালা। পায়ের নিচে মড়া। এক হাতে খড়্গ আর অন্য হাতে মানুষের খুলি ভরা রক্ত। ওই মড়ার ওপরে তিনি নৃত্য করেন আর রক্তপান করেন। বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে তাঁর একটা বিশেষ পুজো হত। তার আগের অমাবস্যায় নরবলি দিয়ে, সেখান থেকে ১০৮টা হাড় নিয়ে তাদের ওপরে বীজমন্ত্র লিখে বৈশাখী পূর্ণিমা থেকে রোজ একটা করে মায়ের চরণে দেওয়া হত। ওই ১০৮ হাড়ের মধ্যে মায়ের আশীর্বাদে কোনও একটা হাড় হঠাৎই জেগে উঠত। যিনি সত্যিকারের সাধক, তিনি ওই হাড়ের সাহায্যে সিদ্ধিলাভ করতেন। কিন্তু হেঁজিপেঁজি লোকের হাতে পড়লে ওই হাড় তাদের সর্বনাশ করে ছাড়ত।’
আমার বুক ঢিবঢিব করছিল। মনে হচ্ছিল দম বন্ধ হয়ে আসছে। তবুও বললাম, ‘যে হাড় সিদ্ধিলাভ করায়, সে-ই আবার ক্ষতি করে?’
বুড়ো খুকখুক করে হাসল। তারপর বলল, ‘ষাট পাওয়ারের আলোর জন্যে যদি তুমি ছশো ভোল্ট কারেন্ট দাও, আলোটা কী হবে? কেটে যাবে না?’
আমি মাথা নাড়লাম—হ্যাঁ।
‘যে হাড় তাঁর আবির্ভাব ঘটাতে পারে, সে তো ছ’হাজার ভোল্ট। আর তুমি? জিরো পাওয়ার।’
আমার মুখ দিয়ে একটাও শব্দ বেরোলো না।
‘তারপর একদিন নদীতে বান এল, তুমুল বান,’ বুড়ো আবার বলতে শুরু করল, ‘সমস্ত ভাসিয়ে দিল। জল নেমে যাবার পরে দেখা গেল মন্দির ভেঙে পড়েছে। কেবল মা নৈরাত্মা যেমনকার তেমনিই রয়েছেন। রাজা মহেন্দ্রপাল আবার নতুন করে মন্দির তৈরি করে দিতে গিয়ে রাত্তিরে স্বপ্নাদেশ পেলেন যে মা ওইভাবেই থাকতে চান। সেই থেকে ওভাবেই খোলা আকাশের নিচে মা রয়ে গেলেন। তারপর দিন গেল, তাজা ফুল বাসি হল, মাটি জমে জমে ঢিবি এসে মাকে ঢেকে ফেলেছে। পুজোও হয় না। কিন্তু মাঝে মাঝে মায়ের রক্তপানের ইচ্ছে হয়। তখন অদ্ভুতভাবে মাটি সরে গিয়ে খড়গের খানিকটা বেরিয়ে আসে।’
বুড়ো থেমে গিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল অদ্ভুত দুটো চোখ মেলে। তারপর আবার বলল,
‘সামনে দেখুন শুখা মাঠ। কিচ্ছু নেই। ওপরে সবুজ ঘাস। তবুও কোনও ভেড়া ছাগল গোরু ওপরে ঘাস খেতে ওঠে না। নিচে দেখবেন ছাতারের মেলা। কিন্তু ওপরে একটাও পাখি বসবে না। বলা তো যায় না হঠাৎ যদি মায়ের রক্তপিপাসা জেগে ওঠে। তারাও বোঝে সব।’
বলার ভঙ্গিটা এত সুন্দর যে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসে আছি। বিশ্বাস আর অবিশ্বাস দুপাশ থেকে দুজনেই তখন আমায় ধরে টানাটানি করছে।
তারপর বুড়ো ঝুপড়ি দেখিয়ে আমাকে বলল, ‘আপনার জন্যে ও জিনিস নয়। যান ফিরিয়ে দিয়ে আসুন।’
কাঁচুমাচু মুখে সেলফোন দেখিয়ে বললাম, ‘একটা ছবি তুলব?’
বুড়ো উদাসভঙ্গিতে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল, ‘তুলুন। তবে ভেতরে গিয়ে কোনও ছবি তুলবেন না।’
ব্যাগ থেকে হাড়টা বের করে আস্তে আস্তে ঝুপড়ির সামনে গিয়ে চটি খুলেও দাঁড়িয়ে পড়লাম। ভেতরে ঢুকতে রীতিমত ভয় করছে। কী দেখব কে জানে! ঘাড় ঘুরিয়ে আবার পেছনে তাকালাম। বুড়ো ভেতরে ঢুকে যাবার জন্যে ইশারা করল। চটি খুলে মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকলাম। খোলা জায়গায় দিনের আলো থেকে হঠাৎ করে ভেতরে ঢোকার জন্যেই প্রথমটায় কিচ্ছু দেখতে পেলাম না। তবুও বুঝতে পারছি সামনে একটা বেদীর ওপরে কোনও মূর্তি বসানো রয়েছে। সামনে হাড়খানা রেখে নিচু হয়ে প্রণাম করলাম। মনে মনে বললাম, ‘তোমার জিনিস নিয়ে ভুল করেছিলাম, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো আমায়। আমার একমাত্র সন্তানকে ক্ষমা করো।’
প্রণাম করে মাথাটা তুললাম আর চোখ সয়ে গিয়ে সামনের দৃশ্য দেখে একটা বিকট আর্তনাদ বেরিয়ে এল আমার মুখ থেকে। এটা কী দেখছি আমি? মাটির বেদীতে একটা মালা, ধবধবে সাদা খুলির মালা— এত ছোট যে বোঝাই যায় বাচ্চাদের মাথা। আর তাদের কেন্দ্রে প্রায় ফুট তিনেক উঁচু মা কালীর মুখ। গোটা শরীর নয়, কেবল মুখটুকু।
ওই বসে থাকা অবস্থাতেই ছিটকে বেরোলাম ঘর থেকে। বাইরে ঝকঝক করছে দিনের আলো। আমের ডালে হাওয়ার দোলা। দূরে দাঁড়িয়ে মিঠু, মানে যে ড্রাইভারকে নিয়ে আমি এসেছি, সেলফি তুলছে। কিন্তু আশপাশে কোথাও বুড়োটাকে চোখে পড়ল না। ছিল হয়তো, কিন্তু আমার তখন কোনওদিকে তাকানোর অবস্থা নেই। পড়ি-কি-মরি করে ছুটে এসে মিঠুকে বললাম, ‘শীগগির চলো। শীগগির বাড়ি চলো।’
তারপরেই ফোন করলাম বিশাখাকে। ও কোথায়? রাজাকে নিয়ে জহুরা মায়ের কাছে পুজো দিতে বেরিয়েছে সকালে। কিন্তু পৌঁছেছে কি? ফোন বেজেই যাচ্ছে, ও ধরছে না। আর আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। টেনশনের চোটে মাথাতেই এল না যে হয়তো মন্দিরের ভেতরে রয়েছে বলে মোবাইলটা সাইলেন্ট রয়েছে। খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আমার তখন পাগলের মত অবস্থা। ছোটুকে ফোন লাগালাম। ও-ই তো নিয়ে গিয়েছে ওদের। কিন্তু এই সময়ে ওর মোবাইলও পরিসেবা সীমার বাইরে।
‘শরীর খারাপ লাগছে স্যার?’ উদ্বিগ্নস্বরে মিঠু জিজ্ঞেস করল।
‘না ঠিক আছে। তুমি যত তাড়াতাড়ি পারো বাড়ি নিয়ে চলো।’
আমি অবসন্নের মত পড়ে রইলাম সীটে আর সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা মাথায় বারবার ফিরে আসতে থাকল। বেদীতে আর কিচ্ছু নেই, শুধুমাত্র মা-কালীর মুখটুকু। জিভটা খাড়া বেরিয়ে রয়েছে মাটির সমান্তরাল হয়ে। সামনে পোঁতা দুটো ত্রিশূলের ওপরে ভর দিয়ে রয়েছে সেই জিভ, আর থেকে ঝরে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। গলা ঘিরেও জমে রয়েছে টাটকা রক্ত, যেন এক্ষুনি মাথাটা কাটা হয়েছে। আর, আর মাথাটা কিন্তু মাটির নয়, স্পষ্ট রক্তমাংসের এবং যার মাথা তাকে নিয়ে গত দশ বছর আমি ঘর করছি।
বাড়ি পৌঁছে পাগলের মত বেল দিচ্ছি, কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না। অনন্তকাল পরে বিশাখা দরজা খুলতেই ওকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লাম। আমার মাথায় স্নিগ্ধ হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ও বলল,
‘সব ঠিক হয়ে যাবে। রাজার আর জ্বর নেই। ফেরার পথে ডাক্তার দেখিয়ে এসেছি, উনিও বললেন আর চিন্তার কিছু নেই। আজ আর কাল সারাদিন রেস্ট নিলেই হবে। আমাদের ট্রেন তো রাত্তিরে। তোমার পায়ের ব্যথার কী অবস্থা?’
ও বলে যাচ্ছে আর আমি উদভ্রান্তের মত ওর মাথায় গলায় মুখে হাত বোলাচ্ছি। বিশাখাই তো? কোনটা সত্যি, যে আমার দু বাহুর মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে নাকি বেদীর ওপরে যাকে দেখে এসেছি? সেইসময়ে ছোট্ট পায়ে ধুপধুপ শব্দ করে রাজা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
৪
দিন তিনেক বাদে দুপুরে কনফারেন্স হলে ডি-এম চোরাচালান নিয়ে মীটিং করছেন, হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠল, দেখি সাধনবাবুর ফোন। ডি-এম কড়া চোখে তাকালেন। পরে কল করছি জানিয়ে মেসেজ করে ফোনটা সাইলেন্ট করে দিলাম।
বিশাখারা যে রাত্তিরে চলে গেল, তার পরদিনই সাধনবাবুর সঙ্গে দেখা করে হাড়ের ছবিটা দেখিয়েছিলাম। উনি অনেকক্ষণ ধরে দেখে বলেছিলেন যে ওটা নাকি প্রাচীন সিদ্ধমাতৃকা হরফে লেখা কোনও বীজমন্ত্র। ওই হরফটা নাকি পালযুগে ব্যবহার করা হত।
‘কোথায় পেলেন?’
নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাটুকু বাদ দিয়ে বাকি সবই বললাম। শুনতে শুনতে উত্তেজিত হয়ে সাধনবাবু ঘুসি মেরেছিলেন টেবলে,
‘ওটাকে তো স্থানীয় লোকজন রাজার-মায়ের-ঢিবি বলে। আমার বহুদিনের সন্দেহ যে খনন চালাতে পারলে ওর নিচ থেকে কিছু না কিছু বেরোবেই। গোটা মালদা জেলা তো প্রত্নতত্বের আকর। কিন্তু কাকে বলব? আর্কিওলজিকাল সার্ভেকে অনেকবার চিঠি দিয়েছি কিন্তু…’ হাতের ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন যে কোনও কাজ হয়নি।
আমি একটু ইতস্তত করে বলেছিলাম, ‘ওই বুড়ো বলেছিল যে ওর নিচে নাকি নৈরাত্মাদেবীর মন্দির চাপা পড়ে আছে!’
‘নৈরাত্মা? আর ইউ শিয়র?’ সাধনবাবু আরও উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন, ‘নৈরাত্মার মূর্তি খুব রেয়ার। বৌদ্ধতন্ত্রের দেবী। পালযুগে তো বৌদ্ধতন্ত্রের রমরমা, কাজেই নৈরাত্মার মূর্তি থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু ওই বুড়ো জানল কোত্থেকে যে এর নিচে কী আছে, না আছে? স্মাগলিং ফাগলিং করে নাকি?’
এইবারে কিন্তু আমার বেশ খটকা লাগল। সত্যিই তো বুড়ো অত কিছু জানবে কী করে? আমরা হয়তো বৃথাই ভয় পেয়েছিলাম। একটা বাচ্চার জ্বর আসবে এবং জ্বরের ঘোরে ও ভুল দেখবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। আর আমারও তো একে ঘুম হয়নি, তায় কড়া ওষুধ এবং সেইসঙ্গে রাজাকে নিয়ে টেনশন। কাজেই মনের অবচেতন থেকে কোন ভাবনা বেরিয়ে এসে কোন চেহারা ধরেছিল কে বলতে পারে?
‘অনেকেই মনে করেন হয়তো বা নৈরাত্মার রূপ থেকেই পরবর্তীকালে মা-কালীর ধারণা এসেছে। তবে প্যান্ডেলে ট্যান্ডেলে যে রূপ দেখেন, সেটা নয় কিন্তু। বরং কালীর ভয়ঙ্করী রূপ। এক হিসেবে তো ঠিকই। নৈরাত্মার মতই কালীও তো মহাশূন্যেরই প্রতীক। কোনও রূপ নেই বলে গায়ের রং কালো। কালীপুজোয় যদি থাকেন আপনাকে ঘুরিয়ে দেখাব। অনেক জায়গায় সেই রূপের পুজো হয়। তবে ওখানে যদি সত্যিই ওরকম কিছু থাকে তাহলে বিরাট ব্যাপার হবে। গিয়ে দেখতে হবে তো!’
ডি-এম আলোচনা করছেন কীভাবে চোরাচালান আটকানো যায় আর আমার মাথায় সাধনবাবুর কথাই ঘুরছে তখন। সত্যিই কি ওই হাড়ের কোনও ক্ষমতা আছে? অদ্ভুত কিছু কি সত্যিই ঘটেছিল সেই রাত্তিরে? নাকি বুড়োটা এবং মেয়েটাও কোনও চক্রের সঙ্গে যুক্ত? কিন্তু বেদীতে সজ্জিত সেই কালীর মুখমন্ডল মনে পড়লে তো এখনও কেঁপে উঠি। ওটাও কি সত্যিই দেখেছিলাম, নাকি ওষুধের ঘোরে হ্যালুসিনেশন দেখেছি?
মীটিং যে শেষ হয়ে গিয়েছে সেটা খেয়ালই নেই। হঠাৎই দেখি কনাফারেন্স রুমে আমি একলা। মোবাইল খুলে দেখি মেসেজ ডেলিভারি হয়নি। বরং সাধনবাবুর আরো কয়েকটা মিসডকল। তার মানে ভদ্রলোক হন্যে হয়ে আমাকে খুঁজছেন। কাজেই ওঁকে পাল্টা ফোন করলাম।
‘মশাই ঢিবিটা খুবই ইন্টারেস্টিং। আমার সঙ্গে আর্কিওলজিকাল সার্ভের দুজন অফিসারও রয়েছেন,’ ওঁর উত্তেজিত কন্ঠস্বর ভেসে এল, ‘আমরা এখন ওই ঢিবির মাথাতেই দাঁড়িয়ে রয়েছি। ইতিমধ্যেই একটা স্কালের টুকরো পেয়েছি। তাতেও সেই সিদ্ধমাতৃকা হরফে বীজমন্ত্র।’
আমার মুখ দিয়ে আপনা থেকেই বেরিয়ে এল, ‘জুতো খুলে উঠেছেন তো?’
‘দুর মশাই, জুতো খুলতে যাব কোন দুঃখে? খালি পায়ে কিছু ফুটে টুটে গেলে? যাকগে, যে জন্যে আপনাকে ফোন করা। আপনার সেই বুড়োর কোনও টিকি দেখতে পেলাম না। আর, আপনি আমগাছের তলায় যে ঝুপড়ির কথা বলেছিলেন, সে কোথায়? আমগাছ তো দূরের কথা, একটা আমপাতাও তো দেখছি না।’
মানে? আমগাছ আর ঝুপড়ি উধাও? কী বলছেন উনি? ওঁর কথা শুনে আমার হাত কাঁপতে শুরু করল। আর সেইসময়ে আমাকে একদম অসাড় করে দিয়ে উনি বললেন,
‘এদিক দিয়ে যে নদী যেত, তার পুরোনো মরা খাত আন্দাজ করা যাচ্ছে। কিন্তু আপনি যে সরোবর আর পাখির কথা বলেছিলেন, সেসব তো দেখতে পাচ্ছি না। সঠিক লোকেশনটা বলতে পারবেন? এ হে হে, কী করে লাগল?’
শেষ বাক্যটা অন্য কাউকে উদ্দেশ্য করে। কিন্তু ওই বাক্যটা কানে যেতেই আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল।
ইতিমধ্যে সাধনবাবু বললেন, ‘আর বলবেন না। মাটিতে একটা লোহার গোঁজমত রয়েছে। ভাদুড়িবাবু না দেখে তাতে খোঁচা খেয়েছেন। এঃ! পা কেটে খুব রক্ত বেরোচ্ছে। দাঁড়ান, পরে ফোন করছি আপনাকে।’
ফোন রেখে দেবার পরেও অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। ভাদুড়িবাবু কে, আমি জানি না। কিন্তু যেহেতু তাঁর পা কেটেছে, তাই এরপর কী ঘটবে আমি জানি। সাধনবাবুকে ফোন করে লাভ নেই, কথা বলতে পারবেন না। কাজেই একটা মেসেজ করে দিলাম,
‘বুড়োকে যদি দেখতে না-ও পান, চিন্তা করবেন না। ও নিজেই আপনাকে খুঁজে নেবে।’
