Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    প্রমথনাথ মল্লিক এক পাতা গল্প533 Mins Read0
    ⤷

    ১. নাম ও ইতিহাস

    প্রথম পরিচ্ছেদ – নাম ও ইতিহাস

    ভগবতী কালীর নাম হইতেই কলিকাতার নাম হইয়াছে ইহা সুপ্রসিদ্ধ পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকগণ প্রায় সকলেই মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিয়াছেন। কেবল জনকয়েক অজ্ঞ লেখক ঐ নামের উৎপত্তি “খালকাটা” যা অজ্ঞ ঘেসেড়ার প্রত্যুত্তরে “কালকাটা” হইতে হইয়াছে উল্লেখ করিয়া উপহসিত হইয়াছেন। ওয়ার্ড সাহেবের মতে কালিকাদেবী কলিকাতা হইতে চলিয়া গেলে ঐ নামের উৎপত্তি হয়। এই মত তাহার গ্রন্থের* পরিভাষায় দিয়াছেন। হিন্দু স্থানি কথায় কালিকা—‘থা’ (ছিলেন) এই হইতেই কলিকাতার নামোৎপত্তি হইয়াছে কেহ কেহ বলিয়া থাকেন। মুসলমান রাজত্বকালে হিজলীতে লবণের কারখানা ছিল ও সুন্দরবনের কাষ্ঠ, মোম, মধু লইয়া পশ্চিমের লোকেরা কলিকাতায় ব্যবসা করিত। তাহাদের অনেক কথা ও ছড়া সেকালের অনেক পুরাতন তথ্য নির্ণয় করে। কলিকাতা আধুনিক নয়, ইহার উল্লেখ আইনি আকবরীতে রহিয়াছে, সুতরাং উহার নামের উৎপত্তি “খালকাটা” বা কালকাটা হইতে হয় নাই। কালীঘাটের নাম আইনি আকবরীতে নাই; গোবিন্দপুর বা সুতানটীরও কোন উল্লেখ নাই। বিপ্রদাসের ‘মনসার ভাসানে’ কালীঘাটে দেবীর পূজাদির কথা আছে। উহার পূর্ব্বেই ঐখানে দেবী গিয়াছিলেন। কবিকঙ্কণের চণ্ডীতে কলিকাতার উল্লেখ এইরূপ আছেঃ—

    “ধালিপাড়া মহাস্থান কলিকাতা কুচিনান দুইকুলে বসাইয়া বাট।
    পাষাণে রচিত ঘাট, দুকূলে যাত্রীর নাট, কিঙ্করে বসায় নানান হাট।”

    কালীদেবী কবে কলিকাতা হইতে কালীঘাট যান তাহার সবিশেষ তথ্য অবগত হওয়া দুরূহ, তবে এই পর্য্যন্ত শোনা যায় ও প্রবাদ এই যে, বর্ত্তমান পানপোস্তার উত্তরে দেবীর মন্দির ও পাকা ঘাট ছিল। সেই পুরাতন পাথরের বাঁধান ঘাট হইতে বর্ত্তমান পাথুরিয়াঘাটার নাম হইয়াছে। সেকালে বর্ত্তমান ষ্ট্রাণ্ড রোড গঙ্গার গর্ভে ছিল। কবি কঙ্কণের চণ্ডীতে ঐ ঘাটের উল্লেখ করা হইয়াছে এবং যাত্রীর ও হাটের কথা আছে। বর্ত্তমান ২০৩ নং দরমাহাটা ষ্ট্রীটে ঠিক পানপোস্তার উত্তর, দেবীর পুরাতন মন্দির পূর্ব্বে সেইখানেই বর্ত্তমান ছিল।* কাপালিকেরা দেবীকে কালীঘাটে লইয়া যায়। সেকালে তাহাদিগকে সকলেই বড় ভয় করিত, কারণ তাহারা দেবীর নিকট নরবলি দান করিত। তাহাতে কেহই তাহাদের প্রতিবাদ করিতে সাহসী হইত না। শোনা যায় যে, ঐ স্থানের অধিকারীগণের পূর্ব্বপুরুষ অত্যন্ত পীড়িত হইয়া দেবীর স্বপ্নাদেশে ঐখানে তাঁহার মন্দির ছিল জানিতে পারে ও তাঁহার পূজাদি করিয়া রোগমুক্ত হন। সেই অবধি ঐ বংশের সকলেই পৃথক হইয়া গেলে সকলেই পৃথক পৃথক কালীপূজা করিয়া থাকে। তাহারা দুর্গাপূজা সেরূপ করে না। বর্ত্তমান বসত বাড়ী হইবার পূর্ব্বে ঐখানে সাগর দত্তের পাটের কল ছিল, উহাতে তিনবার আগুন লাগিয়াছিল ও বর্ত্তমান বসত বাড়ীতে কিছুদিন হইল বজ্রাঘাত হয়।

    মুসলমান রাজত্বকালে কলিকাতার নাম দিল্লী, আগ্রার মত বিখ্যাত না হইলেও সে সময়ে বিদ্যমান ছিল ও উহা সরকার সাতগাঁর অধীন বলিয়া আইনি আকবরীতে দেখা যায়। প্রাচীন বসবাসের চিহ্ণ, পোড়া মাটির ও ধাতুর ঘটি, বাটি, খোলা, খাপড়া ফলের বিচি, গাছের পাতা ও গুঁড়ি আদি বর্ত্তমান কলিকাতার দুর্গের গভীরতম কূপে, লাল দিঘি, মনোহরতলা প্রভৃতি পুষ্করিণীর গভীর খাতে পূর্ব্বে পাওয়া গিয়াছে।

    কালীক্ষেত্র। —বেহালা হইতে দক্ষিণেশ্বরের মধ্যবর্ত্তী স্থানকে লোকে তখন কালীক্ষেত্র বলিত, উহা যে কাশীর ন্যায় মহাপুণ্যক্ষেত্র তাহা দেবী ভাগবত উল্লেখ করিয়াছে। আরও সতীর ছিন্নদেহ ভূমিতে পতিত হইয়া পাষাণত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিল উক্ত হইয়াছে। তন্ত্র বিশেষের মতে একান্ন পীঠের মধ্যে কালীক্ষেত্রই শ্রেষ্ঠ। পীঠমালায়েও দক্ষিণেশ্বর হইতে বেহালা পর্য্যন্ত স্থানকে কালীক্ষেত্র বলে। ঐখানে সতীর দক্ষিণ পদের অঙ্গুলি পড়িয়াছিল। কবিকঙ্কণের চণ্ডীতে কালীঘাটের নামোল্লেখ আছে কিন্তু কালীক্ষেত্র বা কালিকা দেবীর কোন উল্লেখ নাই। কালীক্ষেত্রদীপিকা বলিয়া একটি গ্রন্থ আছে, উহা দিল্লির পাঠান রাজাদের সময়ের বলিয়াই বোধ হয়। তখন কালীঘাটের অনতিদূরে দুই এক স্থানে মানুষের বাস ছিল, তদ্ভিন্ন সমস্তই ভীষণ জঙ্গল, কচু, বেত ও গুল্মাদিপূর্ণ ছিল। তখন সেই জঙ্গলের মধ্য দিয়া একটী পথ ছিল উহা কপিলাশ্রমে গিয়া পৌঁছিত। বর্ত্তমান চিৎপুরের রাস্তাকে সেকালে তীর্থযাত্রীর পথ বলিত। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মার্টিন সাহেব দক্ষিণেশ্বরকে সেকালের বাঙ্গালার রাজধানী বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।** বিখ্যাত গুপ্ত রাজাদের পুরাতন মুদ্রা সকল কলিকাতা ও কালিঘাট হইতে পাওয়া গিয়াছে; ঐ সকল এখন বিলাতের British Museum-এর মুদ্রা প্রদর্শনীতে রক্ষিত হইতেছে। গুপ্ত বংশের অধিকার কালে প্রাচ্য ভারতে তান্ত্রিকগণ প্রবল হইয়া উঠেন। উদীয়মান তান্ত্রিকতায় বৌদ্ধ মন্ত্রযান শৈব শাক্ত সম্প্রদায় গা ঢালিয়া দেন। সেই সময়েই বোধ হয় যে, কালী কলিকাতা হইতে কালীঘাটে স্থানান্তরিত হন।* সেই জন্যই বোধ হয় গুপ্তবংশের মুদ্রা সকল কালিঘাটের নিকটে আবিষ্কৃত হইয়াছিল। তখন কাপালিকগণের নরবলি আদি অত্যাচারে কালিঘাট ও কলিকাতা বনজঙ্গলে পরিণত হইয়াছিল। উহার সঙ্গে সঙ্গে কালীক্ষেত্র নামেরও লোপ হইয়াছিল। সেই হইতেই কলিকাতার নাম আরম্ভ হয়, এইরূপ অনুমান করা অসঙ্গত নয়। প্রত্যক্ষমূলক সমস্ত জ্ঞানই আমাদের নিজ প্রত্যক্ষজাত হইতে পারে না। প্রত্যক্ষ জাত ঘটনা পুরুষানুক্রমে প্রাপ্ত প্রবাদ হইতেই পাওয়া যায়।

    পৌরাণিক সমস্যা ও তত্ত্বনির্ণয়

    বর্ত্তমান ভূতত্ত্ববিদ্‌গণের মতে বহুশতাব্দী পূর্ব্বে কলিকাতা ও তৎসন্নিকটস্থ স্থানগুলি সমুদ্র গর্ভে ছিল। কালধর্ম্মে গভীর সমুদ্রতল হইতে যুগান্তর ধরিয়া চর ও বালুকাস্তর দ্বারা বাঙ্গালার ‘ব’ দ্বীপের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হইয়াছে। হিন্দুর ধর্ম্মশাস্ত্রাদি উহার পোষকতা করে ও বাঙ্গালার তীর্থাদির প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে। পণ্ডিত ফারগুসন সাহেবের মতে, ‘দহ’ শব্দ দীপ শব্দের অপভ্রংশ ও কলিকাতার চতুর্দ্দিকে শিয়ালদহ, এড়িয়াদহ, খড়দহ, প্রভৃতির দহ শব্দমূলক স্থান সকল বর্ত্তমান, তাহাতে উহার উৎপত্তি গাঙ্গেয় ‘ব’ দ্বীপের মত হইয়াছিল বলিয়া বোধহয়। বঙ্গ দেশের প্রাচীন রাজারা উহার চারিধারে ‘আল’ দিয়াছিল বলিয়া উহার নাম বাঙ্গালা, উহা আইনি আকবরীতে উল্লেখ আছে। মহাভারতে আছে যে, চন্দ্রবংশের বলিরাজার পাঁচ পুত্রের নাম হইতে তাহাদের রাজ্যের নাম অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্রু ও শুহ্ম হইয়াছিল। ঐতরের ব্রাহ্মণ (২।১।১) বিশ্বামিত্রের পুত্রগণকে পুণ্ড্রু বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। প্রাচীন বেদাদির সময় বঙ্গ বা গঙ্গার নামোল্লেখ নাই। উহা আর্য্য সূর্য্যবংশের রাজাদের কীর্ত্তি। বনবাস কালে রাজা রামচন্দ্র বিশ্বামিত্রের মুখে গঙ্গার উৎপত্তি ও মাহাত্ম্য শুনিয়াছিলেন। তিনি গৌতমাত্মজ শতানন্দের মুখে বশিষ্ঠ কর্ত্তৃক শক ও যবনাদিদ্বারা বিশ্বামিত্রের নিগ্রহবার্ত্তা অবগত হইয়াছিলেন। সগর রাজা সমুদ্র খনন করাইয়াছিলেন বলিয়া উহার নাম সাগর হইয়াছিল। কপিল মুনির আশ্রমে অশ্বমেধযজ্ঞের অশ্ব আহরণ করিতে গিয়া কপিল মুনির শাঁপে সাগর সন্তানেরা ভস্ম হইয়া যান। শেষে ঐ বংশের ভগীরথ গঙ্গাকে আনয়ন করিয়া তাঁহাদিগকে উদ্ধার করেন। গঙ্গার ভাগীরথী নাম সাগর সঙ্গমের মুখেই হইয়াছিল। উহা সেই সময় হইতে আজ পর্য্যন্ত হিন্দুর পরম পবিত্র তীর্থ। রামচন্দ্র পাণ্ডবেরা প্রমুখ সমস্ত হিন্দু রাজারা তীর্থযাত্রায় ঐখানে গিয়াছিলেন। আজ ও প্রতি বৎসর অসংখ্য নরনারী সাধুমোহান্ত গৃহীগণ বহুকষ্ট স্বীকার, এমন কি প্রাণ পর্যন্ত্য পণ করিয়া সেই সাগরসঙ্গমে স্নান ও কপিলদেবের পূজা করিয়া থাকেন। এই সকল পৌরাণিক উপাখ্যানগুলি আধুনিক ভূতত্ববিদ্‌গণের মতের পোষকতাই করে। আরও দেখা যায় যে, মহারাজ মান্ধাতার গৌড় নামে দৌহিত্র ছিল। তিনি যে স্থানে রাজত্ব করেন সেইদেশ তাঁহার নামে গৌড় বলিয়া বিখ্যাত হয়। এই গৌড়ই বঙ্গদেশের প্রাচীন রাজধানী, মালদহ জেলায় অবস্থিত। মহারাজ জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞে গৌড়ব্রাহ্মণেরাই ব্রতী হইয়াছিলেন। প্রাচীন বাঙ্গালার অধিবাসিদের মধ্যে শকযবনাদির আধিক্য থাকিলেও আর্য্য হিন্দু জাতির অভাব ছিল না, কারণ সেকালের বাঙ্গালার রাজারা সকলেই আর্য্য হিন্দু ক্ষত্রিয় জাতি ছিলেন। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মার্টিন সাহেব বাঙ্গালীর বেশভূষার ধাঁজধরণ দেখিয়া উহারা যে আর্য্য হিন্দুজাতি তাহা স্পষ্ট স্বীকার করিয়া গিয়াছেন। রামায়ণ ও মহাভারতও অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গাদি দেশের রাজাদের সহিত প্রাচীন আর্য্যাবর্ত্তের রাজাদের সম্বন্ধ ও বন্ধুত্ব ছিল বলিয়াছে। অঙ্গাধিপতি লোমপাদ রাজা দশরথের ঔরসজাত কন্যা শান্তাকে পালন ও কন্যা বলিয়া গ্রহণ করেন। দেশের দুর্ভিক্ষ দূর করিবার জন্য ঋষ্যশৃঙ্গকে তাঁহার পিতার অনভিমতে কতকগুলি পরমা সুন্দরী বেশ্যা দ্বারা আনাইয়া যজ্ঞাদি করেন ও ঋষির কোপানল হইতে পরিত্রাণ পাইবার জন্য ঋষ্যশৃঙ্গকে সেই পালিত কন্যা শান্তাকে দান করিয়া জামাতা করেন। সেই ঋষ্যশৃঙ্গই রাজা দশরথের পুত্রেষ্টিযজ্ঞ করেন ও তাহাতে রামচন্দ্রাদির জন্মগ্রহণ হইয়াছিল। রাজা দুর্যোধন কলিঙ্গরাজ চিত্রাঙ্গদের কন্যাকে হরণ করিয়াছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে রাজা দুর্য্যোধনের পক্ষে অঙ্গ বঙ্গাধিপতি রাজারা যুদ্ধ করিয়া স্ব স্ব বলবীর্য্যের সবিশেষ পরিচয় দান করিয়াছিলেন। ইহাতেই বেশ বোঝা যায় যে, কেন মন্বাদি শাস্ত্রকারেরা তীর্থ যাত্রা ব্যতিরেকে অঙ্গ বঙ্গাদিদেশে বাস করা নিষেধ করিয়া গিয়াছেন। তখন ঐ সকল দেশে বৈদিক ধর্ম্মাপেক্ষা তান্ত্রিক ধর্ম্মের প্রতি লোকের আস্থা অধিক ছিল। যাহাই হউক, বাঙ্গালার আদিম অধিবাসীরা আর্য্য হিন্দুজাতি। অনার্য্যশকযবনাদি কর্ম্মোপলক্ষে আসিয়া সেইখানে বাস করিত। বাঙ্গালার বর্ণমালা ভারতীয় শ্রেণীভুক্ত। বাঙ্গালার ইতিহাস আজ পর্য্যন্ত যাহা প্রকাশিত হইয়াছে তাহাতে সমগ্র বাঙ্গালা দেশে সেকালে যে কোন একজন রাজা ছিলেন বলিয়া মনে হয় না। তখন ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বণিকেরা নিজ নিজ এলাকায় রাজার মত কার্য্য করিত। গৌড় বঙ্গমাগধের এই দুরবস্থা দূর করিবার জন্য প্রজারা গোপালদেব নামক একজনকে সিংহাসনে বসাইয়াছিলেন, এইরূপ উল্লেখ ইতিহাসে পরিষ্কার আছে।

    গৌড়ীর প্রজারা ক্রমাগত কান্যকুব্জ, গুজরাট ও কামরূপের রাজাগণের আক্রমণ হইতে উদ্ধার করিয়া দেশের অরাজকতা দূর করিবার জন্য এইরূপ করিতে বাধ্য হইয়াছিল। সেই গোপালদেব পাল বংশের প্রথম রাজা। তিনি কেমন করিয়া রাজ্ঞীর চক্রান্ত হইতে নিস্কৃতি লাভ করিয়াছিলেন তাহার সবিশেষ উল্লেখ এইরূপ আছে যে, একজন রাজা প্রতিদিন নির্ব্বাচিত হইত কিন্তু ভূতপূর্ব্ব রাজার পত্নী রাত্রিতে তাহাদিগকে একে একে সংহার করিত। কেবল গোপালদেব তাহার হস্ত হইতে আপনাকে রক্ষা করিয়া অর্দ্ধশতাব্দী কাল রাজত্ব করেন। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক বৌদ্ধ লামা তারানাথের গ্রন্থে উহার বৃত্তান্ত লিখিত আছে। শ্রদ্ধেয় শ্রীরাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘বাঙ্গালার ইতিহাসে’ মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মত এইরূপ প্রকাশ করিয়াছেন যে,* মুসলমান বিজয়ের পূর্ব্বে গৌড়বঙ্গে বর্ত্তমান সময়ের মত জাতিভেদ ছিল না। পালোপধারী ব্যক্তিগণের বংশধরগণ কায়স্থ, তৈলিক কাংস্যবণিক প্রভৃতি বহুনিম্নজাতিতে প্রবেশ করিয়াছিলেন।** যাহাই হউক তখন দেশে ঘোর অরাজকতা, বর্ত্তমান সেইজন্যই উহার কোন ইতিহাসই নাই যে যাহা দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায় যে কলিকাতাদি পরগণা কাহার অধীন ছিল, তবে এ পর্য্যন্ত বলা যায় যে উহা পাল রাজার অধীন হইয়াছিল। পূর্ব্বে উহা গুপ্ত বংশের অধীনে ছিল। খৃষ্টীয় ৮ম শতাব্দীতে জনসাধারণ সেই গুপ্ত বংশের রাজ্যচুতি করে। উহার পরে পাল বংশের অভুদ্যয় হয়। বাঙ্গালার স্থানে স্থানে বৌদ্ধ ও প্রাচীন হিন্দু কীর্ত্তির ধ্বংস বর্ত্তমান আছে।

    সপ্তগ্রাম

    বৌদ্ধ ধর্ম্মের প্রাদুর্ভাব হ্রাস করিবার জন্য বৈদিক ব্রাহ্মণ সমাজ ষড়যন্ত্রের ফলে রাজা হর্ষবর্দ্ধনের পরেই অরুণাশ্ব সিংহাসন অধিকার করেন। সেই হইতেই বৈদিক ব্রাহ্মণ সমাজের কেন্দ্র কান্যকুব্জ হইয়া পড়ে। রায় সাহেব নগেন্দ্রনাথ বসু তাঁহার জাতীয় ইতিহাসে লিখিয়াছেন, “কনোজপতি যশোবর্ম্মা ও গৌড়পতি আদিশূরের উদ্যমে বৈদিক সমাজের পুনঃ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে স্মার্ত্ত ও মীমাংসকগণ আবার নিবন্ধ প্রণয়নে অগ্রসর হইলেন। গুপ্ত ও হর্ষবর্দ্ধন সাম্রাজ্যের ধ্বংসের সহিত প্রকৃত প্রস্তাবে আর্য্যাবর্ত্ত হইতে বৈশ্য প্রভাবাদিলোপের আয়োজন চলিয়াছিল। নিবন্ধকারগণ এই সময় হইতে বৈশ্য সমাজের বিরুদ্ধে লেখনী চালনা করিতে আরম্ভ করিলেন, এমন কি তাহাদের ধর্ম্ম নৈতিক সনাতন অধিকার হইতে তাহাদিগকে বঞ্চিত করিবার জন্য অনেকেই বদ্ধ পরিকর হইয়াছিলেন।” সেই হর্ষবর্দ্ধনের বংশ ও কুটুম্ব আত্মীয়গণ তাহাদের বহুদিন সঞ্চিত ধনরত্ন ও কুলদেবী সিংহবাহিনীকে লইয়া বাঙ্গালার যে কয়খানি গ্রামে বাসারম্ভ করেন কালে তাহাই সপ্তগ্রাম নামে বিখ্যাত হয়। সুপ্রসিদ্ধ প্রত্নতত্ত্ববিৎ উইলফোর্ড সাহেব সপ্তগ্রামের নামের উৎপত্তি সম্বন্ধে ও সেখানে কাহারা থাকিত তাহা উল্লেখ যোগ্যঃ—“হুগলী জেলার অন্তর্গত বত্তর্মান সপ্তগ্রামকে সেকালে “গাঞ্জেস রিজিয়া” বলিত। পুরাকালে উহা রাজন্যবর্গের বাসভূমি ছিল ও ক্রমে ক্রমে বহুজনাকীর্ণ বহুগ্রাম সম্মিলিত হইয়া সমৃদ্ধিশালী নগরে পরিণত হয়। সাতটি সাধুর নামে সাতখানি গ্রাম উৎসর্গীকৃত হওয়ায় উহার নাম সাতগাঁ বা সপ্তগ্রাম হইয়াছিল। পুরাণেও ঐ কথারই পোষকতা করে যে, কান্যকুব্জের** এক নরপতির সাত পুত্র সাত গ্রামে বাস করিত, তাহাতেই উহার নাম সপ্তগ্রাম হইয়াছিল।

    ঐ সকল রাজপুত্রেরা তাহাদের পৈত্রিক ধনরত্ন দ্বারা ব্যবসা করিত। তাহারা ইউরোপে সেইখান হইতে মুক্তাদি রপ্তানি করিত। প্রসিদ্ধ টলেমি ঐ কথা বলিয়া গিয়াছেন। ইউরোপ হইতে তখন সোনা রূপাদি আসিত। সুবর্ণের বিনিময়ে বঙ্গের যাবতীয় বিখ্যাত পণ্যদ্রব্য ও মুক্তাদি লইয়া যাইত। ইহাতেই সেই দেশীয় বণিকেরা, সুবর্ণবণিক আখ্যা লাভ করে। ভারতের আর কোথাও বণিকগণের ঐ নাম নেই। পাঠান রাজত্বকালে সেই রাজ্যবর্দ্ধনের বংশধরেরা সুবর্ণরেখায় স্বর্ণের আবিষ্কার করিয়া “মল্লিক উপাধি ও মল্লিক খালের উভয় পার্শ্বের জমি জাঁইগীর পাইয়াছিলেন। তাহাতেই ঐখানে মুসলমানদিগের টাঁকশাল হইয়াছিল। প্লিনির সময় হইতে পর্ত্তুগীজদের আগমনের পূর্ব্ব পর্য্যন্ত সপ্তগ্রামই বাঙ্গালার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ বন্দর ছিল। ঐতিহাসিক হণ্টার সাহেবও উহার সমর্থন করিয়াছেন। উহা হইতেই বাঙ্গালার নাম সোনার বাঙ্গালা হইয়াছিল। সপ্তগ্রাম রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজ্যাধিকারলোপের পর শতাধিকবৎসর স্বাধীনতা রক্ষা করিয়াছিল। সুতরাং তাঁহার অধীনস্থ স্থান সমূহও বোধ হয় ঐরূপ স্বাধীন ছিল। আইনি আকবরীতে বাঙ্গালার দুইটী বন্দর সপ্তগ্রাম ও হুগলী ইউরোপীয় জাতির অধিকারে ছিল বলিয়া উল্লেখ আছে। মোগলেরা উহাকে বিদ্রোহীর আড্ডা বলিত ও সেইজন্য উহার নাম ‘বুলঘক খানা’ দিয়াছিল। ১৫৭০ খৃষ্টাব্দে সিজার ফ্রেডরিক ভ্রমণ করিতে আসেন। তিনি সপ্তগ্রামে প্রতি বৎসর ত্রিশ পয়ত্রিশ খানি বিদেশী অর্ণবপোত আসিত বলিয়াছেন। পেগুর সহিত সপ্তগ্রামের রজতাদির ব্যবসা বিশেষরূপে চলিত, ঐস্থানের কার্পাস নির্ম্মিত উত্তম বস্ত্র সুমাত্রা মালাক্কা দ্বীপপুঞ্জে ও ভারতের নানাস্থানে প্রচুর পরিমাণে রপ্তানি হইত। ঐ দুই বন্দরে বাণিজ্যের মাশুল বার্ষিক ত্রিশ হাজার টাকা আদায় হইত। সাতগাঁর অন্তর্গত কলিকাতা মকুমা ও বারাকপুরের খাজনা ৯৩৬২১ দাম ছিল। সেকালে টাকার চল্লিশ ভাগের একাংশ তামার পয়সাকে দাম বলিত। আইনি আকবরীর রাজস্ব হিসাবে এই পর্য্যন্তই পাওয়া যায়। উহাতে বারবকপুর দুইটী আছে। রুকনউদ্দিন বারবকশাহ সপ্তগ্রামের শাসনকর্ত্তা ছিলেন। তিনি সুবিচারক ও সুপণ্ডিত ছিলেন। তাঁহার আমলে কেহ প্রকাশ্যে মদ্যপান করিতে পারিত না। তখন জলাভূমির চারিদিকে আল দেওয়া হইত।

    বারাকপুর তাঁহারই স্মৃতি-রক্ষা করিতেছে। বোধ হয় যে, বত্তর্মান বারাকপুর বারবকপুরের অপভ্রংশ মাত্র** ও মকুমা মাকন্দা হইবে। ঘটক কারিকা বলে যে, রাজা আদিশূর ভট্ট নারায়ণকে তীর্থবাস করিবার জন্য কালীঘাট দিয়াছিলেন। আর উহার বংশধরকে বল্লাল কালীক্ষেত্র একদানপত্রে দান করিয়াছিলেন উল্লেখ আছে। ইহাতে বোধ হয় যে কলিকাতা বা কালীক্ষেত্র সরকার সাতগাঁর অধীনে আসিবার পূর্ব্বে আদিশূরের অধীন ছিল। সপ্তগ্রামের আদিম অধিবাসিরা কলিকাতায় আসিয়াছিল ও সপ্তগ্রামের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই কলিকাতার উন্নতি আরম্ভ হয়। কলিকাতার সহিত সপ্তগ্রামের এই ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ব্যবসার সূত্রেই উন্মুক্ত হইয়া যায়।

    কালীর আবির্ভাব ও প্রতিষ্ঠা

    শাস্ত্রকারেরা বলেন যে, পৃথিবীর মঙ্গলের নিমিত্ত সত্যযুগে দেবতারা স্ব স্ব শক্তির সমষ্টিতে আদ্যাশক্তির সৃষ্টি করেন। সংযম শিক্ষা দ্বারা বলসঞ্চয় সমষ্টিতেই হয়। স্ত্রীজাতিই তাহার মূলে বর্ত্তমান। প্রজাপতি দক্ষের কন্যা প্রথমে সমাজশক্তির প্রতিষ্ঠাত্রী। তিনি যেন জগৎকে পাতিব্রত্য ধর্ম্মশিক্ষা দিবার জন্য পিতার যজ্ঞে স্বামীর অযথা নিন্দা শ্রবণ করিয়া আপনার নশ্বর দেহ ত্যাগ করিয়াছিলেন। মহাযোগী শিব পত্নীপ্রেমে মুগ্ধ হইয়া সেই মৃত সতীদেহ স্কন্ধে ধারণ করিয়া বেড়াইতে ছিলেন। তখন বিষ্ণু সেই পবিত্র মৃতদেহ সুদর্শনচক্রে ছিন্নবিছিন্ন করিয়া ভারতবর্ষের নানাস্থানে ফেলিয়া দেন। তাহাতেই সিদ্ধপীঠের সৃষ্টি হয়। তাহাতেই কোথাও অন্নপূর্ণা, কোথাও বগলামুখী, কোথাও চামুণ্ডাদি বিরাজমান। পৃথিবীর যত প্রকার যাগযজ্ঞ আছে তাহার মধ্যে দাম্পত্যপ্রেমই যে শ্রেষ্ঠ তাহা প্রমাণ করিবার জন্যই যেন কালীমূর্ত্তির আবির্ভাব। সাক্ষাৎ ভীষণ কালরূপী ভগবতী হৃদয়ে ভক্ত মুণ্ডমালা ধারণ পূর্ব্বক তাণ্ডবনৃত্যের সহিত ভবানীপতির গুণকীর্ত্তন করিতেছিলেন। তাহাতে পৃথিবী রসাতল যায় দেখিয়া মহাযোগী মৃত্যুঞ্জয় নামের স্বার্থকতা করিবার জন্য যেন কৌশলে ধরাশায়ী হইয়া সেই নৃত্য ভঙ্গ করিয়াছিলেন। তাহাতেই যেন গঙ্গা* শিববেণী ভ্রষ্ট হইয়া প্রবাহিতা। সত্যই ক্রোধে সকলকে স্বর্গ হইতে মর্ত্তে নামাইয়া আনে। তাহাতেই গঙ্গার এইখানেই নাম পরিবর্ত্তন হইয়াছিল। যাহাই হউক, কালীমূর্ত্তি ভীষণ হইলেও যথার্থ ভক্তের চক্ষে উহা অপূর্ব্ব দাম্পত্যপ্রেমের সমুজ্জ্বল আত্মোৎসর্গের চিত্র। কালীদেবীর প্রথম আবিষ্কারাদির কথা প্রবাদ ও কিম্বদন্দীতে বর্ত্তমান, সুতরাং নানা মুনির নানামত, কোন সন্তোষজনক মীমাংসা করিবার উপায় নাই। মূর্তিপূজা বেদাদির সত্যযুগের সময়ের নয় উহা আধুনিক। বর্ত্তমান কালীদেবীর মূর্ত্তি দেখিয়া বোধ হয় যে, যেন উহা যশোহরেশ্বরীর সম-সাময়িক। বেহালায় রাজা বসন্তরায় কৃত অনেক দিঘি ও মন্দিরাদির ভগ্নাবশেষ বর্ত্তমান আছে। তিনিই বর্ত্তমান কালীর মূর্ত্তি ও তাঁহার পুরাতন ** মন্দির সংস্কার করিয়া দেন। বর্ত্তমান কালীর সেবায়েতগণের পূর্ব্ব পুরুষ ভুবনেশ্বর ব্রহ্মচারী রাজা বসন্তরায়ের মঙ্গলকামনায় দেবীর পূজা করিতেন। দেবীর পূজা ও মন্দিরাদির নির্ম্মাণ দ্বারা রাজা বসন্তরায়ের অধিকারই প্রমাণ হয়। আরও বেহালাদি স্থানে তাঁহার নির্ম্মিত অন্যান্য মন্দিরাদি উহাই স্থির করে। পরবর্ত্তী কালের ঘটনাদিও তাহারাই পোষকতা করে। রাজা বসন্তরায়ের পিতামহ রামচন্দ্র সপ্তগ্রামের কাননগুহের সেরেস্তায় এক মোহরের কার্য্য করিতেন। রামচন্দ্র ঐ কার্য্য পরিত্যাগ করিয়া গৌড়ে কার্য্য করিতে যান। সেইখানেই তাঁহার সৌভাগ্যোদয় ও দেহান্ত হয়। ১৫৬৩ খৃষ্টাব্দে সুলেমান গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন। বঙ্গের সিংহাসনে মুসলমানের মধ্যে সুলেমানের মত ন্যায়বান বিচক্ষণ পণ্ডিত শাসনকর্ত্তা বসে নাই বলিলেই চলে। তিনি পণ্ডিতমণ্ডলী কর্ত্তৃক পরিবেষ্টিত হইয়া রাজকার্য্য করিতেন, ও বড়ই গুণগ্রাহী ছিলেন। রামচন্দ্রের পুত্রেরা সকলেই তাহাদের পিতার পদ ও মর্য্যাদা নবাবসরকারে অক্ষুণ্ণ রাখেন। ভবানন্দ প্রতিভাবলে নবাবের মন্ত্রী হইয়া পড়েন। রামচন্দ্রের তিন পুত্র, ভবানন্দ, বিশানন্দ ও গুণানন্দ। ভবানন্দের শ্রীহরি ও গুণানন্দের জানকীবল্লভ নবাব সুলেমানের পুত্র দায়ূদের সমবয়স্ক ছিল। তাহারা একসঙ্গে লেখাপড়া ও খেলা করিত। সেই দায়ূদ যখন সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত হন তখন শ্রীহরি ও জানকীবল্লভ যথাক্রমে রাজা বিক্রমাদিত্য ও রাজা বসন্তরায় উপাধিতে সম্মানিত হইয়া আমাত্যপদলাভ করেন। সুলেমানের সময় বঙ্গদেশে সম্রাট আকবরের নামে খুতবা (নামাজ) পঠিত হইত। দায়ূদ উহা রহিত করিয়া নিজ নামে তাহা প্রচলিত করিলেন। বিদ্বান ব্যক্তিগণের সহবাসে ও শিক্ষায় তাঁহার হৃদয়ে স্বাধীনতাকাঙ্ক্ষা প্রবল হইয়া পড়ে। তিনি মন্ত্রিগণকে তাঁহার মনোভাব ব্যক্ত করিলেন। উহাতে দূরদর্শী ভবানন্দ চাঁদখাঁ মছন্দরীর পরিত্যক্ত যশোর আবাদ করিবার জন্য জায়গীর লইলেন ও সেইখানে পরিজনসহ চলিয়া গেলেন। গৌড়ে কেবল শ্রীহরিই রহিলেন। এখানে একটী কথা বলিয়া রাখা আবশ্যক। সুলেমানের রাজত্বকালে বাঙ্গালাদেশে কালাপাহাড়ের আবির্ভাব হয়। একজন ব্রাহ্মণ সন্তান মুসলমান রমণীর রূপৈশ্বর্য্যে মুগ্ধ হইয়া স্বধর্ম্ম ও স্বদেশদ্রোহী হইয়া পড়েন। যে গঙ্গাবংশাবতংস রাজা মুকুন্দদেব অদ্ভুত বিক্রমে মুসলমানগণকে পরাজিত করিয়া সপ্তগ্রাম লুণ্ঠন ও ত্রিবেণীতটে সুপ্রশস্ত ঘাট বিজয়ধ্বজা স্বরূপ প্রস্তুত করিয়াছিলেন, তিনি কালাপাহাড় কর্ত্তৃক পরিচালিত পাঠান সৈন্য কর্ত্তৃক পরাজিত হন। এই সকল যুদ্ধাদিতে বাঙ্গালায় অশান্তি আরম্ভ হইয়াছিল। উড়িষ্যার পুরাতন দেবদেবীর ধ্বংস সেই কালাপাহাড়ই করিয়াছিল। ১৫৭৫ খৃষ্টাব্দে দায়ূদ নিহত ও গৌড় মহামারীতে জনশূন্য হয়। সম্রাট আকবর বিদ্রোহদমন ও বাঙ্গালা জয় করিবার জন্য রাজা তোডরমল্ল ও মুনেম খাঁকে পাঠান। সেই রাষ্ট্র বিপ্লবের সময় রাজা বিক্রমাদিত্য ও বসন্তরায় ছদ্মবেশে নানাস্থানে অবস্থান করিয়া জীবন রক্ষা করিতেছিলেন। প্রবাদ যে ভুবনেশ্বর ব্রহ্মচারীর প্রাসাদে ও উৎসাহে রাজা তোডরমল্লের অনুগ্রহ লাভ করিয়া দায়ূদের পরিত্যক্তে সম্পত্তিতে যশোরাদির শ্রীবৃদ্ধি করেন। গৌড় নগরের মহামারীর পূর্ব্বে ১৫৬৮ খৃষ্টাব্দে রাজা বিক্রমাদিত্যের পুত্র প্রতাপাদিত্যের জন্ম হয়। গৌড়েই তাঁহার জন্ম হয় ও তাহার জন্মকালের ঘটনা ও কোষ্ঠীবিচার করিয়া তাঁহাকে পরিত্যাগ করিতে গেলে রাজা বসন্তরায় বিধির নির্ব্বন্ধে উহা করিতে দেন নাই। প্রতাপাদিত্য দিল্লীতে গিয়া সম্রাট আকবরের দরবারের রাজনীতি শিক্ষা করেন ও মিবারের মহারাণা প্রতাপসিংহ কেমন করিয়া দিল্লীর অধীনতা শৃঙ্খল হইতে বিমুক্ত করিবার জন্য সুখ ও স্বার্থত্যাগ করিয়াছিলেন তাহা শুনিয়া উৎসাহিত হইয়াছিলেন। দিল্লী হইতে ফিরিয়া আসিয়া পিতার মৃত্যুর পূর্ব্বে জমিদারীর দশআনা ভাগ পান। রাজা বসন্তরায় ছয় আনা মাত্র পান। তিনি মোগল বাদশার অধীনতাপাশ ছিন্ন করিবার জন্য কৃতসংকল্প হইলেন, কিন্তু কোন ক্রমেই পিতৃব্য বসন্তরায়কে স্বমতে আনয়ন করিতে পারিলেন না। তাহাতেই তিনি তাঁহাকে ও তাহার কর্ম্মক্ষম পুত্রগণকে হত্যা করেন। তিনি ভবিষ্যতে মোগল আক্রমণ রক্ষা করিবার জন্য সেকালের পাঠান সামন্তগণ ও হিন্দু জমিদারগণকে একমতালম্বী করেন। নদীর উপকূলে মাটির দুর্গাদি নির্ম্মাণ করিয়াছিলেন। ঐরূপ দুর্গ জগদ্দল রায়গড়, মাতলা, বেহালা, মুচিখোলা, শিবপুর, সালকিয়া, চিৎপুর, মূলাজোড় প্রভৃতি স্থানে ছিল।

    মেটিয়াবুরুজ ঐ মাটির বরুজ হইতে মুচিখোলাকে মেটিয়াবুরুজ আজও লোকে বলিয়া থাকে। প্রতাপাদিত্য কালীঘাটে আসিতেন। এইরূপে দেখা যায় যে কলিকাতা ও তৎ সন্নিবেষ্ট স্থান সমূহ প্রতাপাদিত্যের আধিপত্য স্বীকার করিয়াছিল। নৈহাটিতে সেই যশোর রাজবংশের যে গঙ্গাবাস বাটী ছিল তাহার ভগ্নাবশেষ এখনও বিদ্যমান রহিয়াছে। প্রতাপাদিত্যের সহিত কলিকাতার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ।

    গোবিন্দপুর

    প্রতাপাদিত্যের খুল্লতাত রাজা বসন্তরায়ের চিরাভিলষিত উৎকলেশ্বর মহাদেব ও গোবিন্দজী বিগ্রহ আনয়ন করিতে গিয়া সুবর্ণরেখাতটে উৎকল বাসীগণ কর্ত্তৃক আক্রান্ত হন। উহাতে গোবিন্দজীর শ্রীমতি সুবর্ণরেখা পড়িয়া যায় ও তাহা তিনি উদ্ধার করিতে পারেন নাই। সেই গোবিন্দজীকে শ্রীমতির সহিত যশোরে লইয়া যাইবেন বলিয়া কলিকাতায় পাঠাইয়া দেন। তাঁহার একজন কর্ম্মচারী গোবিন্দ দত্ত, দেবীর প্রত্যাদেশে কালিঘাটের নিকটবর্ত্তী কোন স্থানের মাটীর ভিতর হইতে প্রভূত অর্থলাভ করেন ও দেবীর পূজাহোমাদি করিয়া গোবিন্দপুর গ্রাম পত্তন করিয়াছিলেন। ঐ দেবতার নামে ঐ গ্রাম পত্তন করা হয় ও অমনোনীত শ্রীমতির মূর্ত্তিগুলি বেহালা প্রভৃতি স্থানে প্রতিষ্ঠিত করা হয়, দিগ্বিজয় গ্রন্থে ইহার আভাস পাওয়া যায়। সতীশ বাবু বঙ্গীয় সমাজ গ্রন্থে ১৪৩।১৪৪ পৃষ্ঠায় বলেন যে কলিকাতা হইতে ত্রিবেণী পর্য্যন্ত ভগীরথীর পূর্ব্বতট বাসী বহুতর সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ কায়স্থ প্রভৃতি ব্যক্তিগণ রাজা বসন্ত রায়ের প্রভাবে তথায় আসিয়া বাস করেন। বর্ত্তমান পিরালী ঠাকুর গোষ্ঠীর পূর্ব্বপুরুষ পঞ্চানন যশোর হইতে ঐখানে বাস আরম্ভ করেন। ঐখানের নাম পত্তন লইয়া অনেক অযথা দাবীর কথা উল্লিখিত হইয়া থাকে। সাহেবরা তাহা লইয়া উপহাসই করিয়া থাকিবেন। উইলসন ও ষ্টার্ণডেল সাহেব তাহাই করিয়াছেন, কিন্তু কি আশ্চর্য্য! উহা সত্য বলিয়া প্রমাণ করিতে যাওয়া বিড়ম্বনা। শেঠেরা, ও রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বংশধর তাহাদের গৃহদেবতা গোবিন্দজীউ হইতে ও হাটখোলার দত্তরা ও কুমারটুলির মিত্রেরা তাহাদের পূর্ব্বপুরুষ গোবিন্দবাবুর নাম হইতে গোবিন্দপুর হইয়াছে বলিয়া দাবী করেন। ঐ সকল দাবীর সন্তোষজনক কোন প্রমাণ নাই ও তাহা সত্য বলিয়া গ্রহণ করিবার উপায় নাই। যাহাই হউক, টাকীর জমিদার রায় চৌধুরীদের পূর্ব্বপুরুষ ভবানিদাস প্রতাপাদিত্যের কর্ম্মচারী ছিলেন। খুলনা বাগের হাট প্রভৃতির যাবতীয় সম্ভ্রান্ত জমিদারগণ* প্রতাপাদিত্যের প্রদত্ত জমিদারী ভোগ করিতেছেন। ইহাতেই প্রতাপাদিত্যের কোন না কোন কর্ম্মচারী কর্ত্তৃক গোবিন্দপুরের নাম প্রতিষ্ঠা হইয়া থাকিবে সঙ্গত বলিয়াই বোধ হয়।

    যুদ্ধ। সেকালে প্রতাপাদিত্যের সমকক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী কেহই ছিল না। তিনি হিন্দু মুসলমান, ফিরিঙ্গি মগেদের নেতা হইয়াছিলেন। তিনি ধূমঘাটের দুর্গ মধ্যে প্রাসাদাদি করিয়া* রাজ অভিষেকাদি করিয়াছিলেন। রাজা বসন্ত রায়ের হত্যার পর তাহার শিশু সন্তান রাঘবকে তাঁহার মাতা কচুবনে লুক্কায়িত রাখিয়াছিলেন সেইজন্য তাহার নাম কচু রায় হয়। প্রতাপাদিত্য ঐ রাঘবকে সেখান হইতে আনাইয়া আপনার পত্নীকে লালন পালন করিতে দেন। সেই পুত্র রাজা বসন্ত রায়ের জামাতা রূপরাম বসুর সাহায্যে পলায়ণ করিয়া দিল্লীর দরবারে প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে পিতৃ হত্যার অভিযোগ উপস্থিত করেন। সেকালে হিন্দু মুসলমান বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল এবং হিজলিকাঁথির ইশাখাঁর চক্রান্তে ও কৌশলে প্রতাপাদিত্যের হস্ত হইতে কচু রায় উদ্ধার লাভ করে। ইহাতেই প্রতাপাদিত্য হিজলী জয় করিয়া ইশাখাঁকে নিহত করেন। রাজমহল হইতে শেরখাঁ প্রতাপাদিত্যকে বশীভূত করিতে গিয়া পরাস্ত হইলেন। এই সকল সংবাদ সম্রাটের কর্ণগোচর হইলে তিনি এব্রাহিম খাঁকে প্রতাপাদিত্যকে দমন করিবার জন্য পাঠাইয়া দেন। তাঁহার সহিত প্রতাপাদিত্যের বেহালা বড়িশার সন্নিকট কলিকাতার দক্ষিণ রায়গড় দুর্গের নিকট যুদ্ধ হয় ও শেষে প্রতাপের জয়লাভ হয়। মোগলগৌরব আকবর প্রতাপাদিত্যের বিজয় কাহিনীতে মর্ম্মাহত হইয়া কুমার খসরুর শ্বশুর ও তাঁহার প্রধান মন্ত্রী আজিম খাঁকে বহু সৈন্য সমভিব্যাহারে বাঙ্গালায় পাঠাইয়া দিলেন। প্রতাপাদিত্যের নিকট কোনরূপ বাধা না পাইয়া তাঁহারা বত্তর্মান কলিকাতার নিকট শিবির স্থাপন করিয়া উপযুক্ত অবসর প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। অকস্মাৎ রাত্রির ঘোর অন্ধকারে প্রতাপের সৈন্যগণের হাতে সেই প্রসুপ্ত মোগল সৈন্যগণ তাহাদের সেনাপতির সহিত মহানিদ্রায় অভিভূত হইল। প্রাচীন ঘটক কারিকা ঐ যুদ্ধে কুড়ি হাজার মোগল সৈন্যের রক্তপাতের উল্লেখ করিয়াছেন। ইহা অতি রঞ্জিত হইলেও সত্য জয় ঘোষণা করিতেছে। কলিকাতায় সেই মোগল ও বাঙ্গালীর রক্তপাত ও প্রথম যুদ্ধ হইয়াছিল। সেই সময়েই কলিকাতার জঙ্গলের হিংস্র জীবজন্তু ঐ স্থান ত্যাগ করিয়াছিল বা তাহারা সেই সকল মৃতদেহ ও উষ্ণশোনিত পান করিয়া বহুদিনের জঠর জ্বালা নিবৃত্তি করিয়াছিল। এই যুদ্ধে বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে যোদ্ধৃবর্গ উত্তেজিত হইয়া কোন বিজয় পতাকা উড্ডীন করেন নাই, তবে যদি বাঙ্গালার মধ্যে কোথাও তীর্থস্থান থাকে যথায় মোগল সম্রাটের অধীনতা শৃঙ্খল মোচন করিবার জন্য বাঙ্গালী দশ সহস্র আততায়ীকে হত্যা করিয়া প্রাণ বিসর্জ্জন করিয়া ধন্য হইয়াছিল, তবে সেই—এই কলিকাতায়। সেই বিজয় বার্ত্তাই, হিন্দু মুসলমানগণের মধ্যে পার্থক্য শেষ করিয়া একপ্রাণে একযোগে বারভূঞাগণকে একত্রিত করিয়াছিল ও মোগল সম্রাটের প্রবল প্রতাপে ভীত না হইয়া বরং তাহার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ বা কায়মনোবাক্যে বিরুদ্ধাচরণ করিতে কেহই পশ্চাৎপদ হয় নাই। তখন সকলেই জন্মভূমির স্বাধীনতার জন্য ধন, মন ও প্রাণউৎসর্গ করিয়া কৃতার্থ হইয়াছিল। সেই দুঃসহ প্রতাপাদিত্যের বিজয়বার্ত্তা সম্রাটকে শেল সম বিদ্ধ করিল ও সেই মোগল শোণিতপাতের ও পরাজয়ের প্রতিহিংসা কামনায় দ্বাবিংশতি আমিরগণ স্বর্ণপ্রসু বঙ্গভূমিতে মোগল বিজয় বৈজয়ন্তী স্থাপন করিবার জন্য আগমন করে। তাঁহাদের সেই দর্প বশীরহাটের অপরাপারে ইছামতীর তীরে চূর্ণ হইয়াছিল। আজও সেই চিরস্মরণীয় সংগ্রামের বিজয় দুন্দুভি সংগ্রামপুরের নামে নিনাদিত হইতেছে। মোগল কুলগৌরব আকবর আগরার মৃত্যু শয্যায় শায়িত, সেই সময় তাঁহার প্রেরিত দ্বাবিংশ আমিরের পরাজয় ও নিধন সংবাদে ব্যথিত, যে নারকীয় পন্থায় তিনি বিদ্বেষী আমীর ও রাজাগণের জীবন নাশ করিতেন ভুল ক্রমে বিধির বিধানে নিজে সেই বিষাক্ত পান সেবন করিয়া ইহলীলা শেষ করেন। আম্বেরের রাসা গ্রন্থে, টেরী তাহারা ভ্রমণ বৃত্তান্তে ও ঔরঙ্গজেব ইউরোপীয় চিকিৎসক মেনুসী ঐ শোচনীয় মৃত্যুর কথার উল্লেখ করিয়াছেন।

    যাহাই হউক কলিকাতার যুদ্ধে মোগলের পরাজয় ও প্রতাপাদিত্যের বিজয় কলিকাতার নামকে যেন চিরস্মরণীয় করিয়া সর্ব্বত্র প্রথম পরিচিত করে।

    তুলনা ও সমালোচনা।—যতদিন ভূমণ্ডলে স্বাধীনতা রক্ষার আদর ও বীরের সম্মান বর্ত্তমান থাকিবে, ততদিন ভারতে দুই প্রতাপের নাম অক্ষুণ্ণ অমর ও উজ্জ্বল হইয়া থাকিবে। দুইজনেই সম্রাট আকবরের শত্রু—একজন রাজস্থানের মিবার মুকুটমণি বীর কেশরী, মহারাণা প্রতাপ সিংহ, আর একজন বাঙ্গালার নবাব সরকারের উচ্চপদস্থ কর্ম্মচারীর পুত্র, বঙ্গগৌরব প্রতাপাদিত্য। উভয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল প্রভেদ বর্ত্তমান। প্রতাপ সিংহ রাজার সন্তান, শিক্ষিত রণবীর ও বীর প্রভুভক্ত রাজপুত অনুচরগণ পরিবেষ্টিত। আর বাঙ্গালী প্রতাপের সেইরূপ কিছুই ছিল না। বাঙ্গালী প্রতাপাদিত্য নিজ চেষ্টায় সমস্তই করিয়াছিল। হিন্দু খৃষ্টান ও মুসলমানগণকে একত্রিত করিয়া শিক্ষিত মোগল সৈন্য ও তাহাদের সেনাপতিগণকে উপর্য্যুপরি পরাজিত করিয়াছিল। তাহাতেই বাঙ্গালী জাতির রণনৈপুণ্য, সাহস ও বল বীর্য্যের সবিশেষ পরিচয় হইয়াছিল। প্রতাপাদিত্য স্বয়ং দিল্লীতে সম্রাটের ঐশ্বর্য্য ও ক্ষমতার বিষয় দৃষ্টিগোচর করিয়াছিলেন ও বাঙ্গালার মুসলমান অধিপতিরা সম্রাটকে কর দান না করিয়া কেমন করিয়া রাজ্য হারাইয়াছিলেন তাহাও দেখিয়াছিলেন। মনে করিলে, তিনিও অনায়াসে রাজা তোডরমল বা মানসিংহের মত দিল্লীর সম্রাট কর্ত্তৃক বাঙ্গালার শাসনকর্ত্তারূপে সম্মানিত হইতে পারিতেন। কিন্তু সেইখানেই প্রতাপাদিত্যের বিশেষত্ব ও বীরত্ব। রাজপুত বীর প্রতাপ যদি স্বদেশভক্ত বীর কবি বিকানীয়ারাধিপতির ভ্রাতা পৃথ্বীরাজের সৎপরামর্শ ও উৎসাহ না পাইতেন, তাহা হইলে তিনিও আকবরের সহিত প্রস্তাবিত সন্ধিপত্রে বদ্ধ হইতেন। সেই পৃথ্বীরাজের পত্র পাঠ করিলে উহা সম্যক উপলব্ধি করা যায়। তন্নিমিত্ত ঐ পত্রের সার মর্ম্ম সংক্ষেপে সন্নিবেশিত করা হইল। ইহাতে স্বদেশপ্রেম ও ভক্তি যে কি বস্তু, তাহা সম্যক অবগত হইয়া প্রতাপাদিত্যের পাপ পুণ্যের বিচার ও গৌরব যে, কোথায় উহা স্পষ্ট জানা যায়। রাণা প্রতাপ কষ্টে ও দুঃখে অবসন্ন হইয়া সম্রাট আকবরের সহিত সন্ধি প্রার্থনা করিয়া পত্র লেখেন। সম্রাট তাহা পাইয়া বড়ই আনন্দিত ও তাহাতে রাজধানী উৎসবে জাগরিত। বন্দি কবি উক্ত পৃথ্বীরাজ প্রতাপের সন্ধিপত্র প্রার্থনা দেখিয়া উহা জাল বলিয়া উড়াইয়া দেন ও তাহার নির্ণয়ার্থ প্রতাপকে পত্র লিখিবার অনুমতি লাভ করেন। সেই পত্রে তিনি লিখিয়াছেনঃ—

    “আকবর কর্ত্তৃক সকলেই ক্রীত, একমাত্র অবশিষ্ট উদয়ের পুত্র প্রতাপ।” প্রতাপ—অমূল্য, সেই ক্ষত্রিয়ের প্রধানতম পণ্য সকলেই বিনিময় করিয়াছে। যে মহারাণা বিষয় বিভব রাজ্য সকলই ত্যাগ করিয়া জীবন পর্য্যন্ত পণ করিয়া সেই অমূল্য রত্ন রক্ষা করিয়াছেন, শেষে সেই চিতোরও কি সেই হাটে বিকাইবে? যিনি আপনাকে প্রকৃত রাজপুত বলিয়া পরিচয় দেন, তিনি কি আপন মর্য্যাদা নৌরোজায় জলাঞ্জলি দিতে পারিবেন? যদিও তাহা অনেকে করিয়াছেন, কিন্তু সেই কলঙ্ক এখনও হামিরের বংশধরকে স্পর্শ করিতে পারে নাই। সেই অমূল্য রত্ন রক্ষা করিবার জন্য যে অসি নিষ্কাসিত হইয়াছে, উহা কি সমগ্র রাজপুত জাতির কলঙ্কমোচন ও মান সম্ভ্রম বজায় না করিয়াই, কেবল ক্ষণস্থায়ী জীবন ও সুখ দুঃখের জন্য ত্যক্ত হইবে? সকলেই সতৃষ্ণ নয়নে সেইজন্য প্রতাপের দিকে চাহিয়া উৎকণ্ঠিত রহিয়াছে।”

    উহার গূঢ় মর্ম্ম অবগত হইয়া মহারাণা প্রতাপ নৌরোজার সময় দিল্লী আক্রমণ করিয়া পূর্ব্ব সন্ধিপত্র জাল প্রতিপন্ন করেন। স্বদেশ উদ্ধারের জন্য স্বাধীনতাপ্রিয় রাজপুত অমাত্য অকাতরে অর্থদান করিয়া রাণা প্রতাপের উদ্যোগের সহায়তা করিয়াছিলেন। এইরূপ কোনও সুযোগ বাঙ্গালী প্রতাপের ছিল না, তবুও তিনি বারবার মোগলবাহিনী পরাস্ত করিয়াছিলেন। এক জননী ও জন্মভূমি উদ্ধার করিবার চেষ্টায় প্রতাপের পিতৃব্যহন্তাদি শত অপরাধ নষ্ট হইয়াছিল। শাস্ত্রে কর্ত্তব্যপরায়ণ ব্যক্তি যে পথাবলম্বন করিয়াছিলেন, প্রতাপ তাহারই অনুসরণ করিয়াছিলেন মাত্র। প্রহ্লাদ হরি কর্ত্তৃক পিতৃবধের কারণ হইয়াও হরিনাম ত্যাগ করেন নাই, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যুধিষ্ঠির পরমগুরু আত্মীয়গণের ধ্বংসের কারণ হইয়াছিলেন, ভরত শ্রীরামচন্দ্রের সম্মান রক্ষার জন্য মাতার আজ্ঞা পালন করিতে কুণ্ঠিত হন নাই। প্রতাপাদিত্যের কার্য্যসমূহ দেশরক্ষার জন্য অনুষ্ঠিত, সেইজন্য উহা পাপ বলিয়া গণ্য হইতে পারে না। সত্য, বাঙ্গালার প্রতাপকে রাণা প্রতাপের মত দুঃখ দারিদ্র্যের ভীষণ কষ্টভোগ করিতে হয় নাই, কিন্তু তাঁহার অনুগত ও ভৃত্যগণের স্বদেশদ্রোহিতা ও বিশ্বাসঘাতকতায় তাঁহার অস্থিপঞ্জর ভাঙ্গিয়া দিয়াছিল। প্রতাপের রায়গড় কলিকাতা ও সংগ্রামপুরের জয়লাভ, রাণা প্রতাপের হলদিঘাট, দেবীর ক্ষেত্রাদি যুদ্ধের সমতুল্য, বা গ্রীকজাতীয় মারাথান ও থার্ম্মপলির সমান। হায়! আজ পর্য্যন্ত বাঙ্গালায় কোন কবিই প্রতাপাদিত্যের শৌর্য্যবীর্য্য ও জয়ঘোষণা করিয়া কিছুই লিখিলেন না। ঁনবীনচন্দ্র প্রমুখ কবিগণ বাঙ্গালীকে ভীরু আদি ভীষণ অন্যায় চিত্রে অঙ্কিত করিয়া বাঙ্গালী জাতির সর্ব্বনাশ করিয়াছেন। আর সেকালের কবি ভারতচন্দ্র প্রতাপাদিত্যের বীরত্বের কোন কথা না বলিয়া, দেশদ্রোহি মানসিংহের দাস ভবানন্দেরই প্রশংসা করিয়া অন্নদামঙ্গলের সৃষ্টি করিয়াছিলেন। সেই ভবানন্দের উন্নতি অন্নদার বরপুত্র হিসাবে হইয়াছিল বলিয়া, দেশে দুর্নীতি প্রচার ও কুলাঙ্গারের সৃষ্টি করিয়াছিলেন। হায়! সে সময়ের লোকের প্রকৃতি ও রুচি, তখনকার কবির কথায় ও কাব্যে প্রকাশ হইয়া পড়ে। যে নিজের নীচ স্বার্থসিদ্ধির জন্য দেশ ও দশকে দাসত্ব শৃঙ্খলে বদ্ধ করিতে পারে, বীরের ও জমিদারগণের সর্ব্বনাশ করে, তাহাকে কবি অন্নদার বরপুত্র সাজাইয়া গুণাকর উপাধি ও অর্থ লাভের লোভে কর্ত্তব্য ও বিদ্যাবুদ্ধির অপলাপ করিয়াছিলেন, কিন্তু শেষে সত্যকথা বলিয়া ফেলিয়াছিলেনঃ—

    “ক্ষিপ্ত আমি ক্ষোভ কত, ক্ষুণ্ণ কহিয়াছি কত, ক্ষমারূপা ক্ষীণে ক্ষমতা।”

    * * * *

    “কৃষ্ণচন্দ্র নরপতি, করিলেন অনুমতি, সেইমত রচিয়া বিধানে।”

    হায়! গ্রহবৈগুণ্যবশতঃ হিন্দুরা সামাজিক বিষয় লইয়া বিবাদেই দেশের সবর্বনাশ করিয়াছিল। প্রতাপাদিত্যের সহিত তাঁহার জামাতা রামচন্দ্র রায়ের মনোমালিন্য হয়। কেদার রায়ের সহিত শ্রীমন্ত খাঁর মনান্তর হওয়ায় চাঁদ রায়ের পরমা রূপবতী ষোড়শী কন্যা সোনামণি ইশা খাঁর হস্তগত হয়। ইশা খাঁকে কেদার রায় ত্রিবেণীর দুর্গমধ্যে অবরুদ্ধ করিয়া রাখেন। সেই ইশা খাঁ মানসিংহকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে পরাস্ত করেন। ইশা খাঁর মৃত্যুর পর ত্রিপুর ও শ্রীপুরের রাজাগণ সোনার গাঁ আক্রমণ করিলে তাঁহার সেই পত্নী সেনামণি স্বয়ং বীরবিক্রমে দেশ রক্ষার জন্য যুদ্ধ করিয়াছিলেন। ইশা খাঁর পিতা বৈশ্য রাজপুত, অযোধ্যা হইতে বাঙ্গালায় বাণিজ্য করিতে আসিয়া মুসলমান হন। তাঁহার দুই পুত্র—ইশা খাঁ ও ইস্মাইল খাঁ বণিকদিগের নিকট বিক্রীত হন। তাঁহাদের পিতৃব্য কুতব খাঁ তাঁহাদিগকে উদ্ধার করেন ও শেষে তাহারা সোনার গাঁর মালিক হইয়া পড়েন। যাহাই হউক, ইহাতে দেখা যায় যে, সেকালে স্বদেশবৎসল বাঙ্গালী স্ত্রীপুরুষের মধ্যে বীরত্বের উদাহরণের অভাব ছিল না। ঐজন্য বিক্রমপুরের চাঁদ রায়, কেদার রায়, মুকুন্দরাম, সীতারাম প্রভৃতির নাম উজ্জ্বল হইয়া রহিয়াছে। শের শাহের ন্যায় চন্দ্রদ্বীপের রাজা উদয়নারায়ণ একাকী নবাবের প্রস্তাবমত প্রকাণ্ড ব্যাঘ্রকে হত্যা করিয়া নিজ সম্পত্তি উদ্ধার করিয়াছিলেন। রঘুবংশের দিগ্বিজয় বর্ণনায় কবি কালিদাস বাঙ্গালায় জয়স্তম্ভ গঙ্গার মধ্যে স্থাপন করা রঘু রাজারও পক্ষে শ্লাঘার কথা মনে করিয়াছিলেন। সেই বাঙ্গালায় গৌরব বারভূঞার আমল পর্য্যন্ত ক্ষুণ্ণ হয় নাই।

    ইতিহাসে কলিকাতার নিকট প্রতাপাদিত্যের বিজয় ও শত্রুসংহার আজিম খাঁর শিবির আক্রমণে হয়। উহা সেকালের বাঙ্গালার স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনাতেই ঐ যুগের ইতিহাসের প্রথম স্থান অধিকার করে।

    মানব ভোগতৃষ্ণায় অভাব সৃষ্টি করে। সেই কল্পিত অভাবের জন্য দুঃখ ভোগ করে। উহা দূর করিবার জন্য সে একেবারে মুগ্ধ হইয়া পড়ে। উহার জন্য সে কোনরূপ দুষ্কার্য্যকে পাপ বা ঘৃণার কার্য্য মনে করে না। মহাকবিরা তাঁহাদের কাব্যে উহার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখাইয়াছেন। আর কবি ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কি ঠিক তাহারই বিপরীত। ভবানন্দকে দেবীর বরপুত্র সাজাইয়া দেশে কৃতঘ্নতারই প্রশ্রয় দিয়াছিলেন। তাহাতে এদেশে লোকে নীচ শ্বাপদের ন্যায় স্ব স্ব উদরপূরণ করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া অনেক ঘরের টেঁকি কুমীরেরই সৃষ্টি করিয়াছিল। দেবীর সমক্ষে যেমন কাপালিক ও দস্যুরা স্ব স্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্য অবলীলাক্রমে পশু ও নরবলি দান করিত, তেমনি সেকালের সম্রাট হইতে সামান্য জমিদারেরা আপনাদের মনুষ্যত্ব ও আত্মমর্য্যাদা ভুলিয়া গিয়া, কেবল স্বার্থসিদ্ধির লোভে দেশের ও দশের সর্ব্বনাশ করিয়া নররক্তের অপব্যবহারে নরকের ভীষণ বিভীষিকা সৃষ্টি করিতেন। তাহাতেই বোধ হয়, শাস্ত্রে মনোভীষ্ট সিদ্ধির জন্য যজ্ঞে বলিদানাদির ব্যবস্থা ও যজ্ঞের জন্যই পশুগণের সৃষ্টি উক্ত হইয়া থাকে। মনুষ্যকে যুদ্ধে পশুশ্রেণীতে পরিণত করিয়া স্বার্থসিদ্ধির নিমিত্তি উৎসর্গীকৃত করা সেকালের বিদ্যাবুদ্ধি ও জ্ঞানের খর্বতা ভিন্ন আর কিছুই নয়। কিন্তু কি দুঃখের বিষয়! সেই সকল স্বার্থান্ধ ব্যক্তিগণ যদি কবি কর্ত্তৃক অন্নদার বরপুত্র সাজান হয়, তাহা হইলেই বলিতে হয় যে, সে সময় বিদ্যাবুদ্ধি ও জ্ঞানাদি দ্বারা স্বার্থত্যাগে স্বজাতি ও স্বদেশের উন্নতি করা বাঙ্গালায় বাঙ্গালীর ধ্যান ও ধারণার অতীত বিষয় হইয়াছিল। তখন ভারতবাসী বা বাঙ্গালীরা অসভ্য ছিল না। তাহাদের পূর্ব্বপুরুষগণের মধ্যে দেশের ও দশের মঙ্গলের জন্য স্বার্থত্যাগ ও কর্ত্তব্যনিষ্ঠার ভূরি ভূরি উদাহরণ শাস্ত্রাদিতে বর্ত্তমান ছিল; তবে যে তাহাদের ঐরূপ দুর্দ্দশা কেন হইয়াছিল, তাহার মীমাংসা এক যুগমাহাত্ম্য ও কালধর্ম্ম ভিন্ন আর কিছুই হইতে পারে না। লোকে তখন “মন্ত্রের সাধন কিম্বা শরীর পতন” এই মন্ত্রের উপাসনা আরম্ভ করিয়াছিল। তাই তখন কর্ম্মচারীরা প্রভুর উন্নতি বা দেশের মঙ্গলের দিকে না তাকাইয়া কোনরূপে আপনাকে রাজ্য ও সম্পদের অধিকারী করিতে পারিলে যথেষ্ট মনে করিত। হায়! পরাধীন বাঙ্গালী জাতির মধ্যে রাজপুত ভাট বা মার্হাট্টা কবিগণের মত স্বাধীনতার যশঃ কীর্ত্তন না থাকিলেও যে, প্রতাপাদিত্য, কেদার রায়, চাঁদরায়াদির জন্ম হইয়াছিল, ইহা বড়ই বিচিত্র। দীপ নিভিবার পূর্ব্বে একবার যেমন দপ্ করিয়া জ্বলিয়া ওঠে, তেমনিই বোধ হয় ঐরূপ হইয়াছিল। প্রাচীন পৌরাণিক যুগে কলির প্রভাবে অক্ষক্রীড়ায় নল যুধিষ্ঠিরাদি রাজারা রাজ্য দেশ ও স্ত্রী পর্য্যন্ত হারাইত, তেমনি সেকালের সম্রাট হইতে মূর্খ প্রজারা সামান্য গৃহবিবাদে বা সামাজিক মনান্তরে প্রতিশোধ লইবার সঙ্কল্প করিয়া খাল কাটিয়া কুম্ভীর আনিয়া দেশ মজাইয়া দিত। ষড়যন্ত্রই কলিকালের ব্রহ্মাস্ত্র। বিদেশীগণ তাহাতেই দেশের বিপ্লবের সময় দুর্দ্দমনীয় পার্ব্বতীয় বারির ন্যায় ভারতবর্ষ অধিকার করিয়াছিল। তাহাতেই বোধ হয়, শ্রীকৃষ্ণ কালযবনের সঙ্গে যুদ্ধ না করিয়া মথুরা ত্যাগ করিবার উপদেশ দিয়াছিলেন ও দ্বারকায় গমন করেন। শেষে শ্রীকৃষ্ণ কৌশল করিয়া যে পর্ব্বত গুহায় রাজা মান্ধাতার পুত্র মুচকন্দ দেবতার বরে নিদ্রিত ছিলেন, সেইখানে কালযবনকে লইয়া গিয়া মুচকন্দের মস্তকে পদাঘাত দ্বারা তাহার নিদ্রা ভঙ্গ করান ও তাহাতেই দেবতার বরানুযায়ী কালযবন ভস্মীভূত হইয়া যায়। কলিকালে যুদ্ধাপেক্ষা মন্ত্রণাবলই শ্রেষ্ঠ হইয়াছে। দেবী ভগবতী ও ব্রহ্মা বিষ্ণু সেই পথ অবলম্বন করিয়া অসুর নাশ করিয়াছিলেন। তিলোত্তমাই সুন্দ উপসুন্দের নাশের কারণ হয় ও ব্রহ্মার অমর বর বিফল করে। মহাদেবের বরে গার্গ্য অপ্সরা গোপালির গর্ভে কালযবনকে লাভ করেন। তিনি যাদবগণের কুলগুরু ছিলেন ও যাদবগণের কন্যা বিবাহ করেন। তিনি শ্যালকগণ কর্ত্তৃক নপুংসক বলিয়া উপহসিত হইয়া তাহাদিগকে শাসন করিবার জন্য তাহাদের অবধ্য কাল-যবনকে যবনরাজের পোষ্যপুত্র করান। এইরূপে দেখা যায় যে, কলিযুগের সূত্রপাত হইতেই হিন্দুর তপস্যায় ও দেবতার বরে যবন জাতির অভ্যুদয় হইয়াছিল; সেইজন্যই কবি ভারতচন্দ্র ভবানন্দের উন্নতি অন্নদার বরে হইয়াছিল বলিয়াছিলেন। যুগমুখী ব্রাহ্মণ যুগধর্ম্মানুসারে কার্য্য করিয়া দেবীর বরলাভ করিয়াছিলেন।

    যাহাই হউক, আলেক্জাণ্ডার, নেপোলিয়ন বা ক্রমওয়েল মহাবীর হইয়া সাম্রাজ্য স্থাপন করিতে পারেন নাই। সেইজন্য তাঁহারা শার্লমান, ফেড্রেরিক বা পিটারের মত ইতিহাসে উচ্চাসন পান নাই। ভারতে একমাত্র চন্দ্রগুপ্ত তক্ষশীলা হইতে তাম্রলিপ্ত পর্য্যন্ত মগধ সাম্রাজ্য স্থাপন করিয়া উহা পুরুষানুক্রমে স্থায়ী করিয়াছিলেন। প্রতাপাদিত্যের সকল বীরত্ব ও যত্ন সেইজন্যই বিফল হইয়াছিল। বাঙ্গালার স্বাধীনতা স্থায়ী হয় নাই। তিনি চন্দ্রগুপ্তের মত আলেক্জাণ্ডারের বিজিত ভারতাংশ পুনরুদ্ধার করিয়া স্থায়ী রাজ্য স্থাপন করিতে পারেন নাই। সেই সময়েও ভারতে জাতীয়তার সৃষ্টি হয় নাই, তাহার পরেও উহা হইবার কোন সুযোগই হয় নাই, ভিন্ন ভিন্ন জাতি, বংশ, ধর্ম্ম ও ভাষা এক সমাজভুক্ত হইয়া সমুদ্রে সম্মিলিত নদী সমূহের ন্যায় তাহাদের পরস্পর ভিন্ন ভিন্ন জাতিজ্ঞানাদি লোপ করে নাই। এইরূপ দেশে এক স্বজাতিপ্রতিষ্ঠা যে জাতির বলবতী হয়, সেই জাতি অন্য জাতি অপেক্ষা প্রবল ও বলশালী হইয়া পড়ে। উহারই প্রভাবে ইটালি এক রাজ্যভুক্ত হইয়াছিল। ভারতের সে সৌভাগ্যোদয় হয় নাই।

    বাণিজ্য স্বাধীনবৃত্তি। বিশ্বাসের উপর নির্ভর করিয়া উহার উন্নতি ও অবনতি হইয়া থাকে। ব্যবসায়ী বণিকগণ সপ্তগ্রামকে বাঙ্গালার বাণিজ্যকেন্দ্র করিয়া বিদেশী বণিকগণের সহিত সেইখানে ভারতের যাবতীয় সামগ্রীর ব্যবসা করিয়া তাহাদের সহিত সম্মিলিত হইত। তাহাদের সহানুভূতি লাভ করিয়া শাসন-কর্ত্তার অত্যাচার হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিত। তাহাতেই পরাধীন বাঙ্গালী জাতির মধ্যে স্বাধীনতার সৃষ্টি হইয়াছিল। সেই সকল স্বদেশী ও বিদেশী বণিকগণের সাহায্যে প্রতাপাদিত্য মোগল সম্রাটের বিরুদ্ধে সৈন্য সামন্ত সৃষ্টি করিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। প্রতাপাদিত্যের সেই সৎ সাহসের ও বীরত্বের তুলনা নাই। তাহার প্রশংসা না করিয়া কবি ভারতচন্দ্র কেমন করিয়া প্রতাপাদিত্যের মৃত্যু আদি বর্ণনা করিলেন ও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাহার অনুমোদন করিলেন বোঝা যায় না, উহা যে ভবানন্দের মানসিংহকে সাহায্য করার অপেক্ষা শতাংশে অধিক গর্হিত কার্য্য, একথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। হায়! যে রসদাভাবে মহাবীর নেপোলিয়নকে রুশিয়া জয় করার আশা ত্যাগ করিতে হয় সেই দেশবৈরী—সৈন্যগণকে রসদ যোগাইয়া, বাঙ্গালীর কালাপাহাড় বল, আর কালযবনই বল, হায়! ভবানন্দ* অন্নদার বরপুত্র সাজিয়া রাজা জমিদার ও ধনবান্ হইয়াছিলেন। কেমন করিয়া সেই ভবানন্দের উপযুক্ত বংশধর কবিকে দিয়া সেই দুরপনেয় কলঙ্ক কালিমা উজ্জ্বল করিয়া লেখাইয়া রাখিলেন ইহা বিবেক ও বুদ্ধির অগম্য। দুর্য্যোধনাদির চরিত্র যেমন পাণ্ডবগণের চিত্র সমুজ্জ্বল করিয়াছিল, তেমনি ভবানন্দ কচুরায় প্রমুখ রাজা মহারাজা যশোহরজিৎগণ প্রতাপাদিত্য, চাঁদরায়, কেদার রায়, মুকুন্দ রায় প্রভৃতির চিত্রে বাঙ্গালীর গৌরব বৃদ্ধিই করিয়াছিল। তখন যে সকল মগ বোম্বেটিয়া, ফিরিঙ্গি দস্যুদের ভয়ে দেশের লোক কাঁপিত, তাহাদিগকে যাঁহারা সৈন্য ও সেনাপতি করিয়া তাহাদের দ্বারা দেশের দুঃখ দূর করিয়াছিল তাঁহারাইত দেশের যথার্থ হিতৈষী ও রাজা। কি আশ্চর্য্য! বলিতে ও লিখিতে কাহারও লজ্জা হয় যে সেই সকল মূর্খ বিদেশী দেশ বৈরীগণের মধ্যে কেহই প্রতাপাদিত্য প্রমুখ কাহারও বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে নাই। যদি চক্রান্ত বা রসদ দানের পরিবর্ত্তে ভবানন্দ ও কচুরায় প্রতাপের সহিত যুদ্ধ করিত, তাহাতে কাহারও কোন দুঃখ ছিল না, তাহাতে শুধু দেশদ্রোহিতা ও বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় হইত মাত্র। ইহাতেই মনে হয় সেকালে “বীরভোগ্যা বসুন্ধরা” এই কথার মূল্য ছিল না। সেই কাপুরুষ কচুরায় যশোহর লাভ করিয়া যশোরেশ্বরীকে ত্যাগ করিয়াছিলেন। রাজা মানসিংহের রসদ যোগাইয়া যে কেবল ভবানন্দের ভাগ্য ফিরিয়াছিল তাহা নহে। নলডাঙ্গা বাঁশবেড়িয়ার জমিদারদেরও সেই দশা। ঐতিহাসিক ষ্টুয়ার্ট সাহেব স্বদেশদ্রোহী রাজপুতকুলকলঙ্ক রাজা মানসিংহের বীরত্ব অপেক্ষা পতিত্বেরই প্রশংসা করিয়াছেন। তাঁহার পঞ্চদশ শত স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানেরা প্রায় সকলেই বাঙ্গালায় ইহলীলা সংবরণ করিয়াছিল। বাঙ্গালায় তিনি দুইটী পত্নীলাভ করিয়াছিলেন ও তাহাতেই তাঁহার বংশরক্ষা হইয়াছিল। কোচবিহারাধিপতি মহারাজ লক্ষ্মীনারায়ণ তাঁহার ভগ্নী পদ্মেশ্বরীকে মানসিংহকে দেন।* তাহাতেই বোধ হয় জয়পুরের রাজারা “কাছোওয়া” বংশ বলিয়া থাকে। লবকুশের বংশ বলিয়া সে কলঙ্ক দূর করিবার চেষ্টা যতই কেন করা হউক না, এ কথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। যাহাই হউক, বাঙ্গালা বিজয়ে রাজা মানসিংহের পত্নীলাভ ও মানে মানে বংশরক্ষা হইয়াছিল। রাজা মানসিংহের পঞ্চদশ শত পত্নীর সকলেরই দুই তিনটী করিয়া পুত্র ছিল, শেষে তাঁহার মৃত্যুকালে কেবল একমাত্র পুত্র বর্ত্তমান ছিল। মানসিংহের অনেক পত্নী তাঁহার সহমৃতা হন। ইহা নিশ্চয়ই তাঁহার গৌরবের কথা। মানসিংহ বাঙ্গালার যাবতীয় সমাচার ভবানন্দ মজুমদারের নিকট অবগত হন। একথা কবি ভারতচন্দ্র লিখিয়া গিয়াছেন ও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র অনুমোদন করিয়াছেন। তখন তিনি যে বিভীষণের কার্য্য করিয়াছিলেন একথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই।

    “মানসিংহ বাঙ্গালার, যত যত সমাচার, মজুন্দারে জিজ্ঞাসিয়া জানে।”

    ভবানন্দ প্রতাপাদিত্যের অধীনে কার্য্য করিতেন কিনা, তাহাতে আর কি আসে যায়, আজ পর্য্যন্ত রাজারা সকল দেশে গুপ্তচরের কার্য্যে প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা করিয়া থাকে ইহা বলিলেই যথেষ্ট হইবে।

    —

    * (Kalika—‘ut’ = to move)

    * ২৩৫ নং দরমাহাটায় শিবের মন্দির আছে।

    ** (Martin’s Eastern India Vol. 3, P 48.) (Catalogue of Asiatic Indian coins
    Society Journal P. 1 42-44.) (r 884)

    * ১৭৮৩ খ্রীষ্টাব্দে কালীঘাটে আবিষ্কৃত দ্বাদশাদিত্য উপাধিধারী তৃতীয় চন্দ্রগুপ্ত ও চন্দ্রাদিত্য
    উপাধিধারী বিষ্ণুগুপ্তের যথাক্রমে তিনটি ও পনরটি সুবর্ণ মুদ্রা লণ্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়মে
    প্রদর্শিত হইয়াছে।

    * বাঙ্গালার ইতিহাস ১ম ভাগ পৃষ্ঠা ১৪৯।

    * Robertson সম্রাট ফরাকশিয়ারের ফারমন।

    * শাস্ত্রীর প্রতাপাদিত্য পৃঃ ৮৬।

    ** “শিবজটা মুক্ত হয়ে ভাগীরথী নাম লয়ে এখা আসি ত্রিবেণী হইল।

    সরস্বতী যমুনারে মিলাইলা দুইধারে মধ্যভাগে আপনি রহিল।।”

    * বঙ্গীয় সমাজ পৃঃ ১৪৩।

    ** শাস্ত্রীর প্রতাপাদিত্য পৃঃ ৭০। বার ভূঞা পৃঃ ১৭৫। রাম রাম বসুর জীবন চরিত।

    *  “যশোর নগর ধাম, প্রতাপ আদিত্য নাম, মহারাজ বঙ্গজ কায়স্থ?

    নাহি মানে পাতপায়, কেহ নাহি আঁটে তায়, ভয়ে যত ভূপতি দ্বারস্থ।

    তার খুড়া মহাকায়, আছিল বসন্তরায়, রাজা তারে সবংশে কাটিল।

    তার বেটা কচুরায়, রাণী বাঁচাইল তায়, জাহাঙ্গীরে সেই জানাইল।

    ক্রোধ হইল পাতশায়, বান্ধিয়া আনিতে তায়, রাজা মানসিংহে পাঠাইলা।

    বাইশী লস্কর সঙ্গে, কচুরায় লয়ে বঙ্গে, মানসিংহ বাঙ্গালা আইলা।

    * গিয়াছিনু বাঙ্গালায়, ঠেকেছিনু বড় দায়,

    সাত রোজ দারুণ বাদলে।

    বিস্তর লস্কর মৈল, অবেশেষে যাহা রৈল

    উপবাসী সহ দশবলে।

    ভবানন্দ মজুন্দার নাম খুব হুসিয়ার,

    বাঙ্গালী বামুণ একজন।

    * সপ্তাহ খোরাক দিল সকলেরে বাঁচাইল,

    ফতে হৈল ইহারি কারণ।

    সে দেবীর পূজা দিয়া ঝড়বৃ নিবারিয়া,

    যোগাইল সকলে আহার।

    রাজ্য দিব কহিয়াছি, সঙ্গে সঙ্গে আনিয়াছি,

    গোলাম কবুলে পার পায়।

    * বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস।—পৃঃ ১৩৮।৯

    ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleদশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস
    Next Article সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Our Picks

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }