সাইলাস মারনার – ১
এক
র্যাভেলো গ্রামে সাইলাস মারনার নামে এক তাঁতী ছিল। ঐ গ্রামে সে পনেরো বছর ধরে বাস করলেও তার কোন বন্ধু-বান্ধব ছিল না। বড় নিঃসঙ্গ লোক ছিল সাইলাস। অদ্ভুত আচরণের জন্যে গ্রামের সকলে ভয় পেত তাকে।
এই অদ্ভুত লোকটির কিন্তু একটা ‘গোপন দুঃখ ছিল, যার কথা কেউই জানত না।
র্যাভেলো গ্রামে আসার আগে ছোট্ট একটা শহরে বাস করত সে। সেখানেই তাঁত বুনত। বন্ধু-বান্ধবেরও অভাব ছিল না তার। বলা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের লোক ছিল তখন সে। বন্ধুদের সঙ্গে প্রার্থনা-সভায় মিলিত হত সাইলাস। তারা একে অন্যকে ‘ভাই’ বলে ডাকত। তাদের দলের নাম ছিল ‘ভ্রাতৃসংঘ’, সে সময় প্রচণ্ড রকম ঈশ্বর ভক্ত ছিল সাইলাস। তার প্রিয় দুই বন্ধুর একজন ছিল উইলিয়াম ডেন আর অন্যজন সারা। এক বাসায় পরিচারিকার কাজ করত মেয়েটি। সাইলাসের ইচ্ছে ছিল টাকা-কড়ি হলে সারাকে বিয়ে করবে সে।
সাইলাস মারনার উইলিয়াম ডেন আর সারা দু’জনকেই সমান ভালবাসত। তার প্রিয় দুই বন্ধুও একে অপরকে পছন্দ করত। ওদের বন্ধুত্ব দেখে আনন্দ পেত সে।
প্রার্থনা-সভায় একদিন এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ভাববিহ্বল অবস্থায়, মৃত মানুষের মত; প্রায় ঘণ্টাখানেকের জন্যে ঘুমিয়ে পড়ল সাইলাস। ‘ওর আত্মা ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলতে গেছে,’ ভাইরা বলল। কিন্তু তাদের সঙ্গে একমত হল না উইলিয়াম ডেন। মনে তার দুষ্টবুদ্ধি। সে ঘোষণা করল, ‘ওর আত্মা গেছে শয়তানের কাছে।’ সাইলাসের ভাববিহ্বল অবস্থা কাটলে উইলিয়াম তাকে বলল, ‘শয়তানের কাছ থেকে নিশ্চয় বদবুদ্ধি নিয়ে এসেছ?’
প্রিয় বন্ধুর কথায় অত্যন্ত আঘাত পেল সাইলাস। তারপর থেকে দিনকে দিন মনমরা হয়ে পড়ল সে। তার দুঃখ আরও বাড়ল যখন দেখতে পেল ইদানীং তাকে এড়িয়ে চলছে সারা। ক্রমে উইলিয়ামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে মেয়েটি। সাইলাস মারনার উইলিয়ামকে মন থেকে বিশ্বাস করত, ভালবাসত। ও যে সারাকে তার কাছে থেকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে এটা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি সে।
এক রাতে সাইলাস এক মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর শিয়রে বসে ছিল। অসুস্থ লোকটির কেউ ছিল না। ফলে তার বন্ধুরা অর্থাৎ ‘ভাই’রা তার সেবা শুশ্রূষা করত। সেরাতে লোকটির কাছে রাত দুটো পর্যন্ত সাইলাসের থাকার কথা। এবং রাত দুটো থেকে ভোর পর্যন্ত থাকবে, উইলিয়াম ডেন।
বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ আবার আবিষ্ট হয়ে পড়ল সাইলাস। ঘোর কাটতে দেখে রাত চারটে বাজে। উইলিয়ামকে খুঁজল সে। নেই। ওদিকে মারা গেছে অসুস্থ বন্ধুটি। লোকজন ডেকে নিয়ে এল সাইলাস। কিন্তু তার মাথায় একটি চিন্তাই কেবল ঘুরপাক খেতে লাগল, উইলিয়াম এল না কেন?
‘ভাই’রা সবাই এল। মৃত লোকটি একটি কাঠের বাক্সে টাকা- পয়সা রাখত। এটা ভ্রাত সংঘের সকলেই জানে। সৎকারের জন্যে টাকার বন্দোবস্ত করতে হবে। ফলে কাঠের বাক্সটা খোঁজা হল। নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোথাও পাওয়া গেল না একটা কানাকড়ি। সকলের সন্দেহ গিয়ে পড়ল সাইলাসের ওপর।
‘টাকার ব্যাপারে তুমি কিছু জান?’ প্রশ্ন করল একজন।
মাথা নেড়ে বারণ করল সাইলাস। মুখে কথা সরল না তার।
ওর কথা বিশ্বাস করল না কেউ। বলল একজন, ‘ওর বাড়িটা খুঁজে দেখা দরকার। হয়ত আমাদের ডেকে আনার আগে টাকাটা ঘরে লুকিয়ে রেখে এসেছে।’
চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সাইলাস। ওদের কথাগুলো যেন কানেই যায়নি তার। এরা তাকে অবিশ্বাস করছে! অবশেষে মুখ খুলল ও। ‘টাকার কথা কিছু জানা নেই আমার। বিশ্বাস না হলে আমার বাড়ি খুঁজে দেখ। ওখানে আমার নিজস্ব টাকা ছাড়া আর কিছুই পাবে না। উইলিয়াম ডেন জানে সে কথা। ওকে জিজ্ঞেস করে দেখ।’
চোখ বুজল উইলিয়াম। মাথা নাড়ল কেবল, যেন অসম্ভব দুঃখ পেয়েছে।
‘এটা ঠিক,’ বলল সাইলাস। ‘বসে থাকতে থাকতে হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি। হয়ত ঘোরের মধ্যে ছিলাম…চোর এসেছিল তখন।
‘সাইলাস, মিথ্যে বোলো না। পাপ স্বীকার কর। এখনও সময় আছে,’ বলল উইলিয়াম ডেন।
সাইলাস নির্বাক চেয়ে রইল বন্ধুর দিকে। সাইলাসের বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজল ওরা। তার খাটের নিচে পাওয়া গেল কাঠের বাক্সটি। উইলিয়াম ডেনই খুঁজে বার করল। বাক্সটি খুলতেই দেখা গেল টাকা রয়েছে ভেতরে। আর রয়েছে একটা চাকু।
‘আরে, চাকুটা সাইলাসের না?’ বলে উঠল উইলিয়াম ডেন। সকলেই দেখল। হ্যাঁ, এটা সাইলাসেরই চাকু। কারও কোন সন্দেহ রইল না আর।
‘পাপ গোপন থাকে না, বন্ধু, তুমি ধরা পড়ে গেছ,’ সাইলাসকে বলল উইলিয়াম ডেন।
‘উইলিয়াম, তুমি আমাকে ভাল করেই চেন। গত ন’বছরে মিথ্যে বলতে শুনেছ আমাকে? ঈশ্বর জানেন আমি চোর নই। চুরির কথা ভাবতেই পারি না আমি।’
‘ভাই,’ বলল উইলিয়াম, ‘তোমার মনের খবর আমি জানব কিভাবে বল?’
‘বন্ধুর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল সাইলাস। হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার চোখ জোড়া। কাঁপতে লাগল সে। ‘এখন মনে পড়েছে। এ .. চাকু আমি রাখিনি। আমার কাছে থাকার কথা নয় এটা। ষড়যন্ত্র!’
‘তবে টাকার বাক্সে চাকু গেল কিভাবে?’ প্রশ্ন করল অন্যেরা। জবাব দিল না সাইলাস। হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা শুরু করেছে তখন সে।
বন্ধুরা মনে করল ঈশ্বরের কাছে নিজের কৃতকর্মের জন্যে ক্ষমা চাইছে সাইলাস। তারা ওকে চোর ঠাওরাল। চুরির কথা স্বীকার করার জন্যে চাপাচাপি শুরু করল। হুমকি দিল ওদের কথা না শুনলে ‘ভ্রাত সংঘ’ থেকে বার করে দেয়া হবে ওকে।
‘আমি নির্দোষ,’ বারবার একই কথা বলতে লাগল সাইলাস। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করল না তাকে।
সবাই চলে গেল। বেশ অনেকক্ষণ পর সাইলাস পৌঁছল উইলিয়াম ডেনের বাড়িতে। ‘উইলিয়াম,’ বলল সে, ‘আমার মনে পড়েছে সব। গত সপ্তাহে আমার চাকুটা ধার নিয়েছিলে তুমি। আর ফেরত দাওনি। তুমিই বাক্সটা চুরি করেছ। তারপর আমার চাকুটা রেখে দিয়েছ বাক্সে। সারাকে পাওয়ার জন্যে আমার এতবড় সর্বনাশ করলে? কী অপরাধ করেছিলাম আমি তোমার কাছে?’
কথা ক’টা বলে আর অপেক্ষা করল না সাইলাস। মনের দুঃখে এত বেশি কাতর হয়ে পড়েছে সে যে ফিরে গেল বাড়িতে।
বাড়ি ফিরে একাকী বসে রইল। সে রাত এবং পরবর্তী দিনটা বসেই কাটাল। হৃদয় ভেঙে গেছে তার। পাগলপ্রায় অবস্থা। মানুষ এবং ঈশ্বরের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে সে।
ওদিকে সারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে সাইলাসের মত একটা চোরকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
এক মাসের মধ্যে বিয়ে হয়ে গেল উইলিয়াম ডেন আর সারার। ভগ্নহৃদয়ে সেই শহর ছাড়ল সাইলাস। চলে এল র্যাভেলো গ্রামে।
দুই
শহরের বাইরে একটা প্রাচীন পাথরের কূয়া রয়েছে। তার পাশে সাইলাস মারনারের কুটির। নির্জন জায়গা। লোকজন খুব কমই যায় ← ওখানে। তার ওপর গ্রামের লোক সাইলাসের ভয়ে কাবু। তাদের ধারণা এই অদ্ভুত লোকটি আজব সব ক্ষমতার অধিকারী। আর তার এসব. ক্ষমতা এসেছে শয়তানের তরফ থেকে।
পনেরো বছর ধরে তারা সাইলাসকে দেখছে। তবু সাইলাস সম্পর্কে তাদের ধারণা এতটুকু পাল্টায়নি। সে সময় অবশ্য তাঁত বোনা গ্রামবাসীদের অনেকের কাছেই অচেনা এক শিল্প। তাঁত যন্ত্রের শব্দ তাদের অপরিচিত। ছোট ছেলেরা এই শব্দ শোনার জন্যে আসে আবার ভয়ে ছুটে পালায়। মাঝে মাঝে তারা সাইলাসকে দরজায় দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পায়। সাইলাসের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। ফলে লোকজন দেখতে হলে তাকে ভ্রূ কুঁচকে তাকাতে হয়। এতে ছেলেরা আরও বেশি ভয় পায়।
এছাড়াও সাইলাসের রহস্যময় ঘোর তো লেগেই রয়েছে। জেম রডনি নামে এক লোক সাইলাসকে এক সন্ধ্যায় আবিষ্ট অবস্থায় দেখতে পেল। সে গ্রামের সরাইখানায় গিয়ে গল্প করল সবার কাছে। ‘ও গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল,’ বলল জেম। ‘চোখ দুটো খোলা। কিন্তু ঠিক যেন মরা মানুষের দৃষ্টি সে চোখে। কথা বললাম, জবাব দিল না। হাত ধরে দেখি কি একেবারে লোহার মত শক্ত। কাঁধে হাত রাখলাম। ওমা! কোন হুঁশই নেই। ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। আমি তো ভাবলাম মরেই গেছে বোধহয়। তারপর হঠাৎই যেন প্রাণ ফিরে পেল। আমাকে বলে কিনা ‘শুভ রাত্রি’। তারপর হেঁটে চলে গেল।’
এ ঘটনাটাই লোকে রঙ চড়িয়ে বলাবলি করতে লাগল। ফলে সাইলাসের প্রতি লোকের কৌতূহল এবং ভীতি বেড়েই চলল।
সাইলাসের অবশ্য কোন কোন অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তোলার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। গ্রামের মুচির স্ত্রী একবার অসুখে পড়ল। ডাক্তার কিছুই করতে পারল না। মহিলাকে সারিয়ে দিল সাইলাস। গাছ-গাছড়া থেকে ওষুধ বানিয়েছিল সে।
সাইলাসের ক্ষমতা সম্পর্কে সকলেই ওয়াকিবহাল। কেউ কেউ মনে করে এটা ঈশ্বরের দান। কিন্তু বেশিরভাগ লোকেরই ধারণা এটা শয়তানের কাছ থেকে এসেছে।
এরপর থেকে সব ধরনের রোগীই ভিড় জমাতে লাগল সাইলাসের কুটিরে। তাদের দাবি অসুখ সারিয়ে দিতে হবে। সাইলাস অনেক করে বোঝাল যে সে ডাক্তার নয়, তার পক্ষে এসব অসুখ সারানো সম্ভব নয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। তারা আসতেই লাগল। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে উঠল সাইলাস। ফলে কেউ এলেই তাড়িয়ে দেয় সে।
এভাবেই দিন কাটাতে লাগল সাইলাস। বন্ধুহীন। দুঃখ ভোলার জন্যে কঠোর পরিশ্রম করে সে। তার একমাত্র ধ্যান জ্ঞান তার যন্ত্র। সারাদিন আবার কখনও কখনও সারা রাত বসে বসে তাঁত বোনে সে।
তাঁত বুনে প্রচুর পয়সা রোজগার করল সাইলাস। মিতব্যয়িতার কারণে ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল তার সোনা আর রূপার মুদ্রা। এই মুদ্রাগুলোই পরিণত হল সাইলাসের একমাত্র বন্ধুতে। এগুলোই তার আদরের ধন, সবচেয়ে প্রিয়।
প্রথম দিকে মুদ্রাগুলো একটা পাত্রে রাখত সে। তাঁত যন্ত্রের নিচে মেঝেতে একটা গর্ত খুঁড়েছিল সাইলাস। সেখানেই রাখত পাত্রটা। পরে মুদ্রার সংখ্যা বেড়ে গেল অনেক। ছোট পাত্রে আর কুলোয় না। তখন চামড়ার দুটো ব্যাগ বানাল সাইলাস। মুদ্রাগুলো ব্যাগ দুটোতে রাখার ব্যবস্থা করল।
রাতে কাজ শেষে গুপ্তধন বার করে সাইলাস। সোনালী-রূপালী মুদ্রাগুলো তালুতে ঢেলে সেগুলোর ওপর হাত বোলায়। আপন মনে হাসে। সে ভাবে, ‘এত কমে চলবে না। আমার আরও চাই। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর পেরোবে আর আমার মুদ্রার সংখ্যাও বাড়তে থাকবে।’
এভাবেই কেটে গেল সাইলাসের পনেরো বছর। এরপর ঘটল তার জীবনের দ্বিতীয় স্মরণীয় পরিবর্তন।
তিন
র্যাভেলো গ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লোক হচ্ছেন স্কয়্যার কাস। তিনি যদিও ধনী জমিদার কিন্তু মনে সুখ নেই তাঁর। ভদ্রলোকের স্ত্রী মারা গেছেন অনেক বছর আগে। দু’ছেলে বড় হয়েছে আজেবাজে লোকজনের সঙ্গে। ফলে বখে গেছে। ছোট ছেলের নাম ডানস্ট্যান। অলস, নিষ্ঠুর এবং অসৎ লোক হিসেবে পরিচিত সে। বড় ছেলেটি এতদিন ভালই ছিল। ইদানীং বদলে গেছে সেও। গডফ্রেকে দেখলে মনে হয় সর্বক্ষণ কিছু একটা ব্যাপার খোঁচাচ্ছে তাকে। গোপন কোন কিছু। এবং সত্যিই তাই।
ন্যান্সি ল্যামেটার নামে এক মেয়েকে ভালবাসে গডফ্রে। গত কয়েক বছর ধরে। মেয়েটি ভাল বংশের। গ্রামের সবাই অপেক্ষা করে ছিল এদের বিয়ে দেখার জন্যে। গ্রামবাসীদের মতে দু’জনে মানাবে ভাল। ন্যান্সি সুখী করতে পারবে স্বামী আর শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে।
কিন্তু গডফ্রের ইদানীংকার পরিবর্তনের ফলে কথা পাল্টে নিয়েছে সকলে। তাদের ধারণা গডফ্রে তার ছোট ভাইয়ের মত বদ হয়ে গেছে। সে এভাবে চললে ন্যান্সি কিছুতেই তার সঙ্গে বিয়েতে রাজি হবে না।
নভেম্বরের এক বিকেল। সেটা র্যাভেলো গ্রামে সাইলাসের পনেরোতম বছর। গডফ্রে তাদের ‘রেড হাউস’-এর বৈঠকখানায় একাকী বসে রয়েছে। অধীর হয়ে কারও জন্যে অপেক্ষা করছে সে। এসময় দরজা খুলে গেল। ঘরে ঢুকল এক তরুণ। মুখটা লাল হয়ে রয়েছে তার, প্রচুর ওয়াইন টানার ফলে। এই তরুণই ডানস্ট্যান। গডফ্রে ভাইয়ের দিকে ঘৃণাভরে তাকাল।
‘ডেকেছ কেন? কি দরকার?’ প্রশ্ন করল ডানস্ট্যান।
‘ফাউলারের ব্যাপারে, রাগতস্বরে বলল গডফ্রে। ‘ভুলে গেছ? ওর ভাড়াটা আমাকে দিয়েছিল সে। বাবাকে পৌঁছে দেয়ার জন্যে। টাকাটা বাবাকে না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলাম আমি। বলেছিলাম ও ভাড়া দেয়নি। সে টাকা দিয়েছি তোমাকে। এখন বাবা ভাড়ার টাকা চাইছেন। বলেছেন ভাড়া না দিলে ফাউলারকে বার করে দেবেন। এখন টাকাটা তুমি দেবে আমাকে।
‘আমি? আমি দেব?’ নিষ্ঠুরভাবে হেসে বলল ডানস্ট্যান। টাকাটা নিয়েছিলে তুমি। তারপর ধার দিয়েছিলে আমাকে। বাবাকে ওটা তুমিই দিয়ে দিয়ো। তুমি আমার বড় ভাই বলেই না আদর করে টাকাটা দিয়েছিলে…’ হা হা করে হাসতে লাগল ডানস্ট্যান।
ভাইকে মারার জন্যে হাত তুলল গডফ্রে। পিছিয়ে গেল ডানস্ট্যান। ‘সাবধান!’ বলল সে। টাকাটা বাবাকে জলদি ফিরিয়ে দাও, নইলে তোমার সব গোপন খবর ফাঁস করে দেব। মলি ফ্যারেনের মত নিচু বংশের মেয়ে মানুষকে বিয়ে করেছ তুমি। রাবা জানতে পারলে কানটা ধরে বার করে দেবে। সব সম্পত্তি লিখে দেবে আমাকে। একটা ফুটো পয়সাও পাবে না তুমি। তখন মজাটা বুঝবে, ‘ থামল সে। তারপর মৃদু হেসে আবার বলতে লাগল, ‘অবশ্য তুমি যদি আমার কথামত চল তবে বাবাকে কিছুই বলব না আমি। কিন্তু ফাউলারের ভাড়ার টাকা তোমাকেই শোধ করতে হবে।’
‘টাকা পাব কোথায়? আমার কাছে একটা পেনিও নেই। আর তুমি মুখ খুললে আমিও চুপ করে থাকব না। তখন বাবা কেবল আমাকে বার করবে না তোমাকেও তাড়াবে।’
‘নিজেও জান বোকার মত কথা বলছ তুমি। আমার এক কথা, স্কয়্যার কাসের টাকা মেটাতে হবে তোমাকেই।’
‘বললাম না টাকা নেই?’ চিৎকার করে বলল গডফ্রে।
‘তোমার ঘোড়া বেচে দাও।’
‘তাতে সময় লাগবে। বাবা এক্ষুণি টাকা চান।’
‘এক কাজ কর। কালকের হান্ট মীটিং-এ ঘোড়াটাকে নিয়ে যাও। ব্রাইস থাকবে ওখানেই। ওয়াইল্ডফায়ার তার পছন্দের ঘোড়া। ভাল দামে কিনে নেবে।’
‘কিন্তু ওখানে গেলে আটটার আগে ফিরতে পারব না। মিসেস অসগুর্ডের পার্টিতে যেতে দেরি হয়ে যাবে।’
‘হো! হো! এই কথা?’ জোরে হেসে উঠল ডানস্ট্যান। ন্যান্সি সুন্দরীও পার্টিতে যাবে। সেজন্যেই এত উতলা হয়ে রয়েছ তুমি…
রাগে লাল হয়ে গেল গডফ্রে। ‘চুপ করবে?’ চেঁচিয়ে উঠল সে।
‘কেন চুপ করব?’ বাঁকা হেঁসে বলল ডানস্ট্যান। ‘তোমার কপাল ভাল বলতে হবে। খুব বেশিদিন বোধহয় বাঁচছে না মলি। তারপর ন্যান্সিকে বউ বানিয়ে ঘরে নিয়ে আসবে। ও তোমার গোপন কথা জানতেও পারবে না-যদি না আমি বলি। অবশ্য তুমি আমার মনমত চললে তার প্রশ্নই ওঠে না।’
‘শোন, ক্রুদ্ধভাবে বলল গডফ্রে, ‘অনেক হয়েছে। আর নয়। বাবাকে সব বলে দেব আমি। আমি না বললেও একদিন না একদিন মলি জানাবেই। আমাকে সেরকমই বলেছে সে। ওর খরচ আমি আর চালাতে পারছি না, ও আসার আগেই বাবাকে খুলে বলব সব।
‘যা ইচ্ছে করতে পার, আমার কিছু যায় আসে না তাতে, ‘ অবহেলাভরে বলল ডানস্ট্যান। চেয়ারে বসল সে। পা দুটো তুলে দিল অন্য আরেকটায়। আধশোয়া অবস্থায় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল সে। মুখে ক্রূর হাসি।
গডফ্রে নিশ্চুপ। উদ্বেগের ছাপ তার মুখে। ‘বাবা খেদিয়ে দিলে করবটা কী?’ ভাবল সে। ‘কাজকে ঘৃণা করি আমি। কিন্তু তাই করতে হবে তখন। ন্যান্সিকেও হারাব…’ শেষ পর্যন্ত রেগে মেগে বলল সে, ‘না, ওয়াইল্ডফায়ারকে বেচব না আমি।’
‘তারচেয়ে বরং আমি কাল যাই। ঘোড়া বেচে দিয়ে আসি।’
‘তারপর টাকাটা নিয়ে হাওয়া হয়ে যাবে, তাই তো?’
‘ঠিক আছে, বিশ্বাস না করলে আর কী করার আছে। আমি তোমার ভালর জন্যেই বলছিলাম। ফাউলারের টাকাটা তো তোমাকেই দিতে হচ্ছে। সেটা জোগাড় করার একটা উপায় বাতলে দিয়েছিলাম কেবল।
আবার চুপ করে গেল গডফ্রে। খানিক বাদে বলল, ‘আচ্ছা, তুমিই যাও। ঘোড়া বেচে টাকা আমার হাতে দেবে। উল্টো-পাল্টা কিছু করলে ভয়ানক বিপদ হয়ে যাবে-তোমারও, আমারও।
‘ব্রাইসের সঙ্গে কথা বলব। কমপক্ষে একশো বিশ পাউণ্ড দেবে।’
‘ঘোড়ায় চড়া অবস্থায় বেশি টেনো না, পড়ে যেতে পারো। তোমার জন্যে ভাবছি না আমি, ভাবছি ওয়াইল্ডফায়ারের জন্যে।’
‘ভেব না। কাজের সময় গিলি না আমি। আর পড়ে গেলেও ক্ষতি নেই, ব্যথা পাব না। কখনও পাইনি। বড় ভাগ্যবান লোক আমি।
কথাগুলো বলে বেরিয়ে গেল ডানস্ট্যান। দড়াম করে বন্ধ করল দরজাটা। গডফ্রে বসে রইল ভারী মন নিয়ে। মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে রাজ্যের চিন্তা। ন্যান্সিকে প্রচণ্ড ভালবাসে সে, কিন্তু তাকে বিয়ে করা সম্ভব হচ্ছে না। গোপনে মলি ফ্যারেনকে বিয়ে করেছে সে। কিন্তু ক’বছর হল স্ত্রীর ওপর মন বিষিয়ে গেছে তার। ঘৃণা করতে শুরু করেছে। ‘ইস্! ও মরত যদি!’ ভাবল সে। মলির কথা ভাবতেই মেজাজ খিঁচড়ে উঠল গডফ্রের, ভাবল সরাইখানায় গিয়ে এক ঢোক গিলবে। তাতে হয়ত খানিকটা ভাল লাগতে পারে। মলিকে ভুলে থাকা যাবে আপাতত।
চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল সে। দ্রুত বেরিয়ে এল বাইরে। পোষা কুকুরটাও সঙ্গ নিল তার। ওটার পেটে কষে এক লাথি ঝাড়ল গডফ্রে।
চার
পরদিন কাক ভোরে ঘোড়া বেচার জন্যে রওনা দিল ডানস্ট্যান কাস। পথে পড়ল সেই পাথরের কৃয়া আর সাইলাসের কুটির। কৃয়াটা গভীর, কাদাপানিতে ভরা। ওটাকে ঘিরে পাতাবিহীন গাছগুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে, ভূতের মত। কুটিরের চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। এছাড়া আশেপাশে কোথাও যেন প্রাণের লক্ষণ নেই। তার কানে এল তাঁতের শব্দ। তারমানে এই ভোরবেলাতেই কাজে বসে পড়েছে সাইলাস।
হঠাৎ একটা চিন্তা এল ডানস্ট্যানের মাথায়। লোকে বলে সাইলাসের অনেক টাকা, লুকিয়ে রাখে কোন এক গোপন জায়গায়। ওর কাছে টাকা ধার চাইলে কেমন হয়? যদি না দেয়? তখন,’ ভাবল ডানস্ট্যান, ‘বুড়োকে এমন ভয় দেখাব যে বাপ বাপ করে ধার দেবে।’
বুদ্ধিটা মাথায় আসতেই আপন মনে হাসল সে। জলকাদা ভেঙে ঘোড়া নিয়ে এগোল। এ.এলাকায় গত ক’দিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছে।
হান্ট মীটিং-এ উপস্থিত ছিল ব্রাইস। ‘এই যে!’ ডানস্ট্যানকে দেখে ডাকল সে, ‘ভাইয়ের ঘোড়া নিয়ে এসেছ দেখি।’
‘এটা এখন আমার,’ অম্লান বদনে মিথ্যে বলল ডানস্ট্যান।
‘তাই? টাকা পেলে কোথায়?
‘গডফ্রের কাছে টাকা পেতাম। তার বদলে ঘোড়াটা নিয়েছি। যদিও ব্যাপারটা মোটেই ভাল লাগেনি আমার, কিন্তু কী আর করা! হাজার হোক ভাই তো!’
‘বেচবে নাকি আমার কাছে?’
‘মাথা খারাপ? একজন দেড়শো পাউণ্ডে কেনার জন্যে কত ঝুলোঝুলি করল, দিইনি।’
‘কেন? ঘোড়াটার দাম তো তার অর্ধেকও হবে না।
‘আমি বলেছি টাকাটা তো আর আসল নয়। ঘোড়ার হৃদয় বোঝে এমন লোকের কাছেই বেচব।’
একথা শুনে পিছে লেগে গেল ব্রাইস। দু’জনে অনেক কথা চালাচালি করল। শেষমেশ অনিচ্ছাসত্ত্বেও (!) রাজি হল ডানস্ট্যান। একশো বিশ পাউণ্ডে রফা হল।
‘বেথারলিতে আমার বাসায় ঘোড়া নিয়ে আসবে। ওখানেই টাকা মিটিয়ে দেব,’ বলল ব্রাইস।
রাজি হল ডানস্ট্যান। তারপর ভাবল, ‘আগে নিজে ঘোড়ায় চেপে খানিক ঘুরে নেব। সবাই দেখুক কি দারুণ ঘোড়সওয়ার আমি।
সরাইখানায় মদ গেলার জন্যে গেল সে। তারপর ওখান থেকে বেরিয়ে যোগ দিল অন্যান্য অশ্বারোহীর সঙ্গে। প্রতিযোগিতা করবে।
ঝোপ-ঝাড়, বেড়া টপকে সবার আগে ছুটল ওয়াইল্ডফায়ার। ডানস্ট্যানের আনন্দ আর ধরে না। পকেট থেকে ব্র্যাণ্ডির বোতল বার করল সে। খানিকটা ঢালল গলায়।
পরের বেড়াটা ডিঙোনর সময় পড়ে গেল তার ঘোড়া। ছিটকে গেল ডানস্ট্যান, সে চোট না পেলেও মারা গেল ওয়াইল্ডফায়ার।
এদিক ওদিক চাইল ডানস্ট্যান। ভাবল, ‘কেউ দেখে ফেলেনি তো?’ কারও হাসির খোরাক হতে চায় না সে। না, কেউই দেখেনি। অন্যেরা তখনও বহু পিছিয়ে রয়েছে। এখন কী করা? ‘অসুবিধে নেই, ভাবল সে। র্যাভেলো এখান থেকে বেশি দূর নয়। হাঁটা মারব। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গেলে কেউ দেখতে পাবে না।
র্যাভেলো গ্রামের দিকে হাঁটা ধরল ডানস্ট্যান। কিন্তু যা ভেবেছিল কাজটা তত সহজ নয়। গত ক’দিনের প্রচণ্ড বৃষ্টির ফলে মাটি হয়ে পড়েছে প্যাচপেচে।
এখন শেষ বিকেল। আঁধার ঘনাচ্ছে দ্রুত। ঘন কুয়াশায় অস্পষ্ট দেখাচ্ছে সামনেটা। আবার গলায় ব্র্যাণ্ডি ঢালল ডানস্ট্যান। গডফ্রের চাবুকটা এখন ওর হাতে। সেটা দিয়েই পথ অনুমান করে এগোতে লাগল সে। ইতোমধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। ভিজে একসা হল ডানস্ট্যান।
শেষ পর্যন্ত ওর চোখে পড়ল একটা আলো। সাইলাসের কুটিরের কাছে এসে পড়েছে বুঝল সে। আলো লক্ষ্য করে তড়িঘড়ি এগোল ও। ভিজে মাটিতে পা পিছলে আছাড়ও খেল বার কয়েক। তবু গতি কমাল না। ‘টাকা!’ ভাবল সে। টাকা রয়েছে ওখানে।
কুটিরের দরজার কাছে পৌঁছে চাবুক দিয়ে জোরে টোকা মারতে লাগল সে। ‘বুড়ো ভয় পাবে নির্ঘাত।’
কিন্তু দরজা খুলল না কেউ। আরও জোরে টোকা দিতে লাগল সে। তাতেও কাজ হল না। ডানস্ট্যান তখন ধাক্কা দিল দরজায়। ওকে বিস্মিত করে দিয়ে খুলে গেল ওটা। চুলায় আগুন জ্বলছে। তার আলোয় পরিষ্কার চোখে পড়ল তাঁত, খাট, চেয়ার, টেবিল। মারনার নেই ঘরে।
আগুনের পাশ ঘেঁষে বসে পড়ল ডানস্ট্যান। ছোট্ট এক টুকরো মাংস সেঁকা হচ্ছে চুলায়। ‘বুড়ো কাছে পিঠেই আছে,’ ভাবল সে। ‘শিগগির খাওয়ার জন্যে ফিরবে। গেছে কোথায়? এমন রাতে তো কারও বেরোনর কথা নয়। আশ্চর্য!’
তারপর তার মাথায় এল, ‘ব্যাটা কৃয়ায় পড়ে মরল নাকি? তাই হবে বোধহয়।’
‘হলেই ভাল, আপন মনে বলল সে। ‘আচ্ছা, বুড়ো মরলে ওর টাকাগুলো পাবে কে? আর টাকা রেখেছেই বা কোথায়? লুকানো রয়েছে জানি। কিন্তু কোথায়? খাটের নিচে নয় তো? নাকি মেঝের তলে?
বালিময় মেঝেটা পরীক্ষা করল ডানস্ট্যান। তাঁত যন্ত্রের নিচে যে বালি রয়েছে সেখানে হাতের ছাপ লক্ষ্য করল সে। কৌতূহলী ডানস্ট্যান বালি সরিয়ে ফেলল। বালি সরাতেই বেরিয়ে পড়ল আলগা ইঁট। সহজেই সেগুলো তুলে ফেলল ও। দেখতে পেল গর্তে রাখা রয়েছে চামড়ার তৈরি দুটো ব্যাগ। ও দুটো বার করল সে। ‘কী ভারীরে, বাবা!’ নিজের মনে বলে উঠল সে। বুক ভরা আশা তার, পাওয়া গেছে গুপ্তধন। ব্যাগ দুটো খুলতেই দেখল যা ভেবেছিল ঠিক তাই। সাইলাস মারনারের জমানো মুদ্রা! ‘কে বলে সাইলাসের টাকা! এগুলো এখন আমার,’ মনে মনে বলল সে। দ্রুত ইঁটগুলো সাজিয়ে গর্ত ভরাট করল ডানস্ট্যান। তারপর বালিচাপা দিল। কারও বোঝার সাধ্য নেই চুরি হয়েছে এ ঘরে।
কাজ সেরে দ্রুত বেরিয়ে এল ডানস্ট্যান। সঙ্গে তার চাবুক আর চামড়ার ব্যাগ দুটো। চারদিক অন্ধকার। বৃষ্টির তোড় বেড়েছে আরও। পা পিছলে পড়তে গিয়েও কোনমতে সামলে নিল ও। তারপর মিশে গেল ঘন অন্ধকারে।
