কালীগুণীন ও সর্বনাশের হেঁয়ালি
(১) বজ্রগর্ভের সঙ্কেত
জলধর ঘোষের ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস একেবারে কাকভোরে। প্রৌঢ় জলধর রোজ আবছা আঁধার থাকতেই নিদ্রা থেকে উঠে পড়ে যষ্টি হাতে কুকুর শৃগাল ময়ূর তাড়না করতে করতে গাঁয়ে হাঁটাচলা করে। জলধর বয়স্থ হলেও এককালে উচ্চপদে কর্ম করে এসেচে। তাকে দশ গাঁয়ের সকলে মান্যিগণ্যি করে।
তো, সেইদিন জলধর যষ্টি হাতে ভ্রমণ করতে করতে গাঁয়ের সীমানায় এসে হঠাৎ থমকে গেল। মাঘ মাসের কুয়াশার দাপট চলচে। আজ হিসেবমত ধরলে শুক্কুরবার, মাঘীপূর্ণিমা তিথি। কুয়াশা ঘেরা পুকুরপাড়ে কে যেন একটা দাঁড়িয়ে রয়েচে না আলো-আঁধারিতে? চক্ষের ভ্রম তো নয়! দীর্ঘ, মেদহীন পুরুষশরীর। এই হাড় হিম করা শৈত্যে পথের পশুপাখিটা অবধি লুকিয়ে রয়েচে, সেখানে এইভাবে পুকুরপাড়ে কে দাঁড়িয়ে রয়? তস্কর, অপহারক নয় তো? জলধরের বয়স হলেও হাতির শক্তি তার দুই হাতে। সে এক টানে যষ্ঠির হাতলটা টেনে ভিতরের ঝকঝকে ফলাটা টেনে বের করে পারুষ্যের সঙ্গে চীৎকার করে উঠে বিশুদ্ধ সংস্কৃতে যা বলল তার বঙ্গার্থ, “কে ও? কথা কও। আমি জলধর ঘোষ। আমাকে চেনো তুমি?”
ছায়ামূর্তি বিন্দুমাত্র বাঙনিষ্পত্তি না করে কুয়াশা পেরিয়ে জলধরের সুমুখে এসে দাঁড়ালো। পৃথিবীর বুকে খুব ধীরে ধীরে একচিলতে আলো ফুটে উঠচে। সেই ক্ষীণ আলোতেও জলধরের খর দৃষ্টি আগন্তুকের মুখের উপর স্থির হতেই তার বলিষ্ঠ হাত থেকে যষ্টি পড়ে গেল ভূমিতে। প্রৌঢ় তড়িঘড়ি হাঁটু গেড়ে বসে, হাতজোড় করে আবেগরুদ্ধ বিস্মিত স্বরে কইলো, “এ কী! এ কী! মহারাজ! আপনি স্বয়ং? এই স্থানে, এই সময়ে!”
আগন্তুক দুই চরণ এগিয়ে এসে স্নেহভরে প্রৌঢ়কে দাঁড় করিয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে কইলেন, “হাঁ জলধর। আমিই।”
“অহো ভাগ্যম! অহো ভাগ্যম! এ যে অবিশ্বাস্য!”
“ওঠো জলধর। অধিক কুশলমঙ্গল বা বাক্যালাপের সময় নাই। আলো ফোটার পূর্বেই আমি স্থান ত্যাগ করবো। তোমার কাছে এসেচি একটা অনুরোধ নিয়ে। যদি রাখো।”
জলধর শিউরে উঠে দুই হাতে কান চাপা দিয়ে চীৎকার করে উঠল, “শত ধিক্ আমাকে মহারাজ, এ কথা বলবেন না। আপনি আজ্ঞা করুন। আমি আপনার দাসানুদাস মাত্র।”
“তাহলে শোনো জলধর, আমি তোমাকেই যোগ্যতম বিবেচনা করে এক মহা সর্বনাশা বিদ্যাকে লুকিয়ে রাখতে এসেচি তোমার কাছে। এই মারণ শক্তির প্রয়োগ আমি একবারই মাত্র করেচি যুদ্ধক্ষেত্রে, তাও অতি ক্ষুদ্র পরিসরে, কিন্তু আমার রাজ্যের বর্তমান বিশৃঙ্খলার সম্পর্কে তুমি অবগত আছো। পরস্পর হত্যালীলায় মেতে উঠেচে গোটা রাজ্য। এর মধ্যে এই অতি ভয়ঙ্কর শক্তির তিলেক সন্ধান পেলেই গোটা রাজ্য রসাতলে যাবে। আমি এই শক্তি এবং এর প্রয়োগবিধি তোমাকে বলে যাচ্চি, কিন্তু কখনও প্রয়োগ করো না। তোমার ধনবল, জনবল এবং চাতুর্য্য দিয়ে একে এমন স্থানে লুকিয়ে রাখবে, পরবর্তী কোনো প্রজন্ম যেন সন্ধান না পায়। পারবে?”
জলধর কম্পিত স্বরে বললে, “পারবো রাজন, আপনিই উপায় বলুন একে লুকিয়ে রাখার?”
প্রৌঢ় মহারাজ ক্ষীণ হেসে জলধরের কর্ণকুহরে ফিসফিস করে কিছুসময় কথা কইতেই জলধরের চক্ষু বিস্ফারিত হল! এত অভাবনীয় কৌশল, এত অসামান্য সঙ্কেতের বাঁধনে বাঁধা থাকলে চরাচরের কেউই কোনোদিনও খোঁজ পাবে না এই রহস্যের! জলধর কাঁপতে থাকা হাতদুটো প্রসারিত করতেই মহারাজ নিজের থলি থেকে অন্যান্য দ্রব্যাদির ভিতর থেকে একখানা মালা আর একখানি পুঁথি বের করে তার করতলে সমর্পণ করলেন। জলধর আবছা আলোকে চেয়ে দেখলে, চারখানা পাষাণ নির্ম্মিত এক বিঘৎ পরিমাণের ভয়ালদর্শন মুন্ড একটা অদ্ভুত সূতায় গ্রন্থিত করা রয়েচে! মুন্ডগুলি দানবাকৃতি। তাদের চক্ষে বসানো চূণী ধ্বকধ্বক করে জ্বলচে, যেন এখুনি গোটা চরাচরকে ধ্বংস করে ফেলতে চায় তারা! জলধর শিহরিত হয়ে চক্ষু মুদ্রিত করতেই তার হাত ধরে আগন্তুক বললে, “এই চার মুন্ডের মালাখানি আমার বলা কৌশলে লুকিয়ে রাখবে চিরশায়িত করে। পাঁচখানি ছিল, তাতে একটি আমি প্রয়োগ করেচি যুদ্ধে। বাকি তোমার হাতে।”
একটু থেমে বললেন, “আমি সুদূর ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছি জলধর। তোমার এই বংশের দুইটি শাখা হবে। তোমার হেপাজতে এই সর্বনাশা মুন্ডমালা রেখো। তোমার অনুজের বংশে রেখো এই পুঁথি। বংশ পরম্পরায় আমার রচনা করা হেঁয়ালির মর্মার্থকে যুগোপযোগী ভাষায় পরিবর্তিত করার আদেশ রইলো। এই পুঁথিও অতি ভয়ঙ্কর পুঁথি জলধর! এক দুর্দম পাষন্ড আর এক মহা মারণাস্ত্র লুকিয়ে রেখে গেলাম ভবিষ্যতের জন্য। আজ থেকে বহু বহু যুগ পর এই দুই অংশই একসঙ্গে জেগে উঠবে।”
তারপর আকাশের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ঠোঁটে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল তাঁর, “আর সেই সঙ্গে এই হেঁয়ালি উদ্ধার করার মানুষও মহামায়ার গর্ভে জন্ম নেবে। আমাদের এই শেষ দেখা জলধর।”
বয়স্থ জলধর শিশুর মতো কেঁদে উঠে বললে, “কেন নরেশ? এ কথা কেন?”
আগন্তুকের মুখে প্রসন্নতা আর বিষণ্ণতা একত্রে মাখামাখি হয়ে কারুণ্য ফুটে উঠল, “আমার বিদায়কাল আসন্ন জলধর। আমাকে যেতে হবে যে…”
পুকুরপাড়ের ওপাশের ঝোপেঝাড়ে মিলিয়ে গেলেন মহারাজ। জলধর বাড়ীর কারোর নিদ্রাভঙ্গ হবার পূর্বেই তড়িঘড়ি কক্ষে প্রবেশ করে আগল দিয়ে দুটি বস্তুকে তোরঙ্গে লুকিয়ে ফেলল। কুঠুরি তৈরি করতে হবে। গোপনের চেয়েও গোপনতম চোরকুঠুরি, যার গর্ভগৃহে সমাহিত থাকবে এই মহা সর্বনাশা বিদ্যা, যে কুঠুরির রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকবে মহারাজের শিখিয়ে যাওয়া মায়াজাল আর সঙ্কেত। কিন্তু এ স্থানে নয়। অনেক অনেক দূরে গিয়ে বসতি পাততে হবে। ভারতবর্ষের একমাথা থেকে অপর মূড়োয় চলে যাবে সে। তবেই এই মারণাস্ত্র রক্ষা পাবে হয়তো। জলধর গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হল।
দুইটি দিন জলধরের চিন্তা হ্রস্ব হল না, উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চলল। এমন সময়ে জলধরের ছোটভাই জলবিম্ব ঘোষ কাঁদতে কাঁদতে এসে পড়ল। জলধর শুষ্ক চোখ তুলে নিরুৎসুক ভাবে শুধালো, “ও কী ও, কাঁদো কেন বিম্ব?”
“সর্বনাশ হয়েচে দাদা, মহারাজ দুই দিবস পূর্বে বনের ভিতরে ঘাতকের হাতে নিহত হয়েচেন! আজ খবর এসেচে এদিকে। সকলে হাহাকার করচেন।”
জলধর বিদ্যুৎপৃষ্টের ন্যায় সোজা হয়ে বিড়বিড় করে কইলো, “দুইদিবস পূর্বে? মাঘী পূর্ণিমায়? কখন ঘটেচে বিম্ব?”
“জনরব বলে, বারবেলায় কি তার কিঞ্চিৎ পরে।”
শুকনো চোখে জলধরের ঠোঁট কেঁপে উঠল, “বিম্ব, ভাই আমার, পূর্ণিমার ভোরে মহারাজ আমার কাছেই এসেচিলেন। বড় বিপদ। সব বলচি তোমাকে, কিন্তু আর বিলম্ব নয়, আজকের মধ্যে যতো গৃহস্থালির জিনিসপত্র বাক্সবন্দী করো, আমরা পূবে রওয়ানা হবো। জমিজিরেৎ থাক পড়ে, মহারাজের আদেশ বিম্ব।”
জলবিম্ব দাদাকে চিনতো। সে কালবিলম্ব না করে আদেশে ব্রতী হল।
রাতের আঁধারে সারসার গো-যানে জলধরের পরিবার চলল পূর্বদেশের পানে। বহু বিপদসংকুল যাত্রার অন্তে জলধর বসতি স্থাপন করল বর্তমান বেহার প্রদেশের মুঙ্গেরের নিকটে, কষ্টহারিণী গঙ্গার ঘাটের সমীপে। জলধরের বংশ ছড়িয়ে পড়ল নানা স্থানে। তাদের এক তরফের হাতে রইলো চতুন্ড মাল্য, আর অন্যের হাতে সেই মারণ-পুঁথি।
(২) সুধাকানন
সুন্দরবন জিলার অন্তর্গত কাঁকড়াঝোরা তালুক আদতে কয়েকটি তালুকের সমন্বয়ে গঠিত একখানা ইউনিয়ন বোর্ড। সারদারঞ্জন রায় এই তালুকের জমিদার হলেও বহু সিদ্ধান্ত নবগঠিত ইউনিয়ন বোর্ডই নিয়ে থাকে। এ নিয়ে বহু ভূস্বামীর মতো সারদারও ক্ষোভ কম নয়। সারদারঞ্জনের বয়ঃক্রম পঞ্চাশ পার করেচে। পুত্রকে শহর কলকাতায় লেখাপড়া শিখিয়ে বিবাহ দিয়েচেন কিছু বিলম্বেই। তালুকের প্রজারা সারদার নিষ্ঠুরতা আর দয়াশূন্যতায় নাজেহাল, কিন্তু মুখ ফুটে বলার সাহস কারোর নাই। একজন ছাড়া
হরিহরও কাঁকড়াঝোরা তালুকেরই প্রজা। এককালে নাকি তারাই ছিল এ অঞ্চলের একমাত্র ধনকুবের। অন্ততঃ হরিহরের প্রকাণ্ড প্রাসাদোপম অট্টালিকার ভেঙে পড়া ধ্বংসাবশেষ, গৃহদেবতার মন্দিরের গঠন এবং তার সুপ্রাচীনত্বই হরিহরের হয়ে সাক্ষ্য দেয়। এই ধ্বংসাবশেষেরই কয়েকখানা কক্ষ মেরামত করে বসবাস করে হরিহর। সে কিঞ্চিৎ ঠোঁট কাটা এবং মেজাজী মানুষ। তার গোটা পরিবার কলকাতায় অতি প্রাচুর্যের মধ্যে বসবাস করলেও এই অখদ্যে গাঁয়ের ভাঙা গৃহের থেকে নড়ানো যায়নি হরিহরকে।
তো, ঘটনাটা বলি।
সারদার পুত্রবধূ বকুলবালা একদিন পরিচারিকা পরিবেষ্টিত হয়ে শাশুড়ির সঙ্গে জমিদার পুকুরে নাইতে নেমে তার কণ্ঠের আভূষণ, বিবাহে পাওয়া আশীর্বাদী চন্দ্রহারখানা জলে হারিয়ে ফেলল। ভীষণ কান্নাকাটি, হৈহৈ এর পরে সারদারঞ্জন হন্তদন্ত হয়ে পুকুরের ধারে এসে উপস্থিত হয়ে বধূকে নিষ্ঠুর তর্জন করে অবশেষে কইলো, “এই ঝি-গুলোর পিঠে চেলাকাট ভাঙ্গলেই অমন দশটা সোনার হার বেরুবে। হতভাগা চোরের দল। এই কেউ দারোগাকে খবর দে, ঘোড়া নিয়ে আসুক।”
পরিচারিকারা ভীষণ আতঙ্কে কাঁদতে কাঁদতে জমিদার গিন্নীর পায়ে পড়তে লাগল। হেমনলিনী আর্দ্র হয়ে স্বামীকে বললে, “হ্যাঁ গা, ঝিরা সকলেই পুরনো বিশ্বাসী লোক। তাদের তুমি ফাটকে দিও নে।”
সারদা স্বভাবোচিত মুখ খিঁচিয়ে বক্র সুরে কইলো, “আহা, ওগো সবাই পুরনো বিশ্বাসী লোক… ফাটকে দিওনা। তুমি কিনে দিয়েচিলে সোনার হারটা? দিয়েচি আমি। উদ্ধারও আমিই করবো। মেয়েমানুষ আবার আমাকে বুদ্ধি দিচ্চে? সারদারঞ্জন রায়কে?”
হেমনলিনী বরাবরই স্বামীর মুখের উপর কখনো কথা কয় না, কিন্তু আজ এতগুলো বাইরের লোকের সামনে এই অপমানে তার মুখ লাল হয়ে উঠল। হেমনলিনী চিবিয়ে চিবিয়ে কইলো, “হাঁ দিচ্চি, কারণ তোমার যদি বিবেক বুদ্ধি থাকতো তবে নিজের পুত্রবধূর স্নানের ঘাটে এভাবে পুরুষ হয়ে ঢুকে পড়তে না।”
সারদাকে কেউ যেন কষাঘাত করল! সে তাড়াতাড়ি উঠে গেল উপরের দিকে। হেমনলিনীর কথার যুক্তি ফেলার নয়। বিশেষতঃ এত লোকের সামনে এই দিনমানে একটা কণ্ঠহার খুলে নেওয়া অসম্ভব। সেটা এমনিই জলে পড়েছে। সারদা নায়েবকে কইলো, “ভটচায মশাই, একবার হরিহরকে ডেকে আনতে পারেন? সে দিনরাত চৌপর জলেই পড়ে থাকে। সে নিশ্চয়ই খুঁজে বের করতে পারবে।”
“আরে মলো যা, পুরোটা শুনেই যান। বলবেন, জমিদার বাবু দুটো গোটা টাকা পুরস্কার দেবে। আর যদি তাতেও রাজী না হয়, তবে বলবেন যে সোনা হারানোর অপরাধে নিজের পুত্রবধূকে ত্যাগ করবেন জমিদার সারদারঞ্জন। এই কথা শুনলে সে স্থির থাকবে না আমি জানি। তার মন বড় নরম।” এই বলে কুটিল হাসি হেসে উঠল সারদা।
নায়েব গিয়ে উপস্থিত হল হরিহরের পোড়ো বাড়িতে আর হাঁক দিল, “ওহে ঘোষের পো, তোমাকে একটিবার যে জমিদারের বাড়িতে যেতে হবে বাপ। বড় আতান্তরে পড়েছি।” এই বলে সমস্ত কথা জানানোর পর দুরন্ত সাঁতারু হরিহর রাজি হল এবং নায়েবের সঙ্গে চলল মেয়েদের ঘাটে। নিজের ধুতি খাটো করে গুটিয়ে নিয়ে, নিজের সর্বক্ষণের সঙ্গী রামধনু রঙা মাথার ফেট্টি খুলে নেমে পড়ল জলমগ্ন সোপান বেয়ে। কিছুটা দূরে হেমনলিনী, তার বধূ আর কিছু মেয়েমানুষ উৎসুক মুখে দাঁড়িয়ে রয়েচে। চতুর সারদা রঞ্জন হারখানা হারানোর পর থেকে মেয়েদের ঘাটে দুইজন দ্বারবান নিযুক্ত করে রেখেচে, যাতে ঝি-দের কেউ এসে ফাঁকতালে হারটা সরাতে না পারে।
হরিহর দুরন্ত সাঁতারু। সে এক বুক শ্বাস নিয়ে জলাশয়ের একেবারে নীচে পৌঁছে গিয়ে পাক হাতড়াতে লাগল খুব সাবধানে, যাতে পাঁক ঘুলিয়ে জল কালো না হয়ে যায়। একেকবার উপরে উঠে শ্বাস নেয়, আবার নিরাশার মুখ করে ডুব দেয়। হেমনলিনী পাষণ্ড স্বামীকে চিনতো। সে গৃহদেবতাকে স্মরণ করে আঁচলে একখানা গিট দিয়ে রাখল। হরিহরের কলকাতার পরিবারের তরফ ধনী হলে হয় কি, পুজোআচ্চা আর গাঁয়ের বাড়ি নিয়ে পড়ে থাকা হরিহরের হাতে টাকাপয়সা তেমন থাকে না। যেটুকু ডাকপিওন এসে দিয়ে যায়, সবটুকু সে খরচ করে বিভিন্ন উদ্ভট শখে। তার কাছে দুটো টাকার মূল্য কম নয়।
হেমনলিনী নানান কথা ভাবতে ভাবতে চিন্তায় তলিয়ে গিয়েচিলো, হঠাৎ সম্বিৎ ফিরল পৌরবর্গের উল্লাসে। হরিহর হাসিমুখে জল থেকে মুখ বাড়িয়েচে। তার হাতটা তুলে সে ঝকঝকে সোনার হারটা দেখালো সারদাকে। পুত্রবধূ কেঁদে ফেলে হরিহরের হাত থেকে হারটা নিয়ে কপালে ঠেকালো। সারদারঞ্জন পিরাণের থেকে একটা আধুলি বের করে হরিহরের হাতে দিয়ে ফেরার উপক্রম করতেই হরিহর বিস্মিত হয়ে বললে, “আধুলি কিসের জমিদার মশায়? নায়েব ভটচায আমাকে দু টাকার কথা বলেচে।”
সারদা তাচ্ছিল্য ভরে হেসে কইলো, “হুহ, দু টাকা! সে কত টাকা দু জানিস? এইটুকু কাজের জন্য দুটো টাকা? এই আধুলি পাচ্চিস তোর ভাগ্যি। আধুলিতে এক হাঁড়ি কণকচূড় চাউল পাবি, চার পলা তেল। আধুলি কম হল?”
হরিহরের চোখ জ্বলে উঠল। সে আধুলিটা ছুঁড়ে ফেলতে গিয়েও বটতলায় নামিয়ে রেখে হিসহিস করে কইলো, “আমি ভিখারি নই জমিদার মশায়। আমি হরিহর। আমার কাছে টাকার থেকে কথার মূল্য অনেক বেশি। আমি মন্দিরের চূড়োর তৈলপাত্রের তেল কেনার জন্য টাকা চাই। আপনি জানেন ওই চূড়োয় ঢালা তেলেই গর্ভগৃহের দেবতার তৈলস্নান হয় প্রতি মাসে। আপনি যখন কড়ার করেচেন তখন ওই দুটো টাকাই আপনাকে দিতে হবে। নাহলে চলবে না।”
সারদা আগেই স্ত্রীর কাছে অপমানিত হয়ে ফুঁসচিলো, এইবার হরিহরের কথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দাঁত কড়মড় করে চীৎকার করে উঠল, “তবে রে শয়তান! তোর এত ধৃষ্টতা? এই একে উচিত শিক্ষা দে তোরা, আর কখনো যেন কাউকে উঁচু স্বরে কথা না কইতে পারে।” এই বলে হনহন করে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল জমিদার, আর চারজন লেঠেল আর দুই দ্বারবান মিলে হরিহরকে লাঠির আঘাতে ভূলুণ্ঠিত করে, নাগরা দিয়ে তার মাথাটা পুকুরপাড়ের নরম মাটিতে ঠেসে ধরে অট্টহাস্য করে কটুবাক্য বলে চলে গেল। হরিহর আহত শরীরে ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে টলোমলো পায়ে তার ভগ্নপ্রায় শূন্য গৃহে ফিরে এসে দ্বারে ঝনাৎ করে শিকলি তুলে দিল।
খুব ভোরে আলো ফোটার সময়ে গাঁয়ের চারজন তরুণ ব্রাহ্মণ পূজার্থে ভিনগাঁয়ে চলেচে, হঠাৎ হরিহর উশকো খুশকো চুল, রাত্র জাগরিত রক্তবর্ণ চক্ষে পথে দেখা দিয়ে কইলো, “আমি রাত্তিরে ভগবানের স্বপ্ন পেয়েছি, ভগবান স্বয়ম্ভূ নয়নজোড়ের নদীর বাঁকে জলের তলে শায়িত রয়েছেন। তাঁকে স্থাপিত করতে হবে। আমার শরীর ক্লিষ্ট। বাবাসকল, তোমরা এই টাকাকটা রাখো, আর আমার মন্দিরে ভগবানকে এনে দাও।”
ব্রাহ্মণরা জিহ্বা দংশন করে টাকার প্রতি দৃকপাত না করে তৎক্ষণাৎ চলল নয়নজোড়ের বাঁওড়ে আর বাঁওড়ের জলতলে সত্যি সত্যিই একখানা শিবলিঙ্গের আকারের পাষাণ পাওয়া গেল! আড়ে বহরে তিন হাত-দুই হাত। ব্রাহ্মণগণ সহর্ষে হইচই করতে করতে শিবলিঙ্গ এনে রাখল মন্দিরের চাতালে। তারা আবার শিবলিঙ্গ তুলে নিয়ে গর্ভগৃহে স্থাপন করতে যাবে, হঠাৎ হরিহর তাদের পথরোধ করে কইলো, “তোমাদের আর কিছু করতে হবে না বাবা। বাকিটা আমি করে নেবো। গর্ভগৃহে অষ্টধাতুর নারায়ণ বিগ্রহ রয়েচেন। তাঁকে যথাবিধি স্থান পরিবর্তন করে তবে শিবলিঙ্গ স্থাপিত করতে হবে। বিলম্বের কথা। তোমরা এখন নিজ নিজ কর্মে যাও।”
ব্রাহ্মণরা নিষ্ক্রান্ত হলে পর হরিহর ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে পথ চলতে লাগল হাতে একখানা পুরনো সড়কি নিয়ে, আর মেয়েদের ঘাটের আড়ালে এসে লুকিয়ে থাকলো। কিয়দক্ষণ পরেই জমিদারের পুত্রবধূ তার পরিচারিকাবর্গের সঙ্গে স্নানান্তে পথ দিয়ে ফিরচে, হঠাৎ হরিহর সপমধ্যে গরুড়ের ন্যায় পথরোধ করে সড়কি বাগিয়ে কর্কশ স্বরে কইলো, “আমি কারুর ক্ষতি করবো নে, কিন্তু মা, তোমার আশীর্বাদী হারখানা খুলে এই এইখানে ভূমিতে রেখে যাও। নচেৎ আমার সড়কি চলবে।”
ভীষণ আতঙ্কে কণ্ঠাভরণ মাটিতে রেখে স্ত্রীলোকেরা ছুটতে শুরু করল জমিদার বাড়ির পথে। হরিহর গয়নাটা হাতে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল পুষ্করিনীর মধ্যস্থলে, তারপর এসে উঠল নিজের মন্দিরে। আহত শরীরে অতি ক্লেশে সেই গুরুভার শিবলিঙ্গ ঠেলে ঠেলে এনে স্থির করল গর্ভগৃহের একপ্রান্তে। এদিকে সারদারঞ্জন এই গহনার হরণবৃত্তান্ত জেনে ক্রোধে একেবারে অস্থির হয়ে উঠে গোপনে দুইজন বাছা লেঠেলকে দিয়ে গোমস্তাকে পাঠালো হরিহরকে মন্দিরেই নিকেশ করার জন্য। গোমস্তা মন্দিরের বাইরে লুকিয়ে প্রহরা দিতে লাগল আর দুই যমদূত সড়কির ফলা বাগিয়ে ঢুকলো মন্দিরের ভিতরে।
কিছু সময় পর গোমস্তা সভয়ে চেয়ে দেখল, হরিহর টলতে টলতে মন্দিরের বাইরে এসে একখানা লাল রঙের পাট্টা ছুঁড়ে ফেলল জঞ্জালের স্তুপে। গোমস্তা এই লাল পাট্টা বিলক্ষণ চেনে! এই পাট্টা ছিল লেঠেল সর্দার কানোয়ার, যে কানোয়া তার সাগরেদকে নিয়ে এখুনি ঢুকেছিল মন্দিরে। তবে কী!
গোমস্তা বহুক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন কানোয়া বা তার সঙ্গীর কোনো হদিশ পেলো না, তখন প্রাণপণে দৌড়ে এসে আছড়ে পড়ল সারদার কাছারিতে। সারদা সমস্ত কথা শোনার পর তার পুরো লাঠিয়াল বাহিনীকে একত্রে প্রেরণ করল মন্দিরে। তারা কর্কশ চীৎকার করতে করতে দেউলে ঢুকে হরিহরকে সড়কির আঘাতে ভূলুণ্ঠিত করে উপর্যুপরি দমাদম লাঠিপেটা করতে থাকলো। প্রাণবায়ু বেরোনোর আগে হরিহর চাপা, বিকৃত গলায় নায়েবের পানে রক্তমাখা চোখে চেয়ে বললে, “কাউকে ছাড়বো না ভটচায, কেউ রক্ষা পাবে না। সর্বনাশের এই শুরু সবে। আমি ফিরে আসবো। আসবো তোদের নরকে পাঠাতে…।”
তারপর রক্তমাখা মুখে যন্ত্রণার সঙ্গে হেসে বললে, “রাক্ষস আসবে গাঁয়ে… সব নিকেশ করে দেবে… রাক্ষস আসবে।” –এই বলে হরিহর হঠাৎ অপ্রকৃতিস্থ স্বরে খলখল করে হেসে উঠল। তার অবশিষ্ট রক্তাক্ত দাঁতের সারিতে যেন একচিলতে ক্লিষ্ট হাসি ছড়িয়ে পড়ল, আর পরমুহূর্তেই রক্তাক্ত হাত-পা অস্বাভাবিক রকম ছটফট করে স্থির হয়ে গেল হরিহর।
জমিদার সারদা সমস্ত শুনে শান্ত চিত্তে মধ্যাহ্নভোজন সেরে বৈকালে বাইরবাড়িতে এসে লেঠেলদের ডেকে কইলো, “কোথায় রেখেচিস?”
“আজ্ঞা হুজুর, হিঙ্গলতলার ডোবার পাড়ে মহিম ডোমের ঝোপড়ায় রেখে দিয়েচি। আপনি হুকুম করলে লাশটা নিয়ে শ্মশানে গিয়ে…”
সারদা হাত নেড়ে কইলো, “না না না, হাঙ্গামা হবে। তার পরিবারের প্রতিপত্তি রয়েচে সদরে। বরং রক্তটক্তগুলো ভালো করে সাফসুতরো করে, পরিষ্কার পোশাক পরিয়ে রাখ। একজন আজই রওয়ানা হোক কলকাতায়। সুবল ডাকপিওনের কাছে মানিঅর্ডার বরাবর হরিহরের পরিবারের ঠিকানা পাবি। ক্যাম্পবেল হাসপাতালের কাছে কোথায় যেন থাকে। তাদের বলবি, হরিহর গাঁয়ে আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে স্ত্রীলোকদের উপরে চড়াও হয় এবং পুকুরপাড়ে পা পিছলে পড়ে মারা গিয়েচে। আর মৃত্যুর কথাটা আজকের তারিখে নয়, আগামী কালকের তারিখে লিখে দিবি। কাল কাকভোরে লাশটা সাজিয়ে রেখে আসবি পুকুরঘাটে, পা পিছলানোর মতো করে।”
সেই কথাই বহাল রইলো। কলকাতা থেকে হরিহরের ভ্রাতুষ্পুত্র ইন্দ্রনাথ পরদিবসে কাঁকড়াঝোরায় এসে দুটি দিন থেকে তিনদিনের দিন হরিহরের পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করে, খুড়ার ব্যবহৃত যৎসামান্য জিনিসপত্তর, তার যষ্ঠী, মাথার রামধনু রঙা চীরখণ্ড, স্মৃতি হিসেবে পায়ের অলক্তছাপ সঙ্গে নিয়ে সারদার নিকট দীনভাবে বিদায় নিয়ে রওয়ানা দিল কলকাতায়। সে খুড়োর মৃত্যুর রহস্য অথবা কাল, কিছুই জানলো না। এতবড় একটা হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে পেরে সারদা কাছারিতে বসে দুলে দুলে হাসচিলো থেকে থেকে। হাসচিলেন বোধকরি বিধাতাও, কারণ বিষম বিপদ শিয়রে এসে এমন আচম্বিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল তালুক জুড়ে যে কেউই সতর্ক হবার সময়টুকু অবধি পেলো না। সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাই আজ তোমাদের বলতে চলেচি, মন দিয়ে শোনো।
(৩) রসাতল
ইউনিয়ন বোর্ডের তরফ থেকে যে টিউবওয়েল বসানোর মুফত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েচে, তারই মাপজোক করতে বিনয়ভূষণ চক্কোত্তি গিয়ে উঠল কাঁকড়াঝোরার ভূস্বামী সারদার গৃহে। সারদার সাতখানি তালুকে ঘুরে ঘুরে, মাপজোক করে প্রথম ছয়টি নলকূপ বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল সাতকানিয়া গাঁয়ে। বড় গ্রাম, তায় সাগরের নিকটে। এই গাঁয়ের জলস্তর পাওয়া গেলে বাকিগুলো সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া চলে। সাতকানিয়ার ছয়খানা স্থানে ফলক বসিয়ে, লোহার তিনকোণা পরকলা বসানো হল। এই লৌহনির্মিত ত্রিকোণ পরকলাতে শিকল ঝুলিয়ে কূপ খনন হবে আগামীকাল।
সরকারের কাজে এসে জমিদারের আতিথ্য গ্রহণ বিষয়টা বিনয়ের তেমন পছন্দ হয়নি কিন্তু এই তালুকে এতগুলো মানুষের থাকার যোগ্য স্থানও নাই তেমন। আগামীকাল পূর্ণিমা, তাই ফটফটে আলো রয়েচে, কিন্তু এই শীতের মধ্যে তাঁবুতে থাকা হাঙ্গাম। বিনয়ভূষণ পরদিবসের কাজকর্ম মজুরদের বুঝিয়ে দিয়ে শয়ন করতে গেল। অতিথিকক্ষের বিশাল পালঙ্কে পাতা নরম শয্যায় শয়নকালে বিনয় ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে ঠিক আগামীকাল ভোরবেলাতেই কী ভয়ঙ্কর বিস্ময় অপেক্ষা করে রয়েচে তাদের জন্য!
২৪শে পৌষ, ১৩৬৯, বুধবার:
ভোজনাধিক্যের জন্যই হোক বা শারিরীক ধকলের জন্য, বিনয়ের নিদ্রা সূর্যোদয়ের সময়েও ভাঙেনি। ভাঙলো আর একটু বিলম্বে, তুমূল কলরব আর আর্তনাদের শব্দে। বাইরের উঠানে একদল মেয়েপুরুষ সমস্বরে ভীষণ ভয়ে কি যেন বলে চলেচে! বিনয় তড়িঘড়ি শয্যা ত্যাগ করে, চশমাটা চক্ষে দিয়ে, কপাট খুলে বাইরে বেরিয়েই অবাক হয়ে দেখলে, উঠানে তারই মজুররা, কুলি আর কামিনরা দাঁড়িয়ে রয়েচে। তাদের সর্দার বিনয়কে দেখতে পেয়ে হাঁ হাঁ করে এসে যা বলল তার মাথামুণ্ডু বুঝতে পারল না বিনয়, শুধু এটুকু বুঝলো যে নলকূপ বসেনি। কুলিরা এই পরগণারই লোক। সারদা তাদের ভাষা কিছু কিছু বুঝে থাকবে। সে বিস্ময়ের সঙ্গে জুড়িগাড়ি জুততে বলে বিনয়কে নিয়ে চেপে বসলো তাতে আর কিছু সময়ে গাড়িতে এবং অনেকটা পায়ে হেঁটে সাতকানিয়ায় পৌঁছে মহা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল বিনয়ভূষণ!
গ্রামখানা নেই! গতকালও মাপজোকের সময়ে গোটা গ্রামটা ছবির মতো দেখেচে সে, কিন্তু আজ গ্রামটা নেই। তার জায়গায় একটা প্রকাণ্ড এলাকা জুড়ে ধ্বস নেমেচে, তাতে ভূতল থেকে কম করে শতহস্ত নীচে তলিয়ে গিয়েচে গোটা গ্রামটা এবং তার আশপাশের গাঁয়ের কিছু অংশ! সারদা কপালের রগ টিপে বসে পড়ল।
হতভম্ব বিনয়ের মুখে ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে একটাও বাক্যস্ফূরণ হয়নি! কালান্তক সুড়ঙ্গের মতো হাঁ করে পাতালে নেমে যাওয়া প্রকাণ্ড গর্তটার দিকে তাকালে মাথা ঘুরে ওঠে! নিজেকে সামলে বিনয় এগিয়ে গিয়ে নির্বাক বসে থাকা সারদার পিঠে হাত রেখে কাঁপা গলায় বলল, “কী ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা জমিদার মশায়! এ কেমন করে ঘটলো? আপনার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারচি রায়মশায়, এতগুলো চেনা মুখ একসঙ্গে তলিয়ে গিয়েচে মাটির তলে, তার উপর…”
সারদা পাংশু মুখ তুলে কইলো, “এই সাতকানিয়া থেকে বার্ষিক ছয়হাজার টাকা আয় ছিল চক্কোত্তি মশায়, সব তলিয়ে গেল…
বিনয় সারদার পিঠ থেকে ঘৃণায় হাতটা সরিয়ে নিল। এই অর্থপিশাচ জমিদারের আতিথ্য নিয়ে নিজেকে ছোট বোধ হচ্চে তার এখন। বিনয় এগিয়ে গিয়ে কুলি সর্দারকে বললে, “এখানে কী ঘটেচে সর্দার? ধীরে ধীরে বলো আমাকে।”
কুলি সর্দার নিজের উত্তেজনা সংহত করে যে অদ্ভুত ঘটনাটা বলল তা এইরকম—
“কুলি মজুরদের দলটা ভোরের আলো ফোটার আগেই রওয়ানা দিয়েচিল সাতকানিয়ার পানে। খাঁড়িটা পার হয়ে ওদিকে বেশ কিছুটা গেলে গ্রামটা। খাঁড়ির কাছাকাছি পৌঁছে কুলিরা দেখল, সাতকানিয়ার ঘুম ভেঙেচে। কিছু রাখাল গোরু বাছুর নিয়ে গ্রামের বাইরে চলেচে, দুই একটি নরনারী এদিক ওদিক চলেচে কাজে, কেউ ক্ষেতে চলেচে।
“হঠাৎ মাটিটা একটু কেঁপে উঠল! কুলি সর্দার খুব অবাক হয়ে ঘটনাটা মনের ভুল ভাবার মধ্যেই একটা ছপাৎ ছপাৎ শব্দ পেয়ে বুঝলো এ তার মনের ভুল নয়। খাঁড়ির জল দুলে চলেচে! বাকিরাও অবাক হয়েচে। আরও কয়েক পা এগোতেই আবার মাটি কাঁপলো। দূরে গরু বাছুরগুলো ঘাস খাওয়া ছেড়ে উপরে মুখ তুললো ভয় পেয়ে। সর্দার কিছু ভাবার আগেই একজন কুলি সবিস্ময়ে আঙুল দেখালো গরুগুলোর দিকে।
““অদ্ভুত! সবকয়টা গরু আকাশের দিকে মুখ তুলে কি যেন দেখচে ভয়ে ভয়ে! হঠাৎ আকাশটা কালো হয়ে এল। একরাশ সামুদ্রিক মেঘ যেন চকিতে ঘিরে ফেলল সাতকানিয়ার আকাশ। গোরুগুলো খোঁটা উপড়ে এলপাতাড়ি ছুটতে আরম্ভ করল। আকাশে একটি দুইটি বিদ্যুৎ গর্জন করতে করতে হঠাৎ যেন সহস্র সহস্র বজ্র একসঙ্গে জ্বলে উঠল! গোটা গ্রামটা যেন আলোয় ঝলসে উঠল। চোখ ধাঁধানো এই আলোর আড়ালে একটা বিকট আওয়াজ আর মাটির ভয়ানক কম্পনের সঙ্গে কুলিরা ছিটকে পড়ল খাঁড়ির জলে, আর পড়িমরি জল থেকে উঠেই প্রাণভয়ে দৌড়াতে থাকে কাঁকড়াঝোরার দিকে। শুধু পলায়মান সর্দারের চোখে তখনও ভয়ঙ্কর অবিশ্বাস! তার সাহস অন্যদের থেকে বেশি বলেই সে দলের সর্দার। সে তীব্র আলোর মধ্যেও কোনোক্রমে চোখ খোলা রেখেছিল। কিন্তু এ কী দেখল সে? নাকি চোখের ভ্রম?
“কুলি সর্দারের অস্পষ্ট ভাবে মনে হল, ওই ভীষণ কম্পনের আগে আলোর পাহাড়ের মধ্যে সে যেন একটা আবছা মুখ দেখেচে! একটা সর্বগ্রাসী রাক্ষসীর মতো হিংস্র, উদগ্র মুন্ড। তার হাঁ করা মুখের মধ্যে তীক্ষ্ণ দাঁতের সারি, আগুনের মতো চোখ। যে মুখ একবার দেখলে আমরণ ভোলা যায় না! হোক তা এক লহমার জন্য, কিন্তু এ চোখের ভুল হতে পারে না।”
সর্দারের কথা শুনে বিনয়ের মুখে অবিশ্বাস ফুটে উঠল। ইতস্তত করে সে কইলো, “যা ঘটেচে তা দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু সরকারের কাজ তো ফেলে রাখা চলে না। তোমার কথা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন এখন থাক সর্দার, আমরা সাতকানিয়ার ওদিকের গ্রাম বড়তলার মাপজোক করে রাখচি, সামনের মাসে আবার এসে বড়তলায় নলকূপের কাজ করে যাবো। লিস্টিতে পরের নাম বড়তলাই রয়েচে, তিনটি নলকূপ বসানো হবে।”
কথা মতো পরের মাসের এগারোই মাঘ, শুক্কুরবার দল নিয়ে বেরোলো বিনয়। দলের মুরুব্বী নাদু নায়েক হাজিরার খাতা নিয়ে বিনয়ের হাতে দিতেই বিনয় বিরক্ত হয়ে কইলো, “তুমি কেন? সর্দার কই?”
নাদু বিনীত ভাবে বললে, “সর্দার তদবা নু জ্বরে ভুগেটে। ল্যাঘা করনের নোক নাই। তাই আমানে ওঠি সভা করিকি ঠিক করলু আমিই সে ভার লইটি।”
বিনয়ের মনটা তিক্ত হয়ে উঠল। সভা করে নতুন দলপতি ঠিক করেচে অথচ সে জানে না। সর্দারের সেই থেকে জ্বরই বা কেন? এত কুসংস্কার এদের? বিনয় কাষ্ঠ হেসে কইলো, “বেশ, তবে তুমিই সামাল দাও। বড়তলা সাইটের তিনটে জায়গা মনে রয়েচে তো? তিনটে দল তিনদিকে কাজ করবে। এখন সকাল সকাল চলো।”
মাফলারটা ঠিকঠাক মুড়ে বিনয় দলবল নিয়ে এগোতে যাচ্চে, এমন সময়ে বড়সাহেব স্ট্যানলি এসে উপস্থিত হল কাঁকড়াঝোরার ঘাটে। এদের যেতে দেখে চীৎকার করে ডাকলো বিনয়কে। বিনয় এগিয়ে গিয়ে করমর্দন করল। বিনয়ের হাতটা না ছেড়েই স্ট্যানলি সাহেব তাকে ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে এল কুলিদের থেকে কিছুটা তফাতে। বিনয় বিস্মিত চক্ষুতে তাকিয়ে রয়েচে দেখে সাহেব নীচু, গাঢ় স্বরে কইলো, “ওয়েল, বাবু, তোমরা দ্বিতীয় যে তালুকটির নাম ইউনিয়ন বোর্ডের তরফ থেকে জমা দিয়াছো, সেই তালুকেই কি এখন কাজ হবে?”
“হাঁ সাহেব, বড়তলা ব্লক। মেজারমেন্ট হয়ে গিয়েচে, আজ গিয়ে…”
“যেতে হবে না। বাতিল করো। সেই তালুকে এই মুহূর্তে কোনো কাজ করায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। আগের দুর্ঘটনার পর গতকাল আবার একখানা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে ওই তল্লাটে। কলকাতা থেকে বিশেষজ্ঞরা আসচেন পরের ডাকনৌকায়। তাঁরা সেই স্থানে যাবেন দুইবার এমন বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করতে।”
“সে কী! আবার কী ঘটেচে সাহেব? কেন যেতে পারবো না ওখানে?” সাহেব আরও একবার কুলিদের আড়চোখে দেখে নিয়ে কইলো, “কারণ গ্রামটা আর নেই। তলিয়ে গিয়েচে মাটিতে।”
বিনয় চমকে উঠতে গিয়েও সাহেবের ইশারায় থমকে গেল। তার কপালে ভাঁজ পড়ল। কুলিরা উদগ্রীব হয়ে গলা উঁচু করে চেয়ে রয়েচে এইদিকেই। এ কি অসম্ভব কথা!
বিনয়ের এইবার কেন জানি মনে হচ্চে, এই বিপর্যয় কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। প্রাকৃতিক নয়। যেন ইচ্ছে করেই কোনো সংহারক দানব ঝাঁপিয়ে পড়চে একেকটা গাঁয়ে। কুলি সর্দার খুব বিশ্বস্ত এবং বাস্তববাদী মানুষ। সে কেন অকারণে এতখানি মিথ্যাচার করবে? সে কী যেন দেখেচিলো?
নাদু এগিয়ে এসে শুকনো মুখে শুধালো, “কী হয়টে বাবু? কাজ হবে নাই?”
“না নায়েক, আপাতত বন্ধ। তোমরা ফিরে যাও। মজুরি আমি ধরে দেবো ‘খন।”
নাদু শূন্য দৃষ্টিতে একটু চেয়ে থেকে বললে, “গটে কথা থাইলা বাবু।”
“কী কথা?”
“বুড়া সদার ভুল কথা কয়টে নি বাবু। সে বুড়া হিচে, তার নজর বুড়া হয় নাই। সেঠি কিছু একখানা থাইলা বাবু। সর্দার কিছু একখান দেখথিলি। সর্দার ভুল দেখে নাই। চলি বাবু।”
বিনয় হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো! নাদুর কথা যে অসম্ভব! সর্দার বলেচিলো সে একখানা প্রকাণ্ড মুখের মতো দেখেচিলো। আকাশ পাতাল ছোঁয়া একটা ছায়া মুখ। দানোর মতো। এও কি সম্ভব?
এই দোটানার মধ্যে একটু পরেই বিনয় সঙ্গ নিলো কলকাতা থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দলটির। স্ট্যানলি সাহেবের কথায় তারাও আপত্তি করল না, বিশেষ করে বিনয় ওই তল্লাটগুলো একবার হলেও গিয়েচে। তাদের প্রশ্ন করে করে তাদের মুখে টুকরো টুকরো ভাবে ঘটনাটা জেনে ভয়ানক চমকে উঠল বিনয়!
কাক জাগানিয়া ভোরে দু’খানি মাছ ধরার বড় নৌকা কাজ শেষে ফিরে আসচিলো খাঁড়ির সংযোগস্থলের দিকে। আকাশে আবছা আবছা আলোর সঙ্গে চাপ চাপ আঁধার ছড়িয়ে রয়েচে। চলন্ত খোলা নৌকাতে ঘুমাতে নাই, তাই ধীবররা ক্লান্ত চোখে নজর করচিল ডাঙার পানে। একটা দুটো পাখপাখালি জেগে উঠে কিচমিচ করচে। হঠাৎ দূরের গ্রামের আকাশে একসঙ্গে সমস্ত পাখি মহা আতঙ্কে কানফাটানো সমস্বরে চীৎকার করতে করতে আকাশে উঠে আকাশ ছেয়ে ফেলল! শুধু তাই নয়, তারা যেন ভীষণ কিছুর ভয়ে সীমানা ছেড়ে পালাতে আরম্ভ করল!
নৌকায় অনেকেরই তন্দ্রা ছুটে গিয়েচিল, তারা একযোগে তাকিয়ে রইল ডাঙার দিকে। হঠাৎ অন্ধকার চিরে একটা ভয়ঙ্কর এবং আকাশছোঁয়া মুখের আদল ফুটে উঠল গাঁয়ের উপরটা জুড়ে। গনগনে ক্রুদ্ধ চোখ, তীক্ষ্ণ সূঁচালো দাঁতের সারি, আকাশ জুড়ে ছড়ানো চুলের রাশি নিয়ে সেই মুখটা ভীষণ রাগে আকাশের দিকে যেন মুখ তুললো। তারপর লক্ষ লক্ষ শতানীকের ফলার মতো আকাশের বুক চিরে নেমে এল বিভীষণ বজ্রের দাগ। মাটি ভয়ানক জোরে লাফিয়ে উঠল আর চোখের পলকে তার অভিঘাতে জল হয়ে উঠল উত্তাল এবং নৌকাদুটো খোলামকুচির মতো পাক খেয়ে ঘুরে গেল!
কোনোক্রমে নৌকা সামাল দিয়ে বন্দরে পৌঁছে রেডিওযন্ত্রে তারা খবর দেয় উপকূল কর্তাদের, এবং তাঁরা তৎক্ষণাৎ খবর দেন কলকাতার প্রধান আপিসে তাদের হস্তক্ষেপ চেয়ে। ধীবররা নিঃসন্দেহে সারা রাত ধরে মণ মণ টাটকা মাছই তুলেচে, কিন্তু বন্দরে ফিরে দেখা গেল দুইটি নৌকার পাহাড়প্রমাণ মাছ সম্পূর্ণ পচে গলে পূতিগন্ধময় হয়ে গিয়েচে। ধীবররা ভয় আর বিস্ময়ে হাঁ করে চেয়ে রইল পরস্পরের প্রতি।
ঘটনা শোনার পর বিনয়ের কপালে স্বেদবিন্দু দেখা দিল এই শীতেও। সে তিক্ত কণ্ঠে শুধালো, “কেমন মুখ তারা দেখেচে এই বিষয়ে কোনো খবর কি তারা বন্দর কর্তাদের বলেচে?”
এক বয়স্ক ভূবিশারদ একটু স্মরণ করে বললে, “হাঁ, হাঁ, বন্দরনায়েক বলেচিলেন বটে। একটা নাকি বিকট রাক্ষুসে দানোর মুখ তারা দেখেচে, অবশ্যই সেসব আমরা বিশ্বাস করিনে।”
বিনয় সবার অলক্ষ্যে কপালের ঘামটা মুছে নিল।
(৪) প্রতিহিংসা
হরি দিন্ডার বয়স পঞ্চাশ অতিক্রম করলেও তার সুগঠিত মাংসপেশী এবং বলশালী কাঠামো দেখলে চল্লিশ বলে ভুল হয়। তো, হরি আজ বল্লভপুরের একটা কাজের থেকে ফিরচিলো আরও ছয়জনের সঙ্গে। কাঁকড়াঝোরায় প্রবেশের আগে কিঙ্করী নাম্নী একটি মাঝারি নদীর সাঁকো বেয়ে অতিক্রম করে তবে গাঁয়ে ঢুকতে পারা যায়। অন্যদিক দিয়ে আরও চওড়া সাঁকো রয়েচে বটে, কিন্তু এই শালকাঠের সাঁকোটা পেরোলে পথ অনেকটা কম হয়ে যায়, তারপর কিছুক্ষণের মধ্যে ঠাকুরাণীর বনটুকু পার হলেই গাঁয়ের বসতি আরম্ভ।
হরির মনটা বেশ খুশি আজ। তালুকের এক বিধবা মোক্ষদার দেড় বিঘা জমি নিয়ে জমিদার মশায়ের সঙ্গে অনেক বচ্ছর ধরে আকচাআকচি চলেচিলো। জমিদারের ঠাকুরদা মোক্ষদার শ্বশুর দুর্লভ ভটচাযকে করমুক্ত দেড় বিঘে জমি দান করেচিলেন। বিষয় সম্পত্তির ভার সারদার হাতে আসার পরই তিনি হাত বাড়ান সেই সম্পত্তিটুকু কেড়ে নেবার জন্য। দুর্লভ ভটচায মারা গিয়েচে অনেকদিন। তার ছেলে শঙ্কর ভটচায জমিদারকে জমি ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করে। কিছুদিন বিবাদ বিতর্ক চলার পর শঙ্কর ঠিক করে সদরে গিয়ে নালিশ ঠুকবে। সেই খবর কোনোভাবে এসে ওঠে সারদার কানে। রাতে শঙ্কর ভটচায আচমন করতে বাইরে বেরিয়ে আর ঘরে ফিরলে না। তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
মোক্ষদা বুকফাটা কান্না কেঁদে সন্তানকে বুকে আঁকড়ে ধরে কোমর বাঁধে সংসারের জোয়াল ঠেলার জন্য। কিছুদিন লোকলজ্জায় চুপ করে থেকে সারদা সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে অসহায় বিধবা মোক্ষদার কাছে জমিটি ফিরিয়ে নেবার প্রস্তাব পাঠায় এবং পাঠানো মাত্র টের পায় যে মোক্ষদা সহায়হীনা বিধবা হতে পারে কিন্তু বড় শক্ত ঠাঁই। সে জমিদারের লেঠেলদের গালি দিয়ে তাড়িয়ে কাঁদতে বসলো। মোক্ষদা বেশ বুঝতে পারলো যে এভাবে বেশিদিন ঠেকিয়ে রাখা চলবে না জমিদারকে। বিশেষ, এই অর্থলোভী মানুষটা তার সন্তানের ক্ষতি করার আগে দুইবার ভাববে না। মোক্ষদা মনে মনে ঠিক করলে যে সে বল্লভপুরে তার দাদার কাছে গিয়ে তার সাহায্যে হাকিমের কাছে মোকদ্দমা করবে। মোক্ষদা নিজের সম্বল, একখানা রূপার রুলি, একছড়া সরু হার আর দুইখানা কাঁসার থালা গাঁয়ের বছিরুদ্দি চাষীর কাছে জমা দিয়ে কিছু টাকা নিয়ে এল মোকদ্দমার আনুমানিক খরচ বাবদ এবং সামান্য সম্বল গুছিয়ে খুব ভোরে বেরিয়ে পড়ল বল্লভপুরের পানে।
বেশ ভোরে নায়েব এসে জমিদারের শয়নকক্ষে করাঘাত করতে সারদা বিরক্ত হয়ে নিদ্রাতুর কণ্ঠে শুধালো, “কে ডাকে?”
“হুজুর, আমি রামকমল। খুব জরুরী বিষয়ে হুজুরে হাজির হয়েছি….”
গৃহিণী কপাট খোলার সময়ে নায়েব চক্ষু অবনত করে রইলো। কিয়দক্ষণ পর কপাট পেরিয়ে সারদা বাইরে এসে কইলো, “কী ব্যাপার নায়েবমশাই? সঙ্গে এটি কে? বামুন পুকুরের পাশে এর আবাদী আছে না?”
নায়েব কইলো, “হাঁ হুজুর, এ হুজুরের প্রজা বছিরদ্দি। মোক্ষদা বামনী গতকাল এর কাছে অলঙ্কার আর থালা বাঁধা রেখে টাকা সংগ্রহ করে খুব ভোরে কোথায় যেন রওয়ানা দিল ছেলের হাত ধরে। ঘরে বেশ করে কুলুপ এঁটে গিয়েচে। বছিরদ্দি কাকভোরে তাকে যেতে দেখেই খবর দিতে এসেচে।”
সারদার মুখ থেকে নিদ্রা সম্পূর্ণ দূর হয়ে তার চোখ জ্বলে উঠল। সে মনে মনে কইলো, “আমি এক বেধবা বামনীর বুদ্ধির সঙ্গে এঁটে না উঠবো তো পাকা জমিদার হলাম কী করতে? শয়তানীর দশদিকে সহায় সম্বল নাই, সে টাকা নিয়ে যাবে কোথা? বল্লভপুরে তার এক ভাই না দাদা মুন্সেফের চাকুরী করে। তবে তার কাছেই চলেচে আমার সর্বনাশ করতে।” সারদা চিবিয়ে চিবিয়ে কইলো, “তোমরা এখন যাও। নীচে গিয়ে হরিকে এখুনি পাঠিয়ে দাও।”
হরি গোমস্তা সারদার কুটিল অভিসন্ধি চরিতার্থ করতে ছয়জন লাঠিয়াল নিয়ে ওৎ পেতে রইলো বল্লভপুরের বনে। এখান থেকে মোক্ষদার পিত্রালয় নজর করা চলে। সারা দুপুর খাপ পাতার পর বিকেলের একটু আগে মোক্ষদার ছোট ছেলেটি খেলতে বেরোলো উঠানে। আরও কিছুক্ষণ পর মোক্ষদা দুধের বাটি হাতে ছেলের নাম ধরে ডাকতে থাকলো, কিন্তু সাড়া পেলো না। তখন সে চিন্তিত হয়ে এদিকে ওদিকে খোঁজ করতে করতে পিছনে ঘুরতেই মাথায় এসে পড়ল ভারী লাঠির আঘাত।
মোক্ষদাকে তারা আধমরা অবস্থায় হিঁচড়ে আনলো জঙ্গলের ভিতরে। ছেলের মৃতদেহের পাশেই মোক্ষদাকে এনে ফেলল তারা। বিধবা নিজের অসহ্য পীড়া ভুলে ছেলের রক্তাক্ত মৃতদেহ জড়িয়ে বুকফাটা কেঁদে উঠতেই একজন লেঠেল সড়কির লোহার ফলাটা গেঁথে দিল মোক্ষদার গলায়। সন্তানহারা মায়ের কান্না স্তব্ধ হয়ে গেল। মাতা পুত্রের মৃতদেহে পাথর বেঁধে টোকাপানার ডোবায় ডুবিয়ে দিল হরি গোমস্তা, তারপর মোক্ষদার পথের উপরে ফেলে আসা দুধের বাটিটা তুলে এনে ডোবাতে ছুঁড়ে ফেলে ফিরতি পথ ধরল কাঁকড়াঝোরার
হরি গুণগুণ করে গান গাইতে গাইতে সাঁকোয় উঠল লেঠেলদের সঙ্গে। সাঁকোটা যথেষ্ট শক্তপোক্ত। গাঁয়ের লোকেরা নিত্য এই পথে চলাফেরা করে। আজ সাঁকোর মাঝখানে গিয়ে হঠাৎ হরির কানে এল একটা ক্যাঁচচ করে শব্দ। এক পা দাঁড়িয়ে আবার পা ফেলতেই আবার সেই আওয়াজ। হরি বিরক্ত হয়ে কইলো, “আ মলো যা, সবকটা দানব মিলে একসঙ্গে কুচ করচিস নাকি? এমনিতেই শালের সাঁকো। তোরা থাম, আমি পার হই, তারপর একজন করে আয়।”
এই বলে হরি দুই পা এগোতেই আবার সজোরে কাঠ বাঁকানোর মতো শব্দটা এসে ধাক্কা মারলো। এবার হরির কানেও যেন একটু অস্বাভাবিক ঠেকলো সেটা। হরির একার চলায় এতখানি শব্দ হতে পারে না। তবে কিসের আওয়াজ ও? হরি অসোয়াস্তি ঢাকতে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে সাঁকোর শেষ প্রান্তে পৌঁছাতেই সেই শব্দটাও বেড়ে গেল, আর ছয়জন লেঠেল হুড়োহুড়ি করে দৌড়ে হরির পাশে এসে দাঁড়িয়ে ভয়ে ভয়ে সাঁকোটা দেখতে লাগল।
চাঁদের আলোয় দৃশ্য কিছু অস্পষ্ট নয়, কিন্তু কিছু তো চোখে পড়চে না? হরি লেঠেলদের কিছু একটা বলতে যাচ্ছে, হঠাৎ সাতজন মানুষ একসঙ্গে চমকে উঠল! আবার সেই শব্দ! ফাঁকা সাঁকোয় ও কীসের আওয়াজ? হরি শুষ্ক ঠোঁট চেটে বললে, “হুজুরকে বলে এটাকে ভেঙে নতুন করে গড়াতে হবে দেখচি।”
লখিয়া সভয়ে বললে, “না দিন্ডামশাই, সাঁকোর কিচ্ছুটি হয়নি। মনে হচ্চে কিছু একটা যেন সাঁকোটার নীচ বরাবর চলে বেড়াচ্চে ঝুলে ঝুলে!”
হরি অবিশ্বাসের সঙ্গে বললে, “তোর মাথাটা একেবারে খারাপ হল লখিয়া? সাঁকোর নীচে কখনো কেউ চলে? চলা যায়?”
বাকি লেঠেলদেরও তেমনই বোধ হয়েচে কিন্তু গোমস্তার অবিশ্বাস দেখে তারা কথা কইলো না। তারা ঠাকুরানীর অগভীর বনের সরু পায়ে হাঁটা পথে প্রবেশ করতেই পিছন থেকে ক্ষীণভাবে একটা ঝুপুস করে শব্দ পেতেই লখিয়া চীৎকার করে উঠল, “শুনলেন? তোমরাও শুনলে? উঁচু থেকে কি একটা যেন কিঙ্করীর জলে ঝাঁপ দিলে! গতিক বড় ভালো ঠেকচে না ভাইসকল। দ্রুত পা চালাও।
দলটা পুরোপুরি ভীত না হলেও কিছুটা অজানা অস্বস্তিতে পড়েছে, কিন্তু তারা সাধারণ গৃহস্থ নয়, নরহত্যাকারী খুনিয়া লেঠেল। অচিরেই ভয়ভীতি ঝেড়ে ফেলে নিজেদের মধ্যে কথা কইতে কইতে চলেচে, হঠাৎ একটা গাছের মাথায় একসঙ্গে সমস্ত পাখি ডেকে উঠে অস্বস্তিটা আবার ফিরিয়ে নিয়ে এল। এমনিতে চাঁদনী রাতে ফটফটে আলো দেখে পাখিরা ভুল করে জেগে ওঠে অনেক সময়, কিন্তু এ তো জাগার শব্দ নয়! কেউ বা কারা যেন জোর করে জাগিয়ে দিয়েচে তাদের হঠাৎ।
জোর কদমে পথ চলতে চলতে বনের একপাশে খুব ক্ষীণভাবে একটা চাবুক চলার মতো সপাং করে শব্দ কানে এল। প্রথম মনের ভুল ভেবেচিল হরি, কিন্তু দ্বিতীয়বার আবার সপাং করে আবছা শব্দ পেতেই হরি শুধালো, “কীসের শব্দ রে লখিয়া? এ তো জ্বালালে দেখচি?”
লখিয়া দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে কইলো, “আমিও শুনেচি হুজুর। বেত আছড়া
সাপে এইরকম শব্দ করে অনেক সময়ে।”
লখিয়া উত্তর দিল ঠিকই, কিন্তু নিজের উত্তরটা যে তার নিজেরই বিশ্বাস হয়নি পুরোপুরি, তা তার স্বরেই প্রকাশ।
আরও বার দুয়েক এদিক ওদিক থেকে শব্দটা পেলো হরি। সাপের শব্দ হয়ে থাকলে বলতে হয় সাপটা তাদের সরু পথের পাশাপাশিই চলেচে। বন শেষের মুখে। গাঁয়ের কিছু বাড়ির মেটে জানালা দিয়ে তিলের তেলের পিদিমের উজ্জ্বল আলো চোখে পড়ছে। গ্রাম ধুয়ে যাচ্চে চাঁদের আলোয়। হরির মনটা নিশ্চিন্ত হয়ে এল। হরি গলা খাটো করে কইলো, “আজ বিকেলের ঘটনা নিয়ে কোনো রকম আলোচনা কিন্তু নয় কারুর সঙ্গে। হুজুর তোদের সবাইকে ভালো পুরস্কার দেবে, বুঝলি সবাই?”
পিছন থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে পিছনে ঘুরে তাকাতেই হরির বুকে কে যেন হাতুড়ি মারলো! পিছনে লখিয়া ছাড়া কেউ নেই! বাকি পাঁচটা দানবের মতো লেঠেল গেল কোথা? লখিয়া ভীষণ ভয়ে বারবার লেঠেলদের নাম ধরে চীৎকার করতে থাকলো, কিন্তু কেউ উত্তর দিল না বনের থেকে। এদিকের চাঁদের আভা কিছুটা বনের ভিতরে পথ বরাবর ঢুকেচে। সেদিকে তাকিয়ে লখিয়া দৌড়ে এগিয়ে গেল। সঙ্গে হরিও।
মাটির উপর দিয়ে ভারী কিছু জিনিসকে যেন ঘষটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ভীষণ শক্তির সঙ্গে। একপাটি জুতা পড়ে রয়েচে শুঁড়িপথের উপরে। হরির শরীরে কাঁপুনি ধরল এই দৃশ্যে। লখিয়া নীচু হয়ে মাটির এক জায়গায় হাত বোলাতে ভেজা মতো ঠেকলো। হাতটা নাকের সামনে এনে ঘ্রাণ নিয়ে লখিয়া প্রচণ্ড আতঙ্কে চীৎকার করে উঠল, “হুজুর… রক্ত!”
হরি গোমস্তা ভয়ানক আতঙ্কে পড়িমরি দৌড়াতে আরম্ভ করল জমিদার বাড়ির দিকে। লখিয়া দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে নেমে পড়ল বনের সীমান্তে একজনের ধানের জমিতে। হরি ছুটতে ছুটতেই অনুভব করল, তাকে লক্ষ্য করে কিছু একটা যেন এগিয়ে আসচে!
হরি বেদম হয়ে জমিদার বাড়ির ফটকের কাছে পৌঁছাতেই তার মনে হল, পিছনের সেই অদেখা আততায়ী পিছু করা বন্ধ করে দিয়েচে। ফটকের দুইদিকে চারখানা বড় বড় হ্যাজাক জ্বলচে, গোটা চারেক দ্বারবান গল্প করচে। ফটকের সামনেটা আলোয় আলো হয়ে রয়েচে। হরি ছুটে এসে ফটকের উপর আছড়ে পড়ে চীৎকার করে উঠল, “হারামজাদার দল, শিগগির ছোটফটক খোল।”
দ্বারবানরা গোমস্তাকে এই অবস্থায় দেখে তটস্থ হয়ে দ্রুতহাতে আড়-ফটক খুলে দিয়ে উদগ্রীব হয়ে শুধালো, “একি হুজুর, আপনার এই অবস্থা?”
হরি হাত দেখিয়ে উত্তর দিতে দিতে আড়-ফটকটার ভিতরে একটা পা বাড়িয়েচে, হঠাৎ সপাং করে একটা শব্দের সঙ্গে একটা কুচকুচে কালো সাপের মতো কি যেন ছুটে এসে হরির কণ্ঠনালী পেঁচিয়ে ধরল!
দ্বারবানরা লেঠেল বা সিপাহী নয়। তারা এই দৃশ্য দেখে ভীষণ চমকে উঠে ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করল। ফটকের সামনের আলোর গন্ডীর ওপারে যে অন্ধকার চাপ বেঁধে রয়েচে, সেই অন্ধকারের মধ্যে আরও অন্ধকারের পিন্ডের মতো কি যেন একটা দাঁড়িয়ে রয়েচে জ্বলন্ত চোখ নিয়ে! সেটা সড়াৎ করে জিভ টানার মতো শব্দ করল, আর হরি গোমস্তা সমেত তার কাঁটাওয়ালা রাক্ষুসে জিভটা অদৃশ্য হল ওই অন্ধকারের মধ্যে। ফটকের সামনে কিছুটা রক্ত ছিটকে পড়ে রইলো। দ্বারবানরা ‘আই বাপ রে…’ চীৎকার করে ফটক ফেলে যে যার পালিয়ে গেল ঊর্দ্ধশ্বাসে।
(৫) বিলের দানো
গোমস্তার নিকেশ হবার পর গোটা গাঁয়ে বেজায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। যেমনটা পাড়াগাঁয়ে আকচার হয়ে থাকে। সাঁঝ নামার পর বাইরে বেরোনো বন্ধ হয়ে গেল। গাঁয়ের বৃদ্ধ প্রজারা ইষ্টিদেবতা স্মরণ করতে শুরু করল, আর যুবকরা কথাটা উড়িয়ে দিয়ে কইলো, “রামোঃ, ভূতটুত সব বাজে কথা, এ নির্ঘাৎ মিঞাবাবার কাজ।”
ভূতই হোক বা বাঘ, গাঁয়ের পথঘাট কিন্তু নিরিবিলি হয়ে পড়ল রাত নামতেই। কেউ কেউ নিজের টালির ঘরে শুয়ে বেশ রাতের দিকে স্পষ্ট শুনেচে, গাঁয়ের পথ দিয়ে খুব জোরে জোরে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে যেন কোনো জানোয়ার চলাফেরা করচে। একটা চাপা আতঙ্ক জমাট বেঁধে রইলো কাঁকড়াঝোরার বুকে
এবার যে দিনটার কথা বলচি, নায়েব রামকমলও সেদিন বিশেষ দেওয়ানী আবশ্যকতা না থাকলে কক্ষণও ঘর থেকে অতদূরে বেরোতো না। দুপুর গড়ানোর মুখে মুদী ভবাণী এসে জমিদারকে কইলো, “হুজুর, মোতীহারির আশুতোষ বাঁড়ুজ্জে গোরুর গাড়ি ডেকেচে। সে গাঁ ছেড়ে চুপিচুপি পালিয়ে যাচ্চে হুজুরের খাজনার ভয়ে।”
বাস্তবিকই ব্রাহ্মণের অনেকগুলো টাকা বাকি পড়েচে। প্রায় দুই হাজার টাকা। তবে সে টাকা শুধু খাজনার নয়, দরিদ্র আশুতোষ বচ্ছর চারেক আগে কাছারি থেকে দেড়শ টাকা ধার নিয়েচিল গরু কেনার জন্য। দারিদ্র্যের তাড়নায় কেনা হয়নি। টাকাটা খরচ করে ফেলে সে। ঠিক তিন বছরের মাথায় গোমস্তা এসে আশুতোষকে বলে, “ঠাকুর, আপনি সুদ তো দিয়ে চলেচেন কোনো মতে, কিন্তু আসলটা দেবার কী বন্দোবস্ত করলেন তাই জানতে পাঠিয়েচে জমিদার মশায়।”
ব্রাহ্মণ গোমস্তাকে ভয় করতো। সে হাতজোড় করে বলে, “আর কয়েকটা মাস দাঁড়াও বাবা, আমি যেভাবে পারি দেড়শ টাকার বন্দোবস্ত করচি।”
গোমস্তা খলখল করে হেসে বলে, “কথা কি কও ঠাকুর, শুনলে হাসতে হাসতে প্রাণটা আইঢাই করে। সে টাকা কি দেড়শ হয়েই আছে? সুদে আসলে মেলাই টাকা হয়ে গিয়েচে না?”
আশুতোষ হতভম্ব হয়ে বললে, “বেড়েচে কী রকম? আমি তো সুদ চুকিয়ে গিয়েচি এতদিন ধরে!”
গোমস্তা হাত উলটে বলল, “সেসব খুব জটিল হিসেব ঠাকুর, তুমি কষতে পারবে না। ওসব নায়েবমশাই কষে দিয়েচেন। এখন তোমার দেনা সর্বমোট দুইটি হাজারে দাঁড়িয়েচে। শোধ করো তো বলো, নাহলে একটা বছর সময় নাও, পুরো টাকা শোধ করো। নাহলে তোমার ছেলেটাকে বাবুদের বাড়ি মুনিষ খাটতে পাঠিয়ে দাও। বছর পাঁচেক খেটে শোধ করুক বাপের দেনা।”
ব্রাহ্মণের মনে হল এখুনি এই জীবন্ত শয়তানটাকে দাঁতে ছিঁড়ে ফেলে, কিন্তু তার সাধ্যে কুলালো না। কাঁদতে কাঁদতে এক বছরের মওলা স্বীকার করলে সে। সেই বছর শেষ হতে আর একটা হপ্তা বাকি। হতদরিদ্র বামুন উপায়ান্তর না দেখে বাড়িটুকু আর একচিলতে জমি ফেলে পুত্রের হাত ধরে রাতের আঁধারে রওয়ানা দেবে ভিন তালুকে ভাগ্যের উপর নির্ভর করে। সেই কথা আশুতোষ বুঝি পরম বিশ্বাসে কখনো বলে ফেলেচে মুদীর কাছে। সেই মুদী এসে খবর দেয় জমিদারিতে। সারদা দুইটা টাকা পুরস্কার দিয়ে নায়েবকে পাঠালো বিকেলের মধ্যে গিয়ে বামুনের ছেলেকে কেড়ে আনতে।
ব্রাহ্মণ হঠাৎ নায়েবের সঙ্গে দুটো লাঠিধারী লোককে আসতে দেখে ছেলেকে নিয়ে লুকিয়ে পড়েচিল বাড়ির পিছনের ডুমুরি দীঘির পাড়ে একটা কসাড় ঝোপে। বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর নায়েব রামকমল বিকেল শেষের মুখে দেখা পেয়েচিল অসহায় পিতা পুত্রের। তাদের সঙ্গে ঠিক কি হয়েছিল বা ঘটেচিল তা বলে তোমাদের ভারাক্রান্ত করতে চাইনে। আমি যা জানি আমার বুকেই থাকুক না হয়।
যা-ই হোক, যা বলচিলাম,
বাপ ছেলের ব্যবস্থা করে বামুনের ঘরে ঢুকে তোরঙ্গ হাতড়ে কিছু টাকাপয়সা পেয়ে একগাল হেসে নায়েব রামকমল সেগুলো ভরে নিলো নিজের থলিতে, তারপর জমিদার বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। ব্রাহ্মণের বাড়ির পিছনে যে ডুমুরি দীঘিটার কথা বললাম, সেটার আকৃতি অতি প্রকাণ্ড। সেই দীঘির এপারের ঠিক যেইখানে বামুনের কুটির, বিশাল দীঘিটাকে অর্ধচন্দ্রাকারে বেড় দিয়ে এসে ঠিক তার ওপারের বিন্দুতে এসে দীঘিকে পিছনে ফেলে যেতে হয় কাঁকড়াঝোরের দিকে।
তো, এই অর্ধচন্দ্রাকৃতি পরিধিটা কিন্তু নেহাত কম দীর্ঘ নয়। রামকমল এবং তার লেঠেলরা জোরকদমে হেঁটে, জলাশয়টাকে বেড় দিয়ে যখন দীঘির ঠিক ওপারে পৌঁছেচে, তখন আঁধার নেমে পড়েচে গাঁয়ে। রামকমল নায়েব। সে লেঠেল বা গোমস্তা নয়। সরাসরি খুনখারাপি জাতীয় ঘটনায় সে অভ্যস্থ নয়। তার চোখ একবার চলে গেল দীঘির ওপারে চাঁদের আলোয় ঝাপসা দেখতে পাওয়া আশুতোষের কুটিরটার দিকে। এই জায়গাটা পার হলে বাঁচা যায়। আচ্ছা, তাদের কেউ দেখে ফেলেনি তো? এই ভাবতে ভাবতে রামকমল যখন দীঘির দিকে পিছন করে কাঁকড়াঝোরার পথটা ধরতে যাবে, তখনই তার ধরা পড়ার আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করেই দীঘির ওপারে ঝাপসা মতো লন্ঠনের আলো দেখা দিল।
নায়েবের বুকটা দুরুদুরু করে উঠল। একেই বলে কপালের ফের। কোন হতভাগার দলের এখনই দরকার পড়ল দীঘির পাড়ে? তারা ইতিমধ্যে বাপ ছেলেকে আবিষ্কার করে ফেলেনি তো? রামকমল একটু ভীত স্বরে বললে, “ওরে শুনচিস? কারা আলো নিয়ে জুটেচে রে ওধারে? কেউ দেখেনি তো তখন তোদের?”
লেঠেল বক্কা কোনো শব্দ না করে আঁধারে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে দীঘির ওপারটা সরু চোখে দেখে শুষ্ক কণ্ঠে বললে, “আশ্চর্য! লন্ঠনের আলো ঝোপের অতখানি উপরে কেমন করে রয়েচে নায়েবমশাই?”
নায়েব সে কথায় ফিরে তাকাতেই দেখল আলোটার ঠিক পাশাপাশি আরেকখানা আলোর বিন্দু ফুটে উঠেচে। ঠিক যেন, কোনো বিশালাকার পশু এতক্ষণ ঝোপের আড়ালে নিজের অর্ধেক মুখ লুকিয়ে রেখে এদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজর করচিল। এখন মুখটা সরাতেই দু’খানা চোখ ধ্বক ক করে বলে উঠল পাশাপাশি।
বিষ্টু লেঠেল সভয়ে বলে উঠল, “ওটা কী সর্দার? কালো ছায়ার মতো ওৎ পেতে রয়েচে যেন? মিঞা নয় তো?”
বাঘের কথাতেও নায়েব ততো ভয় পেলো না, কারণ এত বিশাল প্রশস্ত দীঘি পেরিয়ে কোনো পশুর চটজলদি আক্রমণ করার সাধ্য কি। রামকমল পিরানের পকেট থেকে কচ্ছপের খোলের চশমাটা বের করে চোখে বসাতেই যেন চাঁদের আলো, ডুমুরি দীঘি, সব নিকষ অন্ধকারে ঢেকে গেল। চাঁদের আলো পলকের মধ্যে মুছে ফেলে কেউ যেন প্রকৃতির বুকে গাঢ় কালি ঢেলে দিয়েচে! বাতাসে দুইবার খুব আবছা চাবুক আছড়ানোর মতো শব্দ পেলো রামকমল। চোখে কিছু দেখতে না পেয়ে তাড়াতাড়ি চশমাটা খোলা মাত্রই প্রচণ্ড আতঙ্কে বোবা হয়ে গেল!
একটা দানবের মতো কুচকুচে কৃষ্ণবর্ণ অতি ভয়ঙ্কর মূর্তি যেন ওপার থেকে এক লাফে এপারে এসে দাঁড়িয়েছে একেবারে রামকমলের সামনে দুই হাতের তফাতে। তার চোখদুটো থেকে আগুনের আভা ঠিকরে বেরুচ্চে! রামকমল অচেতন হতে গিয়েও বুঝতে পারল, তার দুই লেঠেলের কোনো চিহ্নই নেই আশপাশে! রামকমল বুকফাটা চীৎকার করে ওঠা মাত্রই একটা কর্কশ, ধারালো জিভ এসে তার গলাটাকে সহস্রনাগের মতো পেঁচিয়ে ধরল। নায়েবের শিথিল হাত থেকে টাকার থলিটা খসে পড়ল। অতি ভয়ঙ্কর অবয়বটা অবলীলায় দীঘি অতিক্রম করে চলে গেল ওপারে, শুধু দীঘির কোণায় একটা ঝুপড়িতে মাছ-পাহারায় বসে থাকা পরাণ মুৎসুদ্দি পুরো ঘটনাটা কাঁপতে কাঁপতে দেখল বেড়ার ফাঁক দিয়ে, আর পিশাচটা চলে যেতেই সে প্রাণভয়ে এলোমেলো হয়ে ছুটে পালিয়ে গেল।
(৬) টেক্কা
জমিদার সারদা সমস্ত ঘটনা জেলের মুখে শুনে নির্বাক হয়ে গেল। তার গোটা শরীরে এক অদ্ভুত কাঁপুনি শুরু হল। শুধু সারদাই নয়, গোটা তালুকের প্রজারাই মোটামুটি অনুমান করতে পেরেচে যে কার অশুভ প্রভাব এই পরপর নৃশংস নরহত্যার ঘটনা ঘটিয়ে চলেচে। জমিদারের ভয়ে কোনো রায়ত মুখ না খুললেও তারা মনে মনে হরির প্রতি সারদার নিষ্ঠুরতার জন্য তাকেই এই গণনিধনের হোতা মনে করে তার নিপাত কামনা করতে শুরু করেচে। সারদাও এটা বিলক্ষণ বুঝতে পেরেচিল। একটি দুইটি চারিটি প্রজার বিদ্রোহ দমন করা সারদার কাছে বাঘ-ছাগল খেলার তুল্য, কিন্তু একসঙ্গে সব প্রজা বিদ্রোহ করে বসলে সমূহ বিপদ। বিদ্রোহ দমন করা যায়, বিপ্লব নয়। সারদা দূর লঙ্কাগ্রাম হতে সেখানকার নামজাদা বনাই গুণীনকে প্রণামী দিয়ে ডেকে পাঠালো।
বনাই সাঁঝ পেরিয়ে কাঁকড়াঝোরে এসে উপস্থিত হল। সারদা তাকে সাদরে নিজের গৃহাভ্যন্তরে আমন্ত্রণ জানালে পর বনাই ধীর পায়ে জমিদার বাড়ির দেউড়িতে পা রেখে নাকটা কুঞ্চিত করে দাঁড়িয়ে পড়লে। বনাইয়ের দুই শিষ্য গুরুর আচরণ বেশ বোঝে। তারাও দুই পা পিছিয়ে এসে গুরুর পাশে দাঁড়িয়ে সন্দিগ্ধভাবে চারদিক দেখতে শুরু করল। সারদা একটু অপ্রস্তুত হয়ে এসে কইলো, “কী হল ঠাকুর? দাঁড়িয়ে পড়লেন যে?”
বনাই দেউড়ি থেকে একটু মাটি তুলে দুই হাতের তালুতে ঘষে তার ঘ্রাণ নিলো, তারপর সরু চোখে একবার মহলটার বাইরে নজর বুলিয়ে ফটকের সামনে গিয়ে আবার মাটি তুলে গন্ধ শুঁকলো। তারপর বাতাসে ঘ্রাণ নিতে নিতে বাইরে একটা গুল্ম ঝোপের কাছে গিয়ে স্থির হয়ে, খুব জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস নিয়ে শিষ্যদের পানে চেয়ে তর্জনী ও অনামিকা ভাঁজ করে হাতটা তুললো। এ কীসের ইঙ্গিত তা সারদার বোঝার কথা নয়, কিন্তু শিষ্য দুইজনের সামান্য চমকে ওঠাটা কিন্তু তার সতর্ক নজর এড়ালো না। সারদা ঠোঁটটা চেটে শুধালো, “কী হয়েছে ঠাকুর?”
বনাই অসন্তুষ্ট মুখে সারদার দিকে চেয়ে বললে, “অপজীবটা এইখানে ঘাঁটি নিয়ে বোধহয় নজর করেচে কখনো মহলের দিকে। আমি গন্ধ পাচ্চি এখানে।”
জমিদারের কিছু বলার আগেই ফটকের দ্বারবান হাঁ হাঁ করে বলে উঠল, “হাঁ বাবাঠাকুর, সেইদিন রাতে ওইখানেই কি যেন একটা দাঁড়িয়েচিলো অন্ধকার মতো। চোখ জ্বলচে!”
বনাই গম্ভীর স্বরে শুধালো, “আকার কেমন? আর কিছু দেখেচো? চেনা কারুর মতো ঠেকেচে?”
সারদা কথাটা ধামাচাপা দেবার জন্য কৃত্রিম হেসে উঠে কইলো, “এসব ছোটলোকের কি দেখার ঠিক আছে ঠাকুর? ছাই দেখতে রাই দেখে। আপনি ওই শয়তান পিশাচটাকে নির্মূল করার ব্যবস্থা করুন।”
বনাই হঠাৎ হাতের চিমটে তুলে সারদার কণ্ঠে ঠেকিয়ে বজ্রপাতের মতো ফেটে পড়ে চীৎকার করে উঠল, “চোওওপ বেআদব! তোর এত বড় সাহস তুই আমার কথা কাটিস? বনমালী তান্ত্রিকের মুখে মুখে কথা? আমি তোকে কথা কইতে অনুমতি দিয়েচি কি এখন?”
সারদা এতগুলো কর্মচারীর সামনে এই অপমানে এতটুকু হয়ে গেল। একজন গুণীন যে জমিদারকে এভাবে মারমুখী হয়ে ধমক দিতে পারে তা চিরকাল অধস্তনদের আর পরিবারের প্রতি হুকুম জারি করা সারদার পক্ষে কল্পনার অতীত! তার অপ্রস্তুত মুখের দিকে চেয়ে বনাই কিছুটা শান্ত হয়ে অসন্তুষ্ট মুখে বললে, “তুমি বাছা লোক বড় ভালো নও। গুণীন, হাকিম আর বৈদ্যকে সব সত্য কথা বলতে হয়, কিন্তু তুমি গোপন করেচো। যাকে শয়তান পিশাচ বলচো, সে পিশাচ হয়েচে কার জন্য? তার থেকে বড় পাপিষ্ঠ তো তুমি।”
সারদা মাথা নীচু করে আড়চক্ষে বনাইয়ের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করতে লাগল। গুণীনের মনোভাব যদি এই হয়, তবে তো চিত্তির।
সারদা চতুর, কিন্তু বনাইয়ের থেকে নয়। গুণীন একটা কাটি দিয়ে ফটকের মাটিতে লম্বা দাগ কেটে, কাটিটা ফেলে দিয়ে শ্বাস ফেলে কইলো, “যা ভাবচো তা নয়। আমি আমার সর্বশক্তি দিয়ে ওই প্রেতকে শেষ করার চেষ্টা করবো। তার অতীত দেখে আমার কাজ নাই, এখন সে নরঘাতক হিংস্র এক অশুভ শক্তি এবং সেটাই তার একমাত্র পরিচয়। আগামীকাল ভালো পূর্ণিমা রয়েচে। চান্দ্র রাশিতে ধনু এবং সৌর রাশিতে মিথুন অধিষ্ঠিত থাকবেন। তায় শনিবার। আমি কালই শুভ শক্তিদের একত্রিত করে ওই শয়তানকে পরাভূত করবো। আমার যা যা দ্রব্য প্রয়োজন তা ওই ওর কাছে লিস্টি করা আছে। সেগুলো এমন কিছু দুর্লভ নয়, বাড়িতেই পেয়ে যাবে হয়তো। বাকিগুলো আমার ঝোলায় আছে। আমি কালকে বিকেলে চন্দ্রোদয়ের পরই যজ্ঞে বসবো। তবে এখানে হবে না। যেখানে প্রেতটির আনাগোনা অপেক্ষাকৃত কম, সেই স্থানকে বেছে নিতে হবে। নচেৎ সে অজস্র বিঘ্ন ঘটাবে। আমার সঙ্গে দুইটি লোক এবং একখানা গোরুর গাড়ি দাও। আমি গোটা গ্রাম ঘুরে দেখবো। তোমরা আর কেউ জমিদার বাড়ির বাইরে পা রাখবে না।”
বনাই নিজের দুই শিষ্য এবং দুইজন গাঁয়ের লোককে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল কাঁকড়াঝোরায় যজ্ঞভূমি অন্বেষণ করতে। সারদার দেউড়িতে অনেকগুলো হ্যাজাকবাতির আলো জ্বলে পুরো উঠানের চৌহদ্দিটা আলো করে রেখেচে। সারদা কয়েকজন লেঠেল, সরকার মশাই এবং কাছারির বৈদ্যকে নিয়ে একখানি চৌপাই বিছিয়ে বসে কথাবার্তা কইচে আর অপেক্ষা করছে, কখন গুণীন তার কাঙ্খিত যজ্ঞভূমি খুঁজে পায়। তৎক্ষণাৎ সেই ভূমি সকাল সকাল পরিস্কার করাতে হবে। দুইজন ভৃত্যকে অন্দরে পাঠানো হয়েছে লিস্টি মিলিয়ে উপকরণগুলি একত্রিত করার জন্য। নীচে বসা একজন লেঠেল কইলো, “হুজুর, এই গুণীন পারবে তো শয়তানটাকে শেষ করতে?”
সারদা দৃঢ় কণ্ঠে বললে, “শোনো কথা, কেন পারবে না? বনাই যেমন তেমন গুণীন নয়। আমি তার অতখানি ধৃষ্টতা হজম করেচি শুধুমাত্র এই কারণেই। একবার শয়তানটাকে বধ করুক, তারপর গুণীনকে শিক্ষে দেবার জন্য তোরা তো রয়েচিস।”
একজন লেঠেল বেজার হয়ে বললে, “আর এসব লোককে ঘাঁটিয়ে কাজ নাই কর্তা। হরিহরকেও এই সড়কি দিয়েই নিকেশ করেচি আমরা সবাই। অর্ধেক তার শিকার হয়ে গিয়েছে, আর আপনার আশীর্বাদে আমরা কয়জন এখনও ঠিক রয়েচি। এখন এই বাবাঠাকুর ভালোয় ভালোয় কাজ সারতে পারলে হয়। ওই যে, কী যেন বলচিল, শয়তানটা বাধা দেবে না কী সব?”
সারদা সেই কথা উড়িয়ে দিয়ে বললে, “ওসব ওরা বলে। বনাই গুণীনের কাছে হরিহরের প্রেত খাপ খোলে তার সাধ্যি কি?”
সারদা হয়তো পরিপূর্ণ আস্থা থেকেই কথাগুলো বলেচিলো, কিন্তু তার হিসাব যে কতখানি মারাত্মক ভুলে ভরা, তা প্রমাণ হল একটু পরেই!
কথাবার্তা কইতে কইতে হঠাৎ ফটকের বাইরের দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল সারদা! ফটকের আলোর পরিধির বাইরে থেকে কে যেন একটা আবছা মতো এগিয়ে আসচে এলোমেলো পায়ে! প্রেতভয়ে ভীত সারদার বুক ছাঁৎ করে উঠল। সে চীৎকার করে দ্বারবানদের সতর্ক করে দিল। লেঠেলরাও কিঞ্চিৎ ভীত হয়ে লাঠি হাতে উঠে দাঁড়ালো। ছায়ার মতো মূর্তিটা টলতে টলতে ফটকের সামনে এসেই ভয়ে ভয়ে বাম দিকে বেঁকে গেল দৌড়ে আর একটা অদেখা বলিষ্ঠ হাতে তার অর্ধমৃত শরীরটা তুলে আছাড় দিয়ে ছুঁড়ে ফেলল প্রাচীর টপকে দেউড়িতে। সারদা ভীত কণ্ঠে চীৎকার করল, “কে? কে ওখানে?”
একজন দ্বারী ভীষণ বিস্ময়ের সঙ্গে উত্তর দিলে, “হুজুর… হুজুর, গুণীন ঠাকুর।”
সারদা লোকজন নিয়ে দৌড়ে গিয়ে যা দেখলে, তাতে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল সে। অতবড় শক্তিধর বনাই গুণীন শিশুদের মতো হাত পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েচে ফটকের ভিতরে। তার পিঠ এবং ঘাড় দিয়ে রক্তের ধারা বুকের দিকে নামচে। কেউ যেন তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে চিরে দিয়েচে শরীরটা! বৃদ্ধ বৈদ্য নীচু হয়ে পরীক্ষা করে বললে, “বেঁচে আছে। জ্ঞান ফিরতে পারে। খুব ধারালো কিছু দিয়ে সজোরে থাবা দেওয়া হয়েচে! আঘাত ভালোই, কিন্তু অচেতন হয়েচে সম্ভবত প্রচণ্ড ভয় পাবার কারণে। জমিদার মশায়, এই আক্রমণের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু একটা রয়েছে!”
লেঠেলরা রক্তাক্ত, অচৈতন্য বনাইকে তুলে এনে শুইয়ে দিল চৌপাইতে। বৈদ্য চোখেমুখে জলের ছিটা দিতে গুণীনের জ্ঞান একটু একটু করে ফিরতে লাগল। তার শরীরটা যেন ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠচে! বৈদ্য আবার মাথা নেড়ে বললে, “ঠিক ধরতে পারচি না, কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটেচে।”
সারদার আশা ভেঙে গিয়েচে আগেই। সে বিরস মুখে বললে, “স্বাভাবিক যে নয় তা আপনাকে বলে দিতে হবে না ঠাকুর, কে এসব করেছে তা সবাই জানে। কিন্তু প্রতিকার হল না।”
আচমকা বনাই পুরোপুরি চেতনা ফিরে পেয়ে ধড়মড় করে উঠে বসেই শরীরের আঘাতের যন্ত্রণায় কাতরে উঠে বিস্ফারিত চোখে সবাইকে দেখতে লাগল। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তার চোখে ভয়ের বদলে ক্রোধ ফুটে উঠল। সারদা তাকে শুধালো, “কী হয়েছে ঠাকুর? এই দশা কে করলে আপনার?”
গুণীন উত্তর না দিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বিড়বিড় করে বলল, “আমাকে একটা লেবু আর তিনটে লঙ্কা দাও এখুনি। আমার এই প্রথম এতবড় ভুল হল! এই প্রথম!”
সারদা তিক্ত কণ্ঠে শুধালো, “কী ভুল ঠাকুর?”
গুণীন চোখে আগুন ঝরিয়ে সারদার পানে চেয়ে দাঁত পিষে কইলে, “আর তা হয়েচে একমাত্র তোর জন্য পাযণ্ড! তুই আমাকে বারংবার সব লুকিয়ে চলেচিস! তুই নিশ্চয়ই ওই পিশাচটাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেচিস খুনী কোথাকার? এই কথাটা আগে বললে এই বিপর্যয় হতো না শয়তান! আমি পুরোপুরি আঁচ পেতুম ওর শক্তির। এর দায় নিতে হবে তোকেই। আমি ছাড়বো না।” তারপর সারদার দিকে দৃকপাত না করে একটু মাটি তুলে লেঠেলদের হাতে দিয়ে তাদের দিকে চেয়ে কইলো, “তোমরা বাছাই করা জনা চারেক আমার সঙ্গে চলো। আর এই মাটি মরে না-গেলে হাত থেকে ফেলবে না।” এই বলে চারদিকটা দেখে নিয়ে, ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে শশসস শব্দ করে মহলের পিছনের খিড়কির দুয়ার দিয়ে নিঃশব্দে বাইরে এল বনাই গুণীন। লেঠেলরা যাবার পূর্বে একবার সারদার পানে চাইলো। অপমানে মুখ রক্তবর্ণ হয়ে যাওয়া সারদা বিরক্তিভরে ঘাড় নেড়ে ইঙ্গিত করতে তারা গুণীনের সঙ্গে চুপিসাড়ে খিড়কি দিয়ে রওয়ানা দিল মাটিটা হাতের মুঠোয় ধরে।
তারা চলে গেলে পর সারদা রক্তচক্ষু করে বসে রইলো চৌপাইতে। তার মাথায় পরপর অপমানে আগুন ধরে গিয়েচে। এই আপদের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার দায় না থাকলে এই দুর্মুখ গুণীনকে হত্যা করতো সে আজ। কিন্তু নিজের গরজে কিল খেয়ে কিল হজম করে বসে রইলো জমিদার। বৃদ্ধ বৈদ্য ফটকের দিকে চেয়ে বসেচিলো, এখন উঠে দাঁড়িয়ে বললে, “একটা কথা ছিল…”
সারদা খেঁকিয়ে উঠল, “আপনার আবার কী কথা?”
বৃদ্ধ বিচলিত না হয়ে কতকটা চিন্তিত মুখে কইলো, “খটকাটা এইবার ধরতে পেরেচি জমিদার মশায়! খুব আতঙ্কে বাঁচার তাগিদে কেউ যদি লোকজনের দিকে ছুটে আসে, তবে সে হঠাৎ অন্যদিকে ঘুরবে কেন? গুণীন তো ফটকের সামনেই এসে পড়েছিল? দ্বারীদেরকে এবং আলোটাও দেখতে পেয়েচিলো। তাহলে ফটক ছেড়ে বাঁয়ের অন্ধকারে ছিটকে গেল কেন, আর তাকে পাঁচিল পেরিয়ে ছুঁড়েই বা ভিতরে ফেলা হল কেন? শয়তানটা তো তাকে বাইরেই ছিঁড়ে ফেলতে পারতো?”
সারদা মাথামুন্ডু বুঝতে না পেরে ফ্যাকাশে স্বরে বলল, “হয়তো পালাতে গিয়ে তাড়াহুড়ায় পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছিল।”
বৈদ্য দুশ্চিন্তায় মাথা নেড়ে কইলো, “নাকি… নাকি পুরোটাই সাজানো হুজুর?”
সারদা হতভম্ব হয়ে উত্তর দেবার আগেই কিছুটা দূরের বনের মধ্যে থেকে সমস্বরে ক্ষীণ আর্তনাদ ভেসে এল! সারদা ধড়মড় করে ফটকের দিকে দৌড়াতেই বৈদ্য তাকে ধরে ফেলে দ্বারবানদের কইলো, “হতভাগার দল, ফটক ফেলে দে। জমিদার মশায়, আমার কথা শুনুন, গুণীন কাটি দিয়ে ফটকে দাগ টেনে দিয়ে গিয়েচিল। সে উঠানের চৌহদ্দির বাইরে বেরুতেও নিষেধ করেচিল, কিন্তু তার ছলনায় আমরা সব ভুলে গিয়েচি হুজুর। বড় প্রমাদ ঘটে গিয়েচে!”
জমিদারের শরীর কেঁপে উঠল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েচে। কোনোমতে মরীয়া হয়ে বললে, “কিন্তু… কিন্তু তাহলে শয়তানটা কীভাবে সেই দাগ পেরিয়ে ভিতরে এসে আমার লেঠেলদের ভুলিয়ে নিয়ে গেল?” বৈদ্য বিষাদের শ্বাস ফেলে বললে, “সে কখন মূল ফটক দিয়ে ঢুকলো বা বেরোলো হুজুর? তখনই সন্দেহ হওয়া উচিত ছিল আমাদের…
সারদা অসহায়ভাবে টলোমলো পায়ে মহলে ঢুকে দোর দিল।
(৭) মারণ যজ্ঞ
২১শে আষাঢ়, ১৩৭০ (শনিবার):
যজ্ঞভূমি নির্বাচিত হয়েচিল কাঁকড়াঝোরের অন্তর্গত বটতলার থান এলাকার একটা ক্ষেতের মধ্যবর্তী স্থান। সেখানে যজ্ঞের উপকরণ নিয়ে যাবার পূর্বেই গাঁয়ের লোকেদের একটা ভুলের জন্য সেই স্থানটি বাতিল করতে হল বনাইকে। এমনিই গতকাল মধ্যরাত থেকে বর্ষার অঝোর বাদলা নেমেচে, তাই কিঙ্করী নদীর জলরাশি ফুলে ফেঁপে উঠেচিলো। গাঁয়ের লোকেরা কিঙ্করীর ফি বছরের মতিগতি বুঝেই শক্ত মাটির বস্তা, বেড়া আর পোড়ামাটির থান দিয়ে শক্তপোক্ত বাঁধ দিয়েচিল, কিন্তু গাঁয়ের চাষী রত্নাকর হঠাৎ বিবাদ আরম্ভ করে যে, এইভাবে বাঁধ দেওয়ার ফলে তার জমিতে রাজ্যের জল ঢুকে পড়বে। বাঁধের কোনো একটা জায়গা যেন কেটে জল নিকেশ করা হয়। গাঁয়ের বাকি চাষীরা এই পাগলের প্রলাপে কান দেয়নি। এই ফুলন্ত নদীতে নিকাশ অসম্ভব। তো, ফুঁসতে ফুঁসতে রত্নাকর রাতে একখানা কোদাল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে বাঁধ কাটতে। খুঁজে পেতে একটা জায়গায় কোপ মারতে মারতে কিছুটা মাটি সরতেই উন্মত্ত জল পাগলের মতো ঢুকে পড়ে বাঁধের বুক চিরে। মূর্খ রত্নাকর চাষীকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে তার নিজের জমি সহ আরও বহু ক্ষেত ভাসিয়ে দেয় সেই সহস্র ফণাধর জল। সেই কারণেই বটতলার থানকে পরিত্যাগ করে গুণীন বেছে নেয় অপর একটি দূরবর্তী স্থান হেঁতালঝাড়কে। এই জায়গাটা উঁচু হওয়ায় বর্ষায় সুবিধা।
সারাটা দিন ধরে হেঁতালের উঁচু বনে একটা অস্থায়ী ভাবে বানানো খড়ের ছাউনিতে বসে বসে উপকরণ ঘষে মুছে তৈরি করল বনাই আর তার দুই শিষ্য। সঙ্গে দুইজন কাছারির ভৃত্যকে দেওয়া হয়েচে সুবিধা অসুবিধা দেখার জন্য, ফাইফরমাইশের জন্য। সারাদিন ধরে বৃষ্টি হয়েছে ঝিরঝির করে, মেঘাড়ম্বর কিছুটা ফিকে হয়েছে। ঠিক সাঁঝের মুখে আকাশের পানে চেয়ে রইলো গুণীন। তার হাতে একখানা মানুষের ঊরুর হাড়। অধীর অপেক্ষার পর মেঘের ওপারে ঘৃতরঙা পূর্ণিমার চাঁদের আভা দেখা যেতেই বনাই শিষ্যদের কইলো, “পাশের খাঁড়িটায় যা, গিয়ে দেখ, সে এসে গিয়েচে।”
শিষ্য দুইজন খুব ভালো করেই জানে কে এসে গিয়েচে। আজ গুরুদেব শবের উপর বসে মারণযজ্ঞে আহূতি দেবেন। সেই লাশ ভেসে এসেচে মন্তরের টানে। অষ্টমী অথবা চতুর্দশী তিথির শনি মঙ্গলবার হল শবসাধনার প্রকৃষ্ট কাল, কিন্তু এ ঠিক শবসাধনা নয়। আপৎকালে সদগুরু শবক্রিয়া করতে পারেন প্রেতদমনের জন্য। সেই শবেরও আবার প্রকারভেদ রয়েচে।
মন্তরে বলে,
অসিবিদ্ধং, শূলবিদ্ধং, খড়্গগবিদ্ধম, জলে মৃতাম্,
বজ্ৰদষ্টং, সর্পদষ্টং, চন্ডাল চঃ বিভূতকম্।
এই ধরণের মৃতদেহে শবক্রিয়া সুপ্রশস্ত। শিষ্যরা খাঁড়িতে মৃতদেহ খুঁজতে গেলে পর বনাই ভক্তিভরে পূর্বদিকে চেয়ে গুরুপ্রণাম করে, দক্ষিণপাকে গণেশবন্দনা সেরে, যজ্ঞভূমি প্রস্তুত ও বটুক সহ যোগিনীপূজার আয়োজন করতে আরম্ভ করলে।
শিষ্যরা একখানা মৃতদেহ নিয়ে উপস্থিত করল যজ্ঞভূমিতে। শব দেখে সন্তুষ্ট হল বনাই। উত্তম শব। আদর্শ ধারক। তরুণও বটে, বলশালীও বটে। সদ্য সদ্য জলে ডুবে জীবন হারিয়েচে। শিষ্যরা শবকে শুদ্ধ জলে স্নান করিয়ে, অঙ্গে রক্তচন্দন লেপন করে, নিয়ম অনুযায়ী শবের হাত ধরে টেনে এনে সূর্যচক্রের মধ্যে শুইয়ে দিল। বনাই লক্ষ্য করল, বৃষ্টির তেজটা যেন হঠাৎ অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে। সেই সঙ্গে পাগলের মতো হাওয়া বইচে। ভৃত্য দুইজন এইসব দেখে ভীত হয়ে কিছুটা দূরে গিয়ে কলাপাতায় তামুক খাচ্চে।
বনাই একখানা কলাপাতায় মোড়ানো পোড়া শোলমাছের টুকরো বে করে শবের উদ্দেশ্যে প্রদান করে, মৃতের মুখে পান লবঙ্গ গুঁজে দিয়ে তার উদ্দেশ্যে পুষ্প নিবেদন করা মাত্র মৃতদেহের গাত্রবর্ণ হঠাৎ রক্তিম হয়ে উঠল! শিষ্যদের কাছে এই অভিজ্ঞতা নূতন। তারা বনাইয়ের দিকে চাইতেই আরও চমকে উঠল! তান্ত্রিকের মুখ আতঙ্কে সাদা হয়ে গিয়েচে! অমন দুঃসাহসী মানুষটা যেন ভয়ে বাঁশপাতার মতো কাঁপচে! শিষ্য দুইজন বিস্মিত হয়ে শুধালো, “কী হয়েচে গুরুদেব? কোনো ভুল করেচি কি?”
বনাই ভীত স্বরে কইলো, “এ কার শব নিয়ে এসেচিস তোরা! এ যে দানোয় পাওয়া শব! একে কোনো কুটিল পিশাচ তার ছলনায় ভুলিয়ে মেরেচে! রক্তবর্ণাং যদিদ বশ্যেত ভক্ষয়েৎ শবসাধকম্! পুষ্প নিবেদনে শব রক্তবর্ণ ধারণ করলে সে সাধককে গিলে খায়!”
ভৃত্য দুইজন বুঝতে পারচিলো কিছু একটা গোলমাল হয়েচে। তারা গুটি গুটি এগিয়ে এসে হঠাৎ চীৎকার করে উঠল, “এ কী! এ কী!”
বনাই ঘোলাটে চক্ষে তাকিয়ে তাদের ক্লিষ্ট গলায় কইলো, “এ কার লাশ?”
ভৃত্যরা সমস্বরে উত্তর দিলে, “এই লাশ রত্নাকর চাষীর। এ-ই গত সন্ধ্যায় হঠাৎ ক্ষেপে উঠে বাঁধ কেটে দিয়ে নিজেও তবে ডুবে গিয়েচে!”
বনাই গুণীনের মুখের রক্ত আরও কয়েক পরত নেমে গেল। তার চতুর মস্তিষ্কে শয়তানের সব কারসাজি ছবির মতো ধরা পড়ে গিয়েচে। গতকাল কয়েকজন লেঠেলকে সে ছদ্মবেশে দেউড়ির গন্ডী থেকে বের করে ছলে হত্যা করেছে। এই ঘটনা শুনে তার কুটিলতা সম্পর্কে ধারণা পেলেও গুণীন ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে তার মতো তন্ত্রবিদের সঙ্গেও এই পিশাচ টক্কর নেবে! সে এই চাষীর শরীরে ভর করে তাকে দিয়ে বাঁধ কাটিয়ে আগের যজ্ঞের স্থানটা জলমগ্ন করেচে, যাতে উপায়ান্তর না দেখে গুণীন কাঁকড়াঝোর থেকে দূরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তার অর্থ, গুণীন এই স্থানটা নির্বাচন করেনি। তাকে ছলেবলে এখানে সরিয়ে আনা হয়েছে!
কিন্তু এর কারণ কী? সে যজ্ঞ পন্ড করার চেষ্টা করেনি, আক্রমণ করেনি, শুধু কাঁকড়াঝোরা থেকে দূরে ঠেলে এনেচে। শয়তানের মাথায় ঠিক কোন কুটিল দুরভিসন্ধি চলচে তা ঠিকঠাক না বুঝলেও খুব ভয়ঙ্কর কিছু একটা যে ঘটতে চলেচে তা বনাই বেশ বুঝলো। আকাশ গাঢ় কালো মেঘে ঢাকা পড়েচে আবার, ভীষণ বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে আরম্ভ করেচে। মাটিটা যেন তিরতির করে কাঁপচে! বনাই আকাশের দিকে মুখ তুলে, চোখ বন্ধ করে গুরুর পাদপদ্ম স্মরণ করে চোখের জল মুছলো। সে দানোয় পাওয়া শব কে নির্বাচন করেচে। তার তন্ত্রক্রিয়ার শব রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। তার মৃত্যু ঠেকায় কে?
বনাই ধীর স্বরে নিজের দুই শিষ্য আর ভৃত্য দুইজনকে আদেশ করল, “তোরা এখুনি এই তল্লাট ছেড়ে পালিয়ে যা। এ আমার আদেশ। কোনো প্রশ্ন নয় হতভাগার দল। যা, দূর হ সামনে থেকে।”
চারজন মিলে পড়িমরি ছুটতে আরম্ভ করল উঁচু বনটা ছেড়ে। তারা যখন বনাইকে ছেড়ে অনেকখানি দূরে চলে এসেচে, হঠাৎ একটা কানফাটানো গর্জনের শব্দ শোনা গেল! সেই গর্জনে ভীত হয়ে পিছনে ঘুরে তাকাতেই তাদের চারজোড়া চোখে ধরা পড়ল বনের উপরের আঁধারে আরও ভয়ঙ্কর মিশকালো একটা আকাশছোঁয়া রাক্ষুসে মূর্তি আকাশের দিকে মাথা তুলেচে! তার বিরাট বিরাট দুইখানা চোখ আগুনের ঢিপির মতো জ্বলচে! তার সুতীক্ষ্ণ দশনের সারি আঁধারেও ঝকঝকে করচে! বিকট মুখটা আকাশের দিকে চেয়ে একটা ভীষণ গর্জন করে উঠতেই আকাশের মেঘকে চৌচির করে যেন একলক্ষ বজ্র একসঙ্গে ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল হেঁতালের উঁচু বনে! চোখের পলকে গোটা এলাকাটা মাটির অতলে তলিয়ে গেল। গোটা এলাকাটা থরথর করে কেঁপে উঠতেই চারজন ছিটকে পড়ল বর্ষার জমা জলে। রাক্ষুসে পাতাল সুড়ঙ্গে তখন হুহু করে গ্রামের জমা জল প্রবেশ করচে।
(৮) শেষ পত্ৰ
জমিদার সারদার মনোবল বিচূর্ণ হয়েচে সম্পূর্ণ রূপে। তার চোখে মুখে দুশ্চিন্তা এসে অকাল বার্ধক্যের থাবা দিয়ে গিয়েচে মাত্র কয়েকটা দিনে। দিনে রাতে গাঁয়ের লোকজন প্রেত দেখতে পায়, ভয় পায়। বনাই গুণীনের নিধন ঘটেচিলো যে শনিবার, তারপর সোয়া হপ্তা কেটেচে। আরও দুইজন রাক্ষসের বলি হয়েচে। এখন বাকি রয়েচে শুধু কাঁকড়াঝোরা আর দুই তিনটি গাঁ। যদি সব উপদ্রব এইমুহূর্তে থেমেও যায়, তবু জমিদারির আয় প্রায় শূন্যের কোঠায়। যে কয়জন প্রজা রয়েচে, তাদের মধ্যে সঙ্গতি যাদের আছে তারা সব ফেলে, জমিদারকে শাপশাপান্ত করতে করতে পালিয়ে যাচ্চে দলে দলে। সারদা বহুবার ভেবেচে নিজের স্ত্রী পুত্র পুত্রবধূকে বর্দ্ধমানে, নিজের শ্বশুরালয়ে পাঠিয়ে দেয়, কিন্তু নির্বান্ধব এই প্রেতপুরীতে তার পক্ষে বাস করা অসম্ভব। তেমন বিপদ এলে ভৃত্যরা কেউ পাশে থাকবে না। সারদা এখন ভীত হলেও একাকী শয়ন করে। বাকিদের শয়নকক্ষ হয়েচে নীচের তলে।
সব ভেবেচিন্তে সারদার মনে একটা অতি ক্ষীণ সম্ভাবনা উদয় হয়েচে। শহর কলকাতায় হরিহরের পরিবারকে একটা পত্র লিখে সব বিপদের কথা জানালে কেমন হয়? তার বংশধরদের কেউ যদি প্রেতশিলায় পিন্ডদান করে, তবে কি হরিহরের পিশাচ মুক্তি পাবে না? থামাবে না সে তার নির্মম আক্রমণ? আজ লিখে কাল রেজিস্টারী করলে বত্রিশে আষাঢ়ের মধ্যে তাদের হস্তগত হবে এই পত্র।
সব ভেবেচিন্তে সারদা এক ভৃত্যকে ডেকে বললে, “নীচের দপ্তরের ঘর থেকে চিঠির একতাড়া কাগজ, লেফাফা আর দোয়াত, ইস্টিলের কলমখানা আর চক নিয়ে আয়। সব রাখা রয়েচে নায়েবের বাক্সটায়। আচ্ছা শোন… বাক্স ধরেই নিয়ে আয়। আমি একখানা চিঠি লিখচি, তুই কাল সকালেই চিঠিখানা লেফাফায় বন্দী করে ডাক আপিসে দিয়ে আসবি আমার নাম করে। এই নে… এইটে রেজিস্টারির পয়সা, আর এইটে তুই রাখ। ভুল হয়না যেন। রাতে আমার ঘুম হয় না। ভোরের দিকে আমি ঘুমিয়ে থাকলে ঘুম ভাঙিয়ে ডাকিস নে, তুই নিয়ে চলে যাস চিঠিখানা। একত্রিশের মধ্যে চিঠি পৌঁছে গেলে সে তেসরা শ্রাবণের মধ্যে উপস্থিত হতে পারবে।” ভৃত্য কপাট টেনে চলে গেলে পর দুইজন লেঠেল মোতায়েন হল কপাটের বাইরে। সারদা দুর্বল হাতে লেফাফার উপরে লিখলে, “ঘোষ বাটী, ছকু খানসামা বাই লেন, কলিকাতা।”
সারদার মস্তিষ্ক দ্রুত চলতে আরম্ভ করল। হরিহরের মৃত্যুর পিছনে তার হাতটুকু সযত্নে গুপ্ত রেখে বাকি সমস্ত ঘটনাগুলো তারিখ সহ, বিশদ সহ লিখতে আরম্ভ করল সে। দোয়াতে কলম ডুবিয়ে ডুবিয়ে লেখা হয়ে চলল সেই পাপের কাহিনি ও তার পরিণামের বিবরণ। এই ভয়ঙ্কর পিশাচকে যে গাঁয়ের লোকেরা হরিহর বলেই সন্দেহ করে তাও লিখতে ভুললো না। জমিদারের প্রতি তার ক্রোধের কারণ হিসেবে সারদা লিখলো, “আমি তোমার খুড়ার ব্যাভিচারিতা এবং স্বেচ্ছাচারিতার মূলে কুঠারাঘাত করিয়াছিলাম, তাহাকে শাসন করিয়াছিলাম, তাই পুকুরঘাটে তাহার অপমৃত্যুর পর আমার প্রতি তাহার ক্রোধ সর্বাধিক প্রকট হইয়াছে।
এই কথাখানি লেখার সময়ে সারদার মনে হল, বাইরে গাছের মাথায় ঝিল্লীপোকাটা অবধি ছিঃ ছিঃ ছিঃ শব্দে ডেকে উঠল। মরীয়া সারদা নিজের অপরাধ আড়াল করে বাকি চিঠিটা যখন সম্পন্ন করল, তখন একটি পৃষ্ঠা ব্যতীত সবকয়টিই পূর্ণ হয়েছে। গোটা ঘর বেঙ্গল কারখানার কালির গন্ধে ম ম করচে। কিন্তু একটা আসল কথা তো বলা বাকি থেকে গেল? সেইটে না বললে তো যে উদ্দেশ্যে চিঠিটা লেখা, তা সফল হবে না। একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অন্যভাবে লিখতে হবে।
সারদা ঢাউস কাচের তেলের বাতির চাকাটা ঘুরিয়ে উসকে দিয়ে, খালি পাতাটিকে শেষে রেখে সবকয়টি পাতাকে দপ্তরী সূতায় গেঁথে, মনে মনে কিছুক্ষণ নকল খসড়া সাজিয়ে নিয়ে এইবার শূন্য পাতাতে কলম ছোঁয়ালো— “বাবা ইন্দ্রনাথ, তুমি যখন কাঁকড়াঝোরা এসেচিলে, আমি তখন একটা বিশেষ কারণে তোমাকে একখানা সত্য কথা বলতে পারিনি। তেমন কিছুই নয় যদিও। আসলে আমি নিজেই জেনেচিলাম অনেক পরে, তাই তোমাকে বলা হয়ে ওঠেনি। আসল কথা হল, তোমার খুড়ামশাই কিন্তু নয়…”
হঠাৎ লেখা ফেলে চমকে উঠে সারদার মনে হল, দুইতলার এই শয়নকক্ষের জানালার বাইরে কে যেন ফোঁস করে শ্বাস ফেলল! সারদা চমকে উঠে পিছনের বন্ধ জানালায় তাকালো। কোনো শব্দ নেই, কিন্তু সারদার স্পষ্ট মনে হচ্ছে এখুনি কেউ ছিল জানালার বাইরে! কোনো এক ইন্দ্ৰিয়াতীত শক্তি যেন তাকে জানান দিচ্চে, জানালার বাইরে ঘোর বিপদ! সারদা এক পা, দুই পা করে এগিয়ে জানালার খড়খড়ি তুলে চোখ রাখল সারদা। .
আজ আকাশে চাঁদ নাই। অমাবস্যা আজ। কিন্তু জমিদার মহলের বাইরে চারিদিকে দুটি দুটি তেলের হ্যাজাকবাতি জ্বলে, তার গণগণ শব্দ আর জোরালো আলো গিয়ে পড়ে অনেকদূর অবধি। সেই আলোতে সারদার মনে হল, মহলের পিছনে, চৌহদ্দির বাইরের পুকুরটার ওইপারে যে ঝোপটা রয়েচে, সেখানে কিছু একটা রয়েচে ঝোপের আড়ালে। ঠিক বোঝা যায় না, কিন্তু খুব অন্ধকার কিছু একটা! মহলের পিছনের জমিতে গোটা তিনেক নেড়ি কুকুর শুয়ে বসে থাকে, তারা কি দেখে যেন পরিত্রাহী চীৎকার করে চলেচে। নেড়ি কুকুরদের অনুমানশক্তি যে কোনো সায়েবী কুকুরের চেয়ে উঁচুদরের। সারদার মন অতি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেচে বলেই সে বেশ টের পাচ্চে ঝোপের ওপারে যা রয়েছে, তা ভালো জিনিস নয়। সেটা আঁধারে মিশে এই জানালাটার দিকেই বোধহয় চেয়ে রয়েচে। সারদা লেঠেলদের ডাকতে পিছনে ঘুরতে যাবে, হঠাৎ চমকে উঠে সে দেখলে, আঁধারের স্তুপটার মধ্যে দুখানি রক্তবর্ণ আলোর বিন্দু ফুটে উঠেচে! ঠিক যেন দু’খানি লোলুপ চক্ষু। সেটা দুই পা এগিয়ে সারদার দিকের নজর নিবন্ধ রেখে ছপাৎ করে পুকুরে নেমে পড়ল। সারদা জানালা থেকে চোখ না সরিয়েই শুকনো স্বরে চীৎকার করে উঠল, “ওরে কে আছিস!”
একজন লাঠিয়াল বাইরে থেকে ছুটে এসে উদ্বিগ্ন স্বরে বললে, “আজ্ঞা হুজুর?”
সারদার নজর তখনও বাইরের দিকে। যে ভয়ঙ্কর জিনিসটা জানালার আলোর দিকে চোখের মণি তুলে এগিয়ে আসচিলো সেটা বোধহয় জলে ডুব দিয়ে আত্মগোপন করেচে। চীৎকারের শব্দ তারও কানে গিয়েচে। সারদা কাঁপা গলায় বললে, “বাইরের পুকুরে কে যেন একটা নেমেছে, বুঝলি?”
লেঠেল বোধহয় চোর ডাকাইতের কথা অনুমান করে বললে, “তাতে ভয় নাই হুজুর, দেউড়িতে সতর্ক পাহারা রয়েচে। প্রাচীর ডিঙিয়ে কেউ ঢুকতে পারবে না।”
সারদা চীৎকার করে বললে, “হতভাগা, চোর নয়, খুব খারাপ কিছু তুই একবার দেখ বাইরে উঁকি দিয়ে।
সারদা দুই পা সরে এলে পর লেঠেল লাঠিটা শক্ত করে ধরে চোখ রাখল গবাক্ষের খড়খড়িতে। ঘাড় কাৎ করে, এদিকে ওদিকে তাকিয়েও কাউকে দেখতে না পেয়ে সে দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বললে, “কিন্তু বাইরে তো ভয়ের কিছুই নাই হুজুর। কিছুই তো চোখে পড়ছে না!”
সারদা কম্পিত হাতে তেলের বাতিটা আরও একটু উসকে দিয়ে হতাশ হয়ে কইলো, “অন্ধ কোথাকার। তুই খড়খড়িটা ফেলে দিয়ে অলিন্দে গিয়ে হাঁক দে। নীচে কাউকে রাতপাহারা দিতে হবে না, দ্বারীরা বাদ দিয়ে সবাই
যেন আজ এই কক্ষে মোতায়েন হয়। যা যা, শিগগির যা।”
লেঠেল খড়খড়ি টেনে দিয়ে কপাটের দিকে চলল। সারদা মাথা নীচু করে কপালের রগ টিপে বসে রইলো। তার চোখ ফেটে হতাশার জলবিন্দু পড়চে। কী দরকার ছিল হরিহরকে হত্যা করার? দুটো টাকা দিয়ে দিলেই চুকে যেত সব। আজ অবধি সারদার হুকুমে নায়েব গোমস্তা লেঠেলরা তো কম নরহত্যা করেনি? কিন্তু কারোর প্রেত তো এভাবে পালটা আক্রমণ করেনি? হরিহরের তবে কী এমন ক্ষমতা ছিল, যার শক্তিতে সে তালুকের পর তালুক ধ্বংস করে চলেচে? সারদা মনস্থির করলে, সে চিঠিটার মুসাবিদা নূতন করে লিখে সমস্ত দোষ স্বীকার করবে ইন্দ্রনাথের কাছে। তাতে যদি কিছু উপায় হয়। এই ভেবে দোয়াত কলমটা টানতে গিয়ে হঠাৎ কপাটের দিকে চোখ পড়তে সারদা হতবাক হয়ে গেল!
লেঠেলটি কপাটের দিকে মুখ করে সারদার দিকে পিছন দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েচে তখনও! সে যায়নি কাউকে ডাকতে! সারদা ভয়ে ভয়ে বললে, “হতভাগা তুই গেলিনে? তোর এত সাহস?”
লেঠেল হেসে বললে, “গিয়ে কী হবে কর্তা? আপনার ভুল হচ্চে। বললাম তো, বাইরে ভয়ের কিচ্ছু নাই…. যা আছে এই ঘরেই আছে।” সারদা ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়াতেই লেঠেল মুখ ফেরালো। সারদা হঠাৎ যেন বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে চীৎকার করে উঠল, “তুই! তুই! ল… লখিয়া!”
“হাঁ হুজুর, লখিয়া। আপনার শয়তান গোমস্তার জন্য যে বেঘোরে মারা পড়েচে কয়মাস আগে। আজ আপনিও মরবেন হুজুর। উঁহু, চীৎকার করে লাভ কী? আপনার আওয়াজ কপাটের বাইরে বেরোলে তো বাইরে দাঁড়ানো সুকিয়া আর নকুলই ছুটে আসতো, আমি কপাট না খুলেই কেমন করে এলাম হুজুর?” এই বলেই লখিয়া খলখল করে হেসে উঠল।
সারদা দুই পা পিছোতেই লখিয়ার শরীরটা ভেঙেচুরে একটা ভয়ঙ্কর কুচকুচে কালো দানবমূর্তি ফুটে উঠল। তার জ্বলন্ত চোখ দুটোর দিকে চাইলে হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ হয়ে যায়। গোটা ঘরটা বুনো গন্ধে ভরে গেল। মূর্তিটার মুখের জায়গাটা থেকে একটা লকলকে ধারালো জিভ বেরিয়ে এসে একটা ক্ষীণ শব্দে পেঁচিয়ে ধরল সারদার গলা। যে গলা আজীবন ভৃত্যদের গালিগালাজ, হুকুম করে এসেচে, আজ মৃত্যুমুখে এসে সেই কণ্ঠ থেকে কোনো শব্দ বের হল না। জিভের পাকটা একটু দৃঢ় হতেই ঘরের চারদিকে রক্তের বিন্দু ছিটিয়ে পড়ল। সারদার ঘাড়টা দেহ থেকে অসঙ্গতি রেখে ঝুলে পড়ল একধারে। পাপের বোঝা দেহটাকে ফেলে রেখে কানফাটানো গর্জন করে উঠল পিশাচটা।
সেই ভয়ঙ্কর চীৎকারে মহলের প্রতিটা মানুষ ভয়ে মূর্ছিতপ্রায় হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর প্রহরীরা খুব সাহস করে সড়কি দিয়ে দরজাটা খুলে ফেলতেই চোখে পড়ল সারদার মৃতদেহটা। ভয়ঙ্করভাবে ঘাড়টা ঝুলে এলিয়ে রয়েছে। গোটা ঘরটা রক্তের ছিটায় ভরে রয়েচে। চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসচে। ঘরে একটা আঁশটে গন্ধ ভরে রয়েচে। সারদার স্ত্রী হেমনলিনী, পুত্র আর পুত্রবধূ এসে আছড়ে পড়ল দুয়ারের সামনে। প্রভাতে শব দাহ করা হল। ভৃত্য নীলকণ্ঠ পরদিন কক্ষে প্রবেশ করে দেখল পালঙ্কের পাশে দপ্তরদানে সারদার শেষ পত্রটা পাথর চাপা দেওয়া রয়েচে। নীলকণ্ঠ চোখ মুছে, পত্রটা খামে ভরে, সারদার দেওয়া টাকায় চিঠিখানা কাউকে না জানিয়ে ডাক আপিসে গিয়ে পাঠিয়ে দিয়ে জমিদারের শেষ হুকুম তামিল করে দিল।
(৯) সঙ্কেত
আমার বৈঠকে আড্ডা রীতিমতো জমে উঠেচে। আড্ডার থেকে বিতর্ক বেশি বলা চলে। একদিকে আমি, সহদেব বাঁড়ুজ্জে আর কেশব গাঙ্গুলি। সহদেব পুলিশের দারোগা আর কেশব মহাকরণের এর পদস্থ করণিক আর অপর দিকে কালীপদ একা। বিতর্কের এই আক্রমণে কালীপদ একাই বুঁদিগড় রক্ষা করে চলেচে বীর বিক্রমে। কানাই একখানা বেতের পাইতে বসে মিটিমিটি হেসে চলেচে আমাদের কাণ্ড দেখে। আমরা বসেচি ধপধপে ফরাসে। আজ দ্বিপ্রহরে আমরা তিনজন বন্ধু শিয়ালদহ ইস্টিশানের পাশেই এক শ্রাদ্ধের বামুন ভোজনে গিয়েচিলাম। অকাল শ্রাদ্ধ। বাড়িতে আশু বিবাহ রয়েচে বলে তড়িঘড়ি শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সেরে ফেলা হয়েচে। আমরা মধ্যাহ্নভোজ সেরে আমার গৃহেই এসেচি আড্ডার্থে। কালীপদ চিঠি দিয়েচিল আজ বিকেলে আসার। সেই লোভ দিয়েই দুই বন্ধুকে এনে তুলেচি। তাদের আমি আগেই বলে রেখেচি, কালীপদ যতই অকাট্য যুক্তি দিক তর্কে, তবুও হার মানবি নে। আরও উত্তপ্ত করে যাবি। যত তপ্ত করবি, ততোই বিস্ময়কর তথ্য শুনতে পাবি, যা আমাদের রোগী দেখা, অপরাধী ঘাঁটা বা কলম পেষার চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের। যা কখনও কোনও কেতাবে লিপিবদ্ধ হয়নি।
তো, আমার কথা শিরোধার্য করে দুইজন সতেজে তর্ক চালিয়ে চলেচে। তর্কের প্রসঙ্গ উঠেচিল খুব সামান্য কারণেই। আমরা যখন শ্রাদ্ধবাড়িতে গিয়ে পৌঁছেছি, তখনও ভোজন প্রস্তুতির বিস্তর বিলম্ব রয়েচে। পাচক ঠাকুর রাঁধা কালীন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় যোগাড়যন্তর করে বাইরের এক পাচককে ঠিক করা হয়। সেই বৃদ্ধ পাচক নড়াচড়া করতে অক্ষম। সে নিজের বাড়িতে ঘি, ময়দা প্রভৃতি নিয়ে গিয়ে লুচি, ব্যাঞ্জন আর মন্ডা প্রস্তুত করে যখন পাঠালো, ততক্ষণে আমরা পিত্তরক্ষার নিমিত্ত পেট ভরে ও ‘বামুনের জন্য আনা ছানার সন্দেশ, সামনের দেবেন ঠাকুরের মিঠাই আর ডাব খেয়ে উদরপূর্তি করেচি। এই অত্যন্ত বিত্তবান বাড়িটির দুই চারিজন বাদ দিলে প্রায় সকলেই আমার রোগী।
বাড়ির কর্তা আমাদের কাছে বারংবার ক্ষমা চাওয়ায় আমরা তাকে হাত ধরে আশ্বস্ত করি। আমরা ফেরার সময়ে কর্তার সনির্বন্ধ অনুরোধে ছাঁদা হিসেবে ঘিয়ের লুচি আর কিছু মিষ্টান্ন নিয়ে আসতে হয়েচে।
তর্কটা শুরু হয়েচিল এই নিয়েই। কালীপদ বলে, শ্রাদ্ধের খাবার নিকৃষ্ট ভোজ। তা খাওয়া অনুচিত। কিন্তু আমরা এমন কথা কখনো শুনিনি, তাই তর্ক আরম্ভ হল। তর্কের রেলগাড়ি লাইন ত্যাগ করে তার স্বভাব মতোই গিয়ে উঠল অন্য লাইনের ঘাড়ে। লুচির থেকে কখন যে সেই তর্ক জন্মান্তরবাদে গিয়ে উপস্থিত হল তা বোধকরি ব্রহ্মারও অগোচর। সহদেব কিছুক্ষণ তর্কে পরাভূত হয়ে অস্বস্তির সঙ্গে শুধালো, “আচ্ছা, তবে আপনি পুনর্জন্মে বিশ্বাসী?”
কালীপদ হেসে কইলো, “আমার বিশ্বাসে কি সত্যটা মিথ্যা হয়ে পড়ে?” কেশব কিছুক্ষণ মনে মনে ভেবে হঠাৎ একটা ভারী কট প্রশ্ন করে বসলো, “আচ্ছা মুখুজ্জেমশাই, এই যে এত শাস্তরে পুনর্জন্মের সমর্থনে এত কিছু বলা হয়েচে, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ অবধি ভাগবৎ গীতায় পুনর্জন্মের কথা বলেচেন, কিন্তু মানুষ যদি একটা সময়ে সত্যিই জন্মের চক্র থেকে মুক্তি পেয়ে থাকে, তবে কোনটা তার শেষ জন্ম সেটা বোঝার কোনো উপায় কোথাও বলা নেই কেন? মানুষের কোনো লক্ষণ, প্রতিলক্ষণ দেখে কেন আজ অবধি বলা যায়না যে কোনটা তার অন্তিম জন্ম?”
কালীপদ চুপ করে খতিয়ে ভাবচে দেখে সহদেব মনে মনে উৎসাহিত হয়ে এতক্ষণের পরাভবের গ্লানি দূর করার জন্য বলল, “যে প্রশ্নের উত্তর আজ অবধি কোনো শাস্তরে লেখা হয়নি সেই উত্তর মুখুজ্জে মশাই পাবেন কোত্থেকে? সব জবাব দেওয়া ওনার পক্ষে সম্ভব বুঝি? শাস্ত্রেই উত্তর না থাকলে আর উপায় কি, তাই না মুখুজ্জে মশাই?”
এই বিতর্কের হোতা আমিই, কিন্তু কালীপদ উত্তর দিতে না পারায় এইবার আমার মনটা বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। কালীপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, “শাস্ত্রে না থাকলেও উত্তরটা দেবার আরেকটি উপায় আছে…” আমার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ওদেরও। কালীপদ কইলো, “উপায়টা হল, শাস্ত্রের শ্লোক ভেঙে তার ভিতরের লুকানো অর্থটা খুঁজে বের করা। সেই হিসেবে, যে মানুষের আকৃতি বেশ দীর্ঘ, উচ্চ, সেই মানুষটি জন্মচক্রের প্রায় শেষজন্মে উপস্থিত হয়েচে।”
এবার আমিই হতভম্ব হয়ে বললুম, “এ শাস্ত্রে রয়েচে দাদা?”
কালীপদ কইলো, “রথস্থ বামনং দৃষ্টা, পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে….”
সহদেব কইলো, “হাঁ, এর অর্থ রথে অধিষ্ঠিত বামনকে দর্শন করলে পুনর্জন্ম হয় না। এর সঙ্গে দীর্ঘ আকৃতির সম্পর্ক কী?”
কালীপদ মিটিমিটি হেসে বললে, “মাটিতে দাঁড়িয়ে একেই রথের ঐ উচ্চতা, তায় বামনাকৃতির কাউকে দেখতে গেলে তোমাকে যে যথেষ্ট দীর্ঘ হতে হবে তা বোঝো না? তবেই তোমার পুনর্জন্ম হবে না আর। এই শ্লোকের মাধ্যমেই সেই সূত্র লুকানো রয়েচে।”
সহদেব হাঁ করে রইলো। কেশব গাঙ্গুলি কইলো, “তবে কি শাস্তরের সবকিছুর মধ্যেই বিজ্ঞান লুকিয়ে রয়েচে দাদা?”
কালীপদ আঙুলে আঙুল মটকে তৃপ্তির স্বরে কইলো, “সব না হলেও বহু তো বটেই। আমরা বিজ্ঞানটুকু না খুঁজে বরং সহজ কাজ হিসেবে পূজাআর্চা আরম্ভ করে দিই। এই যে শ্রীকৃষ্ণ গিরি গোবর্দ্ধনকে কড়ে আঙুলে তুললেন আর সমস্ত প্রজারা গরুবাছুর নিয়ে তার নীচে ছুটে গিয়ে আশ্রয় নিলেন। শ্রীকৃষ্ণের মতো অসাধারণ, অসামান্য পুরুষশ্রেষ্ঠর কাছে বোধকরি কিছুই অসম্ভব নয়, কিন্তু প্রশ্ন হল, উনি যদি পাহাড় তুললেনই তবে সেটাকে আঙুলে করে রাজ্যের উপরে নিয়ে এলেন না কেন? সবাইকে উলটে বাড়িঘর ছেড়ে তার নীচে কেন ছুটতে হল?”
সহদেব বিস্ময়মাখা কণ্ঠে শুধালো, “কেন? ছুটতে হল কেন?”
“কারণ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ সম্ভবত গোবর্দ্ধন পাহাড়ের উপরে নিজের অসামান্য বিজ্ঞানশক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটা অতিকায় বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি করেচিলেন। কালের প্রভাবে তা হয়তো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।
শ্রীকৃষ্ণ নিজের সময়ের থেকে বহু হাজার বছর এগিয়ে ছিলেন। তাই তিনি ঈশ্বরই বটে, পূজনীয়ও বটে।”
আমার জবাব না দিয়ে চেয়ে রয়েচি দেখে কালীপদ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ যে তাঁর ছত্রে ছত্রে কতরকম হেঁয়ালি রেখে গিয়েচেন, কত বিচিত্র সূত্র রেখে গিয়েচেন রূপকের ছলনায়, তা উদ্ধার করা বোধহয় এই আর করে উঠতে পারবো না হে…”
আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, “কেন পারবে না দাদা?”
কালীপদ হেসে বললে, “কারণটা আমার দৈর্ঘ্য। যদি আমার ধারণা সত্যি হয় তবে এইটেই আমার শেষ জন্ম যে।” এই বলে কালীপদ হো হো করে হেসে উঠল। সঙ্গে আমরাও। কেশব গাঙ্গুলি হাসি থামিয়ে বলল, “ডাক্তার সত্য কথা বলেচিলো দাদা, আপনার থেকে অনেক কথা পাওয়া যায় যা কেতাবে নাই। কী আর করলুম জীবনে? কলম পিষে গেলাম আর পাশ দিয়ে গেলাম, তাও নকল করে।”
কালীপদ হেসে বলল, “সে কি হে? নকল করে?”
“হাঁ দাদা, আমার ইশকুল কালেজে আমি শ্রেষ্ঠ নকলনবীশ ছিলুম। একবার পরীক্ষায় প্রহরা দিচ্চেন স্বয়ং বেণীমাধব রায়। তো, তিনি একবার ঘুরপাক দিয়েই আমার সামনে এসে বললেন, ওহে ছোকরা, আস্তিনের মধ্যে আর পিরাণের পকেটে যা যা নকল রেখেচো সেগুলো বের করে জমা দাও, নচেৎ বাইরে যাও।”
আমার আস্তিন থেকে বাস্তবিকই একখানা কাগজের টুকরো বেরিয়ে পড়েছিলো। আমি বেজার হয়ে সবকয়টি নকল তুলে দিলাম ওনার হাতে। উনি গর্বের সঙ্গে মিটিমিটি হেসে টেবিলে গিয়ে বসলেন।”
কালীপদ হেসে বললে, “চমৎকার। তবে তো সেযাত্রা আর বোধহয় পাশ…”
“আরে দাঁড়ান দাদা, বলতেই দিন। আমার পরীক্ষা ভীষণ ভালো হয়েচিলো। কারণ আমার কাছে সবকয়টা নকলের আবার নকল ছিল ট্যাঁকে লুকানো। বেণীমাধব রায় যখন আমার কাগজগুলো ধরে ফেলে আত্মপ্রসাদে ভুগচেন, তখন উনি বোঝেননি যে আসলে আমিই ওগুলো ইচ্ছে করে ওনাকে দেখিয়েচি, যাতে উনি ওগুলো নিয়েই নিশ্চিন্ত থাকেন। হাঃ হাঃ হাঃ।”
নকলেরও আবার নকল! ধন্যি ছাত্র!
এরপর হাসি সামলানো সত্যিই দায় হয়ে উঠল আমার বৈঠকে। এমনকি কানাই সর্দার অবধি হোঃ হোঃ করে হেসে উঠেই কালীপদর দিকে চেয়ে মুখ চাপা দিল।
আড্ডা সমাপ্ত হলে পর ঠিক করলুম রাতের আহার এখানেই সম্পন্ন করবো একত্রে। সহদেব আর কেশব গাঙ্গুলির পরিবার কলকাতায় থাকেন না, সুতরাং কেউই আপত্তি করলে না। দুপুরের আনা গোছা গোছা লুচি, ব্যাঞ্জন চারটি থালায় সাজিয়ে, মন্ডা এবং কয়েকখানা বেগুন ভেজে নিয়ে আহারে বসলাম। কালীপদ এসব মুখে তুলবে না। তার জন্য গরম দুধ, চাঁপাকলা আর খই। সহদেব লুচিতে ব্যাঞ্জন মাখিয়ে তৃপ্তির সঙ্গে মুখে দিয়ে চিবিয়েই থুঃ থুঃ করে ফেলে দিয়ে বললে, “ইশশশ কী তেতো একটা মুখে পড়ল। রামোঃ। মেথি নাকি?”
কালীপদ তার বলার ভঙ্গি দেখে মুখ চেপে হাসচে। আমি আর গাঙ্গুলিও এক টুকরা করে মুখে তুলে সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিলাম। এ কেমন রসিকতা? যেমন তেমন তেতো নয়, খাবারে যেন কেউ নিমের পাতা বেটে ঘুলিয়ে দিয়েচে! আমি কি একটা কইতে গিয়ে হঠাৎ দেখি কালীপদ হাসি থামিয়ে টানটান হয়ে বসে সরু চোখে খাবারগুলোর দিকে চেয়ে রয়েচে। পরক্ষণেই গম্ভীর স্বরে বলল, “কানাই, তোর মুখে কেমন লাগল খাবার?”
কানাই মুখ বিকৃত করে বললে, “এক্কেরে তিতিয়া কর্তাবাবা।”
“আর মিঠাইগুলো?”
“মেঠাই ঠিকই আছে দেখচি…”
কালীপদ নিজের খাবার ফেলে উঠে পড়ে আমাদের খাদ্যবস্তুগুলো এক টান মেরে ফেলে দিল ছড়িয়ে। আমি হতবাক হয়ে মুখের পানে চাইতেই কালীপদ ধীরে ধীরে বললে, “শ্রাদ্ধের ভোজনসামগ্রীর মধ্যে শুধুমাত্র লবণ দেওয়া খাবারগুলোই কখন নষ্ট হয়ে মুখে তেতো লাগে জানো? যাঁর শ্রদ্ধ হচ্চে, তিনি যদি মুক্তি না পেয়ে বরং কোপনস্বভাব রূপে হিংস্র নিঃশ্বাস ফেলতে থাকেন, তখন।”
“আপনি এসব বিশ্বাস করেন ঠাকুরমশায়?”
“হাঁ করি। তুমি করো না, কারণ তুমি জানো না। বিজ্ঞানী জানতেন পৃথিবীটা গোলাকৃতি। বাকিরা জানতো না বলেই ঠাট্টা করতো, কিন্তু তাতে পৃথিবীটি চৌকোনা হয়ে যায়নি কখনো। আমি স্বপ্নবিচার তেমন মানিনে, কিন্তু এইটে মানি যে আমাদের মস্তিষ্ক যখন কোনো বিপদের আভাস পায় তখন বিভিন্ন রকম প্রতীকী স্বপ্ন দেখে। তিনটি স্বপ্ন আমার নিজের চোখে বহুবার সত্যি হতে দেখেচি আসন্ন বিপদ হিসেবে।”
আমি ঢোঁক গিলে বললাম, “কোন স্বপ্ন দাদা?”
কালীপদ রুক্ষ মুখে বললে, “গায়ে মাথায় কারোর কুলোর বাতাস দেওয়া, নৌকায় থাকাকালীন নৌকাডুবি হওয়া এবং সধবা নারীকে কেউ অজস্র সিন্দুর পরাচ্ছে এমন দৃশ্য দেখা…”
কালীপদর বলার ভঙ্গিতে বাকি দুইজন কিছুই ধরতে পারেনি, কিন্তু আমি তার চালচলন বুঝি। আমার মনে হল সে স্বপ্নের কথার আড়ালে কী একটা যেন লুকিয়ে গেল। আহার ভন্ডুল হবার পর সহদেব আর কেশব গাঙ্গুলি ফিরে গেলে পর আমি কালীপদর সামনে এসে বসতেই সে বিন্দুমাত্র ভণিতা না করেই বললে, “আমি নিজেই বলতাম ডাক্তার। যে মানুষটির শ্রাদ্ধ তোমরা খেতে গিয়েচিলে, তার শুধু মুক্তি হয়নি তাইই নয়, বরং…”
“বরং?”
“বরং, সে কোনো ভয়ঙ্কর পৈশাচিক সত্বা ধারণ করেচে। এটা আমার ধারণা ডাক্তার। লক্ষণ দেখে বলচি। নাহলে শুধুমাত্র লবণ পড়া খাবারগুলি এমন বিষবৎ তেতো হয়ে উঠতো না কখনো! তুমি পরোক্ষ-লক্ষণ, সহলক্ষণ জানো না, তাই বুঝবে না। আমি বোধহয় ভুল করচি না। আচ্ছা ঐ বাড়িতে কোনো উপদ্রব হচ্চে না?”
আমি ইতস্তত করে কইলাম, “কই, তেমন তো কিছু বললে না কেউ? দেখেও মনে হল না কৈ?”
কালীপদ আত্মগত ভাবে নীচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল, “তাহলে তার বিচরণক্ষেত্র নিশ্চিত অন্য কোথাও। কোনো অচেনা জায়গায় হয়তো গুমরে গুমরে মরচে… অথবা… আচ্ছা, তা হলেই ভালো। সেই বাড়িতে একবার যাওয়া যায়? কতদূর?”
“দূর কোথা? এই তো সামনে ইস্টিশানের পাশেই ক্যাম্পবেল হাসপাতাল রোডের বিপরীতে। ঘোষ বাড়ী….”
বাইরে বৃষ্টি নেমেচে। আমি আমার সদ্য কেনা বাহারি সাতরঙা ছাতাটা নিয়ে পথে নামতেই কালীপদ কটমট করে চেয়ে বললে, “আর কোনো রঙ বুঝি বাকি ছিল না ছাতিটায়? এইটে কোনো যাত্রাপালার ফেলে দেওয়া ছাতি বুঝি?”
আমার এখন বিদ্রূপ গায়ে মাখলে চলবে না। আমি বিনা বাক্যব্যয়ে ছাতাটা খুলতেই কালীপদ দিব্যি তার নীচে সেঁধিয়ে গিয়ে মিটিমিটি হাসতে হাসতে পথ চলতে লাগল।
(১০) রহস্য ঘনীভূত
ব্রজ ঘোষ সমস্ত কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল! কালীপদর নাম দেখলাম সে আগেই শুনেচে এবং সেই কারণেই তার মুখে এই কথা শুনে ব্রজর মুখে ভয়ের ছায়া পড়ল। সে ভয়ে ভয়ে বললে, “সে কী কথা ঠাকুর! কোথাও কোনো উপদ্রব হচ্চে বলে তো শুনিনি? আর আমরা তো বিধিমতোই তার ক্রিয়াকর্ম করেছি আগেও। আমার ছেলে গিয়েচিল তার খুড়োর কাজ করতে কাঁকড়াঝোরের বাড়িতে, কিন্তু সেও তো কিছু বললে না? আচ্ছা তাকেই একবার ডাকি, “কে আছিস? ইন্দুকে একবার পাঠিয়ে দে গে যা আমার কাছে। এখুনি।”
ইন্দ্রনাথ এসে ফরাসের উপর বিনীতভাবে বসলে পর কালীপদ তার দিকে একটু চেয়ে থেকে ব্রজ ঘোষকে বললে, “ঘোষ মশায়, আমি আপনার পুত্রের সঙ্গে একাকী কথা বলতে চাই। ডাক্তার থাকুক।”
ব্রজনাথ উঠে গেলে পর কালীপদ কইলো, “তুমি যখন গাঁয়ের বাড়িতে কাকার দাহ করতে গিয়েচিলে, তখন এমন কিছু কি দেখেচো যা তুমি বাড়িতে জানিয়ে ভারাক্রান্ত করতে চাওনি?”
ইন্দ্র একবার দোরটা দেখে নিয়ে নিচু স্বরে বললে, “আপনি কেমন করে কী বলচেন আমি জানিনে, তবে কিছু কথা আমি সত্যিই বলিনি বাড়িতে তারা দুঃখ পাবে বলে। ওখানকার জমিদার সারদারঞ্জন না সারদাপ্রসাদ, তিনিই আমাকে রেজিস্ট্রারি পত্র দ্বারা খুড়োর মৃত্যুর সংবাদ জানান। আমি পত্রপাঠ কাঁকড়াঝোরা চলে যাই। ওখানে আমাদের পুরনো বিরাট বাড়ি রয়েচে। ছেলেবেলায় দুই একবার গিয়ে থেকেচি আমরাও, কিন্তু স্থায়ী বলতে খুড়োই থাকতেন।
“খুড়োর অনেক রকম বাতিক ছিল, জ্ঞানও ছিল, কিন্তু তাঁর চরিত্রের কোনো দোষ ছিল না। কিন্তু গাঁয়ের লোকেরা বললে যে তিনি নাকি…. মানে, তাঁর স্বভাবচরিত্র নাকি….”
“বুঝেচি, বলতে হবে না। তার টাকা-পয়সা কেমন যেতো এখান থেকে?”
“ঠাকুর, খুড়ো ছিলেন অকৃতদার, মিতব্যয়ী। এই এস্টেটের আধা ভাগ তাঁরই, কিন্তু তিনি মন্দিরের সংস্কার আর নিত্য খরচের জন্য যৎসামান্য অর্থই নিতেন। চাহিদা ছিল না তাঁর।”
“বেশ। আচ্ছা, যারা তোমার কাকার চরিত্রের দোষের কথা বলচিলো, তারা গাঁয়েরই প্রজা?”
“আজ্ঞে, তাঁরা সকলেই জমিদারের নিকট বহাল…”
কালীপদ ইন্দ্রর চোখের দিকে মণি তুলে বলল, “তাহলে বাছা, জমিদারের অধীনস্থ লোকেরা ছাড়া কেউ তোমার কাকার নামে দোষও দেয়নি, আবার তার যৎসামান্য অর্থেই দিব্যি কালাতিপাত হতো। এগুলি কি চরিত্রের দোষ থাকলে সম্ভব? তুমি বয়োঃকনিষ্ঠ, তোমার সামনে কি আর বলি, তবে এইটে তোমার ভাবা উচিত ছিল।”
ইন্দ্রনাথের চোখে একবিন্দু জল দেখা দিতেই সেটা নিঃশেষে মুছে ফেলে বললে, “জমিদার মশায় মানুষ ততো ভালো নন ঠাকুর। বরং রীতিমতো গোলমেলে বলা চলে। আমি কাঁকড়াঝোরায় থাকাকালীন বুঝতে পারিনি।”
কালীপদ মাথা নীচু করে তার কথার মর্মার্থ অনুধাবন করচিলো, এই শেষ কথাতে তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে ঝুঁকে পড়ে কইলো, “ফেরার পর তাহলে কী করে বুঝলে? কারোর কাছে নিশ্চয়ই কিছু শুনেচো?”
“না ঠাকুর, শুনিনি, তবে তার লেখা একখানা রেজিস্টারি গতকাল এসেচে আমার বরাবর। আমি নিয়ে আসচি সেখানা…”
এই বলে ইন্দ্র কক্ষান্তরে যেতেই কালীপদ ভ্রু কুঁচকে কইলো, “নাহ, বড়সড় গোলমাল রয়েচে হে। আমার মন বলচে।”
ইন্দ্ৰনাথ একগোছা পাতা সম্বলিত একখানা পত্র নিয়ে হাজির হল। চিঠি এসেচে গতকাল, অর্থাৎ একত্রিশে আষাঢ়। আজ বত্রিশ। সে নিজেই পুরো চিঠিখানা আগাগোড়া পড়ে শোনাতে থাকল আর আমি কালীপদর মুখের ভাব পদে পদে পরিবর্তিত হতে দেখলাম। কিন্তু জমিদার সারদা রায় এসব কী অসম্ভব কথা লিখেচে? তারিখ সহ, স্থান সহ যে ঘটনার কথা শুনচি তা কি সম্ভব? এভাবে গাঁয়ের পর গাঁ রসাতলে তলিয়ে যায় কখনো? এ যে ভয়ঙ্কর কথা! পত্র শেষের মুখে এলে পর কালীপদ হাঁ হাঁ করে বললে, “ওকি! থেমে গেলে কেন?”
“থামিনি ঠাকুরমশায়, পত্র এই অবধিই।”
কালীপদ অবিশ্বাসের সঙ্গে চিঠিখানা নিজের হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে কইলো, “তাই তো! এমন আধখাওয়া করে একটা রেজিস্টারি চিঠি কেউ শেষ করে নাকি! শেষের লাইনে লেখা, ‘আসল কথা হল, তোমার খুড়ামশাই কিন্তু নয়…’ এর মানে কী? তুমি তোমার খুড়োর লাশ স্বচক্ষে দেখেচিলে তো বেশ?”
“হাঁ ঠাকুর, বিলক্ষণ! খুড়াই ছিলেন বৈকি!”
কালীপদ ললাট কুঞ্চিত করে বসে রইলো। আমি কইলাম, “আচ্ছা ইন্দ্ৰ, প্রথম যে চিঠিতে তোমার খুড়োর মৃত্যু সংবাদ আসে, সেই চিঠিটে কোথায়?”
ইন্দ্ৰ বুদ্ধিমান ছেলে। সে পকেটে হাত দিয়ে কইলো, “এই যে, নিয়েই এসেচি এইটেও…”
আমি দু’খানি পত্রকে পাশাপাশি শায়িত করে পরীক্ষা করে বললুম, “দেখো তো দাদা, দুটোর হস্তাক্ষরে তফাৎ রয়েচে না? শেষেরটা যেন বড্ড উৎকণ্ঠার মধ্যে লেখা হয়েচে।
কালীপদ মাথা নেড়ে কইলো, “হাঁ, ঠিক কথা।”
“আরও একটা জিনিস দাদা, আমার মনে হয় চিঠিটা লেখার সময়ে জমিদারের কোনো বিপদ আপদ হয়েছিল। যে কালিতে চিঠি লেখা হয়েছে, সেটির থেকে আলাদা আরও দুখানি কালির বিন্দু যেন অসাবধানতাবশত পড়ে গিয়েচে পাতায়”
কালীপদ মুখের দিকে চেয়ে সন্দিগ্ধভাবে বললে, “তাতে কি প্রমাণ হয়?”
“অনেক কিছু। এই দুটি কালি নয়, রক্ত শুকিয়ে যাওয়ার ছোপ…”
কালীপদ চমকে উঠে শুধালো, “সেকি! তুমি কী করে বুঝলে?”
আমি ম্লান হাসতেই কালীপদ কিছুটা অপ্রতিভ হয়ে বলল, “হাঁ, তুমি চিনবে বৈকি। তবে তো বড় ঘোরালো সমস্যা হে! হয়তো তার উপর চিঠি লেখাকালীন কোনো আক্রমণ হয়েচে। কোনো মতে বেঁচে গিয়ে সে চিঠিটা পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু সে ওখানে পরপর এত ভয়ঙ্করভাবে আক্রমণ করচে, অথচ নিজের এই ঘরে কোনো উপদ্রব নাই। তবে ওখানেই কিছু ঘটেচিল নিশ্চিত।”
ইন্দ্র সরল চোখে বলল, “আমাদের এই বাড়ি বৈষ্ণব মতে শুদ্ধ ঠাকুর। আমার পরিবার বহু পুরুষ আগে নাকি স্বয়ং বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের স্নেহধন্য ছিলেন। আমার বাড়ির প্রতি আক্রমণ করার সাধ্যি কোনো প্রেতের নাই হয়তো।”
কালীপদ একটু হেসে কইলো, “তবে খাবারগুলো নষ্ট হল কী করে?” ইন্দ্র অবাক হয়ে বললে, “খাবার নষ্ট হয়েচে? কোন খাবার?” কালীপদ তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে ইন্দ্রর দিকে তাকিয়ে কী যেন ভেবে কইলো, “তোমাদের সে বাড়িখানা কি বাসযোগ্য বাছা?”
আমার মুখে আলো খেলে গেল কথাটা শুনেই। ইন্দ্র যুবক ছেলে। তার এসব গোলমালের আঁচ পেয়েই মনটা অনুসন্ধিৎসু হয়েই ছিল, এক্ষণে সুযোগ পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে বলল, “গোটা দুয়েক ঘর বাসযোগ্য। যাবেন ঠাকুর? রসদ নিই তবে? জানেন ঠাকুর, ওই বাড়িতে নাকি খুড়োর কাছে আমাদের বংশের বহু পুরনো কোনো জিনিস রয়েচে। ঠাকুরদার মুখে আবছা আবছা শুনেচিলাম একবার।”
আমরা ব্রজনাথকে পুরোটা না ভেঙে বললেও তার থেকে অনুমতি পেতে অসুবিধা হল না। আমরা চারজন শিয়ালদহ থেকে ঠিক সকাল নয়টার লক্ষ্মীকান্তপুর গামী রেলগাড়িতে চেপে বসলাম। গাড়িতে চাপার মুখে ইস্টিশানের প্রকাণ্ড ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে কালীপদ কী ভেবে ইন্দ্রনাথকে শুধালো, “তোমার খুড়োর মৃত্যুর তারিখটা কত ছিল?”
ইন্দ্র বললে, “আজ্ঞে, পৌষের দশ।”
কালীপদ একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল, “সেই তারিখটাও ঐ জমিদারেরই বলা তো? মনে হয় কোনো কিছু গোপন করার জন্য তারিখটা একদিন এগিয়ে বলা হয়েচে তোমাকে। তাই পারলৌকিক ক্রিয়াও যথাযথ হয়নি। এই কথাটা শেষমেশ জমিদার মশাইও বুঝতে পেরেচেন বোধকরি। তিনি বলতেও চেয়েচেন তোমাকে”
আমি শুধালাম, “এইটে কেমন করে বলচো?”
“বলছি দুটো ঘটনা একসঙ্গে মিলিয়ে এবং ঘড়ির সময়টা দেখে। এক, ক্রিয়ায় ত্রুটি থাকা। দুই, জমিদারের চিঠির শেষ কথাটুকু। ওটার পরিপূর্ণ কথাটা বোধহয়, ‘আসল কথা হল, তোমার খুড়ামশাই কিন্তু নয় তারিখে মারা গিয়েচিলেন’ এই কথাটাই সম্ভবত ওনার বলার উদ্দেশ্য ছিল, কিন্তু কেন শেষ অবধি উনি লিখে উঠতে পারলেন না, রক্ত কেন এল চিঠিতে, এর উত্তর উনিই দিতে পারবেন।”
একটু থেমে কালীপদ শুধালো, “আচ্ছা ইন্দ্রনাথ, তোমার খুড়োর শব দেখে কি তোমার কিছুই অসঙ্গতি মনে হয়নি?”
ইন্দ্ৰ কিছুটা ভেবে বলল, “মৃত্যুর কারণ যা দেখানো হয়েচিল, তাতে মাথা এবং ঘাড়ের আঘাত দেখলেও অসঙ্গত বলে মনে হয়নি তখন। কিন্তু আরেকটা জিনিসও ছিল। খুড়োমশাইয়ের দুই হাতের পাতায় অজস্র চেরা চেরা ক্ষতের দাগ ছিল। একেবারেই গভীর নয় যদিও। সেগুলো কিসের দাগ আমি বুঝতে পারিনি, শুধাইওনি কাউকে।”
কালীপদ একটু চিন্তা করে বললে, “কোনো কারণে এই গোলমেলে জমিদারটিই তোমার খুড়োকে হত্যা করেনি তো? নচেৎ সে প্রথমে মৃত্যুর দিনটা ভুল বলল কেন? পরে বিপাকে পড়েই বা স্বীকার করতে বসলো কেন? জমিদারদের পোষা লেঠেল থাকে। তাদের সম্মিলিত আঘাত ঠেকানোর দাগ হতে পারে সেগুলি।”
কানাই এতক্ষণ চুপটি করে বসে কথাবার্তা শুনচিলো। এখন গলা খাঁকারি দিয়ে কইলো, “না কর্তাবাবা, লাঠির দাগ বোধহয় নয়। লাঠি ঠেকালে কালশিরা পড়বে, সড়কি ঠেকালে হাত ফালা হবে। কিন্তু দাদাবাবু যেমনটি বলচেন তাতে ওসব আঘাত বোধহয় নয়।”
কালীপদ সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ালো ধীরে ধীরে। রেলগাড়ি আমাদের নামিয়ে দিল দক্ষিণের শেষ ইস্টিশানে। আমরা গো যান, নৌকা এবং পদব্রজে বিকেলের মুখে পৌঁছে গেলাম অভিশাপের বধ্যভূমিতে। সূর্যালোক পড়ে আসা দিনান্তে আমরা গরুর গাড়ি থেকে কাঁকড়াঝোরার কিছু আগেই নেমে পড়লাম, কারণ গাড়োয়ান হঠাৎ বললে, তার গরু নাকি আর যেতে চাইচে না। আমরা কিছুটা হেঁটে কাঁকড়াঝোরায় পা রাখা মাত্র কালীপদ নীচু হয়ে এক খাবলা মাটি তুলে আঘ্রাণ নিয়ে পৃথিবীর মাটি পৃথিবীকে ফিরিয়ে দিয়ে সন্দিগ্ধ ভাবে বললে, “গোলমাল রয়েচে।”
(১১) থাবা
জমিদার বাড়িতে প্রবেশের মুখে দ্বারীরা পথ আটকে কইলো, “বাইরের কাউকে এখন ভিতরে যাবার অনুমতি দেওয়া হচ্চে না। ছোটকর্তার নিষেধ রয়েচে। ফিরে যাও।”
ইন্দ্রনাথ বলল, “আপনি বড়কর্তাকেই খবর দিন। বলুন কলকাতা থেকে হরিহর ঘোষের ভ্রাতুষ্পুত্র এসেচে।”
দ্বারীরা কথাটা শুনেই ভয়ে পিছিয়ে গিয়ে বললে, “যাও যাও, দেখা হবে না। বড়কর্তা মারা গিয়েচেন দুইদিন হল। আগামীকাল তার ক্রিয়া। ছোটকর্তা তাই নিয়ে রয়েচেন।”
কালীপদ দুই পা সামনে এগিয়ে গম্ভীর স্বরে বললে, “তোমাদের ছোট কর্তাকে গিয়ে বলো, রায়দীঘড়া থেকে সেখানকার জমিদার এসে বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েচেন এবং এটাও বলো যে তোমরা তাঁকে ফটকেই আটকে রেখেচো।”
একজন দ্বারী সেলাম জানিয়ে তৎক্ষণাৎ দৌড়ে গেল অন্দরে। আরেকজন বিনয়ী মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলো অপরাধী মুখে। জমিদার সারদার পুত্রের ঘরোয়া নাম বোধহয় সুশান্ত অথবা সুশীল ধরণের কিছু ছিল। এখন আর ঠিকঠাক স্মরণ নেই। আমরা তাকে সুশীল বলেই ডাকবো। তো, সুশীল নিজে এসে আমাদের সসম্মানে অন্দরে নিয়ে গিয়ে বসালো। আমি প্রথম অশৌচ গৃহে বসতে অনিচ্ছুক ছিলাম, কিন্তু কালীপদ যেখানে আপৎকাল মাথায় রেখে উপবেশন করল, সেখানে আমি আর না বসি কেমনে?
সুশীল অবাক হয়ে কইলো, “বাবা আপনাদের পত্র দিয়েচিল? কৈ জানিনে তো?”
ভিতর বাড়িতে খোঁজ নিয়ে একজন ভৃত্যকে নিয়ে হাজির হল সুশীল ভৃত্য মাথা নীচু করে বললে, “হাঁ হুজুর, আমি বড়কর্তার হুকুমমতোই ডাক . আপিসে গিয়ে ওখানি পাঠিয়েচি। কর্তার হুকুম ছিল। বলেচিলেন আষাঢ় একত্রিশে ডাকে দিলে আপনারা শ্রাবণ তেসরার ভিতরে চলে আসতে পারবেন। তাই আমি…”
আমরা হত সারদার কক্ষ ঘুরে ঘুরে দেখলাম। মোটের উপর গোছানো হয়েচে, কিন্তু গোটা কক্ষটার বাতাস যেন ভারী হয়ে রয়েচে। সেই কক্ষে অনুসন্ধান যোগ্য কিছু পাওয়া গেল না। কালীপদ কইলো, “শোনো বাবা,! এই অবস্থায় বলতে খারাপ লাগে, কিন্তু আমরা দুই তিনটে দিন তোমাদের আতিথ্য গ্রহণ করবো। সিধেটিধে অপ্রয়োজন, আমাদের ওসব বালাই নাই। আর কাল একবার এঁদের পুরনো বাড়িটা ঘুরে দেখবো।”
আমাদের জন্য একখানা বড়সড় অতিথিকক্ষ খুলে দেওয়া হল। কক্ষের মধ্যে চারখানা মেহগনি কাঠের কারুকাজ করা জাফরি প্রাচীরের মাধ্যমে অতবড় ঘরখানাকে চমৎকার ভাবে চমৎকার দৃষ্টিনন্দন ভাবে পাঁচ জনের উপযুক্ত করে তোলা হয়েচে। পাঁচ ভাগে পাঁচখানি শয্যা। একই ঘর ও কপাটের ভিতরে পাঁচটি অতিথির আলাদা আলাদা থাকার কৌশল দেখে মুগ্ধ হলাম। ঐ কাঠেরই গায়ে আলাদা আলাদা আয়না, কাছিমখোলের চিরুনী, আতরের শিশি রাখা রয়েচে। ভৃত্য এসে শয্যা বদলে দিয়ে কুঁজোয় জল ভরে দিয়ে গেল।
রাতের আহারের পরপরই ঘুমাতে ইচ্ছে হল না। সে কথা সুশীলকে বলতে সে বললে, “বেশ, তবে বাইরে যাওয়া চলবে না। যদি ছাতে হাঁটতে চান তবে চলুন।”
কানাই গেল নীচের লেঠেলদের সঙ্গে কথাবার্তা কইতে। আমরা চারজন সুবিশাল ছাতে এসে দাঁড়ালাম। জোলো বাতাসের সঙ্গে উন্মুক্ত প্রাণবায়ু আমার এতক্ষণের শ্রান্তি কাটিয়ে দিল এক মুহূর্তে। এমন খোলা আকাশ, এমন মুক্ত আকাশ কলকাতায় কল্পনা করা যায় না। আমার মনের এই প্রশান্তি, প্রকৃতির এই মাধুরীর ঠিক পিছনে পিছনেই যে একটা সর্বনাশা দানব আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপ লুকিয়ে দেখে চলেচে, তা টের পেলাম আর একটু পরেই।
টুকিটাকি কথাবার্তা বলে সুশীল আর ইন্দ্র গিয়ে বসলো দূরের ছাতঘরের পাশে একটা বেদীতে। আমি আর কালীপদ মহলের পিছনটা দেখবো বলে ছাতের পিছনের দিকের পাঁচিলে ঝুঁকে দাঁড়ালাম। পিছনে বাড়ির গায়ে বোধহয় গোটা দুয়েক হ্যাজাক জ্বলচে। এখান থেকে চোখে পড়চে না বটে, তবে তার আলোয় দেউড়ির পিছনটা মোটামুটি আলো হয়েচে। কালীপদ আমাকে একটু দ্বিধাজড়িত স্বরে কইলো, “আচ্ছা ডাক্তার, এখানে এসে যা যা দেখলাম, শুনলাম, তাতে তোমার কোনো খটকা লাগেনি?”
আমি ভেবে বললাম, “দ্বারীরা যে কোনো জমিদারের নামেই ভয় খায়…”
কালীপদ কটমট করে চেয়ে বললে, “শেষে এইটেই তোমার উপলব্ধি হল এতক্ষণ এসে? যে ভৃত্য পত্রখানা ডাকে দিয়েচিল, তাকে তার মনিব একথা কেন বলেচিল যে, তাড়াতাড়ি পাঠালে হরিহরের পরিবার তেসরা শ্রাবণের মধ্যে চলে আসতে পারবে? আজ বত্রিশ। কিন্তু একত্রিশে আষাঢ়ে অধিক মূল্যে ওভাবে রেজিস্ট্রারী করে থাকলে সেই বিকেলেই কলকাতায় চিঠি পৌঁছে যাবে। এখানে আসতে আর একটা দিন ধরো। তার মানে আমাদের মতোই যে কেউই আষাঢ় সংক্রান্তিতেই চলে আসা সম্ভব ছিল। তবে আরও দুইদিন পেরিয়ে ধরল কেন সারদা? এইটে আমাকে ভাবাচ্চে হে।”
আমি কী একটা বলতে যাচ্চি, হঠাৎ নীচের দিকে তিন চারটে কুকুর আমাদের ছাতের উপরে দেখে খাঁউখাঁউ করে চীৎকার করে উঠল। আমি খেই হারিয়ে চমকে উঠেই লজ্জিত হয়ে হেসে ফেললাম। কালীপদ মুখে দুইবার তু তু আওয়াজ করতে তাদের চীৎকার আরও বেড়ে গেল। হয় কুকুরগুলো বাইরের অচেনা মুখকে জমিদারের ছাতে মেনে নিতে পারেনি, নয়তো পরপর এই অশান্ত পরিস্থিতি তাদেরও সন্দিগ্ধ করে তুলেছে।
তাদের সমবেত চীৎকারে কথা বলা দায়। আমি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললাম, “কুকুরগুলো আমাদের নিয়ে এভাবে ক্ষেপে উঠল কেন? চুপচাপ তো দাঁড়িয়ে রয়েচি, আর তাছাড়া…
আমি কথা থামিয়ে দেখলাম কালীপদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কুকুরগুলোর আচরণ এবং কান খাড়া করে তাদের স্বরের ওঠানামা খেয়াল করে চলেচে। আমি একটু আনচান করে উঠতেই কালীপদ ছাতের পাঁচিলটা শক্ত করে চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে একেবারে ফিসফিস করে বলল, “খবরদার পিছনে ফিরবে না ডাক্তার। পিছনে খুব ভয়ঙ্কর কিছু রয়েচে। কুকুরগুলো তাকে দেখেই ভয়ে পাগল হয়ে উঠেচে, কিন্তু প্রভুভক্তের রক্ত তো, ভীষণ আতঙ্কে ও পালিয়ে না গিয়ে আমাদের সাবধান করে চলেচে।”
কালীপদ ওভাবে ঘুরে থেকেই নিজের হাতের কনিষ্ঠা আঙুলের উপর অনামিকা স্থাপন করে কি যেন বিড়বিড় করেই বিদ্যুৎবেগে হাতটা সোজা করে পিছনে ঘুরলো। ছাতটা যেন একটা বিদ্যুৎ চমকানোর মতো আলোয় ঝলসে উঠেই অন্ধকার হয়ে গেল! একটা বুনো, আঁশটে গন্ধ ছড়িয়ে পড়েচে চারদিকে! আমি একেবারে চকিতে পিছনে ফিরেই মনে হল একটা বড়সড় আঁধারের পিন্ড যেন নিঃশব্দে ছিটকে পড়ল ছাত পেরিয়ে বাঁ দিকের গাছগুলোর উপর। গাছের মড়মড় শব্দ, পাখীদের চীৎকার আর কুকুরের শব্দের মধ্যেই সুশীল আর ইন্দ্র ভয় পেয়ে ছুটে আসতেই দূরের বিলটার ওপার থেকে একটা ক্রুদ্ধ গর্জন ভয়ানক অভিঘাতে ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। কোনো খল শিকারী যেন মনোমত শিকারকে হাতছাড়া হবার রাগে চীৎকার করচে!
কালীপদ এই শীতল বাতাসেই হাত দিয়ে ললাটের ঘাম মুছে কইলো, “কিছু না, নীচে চলো।”
রাতে চারজন তিনটে কাঠের পরদার মাঝের শয্যায় শয়ন করলাম। পঞ্চমটি রইলো শূন্য। শোবার আগে কালীপদ কপালে ভাঁজ ফেলে বললে, “অপদেবতাটি বড় সহজ নয়। প্রথমতঃ, তার উপস্থিতি নিঃসাড়। দ্বিতীয়তঃ, তার গতিবেগ অসম্ভব দ্রুত। সে মন্ত্রাঘাতে আবিষ্ট হবার পর চোখের পলকে দূরের বনে পৌঁছে গিয়েচিল। এর আরও কত শক্তি রয়েচে তা ধীরে ধীরে বোঝা যাবে। শোনো দুজনেই, তোমরা অতি আবশ্যকতা হলেও এই কপাট খুলবে না। ঘরের বাইরে যাবে না। কাল একবার ইন্দ্রদের প্রাচীন পোড়ো বাড়িটায় আর গাঁয়ের আনাচ কানাচ ঘুরে দেখতে হবে।”
(১২) সর্বনাশের হেঁয়ালি
কালীপদর ঠেলায় আমার ঘুম ভাঙতেই সে ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে শশসস্ করে একেবারে নীচু গলায় ফিসফিস করে বললে, “একটাও শব্দ নয় ডাক্তার। মনের ভুলেও নয়। যা বলচি মন দিয়ে শোনো, ঐ শয়তান আমাদের প্রতিটা বাক্য শুনতে পায়, এর প্রমাণ আমি পেয়েচি। যে কোনো স্বাভাবিক কথাই সে জানতে পেরে যায়, পায় না শুধু নীচু স্বরের শব্দ। পায়ের আওয়াজ না করে পালঙ্ক থেকে নেমে এসো। এই আতরটুকু গায়ে মেখে নাও ভালো করে, তোমার গায়ের গন্ধ যাতে পূর্ণরূপে ঢাকা পড়ে। তাড়াতাড়ি করো। নীচে গাড়ি তৈরি রয়েচে। দুইজন ভৃত্যকে নিয়ে ইন্দ্রকে না জানিয়েই তার বাড়িতে যেতে হবে আমাদের। আতরের শিশিটা সঙ্গে নিও
কালীপদ ইতিমধ্যেই তার কামিজে সুগন্ধি আতর ঘষে নিয়েচে। আমি বাকিটুকু উত্তমরূপে ঘষে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে কালীপদ আমার হাত ধরে কইলো, “আমার হাত ছাড়বে না। বিপদ হবে।”
কান খাড়া করে কালীপদ একবার চারদিকের সব শব্দ শুনে নিয়ে পা টিপে টিপে আমাকে নিয়ে একেবারে নিঃসাড়ে কপাটের হুড়কো খুলে ফেলল। সতর্ক ভাবে একবার বাইরেটা দেখে নিয়ে চৌকাঠের বাইরে পা রাখা মাত্র কে যেন তাকে পিছন থেকে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দিয়ে ছিটকে ফেলে দিল বাইরে। কালীপদ বেসামাল হয়ে চিতিয়ে পড়ল বারান্দায়! পরমুহূর্তে আমাকে পিছন থেকে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিয়ে কপাটটায় হুড়কো তুলে দিতেই আমি বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে বললাম, “এ কী!”
বাইরে দুই তিনবার সপাং সপাং করে শব্দ আছড়ে পড়ল ভারী কপাটে। কালীপদ উত্তর না দিয়ে কপাটের চৌকাঠ বরাবর পায়ের বুড়ো আঙুলটা ঘষে নিয়ে বিরক্ত হয়ে বললে, “এখুনি বাঘের মুখে পড়েচিলে আরকি। তুমি আমার সঙ্গে শোবে এবার।”
আমি তখনও বাকরুদ্ধ হয়ে বিছানায় বসে আছি দেখে কালীপদ একটু নরম হয়ে কইলো, “তোমার আর দোষ কী? সেই শয়তান তবে হলেও ধুরন্ধর। একটু ধন্ধ আমার ছিলই। সে নিজের গায়ের আঁশটে গন্ধ ঢাকতেই আতরের ছলনা করেচিল। আরও একটা জিনিস অনুমানে বুঝেচি। তুমি বিপদে পড়ে চীৎকার করলেও কিন্তু সেই আওয়াজকে ঐ শয়তান রুদ্ধ করতে জানে। তোমার আওয়াজ কেউ শুনতে পাবে না হয়তো। নাহলে জমিদার সারদার অপঘাতের সময়ে সে কি একটাও চীৎকার করেনি? তবে কপাটের বাইরে থাকা লেঠেলদ্বয় কিছু শুনতে পেলে না কেন? যাক, এখন ঘুমিয়ে পড়ো। আমি কিছুক্ষণ জেগে আছি আরও।”
সকালে কপাট খুলে বেরিয়েই আগে পিছনে ঘুরে তাকিয়ে চমকে উঠে দেখি কপাটের গায়ে কয়েকটা গভীর আঘাতের দাগ। কোনো ধারালো, শক্তিমান হাতিয়ার দিয়ে যেন নিষ্ফল আক্রোশে দরজায় আঘাত করা হয়েচে!
রাতের ঘটনা সকালে ইন্দ্রকে বললেও সুশীলকে কিছুই বলাকওয়া হল না। আজ তার বাপের পারলৌকিক ক্রিয়া। তার দেওয়া এক প্রজাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা চললাম গাঁয়ের আনাচে কানাচে ঘুরতে ঘুরতে। নদীর চড়া, ঝোপঝাড়, বন, গাঁয়ের পথঘাট দেখতে দেখতে কালীপদ আপন মনে কইলো, “সব গতিক সুবিধার নয়। সব জায়গাতেই তার আবছায়া উপস্থিতি বোধ হচ্চে কেন জানি!”
আমরা গায়ে ঘুরে ঘুরে বেশ কিছু লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা কইলাম। অনেকেই ভয়ে কথা বলল না। পথপ্রদর্শক এবং ইন্দ্রর দেখানো পথে আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম একটা ঝোপ জঙ্গলে ভরা বড় বাড়ির সামনে। বাড়িটি রীতিমতো পোড়োই। যে কোনোদিন পড়ে যাবে দেওয়াল গুলো। সামনের উঠানে আগাছা ভরে রয়েচে। অদুরে একটি প্রাচীন দেউল। তার গায়েও বর্ষার লতা উঠেচে। কালীপদ গাড়োয়ানের থেকে বলদ তাড়নার ছিপটি নিয়ে ঝোপেঝাড়ে আঘাত করতে করতে চলল। কানাইও লাঠি ঠুকতে থাকলো। আমরা ঢুকলাম বাড়ির ভিতরে। ইন্দ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বাড়িটার চারদিক ভগ্নপ্রায়। একসময়ে জ্বলজ্বল করা ফলক এখন রুক্ষতা প্রাপ্ত হয়েচে। বাড়ির নাম সুধাকানন। সেসব এড়িয়ে একটা বড় কক্ষের সামনে এসে ইন্দ্ৰ কইলো, “এই ছিল খুড়োর শয়নকক্ষ। টুকিটাকি তার সামগ্রী যা ছিল সবই আমি হয় বিলিয়ে নাহলে নিয়ে গিয়েচি কলকাতার বাড়িতে…”
কালীপদ ইতিউতি নজর ঘুরিয়ে বললে, “আমি তবে অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোই দেখি।” হরিহরের ভাঙা তোরঙ্গ, ধূলিমলিন বিছানাপত্র ঘেঁটে নিরাশ হয়ে কক্ষের বাইরে এসে আরেকটা ক্ষুদ্র কক্ষে উঁকি দিয়ে দেখলাম সেখানা ঠাকুরঘর। কত মাসের পর মাস ধরে গৃহদেবতারা অনাদরে পড়ে রয়েচেন। আমার মনটা কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে উঠল। বাড়ির ভিতরটা ভালোই অন্ধকার। কালীপদ আমার পকেটের টর্চবাতিটার বোতাম টিপে এগিয়ে গিয়ে ছোট্ট পাথরবাটি আর তাতে বসানো শিবলিঙ্গের দিকে চেয়ে ধন্ধ ভরে কইলো, “এ কেমন ঠাকুরঘর হে? শিবলিঙ্গের স্থাপনা হয়েচে অথচ একদিনের তরেও চন্দন বেলপাতা পড়েনি!” এই বলে কালীপদ কিছুটা উৎসুক হয়ে চারদিকটা ইতিউতি দেখতে দেখতে একটা ভারী পেতলের ডালা ওয়ালা তোরঙ্গে গিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ হল।
ইন্দ্ৰ অপ্রস্তুত হয়ে বললে, “আমরা বৈষ্ণব ঠাকুরমশায়। আমার পরিবার শ্রীকৃষ্ণের স্নেহধন্য। শাক্ত পূজার আমাদের পরিবারে চল নাই, অথচ খুড়োর যে কী মতি হয়েচিল, এখানেও শিবলিঙ্গ আবার মন্দিরেও রাধামাধবের বিগ্রহ সরিয়ে মৃত্যুর আগে নাকি শিবলিঙ্গের স্থাপনা করেচিলেন।”
কালীপদর চোখে জ্যোতি দেখা দিল। গুরুভার ডালা খুলে একটা জীর্ণ গুটানো কাগজ বের করে মেলে ধরল সামনে। মুখে বলল, “এই ঠাকুরঘর বোধহয় একটা ধোঁকার টাটি মাত্র, নাহলে উঠানে মন্দির থাকতে কেউ ঘরে একই বিগ্রহ রাখে সচরাচর?”
কাগজের হাতের লেখা অতি প্রাচীন না হলেও অন্ততঃ এক পুরুষ আগের তো বটেই। ইন্দ্র একবার তোরঙ্গটা দেখে নিয়ে কইলো, “আমি ছেলেবেলায় এই তোরঙ্গ আমাদের বাড়িতেই দেখেচি। খুড়ো নিয়ে এসেচিলেন হয়তো। বাবার মুখে শুনেচি, এতে তাঁর ঠাকুরদার লেখা কিছু একটা রয়েচে, যে জিনিস নাকি যুগযুগান্ত ধরে বংশ পরম্পরায় আমাদের পরিবারে কয়েক পুরুষ বাদ দিয়ে দিয়ে নতুন করে লেখা হয়ে আসচে। এতে কি লেখা রয়েচে ঠাকুর
কালীপদ কাগজটা মেলে ধরল আমাদের দিকে। হলদে হয়ে আসা কাগজে ঘন কালো অক্ষরে লেখা রয়েচে একটা হেঁয়ালি ধরনের কিছু,
কে সবকিছু লয়ে দানিলেন ঘোষে,
বুকে তার সুষুপ্ত ধ্বংস সরোষে।
জ্বলে চোখ বিভীষণ, দেখে রবি-চাঁদ,
পঞ্চানন মাল্য হতে এক মুন্ড বাদ,
বাকি চার রক্ষা পায় অমরের বনে,
অগ্নিদেবের চরণখানি চলিবে যেই ক্ষণে,
চৌকাঠেতে চাবিকাঠি, উদ্ধারিবে তা,
করিবে স্থাপন তারে দেখতে ভালো যা,
সে মালার সিংহভাগ আসে করতলে,
অংশগ্রহণ করে ভূমি রসাতলে।
পড়া লিখা অক্ষরের কোনো দাম নাই,
কানেতে শুনিবে যাহা সত্য হয় তাই।
চতুরঙ্গ শুদ্ধ কেহ দন্ডাইবে দ্বারে,
খুলিবে তবেই বাধা এক ফুৎকারে।
কালীপদ বিস্মিত মুখে টর্চবাতির আলোয় সেটুকু আত্মস্থ করে নিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলল। বাইরে আবার বৃষ্টি এল। কালীপদ যতই রসিকতা করুক, আমি আমার যাত্রাপালা মার্কা রঙবেরঙ ছাতাখানা নিয়েই এসেচি এবং তাতে কালীপদর যথেষ্ট উপকার হচ্চে, কিন্তু সে কথা স্বীকার করবে না। আমরা এসে দাঁড়িয়েচি মন্দিরের সামনে। জীর্ণ পাষাণের গড়া মন্দিরটা ঝোপঝাড় আর শৈবাল বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফটকের উপরে একখানা ত্রিনেত্র ধরণের নকশা। মন্দিরের চাতালে উঠে দুই পা এগিয়ে ছাতির তলা থেকে বেরিয়ে তাড়াতাড়ি মন্দিরে ঢুকতে গিয়েই কালীপদ কিসে যেন ধাক্কা খেয়ে ছিটকে এল কপাল চেপে! কিন্তু কিছুই নেই আমাদের সুমুখে! আমি কয়েক পা এগোতেই মন্দিরের দিক থেকে একটা অস্ফুট শনশন ধরনের শব্দ শুনতে পেলাম। কালীপদ সন্তর্পণে একটু এগিয়ে খুব বিস্মিত হয়ে কইলো, “এখন তো আর কৈ কিছু হল না? তবে তখন কিসের বাধা পেলাম বলো তো?”
ইন্দ্র ইতস্তত করে বলল, “এখানে তো কিছুই দেখিনি ঠাকুর? কোনো ধাক্কা খাবার মতো কিছু তো ছিল না?”
“ছিল বাছা, ছিল। এই দেখো, সেই অদৃশ্য বেড়া পেরিয়ে এই অংশটায় বৃষ্টি অবধি পড়েনি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্চে, সেই বেড়া খুললো কে? কোথা থেকে?”
মন্দিরের ভিতরে এসে বিস্মিত হলাম। একপাশে রাধামাধবের বিগ্রহ সরিয়ে রেখে মধ্যস্থলে একখানা বড়সড় শিবলিঙ্গের আকারের পাষাণ রাখা রয়েচে। প্রজারা বলচিলো, এই পাথর নাকি হরিহরের স্বপ্নাদেশে পাওয়া শিবলিঙ্গ। মিছে নয়, গাঁয়ের বামুনেরা নিজের হাতে তুলে এনেচে নদীর তল থেকে। কিন্তু মৃত্যুর আগে আগেই এমন স্বপ্নাদেশের কারণ কী?
কালীপদ একটু ভেবে নিয়ে বলল, “পাথর পাওয়া গিয়েচে সত্যি, কিন্তু স্বপ্নাদেশের কথা বোধহয় ঝুটো। কেন ভুলে যাচ্চো ডাক্তার, হরিহর নাকি চৌপর জলেবিলেই পড়ে থাকতো। তার পক্ষে নদীর কাছাকাছি জলভাগের মধ্যে একটা পাথর দেখা কি এমন কঠিন কথা? এর জন্য স্বপ্ন লাগে না, তবে কথাটা হল, হরিহর নিজের মৃত্যু অনিবার্য ধরে নিয়ে হঠাৎ এই ফন্দীটা করতে গেল কেন? গাঁয়ের রামুনেরা বললে যে হরিহর নাকি পাথরটা মন্দিরের এই এখানেই রাখতে বলে বামুনদের ভাগিয়ে দেয়। বাকিটা সে নিজেই আহত শরীরে ক্লেশের সঙ্গে করে। কিন্তু কেন?
তার হাতের পাতায় যে অজস্র ক্ষতের দাগ ছিল, তা হয়তো এই গুরুভার পাষাণ সরানোর ফলেই হয়েচিল। কানাই….”
কানাই কর্তার ইঙ্গিত বুঝে প্রণাম সেরে নিয়ে সড়কিটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সেই ভারী শিবলিঙ্গকে নিজের বজ্রবাহু দিয়ে পাক দিয়ে হড়হড় করে ঠেলে কিছুটা সরিয়ে নিতেই নীচে একটা কপাট চোখে পড়ল! কানাইয়ের মাথায় কতকগুলো পুরনো খড়কুটো উড়ে এসে পড়ল। কানাই সড়কির ফলাটা বের করে তা দিয়ে একবার চাড় দিতেই কপাট খুলে গেল!! আমি বিস্মিত হয়ে ঝুঁকে দেখতে গেলাম। আবার কানাইয়ের মাথায় একটুখানি চুন সুড়কির গুঁড়ো এসে পড়তেই কালীপদ উপরে তাকিয়েই এক ধাক্কাতে কানাইকে কিছুটা সরিয়ে দিতেই আমার মনে হল মন্দিরের প্রায়ান্ধকার কড়িকাঠে, আমাদের মাথার ঠিক উপরে এতক্ষণ কি যেন একটা জ্বলজ্বলে চোখে ওৎ পেতে বসেছিল! আমরা একসঙ্গে উপরে তাকাতেই একটা ঘুটঘুটে অন্ধকার সরীসৃপের মতো কিছু খড়মড় করে বিদ্যুৎবেগে পালিয়ে গেল! একরাশ পলেস্তরা খসে পড়ল মেঝেতে
আমি বাক্য ফিরে পেয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে কইলাম, “শয়তান খুনীটা আবার ঠিক এসে হাজির হয়েচে তক্কে তকে।”
কালীপদ চোখের একটা উগ্র রকমের ইশারা করতেই আমি থমকে চুপ করে গেলাম। ইন্দ্রর সামনে এমন কথা বললে তার মনে ক্লেশ হতে পারে হয়তো, এই ভেবে বাকি রাগ গিলে ফেললাম। ইন্দ্র একবার হেঁয়ালির পাতাখানা সাবধানে পড়ে দেখল দ্বিতীয়বার, তারপর দ্বিধাজড়িত স্বরে বললে, “আমাদের পরিবারে কখনও শুনিনি কেউ নিজের সবকিছু পরিবারের কাউকে দান করেচেন। আর চৌকাঠের যে সূত্রের কথা রয়েছে তা কোন চৌকাঠ? এত বড় বাড়িটার এতগুলো ভগ্নপ্রায় চৌকাঠ খুঁড়ে খুঁড়ে দেখা সম্ভব?”
কালীপদ ধীরে ধীরে বললে, “এমন কোনো শক্তি তোমার খুড়োর হস্তগত হয়েচিল যা সে প্রেত হবার পর একটি একটি করে ব্যবহার করে চলেচে নাশকতার জন্য। পঞ্চানন মাল্য কী জিনিস জানিনে। ভগবান শঙ্করের কিছু কি? কিন্তু সেইরকম কোনো একটি বিধ্বংসী মালা হয়তো লুকানো রয়েচে কোথাও। তার ক্রিয়া কী, নিরসন কী, হদিশ কী, কিছুই জানি নে। আচ্ছা, কানাই তুই ইন্দ্রকে নিয়ে একবার সামনের ঐ বাড়িতে যা। খুঁড়তে হবে না, তবে সবকয়টা চৌকাঠ নীচু হয়ে ভালো করে দেখবি। কোথাও কোনো ফাঁকফোকর বা অস্বাভাবিক কিছু রয়েচে কিনা। আর শোন, এই মাটিটুকু হাতে রাখ শক্ত করে। হরিহরের প্রেত আশপাশে ঘেঁষবে না। ইন্দ্র, তুমিও রাখো। তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিই, পিশাচদশা প্রাপ্ত হবার পর বিদেহীর কোনো আত্মীয়তা বা মমত্ব বোধ থাকে না। কারণ এবং সুযোগ পেলে তোমাকে হত্যা করতে সে দ্বিতীয়বার ভাববে না।”
ইন্দ্র উৎসুক হয়ে শুধালো, “কিন্তু ঠাকুর, যদি কোনো রহস্য থেকেই থাকে তবে সেইটে যে এই বাড়ির অধীনেই রয়েচে তা কীভাবে নিশ্চিত হচ্চেন?”
কালীপদ আঙুলটা মটকে নিয়ে বললে, “কারণ তোমার বাড়ির নাম সুধাকানন। সুধা অর্থ অমৃত, কানন হল বন। এই চৌহদ্দিই হল হেঁয়ালির সেই অমরের বন।”
কানাই ইন্দ্রকে নিয়ে চলে গেলে পর আমরা গুপ্ত কপাট সরিয়ে একখানা শীর্ণ সোপান বেয়ে নীচে নামলাম। ভ্যাপসা গুমোট বাতাস পেরিয়েও নাকে আসলো একটা আঁশটে গন্ধ। কালীপদ একবার আমার দিকে আড়চোখে চেয়ে বললে, “তাঁর আনাগোনা রয়েচে এই ঘরে। প্রেতদশায় তার বাধা নেই হয়তো প্রবেশে, কিন্তু শরীর থাকাকালীন সে বাইরের অদেখা বেড়াকে কী উপায়ে খুলতো তার নিশ্চয়ই কোনো উপায় একটা আছেই। আমাদের ক্ষেত্রে সেই বাধা কেমন করে খুললো, তাও রহস্য। ছড়াটার শেষের দিকটা স্মরণ করো। চতুরঙ্গ মানে তো দাবা? কোনো একটা দাবার ছকেই বোধহয় দ্বারের বাধা খোলার হদিশ রয়েচে, কিন্তু কোথায়?”
টর্চের লালচে সাদা আলো দেওয়ালে দেওয়ালে ঘুরতে লাগল। গুপ্ত ঘরখানা আড়ে বহরে কুড়ি কুড়ি হাত হবে। মধ্যে একখানা স্থায়ী বেদী, দেওয়ালে বহুকাল নির্বাপিত একখানা মশাল আটকানো, মাথার উপরে ধপধপে সাদা ছাত আর সেই নামার ফোকরটা এবং প্রাচীরের গায়ে বিষ্ণুর আবক্ষ শঙ্খ চক্র গদা পদ্মধারী প্রশান্ত মূর্তি খোদাই করা। কালীপদ বিষ্ণুমূর্তির প্রতি বিঘৎ এ হাত বুলিয়ে বুলিয়ে পরীক্ষা করল, বেদীটাকে পদাঘাত করে করে দেখে নিয়ে হতাশ হয়ে বলল, “এই গুপ্ত কক্ষে কিছু একটা ছিল আমি একেবারে হলপ করে বলতে পারি, তাই প্রেত হবার পরেও হরিহর এই ঘরে নেমেচে। কিন্তু এখন এই ঘরে কিছুই নাই।”
আমরা উপরে উঠে এসে শ্বাস নিয়ে বাঁচলাম। কানাইরা এসে জানালো তারা প্রতিটা চৌকাঠ নীচু হয়ে উত্তমরূপে লাঠি দিয়ে ঠুকে ঠুকে পরীক্ষা করেচে কিন্তু সেগুলি মোটেই ফাঁপা নয়। কোনো চিহ্নও নাই কিছুর। আমরা নিরাশ হয়ে গো যানে করে গাঁয়ের অন্যত্র সন্ধান করতে বেরোলাম। বিকেলের মুখে যখন হেঁতালের বনের পথ দিয়ে আমাদের গোরুর গাড়ি চলেচে, হঠাৎ নরম মাটির এক জায়গায় ভারী ঢাকা পড়ে গিয়ে গাড়ী একেবারে কাৎ হয়ে যেতেই আমরাও হুড়মুড়িয়ে এ ওর গায়ে এসে পড়লাম ছইয়ের ভিতরে।
এক পাশ দিয়ে কোনোমতে নেমে এলাম। প্রায় অর্ধেক চাকা বসে গিয়েচে মাটিতে। গাড়োয়ান বিস্মিত হয়ে কইলো, “একফোঁটা পাঁক নাই এখানে, গাড়ি বসলো কেন? এই পথ দিয়ে রোজই তো যাই, কোনো গর্ত ছিল না হলপ করে বলচি ঠাকুর! কেউ বিরাট গভীর গর্ত খুঁড়ে তাতে কলাপাতা বিছিয়ে মাটি লেপে রেখেছে!”
এ কার কাজ বুঝতে আমাদের বাকি রইল না। আমি কি একটা বলতে যাচ্চি, হঠাৎ পিছনের ঝোপ থেকে সপাং করে একটা শব্দের সঙ্গে কি একটা যেন চোখের পলকে গিয়ে ঢুকলো ছইয়ের ভেতরে, আর বিদ্যুৎবেগে ঝোপেই ফিরে গেল। আমি হুড়মুড় করে ছুটে এসে মাথায় হাত দিয়ে বললাম, “সর্বনাশ!”
ছইয়ের মধ্যে রেখে আসা সেই কাগজখানা আর নাই! আমি কালীপদর কাছে অপরাধী ভাবে ভুল স্বীকার করাতে কালীপদ অন্যমনস্ক হয়ে কইলো, “ভুল তো হয়েচেই। বড় ভুল…”
“কিন্তু গাড়িটা কাৎ হয়ে গিয়ে বেসামাল হয়ে কাগজের কথা আমার মনে ছিল না দাদা!”
কালীপদ কাঁধে হাত রেখে কইলো, “ভুল তোমার হয়নি, ভুল করেচে ঐ হরিহর। ভুল করেচে এই আক্রমণটা করে, কাগজটা চুরি করে। ও হেঁয়ালি আমার মনে গেঁথে গিয়েচে, কিন্তু আরও একটা কথা আমার মনে উঁকি দিচ্চে এখন…” চারদিকটা দেখে নিয়ে কালীপদ কথাটা থামিয়ে দিয়ে বলল, “লেখা অক্ষরের কোনো দাম যখন নাই তখন হেঁয়ালিটা লিখে রাখা হলই বা কেন?” গাড়ী আবার চলতে শুরু করল। জমিদার বাড়ির পথে।। দ্বিপ্রহরে সারদার অপঘাতের পারলৌকিক সম্পন্ন হয়েচে উঠানের এক কোণে। কালীপদ অসন্তোষ প্রকাশ করে বলল, “পুষ্করা বিধি বাড়ির জমিতে করলে বাছা? এগুলি করতে হয় নিরালা জলাশয়ের ধারে। হরিহরের মৃত্যু দশই নয়, নয়ই পৌষে হয়েচিল যা তোমার বাপ ইচ্ছে করেই গোপন করেচেন। ফলে পারলৌকিক পুষ্করার সুযোগ পাওয়া যায়নি যথাযথ ভাবে। হয়তো দশই পৌষে মৃতে দোষ নাই কিন্তু নয় তারিখে দোষ ছিল? সেই অনুযায়ী ক্রিয়া করতে হবে। দুইখানা পাঁজি থাকলে দিয়ে যেও। এই বৎসরের এবং আগের বৎসরের দুইখানা।”
রাতে সুশীলের স্ত্রী বকুল অবগুণ্ঠনাবতী হয়ে এসে ১৩৭০ এবং ১৩৬৯ এর পাঁজি দিয়ে গেল। কালীপদ উপযুক্ত পুষ্করার দিন খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ যেন চমকে উঠে বলল, “বাছা, তোমাকে ঐ সারদার লেখা চিঠিদুটো আনতে বলেচিলাম, সেই দুখানি দাও তো এখুনি। আক্রমণের তারিখগুলো দেখি একবার! কি ভয়ঙ্কর সঙ্কেত!”
কালীপদ বহুক্ষণ ধরে পঞ্জিকা মিলিয়ে ঘোলাটে চোখ তুলে বলল, “এইবার বুঝেচি সারদা কেন তেসরা শ্রাবণের মধ্যে হরিহরের বংশধরকে আনতে চেয়েচিল গাঁয়ে! সেও ধরতে পেরেচিল আমি যা ধরেছি, কিন্তু আসল ধ্বংসের মূল বস্তুটা খুঁজে না পেলে কিছুতেই কিছু হবার নয়! সেইটে কোথায় লুকিয়ে রেখেচে ধুরন্ধর প্রেত?” আমরা উৎকর্ণ হয়ে থাকলেও কালীপদ আর কিছুই বলল না।
রাতে আহারে বসে কালীপদ সামান্য আহার করল দেখে সুশীলের মাতা হেমনলিনী এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন। বিষণ্ণ, গম্ভীর মুখ, পরনে নূতন কালাপেড়ে থান। হেমনলিনী দুঃখ করে কইলেন, “ঠাকুর, অপরাধ হয়েছে মানচি। তা বলে বামুন যদি আহার গ্রহণ না করে আজকের দিনে তবে তাঁর আত্মার যে সদগতি হবে না ঠাকুর..”
হেমনলিনী বসনপ্রান্ত দিয়ে চোখ মুছলো। কালীপদ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ব্যাস্ত হয়ে বললে, “কেন ঠাকরুণ? কীসের অপরাধ? এ কথা কেন?”
“সুশীলের মুখে শুনলাম আপনি বাড়ির সুমুখে পারলৌকিক ক্রিয়া করায় ক্ষুণ্ণ হয়েচেন। আমি বলেচিলাম পিছনের জমিতে করতে কিন্তু ছেলে শুনলে না।”
কালীপদ ক্লিষ্ট হেসে কইলো, “তাতে কী হতো ঠাকরুণ? পিছনের জমি কি চৌহদ্দির ভিতরে নয়? সামনে পিছনে বলে কথা নয়, জমির চারদিকের সীমানাই হল চৌহদ্দি, চতুঃসীমা। তার ভিতরে পুষ্করা নিষিদ্ধ। তবে তাতে রাগ করিনি মা ঠাকরুন। আমি চিন্তা করচিলাম অন্য বিষয়ে।
আহার করে ছাতে উঠলাম। আজ কালীপদ বন্ধন দিয়ে রেখেচে উৎপাত নিবারণের জন্য। পাঁচিলের গা ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে কালীপদ নীচের প্রাঙ্গণের দিকে তাকিয়ে একটু উত্তেজিত হয়ে কইলো, “কানাই, তোরা সুধাকাননের চৌকাঠ যে দেখেছিলি, তার শুধু নীচটুকুই দেখেচিলি? কপাটের পরকলার বাকি অংশটুকু দেখিসনি, না?”
ইন্দ্র বলল, “না ঠাকুর, আপনি তো চৌকাঠটুকুই দেখতে বলেচিলেন?”
“হাঁ, বলেচিলাম। আমারও একই ভুল হয়েচিল। চৌহদ্দি যদি চারটে দিক হয় তবে চৌকাঠ কি করে শুধু নীচের কাঠটুকু হবে? দরজার চারখানা পরকলা নিয়েই চৌকাঠ। কাল একবার বাকি কাঠগুলো আগাগোড়া দেখবি তো কানাই!”
আমরা ছাতে পায়চারি করে এসে কক্ষে বসলাম। আমি তার মন ঘোরানোর জন্য প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বললাম, “এই ঝামেলা মিটে গেলে কলকাতায় ফিরে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে, কি বলো?”
কালীপদ অপ্রসন্ন মুখে কইলো, “আবার তোমার বন্ধুদের ডেকে আনবে বিতর্ক করার জন্য, তাই তো?”
আমি হেসে ফেললাম। “আহা, বিতর্ক কেন? ওরা যেগুলো জানে না সেগুলো জানতে চাইবে না?”
কালীপদ চোখ পাকিয়ে কইলো, “ওটা জানতে চাওয়া ছিল ডাক্তার? তোমার ঐ রাইটার্সের কেরাণী বন্ধু তে রীতিমতো মারমুখী হয়ে পড়েচিল হে!”
আমি হোঃ হোঃ করে হেসে ফেলে বললাম, “সে নয়, মারমুখী ছিল সহদেব। পুলিশ তো। কেশব কিছু বলেনি তো? সে তো শুধু…”
আমি কথা শেষ করার আগেই কালীপদ আমাকে ঝাঁকিয়ে বলল, “কি বললে?”
আমি থতমতো খেয়ে বললাম, “মানে, কেশব কিছু বলেনি তোমাকে সেদিন…”
কালীপদ হাতের তালুতে ঘঁষি মেরে বলল, “ঠিক ঠিক! অক্ষরের থেকে কানে শোনার দাম সত্যিই বেশি।”
আমি বিস্মিত হয়ে বললুম, “মানে?”
কালীপদ কইলো, “কে সবকিছু নিয়া দানিলেন ঘোষে… আসলে কথাটা বোধহয়— ‘কেশব কিছু নিয়া দানিলেন ঘোষে’ খুব চতুরতার সঙ্গে ঘুরিয়ে লেখা হয়েচে যাতে দেখতে আলাদা কিন্তু শুনতে এক থাকে। আচ্ছা ইন্দ্ৰ, তুমি বারবারই বলেচো তোমার পরিবার নাকি শ্রীকৃষ্ণের স্নেহধন্য। এর কারণ কী? কী গল্প ছড়িয়ে রয়েচে তোমার পরিবারে? খুলে বলো।”
ইন্দ্র বিছানায় বসে ধীরে ধীরে বললে, “বহু বহু পুরুষ ধরে বংশপরম্পরায় আমাদের পরিবারে শুনেচি, হাজার হাজার বৎসর আগে নাকি এক মাঘমাসের কাকভোরে স্বয়ং দ্বারকাধীশ শ্রীকৃষ্ণ এসেচিলেন আমাদের পূর্বপুরুষ জলধর ঘোষের কাছে। জলধর ছিলেন দ্বারকাধীশের বিশ্বাসভাজন। তখন যাদব পরিবার ধ্বংসের মুখে। শ্রীকৃষ্ণ নাকি জলধরের কাছে একখানা পুঁথি এবং একখানা মালা রাখতে দিয়েচিলেন। তাকে লুকিয়ে রাখার অদ্ভুত কৌশলও শিখিয়ে দিয়েচিলেন উনিই। তার পরপরই জরা ব্যাধের বাণে দ্বারকাধীশ দেহত্যাগ করেন। সত্যি মিথ্যে জানিনে ঠাকুর।”
কালীপদ ভীষণ উত্তেজিত হয়ে চীৎকার করে উঠল, “আলবৎ সত্য। হতেই হবে! কোনো ভয়ঙ্কর অস্ত্রকে তিনি লুকিয়ে রেখে গিয়েচিলেন হয়তো জলধর ঘোষের কাছে। লুকিয়ে রাখার এমন অসামান্য সঙ্কেতও তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত! বহু যুগ ধরে তারা হয়তো এভাবেই রক্ষা করে আসচে এই মহা মারণাস্ত্রকে। তোমার প্রপিতামহও এই বাড়ি তৈরি করিয়েচিলেন ওই সঙ্কেত মেনেই, যা উদ্ধার করেছে কেবল হরিহর! কাল একবার ভালো ভাবে নজর করে দেখতে হবে পুরো গুপ্তগৃহটা…”
আমি নিরাশার সঙ্গে বললাম, “কিন্তু সে ঘরে তো কিছুই নাই দাদা?”
কালীপদ চোখ সরু করে বলল, “সে ঘরে নাই বটে, কিন্তু চতুর চূড়ামণি কেশব কি এত সহজ পদ্ধতিই বলে যাবেন ডাক্তার? ঘরের ভিতরেও তো ঘর থাকতে পারে? পরীক্ষায় নকলের নকল করার মতো?”
(১৩) ধ্বংসমাল্য
পরদিন, অর্থাৎ দোসরা শ্রাবণের সকালে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম সুধাকাননের উদ্দেশে। কালীপদ প্রথমে আশপাশের চতুর্দিকে বাঁধন দিল, তারপর একজোট হয়ে কানাইয়ের সড়কির পেতল বাঁধানো দিকটা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখতে লাগলাম সব দরজার পরকলাগুলি। দ্বার অধিকাংশই ভগ্ন। অবশেষে সেই নকল ঠাকুরঘরের কপাটের উপরের কাঠটি থেকে ফাঁপা শব্দ আসতেই কানাই একবার তার কর্তাবাবার দিকে তাকিয়েই চাড় মারতে শক্ত শালকাঠের একটা চৌকো অংশ খুলে এল আর ভিতরের ফোকর দিয়ে উঁকি দিল একটা ধাতব জিনিসের অংশ!
কালীপদ কাঁপা হাতে সেই বস্তুটি টেনে বের করে এনে কপালে ঠেকালো। একটা ষড়ভূজ চাকতি মতো জিনিস! তার গায়ে অসংখ্য উঁচু উঁচু ধাতব খোদাই করা নকশা! আমি শুধালাম, “কিন্তু হেঁয়ালিতে তো ছিল চৌকাঠে চাবিকাঠি রয়েচে? কিন্তু এ তো..!”
কালীপদ স্থির চোখে তাকিয়ে বলল, “চাবিকাঠি সবসময় চাবির মতো দেখতে হয় না ডাক্তার, ওটা প্রতীকী। এটাই হয়তো বাসুদেবের বলা কোনো কিছুর অব্যার্থ চাবি! এ যে উলটো হয়ে গেল ডাক্তার! আমরা চাবি পেয়েচি, কিন্তু এই চাবির জন্য কুলুপটি আমাদের খুঁজতে হবে প্রাণপণে! ছড়ায় বলেচে, এই চাবিকে এমন কিছুতে স্থাপন করতে হবে, যা দেখতে ভালো। কিন্তু ওই ঘরে এমন কিছু ভালো দেখতে জিনিস কি ছিল? চলো আরেকবার দেখি…”
আমরা আবার বৃষ্টি মাথায় করে এসে দাঁড়িয়েচি মন্দিরের চাতালে। কালীপদ সতর্ক ভাবে হাতটা সামনে তুলে এগোতে এগোতে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে কইলো, “এই দেখো। অদেখা বেড়া!”
ইন্দ্র আর কানাই ছুটে এসে হাত ঠেকিয়ে দিব্যি টের পেলো একটা অতি স্বচ্ছ কাঁচের মতো অদৃশ্য বাধা! কাঁচের মতো ঠুনকো নয়, বরং বিষম কঠিন এবং অলঙ্ঘনীয়! আমি মন্দিরের একটা প্রাচীন ইটের টুকরো তুলে দূর থেকে ছুঁড়ে মারতে সেটা ছিটকে এসে পড়ল এইদিকেই! আমি সবিস্ময়ে এগিয়ে গিয়ে হাতটা ঠেকাতেই মনে হল একটা না দেখা হিমশীতল কিছু মাথা উচিয়ে রয়েচে চতুর্দিকে বেড়াপাকের ন্যায়। কালীপদকে কিছু একটা বলতে যাচ্চি, হঠাৎ শাঁইশাঁই রকমের একটা চাপা শব্দ হয়ে সেই বিষম প্রাচীর খুলে গেল! বৃষ্টির ছাঁট ঝাঁপিয়ে পড়ল ওইদিকের এতক্ষণের শুষ্ক চাতালে। কালীপদ কী যেন ভেবে ভ্রু কুঁচকে তাকালো চারদিকে।
আমাদের সঙ্গের পথপ্রদর্শক লোকটির নাম জনাই। আমাদের এতক্ষণের উত্তেজনা তার মধ্যেও যে পারদ উত্তুঙ্গ করেচে তা এতক্ষণ টের পাইনি, পেলাম এইবার। ছেলেটি উৎসুক চক্ষে শিবলিঙ্গের আকারের পাষাণটি এবং একপাশে রাখা রাধামাধবের বিগ্রহটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখচে দেখে আমি কইলাম, “কী দেখচো হে?”
জনাই দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে কইলো, “আচ্ছা বামুন ঠাকুর, ঠাকুর দেবতাকে কি তেলে স্নান করানোর কোনো বিধি আছে?”
আমি বললুম, “তা আছে বৈকি। ষোড়শোপচারে পূজা করলে তাতে তৈল, সুগন্ধি, চন্দন, গা-মোছা, সবই দিতে হয়।”
জনাই খুশি না হয়ে বলল, “সে তো পালেপাৰ্ব্বণে। কিন্তু নিয়মিত কোনো বিধি রয়েচে? এই বিগ্রহ বা শিবঠাকুরের গায়ে তো কোনো তেল দেখচিনে?”
কালীপদ উত্তর দিল, “অমন করে কেউ হুড়হুড় করে তেল ঢেলে দেয় নাকি বিগ্রহের উপর যে দেখতে পাবে?”
জনাই শ্বাস ফেলে বললে, “তাহলে এই নিয়ে কেন যে লোকটা মিছিমিছি বিতর্ক করে প্রাণ হারালো কে জানে? কী বোকামি!”
কালীপদ এগিয়ে এসে কইলো, “কীসের কথা বলচো বলো তো?”
জনাই ধীরে ধীরে বলল, “হরিহর খুড়োর সঙ্গে যখন জমিদার মশায়ের বিবাদ হয় তখন আমি সামনেই ছিলাম কিনা। ছোট গিন্নীমার গলার হার সে জলের থেকে উদ্ধার করার পর কৃপণ জমিদার তাকে কথামতো দুই টাকা দিতে অস্বীকার করলে পর হরিহর খুড়ো ক্ষেপে উঠে বলে, ‘আমার ঐ দুইটা টাকাই চাই জমিদার মশায়, আমি ভিখিরি নই। আমার দেবতার নিয়মিত তৈলস্নানের জন্য মন্দিরের চূড়োয় তৈলদান করতে হয়। এই দুটাকা দেবতায় উৎসর্গ, কাজেই আপনাকে দিতেই হবে।”
কালীপদ অবাক হয়ে ইন্দ্রকে শুধালো, “সেকি! তোমাদের কি বাছা এমন কোনো পারিবারিক নিয়ম রয়েচে শিবলিঙ্গকে নিত্য তৈলস্নানের?”
ইন্দ্র বিরস সুরে জানালো, “আগেই বলেচি ঠাকুর, আমরা বৈষ্ণব। আমাদের শাক্ত পূজাই হয় না তো লিঙ্গের তৈলস্নান…”
কালীপদ আমাদের নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে উপর দিকে তাকালো। এতক্ষণ লক্ষ্য করিনি, এই মন্দিরের চূড়ায় একটা গোলাকার বড় পাথরের পাত্রের মতো কিছু বসানো আছে। কানাই সর্দার মন্দিরগাত্রে মাথা ঠুকে, এই খাঁজ ওই খাঁজ বেয়ে উপরে উঠে গেল। চূড়ার উপরে ঝুঁকে, একটু দেখে চীৎকার করে বলল, “ছোকরা ঠিক বলেচে কর্তা, এখানে তেলের গন্ধ রয়েচে। পাত্রটার নীচে একখানা ছিদ্রও রয়েছে।”
কানাই নেমে এলে পর কালীপদ ধন্ধে পড়ে বিড়বিড় করে বলল, “নিয়মিত মাসান্তে তেল ঢালা হতো তো সেই তেল যেত কোথা? বিগ্রহে তো তেলের চিহ্ন নাই? নাকি…. [“
‘আমি অজান্তেই কালীপদর গলার হুবহু প্রতিধ্বনি করে বললাম, “নাকি?” কালীপদ বললে, “নাকি, সেই তেল কোনো গোপন নকশার গোপন দ্বার বেয়ে গোটা মন্দিরের বিশেষ কোনো জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো?”
ইন্দ্র বিস্মিত হয়ে কইলো, “ছড়িয়ে পড়তো? কিন্তু খুড়োর মাথায় এ জিনিসটা আসবে কেন? উদ্দেশ্য কী?”
কালীপদ তিক্ত হেসে বলল, “তোমার খুড়ার বুদ্ধি ছিল, কিন্তু এতটাও নয় যে এতবড় স্থাপত্য তার মাথা থেকে বেরোবে। এ নকশা বোধকরি স্বয়ং বাসুদেবের বলে দেওয়া নকশা, যা অক্ষরে অক্ষরে তোমার পূর্বপুরুষেরা যুগে যুগে বিভিন্ন স্থানে তৈরি করে এসেচেন এবং বংশপরম্পরায় সরতে সরতে বাঙ্গালাদেশে এসে উঠেচেন এবং সেই সঙ্কেত মেনেই তোমার প্রপিতামহ এই মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরের কোনো গোপন কলকবজাকে সচল রাখার জন্যই এই তৈলদানের ছল!”
আমরা আবার পাতালঘরে এসে নামলাম। কালীপদ কইলো, “এতগুলো মানুষ এই ছোট ঘরে থাকলে শ্বাসকষ্ট হবে। দুইজন সিঁড়ির মুখে দাঁড়াও”
আমি একটু হেসে বললুম, “আমার টর্চবাতিটা না থাকলেও সমস্যা বাড়তো কিন্তু দাদা। পুরনো দিনের মতো ঐ দেওয়ালের মশালটা জ্বেলে পর্যবেক্ষণ করতে হলে দম বন্ধ হয়ে যেত বৈকি….”
কালীপদ নীরবে সমর্থন জানিয়ে ঘাড় নাড়লো। কানাই সর্দার আমাদের কথাবার্তা বোধকরি শোনেনি। সে দুই পা নেমে সন্দিগ্ধ হয়ে শুধালো, “আচ্ছা, এই হরিহর নাহয় এখন প্রেত, সে আঁধারে দেখতে পায়, কিন্তু জীবিত অবস্থায় অন্ধকারে সে নামতো কেমন করে?”
কালীপদ রাগের স্বরে বলল, “আবার নেমেচিস তুই? বললাম ফোকরটা আগলা, বন্ধ হয়ে গেলে সবাই পচে মরবো। অন্ধকার কিসের, দেখচিস না দেওয়ালে মশাল খাটানো রয়েচে? সেইটে জ্বেলেই সে নামতো”
কানাই সিঁড়ির মাথায় উঠে বলল, “কী জানি, মশাল জ্বাললো অথচ কালি উঠল না, সে কেমন মশাল!”
কালীপদ চমকে উঠে বলল, “আরে! তাই তো! ছাতটুক যে ধপধপে সাদা, এতটুকু ভুষো নাই! তাহলে সে মশাল বসালো কেন?” এই বলে এগিয়ে গিয়ে পেতলের মশালটা ধরে বিস্তর টানাটানি করতে থাকলো, কিন্তু মশাল অনড়। ইন্দ্ৰ কইলো, “ও কী করচেন ঠাকুর?”
কালীপদ অস্থির হয়ে বলল, “মশালের গায়ে তেলের গন্ধ আসচে যে! উপরের তেলের ধারা এই মশালের গায়ে কোথাও ঠেকতো নিশ্চয়ই, আর তা যখন হতো তখন এই মশাল পুরোপুরি মশাল নয়, একে সচল রাখার দরকার পড়তো অবশ্যই!”
আমি বিমূঢ়ের মতো বললাম, “অগ্নিদেবের চরণখানি চলিবে যেই ক্ষণে!”
“হাঁ ডাক্তার হাঁ, তাইই। কিন্তু এ আপদ নড়ে না কেন?”
আমি হতাশার সঙ্গে বললাম, “হয়তো শত বৎসর ধরে তৈলসিক্ত করা সত্বেও কলকবজা এঁটে গিয়েচে চিরতরে?”
কালীপদ মাথা নেড়ে কইলো, “নাহ ডাক্তার, ঐ হরিহর কিছুদিন আগে অবধি এই ঘর থেকে সর্বনাশা কিছু একটা নিয়ে গিয়েচে গাঁ-কে রসাতলে পাঠানোর জন্য।”
“কিন্তু দাদা, এমনও তো হতে পারে যে সে গোটা মালাটাই তুলে নিয়ে গিয়ে সুড়ঙ্গ চিরতরে এঁটে দিয়ে গিয়েচে শুরুতেই?”
কালীপদ আমার কথা নস্যাৎ করে বললে, “দুটো কারণে তোমার কথা অসম্ভব। এক, সে যদি মারা যাবার পরপরই ঐ পৌষ মাসে এই গুপ্তগৃহে শেষ ঢুকে থাকে তবে তার গায়ের আঁশটে গন্ধ আমরা গতকাল পয়লা শ্রাবণে পেলুম কী করে? সে কদিন আগেও যাতায়াত করেচে নিশ্চিত। সেইজন্যই আশপাশের গাঁ ধ্বংস করলেও সে কাঁকড়াঝোরায় এখনো থাবা দেয়নি, তার মন্দির সমেত গুপ্তগৃহ রসাতলে চলে যাবার আশঙ্কায়।
আর দুই, সে যখন বারবার যাতায়াত করচে, তখন নিশ্চয়ই ঐ হেঁয়ালির মুন্ডমালাকে একসঙ্গে বাইরে বের করার কোনো বাধা রয়েচে। তাই তাকে বারবার আসতে হচ্চে। কী বাধা সেটা আমি ক্ষীণভাবে অনুমান করতে পারচি, তবে সে আর একবার এই ঘরে আসবেই এবং তা কালই। তার আগেই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে ঐ মুন্ডমালার শেষ মুন্ড!”
“আচ্ছা দাদা, এমন তো হতে পারে যে ওই মালাটা একবার স্থাপন করার পর একটা মুন্ড ব্যবহার না করা অবধি পরেরটি তোলা যায় না?”
“তাই বা কী করে হয় ডাক্তার? এই মন্দিরটা শতবর্ষের অধিক হবে না, কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে সেই মালা তো আর এখানে ছিল না? নিশ্চয়ই স্থানান্তরিত হতে হতে এখানে এসেচে? তখন তোলা গেল কেনন করে? তা নয়, অন্য কারণে হরিহর সেগুলো একত্রে তোলেনি। হয়তো সে ভেবেচে এই ঘরের সন্ধান কেউ কখনো পাবে না, তাই এই নিরাপদ স্থানেই সে রেখেচে সেইটাকে….”
“কিন্তু… কিন্তু তুমি এত নিশ্চিত হচ্চ কী করে যে একখানা সর্বনাশা মুন্ড এখনও রয়ে গিয়েচে?”
কালীপদ ঢোঁক গিলে শুষ্ক কণ্ঠ ভিজিয়ে নিয়ে ভাঙা গলায় বলল, “পঞ্চানন মাল্য হতে এক মুন্ড বাদ ডাক্তার! পঞ্চানন মানে শুধু শঙ্কর নন, পাঁচটি মুন্ড। সেই অর্থে বজ্রাঙ্গবলীও পঞ্চানন। আবার পাঁচখানা ধ্বংসকারী মুন্ডযুক্ত মালাও পঞ্চানন। সে মালা থেকে এক মুন্ড বাদ। বাকি চার রক্ষা পায় অমরের বনে, অর্থাৎ সুধা কাননের চৌহদ্দিতে। কিন্তু এখনও অবধি তিনখানা গ্রাম রসাতলে গিয়েচে। একটা এখনও অবশিষ্ট রয়েচে ডাক্তার। সে কালই আসবে ঐ শেষ মারণাস্ত্র দিয়ে তার শেষ শত্রু কাঁকড়াঝোরাকে পাতালস্থ করতে…”
আমি ভয় পেয়ে মরীয়া হয়ে বললাম, “কিন্তু কালই কেন?”
কালীপদ শুকনো গলায় উত্তর দিল, “কারণ কাল তেসরা শ্রাবণ ডাক্তার।”
“কিন্তু তেসরা শ্রাবণে কি আছে? কাল কীসের দিন?” কালীপদ সজোরে শ্বাস নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কাল তন্ত্রদীক্ষার আদর্শ দিন।”
আমি কিছু না বুঝতে পেরে চুপ হয়ে গেলাম।
সবাই ততক্ষণে নীচে নেমে এসেচে উত্তেজনায়। সবাই আপ্রাণ চেষ্টা করচে মশালটা নাড়ানোর, হঠাৎ জনাই বলল, “বামুন ঠাকুর, একবার এইদিকে আসেন, এই দেওয়ালেও তেলের মতো গন্ধ!”
আমরা ধড়মড় করে এগিয়ে গেলাম দেওয়ালে খোদাই করা আবক্ষ বিষ্ণুমূর্তির দিকে। কালীপদ নাক ঠেকিয়ে ঘ্রাণ নিয়ে বলল, “তাই তো!”
আমার হাত থেকে শক্তি ক্ষয় হয়ে আসা টর্চবাতিটা নিয়ে কালীপদ বিষ্ণুর মূর্তির সর্বাঙ্গে বোলাতে বোলাতে স্থির হল নারায়ণের চক্রের উপরে! আমি দেখলাম উত্তেজনায় সেই আলো কাঁপচে!
কালীপদ কম্পিত স্বরে কইলো, “ঝোলা থেকে চাকতিটা বের করে আমার হাতে দাও ডাক্তার…”
আমি ঝোলার থেকে ভারী চাকতিটা বের করে তার হাতে দিতেই সে টর্চের লালচে আলো ফেলল চাকতির উপরে। তাতে ধাতব খোদাই করা নকশাগুলো দেখে নিয়ে আবার বিষ্ণুর চক্রের গায়ে আলো ফেলতেই আমিও চমকে উঠলাম! দুটোতে হুবহু একই নকশা! শুধু চাকতির নকশাটা উঁচু ধাতব পাতের আর চক্রেরটা গর্ত করে কাটা! কালীপদ ধরা গলায় বলল, “এই ঘরে এই একটিই জিনিস আছে যার নামের অর্থ সবার চেয়ে দেখতে ভালো ডাক্তার।”
ইন্দ্র বিহ্বল হয়ে বলল, “সুদর্শন!”
কালীপদ উত্তর না দিয়ে হাতের ভারী চাকতিটা বসিয়ে দিল সুদর্শন চক্রের নকশায়। চাকতিটা খাপে খাপে এঁটে বসতেই কালীপদ সর্বশক্তি দিয়ে দু চারবার সেটা ঘোরানোর চেষ্টা করে বিফল হয়ে একটু থেমে সজোরে চাপ দিল চাকাটার গায়ে। ঘড়াং করে একটা শব্দে চমকে উঠে টর্চটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলাম দেওয়ালের একটা জায়গায় এক আঙুল পরিমাণ ফাঁক দেখা দিয়েচে!
কানাই একবার কালীপদর দিকে চেয়েই নিজের পেতল বাঁধানো সড়কিটা সেই ফাঁকে প্রবেশ করিয়ে ভীষণ জোরে ঠেলাঠেলি করে দেওয়ালটা এক হাত পরিমাণ ফাঁক করে হাঁপিয়ে বসে পড়ল। ভিতর থেকে মড়া পচা গন্ধ নাকে এল। আমরা ধুতির খুঁট দিয়ে নাক চাপা দিয়ে টর্চ বাগিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেই কেঁপে উঠলাম!
ভিতরে একটা ছোট অন্ধকার কক্ষের ঠিক মাঝে একটা বেদীতে একটা পাথরের সিংহের মূর্তি। সেই নিষ্প্রাণ সিংহ এতটাই নিখুঁত যে প্রথমটা কালীপদও চমকে উঠল! কিন্তু আরও ভয়ঙ্কর কিছু রয়েচে! মেঝেতে দুইটি মৃতদেহ পড়ে রয়েচে। তাদের চামড়াগুলো খোলসের মতো লেগে রয়েচে শুষ্ক শরীরে!
আমি হতভম্ব হয়ে তাকাতে জনাই পিছনে উঁকি দিয়ে ভয়ার্ত স্বরে বলল, “এই তবে সেই দুই লেঠেল।”
আমি শুধালাম, “কোন লেঠেল?”
“আজ্ঞে ঠাকুর, জমিদার বাবু শুনেচি দুইজন বাছাই করা লেঠেল পাঠিয়েচিলেন হরিহর খুড়োকে হত্যা করার জন্য, কিন্তু তারা মন্দিরেই অদৃশ্য হয়ে যায়। তবে নিশ্চয়ই হরিহর খুড়ো এই ঘরে থাকাকালীনই তারা আক্রমণ করে এবং কোনোক্রমে এদের এই ঘরে বন্দী করে দোর এঁটে দেন উনি!”
কিন্তু গুপ্ত কক্ষের ভিতরে আবার কক্ষ পাওয়া গেলেও সেই অবশিষ্ট মুন্ড কোথা?
কালীপদ ইশারা করতে কানাই বাইরে বেরিয়ে মশালের নিম্নাংশ ধরে সজোরে ঠেলা দিতেই এতক্ষণের অনড় অগ্নিদেব নড়ে উঠলেন এবং ঘরের ভিতরে ঘটাং শব্দ প্রতিধ্বনিত হতেই আমি ভয়ে লাফিয়ে উঠলাম! কালীপদর আলো গিয়ে পড়েচে সিংহের উপর। সেই পাষাণ সিংহ দুই ভাগ হয়ে চিরে গিয়েচে!
কালীপদ জয়ের হাসি হেসে কইলো, “এই সেই সিংহভাগ ডাক্তার! সিংহ দুই ভাগ হয়ে গিয়েচে।” এই বলে তার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে কালীপদ যেই জিনিসটা বের করে আনলো, তা দেখে আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলাম!
একটা ধাতব মোটা সুতার ছড়া। তার গায়ে গাঁথা একখানা রাক্ষসীর মতো মুন্ড! আকারে এক বিঘৎ। তার খোদাই করা চুলের রাশি ছড়িয়ে পড়েছে। তার হিংস্র দাঁত বেরিয়ে রয়েছে। কেবল চোখদুটি নিষ্প্রভ। কালীপদ অবাক হয়ে তার মুখে আলো ফেলে বললে, “এ মূর্তি বিকটাননার। যোগিনী বিকটাননা! শ্রীদুর্গাকে বেষ্টন করে রাখেন এক কোটি যোগিনী, তাই তাঁর ..স্তবে বলা হয়, ‘মহাঘোরায়ৈ… যোগিনী কোটি পরিবৃতায়ৈ’। এই বিকটানা হলেন ধ্বংসের যোগিনী। খুব সাবধানে এটাকে ঝোলায় ভরো ডাক্তার। খুব সাবধান। বাইরের আলো যেন না লাগে।”
আমি ভয়ে ভয়ে সেই বিকট মুন্ডকে ঝোলায় ভরে বেরোনোর জন্য পিছনে ফিরতেই দেখলাম আধা খোলা পাথরের দরজাটার উপরে খোদাই করে কি সব যেন লেখা রয়েচে দুর্বোধ্য সঙ্কেতে! কালীপদ ভ্রু কুঁচকে সেটার দিকে চেয়ে থেকে আমাকে বলল, “তুমি বাইরে গিয়ে চাকতিটাকে টেনে দোরটা বন্ধ করে দাও। একটু পরেই আবার চাকতি বসিয়ে খুলে দিও, নচেৎ শ্বাসরোধ হয়ে মারা পড়বো নির্ঘাৎ।”
আমি বাইরে বেরিয়ে চাকতিটা টেনে আনতেই ঘড়ঘড় করে ফাঁকটা বন্ধ হয়ে কালীপদ হারিয়ে গেল। অনুমানে একটু সময় পরেই আবার দোরটা খুলতে কালীপদ নাক চাপা দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বেরিয়ে এল। তার মুখে তৃপ্তির হাসি। কালীপদ একটু কেশে বললে, “পাথরের দোরের পিছনে এই ধ্বংসকে নিয়ন্ত্রণ করার হেঁয়ালি ছিল ডাক্তার। প্রথম দুর্বোধ্য ঠেকলেও ততোখানি নয়। এই নিয়ন্ত্রণ কৌশলটুকু সম্ভবত হরিহরের অজানা রয়েচে, কারণ সে যতবারই ঢুকেচে, পুরো কপাট ফাঁকা করেই নিশ্চয়ই ঢুকেচে আর হেঁয়ালি ঢাকা পড়ে গিয়েচে প্রাচীরের ভিতরে। আধা খোলা না থাকলে আমিও দেখতে পেতুম না…’
আমি সন্দিগ্ধ ভাবে বললুম, “তার যা শয়তানি বুদ্ধি, সে এই কৌশল কি আর দেখেনি?”
কালীপদ স্নেহের কণ্ঠে বললে, “তুমিও যেমন ভায়া, এই কৌশল হরিহরের ঠাকুরদার কণ্ঠস্থ ছিল। হরিহর যেটুকু শিখেচে নিজে উদ্ধার করে শিখেচে। তার ঠাকুরদা শিখিয়ে গেলে তো ইন্দ্রর বাপকেও শিখাতো। আর হরিহর যদি এই ধ্বংসকারী মহাযোগিনীর ধ্বংসকারী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণই করতে পারবে, তবে ধ্বংসক্ষেত্র বেঁধে দিয়ে মন্দিরটুকু রক্ষা করে কাঁকড়াঝোরাকে কি সে রসাতলে পাঠানোর সুযোগ ছেড়ে দিত?”
সাঁঝের মুখে সমস্ত গুপ্ত কপাট বন্ধ করে, শিবলিঙ্গকে পূর্বস্থানে ফিরিয়ে দিয়ে আমরা সাবধানে গোরুর গাড়িতে উঠে কালীপদর দেওয়া বাঁধনগন্ডী পার করা মাত্র কালীপদ সখেদে চীৎকার করে উঠল, “কপালে নাই ডাক্তার, নাহলে এত খোঁজার পরেও গুপ্তঘরে ঢুকে কিছুরই সন্ধান পেলাম না কেন? হেঁয়ালির সেই ধ্বংসকারী মারণাস্ত্র কোথায় লুকানো রয়েচে কে জানে?” আমরা ছইয়ের ভিতরে চমকে ওঠা মাত্রই কালীপদ ঠোঁটে আঙুল রেখে ইশারা করতেই আমরা নির্বাক রইলাম। আমার মনে হল দূরের গাছের সারির ওপর থেকে ক্ষীণভাবে একটা খলখল করে হাসির শব্দ পেলাম! আমার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল।
(১৪) যোগিনীর জাগরণ
তেসরা শ্রাবণ, আবার এক শনিবার! গতকাল রাত্র এবং আজ সকাল থেকে সারাটা দিন যে কী রকম তীব্র উত্তেজনায় কেটেচে তা বোঝানোর সাধ্য আমার নাই। কালীপদ প্রথমার্ধে হরিহরের পুষ্করার জন্য কিছু উপকরণ তৈরি করে রেখে এসেচে পুকুর ধারে। দুপুরে আহারের সময়েও কালীপদ কিছুটা নির্বিকার ছিল। আহারান্তে উত্তেজিত ভাবে পাঁজি পড়েচে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ঠিক বিকেল নামার আগে ধড়মড় করে উঠে বলল, “চলো, সুধাকানন যেতে হবে। সময় আসন্ন…’
আমার বুকটা ছাঁৎ করে উঠল! তবে কি পিশাচের আগমন আসন্ন? কালীপদ ঠিক কী চাইচে? কালীপদ ম্লান হেসে বলল, “শুধু মারণাস্ত্র নয় ডাক্তার, ওই সুধাকানন, ওই মন্দির হল হরিহরের প্রাণ, তার হরিহর আত্মা। কাল অনেক দিক খতিয়ে দেখেচি আমি শুয়ে শুয়ে। আজ তার প্রমাণ পাবে। তার আগে নীচে গিয়ে লোকজনকে বলে কয়েকটা জিনিস এই পুঁটুলিতে ভরে ফেলো। নীচে বলাই আছে, গেলেই দিয়ে দেবে।” আমি নীচে গিয়ে বলতেই ভৃত্যরা আমার সামনে কয়েকটা রন্ধনের উপযোগী আহার্য্য এনে রেখে কইলো, “ঠাকুরমশাই কয়ে রেখেচিলেন আজ্ঞে এইগুলার কথা।”
বিশেষ কিছুই নয়, ক্ষুদ্র একফালি পাকা কুমড়া, একটা নিটোল অথচ ছোট্ট বেগুন, দুটো কাঁচা হলুদ আর একটা কচি কলমী শাকের আঁটি! কিন্তু এই যৎসামান্য আহার্য্য ঠিক কার কাজে আসবে না বুঝে পুঁটুলিতে ভরে ফেললাম এবং তার নির্দেশমতো গোপনে রাখলাম। কক্ষে ফিরে এসে দেখি আমার ছাতাখানা নাই। আমি সেই কথা কালীপদকে বলা মাত্র সে যেন একটু হাসি চাপা দিয়ে কইলো, “আপদ গিয়েচে। ওই যাত্রাপালার ছাতা হারাবে, এ আমি জানতুমই জানতুম।”
আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, কলকাতায় ফিরে আবার যখন ছাতা খরিদ করবো, আবারও ঠিক এইরকম ছাতাই কিনবো এবং সেখানা নিয়েই রায়দীঘড়া যাবো।
আজ আমাদের বাড়তি সঙ্গী হল সুশীল। আমরা সুধাকাননে পৌঁছে গেলাম বিকেলের মুখেই। কালীপদ দ্রুত পায়ে জমির চতুর্দিকে বাঁধন কেটে এল। এবারের বাঁধন বাড়ি এবং মন্দির ছাড়াও বেশ কিছুটা বাড়তি জায়গা নিয়ে। আমরা দাঁড়ালাম বাড়ির থেকে বেশ কিছুটা দূরে, কিন্তু বন্ধন গন্ডীর ভিতরেই। গন্ডী বরাবর ওপাশের সব দৃশ্য এই হালকা আলোতেও কেমন যেন ঘোলাটে লাগচে! এ কীসের গন্ডী দিয়েচে কালীপদ!
কিছু শুকনো পাতা খুঁজে জড়ো করে তাতে অল্প আগুন করে ঝোলা থেকে কীসের গুঁড়ো মতো বের করে আগুনে ফেলতেই ধীরে ধীরে দিনের আলো যেন বাড়তে লাগল। উপরে মুখ তুলে দেখি ধীরে ধীরে মেঘের দল পিছু হটে যাচ্ছে যেন ভয়ে ভয়ে। বিকেলের সূর্য বেরিয়ে পড়ল আপাতঃ পরিস্কার হয়ে যাওয়া মেঘের আড়াল থেকে। ইন্দ্র এবং সুশীল এই ব্যাপার দেখে ভীষণ বিস্মিত হয়ে চেয়ে রয়েছে! টানটান কিছুটা সময় অতিবাহিত হবার পর সুশীল ধৈর্য্য হারিয়ে কী যেন একটা বলতে যেতেই .. কালীপদ শশসস্ করে তাকে থামিয়ে দিয়ে উৎকর্ণ হয়ে রইলো।
একটু পরেই আমরাও শুনতে পেলাম। অনেক দূরে গাছপালার উপরে পাখীরা ডেকে ডেকে উঠচে মরীয়া হয়ে। কে যেন গাছের চূড়োয় চূড়োয় এগিয়ে আসচে আমাদের দিকে। একেবারে কাছাকাছি এসে সেই আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল। পরক্ষণেই বনের আড়ালে শোনা গেল ক্রুদ্ধ, শরাহত পশুর মতো ভয়ঙ্কর গর্জন। কেউ যেন ভীষণ ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে অপেক্ষা করচে বনের আড়ালে। কেউ যেন আমাদের এই সময়ে এখানে দেখে দাঁতে নখে ছিঁড়ে ফেলতে চাইচে।
আমি কালীপদর দিকে ভয়ে ভয়ে দুই পা এগোতেই একটা ভয়ঙ্কর কালো ছায়া বনের গাছপালা পেরিয়ে লাফিয়ে পড়ল আমাদের উপর! ইন্দ্র আর সুশীল আতঙ্কে মাটিতে পড়ে গেল। ছায়া দানবটার দুটো চোখ গনগনে আগুনের মতো জ্বলচে! তার মুহুর্মুহু চীৎকার কানে তালা ধরিয়ে দিচ্চে! কিন্তু সে কোনো অদৃশ্য বাঁধনে বাধা পেয়ে যেন বারেবারে ছিটকে যাচ্চে এদিকে ওদিকে! একেকবার সে হুহুঙ্কারে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে গন্ডীর উপর, আর বিদ্যুতের ছোঁয়া পেয়ে যেন ঠিকরে উঠে সরে যায়!
কালীপদর নজর রয়েচে সূর্যের দিকে। আমি হঠাৎ তাকাতেই মনে হল সূর্যটাকে যেন একটা ছায়া এসে ঢেকে দিচ্চে ধীরে ধীরে! কালীপদ নীচু কণ্ঠে বলে উঠল, “আজ পূর্ণগ্রাস সূর্য গ্রহণ লেগেচে ডাক্তার! ঐ দেখো এই মুন্ড কেবলমাত্র রবিশশীর গ্রহণ হলেই জেগে ওঠে! একেই হেঁয়ালিতে ‘অংশগ্রহণ’ বলা হয়েচিল! প্রতিটা ধ্বংসের দিন হিসেব করে দেখেচি আমি সেদিন পাঁজি দেখতে গিয়ে। সবগুলোই হয় চন্দ্র না হয় সূর্যগ্রহণের তিথি ছিল।” এই বলে দ্রুতহস্তে ঝোলার থেকে বের করল যোগিনীর মুন্ডটা। সেটার দিকে চেয়েই হরিহরের প্রেত গোটা গ্রামটা কাঁপিয়ে চীৎকার করে উঠল। কালীপদ মুন্ডটার মুখে কয়েকবার হাত বুলিয়ে তুলে ধরল সূর্যের দিকে।
আমি নির্বাক হয়ে দেখলাম, মুন্ডটার যে চোখ প্রাণহীন, নিষ্প্রভ ছিল, তা আধখাওয়া সূর্যের রশ্মি পড়া মাত্র আগুনের মতো ঝিকিয়ে উঠেচে! হাওয়া প্রচণ্ড বেগে বইতে আরম্ভ করল। হরিহরের প্রেত পাগলের মতো ছিঁড়ে ফেলতে চাইচে মন্ত্রের গভী। সুশীল বেহুঁশ হয়ে ঝুপ করে পড়ে গেল।
হরিহরের প্রেত এইবার আর্তনাদ থামিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। তার প্রেতসুলভ ঘড়ঘড়ে কণ্ঠ ভেসে এল বাতাসে, “তোর বাসনা পূরণ হবে না গুণীন। তুই এই মন্দিরের সর্বনাশ করার যে শয়তানি বুদ্ধি বের করেচিস, তা সফল হবে না আজ আর…”
কালীপদ ক্রুদ্ধ হয়ে চীৎকার করে উঠল, “আমার ইচ্ছেই রইবে হরিহর। এই মন্দির আজ সমতল হবে। সঙ্গে তুইও….”
হরিহরের প্রেত আবার ভীষণ খিলখিল করে হেসে উঠল, “তোদের কি ধারণা, এই মন্দিরের বাইরের অদৃশ্য বেড়াজাল এমনি এমনি খুলে গিয়েচে বারবার? মূর্খের দল! তোদের কপাল ছিল প্রসন্ন, তাই খুলেচে, কিন্তু আজ আর খুলবে না। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। খোলার উপায় আমি বন্ধ করেচি যে। চতুরঙ্গ আর নাই গুণীন।”
আমি ভয়ে ভয়ে হাত বাড়িয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম হরিহরের কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি! এতদিন যে বজ্রকঠিন বেড়া আমাদের স্পর্শ মাত্রই আপনিই খুলে গিয়েচিলো, তা আজ হিংস্র হয়ে পথ আটকে রেখেচে! হঠাৎ আকাশ অন্ধকার করে একটা বিকট উদগ্র মুখ দেখা দিল! অবিকল মুন্ডটার মতো। তার ছুঁচলো দাঁত গোটা বিশ্বকে গিলে ফেলার জন্য মুখিয়ে রয়েচে যেন, তার চুলের রাশি অন্ধকার করেচে আলোর গতিপথ!
কালীপদ আমার হাত থেকে পুঁটুলিটা একরকম ছিনিয়ে নিয়ে বাম হাতে সেটাকে উপুড় করে দিল আমার পায়ের কাছে। সেই রন্ধনের উপকরণগুলো ছড়িয়ে পড়ল চাতালে। আর এক পলকের মধ্যে সেই বহু কাঙ্ক্ষিত শননন শব্দটার সঙ্গে বেড়া খুলে উন্মুক্ত হয়ে গেল ভিতরে প্রবেশের পথ!
কালীপদ সজোরে ঝিকিয়ে ওঠা মুন্ডটাকে ছুঁড়ে মারলো মন্দিরের ভিতরে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেই ভয়ঙ্কর পিশাচ সর্বশক্তি দিয়ে কালীপদর মন্ত্ররেখা ছিন্ন করে ঢুকে এল ভিতরে! তার গোটা শরীরে আগুন ধরে গিয়েচে! সেই হুতাশনগ্রস্ত বিরাট শরীর নিয়ে সে এক লাফে মন্দিরের পাশে গিয়ে যেন পরম মমতায় জড়িয়ে ধরল তার প্রিয় মন্দিরটাকে। তার মাথাটা স্থির রয়েচে চূড়ায়, যেন কোনো স্নেহবান পিতা তার পরম আদরের সন্তানকে শেষ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেছে।
আকাশ ঝলসে যেন সহস্র বজ্র একত্রে নেমে এল মন্দিরের উপরে। চোখের পলকে মন্দির সমেত আশপাশের কিছু জমি তলিয়ে গেল অতল রসাতলে। কালীপদ কপালের স্বেদ মুছে নিয়ে ধীর স্বরে বলল, “নিয়ন্ত্রণের বিধিখানা না পেলে মন্দিরের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও পাতালে চলে যেতাম ডাক্তার। ফিরে চলো।”
আমি হতভম্ব হয়ে তরকারী আর আনাজগুলো দেখিয়ে শুধালাম, “এগুলোয় কী হল?”
কালীপদ বিরস হয়ে বললে, “এতেই তো দোর খুললো হে। চতুরঙ্গ অর্থ কেবল দাবাখেলা নয়, চারটে রঙও চতুরঙ্গ। ‘চতুরঙ্গ শুদ্ধ কেহ দন্ডাইবে দ্বারে, খুলিবে সকল বাধা এক ফুৎকারে’— এর আসল অর্থ হচ্চে, চারটি বিশুদ্ধ রঙ, যাতে অন্য রঙের মিশেল নেই, তাই নিয়ে মন্দিরের সামনে দাঁড়ালে কোনো এক গোপন চোখে সেই রঙগুলো প্রতিফলিত হয় এবং দোরের বাধা এক ফুঁ তে খুলে যায়। হরিহরের অন্তিম সামগ্রীগুলোর মধ্যে ইন্দ্র যে সাতরঙা ফেট্টির কথা বলেচিলো, সেইটে দিয়েই কপাট খুলতো হরিহর….
আমি অবাক হয়ে বললাম, “সে বুঝলুম, কিন্তু তাহলে আগের দুইবার তো আমরা চতুরঙ্গ নিয়ে আসিনি? তাহলে সেই দুইবার কী করে….”
“বটে? তোমার অমন বাহারি রঙিন ছাতাখানা তো দুইবারই তোমার হাতেই ছিল ডাক্তার। সেটার জন্যই আগের দুবার বাধা খুলে গিয়েচিলো অপ্রত্যাশিত ভাবেই। সেই কারণেই সম্ভবত হরিহর লুকিয়ে তোমার ছাতাখানা লোপাট করে দেয় আজ। এইটেই আমাকে নিশ্চিত করে যে, আমার অনুমান সঠিক দিকেই চলেচে। আমার কপাল মন্দ, তুমি ছাতা হারানোর জন্য সন্দেহ করলে আমাকে।”
আমি মনে মনে লজ্জিত হলাম। পরদিন মধ্যাহ্নে কালীপদ হরিহরের পুষ্করা সম্পন্ন করল নয়ই পৌষের হিসেবে। বৈকালে গরুর গাড়িতে চেপে ইস্টিশানের অভিমুখে যাবার পথে আমি কালীপদর মেজাজ বুঝে নিয়ে বললুম, “একটা প্রশ্ন ছিল….”
কালীপদ বিরক্তির চোখে তাকিয়ে কইলো, “এই তোমার এক নেশা ডাক্তার। আবার কীসের প্রশ্ন হে?”
“তেমন কিছু না, কিন্তু ভাবচি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ পাঁচটা মুন্ডের মধ্যে চারটে তো রক্ষা করতে দিয়ে গিয়েচিলেন জলধর ঘোষের কাছে। কিন্তু প্রথম মুন্ডটা শ্রীকৃষ্ণ নিজে কোন কাজে ব্যবহার করেচিলেন?”
কালীপদ আতান্তরে পড়ে কইলো, “আহ, তিনি তো অসামান্য নিয়ন্ত্রবিধি জানতেন এই অস্ত্রের। হয়তো খুব স্বল্প আকারে কোনো কাজে ব্যবহার করেচিলেন তিনি প্রথম মুন্ডটা।”
“সে তো আমিও বুঝেচি, কিন্তু কোন কাজে?”
কালীপদ উত্তর না দিয়ে আপনমনে ছড়া কেটে কইলো, “শেষেতে না ছাড়ে পাপ, প্রকটিলো ব্রহ্মশাপ, মেদিনী গ্রাসিল রথচক্র…”
আমি চমকে উঠলাম! মুখে কিছু প্রকাশ না করে বললাম, “তবে এবার আমার বাড়িতে চলো। আরও কিছু জানার আছে…”
কালীপদ আলস্যে হাত পায়ের খিল ছাড়িয়ে বলল, “ওসব পরে হবে, বরং তোমার টর্চবাতিতে বাড়ি ফিরেই নতুন সেল ভরে নাও
আমি আবার চমকে উঠে বললাম, “মানে?”
“মানে, কাজ সবে অর্ধেক হয়েচে ডাক্তার। শ্রীকৃষ্ণ জলধরের কাছে দুইটি জিনিস গচ্ছিত রেখেচিল। একটি মুন্ডমালা, আরেকটি মারণ-পুঁথি। দ্বিতীয়টির খোঁজ করাটা খুবই দরকার। বাসুদেবের কথা মিথ্যা হবে না। আমার মন বলচে সেখানেও শয়তান জেগে উঠেচে। তৈরি থেকো।”
গাড়ি ক্যাঁচ কোঁচ শব্দে এগিয়ে চলল।
