খোলস – সৈকত মুখোপাধ্যায়
ছোটো গল্প (ডার্ক ফ্যান্টাসি থ্রিলার)
জায়গাটার আসল নামটা বলা ঠিক হবে না। ধরুন তামাবাড়ি…. তামাবাড়ি ফরেস্ট। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে সরু একচিলতে জায়গা। ম্যাপের দিকে তাকালে মনে হয়, একদিক থেকে ভুটান আর অন্যদিক থেকে বাঙলাদেশ দুই আঙুলের চিমটিতে তামাবাড়িকে ধরে রেখেছে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেলে ভালো করে বোঝাও যায় না কখন কোন্ দেশের মাটির ওপর দিয়ে যাচ্ছি।
সীমানা বলে তো কিছু নেই। মাটির রং এক নদী-নালা – গাছপালার চেহারা এক। সর্বোপরি মানুষগুলোর পোশাক-আশাক, চেহারা, খাদ্যাখাদ্য সবই এক।
ভারতীয় হোক, ভুটানিজ হোক কিংবা বাংলাদেশি, সকলেরই চেহারায় মঙ্গোলয়েড লক্ষণ স্পষ্ট। সরু চোখ, চ্যাপটা নাক, হলদেটে গায়ের চামড়া। মেয়েরা লুঙ্গির মতো করে শাড়ি পরে আর ছেলেরা চাপা পাজামা, না হলে হাফপ্যান্ট। হিন্দু, ইসলাম, বৌদ্ধ, খৃস্টান ওসব ধর্ম তামাবাড়িতে চলে না। ওখানে সবাই আদিম পৌত্তলিক। একেক উপজাতি একেক ধরনের প্রাণী বা বৃক্ষের উপাসনা করে, যাকে নৃতত্ত্বের পরিভাষায় বলা হয় ‘টোটেম’। কারুর টোটেম চিতাবাঘ, কারুর টোটেম শালগাছ— এইরকম।
নেশার প্রকোপ অত্যন্ত বেশি। সংস্কার খুবই ঢিলাঢালা। সন্ধের পর থেকে কাউকেই প্রকৃতিস্থ অবস্থায় পাওয়া যায় না— সে ছেলেই হোক কিংবা মেয়ে। আর রাতে একটি মেয়েকে যে শুধু তার স্বামী কিংবা বয়ফ্রেন্ডের বিছানাতেই দেখতে পাওয়া যাবে এমনও কোনো কথা নেই। সে মেয়ের যাকে পছন্দ তার সঙ্গেই শোবে।
তামাবাড়ি সম্বন্ধে আমার এত কিছু জানার কথা ছিল না, বিশেষত এ-কাহিনি যখনকার, অর্থাৎ আজ থেকে কুড়ি বছর আগে। জেনেছিলাম যে, তার কারণ আমার প্রাণের বন্ধু তরুণ সামন্তর পোস্টিং হয়েছিল ওখানে, ওই তামাবাড়িতে।
তরুণ আমার কলেজের বন্ধু। আমাদের দু-জনেরই অরিজিনাল বাড়ি মেদিনীপুরে। সূর্য সেন স্ট্রিটে একই মেসবাড়িতে দু-জনেই থাকতাম। ফলে বন্ধুত্বটা ছিল একেবারে যাকে বলে প্রাণের বন্ধুত্ব। কলেজ থেকে পাস করে বেরোনোর পর দু-জনেই একটা বছর জান লড়িয়ে চাকরির পরীক্ষার প্রিপারেশন নিয়েছিলাম। তারই ফলশ্রুতি, এক বছরের মাথায় তরুণ চাকরি পেয়ে গেল ইন্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিসে আর আমি ব্যাঙ্কে। মজার ব্যাপার, দু-জনেরই প্রথম পোস্টিংও হল উত্তরবঙ্গে। তবে আমার পোস্টিং হল জলপাইগুড়ির কাছে বেলাকোবার, যেটা মোটামুটি বড়ো শহর আর তরুণের পোস্টিং হল এতক্ষণ যে জায়গার কথা বলছি সেই তামাবাড়ি বিট অফিসে।
দু-হাজার পাঁচ সালের কথা বলছি। মোবাইল ফোন তখন চালু হয়ে গেলেও তামাবাড়িতে টাওয়ার পৌঁছতে তখনও অনেক দেরি। তরুণের ভরসা ছিল বিট অফিসের ল্যান্ডলাইন।
আমাদের মধ্যে সপ্তাহে একবার অন্তত ফোনে কথা হল। ওর কথা থেকে বুঝতাম ভয়ংকর ডিপ্রেসনে ভুগছে। খালি বলত, “আর পারছি নারে বুদ্ধ। চারপাশের মানুষগুলোর সঙ্গে এত ভাষার ব্যবধান, কালচারের ব্যবধান কথাই বলতে পারি না। দিনের পর দিন কথা না বলে কেউ থাকতে পারে, বল। তার ওপরে পরিবেশটাও কেমন যেন। যেন জোম্বিদের দেশ। সূর্য অস্ত যাওয়ার পরে রাস্তাঘাটে যাকেই দেখবি মনে হবে একটা মৃতদেহ। দৃষ্টিহীন চোখে তোর পাশ দিয়ে চলে যাবে, ফিরেও তাকাব না।”
ওর মনোবল বাড়ানোর জন্যে বলতাম, “তিনটে বছর একটু দাঁতে দাঁত দিয়ে কাটিয়ে দে ভাই। দেখবি পরের পোস্টিংটাই ভদ্রস্থ জায়গায় হবে। এসব চাকরির নিয়মই তাই। তখন বাংলো, গাড়ি, লোকলস্কর আর সুন্দরী বউ নিয়ে সাহেবের মতো জীবন কাটাবি।”
ও আমাকে তুমুল খিস্তি দিত। বলত, “তবু একবার আসতে পারছিস না এখানে? দুটো দিন কাটিয়ে যেতে পারছিস না আমার সঙ্গে। অথচ মাত্র আশি কিলোমিটার দুরে রয়েছিস।”
ওকে বোঝাতে যেতাম, “আমারও তো নতুন চাকরি, তরুণ। পুরো ব্র্যাঞ্চের কাজ সিনিয়ররা আমার ঘাড়ে ফেলে দিয়েছে। বিশ্বাস কর, রবিবারেও অফিসে বসে….।” কথা শেষ করতে না দিয়েই ও ফোন কেটে দিত।
কিন্তু দু-হাজার পাঁচের মে মাসে এমন একটা ঘটনা ঘটল যে, আমাকে ছুটে যেতেই হল তামাবাড়ি।
*****
ফোনটা এসেছিল বিকেলের দিকে, আমার মোবাইলেই। নম্বরটা তামাবাড়ি বিট অফিসের। ন্যাচরালি ভেবেছিলাম তরুণের ফোন। কিন্তু না। ফোন করেছিল তরুণের অধস্তন এক ফরেস্ট-গার্ড। তাঁর নাম ভুলে গেছি। পদবী ছিল গুরুং। যা-ই হোক, সেই গুরুং মহা উত্তেজিত হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, সামন্তসাহেব আমার এখানে মানে বেলাকোবায় এসে উঠেছেন কী না।
আমি বললাম, “কই না তো। আসার তো কোনো কথাও ছিল না। কেন, কী হয়েছে?”
“বারো ঘণ্টা হয়ে গেল, উনি নিখোঁজ। ওনাকে আশেপাশে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”
একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, “আপনাদের ডিপার্টমেন্টকে জানিয়েছেন? একজন অফিসারকে খুঁজে পাওয়া না গেলে তাদেরই তো প্রথম স্টেপ নেওয়ার কথা।”
গুরুং কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, “জানিয়েছি স্যার। কিন্তু ওদের আসতে দেরি হবে। এখন টাইগার সেন্সাস চলছে। কোনো স্টাফ ফাঁকা নেই। তাছাড়া ওনারা ব্যাপারটায় গুরুত্বও দিচ্ছেন না। ভাবছেন, সামন্তসাহেব কোথাও ফূর্তি করতে গেছেন। আবার নিজে থেকেই ফিরে আসবেন। কিন্তু স্যার…।”
“কিন্তু কী? বলুন।”
“স্যার, সামন্তসাহেবের থাকার ঘরের টেবিলে পেপারওয়েটের নীচে একটা কাগজ চাপা দিয়ে রাখা আছে। কী লেখা আছে বুঝতে পারছি না, কারণ লেখাগুলো বাংলায়। কুড ইট… কুড ইট বি আ সুইসাইড নোট?”
গুরুংয়ের কথা শুনে আমি সত্যিকারেই কেঁপে উঠলাম। তরুণ কী আত্মহত্যার মতো একটা চূড়ান্ত বোকামির কাজ করে বসতে পারে? ওখানে না গেলে বোঝা যাবে না। গুরুংকে বললাম, “আমি কাল সকালেই রওনা দিচ্ছি। পিপিং অবধি রাস্তা আমি চিনি। তুমি ঠিক দুপুর দুটোর সময় ওখানে একজন লোক রেখ, যে আমাকে বাকি পথটা রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে যাবে।”
ও বলল, “কাকে আর রাখব? আমি নিজেই থাকব।” পরদিন ভোরে বেলাকোবা থেকে বাস ধরে জয়ন্তী গেলাম। জয়ন্তী থেকে একটা পথচলতি পিডব্লিউডির জিপকে হাতে-পায়ে ধরে ডুয়ার্সের গহন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পৌঁছলাম হাতিবাড়ি। সেখান থেকে আবার খরস্রোতা রায়ডাক নদীকে ডানপাশে রেখে, প্রায় তিনঘণ্টা দমতোড় চড়াই ভেঙে পৌঁছলাম পিপিং।
ভুটান আর পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে অবস্থিত পিপিং কুড়ি বছর আগে ছিল একটা নির্জন পাহাড়ি গ্রাম। পিপিং নদীর ব্রিজ পেরিয়ে গ্রামে ঢুকবার মুখে দুটি মাত্র দোকান, একটি শুয়োরের মাংসের, অন্যটি দেশি মদের।
দেশি মদের দোকানটার সামনে কাঠের বেঞ্চিতে সবুজ রঙের দেশি আরকের একটা বোতল হাতের মুঠোয় ধরে যে নেপালি ছেলেটি বসেছিল, গায়ে যার ফরেস্ট-ডিপার্টমেন্টের জলপাই রঙের উর্দি, সে আমাকে দেখেই লাফিয়ে উঠে স্যালুট করল। বোতলটা লুকিয়ে ফেলল কিটব্যাগের মধ্যে। সেই গুরুং।
আমরা ব্রিজ পেরিয়ে ভুটানের দিকে না গিয়ে নদীর তীর ধরে ক্রমশ গভীর বনের মধ্যে ঢুকে পড়ছিলাম। হাঁটতে-হাঁটতে টুকটাক গল্প করছিলাম গুরুংয়ের সঙ্গে। একটা জিনিস বুঝতে পারছিলাম— ছেলেটা নেশাখোর হতে পারে, কিন্তু তরুণের প্রতি ওর ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই।
জানবার চেষ্টা করছিলাম ওদের চাকুরিস্থলের হালচাল কেমন। ও তরুণের কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করল। বলল, “জঙ্গলের জানোয়ার নিয়ে কোনো প্রবলেম নেই স্যার। মানুষগুলোকে নিয়েই প্রবলেম। অদ্ভুত মানুষজন। এখনও নরবলি দেয়, জানেন?”
চমকে উঠলাম, “বল কী!”
“হ্যাঁ স্যার। অন্য উপজাতির লোককে একলা পেলে ধরে এনে নিজেদের টোটেমের সামনে বলি দিয়ে দেবে। বেশ কটা এরকম কেস হয়েছে। এত রিমোট জায়গা, পুলিশ-মিলিটারিও আসতে চায় না। তাহলে আর কে ওদের আটকাবে?”
মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “তরুণকে যদি একা পায় … “ গুরুং হা হা করে উঠল। বলল, “ওই ভয়টা নেই স্যার। আমরা বাইরের লোক। আমাদের ভাষা আলাদা, আমাদের চামড়ার রং আলাদা, তাই আমরা ওদের চোখে অপবিত্র। অপবিত্র জিনিস ওরা ঠাকুরের ভোগে দেবে না।”
কিছুটা নিশ্চিন্ত হলাম।
*****
মাত্র তিনটি কাঠের ঘর নিয়ে তামাবাড়ি বিট অফিস গঠিত। মাঝের বড়ো ঘরটি অফিস ঘর। দলিল-দস্তাবেজ ছাড়াও ওই ঘরেই সরকারি রাইফেল, হাতি তাড়ানোর পটকা, চিতা ধরার জাল, এইসব রাখা আছে। ভেতরে লোক না থাকলে ঘরটায় ওরা তালা দিয়ে রাখে।
ওই বড়ো ঘরটার দু-পাশে সমকোণে আরও দুটো কাঠের ঘর। একটায় থাকে দু-জন ফরেস্ট গার্ড। একজন তো গুরুং। অন্যজনের নাম গনেশ। গনেশের সঙ্গে ওখানে পৌঁছে দেখা হল। দেখে মনে হল বয়স সত্তর ছাড়িয়ে গেছে। মাথার সব চুল সাদা, চোখে পুরু কাচের চশমা। বয়সের ভারে একটু কুঁজোও হয়ে গেছে। কী করে এখনও চাকরি করছে কে জানে। অন্য ঘরটা বিট অফিসারের থাকবার ঘর, যেটায় এখন তরুণ থাকে।
পিঠের ব্যাকপ্যাকটা নামিয়ে রেখেই গুরুংকে বললাম, “কই, তরুণ কী চিঠি লিখে গেছে দেখাও।”
“আসুন স্যার।” বিট অফিসারের ঘরের দরজাতেও একটা ছোটো তালা ঝুলছিল। তালা খুলে ও আমাকে ঘরটার মধ্যে ডাকল। জানলাগুলো খুলে দিল। তারপর বলল, “ঠিক যেভাবে উনি রেখে গেছেন, সেইভাবেই রেখে দিয়েছি। হাত ছোঁয়াইনি। ওই যে, টেবিলের ওপরে।”
টেবিলের ওপরে খাতা থেকে ছিঁড়ে নেওয়া একটা রুলটানা ফুলস্ক্যাপ পাতা, দু-দিকে দুটো নুড়ির টুকরো দিয়ে চাপা দিয়ে রাখা ছিল। ঝুঁকে পড়ে দেখলাম, লেখা আছে—
“বুদ্ধ, এটা জানি যে, তুই আসার আগে অবধি কেউ এই লেখা পড়তে পারবে না, কারণ, গুরুং বাংলা পড়তে পারে না আর গনেশ বাঙলা, ইংরিজি, হিন্দি কিছুই পড়তে পারে না।
গুরুং এবং গনেশ দু-জনেই প্রতিদিনের মতো নেশা করতে গ্রামে গেছে। যখন ফিরবে তখন ওরা সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারবে না, আমার সঙ্গে কোথাও যাওয়া তো দূরের কথা। কিন্তু আমাকে এখনই বেরোতে হবে। একটা আশ্চর্য পোকাকে দেখতে পেয়েছি। সেটাকেই ফলো সেটাকেই ফলো করছি। যদি সেই বিশাল পোকাটার একটা ছবি অন্তত তুলতে পারি, তাহলেও এক নতুন প্রজাতির পতঙ্গের আবিষ্কারক হিসেবে আমার নাম নেচার ম্যাগাজিনে উঠে যাবে। আমার এই তামাবাড়ির নরকবাস সার্থক হবে।
আর যদি না পারি, যদি কোনো বিপদে পড়ি, তাহলে তুই তো আছিসই। গুরুংকে সঙ্গে নিয়ে আমার খোঁজে বেরিয়ে পড়িস। ডিপার্টমেন্টের হেল্প যে এখন পাব না, তা জানি।
ওকে বলিস উত্তরদিকে ন্যাড়াপাহাড়টার দিকে যেতে। পোকাটাকে একটু আগে ওদিকেই যেতে দেখেছি। উড়তে পারে না। পেছনের দু-পায়ে ভর দিয়ে সোজা হয়ে ঠিক মানুষের মতো হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছিল। একটু পা চালালেই আশা করছি ধরে ফেলতে পারব।”
গুরুং উদ্বিগ্নভাবে আমার মুখের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার পড়া শেষ হতেই বলল, “স্যার।”
আমি ওর কাঁধে হাত রেখে বললাম, “না, যা ভেবেছিলে, তা নয়। তরুণ একটা বিশাল পোকাকে ফলো করে কোথাও গেছে।”
“পোকা? কোনদিকে গেছেন কিছু বলেছেন?”
“উত্তরে। ন্যাড়াপাহাড়ের দিকে।”
আমার উত্তর শুনে মুহূর্তের মধ্যে গুরুংয়ের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ওকে ভীতু বলে কখনওই মনে হয়নি। তরুণের সঙ্গে ফোনে যেটুকু কথাবার্তা হত, তার মধ্যেও তরুণ বারবার গুরুংয়ের সাহস, গুরুংয়ের অস্ত্র চালানোর দক্ষতা, এইসবের প্রশংসা করত। ওকে ভয় পেতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হল?”
“কিছু না। ওদিকটায়… ইয়ে, মানে একটা বাইসনের পাল আছে, অত্যন্ত খতরনাক। মানুষ দেখলেই অ্যাটাক করে। যা-ই হোক, সাহেবকে খুঁজতে যেতে হবে। আপনি খাওয়া-দাওয়া সেরে নিন। আমি ততক্ষণে গনেশদাকে বলি রাতে খাবার জন্যে কিছু রুটি মাংস প্যাক করে দিতে।”
“রাতে থাকতে হবে?”
“হতেই পারে স্যার। পায়ে হেঁটে কৈটভে যেতে মিনিমাম তিন ঘণ্টা সময় লাগে। এখনই যদি বেরিয়ে পড়ি, তাহলেও সন্ধে সাতটার আগে পৌঁছতে পারব না।”
“কৈটভ!”
“ও-দিকে ওই একটাই গ্রাম। আমাদের পূর্বপুরুষদের দেওয়া নাম কৈটভ। গ্রামবাসীদেরও আমরা বলি কৈটভ। সাহেব আলটিমেটলি ওখানেই পৌঁছোবেন, আমি জানি। গত দশ বছরে আমাদের দু-জন ফরেস্টগার্ডের লাশ খুঁজে নিয়ে এসেছি ওখান থেকে। তাদের শরীরে অবশ্য চামড়া আর হাড় ছাড়া কিছু ছিল না।”
“কী সব আজেবাজে বকছ?” গুরুং-কে ধমক লাগালাম। ও মুখ নীচু করে বলল, “স্যরি স্যার। আর বলব না। চলুন বেরিয়ে পড়ি।”
*****
আসন্ন রাত্রির জনো সম্বল ছিল দু-জনের হাতে দুটো পাঁচ সেলের টর্চ। আমি মেলার বেলুন ফাটানোর এয়ারগান ছাড়া আর বন্দুকের ট্রিগারে কখনও আঙুল ছোঁয়াইনি। তাই শুনে গুরুং আমার কোমরে ভালো করে ফিতে দিয়ে জড়িয়ে একটা নেপালি কুকরি বেঁধে দিয়েছিল। তবে ও নিজেকে সবরকমভাবে সশস্ত্র করে বেরিয়েছিল। রাইফেল এবং কার্তুজের মালা তো ছিলই। তাছাড়া কোমরে ছিল রামদা। তার চেয়েও আশ্চর্য, একটা প্লাস্টিকের জ্যারিকেনে করে এক জ্যারিকেন পেট্রল নিতে দেখেছিলাম ওকে।
আমরা হাঁটতে শুরু করার পর প্রথম দেড় ঘণ্টায় তবু এদিক ওদিক কিছু গ্রামের আলো দেখতে পাচ্ছিলাম। তারপর সেগুলোও হারিয়ে গেল। বুঝতে পারছিলাম, ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর বনে ঢুকে যাচ্ছিলাম। ঝিঁঝি ডাকছে। নাইটজার পাখি ডাকছে। তার মধ্যেই মাঝেমাঝে ভেসে আসছে শাঁখের শব্দের মতো হাতির পালের বৃংহন। আমি আর না-পেরে গুরুংকে চেপে ধরলাম, “খুলে বলো তো, কী আছে কৈটভ গ্রামে? তুমি অত ভয় পাচ্ছ কেন?”
“আসুন, এখানে একটু বসি।” গুরুং হাত দিয়ে একটা চ্যাটালো পাথরের দিকে দেখাল। বসার পর বলল, “আমরা প্রায় পৌঁছেই গিয়েছি। এই উৎরাইটা ধরে আর দু-কিলোমিটার নেমে গেলে, নীচের ওই ছোটো ভ্যালিটার মাঝখানেই কৈটভ গ্রাম।”
নীচে তাকালাম। কোথায় গ্রাম? একবিন্দু আলো দেখছি না তো কোথাও। একবার হাতঘড়িতে সময় দেখলাম। সবে সন্ধে সাতটা। এত তাড়াতাড়ি কী গ্রামের লোকেরা আলো-টালো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল?
গুরুং একটা চুটা ঠোঁটে দিয়ে পকেট থেকে দেশলাইটা বার করেছিল। তারপর কী যেন মনে পড়তেই সভয়ে দুটো জিনিসই আবার উর্দির পকেটে ঢুকিয়ে নিল। বলল, “আপনাকে সত্যি কথাটাই বলি, ওই কৈটভ গ্রামের অধিবাসীদের আমরা এই অঞ্চলের লোকেরা সবাই ভয় পাই। কেউ ওদের কাছে যাই না।
কেন ভয় পাই বলছি। গাঁওবুড়োদের মুখে শুনেছি, ওদের মধ্যে এমন অনেক ব্যাপার আছে যেগুলো রীতিমতো ভূতুড়ে। যেমন, বছরের মধ্যে বেশ কয়েকমাস ওদের দেখা যায় না। ও গ্রাম তখন একদম শুনশান পড়ে থাকে। ওরা যে তখন কোথায় যায়, কীভাবে যায়, কেউ জানে না। জঙ্গলে তো আর শয়ে শয়ে রাস্তা নেই। একটিই রাস্তা, আমাদের ফরেস্ট অফিসের সামনে দিয়ে যেটা গেছে। সে রাস্তা দিয়ে কেউ ওদের বেরোতে দেখেনি কোনোদিন।”
“গ্রামের গরু ছাগল? হাঁস-মুরগি? তাদের কী হয়।” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“সেটাই তো দ্বিতীয় রহস্য” উত্তর দিল গুরুং, “এটাই বোধহয় পৃথিবীর একমাত্র গ্রাম, যেখানে কোনো গৃহপালিত পশুপাখি নেই। এমনকি চাষবাসও নেই এই গ্রামের লোকেদের। ওরা কী খায় কে জানে।
“তারপর?”
“তারপর ধরুন, ওদের গ্রামে কোনো জন্ম বা মৃত্যু হয় না।”
“তাই আবার হয় নাকি! কেমন করে জানলে?”
“মৃত্যু হলে গ্রামের পাশে একটা শ্মশান বা কবরখানা কিছু তো থাকত। কিছুই নেই। আর জন্ম? ওই গ্রামে কেউ কোনো শিশুকে দেখেনি।”
গুরুংয়ের কথা শুনতে-শুনতে আমি একবার আমার হাতের টর্চটা জ্বেলে ফেলেছিলাম। গুরুং এক ঝটকায় টর্চের মুখটা মাটির দিকে নামিয়ে দিয়ে বলল, “নেভান। যতক্ষণ এখানে আছি আলো জ্বালবেন না। দেখুন, ওই গ্রামেও কোনো আলো জ্বলছে না। কৈটভরা আলো পছন্দ করে না।”
“কেন?” ভারি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম।
গুরুং বলল, “কৈটভদের টোটেম কী জানেন? একজাতের পোকা। গঙ্গাফড়িংয়ের মতন দেখতে। ওরা নিজেদের পোকার সন্তান বলে জানে। আর আলো হচ্ছে পোকাদের মৃত্যুর কারণ। তাই ওরা আলো জ্বালায় না।”
আমার মাথার মধ্যে সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। তরুণ একটা গঙ্গাফড়িং-এর মতো বিশাল পোকাকে ফলো করে এদিকে আসার কথা লিখেছিল না? পোকাই এদের উপাস্য?
থেকে যেটিকে মানুষ ভেবেছিলাম, সেটি একটি মানুষের খোলস। চামড়া, দাঁত, নখ, সব ঠিক আছে; শুধু ভেতরে হাড় মাংস বলে কিছু নেই। চামড়াটা খড়খড়ে, শুকনো। অনেকটা কাপড়ের দোকানে যে প্লাস্টিকের নকল মানুষ সাজানো থাকে, যাকে ইংরিজিতে বলা হয় ‘ম্যানিকিন’, সেরকম।
গুরুংয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওরও মুখ শুকিয়ে গেছে। বিড়বিড় করে নেপালি ভাষায় কী যেন বকছে। কিন্তু বেশিক্ষণ আমরা ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। হঠাৎই নিস্তব্ধ রাত্রির বুক চিরে কৈটভগ্রামের দিক থেকে একটা আর্তনাদ ভেসে এল, “বাঁচাও! কে কোথায় আছ, রক্ষা কর।”
এ-গলার স্বর ভুল করার কোনো উপায় নেই। তরুণ। তরুণ কোনো বিপদে পড়েছে। গুরুং চিৎকার করে সাড়া দিল, “ভয় নেই সাহেব, ভয় নেই। আমরা আসছি।” তারপর তিরবেগে ঢাল বেয়ে ছুটতে শুরু করল। আমি হঠাৎ খুব কাছেই কোথায় যেন একটা খসখস শব্দ ওকে অনুসরণ করলাম। শুনতে পেলাম। আমরা দু-জনেই একসঙ্গে সেদিকে তাকালাম। দেখলাম, যে ঢাল ধরে নীচে কৈটভ গ্রামের দিকে নেমে যাওয়া যায়, সেই ঢালেই, আমাদের থেকে বড়োজোর তিনশো মিটার দূরে, এক অদ্ভুত এবং ভয়ংকর নাটক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
একটি লোক, মনে হল মধ্যবয়সি পুরুষমানুষ, সে আর একটি পুরুষমানুষের শরীর দুই পায়ের চাপে প্রাণপণে যেন মাটিতে মিশিয়ে দিতে চাইছে। কিছুক্ষণের মধ্যে সেই কাজে লোকটি সফল হল। পায়ের কাছে পড়ে রইল পরাজিত লোকটির শরীর। বিজয়ী লোকটি কেমন যেন ক্লান্তভাবে টলতে টলতে ঢাল বেয়ে নেমে গেল।
গুরুংয়ের দেখলাম অসীম সাহস। বলল, “চলুন তো দেখি, লোকটা বেঁচে আছে নাকি।” এই বলে ঢাল বেয়ে নেমে গেল। ওর পেছন পেছন আমিও গেলাম এবং গিয়ে যা দেখলাম তাতে ভয়ে গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। দেখলাম, দূর
আরও একটু নেমে একটা বাঁক ঘুরতেই এক ভয়ংকর দৃশ্যের সামনে পড়লাম। খোলা জায়গা বলেই আকাশের আধখানা চাঁদের মৃদু জ্যোৎস্নায় অস্পষ্টভাবে হলেও সবকিছু দেখতে পাচ্ছিলাম। দেখলাম, একটা ফুটবল খেলার মাঠের মতো জমির সীমানা বরাবর শ-খানেক ছোটো ছোটো পাতার ঝুপড়ি। ওটাই নিশ্চয় কৈটভ গ্রাম। আর সেই জমির কেন্দ্রস্থলে তরুণের দুটো হাত দু-দিকে টান দিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে দুটো লোক। ও প্রাণপণে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। ওর দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে আরও প্রায় শ-দুয়েক মানুষ।
নারী-পুরুষ আলাদা করে বুঝতে পারছিলাম না। দুর থেকে সবাইকেই একরকম দেখতে লাগছিল। সকলেই একটু কুঁজো হয়ে হাটছিল। কারুরই মাথায় মনে হচ্ছিল চুল নেই। আর সকলেরই পিঠের দিকে একটা করে চাদর ঝুলছিল।
আমাদের বাঁদিকে প্রায় দুশো হাত দূরে পাহাড়ের গায়ে একটা বেশ বড়োসড় বাঁশঝাড় ছিল। খর্বাকৃতি পাহাড়ি তলতা-বাঁশ, এই গরমে সমস্ত পাতা আর কাণ্ড শুকিয়ে হলুদ হয়ে আছে। তলাটা ঢেকে আছে শুকনো বাঁশপাতার স্তূপে। গুরুং চাপা গলায় বলল, “স্যার, একটা কাজ করবেন? ওই জ্যারিকেন থেকে পেট্রল ঢেলে শুকনো বাঁশপাতাগুলো ভিজিয়ে দিয়ে আসবেন?”
আমি যখন জ্যারিকেনের ঢাকনাটা খুলছি তখনই পরপর দুবার ফায়ারিং-এর আওয়াজ পেলাম। চোখের কোণা দিয়ে গুরুংয়ের রাইফেলের নলের মুখে দু-বার আগুনের ঝিলিকও দেখতে পেলাম। ধন্য টিপ ওর হাতের। কৈটভ গ্রামের মাঠের মাঝখানে যে লোকদুটো তরুণের দু-হাত টেনে ধরে রেখেছিল, দু-জনেই মুখ থুবড়ে পড়ল। আমি জ্যারকেনটা খালি করে ফিরে আসবার পর, গুরুং তৃতীয় গুলিটা চালাল শুকনো বাঁশপাতার স্তূপের ওপরে। ঠিক দশ সেকেন্ড লাগল পুরো বাঁশঝাড়টা দাউদাউ করে জ্বলে উঠতে। আর তারপরেই শুরু হল ম্যাজিক।
নীচের মাঠ থেকে ঝাঁক বেঁধে উড়ে এল ওরা। হ্যাঁ, ঠিকই বলছি, উড়ে এল। কারণ এতক্ষণ যাদের মানুষ ভাবছিলাম, তারা কেউই মানুষ ছিল না। তারা ছিল পোকা। বিশাল সাইজের একজাতের গঙ্গাফড়িং-এর মতো পোকা। যাকে ভেবেছিলাম পিঠের দিকে ঝুলিয়ে রাখা চাদর, সেগুলো আসলে ছিল ওদের গুটিয়ে রাখা ডানা।
অন্য যে কোনো পোকার মতোই তারা আগুনের টানে উড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল জ্বলন্ত বাঁশবনের মধ্যে।
মাংস পোড়ার গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
এইসবের মধ্যেই একটা হাত আমার কাঁধ ছুঁল। মুখ ফিরিয়ে দেখলাম, তরুণ কখন যেন অন্ধকার চড়াই-পথ ভেঙে উঠে এসেছে। ও গুরুকে বুকে জড়িয়ে ধরল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “এবার সব বুঝতে পেরেছি গুরুং। ওরা আক্ষরিক অর্থেই কীটের সন্তান। সেইজন্যেই এই অরণ্যের প্রাচীন মানুসেরা ওদের নাম দিয়েছিল কৈটভ। তারা তো এই কটিগুলোকে কাছ থেকে দেখেছিল।
শুঁয়োপোকার চেহারা যেমন প্রজাপতির থেকে আলাদা হয়, ওদেরও তাই। সেইজন্যেই ওদের শিশুকে চেনা যায় না। সেইজন্যেই ওদের পালিত পশু নেই, চাষাবাদ নেই। ওরা দৈত্যাকার পতঙ্গের মতোই সরাসরি গাছের পাতা কিংবা কাঁচা মাংস খায়।
বোধহয় ডিম পাড়ার পর একসঙ্গে সবাই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। পোকাদের পক্ষে তো সেটাই স্বাভাবিক। তাই দু-মাস তিনমাসের জন্যে ফাঁকা দেখায় এই গ্রামকে।
আমি এখানে পৌঁছোনোর পরেই ওরা কোনোভাবে আমার গন্ধ পেয়ে গিয়েছিল। ঘিরে রেখেছিল পুরো গ্রামটাকে। কোনোরকমে এতক্ষণ লুকিয়ে ছিলাম। আর পারলাম না। সামান্য নড়াচড়া করতেই পোকাগুলো এসে আমাকে ধরে ফেলল। তোমরা না এলে আমারও অবস্থা হত আগের দুই ফরেস্ট গার্ডের মতো।”
বললাম, “ও কথা থাক। তোর সারা শরীরে অসংখ্য নখের আঁচড় দেখছি। এখনই তোকে নিয়ে যেভাবে হোক শিলিগুড়ি পৌঁছতে হবে। চল, আগে বিট অফিস অবধি তো যাই।”
ফেরার পথে আমরা দেখলাম সেই ম্যানিকিনের মতো জিনিসটা তখনও রাস্তার ধারে পড়ে রয়েছে।
এখন আমরা জানি ওটা কী। একটা পোকা খোলস ছেড়েছিল। ওটা সেই খোলস….
