ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল
ব্রাহ্মণ ভূত
অনেক কাল আগের কথা। সেকালে এক বামুন ছিল, কিন্তু সে কুলীন নয় বলে তার আর কিছুতেই বিয়ে হচ্ছিলো না। কি আর করে, বড় লোকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সে বিয়ের জন্যে টাকা ভিক্ষে করে বেড়াতে লাগলো। বিয়ের জন্যে কম টাকার দরকার ছিলো না; বিয়ের জন্যে যতো না লাগতো কনের মা-বাপকে দিতে হতো তার চেয়েও বেশি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে খোশামোদ করে অবশেষে তার টাকাটা সংগ্রহ হলো এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার বিয়েও হয়ে গেল। বিয়ে করে বামুন বৌ নিয়ে এসে মায়ের কাছে দিল। মা খুউব খুশি হলো।
এর কিছুদিন বাদে সে মাকে বললো–মা তোমাকে আর বৌকে খাওয়াবার পয়সা আমার নেই। কাজেই আমি বিদেশ চললাম, কিছু টাকাকড়ি রোজগার না করলেই নয়। হয়তো অনেক বছর লাগবে, কারণ বেশ কিছু হাতে নিয়ে তবেই ফিরবো। এখন আমার কাছে যা কিছু আছে তা তোমাকে দিয়ে গেলাম। তাই দিয়ে যেমন করে পারো চালিয়ে নিও, আর আমার বৌটাকে দেখো।
এই বলে মাকে প্রণাম করে তাঁর আশীর্ব্বাদ নিয়ে বামুন রওনা হয়ে গেল।
সেইদিন সন্ধ্যাবেলাতেই ঠিক ঐ বামুনের মতো চেহারা করে এক ভূত এসে ওদের বাড়িতে হাজির হলো। নোতুন বৌ তাকে দেখে তার স্বামী মনে করে বললো – সে কি ! এতো তাড়াতাড়ি ফিরে এলে যে? বলে গেলে হয়তো কয়েক বছর লেগে যাবে। মত বদলে গেলো বুঝি ?
ভূত বললো—আজ দিনটা বড়ই ভালো, তাই বাড়ি ফিরে এলাম। তাছাড়া কিছু টাকাকড়িও পাওয়া গেছে।
বুড়ি মায়ের মনেও কোনো সন্দেহ জাগলো না। ভূত ঐ বাড়িতেই থেকে গেল। সেই-ই হলো বাড়ির কর্তা, বুড়ির ছেলে নোতুন বৌয়ের স্বামী। পাড়ার লোকেও কোনো তফাৎ দেখলো না, সেই বামুন আর এই ভূতটা হুবহু একরকম দেখতে।
কয়েক বছর কেটে গেল। বামুন এলো ফিরে! বাড়িতে এসে হুবহু তার নিজের মতো দেখতে আর একটা লোককে দেখে সে তো তাজ্জব বনে গেল।
ভূতটা বামুনকে দেখে বললো—তুমি কে গা? আমার বাড়িতে তোমার কি দরকার শুনি ?
বামুন বললো—এ তো বড় অদ্ভুত কথা রে বাবা! সবাই জানে এ আমার বাড়ি, আমার বৌ, আমার মা। আরে, কতো বছর ধরে আমি এখানে আছি। এখন হঠাৎ এসে তো আর বললেই হবে না যে এটা তোমার বাড়ি, তোমার বৌ, তোমার মা। বামুন, তোমার মাথার গোল হয়েছে।
এই বলে ভূত তো বামুনকে বাড়ি থেকে বের করে দিলো।
ব্যাপার দেখে বামুনের মুখে কথাটি আর জোগাল না। কি যে করবে সে ভেবেই পেলো না। শেষটা মনে হলো রাজার কাছে গিয়ে সব খুলে বলা যাক্ । রাজা দু’জনকে ডেকে পাঠালেন। দেখলেন, দু’জনেরই অবিকল একইরকম চেহারা। রাজাও হকচকিয়ে গেলেন ; ঝগড়ার কি সিদ্ধান্ত করবেন ভেবেই পেলেন না!
দিনের পর দিন বামুন রাজার সভায় গিয়ে হাজির হ’তো, তাঁর কাছে কাকুতি-মিনতি করতো,—আমার বাড়ি, আমার বৌ, আমার মাকে ফিরিয়ে দিন মহারাজ।
আর রোজই রাজা মন ঠিক করতে না পেরে ওকে বলতেন—কাল এসো।
বামুন চোখের জল ফেলে, কপাল চাপড়াতো আর বলতো—হায় হায় ! এ কি পাপের পৃথিবী গো! আমার বাড়ি থেকে আমাকে তাড়িয়ে দেয়! অন্য লোকে আমার বাড়ি, আমার বৌ, আমার মা–জোর করে নিয়ে নেয়। আর রাজাটাই বা কি! ন্যায় অন্যায় বিচার করতে জানে না ! !
এখন হয়েছে কি, সভা থেকে বেরিয়ে, শহরের বাইরে যাবার পথে একটা খোলা জায়গা পার হয়ে যেতে হতো, সেখানে কতোকগুলো রাখাল ছেলে খেলা করতো। মাঠে গোরু ছেড়ে দিয়ে, ওরা একটা বড় গাছের তলায় জড়ো হতো। ওরা রাজা রাজা খেলতো। একজন রাখালকে রাজা করা হতো। একজন হতো উজির, একজন কোটাল, বাকিরা হ’তো পেয়াদা।
একদিন রাখাল রাজা তার উজিরকে জিগ্যেস করলো—ঐ বামুনটা রোজ রোজ কাঁদে কেন? কাঁদে কেন তা জানো? উজির সে কথার কোনো উত্তর দিতে পারলো না। তখন রাখাল রাজা বামুনকে ধরে আনবার জন্যে পেয়াদা পাঠালো।
পেয়াদা গিয়ে সত্যিকার বামুনকে গিয়ে বললো—রাজা এখনি আপনাকে তলব দিয়েছেন।
বামুন বললো-কিসের জন্যে? এইমাত্র আমি রাজার কাছ থেকে আসছি। তিনি আমাকে কাল আসতে বলেছেন। আবার ডেকেছেন কেন ?
পেয়াদা বললো- আহা, ও রাজা নয়। আমাদের রাখাল রাজা আপনাকে ডেকেছেন।
বামুন বললো—রাখাল রাজা আবার কে?
পেয়াদা বললো— দেখবেন আসুন।
বামুন তার সঙ্গে রাখাল রাজার কাছে যেতেই, রাজা বললো- আপনি রোজ রোজ এখান দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে যান কেন?
তখন বামুন তাকে নিজের সমস্ত দুঃখের কথা বললো। তাই শুনে রাখাল রাজা বললো—আমি সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি। আপনার অধিকার আমি আপনাকে ফিরিয়ে দেবো। রাজাকে গিয়ে বলবেন, আমাকে যেন মামলা সাব্যস্ত করবার অনুমতি দেন।
বামুন তখন দেশের রাজার কাছে ফিরে গিয়ে তাঁকে অনুনয় করে বললো -রাখালরাজা তার মামলা সাব্যস্ত করতে চাইছে, তাকে যেন সেই অনুমতি দেওয়া হয়। এমনিতেই রাজা ঐ মামলার কিনারা করে উঠতে পারছিলেন না, কাজেই তিনি খুশি হয়েই অনুমতি দিলেন। মামলার সময় ঠিক হলো পরদিন সকালে।
রাখাল রাজা সত্যিই সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলো। পরদিন সকালে একটা সরু মুখ বোতল নিয়ে সে বিচারসভায় এলো। বামুন আর ভূত-ব্রাহ্মণ দুজনেই হাজির হলো। তারপর অনেক সাক্ষীর জবানী শোনা হলো, তর্ক বিতর্ক হলো, বক্তৃতা হলো। শেষে রাখাল রাজা বললো—যাক ঢের হয়েছে যথেষ্ট শুনেছি। এই যে বোতলটা দেখছেন, যে এই বোতলের ভিতরে ঢুকতে পারবে এই আদালতের সিদ্ধান্তে সেই-ই ঐ বাড়ি, বৌ ও মায়ের ন্যায্য অধিকারী প্রমাণিত হবে। এবার দেখা যাক্, আপনাদের মধ্যে কে এই বোতলে ঢুকতে পারেন।
এই কথা শোনামাত্র’ ব্রাহ্মণ-ভূত তাড়াতাড়ি বললো—আমি পারবো। বলেই, সে সুড়ুৎ করে বোতলে ঢুকে পড়লো। আর সঙ্গে সঙ্গে রাখাল রাজা বোতলের মুখ ছিপি দিয়ে এঁটে দিল।
তারপর ?
তারপর, বোতলটি একটা গভীর নদীর জলে ফেলে দিলো। আর, বামুন ফিরে পেলো তার মা ও বৌকে এবং নিশ্চিন্তে সুখে স্বাচ্ছন্দে ঘরকন্যা করতে লাগলো।
