Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান

    May 18, 2026

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    May 18, 2026

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রেমের গল্প – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    May 16, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কৃষ্ণসিন্ধুকী – দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    দেবারতি মুখোপাধ্যায় এক পাতা গল্প298 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    কৃষ্ণসিন্ধুকী – ২৫

    ২৫

    বড়দিনে রস আইল্যান্ডের চেহারা হয় দেখার মতো। প্রতিটা বাংলোয় সাজো সাজো রব। বাবুর্চি, বেয়ারা, খানসামারা খিদমতে ব্যস্ত। বড় বড় সাদা কালো ঘোড়াগুলো সগর্বে ঘুরে বেড়াচ্ছে মাঠে। সমুদ্র থেকে ঠান্ডা বাতাস এসে জুড়িয়ে দিচ্ছে সকলের মন। বছরের বাকি সময় সাহেবরা এখানে দেশীয়দের মতোই থাকে। কিন্তু তারা যে আসলে প্রভু, দেশের সব ‘নেটিভ’দের কাজ যে তাদের তোয়াজ করা, সেটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই বড়দিনের সময়।

    রস আইল্যান্ডের একমাত্র গির্জায় বিউগল বাজছে। পোর্ট ব্লেয়ারে উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাকের পতাকা। ভেসে আসছে কুচকাওয়াজের শব্দ।

    জেলার ব্যারিসাহেব নিজের বাংলো থেকে বেরিয়ে গির্জার দিকে হাঁটছিলেন। অন্যদিন তাঁর চারপাশ ঘিরে থাকে পারিষদ, অনুচররা। বাংলো থেকে ফেরিঘাটের এইটুকু দুরত্বেও নিজের তেজী ঘোড়ায় উড্ডীন হয়ে আসেন নৌকো চড়তে।

    কিন্তু বড়দিনে ইচ্ছা করেই তিনি কাউকে নেন না। আজ সকলের ছুটি। বহুদিন পর ওয়েস্টকোটটা গায়ে জড়িয়ে আনন্দে গুনগুন সুর এসে গেল ব্যারির গলায়। গতকাল সন্ধ্যায় ক্লাবে ক্রিসমাস ইভে অনেকটা পান করে ফেলেছেন। তাই মেজাজ বড়ই ফুরফুরে।

    এমনিতে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে চাকরি করার হাজারটা বিপদ তো আছেই। বিপজ্জনক সব বন্দি। বিষাক্ত পোকামাকড়। উপজাতিদের আক্রমণ।

    তবে এখানকার সব ইংরেজরাই একবাক্যে স্বীকার করবে, সবচেয়ে খতরনাক হল এখানকার অসহ্য গরম। প্রথম প্রথম এই গরমের তীব্রতা অনেকেই বুঝতে পারেনি। খাঁ খাঁ রোদেও সেইসব কর্তারা আঁটসাট কোট পরে হেঁটে বেরিয়েছেন। নেটিভদের মতো সুতির ঢিলেঢালা পোশাক পরলে ভাবমূর্তি মলিন হওয়ার ভয়ে। কিন্তু তারপর যেভাবে পটাপট মরা শুরু হয়েছিল, কবর দেওয়ার জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না।

    এখন তাই এখানে শীতকালের দুটো মাস বাদ দিলে বাকি সময়টা সবাই সুতির জামা পরেন। ছাতা মাথায় হাঁটেন। বিলিতি হ্যাট বাড়িতে রেখে দিয়ে মাথায় পরেন শোলার টুপি।

    ব্যারি নিজেও তাই করেন। শুধু ওয়ার্ড ভিজিটে যাওয়ার সময় গায়ে জড়িয়ে নেন কোট। শীতের সময়টুকু এখানে একমাত্র স্বস্তির। এই সময়টুকু সবাই চেটেপুটে উপভোগ করতে চায়। ভোররাত অবধি পার্টি চলে। নাচ। গান। পান। হুল্লোড়।

    চার্চের কাছাকাছি পৌঁছতেই দেখা হয়ে গেল মিসেস ফোর্ডের সঙ্গে। প্রৌঢ়া মিসেস ফোর্ডকে চেনে না এই তল্লাটে এমন কেউ নেই। আড়ালে তাঁকে বলা হয় রস আইল্যান্ডের ‘গেজেট’। অসুস্থ মিঃ ফোর্ড বাড়িতেই থাকেন, সেভাবে বেরোন না। আর মিসেস ফোর্ড তাঁর রিকশায় চড়ে সারাদিন গোটা রস আইল্যান্ড টহল দেন। সমস্ত বাড়িতে তাঁর যাতায়াত। কোনও বাড়িতে কোনও সাহেব পরিচারিকার দিকে হাত বাড়াচ্ছে, কোন বাড়িতে সাহেব কাজে চলে গেলেই মেম সেজেগুজে বেরিয়ে পড়ছে, সমস্ত খবর তাঁর নখদর্পণে।

    রস আইল্যান্ডের প্রায় সমস্ত বাড়িই জেলের কোন না কোন কর্তার। তাঁরা সকালবেলা ব্রেকফাস্ট সেরে স্টিমারে চলে যান পোর্ট ব্লেয়ার। সারাদিন মেমসাহেবরা একাই থাকেন। মিসেস ফোর্ড এ পাড়া ও পাড়া ঘুরে বেড়ান। কারুর বাড়ি গিয়ে চা খেলেন। কারুর বাড়ি কেক। এভাবে গোটা সকাল কাটিয়ে তিনি বেলায় বাড়ি গিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সারেন। তারপর কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে আর এক দফা চক্কর কাটতে বেরোন। সারাক্ষণ তিনি নিজেকে পরিপাটি রাখেন। শেমিজ। পেটিকোট। লেসের লম্বা গাউন। মাথায় ভিক্টোরিয়ান হ্যাট। তাঁর স্বামী ভাল পেনশন পান। ছেলেও বিলেতে প্রতিষ্ঠিত।

    মিসেস ফোর্ড বিশাল বপু নিয়ে রিকশায় বসে আছেন। হাতে একখানা ঢাউস ব্যাগ। বেচারা রিকশাওয়ালাটা রোগাপ্যাংলা, একে তো সে ভারী চেহারার মিসেস ফোর্ডকে চড়াই রাস্তায় টানতে পারছে না, তার ওপর সামনে জেলার সাহেবকে দেখে তার বোধহয় প্রাণপাখি উড়ে যাওয়ার উপক্রম হল।

    ডেভিড ব্যারি মিসেস ফোর্ডের দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ‘মেরি ক্রিসমাস মিসেস ফোর্ড!’

    ‘মেরি ক্রিসমাস ডেভিড।’ মিসেস ফোর্ড বললেন, ‘অনেকদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হল। যদিও সারাদিনই তোমার কথা রস আইল্যান্ডে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়।’

    ‘কেন? আমি কি মহাপুরুষ না চোর? দুটোর যে কোনও একটা হলে তবেই তো সবাই আলোচনা করে।’

    ‘তুমি হলে ওই দুটোরই বাবা। চোর হোক বা মহাপুরুষ, দুটোকেই গরাদের ওপারে একেবারে বেঁধে রাখো। আর তোমায় নিয়ে কথা হবে না? হা হা!’ নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন মিসেস ফোর্ড।

    পরক্ষণেই কী মনে পড়তে রিকশা থেকে নামতে চাইলেন মিসেস ফোর্ড। একটা সুদৃশ্য লাঠি রিকশার সঙ্গে বাঁধাই ছিল, রিকশাওয়ালা সেটার একপ্রান্ত ধরল। অন্য প্রান্ত ধরে খুব কষ্ট করে নামলেন ফোর্ড। তারপর গলা নামিয়ে বললেন, ‘নতুন যে কমিশনার এসেছে, পোর্টওয়েল, শুনছি খুব গোলমেলে লোক?’

    ব্যারি মাথা নাড়লেন, ‘হ্যাঁ। এসেই নানারকম রিপোর্ট চেয়ে পাঠাচ্ছে। সবেতেই ওনার সমস্যা।’

    ‘কেন?’

    ‘নতুন এসেছে, একটু ক্ষমতা দেখাতে চাইছে।’ ব্যারি সংক্ষেপে বললেন। এত সুন্দর সকালে তিনি মেজাজ খারাপ করতে চান না। এরকম মাঝেমধ্যে অনেকেই এসেছে। ব্যারির রাজত্বে কেউ বেশিদিন ছড়ি ঘোরাতে পারেনি।

    মিসেস ফোর্ড বললেন, ‘পোর্টওয়েলের বউটাও কেমন যেন সৃষ্টিছাড়া। কারুর সঙ্গে মেশে না। গল্পগুজব নেই। দিনরাত নাকি ছবি আঁকে। যত্তসব!’

    ‘ছাড়ান মিসেস ফোর্ড। আজকের দিনে এসব ভাববেন না। মিঃ ফোর্ডকে আমার মেরি ক্রিসমাস জানাবেন।’ কথাগুলো বলে ব্যারি তাকালেন রিকশাওয়ালার দিকে।

    রিকশাওয়ালা এতক্ষণ জড়সড় তো ছিলই। এবার তার হাত দুটো কাঁপতে শুরু করল। রিকশার হাতল ছেড়ে দিয়ে সে কপালে দু’হাত ঠেকাল।

    রস আইল্যান্ডে রিকশা চালালেও ডেভিড ব্যারিকে এভাবে রাস্তায় হাঁটতে দেখার সঙ্গে পরিচিত নয় এখানকার ঠিকে কর্মীরা। সেইজন্যই রিকশাওয়ালার এই অবস্থা।

    কিন্তু ডেভিড ব্যারি স্নিগ্ধ হাসলেন। বললেন, ‘মেরি ক্রিসমাস। ঈশ্বর তোমার সহায় হন।’

    তারপর কোটের পকেট থেকে বের করে সিটের ওপর রাখলেন একটা চকচকে টাকা।

    রিকশাওয়ালার হতভম্ব মুখের সামনে দিয়ে মিষ্টি হেসে এগিয়ে এলেন ব্যারি। যে যাই ভাবুক, আজকের দিনে তিনি একজন ধার্মিক রোমান ক্যাথলিক। কারুর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবে না। কাউকে আঘাত দেবেন না।

    এখন তিনি সোজা চলে যাবেন গির্জার পাদ্রির কাছে। তাঁর উপস্থিতিতে ভগবান যিশুর সামনে হাঁটুগেড়ে বসে ক্ষমা চাইবেন। কনফেশন করবেন। সারাবছরের সব পাপ নামিয়ে দিয়ে আসবেন সেখানে।

    আবার কাল থেকে আগের রূপ।

    এভাবেই চলছে বছরের পর বছর। সারাটা বছর তিনি কয়েদিদের চাবুক মারেন, অমানুষিক অত্যাচার করেন, গালিগালাজ করেন। কখনও মারতে মারতে কেউ মরেও যায়। তারপর বড়দিনের সন্ধ্যায় সব পাপ কাগজে লিখে রস আইল্যান্ডের গির্জায় কনফেশন করে আসেন।

    কিন্তু আজ যেন কী হয়েছে। কিছুতেই স্নিগ্ধ সৌম্য থাকতে পারছেন না ব্যারি। চোখ বুজলেই ভেসে উঠছে কয়েকটা ছেলের ছবি।

    উল্লাসকর। নন্দগোপাল। হোতিলাল।

    উফ! শান্ত থাকার বদলে দাঁতে দাঁত চেপেন ব্যারি।

    প্রচণ্ড বাড় বেড়েছে এরা। এত বড় সাহস, ব্যারির নামে উলটো পালটা চিঠি লেখে, আড়ালে গান গায়, কথা অমান্য করে? অন্যসময় হলে এতদিনে এদের লাশ গোপনে ভেসে যেত সাগরে। কিন্তু বড়দিনের সময়টুকুতে এসব করেন না ব্যারি। তাছাড়া সময়ও পালটাচ্ছে।

    তবে ব্যারি ছাড়ার পাত্র নন। যখন তখন এরা সকলের সামনে ব্যারির সঙ্গে তর্ক করার সাহস পাচ্ছে। শিগগির এদের বিষদাঁত না ভাঙলে এই স্পর্ধা ছড়িয়ে পড়বে অন্যদের মধ্যেও। শীতকালটা যাক, তারপর এদের দেখে নেবেন তিনি। মারতে হবে ঠিকই, তবে কৌশলে।

    পরিকল্পনা স্থির করে প্রভু যিশুর সামনে হাসিমুখে হাঁটু গেড়ে বসেন ব্যারি। চোখ বুজে বুকে আঁকেন ক্রশ।

    ২৬

    পুষ্প আর নীলা সন্তর্পণে হেঁটে চলেছিল সমুদ্ররেখার সমান্তরালে। মাঘ মাসের মধ্যরাত্রি। বিস্তীর্ণ বালুকাবেলায় দেখা যাচ্ছে দূরবর্তী দ্বীপের লাইটহাউস। নির্জন সৈকতে আছড়ে পড়ছে উন্মাদিনী ঊর্মিমালারা।

    ওদের দু’জনেরই গায়ে জড়ানো রয়েছে কালো রঙের পাতলা চাদর। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, কোন একটা বস্তু বুঝি সমুদ্রতীর বেয়ে এগিয়ে চলেছে।

    আজ মনে হয় অমাবস্যা। আকাশে চাঁদ নেই। আলোর ছিটেফোঁটাও যেন কোনওদিনও পড়েনি এই বালিচরে।

    হাঁটতে হাঁটতে একটা ঝোপের কাছে এসে ওরা দাঁড়িয়ে পড়ল। সেখানে নোঙর করা রয়েছে একখানা ডিঙিনৌকো। তাতে মাছের আঁশটে গন্ধ। বোঝাই যায়, এই নৌকো দিনের আলোয় থাকে মৎস্যজীবীদের জিম্মায়। বহুদূর পাড়ি দিয়ে মাছবোঝাই হয়ে আসে সে।

    দূরে একটা আগুন জ্বলছে।

    নীলা ফিসফিস করল, ‘ওটা কীসের আগুন রে?’

    ‘শ্মশান।’

    ‘এখানে শ্মশানও আছে?’

    ‘শোনো কতা! শ্মশান থাকবে না? মানুষ থাকলেই শ্মশান থাকবে। গোরস্থানও আচে। সাহেবদের আচে রস আইল্যানে। আর মোছলমানদের একেনেই। নেই শুধু ঠান্ডা। কতায় আচে, মাঘের শীত বাঘের গায়। তা একেনে সেই শীতের ছিটেফোঁটাও তো দিলে পারে!’ পুষ্প কথা বলতে বলতে নৌকোটাকে ঠেলে ঠেলে জলে নিয়ে আসছিল। নীলাও হাত লাগাল।

    আর ঠিক তখনই অন্ধকারে ভূতের মতো উদয় হল এক ছায়ামূর্তি। শেখর। নৌকোয় উঠে ও ইশারা করল, ‘তোরা উঠে আয়!’

    ডিঙি নৌকোটা যতই সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলেছিল, ততই নীলার হৃদস্পন্দন দ্রুত হচ্ছিল। সমুদ্রের ঢেউ এদিকে বেশ জোরালো। ডিঙিনৌকোখানা মাঝেমাঝেই কাগজের নৌকোর মতো ডুবুডুবু হয়ে যাচ্ছিল। নীলার হঠাৎ মনে পড়ে গেল, বহুবছর আগের কথা। ওদের শ্রীফলতলা গ্রামে বর্ষায় ডোবায় কাগজের নৌকো ভাসাত ও আর জগু। পাতলা কাগজের নৌকো, কিছুদূর চলতে না চলতেই মুখ থুবড়ে পড়ত। একবার ইন্দ্রদাদা শক্ত কার্ডবোর্ড দিয়ে নৌকো বানিয়ে দিয়েছিল ওদের। সেই নৌকো ভাসতে ভাসতে গিয়ে ঠেকেছিল ভবানী বাঁড়াজ্জের বাসভবনে।

    কতদিন কেটে গেছে। আজ শেখর নৌকো বেয়ে ওকে নিয়ে চলেছে। নীলার চোখ ঝাপসা হয়ে এল।

    শেখর নিশ্চুপে নৌকোর দাঁড় বাইছিল। সমুদ্রে নৌকো চালাতে বেশ মুনশিয়ানা লাগে। তবে এ-কাজে শেখর বেশ পটু। প্রায়ই জলের লোটা নিয়ে ও এ দ্বীপ ও দ্বীপ পাড়ি দেয়। অন্ধকারে শেখরের দাঁড় বাওয়ার জন্য একবার ঝুঁকে পড়া, পরক্ষণেই সোজা হওয়া পিঠ দেখতে দেখতে নীলার কেমন যেন ঘোর লেগে যাচ্ছিল। ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের মাঝে পুষ্প ফিসফিস করল, ‘জেলের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে অনেকেই জেনে গেচে কিন্তু!’

    ‘কী জেনে গেচে?’

    ‘এই বোমা কারখানার কতা!’

    ‘সেকী!’ শেখর ভ্রু কুঁচকল, ‘কেমন করে জানল?’

    ‘বাহ। তোমরাই তো গোলাওয়ালাদের কাচে চিঠি পাঠাও।’

    ‘পাঠাতে তো হবেই।’ শেখর বলল, ‘আমরা আর বোমা বাঁধা তেমন শিখতে পেরেছি কোথায়। কবে থেকে চেষ্টা করছি। সেভাবে পারছি না। গোলাওয়ালাদের মধ্যে হেমচন্দ্র কানুনগো আছেন। উনি ফ্রান্স থেকে বোমা বাঁধা শিখে এসেছেন। উল্লাসকর দত্তও বোমা বানাতে দারুণ দড়। ওরা আমাদের লিখে লিখে পাঠান কেমন করে বোমা বাঁধতে হবে। এখন আমরা অনেকদূর এগিয়েছি।’

    ‘উল্লাসদাদাকে আমি চিনতাম।’ নীলা উদাস স্বরে বলল।

    লীলাদিদি নিশ্চয়ই সারাদিন কাঁদে এখন, উল্লাসদাদার জন্য। চিন্তা কোরো না লীলাদিদি। মায়ের পেটের না হলেও তুমি আমার সত্যিকারের দিদি। তোমার উল্লাসদাদাকে আমি ফেরত নিয়ে যাবই! নীলা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল।

    ‘কলকাতার জল গায়ে লেগে তুই তো দেখছি সবাইকে চিনিস!’ শেখরের গলা থেকে যেন শ্লেষ ঝরে পড়ল।

    কতক্ষণ ধরে ওরা সমুদ্রে চলছিল হিসেব নেই, শেখর দাঁড় বেয়ে একটা সরু খাঁড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল। খাঁড়িটা বড়জোর ফুটপাঁচেক চওড়া, দু’পাশে ঘন জঙ্গল। দু’পাশ থেকে মোটা গাছের ডাল উঁচু হয়ে মাথার ওপরে যেন তোরণ রচনা করেছে। ঢেকে দিয়েছে আকাশ।

    নৌকো চলছিল। গৌরীপ্রসন্ন যতটুকু নীলাকে জানিয়েছেন, ওদের গন্তব্য পোর্ট ব্লেয়ারের উলটোদিকের পাহাড়। মাউন্ট হ্যারিয়েট। বহুকাল আগে টাইটলার নামে নাকি এক কর্তা এসেছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রী হ্যারিয়েটের নামে রেখেছিলেন আন্দামানের এই সবথেকে উঁচু পাহাড়ের নাম।

    নৌকো চালাতে চালাতে শেখর আবার কথা বলে উঠল, ‘প্রথম যখন জলের ব্যবসা শুরু করেছিলাম, একাই লোটা নিয়ে যেতাম। চড়াই পথ বেয়ে উঠতাম হ্যারিয়েট পাহাড়ের চূড়ায়।’

    ‘পাহাড়চূড়ায় বসে কে জল খায়?’ নীলা রাতের আকাশ দেখতে দেখতে প্রশ্ন করে।

    ‘বাহ, ওখানে যে সানসেট পয়েন্ট। সাহেব মেমরা সূর্যাস্ত দেখতে যায়। রেস্টিং রুম করা আছে যে!’

    ‘তবে এমন দ্বীপে বোমা বাঁধো কেন? সাহেবরা তো টের পেয়ে যাবে।’

    ‘এই তল্লাটে মোট কত দ্বীপ আছে, তা জানিস? পাঁচশোরও বেশি। জারোয়া ওঙ্গে সেন্টিনেলিদের বাদ দিলে নব্বই ভাগ দ্বীপেই মানুষের পা পড়েনি। বোমা বাঁধতে গিয়ে জংলি জানোয়ারের পেটে যেতে হবে। তাছাড়া ওরা বাকি দ্বীপগুলো নজরে রাখে। এটায় বরং পেছনদিকে যে এসব হতে পারে, তা ওদের কল্পনাতেই আসবে না। একে বলে, বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা।’ শেখর হাসল।

    দ্বীপের পেছনের ডাঙায় নৌকো ভিড়তেই ওরা হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে নেমে এল। নিকষ কালো অন্ধকার চারদিকে। পুষ্প এমন দ্বীপে আসতে অভ্যস্ত, তাই ও বেশ স্বচ্ছেন্দই এগোচ্ছিল।

    নীলা খুব সাবধানে হাঁটছিল। তবু একবার হুমড়ি খেয়ে পড়তে যেতেই শেখর শক্ত হাতে ধরে ফেলল ওকে।

    নির্জন অরণ্য। শেখরের নিঃশ্বাসের উত্তাপ এসে লাগছে ওর মুখে। পুষ্প এগিয়ে গেছে কিছুটা। নীলা হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘তোমায় একটা কথা জিজ্ঞেস করব, শেখরদা?’

    ‘কর।’

    ‘কলকাতায় যে রবিবাবু গান লেখেন, তাঁর নাম কী?’

    শেখর ভ্রু কুঁচকাল। দেশ থেকে এত দূরে এই সামুদ্রিক দ্বীপে মধ্যরাত্রে ওরা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হাঁটছে। অন্য কোনও মেয়ে হলে এই পরিস্থিতিতে এমন অদ্ভুত প্রশ্ন করত না।

    গ্রামে থাকতে ও নীলার প্রেমে পড়েছিল ঠিকই, কিন্তু নীলাকে পড়ার চেষ্টা করেনি। করলে বুঝত, নীলা সাধারণ মেয়ে নয়। ও কথা না বাড়িয়ে বলল, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’

    নীলা মনে মনে নামটা বেশ ক’বার আউড়ে নিল। জুলিয়াকে বলতে হবে। জুলিয়া কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথাই বলছিলেন সেদিন?

    একটা মাটির কুঁড়ে। তার ভেতর খুব অস্পষ্ট আলো। ওখানেই কি বোমা তৈরি হচ্ছে? ওরা চুপচাপ হাঁটছিল। মন্দিরের ভেতরের নিবু নিবু আলোয় চোখ সয়ে যেতেই ভেতরের লোকদুটোর একজনকে নীলা চিনতে পারল। স্বাবলম্বন গাঁয়ের কাঠুরে শ্যামলাল। এই লোকটাকে সাধাসিধা ভীতু প্রকৃতিরই মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন সে বোমা বাঁধছে। ঘর্মাক্ত ললাটে উত্তেজনার ভাঁজ।

    আরেকটা ছেলে পাশে বসে ফিসফিস করছে, ‘বোমার মশলার সঙ্গে লোহার ছাঁট আর পেরেক মেশাতে হবে।’

    ‘কেন রে ফণী?’

    ‘তাতে আরও ভাল কাজ কবে। উল্লাসদাদা বলেচে!’ ফণীভূষণ বলতে বলতে নীলাদের দিকে তাকিয়ে বেকুব হয়ে গেল। জ্বলজ্বলে চোখে পুষ্পর চোখে চোখ রাখল, ‘ওমা তুমি সেই হাসপাতালের নার্স না? কোত্থেকে এলে গো!’

    পুষ্প বিরক্তচোখে মুখ ঘুরিয়ে এল। ফণীভূষণ ইদানীং অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। যখন তখন কোনও একটা ছুতো ধরে চলে আসছে হাসপাতালে। তারপর পুষ্পর দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকছে। সেদিন পুষ্প হাসপাতাল থেকে ফিরছে, এমন সময় কোথা থেকে ভোজবাজির মতো এসে সামনে উদয় হল। হাতে একখানা কাগজ।

    ‘কী এটা?’

    ফণীভূষণ বলল, ‘বে’র।’

    ‘বে’র মানে?’

    ‘আমার এখনও জেল থেকে বেরোতে দেড়বছর। তদ্দিন তুমি কাউকে বে’ করবে না, কথা দাও।’

    ‘রঙ্গ হচেচ নাকি?’ চেঁচিয়ে উঠেছিল পুষ্প।

    ‘আহা রঙ্গ নয়। সত্যি বলচি।’ ফণীভূষণ আর্তির সুরে বলে চলেছিল, ‘যবে থেকে তোমায় দেখেছি, মনে হয়েছে তোমার মাথায় সিঁদুর দেওয়ার জন্যই আমি জন্মেচি।’

    ‘ঝাঁটা মারি মুকে।’

    ‘সে মেরো’খন। কিন্তু তুমি কতা দাও, আর কারুর গলায় মালা দেবে না। অবিশ্যি তার আগে যদি এখান থেকে দু’জনেই পালাতে পারি, তো সোনায় সোহাগা!’

    এত গায়েপড়া যে কোনও ছেলে হতে পারে, তা জন্মে দেখেনি পুষ্প।

    ও কিছু বলার আগেই শেখর বলল, ‘ও আমাদের দলেই আছে।’

    ফণীভূষণ বড় বড় চোখে মাথা দোলাল, ‘তা তো জানি। কিন্তু ডেরায় আনলে কেন?’

    ‘দরকার আছে।’ শেখর গম্ভীরমুখে বলল, ‘কথা না বাড়িয়ে কাজ শুরু কর। ভোরের আলো ফোটার আগে তোকে জেলখানায় চলে যেতে হবে।’

    ‘কী কাজ?’ ফণীভূষণ অপলকচোখে পুষ্পকে দেখে চলেছে।

    শেখর বিরক্তমুখে বলল, ‘কী আবার? এই মেয়েদুটোকে শিখিয়ে রাখতে হবে। ধরা পড়লে আমাদের সার্চ করবে। কিন্তু ওদের চট করে ধরতে পারবে না। সময় বেশি নেই। রোজ রোজ ওদের নিয়ে আসতে পারব না।’

    ‘তার আগে তোমাদের দিন ঠিক করতে হবে।’ শ্যামলাল খিঁচিয়ে উঠল, ‘ফটিকের মতো শকুনগুলো নজরে রাখে আমায়। প্রথমে ঠিক করলে বড়দিন। তারপর শুনলাম, তাতে হবে না। নেহাত বোকা সেজে থাকি তাই।’

    শেখর ফিক করে হাসল, ‘বোকা নয়, বল, বোকা বন্দি।’

    শ্যামলালের এটা মুদ্রাদোষ। কথায় কথায় সাহেবদের সামনে হাতজোড় করে বলে, ‘আমি বোকা বন্দি আছি, হুজৌর। গুস্তাকি মাফ কিয়া যায়ে।’

    খুব কমজনই জানে, এটা ওর মুখোশ। আসল শ্যামলাল একটু ভুলোমন ঠিকই, কিন্তু অকুতোভয়। দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ।

    নীলা সায় দিল। ও নিজেও প্রথমে শুনেছিল। বড়দিনের সন্ধ্যায় ‘অ্যাকশন’ শুরু হবে। এই অ্যাকশন কথাটা ও শিখেছে গৌরীজ্যাঠার কাছে। গৌরীজ্যাঠা বলেছিলেন, ‘বড়দিনে সব সাহেবরা ছুটির মেজাজে থাকে। সেদিন আঘাত হানলে ওরা তৈরি হওয়ার সময় পাবে না।’

    কথা ছিল, নীলা কাজ থেকে সেদিন সোজা চলে আসবে গাঁয়ে। তারপর সেখান থেকেই পরিকল্পনামাফিক কাজ এগোবে। নীলার মনিব সাহেবা জুলিয়া প্রস্তুত হচ্ছিলেন ক্লাবে ক্রিসমাস পার্টিতে যাওয়ার জন্য।

    নীলা কাজকর্ম সেরে ক্যারোলিনকে সাজিয়ে গুজিয়ে বেরিয়ে আসবে, এমন সময় জুলিয়া বলেছিলেন, ‘তুমিও চলো নীলা।’

    ‘ওমা, আমি গিয়ে কী করব?’ নীলার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠেছিল।

    ‘আমি ক্যারোলিনকে একা সামলাতে পারব না।’ জুলিয়া কখনও কখনও ছেলেমানুষ হয়ে ওঠেন, ‘ইউ হ্যাভ টু কাম, নীলা!’

    নীলা ‘না’ বলতে গিয়েও চুপ করে গিয়েছিল। কৌশলে এড়াতে হবে। জড়তা কাটিয়ে ও বলেছিল, ‘আমার ফিভার হয়েচে মেমসাহেব! গলায় ব্যথা।’

    জুলিয়া ভয়ার্তচোখে তাকিয়েছিলেন। নীলা জানত, এই একটা জিনিসকে জুলিয়া যমের মতো ভয় পান। কলকাতায় থাকতে অজানা জ্বরে নিজের বোনকে হারিয়েছিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন, ‘হোলি জেসাস! তুমি এখুনি বাড়ি যাও। আগে বলোনি কেন?’

    ‘বুঝতে পারিনি মেমসাব।’

    ‘আচ্ছা যাও। ডক্টর দেখিয়ে নিতে ভুলো না।’

    নীলা সেদিন মনে মনে হেসেছিল। আন্দামানে ডাক্তার কলকাতার রাস্তায় বাঘের মতোই অদ্ভুত ব্যাপার। এখানে চিকিৎসা মানেই শরীরে সুচ ফুটিয়ে ‘খারাপ রক্ত’ ফেলে দেওয়া।

    সেদিন ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফিরেছিল নীলা। কিন্তু তারপর শুনেছিল, সেদিন ‘অ্যাকশন’ হবে না।

    ‘কেন?’

    গৌরীজ্যাঠা ম্লান হেসেছিলেন, ‘আমাদেরই মধ্যে কোনও খোচর আছে। সে বোধ হয় সাবধান করে দিয়েছে। সেলুলার জেলের চারপাশে অন্য বড়দিনে সিকিউরিটি অনেক শিথিল থাকে। কিন্তু আজ শুনলাম, দ্বিগুণ নিরাপত্তা।’

    ‘যাহ। সব মাঠে মারা গেল।’

    ‘কিছুই মারা যায়নি নীলা।’ গৌরীজ্যাঠা হেসেছিলেন, ‘বিপ্লব একবার শুরু হলে তা কখনওই মারা যায় না। ছাইচাপা থাকলেও সেই আগুন জ্বলে। আমাদের আরও ভাল সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হবে।’

    সেদিনের কথা এই অন্ধকার দ্বীপে বসে মনে পড়তে নীলা অস্ফুটে বলল, ‘দিন কি কিছু ঠিক হয়েচে?’

    ‘হুঁ। বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি। ওইসময় রস আইল্যান্ডে একটা বড় বিয়ে আছে। সুপারিন্টেন্ডেন্ট মারে সাহেবের ভাইয়ের বিয়ে। সবাই ব্যস্ত থাকবে। জুঁইবালা শবনমদের জেল থেকে বের করে আনা যাবে।’ শেখর কেজো গলায় বলল, ‘আর হেমদাদাদের সঙ্গেও একবার কথা বলে নিতে হবে।’

    নীলা চুপ করে রইল। শেখরদা’র কাছে সব খবর আছে। হেমচন্দ্র কানুনগো। উল্লাসকর দত্ত। বারীন ঘোষ।

    ইন্দ্রদাদা আছে কি না সেই খবর কি সত্যিই নেই?

    ২৭

    ইন্দুভূষণ নিজের অন্ধকার কুঠুরিতে চুপচাপ বসে খেচরি অভ্যাস করছিল। এই যোগ ওকে আর উল্লাসদাদাকে অরবিন্দ ঘোষ একসঙ্গে শিখিয়েছিলেন। তার আগের দিনই বিপ্লবে মন্ত্রপূত দীক্ষা হয়েছিল ওর।

    ভাবলে মনে হয় কত জন্ম আগের কথা! ও অবাকচোখে প্রশ্ন করেছিল, ‘দেশের হয়ে লড়তে এসেছি। যুদ্ধ করতে এসেছি। যোগব্যায়াম করব কেন?’

    অরবিন্দ ঘোষ মৃদু হেসেছিলেন, ‘যুদ্ধ করতে সবচেয়ে বেশি কী লাগে, জানো? সাহস। সেই সাহস তোমায় জোগাবে তোমার মন। তাই সেই মনকে আগে করতে হবে শক্তিশালী। একাগ্র।’

    জিভটাকে ধীরে ধীরে মুখের ভেতরদিকে ঢুকিয়ে দিয়ে আলজিভের পেছনে পাঠাতে চেষ্টা করছিল ইন্দুভূষণ। অরবিন্দবাবু যখন দেখিয়েছিলেন, ও আর উল্লাসদাদা হতভম্ব হয়ে দেখেছিল, অরবিন্দবাবুর জিভটা গোটাটাই উলটে গিয়ে আলজিভের পেছনে চলে গেল কেমন। উল্লাসদাদা বিস্মিত মুখে বলেছিল, ‘আরিব্বাস! কই, আমার তো হচ্ছে না সেজদা?’

    অরবিন্দ ঘোষ বারীনদাদার সেজদাদা। সেই সম্পর্কে উল্লাসদাদাও তাঁকে ওই নামে ডাকত। তিনি জিভটাকে যথাস্থানে এনে মৃদু হেসেছিলেন, ‘কোনও কিছু যদি এত সহজেই পাওয়া যায়, তবে কি তার মূল্য থাকে, উল্লাস? প্রতিদিন চর্চা করো, তোমারও হবে।’

    ‘কিন্তু … কী হবে এটা করে, সেজদা?’

    অরবিন্দ ঘোষ চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিয়েছিলেন, ‘যোগের এক বহু প্রাচীন গ্রন্থ আছে। হঠযোগ প্রদীপিকা। সেখানে বলা হচ্ছে,

    ‘কপালকুহরে জিহ্বা প্রবিষ্টা বিপরীতগা।

    ভ্রূবোরন্তর্গতা দৃষ্টিমুদ্রা ভবতি খেচরি।

    ‘প্রতিদিন যিনি সকাল বিকেল গোমাংস খান, তিনিই কুলীন।’ অরবিন্দ চোখ খুলে হেসেছিলেন, ‘এখানে গোমাংস মানে আবার ভেবে বসো না গরুর মাংস। পঞ্চমাতার মধ্যে গো শব্দের অর্থ হল জিভ। সেই জিভকে খাওয়া। অর্থাৎ বাক সংযম। এটাই গোমাংস খাওয়া। যিনি এটা করতে পারেন, তিনিই প্রকৃত মাংসসাধক।

    মা শব্দাদ্রসনা জ্ঞেয়া তদংশান রসনাপ্রিয়ান।
    সদা যো ভক্ষয়েদ্দেবি স এব মাংস সাধকঃ।।*

    [* আগমসার।]

    ‘তোমরা প্রতিদিন দু’বেলা এই খেচরি মুদ্রা চেষ্টা করবে। রাতারাতি হবে না। এও এক সাধনা। করতে করতে দেখবে জিভ উলটে আলজিভের পেছন দিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে নাসিকা কুহরে। তখন একধরনের মিষ্টি রস ক্ষরণ হবে। সেটা অমৃত রস।’

    ‘অমৃত অর্থে?’

    ‘অর্থাৎ তোমরা যা ভাবছ তাই। সেই অমৃতপান করলে আর কিছু না খেলেও চলবে। বিপ্লব করব বললেই হয় না, শরীর ও মনকে সেটার জন্য উপযুক্ত করতে হয়। প্রস্তুত না হয়ে যুদ্ধগমন হল নির্বুদ্ধিতা।’ অরবিন্দ সংক্ষেপে বলে ধ্যানে মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন।

    সেলুলার জেলের ওয়ার্ডারদের বুটজোড়ার পায়চারির মাঝে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ইন্দুভূষণ ব্যাকুল হয়ে খেচরি মুদ্রা করার চেষ্টা করে চলেছিল। সত্যিই যদি মুদ্রাটা ঠিকঠাক করতে পারে, তবে জেলের এই বমি আসার মতোখাবারদাবার খেতে হবে না যে! প্রাচীনকালে কত যোগী দিনের পর দিন অনাহারে থাকতেন। এই খেচরি মুদ্রা দিয়েই তো!

    ওয়ার্ডার পেটি অফিসার জমাদাররা তখন চাইলেও ওকে কাবু করতে পারবে না।

    কিন্তু পারছে কোথায়? সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর সন্ধ্যায় মনঃসংযোগ করতে বসলেই শরীরের সব পেশিগুলো একসঙ্গে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তার সঙ্গে সুগ্রীব দোসর হাতের ঘা গুলো। যতই সব উপেক্ষা করে ও মনকে একাগ্র করতে চায় দুই ভ্রু’র মাঝের কূটস্থে, ততই ঘা-গুলো থেকে রস গড়াতে থাকে। আর কুঠুরিতে বাস করা পোকামাকড়গুলো সেই রসের গন্ধে এগিয়ে এসে চাটতে শুরু করে। পরেরদিন সকালে ঘা-গুলো কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

    মন আবার দুর্বল হয়ে আসছিল। কতদিন আগের শোনা একটা গান গুনগুন করছিল মাথার মধ্যে। গেয়ে না উঠলে এই গুনগুনানি থামবে না।

    ‘মাগো, যায় যেন জীবন চলে
    শুধু জগতমাঝে তোমার কাজে
    ‘বন্দেমাতরম’ বলে
    আমার যায় যেন জীবন চলে।’*

    [* গীতিকার : কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ।]

    মুরারিপুকুরের বাগানবাড়িতে সবাইকে গানখানা শুনিয়েছিল উল্লাসদাদা।

    গানটা গাইলেই শরীরে কেমন বল চলে আসে। সত্যিই তো! এত মন খারাপ কেন করছে ও? পাণ্ডবদের মতো বীরেরাও বারোবছর অজ্ঞাতবাসে ছিলেন। ভীমের মতো বীরকে বিরাট রাজার রসুইশালায় রাঁধতে হত। অর্জুন নাচ শেখাতেন। নকুল সহদেব গরু ঘোড়া দেখাশোনা করতেন। তাঁরা যদি বারোবছরেও ধৈর্য না হারান, ইন্দুভূষণ এত অল্পেই হারাচ্ছে কেন?

    শারীরিক কষ্ট তো থাকবেই। তাই বলে মনকে হারতে দিলে চলবে না। নিজের মনকে নিজেই উজ্জীবিত করতে থাকে ইন্দুভূষণ।

    ভাবতে ভাবতে দেওয়ালে টোকা পড়তে থাকে। টক টক টকাটক।

    উৎকর্ণ হয়ে দেওয়ালের দিকে এগিয়ে যায় ইন্দুভূষণ।

    একটি মেয়ে এখানকার জেলে বন্দি ছিল, ছাড়া পেয়ে গ্রামে গেছে সদ্য। নাম নীলা। সে একজনকে খুঁজছে। তুমি কি তাকে চেনো?

    ইন্দুভূষণ ভ্রু কুঁচকোয়। ফণীভূষণ এসব কী জিজ্ঞেস করছে? কোন জেলবন্দি মহিলাকে ও কি করে চিনবে? আলিপুর জেলের চুয়াল্লিশ ডিগ্রিতে থাকার সময় কোনও মহিলা বন্দির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার সুযোগই ছিল না। প্রতিদিন উত্তেজনা তখন কেসের শুনানি নিয়ে। বন্দিনীদের দিকে তাকাবার সময় কোথায়!

    ইন্দুভূষণ কয়েক মুহূর্ত থেমে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে টোকা দেয়।

    ‘না। অমন কাউকে চিনি না।’

    ২৮

    নীলা অন্যমনস্কভাবে বাড়ি থেকে বেরোল। ওর কোলে যমুনার শিশুকন্যা সরস্বতী।

    যত দিন এগিয়ে আসছে, গৌরীপ্রসন্ন ততই ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। জেলের রাজবন্দি আর বাইরের গ্রামের মুক্ত কয়েদিদের মাঝে তিনি ও পুষ্পই শুধুমাত্র যোগসূত্র। রাজবন্দিদের কাছ থেকে বোমা বাধার সুকৌশলী সূত্র জেনে অজ্ঞ মুক্ত কয়েদিদের পারদর্শী করে তোলা মুখের কথা নয়।

    বহুদিন ধরে চলছে এই পরিকল্পনার বীজবপন। তার ওপর চারদিকে রয়েছে সাহেবদের দেশীয় চর। দেশে সাহেবরা কী করছে জেনে লাভ নেই, এখানে তো তারাই পেটের ভাত জোগাচ্ছে! এই হল তাদের মনোভাব।

    গৌরীপ্রসন্ন বিরক্ত হন, কিন্তু হাল ছাড়েন না। একা পেলেই মানুষকে বোঝান, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আসা কতটা প্রয়োজন। এই করতে করতে বাড়িতে নাওয়াখাওয়ার সময়টুকু ছাড়া বলতে গেলে আর আসেনই না।

    বাচ্চা কাঁখে নীলা হাটে যাচ্ছিল টুকিটাকি কিনতে। অন্যমনস্কভাবে একটা পাথরে হোঁচট খেতেই ও শেখরের মুখোমুখি পড়ে গেল। শেখর আসছে উলটোদিক থেকে।

    ‘সবসময়েই দেখি হোঁচট খাচ্ছিস।’ শেখর বলল, ‘বাচ্চা নিয়ে হাঁটছিস, এত বেখেয়ালি কেন?’

    নীলা উত্তর দিল না।

    ‘আমি জানি তুই দিনরাত কী ভাবিস।’

    ‘জানো যখন, তখন আবার জিজ্ঞেস করো কেন!’

    শেখর ওর পাশে পাশে হাঁটতে আরম্ভ করল, ‘খবর পেয়েছি। ইন্দ্র এখানে এসেছিল ঠিকই। কিন্তু এখন আর নেই।’

    নীলার বুকের ভেতরের দ্রিমি দ্রিমি শব্দটা একলাফে কয়েকগুণ বেড়ে গেল, ‘নেই মানে!’

    ‘তুই তো কবে থেকে পুষ্পকে খোঁজ লাগাতে বলেছিস, ও খুঁজে পেয়েছে কি?’

    ‘পুষ্প খুঁজে পায়নি বলেই বুঝি সে মরে গ্যাচে ধরে নিতে হবে?’ নীলা তীক্ষ্ণস্বরে বলল।

    ‘আহা, মরে গেছে কোথায় বললাম?’ শেখর একমুহূর্ত দম নেয়, ‘ইন্দ্রকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে মাদ্রাজের জেলে।’

    ‘মাদ্রাজ!’ নীলা হতবুদ্ধির মতো বলে, ‘কেন?’

    ‘তা বলতে পারব না। আমি চলি। লড়াই শুরু হতে আর মাত্র ক’দিন বাকি। সাবধানে থাকিস। বন্দেমাতরম ।’

    ‘বন্দেমাতরম ।’ নীলা হাঁটতে থাকে বটে, কিন্তু ওর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। পা দুটো চলতে চায় না। মনে হয়, এখুনি এই কাঁচা পথের মধ্যেই বসে পড়বে ও। জেল থেকে বেরনো, গৌরীপ্রসন্নকে বিবাহ, সবই করেছে ইন্দ্রদাদার সঙ্গে একবার দেখা হওয়ার আশায়। ইন্দ্রদাদাই যখন এখানে নেই, তবে ও কীসের জন্য এই ঝুঁকি নিচ্ছে?

    এই চিন্তা মনে আসা মাত্র লজ্জায় যেন কুঁকড়ে যায় ও। ছি ছি! তবে গৌরীপ্রসন্ন, যমুনা, পুষ্পর কাছে নিজেকে মহান দেখানোর ভড়ং ও করে কী করে? ইন্দ্রদাদা যদি একটা কারণ হয়, অন্য বড় কারণ হল, ভারতমায়ের জন্য আত্মসমর্পণ। আর নিজের দেশকে স্বাধীন করার জন্য যতদূর হাঁটতে হয়, ও হাঁটবে।

    হাঁটতে ওকে হবেই। তারপর যদি কোনওদিন ইন্দ্রদাদার সঙ্গে দেখা হয়, নীলা সগর্বে বলবে। খুনের দায়ে জেলখাটা বন্দিনী হতে পারে। কিন্তু সে-ও একজন বিপ্লবী। দেশমাতাকে সেও ভালবাসে। এতদিন, এতজন্ম পর একটু হলেও সে ইন্দ্রদাদার যোগ্য হতে পেরেছে। স্বামী বিবেকানন্দের পথ অনুসরণ করতে পেরেছে।

    ইন্দ্রদাদা কি তখন ওকে আর পাঁচজনের মতোই ঘৃণা করবে? নাকি তার বড় বড় দু’চোখে ফুটে উঠবে একটু হলেও বিস্ময়!

    দ্বিধাগ্রস্ত মনে নীলা হাটে পৌঁছল। সরস্বতী এর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমন্ত শিশু নিয়েই ও এদিক ওদিক ঘুরছিল হাটে। হাট অবশ্য নামেই। গ্রামের পুরোটাই প্রায় অবিন্যস্ত অরণ্য, মাঝখানে মাঝখানে বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে উঠেছে বাড়ি। বাজার। পুকুর।

    হাটে তিনখানা মোটে দোকানি। একজন বসে তরিতরকারি নিয়ে, আর দু’জন মাছ। শ্যামলাল হাতের কুড়ালখানা কাঁধে নিয়ে গাঁয়ের এদিক ওদিক ঢুঁ দিচ্ছিল। আজ চৈত্রসংক্রান্তি। গৃহস্থবাড়িতে জ্বালানিকাঠ জমিয়ে রাখা শুভ।

    কিগো, গাছ কাটতে হবে? ও ঠাউরমশাই, কাঠ লাগবে?

    যারা ডাকছিল, তাদের সঙ্গে আগে দরদাম স্থির করে নেয়। তারপর জঙ্গলের কোনও ভাল দেখে গাছে উঠে উঁচু মোটা ডালে দড়ি বাঁধে শ্যামলাল। নেমে এসে টানা দেয় অন্য গাছের গুঁড়িতে।

    নীলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। শিকড় ঘেঁষে গোড়ায় প্রথম কোপ পড়লে কত বছর ধরে ঋজু দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো কেমন স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে। একের পর এক কোপে চাকলা চাকলা ডাল কেটে কেটে ছিটকে পড়ে। যেন কসাইয়ের দোকানে তাজা মাংস।

    নীলা উদাস চোখে গাছের গন্ধ নেয়। ওদিকের গাছতলা থেকে তিন-চারজন পুরুষ হাঁ করে তাকে দেখতে থাকে।

    নীলা চুপচাপ ভেবে চলেছিল। সত্যিই ইন্দ্রদাদা আন্দামানে আর নেই?

    হঠাৎ কাঁধে কার হাত। নীলা চমকে তাকায়। চন্দ্রপ্রভা। চন্দ্রপ্রভা সবসময়েই একাধিক সখী পরিবৃতা হয়ে থাকে। কিন্তু আজ ব্যতিক্রম। সে একা।

    ‘কী লা, একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেকচিস? এটা তো ওই যমুনার মেয়েটা? দে, ওকে এবার কোলে নিই। ইদিকে আয় আমার সঙ্গে।’ চন্দ্রপ্রভা প্রায় যেচেই সরস্বতীকে কোলে নিয়ে নেয়।

    তারপর নীলাকে নিয়ে এগিয়ে যায় নির্জনে।

    ‘কিচু দেকচি না গো চাঁদুমাসি।’ নীলা কাষ্ঠ হাসে, ‘ভাল আচ?’

    ‘না, আমরা তো আর তোর মতো কপাল করিনি লো, ভাল থাকব কী করে, বল!’ চন্দ্রপ্রভা বাঁকা হাসল, ‘আমাদের সোয়ামি তো তোর মতো পাটরানি করে রাকেনি লো!’

    নীলা কী বলবে বুঝতে পারে না। চাঁদুমাসির প্রতিটি সংলাপে অবধারিতভাবে চলে আসে অকারণ বিদ্রুপ। কিংবা অহেতুক শ্লেষ। প্রথম প্রথম নীলার কষ্ট হত। দুঃখ হত। কিন্তু এখন ও বোঝে, সম্ভবত চাঁদুমাসি সহজভাবে কথা বলতে শেখেনি। পরিস্থিতির চাপে।

    তখন এই মুখরা রূঢ়স্বভাবা প্রৌঢ়ার জন্য কেমন যেন মায়া জাগে। ও বলল, ‘ঘরে চলো। চোদ্দোশাক রেঁধেচি। খেয়ে বলবে, কেমন হয়েচে।’

    চন্দ্রপ্রভা নীলার আন্তরিক কণ্ঠে একটু থমকে গেল। আজ সে এসেছে একটা উদ্দেশ্য নিয়ে। ভুলিয়ে ভালিয়ে নীলাকে নিয়ে যেতে হবে গাঁয়ের সীমান্তে সমুদ্রের চরে। সেখানে নৌকো নিয়ে অপেক্ষা করছে ফটিক। বাচ্চাটাকে কেড়ে নিয়ে ভয় দেখিয়ে সহজে কাজ হলে ভাল। নাহলে সমুদ্রতীরে পাথর পড়ে থাকে মেলা। কিছুক্ষণের জন্য অজ্ঞান করে এভাবে সাহেবদের কাছে মেয়েপাচার করতে চন্দ্রপ্রভার থেকে দড় কেউ নেই। স্বাবলম্বন গ্রামের লোকেরা সবই জানে। সবাই দেখেও চোখ বুজে থাকে। কারুর ঘরের বউই এখানে সতী নয়, আর তাছাড়া সারাজীবনের জন্য তো নিয়ে যাচ্ছে না। বড়জোর তিনরাত। সঙ্গে কাঞ্চনলাভ অবধারিত।

    চন্দ্রপ্রভা কথা চালিয়ে যাওয়ার ছুতো খুঁজছিল। কিন্তু ওর হঠাৎ কী মনে পড়ে গেল। খনখনে সুরে বলল, ‘তুই নাকি মোল্লাপাড়ার বাচ্চাগুলোকে রোজ দুপুরে খাওয়াস?’

    ‘রোজ কেমন করে খাওয়াব গো? সাহেবের বাড়িতে কাজে যাই যে। যেদিন কাজ থাকে না, সেদিন খাওয়াই।’ নীলা হাসল।

    শ্যামলাল গাছ কাটছে। কাঁচা কাঠের কেমন যেন গন্ধ। একেকটা গাছের গন্ধ একেকরকম। অথচ প্রত্যেকে একই মাটি থেকে খাবার শুষেছে।

    চন্দ্রপ্রভা রাগে হিসহিস করল, ‘নিজের জাত তো আগেই খুইয়েচিস, এবার আমারটাও খেতে চাস?’

    ‘মানে?’

    ‘যে দালানে মোল্লাদের খাওয়াস, সেই দালানে আমায় খাওয়াবি আবাগীর বেটি?’

    নীলা হাসল। ওর একটুও রাগ হল না চাঁদুমাসির ওপর। বছরকয়েক আগে ও নিজেও তো এমনই ছিল। লীলাদিদি ওকে পালটে দিয়েছে। কিন্তু চাঁদুমাসি যদি তেমন কোনও লীলাদিদিকে না পায়, বেচারির কী দোষ? ও বলল, ‘যে মশাটা তোমার নাকে এসে বসেচে, সে কী গো? হিঁদু না মোছলমান?’

    ‘রঙ্গ করচিস, তোর সাহস তো কম না!’

    ‘এই দ্যাকো। রঙ্গ কেন করব? তোমার ভেতরেও প্রাণ আছে। ওর ভেতরেও প্রাণ আছে। হিঁদু মোল্লা ফিরিঙ্গি বলো আর গরু ছাগল মশা মাছি বলো, সবার মধ্যেই প্রাণ থাকে। আত্মা থাকে। আমরা ভাল কাজ করলে ভাল জন্ম পাই। মন্দ করলে মন্দ।’

    ‘তার মানে আমি গেল জন্মে ভাল কাজ করেছিলাম?’

    ‘নিশ্চয়ই। নইলে তুমি মানুষ হয়ে জন্মালে কী করে?’

    ‘মানুষ হয়ে জন্মেচি তো কী হল?’ ঠোঁট উলটোল চন্দ্রপ্রভা, ‘তাতে কী সুখটা পেয়েচি শুনি? বরের মার খেয়েচি, জেলে পচেচি। আর এখন? দাসীগিরি আর দাসীগিরি। আমি তো বলি মেয়েজনম ঠিক মানুষজনম নয়। মানুষজনম পেতে গেলে মরদ হয়েই জন্মাতে হয়। মেয়েমানুষ হয়ে জন্মানোর চেয়ে বনের জন্তুজানোয়ার হয়ে জন্মানো ভাল।’

    নীলা চমকে উঠল। এই কথাগুলো চন্দ্রপ্রভার মুখ থেকে বেরোবে, ও কল্পনা করেনি। ওর মনে পড়ে গেল বহুবছর আগের ইন্দ্রদাদাকে।

    ও ধীরে ধীরে বলল, ‘তা এত বিপদে এত দুঃখেও তুমি তো কোনও অন্যায় করোনি।’

    ‘অন্যায় করিনি?’

    ‘আহা, কারুর ক্ষতি তো করোনি! আগে যেটুকু পাপ করেচ, তা অ্যাদ্দিনে ধুয়েমুচে গ্যাচে।’ নীলা বলল, ‘আমার সোয়ামি কাজ থেকে ফিরে বটগাছতলায় কত দেশবিদেশের গল্প শোনান। আমরা, বাড়ির মেয়েবউরা সবাই শুনি। খুব মজা হয়। তুমি আসো না কেন?’

    ‘কী যে বলিস, তার ঠিক নেই। তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকল, আর আমি নাকি গল্প শুনতে যাব!’

    ‘ওমা গল্প শোনার আবার বয়স আছে নাকি? জানো মাসি, উনি সেদিন একটা গল্প বলছিলেন। আগেকার দিনে একধরনের লোক গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে বেড়াত। তাদের নাম ছিল সিন্ধুকী। সিন্ধুকীরা কী করত জানো?’

    ‘কী?’

    ‘যে বাড়িতে সুন্দরী গুণবতী মেয়ে থাকত, তাদের লুঠ করে নিয়ে যেত।’ নীলা থামল, ‘আমাদেরও তো সিন্ধুকীরাই এখানে এনেছে বলো চাঁদুমাসি, আমরা কেউই তো এখানে স্বেচ্ছায় আসিনি! আমার সোয়ামি এই দ্বীপের একটা নাম দিয়েচেন, জানো!’

    ‘কী নাম?’

    ‘কৃষ্ণসিন্ধুকী। আন্দামান তো কালাপানি। কালো মানে কৃষ্ণ। আবার সিন্ধু মানে সাগর। আন্দামানে তো আমাদের লুঠই করে এনেছে বলো। আমাদের এখানে এনেছে বলেই এই কালাপানিতে গ্রাম হচ্ছে। ফুল ফুটছে।’ নীলা চোখ বন্ধ করল, ‘দেকবে মাসি, পরের জন্মে তুমি রাজরানি হবে।’

    চন্দ্রপ্রভা কুঁকড়ে গেল কেমন। বোঝাই যাচ্ছে, নীলা মেয়েটা ওর সম্পর্কে কিছুই জানে না। চন্দ্রপ্রভাকে রাজরানি হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করে চোখ বন্ধ করে হাসছে কেমন।

    হিজল গাছটা কাটা হয়ে গেছে। শ্যামলাল এবার হাত দিয়েছে পাশের গাবগাছটায়। তিনভাগ কাটা হয়ে যাওয়ার পর গাছগুলো কেমন যেন ককিয়ে ওঠে। কেমন এক দাঁতে দাঁত ঘষার মতো শব্দ হয়। তারপর বিরাট হুলস্থুল করে পাশের গাছগুলোর ওপর এলিয়ে পড়ে সে।

    নীলার মনটা দুলে উঠল। মানুষ নিজের দরকারে এদের খুন করছে। এরা কি এই খুনের প্রতিশোধ নেবে না? নিশ্চয়ই নেবে। একদিন না একদিন।

    সরস্বতীর ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ। জেগে উঠেই সে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। নীলা সঙ্গে সঙ্গে ওকে ভোলাতে শুরু করল। যমুনা যেন কেমন। হঠাৎ হঠাৎ কোলের শিশুটাকে নীলার জিম্মায় রেখে কোথায় যে উধাও হয়!

    ওদিকে চন্দ্রপ্রভার দেরি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে বেশ বুঝতে পারছিল, তার নিজের পা দুটো নড়তে চাইছে না। অস্ফুটে বলল, ‘শোন।’

    ‘কী গো?’

    চন্দ্রপ্রভা ফিসফিস করল, ‘পাপ কি ময়লা নাকি? পাপ যে ধোয়া মোছা যায়, তা কে বলল তোকে?’

    ‘বাহ। সব ময়লাই মোছা যায়। পরিষ্কার কাপড় দিয়ে। পাপও ধোয়া যায়। তুমি রত্নাকর দস্যুর কতা জানো না?’

    ‘না। কে সে? আমাদের ছেলেবেলায় রঘুডাকাতের নাম শুনেচি।’

    ‘যিনি রামায়ণ লিখেছিলেন। প্রথমে ছিলেন ভয়ংকর এক দস্যু। দস্যু রত্নাকর। বনে লুকিয়ে থাকতেন, পথিকের পয়সাকড়ি কেড়ে নিয়ে তাকে মেরে ফেলতেন। একদিন এক সাধুকে লুঠ করতে যাবেন, সাধু বাধা দিয়ে বললেন, তুমি আগে বলো, তোমার পাপের ভাগ কে নেবে? রত্নাকর বলল, ডাকাতির পয়সা দিয়ে যাদের খাওয়াই, আমার বউ বাচ্চা বাপ মা, সকলেই নেবে। সাধু হেসে বললেন, আমি অপেক্ষা করছি। তুমি বাড়িতে জেনে এসো। তারা সত্যিই তোমার পাপের ভাগ নেবে কি না!’ নীলা একটানা বলে থামল।

    সরস্বতীও কান্না থামিয়ে বড় বড় চোখে ওকে দেখছে।

    ‘তারপর? রত্নাকরের পরিবার কী বলল?’ চন্দ্রপ্রভা ব্যাকুলসুরে প্রশ্ন করল, ‘তারা ভাগ নিল নিশ্চয়ই।’

    ‘না। সবাই বলল, আমাদের খাওয়ানো তো তোমার কর্তব্য। এখন সেই অন্ন তুমি কোথা থেকে কেমন করে আনচ, তা তো আমাদের দেখার কথা নয়। তুমি তার জন্য কোনও পাপ করলে তার দায়ও আমাদের নয়।’ নীলা একটা শ্বাস ফেলল, ‘তারপর রত্নাকর ডাকাতি ছেড়ে দিল, জানো মাসি। সে ধ্যানে বসল। গভীর সেই ধ্যান। সব পাপ ধুয়ে মুছে গেল তার। সে হয়ে উঠল মস্ত এক ঋষি। ঋষি বাঃ কী। লিখলেন রামায়ণ।’ নীলা হাসল, ‘পাপ ধোয়া যায় গো মাসি! পুণ্য দিয়ে মুছে ফেলা যায় সব পাপ!’

    চন্দ্রপ্রভার গায়ে কাঁটা দিল। এই মেয়েটা খুব অন্যরকম।

    নীলা আবার বলল, ‘আর মোল্লা হোক, ফিরিঙ্গি হোক বা হিঁদু। সবার শরীরেই বইছে লাল রক্ত। আত্মা। সেই আত্মাকে খাওয়ানোর মতো পুণ্যি আর কিচু হয় নাকি? তুমিই বলো!’

    চন্দ্রপ্রভার যেন দারুণ জ্বর এসে গেছে। থরথর করে কাঁপছে সে। পুণ্য! কী পুণ্য করেছে সে এই দু’কুড়ি বছরে? ভাবতে বসলে যে খালি কলসী ভর্তি পাপই নজরে আসে! হরিহরের জন্য ও দিনরাত এত পাপ করে যাচ্ছে। কিন্তু ওর পাপের ভাগ তবে হরিহর নেবে না?

    নীলা আর দাঁড়াল না। হাটে ও দাঁড়িয়ে ছিল শ্যামলালের কোনও ইশারা পাওয়ার জন্য। কথা ছিল, বৈশাখে কাজ শুরু হবে। আগামীকাল থেকেই বৈশাখ মাস পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু শ্যামলাল নিজের কাজে ব্যস্ত। সে এবার মরে যাওয়া গাব আর হিজলগাছটার ডালপালা কেটে টুকরো টুকরো করবে। তারপর লম্বালম্বি চিরে রান্নার চ্যালাকাঠ বানাবে। রাজেন্দ্রাণীর মতো একটু আগেও সগর্বে যে গাছদুটো দাঁড়িয়েছিল, তাদের চ্যালাকাঠে পরিণত হওয়া দেখতে যেতে আর ভাল লাগল না নীলার। যাকে রাজার বেশে দেখেছে, তাকে ফকিরবেশে দেখতে মন সাধ দেয় না।

    হয়তো সেইজন্যই ঈশ্বর নিঃস্ব রিক্ত বন্দি ইন্দ্রদাদাকে ওর কাছে আনলেন না।

    পিছু ফিরে এগোতে যেতেই চন্দ্রপ্রভা ডাকল।

    ‘কীরে মুখপুড়ি? চলে যাচ্ছিস যে বড়?’

    নীলা বিস্ময়ে পিছু ফিরতেই চন্দ্রপ্রভা চাপা গলায় বলল, ‘চোদ্দোশাক রেঁধেছিস বললি! আমায় খাওয়াবি না?’

    ২৯

    উল্লাস স্থির করে ফেলেছে, যখনই ওকে কোনও কঠিন পরিশ্রমের কাজ দেওয়া হবে, ও কিছুতেই করবে না।

    ‘নেহি করেগা? মতলব?’ ওয়ার্ডার থেকে পেটি অফিসার সবাই উল্লাসের কথা শুনে তাজ্জব।

    ‘নেহি করেগা মতলব নেহি করেগা।’ দৃঢ়ভাবে বলল উল্লাস, ‘তোমরা যা খেতে দাও, তাতে এত খাটা যায় না। করব না বলে দিলাম, এবার তোমরা যা পারো করে নাও।’

    মুনশি গোলাম চাবুক হাতে তেড়ে আসে। খোয়েদাদ খাঁ তাকে ইশারায় থামায়। হাজার হোক, উল্লাস রাজবন্দি। রাজবন্দিদের সাধারণ কয়েদিরাও সমীহ করে চলে। এরা তো নিজেদের স্বার্থের জন্য অপরাধ করেনি। করেছে দেশের জন্য। আর তার ওপর হোতিলালের ওই চিঠির পর ব্যারি সাহেবকে অনেকরকম জবাবদিহি করতে হয়েছে সদর দপ্তরে। খোয়েদাদ খাঁ আর ঝুঁকি নেয় না, সোজা গিয়ে ডেকে আনে ওভারসিয়ার।

    উল্লাস তাতেও নির্বিকার। চুপচাপ বসে সে ধ্যান করতে থাকে। সেজদাদা বলতেন, চোখ বন্ধ করে কূটস্থে মন রাখতে। সেই চেষ্টাই করে ও। আলিপুর জেলে থাকার সময় গীতা রাখার অনুমতি মিলেছিল, এখানে সেটুকুও নেই।

    চোখ বন্ধ করে ও বিড়বিড় করে,

    ‘দ্বাবিমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরসছাক্ষর এব চ।
    ক্ষরঃ সবর্বাণি ভূতানি কূটস্থোহক্ষর উচ্যতে।।’*

    [* গীতা – ১৫/১৬]

    .

    সেজদা বলতেন, ‘তোমরা বিপ্লব করতে এসেছ। গীতা পড়তেই হবে।’

    ‘কেন সেজদা?’

    ‘গীতার আসলে দুটো রূপ। একটা যুদ্ধের গীতা। অন্যটা দার্শনিক গীতা। কুরুক্ষেত্র অর্থাৎ মন নিরুদ্ধ হওয়ার আগে ইন্দ্রিয়দের এদিক ওদিক ছোটাছুটি। গীতায় কুরু পাণ্ডবদের যে শঙ্খনিনাদ, পাঞ্চজন্যং হৃষিকেশো দেবদত্তং ধনঞ্জয়ঃ, তার মানে ভৃঙ্গ, বেণু, বীণ, ঘণ্টা এই সমস্ত কিছুর শব্দ কেন্দ্রীভূত করো কূটস্থে।’

    .

    ওয়ার্ডারদের লাঠির ঠকাঠক শব্দ। পেটি অফিসারের ভারী বুটের আওয়াজ। গরাদের ধাতব ধ্বনি। উল্লাস সমস্ত শব্দকে গ্রহণ করতে থাকে কূটস্থে। অন্তরের শক্তি ততই যেন বাড়তে থাকে।

    একসময় সেই শক্তি এতটাই বেড়ে যায়, উল্লাস কাঁপে। ধীরে ধীরে ওর বন্ধ চোখের মাঝে তখন খেলা করতে থাকে নানারকমের আলোর জ্যোতি। নীল। সবুজ। গোলাপি। কমলা। কী রং নেই তাতে! আশ্চর্যের বিষয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব রং মিশে গিয়ে তৈরি হয় একটা পরিচিত মুখ।

    অনিন্দ্যসুন্দর সেই মুখ। লীলা।

    ওভারসিয়ার বারবার জিজ্ঞেস করেও কোনও সদুত্তর পেল না। ইঙ্গিত ভাল নয় দেখে এত্তেলা পাঠাল ডিস্ট্রিক্ট অফিসারের কাছে। ডিস্ট্রিক্ট অফিসারের এজলাস সেলুলার জেলে নয়, ভাইপার দ্বীপে। উল্লাসকে নিয়ে স্টিমার পাড়ি দিল ভাইপার দ্বীপের দিকে।

    ওদিকে সেলুলার জেলে থমথম করছে নিস্তব্ধতা। যতই গোপনীয়তা অবলম্বন করা হোক, কীভাবে যেন কয়েদিরা জেনে গেছে উল্লাসের এই প্রকাশ্য জেহাদের কথা। দেওয়ালে দেওয়ালে টরে টক্কায় খবর পৌঁছে যাচ্ছে কুঠুরি থেকে কুঠুরিতে। বারীন, হেমচন্দ্রের মতো সিনিয়র নেতারা চিন্তিত মুখে বসে থাকেন। উল্লাসকে কৌশলে ভাইপার আইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হল কেন? ওকে কি ওখানে গোপনে হত্যা করা হবে?

    উপেন বিভূতি অবিনাশরা ফুঁসে ওঠে। উল্লাসের গায়ে একটা দাগ লাগলে সেলুলার জেল জ্বলে যাবে। হোতিলাল, নন্দগোপালরাও গলা মেলায়। অনেক সহ্য করেছে সকলে। আর নয়। ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে।

    তবে ভাইপার দ্বীপের ডিস্ট্রিক্ট অফিসার লোকটা মন্দ নয়। তিনি উল্লাসকে বললেন, ‘তোমার যদি কাজ করতে ভাল না লাগে, কয়েকদিন রেস্ট নাও।’

    ‘রেস্ট নেব? কীভাবে?’

    ‘আমি লিখে দিচ্ছি। তুমি হাসপাতালের ডক্টরের কাছে যাও। কিছু একটা অসুখ বলবে, উনি তোমায় ভর্তি করে নেবেন।’

    ‘আমার কোনও অসুখ নেই। আমি মিথ্যে কথা কেন বলব?’

    ডিস্ট্রিক্ট অফিসার এবার কিছুটা বিরক্ত হলেন, ‘তবে তো তোমায় কাজ করতেই হবে। This is jail. এখানে তোমায় বসিয়ে বসিয়ে কেউ খাওয়াবে না।’

    ‘বসিয়ে বসিয়ে যেমন কেউ খাওয়াবে না, তেমনই আমার ভাগের দুধটুকুও নিশ্চয়ই কারুর খেয়ে নেওয়ার কথা নয়। আমাদের বারীনদা আর অবিনাশ রুগ্ন বলে তাদেরও রোজ দুধ বরাদ্দ আছে। এক ঢোঁকও পেটে যায় না ওদের।’ কেটে কেটে বলল উল্লাস, ‘ইন্দ্রভূষণ রায়। তার দু’হাতে ঘা। কিছুতেই সারছে না। খেতে অবধি পারছে না। আপনারা কী করেছেন তার জন্য?’

    ডিস্ট্রিক্ট অফিসার পাশে অধোবদনে দণ্ডায়মান কর্মীর সঙ্গে কিছুক্ষণ নীচু স্বরে কথা বলে সোজা হয়ে বসেন, ‘হাসপাতাল থেকে তো ট্রিটমেন্ট করা হয়েছে।’

    ‘মিথ্যে কথা। ওটা ট্রিটমেন্ট?’ চেঁচিয়ে উঠল উল্লাস, ‘ইন্দ্রর ঘা-টাকে শুধু ড্রেসিং করা হয়েছে। ঘা-টা তো ছড়িয়েই পড়ছে। কোনও ওষুধ দেওয়া হয়নি। তাকে কথায় কথায় টর্চার করা হচ্ছে। তোমরা নিজেদের সভ্য জাতি বলে বড়াই করো। এই তার নমুনা?’

    উল্লাস চোস্ত ইংরেজিতে আরও কীসব বলে যাচ্ছিল। তার মাথায় আগুন চড়ে গেছে। কতদিন? আর কতদিন এভাবে ইঁদুরের মতো বাঁচতে হবে ওদের? এর চেয়ে যে বীরের মতো ফাঁসিতে চড়ে শহিদ হওয়া অনেক বেশি সম্মানের ছিল।

    চেঁচাতে চেঁচাতে ধস্তাধস্তি লেগে গেল পাশের সিপাইদুটোর সঙ্গে। উল্লাসের শক্তপোক্ত লম্বা চওড়া চেহারা দিনের পর দিন অর্ধাহার আর কায়িক শ্রমে অনেক ভেঙে গেছে, তবু তার সঙ্গে এঁটে ওঠা দায়। পায়ে ডান্ডাবেড়ি নিয়েই সে তেড়েফুঁড়ে উঠছে।

    .

    ডিস্ট্রিক্ট অফিসার বেশিক্ষণ এই আগুনের গোলাকে ভাইপার দ্বীপে রাখার সাহস পেলেন না। সেলুলার জেলের মতো অত সৈন্যও এখানে নেই।। উল্লাসকে দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া হল, সে কোনওরকম শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করবে না।

    ওর লেখার ভিত্তিতে আরও তিনমাসের অতিরিক্ত সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে তাকে ভাইপার দ্বীপ থেকে ফের ফেরত নিয়ে আসা হল সেলুলার জেলে। খুলে দেওয়া হল পায়ের বেড়ি।

    হাতকড়া পরে উদাসচোখে কুঠুরির অন্ধকারে ভূতের মতো বসে থাকে উল্লাস। বসে থাকতে থাকতে তার কখনও এত রাগ হয়, মনে হয় এই জেলের সব কর্মীকে খুন করে ফেলে।

    পরক্ষণে কান্না পায়। খুব কান্না। মায়ের কথা মনে পড়ে। মায়ের কোলে শুতে ইচ্ছে হয়। আবেগ চেপে রাখার পাত্র ও নয়। কান্না পেলে হাঁটুদুটো বুকের কাছে চেপে ধরে ও হাউহাউ করে কাঁদে।

    .

    এবার সামনে আসেন স্বয়ং ব্যারি। চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘তুমি কি এখানে এসেও নেতা হয়েছ? নিজে তো কাজ করছ না, অন্যদেরও খ্যাপাচ্ছ। এসব চালাকি এখানে করলে ফল ভাল হবে না।’

    উল্লাস প্রাণপণে হাসি চাপার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। হো হো করে হেসে ওঠে।

    ব্যারির ফর্সা মুখ এত লাল হয়ে ওঠে, যেন মনে হয় ছলকে বেরোবে রক্ত।

    ‘হাসছ কেন তুমি? একবার কাজ না করে আর দ্যাখো, সারাদিন হাতকড়ায় থাকবে।’ হিস্টিরিয়া রুগির মতো চেঁচাতে থাকেন ব্যারি, ‘শু-শুধু হাতে নয়, পায়েও ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রেখে দেব সারাক্ষণ!’

    ‘তো?’ উল্লাসের স্বর থেকে ছিটকে বেরোচ্ছিল শ্লেষ।

    ‘তোমায় … তোমায় আমি চাবুক মারব। চাবুকের পর চাবুক!’ ব্যারি কেমন ঘোলাটে চোখে চিৎকার করছিলেন।

    ‘তো?’

    ব্যারি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলেন, ‘খেতে দেব না তোমায়। দিনের পর দিন। কলকাতার কোনও কাগজ টেরটিও পাবে না!’

    ‘তো?’ হা হা করে হাসল উল্লাস, ‘ধীরে সাহেব, ধীরে! উত্তেজনা কমাও। বলা যায় না, হার্ট অ্যাটাক ফ্যাটাক হয়ে গেলে এখানে চিকিৎসা পাবে নাকি? তখন তোমার লাশটা কোথায় ভাসবে তার ঠিক আছে?’

    ব্যারি দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ওকে এবার মারতে এলেন।

    দূর থেকে খোয়েদাদ খাঁ আর বাকিরা সভয়ে দেখছে। ওয়ার্ডার আসফান্দের চোখ বিস্ফারিত। ছুটতে ছুটতে সে জল নিয়ে আসে জেলার সাহেবের জন্য। জল খেয়ে ব্যারি হাঁপাতে হাঁপাতে লাল চোখে উল্লাসের দিকে তাকান।

    ওয়ার্ডার পেটি অফিসাররা নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়াচাওয়ি করে। ঝড় ওঠার আগে যেমন পিঁপড়েরা বুঝতে পারে, তেমন তারাও যেন বেশ বুঝতে পারছে, জেলার সাহেব নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। নিজের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নিয়ন্ত্রণ কমছে কয়েদিদের ওপরেও। মানুষ একটা সময় অবধি ভয় পায়। কিন্তু ভয় পেতে পেতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তখন বেপরোয়া অকুতোভয় হয়ে ওঠে। এদেরও তাই হয়েছে। ওপরে এখনো হম্বিতম্বি করলেও সেলুলার জেলের সব কর্তাব্যক্তিরাই যেন মনে মনে বেশ থমকেছেন।

    নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ব্যারি প্রস্থান করতে চান। কিন্তু উল্লাস একই লয়ে হেসে চলেছিল। হাসতে হাসতে সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ও সাহেব শুনে যাও। তুমি এখানে চাকরি করতে এসেছ। পেটের দায়ে। আর আমরা প্রাণের মায়া ত্যাগ করে দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। পেটের দায়ে নয়। স্বেচ্ছায়। পার্থক্যটা বুঝতে পারছ?’

    ব্যারি পিছু ফিরে উল্লাসের দিকে তাকান। সেই দৃষ্টিতে ঘৃণা আর ক্রোধের থেকেও বেশি পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে শঙ্কা।

    উল্লাস আবার চিৎকার, ‘ইন্দ্রর ঘা-র ট্রিটমেন্ট যদি না হয়, বারীনদাদাদের দুধ যদি প্রতিদিন না দেওয়া হয়, চাবুক কেন, মেরে ফেললেও তুমি আমায় কাজ করাতে পারবে না। আমার নাম উল্লাসকর দত্ত। নামটা মনে রেখো।’

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅন্তিম অভিযান – দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    Next Article জন্তু – দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    Related Articles

    দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    নির্বাচিত ৪২ – দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    August 28, 2025
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    দাশগুপ্ত ট্রাভেলস – দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    August 28, 2025
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    দিওতিমা – দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    August 28, 2025
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    ৭ শিহরণ – দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    August 28, 2025
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    অঘোরে ঘুমিয়ে শিব – দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    August 28, 2025
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    ঈশ্বর যখন বন্দি – দেবারতি মুখোপাধ্যায়

    August 28, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান

    May 18, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান

    May 18, 2026
    Our Picks

    মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান

    May 18, 2026

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    May 18, 2026

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রেমের গল্প – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    May 16, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }