কৃষ্ণসিন্ধুকী – ৩০
৩০
পৃথিবী ঘোরে। সময় এগোয়। গাছের পাতা ঝরে। আবার নতুন পাতা জন্মায়। কিন্তু দ্বীপান্তরের মানুষগুলোর জীবনযাত্রায় কোনও পরিবর্তন হয় না। প্রতিদিন তারা হাড়মাস কালি করে খাটে। গঞ্জনা শোনে। আধপেটা খায়। প্রতিদিন তারা একটু একটু করে মরে।
যে ছেলেটা সমাজবদলের স্বপ্ন দেখেছিল, নারকেলের ছোবড়া পেটাতে পেটাতে আর ওয়ার্ডারদের গালিগালাজ মারধর খেতে খেতে তার মেরুদণ্ড প্রতিদিন নুয়ে যায়। যে দুর্ধর্ষ গোলাওয়ালারা একদিন আলিপুর জেল থেকে রওনা দিয়েছিল আন্দামানের উদ্দেশ্যে, সেই বারীন, হেমচন্দ্র, উপেন, উল্লাসরা আজ সবাই-ই পরিণত হয়েছে জীবন্ত কঙ্কালে। দিনের পর দিন হাড়ভাঙা খাটনি আর স্বাদহীন খাবার ওদের প্রতিদিন একটু একটু করে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর দিকে।
এর মাঝে নতুন অনেকেই এসে জুটেছে সেলুলার জেলে। চুঁচুড়ার কিশোর ননীগোপাল মুখার্জি রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সামনে সিআইডি অফিসার ডেনহ্যাম সাহেবকে বোমা ছুঁড়ে ধরা পড়ল। বিচারে তাকে যখন আন্দামানে পাঠানো হল, তখন তার বয়স মোটে সতেরো বছর।
এভাবেই এসেছে ঢাকার ডাকসাইটে নেতা পুলিন বিহারী দাস। মহারাষ্ট্রের বিনায়ক সাভারকর। মজার ব্যাপার হল; সাভারকরের বাবা ও দাদা দু’জনেই বন্দি আছেন এই আন্দামানেরই জেলে, কিন্তু কথা বলা তো দূর, মুখোমুখিও হওয়া যাবে না।
ওদিকে ননীগোপাল একেবারে বাচ্চা ছেলে হলে কী হবে, তার হাবভাবে কয়েকদিনের মধ্যে জেলের সব ওয়ার্ডার সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। সে সটান বলে দিল, ‘মাগনায় এত কাজ করতে পারব না।’
শাস্তির পর শাস্তি চলতে লাগল। হোতিলাল, নন্দগোপাল, উল্লাসকরদের ওপর তো অত্যাচার চলছিলই, কিন্তু সবচেয়ে বেশি অত্যাচার হল ওই বাচ্চা ছেলেটার ওপর। সারাদিন তাকে দাঁড়া হাতকড়িতে ঝুলিয়ে রাখা হত। ফল হল উলটো। একগুঁয়ে ননীগোপাল তাতে নিজের জামাকাপড় কাচার কাজটাও বন্ধ করে দিল। ওয়ার্ডাররা তখন তাকে জোর করে চটের বস্তার কাপড় পরাল। সে সেটাকেও ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চিৎকার করল, ‘Naked we came from our mother’s womb and naked shall we return.’
মায়ের পেট থেকে আমরা উলঙ্গ হয়ে এসেছি, উলঙ্গই ফিরে যাব। কিছুতেই তাকে জামাকাপড় পরানো গেল না। জোর করে মাটিতে চেপে ধরে চটের বস্তা পরাতে গেলেও সে তা খুলে ফেলে দিল।
ওয়ার্ডারদের মধ্যে ত্রাস ছড়িয়ে পড়ল। ননীগোপাল গলায় ঝুলতে থাকা টিকিট ভেঙে ফেলে দিয়েছে। এমনকি জেলার বা চিফ কমিশনার সাহেব এলেও উঠে দাঁড়ায় না। সেলাম তো দূরের কথা। সে উলঙ্গ হয়ে সারাদিন বসে থাকে। স্নান করে না। খেতেও চায় না। কাজও করে না। তার মুখে একটাই কথা। তাকে রাজবন্দির সম্মান দিতে হবে। এই সব অপমানজনক কাজ থেকে দিতে হবে অব্যাহতি।
বেগতিক দেখে ব্যারি সাহেব ভয় দেখালেন বেত মারার। ফল হল উলটো। উল্লাসকর, সাভারকররা সাবধান করে দিল, ননীগোপালকে যদি এক ঘা-ও বেত মারা হয়, আমরা সবাই বিদ্রোহ করব। সব ভেঙে তছনছ হয়ে যাবে!
এতকিছু যখন ঘটছিল, নীলা লড়ছিল তার নিজের লড়াই। প্রতিদিন সকালে উঠে যন্ত্রের মতো ঘরের কাজকর্ম সারা, তারপর জাহাজঘাটে ছোটা। সারাদিন রস আইল্যান্ডে কাজ সেরে সন্ধ্যা নামার আগে বাড়ি ফেরা। এরই মাঝে খবর চালান। আর প্রতিদিনের মতো ব্যাকুল গলায় পুষ্পকে প্রশ্ন করা।
খোঁজ পেলি রে?’
‘না নীলাদিদি!’
তবে কি শেখরের কথাই সত্যি? ইন্দ্রদাদাকে পাঠিয়ে দিয়েছে মাদ্রাজের জেলে? কিন্তু কেমন যেন বিশ্বাস হয় না শেখরের কথা। শেখরের চোখদুটো কেমন যেন অচেনা লেগেছিল সেদিন!
গৌরীপ্রসন্ন ফেরেন গভীর রাত্রে। খাবার রাখা থাকে নিজেই খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়েন বাইরে। আবার বেরিয়ে যান ভোর হতে না হতেই।
নীলা কালোমুখে বিনিদ্র রাত কাটায়।
সব কাজ ভালভাবে মেটার পর তবে কী করবে তবে ও? মাদ্রাজ চলে যাবে? সেখানে গিয়ে খুঁজবে ইন্দ্রদাদাকে?
সেদিন সকালে যমুনার বাচ্চাটা তীব্রস্বরে কাঁদছিল। নীলা অনেকক্ষণ থেকেই শুনতে পাচ্ছিল, কিন্তু ভেবেছিল খিদে পেয়েছে বুঝি। কিন্তু, না। হেঁশেলের উনুন নিভিয়ে ছুটে এসে যমুনার ঘরে ঢুকে নীলা অবাক হয়ে গেল।
দোর ভেজানো। ভেতরে একখানা তক্তপোষ। তার ওপর শুয়ে বাচ্চাটা তারস্বরে কেঁদে যাচ্ছে। যমুনার চিহ্নমাত্র নেই। ওর স্বামী পরেশরামও নেই।
এত সকালে যমুনা কোথায় গেছে? প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে কোনও মেয়ে একলা যায় না। সার বেঁধে যায়। তেমন কিছু হলে নীলাকে যমুনা ডেকে নিত।
তবে?
সরস্বতী চোখ বন্ধ করে তারস্বরে কেঁদে যাচ্ছে। নীলা কোলে তুলে নিয়ে ঘুরল। গান করল। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। বাচ্চাটার চোখমুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। কান্নার তীব্রতা এতটাই বাড়ছে যে, নিঃশ্বাস আটকে যাবে যেন!
নীলার কী মনে হল, নিজের শুকনো স্তন অনাবৃত করে স্তনবৃন্ত ঠেসে ধরল বাচ্চাটার মুখে। বাচ্চাটা আঁকুপাঁকু করে চুপ হয়ে গেল।
কোথা থেকে কী হয়ে গেল, নীলার দু’চোখ ছাপিয়ে জল এসে গেল। সরস্বতী এতক্ষণ দুধের নেশায় কাঁদছিল। কিন্তু নীলার স্তনে তো দুধ নেই। বাচ্চাটা সাময়িক চুপ করেছে, একটু পরেই শুকনো বুক থেকে মুখ সরিয়ে চেঁচাতে শুরু করবে।
নীলা অসহায় চোখে চারদিক তাকাচ্ছিল, ঠিক সেইসময় ঘরে ঢুকে এল যমুনা। ফ্যাকাসে চোখ। ঘর্মাক্ত শরীর। আলুথালু বসন।
নীলা ক্রুদ্ধ বাঘিনীর মতো ফুঁসে উঠল, ‘কোথায় মরতে গিয়েচিলি মুখপুড়ি? মেয়েটা যে এলিয়ে গেল! কেমনধারা মা তুই?’
যমুনা কোনও উত্তর দিল না। মেয়েকে এসে বুকে তুলে নিল।
‘চুপ করে রইলি যে বড়? আমি আর একটু পরেই কাজে বেরিয়ে যেতাম। মেয়েটার যদি ততক্ষণে দম আটকে যেত? এর আগেও শুনেছি, ভোরবেলা বাচ্চাটা কাঁদে। পেটে ধরলেই মা হয় না, তোর শরীরে কি মায়া দয়া নেই?’ বলতে বলতে চুপ করে যায় নীলা।
যমুনা ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। চোখের কোণে জল। নীলা থমকায়। বাচ্চাটাও কিছুটা বুকের দুধ খেয়ে নিয়েই আবার ঘুমনোর তোড়জোড় শুরু করে।
‘কোথায় গেছিলি তুই?’
যমুনা ভিজে চোখেই হাসে। মাথা নাড়ে।
নীলা উঠে যমুনার দু’কাঁধ ধরে ঝাঁকায়, ‘বল? কোথায় গিয়েছিলি তুই?’
‘ফি হপ্তাতেই তো যেতে হয়।’
‘কোথায়?’
‘ঠিক নেই কোনও। যে ঘরে যেদিন ডাক আসে।’
নীলার চোখে অবিশ্বাস আর বিস্ময় খেলা করতে দেখে যমুনা ম্লান হাসল, ‘অমন করে তাকানো সোজা। পেটের জ্বালা বড় জ্বালা।’
‘কেন, পরেশরাম খরচা দেয় না?’
‘হুঁহ! কোনকালে দিত? ওর কাজ খালি আমায় পেটানো, আর সব টাকা উড়িয়ে দিয়ে মাতলামি করা।’
‘তুই আমায় বলিসনি কেন?’
‘বললে কী করতিস?’
‘শেখরদা’কে বলে তোকে রস আইল্যান্ডে ঠিক কোনও বাড়িতে কাজে ঢুকিয়ে দিতাম।’
যমুনা খিলখিল করে হেসে ফেলল।
নীলা তীক্ষ্ণচোখে তাকাল, ‘হাসছিস যে?’
যমুনা উত্তর দিল না। ঘরের এককোণে রাখা কুঁজো থেকে জল খেল ঢকঢক করে। তারপর বলল, ‘তুই যার কথা বললি, তার কাছ থেকেই আসচি। তাকে খুশি করলে তবে ওপরওয়ালাদের কাছে যাওয়ার ছাড়পত্র মেলে। ভাল কামাই হয়।’
‘কী!’
যমুনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘যা বলেচি, আমার সরস্বতীর মাথায় হাত রেকে আবার বলতে পারি।’
‘তুই আমার সঙ্গে আজই সন্ধেবেলা চল।’ নীলার নাকের পাটা ফুলছিল রাগে।
‘কোতায় যাব?’
‘চণ্ডীমণ্ডপে। সেকেনে তো শুনেচি বিচার হয়।’
‘কীসের বিচার? ঠগ বাছতে এই গাঁখানাই দেকবি উজার হয়ে যাবে। এই গাঁয়ের ক’টা বউ শুধু সোয়ামির সেবা করে? সবাইকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বেরোতে হয়। চারদিকে উপোসী বাঘ, আর মাঝখানে আমরা ক’টা হরিণ।’
‘মরদরা বাঘ আর আমরা হরিণ? নিজের অপকম্মের সাফাই দিচ্চিস? কেন, আমরা কি ওদের খাবার?’
‘তা নয়তো কী?’ যমুনা এবার চিৎকার করে উঠল, ‘তোকে আমাকে, চাঁদুমাসিকে, আরও এই গাঁয়ের যত মেয়েমানুষ, এই দ্বীপের যত মেয়েমানুষ কয়েদি, তাদের কেন একেনে আনা হয়েচে, তুই জানিস না?’
‘কেন?’
‘সব জেনেও ন্যাকা সাজিস কেন? আনা হয়েচে সংসার করতে।’
নীলা দর্পের সঙ্গে বলল, ‘হ্যাঁ, সংসার করতে। বেশ্যাগিরি করতে নয়।’
‘ওরে আমার সতীসাবিত্রী রে!’ যমুনা যাত্রাপালার মতো অট্টহাস্য করে উঠল, ‘ওই সংসার কথাটাই সবচেয়ে বড় রঙ্গ। সেদিন গৌরীজ্যাঠার গল্পটা শুনিসনি?’
‘কোন গল্প?’
‘বহু আগে সিন্ধুকীরা ঘুরে বেড়াত গাঁয়ে গাঁয়ে। মেয়েদের তুলে নিয়ে যেত।’
‘জানি।’
‘তবে? এই কালাপানিতে আমাদেরও তো লুঠ করে এনেছে। আমাদের আবার পাপপুণ্য কী?’
‘চুপ কর!’ নীলা থরথর করে কাঁপছিল। ওর গ্রামের দাদা, ওদের যুদ্ধের সহযোদ্ধা শেখরদা… সেও এমন?
শেখরদা’ও ওই ফটিক সুবীরের মতো?
যমুনা ওর দিকে একটা চিরকুট বাড়িয়ে দেয়।
‘শেখর তোকে দিতে বলেচে। ভেবেচিলাম, পরে দেব, তা তুই যখন সব জেনেই গেলি…!’
নীলা ঝাপসা চোখে কাগজটা নেয়।
‘সামনের রবিবার মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েচে। তত্ত্বতালাশ শুরু করে দে।’
৩১
দিনকাল যে খুব দ্রুত বদলাচ্ছে তা দেশ থেকে এতদূরে বসেও সেলুলার জেলের কর্তারা বেশ বুঝতে পারছিল। বড়দিনের কয়েকদিন আগে ভারতবর্ষের রাজধানী কলকাতা থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে উত্তরের দিল্লিতে। প্রায় দেড়শো বছর আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ‘কলিকাতা’য় এসেছিল। হুগলি নদীর তীরে কলিকাতা গ্রামকেই তারা মূলত বেছে নিয়েছিল ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে।
বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডে পরিবর্তিত হওয়ার পরেও ওয়ারেন হেস্টিংস শাসনকাজ চালিয়েছেন কলকাতাকে কেন্দ্র করেই। মহাবিদ্রোহের পর যখন কোম্পানি বাহাদুরের হাত থেকে ক্ষমতা গেছে ব্রিটিশ রাজপরিবারের হাতে, তখনও কেন্দ্রে থেকেছে কলকাতা। উন্নয়নে, মানসিকতায়, সংস্কৃতিতে, বিপ্লবে সবেতেই কলকাতা শীর্ষে। বাঙালি সর্বাগ্রে।
কিন্তু বঙ্গভঙ্গের পর যে শিরশিরে ভয় ইংরেজ কর্তাদের মেরুদণ্ডে হিম ধরাল, তারপর গোপনে ভাবনাচিন্তা শুরু হল কলকাতা থেকে রাজধানী সরানোর। নিজেদের মধ্যে বেশ কিছু চিঠিচালাচালির পর প্রথম প্রস্তাবের চিঠিটি লন্ডনে সেক্রেটারি অফ স্টেটকে পাঠানো হয়েছিল মাসছয়েক আগে। চিঠিতে লেখা হয়েছিল, ভারতের রাজধানীর জন্য দেশের কেন্দ্রে থাকা কোনও শহরই ভাল। কলকাতা থেকে শাসনকার্য চালাতে খুব অসুবিধা হচ্ছে।
আসল কারণ যে অন্য, তা সকলেই বুঝতে পারছিল। এর আগেও এই একই কারণে দুই বাংলাকে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গ ও হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু তাতে বিপ্লবীদের যে অভ্যুত্থান হয়েছে, তাতে উত্তাল হয়েছে কলকাতা। সেই পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে রাজধানী পরিবর্তনের প্রস্তাব যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝেই সিলমোহর দিতে একটুও দেরি করেননি রাজা পঞ্চম জর্জ।
সরকারি সব অফিস কলকাতা থেকে দিল্লি রওনা দিল, আন্দামানেও রাজবন্দিদের প্রতি স্বৈরাচারী মনোভাব পালটানোর কড়া ইঙ্গিত এল। এমনিতেই সেলুলার জেলে রাজবন্দিরা যে ধর্মঘট শুরু করেছে, তার খবরের আঁচ গিয়ে টুকটাক পড়েছে দেশে। উল্লাসকর, হোতিলাল দিনের পর দিন কঞ্জি খেয়ে ধর্মঘট করছে।
কেউ যদি মারা যায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
জেলের বড়কর্তারা সমঝোতায় এলেন। যাদের খাতায় কলমে দুধ বরাদ্দ আছে, দেওয়া হবে ঠিকঠাক। ইন্দুভূষণেরও চিকিৎসা করা হবে।
‘ঠিক তো?’ উল্লাসের প্রশ্নে মিষ্টি হেসে ঘাড় নাড়েন কর্তারা।
কয়েকজন দাপুটে রাজবন্দিকে বেছে নিয়েছেন তাঁরা। বারীন ঘোষ। হেমচন্দ্র। উল্লাসকর। তাদের জেলখানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হল। নির্দেশ এল, বাকি মেয়াদ ওদের শেষ করতে হবে আন্দামানেই, মুক্তি আকাশের নীচে প্রবল পরিশ্রম করে।
হেমচন্দ্র প্রশ্ন করেন, ‘আর আমাদের বাকি রাজবন্দিরা?’
‘তাদেরও ছাড়া হবে খেপে খেপে। অত কাজ তো বাইরে নেই। একটু বোঝার চেষ্টা করুন প্লিজ!’
বারীন, উল্লাসরা নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে কর্তাদের চুক্তি মেনে নিল। এও পরাধীনতা, কিন্তু এতদিন পর খোলা বাতাসে শ্বাস নিতে পারবে, ভেবেই ওরা আনন্দে পাগল হয়ে গেল।
বারীন উত্তেজিত চোখে বলল, ‘আমাদের বোমা ফেলার প্ল্যানটা আরও সহজ হয়ে গেল। আমরা বাইরেই থাকব। বোমা পড়লে সব যখন উড়ে যাবে, ওদের বের করে নিয়ে আসব।’
উল্লাসের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার পর থেকে ব্যারি সাহেব আর ওদের মুখোমুখি হননি। হ্যারি কোলফিল্ড সব দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মুখে হাসি ঝুলিয়ে রেখে।
উপেন, হেমচন্দ্র, বারীনদের মতো কয়েকজনকে পাঠিয়ে দেওয়া হল পোর্ট ব্লেয়ারের পূর্ব দিকে। কেউ রাস্তা বানাবে। কেউ জঙ্গল সাফ করবে। কেউ কাঠ কাটবে।
অন্যদিকে উল্লাসকরকে পাঠানো হল পোর্ট ব্লেয়ারের পশ্চিম দিকে, পোর্ট মোয়াটে। কাছেই ডান্ডাস পয়েন্টে ইটভাটায় কাজ করতে হবে ওকে। এখানে বিশাল ইটভাটা। বছরে তিন-চারমাস বন্দিদের পাঠিয়ে আন্দামানের সারাবছর ইট বানিয়ে নেওয়া হয়।
একদিন উল্লাস ইটভাটায় কাদার গোলা বানাচ্ছে, হঠাৎ চোখ পড়ল দূরের অরণ্যে। একটা বড় গাছ। সেই গাছের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে লীলা। ওকে ইশারা করে ডাকছে।
উত্তেজনায় হৃৎপিণ্ড ধক করে লাফিয়ে উঠল। লীলা সেই কলকাতা থেকে এই পোর্ট মোয়াটে এল কী করে? সত্যিই এসেছে? উল্লাস চোখ কচলায়। না। কোনও সন্দেহ নেই। ওই তো লীলা, হলুদ রঙের একটা শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হলুদ শাড়িতে খয়েরি কাজ। দূর থেকে ওকে দেখে মনে হচ্ছে সূর্যমুখী ফুল।
উল্লাস চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে সন্তর্পণে এগিয়ে গেল। কাছাকাছি হতেই লীলা ছুটে এল। উল্লাসের এত কাছে এসে দাঁড়াল যে, ওর বুকে নিঃশ্বাসের ওঠাপড়া দেখতে পাচ্ছিল উল্লাস। ও বলল, ‘তুমি এখানে এলে কী ভাবে?’
‘একা আসিনি। আমি আর হেমাঙ্গিনী খুড়িমা এসেছি তোমায় দেখতে।’ লীলা চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছ?’
‘ভাল।’
‘কত ভাল তা তো বুঝতেই পারছি। চেহারার কী অবস্থা হয়েছে।’
উল্লাস বলল, ‘তুমি এখানে চলে এলে? যদি কোনও বিপদ হয়…!’
লীলা হাসল। উল্লাসের মনে হল, হাজারখানা শুক্তির পেট চিরে যেন বেরিয়ে এল ঝকঝকে মুক্তো!
লীলা হাসতে হাসতেই বলল, ‘বিপদ হলে তুমি তো আছ।’
উল্লাস জড়িয়ে ধরল লীলাকে। সামান্য সংকোচ। তারপর সব দ্বিধা ঝেরে ফেলে ঠোঁটে ডুবিয়ে দিল বহুদিনের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট।
কী শান্তি চারপাশে। আকাশ দিয়ে মেঘ উড়ে যাচ্ছে। গাছের পাতা খসে পড়ছে টুপটাপ করে। কত জন্ম যেন পেরিয়ে যাচ্ছে।
‘ও দাদা! ও দাদা!’
উল্লাস চমকে উঠে শব্দের উৎস বরাবর তাকাতেই স্বাবলম্বন গ্রামের সেই কাঠুরে ছেলেটাকে দেখতে পেল। লীলা দ্রুত নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। মিষ্টি হেসে বলল, ‘আসি?’
উল্লাস হাসল, ‘তুমি তো এমন ছিলে না লীলা!’
‘কেমন ছিলাম না?’
‘এই … বিপদ হলে তুমি তো আছ, লজ্জা লজ্জা মুখে হাসি … এইসব … এইসব মেয়েলিপনা।’ উল্লাস শিশুর মতো ঘাড় দোলাল, ‘তুমি তো ছিলে আমার মতো। বেপরোয়া। একাই একশো ধরনের। তুমি ছিলে আমার সবচেয়ে সাহসী সাথী। বরং আমার মতো অযথা মাথা গরম না করে ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দিতে পারতে।’
‘এখনও পারি। কিন্তু তোমার কাছে এলেও কি সেসব পারতে হবে? তখন কি আমার একটু আদুরে হতে ইচ্ছে করে না?’ লীলা অভিমানী মুখে তাকাল।
.
‘ও দাদা -আ-আ!’
আহ, জ্বালাতন! উল্লাস বিরক্তমুখে কী বলতে যাবে, তার আগেই লীলা ফিসফিস করল, ‘আসি!’
‘দাঁড়াও দাঁড়াও। এখানে কোথায় থাকবে তোমরা?’
লীলা যেন শুনতেই পেল না। ত্রস্তা হরিণীর মতো ছুটে পালাল দূরে। তারপর বনের গাছগুলোর মধ্যে যেন হারিয়ে গেল।
শ্যামলাল আরও এগিয়ে এসে ডাকল, ‘ও দাদা! একা একা বিড়বিড় করচেন কেন?’
উল্লাস চটে গিয়ে বলল, ‘একা কোথায়? দেখলে না, এতক্ষণ ও ছিল?’
‘কে ছিল?’
‘কেউ না।’ বিরক্তমুখে উল্লাস বলল, ‘বলো।’
শ্যামলাল কাঁধ থেকে কুড়ালটা নামিয়ে বলল, ‘এই রোববার দিনক্ষণ ঠিক হয়েছে।’
‘রবিবার? জেলখানায় লোকজন কম থাকে বলে?’
‘শুধু তাই নয়। ওইদিন মারে সাহেবের বে’ আচে।’
‘মারের বিয়ে!’ উল্লাস হাঁ হয়ে গেল, ‘তার তো কবরে ঘুমনোর সময় হল, বিয়ে কী বলছ?’
‘আজ্ঞে, তাহলে বোধ হয় তার ছেলের বিয়ে। না না বোধ হয়, বোনের। কে জানে, মোট কথা, একটা সাহেব সেদিন বে করবেন।’
‘বুঝেছি। ভাল লোককেই দূত বানিয়েছে দেখছি। এ দূত শুধু দূত নয়, একেবারে মেঘদূত। সংতপ্তানাং ত্বমসি শরণং তৎ পয়োদ প্রিয়ায়াঃ।’*
[* হে মেঘ! তুমি শোকে আচ্ছন্ন প্রাণীদের আশ্রয় হও। শ্লোক ৭, মেঘদূতম কালিদাস।]
‘আজ্ঞে?’ শ্যামলাল কিছু না বুঝে চোখ বড় বড় করল।
‘কিছু না। যক্ষ মেঘকে অনুরোধ করেছিলেন প্রিয়ার খবর এনে দিতে, আর তুমি এসে সব ভণ্ডুল করলে।’
‘আজ্ঞে আমি বোকা বন্দি আছি, হুজৌর!’
‘সে তো দেখতেই পাচ্ছি। যাকগে, ছাড়ো এসব কথা। তুমি তোমার কর্তাদের বলে দিও, আমরা সোজা জাহাজে চলে যাব। আমাদের বাকি যে ক’জন জেলে রয়েছে, তাদের সবাইকে ওরা যেন নিয়ে আসে।’
শ্যামলাল কিছুক্ষণ বিড়বিড় করল বাক্যটা, তারপর হাঁটা লাগাল।
উল্লাস কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। যদি লীলা আবার ফিরে আসে।
কিন্তু না। লীলা আর এল না।
হেমাঙ্গিনী লীলাকে নিয়ে এখানে এসেছেন? বিপিনকাকা জানেন তো?
এই নির্জন দ্বীপে কোথায় থাকবে ওরা?
৩২
যত দিন যাচ্ছে, ইন্দুভূষণের পৃথিবীটা ততই কঠিন হয়ে উঠছে। বিষাক্ত গাছের আঠা থেকে যে ঘা তার দু’হাতে ছড়িয়েছিল, তা সারেনি একটুও। বরং আরও বেড়ে গেছে। ও পেটি অফিসারকে বারবার বলেছিল, চাই না বাইরের কাজ। জেলের ভেতরের কাজই দেওয়া হোক ওকে। তাতে যদি এই ঘা একটু সারে।
কিন্তু কে শোনে কার কথা। এক সপ্তাহ জেলের ভেতর কাজ করতে না করতেই আবার নতুন অর্ডার এল। জঙ্গলেই কাজ করতে যেতে হবে।
যে কয়েকজন বাঘা বাঘা রাজবন্দি ছিল, তাদের কৌশলে বাইরে পাঠিয়ে ঠান্ডা করে দিয়েছে প্রশাসন।
ভেতরে চলছে সেই আগের মতো অমানুষিক অত্যাচার।
ইন্দুভূষণ সজল চোখে দেওয়াল মারফত টরেটক্কা পাঠায়, ‘বারীনদাদাকে খবর পাঠা মকবুল! আমি ভাত অবধি খেতে পারছি না।’
‘আর দু-তিনদিন অপেক্ষা করো দাদা! দুটো কি তিনটে দিন। ওরা এসে পড়বে এর মধ্যেই।’ মকবুল উত্তর দেয়।
কারা এসে পড়বে? তারা এসে পড়লেই বা কী হবে? ইন্দুর ছটফটানি যায় না। সে চেষ্টা করে যোগ অভ্যাস করতে। ধ্যান করতে। কিন্তু ক্ষুধার্ত পেট আর হাতের অসহ্য জ্বলুনি তাকে স্থির থাকতে দেয় না। হাত থেকে যে জ্বালাপোড়া ভাব শুরু হয়েছিল, তা যেন ছড়িয়ে পড়েছে শরীরের প্রতিটি কোষে।
ও চিৎকার করে নিজের চুল ছিঁড়তে থাকে আপনমনে, ‘আমি পারিনি সেজদা! পারিনি নিজেকে যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত করে তুলতে। আমি… আমি… I’m an utter failure !’
নির্জন অরণ্যে গাছের তলায় বসে ইন্দুভূষণের চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়তে থাকে। প্রহরীরা কেউ ভ্রুক্ষেপ করে না। উল্লাসদাদা যদি এখানে থাকত, নিশ্চয়ই ইন্দুর হয়ে গলা ফাটাত। উল্লাসদাদা কারুর পরোয়া করে না। কিন্তু শেখরকে দিয়ে তো উল্লাসদাদার কাছে ও খবর পাঠিয়েছে। তবু উল্লাসদাদা কেন নীরব?
আচ্ছা হেমদাদাই কি ঠিক? নেতারা আগে নিজেদের সুবিধা বোঝেন? কিন্তু তাই যদি হবে, হেমদাদা নিজেই বা চলে গেলেন কেন? কেন বললেন না, মুক্ত কয়েদি করতে হলে সবাইকে করো! আসলে সবাই কি আগে নিজেরটাই দেখে?
শ্রীফলতলা গ্রামের বন্ধু শেখরের সঙ্গে ওর হঠাৎ করেই একদিন দেখা হয়েছিল। ইন্দু গিয়েছিল জঙ্গলে গাছের আঠা ছাড়াতে, এমন সময় দূর থেকে আসতে থাকা একটা ছেলেকে দেখে ও অবাক হয়ে গিয়েছিল। হাঁটার ধরনটা যেন কেমন পরিচিত লেগেছিল। সামনের ঢেউ খেলানো চুলটাও বড় চেনা চেনা মনে হচ্ছিল। কাছাকাছি হতেই লাফিয়ে উঠেছিল ইন্দুভূষণ, ‘শেখর, তুই?’
কিন্তু শেখর যেন ওকে দেখে অবাক হয়নি। শুধু হেসেছিল, ‘কেমন আছিস?’
‘আমি… কেমন আছি… মানে…!’ আবেগে ইন্দুভূষণ কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। ছোটবেলায় একসঙ্গে কত খেলেছে দু’জনে, পদ্মদিঘির পাশে বসে কত স্বপ্ন দেখেছে। অন্যরকম কিছু করার স্বপ্ন। দেশ বদলানোর স্বপ্ন। দু’জনে দুটো ভিন্ন মেরুর হলেও নিজেদের বন্ধুত্বে তা কোনওদিনও অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। উদীয়মান ধনী ভবানী বাঁড়াজ্জের পুত্র হয়েও শেখর আগলেছে বনেদি কিন্তু ক্ষয়িষ্ণু রায়চৌধুরী বাড়ির ইন্দ্রকে। ভবানী বাঁড়াজ্জে যখন ছেলেকে রাতারাতি কলকাতা পাঠিয়ে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করলেন, তখনও শেখর ইন্দ্রকে বলেছিল, ‘গাঁয়ে থেকে থেকে আমি নাকি কুয়োর ব্যাঙ হয়ে যাচ্ছি, তাই বাবা আমায় কলকাতায় পাঠাচ্ছেন শহুরে আদবকায়দা শিখে আসতে। তাতে নাকি ব্যবসা চালাতে আরও সুবিধা হবে। কিন্তু তুই তো জানিস, আমার মনের ইচ্ছা কী।’
‘জানি।’ আস্তে করে বলেছিল ইন্দ্র, ‘আমিও তো যাব কলকাতায়। কিন্তু মায়ের অসুখ। কিছুদিন সময় লাগবে যেতে।’
‘জানি তো। তুই সব সামলে নিয়ে আয়। আমি তোর সব ব্যবস্থা করে রাখব।’
কথা তো সবাই দেয়। কিন্তু সেই কথা রাখে ক’জন? তাও আবার চঞ্চল বয়সের সদ্যযুবকের প্রতিশ্রুতি। শেখরও কথা রাখেনি। কলকাতায় পৌঁছেই সে ভুলে গেছিল গ্রামের বন্ধুকে।
তবু ইন্দ্রভূষণ রাগ করেনি। কলকাতা আসতে তার দেরি হয়ে গিয়েছিল আরও বছরদুয়েক। তবু তার মনে আশা ছিল, বন্ধুকে সে ঠিক খুঁজে বের করবে।
কিন্তু পায়নি। শ্রীফলতলা গ্রামের প্রতিপত্তিশালী ব্যবসায়ী ভবানী বাঁড়াজ্জের একমাত্র পুত্র যেন কলকাতায় গিয়ে উবে গিয়েছিল।
এতদিন পর শেখরের সঙ্গে দেখা। তাও কিনা আন্দামানে? ইন্দুভূষণ তো জানতই না, শেখর আন্দামানে থাকে।
ওর বিস্মিত চোখ দেখে শেখর হেসেছিল, ‘জানি তুই এসেছিস। উল্লাসদাদাদের সঙ্গে দেখাও হয়েছে। তোর সঙ্গে হয়নি। আমি তোর অনেক আগেই এখানে এসেছিলাম। ফ্রি টিকিট পেয়েছি বছরদেড়েক আগে।’
ইন্দুভূষণ উচ্ছাসে শেখরের হাত দুটো জড়িয়ে ধরতে গিয়েছিল। কিন্তু তার আগেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়েছিল শেখরের পায়ের সামনে। পায়ে ডান্ডাবেড়ি বেঁধে জঙ্গলে পাঠানো হয়। কাজ হয়ে গেলে প্রহরীরা এসে ধরে ধরে নিয়ে যায়। ছোটবেলার বন্ধুকে দেখে ইন্দুভূষণ পায়ের শিকলের কথা বিস্মৃত হয়েছিল। জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিল শেখরকে।
অদ্ভুত ব্যাপার, বন্ধুকে পড়ে যেতে দেখেও শেখর তোলেনি। বরং কেমন যেন অচেনা দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল তার দিকে। শেখরের চোখদুটো কেমন যেন সার্চলাইটে মতো জ্বলছিল। যেন সে অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি দিয়ে পড়ে ফেলতে চাইছে ইন্দুভূষণের মন।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শেখর ফিসফিস করেছিল, ‘এখানে এসে তোর বাইরের আর কারুর সঙ্গে দেখা হয়েছে?’
ইন্দুভূষণ শেখরের নির্লিপ্তিতে অবাক হচ্ছিল। কিছুটা ব্যথিতকণ্ঠে বলেছিল, ‘নাহ। কার সঙ্গে আর হবে?’
‘হুম।’ শেখর চারপাশে আলগোছে চোখ বুলিয়ে নিয়ে একটা অদ্ভুত কথা বলেছিল, ‘এখানকার মেয়েরা সুবিধের নয়। কেউ যদি কোনও মেয়ের কথা বলে, হামলে পড়বি না।’
ইন্দুভূষণ কিছুই বুঝতে পারছিল না। এতদিন পর দেখা, শেখর অন্য কোনও কথা না বলে এসব কী প্রসঙ্গ তুলছে?
ওকে চুপ করে থাকতে দেখে শেখর বোঝানোর ভঙ্গিতে বলেছিল, ‘এখানে গাছেরও কান আছে। কোথা কে দেখে ফেলবে। আমি চলি। মন খারাপ করিস না। তোরা খুব শীগগির মুক্তি পাবি। আমি নিজে তোকে জাহাজে তুলে দেব।’
ইন্দুভূষণ কাতর গলায় বলেছিল, ‘আমার দু’হাত ভর্তি ঘা। কোনও ট্রিটমেন্টও করাচ্ছে না, ওই হাত দিয়েই কাজ করতে হচ্ছে। উল্লাসদাদাদের কানে কথাটা একটু তুলিস ভাই।’
শেখর আলতো ঘাড় নেড়ে চলে গিয়েছিল। ইন্দুভূষণ কী বলবে বুঝতে পারেনি সেদিন।
আন্দামান এক আজব জায়গা, এখানে সবাই কেমন পালটে যায়। আচ্ছা, ও নিজেও কি পালটে গেছে?
ইন্দুভূষণ আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে হাতের দিকে তাকায়। পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। ঘাগুলো লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। সেখান থেকে রস গড়াচ্ছে টপটপ করে। সেই রস যেখানে লাগছে, সেখানে কয়েকঘণ্টার মধ্যে জন্ম নিচ্ছে নতুন ঘা।
বৈশাখের প্যাচপেচে গরম। উপকূলবর্তী অঞ্চল বলে সবসময় যেন একটা গরম লু বইছে। আর ততই ঘাগুলো চুলকোচ্ছে। কুঠার দিয়ে দুটো হাত কবজি থেকে কেটে ফেললে কি এই অসহনীয় কষ্ট থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না?
ইন্দুভূষণের ক্রমাগত আর্তিতে একরকম বিরক্ত হয়েই টিন্ডেল ডেকে আনে গোলাম রসুলকে। সে এসে শিউরে ওঠে, ‘তওবা তওবা! এ কী অবস্থা?’
ইন্দুভূষণ বলে, ‘গোলামভাই! আমি ভাত খেতে পারছি না। কাজ করব কী করে?’
গোলাম রসুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পাশে দণ্ডায়মান টিন্ডেলকে নীচুস্বরে কী যেন নির্দেশ দিয়ে চলে গেল।
টিন্ডেল এসে বলল, ‘তুমহারা ঘানিমে ডিউটি হ্যায়। চলো!’
ঘানিতে? ইন্দুভূষণ আঁতকে উঠল, ‘সে যে ভয়ংকর শ্রমের কাজ গো! আমি এই ঘা ভর্তি হাত নিয়ে তেল পিষব কেমন করে? ঘাগুলো তো ঘষা খাবে।’
কেউ কথা শুনল না।
.
বিকেলবেলা নারকেল পিষছিল ইন্দুভূষণ। হাতের ঘা’গুলোয় এতটাই জ্বালা করছে, যেন মনে হচ্ছে শরীরের সর্বত্র কেউ সুচ ফোটাচ্ছে। মাথা দপদপ করছে। বিষের যন্ত্রণা যেন ছড়িয়ে যাচ্ছে গোটা দেহে। তবু কাজ থামানো যাবে না। থামালেই চাবুকের বাড়ি এসে পড়বে।
পিষতে পিষতে একসময় ইন্দুভূষণ ঘানিতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। ‘ধপ’ করে একটা শব্দ হতেই ছুটে আসে টিন্ডেল।
ততক্ষণে ইন্দুভূষণের ঘাগুলো পচতে শুরু করেছে।
ঘানির চারপাশে ভনভন করছে মাছি। মাছিগুলো ঘা-য় একবার করে বসছে, পরক্ষণেই গিয়ে উড়ে বসছে সদ্য পিষে বের করা তেলে।
ইন্দুভূষণ অচেতন পড়ে থাকে মাটিতে।
.
৩৩
আজ রাত্রেই বোমা ফেলা হবে জেলখানায়। সকলে মিলে জমায়েত হয়েছে শ্যামাপ্রসাদ চক্রবর্তীর বাড়িতে। সেখানে বক্তৃতার ঢঙে পুরো পরিকল্পনাটা আরও একবার ছকে দিচ্ছিলেন গৌরীপ্রসন্ন।
তাঁর সামনে গোল হয়ে বসে শুনছিল শেখর, শ্যামলাল, নীলা, পুষ্পরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই এই বৈঠকের সিদ্ধান্ত পৌঁছে যাবে সদ্য বেরনো রাজবন্দিদের কাছে। তাঁদের স্বাবলম্বন গ্রামের ধারেকাছে আসা মানা, কিন্তু খবর চলে যায় ঠিকই।
অত্যন্ত গোপন এই বৈঠক চলছে শ্যামাপ্রসাদের শোয়ার ঘরে। অকৃতদার শ্যামাপ্রসাদ সবার শ্রদ্ধার ব্যক্তি। তাঁর বাড়িতে বিকেলবেলায় যে এমন কর্মকাণ্ড চলছে, তা স্বাবলম্বন গ্রামের কেউ টের পাবে না। বাইরের উঠোনে বসে প্রহরায় আছেন শ্যামাপ্রসাদ নিজে। কেউ এলে তিনি সামাল দেবেন।
গৌরীপ্রসন্ন বলে চলেছিলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য কিন্তু গোটা জেল নয়। সেলুলার জেলে বন্দি থাকা খুনি ধর্ষকদের বের করে কোনও লাভ নেই। আমাদের লক্ষ্য হল রাজবন্দিদের বের করে আনা। পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড বরাবর যে দেড় মানুষ উঁচু পাঁচিল, তার গা ঘেঁষে পরপর মাইন বসানো আছে। কাল অবধি সেই কাজ আমরা চালিয়ে গেছি। আজ রাতের অন্ধকারে তোমাদের শুধু সেগুলোকে স্লো ফিউজে আগুন ধরাতে হবে।’
শেখর বলল, ‘নীলা, পুষ্পদের কি বোমা দিয়ে দেব?’
‘একটা করে। কীরে পুষ্প, তুই তো শুধু বোমা ছুঁড়তেই শিখিসনি, শ্যামাপ্রসাদ বলছিল, পিকরিক অ্যাসিড গলিয়ে খোলের মধ্যে ঢেলে বোমা বানাতে শিখে গেছিস বেশ।’ গৌরীপ্রসন্ন পুষ্পর দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ‘নীলা থাকবে জাহাজঘাটায়। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই দীনবাঈ চলে আসবে জুঁইবালা আর শবনমকে নিয়ে। তারপর বাকি মেয়েরা একসঙ্গে সেজেগুজে বেরিয়ে যাবি। এমনভাবে বেরোবি যেন মনে হয়, সমুদ্রে সাঁঝের বাতাস খেতে যাচ্ছিস। পুষ্প, বিস্ফোরণের পর রাজবন্দিদের পথ দেখিয়ে জাহাজে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তোদের ওপরেই থাকবে। অবশ্য দীনবাঈ নেতৃত্ব দেবে। সব গলিঘুঁজি ওর নখদর্পণে।’
দীনবাঈ মানে? মহিলা জেলের জমাদার দীনবাঈ জোশী? নীলা বিস্মিতমুখে পুষ্পর দিকে তাকাল, ‘দীনবাঈ আমাদের দলে?’
পুষ্প ফিসফিস করল, ‘তুমি দীনবাঈচাচির শক্ত খোলসটাই দেকেচ গো নীলাদিদি! ভেতরের নরম শাঁসটাকে দ্যাকোনি। আমার মা মরার পর চাচি আমায় কোলেপিঠে করে মানুষ করেচে। জানো, চাচি কাকে ভালবেসেচিল?’
‘কাকে?’ নীলা সবিস্ময়ে তাকায়।
‘শের আলিকে। চেনো তাকে?’
‘না তো!’
‘আন্দামানে প্রথমদিককার বন্দি হয়ে এসেছিল ওরা। তখন জেলখানা হয়নি। ওই যে জাহাজঘাটার রহমানচাচা আছে না, তার দোস্ত ছিল। দীনবাঈচাচি আর শের আলির মধ্যে খুব ভাবভালবাসা ছিল। আর চাচিকে কে ভালবেসেছিল, জানো?’
‘কে?’ নীলার সব গুলিয়ে যাচ্ছিল।
‘রহমান চাচা। কোনওদিনও মুখ ফুটে বলেনি। আজও বলে না। তার জিগরি দোস্ত ছিল যে শের আলি!’
‘তারপর?’
‘বড়লাট মেয়ো এলেন আন্দামান দেখতে। শের আলি সবার সামনে তাঁকে ছুরি মেরে খুন করেছিল, জানো!’
‘একা?’
‘একদম একা। শের আলি যে। একাই বাঘ। তবে আমার মনে হয়, রহমান চাচাও মদত করেছিল।’ পুষ্প চোখ বন্ধ করল, ‘তার যেদিন ফাঁসি হয়, তারপরের দিনই চাচি মহিলা ওয়ার্ডার হয়ে যোগ দেয়। আমার মা তখনও বেঁচে। মা’কে চাচি কী বলেছিল জানো?’
‘কী?’
‘বলেছিল, শের আলি ছিল বিপ্লবী। ক্রান্তিকারী। যারা ওকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে, তাদের মধ্যে ঢুকে চাচি সবক’টাকে শেষ করবে।’ পুষ্প একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘এতদিনে বোধ হয় সেই সময় এসেছে গো নীলাদিদি!’
নীলাদিদির বিস্ময়ের পারদ ক্রমশ চড়ছিল। রহমানচাচা তবে এই দ্বীপে থেকে গেছে দীনবাঈ জোশীর নীরব প্রেমিক হয়ে? আর দীনবাঈ নিজে এতবছর ধরে ঘুঁটি সাজাচ্ছে নিজের প্রেমিকের হত্যার প্রতিশোধের?
মানুষকে বাইরে থেকে কত ভুল ধারণাই না করে মানুষ! সেই যে ইন্দ্রদাদা খুলনার হাট থেকে ফেরার পথে বলেছিল, ‘অত সহজে কাউকে দাগিয়ে দিসনি নীলু!’
সেই কথাখানাই ঠিক। ওর মতো ডাকাবুকো মেয়ে যা বোঝেনি, ওইটুকু বয়সে ইন্দ্রদাদা তা বুঝে ফেলেছিল।
ইন্দ্রদাদার কথা মনে পড়তেই নীলা আবার দুর্বল হয়ে পড়ে। গলায় কী যেন দলা পাকায়। নিজেকে সামলে নিয়ে ও বলে, ‘আমায় একবার কাজে যেতে হবে।’
‘আজ? আজ ছুটি নাওনি গিন্নি?’ গৌরীপ্রসন্ন বিস্মিত হন।
‘ওই সাহেবের তো বদলি হয়ে গেছে, আপনাকে কাল রাতেই তো বললাম!’ নীলা দ্রুত শেষের কথাগুলো জুড়ে দেয়, ‘কাল সকালে ওদের জাহাজ ছাড়বে। বম্বে যাবে। আজ আমায় একবার যেতে হবে। মালপত্র বাঁধাবাঁধি আছে অনেক।’
শেখর অবাক হয়ে গৌরীপ্রসন্নর দিকে তাকায়, ‘পোর্টওয়েলের ট্রান্সফার হয়ে গেল এরই মধ্যে? এই তো সবে এল!’
‘হ্যাঁ। গিন্নি আমায় বলেছিল, আমিই বলতে ভুলে গেছি।’ গৌরীপ্রসন্ন দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেন।
শেখর বলল, ‘ওকে নিয়ে ব্যারি খুশি ছিল না শুনেছিলাম। কাজেকর্মে বাগড়া দিচ্ছিল। মারে সাহেবের সঙ্গে ষড় করে তার মানে ভাল লোকটাকে বম্বে প্রেসিডেন্সি জেলে ট্রান্সফার করে দিল।’
‘হুম!’ গৌরীপ্রসন্ন মাথা নাড়েন, ‘ঠিক আছে গিন্নি, তুমি তবে চলে যাও। নাহলে ওরা আবার সন্দেহ করতে পারে। ওখান থেকে এসে জাহাজঘাটায় অপেক্ষা কোরো।’
শেখরের চোখের অদ্ভুত দৃষ্টি চোখ এড়ায় না নীলার। শেখর বোধ হয় বুঝতে পারছে, গৌরীপ্রসন্ন আর নীলা সকলের সামনে স্বাভাবিক দম্পতির অভিনয় করছে।
এমনসময় ঘরে ঢুকে এলেন শ্যামাপ্রসাদ।
‘বারীনবাবুরা সেদিন সরাসরি জাহাজে চলে আসবেন। এমনই কথা হয়েছে।’
‘ওঁরা পারবেন তো?’ গৌরীপ্রসন্নর কণ্ঠে সংশয়ের সুর।
শ্যামাপ্রসাদ হাসেন, ‘কী যে বলো হে গৌরী! ওঁরা আমাদের চেয়ে কয়েকগুণ দড়। সারা দেশকে কাঁপিয়ে এখানে এসেছেন। বরং ওঁরাই আমাদের শক্তি! যাকগে। ওরে পুষ্প। হাসপাতাল থেকে তোর ডাক এসেছে। কম্পাউন্ডার লালমোহন ডাকছে। কে এক বন্দি অজ্ঞান হয়ে গেছে।’
‘উফ টেকো সাহা আমায় কিছুতেই শান্তিতে থাকতে দেবে না।’ পুষ্প বিরক্তমুখে উঠে দাঁড়াল, ‘যাই। জ্যাঠামশাই, আমি হাসপাতাল থেকেই জঙ্গলে চলে যাব। বন্দেমাতরম !’
‘বন্দেমাতরম !’ নীলা শেখর শ্যামলাল আর আরও সকলে সমস্বরে বলে উঠল।
নীলার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। স্বামীর নির্যাতন, ফুলির মৃত্যু, জেলের অত্যাচার সব ধূসর অতীত ধুয়েমুছে গেছে। আজই ওর জীবনের সবচেয়ে বড় দিন। উত্তেজনার আধিক্যে ও খেয়াল করল না, গৌরীপ্রসন্নের মুখটা কেমন গম্ভীর হয়ে উঠেছে।
চোখাচোখি হতেই গৌরীপ্রসন্ন বিড়বিড় করলেন।
‘লালমোহন কেমন করে জানল, যে পুষ্প শ্যামাপ্রসাদের বাড়িতে আছে?’
৩৪
বারকয়েক জলের ছিটে দিতেই ছেলেটার জ্ঞান ফিরে এল ঠিকই, কিন্তু তার হাতদুটো দেখে পুষ্প শিউরে উঠল। দুটো আঙুলের ওপরের অংশটা নেই। ইঁদুর খুবলে খেয়ে নিয়েছে? বাকি ঘা থেকেও দুর্গন্ধ ছাড়ছে। রোগা শরীরটা নারকেল ছোবড়ার ধুলোয় মাখামাখি। পায়ে চেপে বসে রয়েছে ডান্ডাবেড়ি।
ছেলেটা জ্ঞান এলেও যেন পুরোপুরি সজ্ঞানে আসতে পারছিল না। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। চোখ আধখোলা রেখে ও কোঁকাচ্ছিল, ‘মা! ও মা! মাগো!’
পুষ্প ওয়ার্ডারের দিকে তাকাতেই সে বলল, ‘কাঁধে ত্রিশ পাইন্ডের ভুসির বস্তা ছিল। হঠাৎ উলটে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। পুরো এক বস্তা ভুসি নষ্ট।’
পুষ্পর ইচ্ছে হল সপাটে একখানা চড় কষিয়ে দেয়। কিন্তু ও নিজেকে সংবরণ করল। একটা পাতি ওয়ার্ডারকে চড় মারলে যে খুব শোরগোল হবে তা নয়, কিন্তু আজ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। এই সব করে লোকজনের মনোযোগ নিজের দিকে টানতে চায় না ও। তাছাড়া ওয়ার্ডাররাও তো ভৃত্য বই কিছু নয়।
তেতো মুখে ও ফার্স্ট এইড বাক্সটা খুলল। কী চিকিৎসা করবে ও এই ছেলেটার? কী আছে ওর কাছে? কিছু তুলো, গজ আর আয়োডিন। আপাতত ঘা’গুলো পরিষ্কার করলে হয়তো ছেলেটা একটু আরাম পাবে।
পুষ্প কাজ করছিল। আর মনে মনে ভাবছিল। কাল রাতেও চাচি বলছিল, রাতের পর রাত অন্ধকারে জেলের পাঁচিল বরাবর মাইন পাতা হয়েছে।
‘আচ্ছা, বোমা বাঁধতে যে সাজসরঞ্জাম, মাইন তৈরির তার, সেসব এরা পায় কোথায় চাচি?’ পুষ্প জানতে চেয়েছিল।
‘জাহাজে করে আসে। চালের বস্তার মধ্যে। ভুসির মধ্যে। তুই কি ভাবছিস জাহাজঘাটায় আমাদের লোক নেই?’ চাচি খরচোখে বলেছিল, ‘ওরে, আমরা কত বচ্ছর ধরে এই নরকে পচছি, সবাই আজাদি চাইছে। এমন ঝুটা আজাদি নয়, সচ্চা আজাদি।’
ঘা’গুলো থেকে এত দুর্গন্ধ ছাড়ছে, পুষ্পর বমি পেয়ে যাচ্ছে। নিজেকে শান্ত রেখে আয়োডিনের শিশিটা খুলল। আর ঠিক তখনই সামনের ঘানিতে কাজ করা আরেকটা লোক এগিয়ে এল। ওয়ার্ডারের লালচোখকে উপেক্ষা করে বাঁকা হেসে বলল, ‘ড্রেসিং করে কী হবে? ওর তো গ্যাংগ্রিন হয়ে গেছে হাতদুটো। তোমাদের ডাক্তারবাবু বুঝি এখনও আসতে পারছেন না? তুমি ডাক্তারির বোঝো কী?’
পুষ্প উত্তর দিল না। ও কী করবে ডাক্তার না এলে? যতদূর জানে, আজ রস আইল্যান্ডে এক কর্তার ছেলের বিয়ে। পাঁচদিন ধরে সেখানে মোচ্ছব চলছে। অধিকাংশ সাহেব সেখানেই ব্যস্ত। বিনাবাক্যব্যয়ে ও ঘা-টাকে পরিষ্কার করতে লাগল।
ঘায়ে ঠান্ডা পরশ পেতেই ছেলেটা যেন চমকে উঠল। চোখ বুজেই বলতে লাগল, ‘মা, আমায় শ্রীফলতলা নিয়ে চলো মা! আমি যা করতে এসেছিলাম, করতে পারছি কই?’
পুষ্প চমকে উঠল। শ্রীফলতলা নামটা যেন কেমন চেনা চেনা লাগল ওর।
বাঁকা হাসা লোকটা এবার উবু হয়ে বসে ছেলেটার মাথায় হাত বোলাতে লাগল, ‘ইন্দ্র, মনে জোর রাখ ভাই। ভুল যখন করেই ফেলেছিস, সেটা শুধরানোর সময়টুকু অপেক্ষা কর।’
ইন্দ্র?
পুষ্প চমকে উঠল। পশতুন ওয়ার্ডার সামনে দাঁড়িয়ে মাটিতে লাঠি ঠুকছে। ও ভ্রুক্ষেপ না করে শক্তমুখে লোকটাকে বলল, ‘ইন্দ্র বলচেন কেন? ওর নাম তো ইন্দুভূষণ।’
‘সে তো আলিপুরে সাহেবদের রেজিস্টারে ওই বানান লিখে ফেলেছে। ওর নাম ইন্দ্র। আমরা সবাই আলিপুর মামলার কনভিক্ট।’
পুষ্প হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর সম্বিত ফিরে পেতেই জোরে জোরে ইন্দুভূষণকে ঝাঁকাতে লাগল, ‘অ্যাই! অ্যা-অ্যাই! তু-তুমি নীলামণি বলে কাউকে চেনো?’
ইন্দুভূষণ আধো ঘুমে আধো অচেতনে বিড়বিড় করল, ‘নীলু! আমার গাঁয়ের মেয়ে। তরতর করে খেলত। আ-আমি ওকে স্বামীজির বই দিয়েছিলাম! কতদিন ওকে দেখিনি। নীলু, তুই কেমন আছিস? কলকাতায় তোকে অনেক খুঁজেছি। পাইনি।’
পুষ্প অস্থিরভাবে উঠে দাঁড়াল। এখুনি নীলাদিদিকে জানাতে হবে। শেখরদা মিথ্যে কথা বলেছিল। নীলাদিদির ইন্দ্রদাদা মোটেই মাদ্রাজ চলে যায়নি। এখানেই রয়েছে। এই পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডেই।
কিন্তু এখন কী করে নীলাদিদিকে পাবে? নীলাদিদি এখন রস আইল্যান্ডে মনিবের বাংলোয়। আরেকটু পরেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হবে। নীলাদিদি তারপর অপেক্ষা করবে জাহাজঘাটায়। সেখানে সবুজ সংকেত মিললেই চলে যাবে সেই গোপন ঘাটে, যেখান থেকে বন্দিরা নৌকো করে চলে যাবে একটু দূরে ভাসমান মহারাজা জাহাজে।
তারপর পুষ্পদের সঙ্গে মিলে নীলাদিদির আবার গ্রামেই ফিরে যাওয়ার কথা।
কিন্তু না। নীলাদিদি তো ফিরবে না। তাকে তো তার ইন্দ্রদাদার সঙ্গে জাহাজে চড়ে পালাতে হবে!
পুষ্প ঠিক করে ফেলল, যেভাবে হোক, নীলাদিদিকে খবর পাঠাতেই হবে।
কী করে পাঠাবে?
