Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    ছিন্নবাধা – সমরেশ বসু

    সমরেশ বসু এক পাতা গল্প373 Mins Read0
    ⤷

    ১.১ শিকল দিয়ে বাঁধা

    ছিন্নবাধা – উপন্যাস – সমরেশ বসু

    প্রথম খণ্ড

    ০১.

     আগে শিকল দিয়ে বাঁধা ছিল। এবার মুখে আগুন দেওয়া হবে।

    সবাই হই হই করে উঠল। সবাই এগিয়ে এল কাছে। ছেলে বুড়োর ধাক্কাধাক্কি, মেয়েদের ঠেলাঠেলি। সবাই কাছে আসতে চায়।

    লাঠি উঁচিয়ে এল একজন। –আঃ, বারণ করছি, শুনছ না কেন তোমরা। সরে দাঁড়াও, সরে দাঁড়াও, এট্টা অঘটন ঘটলে পরে আমাদের নিয়ে টানাটানি করবে। কিন্তু সরতে কি চায় লোকে। আরও ঠেলে আসে। সারা মেলা উজাড় করে এসেছে সবাই। কত দূর দূরান্ত থেকে আসছে মানুষ, শুধু সন্ধ্যাবেলার এই উৎসবটুকুর জন্য।

    এক মন বারুদের তুবড়ি। লোকে বলে, এক মনি তুবড়ি। শিকল দিয়ে না বাঁধলে তার তেজ রুখবে কে। এমনিতেই শিকল ছিঁড়ে তুবড়ি আকাশে উঠতে চায়। শুধু শিকল বাঁধা নয়, মাটি কেটে বসানো হয়েছে এক মনি খোঁল। তবু আড়-মাতলার মতো এদিকে ওদিক করে আগুনের ফোয়ারায় কোনও গতিকে যদি একবার ফাটে, এই বারোয়ারিতলা শুদ্ধ লঙ্কাকাণ্ড করে ছাড়বে।

    উৎসবের উপলক্ষ নবমদোল। বারোয়ারিতলার দক্ষিণে আছেন শ্যামরায়। বড় দিঘির ধারে তাঁর মন্দির। নবমদোল ওই শ্যামরায়ের। কিন্তু বাজি পোড়ানো উৎসবটা চিরকাল এখানেই হয়ে আসছে। এখানে পুকুরের ধারে। এই পুকুরের তিনদিকে শিবমন্দির আর বুড়ো বট অশখের ভিড়। একদিকে দেবী চণ্ডিকার মন্দির। দেখে বোঝা যায়, ঘোর শাক্ত ভূমি। শ্যামরায় উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন যেন। আগে পাঁঠাবলিও হত নবমদোল উপলক্ষে। আজকাল বন্ধ হয়ে গেছে সেটা। কিন্তু বাজি পোড়ানোর মধ্যে সেই মত্ততাটা টের পাওয়া যায় এখনও।

    তুবড়ি পোঁতা হয়েছে পুকুরের ধারে। দোলপূর্ণিমার পর নবমী তিথিতে নবমদোল। আকাশে এখনও চাঁদ দেখা দেয়নি। পুকুরের পাড়ে ভিড় করে এসেছে সবাই। একমনের পর, ধাড়ির পিছনে ছাঁয়ের মতো পাঁচ সেরি দশ সেরি আছে কয়েক গণ্ডা।

    মেলার আসরটা আর একটু দূরে। সে আসরে আজ ভাঙন ধরেছে বিকেল থেকেই। বেচা-কেনা ঘুচিয়ে সবাই মেতে উঠেছে এদিকে। মেলার হ্যাজাক লণ্ঠন এখন সব এখানেই সকলের হাতে হাতে, গাছের ডালে ডালে।

    এর পরে আছে কেষ্টযাত্রা। বড় দিঘির পারে, শ্যামরায়ের মাঠে যাত্রার আসরও তৈরি হয়ে গেছে। সাজঘর হয়েছে শ্যামরায়ের মন্দিরের পাশে, পরিত্যক্ত ভোগ-রান্নাঘরে। রান্নাভোগ আর জোটে না শ্যামের কপালে। একটু চিনি বাতাসা কলা, ফুল চন্দনই অনেকখানি। এর পরেও থাকা না থাকা শ্যামরায়ের মর্জি।

    শেষ ফাল্গুনের বাতাসে চৈত্রের পাগলামি টের পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে পাক খায়, চক্র দিতে চায় ঘূর্ণি বানের মতো।

    বাতাসের চেয়ে মানুষের নেশাটাও কম নয়। তুবড়ি পোড়ানো দেখার ঠেলাঠেলিতে ইতিমধ্যেই কয়েকজন পুকুরের জলে ডুবে উঠেছে। তা নিয়ে হাসাহাসি গালাগালির অন্ত নেই। সেয়ানা মানুষ পড়েছে তাই। নইলে কান্নাকাটি পড়ে যেত।

    সুরীন দেখছিল সব দাঁড়িয়ে। এ গাঁয়ের ছেলে সে। বয়স পঞ্চাশ ধরেছে। পঁচিশ বছর গ্রামছাড়া। বছরে এই দুটি দিনের জন্যে না এসে পারে না। আসে, দু দিন থাকে, তারপর বিদেশির মতো চলে যায়। বাগদিপাড়ার মানুষ। আগেকার লোকেরা চিনতে পারে। হালের মেয়ে পুরুষেরা কেউ চেনে না তাকে। যারা চেনে, আর যারা চেনে না, তাদের সকলের কাছেই সুরীন, অর্থাৎ সুরেন। দিগর এক অচেনা সংসারের মানুষ। সবাই তাকে হাঁ করে দেখে। সে দেখার মধ্যে শুধু অপরিচয়ের ভয় ও বিস্ময়।

    ঠাণ্ডারাম দিগরের ছেলে সুরীন দিগর। পায়ে তার ইংরেজি বুট জুতো, বাবুদের মতো শার্ট গায়ে, কোঁচানো ধুতি। মাথায় তেল চকচক করে। গোঁফজোড়ার চাকন-চিকনও কম নয়।

    নিজের ভিটেমাটি কিছু নেই। পাড়ায় এসে ওঠে পরের ভিটেতে। জায়গা দেওয়ার লোকের অভাব নেই পাড়ায়। সুরীন যার ঘরে ওঠে, যে কদিন থাকে তার ঘরে সেই কদিন দুঃখ থাকে না। গোটা পাড়ায় ভোজ লেগে যায়। হাঁড়ি অতি ছোট, তাড়ির জালা নিয়ে বসে সুরীন সকলের সঙ্গে। মেয়েরাও খাতির করে। দরকার হলে, এক আধখানা শাড়ি দিয়ে খাতিরটুকু গাঢ় করে নেয়।

    ফুর্তি মস্করাতে খুবই সিদ্ধহস্ত সুরীন। কিন্তু এমনি মানুষ হিসাবে বেশ রাশভারী। চেহারায় আর কথায়, ধার আছে যথেষ্ট। বলে, মিস্তিরির কাজ করি।

    –কোথায়?

    চটকলে।

    –কোথাকার চটকলে?

    –চাঁপদানি।

    গাঁয়ের লোকেরা জানে। প্রতি বছর একই কথা জিজ্ঞাসাবাদ হয়।

    তবু নতুন করে বিস্মিত হবার জন্যই যেন সবাই জিজ্ঞেস করে, কত টাকা কামাও?

    সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে হিসাব কষে। সপ্তাহে যদি ছাব্বিশ টাকা হয়, তবে মাস গেলে একশো চার টাকা। বাবা! বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। অবিশ্বাস করবার সাহস নেই। অমনি হয়তো কেউ ঘনিয়ে আসে। বলে, বুইলে গো সুরীনদাদা, বউটা মেয়েমানুষ।

    সুরীন গোঁফের ফাঁকে হেসে বলে, মাটির পরে দাঁড়িয়ে বলছিস?

    –হ্যাঁ, আকাশের তলায় পেঁড়িয়ে বলছি, মেয়েমানুষ বউটা। কিন্তুক, এট্টা কাপড় দিতে পারি।

    –পারিস না?

    না।

    সুরীন পকেট থেকে টাকা বের করে দেয়। যা, একটা কাপড় কিনে দি গে যা বউকে।

    টাকা যেন ভোলামকুচি। সুরীন দিগরের অমন অনায়াস টাকাগুলি টাকা কিনা, সেটাও যেন খটকা যায় মনে। বুড়িরা এক কথা বারবার জিজ্ঞেস করে, বেথা করেছ?

    না।

    করতে লাগবে না? ব্যাটাছেলে মানুষ, বউ ছেলেপুলে না হলে চলে?

    সুরীন বলে, না মাসি, ওটা হল না আর এ জন্মে। একটা মেয়েছেলে আছে।

    সোজা কথা, সোজা করেই বলে। কোনও রাখ ঢাক নেই। বুড়িদের স্নেহ দিয়ে মন কাড়বার হাঁস-ফাসানি থিতিয়ে আসে একটু। বলে, অ। তা গাঁয়ের মেয়েছেলেই এট্টা নিয়ে গেলে পারতে।

    সুরীন বলে, শহরে বড় ছড়াছড়ি মাসি। এখন তো আরও। দু সন হল তোমার লড়াই শেষ হয়েছে। দেশের সরকারও দেশের লোক হয়েছে। আর কলবাজারে একবার মেয়েমানুষের ভিড়টা দেখে এসো। এক ছিটে গুড়ে যেন পিঁপড়ের গাদি। তবে মেয়েছেলে, মেয়েছেলে শহরে গাঁয়ে তার তফাত কিছু নেই।

    অ।

    একটু মুষড়ে পড়ে সবাই। সাধ করে তো কেউ বলে না। দায়ে পড়ে বলে। যদি একটু সুখের মুখ কেউ দেখতে পায়। যে মেয়েমানুষের স্বামীপুত্র নেই, তার কোনও বাঁধন নেই। সে যেতে চায়।

    সুরীন বলে, আর মন বলে কথা। যেখানে সে বসে, সেখানেই ভাল। তাকে নিয়ে ছুটোছুটি করলে, সে ছুটিয়ে মারে চিরকাল!

    তা বটে।

    এই হল সুরীন। গাঁয়ে নবমদোলের উৎসব। বাগদিপাড়ায় উৎসব সরীনকে নিয়ে। তাড়ি মাংস, মায় কাপড়-চোপড়, নানান কিছুতে অনেক খরচা করে যায়। দাগ রেখে যায় সকলের মনে। আগামী বছরের তৃষ্ণা রেখে যায় সকলের প্রাণে।

    তারপরে এরা ভুলে যায়, সুরীন ভুলে যায়। এরা থাকে গাঁয়ের বাগদিপাড়ায় বাগদি হয়ে। সুরীন চাঁপদানির উইভিংএর মিস্তিরি, চন্দননগরের মালিপাড়ার সুরীন মিস্তিরি। সুরীনদাদা।

    বছরের এই সময়টা, অভ্যাসবশত যেন চলে আসে সুরীন। সেখানে তার মেয়েমানুষ ভামিনী প্রতি বছরই ঝগড়া করে। আসতে চায় সঙ্গে।

    সুরীন বলে, না, তিনশো তেষট্টি দিন তোর ঘর করি। দুটো দিন তুই ছেড়ে দে বাপু, শুধু শুধু আমার সঙ্গ নিসনি।

    পেট থেকে পড়ে, এ গাঁয়ে মানুষ হয়েছে। উৎসব বলতে আর কিছু জানে না, নবমদোল ছাড়া। শহরে তো রোজই উৎসব। নবমদোলে এসে, নিজের জীবনটাকে একবার পিছু ফিরে দেখে যাওয়া ছাড়া এর মধ্যে আর কিছু নেই সুরীনের।

    এক মনি তুবড়ি জ্বলেছে। দশটা স্টিমের মতো কান ফাটা শব্দ তার। আগুনের উঁচু ফোয়ারা ঠেকেছে গিয়ে আকাশে। বহু দূর-ব্যাস নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বড় বড় ফুলকি। যেন গলানো আগুন, জলের ফোয়ারার মতো। বাতাসটা সুবিধের নয়। আগুন ছড়িয়ে পড়তে চাইছে উত্তরে, একেবারে উপরে গিয়ে কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে।

    কয়েকজন একসঙ্গে চিৎকার করে সবাইকে বলছে দূরে থাকতে। মনে হয়, পুকুরের জলও আগুন হয়ে উঠেছে। আলোর ধারায় মাটির পোকামাকড়টিও দেখা যায়।

    সুরীনের সঙ্গে রয়েছে পাড়ারই কয়েকজন।

    সমস্বরে সবাই শ্যামরায়ের জয় জয়কার করছে।

    সুরীন ভিড় থেকে বেরিয়ে, শ্যামরায়ের মন্দিরের দিকে চলল। সঙ্গে পাড়ার মদন আর জগা। আজকে রাতে সুরীন শেষবার ফুর্তি করবে। তার প্রসাদ না নিয়ে ফিরবে না দুটিতে।

    সুরীন ভাবছিল অভয়ের কথা।

    বিশ বছরের অভয়। তার মায়ের নাম প্রমীলা।

    তিন বছর আগে প্রথম চোখে পড়েছিল অভয়কে।

    যেদিন পড়ল, সেদিন জিজ্ঞেস করল সুরীন, এটি কে?

    –পোমিলার ছেলে, যে পোমিলা মরে গেছে।

    মনে পড়ল সুরীনের। সিংভূমে কাজ করতে গিয়ে, পটল দিগর নিয়ে এসেছিল প্রমীলাকে। সেও অনেকদিনের কথা। প্রমীলা এসেছিল পটলার সঙ্গে। কিন্তু পটলার সঙ্গে ঘর করতে পারেনি। রূপ ছিল কিনা বোঝা যায়নি, যৌবনটা ছিল দিশেহারা বানের জলের মতো। গতরে অন্তরে তাকে বাঁধ দিতে পারেনি পটলা ; বানের জল, যেদিকে পেরেছে, সেদিকেই গেছে। বারো বছর আগে, নবমদোলে এসে, প্রমীলার ঘরে রাত কাটিয়ে গেছে সুরীন। ছেলেটাকে লক্ষই পড়েনি। এখানে আসার পর, এ গাঁয়ে অভয় জন্মেছে। কার ছেলে, বলা মুশকিল! প্রমীলার গর্ভজাত, একমাত্র সেইটিই সত্য।

    তিন বছর আগে চোখে পড়ল। চোখে পড়েনি, কানে শুনল প্রথম অভয়ের গান। আতি গয়লানির উঠোনে দাঁড়িয়ে গান ধরেছে অভয়।

    তুমি আমার গাঁয়ের শ্যামরায়
    তোমার কথা কেমনে ভোলা যায়।

    গানের কথাবাতা তেমন পাকা নয়, কেমন যেন আপনি আপনি বানানো। সুরীন বলল, বাঃ, বেশ গলাখানি তো। আতি গয়লানির যেন ভয় হয় অভয়ের গলা শুনলে। অভয় গাইছে।

    যদি পাপ করে থাকো কেউ,
    একবার শ্যামরায়ের কাছে যেয়ো।
    তানারে না বলে কভু পার নাহি পাওয়া যায়।

    এ সব অভয় নাকি নিজেই তৈরি করে গায়। সব সময় ছাঁদ ছন্দ মিল থাকে না। কিন্তু গলার এবং গাওয়ার ভঙ্গির গুণ বড় মিষ্টি লাগে। কিন্তু গানের সঙ্গে মানুষটির মিল নেই।

    বয়স নাকি কুড়ি। কিন্তু অমন বিশাল চেহারার পুরুষ বোধহয় গাঁয়ে আর একটিও নেই। রংটি কালো, চোখ দুটি টানা টানা। মাথার চুলগুলি কদম ছাঁট। চলতে ফিরতে গায়ের পেশি ঢেউ দিয়ে ওঠে। যেন কালো গাঙে ঢেউ লেগেছে। চাউনিটি কেমন যেন খ্যাপা খ্যাপা, রাগত ভাব। চোখ দেখলে অন্তরের ভাবটুকু আন্দাজ করা যায়।

    সুরীন বলল, এটি কে?

    পোমিলার ছেলে।

    কী করে?

    কী আবার করবে। বারো সাঙার ছেলে, কেউ কারুর নয়। কখনও হাল চষে, হাঁপর টানে কখনও কামারের ঘরে।

    সুরীন তাকিয়ে রইল অভয়ের দিকে। ভাল লাগল ছেলেটিকে। মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখল কুড়ি বছরের একটি বেজন্মা পুরুষকে। আর মনে পড়ে গেল তার শহরে, মালিপাড়ায় তার প্রতিবেশিনী শৈলীর কথা। প্রৌঢ়া শৈলী, আর তার মেয়ে নিমির কথা।

    .

    শ্যামরায়ের মন্দিরের কাছেও ভিড় কিছু কমে নেই। তবে অধিকাংশই মুনকে তুবড়ির তল্লাটেই ঠেলাঠেলি মারামারি করছে। আসবে যখন, গোরুর পালের মতো দল বেঁধে আসবে যাত্রার আসরে। সবাই এলে বাতি জ্বালার আয়োজন হবে। আসর এখনও অন্ধকার। সেই অন্ধকারেই। অনেকে বসে গেছে।

    সুরীন দাঁড়াল শ্যামরায়ের মন্দিরের সামনে। সুরীনের ইতি উতি তাকানো ভাবসাব দেখে, জগা আর মদন নাক তুলে গন্ধ শুকল বাতাসে।

    জগা বলল, বড় জবর বাস ছেড়েছে সুরীনদা।

    মদন বলল, হ্যাঁ। মনে ল্যায়, দিঘির ওপার থেকে আসছে।

    সুরীন সে কথার কোনও জবাব না দিয়ে মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল উপরে। মন্দিরের দাওয়ায় তখনও মেয়েদের ভিড় রয়েছে। গোটা দাওয়ায়, মন্দিরের ভিতরে, পিতল-বিগ্রহের সর্বাঙ্গে আবিরের ছড়াছড়ি।

    মদন আর জগা তীর্থের কাকের মতো তাকাল দিঘির ওপারের অন্ধকারে। বড় বড় গাছের ঝুপসিঝাড়ে, থেকে থেকে জোনাকির মতো জ্বলে উঠছে দু একটি বিড়ির আগুন। ফুলকি উড়ে যাচ্ছে বাতাসে। দু একবার টর্চলাইট জ্বলে উঠতেও দেখা গেল। মনে হল, সুদূর অন্ধকার প্রেত-প্রান্তরে একদল ছায়া ঘুরে ফিরে যেন কীসের জটলা পাকাচ্ছে।

    ওখান থেকেই গন্ধ আসছে বাতাসে। সেই গন্ধে পাগল দুটি মানুষ। সুরীনের দিকে তাকাল। ব্যাকুল হয়ে। সময় চলে যায়। অন্ধকারের ওই অস্পষ্ট রহস্যের খেলা না জানি কখন শেষ হয়ে যায়।

    শ্যামরায়ের পূজারী ঠাকুর মুখুজ্জে লাল হয়ে উঠেছে আবিরে। মাখিয়ে দেয়নি কেউ। সারাদিন ঠাকুরের পায়ে যা পড়েছে, তারই ছিটেফোঁটায় মুখুজ্জে মাখামাখি হয়ে গেছে। হ্যাজাকের আলোলা পড়ে একটি অমানুষিক মূর্তি হয়েছে তার। শরিকানার ভাগে যার এ বছরে শ্যামরায়ের সেবার ভাগ। পড়েছে, সে সেবাইত হয়তো এখন কলকাতায় অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত। এক আধ পয়সা যা পড়ে, তাই কুড়িয়ে নিতে মুখুজ্জেও ব্যস্ত। সারা বছরের প্রসাদের চেয়ে, এই দিনটির আয় সারা বছরের পথ চেয়ে থাকে।

    সুরীন বলল মুখুজ্জেকে, ঠাকুরমশাই!

    মুখুজ্জে তখন ক্ষীণ দৃষ্টি নিয়ে, আবিরের অস্পষ্টতায় পয়সা কুড়োচ্ছে উপুড় হয়ে।

    সুরীন আবার বলল, ঠাকুরমশাই, আপনার মূল গায়েনটি গেল কোথায়?

    মুখুজ্জে সোজা হয়ে বলল, কে? তারপর সুরীনকে দেখে একগাল হেসে বলল, ও সুরীন, আয় ব্যাটা আয়, তোর জন্যে চন্নামিত্তি পেসাদ…।

    চরণামৃতটুকু মুখে মাথায় দিয়ে, প্রসাদ হাতে নিয়ে, পুরো একটি টাকা আলগোছে ফেলে দিল সুরীন মুখুজ্জের হাতে। দিয়ে বলল, জিজ্ঞেস করছিলাম, আপনার শ্যামরায়ের গায়েনটি—

    –আরে ও শালার কথা

    বলতে বলতেই মস্ত বড় করে জিভ কাটলে মুখুজ্জে। মন্দিরের মধ্যে, শ্যামরায়ের সাক্ষাতে বামুনের ছেলের মুখোরাপ করা পাপ। তার ওপরে আবার পুজুরি। ওই পুরো একটি টাকায় কী। রকম গোলমাল হয়ে গেছে সব। বলল, ও মুশকো হারামজাদাটা হবে আমার ঠাকুরের গায়েন। সে কপাল করে এসেছে ও এ জন্মে? যদিও বা হত, তা কপালে জুটেছে এক গুরু, ব্যাটা শুদ্রদের বামুন, মাতালকে মাতাল–ঠ করে শব্দ হল পায়ের কাছে। ঝুঁকে পড়ল মুখুজ্জে হাত বাড়িয়ে। ঝুঁকেই বলল, সেই নিতে ভটচায এসে ডেকে নিয়ে গেল ছোঁড়াকে। এই তো খানিকটে আগেও বসে বসে গান করছিল।

    নিতাই ভটচায ডেকে নিয়ে গেছে। সুরীন একটু হতাশ হল। সময় নেই আর হাতে বিশেষ। যা বলবার তা আজ রাতের মধ্যেই সারতে হবে।

    জগা বলল, ভটচায মশায়ের সঙ্গে যদি গিয়ে থাকে তো দিঘির ওপরেই আছে, বুঝলে সুরীনদাদা। চলো, ওদিকটায় যাই, দেখি।

    অভয়কে খুঁজছে সুরীন। মুখুজ্জের রাগের কারণ আছে। মন্দিরের দোরগোড়ায় বসে অভয় দুটি গান করলে লোক আসে বেশি। গানের মহিমা প্রাণে গেলে তো কথাই নেই। পয়সা দুটি বেশিও পড়তে পারে।

    সুরীন বলল, যাবার জন্যে তো হাঁপিয়ে মরছিস সেই সনজেবেলা থেকে। চল। কিন্তু ভটচার্য মশায়কে যদি ওখেনে না পাওয়া যায়, তবে তো মুশকিল।

    জগা আর মদনের ছটফটানির কারণ আর কিছু নয়, মদ। আগে শ্যামরায়ের দোলোপলক্ষে মেলায় মদের দোকান বসত। সেই সঙ্গে, দিঘির এপারেই, মকারাদি অন্য বিষয়েরওবেসাতি ছিল। বর্ধমান কাটোয়া শহর থেকে নিজেরাই এসে, কোনওরকমে ছিটেবেড়ার দোচালা আড়াল করে নিত একটি করে। বাইরে থেকে যারা মেলায় আসত, আর গাঁয়ের সব বাদল পোকাগুলি গিয়ে পুড়ে মরত সেই চালাঘরে। এতে আইন কখনও নাক গলাত না। কিন্তু এই অতি প্রকাশ্য ব্যাপারে দিঘির পারের কোল-আঁধারের নলচে আড়ালটুকু থাকত।

    তারপর দিনকাল গেল বদলে। একটা যুদ্ধ এসে সবকিছুই দিয়ে গেল এলোমেলো করে। তার নিয়মানুযায়ী, এক জায়গায় মৌচাক ভাঙে, চাক বাঁধে আর এক জায়গায়। মেলায় বসার মদের দোকানের লাইসেন্স গেল উঠে। গাঁ-ঘর-দেশের মানুষেরা নাকি সব সৎ হয়ে গেছে, ও সব আর চলে না। চালাঘরগুলিও উঠে গেল। ও সব পুরনোদিনের কেচ্ছা দেখে, লজ্জায় মরে নতুনদিনের মানুষরা।

    কথাটির গায়ে কিছু সত্যের গন্ধ আছে। বাকি সত্যটা, যুদ্ধের দুর্দিনে মদের দোকানের লাইসেন্সের খরচ ওঠেনি, পড়তা পড়েনি চালাঘরের। তা ছাড়া শহরের পোকাগুলি পোড়বার মত আগুনেই কুলিয়ে উঠত না। বর্ধমানের এই দূর গ্রামে কে আসবে।

    কিন্তু মানুষের এ প্রবৃত্তি সমুদ্রের নিচু তলার মতো। যত গভীর, তত অন্ধকার, তত বিস্ময়কর বিচিত্র। দিঘির পাড়ের কোল-আঁধারে সেই প্রবৃত্তিটা আবার উঠল মাথা চাড়া দিয়ে। খালি বদলে গেল তার রূপ।

    এখন দোকান বসে না। ঘরে বসে চোলাই করা হাঁড়ি আসে কাঁড়ি কাঁড়ি। চালাঘরের আড়ালের ছলনাটা গেছে মুছে। খোলা আকাশের তলায়, ঝুপসি ঝড়ের ঘুপচিটুকুই অনেকখানি।

    বেচা-কেনার রকমফের মাত্র। দিঘির পাড়ের কোল-আঁধারে, রহস্যময় নলচে আড়াল এখনও তেমনি ডাকে হাতছানি দিয়ে।

    অন্ধকারে ইঁদুর-খোঁজা বেড়ালের মতো জ্বলজ্বল করে উঠল জগা আর মদনের চোখ। দর্শনে আর ঘ্রাণেই তাদের উপোসী প্রাণে অর্ধেক নেশা গেল জমে।

    অন্ধকারে সাপের মতো, এখানে ওখানে মানুষের ছায়া নড়েচড়ে উঠছে। কাঁচের চুড়ির রিনিঠিনির সঙ্গে বাতাসে আচমকা শোনা যায় সব বিচিত্র চাপা কুহর। বেদের চেনা সাপের হাঁচির মতো ভয়ংকর নির্লজ্জ, কিন্তু সলজ্জ খ্যাঁকারি শোনা যায় কোথাও। কোথাও মাতালের অট্টনোল, অস্ফুট প্রলাপ। দিঘির পাড়ের বাতাসও যেন চক্রেবসা ভৈরবের মতো ঢুকুটুকু রসোন্মত্ত।

    সুরীন খুঁজছে অভয়কে। তিন বছর ধরে, অনেক ভাবনা চিন্তার পর সুরীন সাব্যস্ত করেছে, অভয়কে সে নিয়ে যাবে। জাত-জন্মহীন প্রমীলার ছেলে বলেই শুধু নয়, নিয়ে যাবার মতো এমন ভাল ছেলে আর একটিও তার চোখে পড়েনি, মন কাড়েনি। তার ঘরের মানুষ ভামিনী আর নিমির মা শৈল, সকলের মতামত নিয়ে এসেছে সে এবার।

    তিন বছর আগে, প্রথম যেদিন সুরীন দেখেছে, তখনই গিয়ে সে কথাটি পেড়েছিল শৈলর কাছে।

    আগামী কাল সুরীন চলে যাবে। অভয়ের সঙ্গে কথাটা পাকাপাকি করে নিতে হবে রাত্রের মধ্যেই।

    ইতিপূর্বে গেয়ে রেখেছে অভয়ের কাছে, শহরে যাবে অভয়পদ?

    অভয় দেখতে যত বড়, মুখের কাঁচা ভাবখানি তত বেশি। বড় জাতের হলে যেমনটি হয়। হঠাৎ তাকালে মনে হয়, চাউনিটা কেমন যেন রুক্ষ। সেটা জীবনধারণের অভ্যাসে, রুক্ষ হয়ে উঠেছে। আদর যত্নে পালিত হয়নি কোনওদিন। প্রমীলার নিতান্ত বাঁচার তাগিদের পাঁকে ওর জন্মই ছিল অনাকাঙিক্ষত। যে বয়সটা মায়ের হাতে ছিল তার বাঁচন মরণ দায়, তত দিন বেঁচে থাকাটাই সব। চেয়ে বিস্ময়কর ছিল। সংসারে বাঁচতে হলে, জোর করে বাঁচতে হয়, এইটা রাশি রাশি কুকুরের বাচ্চাগুলি জানে, সে রকম।

    কিন্তু কীসের একটি ভাব-ঘোরের তন্ময়তা আছে ঘিরে অভয়ের সারা মুখে। কোথায় আর একটি অদৃশ্য সংসারের সঙ্গে যেন যোগাযোগ আছে তার। মাঝে মাঝে আপন মনে ফিসফিস করে, হাসে, ইশারা করে আঙ্গুল নাড়ে। তারপর চেঁচিয়ে গান ধরে।

    লোকে বলে, একটু যেন কেমন কেমন ভাব। মাথায় ছিট আছে।

    সুরীন জানে, ছিট নয়। সংসারে খাঁটি মানুষদের কতগুলি পাগলামি আছে। অভয় সে রকম একটি পাগল।

    আর খ্যাপামিটা?

    হ্যাঁ, মাঝে মাঝে খেপে যায়। সুরীন মনে মনে বলে, ওটা ওর খাঁটি প্রাণের খ্যাপামি। ফাঁকির। চেয়ে সেটা ভাল।

    শহরবাসী সুরীনের থেকে অভয়ের কথা একটু বেশি মাজা ঘষা। নিতাই ভটচায়ের কাছে, দ্বিতীয়ভাগ শেষ করেছে পুরোপুরি। বলেছে, আজ্ঞে, কাটোয়া বর্ধমান শহরগুলান ঘুরে এয়েছি কয়েকবার।

    সুরীন হেসে বলেছে, কাটোয়া বর্ধমান নয়, চুঁচড়ো চন্দননগরের কথা বলছি। আর ঘুরে আসার কথা নয়, কাজকম্মো করে থাকার কথা বলছি।

    অভয় বলেছে, আজ্ঞে আমি মুখ্য-সুখ মানুষ খুড়ো। শহরে করেকন্মে খাবার মুরোদ নেই আমার।

    –মুরোদ মানুষের হাতে। তোমার আমার মতো অনেক মুখ সেখানে করে খাচ্ছে। আর, মানে কথা হল, তোমার ভার তো আমি নিচ্ছি গো।

    -কেন সুরীন খুড়ো, কেন বলত।

    হঠাৎ কথা জোগায়নি সুরীনের মুখে। বলেছে, তোমাকে ভাল লাগে, তাই।

    -কেন?

    তা বটে! সংসারে ভাল লাগারও একটা কৈফিয়ত আছে। কেন? মনের আসল কথাটি তখন চেপে গেছে সুরীন। বলেছে, তোমাকে তো দেখছি আজ কয়েক বছর ধরে। তা ছাড়া, তোমার মা আমাকে বলে রেখে গিছল। বলেছিল, মরণকালে হরিনাম করছি সুরীন ঠারপো। শহরে থাকো, দশরকম জানো। অভেটার কোনও গতি যদি তুমি করতে পারো, কোরো।

    সুরীনের মনে হয়, সে একটুও মিথ্যে বলছে না। যেন সত্যি সত্যি প্রমীলার গলায় কথাগুলি শুনতে পাচ্ছে সে। তা ছাড়া অভয়ের অমঙ্গল চিন্তা নেই এর মধ্যে। অকল্যাণের বিষয়ও নয়। তার প্রতিবেশিনী শৈলর একটি ছেলে চাই। মেয়ে নিমিকে বিয়ে দিয়ে সে ঘরে রাখবে। শহরের আশেপাশে, চেনা পরিচিত যারা আছে, তাদের পছন্দ নয় শৈলবালার। একটি ভাল ছেলে চাই। তার। যে কাজ কর্ম করবে, নেশাভাঙ করবে না, জুয়া খেলবে না। অন্য মেয়েদের কাছে যাবে না। ঘর গৃহস্থি করবে মনোযোগ দিয়ে, ছেলেপুলে নিয়ে সংসার করবে।

    সেদিক থেকে, অভয়কে নজরে লেগেছে সুরীনের।

    মায়ের কথা শুনে অভয় বলেছে, এ সব কথা কখনও মনে হয়নি খুড়ো।

    মনটন খারাপ হলে, গাঁ ছেড়ে চলে গেছি দু দিনের জন্যে এখেনে সেখেনে। দু একবার তিন চাকার রিকশা টানবার ফিকির করেছি। আবার চলে এসেছি। আমার রাস্তা ভিন্ন।

    -জানি, তুমি গান বাঁধো, গান গাও।

    মান্যিগণ্যি আর সহবত জানে অভয়। বলেছে সুরীনকে, সে আজ্ঞে তোমাদের দশজনার কিরপা সুরীন খুড়ো! তা, জীবনের আগে পাছে টান নেই, ওই নিয়েই কাটিয়ে দেব জীবনটা।

    –তাতে হয় না অভয়। ওটা তোমার প্রাণের সাধ বুঝলাম। কাটাতে পারছ কোথায় বাবা। তোমাকে পেটের জন্যে পরের জমিতে লাঙল চষতে হয়, চাকরান খাটতে হয়। দশটা বাড়িতে নানান রকম কাজ করতে হয়। শুধু গান গেয়ে পেট চলার টাইম চলে গেছে।

    কী চলে গেছে বললে?

    –টাইম, টাইম মানে দিনকাল। আবার কলকারখানার হাজিরার টাইমও হয়, বুঝলে না?

    –হ্যাঁ, কথাটা শুনেছিলাম কিনা আগে।

    –তা যা বলছিলাম, একটু থিতু হয়ে বসতে হবে, বুঝলে। মানে কথা, গান করবে সবই করবে, কিন্তু ঘর সংসারও তো করতে লাগবে, না কী?

    অভয় অবাক হয়ে বলেছে, আমার ঘর সংসার?

    –হ্যাঁ গো, তোমার। কেন, হতে নেই?

    হতে আছে, কিন্তু হয় কেমন করে, তা জানিনে।

    বলে দু চোখ ভরে বিস্ময় সংশয় অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে থেকেছে দূরে। তারপর নিঃশব্দে হেসে উঠেছে আপন মনে।

    সে হাসি দেখে, সুরীনের বুকের মধ্যে টনটন করে উঠেছে। এমন মানুষকে লোকে পাগল বলে।

    বলতে পারে। জীবনের যে সোজা পথ দেখেনি, সমতল দেখেনি, খানা-খন্দ-নালা ঘেঁটে চলেছে, প্রাণের তলায় যার অনেক আগুন, লোকে তাকে পাগল বলে। ঘরের ফাঁদ এড়িয়ে সে বৈরাগী হয়ে জীবন কাটাতে চায়। একদিন সুরীনও তাই চেয়েছিল। তবু গান গাইতে, বাঁধতে জানত না। অনেক জায়গায় ঠেকতে ঠেকতে, শেষ ঠেকেছে ভামিনীর ঘরে।

    সুরীন বলেছে, ঠিক কথা বলেছ বাবা, কেমন করে হয়? থিতু হয়ে বসা বড় কঠিন জিনিস। চাইলেই বা দেয় কে। তা তোমার এটি ব্যবস্থা আমার হাতে রয়েছে, তাই বলছি। মনের মতো। একটি ছেলে পেলে, নিজের মেয়ে ঘর, সব দিয়ে যেতে চায় একজন।

    –মনের মতো ছেলে?

    –হ্যাঁ। চলো, মন না চায়, দেখে শুনে ঘুরে চলে আসবে।

    গলা নামিয়ে বলেছে অভয়, শুনে আমার মন বড় আনচান করে উঠছে খুড়ো।

    করবে বইকী, করা উচিত। তাদের দরকার, তোমার হলে ভাল হয়, মাঝখান থেকে আমি মিলিয়ে দেবার মানুষ মাত্তর।

    অভয় কথার জবাব না দিয়ে গুনগুন করে গেয়েছে,

    বলেছিলে মনের মতো,
    সেই ভাবেতে ছিলাম রত।
    এত কথা মনে ফেঁদে
    (এবার) একলা বসে মরি কেঁদে।
    মনের যে নাই কোন শর্ত।

    গেয়েই লাফ দিয়ে উঠে গলা ছেড়ে বলেছে, ও সব আজ্ঞে আমি কথাটথা দিতে পারব না এখন। গুরুদেবের সঙ্গে কথাবার্তা বলে দেখি, যা বলে তাই হবে। বলেই হনহন করে চলে গেছে। যন্ত্র-ঘাঁটা মানুষ সুরীন। একটু রুষ্ট হয়ে উঠেছিল। তারপরে আবার সামলে গেছে। ডাকলে দশটা ছেলে আসবে এখুনি ছুটে। তা চায় না সুরীন।

    .

    কিন্তু গেল কোথায় অভয়। দিঘির পাড়ে তো তাদের চিহ্নও নেই। গুরু শিষ্য কি আর একসঙ্গে ঘুপচি অন্ধকারের লীলায় মেতেছে।

    জগা আর মদন অস্থির। সুরীনের রক্তেও দোলা লাগছে। এখনও লাগে, চিরকালই লাগবে হয়তো। শ্যামরায়ের দোলমেলায় আসা তার জীবনটাকে একবার পিছন ফিরে দেখে যাওয়া।

    এখানে ওখানে মেয়ে পুরুষের চাপা গলার হাসাহাসি। আর অস্পষ্ট ছায়াগুলির সব বিচিত্রভাবে নড়াচড়া। দেখেশুনে রক্তের মধ্যে জ্বলে চিনচিন করে। দাউ দাউ করে জ্বলার মতো আগুন আর নেই।

    এক জায়গায় গোল হয়ে বসেছে অনেকে। মাঝখানে বসেছে একজন চোলাই রসের ভাঁড় নিয়ে। ঠাওর করে দেখল সুরীন, সেখানে অভয় আর তার গুরু, কেউ নেই। টিমটিম করে একটি হ্যারিকেন জ্বলছে। মদ মেপে মেপে দেওয়ার সময় মদওয়ালা হ্যারিকেনটি উসকে দেয়, তারপর আবার দেয় নিভিয়ে। যদিও গ্রামের চৌকিদার আর আবগারি দলের লোকও বসে আছে সেখানে গিয়ে। তবু, কাজটা তো বে-আইনি।

    হ্যারিকেনের আলোয় দেখা গেল, দুটি মেয়েও বসে আছে অদুরেই। পুরুষ সঙ্গী নেই। অপেক্ষায় আছে।

    সুরীন ডেকে নিল একটিকে। মদ খেল সবাই বসে বসে। মেয়েটি একটু কম খেল। প্রথম জগা বলল মেয়েটিকে, চিনে রাখো আমাদের সুরীনদাদাটিকে, বুইলে। মেয়েটি হেসে বলল, চিনছি।

    মদন হিহি করে হেসে গা ঘেঁসে বসল মেয়েটির। বলল, আমাদেরও ছিটেফোঁটা চিনো তা বলে।

    মেয়েটি তেমনি হেসে বলল, তাও চিনছি।

    সুরীন তাকাল মেয়েটির দিকে। তারপর চারজনে গিয়ে বসল একটি গাছ তলায়।

    জগার নেশাটা তাড়াতাড়ি চড়েছে। বলল, সুরীনদাদা, তুমি অভেকে সঙ্গে নিতে চাও, আমাদের নয় কেন গো?

    সুরীন বলল, তোর কি বাপ ছিল না?

    –তা হলেই নেবে?

    –হ্যাঁ।

    –তবে নেই।

    –উঁহু, ওরকম হলে হবে না। যার তিন কুলে কেউ নেই, সে রকম ছেলে চাই। তোর বউ আছে, তুই পালিয়ে আসবি।

    বউ নিয়ে যাব। আমাকে নিয়ে চলো।

    বউ থাকলে হবে না। কুকুর একটা থাকলেও হবে না।

    কিছুক্ষণ পরে, কাছেই অভয়ের গলা শোনা গেল। সুরীন উঠে গেল সেখানে। দেখল, ভটচায আর অভয় বসে আছে।

    ভটচায বলল, কে?

    –আমি সুরীন ঠাকুরমশাই।

    ভটচায প্রায় মহাদেব হয়ে বসে আছে। পায়ের কাছে বসে আছে অভয়। সামনে একটি ভাঁড়। ভটচায বলল, বোসো সুরীন।

    সুরীন বসল। অন্ধকারে মানুষ দেখা যায় না। কিন্তু আলাপে কোনও অসুবিধা নেই। ভটচায বলল, তোমার তো শুনি খুবই বাড়বাড়ন্ত। অভেকে নিয়ে যেতে চাও?

    –হ্যাঁ।

    নিয়ে যাও। কী হবে এখেনে পড়ে থেকে। একটু দেশবিদেশ মানুষজন দেখুক। গান গেয়ে আজকাল আর পেট চলে না। তবে, ছোঁড়া একটু বেশি ভাল। ওই যে বলে না, যাদের যত ছেদা, তাদের তত ঢাকা। ব্যাটাচ্ছেলেকে দ্বিতীয়ভাগের পাঠ শিখিয়েছি, কিন্তু মদ ধরাতে পারিনি।

    সুরীন তাতে খুশি, কিন্তু ভটচাযের সামনে প্রকাশ করা যায় না।

    মাঝখান থেকে অভয় চোলাই মদের ভাঁড়টা তুলে, চোঁ চোঁ করে খেয়ে ফেলল অনেকখানি। ভাঁড় নামিয়ে বলল, নেও, গুরুঠাকুর, হয়েছে? মদ খেলাম, সুরীন কাকার সঙ্গে চলেও যাব। তোমার হিদয়টুকু তাতে জুড়াবে তো। বলে, উঠে হন হন করে চলে গেল।

    সুরীন বসে রইল হাঁ করে। ভটচায অট্টগলায় হেসে উঠল। বলল, দেখলে তো সুরীন। ব্যাটার বাপ কে ছিল, আমি তাই ভাবি।

    ভটচাযের কথা আর হাসি শুনে বুঝল সুরীন, লোকটা ভালবাসে অভয়কে।

    ভটচায আবার বলল, ছোঁড়া কথা বানায় ভাল, গলাটিও মিষ্টি। কিন্তু কপালে জুটবে শেষে ভিক্ষে। নিজেকে দিয়ে তো বুঝতে পারছি। ঘরে এখনও আমার দুটো মেডেল আছে। ভিক্ষে করে মরার চেয়ে বেঁচে থাকা ভাল, নিয়ে যাও। আমাকে এসে বলছিল, না যাবার মন নিয়ে। বলেছি, চলে যা। মনের জিনিস কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। তাইতেই আরও রাগ হয়েছে আমার ওপর। তা, বিয়ে দেবে ওর?

    –হ্যাঁ।

    –ওর জাত জন্ম নেই, কোথায় মেয়ে পাবে?

    –যে মেয়ের জাত জন্ম নেই, সেই মেয়েই পাবে।

    -বেশ্যার মেয়ে?

    –হাফ গেরস্থ।

    ভটচায বলল, ও-ই হল। বাড়ি ঘর আছে?

    সুরীন বলল, কোনওরকম।

    যে রকম দিনকাল পড়েছে, কোনওরকম আমাদের হলে আমরাও আজকে ছাড়তে পারিনে।

    তা জানে সুরীন। সে চটকলের মিস্তিরি। তবু, জিভ কেটে, কানে আঙুল দিয়ে বলল, ছি, ছি, তা কি হয়!

    .

    ০২.

    পরদিন অভয়ের দেখা নেই। আতি গয়লানী বলল সুরীনকে, অভয় আজ যাবে না, বলতে বলেছে। আজ শ্যামরায়ের থানে গান হবে, তা এই পেথমবার অভয় কবি গাইবে। কাল যাবে বলেছে।

    এর উপরে সুরীনের কথা চলে না। জীবনে এই প্রথমবার অভয় আসরে নামতে যাচ্ছে। এখানে বাধা দেওয়া যায় না। পরিবর্তে একদিন বেশি থেকে যাওয়া যায়।

    কিন্তু সারাদিন পাড়ার মধ্যে কৈফিয়ত দিতে দিতে প্রাণ গেল সুরীনের। অভেকে নাকি তুমি নিয়ে যাচ্ছ? প্রমীলার ছেলেটাকে। আ মরণ! কার যে কখন কপাল খোলে। নইলে লক্ষ্মীমন্ত সুরীন কেন সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইবে।

    সন্ধ্যাবেলা সুরীন গেল শ্যামরায়ের মন্দিরের মাঠে। আজকের আসর একটু তাড়াতাড়ি বসেছে। মুকে তুবড়ির বাজি পোড়ানো নেই আজ।

    ঢাকে কাটি পড়েছে এর মধ্যেই। আসরে লোক জমেই আছে।

    আমদাবাদের কবিয়াল শরত সাঁতরা দাঁড়াল। শরত শুধু নামকরা নয়, তার ভালমানুষি কথার-বিষেরই দাম। বয়স হয়েছে। তা ছাড়া সম্পন্ন চাষি, তাই এখনও এদিক ওদিক যাতায়াত করে।

    নিতাই ভটচায়ের কাছেই বসেছে অভয়। ভটচাযেরই একটি পুরনো হাফশার্ট আর ধোয়া ধুতি পরেছে সে। ঘাড় পর্যন্ত চুল নিভাঁজ করে আঁচড়েছে তেলে জলে। গলায় পরেছে মালা।

    শরত উঠে প্রায় আধঘণ্টা ধরে, তেত্রিশ কোটি দেবতার আর গুরুর বন্দনা করল। তারপর অভয়ের দিকে তাকিয়ে তার চোখ দুটিতে ধূর্ত শিয়ালের হাসি উঠল ঝিকিয়ে। গান গেয়ে বলল, শ্যামরায়ের দোলে, গান গাইব বলে, বড় আশায় এসেছি। এখানকার উঁচুনিচু সকল মানুষের কুল ভাল, সমাজ শিষ্ট। অভয়পদ তার নাম ধাম বলুক, বংশ পরিচয়, বাপের পরিচয় দিক, তবে আমি গাইব। অজ্ঞাতকুলশীলের সঙ্গে আমি গান করিনে।

    হঠাৎ একটা চিৎকার শোনা গেল। দেখা গেল, ভটচায চেঁচাচ্ছে অভয়কে ধরে। অভয় আসর ছেড়ে চলে যাবার জন্যে জোর করছে। ভটচায বলছে, বোস বলছি হারামজাদা।

    আসরেও গুলতানি উঠল। অভয় বসতে আবার থামল। দেখা গেল, ভটচায অভয়কে চেপে ধরে কী সব বলছে।

    শরত বসল, কিন্তু অভয় ওঠে না। কই, কী হল গো!

    ভটচায প্রায় ধাক্কা মেরে উঠিয়ে দিল অভয়কে। তখন আর চুলের বাহার নেই, টানা হেঁচড়ায় জামাটিও ছিঁড়েছে। ছেঁড়া মালা কোন ধুলোয় গেছে লুটিয়ে। ডুম ডুম করে উঠল ঢাক। মনে হল যেন ঢাকের প্রহার অভয় নিজের পিঠে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে। অসহায়, পরিচয়হীন বিরাট প্রস্তর মূর্তিটা দাঁড়িয়ে আছে ঘাড় ভেঙে। শত শত কৌতূহলিত বিদ্রুপাত্মক চোখের সামনে, অপমানে ঘৃণায় শক্ত হয়ে গেছে।

    ভটচায হুঙ্কার দিল, গা, গা না। বলে নিজেই উঠে দাঁড়াল আসরে। তার পরে নিজেই ঢাকের তালে তালে তোল দিল, শ্যামরায়ের কাছে, জগত বাঁধা আছে। তুই গা তাঁর নাম করে, ভূত প্রেত পালাবে দূরে। কৌরব কুল কীসে মরে? যখন ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।

    অভয়ের গলা শোনা গেল। কিন্তু মানুষ বড় বিচিত্র। মরা গোরুর মাংসে, মাছির মতো তাদের টিটকারি ভন ভন করে।

    অভয় গেয়ে বলল, শ্যামরায় ছাড়া ওর আর ভজবার দেবতা নেই, তাই বন্দনা করল। গুরু ওর অনেক, তাই ভটচাযকে, শরত সাঁতরাকেও বন্দনা করল। সাঁতরা কেন গুরু? না, মনে করিয়ে দিয়েছে একটা কথা। কী? না…।

    তবু গলা চড়ে না অভয়ের। ঢাকের বোল চড়া। সে গাইল একটু টেনে টেনে,

    বলে গেছেন কবি ব্যাসদেব
    কন্নেরও বাপ ছিল।

    এইটুকু ধুয়া রেখে গাইল,

    জগতের জন্মদাতা, ব্রহ্মা পিতা,
    জন্ম দিলেন মানুষেরে।
    তিনি আদি ছেলের আদি পিতা
    নাই অন্যথা
    এর বাড়া এর বাপ নাই রে ॥
    তিনি আপনার পিতা, আমার পিতা,
    সবার পিতা, কবির পিতা,
    ও ভাই মানব জনম সার্থক হল।
    কন্নেরও বাপ ছিল।

    কিন্তু জমতে চায় না। শরত সাঁতরার টক-ঝাল-নোনতার মধ্যে এ যেন কেমন পানসে পানসে লাগে। শতর যেদিকে স্রোতের ঢল বইয়েছে আসর সেদিকে নেমে গেছে। তাকে টেনে ভোলা দায়। অভয়ের গলা বন্ধ হয়ে আসে, ঘাম ঝরে সর্বাঙ্গে। তবু গায়,

    ইংরাজের যীশুখিরিষ্ট, মহা ইষ্ট
    কী আছে তাঁর বাপের পরিচয়,
    তিনি সাদার পিতা, কালার পিতা,
    তাঁহারে গড় করি মহাশয়।

    কিন্তু ভটচাযের এত শেখানো অস্ত্র দিয়েও অভয় দাগ কাটতে পারল না। সভায় গণ্ডগোল লেগে গেল।

    ভটচায উঠল। হাতজোড় করে অভয়ের হয়ে গান চালাবার অনুমতি চাইল। শরত সাঁতরা অনুমতি দিল, অনুমোদন করল সভা। মুখ ঢেকে বসল অভয়। জীবনে এই তার প্রথম আসরে নামার আদিপর্ব।

    পুকুরের গা ছাড়া পানা যেমন ধীরে ধীরে জমে, ভটচাযের আসরে নামায় সভা তেমনি ঘন হল আবার।

    ভটচায প্রথমেই গাইল,

    হায় একী হাল, কী কলিকাল!
    বেড়ে মজা দেখালি মা।

    শরতকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল,

    আসরেতে দাঁড়িয়ে বাপ,
    ছেলেকে বলে বেজন্মা।
    হায় কলিকাল…!

    আসরের নেশা চড়ল। মড়ার রক্ত পেল মাছিরা। তারপর,

    অভয়ের বয়স কুড়ি বছর।
    তার আগের বছর…
    তার আগের বছর, দশমাস দশদিন আগে
    প্রমীলার ঘরে শরত জাগে
    জানে এই শর্মা ॥
    ছেলেকে বলে বেজন্মা।
    হায় কলিকাল…!

    উল্লাসে, হুল্লোড়ে, হরিধ্বনিতে উন্মাদ হল সভা।

    শুধু মাথা তুলল না অভয়। সুরীন সেইটাই দেখল বারে বারে। পালটা-পালটি হল গানের, জিত হল ভটচাযেরই। গান শেষ হল।

    শরত সাঁতরা এসে হাত ধরল অভয়ের। দেখেই অভয়ের দু চোখ জ্বলে উঠল। নিমিষে তার শক্ত লম্বা হাত তুলে সাঁতরার গালে মারল চড়। মেরেই হকচকিয়ে গেল একেবারে।

    ভটচায ছুটে এল হা হা করে, আরে হারামজাদা, কী করলি, কী করলি তুই। মারলি?

    বলে, ঢুলির হাত থেকে বেতের কাটি নিয়ে অভয়কে পিটল ভটচায। বলল, শালা, তোর জন্যে যে সাঁতরাকে আমি এত গাল দিলুম, তার কী?

    মার খেল অভয় দাঁড়িয়ে। কিন্তু শরত সাঁতরা গাল খেয়েছে। অভয় যে সত্যিকারের অজ্ঞাতকুলশীল। সেই জন্যে আঘাতটাও তার সত্যিকারের।

    এই অভয়ের আসরে নামার প্রথম দিন।

    পরদিন ভোরবেলা অভয় নিজে গেল জগার বাড়ি। ডেকে তুলল সুরীনকে। বলল, কখন যাবে।

    –এই তো, এখুনি ফাস্ট গাড়ি ধরতে হবে। তা তোমার জিনিস-পত্র?

    অভয় খানকয়েক বই-খাতা দেখিয়ে বলল, সব নিয়েছি।

    সুরীন তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তা বেশ।

    অভয়কে নিয়ে চলে গেল সুরীন।

    .

    ০৩.

    বেলা প্রায় এগারোটার সময় শহরের মালিপাড়ায় এসে পৌঁছুল। উঠোনে দাঁড়িয়ে থেকে বলল সুরীন, কই লো ভামিনী, দ্যা কাকে নিয়ে এইচি।

    সুরীনের একদিন দেরি হয়েছে। গলার স্বর শুনে ভামিনী মুখ ঝামটা দিতে গিয়ে থতিয়ে গেল। উঠোনের ওপর অভয়কে দেখে বলল, অ! এই বুঝি? এসো বাছা এসো।

    অভয় উপুড় হয়ে প্রণাম করল ভামিনীকে।

    যেন সাপ দেখে চমকে উঠল ভামিনী। থতিয়ে গিয়ে, দু পা পেছিয়ে বলল, ওমা, কোজ্জাব গো। একী, গড় করা কেন?

    ভামিনী হাসবে না কাঁদবে, ভেবে পেল না। তার চল্লিশ বছরের জীবনে, কেউ পায়ে হাত দেয়নি। দেওয়ার দরকার হয়নি। তার জীবনের সীমানার মধ্যে, ও সব পাট কোনওকালেই ছিল না। নিজেরা প্রণাম করেছে ঠাকুর দেবতাদের উদ্দেশে, ব্রাহ্মণ পুরোহিতের পায়ে। কিন্তু এতখানি জীবনে তার পায়ে হাত দেওয়ার মানুষ জোটেনি।

    সুরীন বলে উঠল, তা করুক না। ওটা অল্যাজ্য তো কিছু হয়নি।

    ভামিনীর সঙ্গে সুরীনের একবার চোখাচোখি হল। কীসের একটু ইশারা ছিল সুরীনের চোখে।

    ভামিনী আর কোনও কথা বলল না।

    অভয় বলল, সুরীনখুড়োর ইস্তিরি, বয়সে কত বড়, গড় না করলে চলে?

    ভামিনী একবার তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল অভয়ের দিকে। দেখে নিল, কথার মধ্যে আসলে কোনও খোঁচা আছে কিনা। কেন না, সুরীনের ইস্তিরি কেউ বলে না তাকে।

    কিন্তু অভয়ের ভাবসাব দেখে, উলটে ভামিনীর হাসি পেল। একটু যেন কেমন লাগে। পাগল নয় তো।

    দাওয়ার ওপর মাদুর পেতে দিল ভামিনী। বলল, এসো, বোসো।

    সুরীন বলল, হ্যাঁ, বসো বাবা। একটু জিরিয়ে নাও, তারপর হাত মুখ ধুয়োখনি। একটু চা খাবে?

    গতকাল রাত্রের গ্লানিটা এখনও যায়নি অভয়ের। নতুন জায়গায়, নতুন শহরে ও মানুষের মধ্যে এসেও, সাড়া পড়েনি তার প্রাণে। যেন আপন-জন, সাধ-আহ্লাদ, সব কিছু ছেড়ে, সে নির্বাসনে এসেছে।

    চা খাওয়ার অভ্যাস নেই অভয়ের। কিন্তু না খেয়েছে তা নয়। ঘাড় নেড়ে জানাল, খাব।

    সুরীন ঘরের মধ্যে গেল। ভামিনী এসে ফিসফিস করে বলল, মাথা খারাপ নাকি?

    সুরীনও চাপা গলায় বলল, না, মাথা ভালই। ছেলেও খুব ভাল। তবে একটু ওই রকম। গাইয়ে মানুষ তো। কথা একটু মাজা ঘষা। দশজনের চেয়ে ওইখানে তফাত। তবে মনটা খুবই ভাল। এখন তোরা যদি খারাপ না করে দিস, তবেই—

    অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে, ঠোঁট টিপে একটু হাসল সুরীন।

    ভামিনী চাপা গলায় ঝেজে উঠল, মরণ! মুখে আগুন তোমার।

    সুরীন নিঃশব্দে হেসে উঠল। বলল, তার ওপর কাল রাতে বড় মারধোর খেয়েছে ছেলেটা।

    ভামিনী বিস্মিত হয়ে বলল, ওমা! কেন?

    সুরীন চুপিচুপি গলায় গানের আসরের ঘটনা বলল। বলল, নিতে ভটচায বড় জবর মার মেরেছে ছেলেটাকে।

    শুনে কয়েক মুহূর্ত হাঁ করে রইল ভামিনী। নতুন কৌতূহলে, সে উঁকি মেরে আবার দেখল একবার অভয়কে।

    সুরীন গলা বাড়িয়ে বলল, তা লে, একটু চা টা দে।

    ভামিনী কয়েক মুহূর্ত চুপ করে, মুখখানি গম্ভীর করল। কিন্তু গম্ভীর মুখে চাপা গলায় কথা বলা বড় মুশকিল। তাতে গাম্ভীর্য বজায় থাকে না যেন।

    তবু বলল ভামিনী, ছেলেটার জামাকাপড় কোথায়?

    সুরীনও গম্ভীর হল। বলল, নেই!

    ভামিনী বলল, জামাকাপড় নেই, কাজকর্ম নেই। তবে কি ঘরে বসিয়ে পুষবে নাকি?

    ঘরের বউ হোক আর বাইরের বউ-ই হোক, মন ওই একটিই। ভামিনী ও কথাটা না বললেই বরং অবাক হত সুরীন। বলল, সে ব্যবস্থা হবে, তোকে ভাবতে হবে না। আমার ঘরে থাকবার জন্যে তো আসেনি। তোর একটা মেয়ে থাকলে না হয় তাই করতুম। এখন যা, চা করে নিয়ে আয়, কথা পরে হবে।

    ভামিনী যাবার আগে বলে গেল, তার চেয়ে, যার হবু জামাই, তার বাড়িতে তুললেই পারতে, এখানে কেন?

    সুরীন ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর বাইরে, দাওয়ায় এসে বসল অভয়ের পাশে। অভয় মাথা নিচু করে বসেছিল।

    সুরীন বলল, কী গো, লজ্জা টজ্জা করছে নাকি?

    সুপ্তোত্থিতের মতো চমকে উঠল অভয়। বলল, এঁজ্ঞে না, লজ্জা করব কেন? ভাবছিলুম—চুপ করে গেল অভয়। সুরীন বলল, কী ভাবছিলে?

    কালকের কাজটা আমার বড় অন্যায় হয়ে গেছে। সাঁতরাকে মারা আমার ঠিক হয়নি।

    সুরীন বলল, আমি সেটা মানব না। তোমাদের আসরের অনিয়ম কতখানি হয়েছে জানিনে। কিন্তু সাঁতরা তোক ভাল নয়।

    অভয়ের চোখ দুটি এমনিতেই একটু ভাব-তন্ময়। খানিকক্ষণ দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে, যেন চুপি চুপি বলল, সুরীন খুড়ো, খোজঁকে খোঁড়া বললে তার কষ্ট হয়। মানুষে সেইটে বোঝে না! না বুঝুক, খোঁড়ার জ্বালা তাতে জুড়োয় না।

    সুরীন বুঝল, ওই এক ভাবনা ছাড়া আর কিছু মাথায় নেই অভয়ের। বলল, তুমি যা জবাব দিয়েছ, সেটা কজনা পারে। আর হাত তুলে ফেলেছ, তাও সংসারে চলতে গেলে হয়ে যায়। কিন্তু এ সব তুমি এখনও ভাবছ? এটা তো ঠিক নয় বাবা।

    –তা বটে। সুরীন খুড়ো, গুরুর আদেশে এই আমার পেখম আসরে নামা।

    –ভালই তো। আগে তেতো, পরে মিঠে।

    –কিন্তুন লোকে বলে, যার শুরু ভাল, তার শেষ ভাল।

    বটে কথাই তো। খেতে তেতো হলে কী হবে, আসলে যে সেটাই ভাল। নইলে দশ ব্যঞ্জন, বেড়ে দেবার আগে, ওইটি দেয় কেন, বলো?

    কথাটি মনে ধরল অভয়ের। দুই চোখে তার বিস্মিত খুশির ঝিকিমিকি। মুখের ভাব যেন অনেকখানি হালকা হয়ে গেল। বলল, হ্যাঁ এটা তুমি বেশ বলেছ সুরীন খুড়ো। নইলে দেয় কেন?

    ভামিনী মুড়ি আর চা দিল সামনে।

    সুরীন বলল, নাও, খাও। নতুন জায়গায় এয়েছ, একটু এদিক ওদিক দেখ।

    অমনি অভয় বলে উঠল, হ্যাঁ, কিছু মনে কোরো না গো খুড়িমা। আমার তেমন ভালমন্দ জ্ঞান নেই।

    ভামিনী ফিরে তাকাল। ঠোঁটের কোণে তার হাসি মিটমিট করছে। বলল, না, মনে আবার কী করব।

    আবার বলল অভয়, সুরীন খুড়ো বললে, ভাবলুম, দেখি, একবার কপাল কে, কী আছে। এখেনে। তবে, কথায় বলে, তুকতাক ছ মাস, কপালের ভোগ বারো মাস। কপালে দুঃখু থাকলে, তাকে বাঁধবে কে?

    ভামিনীর বারে বারেই হাসি এসে যায়। সঠিক কোনও কারণ নাই তার। অভয়ের ভাবভঙ্গি, কথা শুনলে আপনি হাসি পায়। বলল, কপালে দুঃখু কেন থাকবে। যে জন্যে তোমাকে নিয়ে এসেছে, তাতে তোমার ভালই হবে।

    একটু আগেই ভামিনীর প্রতি সুরীনের মনটা যে বিরূপ হয়েছিল, সেটুকু কেটে গেল। ভামিনীর মুখ দেখেই বুঝতে পারল, মুখে যা-ই বলুক, ছেলেটাকে ভাল লেগেছে তার।

    অভয় মুড়ি তুলতে যাচ্ছিল মুখে। ভামিনীর কথা শুনে বলল, সেটা হলফ করে বলা যায় না খুড়িমা। কপাল তো আমার।

    সুরীনের মুখ দেখে ভামিনী চুপ করে গেল। কথা বাড়াতে চায় না সুরীন।

    অভয় হঠাৎ সুর করে, নিচু গলায় গেয়ে উঠল,

    জোনাকির আলো, দেখতে বড় ভাল
    তাতে আগুন জ্বলে না।…

    বাকিটুকু শেষ করে, থেমে গেল অভয়। সুরীন বলল, বাঃ বেশ কথা। তারপর?

    ভামিনী বলল, গলাটিও মিষ্টি।

    অভয় তাড়াতাড়ি বলল, বড় ভুল হয়ে গেছে সুরীন খুড়ো। ভুলে গেয়ে ফেলেছি।

    ভামিনী আর সুরীন চোখাচোখি করে, চুপ করে গেল। অভয়ও নীরব। নীরবতাটুকুও আবার অভয়ের লজ্জার কারণ। সে মচ মচ করে মুড়ি চিবুতে লাগল।

    ভামিনীর প্রাণে যে একটু দুঃখ না হচ্ছিল, তা নয়। তবু অভয়ের মধ্যে আত্মভোলা ছেলেমানুষি ভাবটি, থেকে থেকে হাসির উদ্রেক করছিল তার।

    সুরীন বলল, তুই আর দাঁড়িয়ে রইলি কেন গো ভামিনী রান্না করে নিয়ে যা, অভয়কে নিয়ে আমি একটু ঘুরে আসি।

    কয়েকটা টাকা সঙ্গে অভয়কে নিয়ে বেরুল সে।

    সুরীনের বাড়ির মতোই আশেপাশে খান পাঁচ সাতেক বাড়ি। টালি ছাওয়া চাল, ছিটেবেড়ায় মাটি লেপা দেয়াল, হাত পা মেলবার মতো ছোট একটি উঠোন। সরু গলির একপাশে গঙ্গা, আর এক পাশে বাড়িগুলি।

    এই বাড়ি কটি পার হয়ে, পশ্চিমে আরও অনেকগুলি বাড়ি। সেগুলি আরও ঘিঞ্জি। তবে সবই কাঁচা নয়, পাকা বাড়িও আছে দু একখানা। কিন্তু ছোটখাটো, ভাঙাচোরা পুরনো। তারপরে বড় বড় পাকাবাড়ি, সারি সারি চলে গেছে উত্তর দক্ষিণে। দোতলাই বেশি, তেতলাও আছে খান দুয়েক।

    ঘিঞ্জি পাড়াটির দু পাশে, এখানে সেখানে কয়েকটি মেয়েমানুষ বসেছিল ইতস্তত। কেউ কথা বলছে, কেউ চুল এলিয়ে দিয়ে বসেছে, উকুন মারছে আর একজন।

    একটু বেশি বয়সী একজন জিজ্ঞেস করল সুরীনকে, কাজে বেরোওনি মিস্তিরি দাদা?

    সুরীন বলল, না ছুটিতে আছি। একটু দেশে গেছলুম, কাল জয়েন করব।

    সবাই তাকিয়ে দেখল অভয়কে। সোজা চোখে নয়, চোখের কোণে তির্যক দৃষ্টি হেনে, ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে দেখল। কাপড় পরার ধরনধারণও একটু কেমন যেন তাদের। বাতাস নেই, কেউ টানা হ্যাঁচড়াও করছে না। তবু আঁচলগুলি যেন বেসামাল। সাজগোজার ব্যাপার নয়। চিলতে জামায় অনেকখানি খোলা গায়ে, সবাইয়ের শরীর কেমন একটু খোঁচা খোঁচা দেখাচ্ছে।

    বর্ধমানে, কাটোয়ায়, গাঁয়ের মেলায় এ রকম মেয়েমানুষ অনেক দেখেছে অভয়, চেনেও। এ সব দেখে তার মনে কোনও বিকার হয় না। কিন্তু সুরীনকাকার বউয়ের সঙ্গেও কোথায় যেন একটি অস্পষ্ট মিল রয়েছে এদের সঙ্গে। কথাবার্তা ব্যবহারে নয়। খুড়ির সবটুকু চিনলেও, মানুষটিকে ভাল লেগেছে অভয়ের। হ্যাঁ, মনে পড়েছে, বাঁকা সিঁথিতে সিঁদুর আর কপালে খয়েরি টিপ। সামান্য জিনিস। কিন্তু মানুষকে কেমন যেন অন্যরকম দেখায়।

    গাঁয়ে, তার বন্ধু নেয়ামত মাঝে মাঝে তাকে বাড়ি নিয়ে যেত, বিবিকে গান শোনাবে বলে। বিবি বেরুত অভয়ের সামনে। তার বাঁকা সিঁথের সোনালি রং আর কপালে কাজলের টিপ থাকত। কিন্তু সে যে নেয়ামত চাষির বউ, বোঝা যেত।

    সেটা একরকম, এও আর একরকম। সেটার মধ্যে মুসলমান ঘরনিকে চেনা যায়। এখানে হয় যেন হাটের প্রত্যয়।

    ঘিঞ্জি বাড়িগুলি পার হয়ে, একটি বড় বাড়ির পাশ দিয়ে, বড় রাস্তায় এসে পড়ল দুজনে। সেখানে গাড়ি ঘোড়ার ভিড়। সারবন্দি সাইকেল রিকশার মিছিল। আরও পশ্চিমে গঞ্জ, রাস্তার ওপরে বড় বড় দোকান-পাট। অভয় পড়তে পারে। দু চোখ ভরে বাংলা সাইনবোর্ড পড়ে গেল। প্যারাডাইস আর্ট গেলারীকে সে পড়ল, প্যারাডাইসো, আ-ট-গ্যালারি। নীচে লেখা আছে, স্টেজ, ড্রেস ও পেন্টার সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। তারপরেই দেশী মদের দোকান। রেস্টুরেন্ট, মনিহারি দোকান, মুদিখানা, তারপরেই ভুগি-তবলা-খোল, পাশে হারমোনিয়মের দোকান।

    সুরীনের পিছনে যেতে যেতে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ল অভয়। খোল বাজানোটা ভাল রপ্ত আছে তার। শ্যামরায়ের এদিক নেই, ওদিক আছে। মুখুজ্জের নির্দেশে প্রতিদিনই খোল বাজিয়ে গান করেছে অভয়। ডুগি তবলাতে কোনওদিন হাত পড়েনি তার। জীবনে কয়েকবার হারমোনিয়ম টিপেছে। কিন্তু সুরের দিশা পায়নি।

    সুরীন ফিরে বলল, কই, এসো।

    মনে মনে হাসল সুরীন। মুখে বলছে, ভুলে গান গেয়ে ফেলেছে। গানের সরঞ্জাম দেখলে, সেখান থেকে আর পা উঠছে না ছেলের।

    অভয় বলল, বদ্ধোমানের চেয়েও এ শহরখানির রং চং বেশি দেখছি।

    সুরীন হেসে বলল, বড় জবর রং বাবা। চোখ কানা হয়ে যায়। এ শহরের আর এক নামই হল রং-এর শহর, বুয়েচ? সেজন্যে, তিনটি চোখ দরকার এখেনে।

    খানিকটা অবুঝের মতো হেসে বলল অভয়, অ। তাই বুঝিন?

    হ্যাঁ বাবা।

    তারপর রেডিয়োর গান শুনল অভয়। আগেও শুনেছে বর্ধমানে। গাঁয়েও শুনেছে। বাবুদের বাড়িতে ব্যাটারিতে রেডিয়ো শোনা যায়।

    অভয়ের মনের গুমোট কেটে গেল অনেকখানি। মহামায়া অপেরা পার্টির সামনে দাঁড়িয়ে দেখল, ছোট ছোট ছেলেদের মহড়া চলছে নাচ গানের। পায়ে ঘুঙুর বেঁধে সবাই নাচছে আর গাইছে,

    চোখের কোণে আঘাত হেনে
    যেয়োনা গো, যেওনা।

    অভয় বলল, এই বড় বড় বাড়ি-দালান কীসের খুড়ো?

    সুরীন এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, মেয়েমানুষের বাড়ি, মানে কথা, বেবুশ্যেদের।

    এবার অভয়ের বাক্য হরে গেল। এত বড় বড় বাড়িতে শুধু বেবুশ্যেদের বাস! যেন পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেনি, এমনি চোখে তাকাল অভয়। তারপর বাড়িগুলির দিকে ফিরে তাকাল নতুন চোখে। ইতিমধ্যে বারকয়েক দোতলার বারান্দায়, জানালায় দু একটি মেয়েমানুষকে চোখে পড়েছে। কিন্তু একবারও বুঝতে পারেনি। বড় মানুষের বাড়িই ভেবেছে। ভেবেছে, তাদেরই ঘরের। মেয়েছেলে। ওই যে দেখা যায়, নীলাম্বরীর আঁচল এলিয়ে রেলিং-এ ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েমানুষটি, গলায় সোনার হার, কানে দুল, হাতে একরাশ চুড়ি। সেও তবে বেচা-কেনার পশরা।

    সুরীন ডাকল, এসো অভয়পদ।

    সামনেই একটি কাপড়ের দোকানে তাকে ডেকে নিয়ে তুলল সুরীন।

    অভয় বলল, কী হবে?

    –তোমার একটি জামা, আর একটি কাপড় কিনব।

    অভয়ের মনটা আনন্দে ভরে উঠল, কিন্তু অস্বস্তি হল তার দ্বিগুণ। এই সমস্ত আত্মীয়তার ব্যাপারটা এখনও পরিষ্কার হয়নি তার কাছে। সুরীনকে সে চেনে, গাঁয়ের দশজনের কাছেও শুনেছে। অনেক কথা। তবু নিজের অধিকার সম্পর্কে অভয়ের খুতখুতুনি যেতে চায় না। বলল, থাক না, দু দিন পরে হলেও চলত।

    সুরীন শান্ত হেসে বলল, তা কি চলে কখনও বাবা! এখন হয়তো তোমার মনে দশরকম গাইছে, পরে আর তা থাকবে না। কিন্তু আমি তোমাকে ঘরে এনে তুলেছি। দু পাঁচজন লোক আসে আমার বাড়িতে। তোমার একটি জামা কাপড় থাকবে না, সে কী হয়? আর…যখন তুমি রোজগার করবে, হাতে পয়সা পাবে, তখন শোধ দিয়ে, তা হলেই হবে তো?

    অভয় আর কিছু বলল না।

    দশ হাত একখানি মাঝারি ধুতি নিয়ে সুরীন বলল, কেমন জামা নেবে বলো তো? সাট না পাঞ্জাবি?

    –সে আবার কী?

    –এই আমার মতো নেবে? গলায় এই কলার, না এটি ছাড়া।

    অভয়ের চোখের সামনে ভেসে উঠল শরত সাঁতরার পাঞ্জাবি। নিতাই ভটচাযও যখন আসরে নামত, সে রকম জামাই গায়ে দিত। বলল, ওটা ছাড়াই হোক।

    অর্থাৎ কলার ছাড়া, পাঞ্জাবি চায়। লংক্লথের রেডিমেড পাঞ্জাবি সুরীন কিনল।

    দোকান থেকে বেরিয়ে অন্য রাস্তা ঘুরে বাড়ি ফিরে এল দু জনে।

    শৈলবালা আর ভামিনী ছিল উঠোনে। ভামিনী বলল, ওই যে, এসেছে।

    মধ্যবয়সী শৈলবালা, বিধবার বেশ। মোটাসোটা মানুষ, কেমন একটু অপলক দিশাহারা চাউনি।

    সুরীন বলল, এই যে, শৈলদিদি, এয়েছি? এই আমাদের অভয়।

    শৈল অভয়কেই দেখছিল। ঠিক অনুমান করতে পারছিল না, মানুষটি কেমন! বলল, অ!

    সুরীন অভয়কে বলল, তোমাকে শৈলদিদির কথা বলেছি তো, এই সেই।

    অভয় নত হয়ে প্রণাম করল শৈলকে। শৈলও প্রায় ভামিনীর মতোই হা হা করে উঠল, না গো। বাবা, না না। এ পায়ে হাত দিয়ো না, ছি!

    সুরীন চাপা গলায় প্রায় ধমকে উঠল, আঃ, ও কী কথা শৈলদিদি। তোমার জামাই হবে, পায়ে হাত দেবে না?

    শৈলবালার দু চোখ ফেটে জল এল। ফিসফিস করে বলল, সারা জীবন আঁধারে থেকে, ছি ছি। ছাড়া আর কী বলব আমি। আমার যে সবই ছি ছি!

    .

    ০৪.

    সুরীন দেখল, শাশুড়ি জামাইয়ে মিলবে ভাল। শৈলদিদিও যেমন পাগল, অভয়ও তেমনি আর এক পাগল।

    শৈলকে চেনে সে অনেকদিন। অভয়কেও চিনেছে হালে। অবশ্য তফাত একটু থাকবেই। কেন না, দুজনের জীবনধারার রীতিনীতি আলাদা ছিল। অভাবকে চেনে অভয়, ক্ষুধা কাকে বলে। সেটা বোঝে মর্মে মর্মে। কিন্তু সংসারের সেইটাই সবচেয়ে বড় পরিচয় নয়। সংসারের আর একটি বড় পরিচয়, অভয়ের গান। নদীতে স্রোত আছে, ঢেউ আছে, সেটা এক কথা। তা ছাড়াও আছে দহ এবং ঘূর্ণি। নদীর সুদীর্ঘ পথে সে যে কোথায় ওতপেতে আছে হিংস্র থাবা বাড়িয়ে, সেটা ঠাহর। করা বড় কঠিন।

    লোকে খাটিয়ে নিয়ে খেতে দেয় না, সেটা অভয় বোঝে। সাঁতরা কবিয়ালের মন বোঝে নি অভয়, তাই মেরে বসেছে।

    প্রাণের বশে চলে অভয়, বুদ্ধির বশে চলে না। এ সব মানুষ জীবনভর দুঃখ পায়। কেননা, এরা প্রাণ খুলে হাসে, কাঁদেও প্রাণ উজাড় করে। ঘৃণা করে রুদ্র হয়ে, ভালবাসে গোলামের মতো। সেজন্যে এরা শত অভাবের মধ্যেও দুটি পয়সা জমিয়ে, এক চিমটি কেনার কথা ভাবে না। সেই সময়টা বসে বসে গান বাঁধে।

    অভয়ের সঙ্গে শৈলবালারও এক রকমের মিল রয়েছে।

    ভামিনীর আগে শৈলবালার সঙ্গে সুরীনের চেনাশোনা। আজ সে প্রকৃত ঘাটে এসে উঠেছে কি বোঝে না। বছর বাইশ আগে সুরীনের জীবন তখনও পুরোপুরি অঘাটে ঘুরে মরছিল। রোজগার। করে বটে, মন বসাবার ঘর নেই। জোয়ান বয়স, রক্তের টানেই যেত শহরের বারোবাসরে। সরকারি কার্ড নিয়ে শৈলবালা তখন দেহের ব্যবসা করে। বয়স তখন শৈলর বাইশ-চব্বিশের মতো।

    এই যে বসে বসে শৈল এখন প্যাঁচাল পাড়ছে, দেখে মনে হয়, আজও সেই শৈলই বসে আছে। যেন। আগের তুলনায় মোটা হয়েছে বটে। বয়সও হল পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ। কিন্তু কটা রংটি আছে ঠিক। চোখ দুটি তেমনি ছেলেমানুষের হারিয়ে যাওয়ার মতো দিশেহারা। তার মধ্যে একটি কিশোরী মেয়ের আবেশ মাখানো চোখে। ভামিনীদের মতো কোনওদিনই তাকে বারোবাসরের

    মদমত্তা নাগরী বলে মনে হতো না। . যৌবনের অভাব ছিল না তার শরীরে। শেষপ্রান্তে এসে আজও যৌবন না-ছোড়বান্দা। মেয়েমানুষের প্রতি যে-পুরুষের স্বভাব-টান আছে, তারা এখনও শৈলবালার কাছে কাছে ঘোরে। কিন্তু তখন এবং এখন, সব সময়েই একটি গৃহস্থ আটপৌরে মেয়ের মতো মনে হয় তাকে। ছিটেফোঁটা রূপের সঙ্গে যৌবন যে তার ছিল, সে-বিষয়ে সে কেমন যেন বরাবরই অচেতন। কিংবা বেশি সচেতন, তাই রেয়াত করেনি। কিন্তু সেটা মনে হয় না তাকে দেখে।

    দেহ বিক্রি করতে এসে, সোহাগ কেড়ে দাম বাড়াবার ছলনাটা রীতি। শৈলবালার সেটাও রপ্ত ছিল না। সবাই তাকে বোকা মেয়েমানুষ বলেই জানত। বাড়িউলি বলত, সাজগোজ করেও তুই দেখছি একটা মড়া। কে কত দাম দেয়, তোর সময় কাড়ে, সেটাও আন্দাজ পাসনে। মিছিমিছি এ রাস্তায় আসা কেন বাপু।

    কথাটা মিথ্যে নয়। শৈলকে দেহোপজীবিনী হিসেবে মনে হয়, বোধশোধ নেই যেন। এ জীবনে আনন্দ না থাক, নিরানন্দ থাকার কথা নয়। শৈলকে দেখে সেটুকু অনুমান করা দুঃসাধ্য ছিল।

    সুরীন যেদিন প্রথম তার ঘরে গিয়েছিল, সেইদিন ফিরে যাবার সময় শৈল তাকে বলেছিল, আবার এসো।

    কথাটি শৈল সবাইকেই বলত। খুবই যান্ত্রিক ভাবে বলত। বোঝা যেত, কথাটি শেখানো। এমনিতেই কেমন যেন সুরীনের খাপছাড়া লাগছিল মেয়েটিকে। কথা শুনে তার মেজাজটাই। গিয়েছিল বদলে। মনে হয়েছিল রাতটা ব্যর্থ হয়ে গেছে তার। কিন্তু রাগ করতে পারেনি। শৈলকে। ভাল লেগেছিল তার।

    তবে শৈলর জন্য একদল মানুষ সব সময় উৎসুক ছিল। তাদের মধ্যেই একজন শৈলকে বেশ্যালয়ের বাইরে নিয়ে এসেছিল। বেশি দূর নয়, পাড়ার কাছেই আলাদা একটু জমি কিনে, ছিটেবেড়ার একখানি ঘর তুলে দিয়েছিল। তারপরে শৈলর মেয়ে হল।

    যে শৈলকে ঘর দিয়েছিল, সে মারা গেছে। তারপরে দু চারজন বাস করে গেছে শৈলর সঙ্গে। কিন্তু শৈল বড় বিচিত্র রূপে বদলে গিয়েছিল। মেয়ে হওয়ার পর সেই প্রথম টের পাওয়া গেল, শৈলবালার মধ্যে একটি সুষ্ঠু সুশৃঙ্খল সংসার-পিপাসিত মেয়েমানুষ বাস করে। মেয়েকে নিয়ে সে প্রথমে পালাবে ভেবেছিল। কিন্তু পেট বড় দায়। পালাতে পারেনি, মেয়ে আগলানো তার ধ্যান জ্ঞান হয়ে পড়েছিল।

    বারোবাসরের পাড়ার ধারে বাস। বড়দের দেখে, ছোটদের অনুকরণের খেলা একটি অদৃশ্য কলকাটির কারবার। শৈলের মেয়ে নিমি, ছোটকালে অনুকরণ করত। যদিও সেটা খেলা। দিবারাত্রি বাস, কখন কোন ফাঁকে কী দেখেছে। সেইটুকু সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে খেলা করেছে। নিজে উনুনের ছাইয়ের পাউডার মেখেছে মুখে, কাজল দিয়েছে চোখে, শৈলর দশহাত শাড়ি জড়িয়ে দাঁড়িয়েছে দরজার কাছে। সমবয়সী বন্ধুকে বলেছে, আমি যেন আনি মাসি, তুই এসে আমাকে বলবি, কী গো সই। চলো ঘরে যাই।

    টের পেয়ে শৈলর বুক কেঁপে ঝনঝনিয়ে উঠেছে। ছুটে এসে মেয়েকে মেরেছে ঠাস ঠাস করে, হারামজাদি, বজ্জাত, বড় সাধ হয়েছে, না?

    নিমি কেঁদেছে পা ছড়িয়ে বসে। আশেপাশের আধা-গৃহস্থ প্রতিবেশিনীরা ঠোঁট উলটে হেসেছে, মাগির রকম দেখে মরে যাই। বলে মেয়ের রক্তের মধ্যে বেবুশ্যের বাস। উনি তাকে সতী-সাবিত্রী করতে যাচ্ছেন।

    সেইটাই বিস্ময়। সেই শৈলবালা যে এই কারণে মেয়েকে শাসন করতে পারে, গালাগাল দিতে পারে, বিশ্বাস হয় না। বাড়িউলি যাকে মরা বলত, তার মধ্যে যে সহসা একদিন এমনি করে প্রাণ সঞ্চারিত হতে পারে, আগে ভাবা যেত না।

    আগে শৈল কথা বলতে পারত না। এখন বলে। শুধু বলে না, বড় আশ্চর্য সব কথা বলে। কথা শুনলে মনে হয় না, দীর্ঘ জীবন কেটেছে তার পতিতালয়ে। যেন চিরদিনই সে এমনি নিমির মা ছিল। তাকে নিয়েই জীবনের যত ওঠা নামা ছিল তার। কোথা থেকে সে এসেছিল, কেউ জানত না। আঠারো উনিশ বছরের একটি ভীরু মেয়েকে এক আধবুড়ো বিক্রি করে দিয়ে গিয়েছিল বাড়িউলির কাছে। সে বছরটা বাংলাদেশে অজন্মার কাল গিয়েছিল। এ যুদ্ধের মড়কটা হয়তো বেশি হয়েছে। কিন্তু দু তিন বছর অন্তর দূর বাংলায় অজন্ম ও মড়ক কিছু নতুন নয়।

    বাড়িউলি তার ভাবসাব দেখে প্রথমেই ফেলে দিয়েছিল তাকে কয়েকটি পুরুষের হাতে। মানুষ বুঝে নানান রকমের ওষুধের ব্যবহার ছিল, আছেও এই আধুনিক জীবনের ভয়াল হিংস্র অন্ধকারে। ঘন ঘন অজ্ঞান হত তখন শৈল। কোনও কোনওদিন জ্ঞান একেবারেই থাকত না। কঙ্কালসার হয়ে উঠেছিল শৈল।

    তারপর শৈল বারোবাসরের উপযুক্ত হয়েছিল। যেমন করে বনের পশু বশ মানে। ফিরেও পেয়েছিল স্বাস্থ্য। সুতরাং কোনওকালেই বোঝা যায়নি, কোনওদিন তার বোধবুদ্ধি ছিল কিনা। বোঝা গেল নিমির জন্মের পর।

    বছর কয়েক আগেও লোকজন এসেছে তার কাছে। মদ ভাং খেয়ে নেশা করে এসেছে। কিন্তু জেনেই এসেছে, শৈলবালার ঘরে ঠাঁই পাওয়া যাবে না। নতুন বাড়িতে আসার এই উনিশ কুড়ি বছর, যে কজনা এসেছে, তারা গৃহস্থের মতো বাস করে গেছে শৈলের সঙ্গে। নিমি তাদের প্রত্যেককেই ডেকেছে মেসো বলে।

    এখনও শৈলর কাছে যারা ঘোরাফেরা করে, তাদের চাটু কথায় মাঝে মাঝে ভুলে যায়। সেটা জীবনের অভ্যাসও খানিকটা। শুধু মেয়ের দিকে কেউ ফিরে চাইলেই সে রুদ্রাণী মূর্তি ধরে। সরীন দেখেছে, শৈলদিদির ঠকবার কপাল। ভালমানুষি কোনওকালেই গেল না। যখন যেটুকু পারে লোকের করে। সেদিক থেকে শৈলও প্রাণের বশেই চলে। মেয়েকে যে রক্ষা করে, সেটুকুও প্রাণের বশেই। নিমির যে ক্ষতি করতে চায়, তাকে ছিঁড়ে খাবে শৈল।

    কিন্তু নিমির জন্ম এখানে, এখানেই সে বড় হয়েছে। এই আধা-গৃহস্থ আর পাশের বারবধূ-পাড়ার সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে সে। তার চরিত্রে সে সব কিছু কাজ করেছে বইকী।

    তা ছাড়া মেয়ে আগলানোও এখানে বড় সহজ নয়। যেন শেয়ালের মুখে হাঁস মুরগি-ছানা ছেড়ে রাখার মতো। কখন কোন ফাঁকে ছোঁ মেরে নিয়ে যায় সেই ভাবনা। ঘরে থাকলে, বাইরে শিস দিয়ে ডাকে, নাম ধরে গান গায়। আড়াল আবডাল পেলে তো কথাই নেই। ডাকে হাতছানি দিয়ে। সেই ভয় সবসময় শৈলর। মায়ে মেয়েতে যখন ঝগড়া হয়, তখন নিমি ফুঁসে উঠে বলে, অমন করবি তো বেরিয়ে যাব ঘর থেকে।

    -কোথায় যাবি?

    –যাব, পাড়ায় গিয়ে দাঁড়াব বলে দিলাম।

    অর্থাৎ বারোবাসরের বারোবধূদের সারিতে গিয়ে দাঁড়াবে। নিমি জানত, ওইটি শৈলর সবচেয়ে বড় রাগ, বড় দুর্বলতার জায়গা। শোধ তুলতে হলে, মাকে শাস্তি দেওয়ার ওর চাইতে বড় কথা আর কিছু নেই।

    মারতে গিয়েও শৈলর হাত পা কেঁপে যায়। মাথা ঘোরে, উঠোনে পড়ে দাপায়। নিমি শোধ নিয়ে ঠাণ্ডা হয়। শৈলকে ধরে তোলে। বুকে করে তুলে মাকে আদর করে বলে, মুখপুড়ি, আর লাগবি আমার পেছুতে? এখন চ খাবি, রান্না করেছি। নইলে ভাল হবে না।

    যেমন জায়গায় মানুষ, যেমন মেশামেশি, তাদের হাসি কান্না ঝগড়ায় সেটা না ফুটে পারে না। কিন্তু মন বলে জিনিস। সেটা ঠিক থাকলেই হল। সেইটুকু ভরসা নিমির উপরে। বড় যে রূপসী। হয়ে উঠেছে।

    যত বয়স হয়েছে, ততই নিমির রূপ ফুটেছে। ভাল খাইয়ে পরিয়ে আর দশটি মায়ের মতোই নিমিকে বড় করেছে শৈল। মেয়েকে ভাল হাতে তুলে দিতে হবে।

    ভামিনীকে নিয়ে সুরীনও অনেকদিনের বাসিন্দা এখানে। শৈলর সঙ্গে দাদা-দিদির সম্পর্কটা তাদের প্রথম দিন থেকেই।

    সুরীনকে বারবার বলেছে শৈল, সুরীনদাদা, আমার নিমির মতন ছেলেও তো সংসারে জন্মায়। দেখছি, আশেপাশে তাদের বেথাও হচ্ছে। আমার নিমির তোমরা একটা ব্যবস্থা করে দাও। নইলে, মেয়েটাকে খুন করা ছাড়া আমার মরা হয় না দাদা।

    শুধু সুরীন নয়, অনেককে বলেছে শৈল। মেয়ে দশ বছরে পা দিতে না দিতে বলেছে। একটি ভাল ছেলে এনে দাও, জোয়ান ছেলে এনে দাও। জোয়ান ছেলে, এই মেয়ে আর ঘর যাতে রক্ষা করতে পারে, বার-টান যেন না থাকে।

    অভয়কে এনেছে সুরীন। এর চেয়ে ভাল ছেলে আর কোথায় পাবে সে?

    দেখা হতে না হতে শৈল একরাশ কথা পেড়ে বলল অভয়ের কাছে। বলল, আমি বাবা সংসারে উচ্ছিষ্ট।

    অভয় বলল, মা কখনও উচ্ছিষ্ট হয়।

    অভয়ের কথা শোনে আর শৈলর চোখ ফেটে জল আসে।

    -বাবা, আমার জীবনে অনেক দুঃখ, অনেক কথা। শেয়াল কুকুরেরও বাড়া। তোমাকে আমার বড় ভাল লাগল বাবা!

    অভয় বলে, আমি যদি মন্দ হই?

    শৈল বলে, আমি যে মন দিয়ে বুঝেছি বাবা, তুমি ভাল।

    বিশ বছরের স্নেহহীন শক্ত বুকে অভয়ের আনন্দময় ব্যথায় টনটন করে উঠল।

    ভামিনী মুখ টিপে টিপে হাসছিল। শৈলর চেয়ে তার বয়স কিছু কম। চোখে মুখে সেই ছটা ধরে রাখবার প্রয়াস যেন একটু বেশি। হাসির মধ্যে মাঝে মাঝে তার রাগও হচ্ছিল। ভু দুটি এঁকেবেঁকে উঠছিল। কেন যেন প্রাণের এক গহন দেশে তার জ্বলছিল চিনচিন করে।

    বেলা মাঝখান থেকে ঢল খেয়ে গেছে। সুরীন হেসে বলল, শৈলদিদি, এবার চান খাওয়া দাওয়া করতে হবে যে!

    লাফ দিয়ে উঠল শৈল, ওমা! তাই তো গো। যাই ভাই, উঠি।

    যেতে যেতে ফিরে বলল, শুনে যাও একবারটি সুরীনদাদা।

    বাড়ির বাইরে এসে ফিসফিস করে বলল শৈল, ও সুরীনদাদা, এ যে আমার নিমির চেয়ে ভাল ঘরের ছেলে বলে মনে হয়। কী সহবত, শান্ত।

    সুরীন হেসে বলল, আজ কী বার সেটা দেখে কথা বলো শৈলদিদি। পরে কী হয়, সেটি দেখো।

    শৈল বলল, তা বটে। তা ভাই, তোমার দুটি হাতে ধরি, ছেলেটার একটা কাজকর্ম জোগাড় করে দাও তোমাদের কলে।

    সুরীন বলল, নিশ্চয় দেব আমাদের কলে না হয়, এখানকার কারখানার ম্যানেজারও আমার চেনা মানুষ। সে তুমি ভেবো না।

    শৈল হাসতে হাসতে চোখের জল মুছে চলে গেল।

    .

    ০৫.

    শহরের মানুষ কেউ কাউকে চেনে না, এমনি প্রবাদ আছে। মিথ্যে নয় তা, কিন্তু সবখানে সমান নয়। কলকাতার কথা জানে না অভয়। চন্দননগরেরও সব দেখা শোনা হয়ে ওঠেনি তার। কিন্তু সুরীনদের মতো মানুষের সমাজ সে রকম নয়। অভয়ের বিষয় কোথায় কী বলেছে সুরীন, সে-ই জানে। তা ছাড়া একা শৈলবালাই অনেকখানি। পাড়ার অনেকেই যে যার অবসর মতো একবার করে দেখে গেছে অভয়কে। সব সময় দেখা হয়ে ওঠেনি। কয়েক দিন ধরে অভয় সুরীনের সঙ্গে রোজগারের ধান্দায় বেরুচ্ছে।

    সুরীন ভোরবেলার প্রথম বাস ধরে। তার কারখানা অনেক দূরে। চাঁপদানি থাকতে পারলেই তার পক্ষে সুবিধে ছিল। ভামিনীর মুখ চেয়ে, বরাবর তাকে এখানেই থেকে যেতে হয়েছে।

    কিন্তু অভয়কে সারাদিন থাকতে হয় না কারখানায়। হাজিরা দিতে হয় রোজ। বেলা নটার মধ্যেই আবার ফিরে আসে সে। সেও বড় বিপদের বিষয় হয়েছে অভয়ের কাছে। সুরীনকাকা তাকে পয়সা দিয়ে পাঠিয়ে দেয় বাসে। বাস থেকে নামবার জায়গাটা কিছুতেই ঠাহর করতে পারে না তার নতুন চোখ দিয়ে। প্রথম দিন ভয়ে ভয়ে অনেক আগেই নেমে পড়েছিল। দ্বিতীয় দিন জায়গা ছাড়িয়ে নামতে যাবে, কনডাক্টর ধরেছিল চেপে। চার পয়সা নাকি বেশি দিতে হবে। ও সব হাবাগোবামুখো ভাল মানুষ তারা নাকি অনেক দেখেছে। সব ব্যাটাই সাধু, শুধু অল্প পয়সার টিকেট কেটে বেশি রাস্তা যাবার ফোকটিয়া বাবুগিরির বেলায় সাধুগিরি থাকে না। অপমান বোধ হয়েছিল অভয়ের, রাগও হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কনডাক্টরই বুঝেছিল, অভয় সত্যি নতুন মানুষ। তারাও মানুষ চেনে।

    শহরের এ জীবন পরে কেমন লাগবে কে জানে। এখন সব কিছুই তার ভাল লাগছে, সবাইকেই মনে হচ্ছে আপন জনের মতো।

    এ আসে, সে আসে। মেয়েরা এসে বলে, কই গো ভামিনীদিদি। শৈলীর জামাই দেখাও।

    অভয়ের খুড়ি ভামিনী যেন একটু কেমন কেমন কথা বলে সকলের সঙ্গে। ঠোঁট বাঁকিয়ে ভু কুঁচকে, একটু যেন শ্লেষভরেই বলে, দেখাব আবার কী? আঁচলে করে তো বেঁধে রাখিনি। কী দেখবার আছে, দেখে যাও।

    যারা আসে তারা ভাবে, ও মা! এ কী ঠ্যাকারে ঠ্যাকারে কথা। তুমি খাওয়াও, না তুমি পোষো? তোমার কেন বাপু চ্যাটাং চ্যাটাং কথা!

    মনে মনে বলে। মুখে বলবার সাহস কারুর নেই। বলার দরকারই বা কী। সবাই অভয়কে দেখে যায়। অভয় যেন কেনা-বেচার পুতুল। নড়েচড়ে দেখবার উপায় নেই, চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখে যায় সবাই। খুশি হয়ে বলে যায়, বাঃ, বেশ জামাই হবে শৈলীর।

    কেউ কেউ দু দণ্ড কথাও বলে যায়। অমায়িক মিষ্টি কথাবার্তা শুনে সবাই খুশি। লোকের স্বভাব নাকি এমনি, তারা সব কিছুর খুঁত ধরতে চায়। কালো রং ছাড়া অভয়ের কোনও খুঁত ধরতে পারে না কেউ। বলে, আহা, বেশ বেশ। শৈলীর কপালখানি ভাল। পুরুষ মানুষের আবার রং! চেহারাখানিও দেখতে হবে তো।

    ফিরে গিয়ে বলে, এই মস্ত বুক, এতখানি কাঁধ ছেলেটার। সুরীন জুটিয়েছে একটি মস্ত মদ্দো।

    এই রকম ছেলেই দরকার।

    ওই খুশির রংটুকু ঘষে ঘষে তুললে, একটি অস্পষ্ট দাগ থেকেই যাবে, তাকে ভোলা যাবে না। সেটুকু এক অস্পষ্ট বেদনা, খানিকটা জ্বালা। এ সমাজে ছেলের বড় টান, অর্থাৎ অভাব। আধা-গৃহস্থ কিংবা পুরোপুরি দেহোপজীবিনী সকলেরই সন্তান নেই। তবু একদিন বয়স যায়, রং-রস-স্পৃহা ধুয়ে যায় কালের জলে। তখন একজনের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাবার দরকার হয়। সে-একজন যত খারাপই হোক, মরণের সময়ে তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে মরতে হবে না। অশ্রদ্ধা করেও দৃ গণ্ডুষ জল দেবে। সন্তান যাদের আছে, যাদের নেই, সকলেরই আখেরের ভাবনা বড় ভাবনা। যাদের যৌবনে ঘর ছেড়ে মানুষ উঠতে চায় না, ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে হয়, একদিন তাদেরই ঘরের দোরে নেড়ি কুকুরটাও থাকতে চায় না এক দণ্ড! দেহ পণ্যের আড়ত ছাড়িয়েও, জীবনের কতগুলি নিয়ম এমন একবগ্গা চলে। তাই জামাই কিংবা ছেলে–অন্যথায় উপপতি যেমন সম্পর্কেরই হোক, একটি পুরুষ দরকার। মেয়েমানুষ হয়ে শুধু মাত্র পুরুষ মানুষ নিয়ে কারবার করেও এ সমাজ পুরুষের বড় কাঙাল। যারা এ পথে ভোগ করতে আসে, সেই স্বৈরিণীরা তপস্বিনী সাজতে পারে। যারা ভুগতে আসে, জীবনের তৃষ্ণা তো তাদের কোনওদিন মরে না। তাই তারা নিরাপত্তা খোঁজে।

    তাই শৈলবালার জামাই দেখে খুশি হয়ে হাসতে গিয়ে বুকের গভীরে একটু ফিক ব্যথার মতো খচ খচ করে। নিজের কথা মনে পড়ে তাদের। অভয় অতশত বোঝে না। সকলে আসে, তার লজ্জা করে, কিন্তু ভাল লাগে। সে সকলের সঙ্গে কথা বলতে পারে না। মাসি-পিসি, খুড়ো-জ্যাঠা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। গাঁয়ের জন্যে মনটা টনটন করে এক এক সময়। কিন্তু ভুলে যেতেও দেরি হয় না। একলা বসে ভাববার সময় কোথায়। সর্বক্ষণ কাছে-পিঠে কেউ না কেউ আছে।

    কোনও কোনও সময় মনটা অভয়ের থমকে যায়। ভামিনী খুড়িকে সে সব সময় বুঝে উঠতে পারে না। লোকের কাছে এমনভাবে বলে অভয়ের কথা, যেন সে ভামিনীর কেউ নয়। উটকো ঝামেলা, আপদ বিশেষ যেন। কেউ এসে অভয়ের কথা জিজ্ঞেস করলে, বড় খোঁচা দিয়ে কথা বলে। বলে, মানুষ, তার আবার দেখবার কী আছে? চারটে হাতও নেই, তিনটে চোখও নেই। কখনও বলে, পুতুল খেলনা নাকি যে দেখাব। এ এক কাজ হয়েছে বটে আমার।

    শুনে বড় মন খারাপ হয় অভয়ের। কিন্তু লোক না এলে, না থাকলে, ভামিনী আর এক মানুষ। তখন কত হাসি, কত কথা। এক দণ্ড ভামিনীর কাছ-ছাড়া হওয়ার উপায় থাকে না অভয়ের। নিজেই ডেকে নেয়। বলে, একলা বসে কী করছ। এসো, রান্নাঘরে এসো, কথা বলতে বলতে রান্না করি।

    সে ভামিনী অন্য মানুষ। কারখানায় কী কথা হল, অভয় কী দেখল–সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে ভামিনী। তখন কটুভাষিণী ভামিনীর কথা ভুলে যায় অভয়। শিল টেনে নিয়ে, ভামিনীর হাত থেকে নোড়া কেড়ে নিয়ে নিজেই বাটনা বাটতে বসে যায়। ভামিনী অসহায় কৌতুকে হেসে বলে, ও মা, এ কী ছেলে গো। দাও দাও, তোমাকে বাটনা বাটতে হবে না তা বলে।

    অভয় বলে, কেন হবে না। পারি না বুঝি? খুড়ির কাজ করে দেব, তার আবার কী আছে? মস্ত বড় শরীরটাকে উপুড় করে সেই বাটনা বাটা দেখে ভামিনী হেসে বাঁচে না। বলে, থাক, আর দু দিন বাদে তো বাপু পরের ঘরেই চলে যাবে। তখন খুড়ির বাটনা বাটবে কে?

    অভয় বলে, পরের ঘরে যাব বলে, খুড়িকে আমার পর করবে কে?

    ভামিনীর চোখে মুখে দেহে এখনও রং-এর খেলা খেলে বেড়ায়। চোখের কোণে তাকিয়ে বলে, কেন, বউ-শাশুড়ি?

    অভয় বলে, ইস্! খুড়ির চেয়ে বুঝি তারা আপন?

    ভামিনী বলে, তাই হয় গো, তাই হয়।

    বলতে বলতে ভামিনী কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে যায়। মনের কোণে কোথায় সে তার কীসের একটু জ্বালা অষ্টপ্রহরই জ্বলছে, সেটুকু নিজেও যেন সব সময় ঠাহর করতে পারে না। সেই জ্বলুনির কারণটুকু অভয়। যেন কোথায় একটি অস্পষ্ট পরাজয়ের ব্যথার ছিটা লেগে আছে তার প্রাণে। বেশি ঘষে ঘষে তুলতে গেলে, সেই দাগ স্পষ্ট হয় আরও। সংসারের উপর, সমাজের উপর, সুরীন-অভয়ের প্রতিও মনটা বিমুখ হয়ে ওঠে। পাড়ার লোকে এসে অভয়কে দেখতে চাইলে, তখন কোপটা গিয়ে পড়ে তাদের উপর। এমনিতেই তার কথা একটু বাঁকা-বাঁকা, একটু রোখপাক করা সুর। তাই বিশেষ কেউ কিছু মনে করে না।

    রান্না শেষে ভামিনী চান করতে যায় গঙ্গায়। সঙ্গে অভয়ও যায়। অভয় হয়তো সামান্য একটু সাঁতার কাটে। চান করে শান্তভাবে। ভামিনীই একটু বেশি সাঁতার কাটে, জলে ঝাঁপায়, ছেলেমানুষের মতো হুল্লোড় করে।

    খুড়ির ছেলেমানুষি দেখে অভয়ের হাসি পায়। বলে, দেখো, খুড়ি, বেশি জলে যেয়ো না।

    –কেন, গেলে কী হবে? ডুবে যাব?

    অভয় এমনিতে যা-ই হোক, আসলে কথার কারবারি। বলে, না। সাঁতার জানো, তুমি ডুববে কেন। কিন্তু সোঁতের জলে পড়ে গেলে, টানে টানে ভেসে যাবে যে?

    -কেন, আমার গতরে ক্ষ্যামতা নেই বুঝি? টান কাটিয়ে চলে আসব। অভয় হেসে তাকায় ভামিনীর দিকে। ভামিনীর মনে হয়, অভয় যেন তার শরীরে বয়সের দাগ খুঁজছে। সাঁতার জানলেও, টান কাটিয়ে আসতে শরীরে ক্ষমতার দরকার। তখন ভামিনী একটু করুণ হেসে বলে, আর খুড়ি ভেসে গেলেই, কার কী যাবে বাবা।

    অভয় বলে, না খুড়ি, ও কথা তা বলে তুমি বলতে পারো না। ভামিনী আবার অন্যমনস্ক হয়ে যায়। তার মনের গতিবিধি বোঝা বড় দায়। নিজের উপরেই তার রাগ হয়, মনে মনে বলে, মুখপুড়ি ভামি, তোর মরণ নেই লো? বয়স হয়ে মরতে চললি, এইটুকু ছেলেকে তুই কী বোঝাতে চাস?

    আবার নিজেই জবাব দেয়, রক্ষে করো। আ মরণ, ছি ছি ছি। ভামিনীর কি সামান্য ধর্মজ্ঞানও নেই?

    তবু জ্বলুনিটুকু তো বিদেয় হয় না। পুরুষের মতো পুরুষ সুরীন মিস্তিরির ঘরের মানুষ সে। শুধু ঘরের কেন, মনের মানুষ সে সুরীনের। এখনও সুরীন দু দিন বাইরে থাকলে, ঘরটা যেন খা খা করে। কল থেকে ফিরতে দেরি হলে পরে ঘর-বার করে। যেচে মান, কেঁদে সোহাগের ফাঁকিবাজি করতে হয়নি কোনওদিন ভামিনীকে। সুরীনের অন্যায়ে কখনও রাগ করলে, সুরীন ভয়ে ও আফশোসে এতটুকু হয়ে যায়। বলে, এই তোর গা ছুঁয়ে দিব্যি করছি গো ভামিনী, আমাকে মাপ করে দে ভাই। ভামিনীর কাছে, মেয়ে হয়েও দেহ বড় কথা নয়। তা বলে মন কি কোনও পদার্থ নয়? মনের ঘেন্না বলে কোনও বস্তু নেই নাকি সংসারে?

    তবু মনের কোণের সেই জ্বলুনিটুকু, মনকে যেন বিপথে চালিত করে। জীবনভর প্রায় হাটের কারবারে যেটি মূলধন ছিল, সেই দেহই সব কিছুতে, সবার আগে সামনে এসে দাঁড়ায়। এটা তাদের অভ্যাসের দাসীবৃত্তির অভিশাপ। আসল মেয়ে-মানুষটি চিরদিন তার আড়ালেই থেকে যায়।

    এই যে ভেজা গায়ে, শাড়ি জড়িয়ে, শরীরে একটু বেশি ঢেউ তুলে তুলে যায় ভামিনী অভয়ের আগে আগে, আর আড়ে আড়ে ফিরে ফিরে তাকায় অভয়ের চোখের দিকে, এ সব কীসের জন্যে? ওটা তার জ্বলুনির প্রশ্রয়। আপনি আপনি হয়ে যায়, বুদ্ধি কূট হয়।

    খেতে বসে, বেশি করে ভালটুকু খাওয়ায় ভামিনী অভয়কে। ধমক দেয় চোখ পাকায়। স্নেহের শাসনও যে কতখানি কঠিন হতে পারে, ভামিনীর মতো মেয়ের হাতে পড়লে সেটা অনুমান করা যায়।

    কিন্তু ভামিনী কপালের টিপ কাঁপায় কেন? দুপুরের নির্জনে, বিস্রস্ত হয়ে কথায় কথায় খিলখিল করে হেসে, মাথা ধরার বিপজ্জনক ভান তো ভাল নয়।

    ভাল নয় মনে হলেই গম্ভীর হয়ে ওঠে ভামিনী। চোখে বুঝি তার জল আসতে চায়। নিচু স্বরে, করুণ সুরে, ডেকে বলে–অভয়, সংসারে মানুষের কি বড় জ্বালা বাবা।

    –কেন খুড়ি, এ কথা বলছ কেন?

    বলছি এই জন্যে, নিমি শৈলদিদির মেয়ে না হয়ে তো আমার মেয়ে হতে পারত, অ্যাঁ?

    কোন কথায় কী হয়েছে, অভয় না বুঝে হেসে বাঁচে না। বলে, ছেলে পেয়ে বুঝি তোমার মন ভরে না খুড়ি।

    ভামিনী চুপ করে যায়। তার জ্বলুনি বোঝার মতো মনের আনপথে গতিবিধি নয় অভয়ের। আর কেমন করেই বা বুঝবে। সত্যি, বড়লোকে রক্ষিতা রাখে, সুরীনের মতো মানুষেরা বিয়ে না করেও, যাকে ঘরে এনে রাখে, সে বউয়ের চেয়েও বড়। সে মনেরই মানুষ। ভামিনী সুরীনের সেই মানুষ। মন বুঝি ছোট ভামিনীর, প্রাণ বুঝি হিংসেয় ভরা। তাই পেটের নাড়ি ছিঁড়ে তার কোনও নিমি আসবে না, কোনও অভয় তাকেই মা বলে এ ঘরে ঘর বাঁধবে না, এই ভেবে তার জ্বলুনি কাটতে চায় না। তাই চল্লিশের অঙ্গনে বিপরীত রীতি খেলা করে ওঠে। সবকিছু দিয়ে বাঁধতে ইচ্ছে করে। একে ভামিনী রোধ করবে কী দিয়ে, সে ওষুধ তার জানা নেই। তাই শৈলবালাকে দেখলেও গা জ্বালা করে ভামিনীর। শৈলবালা রোজ রোজ চচ্চড়িটা, তরকারিটা বেঁধে দিয়ে যায়, সে সব ফেলে দিতে ইচ্ছে করে ভামিনীর। লোকজন এলে, মন তিক্ত হয়।

    কখনও কখনও কলহের উপক্রম হয়ে ওঠে শৈলবালার সঙ্গে। পাড়ার লোকেরা গিয়েও শৈলবালাকে নানান কথা বলে।

    কিন্তু অভয় ভালবাসা ও স্নেহটুকু পেয়েই সুখী।

    .

    ০৬.

    তবু মন ভার হয় বইকী অভয়ের। সকলের স্নেহ ভালবাসা নিরঙ্কুশ ভোগ করার কোনও উপায় নেই। বোধহয়, সেটা সংসারেরই আইন। শৈলবালার সঙ্গে ভামিনীর বিবাদ, এর যত দায়, যত অশান্তি, সবই যেন অভয়ের।

    ভামিনীর পাল্লার বাইরে পেলে, শৈলবালাও অভয়কে অনেক কথা বলে। এ বিবাদের জন্যে, অভয়ের মনের ভাব প্রাণান্তকর হয়। মানুষ সবাই একরকম হয় না। ভামিনী-খুড়ির স্নেহ একটু জটিল, কিন্তু দু জনের ভালবাসা অভয়ের মনের একই স্থানে, একই সুরে বাজে। কাউকে স্নেহের দ্বন্দ্বে লড়িয়ে দিয়ে, তলায় ভালবাসা কুড়িয়ে বেড়ায় না সে। জীবনে এই মানুষগুলিকে পাওয়া, সেই। যে তার অনেকখানি।

    আরও লোক আসে সন্ধ্যার পরে, সুরীনের কাছে। বাড়িতে বসে দশ রকম কথাবার্তা হয়। যারা আসে, তারা সকলেই কোনও না কোনও মিলের মিস্তিরি। তাদের মধ্যে নানারকম আলোচনা হয়। মিল সংক্রান্ত বিষয় তার মধ্যে বেশি। তা ছাড়া শহরের কথা, এ পাড়া সে পাড়ার বিষয়, কোথায় কি ঘটেছে কিছু বাদ যায় না। এদের মধ্যে গোঁদলপাড়া কারখানার মিস্তিরি অনাথ সবচেয়ে বেশি মন কেড়েছে অভয়ের। এ শহর আর কারখানার বাইরে, দূরের সংবাদ বলে সে। কলকাতার কথা বলে, আরও দূর দূরান্তে, হিল্লিদিল্লির সংবাদ আনে। অভয়ের কাছে সে সব রাজা-রাজড়ার সংবাদ। সে। যখন কথা বলে, বাকি সবাই মনোযোগ দিয়ে শোনে। সুরীন খুড়োর বড় ভক্তি এই অনাথের উপর।

    লোকটির বয়স অনুমান করা যায় না। সব সময়েই মাথায় রাশিখানিক রুক্ষ আধপাকা চুল, গোঁফ দাড়ি খোঁচা খোঁচা। এমনিতে আছে বেশ গম্ভীর মানুষ, মনের ভাবসাব বোঝা যায় না। যেমনি হাসে, অমনি সামনের দুটি দাঁতহীন সেই হাসিতে, একেবারে শিশু বলে মনে হয়। বড় মানুষের হাসি শিশুর মতো দেখতে হলে, মানুষের শুধু আনন্দ হয়। কিন্তু অনাথের পেশিবহুল শক্ত মুখখানিতে দুটি দাঁতহীন অনাবিল হাসি দেখে, নিজে হাসতে গিয়ে অভয়ের বুকের মধ্যে কেন যেন টনটন করে। ওই দুটি শূন্য দাঁতের অন্ধকারে কী যেন লুকিয়ে রেখেছে, দেখে বড় মায়া লাগে শক্ত সমর্থ মানুষটার জন্যে। পনেরো বছর আগে নাকি জেল খেটেছিল। চুরি ডাকাতি নয়, কারখানার কোম্পানির সঙ্গে ঝগড়া করে। এমন আসামি অভয় তার জন্মে দেখেনি। জেল থেকে বেরিয়ে, দশ বছর কোনও চাকরি পায়নি মানুষটি। বছর পাঁচেক হল, আবার কাজ পেয়েছে গোঁদলপাড়ায়।

    অনাথেরও নাকি বড় ভাল লেগে গেছে অভয়কে। শুধু সুরীন হেসেছিল মনে মনে। ভামিনীকে ঘরে গিয়ে বলেছিল, দ্যাখ গো ভামিনী, দুটো পাগলকে কেমন এক গারদে পুরে দিয়েছি।

    ভামিনী অবাক হয়ে বলেছিল, সে আবার কী!

    বিস্ময় কাটতে দেরি হয়নি ভামিনীর। কথাটা মিথ্যে বলেনি সুরীন। অনাথকে কী বলেছিল সুরীন অভয়ের বিষয়ে, কে জানে। সে প্রথম দিনেই অভয়কে খানিকক্ষণ দেখে শুনে বলেছিল, তোমাকে বেশ লাগল।

    অভয় বলেছে, সে এঁজ্ঞে আপনি ভাল বলে।

    অনাথ বলেছে, ও সব এজ্ঞে টেজ্ঞে নয়, মন খুলে দাও। আমিও তোমার খুড়ো। তবে দেখো বাবা, সাঁতরা কবির মতন ঘাড়ে রদ্দা মেরে বসো না।

    অভয় গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। বিশাল শরীরটা শক্ত করে বসেছিল। তারপরে বলেছিল, তা বলে সুরীন খুড়োকে তো মারিনি যে সবার কাছে গপ্পো করেছে।

    বলে সে উঠে পড়তে যাচ্ছিল। অনাথ তাকে ধরে ফেলেছে।

    -আরে তুমি রাগ করলে নাকি?

    অভয়ের চোখে চাপা রাগ। সে তখন সুরীনকে খুঁজছিল ভিড়ের মধ্যে। দেখতে পায়নি। সুরীন খানিকটা ভয়ে ও বিস্ময়ে চুপ করে বসেছিল। অভয় বলেছিল, একটা অন্যায় করে ফেলেছি। সে কথা খুড়ো সবাইকে বলে বেড়াবে?

    অনাথ বিস্মিত খুশিতে দেখছিল অভয়কে। হা হা করে হেসে উঠেছিল আবার। বলেছিল, কে বলেছে অন্যায় করেছ।

    -ভুল তো হয়েছিল?

    –কে বললে ভুল হয়েছিল। ঠিক করেছ, আলবত কাজ করেছ।

    অভয় তার সংশয় ভরা চোখে তাকিয়েছিল। অনাথের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তখন সবাই হেসে উঠেছিল। অনাথ বলেছিল, অপমানের শোধ নেবে না তো কি! তুমি মানুষ না? তবে সাঁতরার ওপর শোধ নিতে হলে, তার চেয়ে বড় কবিয়াল হতে হবে তোমাকে, বুঝলে।

    মুহূর্তে মুখের ভাব বদলেছিল অভয়ের। হেসে মুখ নামিয়েছিল লজ্জায়। বলেছিল, খুড়ো আমি মুখখু মানুষ ক্ষমা করুন।

    সুরীন হাসতে হাসতে বলেছিল, বাবা, ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল গো!

    অভয় বলেছিল, আমার হল সেই অবস্থা,

    ঠেকিকে বোঝাবে কতো
    কথায় বলে লাথির ঢেঁকি
    চাপড়েতে ওঠে না তো?

    আমাকে মেরে বোঝান আপনারা।

    অনাথ সত্যি পিঠে চাপড় মেরে বলেছে, মেরে নয়, তোমাকে আমি কেড়ে নিয়ে বোঝাব ব্রাদার।

    বাদার? সেটা কী খুড়ো?

    –হুঁ হুঁ, ইংরেজি বলেছি, বুঝলে। বাদার নয়, ব্রাদার। মানে ভাই। খুড়ো ভাইপো চলবে না। তুমি আমার বন্ধু। দোস্ত। কিন্তু গান শোনাতে হবে যে।

    আবার অভয় থমকে গিয়েছে। অনাথ বলেছে, না না, তোমাকে আমি হুকুম করব না। যে-দিন তোমার মন চাইবে, সেদিনে।

    অভয়ের মুখখানি থমথম করেছে। বলেছে, সে সোঁত বন্ধ হয়ে গেছে।

    অনাথ কথার কারবার করে না বটে, মানুষ নিয়ে কারবার করে। বলেছে, স্রোত পাক খাচ্ছে। পথ পেলে সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

    কথাটি শুনে গলা ছেড়ে গান গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করেছে অভয়ের। সুন্দর সুন্দর কথা দিয়ে সাজানো মিঠে পদ, তার ঠোঁটের কূলে এসে সত্যি পাক খেয়েছে তার বোব স্বর যেন টনটনিয়ে উঠেছে বড় ব্যথায়। পারেনি গাইতে।

    এমনি করে ভাব হয়েছে দুজনের। একজন অনাথ খুড়ো, আর একজন বন্ধু, দোস্ত। অভয় আরও শুনেছে, অনাথ নাকি কিছু লেখাপড়াও জানে।

    সুরীন হেসে বলে, আমি জানতুম, দুটিতে দেখা হলে হয়, কেমন জমে একবার সবাই দেখবে।

    অনাথ ছাড়াও সন্ধ্যায় আসরে আরও কয়েকজন আসে। তাদের সকলের সঙ্গেই অভয়ের বড় ভাব। কম বেশি সকলেরই মন কেড়েছে সে। অনাথ বলে, দোস্তের জন্যে আমাদেরও ধান্দা করতে হয়, একটা চাকরিবাকরি দরকার।

    তা ঠিক। সুরীন মুখ গম্ভীর করে বলে, হ্যাঁ। এক মাস হয়ে গেল, হাঁটাহাঁটি সার হচ্ছে। টর্ন। ঘরের সায়েব একটা আশা দিয়ে রেখেছে। সহজে যে হয়ে উঠবে, মনে হয় না।

    অনাথ বলে, চাকরির বাজার বড় মন্দ। তা দেখা যাক। সবাই মিলে দেখো। জগদ্দলে শ্যামনগরেও দেখো, আমি দেখি। বন্ধুকে আমি কাজে লাগাতে পারলেই ভাল হয়।

    সবদিক থেকেই অভয়ের মন ভরা। কেবল, একটি কথা সে ভুলতে পারে না। বসে খাওয়ার রীতি তার অজানা ছিল। জীবনের পালে যে তার নতুন বাতাস লেগেছে, কখন না জানি বাতাস ঢিল পড়ে যায়। আশা বড় মারাত্মক বস্তু। কাজে না সার্থক হলে, মরণের সামিল মনে হয় তখন। হাঁটতে না শিখতে যে মানুষ খুঁটে খেতে শিখেছে, একমাস ধরে তার নিজেকে গলগ্রহ ঠেকেছে। এক এক সময় হাসতে গিয়েও যে বুকের মধ্যে খচ করে লাগে। সন্ধ্যাবেলায় এই আসরে ভামিনীও যোগ দেয় তার কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে। সবাইকে চা দেয়, পান থাকলে খাওয়ায়। সে ঠোঁট টিপে হেসে বলে, হ্যাঁ, তা ছাড়া ছেলের আমার মনের দিকে তাকিয়ে দেখতে হবে তো।

    সহসা সবাই ধরতে পারে না, ভামিনীর মনের কথা।

    ভামিনী বলে, তোমরা যেন সব হাবা হয়ে গেলে। এক জনের জন্যে তো মনটাও খালি খালি লাগতে পারে। আশার মানুষ, তাকে পাবার জন্যেও

    ও, ভামিনী শৈলবালার মেয়ে নিমির কথা বলে।

    অভয় লজ্জা পায়। ভামিনী হাসে, সুরীন গম্ভীর হয়ে বলে, সত্যি।

    অনাথ বলে, তাই তো বটে, বউ না হলে কখনও বন্ধুর চলে?

    বলে ভামিনীর দিকে চেয়ে ফোগলা দাঁতে হেসে জিজ্ঞেস করে, শৈলদিদির মেয়েরও বুঝি তর সইছে না?

    তখন একটু ঠোঁট বাঁকিয়ে ভামিনী বলে, কী জানি! উঁকি ঝুঁকি কি আর না মারছে।

    অভয় অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর হয়ে বলে, মন টন আবার কী। কাজ নেই, কম্মো নেই, বউ একটা হলেই তো হল না।

    তার কথা শুনে সবাই হাসে হো হো করে।

    তারপর একলা শুয়ে ভাবে অভয়। ভাবে, সত্যি তার মন কেমন কেমন করে নাকি? একটু দেখতে ইচ্ছে করে?

    কবে একদিন সে যাচ্ছিল পাড়ার জলকলের পাশ দিয়ে। মেয়েরা ভিড় করেছিল সেখানে। অভয় দূরে থাকতেই মেয়েরা চাপা গলায় বলে উঠেছিল, ওই রে, সে আসছে, এই নিমি, দ্যাখ দ্যাখ। আ মলো মুখপুড়ি, পালাচ্ছিস কেন।

    জলকলের ভিড়ে একটা ধরাধরি টানাটানি পড়ে গিয়েছিল। একজন পালিয়েছিল আঁচল ছিনিয়ে নিয়ে। চোখের পলকে কত কী যে চোখে পড়েছিল, যা কখনও চোখের পলকে চোখে পড়ে না। তার গোরা রং, গ্রামের বন্ধু শুলার বউয়ের মতো বড় বড় চোখ, ভেঙে পড়া খোঁপা, খসে পড়া আঁচল। তারপর মেয়েদের ভিড়ের পাশ দিয়ে যাবার সময়, সকলের কী হাসি! কে একজন বলে উঠেছিল, আহা ফসকে গেল। আর একজন বলেছিল, ছুঁড়ি ভয় পেয়েছে।

    হ্যাঁ, ভয়ে ঘুম হয় না রাতে।

    অভয়কে দাঁড় করিয়েছিল তারা, ও জামাই, শোনো শোনো।

    অমন জোয়ান মানুষ অভয়, তারও বুকের মধ্যে কেমন থরথরিয়ে উঠেছিল। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল।

    তার গ্রাম্য বিনয় দেখে সবাই আর হেসে বাঁচেনি। বলেছিল, দেখতে পেলে না তো?

    মাথা নিচু করে হেসেছিল অভয়। বলেছিল, দেখা না দিলে কি কাউকে দেখা যায়!

    ওমা, ওমা–শব্দের সঙ্গে আবার একটি হাসির ঝড় উঠেছিল।

    আরও কয়েকদিন এমনি ঘটেছে। যাবার পথে শুনতে পেয়েছে মেয়ে-গলায়, এই নিমি, এই যে যাচ্ছে রে।

    গত বছরেই কবে যেন একদিন গাঁয়ে, এক বিয়ে বাড়িতে কাজ পড়েছিল অভয়ের। বর আসতে সেও চেঁচিয়ে বলেছিল, দেখি দেখি, একটু দেখে নিই। কে যেন পিছন থেকে বলে উঠেছিল, হ্যাঁ, দেখে নে। তোর জীবনে তো আর ও সব কোনওদিন হবে না।

    সুরীন খুড়ো কোথায় টেনে নিয়ে এল, ধন্দের ঘোর লেগে গেল মনে। ধন্দ কাটতে চায় না। সন্দেহ হয়, শুলার মতো সেও একটি মেয়ের সঙ্গে ঘর করবে। তার এত বড় শরীর দিয়ে অনেকের অনেক কাজ মিটেছে, সেটা প্রয়োজনীয় ছিল। মন নিয়ে কেউ নাড়াচাড়া করেনি, সেটা অপ্রয়োজনীয় ছিল। মন নিয়ে অভয় একলা ছিল! মিথ্যে নয়। এখন সেই মনে অপরের ভাগ পড়েছে। একটি বিস্ময়কর ছায়া পড়েছে সেখানে। যে ছায়া হাতড়ে হাতড়ে তার রক্তের টানা স্রোতে হঠাৎ ঘুর্ণি লাগিয়ে দেয়। তখন গান গাইতে ইচ্ছে করে অভয়ের।

    সব মিলিয়ে, মনের দিগন্ত জুড়ে, নতুন জীবনের স্বাদ নেশা ধরিয়ে দিতে চায়। কিন্তু কাজের কথা মনে হলে, তখন বড় বিস্বাদ লাগে অভয়ের।

    কয়েকদিনের পর, সুরীনদের কারখানায় নিয়মিত হাজিরা দিয়ে ফিরে, অভয় ঘরে ফিরে গেল না। এদিক ওদিকে ঘুরে গঙ্গার ধারে খেয়াঘাটের কাছে গিয়ে দেখল, ঘরামিরা নতুন ঘর তুলছে। মস্ত বড় ঘর, বোধহয় মালখানা হবে।

    খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখে, একজনকে জিজ্ঞেস করল অভয়, লোকের দরকার আছে আর?

    কাজ করতে করতে কয়েক মুহূর্ত অভয়কে দেখে, আর একজনকে ডাকল।

    সে এসে জিজ্ঞেস করল, ঘরামির কাজ জানো?

    নিজের না হোক, পরের ঘর অনেক তৈরি করেছে অভয়। বলল, বাজিয়ে দেখুন।

    বাজিয়ে দেখা গেল, ভালই বাজে। দু টাকা রোজে সারাদিন কাজ করে যখন ফিরল, তখন সুরীনের বাড়িতে একরাশ মেয়ে-পুরুষ। সন্ধ্যা উতরে গেছে তখন, বাতি জ্বলেছে। সুরীনও ফিরে এসেছে অনেকক্ষণ। সারাদিনে অভয় ফিরে না আসায় শোরগোল পড়ে গেছে।

    শৈলবালাই প্রথম চিৎকার করে উঠল, অই গো, অই এসেছে। কোথায় ছিলে?

    অভয় বলল, এই একটু এদিক ওদিক করছিলুম।

    ভামিনী মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল, তা রাতটুকুও বাপু এদিক ওদিক করে এলেই পারতে?

    অভয় হাসল। সবাই চলে যাবার পর অভয় সুরীনের দিকে টাকা দুটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল, কাজ করেছি খুড়ো আজ।

    সুরীন অবাক হয়ে বলল, কী কাজ, কোথায়?

    সব বলল অভয়। শুনে সুরীনের মনটা খারাপ হয়ে গেল। শৈলদিদি শুনলে তার মান যাবে। জামাইকে দিয়ে শেষে ঘরামির কাজ করালে সে।

    অনাথ শুনে খুব খুশি। অভয়ের পিঠ চাপড়ে বলল, বেশ করেছ বন্ধু, বাপের ব্যাটার মতো কাজ করেছ। কাজ না করলে মানুষ বাঁচে কখনও!

    তিন দিন কাজ পেল অভয়।

    চতুর্থ দিনে আবার বেকার। ভামিনী পাড়ায় কোথায় গিয়েছে দুপুরের পাট মিটিয়ে। অভয়কে বলে গেছে দরজা বন্ধ করে ঘুমোতে। ঘুম আসেনি। অভয় বসেছিল দাওয়ায়। কিন্তু কয়েকবারই চমকে উঠেছে, ফিসফাস শব্দ শুনে। মানুষ দেখা যায় না, কিন্তু চুপিচুপি কথা, চুড়ির রিনিঠিনি কোথা থেকে যেন বেজে উঠেছে কয়েকবার।

    তারপর নিমিকে চেপে ধরে, দুটি মেয়ে ঢুকল বাড়ির পিছন থেকে। দাপাদাপি করছিল নিমি, চুল এলো করে, শাড়ি বিস্রস্ত করে। সামনেই অভয়কে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু মুখখানি যেন ভার, যদিও ফরসা। মুখে একটু রক্ত ছড়িয়ে গেছে। ঘাড় না ফিরিয়ে তাকিয়ে ছিল অন্যদিকে। অভয় দেখল–শুলার বউয়ের চেয়েও চোখ দুটি ভাল, কালো মণি দুটি বড় বেশি দপদপে, কিন্তু স্থির। ঠোঁটের কোণ দুটি টিপে রয়েছে নিমি, মুখখানি তাতে কঠিন হয়ে উঠেছে।

    বিমূঢ় অভয় হাসতে গিয়েও হাসতে পারল না। উঠে দাঁড়াল শুধু।

    এক সঙ্গিনী বলল, নে, কী বলবি বল, খুব তো তড়পাচ্ছিলি।

    বলে আঁচল টেনে দিল।

    আর একজন বলল অভয়কে, কেমন?

    অভয়ের বুকের মধ্যে রক্ত তোলপাড় করে উঠল। নিমিকে সে এতদিন ভাল করে দেখেনি। আজ দেখে তার তীব্র আনন্দের মধ্যে একটি তীক্ষ্ণ সংশয় খেলে গেল। কোথায় যেন একটু দূরত্ব রয়েছে অভয়ের সঙ্গে, কাছের মেয়ে নয়। এ যেন নিটুট শরীরে, ছেয়ালো ছেয়ালো স্বাস্থ্যবতী মেয়ে। জোয়ার এসেছে যেন উজান ঠেলে তাই প্রথম মুখপাতে একটু যেন বেশি দামাল মনে হয়। এবং ফরসা, শৈলবালার মতো।

    সঙ্গিনী বলল, কী হল, বাক্যি হরে গেল যে!

    অভয় হেসে বলল, হ্যাঁ, কথায় যে কুলায় না।

    তবে গান দিয়ে হোক।

    হ্যাঁ, গান গাইতে ইচ্ছে করে, কিন্তু লজ্জা করে। বলল, সেই গান শুনেছিলুম, গোরো-চনা গোরী নবীনা কিশোরী, সেইরকম।

    সঙ্গিনী দুটি হেসে লুটিয়ে পড়ে আর কি। বলল, কিন্তু রাগ করেছে।

    অভয় বলল, কেন?

    –জিজ্ঞেস করো।

    নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দাওয়া থেকে নেমে এল অভয়। সামনে এসে বলল সঙ্গিনীদের, কেন?

    মেয়ে দুটি হেসে উঠে ধাক্কা দিল নিমিকে। নিমি ততক্ষণে মুখে আঁচল চেপে, হেসে উঠেছে। একজন বলল, তোমাকে বলেছে, গেঁয়ো, গেঁয়ো মিনসে।

    অভয় ছড়া কেটে বলল,

    গাঁয়ে আমার জম্মে কম্মো,
    শহর আমি চিনি না যে।
    সে আমাকে ডাক দিয়েছে।
    যে আছে এই শহর গঞ্জে ॥

    এবার নিমি পালাবার জন্যে দৌড় দিতে গেল। ধরে রাখল সঙ্গিনীরা। বলল, ওমা, সত্যি সত্যি কবিয়াল রে।

    আর একজন বলল অভয়কে, আরও বলেছে। বলেছে, বড্ড কালো।

    বুঝি সত্যি কালো কি না দেখে নেবার জন্যে নিমি চোখ তুলতেই, চোখাচোখি হল অভয়ের সঙ্গে। অভয় বলল, হ্যাঁ ঠাকরুণ,

    কালো, খুব কালো আমার বরণ
    যে বলে তার চোখের মণির মতন।

    –আরও বলেছে। বলেছে, আর কতদিন, চাকরি কেন হয় না?

    এবার নিমি জোর করে ছুটে পালিয়ে গেল। মেয়ে দুটিও গেল হাসতে হাসতে। অভয়ের মুখখানি ভার হয়ে উঠল।

    কিন্তু ভার করে তাকে বেশিক্ষণ থাকতে হল না। নিমি এসে তার ভরা জোয়ার দিয়ে গেছে। সন্ধ্যাবেলা অনাথ এল চিৎকার করতে করতে, দোস্ত, এই দোস্ত, জামাই, বন্ধু আমার কোথায় গেলিরে।

    অনাথের তুই তোকারি শুনে একটু অবাক হলেও একটু বেশি খুশি টের পেয়ে অভয় বলল, কী বলছ?

    অনাথ বলল, কী বলছি? কী না বলছি, তাই বল। আসছে হপ্তা থেকে তোর কাজ হয়েছে আমাদের মিলে।

    সত্যি, সত্যি?

    তবে কি মিথ্যে?

    অভয়, পায়ে হাত দেবে ভেবেছিল। কিন্তু জড়িয়ে ধরল অনাথকে দু হাতে।

    সুরীন তখনও আসেনি। কেবল রান্নাঘরে ভামিনীর মুখখানি গম্ভীর হয়ে উঠল।

    ⤷
    1 2 3 4 5 6
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleজগদ্দল – সমরেশ বসু
    Next Article ষষ্ঠ ঋতু – সমরেশ বসু

    Related Articles

    সমরেশ বসু

    প্রজাপতি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    গঙ্গা – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    বিবর – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    অকালবৃষ্টি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    নয়নপুরের মাটি – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    সমরেশ বসু

    শ্রীমতি কাফে – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }