লট নম্বর ২৪৯ – আর্থার কোনান ডয়েল
লট নম্বর ২৪৯
১৮৮৪ সালের কথা। অক্সফোর্ডের ওল্ড কলেজের বিশাল বাড়িটার এক কোনায় একটা অংশ ছিল খুব পুরোনো। এত পুরোনো যে ওই অংশে ঢোকার বিরাট দরজাটা বয়সের ভারে বেঁকে গেছে। আশেপাশের পাথরের দেয়ালে গজিয়েছে আগাছা, পড়েছে শ্যাওলা।
বাড়ির এই অংশের আলাদা সিঁড়ি, উঠে গেছে চারতলা পর্যন্ত। একতলায় একটা ঘরে কয়লা রাখা হয় আর অন্য ঘরে থাকে চৌকিদার টমাস স্টাইলস। দোতলা, তিনতলা আর চারতলায় দুটি করে ঘর—একটা বসার আর একটা শোওয়ার। প্রতি তলায় থাকে একজন করে ছাত্র—অ্যাবারক্রম্বি স্মিথ (চারতলায়), এডওয়র্ড বেলিংহ্যাম (তিনতলায়), এবং উইলিয়ম মংকহাউস লী (দোতলায়)। প্রতি তলাতেই সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এর পাশে করিডর, সেখান দিয়ে ক্লাসরুমে, কলেজের অফিসে চলে যাওয়া যায়।
গরমকালে একদিন রাত দশটায় স্মিথ নিজের ঘরে বসে পাইপ খেতে খেতে গল্প করছিল ওর স্কুলের বন্ধু হেস্টি-র সঙ্গে। দুই বন্ধুই খেলার পোশাকে—একটু আগেই নৌকা চালিয়ে এসেছে। দুজনের পেটানো চেহারা আর সপ্রতিভ মুখচোখ দেখলেই বোঝা যায় ওরা শারীরিক শক্তি ও সাহসে ভরপুর। স্মিথের টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে ডাক্তারির বই, হাড়গোড়, শারীরবিদ্যার চার্ট ইত্যাদি। আসন্ন পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। দুই বন্ধু কখনো কথা বলছে, কখনো বা চুপচাপ বসে আছে।
হঠাৎ হেস্টি বলল,—আচ্ছা স্মিথ, তোমার দোতলা ও তিলতলার দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে না কি?
—না, সেরকম কিছু হয়নি। দেখা হয়ে গেলে খালি মাথা নেড়ে ‘হ্যালো’ বলা ছাড়া।
—আমি ওদের সম্বন্ধে কিন্তু কিছু জানি। যেটুকু জানি সেটুকুই যথেষ্ট। তুমি কিন্তু ভাই ওদের দুজনকে একটু এড়িয়েই থেকো। অবশ্য লী ছেলেটা খারাপ নয়। সে দোতলায় থাকে। কিন্তু ওর সঙ্গে মিশতে গেলেই তুমি তিনতলার বেলিংহ্যামের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে।
—বেলিংহ্যাম? মানে ওই মোটা ছেলেটা?
—ঠিক ধরেছ। ওর থেকে যত দূরে থাকা যায়, ততই মঙ্গল।
—কী ব্যাপার বলো তো? মদ খায়? জুয়া খেলে? বদ স্বভাবের?
—ঠিক তা নয়। মনে হয় ও কোনো নারকীয় বা শয়তানি কাণ্ডকারখানায় জড়িত। ওকে দেখলেও গা-টা কেমন শিরশির করে—অনেকটা সরীসৃপ দেখলে যেমন হয়। তবে হ্যাঁ, ওর পাঠ্য বিষয়ে ওর মতো মেধাবী ছাত্র আর কখনো এই কলেজে ছিল না।
—কী পড়ে? ডাক্তারি, না ভাষা-সাহিত্য?
—প্রাচ্যভাষা। আরবি, হিব্রু, মিশরীয় খ্রিস্টানদের ভাষা—সবেতেই তুখোড়। এই সব ভাষাভাষী লোকের সঙ্গে ও যখন কথা বলে, তখন তারা অবাক হয়ে যায়। একজন ইংরেজের প্রাচ্যভাষায় এমন দক্ষতা দেখে ছাত্ররাও স্তম্ভিত হয়ে গেছে অনেকবার।
—ওর সঙ্গে লী-র সম্পর্কটা ঠিক কেমন?
—শুনেছি, লী-র বোন ইভলিনের বিয়ে হবে ওর সঙ্গে। লী-র বাড়ির সবাইকে আমি চিনি। ওইরকম একটি ভালো মেয়ের বর বেলিংহ্যাম! ঠিক যেন একটা সুন্দর পাখি আর একটা কালো ব্যাং।
—দ্যাখো হেস্টি, মনে হয় বেলিংহ্যামকে তুমি বিনা কারণে অপছন্দ করো। হয়তো বা ঈর্ষাও করো। ওর স্বভাব-চরিত্রের ব্যাপারে কোনো প্রমাণ আছে তোমার কাছে?
—কথাটা যখন তুললেই, তখন একটা ঘটনার কথা বলি। গতবার শীতকালে একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। নদীর পাশের পায়ে-চলা পথটা এমনিতেই সরু। তার দু-ধারে আবার জল জমে গেছে। এক মহিলা ওই সরু পথ দিয়ে আসছিলেন। উল্টোদিক থেকে আসা বেলিংহ্যাম মহিলাকে তো রাস্তা ছাড়লই না, বরং তাঁকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তার ধারের জলকাদায় ফেলে দিল। তাই দেখে আমাদের কলেজেরই ছাত্র নর্টন, বেলিংহ্যামের এই অসভ্য আচরণের প্রতিবাদ করে। দুজনের মধ্যে হয় তুমুল বচসা। তখন নর্টন হাতের ছড়িটার এক ঘা বসিয়ে দেয় বেলিংহ্যামের কাঁধে। এখনও যখন দুজনে সামনাসামনি পড়ে যায়, তখন তুমি দেখো কীরকম বিষদৃষ্টিতে নর্টনের দিকে তাকায় বেলিংহ্যাম।—যাক, রাত প্রায় এগারোটা বাজল। আমি এখন চলি। আমার আবার আজকাল নৌ-চালনার (রোয়িং) ট্রেনিং চলছে। বেলিংহ্যাম সম্বন্ধে যা বললাম, তুমি কিন্তু তা মনে রেখো।
হেস্টি চলে যেতেই স্মিথ পড়াশোনা শুরু করে দিল। ঘণ্টাখানেক পড়ার পর ঘড়ির কাঁটা যখন বারোটা ছুঁইছুঁই, তখনই হঠাৎ ওর কানে এল একটা তীক্ষ্ন আওয়াজ, তারপর বড় একটা দুর্ঘটনার অভিঘাতে যেন কেউ হাঁফাতে হাঁফাতে নিশ্বাস নিচ্ছে এমন একটা শব্দ। কান খাড়া করে শুনল স্মিথ—আওয়াজটা আসছে তিনতলা থেকে অর্থাৎ বেলিংহ্যামের ঘর থেকে। সেই বেলিংহ্যাম, যার মুখটা বিবর্ণ, ফোলা ফোলা, যে গভীর রাত অবধি জেগে থাকে, এমনকী স্মিথ শুয়ে পড়ার পরেও। স্মিথ কিন্তু কেবল হেস্টির অভিমতের ওপর নির্ভর করে বেলিংহ্যামকে খারাপ মানুষ ভাবতে পারেনি। বরং তারই এক সতীর্থ বিপদে পড়েছে, এই ভেবে সে একটু উদ্বিগ্নই হল।
খানিকক্ষণ আর কোনো আওয়াজ নেই। স্মিথ আবার বইয়ে চোখ রয়েছে। হঠাৎ কানে এল তীব্র আর্তনাদ। কেউ যেন চরম বিপদে রেখেছে। সেই আওয়াজ শুনে সাহসী স্মিথেরও হাড় যেন হিম হয়ে গেল, গায়ে কাঁটা দিল। নীচে যাবে কি যাবে না ভাবতে ভাবতেই ও সিঁড়িতে পদশব্দ শুনতে পেল। একটু পরেই ঘরে ঢুকল লী, মুখচোখ ফ্যাকাশে। হাঁফাতে হাঁফাতে ও বলল—শিগগির নীচে এসো। বেলিংহ্যাম অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
দুজনে দুদ্দাড় সিঁড়ি ভেঙে বেলিংহ্যামের বসার ঘরে ঢুকতেই স্মিথ ঘরের ভেতরটা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। ঘরটা যেন একটা মিউজিয়াম। দেয়ালে ও সিলিং-এ মিশর ও প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অজস্র পুরাতাত্ত্বিক বস্তু টাঙানো। বিভিন্ন জন্তু-জানোয়ারের মাথাওয়ালা মূর্তি, মিশরীয় মানুষের স্ট্যাচু, হোরস, আইসিস, ওসাইরিস ইত্যাদি দেবতার ছবি ঘরের চারদিকে রাখা। নীলনদের একটা কুমিরের বিশাল প্রতিমূর্তিও ঝুলছে দেয়ালের একদিকে।
পড়ার টেবিলে স্তূপাকার কাগজপত্র, শিশি-বোতল, পুঁথি লেখার তালপাতা ইত্যাদি। আর আছে একটা লম্বা পাথরের বাক্স—অনেকটা কফিনের মতো—আর তার মধ্যে একটা মমি। পোড়া কয়লার মতো তার রং, শরীরটা শুকিয়ে দড়ির মতো—বীভৎস দেখতে। শরীরের সবটাই বাক্সে—শুধু শুকনো বাহু আর হাত দুটো বাইরে। বাক্সের গায়ে হেলান দেওয়া প্যাপিরাসের একটা রোল। চেয়ারে বসে বেলিংহ্যাম, আতঙ্কে বিস্ফারিত চোখে দেয়ালে ঝোলানো কুমিরের মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে, মাথা পিছনদিকে হেলানো। দুই মোটা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে হাপরের মতো নিশ্বাস বেরোচ্ছে।
অচেতন বেলিংহ্যামকে দুজনে ধরাধরি করে একটা সোফায় শুইয়ে দিল। তারপর ওর মুখেচোখে জল ছিটিয়ে স্মিথ জিগ্যেস করল— ব্যাপারটা ঠিক কী হয়েছিল বলো তো?
লী বলল,—তা জানি না। ওর আওয়াজ শুনেই দৌড়ে আসি।
—ওর হার্টের যা অবস্থা দেখছি, মনে হয় কোনো কারণে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিল। দ্যাখো, ওর মুখটা দ্যাখো।
বেলিংহ্যামের মুখমণ্ডল বিবর্ণ, প্রায় রক্তশূন্য। মাথার ছোট-করে-কাটা চুলগুলো যেন খাড়া হয়ে আছে। যেন অজানা কোনো বিভীষিকার প্রভাবে চোখের মণি বিস্ফারিত। ওর অবস্থা দেখে স্মিথ মনে মনে ভাবল—বেলিংহ্যাম সম্বন্ধে হেস্টির মন্তব্যে হয়তো কিছু সারবত্তা আছে।
স্মিথ লী-কে জিগ্যেস করল—কী দেখে এত ভয় পেয়েছিল ও?
—মমিটা দেখে।
—মমি? কীভাবে? কখন?
—তা তো বলতে পারব না। কী বীভৎস দেখতে ওটা। গত শীতেও একদিন এইরকম কাণ্ড হয়েছিল। এবার কিন্তু ওর মমিটাকে বিদায় করাই উচিত। কেন যে এরকম বিপজ্জনক শখ নিয়ে ও মেতে আছে।—জ্ঞান ফিরে আসছে মনে হয়।
বেলিংহ্যামের মুখের ফ্যাকাশে ভাবটা কমে এসেছে। চোখের পাতা দুটো হালকা কাঁপছে। দু-হাতের আঙুলগুলো মুঠো করল, তারপর আবার মুঠো খুলল। ওর মুখ থেকে বেরোল একটা লম্বা নিশ্বাস। তার পরেই চারদিকে তাকিয়ে মমিটাকে দেখেই একলাফে সোফা থেকে উঠে পড়ল। প্যাপিরাসের রোলটা নিয়ে একটা ড্রয়ারে রেখে ড্রয়ারটায় চাবি দিয়ে দিল।
এবার সোফায় বসে ও বলল,—কী হয়েছে? তোমাদের কী চাই?
লী বলল,—তুমি চেঁচামেচি করে যা কাণ্ডটা করেছিলে! স্মিথ না এলে আমি তোমাকে সামলাতে পারতাম না।
বেলিংহ্যাম বলল,—ও! অ্যাবারক্রম্বি স্মিথ! তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। বোকার মতো কী কাণ্ডটাই না করেছিলাম।—এই বলে দু-হাতে মুখ ঢেকে ও পাগলের মতো হাসতে লাগল।
স্মিথ ওর দু-কাঁধ ধরে ঝাঁকানি দিয়ে বলল,—তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। মাঝরাতে মমি নিয়ে এই খেলাগুলো বন্ধ করো তুমি। নাইলে কিন্তু পুরো উন্মাদ হয়ে যাবে।
—তোমার অবস্থা আমার থেকেও খারাপ হত যদি দেখতে…
—কী দেখতাম?
—কিছু না। আসলে মমির সঙ্গে মাঝরাতে তুমি আমার মতো বসে থাকতে পারতে না। ঠিকই বলেছ! আমি একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলাম। শরীরটা এখন একটু ভালো লাগছে। তবে আর একটু সময় থাকো তোমরা—যতক্ষণ না পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাই।
ঘরে একটা বদ্ধ ভাব। জানালা খুলে দিতেই বাইরের ঠান্ডা হাওয়া ঘরে ঢুকল। বেলিংহ্যাম হঠাৎ টেবিল থেকে তালপাতার মতো কী একটা উঠিয়ে বাতির চিমনির মধ্যে ফেলে দিল। ঘর ভরে উঠল একটা ঝাঁঝালো গন্ধে। তারপর বলল,—এটা একটা পবিত্র গাছের পাতা—মিশরের পুরোহিতরা ব্যবহার করত। আচ্ছা স্মিথ, তুমি প্রাচ্যদেশের ভাষাটাষা কিছু জানো?
—একদম না। একটা শব্দও জানি না।
বেলিংহ্যাম যেন উত্তরটা শুনে আশ্বস্ত হল। বলল,—আচ্ছা, কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম?
—বেশিক্ষণ নয়। মিনিট চার-পাঁচেক।
—অচেতন অবস্থাটা কি বিচিত্র! আমি জানি না কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম—কয়েক সেকেন্ড না কয়েক সপ্তাহ। টেবিলের ওপর এই লেখাটিকে দ্যাখো—চার হাজার বছর আগে এর শরীরটাকে প্যাক করা হয়েছিল। চোখের পলক ফেলতে যেটুকু সময় লাগে, সেটাই হয়তো ওর কাছে চার হাজার বছরের সমান। মমিটা দারুণ না?
স্মিথ টেবিলের কাছে গিয়ে পেশাদারি ভঙ্গিতে মমিটাকে দেখতে থাকল। বিবর্ণ এবং শুকনো হয়ে গেলেও শরীরের ছিরিছাঁদ নিখুঁত। কালো গভীর চক্ষুকোটরের মধ্যে মটরদানার মতো দুটি চোখ। গায়ের চামড়া হাড়ের ওপর টানটান হয়ে আছে। কানের ওপর এসে পড়েছে কালো কর্কশ চুল। কুঁচকে যাওয়া ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ইঁদুরের দাঁতের মতো দুটো দাঁত। বুকের পাঁজরা, ঢুকে যাওয়া পেট, পেটের ওপর ছুরি দিয়ে কাটার দাগ—যেখানে শরীরের পচন রোধ করার জন্য ওষুধ ঢোকানো হয়েছিল—এসবই চোখে পড়ল। নিস্পন্দ দেহেও যেন কর্মচঞ্চলতার আভাস—স্মিথ শিউরে উঠল। শরীরে নীচের দিকটা হলুদ রঙের মোটা ব্যান্ডেজ দিয়ে বাঁধা। বিভিন্ন ভেষজ পদার্থের টুকরো বাক্সটার মধ্যে ছড়ানো।
বেলিংহ্যাম বলল,—আমি এর নাম জানি না। বাক্সটার ওপর খোদাই করে কিছু লেখা নেই। ওপরে খালি লেখা আছে—লট নম্বর ২৪৯—এখন এটাই ওর নাম। নিলামে যখন মমিটা কিনেছিলাম, তখন এই নম্বরটাই ছিল বাক্সটার।
স্মিথ বলল,—লোকটার স্বাস্থ্য তো ভালোই ছিল বলে মনে হয়।
—হ্যাঁ, প্রায় দানবের মতো শরীর। ছ’ফুট সাত ইঞ্চি লম্বা—মিশরীয়দের গড় উচ্চতার থেকে অনেক বেশি। হাড় আর গাঁটগুলো দ্যাখো। ওর সঙ্গে লড়াই করা নিশ্চয়ই সহজ ছিল না।
মমিটার হাতের বাঁকা নোংরা নখগুলোর দিকে ঘৃণাভরে তাকিয়ে লী বলল,—হয়তো এর মতো লোকরাই পিরামিডগুলো বানিয়েছিল।
বেলিংহ্যাম বলল,—যে মালমশলা এই মমিতে আছে, তা দেখে মনে হয় লোকটা সমাজের গণ্যমান্য কেউ ছিল। সাধারণ মানুষের দেহ সংরক্ষণের জন্য সস্তার জিনিস ব্যবহার করা হত।
বেলিংহ্যাম কথা বলে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু বোঝাই যাচ্ছিল যে ওর ভয় এখনো কাটেনি। হাত দুটো এমনকী ঠোঁট দুটোও কেঁপে কেঁপে উঠছিল। মাঝে-মাঝেই ওর চোখ চলে যাচ্ছিল টেবিলে শায়িত ওর বীভৎস সঙ্গীর দিকে।
স্মিথ বলল,—আমি এখন চলি ভাই। পড়াশোনা আছে। তুমি তো এখন ঠিকই আছ। তবে এইসব বিষয় ছেড়ে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করো।
—তুমি চলে যাচ্ছ না তো লী? বেলিংহ্যামের প্রশ্ন।
—তুমি যা চাও তাই করব।
—তাহলে চলো, বাকি রাতটুকু তোমার ঘরের সোফায় কাটিয়ে দিই। শুভরাত্রি, স্মিথ।
এই হল বেলিংহ্যামের সঙ্গে স্মিথের পরিচয়ের ইতিহাস। যদিও এই পরিচয়কে গভীর করে তোলার কোনো ইচ্ছাই ছিল না স্মিথের। বার দুয়েক স্মিথকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল বেলিংহ্যাম। অবশ্য বেলিংহ্যামের পড়াশোনার পরিধি, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি এবং ভদ্র ব্যবহার ভালোই লেগেছিল স্মিথের। তাই বেলিংহ্যামের অসুন্দর চেহারা সত্ত্বেও দুজনের মধ্যে কিছুটা বন্ধুত্বও হল। কিন্তু বেলিংহ্যামের হাবেভাবে বা অসংলগ্ন কথাবার্তায় কিছুটা পাগলামির আভাস পেত স্মিথ। যেমন একদিন ও হঠাৎ বলে উঠল—শুভ এবং অশুভ শক্তির ওপর প্রভুত্ব করার ক্ষমতা একটা দারুণ ব্যাপার। আর একদিন ও বলল,—লী ছেলেটা ভালোই, কিন্তু ওর কোনো উচ্চাকাঙ্খা নেই। কোনো বড় পরিকল্পনায় ওকে অংশীদার করা যায় না।
বেলিংহ্যামের আর একটা নতুন অভ্যেস চোখে পড়ল স্মিথের। গভীর রাতে ও নিজের সঙ্গে কথা বলত। ঘরে অন্য কেউ নেই, অথচ ওর কথা বলার আওয়াজ কানে আসত। এই সম্বন্ধে ওকে কোনো প্রশ্ন করলে ও সরাসরি ব্যাপারটা অস্বীকার করত।
এমনকী একতলায় যে থাকে, অর্থাৎ পরিচারক টমাস স্টাইলস একদিন স্মিথকে বলল,—আচ্ছা, মিঃ বেলিংহ্যামের কী শরীর ঠিক নেই? আজকাল উনি নিজের সঙ্গে কথা বলেন—আমি শুনতে পাই। জানেন, উনি বাইরে গেলে তালাবন্ধ ঘরের মধ্যে থেকেও আওয়াজ পাই—যেন কেউ বা কিছু নাড়াচাড়া করছে।
—তোমার মাথা খারাপ হয়েছে স্টাইলস।
—তা আপনি যা বলেন স্যার। তবে এই নড়াচড়ার আওয়াজ আমি একাধিকবার শুনেছি।
স্মিথ ব্যাপারটা তখনকার মতো উড়িয়ে দিলেও, কয়েকদিন পরে ওটা নিয়ে আবার ভাবতে হল। একদিন রাতে বেলিংহ্যাম যখন স্মিথের ঘরে আড্ডা দিতে এসে মিশরের সমাধির গল্প করছিল, তখন স্মিথ নীচের তলার ঘরের দরজা খোলার কিংবা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ শুনতে পেল। ও বেলিংহ্যামকে বলল,—তোমার ঘরে যেন কেউ ঢুকল কিংবা বেরোল।
বেলিংহ্যাম তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। ওর মুখেচোখে অসহায়তার অভিব্যক্তি—কিছুটা অবিশ্বাস, কিছুটা ভয় মেশানো। ও বলল,—না, না, আমি তো দরজায় তালা দিয়ে এসেছি। কেউ তো দরজা খুলতে পারবে না।
স্মিথ বলল,—ওই শোনো, সিঁড়ি দিয়ে কেউ যেন ওপরে উঠে আসছে।
তক্ষুনি বেলিংহ্যাম প্রায় দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। স্মিথ কিন্তু বুঝতে পারল যে বেলিংহ্যাম সিঁড়ির মাঝামাঝি জায়গায় থেমে গিয়ে যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। একটু পরেই নীচে বেলিংহ্যামের ঘরের দরজাটা বন্ধ হওয়ার ও চাবি দেওয়ার আওয়াজ শোনা গেল। বেলিংহ্যাম ফিরে এল স্মিথের ঘরে। ওর ফ্যাকাশে মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সোফায় বসে বলল,—তেমন কিছু নয়। কুকুরটা। দরজা ঠেলে আমার ঘরে ঢুকে গেছল। সত্যিই আমি চাবি দিতে ভুলে গেছিলাম।
স্মিথ একটু অবাক হয়েই বলল,—তোমার যে একটা কুকুর আছে, তা তো জানতাম না।
—অনেকদিন পরে ব্যাটা এখানে আবার এসেছে। ওটাকে এবার বিদায় করব।
—আমি কিন্তু কুকুর ভালোবাসি। একবার দেখাবে কুকুরটাকে?
—আজ দেখানো সম্ভব হবে না ভাই। আমার আবার একজনের সঙ্গে এখন দেখা করতে যেতে হবে। আজ চলি।
টুপিটা হাতে নিয়ে বেলিংহ্যাম তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেল। কিন্তু স্মিথ স্পষ্ট শুনতে পেল, বেলিংহ্যাম নিজের ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে চাবি দিয়ে দিল।
বেলিংহ্যামের সঙ্গে এই সাক্ষাতে স্মিথের মনে একটু বিতৃষ্ণার ভাব এল। বেলিংহ্যাম নির্ভেজাল মিথ্যে কথা বলেছিল। স্মিথ ভালোভাবেই জানে, ওর কোনো কুকুর নেই। তাছাড়া, সিঁড়িতে যে পায়ের শব্দ শোনা গেছিল, সেটা কোনো চতুষ্পদের নয়। তাহলে সেটা কী? স্টাইলস যে চলাফেরার শব্দ শুনেছিল, তাহলে কী সেটা সত্যি? মনে এইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই স্মিথের ঘরে ঢুকে পড়ল হেস্টি। হইহই করে স্থানীয় ক্লাব ক্রিকেটের আজকের খেলার বিবরণ দিতে দিতেও হঠাৎ বলে উঠল—নর্টনের খবর শুনেছ?
—মানে সেই নর্টন যার সঙ্গে বেলিংহ্যামের ঝগড়া হয়েছিল? কী হয়েছে?
—কলেজ গেট থেকে একশো গজ দূরে বড় রাস্তার বাঁকে ওর ওপর আক্রমণ হয়েছে।
—কিন্তু কে?
—ভাই, ওটাই বলা কঠিন। ‘কে’ না ‘কি’। নর্টন হলফ করে বলছে, আক্রমণকারী কোনো মানুষ নয়। ওর গলায় আঁচড়ের দাগগুলো দেখে মনে হয়, এটা কোনো মানুষের কর্ম নয়।
—তাই হলে? ভূত-প্রেত নাকি?
—না, তেমন কিছু নয়। আশেপাশের কোনো সার্কাস থেকে হয়তো বাঁদর জাতীয় কোনো জানোয়ার পালিয়ে এই অঞ্চলে এসেছে। নর্টন তো ওই রাস্তা দিয়ে রোজ রাতে ফেরে। রাস্তায় পড়ে একটা এলম গাছ। নর্টন কিছু দেখতে পায়নি। কিন্তু ওর ধারণা, ওই গাছ থেকেই কিছু নেমে এসে ওকে আক্রমণ করে। ইস্পাতের দড়ির মতো শক্ত অথচ সরু দুটো হাত ওর গলা টিপে ধরেছিল। প্রায় দমবন্ধ অবস্থা। ওর চিৎকার শুনে আশেপাশের কিছু লোক ছুটে আসতেই আক্রমণকারী প্রায় বেড়ালের মতো নিঃশব্দে দেওয়াল টপকে পালায়।
—মনে হয়, আগেকার দিনের সেই লোহার কলারের মতো জিনিস অর্থাৎ গ্যারোটার নিয়ে কেউ আক্রমণ করেছিল। এ জিনিস দিয়ে মানুষ মারা হত।
—কী জানি! তবে গ্যারোটারের কী লম্বা লম্বা নখ থাকবে, না কি গ্যারোটার হাতে আক্রমণকারী ব্যক্তি বেড়ালের মতো দেওয়াল টপকে পালাবে? তবে হ্যাঁ, তোমার প্রতিবেশী বন্ধু বেলিংহ্যাম এই ঘটনা শুনে নিশ্চয়ই খুশি হবে, কেননা নর্টনের ওপর ওর আক্রোশ ছিল। কিন্তু স্মিথ, তোমার মুখ দেখে মনে হয় এই রহস্যের যেন কিছু সমাধান তোমার কাছে আছে।
—আরে না, না। ব্যাপারটা উড়িয়ে দিল স্মিথ।
—ভালো কথা—শুনলাম বেলিংহ্যাম আর লী দুজনের সঙ্গেই তোমার পরিচয় হয়ে গেছে। লী ছেলেটা খারাপ নয়। কিন্তু বেলিংহ্যামের ব্যাপারে সাবধান থেকো। এখন আসি। আমার আবার এই বুধবারের পরের বুধবার নৌ-চালনার প্রতিযোগিতা আছে। দেখতে এসো কিন্তু।
স্মিথ কিন্তু পড়ায় মনোযোগ দিতে পারল না। ওর খালি মনে হচ্ছে নীচের ঘরের রহস্যময় লোকটা নর্টনের ওপর আক্রমণের ঘটনার মধ্যে সংযোগ আছে। একটু পরে হাতের বইটা সরিয়ে নিয়ে মনে মনে বলে উঠল স্মিথ—ওই হতচ্ছাড়ার জন্যে আজ রাতের পড়াটার বারোটা বাজল! ওকে এবার থেকে এড়িয়ে চলতে হবে।
পরের দশ দিন স্মিথ বেলিংহ্যামকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেল। ও দরজায় ঠকঠক করলেও দরজা খুলত না। ও সাধারণত যে সময়ে স্মিথের সঙ্গে দেখা করতে আসত, তার আগেই স্মিথ ছড়ি হাতে হাঁটতে বেরিয়ে যেত। এমনই একদিন বিকেলে যখন স্মিথ সিঁড়ি দিয়ে নামছিল, তখন হঠাৎ বেলিংহ্যামের ঘর থেকে বেরিয়ে এল লী। রাগে গনগন করছে লী-র মুখ। ওর পেছনে পেছনে বেরিয়ে এল বেলিংহ্যাম—ওরও মুখে হিংস্র ক্রোধের অভিব্যক্তি।
হিস হিস করে লী-কে বলল বেলিংহ্যাম,—আহাম্মক কোথাকার। তোমাকে এর মূল্য দিতে হবে।
লী বলল—ঠিক আছে। তবে আমার কথা শুনে রাখো। আমি আর এসবে নেই।
—তুমি কিন্তু প্রমিস করেছিলে।
—ঠিক আছে, আমার মুখ বন্ধ রাখব। কাউকে কিছু বলব না। কিন্তু এটাও জেনে রাখো—আমার বোনের মরা মুখ দেখব, কিন্তু ওর সঙ্গে তোমার বিয়ে হতে দেব না। তুমি আমাদের বাড়িতে আর আসবে না।
এটুকু শুনেই স্মিথ তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল। ওদের দুজনের ঝগড়ার মধ্যে ঢুকে লাভ নেই। লী-র বোনের বিয়ে যদি কেঁচে যায়, ভালোই হবে। বেলিংহ্যামের মতো একটা নচ্ছারের হাতে নিরীহ একটি মেয়েকে তুলে দেওয়া যায় না। কিন্তু কী প্রমিসের কথা বলছিল ওরা? কী গোপন কথা লী ফাঁস করবে না? ভাবতে লাগল স্মিথ।
আজ নৌ চালনা প্রতিযোগিতা—হেস্টি বনাম মালিনস। বিকেলবেলায় আইসিস নদীর তীরে লোকজন ম্যাচ দেখতে ভিড় জমাচ্ছিল। কলেজের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী, অ্যাথলিটরা—কেউ বাকি নেই।
স্মিথ এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছিল যেখান থেকে প্রতিযোগিতার অন্তিম ও তীব্রতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভালো করে দেখতে পাওয়া যায়। হেস্টি যখন প্রায় বিজয়ী এবং ওর প্রতিদ্বন্দ্বী অনেকটা পিছিয়ে, স্মিথ হোস্টেলের পথে পা বাড়াল। তখনই ওর পিঠে কেউ যেন হাত রাখল। পিছন ফিরে দেখল স্মিথ লী-কে।
লী বলল,—কাছেই আমাদের একটা ছোট কটেজ আছে। গরমকালে মাঝে মাঝে এসে থাকি। এসো না, এক কাপ চা খেয়ে যাও।
প্রথমে মৃদু আপত্তি করেও লী-র অনুরোধ মেনে নিল স্মিথ। পঞ্চাশ গজ দূরে ছোট্ট ছিমছাম কটেজে চা খেতে খেতে বলল লী—একটা কথা বলি স্মিথ। আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতাম, তাহলে এক্ষুনি আমার হোস্টেলের ঘরটা বদলে নিতাম।
—অ্যাঁ?
—কথাটা অদ্ভুত শোনাচ্ছে ঠিকই। তবে আমি কারণটা বলতে পারব না—আমার মুখ বন্ধ। এটুকু বলতে পারি, বেলিংহ্যামের কাছাকাছি না থাকাই ভালো।
—কিন্তু কেন?
—সেটাই তো বলতে পারব না ভাই—আমাকে মাফ করো। কিন্তু তোমার ওই ঘরটা ছেড়ে দাও। তুমি তো সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আমার আর বেলিংহ্যামের ঝগড়া শুনেছিলে। যে রাতে ও অজ্ঞান হয়ে গেছিল, সেই রাত থেকেই ওর সম্বন্ধে সন্দেহ আমার মনে দানা বাঁধছিল। পরে ওকে চেপে ধরতে ও এমন কিছু বলেছিল যা শুনে আমার মাথার চুল খাড়া হয়ে যায়। ও চায় ওর কাজে আমি সহায়তা করি। কিন্তু আমি ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান পরিবারের সন্তান। এমন অনেক কিছু আছে যা আমার ধর্মের গণ্ডির বাইরে। তবে ঈশ্বরের দয়ায় ওর সঙ্গে আমার বোনের বিয়েটা আটকাতে পেরেছি।
—আমি তো তোমার কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝছি না।
—স্মিথ, আমি তোমাকে বেলিংহ্যাম সম্বন্ধে সতর্ক করে দিলাম। এই মুহূর্তে বেলিংহ্যাম একজন বিপজ্জনক প্রতিবেশী। তুমি প্লিজ ঘর পালটাও।
স্মিথ এবার সোজাসুজি লী-কে বলল,—আমিও কিন্তু এ সম্বন্ধে কিছু কিছু জানি। যেমন ধরো, বেলিংহ্যামের ঘরে আরও একজন থাকে।
উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে বলল লী,—তুমি জানো?
—কোনো মহিলা থাকে?
লী হতাশভাবে বলল,—আমি কিছু বলতে পারব না। আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
—বেশ। তবে কাউকে ভয় পেয়ে ঘর ছেড়ে দেওয়ার বান্দা আমিও নই। বেলিংহ্যাম কবে কী করবে এই আশঙ্কায় লটবহর নিয়ে আমার পছন্দের ঘর আমি ছাড়ব না। দেখা যাক কী হয়। আসি ভাই।
কিছুটা কৌতূহল, কিছুটা চিন্তা নিয়ে হোস্টেলে ফিরল স্মিথ। পড়াশোনায় মগ্ন থাকলেও স্মিথের একটা নির্দোষ শখ ছিল। প্রতি মঙ্গল আর শুক্রবার সন্ধ্যায় ও অক্সফোর্ড থেকে দেড় মাইল দূরে ফার্লিংফোর্ড গ্রামে যেত—ওর দাদার বন্ধু ড. পিটারসনের বাড়িতে। পিটারসন একাই থাকে। পয়সা কড়িও আছে ভালো। বাড়িতে বড় লাইব্রেরি। ওর সঙ্গে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে ঘণ্টাখানেক গল্পগুজব, সঙ্গে চা-কফি, স্মিথের অভ্যেস হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
লী-র সঙ্গে কথাবার্তা হওয়ার পরের দিনের ঘটনা। সন্ধে সওয়া আটটায় পড়ার বই বন্ধ করল স্মিথ। তখনই ওর চোখে পড়ল বেলিংহ্যামের কাছ থেকে ধার করে আনা একটা বই। আরে! বইটা তো এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি। বইটা নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ও বেলিংহ্যামের দরজায় করাঘাত করল। কোনো উত্তর নেই। দরজার হ্যান্ডেলটা ঘুরিয়ে দেখল—দরজা খোলা। ভালোই হল! বদমাইশটার সঙ্গে কথা না বলে বইটা চুপচাপ রেখে দিলেই হবে। ঘরে ঢুকে বইয়ের সঙ্গে নিজের একটা কার্ড টেবিলের ওপর রাখল স্মিথ।
বাতির ম্লান আলোতেও ঘরের ভেতরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ঘরের সব জিনিসই ঠিকঠাক আছে, এমনকী মমির বাক্সটাও। কিন্তু ও কি? মমিটা তো নেই! কোথায় গেল ওটা? বেলিংহ্যাম সরল বিশ্বাসে দরজা খুলে রেখে গেছে—সুতরাং ওর গোপনীয় কিছু নেই। তাহলে কী ওকে অকারণে সন্দেহ করছি, ভাবল স্মিথ।
স্মিথ সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। হঠাৎ অন্ধকারে কী যেন ওর গায়ের পাশ দিয়ে চলে গেল। একটা চাপা শব্দ, একটু হাওয়ার দমক, আর ওর শরীরকে কেউ যেন আলতো করে ছুঁয়ে গেল। স্মিথ চেঁচিয়ে উঠল— কে? স্টাইলস নাকি? একতলা থেকে কোনো উত্তর এল না। হয়তো পুরোনো বাড়িটার ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে একটা দমকা হাওয়া এসে থাকবে। কিন্তু হালকা পায়ের আওয়াজ তো শোনা গেছিল।
নীচে নেমে স্মিথ দেখল, লনের ওপর দিয়ে দৌড়ে আসছে হেস্টি। স্মিথ বলল,—কী খবর হেস্টি?
—এক্ষুনি চলো আমার সঙ্গে। লী জলে ডুবে গেছে। ডাক্তার পাওয়া গেল না। তুমি গেলেই হবে। মনে হয়, ওর শরীরে এখনো একটু প্রাণ আছে।
—দাঁড়াও, একটু ব্র্যান্ডি নিয়ে আসি। বলেই দুদ্দাড় করে সিঁড়ি ভেঙে নিজের ঘরে গেল স্মিথ। ব্র্যান্ডি নিয়ে নামার সময় তিনতলায় বেলিংহ্যামের ঘরের দিকে চোখ পড়ল ওর। একটু আগেই তো এই ঘরের দরজাটা টেনে বন্ধ করে নীচে গিয়েছিল স্মিথ। তাহলে দরজাটা আবার এখন খোলা কেন? খোলা দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে মমির বাক্সটা। তিন মিনিট আগেও বাক্সটা খালি ছিল। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে দেখল স্মিথ—এখন বাক্সের মধ্যে সেই বীভৎস, কালো, লম্বা, দড়ির মতো পাকানো চেহারাটা। চামড়া কুঁচকানো কালো মুখটা দরজার দিকে। শরীরটা প্রাণহীন ও নিস্পন্দ হলেও কোটরে বসা চোখ দুটোয় যেন চেতনার আভাস। ভীত ও হতভম্ব স্মিথ কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গেছিল ওর ফিরে আসার উদ্দেশ্য। ওর ঘোর ভাঙল নীচের থেকে হেস্টির ব্যাকুল ডাকে,—কী হল স্মিথ? তাড়াতাড়ি এসো। একজনের জীবন-মরণের প্রশ্ন!
অন্ধকারের মধ্যে দু-বন্ধু প্রাণপণে দৌড়ে হাঁফাতে হাঁফাতে গিয়ে পৌঁছল নদীর ধারে লী-র সেই ছোট্ট কটেজে। লী-কে একটা সোফায় শোয়ানো হয়েছে—তার ভিজে পোশাক থেকে এখনো বিন্দু বিন্দু জল পড়ছে, মাথার চুলে লেগে আছে শ্যাওলা, ঠোঁটের কোণে গ্যাঁজলা। ওর পাশে বসে ওর আরেক বন্ধু হ্যারিংটন।
স্মিথ লী-কে পরীক্ষা করে বলল,—বেঁচে আছে এখনও।
পরের দশ মিনিট চলল ওকে সুস্থ করে তোলার প্রচেষ্টা। একটু কেঁপে উঠল ওর দেহ, ঠোঁট দুটোও নড়ে উঠল। আস্তে আস্তে ও চোখ খুলল। তিনজনেই তখন উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল। লী-কে একটু ব্র্যান্ডি খাইয়ে দেওয়া হল।
হ্যারিংটন বলল,—কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম! লী নদীর তীরে বেড়াতে গেছল। হঠাৎ শুনি একটা চিৎকার আর ঝপাং করে কিছু জলে পড়ে যাওয়ার শব্দ। দৌড়ে গিয়ে ওকে যখন জল থেকে টেনে তুললাম, মনে হল ও বেঁচে নেই।
লী ধীরে ধীরে উঠে বসল। তারপর বলল—এখন মনে পড়ছে—আমি জলে পড়ে গেছলাম।
—কী করে জলে পড়লে? স্মিথের প্রশ্ন।
—আমি নিজে নিজে জলে পড়ে যাইনি। নদীর ধারে দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন আমাকে তুলে নিয়ে জলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। আমাকে তুলল এমন করে যেন আমি একটা পাখির পালক। কিছু দেখতেও পাইনি। কিছু শুনতেও পাইনি। কিন্তু জানি সেটা কী ছিল।
ফিস ফিস করে বলল স্মিথ,—আমিও জানি।
—বুঝতে পেরেছ? এবার মনে পড়েছে আমার উপদেশ?
—হ্যাঁ। এবার মনে হচ্ছে তোমার কথাই মেনে নিতে হবে।
হেস্টি বলল,—তোমরা কী নিয়ে কথা বলছ কিছুই বুঝলাম না। যাই হোক, ও এবার বিশ্রাম করুক। চলো স্মিথ, আমরা এবার কলেজে ফিরে যাই।
ফেরার পথে দুজনের মধ্যে তেমন কিছু কথা হল না। স্মিথ সন্ধের ঘটনাক্রম নিয়ে ভাবছিল—মমির অনুপস্থিতি, সিঁড়িতে ওর গা ছুঁয়ে কিছু চলে যাওয়া, মমির ব্যাখ্যাতীত প্রত্যাবর্তন, লী-র ওপর এই হামলা, এর আগে নর্টনের ওপর আক্রমণ! এই সব ঘটনার মধ্যে কোনো কার্যকারণ সম্বন্ধ আছে কি? রহস্যময় প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের ঘটনা এবং পরে তার বিচিত্র আচরণ—এ সবই স্মিথের মনে পড়ল। প্রথমে যা ছিল মৃদু সংশয়, তা এখন স্মিথের মনে বিশ্বাসে পরিণত হচ্ছে। অবিশ্বাস্য হলেও এক অশ্রুতপূর্ব, নারকীয় রহস্যের মুখোমুখি হয়েছে সে। প্রমাণ না থাকলেও স্মিথ শপথ করে বলতে পারে, বেলিংহ্যাম আদতে একটা খুনি এবং অপরাধজগতের ইতিহাসে তার মতো অস্ত্র নিয়ে আর কেউ আর অপরাধ করতে নামেনি। মনে হচ্ছে লী-র কথা মতো এখান থেকে সরে পড়াই ভালো—লেখাপড়া করবে, না কি সর্বক্ষণ কান খাড়া করে বসে থাকবে নীচের ঘরের কাণ্ডকারখানা, পায়ের আওয়াজ ইত্যাদি শোনার জন্যে?
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে দেখল স্মিথ, বেলিংহ্যামের ঘরে আলো জ্বলছে। তিনতলায় পৌঁছতেই দরজা খুলে মুখ বের করল বেলিংহ্যাম। ফোলা, বদমাইশি বুদ্ধি ভরা মুখটা দেখে মনে হল যেন একটা অতিকায় মাকড়সা সদ্য বিষাক্ত জাল বুনে বেরিয়ে এল।
—গুড ইভনিং! ভেতরে আসবে না?
—নাঃ। কড়া গলায় জবাব দিল স্মিথ।
—পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত বুঝি? আসলে, লী-র ঠিক কী হয়েছে সেটা তোমার কাছ থেকে শুনতে চাইছিলাম।
মুখটা গম্ভীর, কিন্তু চোখে কৌতুকের ঝিলিক বেলিংহ্যামের। স্মিথের মনে হল—দিই হতচ্ছাড়াকে দু-এক ঘা বসিয়ে।
স্মিথ বলল,—তুমি হয়তো শুনে দুঃখিত হবে যে লী সম্পূর্ণভাবে বিপন্মুক্ত এবং সুস্থ আছে। তোমার কারিকুরি কিছুই খাটেনি। আমার দিকে এমন করে তাকানোর দরকার নেই। আমি সব জানি।
বেলিংহ্যাম এক-পা পিছিয়ে দরজাটা অর্ধেক বন্ধ করে বলল,—কী পাগলের মতো যা-তা বলছ? আমি কেন লী-র ক্ষতি করব?
—তুমি আর তোমার সঙ্গী ওই যে হাড়ের থলিটা—তোমরাই যা করার করেছ। তোমার মতো অপরাধীদের আগেকার দিনে পুড়িয়ে মারা হত, আজকাল ফাঁসি দেওয়া হয়। খবরদার বেলিংহ্যাম—তোমার উপস্থিতিতে এই কলেজের একজনেরও যদি মৃত্যু হয়, তবে ঈশ্বরের দোহাই, আমি তোমাকে ফাঁসিকাঠে চড়াব। মিশরের ওইসব ব্যাপার…ইংল্যান্ডে চলবে না বলে দিচ্ছি।
—তুমি বদ্ধ পাগল!
—ঠিক আছে, তাই! তবে যা বললাম তা মনে রেখো, কেন না আমি যা বলি, কাজে তা আরো ভালো করে দেখিয়ে দিই।
দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে রাগে গরগর করতে করতে স্মিথ নিজের ঘরে গেল। অনেক রাত অবধি জেগে থেকে আজকের ঘটনা নিয়ে ভাবল। পরের দিন বেলিংহ্যামের সঙ্গে কোনো দেখাসাক্ষাৎ হল না স্মিথের। এদিকে বন্ধুরা জানাল, লী এখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে।
সারাদিন কাজকর্মের পর মাথাটাকে একটু বিশ্রাম দিতে স্মিথ ঠিক করল, আজ সন্ধেবেলায় ড. পিটারসনের বাড়িতে আড্ডা দিতে যাবে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দেখল—বেলিংহ্যামের ঘরের দরজা বন্ধ। বাড়ির বাইরে এসে পেছন দিকে তাকিয়ে দেখল, তিনতলায় কাচের জানলায় নাক ঠেকিয়ে দূরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে বেলিংহ্যাম। বসন্তকালের মনোরম সন্ধ্যায় সুন্দর হাওয়া দিচ্ছিল। আকাশে আধখানা চাঁদ।
পাঁচ মিনিট হাঁটার পরেই শহর ছাড়িয়ে নির্জন রাস্তায় চলে এল স্মিথ। এই রাস্তা দিয়েই ড. পিটারসনের বাড়ি যেতে হয়। একটু পরেই এল একটা নুড়ি-বিছানো পথ। একটা গেট পেরিয়ে সেই পথে ঢুকতে হয়। একটু দূরে দেখা যাচ্ছে জনবসতি, আলোকিত ঘরবাড়ি। লোহার গেটটা খুলতে গিয়ে পেছন দিকে তাকাল স্মিথ। একটা কিছু যেন এদিকে জোরে জোরে আসছে। অন্ধকারেও বোঝা গেল, কালো রঙের কেউ বা কিছু রাস্তার ধারের ঝোপঝাড়ের পাশ দিয়ে গুঁড়ি মেরে নিঃশব্দে এদিকে ধেয়ে আসছে। স্মিথ বুঝতে পারল, অনুসরণকারী বিশ পা দূরত্বের মধ্যে এসে গেছে। চোখে পড়ল তার লিকলিকে সরু গলাটা আর দুটো চোখ। এমন চোখ যা অনন্তকাল ধরে স্মিথের স্বপ্নে গেঁথে থাকবে। একটা অস্ফুট আওয়াজ করে স্মিথ আলোকিত বাড়িগুলির দিকে দৌড়তে শুরু করল। দৌড়ে স্মিথের সুনাম আছে, কিন্তু এমন দৌড় সে জীবনে দৌড়য়নি।
লোহার গেটটা বন্ধ করে এলেও, স্মিথ শুনতে পেল অনুসরণকারীর গেটটা খুলে ফেলার শব্দ। স্মিথের পেছনে কারোর দ্রুত দৌড়ে আসার আওয়াজ, যেন এক বিভীষিকা তাকে বাঘের মতো তাড়া করছে—সেটার একটা হাত বাড়ানো, চোখ জ্বলজ্বল করেছে। ভাগ্য ভালো, পিটারসনের বাড়ির দরজাটা অর্ধেক খোলা। স্মিথের প্রায় ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে অনুসরণকারী—তার গলায় ঘড়ঘড়ে আওয়াজ। স্মিথ নিজেকে ঘরের মধ্যে প্রায় ছুঁড়ে দিয়ে দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে দিল। তারপর প্রায় অর্ধচেতন অবস্থায় বসে পড়ল একটা সোফায়।
পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে অবাক পিটারসন জিগ্যেস করল,—কী ব্যাপার স্মিথ, কী হয়েছে?
—একটু ব্র্যান্ডি দাও তো!
এক ঢোকে ব্র্যান্ডিটুকু গলাধঃকরণ করে একটা বড় শ্বাস নিয়ে উঠে দাঁড়াল স্মিথ। বলল—মনে হচ্ছে এখন প্রাণ ফিরে পেলাম। জীবনে কখনো এমন ভয় পাইনি। যদি তোমার অসুবিধে না হয়, তাহলে রাতটা তোমার এখানেই কাটাতে চাই। ওই রাস্তা দিয়ে রাত্তিরে হোস্টেলে ফেরার হিম্মত আমার নেই।
—অবশ্যই থাকতে পারো। কিন্তু কী ব্যাপার বলো তো?
—জানলার কাছে এসো। আমি যা দেখেছি, তা তোমাকে দেখাব।
দোতলায় উঠে জানালা দিয়ে দুজনে বাইরে তাকাল, কিন্তু শান্ত, নির্জন, জ্যোৎস্নালোকিত পথ আর মাঠঘাট ছাড়া কিছুই চোখে পড়ল না। একটু পরে স্মিথ বলল—রাস্তাটা যেদিকে বেঁকেছে, ওদিকে তাকাও।
—হ্যাঁ, তাই তো! কেউ যেন চলে গেল। মনে হয় একটা লোক খুব লম্বা, রোগা। কিন্তু তাতে কী? তুমি এখনো কাঁপছ কেন?
—আমি শয়তানের হাতের মুঠোয় প্রায় চলে গেছিলাম। এসো, তোমার পড়ার ঘরে বসে ব্যাপারটা বলি।
মমির বাক্সের সামনে বেলিংহ্যামের অজ্ঞান হয়ে যাবার ঘটনা থেকে শুরু করে আজ সন্ধে অবধি ঘটে যাওয়া সবকিছু স্মিথ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করল। তারপর বলল—বীভৎস, অবিশ্বাস্য কিন্তু নির্জলা সত্যি।
অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে হতবুদ্ধি পিটারসন বলল,—এমন কাণ্ডকারখানা কখনো শুনিনি। যাই হোক, তোমার অনুমান কী সেটা বলো। পরে আমার ব্যাখ্যা শোনাব।
—ব্যাপারটা স্পষ্ট করে বোঝানো কঠিন, কিন্তু আমার মনে হয় প্রাচ্যবিদ্যার চর্চা করতে করতে বেলিংহ্যামের হাতে এমন কিছু গূঢ় নারকীয় ফরমুলা আসে, যার সাহায্যে অল্পক্ষণের জন্যে হলেও কোনো মমির—কিংবা এই মমিটার—মধ্যে প্রাণসঞ্চার করা যায়। যে রাতে ও অজ্ঞান হয়ে যায়, সেই রাতে মনে হয় এই নিয়েই কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিল। প্রথম বার তো! মমিটা নড়ে উঠতেই ও ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে এই পরীক্ষায় ও অভ্যস্ত হয়ে যায়। এই বিচিত্র বিদ্যা রপ্ত করে তারপর বেলিংহ্যাম মমিটাকে নিজের অঙ্গুলিহেলনে চালাতে লাগল। তবে মমিটার মধ্যে প্রাণসঞ্চার খুব সামান্য সময়ের জন্যেই হয়, কেননা আমি ওটাকে শায়িত অবস্থাতেই দেখেছি বেশির ভাগ সময়। মমিটার বুদ্ধি ও শক্তি দুটোই আছে। লী-কে এই পরীক্ষায় দলে টানতে চেয়েছিল বেলিংহ্যাম, কিন্তু এই শয়তানি কাণ্ডকারখানায় লী-র ধর্মপ্রাণ মন সাড়া দেয়নি। এই নিয়ে দুজনের বচসা হয়। লী বলেছিল, ওর বোনকে বেলিংহ্যামের সব গোপন কথা জানিয়ে দেবে। লী মুখ খোলার আগেই বেলিংহ্যাম চেয়েছিল ওর মুখ চিরতরে বন্ধ করে দিতে। এই ভয়ানক জীবটিকে পাঠিয়েছিলেন লী-কে নিকেশ করতে। এর আগে পুরোনো আক্রোশ মেটাতে ও মমিটাকে পাঠিয়েছিল নর্টনের কাছে। ভাগ্য ভালো, তাই দুটো খুনের দায় থেকে বেঁচে গেছে বেলিংহ্যাম। এরপর এল আমার পালা। আমি যখন এসব ঘটনার জন্যে ওকে দায়ী করলাম, ও ঠিক করল আমাকেও রাস্তা থেকে সরাবে। তাই ওর ভয়াবহ প্রতিনিধিকে পাঠিয়েছিল আমাকে শেষ করতে। খুব জোর বেঁচে গেছি পিটারসন, না-হলে কাল সকালে তোমার দরজার বাইরে আমার লাশটা দেখতে পেতে।
—তুমি কিন্তু স্মিথ, ব্যাপারটাকে একটু বেশি গুরুত্ব দিচ্ছ। অক্সফোর্ডের রাস্তায় এমন একটা জীব ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথচ তাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না—সম্ভব নাকি?
—লোকে কিন্তু দেখেছে ওটাকে। ভেবেছে সার্কাস থেকে পালানো বাঁদর জাতীয় কিছু।
—আসলে স্মিথ, পড়ার চাপে তোমার মাথা গরম হয়েছিল। তাছাড়া, এইসব ঘটনা নিয়ে তুমি খুব ভাবছিলে। ক্ষুধার্ত, শীর্ণ কোনো ভবঘুরে হয়তো তোমাকে তাড়া করেছিল। বাকিটা সবই তোমার ভয় ও কল্পনার মিশেলে তৈরি।
—না, পিটারসন, তা নয়।
—আরো বলছি। যেদিন বেলিংহ্যামের ঘরে তুমি দেখলে যে মমির বাক্সটা ফাঁকা আবার একটু পরেই দেখলে মমিটা বাক্সের মধ্যে আছে, সেদিন কিন্তু ঘরটা পুরোপুরি আলোকিত ছিল না। হয়তো ক্ষীণ আলোয় প্রথমে তুমি বাক্সের মধ্যে মমিটাকে দেখতেই পাওনি।
—আমার ভুল দেখার প্রশ্নই ওঠে না।
—তাছাড়া, লী হয়তো সত্যিই জলে পড়ে গেছল। নর্টনের গলায় সত্যিই ফাঁস লাগিয়েছিল কেউ। তুমি বেলিংহ্যামের বিরুদ্ধে যে গুরুতর অভিযোগ আনছ, যে-কোনো ম্যাজিস্ট্রেট তা হেসে উড়িয়ে দেবে।
—তা জানি। তাই যা করার তা আমি নিজেই করব।
—অ্যাঁ?
—হ্যাঁ। এই অদ্ভুত জীবের জন্যে কলেজে আমি সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকব তা সম্ভব নয়। মানুষের প্রতিও আমার কিছু কর্তব্য আছে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। একটা কলম আর কাগজ দেবে?
দেড়ঘণ্টা ধরে স্মিথ খসখস করে অনেক কিছু লিখল। তারপর লিখিত কাগজগুলো জড়ো করে শেষ পৃষ্ঠাটা পিটারসনের সামনে রেখে বলল,—এখানে সাক্ষী হিসেবে একটা সই করো।
—সাক্ষী? কীসের?
—আমার সই এবং আজকের তারিখের। তারিখটা জরুরি। আমার জীবন-মরণের ব্যাপার।
—তোমার মাথা ঠিক আছে তো? শুয়ে পড়ো এখন—অনেক রাত হয়েছে।
—পিটারসন, আমার জীবনে এত ঠান্ডা মাথায় আজ পর্যন্ত কিছু বলিনি। তুমি সই করলেই আমি শুতে যাব।
—কী লিখেছ?
—তোমাকে আজ যা যা বললাম তাই। এবার সই করো।
—বেশ। সই করে পিটারসন জিগ্যেস করল,—কিন্তু তোমার মতলবটা কী?
—তুমি কাগজগুলো রাখো। পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করলে ওগুলো তুমি আদালতে দেখাবে।
—গ্রেফতার? কেন?
—খুনের অপরাধে। খুন হতেই পারে। সব পরিস্থিতির জন্যে আমি প্রস্তুত। একটাই রাস্তা আমার সামনে, আর সেই রাস্তাই ধরব। তোমার হাতে কাগজগুলো দিয়ে নিজেকে এখন হালকা লাগছে। এবার শুতে যাই, কারণ কাল সকালে একদম ফ্রেশ থাকতে হবে।
অ্যাবারক্রম্বি স্মিথ ছেলেটি এমনিতে ভালো, ঠান্ডা মাথার, কিন্তু কারো সঙ্গে শত্রুতা হলে এই স্মিথই হয়ে ওঠে ভয়ংকর। তখন সে না করতে পারে এমন কোনো কাজই নেই। ছাত্র হিসেবে পড়াশোনায় সে যতটা স্থিরসংকল্প, জীবনের অন্য কোনো উদ্দেশ্য চারিতার্থ করতেও ততটাই।
সকাল ন’টা নাগাদ ও অক্সফোর্ডে ফিরে এল। শহরের বিখ্যাত বন্দুক ব্যবসায়ী ‘ক্লিফোর্ডস’-এর দোকানে গিয়ে কিনল একটা ভারী রিভলভার ও এক বাক্স গুলি। ছ’টা গুলি ভরে রিভলভারটা রাখল কোটের পকেটে। তারপর গেল বন্ধু হেস্টির হোস্টেলে। হেস্টি তখন ব্রেকফাস্ট করতে করতে খবরের কাগজের খেলার পাতাটায় চোখ বোলাচ্ছিল। স্মিথকে দেখে বলল,—কী খবর? কফি খাবে?
—না ভাই। তুমি আমার সঙ্গে একটু আসবে? যা বলব তা করতে হবে কিন্তু।
—অবশ্যই।
—সঙ্গে একটা মোটা দেখে ছড়ি নিয়ে এসো।
—আমার একটা শিকারের চাবুক আছে। সেটার ঘায়ে ষাঁড়ও শুয়ে পড়বে।
—বাঃ। আর একটা জিনিস। শব-ব্যবচ্ছেদ করার এক বাক্স ছুরি আছে না তোমার? ওর থেকে সবচেয়ে বড় ছুরিটা নিয়ে এসো।
—এই নাও চাবুক আর ছুরি। মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধযাত্রা করছ।
ছুরিটা কোটের মধ্যে লুকিয়ে রাখল স্মিথ। হোস্টেলের দিকে যেতে যেতে হেস্টিকে বলল—কাজটা আমি একাই করতে পারি, শুধু সাবধানতার জন্যে তোমাকে সঙ্গে নিলাম। বেলিংহ্যামের সঙ্গে একটু কথাবার্তা বলতে হবে। ওকে সামলানোর জন্যে আমি একাই যথেষ্ট। তবে আমি যদি তোমাকে চেঁচিয়ে ডাকি, তবে তুমি তৎক্ষনাৎ ওপরে ওর ঘরে এসে যত জোরে পার চাবুকটা চালাবে। ঠিক আছে?
—একদম। তোমার ডাক পেলেই আমি হাজির হব।
—তাহলে তুমি নীচে এখানেই অপেক্ষা করো। একটু হয়তো সময় লাগবে, কিন্তু ততক্ষণ কোত্থাও যেয়ো না।
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে স্মিথ বেলিংহ্যামের ঘরের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। বেলিংহ্যাম টেবিলে বসে লিখছিল। ওর বিচিত্র সম্পত্তি আশেপাশে ছড়িয়ে—তার মধ্যে আছে ‘লট নং ২৪৯’ লেখা বাক্সটা আর বাক্সবন্দী পাকানো দড়ির মতো শরীরটা। স্মিথ ঘরের চারদিকে জরিপ করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর একটা দেশলাইকাঠি জ্বালিয়ে ফায়ারপ্লেসের মধ্যে ফেলল। আগুন জ্বলে উঠল ফায়ারপ্লেসে। বিস্ময় ও ক্রোধে বিস্ফারিত চোখ বেলিংহ্যামের। ও বলে উঠল,—বাঃ! সবকিছু বেশ গুছিয়ে নিলে তো—যেন এটা তোমার বাড়ি!
স্মিথ ধীরে-সুস্থে বসে নিজের ঘড়িটা রাখল টেবিলে। তারপর রিভলভারটা বের করে ট্রিগারে আঙুল রেখে ওটাকে রাখল কোলের ওপর। আর কোটের ভেতর থেকে লম্বা ছুরিটা বের করে ছুঁড়ে দিল বেলিংহ্যামের দিকে। তারপর বলল,—এইবার উঠে মমিটাকে টুকরো টুকরো করে কাটো।
অবজ্ঞায় ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল বেলিংহ্যাম,—তাই নাকি?
—ঠিক তাই। লোক বলে, আইন নাকি তোমাকে ছুঁতে পারবে না। কিন্তু আমার আইন খুব সরল। তোমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিলাম। যা বললাম তা করতে শুরু করো। নাহলে, ভগবানের দিব্যি, এই পিস্তলের গুলি ঢুকবে তোমার মাথায়।
—তুমি আমাকে খুন করবে? বলে বেলিংহ্যাম উঠে দাঁড়াল। ওর মুখ ছাইয়ের মতো সাদা।
—হ্যাঁ।
—কারণ?
—তোমার বদমাইশি শেষ করতে। এক মিনিট হয়ে গেছে।
—কিন্তু কী করেছি আমি?
—সেটা আমি জানি আর তুমিও জানো।
—তুমি কিন্তু আমাকে ধমকি দিচ্ছ।
—দু-মিনিট হয়ে গেছে।
—কিন্তু তুমি কারণ কিছু বলছ না, তুমি উন্মাদ—বদ্ধ উন্মাদ। আমার জিনিস কেন আমি নষ্ট করব? কত দামি এই মমিটা।
—তুমি ওটা টুকরো টুকরো করে কেটে জ্বালিয়ে দাও।
—আমি তা করতে পারব না।
—চার মিনিট পেরিয়ে গেছে কিন্তু!
স্মিথ রিভলভারটা হাতে নিয়ে ভাবলেশহীন মুখে বেলিংহ্যামের দিকে তাকাল। ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা নড়ার আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে আঙুল রেখে রিভলভারটা তাক করল।
আর্তস্বরে বলে উঠল বেলিংহ্যাম,—থামো! থামো! করছি।
তাড়াতাড়ি উঠে ছুরিটা হাতে নিয়ে ও মমিটাকে কোপাতে লাগল। মাঝে মাঝেই ও পেছন ফিরে দেখতে লাগল—স্মিথের চাহনি নিষ্পলক, হাতের রিভলভার ওর দিকে তাক করা। ছুরির কোপে মমিটা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যাচ্ছে—শোনা যাচ্ছে পটপট আওয়াজ। হলদেটে ধুলোর মতো গুঁড়ো গুঁড়ো জিনিস বেরিয়ে আসছে ওটার ছিন্নভিন্ন অবয়ব থেকে। মশলা, শুকনো সুগন্ধদ্রব্য ইত্যাদি মেঝের ওপর পড়ছে। হঠাৎ সশব্দে ওটার শিরদাঁড়া ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গেল। তারপর বাদামি রঙের টুকরোগুলো একসঙ্গে স্তূপীকৃত হয়ে মেঝের ওপর পড়ল।
স্মিথ বলে উঠল,—এবার সব টুকরো আগুনে ফেলে দাও।
শুকনো খড়ের মতো মমির টুকরোগুলো ফায়ারপ্লেসে দিতেই আগুনের শিখা লকলক করে উঠল। ঘরে প্রচণ্ড উত্তাপ—দুজনেরই মুখ ঘামে ভিজে গেছে। ঘন ধোঁয়া বেরোচ্ছে আগুন থেকে, ঘর ভরে গেছে পোড়া চুল আর লঙ্কার গন্ধে। মিনিট পনেরোর মধ্যে ‘লট নং ২৪৯’-এর যা অবশিষ্ট রইল, তা হল কয়েকটি দগ্ধ ও ভঙ্গুর কাঠি।
তীব্র ঘৃণায় এবং রাগতভাবে বেলিংহ্যাম বলল,—আশা করি এবার তুমি খুশি হয়েছ।
—না। তোমার অন্যান্য জিনিসও ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে। এখানে কোনো শয়তানি কাণ্ডকারখানা চলবে না। এই সব পাতাগুলো আগুনে ফেলো!
ওগুলো আগুনে দিয়ে জিগ্যেস করল বেলিংহ্যাম,—আর কিছু?
—এবার ওই প্যাপিরাসের রোলটা বের করো, যেটা মমির বাক্সের পাশে সেদিন সন্ধেবেলা দেখেছিলাম। মনে হয় ওটা দেরাজে রাখা আছে।
হাউমাউ করে উঠল বেলিংহ্যাম,—না। না। ওটা জ্বালিয়ো না। তুমি জানো না ওটা কী অসাধারণ জিনিস! ওতে যে জ্ঞানের কথা লেখা আছে, তা তুমি কোথাও পাবে না।
—ওটা বের করো বলছি।
—স্মিথ, তুমি বুঝতে পারছ না। আমি তোমাকে ওই জ্ঞানের কথা জানাব। যা ওতে আছে সব শেখাব। আচ্ছা, দাঁড়াও, ওটা যদি জ্বালাতেই হয়, কথাগুলো একটা কাগজে টুকে নিই।
স্মিথ এগিয়ে গিয়ে দেরাজটা খুলে ফেলল। তারপর দেরাজ থেকে হলদেটে কাগজের কুঁচকোনো রোলটা নিয়ে আগুনে ফেলে দিল। জুতোর গোড়ালি দিয়ে প্রায় দগ্ধ কাগজটা পিষেও দিল। বেলিংহ্যাম চেঁচাতে চেঁচাতে কাগজটা ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু স্মিথ ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে কাগজটার ওপর ততক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল যতক্ষণ না পুরোটা ছাই হয়ে গেল।
স্মিথ বলল,—মাস্টার বেলিংহ্যাম, মনে হয় আমি তোমার বিষদাঁত ভেঙে দিয়েছি। যদি আবার পুরোনো কেরামতি করার চেষ্টা করো তাহলে কিন্তু আমি আবার ফিরে আসব। গুড মর্নিং! যাই, আমার আবার পড়াশোনা আছে।
Arthur Conan Doyle—‘Lot No.249’ গল্পের অনুবাদ
