সারাগোসা যুদ্ধে ব্রিগেডিয়ার – আর্থার কোনান ডয়েল
সারাগোসা যুদ্ধে ব্রিগেডিয়ার
গ্রামের সরাইখানায় বেশ ছড়িয়ে বসে ব্রিগেডিয়ার জেরার বললেন, ‘আচ্ছা, স্পেনের সারাগোসা শহর দখলে আমার ভূমিকার কথা কখনো তোমাদের বলেছি কি? না? তাহলে আজ তোমাদের সেই কাহিনিই শোনাই।’
তখন আমার বয়স পঁচিশ। অশ্বারোহী দলে আমি লেফটেন্যান্ট। যেমন বেপরোয়া তেমন সাহসী।
আমাদের সম্রাট নেপোলিয়নের নেতৃত্বে ফ্রান্স তখন জার্মানি দখল করে নিয়েছে। যুদ্ধ তখন চলছে স্পেনে। সম্রাট স্বয়ং আমাকে পাঠিয়ে দিলেন স্পেনে—মার্শাল ল্যানে-র সৈন্যদলের অশ্বারোহী বিভাগে সিনিয়র ক্যাপ্টেন তকমা দিয়ে।
বার্লিন থেকে অনেকটা রাস্তা, পাহাড় পর্বত ইত্যাদি পেরিয়ে স্পেনে ঢুকে শুনলাম, মার্শাল ল্যানে সারাগোসা শহর অবরোধ করে বসে আছেন। আদেশ পেলাম সারাগোসায় চলে যাবার।
সারাগোসা শহর অবরোধের কাহিনি তোমরা হয়তো পড়ে থাকবে। সাংঘাতিক সমস্যায় পড়েছিলেন আমাদের মার্শাল ল্যানে। শহরটা বেশ বড়, লোকসংখ্যা আশি হাজার। শহরের সমস্ত নাগরিক—সৈন্য, কৃষক, এমনকী পাদ্রিরা পর্যন্ত—অন্তর থেকে আমাদের অর্থাৎ ফরাসিদের ঘৃণা করে। আমাদের সৈন্যসংখ্যা তিরিশ হাজার। শহরের প্রাচীর ভেঙে দিলেই সাধারণত শহর দখল হয়ে যায়। কিন্তু এখানে প্রত্যেক বাড়িই যেন এক-একটা দুর্গ। কামান দেগে, মাইন পেতে একটার পর একটা বাড়ি উড়িয়ে দিয়ে আমাদের অগ্রসর হতে হচ্ছে। শহরের প্রায় অর্ধেক দখল করে নিলেও বাকি অর্ধেক ছিল বাস্তিলের দুর্গের মতো উঁচু আর মজবুত প্রাচীর দিয়ে ঘেরা গির্জা আর মঠ, যেখানে পাদ্রি ও সন্ন্যাসিনীরা থাকত। এই অংশ আমাদের দখল করতে হবে—এই পরিস্থিতিতে আমি সারাগোসায় পৌঁছলাম।
এখানে আমাদের অশ্বারোহী রেজিমেন্টের পরিস্থিতি দেখে একটু বিচলিতই হয়ে পড়লাম। কর্নেল লোকটার যোদ্ধা হিসেবে সুনাম নেই। তাঁবুতে বিশৃঙ্খল অবস্থা। সেনারাও কেমন যেন ঢিলেঢালা, অগোছালো। ঘোড়াগুলোর ঠিকমতো যত্ন হচ্ছে না। ওদের সঙ্গে ডিনার খেতে খেতে কথায় কথায় বলেই ফেলেছিলাম যে, জার্মানিতে আমাদের অশ্বারোহী রেজিমেন্ট কিন্তু অন্যরকম।
কথাটা না বললেই হয়তো ভালো হত। কেন না, ওরা সবাই হঠাৎ কেমন চুপচাপ হয়ে গেল। কর্নেল তো বেশ রেগেই গেলেন। আর মেজর অলিভিয়ার তার প্রকাণ্ড গোঁফজোড়ায় তা দিতে দিতে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যে, সে যেন আমাকে খেয়েই ফেলবে।
ডিনারের পর ওদের বারো জন অফিসারের সঙ্গে বসে স্থানীয় ওয়াইন খেতে খেতে গল্প করছিলাম। মিথ্যে বলব না—একটু নেশা হয়ে গেছিল। কথা প্রসঙ্গে আমার বীরত্বের কথা ওদের বলে ফেলেছিলাম—যেমন, তলোয়ার চালানোয় আমি এক নম্বর, সব থেকে দক্ষ ঘোড়সওয়ার ইত্যাদি ইত্যাদি। ওরা চুপচাপ আমার কথা শুনছিল। একটু পরে সবাই হো-হো করে হেসে উঠল। রাগে, দুঃখে, অপমানে আমার চোখে জল এসে গেল। তার মানে, ওরা ভাবছে আমি মিথ্যাবাদী, আমাকে বোকা বানিয়ে ওরা এতক্ষণ মজা করছিল।
মেজর এক ক্যাপ্টেনকে বলল, ‘মার্শাল ল্যানে-র তো এখানে থাকার কোনো মানেই হয় না। ক্যাপ্টেন জেরার-ই তো আমাদের সর্বাধিনায়ক হতে পারেন।’
আবার সকলের তুমুল অট্টহাসি—চোখে বিদ্রুপের ইঙ্গিত। চোখের জল মুছে শান্তস্বরে মেজরকে জিগ্যেস করলাম, ‘সকালে ক’টার সময় তোমাদের প্যারেড হয়?’
মেজর বলল, ‘কেন? প্যারেডের সময় পালটে দেবার কথা ভাবছ না কি?’ আবার সমবেত অট্টহাস্য।
তীক্ষ্নস্বরে প্রশ্নটা আবার করতেই একজন ক্যাপ্টেন বলল, ‘সকাল ছ’টায়।’
আমি বললাম, ‘ধন্যবাদ। তোমরা এখানে বারোজন আছ—একজন মেজর, চারজন ক্যাপ্টেন ও সাতজন লেফটেন্যান্ট। এর মধ্যে দুজন সবে সেনাদলে ভর্তি হয়েছে—ওদের না হয় বাদ দিলাম। বন্ধুরা, তোমরা যে রূঢ়তার সঙ্গে আজ আমার অভ্যর্থনা করলে, তার প্রতিদানটুকু দিতে চাই। না দিলে দুঃখিত হব।’
মেজর বলল, ‘অবশ্যই, অবশ্যই। বলো, কার সঙ্গে লড়াই করতে চাও?’
‘তোমাদের সকলের সঙ্গে।’
ওরা একটু অবাক হয়ে পরস্পরের দিকে তাকাল। তারপর নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কিছু কথা বলে আবার হো-হো করে হেসে উঠল।
মেজর বলল, ‘তোমার অনুরোধ বিচিত্র হলেও আমরা রাজি। তুমিই ঠিক করো, কীভাবে ডুয়েল লড়তে চাও।’
‘তলোয়ার দিয়ে। লড়াইটা হবে ক্রমান্বয়ে পদমর্যাদা অনুসারে। প্রথমে তোমার সঙ্গে, ঠিক ভোর পাঁচটায়। তারপর জনা-পিছু পাঁচ মিনিট করে। প্যারেড শুরু হবার আগেই ব্যাপারটা শেষ করতে হবে। তোমরা আমাকে লড়াইয়ের জায়গাটা দেখিয়ে দাও।’
আমার শীতল কণ্ঠস্বরে ততক্ষণে ওদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে। মেজরের মুখ থমথমে। ও বলল, ‘আস্তাবলের ঠিক পিছনের খালি জায়গাটায় ভোর পাঁচটায় তোমার সঙ্গে দেখা হবে।’
ঠিক এই মুহূর্তেই মেসের দরজা খুলে ঢুকে পড়লেন কর্নেল। ভয়ানক উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘মার্শাল ল্যানে-র হুকুম—একজন অশ্বারোহী সেনাকে চাই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে। কাজটা বিপজ্জনক। বিবাহিত লোক চলবে না। কে রাজি আছ বলো!’
আমি তৎক্ষণাৎ এগিয়ে গিয়ে কর্নেলকে বললাম, ‘স্যর, এই কাজটা আমারই পাওয়া উচিত, অধিকার বলে—কেন না আমি সদ্য প্রমোশন পেয়ে এখানে এসেছি সিনিয়র ক্যাপ্টেন হয়ে। সুবিধার দিকে থেকেও—কেন না, যেহেতু আমি আজই এসেছি, আমি যদি এই কাজটা করে ফিরে না আসি, তাহলে আমার অভাব আপনারা টের পাবেন না।’
কর্নেল রাজি হলেন। তাঁর সঙ্গে যেতে যেতে ওদের সবাইকে শুভরাত্রি জানিয়ে বলে দিলাম, কাল ভোর পাঁচটায় দেখা হবে। ওদের মুখ দেখে মনে হল যে ওরা আমার চরিত্রটা এতক্ষণে একটু একটু বুঝতে পারছে।
ছাউনি থেকে বেরিয়ে শহরের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে অলিগলির মধ্যে দিয়ে আমি আর কর্নেল পৌঁছলাম একটা ছাদবিহীন বাড়িতে। সেখানে দুজন অফিসার মনোযোগ দিয়ে একটা ম্যাপ দেখছিলেন। একজন মার্শাল ল্যানে, অন্যজন সামরিক ইঞ্জিনিয়রদের সর্বেসর্বা জেনারেল র্যাজো।
কর্নেল পরিচয় করিয়ে দিতেই মার্শাল ল্যানে আমার সঙ্গে করমর্দন করে বললেন, ‘তোমার সাহসের প্রশংসা করি। এই নাও, তোমার জন্য একটা ছোট্ট উপহার।’ তারপর ছোট্ট একটা কাচের শিশি আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘চরম মুহূর্তে যদি দরকার হয়, তাহলে এটা ঠোঁটে ঠেকালেই তৎক্ষণাৎ মৃত্যু!’
অভিযানের শুরুটা মন্দ হল না, যদিও শিরদাঁড়ার শিরশিরানি আর মাথার চুল খাড়া হয়ে ওঠা—এই দুটো জিনিস আটকাতে পারলাম না।
স্যালুট করে যখন মার্শালকে বললাম যে, আমি কাজটার বিন্দুবিসর্গও অবগত নই, তখন উনি প্রথমে কর্নেলকে একটু ধমক দিলেন। আমি অবশ্য তক্ষুনি বলে উঠলাম, ‘স্যর, যে কাজে ঝুঁকি যত বেশি, গৌরবও ততটাই বেশি। ঝুঁকি বা বিপদ না থাকলে কাজের কোনো মজাই নেই।’
মার্শাল বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে—আমি যেন বীরত্বের প্রতিমূর্তি। স্পেনের যুদ্ধে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার কী দারুণ সুযোগ আমার হাতে!
মার্শালের আদেশে জেনারেল র্যাজো আমাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে দেখালেন ধূসর রঙের একটা সুউচ্চ দীর্ঘ প্রাচীর। বললেন, ‘ম্যাডোনা কনভেন্টের প্রাচীর ওটা। ওপার থেকে আত্মরক্ষা করছে শত্রুসেনা। এই প্রাচীর ভেঙে দিতে পারলে পুরো সারাগোসা শহর আমাদের দখলে চলে আসবে। কিন্তু সমস্যা এই যে প্রাচীরের আশেপাশে শত্রুপক্ষ মাইন পেতে রেখেছে। তাছাড়া, কামান দেগে এই প্রাচীর ভাঙা যাবে না। কিন্তু আমাদের কাছে খবর আছে যে ওপারের কনভেল্টের একতলার একটা ঘরে অনেক বারুদ রাখা আছে। একটাই উপায় আছে। ওই বারুদের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারলে ভেঙে পড়বে এই প্রাচীর আর আমরা পেয়ে যাব শহর দখল করার রাস্তা।’
‘কিন্তু ওখানে যাব কী করে?’ আমার প্রশ্ন।
‘বলছি। আমাদের-ই এক ফরাসি বন্ধু, নাম উবার, ওপারে আছে। কথা ছিল ও ভোরবেলায় বারুদখানায় বিস্ফোরণ ঘটাবে। কিন্তু বিস্ফোরণ হয়নি। এদিকে হাজারখানেক বোমারু সেনা নিয়ে আমরা বসে আছি। দুদিন হয়ে গেল উবারের কোনো খবর নেই।’
‘তার মানে আমাকে গিয়ে দেখতে হবে ব্যাপারটা কী?’
‘ঠিক তাই। ও কি অসুস্থ, আহত না মৃত? ওর জন্য আর অপেক্ষা করা কি ঠিক হবে? এই নাও শহরের ম্যাপ। শহরের ঠিক মাঝখানে একটা স্কোয়ার আছে। তার এক কোনায় একটা গির্জা। আর গির্জার পাশের রাস্তাটা হল টোলেডো স্ট্রিট। উবারের বাড়ি ওখানেই, দুটো দোকানের মাঝখানে। ওর সঙ্গে দেখা করে জানতে হবে এই প্ল্যানমাফিক কাজ কি সত্যিই করা যাবে নাকি আমাদের অন্য কোনো উপায় বের করতে হবে?’—এই বলে জেনারেল আমাকে ব্রাউন রঙের একটা জোব্বা দিলেন—পাদ্রিদের পোশাক।
আমি আপত্তি করলাম, ‘গুপ্তচরের মতো ছদ্মবেশে আমি যাব না।’
‘পাগলামো কোরো না। তুমি ফরাসি সেনার পোশাকে রাস্তা দিয়ে যাবে কী করে? জানো তো, স্পেনীয়রা শত্রুর শেষ রাখে না—নৃশংসভাবে তাদের হত্যা করে।’
অগত্যা পোশাকটা পরে নিলাম। সঙ্গে তলোয়ারটা নেওয়া গেল না—ঝনঝন শব্দ হতে পারে। জেনারেল একটা ছুরি হাতে দিয়ে বললেন, ‘উবারকে বোলো, ভোর চারটের সময় আমার বোমারু সৈন্যরা গ্রেনেড নিয়ে তৈরি থাকবে। আর হ্যাঁ, প্রাচীরের কাছেই আমাদের এক সার্জেন্ট পাহারায় আছে। ও তোমাকে ওপারে যাবার রাস্তা দেখিয়ে দেবে। শুভ রাত্রি। তোমার মঙ্গল হোক।’
প্রাচীরের ওপর থেকে স্পেনীয় পাহারাদাররা প্রায়ই গুলি চালায়। তাই প্রাচীরের গা ঘেঁষে সার্জেন্টকে অনুসরণ করে পৌঁছলাম একটা বড় বাদামগাছের নীচে। সার্জেন্ট বলল, ‘এই গাছটায় চড়ে সবথেকে উঁচু শাখা থেকে লাফ দিলেই পড়বে ওপারে একটা বাড়ির ছাদের ওপর। তারপর ঈশ্বরই তোমাকে পথ দেখাবেন।’
চাঁদের আলোয় বাড়িটার ছাদ চোখে পড়ছিল। গাছে চড়ে একটু উঠতেই শুনতে পেলাম হালকা পদশব্দ। সঙ্গে সঙ্গে গাছের একটা শাখায় লেপটে গিয়ে নিজেকে আড়াল করলাম। বন্দুক হাতে একটা লোক পাহারা দিতে দিতে হঠাৎ ছাদের কার্নিসের কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে বন্দুক চালাল। একটু পরেই নীচের থেকে ভেসে এল গোঙানির আওয়াজ। তার মানে আমাদের ওই সার্জেন্ট গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
স্পেনীয় লোকটা প্রথমে একচোট হাসল, তারপর গোঙানির আওয়াজ ক্রমাগত শোনা যেতে ও ছাদ থেকে নেমে এল গাছের ওপর—সম্ভবত হতভাগ্য সার্জেন্টের ভবলীলা সাঙ্গ করতে। কিন্তু লোকটা আমার কাছে আসতেই ছুরিটা আমূল ঢুকিয়ে দিলাম ওর শরীরে। লোকটা ধড়াস করে গিয়ে পড়ল মাটিতে। ফরাসি ভাষায় দু-একটা শপথবাক্য এবং ধ্বস্তাধ্বস্তির আওয়াজ শুনে বুঝলাম, সার্জেন্ট তার আঘাতের প্রতিশোধ নিয়েছে।
একটু অপেক্ষা করে গাছের থেকে লাফিয়ে নামলাম ছাদের ওপর। নীচে ফেলে দিলাম স্পেনীয় লোকটার বন্দুকটা, কেন না ছাদে পড়ে থাকা বন্দুক দেখলেই শত্রুপক্ষ বুঝতে পারবে কিছু একটা হয়েছে।
এবার আমার কাজ হল ছাদ থেকে নীচে নেমে শহরে ঢোকা। সিঁড়ি খুঁজতে অসুবিধা হল না। ‘ম্যানুয়েলো’ ‘ম্যানুয়েলো’ বলে ডাকতে ডাকতে একটা দাড়িওয়ালা মুখ বেরিয়ে এল ছাদের এক অংশে মেঝেতে লাগানো একটা দরজা থেকে। কোনো উত্তর না পেয়ে লোকটা পুরো শরীরটা বের করে ছাদের ওপর এল, তারপর এল ওর তিজন সশস্ত্র সঙ্গী। ভাগ্যিস বন্দুকটা নীচে ফেলে দিয়েছিলাম। ওরা ভাবল পাহারাদারটা ছাদের অন্য কোনো অংশে আছে। ওরা চারজন ছাদের অন্যদিকে যেতেই আমি নিঃশব্দে সেই দরজার ভিতর শরীরটা ঢুকিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে খোলা সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে পড়লাম একটা গলিতে। বাড়িটায় কোনো লোকজন ছিল না।
গলিটাও জনমানবশূন্য, কিন্তু এটা গিয়ে পড়েছে একটা বড় রাস্তায়। রাস্তায় মাঝে মাঝেই ধুনির মতো আগুন জ্বালিয়ে শুয়ে আছে সৈন্যসামন্ত ও সাধারণ মানুষ। তীব্র দুর্গন্ধে ভরা চারদিক। শহর অবরোধ হওয়ার পর থেকে জঞ্জাল পরিষ্কার হচ্ছে না, এমনকী শবদেহের সৎকারও হচ্ছে না। রাস্তায় লোকজন চলাফেরা করছে, তাদের মধ্যে জোব্বা পরা বেশ কিছু পাদ্রিও চোখে পড়ল। আমি তাদের মধ্যে মিশে গিয়ে স্কোয়ারে পৌঁছে ম্যাপ অনুযায়ী খুঁজে নিলাম উবারের বাড়িটা। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ নয়, তাই ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়লাম।
বাড়ির ভিতরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। যে ঘরে ঢুকেছিলাম, সেখানে একটা টেবিলের ধারে দাঁড়িয়ে ভাবছি কী করা যায়? উবার কি একাই থাকে? নাকি বাড়িতে স্থানীয় লোকজনও আছে? ওদের কাছে ধরা পড়ে গেলে আমার এই অভিযান ব্যর্থ হয়ে যাবে। হঠাৎ-ই আমার শরীরের রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল। আমার কানের কাছে একটা যন্ত্রণাবিদ্ধ কণ্ঠস্বর— ফিসফিস করে ফরাসি ভাষায় কেউ যেন বলছে, ‘হা ঈশ্বর! হা ঈশ্বর!’ ভয় পেলেও একটু স্বস্তি হল—কণ্ঠস্বরটা ফরাসি ব্যক্তির।
জিগ্যেস করলাম, ‘কে এখানে? মঁসিয়ে উবার?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ! একটু জল দাও! একটু জল!’
আওয়াজটা ওপর থেকে আসছে। হতভম্ব হয়ে জিগ্যেস করলাম, ‘আপনি কোথায়?’
‘এই তো, এখানে।’ কাঁপা গলায় ফ্যাসফেসে আওয়াজ। হাত বাড়াতেই আমার হাত ঠেকে গেল একটা মানুষের পায়ে। কিন্তু পা-টা ঝুলছে কী করে? একটা মোমবাতির ছোট টুকরো জ্বালাতেই যা দেখলাম তাতে আমার বিস্ময় কমল বটে, কিন্তু আতঙ্কে শিউরে উঠলাম।
লোকটার হাতে আর পায়ে বড় বড় পেরেক গেঁথে ওকে দেওয়ালে লটকে দেওয়া হয়েছে। হতভাগ্য মানুষটা যন্ত্রণার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে, মাথাটা বুকের ওপর ঝুলে আছে, জিব বেরিয়ে এসেছে। তৃষ্ণা ও যন্ত্রণায় লোকটা প্রায় মৃত। ওর সামনে ওয়াইনের একটা বোতল রাখা, মনে হয় নৃশংস স্পেনীয়রা চায় যে, বোতল না ছুঁতে পেরে লোকটা আরও কষ্ট পাক। বোতলটা ওর মুখের সামনে আমি ধরতেই ও একটু পান করল। তারপর বলল, ‘আমার অন্তিম মুহূর্ত এসে গেছে। স্পেনীয়রা আমার মতলব জানতে পেরে যায়। তাই আমার এই দশা করেছে। দুদিন ধরে এইভাবে তিলে তিলে মরছি। কাজের কথাটুকু শুনে নাও। কনভেল্টে মাদার সুপিরিয়রের ঘরে বারুদ রাখা আছে। ওই ঘরের দেওয়াল ফুটো করে চ্যাপেলের মধ্যে দিয়ে সিস্টার অ্যাঞ্জেলার ঘর অবধি বারুদে আগুন দেওয়ার তার বসিয়ে রেখেছি। সবকিছুই ঠিক ছিল। দুদিন আগে ধরা পড়ে গেলাম।’
একটু পরে উবার আবার বলল, ‘বন্ধু, তুমিও ফরাসি, আমিও ফরাসি। আমার শেষ অনুরোধ রাখবে? আমার বুকে ছোরা বসিয়ে আমাকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দাও!’
হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল মার্শাল ল্যানে-র দেওয়া ছোট্ট শিশিটার কথা। শিশির ভিতরের পদার্থটা ঢাললাম ওয়াইনের বোতলে। উবারকে যেই মিশ্রিত পানীয়টা দিতে যাব, ঠিক তখনই ঘরে ঢুকে পড়ল ভয়ংকর চেহারার দুটো স্পেনীয়, দুজনেরই কাঁধে বন্দুক। আমি তখনই মোমবাতি নিভিয়ে পর্দার আড়ালে গা-ঢাকা দিলাম। লোক দুটো উবারের অবস্থা দেখতে এসেছে। লণ্ঠন উঁচু করে উবারকে দেখে দুজনেই প্রথমে খুব একচোট হাসল। তারপর একজন ওয়াইনের বোতলটা উবারের মুখের কাছে নিয়ে গেল। উবার মুখ এগিয়ে আনতেই লোকটা সরে গিয়ে নিজেই বোতল থেকে লম্বা একটা চুমুক দিল। ফল প্রত্যাশিত—তৎক্ষণাৎ লোকটা আর্তনাদ করে, নিজের গলায় দুহাত রেখে পড়ে গেল মেঝের ওপর। মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যু। অন্য লোকটা ভয় পেয়ে চিৎকার করে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে দেখলাম, উবারও মারা গেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে হাজার হাজার মৃত্যু দেখে আমার মতো পোড়-খাওয়া সৈনিকও সেই স্বল্পালোকিত ঘরে দেয়ালে ঝুলে থাকা আর মেঝেতে পড়ে থাকা—দুটো মৃতদেহের ভয়াবহতা সহ্য করতে পারল না। আতঙ্কে বিহ্বল হয়ে এক দৌড়ে পৌঁছে গেলাম গির্জার কাছে। গির্জার ঘড়িতে তখন রাত দুটো বাজছে। উবারের খবরটা নিয়ে ফিরে গেলেই আমার অভিযান সম্পূর্ণ হত। কিন্তু উবারের অসমাপ্ত কাজ শেষ করে স্পেনের যুদ্ধে গৌরবের টিকা লাভ করার স্বপ্ন ততক্ষণে আমার মনে উঁকি দিয়েছে। হাতে এখনও দু-ঘণ্টা সময় আছে।
গির্জার ভিতরে বহু গৃহহীন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। একটা অস্থায়ী হাসপাতালের মতো অংশে আহত ও অসুস্থ লোকজন। অনেকে বেদির কাছে গিয়ে প্রার্থনা করছে। আমিও প্রভুর কাছে মনে-প্রাণে প্রার্থনা করলাম যাতে এই অভিযান সফল হয়।
ঠিক তিনটে বাজতেই আমি গির্জা থেকে বেরিয়ে ম্যাডোনার কনভেল্টের দিকে চললাম। স্কোয়ারের কাছে বেশ কিছু সশস্ত্র সাধারণ নাগরিক দাঁড়িয়ে আছে ফরাসি আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে। সাধারণ নাগরিকদের মতো সাংঘাতিক প্রতিপক্ষ আর হয় না। এদের মেরে কোনো গৌরব নেই। অপরদিকে, মরিয়া হয়ে চোরাগোপ্তা আক্রমণে এরা অভিজ্ঞ সেনাদলকেও হারিয়ে দিতে পারে।
যাই হোক, এসব ব্যাপার নিয়ে ভাবার সময় হাতে নেই। কনভেল্টের কম্পাউন্ডে তো পাদ্রির পোশাকে ঢুকে পড়লাম, কিন্তু সন্ন্যাসিনীদের এই মঠের ভিতরে যাই কী করে? সশস্ত্র প্রহরীরা তো আমাকে আটকে দেবে।
হঠাৎ একটা বুদ্ধি মাথায় এল। কম্পাউন্ডের একপাশে একটা কুয়ো দেখতে পেলাম। তার চারধারে কয়েকটা বালতি রাখা। দুটো জলভরা বালতি দুহাতে ঝুলিয়ে ঢুকে পড়লাম সন্ন্যাসিনীদের আবাসে। প্রহরী কোনো প্রশ্ন করল না, কারণ উত্তর তো আমার হাতে ঝুলছে। ভিতরে একটা লম্বা করিডর, মেঝে পাথর দিয়ে বাঁধানো। করিডরের একধারে সন্ন্যাসিনীদের থাকার জন্য সারি সারি ঘর।
করিডরে সৈনিকরা গল্পগুজব, ধূমপান করছিল। পাদ্রির পোশাক দেখে তাদের কেউ কেউ আমার আশীর্বাদ চাইল। আমিও নীচু স্বরে ল্যাটিনে আশীর্বচন শোনালাম। একটু পরেই দেখি চ্যাপেলটা অর্থাৎ সন্ন্যাসিনীদের ছোট ভজনালয়। পাশের ঘরটাতেই নিশ্চয় বারুদখানা, কেননা ঘরের দরজার বাইরে মেঝের ওপর বারুদের কালো কালো গুঁড়ো পড়ে আছে। ঘরের বাইরে দুজন ভীষণদর্শন প্রহরী। একজনের বেল্ট থেকে ঝুলছে ঘরের চাবি। একজন প্রহরী থাকলে ব্যাপারটা এখনই মিটিয়ে ফেলতাম। কিন্তু দুজনকে কীভাবে সামলাব? চ্যাপেলের অপর পাশে সিস্টার অ্যাঞ্জেলার ঘর। ঘরের দরজাটা অর্ধেক খোলা। বালতি দুটো বাইরে রেখে ঢুকে পড়লাম ঘরে।
ঘরে বসে আছেন তিনজন সন্ন্যাসিনী। একজন বয়স্ক, গম্ভীর—উনিই নিশ্চয়ই মাদার সুপিরিয়র। অন্য দুজন অল্পবয়সি। আমি যেতেই তিনজনে যেভাবে উঠে দাঁড়ালেন, তাতে বুঝতে পারলাম আমার মতো কারো আগমনের প্রতীক্ষায় ছিলেন তাঁরা। হয়তো মঠের ওপর সম্ভাব্য আক্রমণের জন্য অন্য কোথাও তাঁদের নিয়ে যাওয়ার কোনো নির্দেশ ছিল। আমি কোনো কথা না বলে অধৈর্য ভাব দেখিয়ে ওঁদের তিনজনকে সিস্টার অ্যাঞ্জেলার ওই ঘর থেকে বেরকরে চ্যাপেলের থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা জায়গায় দাঁড়াতে বললাম।
ব্যস, সিস্টার অ্যাঞ্জেলার ঘর খালি, এবং আমার শেষ অন্তরায়টুকুও আর রইল না।
কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেলেই অতর্কিতে বিপদ আসে, এটা আমার জীবনে বার বার দেখেছি। মাদার সুপিরিয়রের অভিব্যক্তিতে হঠাৎ দেখতে পেলাম বিস্ময় এবং সন্দেহ। আমার ডান হাতে ছিল রক্তের দাগ—গাছের ওপর যে প্রহরীকে হত্যা করেছিলাম, তার। অবশ্য সেটা মারাত্মক কোনো চিহ্ন নয়, কারণ যুদ্ধের সময় তখনকার দিনে পাদ্রিরাও সশস্ত্র থাকত। কিন্তু সমস্যা হল আমার তর্জনীতে পরা সোনার আংটিটা নিয়ে। দারিদ্রই যার অলঙ্কার, সেই সন্ন্যাসীর হাতে আংটি থাকে কী করে? ওঁদের তিনজনকে ওই জায়গায় রেখে আমি সিস্টার অ্যাঞ্জেলার ঘরের দিকে এগোতেই মাদার দুজন প্রহরীকে সতর্কমূলক কিছু বললেন।
প্রহরী দুজন অগ্রসর হওয়ার আগেই ওদের পাশ দিয়ে দৌড়তে দৌড়তে আমিও চেঁচিয়ে কিছু বলে উঠলাম, যাতে মনে হয় আমার ও প্রহরী দুজনের লক্ষ্যবস্তু এক-ই। একটু পরেই সিস্টার অ্যাঞ্জেলার খালি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। দরজাটা খুব ভারী আর মজবুত, নীচে ও ওপরে খিল দেওয়া। এই দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকতে ওদের সময় লাগবে।
দরজার বাইরে তখন প্রচণ্ড চিৎকার। বন্দুকের কুঁদো দিয়ে দরজায় ধাক্কা মারার শব্দ। আর ঘরের ভিতর আমি হামাগুড়ি দিয়ে ব্যাকুলভাবে খুঁজছি বারুদ জ্বালানোর তারের লাইন। কিন্তু কিছুই চোখে পড়ল না। ইতিমধ্যে বন্দুকের দুটো গুলি দরজা ফুটো করে এসে লাগল ঘরের দেওয়ালে। ঠান্ডা মাথায় এক মুহূর্ত ভেবে দেখলাম—উবার নিশ্চয়ই বারুদ জ্বালানোর লাইনটা এমন জায়গায় করেছে যেটা সহজে সন্ন্যাসিনীদের চোখে পড়বে না।
দেখলাম, ঘরের এক কোনায় সেন্ট জোসেফের একটা মূর্তি। মূর্তির পায়ের কাছে ফুল-মালা। আর জ্বলছে একটা প্রদীপ। ফুল-মালা সরাতেই চোখে পড়ল একটা সরু কালো রেখা, যেটা দেয়ালে একটা ছোট্ট ছিদ্রের ভিতর ঢুকে গেছে। প্রদীপটা ঝুঁকিয়ে দিলাম ওই রেখার ওপরে, আর নিজে শুয়ে পড়লাম মেঝের ওপর। একটু পরেই শোনা গেল বাজ-পড়ার মতো আওয়াজ। ঘরের দেওয়ালগুলো দুলতে লাগল। ছাদের চাঙর খসে পড়তে থাকল মেঝের ওপর। ভীত, সন্ত্রস্ত স্পেনীয়দের আর্ত চিৎকার ছাপিয়ে শোনা গেল ফরাসি সেনার বিজয়োল্লাসের ধ্বনি। একটা সুখস্বপ্নের মধ্যে আমি যেন সেই আওয়াজ শুনলাম, তারপর আর কিছুই কানে এল না।
জ্ঞান ফিরলে দেখলাম দুজন ফরাসি সৈনিক আমাকে ধরে ওঠানোর চেষ্টা করছে। আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করছিল তখনো। করিডরে গিয়ে দেখলাম চতুর্দিকে ফরাসি সেনা। স্বয়ং মার্শাল ল্যানে এসেছেন।
আমার মুখে পুরো ঘটনার বিবরণ শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে মার্শাল ল্যানে বললেন, ‘ক্যাপ্টেন জেরার, অসাধারণ! সম্রাটকে আমি নিজে সমস্ত ব্যাপারটা জানাব।’
আমি বললাম, ‘স্যর, আমরা যেন মঁসিয়ে উবারকে ভুলে না যাই। সবকিছু উনিই করে গেছিলেন, আমি কেবল ওঁর অসমাপ্ত কাজটুকু শেষ করেছি।’
‘অবশ্যই ওকে আমরা ভুলব না। যা হোক, এখন ভোর সাড়ে চারটে। সারারাতের ধকলের পর তোমার নিশ্চয় খিদে পেয়েছে। আমার এবং অন্য সিনিয়রদের প্রাতরাশে তুমি হবে আমাদের আজকের সম্মানিত অতিথি।’
‘কিন্তু স্যর, আমার একটা ছোট কাজ বাকি আছে।’
‘এত ভোরে?’
‘হ্যাঁ, স্যর। কাজটা আমার সহকর্মীদের সঙ্গে। ওরা আমার জন্য অপেক্ষা করবে।’
‘ঠিক আছে। তাইলে কাজটা সেরে চলে এসো।’ এই বলে মার্শাল চলে যেতেই আমি দ্রুতপদে পৌঁছে গেলাম কাল রাতের সেই ছাদবিহীন ঘরে। পাদ্রির জোব্বা ছেড়ে আবার হয়ে গেলাম অশ্বারোহী সৈনিক। তারপর চলে গেলাম ডুয়েল-লড়ার পূর্ব-নির্ধারিত স্থানে। শরীরে অপরিসীম ক্লান্তি। সারা রাত্রিব্যাপী বিচিত্র সব পরিস্থিতির প্রভাবে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। এদিকে ফরাসি ছাউনিতে বাজছে বিউগল আর ড্রাম। ক্যাম্প-ফায়ারের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে।
আমাদের ডুয়েল-লড়ার জায়গায় আমার বারোজন সহকর্মী দাঁড়িয়ে, প্রত্যেকের কোমরে তলোয়ার। বারুদে কালো আমার মুখ আর রক্তমাখা আমার হাত দেখে ওরা নিশ্চয়ই ভাবছিল—এই কি সেই ক্যাপ্টেন জেরার, যাকে নিয়ে আমরা গতকাল ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছিলাম?
আমি বললাম, ‘সুপ্রভাত, বন্ধুরা। তোমাদের অপেক্ষা করানোর জন্য ক্ষমা চাইছি। আসলে আমি এতক্ষণ আমার সময়ের মালিক ছিলাম না। আমার একটা অনুরোধ আছে। মার্শাল ল্যানে আমাকে প্রাতরাশে নিমন্ত্রণ করেছেন। ওঁকে তো বসিয়ে রাখতে পারি না!’
মেজর অলিভিয়ার বলল, ‘কী করতে চাও?’
‘তোমাদের সঙ্গে জনা-পিছু পাঁচ মিনিট করে লড়ার সময় নেই। তোমাদের বারোজনের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়াই করার অনুমতি দাও।’
ওদের উত্তরটা কিন্তু এল খুব সুন্দরভাবে, একদম ফরাসি স্টাইলে। বারোটা তলোয়ার একসঙ্গে উঠল আমাকে স্যালুট করতে। প্রত্যেকে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে, তলোয়ার মুখের সামনে ধরা।
আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কাল রাতে ছিলাম আমি এদের উপহাসের পাত্র, আর এরা সকলে আজ আমাকে স্যালুট করছে। আবেগে আমার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে গেল, কেবল বলতে পারলাম, ‘কমরেডস… কমরেডস’। অলিভিয়ার আমাকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরল, দুজন ধরল আমার দুই হাত, কেউ কাঁধে, কেউ-বা পিঠ চাপড়াতে লাগল। সকলের মুখে হাসি।
বুঝতে পারলাম, এই অশ্বারোহী রেজিমেন্টে আমার স্থান আমি করে নিয়েছি।
