রাহাজানি – আর্থার কোনান ডয়েল
রাহাজানি
স্থানঃ লন্ডনের ইস্টবোর্ন থেকে টানব্রিজ হাইওয়ের
একটা নির্জন অংশ—দুপাশে ঊষর প্রান্তর।
দিনঃ রবিবার। সময়ঃ রাত সাড়ে এগারোটা।
একটা লম্বা রোলস-রয়েস লন্ডনের দিকে ওই রাস্তা দিয়ে চলেছে অত রাতে। হেডলাইটের আলোয় সিনেমার ছবির মতো দুপাশের প্রান্তর ও বুনো লতাগুল্ম সরে সরে যাচ্ছে। অন্ধকারে গাড়িটার নম্বর চোখে পড়ে না। গাড়ির ওপরটা খোলা কিন্তু বডি আর বনেট মোটা গাঢ় রঙের কাপড় দিয়ে মোড়া। আকাশে চাঁদ নেই—তাই গাড়িটার আসল আকৃতি বোঝা কঠিন।
চালক ছাড়া গাড়িতে আর কোনো যাত্রী নেই। চালকের হাত স্টিয়ারিং হুইলে, মাথার টুপি কপাল পর্যন্ত নামানো, ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট। ওভারনকাটের উঁচু কলারে কানদুটো ঢাকা। ঢালু রাস্তায় ইঞ্জিন বন্ধ করে দেওয়া—গাড়ি নিঃশব্দে গড়িয়ে চলেছে। চালক এক দৃষ্টে সামনে তাকিয়ে আছে যেন প্রতীক্ষিত কোনো কিছুর আশায়।
উল্টো দিক থেকে আসা একটা গাড়ির হর্নের আওয়াজ শোনা গেল। রবিবার রাতে লন্ডন থেকে অনেক গাড়িই ফেরে। ওখানে উইকএন্ড কাটিয়ে রাতের দিকে ফেরা বেশ প্রচলিত প্রথা।
হ্যাঁ, সত্যিই একটা গাড়ি এদিকে আসছে। রোলস-রয়েস-এর চালক সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসে ঠোঁটে ধরা সিগারেটটা ফেলে দিল। পকেট থেকে একটা কালো কাপড় বের করে চোখ দুটো বাদ দিয়ে ঢেকে নিল মুখটা। হেড লাইট নিভিয়ে পাশের সিটের ওপর রাখল একটা টর্চ ও একটা মাউসার পিস্তল।
ঢেউ-খেলানো রাস্তায় ওঠা-নামা করতে করতে সামনের গাড়িটা রোলস-রয়েস-এর ত্রিশ গজের মধ্যে চলে এল। তখনই রোলস-রয়েস-এর চালক গাড়িটাকে রাস্তায় আড়াআড়ি দাঁড় করিয়ে আগত গাড়িটার রাস্তা আটকে দিল। জোরে ব্রেক করে থেমে গেল আগত গাড়িটা।
গাড়িটার থেকে রাগত স্বরে বলা কথা ভেসে এল, ‘এটা কী হচ্ছে? এক্ষুনি একটা দুর্ঘটনা হতে পারত। হেড লাইট জ্বালাননি কেন? আমার গাড়ি আপনার গাড়িতে ঠেকে গেছল প্রায়।’
টর্চের আলোয় দেখা গেল, কণ্ঠস্বরের অধিকারী এক রাগী যুবক, তার চোখদুটো নীল, হলদেটে গোঁফ। গাড়িটা একটা পুরনো ওলসলে। হঠাৎ যুবকটির মুখে রাগের পরিবর্তে ফুটে উঠল বিস্ময়ের অভিব্যক্তি।
রোলস-রয়েস-এর সিট থেকে বেরিয়ে এসেছে চালক। তার হাতে ধরা কালো পিস্তলটা যুবকের মুখের ওপর ঠেকিয়ে এবং মুখোশের থেকে বেরিয়ে থাকা দুটো ক্রুর চোখে তাকিয়ে সে কড়া গলায় বলল, ‘হ্যান্ডস আপ! নইলে কিন্তু—’
অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাত দুটো ওপরে তুলল যুবক। এবার আদেশ হল, ‘নেমে এসো!’
যুবক গাড়ি থেকে নেমে এসে বলল, ‘এসব কী হচ্ছে, অ্যাঁ? পুরনো আমলের রসিকতা? ঠাট্টা করছেন?’
পিস্তলের পিছন থেকে আওয়াজ এল, ‘ঘড়িটা!’
‘কী বলছেন কী?’
‘বলছি, ঘড়িটা।’
‘ঠিক আছে, এই নিন ঘড়ি। রং সোনালি হলেও সোনার ঘড়ি নয় কিন্তু। তবে যা করছেন তা কোনো মঙ্গলের রাজত্বে বা দুশো বছর আগে মানাত। আধুনিক ইংলন্ডে এ জিনিস চলে না।’
‘মানিব্যাগটা!’ কয়েকটা হুকুমের মতো। যুবকটি হুকুম তামিল করল।
‘কোনো আংটি নেই?’
‘আংটি পরি না।’
‘চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো। একদম নড়বে না।’ লোকটা যুবকের পাশ কাটিয়ে ওলসলে গাড়িটার বনেটটা খুলল এবং একটা প্লায়ার্স দিয়ে গাড়িটার স্পার্ক প্লাগের তার কেটে দিল।
‘এটা কী করলেন? গাড়ি চালাব কী করে?’ আর্তস্বরে প্রশ্ন যুবকের। সঙ্গে সঙ্গে পিস্তলটা তার মাথার দিকে তাক করা হল। ঠিক তখনই এক লহমার জন্যে যুবকের চোখে এমন কিছু পড়ল যে সে স্তম্ভিত হয়ে গেল। হয়তো সে কিছু বলেও ফেলত, কিন্তু কোনোক্রমে নিজেকে সংবরণ করল। লোকটা যুবককে গাড়ির ভিতর ঢুকতে বলল। যুবক গাড়িতে বসতেই প্রশ্ন করল সে, ‘কী নাম তোমার?’
‘রোনাল্ড বার্কার। আপনার নাম?’
লোকটা রোনাল্ডের এই অনাবশ্যক কৌতূহলের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। তবে জিগ্যেস করল, ‘কোথায় থাকো?’
‘আমার মানিব্যাগ থেকে একটা কার্ড নিয়ে দেখে নেবেন।’
রোলস-রয়েস গাড়িটার ইঞ্জিন চালুই ছিল। লোকটা এক লাফে গাড়িতে উঠে গিয়ার দিয়ে চালিয়ে দিল গাড়িটা। আর এদিকে রোনাল্ড গাড়ির যন্ত্রপাতির বাক্সটা বের করে ছেঁড়া তার জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল।
রোনাল্ডের গাড়িকে অনেকটা পিছনে ফেলে রোলস-রয়েস-এর চালক লুঠের মাল ধীরে-সুস্থে পরীক্ষা করল। মানিব্যাগে পাওয়া গেল সামান্য ক’টা টাকা। এত কাণ্ড করে কেবল একটা সাধারণ ঘড়ি ও ক’টা টাকা পাওয়া সত্ত্বেও লোকটার মুখে রাগের বদলে কৌতুকের আভাস ফুটে উঠল। লুঠের মাল ওভারকোটের পকেটে পুরে ও এবার গাড়িটা দ্রুতগতিতে চালিয়ে দিল। মুখে স্পষ্টতই টেনশনের ছাপ। উল্টোদিক থেকে আসা একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা যাচ্ছে।
টেনশন সত্ত্বেও লোকটার ভাবভঙ্গি এখন বেশ বেপরোয়া গোছের, এবার আর কোনো গোপনীয়তা নেই। হেডলাইট জ্বালানো অবস্থাতেই নিজের গাড়িটা রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে আগতপ্রায় গাড়িটাকে ও থামানোর সংকেত দিল। গাড়ির আরোহীরা যেটুকু দেখতে পেল তাতেই যথেষ্ট ঘাবড়ে গেল। বড় কালো একটা গাড়ি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে, চালকের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা এবং চালকের ভীতিপ্রদ চেহারা ও হাবভাব। আগত গাড়িটা একটা হুড-খোলা হাম্বার। তার উর্দি পরা খাটো চেহারার চালকের মুখে হতভম্ব ভাব। গাড়ির পিছনের সিটে বসে দুটি সুন্দরী যুবতী—একজনের মুখ থেকে বেরিয়ে এল ভয় ও আশঙ্কা মিশ্রিত অস্ফুট আওয়াজ, অন্যজন অবশ্য সংযত।
শেষোক্ত মেয়েটি অন্যজনকে বলল, ‘ঘাবড়িয়ো না হিল্ডা। আমাদেরই কোনো বন্ধু মজা করে কিছু করছে বলে মনে হয়।’
‘না, না, ফ্লসি। এ তো সত্যি ডাকাত। কী হবে বলো তো?’
‘আরে, কাল খবরের কাগজে এই ঘটনাটার কথা যখন প্রকশিত হবে, ভেবে দ্যাখো তো বিনা পয়সায় আমাদের কেমন প্রচার হয়ে যাবে!’
‘রাখো তো তোমার প্রচার! মনে হচ্ছে আমি এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে যাব। দুজন মিলে চেঁচালে হয় না? দ্যাখো, দ্যাখো, আমাদের ড্রাইভারের কী অবস্থা!’
রোলস-রয়েস-এর চালক কিন্তু এবার সত্যিই বেপরোয়া, হাম্বার গাড়ির ড্রাইভারকে ঘাড় ধরে গাড়ি থেকে টেনে বের করে পিস্তল দেখিয়ে ওকে দিয়েই গাড়ির স্পার্ক প্লাগ টেনে বিচ্ছিন্ন করে দিল সে। গাড়িটাকে অচল করে দিয়ে টর্চ হাতে গাড়ির জানালার কাছে গিয়ে বেশ ভদ্রভাবে মেয়ে দুটিকে বলল, ‘আপনাদের অসুবিধে করার জন্য দুঃখিত। আপনাদের পরিচয়?’
ফ্লসি বলল, ‘আগে বলুন, আমাদের গাড়ি এভাবে আটকানোর কারণ কী?’
উত্তর এল কড়া গলায়, ‘আমার হাতে সময় নেই। আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।’
ভয়ে আধমরা হিল্ডার অনুরোধে ফ্লসি বলল, ‘আমি ফ্লসি থর্নটন এবং এ আমার বন্ধু হিল্ডা ম্যানারিং। আমরা দুজনেই লন্ডনের গেইটি থিয়েটারের অভিনেত্রী। আমাদের নাম হয়তো শুনে থাকবেন। আজ রবিবার ছুটি কাটিয়ে ফিরছি।
‘আপনাদের পার্স ও গয়নাগাটি যা আছে বের করুন।’
প্রথমে আপত্তি জানালেও ওরা দুজনেই শেষমেশ পার্স, আংটি, কানের দুল, বালা, হার ইত্যাদি গাড়ির সামনের সিটে রেখে দিল। অন্ধকারে হিরের টুকরোগুলো ঝিকঝিক করছিল। লোকটা গয়নাগুলো হাতে নিয়ে যেন মনে মনে ওজন বোঝার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘এর মধ্যে আপনাদের বিশেষ প্রিয় কোনো গয়না আছে?’
ফ্লসি বলল, ‘আমাদের জিনিস আমাদেরকেই ভিক্ষা দিতে হবে না। হয় সবকিছু নিয়ে নিন, নাহলে সবটাই ফেরত দিন।’ হিল্ডা কিন্তু হাত বাড়িয়ে একটা মুক্তোর হার ছিনিয়ে নিল। লোকটাও সেটা বিনাবাক্যব্যয়ে ছেড়ে দিল।
শক্ত ধাতের মেয়ে ফ্লসি এবার কেঁদে ফেলল—ওর দেখাদেখি হিল্ডাও। লোকটার প্রতিক্রিয়া হল কিন্তু অপ্রত্যাশিত। সমস্ত গয়নাগাটি ওদের কোলের ওপর ফেলে দিয়ে লোকটা বলল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। সবকিছু ফিরিয়ে দিলাম। আপনাদের কাছে দামি হলেও আমার কাছে এগুলো মূল্যহীন।’
মেয়ে দুটির মুখে এখন হাসি। ওরা একযোগে বলল, ‘পার্স দুটো স্বচ্ছন্দে নিতে পারেন। ওই দুটো পার্সে যা টাকা আছে, তার দশগুণ মূল্যের বেশি প্রচার পেয়ে যাব আমরা। কিন্তু আপনি এমন পেশা কেন বেছে নিলেন?’
লোকটা অবশ্য ওদের এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মুডে ছিল না, কেন না তখন দেখা যাচ্ছে বহুদূরে বিন্দুর মতো কোনো গাড়ির আলো। নতুন শিকারের আশায় লোকটা গাড়ি চালিয়ে দিল ওই আলোর দিকে। অচল গাড়িতে বসে ফ্লসি আর হিল্ডা তাকিয়ে রইল দূরে অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া রোলস-রয়েস-এর দিকে।
এবার আমদানি ভালোই হবে মনে হয়। উল্টোদিক থেকে আসা গাড়িটা বহুমূল্য ডেইমলার—চারটে হেডলাইট, সামনে পিতলের কারুকার্য। গাড়ির গম্ভীর নির্ঘোষই বলে দিচ্ছে ইঞ্জিনের শক্তি। গাড়িটা মসৃণভাবে এগিয়ে আসছিল, কিন্তু রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা রোলস-রয়েস-এর কাছে এসে গাড়িটাকে থামতেই হল। ক্রোধে অগ্নিবর্ণ একটা মুখ বেরিয়ে এল ওই গাড়ির জানালা থেকে। আগন্তুকের মাথার সামনের দিকে টাক, গাল দুটো ফোলা, চর্বিতে ভরা মুখমণ্ডলে দৃশ্যমান দুটো কুতকুতে শয়তানি চোখ। চিৎকার করে ফ্যাসফেসে গলায় বলে উঠল সে, ‘রাস্তা থেকে এই মুহূর্তে গাড়ি সরাও! তা নইলে, হার্ন (ড্রাইভার), তুমি ওই রোলস-রয়েসকে ধাক্কা মেরে বেরিয়ে যাও! বরং ওকে ওর গাড়ি থেকে টেনে বের করো। নির্ঘাত নেশা করেছে লোকটা।’
চালক মালিকের কথায় গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে আসা লোকটার কলার ধরতেই তার মাথায় পড়ল পিস্তলের ঘা। ডেইমলারের চালক গোঙাতে গোঙাতে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। এইবার লোকটা ডেইমলারের দরজা খুলে এল হ্যাঁচকা টানে গাড়ির আরোহীকে বের করে রাস্তার ওপর দাঁড় করাল। তারপর একদম ঠান্ডা মাথায় আগন্তুকের দুই গালে মারল দুটো চড়। সেই স্তব্ধ রাতে চড়ের আওয়াজ শোনাল ঠিক পিস্তল থেকে গুলি বেরনোর শব্দের মতো। আগন্তুক বিবর্ণ মুখে প্রায় অচৈতন্য হয়ে গাড়ির গায়ে ঢলে পড়ল। লোকটা তখন আগন্তুকের পকেট থেকে চেনওয়ালা সোনার ঘড়ি, হিরে বসানো টাই-পিন, চার আঙুলে পরা চারটে আংটি এবং একটা চামড়া দিয়ে বাঁধানো দামি নোটবুক ছিনিয়ে নিল। ওগুলো নিজের কোটের পকেটে ভরে তারপর সে নিল আগন্তুকের মুক্তোর কাফ লিংক ও জামার কলারের সোনার বোতাম। গাড়ির চালক তখনও অচেতন। লুণ্ঠন করা শেষ। এইবার লোকটা ডেইমলারের অর্ধচেতন আরোহীকে ধরে ঠান্ডা মাথায় কিন্তু প্রচণ্ড আক্রোশে তার পরনের জামাকাপড়গুলো প্রায় ছিন্নভিন্ন করে রাস্তায় ফেলে দিল।
হয়তো আর কিছু করার পরিকল্পনা ছিল লোকটার, কিন্তু ততক্ষণে দেখা গেল ওর ফেলে আসা রাস্তায় একটা গাড়ির আলো। অর্থাৎ ওর পূর্বকৃত ডাকাতির দুটি ঘটনাই ওই গাড়ির নজরে পড়ে থাকবে। হয়তো ওটা পুলিশেরই গাড়ি। হয়তো এই তল্লাটের সব কনস্টেবলকেই ডাকাত ধরতে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সুতরাং হাতে আর সময় নেই। লোকটা একলাফে নিজের গাড়িতে উঠে দাবিয়ে দিল অ্যাক্সিলারেটর। গাড়ি দ্রুতবেগে এগিয়ে চলল। বেশ কিছুটা গিয়ে গাড়িটা হাইওয়ে ছেড়ে ঢুকল একটা সংকীর্ণ রাস্তায়। আরও খানিকক্ষণ জোরে চালিয়ে সম্ভাব্য কোনো অনুসরণকারীর থেকে অন্তত পাঁচমাইল ব্যবধান রেখে লোকটা গাড়ি থামিয়ে লুঠের মালের হিসেব করতে শুরু করল। রোনাল্ড বার্কারের সামান্য ক’টা টাকা, দুই অভিনেত্রীর পার্সে পাওয়া অপেক্ষাকৃত বেশি টাকা, এবং শেষ শিকারের কাছ থেকে পাওয়া দামি অলংকার, ঘড়ি ও নোটবুকে রাখা অনেক টাকা—তিনশো পাউন্ডের ওপর—ও কিছু মূল্যবান কাগজপত্র। সবকিছু মিলিয়ে এক রাতের আয় হিসেবে যথেষ্ট। লুঠের সমস্ত মাল নিজের কোটের পকেটে ঢুকিয়ে এবং একটা সিগারেট ধরিয়ে নিশ্চিন্তমনে রোলস রয়েস-এর চালক ফেরার পথ ধরল।
সোমবার সকাল। পূর্বপুরুষদের তৈরি প্রাসাদোপম বাড়িতে স্যর হেনরি হেলওয়ার্দি ব্রেকফাস্ট সেরে স্টাডিতে গেলেন। কয়েকটা জরুরি চিঠি লিখেই চলে যাবেন আদালতে। উনি এই অঞ্চলের আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট—ফৌজদারি মামলার ভারপ্রাপ্ত বিচারক। অভিজাত পরিবারের মানুষ। লম্বা-চওড়া, সুগঠিত শরীর, দৃঢ় চোয়াল আর ঘন কালো ভ্রূজোড়া—এসব মিলিয়ে বেশ সমীহ করার মতো চেহারা। অশ্ব প্রজননের একটা ব্যবসাও আছে তাঁর। নিজেও ভালো অশ্বারোহী। প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালে তাঁর মাথার ঘন কালো চুলের মধ্যে ডান কানের ওপর একগুচ্ছ সাদা চুল। এটুকু বাদ দিলে ভাবা শক্ত যে, তাঁর বয়স প্রায় পঞ্চাশ।
চিন্তান্বিত মুখে একটা পাইপ ধরিয়ে সবে চিঠি লিখতে যাচ্ছেন এমন সময় শোনা গেল একটা ঝরঝরে পুরনো গাড়ির আওয়াজ। বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল একটা অলসলে গাড়ি, তার ফর্সা চেহারার চালকের গোঁফজোড়া হলদেটে। পরিচালক এসে খবর দিল যে মিঃ রোনাল্ড বার্কার এসেছেন। বার্কার বয়সে ছোট এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ হলেও স্যর হেনরির সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব। দুজনেই শখ পিস্তল ছোঁড়া, অশ্বারোহণ ও বিলিয়ার্ড খেলা। সপ্তাহে অন্তত দুটো সন্ধেবেলা বার্কার স্যর হেনরির বাড়িতে আসেন।
স্যর হেনরি বার্কারের দিকে উষ্ণ অভ্যর্থনার হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘কী ব্যাপার? আজ এখানে এত সকালে?’
কিন্তু বার্কারের প্রতিক্রিয়া ও ব্যবহার যেন একটু অন্যরকম। হেনরির সঙ্গে হাত না মিলিয়ে নিজের গোঁফে হাত বোলাতে বোলাতে বার্কার কেমন যেন প্রশ্নসূচক ভঙ্গিতে হেনরির দিকে তাকিয়ে রইলেন। কীভাবে কথা শুরু করবেন তা যেন বুঝতে পারছেন না।
এবার হেনরি অধৈর্যের সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘কী হল? কোনো সমস্যা হয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’ বেশ জোরের সঙ্গে বললেন বার্কার।
‘কাকে নিয়ে?’
‘আপনাকে।’
হেনরি মৃদু হেসে বললেন, ‘বসো। আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে বলো।’
একটু ভেবে বার্কার যে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন তার অভিঘাত প্রায় বন্দুক ছোঁড়ার মতো।
‘কাল রাতে ডাকাতি করে আমার জিনিসপত্র লুঠ করলেন কেন?’
হেনরি ভাবলেশহীন মুখে জিগ্যেস করলেন, ‘এ কথা কেন বলছ?’
‘মোটর গাড়িওয়ালা লম্বা চওড়া চেহারার একটা লোক মেফিল্ড রোডে আমাকে পিস্তল দেখিয়ে আমার মানিব্যাগ ও ঘড়ি নিয়ে নেয়। স্যর হেনরি, আপনিই সেই লোক!’
হাসলেন স্যর হেনরি, ‘এই অঞ্চলে আমিই একমাত্র লম্বা-চওড়া মানুষ? একমাত্র আমারই গাড়ি আছে?’
‘দেখুন, গাড়ির নাড়ি-নক্ষত্র আমি জানি। এই তল্লাটে আর কার রোলস-রয়েস গাড়ি আছে বলুন তো?’
‘আজকের দিনে রাহাজানি করতে গেলে ডাকাত নিজের জেলার বাইরে গিয়ে করবে। তাছাড়া দক্ষিণ ইংলন্ডের বিভিন্ন জেলায় অনেকেরই রোলস-রয়েস গাড়ি আছে। তেমন কেউ হয়তো তোমাকে ধরেছিল।’
‘মানতে পারলাম না স্যর হেনরি। আপনি কণ্ঠস্বর দু-এক পর্দা নামালেও আপনার গলার আওয়াজ আমার চেনা। কিন্তু ওসব কথা থাক। কেন করলেন এই কাজ? একটা ঘড়ি আর ক’টা টাকার জন্যে আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ওপর ডাকাতি? অবিশ্বাস্য!’
হেনরি হেসে বললেন, ‘অবিশ্বাস্যই বটে!’
‘তারপর ওই দুজন অভিনেত্রী—কত কষ্ট করে টাকা রোজগার করে। আমার গাড়ি চালু করে, ওই রাস্তায় আমি আপনাকে অনুসরণ করে, আপনার কীর্তির সব চিহ্নই দেখেছি। তবে হ্যাঁ, ওই শহুরে টাকার কুমিরটার ওপর ডাকাতি করে আপনি খারাপ কাজ করেননি। ডাকাতি করতে হলে ওইরকম শিকারই ধরা উচিত।’
‘তোমার কাছে এসবের কোনো প্রমাণ আছে?’
‘আমি পুলিশ আদালতে শপথ করে আপনার বিরুদ্ধে জবানবন্দী দিতে পারি। কী করে আপনাকে চিনলাম জানেন? আপনি যখন আমার গাড়িটার ইলেকট্রিক তারটা কাটছিলেন, তখন আপনার মুখোশের পাশ থেকে বেরিয়ে থাকা সাদা চুলের গুচ্ছ দেখতে পাই।’
এই প্রথম স্যর হেনরির মুখে অভিব্যক্তির মৃদু প্রকাশ হল। তিনি বললেন, ‘তোমার কল্পনাশক্তি সত্যিই দারুণ।’
এবার বার্কার কালো কাপড়ের ছোট একটা টুকরো হাতের মুঠো থেকে বের করে বললেন, ‘এটা দেখেছেন? অভিনেত্রীদের গাড়ির কাছে পড়েছিল এই টুকরোটা। আপনার মুখোশের একটা অংশ। হয়তো কিছুতে লেগে একটু ছিঁড়ে গিয়েছিল। যান, এবার আপনার ওভারকোটটা নিয়ে আসুন। এর শেষ দেখে আমি ছাড়ব।’
স্যর হেনরি উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের দরজায় তালা দিয়ে চাবিটা পকেটে রেখে বললেন, ‘ঠিক আছে। তোমাকে সবটুকুই দেখাব। তবে তার পরিণতি যদি খারাপ হয়। তার জন্যে দায়ী হবে তুমি-ই।’
‘আমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই স্যর হেনরি। আমার যা করণীয় তাই করব। কোনো আষাঢ়ে গল্প ফেঁদে বসবেন না যেন!’
‘তোমার কোনো খারাপ পরিণতি হবে তা আমি বোঝাতে চাইনি। আমার সংসারে আমি একাই। কিন্তু বংশগৌরবের ব্যাপারটা আছে। তাই বংশগৌরব রক্ষা করার জন্যে কালকের ঘটনার পরিণতি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’
‘এখন এসব বলে কী লাভ?’
‘দেরি হয়ে গেলেও এটা বলা দরকার। অনেক কিছু বলব তোমাকে। প্রথমত, তোমার অনুমান যথার্থ। কাল তোমার গাড়ি আমিই আটকেছিলাম।’
‘কিন্তু কেন?’
‘বলছি।’ স্যর হেনরি একটা দেরাজ থেকে দুটো প্যাকেট বের করে বললেন, ‘এই দুটো প্যাকেটই আজ পোস্টে পাঠিয়ে দেব ঠিক করেছি। প্রথমটা যাবে তোমার ঠিকানায়। তুমি বরং এটা এখনই নিয়ে নাও—এতে তোমার ঘড়ি ও মানিব্যাগ আছে। অর্থাৎ তোমার গাড়ির ইলেকট্রিক তারটুকু কেটে দেওয়া ছাড়া তোমার আর কোনো ক্ষতি করিনি। দ্বিতীয় প্যাকেটটা আজই পোস্ট করব লন্ডনের গেইটি থিয়েটারের দুই অভিনেত্রীকে। এতে ওদের দুজনের পার্স রয়েছে। আশা করি তোমাকে বোঝাতে পেরেছি যে দুটি ঘটনাতেই সবকিছু ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল আমার।’
‘তারপর?’ বার্কারের প্রশ্ন।
‘তারপর বলছি স্যর জর্জ ওয়াইল্ডের কথা। তুমি হয়তো জানো ওঁর প্রতিষ্ঠিত ব্যাঙ্কের অপকীর্তির কথা। তুমি এ-ও জানো যে, আমি ধনী নই। সম্প্রতি আমি কয়েকটি কারণে একটু আর্থিক টানাটানির মধ্যে পড়ি। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এক হাজার পাউন্ড ছিল আমার কাছে। ওই টাকাটা ব্যাঙ্কে রেখে তার সুদের মাধ্যমে আমার আর্থিক পরিস্থিতিটা সামলে নেব ভেবেছিলাম। ওয়াইল্ডকে আমি চিনি। ওর ব্যাঙ্ক তখন সাত পারসেন্ট হারে সুদ দিচ্ছিল। ওকে জিগ্যেস করেছিলাম আমার টাকাটা ওর ব্যাঙ্কে নিরাপদ থাকবে কি না। ওর আশ্বাসের ভিত্তিতে টাকাটা ওর ব্যাঙ্কে জমা দিলাম এবং তার ঠিক আটচল্লিশ ঘণ্টা পরে ব্যাঙ্কটা ফেল করল। সরকারি সূত্রে জানতে পারি যে ওয়াইল্ড অন্তত তিন মাস আগে থেকেই জানত যে ব্যাঙ্কটার বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবুও ও সেই ডুবন্ত জাহাজে আমার মাল তুলেছিল।
‘আমার টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অথচ ওয়াইল্ড আজও টাকার কুমির। ওর কাছে টাকাটা ফেরত চাইতেও গেছিলাম। ও ব্যঙ্গ করে আমাকে আইনি রাস্তা নিতে বলেছিল। আরও বলেছিল, বিনিয়োগের ঝুঁকির শিক্ষাটা কত অল্প খরচে পেয়ে গেলে বলো তো।
‘তখনই ঠিক করলাম, যেভাবেই হোক ওর হিসেবটা চুকিয়ে দিতে হবে। জানতাম, প্রতিটি রবিবার ও লন্ডনে কাটিয়ে রাতে ফিরে আসে, আর ওর পকেট-বুকের মধ্যে থাকে অনেক টাকা। ওই পকেট বুকটা এখন আমার কাছে। এবার বলো, নৈতিকতার মাপকাঠিতে আমি অন্যায় কিছু করেছি কী?’
বার্কার বললেন, ‘বুঝলাম। কিন্তু আমি, ওই মেয়ে দুটো—আমাদের কী অপরাধ ছিল?’
‘বার্কার, মাথাটা একটু ব্যবহার করো। সবাই জানে ওয়াইল্ডের সঙ্গে আমার এখনকার সম্পর্কের কথা। ব্যক্তিগত শত্রুতার জন্যে আমি যদি কাউকে আক্রমণ করতাম, তাহলে কি আমি সহজে ধরা পড়ে যেতাম না? অতএব আমাকে এক সাধারণ ডাকাত সেজে রাহাজানি করতে হল এবং ওয়াইল্ডের ওপর আমার হামলাটা হল কেবল একটা সমাপতন। দুর্ভাগ্য যে আমার প্রথম শিকার ছিলে তুমি, যদিও তোমার ওপর হামলা করার সময় হাসি পাচ্ছিল আমার। পরের শিকার মেয়ে দুটি। নাটকটা জমাতে গিয়ে ওদের সঙ্গে মুখে কড়া ব্যবহার করলেও ওদের গয়নাগাটি কিন্তু ঘটনাস্থলেই ফেরত দিয়েছিলাম। তারপর এল আমার আসল শিকার। এতে কোনো নাটক ছিল না। ওকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিলাম। শিক্ষা দিয়েছি। বার্কার, এবার বলো তোমার অভিমত কী?’
বার্কার ধীরে ধীরে উঠে একগাল হেসে হাত মেলালেন স্যর হেনরির সঙ্গে। বললেন, ‘যা করেছেন তা সাংঘাতিক ঝুঁকির ব্যাপার। আর কখনো এসব করবেন না। ধরা পড়লে খুব বিপদ হবে কিন্তু।’
‘না, আর কখনো করব না। কিন্তু বার্কার, কাল রাতের ওই এক ঘণ্টা সময় ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। দারুণ উপভোগ করেছি ব্যাপারটা। সত্যিই আর কখনো এমন কিছু করব না, কেননা শিকারের নেশার মতো ডাকাতির বা রাহাজানির নেশা হয়ে যেতে পারে।’
টেবিলের ওপর টেলিফোনটা বেজে উঠল। রিসিভারটা কানে লাগিয়ে ওপ্রান্তের কথা শুনলেন স্যর হেনরি। তারপর বার্কারকে বললেন, ‘আজ আদালত যেতে দেরি হয়ে গেল। ওখান থেকেই ফোন এসেছে। ওরা তাড়াতাড়ি পৌঁছতে বলল। আজ বেশ কয়েকটা চুরির কেসের বিচার করতে হবে।’
Sir Arthur Conan Doyle’s ‘A Pirate of the Land’
