কালো প্রাসাদের মালিক – আর্থার কোনান ডয়েল
কালো প্রাসাদের মালিক
দুশো বছরেরও আগের কথা। জার্মান সেনাদল ফ্রান্সে ঢুকে পড়েছে এবং প্যারি শহরকে তারা ঘিরে ফেলেছে উত্তরে ও দক্ষিণে। ফরাসি সেনারা তাড়া খেয়ে ফ্রান্সের উত্তরদিকে চলে যাচ্ছে। জার্মানরা ধীরে-ধীরে ফ্রান্সের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
পরাজয়ের অপমান ও গ্লানিতে ফরাসি নাগরিকরা মুহ্যমান। পদাতিক, অশ্বারোহী, গোলন্দাজ—সব ধরনের সেনাদের চেষ্টা ব্যর্থ করে ফ্রান্স অবশ্যম্ভাবী পরাজয়ের মুখোমুখি। দল বেঁধে লড়াইয়ে ফরাসিরা জার্মানদের থেকে কম দক্ষ হলেও, চোরাগোপ্তা একক যুদ্ধে ফরাসিরা নিপুণ। তাই প্রকাশ্য যুদ্ধের বাইরেও আর এক ধরনের যুদ্ধ চলতে লাগল—ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিহিংসার যুদ্ধ। জার্মানরা একজন ফরাসিকে হত্যা করলেই আর এক ফরাসি তার প্রতিশোধ নিতে লাগল।
জার্মানির এক সেনাধিকারী কর্নেল ফন গ্রাম এইরকম চোরাগোপ্তা আক্রমণে বিশেষ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাঁর পদাতিক সেনাদল তখন নর্মান্ডির একটা ছোট শহরে। আশপাশে ছোট-ছোট গ্রাম আর খামারবাড়ি। ফরাসি সেনাদের কোনও চিহ্ন নেই কোথাও। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতিদিন সকালে খারাপ খবর আসত—হয় কোনও জার্মান সান্ত্রীকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে, কিংবা জার্মান সেনাদের কোনও ছোট দল নিখোঁজ।
এইরকম খবর পেলেই কর্নেল রেগে গিয়ে গ্রামের কিছু বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিতেন। নিরীহ গ্রামবাসীরা ভয়ে কাঁপত। কিন্তু পরদিন সকালে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।
এই অদৃশ্য শত্রুকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। কিন্তু বেশ বোঝা যাচ্ছিল, অপরাধের উৎস একটাই। কেন না জার্মান সেনাদের হত্যা বা নিখোঁজ করা হচ্ছিল একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতেই।
গ্রামবাসীদের ভয় দেখিয়েও অপরাধের কোনও সূত্র পাওয়া গেল না। তখন বাধ্য হয়েই কর্নেল ফন গ্রাম অপরাধীকে ধরে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করলেন।
প্রথমে পাঁচশো ফ্রাংক, তারপরে আটশো ফ্রাংক পুরস্কার ঘোষণা করেও কোনও লাভ হল না। গ্রামবাসীরা কেউই প্রলোভনের ফাঁদে পা দিল না।
শেষে একজন পদস্থ জার্মান সেনাধিকারীর হত্যার পর পুরস্কারের অঙ্ক বাড়িয়ে করা হল এক হাজার ফ্রাংক।
এবার আশার আলো দেখা গেল। ফ্রাঁসোয়া নামের এক কৃষি শ্রমিক আর লোভ সামলাতে পারল না।
নীল পোশাক পরা, ক্ষয়াটে মুখের ফ্রাঁসোয়ার দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে কর্নেল জিগ্যেস করলেন,—তুমি ঠিক জানো অপরাধী কে?
—হ্যাঁ, হুজুর।
—অপরাধীর নাম?
—হুজুর, ওই এক হাজার ফ্রাংক—
—যতক্ষণ না তোমার কথার সত্যতা প্রমাণিত হচ্ছে, এক পয়সাও পাবে না। এবার বলো! আমাদের লোকদের কে হত্যা করছে?
—ওই কালো প্রাসাদের মালিক কাউন্ট ইউস্তাস!
—মিথ্যে কথা! অভিজাত সম্প্রদায়ের একজন ভদ্রলোক কখনোই এই জঘন্য অপরাধ করতে পারেন না।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে ফ্রাঁসোয়া বলল,—বুঝতে পারছি আপনি কাউন্টকে চেনেন না। আমি যা বলছি তা সত্যি। আপনি নির্দ্ধিধায় খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। কাউন্ট ইউস্তাস এমনিতেই কড়া ধাতের মানুষ। কিন্তু একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর পর থেকে উনি ভয়ংকর হয়ে উঠেছেন। তাঁর ছেলে যুদ্ধের সময় জার্মান সেনাদের হাতে ধরা পড়েছিল। জার্মানি থেকে পালাবার সময় তার মৃত্যু হয়। তারপর থেকেই কাউন্ট উন্মাদের মতো হয়ে যান। নিজের প্রজাদের সঙ্গে নিয়ে জার্মান সৈন্যদের নিয়মিত অনুসরণ করেন। জানি না কতজন জার্মানকে আজ পর্যন্ত মেরেছেন। মৃতদের কপালে ছুরি দিয়ে কেটে তৈরি করা যে ক্রশটা দেখা যায়, সেটা কাউন্টের বংশের চিহ্ন।
কথাটা সত্যি। প্রত্যেক মৃত জার্মানের কপালে ক্রশ চিহ্ন পাওয়া গেছে। কর্নেল একটু ঝুঁকে পড়ে টেবিলের ওপর রাখা ম্যাপটার ওপর আঙুল বুলিয়ে বললেন,—প্রাসাদটা তো কাছেই।
—হ্যাঁ, হুজুর। এখান থেকে মাত্র সাড়ে তিন মাইল।
—তুমি জায়গাটা চেনো?
—আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি তো ওখানেই কাজ করতাম।
কর্নেল বেল বাজিয়ে একজন সার্জেন্টকে ডেকে বললেন,—এই লোকটাকে কিছু খেতে দাও, আর আপাতত একে আটকে রাখো।
—কেন হুজুর, আমাকে আটকে রাখবেন কেন? আমি তো আর কিছুই জানি না।
—তোমাকে আমরা গাইড হিসেবে চাই।
—কিন্তু কাউন্ট ইউস্তাস যদি আমাকে দেখতে পান, যদি তাঁর হাতে পড়ি—দোহাই হুজুর—
ফ্রাঁসোয়াকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সার্জেন্টকে ইশারা করলেন কর্নেল। সেইসঙ্গে বললেন, ক্যাপ্টেন বাউমগার্টেনকে এক্ষুনি আমার কাছে পাঠাও।
ক্যাপ্টেন বাউমগার্টেন তক্ষুনি এলেন। তিনি মাঝবয়েসি। চোয়াল চওড়া, চোখ দুটো নীল, হলদেটে গোঁফ আর পোড়া ইটের মতো লাল মুখের রং। মাথায় চুল নেই। মাথার চামড়াটা টানটান আর এত উজ্জ্বল যে তা আয়নার মতো লাগে। একটু ধীরপ্রকৃতির লোক হলেও ক্যাপ্টেন খুব সাহসী আর নির্ভরযোগ্য। কর্নেলের তাই বিশেষ আস্থা বাউমগার্টেনের ওপর।
—ক্যাপ্টেন, তুমি আজ রাতেই ওই কালো প্রাসাদে চলে যাও। একটা গাইড দিয়ে দিচ্ছি। তুমি কাউন্ট ইউস্তাসকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসবে। কোনওরকম প্রতিরোধের চেষ্টা করলে তৎক্ষণাৎ গুলি চালাবে।
—ক’জন লোক নিয়ে যাব, কর্নেল?
—দেখো। চারদিকে তো গুপ্তচর! কাউন্ট কিছু বোঝা বা জানার আগেই তার ওপর হামলা করা দরকার। বেশি লোক না নিলেই ভালো।
—ঠিক আছে, জনা কুড়ি লোক নিলেই হবে। আর উত্তরদিকে যাওয়ার ভান করে ম্যাপে দেখানো এই রাস্তায় হঠাৎ ঢুকে পড়ব। তাতে কেউ কিছু বোঝার আগেই কালো প্রাসাদে পৌঁছনো যাবে।
—বেশ। কাল সকালেই তোমার সঙ্গে দেখা হবে—বন্দিসহ।
ডিসেম্বরের ওই শীতের রাতে ক্যাপ্টেন বাউমগার্টেন কুড়ি জন সৈনিক নিয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে বড় রাস্তা ধরে রওনা হলেন। দু-মাইল গিয়েই দলটি ঢুকে পড়ল একটা সরু মেঠো রাস্তায়। ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছিল। পপলার গাছ আর দু-পাশের খেতের মধ্যে থেকে ভেসে আসছিল বৃষ্টি আর হাওয়ার শব্দ।
ক্যাপ্টেনের পাশেই হাঁটছিল সার্জেন্ট মোসার। সার্জেন্টের কবজির সঙ্গে ফ্রাঁসোয়ার একটা হাত বাঁধা। ফ্রাঁসোয়ার কানে-কানে বলে দেওয়া হয়েছে, এই দলের ওপর কোনও অতর্কিত আক্রমণ হলে প্রথম গুলিটা তার মাথায় ঢুকবে। পেছনে-পেছনে হাঁটছিল দলের বাকি সেনারা। নরম ভেজা মাটিতে তাদের জুতোর শপশপ আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। গন্তব্য, উদ্দেশ্য এসবই তাদের জানা এবং সাথীদের মৃত্যুর বদলা নেওয়ার সুযোগ পেয়ে তারা সকলেই উদ্দীপ্ত।
রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ ফ্রাঁসোয়া সবাইকে নিয়ে এসে থামল দুটো বড় থাম লাগানো একটা প্রকাণ্ড লোহার গেটের সামনে। গেটের সঙ্গে লাগানো পাঁচিল মাঝে-মাঝেই ভেঙে গেছে। চারপাশে আগাছা আর কাঁটাঝোপ। ভাঙা পাঁচিলের মধ্য দিয়ে কম্পাউন্ডে ঢুকে পুরো দলটা ওক গাছের ছায়ার নীচে লুকিয়ে এগিয়ে গেল প্রাসাদের দিকে।
কালো রঙের প্রকাণ্ড প্রাসাদ। বর্ষাকালের ছেঁড়া মেঘের ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্না এসে প্রাসাদের ওপর একটা আলো-আঁধারি পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রাসাদের আকৃতি অনেকটা ইংরেজি ‘এল’ অক্ষরের মতো। সামনে খিলান দেওয়া একটা নীচু দরজা। আর দেওয়াল জুড়ে জাহাজের জানলার মতো ছোট-ছোট জানলা। ছাদের কিছু-কিছু অংশ কোণার দিকে ভেঙে পড়েছে।
একতলার একটা জানলায় আলো দেখা যাচ্ছিল। ক্যাপ্টেন নীচু গলায় আদেশ দিয়ে দলের লোকদের বাড়িটার বিভিন্ন দিকে পাহারা দিতে পাঠালেন। তিনি আর সার্জেন্ট পা টিপে-টিপে জানলার কাছে গিয়ে উঁকি মারলেন ভেতরে।
ঘরটা ছোট, আসবাব সামান্যই। সাধারণ কাজের লোকের পোশাক পরা একজন বয়স্ক লোক একটা কাঠের চেয়ারে বসে মোমবাতির আলোয় একটা ছেঁড়া কাগজ পড়ছিল। পা-দুটো সামনে একটা বাক্সের ওপর তোলা। পাশেই টুলের ওপর একটা মদের বোতল ও গেলাস। জানলার মধ্যে দিয়ে বন্দুক ঢোকাতেই লোকটা ভয়ে চিৎকার করে লাফিয়ে উঠল।
—একদম চুপ! পুরো বাড়ি আমরা ঘিরে ফেলেছি। পালানোর কোনও রাস্তা নেই। এসে দরজাটা খুলে দাও, নাহলে আমরা জোর করে ভেতরে ঢুকব।
—গুলি চালাবেন না! এক্ষুনি দরজা খুলে দিচ্ছি।
একটু পরেই পুরোনো তালা খোলার ও দরজার হুড়কো সরানোর আওয়াজের সঙ্গে-সঙ্গে দরজাটা খুলে গেল আর কয়েকজন জার্মান সৈন্যকে নিয়ে ক্যাপ্টেন বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়লেন।
—এই প্রাসাদের মালিক কাউন্ট ইউস্তাস কোথায়?
—মালিক তো এখন নেই। বাইরে গেছেন।
—এত রাতে বাইরে? মিথ্যে কথা বলার জায়গা পাওনি?
—সত্যি বলছি উনি বাড়িতে নেই।
—কোথায় গেছেন?
—জানি না।
—কী করতে গেছেন?
—জানি না।…স্যার, পিস্তলটা আমার দিকে ওভাবে তাক করবেন না। আপনারা আমায় মেরে ফেলতে পারেন, কিন্তু যে প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই, তা কী করে দেব?
—প্রায়ই কি উনি এরকম সময়ে বাইরে যান?
—হ্যাঁ।
—কখন ফেরেন?
—রাত ফুরোবার ঠিক আগে।
ক্যাপ্টেন বাউমগার্টেন যুগপৎ হতাশ ও বিরক্ত হলেন। লোকটা বোধহয় ঠিকই বলছে—কাউন্ট হয়তো সত্যিই বাড়িতে নেই। কিছু লোককে প্রাসাদের সামনে আর কয়েকজনকে পিছনে পাহারা দিতে বলে তিনি আর সার্জেন্ট কাজের লোকটিকে সামনে রেখে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লেন। বাড়িটা সার্চ করা দরকার। ভয়ে কাঁপছিল লোকটি। তার হাতে ধরা মোমবাতির কাঁপা-কাঁপা আলোয় বাড়ি সার্চ করা হল। একতলার বিশাল রান্নাঘর থেকে শুরু করে দোতলার বিশাল খাওয়ার ঘর পর্যন্ত পুরো প্রাসাদ সার্চ করেও কোথাও কোনও জীবনের লক্ষণ পাওয়া গেল না। একদম ওপরে চিলেকোঠায় ছিল মেরি—কাজের লোকটির স্ত্রী। বাড়িতে আর কোনও চাকর-বাকর নেই এবং মালিকের কোনও চিহ্ন নেই।
বেশ কিছুক্ষণ পরে সার্চের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারলেন ক্যাপ্টেন বাউমগার্টেন।
বাড়িটা সার্চ করা সত্যিই কঠিন। সরু-সরু সিঁড়ি, যাতে একজনই যেতে পারে। বাড়ির চতুর্দিকে গোলোকধাঁধার মতো অজস্র অলিন্দ। দেওয়ালগুলো এত চওড়া যে পাশাপাশি ঘরগুলোও কার্যত সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন। বিশাল সাইজের ফায়ার প্লেস। জানলাগুলো দেওয়ালের মধ্যে প্রায় ছ’ফুট ঢোকানো। বহু চেষ্টা করেও কিন্তু ক্যাপ্টেন কোথাও কোনও গুপ্ত লুকোনোর জায়গা খুঁজে পেলেন না।
অবশেষে তিনি সার্জেন্টকে বললেন,—আমার মাথায় একটা মতলব এসেছে। এই কাজের লোকটার সঙ্গে আমাদের একজন গার্ডকে রেখে দাও। লক্ষ রেখো, ও যেন কারোর সঙ্গে কোনওরকম যোগাযোগ না করে। বাইরে যারা পাহারা দিচ্ছে তাদের বলে দাও অতর্কিতে আক্রমণ করার জন্য তৈরি থাকতে। মনে হয়, ভোরের আগেই পাখি বাসায় ফিরবে।
—ঠিক আছে। আমাদের বাকি লোকরা কী করবে?
—ওদের সবাইকে রান্নাঘরে গিয়ে খেয়ে নিতে বলো। আর তুমিও কিছু খেয়ে নাও। ঝড়বৃষ্টির রাত, বাইরে থাকার বদলে বাড়িতে বসে পাহারা দেওয়াই ঠিক হবে। আমি এই খাওয়ার ঘরেই বসছি। কোনওরকম বিপদের আঁচ পেলেই আমায় ডাকবে।
ক্যাপ্টেন পোড়-খাওয়া সৈনিক। শত্রু পরিবেষ্টিত অনেক পরিবেশেই আগে রাত কাটিয়েছেন। কাজের লোকটিকে খাবার ও পানীয় আনতে বলে ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালিয়ে তিনি আরামে রাত কাটাবার ব্যবস্থা করে ফেললেন। বাতিদানের দশটা মোমবাতিই জ্বালালেন। ফায়ারপ্লেস থেকে কাঠ জ্বলার গন্ধ আর নীল ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে। জানলার কাছে গিয়ে দেখলেন, চাঁদ আবার মেঘের আড়ালে চলে গেছে। ঝেঁপে বৃষ্টি এসেছে। হাওয়ায় শোঁ-শোঁ শব্দ।
এরই মধ্যে খাবার ও পানীয় এসে গেল। সারাদিনের ধকলের পর ক্যাপ্টেন ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত। সুতরাং তলোয়ার, হেলমেট ও বেল্টসুদ্ধু রিভলভার খুলে একটা চেয়ারের ওপর রেখে তিনি খাওয়া সেরে নিলেন। তারপর পানীয়ের গেলাসটা সামনে রেখে একটা চুরুট ধরিয়ে চেয়ারটা পিছনদিকে হেলিয়ে আরাম করে বসলেন।
মোমবাতির আলোর বৃত্তের বাইরে এই বিশাল খাওয়ার ঘরের অন্যান্য অংশ আলোছায়ায় কেমন রহস্যময় লাগছিল। দুটো দেয়ালে কালো কাঠের প্যানেল আর দুটো দিকে পরদা ঝোলানো—তাতে শিকারের ছবি। ফায়ার প্লেসের ওপর বেশ ক’টা পারিবারিক শিল্ড রাখা—প্রতিটির ওপর ক্রশ চিহ্ন।
আগের প্রজন্মের চারজন কাউন্টের বিশাল অয়েল পেন্টিং ঝুলছে ফায়ারপ্লেসের উলটোদিকের দেওয়ালে। প্রত্যেকেরই নাক বাজপাখির ঠোঁটের মতো আর মুখমণ্ডলে এক ধরনের উগ্রতা। চারজনকে প্রায় একইরকম দেখতে। পোশাকের তফাত ছাড়া তাদের আলাদাভাবে চেনা কঠিন। এই চারজনের ছবি দেখতে-দেখতে ঘরের আরামদায়ক উষ্ণতায় ঘুমে চোখ বুজে এল ক্যাপ্টেনের। একটু পরেই তাঁর মাথাটা ঝুলে পড়ল বুকের ওপর।
হঠাৎ একটা ছোট্ট আওয়াজ শুনে ক্যাপ্টেন তড়াক করে উঠে পড়লেন। ঘুমের চোখে তাঁর প্রথমে মনে হল পেন্টিং-এর একটি চরিত্র যেন ফ্রেম থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছে। তারপরেই ক্যাপ্টেন বুঝলেন তাঁর একহাত দূরে টেবিলের পাশে বিশাল চেহারার এক রক্তমাংসের মানুষ দাঁড়িয়ে। স্থির, জ্বলজ্বলে দুটি চোখ ছাড়া প্রায় মৃতের মতো স্তব্ধ।
মানুষটির চুল কালো, গায়ের রং জলপাইয়ের মতো। থুতনিতে ছুঁচলো কালো দাড়ি। নাকটা বাজপাখির ঠোঁটের মতো। গালের চামড়া কিছুটা কুঁচকে গেছে, কিন্তু চওড়া কাঁধ আর কবজির হাড় দেখে বোঝা যায় যে বয়স তাঁর অপরিসীম শারীরিক শক্তিকে গ্রাস করতে পারেনি। হাত দুটো বুকের ওপর জড়ো করা আর মুখে শীতল হাসি।
—না, না, আপনার অস্ত্রশস্ত্রগুলো খোঁজার জন্য কষ্ট করবেন না। ক্যাপ্টেন খালি চেয়ারের দিকে আড়চোখে তাকাতেই মানুষটি বলে উঠলেন,—আপনি বোধহয় একটু অবিবেচক। যে বাড়ির ভেতরটা এমন গোলোকধাঁধার মতো, আর যেখানে এত গোপন যাতায়াতের জায়গা আছে, সেখানে আপনি এত নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছিলেন! কেমন মজা দেখুন তো—আপনি যখন খাওয়াদাওয়া করছিলেন, তখন আমার চল্লিশজন লোক আপনার ওপর নজর রাখছিল।…এ কী, এটা আবার কী করছেন?
ক্যাপ্টেন দু-হাতে ঘুষি পাকিয়ে এগোতেই, আগন্তুক ডান হাতে রিভলভার ধরে বাঁ-হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে ক্যাপ্টেনকে আবার চেয়ারে বসিয়ে দিলেন।
—চুপ করে বসে থাকুন। আপনার লোকজনের ব্যাপারে ভাবতে হবে না। ওদের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এখন আর আপনার অধীনস্থ কোনও দল এখানে নেই। সুতরাং এখন খালি নিজের কথাই ভাবুন।…কী নাম আপনার?
—আমি ২৪ নম্বর পোসেন রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন বাউমগার্টেন।
—বেশ ভালোই ফরাসি বলেন দেখছি, অবশ্য একটু জার্মানসুলভ টান আছে উচ্চারণে। আশা করি জানেন আমি কে।
—আপনি এই প্রাসাদের মালিক কাউন্ট ইউস্তাস।
—ঠিক ধরেছেন। আমার বাড়িতে এসে আমার সঙ্গে দেখা বা একটু কথাবার্তা না হলে খুব দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হত। এর আগে বহু জার্মান সৈনিকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, কিন্তু এই প্রথম একজন জার্মান অফিসারের মুখোমুখি হলাম। আপনাকে অনেক কিছু বলার আছে।
ক্যাপ্টেন চেয়ারে চুপ করে বসে রইলেন। কাউন্টের কথা ও ব্যবহারের মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যে ক্যাপ্টেন তাঁর শিরদাঁড়ায় একটা অজানা আশঙ্কার শিরশিরানি টের পেলেন। তাঁর অস্ত্রশস্ত্র আশেপাশে কোথাও দেখতে পেলেন না। তাছাড়া কাউন্টের বিশাল আকৃতি ও শক্তির কাছে তিনি যে শিশু, সেটা একটু আগেই ক্যাপ্টেন বুঝতে পেরেছেন। কাউন্ট হঠাৎ মদের বোতলটা আলোর দিকে তুলে বলে উঠলেন,—ছি! ছি! পিয়ের আপনাকে এই অতিসাধারণ ওয়াইনটা দিয়েছে। কী লজ্জার কথা বলুন তো! না, না, আরও ভালো কিছু আনানো যাক।
কাউন্টের জ্যাকেটের গলার কাছে ঝোলানো একটা হুইসল—সেটা তিনি বাজালেন। সেই কাজের লোকটি তৎক্ষণাৎ ঘরে এসে হাজির হল।
—১৫ নম্বর বিন থেকে পুরোনো একটা ভালো ওয়াইন নিয়ে এসো।
কাউন্ট আদেশ দেওয়ার খানিক পরেই পিয়ের অতি সন্তর্পণে একটা বোতল নিয়ে এল। কাউন্ট তার থেকে দুটো গ্লাস ভরলেন।
—নিন, খান! আমার সংগ্রহের সব থেকে ভালো ওয়াইনের মধ্যে এটি একটি। খান, আনন্দ করে খান। মাংস, গলদা চিংড়ি—এসবও আছে। কিছু আনাব নাকি? আর একবার একটু ভালো করে ডিনার করুন। বললেন কাউন্ট।
ক্যাপ্টেন ঘাড় নেড়ে অসম্মতি জানালেন। তবে ওয়াইনের গ্লাসটা শেষ করলেন। গ্লাসটা আবার ভরে দিয়ে কাউন্ট বললেন,—আমার বাড়ির সবকিছুই আপনার জন্য। আপনি চাইলেই হল! যাই হোক, আপনি ওয়াইনটা খেতে থাকুন আর আপনাকে আমি একটা গল্প বলি। গল্পটি কোনও জার্মান অফিসারকে বলার জন্য আমি বড় উৎসুক ছিলাম। আমার একমাত্র সন্তানকে নিয়ে এই গল্প। ও যুদ্ধবন্দি হয়ে পালাতে গিয়ে মারা যায়। গল্পটি বিচিত্র এবং আপনাকে আমি হলফ করে বলতে পারি, এ-গল্প আপনি জীবনে ভুলতে পারবেন না।
—আমার ছেলেটা বড় ভালো ছিল ক্যাপ্টেন। গোলন্দাজ-বাহিনীতে অফিসার, ওর মায়ের গর্ব। মৃত্যুর খবর আসার এক সপ্তাহের মধ্যে ওর মা মারা যান। মৃত্যুর খবরটা এনেছিল তার এক সহকর্মী, যে বেঁচে পালাতে পেরেছিল। ও যা বলেছিল সেটাই আপনাকে বলতে চাই।
—৪ আগস্ট আমার ছেলে উইসেনবুর্গে ধরা পড়ে। যুদ্ধবন্দিদের কয়েকটা দলে ভাগ করে জার্মানরা তাদের বিভিন্ন জায়গায় পাঠায়। আমার ছেলেকে পাঁচ তারিখে যে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানকার জার্মান অফিসার ওদের সঙ্গে ভদ্র ও সদয় ব্যবহার করেন। ওই জার্মান অফিসার আমার ক্ষুধার্ত সন্তানকে খাবার দেন, সঙ্গে এক বোতল ভালো ওয়াইনও দেন—যেমন আমি আপনাকে দিলাম। উনি আমার ছেলেকে নিজের বাক্স থেকে একটা চুরুট-ও দেন।…নেবেন নাকি একটা চুরুট?
ক্যাপ্টেন মাথা ঝাঁকিয়ে ‘না’ বললেন। কাউন্টের মুখের শীতল হাসি আর জ্বলজ্বলে চোখ দেখে তাঁর ভয় করছিল।
—ওই জার্মান অফিসার আমার ছেলের সঙ্গে খুবই ভালো ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু পরের দিন ওদের একটা অন্য গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। জানেন ক্যাপ্টেন, দুর্ভাগ্যবশত এই নতুন জায়গার জার্মান অফিসারটি ছিল গুন্ডা প্রকৃতির ও অত্যন্ত বদ। সে যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে খুব দুর্ব্যবহার করত আর কারণে-অকারণে তাদের অপমান করত। একদিন রাতে তার অপমানের বিরুদ্ধে আমার ছেলে উচিত জবাব দিতেই ওই বদমাইশ জার্মান অফিসার তার চোখের ওপর ঘুসি মারে—ঠিক এইরকম করে!
ঘুষির আওয়াজে সারা ঘরটা যেন ঝনঝন করে উঠল। ক্যাপ্টেন বাউমগার্টেনের মাথাটা ঝুলে পড়ল বুকের ওপর আর তিনি মুখে হাত চাপা দিতেই হাতের ফাঁক দিয়ে রক্তের ধারা বেরিয়ে এল। কাউন্ট আবার ধীরেসুস্থে তাঁর চেয়ারে গিয়ে বসলেন।
—ওই ঘুষিতে আমার ছেলের মুখটা বিকৃত হয়ে যায় আর সেই পাষণ্ড জার্মান তাই নিয়ে আমার ছেলেকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করত।…ক্যাপ্টেন, আপনাকেও এখন দেখতে বেশ হাস্যকর লাগছে। আপনাকে এখন দেখলে আপনার কর্নেল নিশ্চয় ভাববেন যে কোথাও দুষ্টুমি করতে গিয়ে আপনি মার খেয়ে এসেছেন। যাই হোক, গল্পেতে আবার ফেরা যাক। আমার ছেলে তখন কপর্দকশূন্য। তাই দেখে একজন দয়ালু জার্মান মেজর ওকে দশটি স্বর্ণমুদ্রা কোনওরকম কিছু বন্ধক ছাড়াই ধার দেন। আমি সেই মেজরকে চিনি না, তাই এই দশটি স্বর্ণমুদ্রা, ক্যাপ্টেন, আপনার মাধ্যমে আমি ফেরত দিলাম—এগুলি গ্রহণ করুন। সেই দয়ালু জার্মান মেজরের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
—ওই গুন্ডা প্রকৃতির অফিসারটি ইতোমধ্যে যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে একটার পর-একটা নতুন জায়গায় যাচ্ছিল। আমাদের বংশের কেউ কখনও কোনও অপরাধ মাথা নুয়ে সহ্য করে না। তাই আমার ছেলের ওপর সেই পাষণ্ডের অত্যাচার চলতেই থাকল। সে আমার ছেলেকে কখনও হাত দিয়ে মারত, কখনও লাথি মারত, আবার কখনও বা তার গোঁফের চুল টেনে ছিঁড়ত—ঠিক এইভাবে, এইভাবে, এইভাবে।
ক্যাপ্টেন বাউমগার্টেন যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলেন। কিন্তু বিশালকায় এই মানুষটির ক্রমান্বয় আঘাতের সামনে তিনি অসহায়। শেষে অর্ধচেতন ও প্রায় অন্ধ অবস্থায় তিনি যখন কোনওক্রমে উঠে দাঁড়ালেন, কাউন্ট আবার ধাক্কা মেরে তাঁকে সেই চেয়ারেই বসিয়ে দিলেন। নিষ্ফল রাগে, অপমানে ক্যাপ্টেন ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললেন।
—আমার ছেলেটাও অপমানে এইরকমই আপনার মতো কেঁদে ফেলত। বললেন কাউন্ট,—ভেবে দেখুন, উদ্ধত ও নির্দয় শত্রুর বিরুদ্ধে কিছু না করতে পারার অসহায়তা কী নিদারুণ! আমার ছেলের মুখের বিকৃত, রক্তাক্ত অবস্থা দেখে একজন জার্মান সেপাই ওর মুখে ব্যান্ডেজ করে দেয়। আপনারও দেখছি চোখের থেকে রক্তপাত হয়েছে। আমার এই সিল্কের রুমালটা দিয়ে আপনার ক্ষতস্থানটা কি বেঁধে দেব?
কাউন্ট ঝুঁকতেই, ক্যাপ্টেন এক ঝটকায় তাঁর হাতটা সরিয়ে দিলেন।
—তোমার মতো পাষণ্ডের অত্যাচার সহ্য করতে পারি, কিন্তু অসহ্য তোমার এই ভণ্ডামি। বিকৃত গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন ক্যাপ্টেন।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে কাউন্ট বললেন,—ঘটনাগুলি আমি খালি ক্রমানুসারে বলে যাচ্ছি। আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, প্রথম যে জার্মান অফিসারের সঙ্গে আমার দেখা হবে, তাকে সবকিছু বলব। কত অবধি যেন বলেছি—হ্যাঁ, সেই দয়ালু জার্মান সেপাইয়ের কথা পর্যন্ত। খুবই খারাপ লাগছে যে আপনি আমার হাতের থেকে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুও করাতে চাইছেন না! যাই হোক, আমার ছেলেকে এর পর পনেরো দিন বন্দি করে রাখা হয়। সবথেকে খারাপ লাগত যখন ও কুঠুরির জানলার কাছে সন্ধের সময় চুপচাপ বসে থাকত আর জার্মান সেপাইরা ওকে নিয়ে ব্যঙ্গ করত, যেন ও একটা রাস্তার কুকুর। আপনিও আপাতত যেভাবে বসে আছেন তা নিয়ে ব্যঙ্গ করা যায়, তাই না?—চুপ করে বোস ওই চেয়ারে, কুকুর কোথাকার!
—হ্যাঁ, দিন পনেরো বন্দি থাকার পর আমার ছেলে আর ওর বন্ধু পালাল। কত বিপদের সামনে যে ওরা পড়েছিল, কত কষ্ট করতে হয়েছিল ওদের—সেসব এখন বলে লাভ নেই। ওরা কৃষকের ছদ্মবেশে রাতের পর-রাত হেঁটে জার্মানদের অধিকৃত জায়গার শেষপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। মুক্তি যখন মাত্র আর একমাইল দূরে, তখন জার্মানদের এক টহলদারী সেনাদলের হাতে ওরা ধরা পড়ে গেল। তীরে এসে তরী ডোবা একেই বলে, তাই না?
কাউন্ট এবার হুইসলটা দু-বার বাজালেন। তিনজন রুক্ষদর্শন চাষা-ভূষো গোছের লোক ঘরের মধ্যে চলে এল।
—মনে করুন, এই তিনজন আমার টহলদারী সেনা। বললেন কাউন্ট,—যে জার্মান ক্যাপ্টেনের কাছে আমার ছেলে ও তার বন্ধুকে নিয়ে যাওয়া হল, তিনি বিনা বিচারে ওদের ফাঁসির হুকুম দিলেন। ওদের অপরাধ? ওরা ফরাসি সৈনিক হওয়া সত্ত্বেও বেসামরিক পোশাকে জার্মানি অধিকৃত জায়গায় ধরা পড়েছে।—যা, ওই মাঝখানের কড়িকাঠটা ব্যবহার কর, ওটা বেশ পোক্ত আছে।
তারপর ক্যাপ্টেনকে তাঁর চেয়ার থেকে উঠিয়ে টানতে-টানতে ঘরের মাঝখানে নিয়ে যাওয়া হল। তাঁর মাথার ঠিক ওপরেই ফাঁস দেওয়া একটা মোটা দড়ি ঝোলানো। ফাঁসটা ক্যাপ্টেনের মাথার ওপর দিয়ে গলিয়ে দেওয়া হল। তিনি গলায় দড়ির কর্কশভাব অনুভব করতে পারছিলেন। সেই তিনজন লোক দড়ির এক প্রান্ত ধরে কাউন্টের আদেশের অপেক্ষায় রইল।
ক্যাপ্টেন বাউমগার্টেনের মুখ বিবর্ণ, কিন্তু তবুও তিনি শক্ত থাকার চেষ্টা করছিলেন। হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি রেখে নির্ভীকভাবে কাউন্টের দিকে তিনি তাকিয়ে রইলেন।
—আপনি এখন মৃত্যুর মুখোমুখি। আপনার ঠোঁট দেখেই বুঝতে পারছি যে আপনি প্রার্থনা করছেন। আমার ছেলেও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেছিল। সেই সময় হঠাৎ এক পদস্থ জার্মান অফিসার এসে পড়েন। তিনি শুনতে পান যে আমার ছেলে ওর মায়ের জন্য প্রার্থনা করছে। অফিসার নিজেও সন্তানের পিতা। তিনি আর সবাইকে বাইরে যেতে বলে দুই বন্দির কাছে গেলেন। আমার ছেলে ওঁকে সবকিছু খুলে বলল। এ-ও জানাল যে, সে তার বৃদ্ধ পিতামাতার একমাত্র সন্তান ও তার মা অসুস্থ।
স্নেহপ্রবণ মহান সেই জার্মান অফিসার তখনই ওর গলা থেকে ফাঁসির দড়িটা খুলে দিলেন—যেমন আপনার দড়িটাও আমি খুলে দিলাম। তারপর উনি আমার ছেলের দুই গালে পরম স্নেহভরে চুম্বন করলেন—আমিও, ক্যাপ্টেন, তোমাকে সেইভাবে চুম্বন করলাম। শেষে উনি আমার ছেলেকে চলে যেতে বললেন—যেমন আমিও তোমাকে এখন চলে যেতে বলছি। আমার ছেলে ফেরার পথে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। কিন্তু ক্যাপ্টেন, সেই মহান জার্মান অফিসারের সমস্ত আশীর্বাদ যেন তোমায় রক্ষা করে।
তারপরেই ক্যাপ্টেন বাউমগার্টেন আহত, রক্তাক্ত অবস্থায়, ক্ষতচিহ্ন আঁকা মুখ নিয়ে টলতে-টলতে কালো প্রাসাদের বাইরে বেরিয়ে এলেন—ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টিতে ভরা সেই দুরন্ত শীতের ভোরে।
‘The Lord of Chateau Noir’ গল্পের অনুবাদ
