সেই হাতটা – আর্থার কোনান ডয়েল
সেই হাতটা
ব্রিটিশ আমলে ভারতের বিখ্যাত শল্যচিকিৎসাবিদ আমার কাকা স্যার ডোমিনিক হোলডেন যে আমাকে তাঁর বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করে গেছেন, এ কথা সকলেরই জানা। কিন্তু আর পাঁচজন সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীকে অগ্রাহ্য করে কেন তিনি আমাকেই তাঁর সমস্ত সম্পত্তি দিয়ে গেলেন তার কারণ অনেকেই জানেন না। তাঁর বদান্যতায় একজন সাধারণ পশারের ডাক্তার থেকে আমি রাতারাতি এক প্রভূত বিত্তশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়েছি। খুব কম লোকই জানেন যে স্যার ডোমিনিকের জীবনের শেষ ক’টা বছরে আমি তাঁর জন্য যা করেছিলাম, তা আর কারও পক্ষে করা সম্ভব ছিল না। সেই ব্যাপারটাই আজ খুলে বলছি—বিশ্বাস করা না করা আপনাদের ওপর।
স্যার ডোমিনিক কর্মজীবন শুরু করেন ব্রিটিশ সেনাদলের ডাক্তার হিসেবে। পরে বোম্বেতে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে তিনি প্রভূত সুনাম অর্জন করেন। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হিসেবে তাঁর প্রায়ই ডাক পড়ত। তা ছাড়া বোম্বেতে তিনি একটা হাসপাতালও শুরু করেন, এবং সেই হাসপাতালের পরিচালনার কাজে নিজে যুক্ত ছিলেন। এত পরিশ্রমে তাঁর স্বাস্থ্য ধীরে-ধীরে ভেঙে পড়ল। তখন বন্ধুবান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীদের উপদেশে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে গেলেন। উইল্টশায়ারে অনেক জমিজমা ও একটি জমিদারবাড়ি কিনে ওখানেই থাকতেন। তুলনামূলক প্যাথোলজি ছিল তাঁর প্রিয় বিষয় এবং তারই চর্চা করে সময় কাটাতেন।
আমাদের পরিবারের সকলেই এই ধনী ও নিঃসন্তান আত্মীয়ের দেশে ফিরে আসাতে, বলা বাহুল্য, খুব খুশি হয়েছিল। কাকাও মাঝে-মাঝেই এক এক করে তাঁর ভাইপো, ভাইঝিদের ওখানে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পাঠাতেন। অবশ্য ওখানে গিয়ে কারওরই খুব একটা ভালো লাগত না। যাই হোক, আমারও একদিন আমন্ত্রণ এল ওখানে যাওয়ার। কিন্তু আমার একার, সপরিবার নয়।
প্রথমে ভেবেছিলাম যাব না। তারপর সাতপাঁচ ভেবে অক্টোবরের এক দুপুরে উইল্টশায়ারের দিকে রওনা হলাম। তখনও জানি না এই যাত্রার পরিণতি কী।
ভিনটন স্টেশনে যখন নামলাম ততক্ষণে দিনের আলো ম্লান হয়ে এসেছে। উইল্টশায়ারের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিচিত্র লাগল। জায়গাটা উপত্যকার মতো—চারদিকে কৃষিজমি আর ছড়ানো ছিটোনো কৃষকদের ঘরবাড়ি। সমতল জমির পরেই শুরু হয়েছে সাদা-সাদা চকের পাহাড়, পাহাড়গুলোর ওপরে গোল, চৌকোনা প্রভৃতি বিভিন্ন আকারের প্রাচীর—অনেকটা দুর্গের প্রাচীরের মতো। কয়েকশো বছর আগে এই প্রাচীরগুলো কারা তৈরি করেছিল—ব্রিটিশরা না রোমানরা—এ নিয়ে মতভেদ আছে। পাহাড়ের গায়ে ঢেউ-খেলানো জমির ওপরেও গোল গোল ঢিপি।
এই বিচিত্র পরিবেশে কাকার বাড়িটা বেশ মানিয়ে গেছে। গেটের স্তম্ভদুটো ভাঙা ও শ্যাওলা-ধরা। গেট থেকে বাড়ি অবধি পাথর ছড়ানো রাস্তাটার যত্ন হয়নি বহুদিন। হেমন্তের ঝরা পাতা ঠান্ডা হাওয়ায় এলোমেলো উড়ছে। এলম গাছের সারির ফাঁক দিয়ে দূরে বাড়ি থেকে একটা আলো দেখা যাচ্ছে। সন্ধের আবছা আলোয় বাড়িটা দেখতে পেলাম—লম্বা, নীচু ধরনের। পুরোনো আমলের স্থাপত্যের ছাপ—ঢালু ছাদ, টালি দেওয়া, দেওয়ালের গায়ে কাঠের সাপোর্ট। গাড়িবারান্দা থেকে বাড়িতে ঢোকার দরজার পাশেই একটা চওড়া জানলা। সেই জানলা দিয়ে দেখতে পেলাম, ঘরের মধ্যে ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বলছে। ওই ঘরটাই কাকার স্টাডি। বাড়ির বুড়ো এক পরিচারক আমাকে ওই ঘরেই নিয়ে গেল।
শীতের কাঁপুনি থেকে বাঁচতে কাকা ফায়ার প্লেসের কাছেই ঝুঁকে বসেছিলেন। ঘরে তখনও কোনও বাতি জ্বালানো হয়নি। ওই আগুনের আলোয় দেখলাম কাকাকে—বিশাল মুখমণ্ডল, চেহারায় পাহাড়ের রুক্ষতা, নাক ও গাল রেড ইন্ডিয়ানদের মতো, থুতনি থেকে চোখের কোণ অবধি চামড়ার ওপর অজস্র আঁকিবুঁকি। আমাকে দেখেই কাকা তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা করলেন। ঘরে এবার একটা বাতি জ্বালানো হল। ঘন ভ্রূ-র নীচে থেকে তাঁর তীক্ষ্ন দুটি চোখ আমাকে যে বিশেষভাবে নিরীক্ষণ করছে, তা বুঝতে পারলাম।
আমিও ততক্ষণে কাকাকে ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম। শরীরের গঠন প্রায় দৈত্যের মতো, কিন্তু শরীরটা এত শুকিয়ে গেছে যে চওড়া হাড্ডিসার কাঁধের থেকে ঝোলানো কোটটা দেখে মনে হচ্ছিল যে, ওটা যেন হ্যাঙার থেকে ঝুলছে। চওড়া কবজিটা যেন শুধু হাড় দিয়ে তৈরি—হাতের শিরাগুলি বিশেষভাবে প্রকট। জীবিকায় সফল ও শারীরিকভাবে সমর্থ একজন মানুষের চোখে যে সাফল্য ও সন্তুষ্টির ঔজ্জ্বল্য থাকে, তা নেই। চোখে একটা সন্ত্রস্ত ভাব—যেন কোনও অজানা বিপদের ছায়া। মনে হয়, স্যার ডোমিনিকের অদম্য জীবনীশক্তিকে যেন কেউ শুষে নিয়েছে। আমার ডাক্তারি বুদ্ধিতে মনে হল, কাকার হয়তো কোনও মারাত্মক রোগ হয়েছে এবং আসন্ন মৃত্যু চিন্তায় তিনি সন্ত্রস্ত। অবশ্য পরে বুঝেছিলাম, আমার সিদ্ধান্ত ভুল।
আগেই বলেছি, কাকার অভ্যর্থনায় উষ্ণতার কোনও অভাব ছিল না। ঘণ্টাখানেক পরে কাকা ও কাকিমার সঙ্গে ডিনারে বসলাম। পরিবেশন করছে একজন ভারতীয় পরিচারক।
আমার কাকিমা লেডি হোলডেন ছোটখাটো চেহারার মানুষ, চোখে যুগপৎ মমতা ও সতর্কতার ছাপ। দুজন সারা জীবন বিভিন্ন পরিবেশে অনেক লোকজনের মধ্যে কাটিয়ে আজ জীবন-সায়াহ্নে এই নির্জন পরিবেশে কেবল পরস্পরের সাহচর্য্যে দিন কাটাচ্ছেন।
ডিনারের সময় কথাবার্তা ও হাসিঠাট্টা চলতে থাকলেও এটা পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, ওদের দুজনের চোখেই কোনও অজানা আতঙ্কের ছায়া। খানিকটা জোর করেই যেন ওঁরা পরিস্থিতিটাকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন।
খাওয়ার পরে ওয়াইনের গ্লাস হাতে একটু গল্পগুজব হল। কীভাবে জানি না গল্পের বিষয়টা চলে গেল অলৌকিক ও অতিপ্রাকৃত ঘটনার দিকে। কথায়-কথায় আমি ওঁদের বললাম যে ডাক্তার হিসেবে আমার বিশেষজ্ঞতা স্নায়ুসম্বন্ধিত অসুখের ব্যাপারে। এমনকী কয়েকজন ডাক্তারবন্ধু মিলে ভূতুড়ে বাড়িতেও রাত কাটিয়েছি—যদিও বলার মতো তেমন কিছু উত্তেজক অভিজ্ঞতা হয়নি। কাকা-কাকিমা দুজনেই খুব মন দিয়ে আমার কথা শুনছিলেন। মাঝে-মাঝেই অর্থপূর্ণভাবে পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করছিলেন। একটু পরে কাকিমা শুতে চলে গেলেন।
এরপর কাকা একটা চুরুট ধরালেন। চুরুট ধরানোর সময় তার কাঁপতে থাকা হাত আর মুখের ভাব দেখে মনে হল তিনি আমাকে কিছু গোপন কথা জানাতে চান। ঠিক তাই! একটু পরেই কাকা বললেন,—তোমারই মতো একজনের সঙ্গে আমি দেখা করতে চাইছিলাম। অতিপ্রাকৃত ও অলৌকিক ব্যাপারে তোমার যে যথেষ্ট উৎসাহ ও জ্ঞান আছে, সেটা বুঝতে পারছি। শুধু তাই নয়, এসব বিষয়ের একটা যুক্তিগ্রাহ্য ও দার্শনিক দিকও আছে—সেটাও তুমি জানো। তোমার মাথাও ঠান্ডা। ভূতপ্রেত দেখলে তুমি কি ঘাবড়ে যাবে?
—মোটেই না। বরং এসব ব্যাপারে আমি খুব উৎসাহী।
—আশাকরি বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকেই তুমি এসব ব্যাপার দ্যাখো।
—অবশ্যই।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাকা বললেন,—জানো, হার্ডএকর, আমি আগে ঠিক তোমার মতোই ছিলাম। ইন্ডিয়ায় সবাই আমার সাহস ও শক্ত নার্ভ দেখে অবাক হয়ে যেত। এমনকী সিপাহী বিদ্রোহের সময়েও আমি একটুও ঘাবড়াইনি। আর আজ? এই অঞ্চলে আমার মতো ভীতু লোক একটাও পাবে না। তুমিও অবশ্য খুব বেশি সাহস দেখাতে যেও না—তা হলে তোমার অবস্থা আমার মতোই হয়ে যেতে পারে।
আমার উৎসাহ দেখে কাকা আবার শুরু করলেন,—কয়েক বছর হল একটা অদ্ভুত কারণে আমার ও তোমার কাকিমার জীবন থেকে সুখ-শান্তি চলে গেছে। কারণটা শুনলে অনেকেই হয়তো হেসে ফেলবে। কিন্তু এই ব্যাপারটার সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করে আমরা দুজনেই শেষ হয়ে গেলাম।
—ব্যাপারটা কী, একটু খুলে বলবেন?
—আগে থেকে সেটা বলে দিলে হয়তো তুমি স্বাধীনভাবে জিনিসটার বিচার করতে পারবে না। তুমি নিজের চোখেই সবকিছু দেখলে ভালো হয়। আমার সঙ্গে একটু এদিকে এসো।
খাওয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে একটা লম্বা প্যাসেজের শেষে বেশ বড় একটা ঘরে আমরা এলাম। ঘরটা একটা ল্যাবরেটরি—অনেক যন্ত্রপাতিতে ভরা আর দেওয়াল জোড়া তাকে অজস্র কাচের জার রাখা।
কাকা বললেন,—মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিশাল সংগ্রহ ছিল আমার। বোম্বেতে আমার বাড়িতে আগুন লেগে তার অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে যায়। যা অবশিষ্ট ছিল, সেগুলোই এখানে দেখতে পাচ্ছ।
ভারতের বিভিন্ন জায়গার মানুষের শরীরের অস্বাভাবিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গর জারগুলিতে রাখা—ফুলে যাওয়া লিভার বা কিডনি, বাঁকা হাত-পা, বিচিত্র রকমের সিস্ট, বিকৃত বা অসুস্থ কোনও অঙ্গ।
কাকা বললেন,—তুমি যদি এ ঘরেই রাতটা কাটাও তাহলে ভালো হয়। এই ডিভানটাতে শুতে পারো। কোনওরকম আপত্তি থাকলে আমায় বলো।
—না, না। কোনও আপত্তি নেই।
—বাইরের প্যাসেজে বাঁ-দিকে দ্বিতীয় ঘরটা আমার। দরকার পড়লেই আমায় কিন্তু ডেকো। আমার তো রাতে ভালো ঘুম হয় না। তুমি ডাকলেই আমি চলে আসব।
কাকা চলে যেতেই ল্যাবরেটরির দরজা বন্ধ করে আমি ডিভানে শুয়ে পড়লাম। আমার শারীরিক শক্তি আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই। আর ভয়ের কথা যদি আসে, এটুকু বলতে পারি যে মানুষের মস্তিষ্কে এক সময় একটিমাত্র মানসিক অবস্থা থাকতে পারে। অর্থাৎ, এই অলৌকিক রহস্য উন্মোচনের জন্য যে উৎসাহ ও কৌতূহল এই মুহুর্তে আমার সত্তাকে আচ্ছন্ন করেছে, সেখানে ভয়ের কোনও স্থান নেই। খেলা শুরুর আগে একজন খেলোয়াড় যেমন উত্তেজনা মেশানো উৎসাহ নিয়ে অপেক্ষা করে, আমার মানসিক অবস্থাও তখন সেইরকম।
ঘরটাকে অবশ্য কোনওভাবেই আদর্শ শয়নকক্ষ বলা যাবে না। বিভিন্ন কেমিক্যালের গন্ধে ভরা। তা ছাড়া, জারে রাখা বিকৃত ও অসুস্থ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিকেও ঘুম আসার পক্ষে বিশেষ সুবিধাজনক বলা যায় না। আমি মোমবাতিটা নিভিয়ে দিতেই দেখলাম, জানালার মধ্য দিয়ে চাঁদের আলো ঘরের একটা অংশকে আলোকিত করেছে। সবকিছু মিলিয়ে আলো-আঁধারিতে পরিবেশটা একটু ভূতুড়েই লাগছিল। পুরো বাড়িটা এত নিস্তব্ধ যে বাইরে হাওয়ায় গাছের পাতা বা শাখা নড়ার আওয়াজও শোনা যাচ্ছিল। এপাশ ওপাশ করে কিছুক্ষণ ঝিমিয়ে থেকে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম—একেবারে গভীর, স্বপ্নহীন ঘুম।
হঠাৎ ঘরের ভেতর একটা আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে একটু উঠে চারদিকে তাকালাম। কয়েক ঘণ্টা কেটে গেছিল—কেন না চাঁদের আলো সরতে-সরতে এখন আমার বিছানার কাছাকাছি এসে গেছে। বাকি পুরো ঘরটা ছায়াচ্ছন্ন। আস্তে-আস্তে অন্ধকারে চোখ সয়ে গেলে দেখলাম কিছু একটা চলাফেরা করছে—দেওয়ালের ধার ঘেঁষে। বেশ রোমাঞ্চকর ব্যাপার। আমার বিছানার কাছে আলোকিত জায়গার পাশে যখন জিনিসটা এসে গেল, বুঝলাম সেটা একটা মানুষের আকৃতি। চেহারাটা ছোটখাটো কিন্তু ষণ্ডা গোছের, শরীরটা একটা আলখাল্লায় ঢাকা। তার মুখের ওপর চাঁদের আলো পড়তে দেখলাম, মুখের রং অনেকটা চকোলেটের মতো আর মাথায় চুলে একটা ঝুঁটি বাঁধা। ধীরে-ধীরে হেঁটে সে প্রত্যেকটা জারের ভেতরের বস্তু নিবিষ্টচিত্তে নিরীক্ষণ করছিল—একটার পর একটা। জার রাখার তাক শেষ হয়েছে আমার বিছানার কাছে। ওখানে এসে সে হঠাৎ থেমে আমার দিকে তাকাল আর হতাশার ভঙ্গিতে দু-হাত শূন্যে ছুড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
‘হাত’ বলা হয়তো ঠিক হল না—লোকটা বাহু দুটো তুলেছিল। বাহু ওপরে তোলার সময় আলখাল্লার আস্তিন নেমে আসতেই ওর বাঁ-হাতটা পরিষ্কার দেখতে পেয়েছিলাম—কিন্তু ডান হাতের জায়গাটা ঠুঁটো, হাত নেই। এই ব্যতিক্রমটুকু ছাড়া লোকটার চেহারা ও চলাফেরা এত স্বাভাবিক ছিল যে, ওকে সহজেই স্যার ডোমিনিকের আর একজন ভারতীয় ভৃত্য বলে চালিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু লোকটার হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটা বেশ রহস্যময়। মোমবাতি জ্বেলে ঘরের চারদিক খুঁজেও তার কোনও হদিস পেলাম না। বাকি রাতটুকু জেগে কাটিয়ে দিলাম। অবশ্য সেই রাতে আর কোনও ঘটনা ঘটেনি।
ভোর হতেই বাইরে বেরিয়ে দেখলাম, কাকা লনে পায়চারি করছেন। আমাকে দেখেই উত্তেজিতভাবে বললেন,—লোকটাকে দেখেছ? ভারতীয়। একটা হাত নেই।
—হ্যাঁ, দেখেছি।
—ব্রেকফাস্টের সময় এখনও হয়নি। এসো, তোমায় ততক্ষণে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। গত চারবছরে,—বোম্বেতে, দেশে ফেরার সময় জাহাজে, এই বাড়িতে—প্রতিটি রাত এই লোকটা আমার ঘুম ভাঙিয়েছে। ওর রুটিন একেবারে স্থির। আমার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আমার কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে ঘুম ভাঙায়, তারপর আমার শোওয়ার ঘর থেকে ল্যাবরেটরিতে যায়, তাকে রাখা সবক’টা জার খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দ্যাখে, তারপর অদৃশ্য হয়ে যায়। এক হাজারেরও বেশিবার এই রুটিন দেখে-দেখে আমার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
—কী চায় লোকটা?
—ওর হাত ফেরত চায়।
—হাত?
—ব্যাপারটা তোমায় খুলে বলি। বছরদশেক আগে একবার আমাকে ডাক্তারি কাজে পেশোয়ার যেতে হয়েছিল। সেই সময় ঘটনাচক্রে এক রোগীকে আমার কাছে চিকিৎসার জন্য আনা হয়। লোকটা আফগানিস্তানের প্রত্যন্তের কোনও উপজাতি সম্প্রদায়ের। ভাঙা-ভাঙা পোশতু-তে কথা বলছিল। ওর হাতের গাঁটে সাংঘাতিক একটা গ্যাংগ্রিন গোছের কিছু হয়েছিল। দেখেই বুঝলাম, ওই হাত কেটে বাদ না দিলে ওর বাঁচার কোনও আশা নেই। অনেক বোঝানোর পর ও অপারেশন করাতে রাজি হল। অপারেশনের পর ও আমার ফি জানতে চাইল। লোকটার আর্থিক অবস্থা প্রায় ভিখারির মতো। আমি হেসে ওকে বললাম যে, তোমার এই কেটে বাদ দেওয়া হাতটাই আমার ফি। আমার প্যাথোলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে আর একটা নুতন আইটেম আর কী!
কাকা বলে চললেন,—লোকটা আমার এই প্রস্তাবে বিশেষ আপত্তি জানাল। ওদের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী মৃত্যুর পরে আত্মা আবার শরীরে প্রবেশ করে। সে ক্ষেত্রে মৃত মানুষের অঙ্গহীনতা বা কোনও খুঁত আত্মার পক্ষে একটা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমি ওকে বললাম, তোমার তো হাতটা বাদ-ই গেছে। তা হলে ওটাকে কীভাবে রেখে দেবে? ও বলল, হাতটাকে নুনজলে চুবিয়ে আমার সঙ্গে নিয়েই ঘুরব। আমি তখন ওকে বোঝালাম যে হাতটা আমি আরও ভালোভাবে সংরক্ষণ করব। শেষ পর্যন্ত ও রাজি হয়ে গেল। কিন্তু বলল, সাহেব, আমি মারা যাওয়ার পরে কিন্তু ওই হাতটা আমার চাই। ব্যাপারটা আমি তখন হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। তারপর বোম্বে ফিরে এসে আমি যথারীতি আমার প্রাইভেট প্র্যাকটিসে লেগে গেলাম। লোকটাও সম্ভবত ওর দেশে ফিরে যায়।
—আর ওই হাতটা?
—বলছি। তোমায় আগেই বলেছিলাম, বোম্বেতে আগুন লেগে আমার বাড়ির বহু জিনিস নষ্ট হয়। তার মধ্যে আমার সংগ্রহের বেশ কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও নষ্ট হয়ে যায়। ওই হাতটাও ছিল তারই মধ্যে। তখন অবশ্য সে ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাইনি। এসব হয়েছিল ছ’বছর আগে। এরপরই শুরু হল আসল কাণ্ড। বছরচারেক আগে এক রাতে ঘুমের মধ্যে কে যেন আমার জামার হাতা ধরে টান মারল। প্রথমে ভাবলাম, আমার পোষা কুকুরটা। তারপরে দেখি, আলখাল্লা পরিহিত আমার সেই আফগান রোগী, ঠুঁটো বাহুটা তুলে আমায় দেখাচ্ছে। তারপরে ধীরে-ধীরে আমার ঘরে (তখনও আমার ল্যাবরেটরি ঘর মেরামত হয়নি) রাখা জারগুলো একে একে নিরীক্ষণ করে প্রথমে হতাশ, পরে ক্রুদ্ধ হয়ে সে অদৃশ্য হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম, লোকটা সদ্যই মারা গেছে এবং আমার কাছে তার জমা রাখা হাতটা নিতে এসেছে!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাকা বললেন,—এরপর গত চারবছর ধরে প্রতিটি রাতে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। রাতে এই ঘটনার জন্য অপেক্ষা করি বলে আমার ভালো ঘুম হয় না। তোমার কাকিমারও একই অবস্থা। আমাদের বার্ধক্যের শান্তিপূর্ণ জীবন এখন সম্পূর্ণভাবে বিষিয়ে গেছে। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। তোমার সাহসের জন্যই আজ আমরা এই ব্যাপারটা কাউকে প্রথম জানালাম। তা ছাড়া, তুমিও যেহেতু ঘটনাটা নিজের চোখে দেখেছ, একটু স্বস্তি পাচ্ছি এই ভেবে যে আমি এখনও পাগল হয়ে যাইনি এবং ব্যাপারটা আমার স্বকপোলকল্পিত নয়।
নিজের চোখে সবকিছু দেখে এবং এই ধরনের বিষয়ে আমার যেটুকু জ্ঞান তা দিয়ে এটুকু বুঝতে পারলাম যে পুরো ব্যাপারটাই নির্ভেজাল সত্যি। ব্রেকফাস্টের পরে কাকা-কাকিমাকে বললাম যে আমায় এক্ষুনি একবার লন্ডনে যেতে হবে।
কাকা খানিকটা পরিতাপের সুরেই বললেন,—আমারই ভুল হয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্যের বোঝা তোমার ওপর চাপিয়ে দিয়ে অন্যায় করেছি। তাই তুমি চলে যাচ্ছ।
—না, না, আমি এই রহস্যের সমাধানের জন্যই লন্ডনে যাচ্ছি। সন্ধেবেলায় ফিরে এসে রাতটা আজ ওই ল্যাবরেটরি ঘরেই কাটাব।
কাকাকে আর কিছু ভেঙে বললাম না। দুপুরে লন্ডনে পৌঁছে আমার চেম্বারে গিয়ে একটা বই খুলে নিম্নলিখিত অনুচ্ছেদটায় চোখ বুলিয়ে নিলামঃ
‘মৃত্যুর সময়ে বিশেষ কোনও মানসিক অবস্থার জন্য কিছু-কিছু আত্মা জড় জগৎ থেকে সঙ্গে-সঙ্গে মুক্তি পায় না। লোভ, প্রতিহিংসা, উদ্বেগ, প্রেম, করুণা ইত্যাদির জন্য এরকম মানসিক অবস্থা হতে পারে। সাধারণত এর কারণ কোনও অপূর্ণ কামনা। সেই কামনার পূরণের সঙ্গে-সঙ্গে আত্মা পৃথিবীর স্থূল পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে পারে। এমনকী কামনা পূরণের একটা মোটামুটি বিকল্পের ব্যবস্থা করতে পারলেও আত্মার মুক্তি সম্ভব।’
সকাল থেকেই এই ‘মোটামুটি বিকল্প’ কথাগুলো আমার মাথায় আসছিল। বই থেকে এই অংশটা পড়ে নিশ্চিত হয়ে তক্ষুনি পৌঁছলাম শ্যাডওয়েলে নাবিকদের একটা হাসপাতালে যেখানে আমার বন্ধু জ্যাক হিউয়েট হাউস-সার্জন। ওকে খুঁটিনাটি না জানিয়ে খালি বললাম আমি কী চাই।
—কোনও ভারতীয় মানুষের একটা হাত! কেন? কী জন্যে চাই?
—তোমাকে পরে সবকিছু বলব। তোমাদের হাসপাতালে তো অনেক ভারতীয় রোগী আছে।
—দাঁড়াও, দেখি। বলে জ্যাক হাসপাতালের এক কম্পাউন্ডারকে ডেকে পাঠিয়ে জিগ্যেস করল,—আচ্ছা, জাহাজের মেশিনঘরে চাকায় ফেঁসে গিয়ে ওই যে জখম ভারতীয় নাবিকের হাত দুটো বাদ দেওয়া হল, সেই হাত দুটো এখন কোথায়?
—পোস্ট-মর্টেম-এর ঘরে আছে, স্যার।
—আচ্ছা, ওখান থেকে চট করে একটা হাত অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে প্যাক করে ডাঃ হার্ডএকরকে দিয়ে দাও।
রাতে কাকার বাড়িতে ফিরে ল্যাবরেটরিতে একটা খালি জারে হাতটা রাখলাম। জারটা যে তাকে রাখলাম, সেটা আমার বিছানার কাছাকাছি। কাকাকে বিশেষ কিছু খুলে বললাম না।
আজ ঘুমের কোনও প্রশ্নই নেই। আমার পরীক্ষা সফল হয় কি না তা দেখার জন্য ঢাকনা দেওয়া একটা বাতি জ্বালিয়ে প্রতীক্ষা শুরু করলাম। এবার তাকে স্পষ্ট দেখতে পেলাম। প্রথমে দরজার কাছে একটা ছায়ার মতো দেখা গেল। তারপরে সেটা ধীরে-ধীরে একটা মানুষের অবয়রে পরিণত হল। কাল রাতের মতোই সে লাইন ধরে এক-এক করে জারগুলো দেখতে-দেখতে এসে থামল সেই জারের কাছে যাতে আমি লন্ডন থেকে আনা হাতটা রেখেছিলাম। আশায় অধীর হয়ে সে হাতটাকে জার থেকে বের করল, পরমুহূর্তের হতাশায় ও ক্রোধে কাঁপতে-কাঁপতে হাতটাকে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিল। সেই নিস্তব্ধ রাতে হাত ছুড়ে ফেলার আওয়াজ পুরো বাড়িতে শোনা গেল। তাকিয়ে দেখলাম, লোকটা আর নেই। স্যার ডোমিনিক দৌড়ে এসে ঘরে ঢুকে বললেন,—তোমার কোনও আঘাত লাগেনি তো?
—না-না। কিন্তু পরীক্ষা সফল হল না। খারাপ লাগছে।
ভাঙা কাচের মধ্যে পড়ে থাকা হাতটাকে দেখে কাকা বললেন,—প্ল্যানটা তুমি ভালোই করেছিলে। কিন্তু এ রহস্যের কোনও সহজ সমাধান নেই। তুমি কিন্তু আর কখনও এ-ঘরে ঢুকবে না। তোমার কোনওরকম ক্ষতি হলে আমি নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারব না।
বাকি রাতটুকু ওই ঘরেই শুয়ে ভাবছিলাম আমার পরীক্ষার ব্যর্থতার কথা। ভোরের আলো ঘরে এসে পড়তেই মেঝেতে পড়ে থাকা হাতটার দিকে তাকালাম। হাতটা তুলে একবার দেখতেই বিদ্যুৎচমকের মতো মাথায় একটা সমাধানের সূত্র এসে গেল। যা ভেবেছি, ঠিক তাই। আমার আনা হাতটা ওই আহত নাবিকের ‘বাঁ-হাত’।
সকালের প্রথম ট্রেন ধরে লন্ডনে পৌঁছেই সোজা হাজির হলাম নাবিকদের সেই হাসপাতালেই। আমার আশঙ্কা তখন একটাই—পোস্ট-মর্টেম-এর পরে অন্য হাতটা যদি এতক্ষণে জ্বালিয়ে দিয়ে থাকে, তা হলে কী হবে! সৌভাগ্যবশত আমার আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হল—অন্য হাতটা এখনও পোস্ট-মর্টেম-এর ঘরেই রাখা আছে। সেটা নিয়ে তৎক্ষণাৎ রওনা হয়ে সন্ধের আগেই কাকার বাড়ি পৌঁছে গেলাম।
কাকা কিন্তু আমাকে কিছুতেই আর ল্যাবরেটরি ঘরে থাকতে দিলেন না। অগত্যা হাতটাকে একটা জারে ভরে আগের দিনের মতোই একটা তাকে রেখে দিলাম। তারপর শুতে গেলাম বাড়ির অন্য অংশে একটা ভালো শোওয়ার ঘরে।
কিন্তু আমার ভাগ্যে বোধহয় নিরুপদ্রব ঘুম আপাতত আর নেই। মাঝরাতে হাতে একটা বাতি নিয়ে ঢোলা ড্রেসিং গাউন পরা অবস্থায় উত্তেজিতভাবে যিনি ঘরে ঢুকলেন, তাঁকে দেখে গতকালের সেই আফগান লোকটাকে দেখার মতো ভয় পেলে বা অবাক হলে কিছু অস্বাভাবিক হত না। কিন্তু ইনি স্যার ডোমিনিক—আমার কাকা। কোনও জাদুমন্ত্রবলে যেন তাঁর বয়স অন্তত কুড়ি বছর কমে গেছে। চোখেমুখে ঝকঝকে ভাব। বিজয়ীর ভঙ্গিতে একটা হাত তুলে আমাকে বললেন,—হার্ডএকর, আমরা শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছি। এখন বলো, তোমার এই ঋণ আমি কী ভাবে শোধ করি?
—রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে?
—হ্যাঁ। তাই তো তোমার ঘুম ভাঙিয়ে সুখবরটা দিতে এলাম। ভগবানই তোমাকে পাঠিয়েছিলেন আমাকে বাঁচাতে—কেন না আর ছ’মাস এরকম চললে আমি আর বাঁচতাম না।
—কিন্তু কী দেখলেন? কী করে বুঝলেন যে সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে?
—যা দেখেছি বা অনুভব করেছি, তাতে আমি নিশ্চিত যে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরিসমাপ্তি হয়েছে। আজ রাতে সে আমার ঘরে এসে অন্যদিনের থেকেও জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে আমায় জাগিয়ে দিয়েছিল। কেন না গতকালের ঘটনায় সম্ভবত আমার প্রতি তার ক্রোধ ও বিদ্বেষ আরও বেড়ে গেছিল। আমাকে জাগিয়ে সে তার চিরাচরিত ল্যাবরেটরি পরিক্রমায় চলে গেল। কিন্তু এত বছরে এই প্রথম সে আবার আমার ঘরে ফিরে এল। আনন্দে হাসছিল সে। কালো মুখে তার সাদা দাঁতগুলো ঝকঝক করছিল। তারপর আমার বিছানার পায়ের দিকে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে ওদের প্রথামতো তিনবার মাথা ঝুঁকিয়ে আমায় কুর্নিশ করল। তৃতীয়বার কুর্নিশ করার পর ও বাহু তুলতেই দেখলাম, ওর দুটো হাতই আছে। তারপরেই ও মিলিয়ে গেল এবং আশা করি, চিরদিনের জন্য।
এর পরে কাকাকে আর কখনও ওই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়নি। উনি আর কাকিমা আরও বেশ কিছুকাল বেঁচেছিলেন—সব মিলিয়ে শান্তিপূর্ণ দীর্ঘ জীবন। ইংল্যান্ডে জীবনযাপনের খুঁটিনাটি থেকে শুরু করে সম্পত্তি কেনাবেচা পর্যন্ত অনেক ব্যাপারেই ওঁরা আমার পরামর্শ নিতেন। সুতরাং আমার আর পাঁচ জ্ঞাতিভাইদের অগ্রাহ্য করে যখন স্যার ডোমিনিক আমাকে তাঁর প্রভূত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করে যান, তখন আমি বিন্দুমাত্র বিস্মিত হইনি। এক সাধারণ ডাক্তার থেকে রাতারাতি উইল্টশায়ারের এক বিখ্যাত ধনী ব্যক্তি হিসেবে আমি পরিচিত হলাম। এর জন্য কিন্তু হাতকাটা ওই আফগান লোকটি এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও কাকার বাড়িতে আসার প্রথম দিনটির কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
‘The Brown Hand’ গল্পের অনুবাদ
