রহস্যময় সিন্দুক – আর্থার কোনান ডয়েল
রহস্যময় সিন্দুক
‘আচ্ছা, অ্যালারডাইস, ওটাকে দেখে কী মনে হয় তোমার?’ প্রশ্ন করলাম আমাদের জাহাজের সেকেন্ড অফিসারকে। আমরা দুজনে জাহাজের পেছনদিকে পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে। ঝড় থেমে গেলেও সমুদ্রের ঢেউ তখনো উত্তাল। জাহাজের গায়ে ঝোলানো আমাদের নৌকো দুটোও ঢেউয়ের ধাক্কা খাচ্ছে।
দু-পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে চোখে দূরবিন লাগিয়ে অ্যালারডাইস দেখছিল সেই হতভাগ্য অজানা বস্তুটাকে। ঢেউয়ের সঙ্গে ওঠানামা করছিল সেটা। প্রায় ডুবন্ত জিনিসটার সবুজ রঙের একটা অংশ দেখতে পাচ্ছিলাম।
হ্যাঁ, ওটা একটা দু-মাস্তুলের জাহাজ, যদিও প্রধান মাস্তুলটা মাঝখান থেকে ভেঙে পড়েছে। আহত শঙ্খচিলের মতো জলে ভাসছে মাস্তুলটার ধ্বংসাবশেষ। অন্য মাস্তুলটা ঠিক থাকলেও, জাহাজের পালগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে পতাকার মতো উড়ছে। এমন বিধ্বস্ত জাহাজ আমি আগে কখনো দেখিনি।
অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কেন-না গত তিনদিনে কয়েকবারই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল যে, ভেবেছিলাম এজীবনে ডাঙার মুখ আর কখনোই দেখতে পাব না। আমাদের জাহাজ ‘মেরি সিনক্লেয়ার’ খুব মজবুত, তাই বিশেষ কোনো ক্ষতি হয়নি। ঝড় থামার পর বুঝতে পারলাম, সবাই আমাদের মতো ভাগ্যবান নয়। নির্মেঘ আকাশের নীচে নীল জলের ওপর ওই জাহাজটা টলমল করে কাঁপতে কাঁপতে যেন জানাচ্ছিল তার সদ্য-সমাপ্ত ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা।
আমাদের জাহাজের সকলে ডেক-এ জমায়েত হয়েছিল বিধ্বস্ত জাহাজটাকে দেখতে। অ্যাটলান্টিকের যে অংশ দিয়ে আমাদের যাত্রাপথ, সেটা ঠিক বাণিজ্য-পথের মধ্যে পড়ে না। তাই গত দশদিন নিঃসঙ্গ নির্জন সমুদ্রে পাড়ি দেওয়ার পরে আমরা সকলেই একটা অন্য জাহাজ দেখে কৌতূহলী হব, এটাই স্বাভাবিক।
অ্যালারডাইস এবার মন্তব্য করল, ‘মনে হচ্ছে জাহাজটা পরিত্যক্ত— ওটায় কেউ নেই।’
সত্যিই জাহাজটায় জনপ্রাণীর কোনো চিহ্ন নেই, এমনকী, আমাদের সম্মিলিত কণ্ঠের চিৎকারেরও কোনো উত্তর এল না। মনে হয় জাহাজটার ডুবে যাওয়ার আশংকায় মাঝি-মাল্লারা সবাই জাহাজ ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
সেকেন্ড অফিসার হিসেব করে আবার বলল, ‘যে-কোনো মুহূর্তে জাহাজটা ডুবে যাবে। রেলিং অবধি জল উঠে গেছে।’
সে আরও বলল, ‘জাহাজের পতাকাটা ব্রাজিলের। তবে নীচের দিকটা ওপরে। তার মানে জাহাজটা বিপদের সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।’
ওর হাত থেকে দূরবিনটা নিয়ে আমি যতদূর চোখ যায় দেখলাম। অ্যাটলান্টিকের গভীর নীল জলরাশি। ঢেউয়ের ফেনা। জনপ্রাণীহীন। আমি বললাম, ‘হয়তো জাহাজে জীবিত মানুষ এখনো আছে।’
অ্যালারডাইস বলল, ‘হয়তো মালপত্রও আছে—সেগুলো উদ্ধার করা যেতে পারে।’
‘তাহলে চলো, জাহাজটার কাছে যাওয়া যাক।’
দুই জাহাজের মধ্যে যখন একশো গজের মতো তফাত, তখন অ্যালারডাইসকে বললাম, একটা নৌকো আর চারজন লোককে নিয়ে ওই জাহাজে উঠতে।
ঠিক তক্ষুনি জাহাজের ডেক-এ এল আমাদের ফার্স্ট অফিসার আর্মস্ট্রং। তাই ওকে আমাদের জাহাজের ভার দিয়ে আমিও নৌকোয় উঠে পড়লাম। ওই পরিত্যক্ত জাহাজে কী আছে তা জানার জন্য আমার কৌতূহলও কম ছিল না।
ওইটুকু দূরত্ব, কিন্তু পৌঁছোতে সময় লাগল অনেকটাই, উত্তাল ঢেউয়ে আমাদের নৌকোটা এত ওঠানামা করছিল যে মাঝে মাঝে দুটো জাহাজই দৃষ্টির বাইরে চলে যাচ্ছিল। নৌকো ঢেউয়ের ওপরে উঠলে অস্তগামী সূর্যের উষ্ণতার ছোঁয়া, আর নীচে নামলে শীতল অন্ধকার। বোঝার চেষ্টা করছিলাম কোন দিক থেকে জাহাজটায় সহজে ওঠা যেতে পারে। চোখে পড়ল জাহাজটার নাম—’নোসা সেহনোরা দা ভিত্তোরিয়া’।
আমাদের নৌকো আর ওই জাহাজটা সম উচ্চতায় আসতেই চোখের পলকে আমরা সবাই লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম পরিত্যক্ত জাহাজের ডেক-এ। আমাদের জাহাজের মিস্ত্রিও সঙ্গে এসেছিল। ও আমাদের নৌকোটা জাহাজের গায়ে একটা হুকের সাহায্যে বেঁধে দিল।
প্রথম চিন্তা হল আমাদের নিরাপত্তা। জাহাজটা যদি হঠাৎ ডুবে যায়? আমাদের দুজন নাবিক নৌকোটাকে শক্ত করে ধরে রইল যাতে দরকার হলেই নৌকোয় উঠে আমরা আত্মরক্ষা করতে পারি। আর মিস্ত্রি দেখতে গেল জাহাজের ভেতরে কতটা জল ঢুকেছে, জল বাড়ছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি, সেকেন্ড অফিসার আর অন্য এক নাবিক মিলে খুব তাড়াতাড়ি জাহাজ ও মালপত্রগুলোর ওপর চোখ বোলালাম।
ডেক-ভর্তি ধ্বংসাবশেষ, মরা মুরগিসহ মুরগির খাঁচা জলে ভাসছে। একটা মাত্র নৌকো আছে জাহাজে; অর্থাৎ সকলে জাহাজ ছেড়ে চলে গেছে। ক্যাপ্টেনের কেবিনের একটা দেওয়াল জলের ধাক্কায় বিধ্বস্ত। টেবিলটা তিনি যেভাবে ছেড়ে গেছেন ঠিক সেই অবস্থাতেই পড়ে আছে। স্প্যানিশ কিংবা পোর্তুগিজ ভাষায় লেখা কাগজপত্র, রেজিস্টার ইত্যাদি। আর ঘরের চতুর্দিকে ছড়ানো সিগারেটের ছাই।
জাহাজের লগ-বুকটা কিন্তু খুঁজে পেলাম না। ওটা পেলে জাহাজটার যাত্রাপথ, দৈনিক অগ্রগতির হিসেব ইত্যাদি জানা যেত। অ্যালারডাইস অবশ্য বলল যে, দক্ষিণ আমেরিকার জাহাজ লগ-বুকের ধার ধারে না কিংবা হয়তো ক্যাপ্টেনই ওটা নিয়ে চলে গেছেন। আমি ঠিক করলাম, কাগজ-পত্রগুলো নিয়ে যাব।
ইতিমধ্যে মিস্ত্রি এসে একটা সুখবর দিল—জাহাজে প্রচুর জল ঢুকলেও বেশ কিছু মালপত্র ভাসমান বলে, জাহাজটা হঠাৎ ডুবে যাবে না। হয়তো আদৌ ডুববেই না, সমুদ্রের বুকে টলমল করে ভাসতে থাকবে আর অন্য জাহাজের দুর্ঘটনার কারণ হবে।
আমি অ্যালারডাইসকে বললাম, ‘বিপদের যখন এখনই কোনো আশংকা নেই, তুমি বরং নীচে গিয়ে দ্যাখো মালপত্র কিছু উদ্ধার করা যায় কিনা। আমি একটু কাগজপত্রগুলো দেখি।’
কাগজপত্র দেখে জানা গেল, ‘নোসা সেহনোরা দা ভিত্তোরিয়া’ মাসখানেক আগে বাহিয়া বন্দর ছাড়ে। ক্যাপ্টেনের নাম টেকসেইরা। নাবিকের সংখ্যার উল্লেখ নেই কোথাও। জাহাজটা যাচ্ছিল লন্ডনে। তবে কাগজ অনুযায়ী মালপত্র যা নিয়ে যাচ্ছিল, সেগুলো উদ্ধার করা বা তার থেকে কিছু মুনাফা লাভের সম্ভাবনা কম। কাঠ, আদা, বাদাম ইত্যাদি।
কাঠ মানে বিশাল বিশাল গুঁড়ি। ওগুলোর জন্যেই জাহাজটা ডোবেনি। তবে কাঠের এই গুঁড়িগুলো তো নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আর ছিল কিছু শৌখিন জিনিস—মেয়েদের টুপি, ফিতে, রংচঙে পাখির মূর্তি ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে, একশো বাক্স সংরক্ষিত ফল।
এরপর আমার বিশেষ করে নজর পড়ল ইংরেজিতে লেখা একটা নোটিসঃ
‘স্যান্টারেম সংগ্রহের অপূর্ব ও মূল্যবান শিল্পবস্তুগুলি যা লন্ডনের প্রন্টফুট ও নিউম্যান কোম্পানিকে পাঠানো হচ্ছে, সেগুলি নিরাপদ স্থানে রাখার অনুরোধ করা হচ্ছে। বিশেষত, লেইরা-র ডন র্যামিরেজের সিন্দুকটি যেন সবাইয়ের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।’
ডন র্যামিরেজের সিন্দুক! অপূর্ব ও মূল্যবান শিল্পবস্তু! এই তো দামি জিনিস পাওয়ার সম্ভাবনা! কাগজটা হাতে নিয়ে আমি উঠে দাঁড়াতেই দেখি অ্যালারডাইস এসে হাজির, ও বলল, ‘স্যর, এই জাহাজের ব্যাপার-স্যাপার ঠিক স্বাভাবিক লাগছে না।’ ওর পোড়-খাওয়া মুখে যেন একটা সন্ত্রস্ত ভাব।
‘কেন, কী ব্যাপার?’
‘খুন, স্যর, খুন! একটা লোক মরে পড়ে আছে, তার মাথা ফেটে চৌচির। আসুন, আমার সঙ্গে আসুন।’
জাহাজে ডেক-এর নীচে কোনো ঘর নেই। ডেক-এই ক্যাপ্টেনের ঘর, রান্না, খাবার ঘর, নাবিকদের থাকার ঘর। রান্নার জায়গায় বাসনপত্র ছত্রাকার হয়ে পড়ে আছে। এরই সংলগ্ন একটা ঘরে শোওয়ার জন্যে, দুটো বাংক আর একদিকে খালি অংশে পালের কাপড়, পতাকা ইত্যাদি পড়ে আছে। মোটা কাপড় দিয়ে ঢাকা বেশ কিছু প্যাকেট দেয়ালে দড়ি দিয়ে লটকানো।
আর এক প্রান্তে রাখা বিশাল একটা সিন্দুক, লাল-সাদা ডোরা কাটা। অবশ্য বহুকাল ধরে ধুলোময়লা লেগে লাল ও সাদা রং দুটোই ম্লান হয়ে গেছে। মেপে দেখা গেল, সিন্দুকটা চার ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা, তিন ফুট দু-ইঞ্চি উঁচু আর প্রস্থে তিন ফুট। জাহাজে সচরাচর যেরকম সিন্দুক থাকে, তার থেকে অনেকটাই বড়।
তবে এই ভাঁড়ার ঘরে ঢুকে সিন্দুকে চোখ পড়ার আগেই দেখতে পেলাম, মেঝের ওপর একটা লোকের দেহ। লোকটার চেহারা ছোটখাটো, গায়ের রং তামাটে, গালে কোঁকড়ানো দাড়ি। সিন্দুকের থেকে অনেকটা দূরে পড়ে আছে লোকটা, পা-দুটো সিন্দুকের দিকে। পালের সাদা কাপড়ের ওপর যেখানে ওর মাথা, সেই অংশটুকু লাল, আর লাল রঙের সরু কয়েকটা ফিতে যেন ওর ঘাড় পেঁচিয়ে মেঝের দিকে চলে গেছে। কিন্তু কোনো ক্ষতের চিহ্ন চোখে পড়ল না। লোকটা যেন ঘুমন্ত শিশুর মতো শান্ত।
একটু ঝুঁকে দেখতেই বুঝতে পারলাম লোকটা কীভাবে আঘাত পেয়েছিল আর বুঝতে পেরে আমি ওখান থেকে তক্ষুনি দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। আতঙ্কে আমার মুখ থেকে অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এল। সম্ভবত পেছন থেকে কেউ লোকটার মাথায় কসাইদের কুঠার চালিয়েছে। আঘাতের তীব্রতায় ওর মাথা ফেটে গিয়ে ঘিলু বেরিয়ে এসেছে। ওর মুখে শান্তি, কেন-না মৃত্যু হয়েছিল চোখের পলকে। আর আততায়ীকে দেখার কোনো সুযোগ পায়নি সে।
অ্যালারডাইস মৃদুস্বরে জিগ্যেস করল, ‘ক্যাপ্টেন, কী মনে হয়—দুর্ঘটনা, না খুন?’
‘লোকটাকে খুন করা হয়েছে। ওপর থেকে খুব ভারী আর ধারালো কোনো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু লোকটা কে আর কারাই বা ওকে মারল?’
‘স্যর, লোকটার আঙুলগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে যে, ও ছিল একজন সাধারণ নাবিক।’
লোকটার পকেট থেকে বেরোল এক সেট তাস, একটা গুলতি আর এক দলা ব্রাজিলীয় তামাক। আর হাতে ধরা ছিল স্প্রিং-দেওয়া ব্লেডওয়ালা ইস্পাতের ধারালো একটা বড় ছুরি। বোঝাই গেল যে, ওই ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয়নি তাকে।
সেকেন্ড অফিসার বলল, ‘স্যর, মনে হয় লোকটা বিপদের আশঙ্কায় ছুরি হাতে প্রস্তুত ছিল, তবে শেষ রক্ষা হয়নি। যাই হোক, এখন আর করার কিছু নেই। দেয়ালে ঝোলানো ওই প্যাকেটগুলো কীসের বলুন তো? মনে হয়, যেন মূর্তি অস্ত্রশস্ত্র, শিল্পবস্তু ইত্যাদি—তাই না?’
আমি বললাম, ‘ঠিক বলেছ। জাহাজের মালপত্রের মধ্যে কেবল এই জিনিসগুলো থেকেই কিছু টাকা কামানো যাবে বোধহয়। আমাদের জাহাজে খবর দাও দ্বিতীয় নৌকোটাও এখানে পাঠাতে আর ওতেই রাখো এই মালপত্রগুলো।’
এবার আমার নজর গেল ডোরাকাটা সিন্দুকটার দিকে। বাইরে থেকে আসা দিনের আলোয় ওটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। সিন্দুকটার ওপর কোনো অভিজাত বংশের প্রতীকচিহ্ন আর স্প্যানিশ ভাষায় কিছু কথা খোদাই করা আছে। কথাগুলোর অর্থ-‘ভেরাকুয়াস প্রদেশের শাসক ও ক্যাপ্টেন-জেনারেল ডন র্যামিরেজ ডি লেইরা-র ধনদৌলতের সিন্দুক।’ আর এক কোনায় খোদাই করে লেখা—’১৬০৬ খ্রিস্টাব্দ।’ সিন্দুকের ওপর সাঁটা আছে ইংরেজিতে লেখা একটা কাগজ—’সনির্বন্ধ অনুরোধ করা হচ্ছে, যে-কোনো কারণেই যেন এই বাক্সটি না খোলা হয়।’
একই সতর্কবার্তা আরেকটি লেবেলে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা। তালাটা অত্যন্ত জটিল ধরনের আর খুব ভারী। সেটার ওপরেও লাতিন ভাষায় কী সব লেখা ছিল, মানে বুঝলাম না।
ইতিমধ্যে ফার্স্ট অফিসার আর্মস্ট্রং দ্বিতীয় নৌকোটা নিয়ে এসে গেছে। আমরা প্যাকেটগুলো নামিয়ে ওই নৌকোয় রাখতে শুরু করলাম। নৌকোটা ভরে যেতেই আর্মস্ট্রং ওটা নিয়ে চলে গেল আমাদের জাহাজের দিকে। তখন আমরা চারজন মিলে ধরাধরি করে সিন্দুকটা রাখলাম আমাদের নৌকোয়। সিন্দুকটা এত ভারী যে, সেটাকে নৌকায় মেপে মেপে সঠিক জায়গায় রাখতে হল। একটু এদিক-ওদিক হলেই নৌকো উল্টে যাবার সম্ভাবনা। মৃতদেহটা ওই জাহাজেই পড়ে রইল।
অ্যালারডাইসের মতে, জাহাজ ছেড়ে পালানোর সময় লোকটা হয়তো লুঠপাট শুরু করেছিল, এবং খুব সম্ভবত ক্যাপ্টেন ছোট একটা কুঠার জাতীয় কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে ওকে আঘাত করেছিল। ব্যাখ্যাটা হয়তো যুক্তিসংগত, কিন্তু আমার মন তাতে সায় দিচ্ছিল না। তবে সমুদ্রের রহস্যের তো কোনো শেষ নেই। ওই নাবিকটার মৃত্যুও রহস্যের তালিকায় আর একটা সংযোজন হয়ে থেকে যাবে।
মোটা দড়ির সাহায্যে সিন্দুকটা নৌকো থেকে আমাদের জাহাজে তুলল চারজন নাবিক। কেবিনে টেবিল আর লকারের মাঝের জায়গাটুকুতে ওটাকে কোনোক্রমে রাখা হল। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর সবাই মিলে আজকের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আমাদের মধ্যে আর্মস্ট্রং-ও ছিল। লম্বা, রোগা চেহারার লোক, জাহাজের ফার্স্ট অফিসার, নাবিক হিসেবে খুবই ভালো। কিন্তু লোকটার দুটো দোষ—অদূরদর্শিতা আর অর্থলিপ্সা। ধনদৌলতে ভরা সিন্দুক এবং উদ্ধার করা প্যাকেটগুলো দেখে ও খুবই উত্তেজিত। ভাগ-বাঁটোয়ারা করলে কে কত পাবে, এই নিয়ে ও কথা বলতে শুরু করেছে। লোভে ওর চোখ দুটো চকচক করছিল।
আর্মস্ট্রং বলল, ‘ক্যাপ্টেন বার্কলে, কাগজে লেখা আছে যে জিনিসগুলো তুলনাহীন ও মহার্ঘ। তাই এগুলোর দাম কী হতে পারে তা কল্পনাও করা যায় না। বড় বড় সংগ্রাহকদের কাছে এক হাজার পাউন্ড কিছুই নয়। মনে হয়, যাত্রাশেষে আমাদের ভালোই আমদানি হবে।’
আমি বললাম, ‘এটা দক্ষিণ আমেরিকার সাধারণ শিল্পবস্তু বলেই তো মনে হচ্ছে আমার।’
‘স্যর, আমি চোদ্দোবার দক্ষিণ আমেরিকা গেছি, কিন্তু এমন সিন্দুক কখনো দেখিনি। শুধু সিন্দুকটারই দাম হবে অনেক। তাছাড়া ওটা যা ভারী, ওর মধ্যে নিশ্চয়ই ধনরত্ন আছে। চলুন না, ওটা খুলে দেখি।’
আর্মস্ট্রং উবু হয়ে বসে ঘাড় বাঁকিয়ে নাকটা তালার ওপর প্রায় ঠেকিয়ে সিন্দুকটা নিরীক্ষণ করতে করতে বলল, ‘এটা ওক কাঠে তৈরি, একটা বাটালি কিংবা শক্ত ব্লেডওয়ালা ছুরি পেলে তালাটা ভাঙা যেত, সিন্দুকের ক্ষতি না করেই।’
আমি বললাম, ‘ওই মৃত লোকটাও হয়তো হাতে ছুরি নিয়ে সিন্দুকটা খোলার চেষ্টা করেছিল।’
‘তা তো জানি না ক্যাপ্টেন, তবে আমি অবশ্যই সিন্দুকটা খুলতে পারব। অ্যালারডাইস, স্ক্রু-ড্রাইভারটা দাও তো! আর হ্যাঁ, আলোটা দেখাও। দু-ঝটকায় তালাটা ভেঙে ফেলব।’
লোভে, কৌতূহলে আর্মস্ট্রং-এর চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। আমি বললাম, ‘একটু দাঁড়াও। এত তাড়াহুড়োর কী আছে? লেবেলে লেখা সতর্কবার্তা তুমি পড়েছ? তার কোনো মানে আছে কি না জানি না। কিন্তু আমার মন বলছে ওটা উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। সিন্দুকটা এখানেই খোলো আর যাত্রাশেষে মালিকের অফিসেই খোলো, ভেতরের জিনিসপত্র তো পালিয়ে যাচ্ছে না!’
আর্মস্ট্রং বেশ হতাশ হল। পাতলা ঠোঁট দুটো অবজ্ঞায় বেঁকিয়ে বলল, ‘স্যর আপনি নিশ্চয়ই কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন। আসলে আমরা যদি ভেতরের জিনিসগুলো না দেখি, আর সিন্দুকটা যদি আমাদের হাতের বাইরে চলে যায়, তাহলে আমরা কি আর ওগুলোর মালিকানা প্রমাণ করতে পারব? তাছাড়া…’
‘ব্যস, আর্মস্ট্রং। আর কোনো কথা শুনতে চাই না। আজ রাতে সিন্দুক খোলা হবে না। এই আমার শেষ কথা।’
অ্যালারডাইস বলল, ‘লেবেলটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ইউরোপীয়ানরা সিন্দুকটা কখনো খুলে থাকবে। তাছাড়া, গত দুশো বছরে অনেকেই হয়তো ওটা খুলেছে। আর একটা কথা। সিন্দুক বলেই যে ওর মধ্যে রত্নভাণ্ডার আছে তার কোনো মানে নেই।’
আর্মস্ট্রং স্ক্রু-ড্রাইভারটা টেবিলের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে ক্যাপ্টেন, আপনি যা বলছেন তাই হবে।’
বাকি সন্ধেটা আমরা যখন বিভিন্ন বিষয়ে গল্প-গুজবে মত্ত, তখনো কিন্তু আর্মস্ট্রং-এর দৃষ্টি বার বার যাচ্ছিল সিন্দুকের দিকে—চাহনিতে একই রকম লোভ আর কৌতূহল।
এবার গল্পের সেই অংশে এসে গেছি, যার কথা ভাবলে আজও আমি ভয়ে শিউরে উঠি। আমাদের জাহাজে বড় কেবিনের চারদিকে অফিসারদের থাকার ঘর। আমার ঘরটা অবশ্য একটু দূরে, একটা প্যাসেজ পেরিয়ে যেতে হয়। আমার ঘরের বাইরে রাত পাহারা সাধারণত তিনজন অফিসার পালাক্রমে দেয়। মাঝরাতে আজ পাহারার ভার ছিল আর্মস্ট্রং-এর ওপর। ভোর চারটের সময় ওর পাহারা শেষ হবে। তখন থেকে সকাল পর্যন্ত পাহারা দেবে অ্যালারডাইস।
আমার ঘুম খুব গভীর, কেউ ঠেলে না ওঠালে অনেক সময় আমার ঘুম ভাঙে না। কিন্তু ওইদিন শেষরাতে, সাড়ে চারটে নাগাদ আমার ঘুম হঠাৎ ভেঙে গেল। সম্পূর্ণ সজাগ হয়ে আমি বার্থের ওপর উঠে বসলাম। উত্তেজনায় টান টান। একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম—যেন সশব্দে কিছু পড়ে গেছে আর তার পরেই একটা মানুষের আর্ত চিৎকার। হঠাৎ আবার চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কোনো কাল্পনিক আওয়াজ নয়, আমার ঘরের কাছাকাছি কোনো জায়গা থেকেই এসেছে। একলাফে বার্থ থেকে উঠে জামাটা গলিয়ে কেবিনের দিকে গেলাম।
প্রথমে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল না। ভোরের আবছা আলোয় দেখতে পেলাম লাল-কাপড়ে-ঢাকা টেবিলটা, ছ’টা রিভলভিং চেয়ার, আখরোট-কাঠের লকারগুলো; আর হ্যাঁ, সবশেষে ওই বিশাল ডোরাকাটা সিন্দুকটা।
ভাবছিলাম ডেক-এ গিয়ে অ্যালারডাইসকে জিগ্যেস করব ও কোনো আওয়াজ শুনতে পেয়েছে কি না। তখনই হঠাৎ চোখ পড়ল টেবিলের নীচে, দেখি কী যেন একটা বেরিয়ে আছে। একটা লোকের পা, আর পায়ে একপাটি লম্বা, জাহাজি জুতো। ঝুঁকে দেখলাম, লোকটা উপুড় হয়ে পড়ে আছে, হাত দুটো ছড়ানো, দেহটা যেন মোচড়ানো। বলা বাহুল্য, লোকটা আমাদের জাহাজের ফার্স্ট অফিসার আর্মস্ট্রং।
এক নজরেই বোঝা গেল ওর দেহ প্রাণহীন। হাঁপাতে হাঁপাতে এক দৌড়ে গেলাম ডেক-এ এবং কেবিনে ফিরে এলাম অ্যালারডাইসকে সঙ্গে নিয়ে।
দুজনে মিলে হতভাগ্য ফার্স্ট অফিসারের দেহটা টেবিলের তলা থেকে বের করলাম। ওর রক্তাক্ত মাথাটা দেখে আমরা দুজনে দৃষ্টি বিনিময় করলাম। ‘ঠিক সেই স্প্যানিশ নাবিকটার মতো’, বললাম আমি।
‘ঠিক তাই। ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন। ওই শয়তানি সিন্দুকটা! দেখুন, আর্মস্ট্রং-এর হাতটা দেখুন!’
আর্মস্ট্রং-এর ডান-হাতে ধরা কালকের সেই স্ক্রু-ড্রাইভারটা, অ্যালারডাইস বলল, ‘স্যর, ও সিন্দুকটা নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছিল। ও জানত, আপনি ঘুমোচ্ছেন আর আমি ডেক-এ। এই সুযোগে সিন্দুকটার তালা খোলার চেষ্টা করেছিল। তারপর একটা কিছু হয়েছিল আর ও চেঁচিয়ে উঠেছিল। আপনি সেই আওয়াজই শুনেছিলেন।’
ফিসফিস করে বললাম, ‘কী হয়েছিল, অ্যালারডাইস?’
ও আমার হাত ধরে ওর নিজের কেবিনে নিয়ে গেল। বলল, ‘এখানে নিশ্চিন্তে কথা বলা যেতে পারে। বলা তো যায় না, ওখানে আমাদের কথা কে শুনে ফেলবে! ক্যাপ্টেন বার্কলে, সিন্দুকটাতে কী আছে বলে আপনার মনে হয়?’
‘আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।’
‘স্যর, সমস্ত তথ্য আমার সিদ্ধান্তের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। সিন্দুকটার আকার দেখুন। খোদাই করা কারুকাজ ও ধাতুর নকশার আড়ালে অনেক ছিদ্র থাকতে পারে। ওটার ওজন দেখুন—বহন করতে লেগেছিল চারজন জোয়ান মানুষ। সবশেষে, যে দুজন মানুষ ওটা খোলার চেষ্টা করেছিল, দুজনেই নৃশংসভাবে খুন হয়। অর্থাৎ, স্যর, এর মানে একটাই…’
‘অর্থাৎ ওটার মধ্যে একটা মানুষ আছে?’
‘ঠিক তাই। আমার ধারণা সিন্দুকের ভেতর এমন একজন বেপরোয়া সশস্ত্র লোক লুকিয়ে আছে যে ধরা পড়ার আগে আমৃত্যু লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে।’
‘কিন্তু তার খাবারদাবার? জল-টল?’
‘স্যর, এত বড় সিন্দুকে কিছু রসদ তো রাখা যেতেই পারে। আর জাহাজের নাবিকদের সঙ্গে দোস্তি করে পানীয়ের একটা কিছু ব্যবস্থা করে থাকবে।’
একটু পরে অ্যালারডাইস আবার কথা বলল, ‘স্যর, আমার মনে হয় লোকটা বিপজ্জনক টাইপের এক গুন্ডা। দড়ি দিয়ে সিন্দুকটা বেঁধে সমুদ্রে নামিয়ে আমাদের জাহাজের সঙ্গে ওটা খানিকক্ষণ টেনে নিয়ে গেলে কেমন হয়? তারপর ওটা ধীরেসুস্থে খুলে দেখা যেতে পারে। কিংবা সিন্দুকটা জাহাজের ডেকে নিয়ে গিয়ে ওটা যদি অনেকটা ওপরে কিছুর সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে দিই, তাহলে লোকটা খাবার জল-টল পাবে না। অথবা, সিন্দুকটাকে ভালোভাবে যদি পালিশ করে ওটার ছিদ্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া যায়? তাহলে লোকটা আর শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে পারবে না।’
একটু রেগে গিয়ে বললাম, ‘কী যা-তা বকে যাচ্ছ? জাহাজে আমরা এতজন মানুষ, একটা লোকের ভয়ে কুঁকড়ে থাকব? ভেতরে সত্যিই যদি কেউ থাকে, তাকে আমি লড়াই করে বের করব।’ ঘরের থেকে আমার রিভলভারটা নিয়ে এলাম। বললাম, ‘ঠিক আছে অ্যালারডাইস। এবার তুমি তালাটা খোলো, আমি দিচ্ছি পাহারা।’
ঈশ্বরের দোহাই স্যর, ভালো করে ভেবে দেখুন কী করছেন! দুটো লোক ঠিক এই কাজ করতে গিয়ে মারা গেছে, কার্পেটের ওপর লেগে থাকা একজনের রক্ত এখনো শুকোয়নি।’
‘তারই তো প্রতিশোধ নিতে হবে!’
‘তাহলে স্যর, জাহাজের মিস্ত্রিকে অন্তত ডাকি। ওর চেহারা গাট্টাগোট্টা। তিনজন একসঙ্গে থাকলে একটু ভরসা হয়।’
অ্যালারডাইস মিস্ত্রিকে ডাকতে চলে গেল। আমি ভীতু স্বভাবের নই, তবু এমন ভাবে দাঁড়ালাম যাতে টেবিলটা থাকে আমার আর সিন্দুকের মাঝখানে। সকালের আলোয় সিন্দুকের লাল-সাদা ডোরাগুলো আর খোদাই করা কাজ সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কত যত্ন করেই না বানানো হয়েছিল এই সিন্দুকটা! একটু পরেই ওরা দুজনে চলে এল, মিস্ত্রির হাতে একটা হাতুড়ি।
অ্যালারডাইস স্ক্রু-ড্রাইভারটা হাতে নিয়ে চোয়াল শক্ত করে যেন নিজের সব সাহসটুকু একত্র করল। তারপর বলল, ‘আপনারা দুজনে লক্ষ রাখুন, আমি সিন্দুকটা খুলছি। লোকটা যদি উঠে দাঁড়ায়, তাহলে ওর মাথায় কিন্তু হাতুড়ির ঘা মারতে হবে আর লোকটা যদি হাত ওঠায়, ওকে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করবেন স্যর।’
সিন্দুকের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে অ্যালারডাইস স্ক্রু-ড্রাইভারটার ব্লেড সিন্দুকের ডালার নীচে ঢুকিয়ে চাপ দিতেই একটা শব্দ করে তালাটা খুলে গেল। ‘সাবধান’—বলে চেঁচিয়ে ও ডালাটা ওপরের দিকে তুলে দিল।
ডালাটা আস্তে আস্তে ওপরদিকে উঠতে লাগল। আমরা তিনজনই লাফ মেরে পেছিয়ে এলাম—আমার হাতে রিভলভার, মিস্ত্রির হাতে হাতুড়ি। যখন কিছুই হল না বা ঘটল না, আমরা এগিয়ে গিয়ে সিন্দুকের ভেতর উঁকি দিলাম। সিন্দুক খালি! কেউ নেই, কিছু নেই!
অবশ্য একদম খালি নয়, কারণ সিন্দুকের এক কোনায় ছিল একটা হলদে রঙের মোমবাতির বাতিদান, তার গায়ে কারুকাজ করা। বাতিদানটা সিন্দুকের মতোই পুরোনো। হলুদ রঙের জেল্লা আর কারুকাজ দেখে মনে হয় বাতিদানটা মূল্যবান। সিন্দুকের ভেতর ধুলোর পুরু আস্তরণ।
অ্যালারডাইস হতভম্ভ। বলল, ‘তাজ্জব ব্যাপার! তাহলে সিন্দুকটা এত ভারী কেন?’
‘সিন্দুকের চারপাশ আর ডালাটা দ্যাখো না। পাঁচ ইঞ্চি পুরু! আর ওই লোহার স্প্রিং-টা?’ আমি বললাম।
‘স্প্রিং-টা তো ডালাটাকে ধরে রাখার জন্যে, যাতে ওটা নেমে না আসে! কিন্তু স্যর, ভেতরে জার্মান ভাষায় কী যেন লেখা!’
আমি ওটা পড়ে বললাম, ‘১৬০৬ সালে অগসবুর্গের যোহান রথস্টাইন এই সিন্দুকটা তৈরি করেছিল।’
‘দারুণ বানিয়েছিল কিন্তু জিনিসটা! কিন্তু ক্যাপ্টেন, এত কিছু ঘটে গেল, কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না। তবে এই মোমবাতিদানটা সোনার মতো দেখতে। এত ঝামেলার পর যা হোক একটা কিছু তো পাওয়া যাবে।’
এর পরে যেটা ঘটল, সেটার একমাত্র ব্যাখ্যা হল, আমার মধ্যে কোনো ঐশ্বরিক শক্তির অকস্মাৎ উদ্ভব। হয়তো মধ্যযুগের কোনো কাহিনির কথা আমার হঠাৎ মনে পড়ে গিয়ে থাকবে, কিংবা তালাটার ওপর মরচের দাগ ছাড়াও কোনো লাল দাগ হয় তো আমার চোখে পড়েছিল, অ্যালারডাইস বাতিদানটা নেবে বলে যেই ঝুঁকল, আমি মুহূর্তের মধ্যে ওর কলার ধরে ওকে সোজা দাঁড় করিয়ে দিলাম। এমন বিদ্যুৎগতিতে আমি কাজটা করেছিলাম যে, আজও মনে হয় ব্যাপারটা অতিলৌকিক।
আমি বললাম, ‘কোনো শয়তানি কাণ্ড-কারখানা আছে। ঘরের কোণা থেকে ওই মাথা-ব্যাঁকানো ছড়িটা আমাকে দাও।’
সাধারণ ছড়ি, হাঁটার সময় ব্যবহার করা হয়, শুধু মাথার দিকটা বাঁকা। আমি ছড়িটা সিন্দুকের ভেতরে রাখা মোমবাতিদানের ওপর নিয়ে গিয়ে একটা টান দিলাম। বিদ্যুৎচমকের মতো এক সারি চকচকে ইস্পাতের ফলার মতো দাঁত সিন্দুকের ওপর থেকে বেরিয়ে এল, যেন একটা হিংস্র বন্যজন্তু আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কামড়াতে এল। তারপরেই সিন্দুকের ডালাটা সশব্দে আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে গেল। তাকে রাখা বাসনপত্র, গেলাস ইত্যাদি সেই অভিঘাতে ঝনঝন করে উঠল। ভীত ঘোড়ার মতো অ্যালারডাইস টেবিলের এক কোনায় বসে কাঁপতে লাগল।
একটু পরে ওর গলা থেকে আওয়াজ বেরোল, ‘ক্যাপ্টেন বার্কলে, আজ আপনি আমার প্রাণরক্ষা করেছেন!’
এই হচ্ছে তাহলে ডোরাকাটা সিন্দুকের রহস্য। ডন র্যামিরেজ ডি লেইরা, এই সিন্দুকে লুকিয়ে রাখত তার অসদুপায়ে অর্জিত ধনসম্পদ। চোর যত ধূর্তই হোক না কেন, সোনালি মোমবাতিদানটাকে কোনো মূল্যবান বস্তু ভেবে যদি ওটায় হাত দেয়, স্প্রিং দেওয়া ইস্পাতের ফলাগুলো তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে এসে তার মাথায় ঢুকে যাবে আর সেই মারণ-অভিঘাতে সে ছিটকে গিয়ে পড়বে দূরে। সঙ্গে সঙ্গে ডালাটাও যাবে বন্ধ হয়ে।
কী অসাধারণ কারিগরি নৈপুণ্য অগসবুর্গের মিস্ত্রির! ভাবছিলাম কত মানুষই না প্রাণ দিয়েছে এই সিন্দুক খুলতে গিয়ে।
সিন্দুকের ইতিহাস ভাবতে ভাবতেই আমার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। জাহাজের মিস্ত্রিকে বললাম, ‘তিনজন লোক এনে সবাই মিলে, ধরাধরি করে সিন্দুকটা ডেক-এ নিয়ে এসো।’
অ্যালারডাইস জিগ্যেস করল, ‘ওটা সমুদ্রে ফেলে দেবেন নাকি স্যর?’
‘হ্যাঁ, অ্যালারডাইস। আমি সাধারণত কুসংস্কারে বিশ্বাস করি না, কিন্তু এমন কিছু কিছু জিনিস আছে যা আমাদের মতো পোড়-খাওয়া নাবিকদের পক্ষেও সহ্য করা কঠিন।’
‘ক্যাপ্টেন বার্কলে, এখন মনে হয়েছে ওই অশুভ জিনিসটার প্রভাবেই দু-মাস্তুলওয়ালা জাহাজটার ওই দশা হয়েছিল, চলুন স্যর যা করার তাড়াতাড়ি করে ফেললেই ভালো।’
তিনজন লোকের জন্যে অপেক্ষা না করে মিস্ত্রি, অ্যালারডাইস আর আমি সিন্দুকটাকে ডেক-এ নিয়ে গিয়ে ঠেলাঠেলি করে জাহাজের পাঁচিলের বাইরে ফেলে দিলাম। সাদা ফেনা ফোয়ারার মতো উঠল আর সিন্দুকটা ডুবে গেল অথৈ জলে। সমুদ্রের তলদেশে কোথাও পড়ে রইল ডোরাকাটা সিন্দুক।
কোনোদিন যদি সমুদ্রের জল শুকিয়ে শুকনো ডাঙা বেরিয়ে পড়ে আর ওই সিন্দুকটাকে দেখতে পেয়ে কোনো মানুষ যদি ওর ভেতরে কী আছে তা জানার চেষ্টা করে, তাহলে সেই মানুষের জন্য শোক প্রকাশ করা ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই।
‘The Striped Chest’ গল্প অবলম্বনে
