পোলস্টার জাহাজের ক্যাপ্টেন – আর্থার কোনান ডয়েল
পোলস্টার জাহাজের ক্যাপ্টেন
ডাক্তারি ছাত্র জন. এম. রে-র ডায়েরি
সেপ্টেম্বর ১১
বরফের বিশাল প্রান্তরে আজও আমাদের জাহাজ নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে। জাহাজের উত্তরদিকের বরফের প্রান্তের আয়তনে ইংল্যান্ডের একটা কাউন্টির কম নয়। জাহাজের মেট জানাল যে জাহাজের দক্ষিণ দিকেও বরফ জমাট বাঁধছে। অর্থাৎ ওইদিক দিয়ে ফেরার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। আমাদের রসদও ফুরিয়ে আসছে। মে মাসের পর আজই প্রথম আকাশে একটা তারা দেখতে পেলাম। তার মানে বিরামহীন দিবালোকের মরশুম শেষ—শুরু হতে চলেছে অন্তহীন রাতের সময়।
এদিকে জাহাজের নাবিকদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধছে। তারা স্কটল্যান্ডে অর্থাৎ তাদের দেশে ফিরতে চায়। দেশে এখন হেরিং মাছ ধরার মরশুম এবং কাঁচা টাকা রোজগারের সুযোগ। নাবিকরা ঠিক করেছে ওরা দল বেঁধে ক্যাপ্টেনকে ওদের অভিযোগ জানাবে। অবশ্য ক্যাপ্টেন যা রাগী ও রগচটা গোছের মানুষ, উনি হয়তো ওদের অভিযোগকে পাত্তাই দেবেন না। তবে হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন আমার কথা ঠান্ডা মাথায় শোনেন। দেখি ওদের অভিযোগ তাঁর কাছে পেশ করতে পারি কি না।
বলা বাহুল্য, আমাদের জাহাজ ‘পোলস্টার’ এখন উত্তর মেরুতে। সবথেকে নিকটবর্তী জনপদ অন্তত ন’শো মাইল দূরে গ্রিনল্যান্ডে। আমাদের মতো তিমি শিকারের কোনো জাহাজ বছরের এই সময় পর্যন্ত এত উত্তরে থাকে না।
রাত ন’টা
ক্যাপ্টেন ক্রেইগিকে জানালাম নাবিকদের অভিযোগ। থমথমে মুখ। কিছুক্ষণ পায়চারি করলেন। ভাবলাম এই বুঝি আমার ওপর রাগারাগি করবেন। কিন্তু না! আমার বাহুতে হাত রেখে নরম গলায় বললেন, ‘দ্যাখো ডাক্তার, আমি কি চাই না তোমরা সব ঘরের ছেলে এবার ঘরে ফেরো?’ তারপরেই গলা চড়িয়ে বললেন, ‘আমি নিশ্চিত যে উত্তরদিকে তিমি আছে। বিশ্বাস হচ্ছে না আমার কথা? বাইশ মিনিটে বাইশটা মাছ দেখেছি। বরফের ভয়ে আমি বিপুল ঐশ্বর্যের হাতছানিকে উপেক্ষা করব? উত্তুরে হাওয়া বইলেই বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে আমরা এগিয়ে যাব। আর দক্ষিণ দিকে যদি বরফ জমাট বেঁধে যায়, তাহলে এটুকুই বলতে পারি যে নাবিকদের মাইনে দেওয়া হচ্ছে ঝুঁকি নেওয়ার জন্যেই। আর আমি? আমার মন এই জগতে নয়, অন্য জগতে বাঁধা পড়ে আছে। তোমাকে না এনে গতবারের ডাক্তারকে আনলেই ভালো হত বলে মনে হচ্ছে। তুমি যেন বলেছিলে তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে?’
‘হ্যাঁ,’ বলে ঘড়ির চেনের সঙ্গে বাঁধা লকেটের ঢাকনাটা খুলে ক্যাপ্টেনকে আমার ভাবী স্ত্রী ফ্লোরার ছবিটা দেখালাম।
হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে রাগে কাঁপতে কাঁপতে চেঁচিয়ে উঠলেন ক্যাপ্টেন, ‘তোমার সুখের মূল্য আমার কাছে এক কানাকড়িও নয়। তোমার ভাবী স্ত্রীর ছবি দেখে আমি কী করব?’ এই বলেই কেবিন থেকে বেরিয়ে উনি ওপরের ডেক-এ চলে গেলেন। বুঝতেই পারলাম না আমার কী অপরাধ। এমন দুর্ব্যবহার ওঁর কাছ থেকে এই প্রথম পেলাম। কেবিনে বসে শুনতে পাচ্ছি ওর উত্তেজিত ভাবে পা ফেলার আওয়াজ।
ক্যাপ্টেন নিকোলাস ক্রেইগি বিচিত্র প্রকৃতির মানুষ। ক্ষণে ক্ষণে ওঁর মেজাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষটির সম্বন্ধে আমার ধারণারও বার বার বদল হয়েছে। লম্বা চওড়ার চেহারা ক্যাপ্টেনের, মুখটা তামাটে হলেও সুন্দর। মাঝে মাঝেই হাত-পা এমনভাবে নাড়তে থাকেন যে মনে হয় স্নায়বিক কোনো রোগের শিকার তিনি অথবা শরীরের অসীম শক্তি কোনো কারণে অবরুদ্ধ হয়ে আছে। চোয়াল ও মুখের ভাব পুরুষালি। চোখ দুটো নজরকাড়া—বাদামি রঙ আর অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল। সেই উজ্জ্বলতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুগপৎ একটা বেপরোয়া ভাব এবং ভয়ের আভাস। চোখে এই ভীতিপূর্ণ দৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আচরণ হয়ে ওঠে উগ্র প্রকৃতির এবং তখন তিনি কেবিনে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন যতক্ষণ না মেজাজ ঠিক হয়। ওঁর ঘুম পাতলা। রাতে আমার কেবিন থেকে শুনতে পাই, উনি ঘুমের মধ্যে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কী সব বলতে থাকেন।
আবার এই মানুষই অন্য সময়ে ফুর্তিবাজ। পড়াশোনা করেছেন অনেক। অত্যন্ত সাহসী নাবিক। গত মাসেই একদিন ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুযোর্গের মধ্যে হাসিখুশি মেজাজে তিনি আমাদের জাহাজটাকে সামলেছিলেন। ওঁর বয়স ত্রিশের কোঠায়, যদিও চুলে ও গোঁফে হালকা পাক ধরেছে।
ক্যাপ্টেন আমাকে একদিন বলেছিলেন যে মৃত্যু নিয়ে ভাবতে তাঁর ভালো লাগে। জানি না জীবনে কী এমন আঘাত পেয়েছেন যে জীবনের থেকে মৃত্যু তাঁর কাছে বেশি শ্রেয় বলে মনে হয়।
পদশব্দ শুনে বোঝা গেলে ক্যাপ্টেন ঘরে ঢুকেছেন। আমারও মোমবাতি পুড়ে প্রায় নিঃশেষ। শুয়ে পড়লাম।
সেপ্টেম্বর ১২
আমাদের জাহাজ ওইখানেই দাঁড়িয়ে। তবে আজকের দিনটা শান্ত ও পরিষ্কার। ব্রেকফাস্টের সময় ক্যাপ্টেন কালকের ব্যবহারের জন্যে আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন।
জাহাজের চিফ ইঞ্জিনিয়র আবার একটু জ্যোতিষ ট্যোতিষ চর্চা করেন। কথায় কথায় উনি আমাকে বললেন যে-ক্যাপ্টেনের আলোকদৃষ্টি আছে—উনি ভবিষ্যৎ দেখতে পান।
নাবিকদের কুসংস্কার সামলানো একটা বড় কাজ। গাট্টাগোট্টা জোয়ান নাবিকরা রাতে অনেক সময় ডিউটি দিতে ভয় পায়। জাহাজের পিছন থেকে ওরা নাকি শুনতে পেয়েছে কারো সকরুণ আর্তি বা কান্না। আমার হিসেবে ওটা হয়তো কোনো সামুদ্রিক পাখির আওয়াজ। কিন্তু নাবিকরা মানলে তো! অগত্যা ওদের প্রায়ই স্নায়ু ঠান্ডা করার ওষুধ দিতাম। ক্যাপ্টেন কিন্তু এই আওয়াজ শোনার ব্যাপারটায় বেশ গুরুত্ব দিলেন। ভেবেছিলাম উনি হয়তো কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন না।
আমাদের জাহাজের সেকেন্ড মেট মিঃ ম্যালসন নাকি কাল রাতে ভূত দেখতে পেয়েছেন। ওঁর দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের জাহাজটা ভূতগ্রস্ত। যাই হোক, একটু ওষুধ-টষুধ দিয়ে ওঁকে ধাতস্থ করে শুনলাম ওঁর অভিজ্ঞতা।
কাল রাতে উনি জাহাজের টঙে চড়ে ডিউটি দিচ্ছিলেন। গভীর রাত। এক ফালি চাঁদ মাঝে মাঝেই মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। দূরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এমন সময় জাহাজের কর্মী তিমি শিকারি ম্যাকলিওড এসে ওঁকে বলল যে, জাহাজের ডানপাশে সামনের দিক থেকে একটা অদ্ভুত আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। দুজনে ওইখানে গিয়ে কান পেতে শুনলেন—যেন কোনো শিশু বা তরুণীর বেদনার্ত কান্নার শব্দ। একটু পরে মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ উঁকি দিল আর ওঁরা দেখতে পেলেন সাদা মতো একটা অবয়ব যেন বরফের প্রান্তর পার হচ্ছে। একটু পরেই সেই অবয়ব আর চোখে পড়ল না। কিন্তু খানিকক্ষণ পরে জাহাজের বাঁদিকে সেটা দেখা গেল। ওটা মেরু ভালুক ভেবে দুজনেই বন্দুক হাতে জাহাজ থেকে নেমে পড়লেন বরফের প্রান্তরে। গিয়ে দাঁড়ালেন বরফের একটা ঢিপির ওপর। সেই আকৃতি বা অবয়ব আবার চোখে পড়ল। ওটা অবশ্যই ভালুক নয়। দীর্ঘ, ঋজু, সাদা কিছু—পুরুষ বা নারী যদি না হয়, তাহলে ভয়ানক কোনো বস্তু। তৎক্ষণাৎ ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে এসে ওঁরা জাহাজে উঠে পড়েন। ম্যানসন ঠিক করেছেন, সন্ধের পর আর কখনো জাহাজ থেকে নামবেন না।
আমার ধারণা ম্যানসন দেখেছেন পেছনের দু-পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানো কোনো মেরু ভালুককে। কিন্তু নাবিকরা এই ঘটনার কথা শুনে তিমি শিকারি কর্মীদের সঙ্গে একজোট হয়ে অসন্তোষ প্রকাশের আন্দোলনে নেমে পড়ল। ওদের সকলের বিশ্বাস, ‘পোলস্টার’ ভূতে পাওয়া জাহাজ।
এই ঘটনাটুকু উপেক্ষা করলে আর সব কিছু কিন্তু স্বস্তিদায়ক। দক্ষিণ প্রান্তের বরফ যেন একটু নরম হয়েছে। জলও একটু কম ঠান্ডা। মাছ-টাছ চোখে পড়ছে। বিশেষত চিংড়ি। অর্থাৎ তিমি পাওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা। দূরে একটা তিমিকে নাসারন্ধ্র দিয়ে জলের ফোয়ারা ছুঁড়তেও দেখা গেল।
সেপ্টেম্বর ১৩
জাহাজের চিফ মেট মিঃ মিলনের কাছ থেকে ক্যাপ্টেন সম্বন্ধে কিছু তথ্য পাওয়া গেল। নাবিক ও জাহাজের মালিক উভয়ের কাছেই ক্যাপ্টেন এক রহস্যময় মানুষ। যাত্রা শেষ হলে তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান, আবার তাঁর দর্শন পাওয়া যায় পরের মরশুমে। তাঁর শহর স্কটল্যান্ডের ডান্ডিতে তাঁর কোনো বন্ধুবান্ধব নেই। তাঁর জীবনের গোড়ার কথা কেউ জানে না। যে-কোনো উপায়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে ভালোবাসেন। তাই হয়তো নিয়েছেন সবচেয়ে বিপজ্জনক পেশা—তিমি শিকারের জাহাজের ক্যাপ্টেনের কাজ। তাঁর ঘাড়ে একটা বড় ক্ষতের দাগ, গলায় স্কার্ফ বেঁধে ঢেকে রাখেন। ওই ক্ষতের কারণ সম্বন্ধে কেউ কিছু জানে না।
পূর্ব দিক থেকে হালকা হাওয়া বইছে। চতুর্দিকে ধু-ধু করছে ধবধবে সাদা বরফের প্রান্তর। দক্ষিণ দিকে এক ফালি অংশে নীল জল দেখা যাচ্ছে—আমাদের ফেরার একমাত্র পথ। কিন্তু ওই জলের ফালিটুকু দ্রুত জমাট বাঁধছে। জাহাজের রসদে টান পড়েছে—আলু শেষ, বিস্কুটও প্রায় তথৈবচ। তবে ক্যাপ্টেনের কোনো হেলদোল নেই। জাহাজের টঙে চড়ে চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে দিগন্ত জরিপ করছেন সর্বক্ষণ। কারোর সঙ্গে মেলামেশা করছেন না।
সন্ধে সাড়ে সাতটা
আমি এখন নিঃসন্দেহ যে, আমাদের ক্যাপ্টেন ছিটগ্রস্ত নন, একেবারে বদ্ধ উন্মাদ। ঘটনাটা বলি।
ক্যাপ্টেন ওপরের ডেকে চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে নিরীক্ষণরত। আমি নীচের ডেকে দাঁড়িয়ে অস্তগামী সূর্যের সোনালি আভা মুগ্ধ হয়ে দেখছি। হঠাৎ চমকে উঠলাম—আমার পাশেই কেউ যেন দাঁড়িয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় কী বলছে। তাকিয়ে দেখি ক্যাপ্টেন—নীচে নেমে এসেছেন। বরফের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন—মুখে ভয়, বিস্ময় ও আনন্দের অভিব্যক্তি। হাত-পাগুলো বেঁকে চুরে যাচ্ছে মৃগীরোগীর মতো।
আমার কবজি ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বরফের প্রান্তরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘দ্যাখো! ওইদিকে দ্যাখো। ওই দুটো ঢিপির মাঝখানে! ওই তো মেয়েটি! নিশ্চয় দেখতে পাচ্ছ ওকে! যাঃ, চলে গেল, আমাকে দেখে পালিয়ে গেল।’
বেদনাবিদীর্ণ কণ্ঠস্বর, মুখ ফ্যাকাশে। মনে হয় এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন। ধরাধরি করে ওঁকে একটা টেবিলে নিয়ে গেলাম। একটু ব্র্যান্ডি খেয়ে উনি চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। আমাকে বললেন, কেবিনের দরজাটা বন্ধ করে ভেতরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দিতে। তারপর আমাকে জিগ্যেস করলেন, ‘ওকে দেখলে ডাক্তার?’
‘না তো, কিছুই দেখিনি।’
‘ওহো! তোমার চোখে তো বাইনোকুলার ছিল না—থাকলেই দেখতে পেতে ওকে। আমি কিন্তু ওকে দেখেছি। দেখেছি ওর ভালোবাসায় ভরা দুটি চোখ। আচ্ছা ডাক্তার, তোমার কি মনে হয় আমি পাগল হয়ে গেছি?’
‘আমার মনে হয় আপনার অন্তরে এমন কিছু আছে যা আপনাকে উত্তেজিত করছে এবং আপনার ক্ষতি করছে।’
‘ঠিক বলেছ ডাক্তার। আমার মনে অনেক কিছু আছে। কিন্তু জাহাজ চালানোর নাড়ীনক্ষত্র সব আমার জানা। আদালতে আমাকে পাগল প্রমাণ করতে পারবে তুমি?’ নিজেকে পাগল প্রতিপন্ন না করার জন্যে ক্যাপ্টেনের এই বিচিত্র যুক্তি শুনে আমি অবাক হলাম।
আমি বললাম, ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফিরে গিয়ে শান্ত নিস্তরঙ্গ ভাবে কিছুদিন কাটানোর চেষ্টা করুন।’
‘আচ্ছা, দুঃস্বপ্ন দেখা ছাড়া পাগলামির আর কী কী লক্ষণ আছে?’
‘এই ধরুণ, মাথাব্যথা, কান ঝিঁঝি করা, চোখের সামনে আলোর ঝলকানি, অদৃশ্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে দেখেছেন বলে ভেবে নেওয়া—’
‘কিন্তু ও ছিল, আমি ওকে দেখেছি,’ নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে ক্যাপ্টেন চলে গেলেন।
ক্যাপ্টেনের চরিত্রের রহস্যময়তা বেড়েই চলেছে। এর কারণ কী কোনো অপরাধবোধ? আমার অবশ্য তা মনে হয় না। হয়তো তিনি কোনো দুর্ভাগ্যের শিকার।
আজ রাতে আবার হাওয়া দক্ষিণমুখী। তার প্রভাবে দক্ষিণদিকের বরফ আরও জমাট বেঁধে গিয়ে আমাদের ফেরার রাস্তা বন্ধ করে দেবে। এখন ঈশ্বরই আমাদের ত্রাণ করতে পারেন।
সেপ্টেম্বর ১৪
আজ রবিবার। বিশ্রামের দিন। আমাদের আশঙ্কাই সত্যি প্রমাণিত হল। জলের যে সংকীর্ণ ধারাটা দক্ষিণদিকে দেখা যাচ্ছিল সেটা মিলিয়ে গেছে। এখন চারদিকে শুধুই নিরেট তুষার আর মৃত্যুর দেশের ভয়াবহ নিস্তব্ধতা। একটা গাঙচিলও দেখা যাচ্ছে না। একটা মেরুপ্রদেশের শিয়াল দেখতে পেলাম। যদিও এই শিয়াল সাধারণত জাহাজ বা মানুষের কাছে চলে আসে। এই শিয়ালটি কিন্তু দূর থেকে আমাদের দেখেই পালিয়ে গেল। নাবিকরা বলল, এটা দুর্লক্ষণ। জাহাজটা অভিশপ্ত।
ক্যাপ্টেন দুপুরের দিকে আধঘণ্টার জন্যে কেবিন থেকে বেরিয়েছিলেন। তাকিয়ে ছিলেন গতকালের জায়গাটার দিকে। অবশ্য কিছু দেখতে পেয়েছেন বলে মনে হল না। সূর্যাস্তের রক্তিমাভায় বরফের প্রান্তরকে মনে হচ্ছে রক্তের লেক। অপূর্ব সুন্দর, কিন্তু দেখলে কেমন গা ছমছম করে। হাওয়াটা উত্তরদিক থেকে আসছে মনে হয়। চব্বিশ ঘণ্টা এমন চললে আমাদের ফেরার রাস্তা হয়তো আবার খুলে যাবে।
সেপ্টেম্বর ১৫
আজ আমার ভাবী স্ত্রী ফ্লোরার জন্মদিন। ওর কথা খুব মনে পড়ছে।
তাপমাত্রা মাইনাস সেভেন। হাওয়া কম, যেটুকু বইছে তা আমাদের অনুকূলে নয়। ক্যাপ্টেনের মুড বেশ ভালো। আমার কানে কানে বলে গেলেন, ‘ডাক্তার, যা দেখেছিলাম তা ঠিকই—দৃষ্টিবিভ্রম নয়।’
আগেই বলেছি, জাহাজের রসদের অবস্থা ভালো নয়। এই বিষয়ে বক্তব্য রাখতে চান ক্যাপ্টেন। জাহাজের সবাই একত্র হল। ক্যাপ্টেন একেই তো সুঠাম সুদর্শন মানুষ, তার ওপরে তাঁর ভাবভঙ্গি, চলাফেরা দেখলেই মনে হয় তিনি জাত নেতা।
ক্যাপ্টেন বললেন, ‘বন্ধুরা! তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ আমি তোমাদের কী বিপদের মধ্যেই না ফেলেছি! কিন্তু ভুলে যেও না অতীতে অন্য যে-কোনো জাহাজের তুলনায় আমাদের এই ”পোলস্টার” জাহাজ কত বেশি মাছ, তেল ইত্যাদি আহরণ করেছে। এবং তার থেকে লাভের অংশ আমরা সকলে সমানভাবে ভাগ করে নিয়েছি। তাই আজ তোমাদের পরিবার সচ্ছল। এবার আমার হিসেবে ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু চিন্তার কোনো কারণ নেই। জাহাজে করে ফিরতে না পারলেও আমরা সবাই এই বরফের প্রান্তর হেঁটে পেরিয়ে ডাঙায় পৌঁছব। রাস্তার রসদ হিসেবে সিলমাছের অভাব হবে না। তবে আমার মনে হয়, জাহাজে করেই তিন সপ্তাহের মধ্যেই আমরা স্কটল্যান্ডের তীরে পৌঁছে যাব। ততদিন অবধি আমাদের সকলকে অর্ধেক র্যাশনে চালাতে হবে। ক’টা দিনের তো ব্যাপার—একটু কম খেয়ে থাকতে হবে।’
এই ছোট্ট বক্তব্যটুকুতে কিন্তু নাবিকদের মন গলে গেল। সবাই খুশি হয়ে ক্যাপ্টেনকে জানাল থ্রি চিয়ার্স।
সেপ্টেম্বর ১৬
বরফের প্রান্তরে যেন একটু ফাঁক দেখা যাচ্ছে। জাহাজের ইঞ্জিন চালু করে রাখা হয়েছে, সুযোগ পেলেই জাহাজ রওনা দেবে। আধপেটা খেয়েও নাবিকরা মোটামুটি খোশমেজাজে আছে। ক্যাপ্টেনও আছেন দারুণ মুডে। উনি কোনোদিন কাউকে নিজের কেবিনে ঢুকতে দেন না, অথচ আজ আমাকে বললেন ওঁর কেবিনে গিয়ে ঘড়ি দেখে সময়টা জানাতে। কেবিনে মামুলি ক’টা আসবাবপত্র আছে। দেয়ালে বেশ কয়েকটা প্রতিকৃতি টাঙানো—ফটোর স্টাইলে আঁকা। সেগুলির মধ্যে জলরঙে আঁকা এক যুবতীর মুখের ছবি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। অসাধারণ সেই মুখের অভিব্যক্তি—চারিত্রিক দৃঢ়তা ও নারীসুলভ কোমলতার যুগপৎ প্রকাশ। ছবির নীচে পরিচয়লিপি থেকে বোঝা গেল যে মেয়েটি উনিশ বছর বয়সে মারা যায়। ক্যাপ্টেনের বিছানার পায়ের দিকের দেয়ালে ছবিটা টাঙানো—অর্থাৎ এটি তাঁর চোখের সামনেই রাখা। ব্যক্তিগত আর সব জিনিসের মধ্যে একটা হুঁকো ছাড়া সবকিছুই সাদামাটা। মেয়েটির ছবি আমার মনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলল।
রাত এগারোটা কুড়ি
অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়ে ক্যাপ্টেন একটু আগেই শুতে গেলেন। আড্ডার বিষয়বস্তু মূলত অধ্যাত্মবাদ—আত্মার প্রকৃতি ও স্বরূপ, গ্রিক দার্শনিকদের এ বিষয়ে ভাবনাচিন্তা ইত্যাদি।
উত্তরদিক থেকে হাওয়া চলছে এখন। অন্ধকার রাত। আশা করি আগামীকাল আমরা এই তুষার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাব।
সেপ্টেম্বর ১৭
আবার ভূত দেখার ঘটনা। সকলে এমনভাবে বলছে যেন তারা নিজের চোখে দেখেছে। মোদ্দা কথা, সারারাত ধরে জাহাজের চারপাশে কী যেন ঘুরে বেড়াচ্ছিল। দুজন নাবিক এবং অফিসার মিঃ মিলনে প্রত্যক্ষদর্শী। ব্রেকফাস্টের সময় মিঃ মিলনকে বললাম, ‘আপনি তো লেখাপড়া জানা মানুষ। এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন?’
উনি উত্তর দিলেন, ‘ডাক্তার, দিনের বেলা এসব কথা বলা সহজ। কিন্তু নিশুত রাতে জাহাজের ওপরের ডেক-এ একা দাঁড়িয়ে যা দেখেছি তা রক্ত ঠান্ডা করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। একটা সাদা রঙের ভীতিকর আকৃতি জাহাজের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে—কখনো এদিকে, কখনো ওদিকে। সেই আকৃতির থেকে বেরিয়ে আসছে মা-হারা মেষশাবকের মতো আর্ত চিৎকার।’
এইসব ভূতুড়ে ঘটনার কথা ক্যাপ্টেনের কানে না গেলেই ভালো হত। কিন্তু দুভার্গ্যবশত নাবিকদের এই বিষয়ে কথাবার্তা তিনি শুনে ফেলেছিলেন। যা আশঙ্কা করেছিলাম তা-ই হল। ক্যাপ্টেনের অন্তর্নিহিত পাগলামি একটু বাড়াবাড়ি রকমে প্রকাশিত হল। খাঁচায় বন্দি বাঘের মতো জাহাজের ডেক-এ পায়চারি করছেন আর তাকাচ্ছেন তুষার প্রান্তরের দিকে। মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে বলছেন, ‘আর একটু অপেক্ষা করো, আর একটু!’
বরফ বেশ দ্রুতবেগেই ভাঙছে। ভাগ্য প্রসন্ন হলে হয়তো আমরা কালই যাত্রা শুরু করতে পারব।
দুপুর বারোটা
আমার হাতের লেখা কেঁপে যাচ্ছে। ব্র্যান্ডি খেয়েও এখনো স্বাভাবিক হয়ে উঠিনি। ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলাম। এখন আর বাকি সবার অভিজ্ঞতাকে আষাঢ়ে গল্প বলে উড়িয়ে দিতে পারছি না।
কী হয়েছিল বলি। কাল রাতে ডিনারের পর ডেক-এ গিয়েছিলাম ধূমপান করতে। অন্ধকার রাত। বরফের প্রান্তরে অবর্ণনীয় নৈঃশব্দ্য। জাহাজের রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ ঠিক নীচেই বরফের মধ্যে যেন একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল—তীব্র ও তীক্ষ্ন একটা চিৎকার, যা ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে পরিণত হল একটা দীর্ঘ আর্ত ক্রন্দনে। নিস্তব্ধতা খান খান করে ভেঙে দেওয়া সেই ভয়াবহ আওয়াজ এখনো যেন শুনতে পাচ্ছি। সেই আর্ত চিৎকারে মিশে আছে হৃদয়বেদনা এবং উন্মুখ আশা। হয়তো একটু বন্য উল্লাসও। এত কাছের থেকে আওয়াজটা আসছে অথচ বুঝতে পারছি না তার উৎসমুখ। কাঁপতে কাঁপতে নীচে নেমে আসছি, এমন সময় দেখা হয়ে গেল মিঃ মিলনের সঙ্গে। উনি বললেন, ‘কী ডাক্তার, আওয়াজটা শুনলেন? এবারেও কী বলবেন ওটা কুসংস্কার?’ কী আর করি? ক্ষমা চাইলাম ওঁর কাছে।
সেপ্টেম্বর ১৮
রাতটা কাটল অস্বস্তি আর অনিদ্রায়। ক্যাপ্টেনের অবস্থাও ভালো নয়—মনে হয় ঘুমোতে পারেননি, মুখ-চোখ বসে গিয়েছে, চোখ দুটো লাল। আমি অবশ্য ক্যাপ্টেনকে আমার অভিজ্ঞতার কথা বলিনি।
প্রত্যাশামতোই সকালে নোঙর তুলে জাহাজ চলতে শুরু করল। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রায় বারো মাইল যাওয়ার পরে বাধা এল। সরু জলপথটুকুতে একটা বিশাল বরফের চাঙড়। ওটা গলতে অন্তত চব্বিশ ঘণ্টা লাগবে। আপাতত আর এগোনোর উপায় নেই। বড় বড় সিলমাছ আশেপাশে সাঁতার কাটছিল। ওরই একটা, প্রায় এগারো ফুট লম্বা, শিকার করা হল।
সকলেরই অভিমত, আমরা এখন বিপন্মুক্ত এবং খুব তাড়াতাড়ি সাগরে গিয়ে পড়ব। কিন্তু ক্যাপ্টেনের ধারণা, আমাদের বিপদ এখনো শেষ হয়নি। বললেন, ‘এইসব অঞ্চল ভয়ানক বিপদসংকুল। দেখেছি, বরফের ওপর নেমে হাঁটতে হাঁটতে মানুষ হঠাৎ একটা গহ্বরের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। সবুজ জলে একটু বুদবুদ ছাড়া তার আর কোনো চিহ্নই পাওয়া গেল না। এইসব জায়গায় এমন পরিস্থিতিতে পড়লে মনে হয়, একটা উইল করে গেলে মন্দ হত না।’
‘তা অবশ্য ঠিকই বলেছেন,’ সায় দিলাম আমি।
‘অবশ্য আমার বিশেষ কিছুই নেই। তবুও আমার কিছু হয়ে গেলে তুমিই আমার জিনিসপত্রের বিলিব্যবস্থা কোরো। কেবিনে যা কিছু আছে, তা বিক্রি করে টাকাটা নাবিকদের মধ্যে ভাগ করে দিও। আর ডাক্তার, আমার ঘড়িটা তুমি নিও। এটুকু করে দেবে তো আমার জন্যে?’
‘অবশ্যই করব,’ বললাম, কিন্তু ক্যাপ্টেনের ভাবগতিক বোঝা ভার। বিপদ যখন শেষ হয়ে এসেছে তখন উনি বলছেন উইলের কথা। তাহলে কী উনি আত্মহত্যা করবেন? ঠিক করলাম ক্যাপ্টেনের ওপর কড়া নজর রাখব। মিঃ মিলনে অবশ্য বললেন যে ছিটগ্রস্থ ক্যাপ্টেনের কথার ওপর অত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। আমি কিন্তু অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেনের আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারলাম না।
শেষ পর্যন্ত চরম বিপর্যয়টা ঘটেই গেল। কী লিখব জানি না। ক্যাপ্টেন চলে গেছেন। আশঙ্কা হচ্ছে তাঁকে আর জীবিত দেখতে পাব কি না। আজ ১৯ সেন্টেম্বর। এখন সকাল সাতটা। কাল সারারাত জাহাজের একদল নাবিককে নিয়ে তুষার প্রান্তর তন্নতন্ন করে খুঁজেছি ক্যাপ্টেনের বা তাঁর কোনো চিহ্নের সন্ধানে। কিন্তু না, কোনো চিহ্নই পাওয়া যায়নি।
এবার যা লিখছি তা কিন্তু অনুমান বা গুজবের ভিত্তিতে লেখা নয়। একজন সুস্থমস্তিষ্ক এবং শিক্ষিত মানুষ হিসেবে আমি দায়িত্ব নিয়ে শুধু চোখে দেখা ঘটনাটুকু লিপিবদ্ধ করছি।
কাল সন্ধেবেলার কথাবার্তার পর ক্যাপ্টেন এমনিতে ঠিকই ছিলেন। তবে ওঁকে একটু নার্ভাস লাগছিল, কিছুটা অস্থিরও। পনেরো মিনিটের মধ্যে কেবিন থেকে ডেক-এ এসেছিলেন সাতবার। হাত-পা নড়ছিল একটু বেশি। অকারণে হই-চই করে ও জোরে জোরে হেসে বোঝাতে চাইছিলেন যে, সবকিছু ঠিক আছে।
ডিনার সেরে ক্যাপ্টেন জাহাজের পিছনদিকের ডেক-এ গেলেন। আমি ওঁর সঙ্গ ছাড়লাম না। অন্ধকার স্তব্ধ রাত। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা মেঘের ফাঁক দিয়ে চাঁদ মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে। ক্যাপ্টেন বোধহয় আমার উপস্থিতির কথা ভুলে গিয়েছিলেন। জাহাজের রেলিং-এর ওপর ঝুঁকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন সেই বিস্তীর্ণ তুষার মরুর দিকে—তার অনেকটা ছায়ায় আবৃত, কিছুটা চাঁদের আলোয় দৃশ্যমান। ঘন ঘন ঘড়ি দেখছিলেন ক্যাপ্টেন। বিড়বিড় করে একটা ছোট বাক্যও বললেন। তার মধ্যে ‘রেডি’ কথাটা শুনতে পেলাম। মনে হল যেন তিনি কারো সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সাক্ষাৎ করতে এসেছেন। কার সঙ্গে দেখা করবেন ক্যাপ্টেন? একটা ভয়ের শিহরণ অনুভব করলাম।
হঠাৎ ক্যাপ্টেনের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল, উনি কিছু একটা দেখতে পেয়েছেন। পা টিপে টিপে ওঁর পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। জাহাজের দিকে যেন কুয়াশার একটা কুণ্ডলী এগিয়ে আসছে। কোনো আকৃতি নেই— একটা অস্পষ্ট আবছা কিছু—চাঁদের আলোয় মাঝে মাঝে একটু স্পষ্ট হচ্ছে।
‘আসছি, আমি আসছি’ বলে চেঁচিয়ে উঠলেন ক্যাপ্টেন। কণ্ঠস্বরে অসীম মমতা ও ভালোবাসা। যেন কোনো প্রিয়জনকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে যাচ্ছেন।
পরের মুহূর্তেই যা ঘটে গেল তা প্রতিরোধ করার শক্তি আমার ছিল না। এক লাফে জাহাজের রেলিং-এর ওপর উঠে গিয়ে আর এক লাফে ক্যাপ্টেন পৌঁছে গেলেন বরফের প্রান্তরের ওপর সেই অস্পষ্ট ছায়ার অবয়বের কাছে। দু-হাত বাড়িয়ে, কোনো প্রিয়জনকে যেন প্রীতি সম্ভাষণ করতে করতে, দৌড়ে চলে গেলেন অন্ধকারের মধ্যে। চিত্রার্পিতের মতো আমি দাঁড়িয়ে দেখলাম অপস্রিয়মান ক্যাপ্টেনের শরীর এবং শুনলাম ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাওয়া ওঁর কণ্ঠস্বর। হঠাৎ মেঘের আড়াল থেকে আসা চাঁদের আলোয় সেই তুষারপ্রান্তর ক্ষণিকের জন্যে উদ্ভাসিত হল। দেখলাম, অতি দ্রুতবেগে দৌড়ে তিনি চলে গেছেন বহুদূরে। এর পর আর ক্যাপ্টেনকে দেখতে পাইনি—সম্ভবত পাবও না।
তৎক্ষণাৎ কয়েকজন নাবিককে নিয়ে ক্যাপ্টেনের সন্ধানে বেরোলাম। কিন্তু তাঁর কোনো হদিশ পাওয়া গেল না। কয়েক ঘণ্টা পরে আবার তাঁকে খোঁজার চেষ্টা করব। এই ডায়েরি লিখছি আর মনে হচ্ছে যেন এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখছি।
সকাল সাড়ে সাতটা
আমাদের দ্বিতীয় অভিযানও ব্যর্থ হল। কুড়ি মাইল হেঁটেও সেই তুষারস্তরের শেষ সীমা দেখতে পেলাম না। বরফ এত শক্ত যে তার ওপর পায়ের ছাপ দেখতে পাওয়া অসম্ভব। নাবিকদের দৃঢ় বিশ্বাস, ক্যাপ্টেন আর বেঁচে নেই। সুতরাং এই খোঁজাখুঁজিতে আর সময় নষ্ট না করে আমাদের আজই রওনা হওয়া উচিত। আমি আর মিঃ মিলনে নাবিকদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে আগামীকাল রাতটুকু পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রস্তাব মঞ্জুর করলাম। ঠিক করলাম, বিশ্রাম নিয়ে একবার শেষ চেষ্টা করা যাবে।
সেপ্টেম্বর ২০, সন্ধেবেলা
আজ সকালে দু’দলে বিভক্ত হয়ে আমরা শেষ অভিযান শুরু করলাম—আমার দল দক্ষিণ দিকে ও মিঃ মিলনের দল উত্তর দিকে রওনা হল। দক্ষিণ দিকে দশ-বারো মাইল গিয়েও কিছু চোখে পড়ল না। একটা উড়ন্ত বাজপাখি ছাড়া আর কিছু দেখা গেল না। নাবিকদের কোনোক্রমে রাজি করালাম তুষার প্রান্তরের শেষ পর্যন্ত যেতে।
একশো গজের মতো এগোতেই ম্যাকডোনাল্ড চেঁচিয়ে বলল যে ও কিছু দেখতে পেয়েছে। ওর পিছন পিছন আমরাও দৌড়তে শুরু করলাম। সাদা বরফের ওপর কালো মতো কিছু পড়ে আছে। দূরত্ব কমতেই একটা মানুষের অবয়ব দেখতে পেলাম। কাছে গিয়ে দেখা গেল ইনিই সেই ব্যক্তি যাঁর সন্ধানে আমরা দুদিন ধরে চেষ্টা চালিয়েছি। ক্যাপ্টেন পড়ে আছেন উপুড় হয়ে এবং তাঁর কালো ইউনিফর্মের ওপর তুষারের কুচি পড়ে ঝিকমিক করছে। আমরা যেতেই সেই তুষারের টুকরোগুলো যেন কুণ্ডলীকৃত হয়ে ওপরে উঠে গেল এবং সমুদ্রের দিকে চলে গেল। আমার চোখে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক না লাগলেও দলের লোকজন বলল যে ওই বরফের টুকরোর জমাট আকৃতি ঠিক একটা নারীশরীরের মতো। ক্যাপ্টেনের শরীর থেকে উঠে দূরে উধাও হয়ে গেল। ক্যাপ্টেনের মুখে লেগে থাকা উজ্জ্বল হাসিটুকু দেখে বোঝা গেল যে তাঁর মৃত্যু বেদনাদায়ক হয়নি। যে প্রিয়জন তাঁকে ডেকে অন্য জগতে নিয়ে গেল, তারই দিকে তাঁর হাত দুটো বাড়ানো।
আজ বিকেলেই ক্যাপ্টেনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হল। দেহটা জাহাজের পতাকায় মুড়ে এবং পায়ে বত্রিশ পাউন্ড ওজনের একটা কামানের গোলা বেঁধে দেওয়া হল। আমিই প্রার্থনা ইত্যাদি সম্পন্ন করালাম। পোড়-খাওয়া, রূঢ় প্রকৃতির নাবিকরা শিশুর মতো কাঁদছিল—তারা আজ ক্যাপ্টেনের মায়া-মমতা, বদান্যতার কথা ভেবে চোখের জল সামলাতে পারছিল না। জাহাজের ঝাঁঝরিটা খুলে ক্যাপ্টেনের দেহটা নামিয়ে দেওয়া হল নীচে যেখানে জল ছিল। জল উৎক্ষিপ্ত হওয়ার একটা শব্দ শুনতে পেলাম। ঝুঁকে দেখলাম দেহটা আস্তে আস্তে নেমে যাচ্ছে জলের তলায় অনন্ত আঁধারে। ওইখানে চিরশয়ানে থাকবেন ক্যাপ্টেন, তাঁর রহস্য, তাঁর গোপন কথা আর তাঁর দুঃখকষ্ট নিয়ে। হয়তো ভবিষ্যতে কোনোদিন সমুদ্র ফিরিয়ে দেবে মৃতদের, হয়তো তখন ক্যাপ্টেন ফিরে আসবেন মুখে হাসি ও প্রসারিত দুই বাহু নিয়ে।
আমার ডায়েরি লেখায় এখন ইতি টানছি। বাড়ি ফেরার রাস্তা এখন সহজ ও পরিষ্কার। এই তুষারপ্রান্তরের স্মৃতি এবং উপরোক্ত ঘটনাবলী খুব শিগগির অতীতের অংশ হয়ে যাবে। কেবিনে বসে লিখছি এখন। মনে হচ্ছে যেন শুনতে পাচ্ছি ওপরে মৃত মানুষটার পদশব্দ।
আমার শেষ কাজটা বাকি। ক্যাপ্টেনের কেবিনে ঢুকে তাঁর জিনিসপত্রের একটা তালিকা তৈরি করতে গেলাম—জাহাজের নথিতে থাকবে সেটা। ঘরের ভেতরে সবকিছুই আগের মতো পড়ে আছে। কেবল ক্যাপ্টেনের খাটের পায়ের দিকের দেওয়ালে যে ছবিটা ছিল সেটা ফ্রেম থেকে সম্ভবত ছুরি দিয়ে কেটে নেওয়া হয়েছে এবং ছবিটা ঘরে নেই। ঘটনা পরম্পরায় এই বিচিত্র ও অস্বাভাবিক ব্যাপারটার সম্ভাব্য যোগসূত্রের উল্লেখ করে ‘পোলস্টার’ জাহাজের যাত্রার কাহিনি এখানেই শেষ করছি।
ডাক্তারি ছাত্র তথা ডায়েরির লেখকের পিতা ডাঃ রে-র সংযোজন
আমার পুত্রের লেখা ‘পোলস্টার’ জাহাজের কাহিনি আপাতদৃষ্টিতে অলৌকিক মনে হলেও আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে ও সত্যি ঘটনাই লিখেছে। তবুও আমি প্রথমে ওকে ডায়েরিটা ছাপতে দেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিইনি।
যাই হোক, সম্প্রতি আমি স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় একটা ডাক্তারি কনফারেন্স-এ গিয়েছিলাম। ওখানে আমার কলেজের এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাকে আমার পুত্রের উপরোক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলতেই সে জানাল যে ক্যাপ্টেনk ক্রেইগিকে সে চেনে। ক্যাপ্টেনের সম্বন্ধে আমার বন্ধু যা বলল তার সঙ্গে আমার পুত্রের লেখা বিবরণের পুরোপুরি মিল আছে। আমার বন্ধু আরও জানাল যে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে ওই অঞ্চলের একটি অপূর্ব সুন্দরী মেয়ের বিয়ের কথা পাকা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ক্যাপ্টেন যখন সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিল, তখন বিয়ের আগেই মেয়েটির কোনো বিভীষিকাময় ঘটনায় মৃত্যু হয়।
