ব্রিগেডিয়ার জেরার ও আঁধারপুরী – আর্থার কোনান ডয়েল
ব্রিগেডিয়ার জেরার ও আঁধারপুরী
সরাইখানায় আড্ডা দিতে দিতে বললেন ব্রিগেডিয়ার জেরারঃ এই যে তোমরা আমাকে একটু মান্যিগণ্যি করো, সেটা খুব ভালো লাগে। কারণ আমাকে সম্মান করা মানে দেশকে সম্মান করা আর তোমাদের নিজেদেরকেও। এখন আমার বয়স হয়েছে, গোঁফজোড়া পাকা।
কিন্তু ভুলো না, ফ্রান্সের ইতিহাসের আমি একটা অধ্যায়। আমি ছিলাম তখনকার যুবাসৈনিকদের একজন, যারা দাড়ি কামাতে ক্ষুর ব্যবহার শেখার আগেই তলোয়ার চালানোর কৌশল শিখে ফেলত। বিশ বছরে একশোর বেশি যুদ্ধে আমাদের পিঠের ব্যাগের রং শত্রুপক্ষ কখনও দেখতে পায়নি।
দু-একটা যুদ্ধে হয়তো হেরেছি, কিন্তু পরাজয়ের কারণ বেয়নেট নয়, থার্মোমিটার। ইউরোপের সব বড় শহরেই ছিল ফরাসি সেনাদলের আস্তাবল।
এখনও চেয়ারে বসে ঝিমোনোর সময় দেখি আমাদের সময়ের বীর যোদ্ধাদের সারি—সবুজ পোশাকের পদাতিক, বর্শাধারী, অশ্বারোহী, গোলন্দাজ। আর শুনি রণদামামার গম্ভীর আওয়াজ। দেখি, ধুলো আর ধোঁয়ার মধ্যে টুপির সারি, রোদে পোড়া তামাটে রঙের মুখগুলো টুপির ওপর লাগানো পালকের দোলুনি আর ইস্পাতের ঝকমকানি। আর দেখি তাঁকে, সম্রাট নেপোলিয়ানকে—ঠোঁটে মৃদু হাসির আভাস, গোলগাল দুটো কাঁধ আর চোখে সুদূরের ইঙ্গিত। তৎক্ষণাৎ ভেঙে যায় আমার দিবাস্বপ্ন, ছায়ার জগৎ থেকে ফিরি বর্তমানে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই আমি ব্রিগেডিয়ার হয়ে যাই। পরে জেনারেল হয়ে যাওয়াও ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু আমার সৈনিক জীবনের প্রথম পর্বের কথা বলতেই বেশি ভালো লাগে—শৌর্য, বীর্য আর বিপদে ভরা সেই পর্বের।
আসলে জেনারেল বা ব্রিগেডিয়ারদের প্রশাসনিক কাজই বেশি। সাহস আর বীরত্বের কাজগুলোর ভার পড়ে লেফটেন্যান্ট, ক্যাপ্টেনদের ওপর, এক চুমুকে পানীয় শেষ করে, বান্ধবীর থেকে বিদায় নিয়ে, জ্যাকেটটা গলিয়ে দু-পায়ে জুতোর গোড়ালিতে ক্লিক করে এক লহমায় তৈরি হতাম আমরা তখন। লক্ষ্য একটাই—বীরের মতো লড়তে হবে। তাই তোমাদের যে সব গল্প বলব, সে সব আমার জীবনের এই পর্বের।
আজ রাতে তোমাদের বলব এক আঁধারপুরীর গল্প। যাতে আমি আর সাব-লেফটেন্যান্ট মিলে টক্কর দিয়েছিলাম ব্যারন স্ট্রাউবেনথল-এর সঙ্গে।
১৮০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। আমরা তখন ড্যানজিগ জয় করেছি। কিন্তু প্রচণ্ড শীত আর যুদ্ধে আমাদের এত ঘোড়া মারা পড়েছিল যে, আমাদের অশ্বারোহী বাহিনীর পদাতিক হয়ে যাওয়ার দশা।
মেজার লজাঁদ্রে আর আমার ওপর তাই ভার পড়ল প্রাশিয়া থেকে চারশো ঘোড়া পোল্যান্ডে নিয়ে আসার। আমি ঘোড়া ভীষণ ভালোবাসি। তাই এই দায়িত্ব পেয়ে খুব খুশি হলাম। কিন্তু রাস্তাঘাট অতি খারাপ, তার ওপর এক-হাঁটু বরফে ঢাকা। তাই আমি আর মেজর আমাদের সঙ্গী কুড়িজন জখম জওয়ানকে নিয়ে ধীরে ধীরে চলতে লাগলাম।
রিসেনবার্গ-এ মেজর লজাঁদ্রে আমার হাতে এক টুকরো কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন,—জেনারেল সাহেবের হুকুম—তুমি এক্ষুনি রোসেল-এর দিকে রওনা হও আর ওখানে রেজিমেন্টের হেডকোয়ার্টারে গিয়ে রিপোর্ট করো। মনে মনে বললাম,—বয়েই গেল! আমার মতো অফিসারের বস হওয়ার যোগ্যতা তোমার নেই। খুশিও হলাম এই ভেবে যে জেনারেল সাহেব বুঝতে পেরেছেন আমি ছাড়া আমাদের রেজিমেন্ট কানা। অবশ্য চলে যেতে মন একটু খারাপ হচ্ছিল না তা নয়। সরাইখানার মালিকের সুন্দরী মেয়েটির সঙ্গে আলাপ সব জমে উঠছিল।
যাকগে, কী আর করা যাবে? আমরা তো দাবার ছকের বোড়ে। আমার বিশাল কালো ঘোড়ার পিঠে একা একা রওনা হলাম।
রাস্তায় যে সব পোলিশ বা ইহুদি লোকজন ছিল তাদের নিরুত্তাপ জীবনে তারা এমন দৃশ্য কখনও দেখেনি। কুয়াশা-ঢাকা সেই সকালে আমার ঘোড়ার ঢেউ-খেলানো পিঠের ওপর শিশিরের ঝিকমিকানি, তার খুরের আওয়াজ, লাগামের শিকলের ঝনঝন—লোকগুলো বিস্মিত, বাকরুদ্ধ।
আমি এতিয়েন জেরার—পঁচিশ বছর বয়স। তুখোড় অশ্বারোহী, তলোয়ার চালনায় সুদক্ষ, পরনে আকাশি-নীল আর গাঢ় লাল মেশানো টেনটথ রেজিমেন্টের পোশাক—আমাকে মুগ্ধ নয়নে দেখছিল সব কুটিরের জানলা থেকে নানা বয়সের মহিলারা।
নির্মেঘ আকাশ। সূর্যের তাপ কম। চতুর্দিকে বরফ-ঢাকা প্রান্তর। আমার আর ঘোড়ার নিশ্বাস বেরোচ্ছে বাষ্পের মতো, রেকার থেকে টুপটাপ ঝরে পড়ছে জমাট-বাঁধা তুষার। চতুর্দিকে রিক্ততার চিহ্ন। গরু-ভেড়া একটাও চোখে পড়ছে না। নির্জন বাড়িগুলো থেকে কোনও ধোঁয়া বেরোচ্ছে না। মাত্র মাস তিনেক আগেই আমাদের সৈন্যবাহিনী এই অঞ্চল দিয়ে গেছে। তার ফল এই জনমানবহীনতা।
দুপুর নাগাদ যে গ্রামে পৌঁছোলাম তার কাছেই নাকি সম্রাট তাঁবু ফেলে শীতের ছুটি কাটাচ্ছেন। সুতরাং ওই অঞ্চল গাড়ি, ঘোড়া, সৈনিক, লোকজনে ভর্তি। এই ভিড় ঠেলে গন্তব্যস্থলে পৌঁছোতে গেলে তো আমার অনেক দেরি হয়ে যাবে। আশেপাশের সমতল প্রান্তরের ওপর দিয়েও ঘোড়া ছোটানোর উপায় নেই—সে সব অন্তত পাঁচ ফুট বরফে ঢাকা।
হঠাৎ চোখে পড়ল পাইনবনের মধ্য দিয়ে একটা রাস্তা যেটা আমার গন্তব্য অর্থাৎ উত্তরদিকে গেছে। চৌরাস্তার মোড়ে কয়েকজন সৈনিকের সঙ্গে তাদের অফিসার দাঁড়িয়ে। ওরা সবাই ঘোড়ায় চড়ার তোড়জোড় করছে। অফিসারটি ছোকরা, ছিপছিপে চেহারা, গায়ের রং একটু ফ্যাকাশে।
ও আমাকে চিনতে পারল। আমাকে অবশ্য রেজিমেন্টের সকলেই চিনত—সবসুদ্ধু মোট ছ’জনকে তলোয়ারের লড়াইতে হারিয়েছি তখন পর্যন্ত। অফিসারটি দিল ওর পরিচয়—সাব-লেফটেন্যান্ট দুরোক।
জিগ্যেস করলাম,—সবে ঢুকেছ?
—গত সপ্তাহে, স্যর।
ওকে দেখে আমার মনে পড়ে গেল সেনাদলে আমার প্রথম যোগ দেওয়ার কথা। সেই একই দৃশ্য—ছোকরা অফিসার আর পোড়-খাওয়া জওয়ানরা। ওকে বিশেষ পাত্তা দিচ্ছিল না জওয়ানরা। অবশ্য আমি কড়াভাবে ওদের দিকে একটু তাকাতেই জওয়ানরা ঢিলেঢালা ভাব ছেড়ে ঘোড়ার পিঠে টানটান হয়ে বসল।
—আচ্ছা, তোমরা কি এই উত্তরমুখী রাস্তাটা দিয়েই যাবে? আমি জিগ্যেস করলাম।
—হ্যাঁ স্যর। তবে আমার অর্ডার হল আরেনসডর্ফ অবধি পাহারা দেওয়ার।
—তোমার আপত্তি না থাকলে তোমাদের সঙ্গে ওই পর্যন্ত আমি যেতে চাই।
এই অঞ্চলে কোসাক দস্যুদের উপদ্রব। তাই রাস্তা ফাঁকা। আমি আর দুরোক প্রথমে, পেছনে ছ’জন অশ্বারোহী সেনা।
দুরোক ছেলেটি ভালো। ওর মায়ের কথা, বোনের কথা বলছিল। তবে মাথা ভর্তি পুঁথিগত বিদ্যা—আলেকজান্ডার সম্বন্ধে যতটা জানে, ঘোড়া সম্বন্ধে ততটা নয়।
খানিকক্ষণ পরে একটা গ্রাম এল। দুরোক ঘোড়া থামিয়ে পোস্ট অফিসে গিয়ে পোস্ট মাস্টারকে জিগ্যেস করল,—আচ্ছা, ব্যারন স্ট্রাউবেনথল কি আশেপাশেই কোথাও থাকেন?
পোস্টমাস্টার মাথা নাড়লেন—জানি না। আমি ব্যাপারটাকে বিশেষ গুরুত্ব দিলাম না। কিন্তু এর পরের গ্রামের পোস্ট অফিসে গিয়েও দুরোক একই প্রশ্ন করল। এখানেও উত্তর নেতিবাচক।
এবার আর আমি কৌতূহল চাপতে না পেরে জানতে চাইলাম—কে এই ব্যারন স্ট্রাউবেনথল?
দুরোকের ছেলেমানুষের মতো মুখে হঠাৎ এল কাঠিন্য। বলল,—ব্যারনকে একটা জরুরি খবর দিতে হবে। তাই ওঁকে খুঁজছি।
আমি আর প্রশ্ন করে ওকে বিব্রত করলাম না। কিন্তু দেখলাম রাস্তায় কোনও লোককে দেখতে পেলেই দুরোক ব্যারনের ঠিকানা জানতে চাইছে।
সূর্য যখন প্রায় ডুবু-ডুবু, তখন একটা টিলা পেরিয়ে দেখলাম আমাদের ডানদিকে একটা ছোট গ্রাম। বাঁ-দিকে পাইন বনের মধ্য থেকে উঁকি মারছে একটা সুউচ্চ কালো রঙের দুর্গের মতো প্রাসাদ। গ্রামের নাম অ্যারেনসডর্ফ।
—তাহলে রাতটা আজ এখানেই কাটানো যাক। বলল দুরোক। এবার ও একজন কৃষক-শ্রেণির লোককে জিগ্যেস করল,—ব্যারন স্ট্রাউবেনথল কোথায় থাকেন?
পাইন বনের থেকে উঁকি দেওয়া দুর্গের মতো প্রাসাদটাকে দেখিয়ে কৃষকটি বলল,—ওই তো আঁধারপুরী। ব্যারনই ওটার মালিক।
শিকার দেখে শিকারির মুখ থেকে যেমন আওয়াজ বেরোয়, দুরোক সেরকম একটা আওয়াজ করল। হঠাৎ যেন ওর মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল, চোখে জ্বলন্ত দৃষ্টি, ঠোঁটে এক অজানা প্রতিজ্ঞার দৃঢ়তা। ওর মুখচোখ ভাবভঙ্গি দেখে কৃষকটি ঘাবড়ে গেল।
ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝুঁকে জিগ্যেস করল দুরোক,—তোমরা ওই প্রাসাদকে আঁধারপুরী বলো কেন?
—এই নামেই তো বাড়িটাকে সবাই জানে। সবাই বলে, ওখানে কী সব গোলমেলে কাণ্ডকারখানা হয়। পোল্যান্ডের সব থেকে বেশি পাজি, বদমাইশ একটা লোক ওখানে গত চোদ্দো বছর বাস করছে। গন্ডগোল তো কিছু
একটা আছেই।
—লোকটা কি পোলিশ? তোমাদের পোল্যান্ড দেশের মান্যগণ্য কেউ?
—না, পোল্যান্ডের এমন ধরনের মানুষ জন্মায় না।
—তবে কি উনি ফরাসি? প্রশ্ন দুরোকের।
—লোকে তো বলে উনি ফ্রান্সের মানুষ।
—ওঁর মাথার চুলের রং কি লাল?
—একদম। ঠিক যেন খেঁকশিয়ালের গায়ের রং?
—বটে! বটে! একেই তো খুঁজছিলাম আমি এতদিন। উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বলল দুরোক,—কে বলে পৃথিবীতে ন্যায়-বিচার নেই? ঈশ্বরই আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আসুন, মঁসিয়ে জেরার, আমার লোকজনদের একটা থাকার ব্যবস্থা করে আমার এই ব্যক্তিগত কাজটা মিটিয়ে ফেলি।
গ্রামের একটা সরাইখানায় দুরোকের লোকজনের থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল। আমার পরিকল্পনা ছিল কয়েক ঘণ্টায় আরও খানিকটা রাস্তা পেরিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার। কিন্তু দুরোক আমার জানু স্পর্শ করে বলল,—আমাকে ছেড়ে যাবেন না স্যর।
—তুমি যদি আমাকে সবকিছু খুলে বলো তবেই তো বলতে পারব আমি তোমার কাছে আসতে পারব কি না।
—অবশ্যই পারবেন। আপনার সম্বন্ধে যা শুনেছি, মঁসিয়ে জেরার, আপনিই হয়তো একমাত্র মানুষ যাঁকে আজ রাতে আমার দরকার। আপনি তো আজ গন্তব্যস্থলে কোনওভাবেই পৌঁছোতে পারবেন না। আমার ও আমাদের পরিবারের সম্মানরক্ষায় সাহায্য করতে আজ রাতটুকু আমার সঙ্গে থাকুন। অবশ্য আপনার শারীরিক বিপদের একটু আশঙ্কা থাকতে পারে।
ছেলেটি বেশ কায়দা করে আমাকে চ্যালেঞ্জটা ছুড়ে দিল। তাছাড়া ওকে দেখে আমার প্রথম যৌবনের কথাও মনে পড়ছিল। ওর প্রতি মনে একটু সহানুভূতিও যে না আসছিল তা নয়। দেখা যাক কী করা যায়। ওর কাহিনিটা তো শুনি।
সরাইখানার বসার ঘরে দুরোক যা বলল তা এইঃ
ফরাসি বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই কারারুদ্ধ অভিজাত ব্যক্তিদের অনেককেই বিচারের প্রহসন করে দোষী সাব্যস্ত করা হত। তারপর তাদের তুলে দেওয়া হত মারমুখী জনতার হাতে। জনতা তৎক্ষণাৎ তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিঁড়ে ফেলে বীভৎসভাবে হত্যা করত।
আমার বাবা ছিলেন তখনকার ফ্রান্সের বিখ্যাত ব্যাঙ্কার—ক্রিস্তফ দুরোক। সারা জীবন তিনি দরিদ্র মানুষদের জন্য অনেক কল্যাণকর কাজ করেছিলেন। কারারুদ্ধ অবস্থায় তাঁর যখন বিচার হল, তখন তিনজনের মধ্যে দুজন বিচারকই তাঁকে মুক্তি দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু তৃতীয় বিচারকের সামনে তাঁরা কিছু করতে পারলেন না।
এই বিচারকটি বিখ্যাত ছিল তার বিশাল চেহারা আর নির্মম স্বভাবের জন্য। সে নিজের হাতে বাবাকে টেনে এনে ভারী বুটের লাথি মারতে মারতে রাস্তায় বের করে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বাইরের উন্মত্ত জনতা বাবার হাত-পা ছিঁড়ে তাকে হত্যা করে।
এটা নির্ভেজাল খুন ছাড়া কিছুই নয়, কেন না সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের মতে বাবা ছিলেন নির্দোষ। বীভৎস, অমানুষিক এই ঘটনার কথা ভেবে আজও আমি শিউরে উঠি।
দেশে যখন আবার শান্তি ফিরে এল, তখন আমার দাদা ওই তৃতীয় বিচারকটির ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে শুরু করল। জানা গেল তার নাম ক্যারাবাঁ। এক অভিজাত, ধনী বিদেশিনী—নাম ব্যারনেস স্ট্রাউবেনথল—তখন ফ্রান্সে কারারুদ্ধ ছিলেন। ক্যারাবাঁ সেই মহিলার মুক্তির ব্যবস্থা করেছিল এই শর্তে যে তিনি ক্যারাবাঁকে বিবাহ করে তাকে তাঁর সম্পত্তির মালিকানা দিয়ে দেবেন। দেশে অরাজকতা শেষ হতেই ক্যারাবাঁ সেই মহিলাকে বিবাহ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। তারপর তার আর কোনও খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে, ততদিনে আমাদের পরিবার প্রায় কপর্দকশূন্য। ওই পাষণ্ডকে খুঁজে বের করার আর্থিক সামর্থ্য আমাদের ছিল না। কিন্তু প্রতিহিংসার আগুন পরিবারের সকলের অন্তরে ধিকিধিকি জ্বলছিল।
আমার দাদা সেনাদলে যোগ দিল। দক্ষিণ ইউরোপের যে যে দেশে সে সেনাদলের সঙ্গে গিয়েছিল, সর্বত্র ক্যারাবাঁর খোঁজ করেছিল। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। গত অক্টোবরে দাদা যুদ্ধে মারা যায়।
এরপর আমি যোগ দিই সেনাদলে। আমার সৌভাগ্য, পনেরো দিনের মধ্যেই এই নরপশুর খোঁজ পেলাম আর পেলাম আপনার মতো মানুষকে যাঁর দুঃসাহসিকতা ও পরোপকারিতা সম্বন্ধে সেনাদলের সকলেই জানে।
দুরোকের কথা মন দিয়ে শুনে একটু নীরব থাকার পরে আমি বললাম, কীভাবে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি?
—আপনি আমার সঙ্গে থাকুন, তাহলেই হবে। আমি জানি আমি কী করব।
অ্যাডভেঞ্চারের লোভ সামলানো কঠিন। তার ওপর ছিল ছেলেটির প্রতি সহানুভূতি। বলে ফেললাম,—ঠিক আছে। কাল সকালে কিন্তু আমাকে যেতেই হবে। কিন্তু আজ রাতটা আমি তোমার জিম্মায়।
প্রাসাদটা মাইলখানেক দূরে। তাই ঘোড়া না নিয়ে দুজনে হেঁটে যাওয়াই মনস্থ করলাম। দুজনেরই সঙ্গে তলোয়ার। আমি পিস্তলটাও নিয়ে নিলাম।
কালো ঘন পাইনগাছের জঙ্গল ঘিরে রাস্তাটা। গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে তারকাখচিত আকাশের টুকরো।
একটু পরেই আঁধারপুরীর সামনে এসে গেলাম। বিশাল বাড়িটা সৌন্দর্যহীন প্রাচীনতায় মোড়া। একটা জানলা থেকে আলো দেখা যাচ্ছে—এ ছাড়া বাড়িটা অন্ধকার ও নিঃশব্দ। যেন অশুভ, অমঙ্গলজনক একটা পরিবেশ। একটা গা ছমছমে অনুভূতি হল। দরজায় তলোয়ারের বাঁট দিয়ে আঘাত করতে থাকলাম।
অবশেষে একটা লোক দরজা খুলল। লোকটা রোগা, গালে দাড়ি, মুখটা যেন বাজপাখির মতো। ওর এক হাতে লণ্ঠন, অন্য হাতে শিকল দিয়ে বাঁধা একটা বিশাল কুকুর—হাউন্ড। লোকটা বলল,—ব্যারন স্ট্রাউবেনথল এত রাতে কারোর সঙ্গে দেখা করবেন না।
—তুমি ব্যারনকে বলো আমি বহুদূর থেকে আসছি এবং তাঁর সঙ্গে দেখা না করে আমি যাব না। দুরোকের চাঁচাছোলা কথা।
—আসলে এ সময়ে উনি একটু মদ্যপান করেন কিনা। সকালে সাক্ষাৎ করলে দেখবেন ব্যারন কেমন খুশমেজাজে আছেন।
কথা বলতে বলতে লোকটা দরজাটা একটু বেশি ফাঁক করে ফেলেছিল। দেখলাম, হলঘরে তিনজন গুন্ডাপ্রকৃতির লোক দাঁড়িয়ে। তাদের একজনের হাতে শিকলে বাঁধা আর একটা হাউন্ড। দুরোক এসব উপেক্ষা করে বলল,—অনেক কথা হয়ে গেছে। তোমার মালিকের সঙ্গেই আমার কাজ।
হলঘরের লোক তিনটে এগিয়ে এল দুরোকের দিকে। একে তো আমাদের দুজনের সামরিক পোশাক, তার ওপর সেই মুহূর্তে দুরোকের এমনই ব্যক্তিত্বপূর্ণ ভাবভঙ্গি যে মনে হচ্ছিল, ও-ই যেন এই বাড়ির মালিক। ওদের একজনের কাঁধে হালকা চাপড় মেরে দুরোক বলল,—ব্যারনের কাছে আমায় নিয়ে চলো।
লোকটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে পোলিশ ভাষায় বিড়বিড় করে কী যেন বলল। তখন দাড়িওয়ালা লোকটা সদরদরজা বন্ধ করে রহস্যময় হাসির সঙ্গে বলল,—ঠিক আছে, আপনার কথাই থাকল। ব্যারনের সঙ্গে দেখা করুন। হয়তো সাক্ষাৎ শেষ হওয়ার আগে মনে হবে যে আমার কথা শুনলেই ভালো করতেন।
বিভিন্ন জানোয়ারের চামড়া হলঘরের কার্পেটের কাজ করছে। দেওয়ালেও জানোয়ারদের মাথা স্টাফ করে ঝোলানো। হলঘর পেরিয়ে ঢুকলাম একটা ছোট ঘরে। সর্বত্রই অযত্নের ছাপ। ঘরের উলটো দিকে পর্দা-ঝোলানো একটা দরজা। ঘরের মাঝখানে একটা চৌকো টেবিল, তাতে ব্যবহৃত কয়েকটা প্লেট, উচ্ছিষ্ট খাবার পড়ে আছে। কয়েকটা খালি বোতল। টেবিলের একপ্রান্তে বসে আছে এক ব্যক্তি—বিশাল চেহারা, মাথাটা ঠিক সিংহের মাথার মতো। মাথায় কমলা রঙের চুলের রাশি। ঘোড়ার কেশরের মতো মোটা, জটপাকানো দাড়ি—দাড়ির রং-ও চুলের মতো।
আমি মানুষের পাশবিক মুখ অনেক দেখেছি, কিন্তু এই লোকটার মুখের মতো মুখ কখনও দেখিনি—নীল রঙের কুতকুতে ছোট দুটি চোখ, হিংস্রতায় ভরা, ঝোলা গাল আর মোটা ঠোঁট। লোকটার মাথাটা যেন একটু দুলছে, চোখে নেশাগ্রস্তের চাহনি। তবে ও বুঝতে পারল যে আমরা মিলিটারির লোক।
একটু হেঁচকি তুলে বলল,—বলুন, প্যারিসের কী খবর? পোল্যান্ডকে তো মুক্ত করতে এসেছেন আপনারা, এদিকে নিজেরা তো হয়ে পড়েছেন তিনকোণা টুপিওয়ালা ওই বেঁটে লোকটার (নেপোলিয়ন) ক্রীতদাস।
দুরোক কোনও কথা না বলে লোকটার পাশে গিয়ে জিগ্যেস করল,—জঁ ক্যারাবাঁ?
চমকে উঠল লোকটা। চোখে নেশার আচ্ছন্নতার ছাপ একটু কমল মনে হয়।
—জঁ ক্যারাবাঁ? আবার বলল দুরোক।
চেয়ারের হাতলটা চেপে ধরে সোজা হয়ে বসে লোকটা বলল,—বারবার এই নামটা উচ্চারণ করছ কেন? যদি ধরেই নিই যে ওই নামটা এককালে আমার ছিল, তাতে তোমার কী? তুমি তো তখন শিশু ছিলে।
—আমার নাম দুরোক।
—তুমি কি…
—হ্যাঁ, আমার বাবাকেই তুমি খুন করেছিলে।
ব্যারন হাসল। শুকনো হাসি। চোখে ভীতি। বলল,—শোনো, পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে কী লাভ? ওটা ছিল একধরনের যুদ্ধ—সাধারণ মানুষ বনাম অভিজাত শ্রেণি। তোমার বাবা তাতে মারা যান। আমারও তো কত সঙ্গীসাথী মারা গেছিল। এসো, সেসব কথা ভুলে আমরা পরস্পরকে জানার চেষ্টা করি। কাঁপতে থাকা লালচে রঙের হাতটা বাড়িয়ে দিল ব্যারন।
দুরোক বলল,—থাক! খুব হয়েছে। আমার এই তলোয়ারটা যদি তোমার বুকে এখনই বিঁধিয়ে দিই তাহলে কোনও অন্যায় হবে না। কিন্তু তুমি ফ্রান্সের লোক, তুমিও এককালে ফরাসি পতাকার নীচে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছিলে। তাই ওঠো! নিজেকে বাঁচাও।
—তোমার বয়স কম, একটুতেই রক্ত গরম—ব্যারনের কথা শেষ হল না। দুরোকের একটা চড় পড়ল ওর গালে। ঠোঁটের পাশে রক্তের দাগ, দুই চোখে আগুন ঝরে পড়ছে ব্যারনের।
—এই চড়ের পরিণাম তোমার মৃত্যু।
—বেশ তো! বলল দুরোক।
—দাঁড়াও, আমার তলোয়ারটা এক্ষুনি নিয়ে আসছি। ব্যারন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে পর্দা-ঢাকা অন্য দরজাটার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একটি সুন্দরী যুবতী। আমরা বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ। মেয়েটি বারবার দুরোকের হাত চুম্বন করতে করতে বলল,—আমি সব কিছু দেখেছি। আপনি উপযুক্ত কাজই করেছেন। আপনার এই হাত ওই মিথ্যাবাদী বদমাইশটাকে চড় মেরেছে। হয়তো আপনার এই হাতই আমার মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে। আমি ওই লোকটার সৎমেয়ে। আমি ওকে ভয় পাই, ওকে ঘৃণা করি! পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে!—মেয়েটি চকিতে আবার পর্দার আড়ালে চলে গেল।
তলোয়ার হাতে ঘরে ঢুকল ব্যারন, পিছনে দাড়িওয়ালা সেই লোকটা। ব্যারন বলল,—এই দ্বন্দ্বযুদ্ধে সহায়ক হিসেবে এই লোকটাই আমার সঙ্গে থাকবে। কিন্তু লড়াই করার পক্ষে এই ঘরটা ছোট। এসো আমার সঙ্গে—একটা বড় ঘরে যাওয়া যাক।
হলঘরের পরেই একটা বেশ বড় ঘর—দেওয়ালের গায়ে লাগানো অনেক পিপে আর প্যাকিং বাক্স ছাড়া ঘরটা খালি। ঘরের এক কোণে তাকের ওপর একটা বাতি জ্বলছে।
দুরোক খোলা তলোয়ার হাতে একলাফে প্রথমেই ঘরের ভিতরে ঢুকল। ব্যারন দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে আমাকে ঘরে ঢুকতে বলল। আমি ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে চাবি লাগানোর শব্দ পেলাম। আমরা দুজনেই বন্দি।
লোকটার সীমাহীন নীচতায় আমরা এক মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গেছিলাম। তারপর ধিক্কার দিলাম নিজেদেরকে চূড়ান্ত বোকামির জন্য। কীভাবে আমরা ওই পাষণ্ডটাকে বিশ্বাস করলাম? ঘুষি মেরে, বুট-পরা পায়ের লাথি মেরে দরজা ভাঙার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পুরোনো দিনের কাঠের বিশাল দরজা—লোহার পাত দিয়ে বাঁধানো। কিছুই হল না। চেঁচালাম খানিকক্ষণ— আমাদের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল।
মাথাটা প্রথমে ঠান্ডা হল আমারই—এতকাল সেনাদলে থাকার অভ্যেস তো। দুরোককে বললাম,—চলো, ঘরের ভিতরটা ভালো করে পরীক্ষা করি।
একটা মাত্র জানলা—এত ছোট যে আমাদের মাথাও গলবে না। তার ওপরে সেটা ঘরের সিলিং-এর কাছে। একটা পিপের ওপর দাঁড়িয়ে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দুরোক বলল,—খালি পাইন বন আর বরফে ঢাকা একটা রাস্তা দেখা যাচ্ছে। তার পরই ‘আঃ’ বলে ও একটা বিস্ময়সূচক শব্দ করল।
তৎক্ষণাৎ আমিও একলাফে পিপেতে উঠে জানলা থেকে উঁকি দিলাম। বরফ-ঢাকা রাস্তায় একটা লোক ঘোড়ার পিঠে চলেছে। লোকটা পাগলের মতো চাবুক মারছে ঘোড়াটাকে আর ঘোড়াটা লাফিয়ে লাফিয়ে জোরে দৌড়োচ্ছে। একটু পরে ওরা পাইন বনের কালো ছায়ায় মিলিয়ে গেল।
—কী মনে হয় স্যর? দুরোকের প্রশ্ন।
—ব্যাপার বিশেষ সুবিধের মনে হচ্ছে না। ব্যারন বোধহয় লোকটাকে পাঠাল আমাদের গলা কাটার জন্য দু-একটা গুন্ডাকে আনতে। দেখা যাক, বেড়াল আসার আগেই আমার এই ইঁদুর ধরা কল থেকে বেরোতে পারি কিনা।
একটাই আনন্দের কথা। বাতিতে যেটুকু তেল আছে, তাতে সারারাত চলে যাবে। অর্থাৎ আমাদের অন্ধকারে থাকতে হবে না। পিপে আর বাক্সগুলো পরীক্ষা করে দেখলাম যে এগুলোতে পনির, সবজি, শুকনো ফল, মদ ইত্যাদি রাখা। অর্থাৎ এটা ব্যারনের ভাঁড়ার ঘর। সারাদিন কিছু খাইনি, তাই ওইখান থেকেই কিছু খেয়ে নিলাম। দুরোক কিছু খেল না। ঘরে পায়চারি করতে করতে আপন মনে বলতে লাগল,—পালাবে কোথায়? ওকে আমি ধরবই।
আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। আমি, এতিয়েন জেরার, গ্র্যান্ড আর্মির সব থেকে বিখ্যাত লেফটেন্যান্ট যার সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, দুরোকের কথায় এখানে এসে কী বিপদেই না পড়লাম। যদি আমার এখানে একটা কিছু হয়ে যায়, তবে দেশের বা সম্রাটের জন্য নয়, নেহাতই একটা পারিবারিক প্রতিশোধের ব্যাপারে আমার প্রাণটি খোয়াব আর আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ স্বপ্নই থেকে যাবে।
দুরোককে বললাম,—বেশ! ওকে হাতে পেলে যা করার কোরো। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, ও আমাদের কী করবে।
—ওর যা ইচ্ছে করুক। আমার কর্তব্য আমার বাবার প্রতি।
—বোকার মতো কথা বলছ। তোমার যদি তোমার বাবার প্রতি কর্তব্য থাকে, আমারও কর্তব্য আমার মায়ের প্রতি। আপাতত এখান থেকে সুস্থ শরীরে বেরিয়ে যাওয়া প্রধান কর্তব্য।
এবার দুরোকের মাথায় ঢুকল ব্যাপারটা। বলল,—মঁসিয়ে জেরার, আমায় ক্ষমা করুন। আমি খালি নিজের কথাই ভাবছিলাম। আপনি বলুন, আমি কী করব?
—দ্যাখো, ব্যারন এখানে আমাদের রেখেছে পনির খাইয়ে স্বাস্থ্যবান করার জন্য নয়, আমাদের খতম করবে বলে। ও জানে, আমরা এখানে এসেছি কাউকে না জানিয়ে। এবং কেউ আমাদের খোঁজ পাবে না। তাই ওরা এখানে আসবেই আমাদের শেষ করতে। হয়তো পিপের আড়াল থেকে লড়াই করে আমরা পাঁচজনকে ঠেকিয়ে রাখব। তাই মনে হয় ব্যারন লোক পাঠাল আরও কয়েকজনকে ডাকতে।
—ওরা আসার আগেই আমাদের পালাতে হবে। আচ্ছা, দরজাটা জ্বালিয়ে দিলে হয় না?
—সহজেই হয়। বেশ কয়েক পিপে তেল আছে। সমস্যা হল, সেক্ষেত্রে আমরাই শামুক-পোড়ার মতো পুড়ে মরব।
—অন্য কিছু উপায়? আরে, ওটা কীসের আওয়াজ?
সেই ছোট্ট জানলায় একটা মৃদু শব্দ। একটা ছায়াও পড়ল, কেন না তারাগুলো ঢেকে গেল। একটা ফর্সা হাত বেরিয়ে এল জানলা থেকে, আঙুলের ফাঁক থেকে ঝুলছে একটা চকচকে জিনিস।
—শিগগির! নারীকণ্ঠের আওয়াজ।
দুজনে তক্ষুনি পিপের ওপর উঠে দাঁড়ালাম।
—ওরা কোসাক দস্যুদের খবর দিয়েছে। তোমাদের প্রাণ বিপন্ন। আমিও শেষ!
শুনতে পেলাম বাইরে পায়ের আওয়াজ, তর্জন-গর্জন এবং আঘাতের শব্দ। জানলা দিয়ে আবার তারা ভরা আকাশ দেখা গেল। একটু পরেই শোনা গেল চাপা কান্নার আওয়াজ আর একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ। আতঙ্কে আমাদের শিরদাঁড়ায় একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
আমি বললাম,—বদমাইশগুলো মেয়েটিকে ধরেছে। ওকে নির্ঘাত মেরে ফেলবে।
দুরোক পাগলের মতো হাতের মুঠি দিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল। প্রতিটি ধাক্কার সঙ্গে সঙ্গে ওর হাতে পড়ছে রক্তের ছোপ।
মেঝের ওপর পড়ে থাকা একটা চাবি ওর হাতে দিয়ে বললাম,—এই নাও চাবি। মেয়েটিকে ওরা টেনে নিয়ে যাবার সময় ও মনে হয় জানলা দিয়ে আমাদের জন্য চাবিটা ফেলে দিয়ে গেছে।
কিন্তু তালায় হাত পৌঁছোলেও এত ছোট্ট চাবি দিয়ে অত বড় তালা খোলার প্রশ্নই ওঠে না। দু-হাতে মাথা চেপে ধরে হতাশায় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল দুরোক।
আমি অবশ্য সহজে ছাড়বার পাত্র নই। মেয়েটি যখন নিজের জীবন বিপন্ন করে এই চাবিটা দিয়েছে, তখন নিশ্চয়ই এর কোনও অর্থ আছে। দুজনে মিলে এক এক করে দেওয়াল থেকে সরাতে লাগলাম পিপে আর বাক্সগুলো।
সবশেষে একটা বিশাল পিপে সরাতেই দেখলাম একটা ছোট দরজা। চাবিটা এই দরজার তালায় লেগে গেল। দরজা খুলে যে ঘরটায় ঢুকলাম সেটা প্রাসাদের বারুদভাণ্ডার। পিপেতে ভরে রাখা বারুদ আর ঘরের মাঝখানেও বারুদের একটা কালো স্তূপ। ঘরের অন্য প্রান্তে একটা দরজা, কিন্তু সেটা তালাবন্ধ।
—সেই আগের মতোই পরিস্থিতি। আমাদের কাছে ওই দরজার চাবি নেই। দুরোকের কণ্ঠস্বরে হতাশা।
আমি বারুদের পিপেগুলো দেখিয়ে বললাম,—অনেক চাবি আছে।
—দরজা বারুদ দিয়ে উড়িয়ে দেবেন?
—ঠিক তাই। ওই তালা বন্ধ দরজাটা।
মোমবাতি ভরা একটা টিনের বাক্স খালি করে তাতে বারুদ ভরে দিলাম। সঙ্গে দিলাম আধইঞ্চি লম্বা একটা মোমবাতি। বাক্সটা তিনটে বড় পনিরের টুকরোর ঠেকনা দিয়ে তালার সঙ্গে ঠেকিয়ে রাখলাম। তারপর মোমবাতির টুকরোটুকু জ্বালিয়ে দিয়ে বারুদখানার দরজা বন্ধ করে চলে গেলাম ভাঁড়ার ঘরে।
একবার কল্পনা করো আমাদের অবস্থাটা। পুরো বারুদখানাতেই যদি আগুন লেগে যায় আর সেই আগুন ভাঁড়ার ঘরে এসে পড়ে, তাহলে আমাদের পোড়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবে না। এত দেরি হচ্ছে কেন? আধ ইঞ্চি মোমবাতি পুড়তে এত সময় লাগে?
যখন প্রায় অধৈর্য হয়ে উঠেছি, ঠিক তখনই শোনা গেল বোমা ফাটার মতো আওয়াজ। বারুদখানার আমাদের দিকের দরজাটা টুকরো টুকরো হয়ে গেল। বিস্ফোরণের অভিঘাতে ভাঁড়ার ঘরের আপেল, পনির, সবজি ইত্যাদি বৃষ্টির মতো ছড়িয়ে পড়ল। ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে আমরা বারুদঘরের উড়িয়ে-দেওয়া দরজার জায়গাটা নিয়ে গিয়ে পড়লাম একটা উঠোনে।
গিয়ে দেখি, আমাদের জেলখানার ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গে জেলরক্ষীদেরও ক্ষতি হয়েছে। মাংস কাটার কুড়ুল হাতে একজন পড়ে আছে, কপালে গভীর ক্ষত। বিশাল একটা হাউন্ড দু-পা ভেঙে পড়ে আছে, মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছে। হঠাৎ দুরোকের আওয়াজ শুনে তাকিয়ে দেখি অন্য একটা হাউন্ড ওর ঘাড়ে দাঁত বসিয়েছে।
কুকুরটাকে বাঁ-হাত দিয়ে ঠেলে রেখে দুরোক বারবার ওর দেহে তলোয়ার বিঁধিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু কুকুরটা ওকে কিছুতেই ছাড়ছে না। পিস্তলটা বার করে আমি কুকুরটার মাথায় একটা গুলি করতেই দুরোক মুক্ত হল। কুকুরটার প্রাণহীন দেহ পড়ে রইল ওখানে।
থেমে থাকার সময় নেই। নারীকণ্ঠের একটা আর্তনাদ শুনতে পেলাম। হয়তো আমরা বেশি দেরি করে ফেলেছি। হলঘরে দুটো লোক ছিল। তারা আমাদের খোলা তলোয়ার আর মারমুখী মূর্তি দেখে সরে পড়ল। এদিকে দুরোকের ঘাড়ের ক্ষত থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ে ওর পোশাক লাল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওর অদম্য শক্তির জোরে আমার আগেই ও ঢুকে পড়ল সেই ঘরে যেখানে ব্যারনের সঙ্গে আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল।
ব্যারন ওই ঘরেই দাঁড়িয়ে। তার চুল খাড়া হয়ে আছে রাগী সিংহের মতো। চওড়া দুটো কাঁধের ওপর বিশাল মাথা। মুখ ক্রোধে লাল, হাতে খোলা তলোয়ার। মনে মনে লোকটার চেহারার তারিফ করলাম—চেহারাটা গ্রেনেডিয়ারের মতো। মেয়েটি একটা চেয়ারে জবুথবু হয়ে বসে। ওর বাহুতে চাবুকের দাগ এবং মেঝেতে পড়ে থাকা কুকুরের চাবুক দেখে যা বোঝবার বুঝে নিলাম। মেয়েটিকে ওই নরপশুর অত্যাচার থেকে আমরা বাঁচাতে পারিনি।
আমরা ঘরে ঢুকতেই নেকড়ের মতো আওয়াজ করে তলোয়ার হাতে ব্যারন ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের ওপর। তলোয়ার চালাতে চালাতে আমাদের গালিগালাজ করতে লাগল।
তলোয়ার নিয়ে লড়াই করার উপযুক্ত জায়গা নয় ওই ছোট ঘরটা। দুরোক আটকে পড়েছে দেওয়াল আর টেবিলের মধ্যের সরু জায়গাটায়। আমি ওখানে ঢুকতে পারছি না। তলোয়ার চালানোর সুদক্ষ দুরোক বনবিড়ালের মতো লড়ছিল।
ব্যারনও দক্ষতায় কম যায় না। ওর ওজনদার শরীর ও আসুরিক শক্তির সুবিধা দুরোকের নেই। দুবার দুরোকের কাঁধের ওপর পড়ল ব্যারনের তলোয়ার। দুরোক হুমড়ি খেয়ে পড়তেই ব্যারন ওকে খতম করার জন্য তলোয়ার চালাল। আমার তলোয়ারখানা বাড়িয়ে দিয়ে আমি অবশ্য আঘাতটা রুখে দিলাম।
ব্যারনকে এবার বললাম,—মাফ করবেন, কিন্তু এতিয়েন জেরারের সঙ্গে আপনার বোঝাপড়াটা এখনও বাকি আছে।
লোকটা দেওয়ালে হেলান দিয়ে হাঁপাচ্ছিল। তাই বললাম,—দম নিয়ে নিন। আমি অপেক্ষা করছি।
—কিন্তু আপনার সঙ্গে তো আমার কোনও ঝগড়া নেই।
—আমাকে আপনার ভাঁড়ার ঘরে বন্দি করে রাখার হিসেব তো চোকাতেই হবে। তাছাড়া, ওই মেয়েটির বাহুর আঘাতের ব্যাপারটাও তো আছে।
—তবে তাই হোক। বলে লোকটা দাঁত খিঁচিয়ে আমার দিকে উন্মাদের মতো তেড়ে এল। পরের এক মিনিট শুধু ওর জ্বলজ্বলে নীল চোখ দুটো আর তলোয়ারের ডগায় লেগে থাকা রক্তচিহ্ন দেখতে থাকলাম। রক্তচিহ্নটা কখনও আমার বুকের কাছে কখনও-বা গলার কাছে চলে আসছে। অসাধারণ দক্ষতা ওর অসি চালনায়। আমার দেখা ছ’জন শ্রেষ্ঠ অসি চালকের মধ্যে ও নিঃসন্দেহে একজন।
কিন্তু ও বুঝতে পারল যে আজ আমিই সেরা। আমার দৃষ্টিতে ও দেখতে পেয়েছে মৃত্যুর পরোয়ানা। ধীরে ধীরে ওর মুখ হয়ে গেল ফ্যাকাশে, দম শেষ হয়ে হাঁপাতে লাগল।
আমার শেষ আঘাতটার পরেও ও মরতে মরতে তলোয়ার চালিয়ে যাচ্ছিল, মুখে গালাগালি, রক্ত জমাট বাঁধছিল দাড়িতে। কমলা রঙের দাড়ির ওপর লাল টকটকে রং-এর থেকে বীভৎস দৃশ্য আমার সৈনিক জীবনে বহু হত্যাকাণ্ডের মধ্যে আর কখনও দেখিনি।
ব্যারনের সেই দানবীয় শরীর মেঝেতে পড়ার পরেই মেয়েটি চেয়ার ছেড়ে উঠে দু-হাতে তালি দিতে দিতে উল্লাসে চেঁচাতে লাগল। মেয়েটি যে কত অত্যাচার সহ্য করেছে সে কথা আমার সেই মুহূর্তে মনে পড়েনি। তাই ওর কুরুচিকর ভাবভঙ্গি দেখে ওকে চুপ করে থাকতে বলতে যাচ্ছিলাম। ঠিক সেই সময়েই নাকে এল পোড়া গন্ধ আর ঘরের দেওয়ালে হলুদ আলোর আভা।
দুরোকের কাঁধে হাত রেখে বললাম,—দুরোক। দুরোক। প্রাসাদের আগুন লেগেছে।
উঁকি মেরে দেখে এলাম, আমাদের বারুদ-বোমার আগুন ছড়িয়েছে ভাঁড়ার ঘরে। বেশ কিছু বাক্স দাউ দাউ করে জ্বলছে। এখন এই আগুন যদি বারুদঘরের স্তূপাকার বারুদে লাগে সেকথা ভেবে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
এক-দু-মিনিটের মধ্যেই সাংঘাতিক কিছু ঘটে যেতে পারে। এদিকে তলোয়ারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত দুরোক অচেতন হয়ে পড়ে আছে।
তার পরে কী কী করেছিলাম বা হয়েছিল, ঠিক মনে নেই। অস্পষ্ট মনে আছে, দুরোকের একটা হাত ধরে টানতে টানতে ওকে হলঘরে নিয়ে এলাম, মেয়েটি ওর অন্য হাতটা ধরে আছে। বাড়ির বাইরে এসে বরফঢাকা রাস্তা পেরিয়ে পাইন বনের কাছে পৌঁছেছি। ঠিক তখনই কানে এসেছিল কিছু একটা ভেঙে পড়ার আওয়াজ আর আকাশচুম্বী আগুনের শিখা। একটু পরেই আরও জোরে আওয়াজ। মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম দুরোকের শরীরের পাশে।
কয়েক সপ্তাহ বাদে সুস্থ হওয়ার পরে দুরোকের কথায় জানলাম, একটা বড় কাঠের টুকরো আমার মাথায় পড়ে আমাকে মৃত্যুর দরজার কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। আর প্রাসাদের ওই পোলিশ মেয়েটি দৌড়ে অ্যারেনসডর্ফে গিয়ে দুরোকের সঙ্গীদের খবর দিয়েছিল। তারা এসে আমাদের উদ্ধার করেছিল। একটু দেরি হলেই আমরা কোসাকদের হাতে মারা পড়তাম—ব্যারনের সহায়কের ডাকা কোসাক দস্যুরা প্রায় এসে পড়েছিল।
আর ওই মেয়েটি, যে দু-দুবার আমাদের প্রাণ বাঁচিয়েছিল, তার ব্যাপারে দুরোক বিশেষ কিছু জানায়নি। দু-বছর পর প্যারিসে দুরোকের বাড়ি গিয়ে দেখি ও বিয়ে করেছে। ওর স্ত্রীকে দেখে বিস্মিত হলেও বুঝলাম, মেয়েটির পরিচয় জানার প্রয়োজন নেই।
আর হ্যাঁ। ভাগ্যের কী লিখন। দুরোকের নতুন নাম ব্যারন স্ট্রাউবেনথল এবং বিবাহসূত্রে ও অগ্নিদগ্ধ আঁধারপুরীর মালিক।
