রহস্যে ঘেরা লড়াই – আর্থার কোনান ডয়েল
রহস্যে ঘেরা লড়াই
শার্লক হোমস-কে নিয়ে অন্য লেখকেরা যেমন আর্থার কোনান ডয়েলের শৈলীতে নতুন নতুন ডিটেকটিভ গল্প লিখেছেন, তেমনি শার্লক হোমস-এর প্যারডি করেও হালকা মেজাজের মজার গল্পও লেখা হয়েছে। বস্তুত, হোমস-গবেষকেরা স্বয়ং কোনান ডয়েলের লেখা দুটি ছোট প্যারডির সন্ধান পেয়েছেন। নাম যথাক্রমে ‘দ্য ফিল্ড বাজার’ (১৮৯৬) এবং ‘হাউ ওয়াটসন লারনড দ্য স্টিক’ (১৯২৪)। এই গল্প দুটির অনুবাদ করা হল।
হোমস বনাম ওয়াটসন
আমি হলে তো অবশ্যই করতাম—বলল শার্লক হোমস।
হঠাৎ ওর এই কথা শুনে আমি একটু অবাক হলাম।
হোমস ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে কফি-পটের ওপর খবরের কাগজটা রেখে ওটা পড়ছিল। আমি ওর দিকে তাকালাম। ও-ও আমার দিকে তাকিয়ে, দৃষ্টিতে কৌতুকের আভাস। আর বুদ্ধিদীপ্ত কোনো কিছু আলোচনার সময় ওর দৃষ্টিতে যে একটা প্রশ্নবাচক ভঙ্গি থাকে, সেটাও চোখে পড়ল আমার।
—কী করতে?—আমি জিগ্যেস করলাম।
হোমস তাক থেকে ওর পারস্যের পা-ঢাকা চটিটা নামিয়ে তার মধ্যে থেকে খানিকটা তামাক বের করে পাইপে ভরল। ব্রেকফাস্টের পরে ধূমপান ওর পুরোনো অভ্যেস।
—তুমি কিন্তু প্রশ্নটা করলে একেবারেই তোমার স্বভাবমতো, বলল হোমস।—কিছু মনে কোরো না ওয়াটসন, বুদ্ধিশুদ্ধির ব্যাপারে আমার যেটুকু খ্যাতি, তার অনেকটাই কিন্তু তোমার মতো একজন সঙ্গী পেয়েছি বলে।
—ব্যঙ্গটা আমি গায়ে মাখলাম না, কেন না আমাদের দুজনের বন্ধুত্ব বহুকালের। তবে একটু মনক্ষুণ্ণ হলাম তো অবশ্যই।
—ঠিক আছে ভাই, মানলাম আমার মাথা মোটা, কিন্তু সত্যি বলছি আমি বুঝতেই পারছি না তুমি কী করে জানলে যে আমি…আমাকে….
—অনুরোধ করা হয়েছে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজিত মেলায় সাহায্য করতে, তাই না?
—ঠিক তাই। সবেমাত্র ওদের চিঠিটা পেয়েছি। কিন্তু এ নিয়ে তো তোমার সঙ্গে কোনো কথাই হয়নি।
—তা সত্ত্বেও আমি ব্যাপারটা আন্দাজ করেছি, চেয়ারে হেলান দিয়ে দু’হাতের দশটা আঙুলের ডগা একত্র করে বলল হোমস।—এমনকী এটাও বলতে পারি যে মেলাটির উদ্দেশ্য হল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেট খেলার মাঠটা বড় করার জন্য টাকা তোলা।
আমি হতভম্ব হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম আর ও নিঃশব্দ হাসির ফোয়ারায় কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকল।
—ব্যাপারটা কী, জানো ওয়াটসন? তোমাকে পড়ে ফেলা খুবই সহজ। এমনকী খবরের কাগজের সম্পাদকীয় পড়ে বোঝার থেকেও সহজ। যে কোনো বাহ্যিক ব্যাপারে তোমার প্রতিক্রিয়া হয় তৎক্ষণাৎ। তোমার মানসিক প্রক্রিয়া একটু ধীরগতিতে চললেও, সেটা কিন্তু স্পষ্ট, সহজবোধ্য।
ব্যঙ্গটা আবার অগ্রাহ্য করে বললাম,—একটু বলো না ভাই কী করে তুমি আজকের এই ব্যাপারটা বুঝে ফেললে।
—দ্যাখো ওয়াটসন, এই ব্যাখ্যা দেওয়াটা আমার খ্যাতির প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাখ্যা শুনে সবাই বলে—আরে! এ তো জলের মতো সহজ। অবশ্য তোমার এই কেসটিতে পুরো বিশ্লেষণটা চোখে দেখা তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে। তাই আমি কোনো প্রশংসার দাবি করি না। তুমি ঘরে ঢুকলে, মুখে চিন্তার ছাপ—যেন কিছু একটা ব্যাপারে দোটানায় আছ। তোমার হাতে শুধু একটা চিঠি। কাল রাতে তো তুমি খোশমেজাজে শুতে গেছিলে। অর্থাৎ এই চিঠিটাই তোমার মেজাজ পাল্টে দিয়েছে।
—এটা তো বোঝাই যাচ্ছে।
—বুঝিয়ে দিলে সবকিছুই জলবৎ তরলং হয়ে যায়। যা হোক, আমি নিজেকে তখন প্রশ্ন করলাম যে চিঠিতে এমনকী থাকতে পারে যাতে তোমার মেজাজ পালটে গেল। ঘরে ঢোকার সময় তুমি খামটা এমনভাবে ধরেছিলে যে তার উল্টোদিকটা আমার চোখে পড়েছিল। দেখলাম, তাতে একটা লোগো আছে, যেটা তোমার কলেজ জীবনের ক্রিকেট খেলার টুপির ওপরের লোগোর মতো। বুঝতে পারলাম, চিঠিটা এসেছে হয় এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, নয় বিশ্ববিদ্যালয়েরই কোনো ক্লাব থেকে। তারপর তুমি খাবার টেবিলে তোমার প্লেটের পাশে চিঠিটা রাখলে—প্রাপকের ঠিকানার দিকটা ওপরে। আর তুমি তাকের ওপর দেয়ালে টাঙানো একটা বাঁধানো ফোটোগ্রাফ দেখতে লাগলে।
বিস্মিত হলাম কী নিখুঁতভাবে হোমস আমার প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ করেছে। অধীর আগ্রহে বললাম,—তারপর?
—খামের ওপর লেখা ঠিকানাটার দিকে তাকালাম। ছ’ফুট দূর থেকেও বুঝতে পারলাম যে চিঠিটা বেসরকারি। কেন না তোমার নামের আগে ‘ডাক্তার’ লেখা আছে। তুমি তো শুধু ব্যাচেলর অফ মেডিসিন অর্থাৎ এম.বি। এম.বি.বি.এস না হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নামের আগে কখনো ‘ডাক্তার’ লেখেন না। অর্থাৎ চিঠিটা এসেছে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে। খাবার টেবিলে এসে যখন তুমি খাম থেকে চিঠিটা বের করলে, দেখলাম ওটা ছাপানো চিঠি। তখনই আমার মাথায় ঢুকল মেলা বা Fete-এর ব্যাপারটা। প্রথমে ভেবেছিলাম ওটা কোনো রাজনৈতিক দলের ছাপানো আবেদন, কিন্তু তখন রাজনীতিতে যে মন্দা চলছে, তা ভেবে সেই সম্ভাবনা নাকচ করলাম।
যাই হোক, খাওয়ার টেবিলে আসার পরেও তোমার মুখের অভিব্যক্তি একই রকম রইল, ওই বাঁধানো ফোটোগ্রাফটা দেখা সত্ত্বেও। তখন আমি ফোটোগ্রাফটার দিকে দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম, ওটা এডিনবেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেট টিমের একটা পুরোনো গ্রুপ ফোটো—ফোটোতে তুমিও আছ। ফোটোটার পটভূমিতে প্যাভিলিয়ন আর মাঠ। আমার সামান্য অভিজ্ঞতায় জানি, পাড়ার গির্জা আর ক্রিকেট ক্লাব—এদের টাকার টানাটানি থাকে সর্বদাই। টেবিলে বসে তুমি যখন খামটার ওপর আঁকিবুকি কাটছিলে, তখন আমি নিশ্চিত হলাম যে, মেলায় তোলা টাকা থেকে ক্রিকেট ময়দানের কী উন্নতি করা যেতে পারে সেই নিয়ে তুমি ভাবছ। তোমার মুখে অবশ্য তখনো দোটানার ছাপ। তাই আমি বলে উঠেছিলাম যে, এইরকম সাধু উদ্দেশ্যে তোমার সাহায্য করা উচিত।
পুরো ব্যাখ্যাটাই এত সহজ যে আমি মৃদু হেসে বললাম,—সত্যিই তো! কী সহজ!
একটু বিরক্ত হয়ে হোমস বলল,—আর একটু বলি। ওই ক্লাবের কর্মকর্তারা স্যুভেনির-এ তোমার একটা লেখা চেয়েছে আর তুমি ঠিক করেছ যে, আজকের এই ঘটনাটা নিয়েই লিখবে।
—কিন্তু কী করে…আমার কণ্ঠে বিস্ময়।
—এটাও জলের মতোই সহজ। মাথা খাটিয়ে বের করার চেষ্টা করো দেখি, এটা কী করে বললাম।
খবরের কাগজটা তুলে ধরে হোমস বলল,—কিছু মনে কোরো না ওয়াটসন। যে গাছের কাঠ দিয়ে বেহালা তৈরি হয়, সেই গাছের ওপর আজকের কাগজে একটা ইন্টারেস্টিং লেখা আছে। এখন আমি ওই লেখাটা পড়ব। তুমি তো জানোই এইসব ছোটখাটো বিচিত্র বিষয়ে আমার কেমন আগ্রহ!
ওয়াটসন বনাম হোমস
ওয়াটসন গভীর মনোযোগে তীক্ষ্নদৃষ্টিতে ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসা হোমসকে দেখছিল। হোমস হঠাৎ মুখ তুলে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল।
হোমস জিগ্যেস করল—কী ভাবছ ওয়াটসন?
—তোমার ব্যাপারেই।
—আমার ব্যাপারে?
—হ্যাঁ হোমস। ভাবছিলাম তোমার বুদ্ধির খেলাগুলো কত সাধারণ, কত ভাসা-ভাসা। আর, ওগুলোকে পাবলিক বোকার মতো কেমন উপভোগ করে।
—ঠিকই বলেছ। আমি নিজেও ওইরকম মন্তব্যই করেছিলাম।
ওয়াটসন এবার সরাসরি বলল,—তোমার বিশ্লেষণ পদ্ধতি সহজেই শেখা যায়।
হোমস মৃদু হেসে বলল,—নিঃসন্দেহে, তুমি নিজেই এই পদ্ধতির একটা নমুনা দেখাও না।
—অবশ্যই! যেমন ধরো, আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই তুমি চিন্তিত ছিলে।
—বাঃ! বলল হোমস,—কী করে বুঝলে?
—কেন না তুমি সবসময় ফিটফাট থাকো, অথচ আজ সকালে দাড়ি কামাওনি।
—আরে! বুদ্ধি করে বেশ ধরেছ তো ব্যাপারটা! তুমি যে আমার এত ভালো চেলা হয়েছ সেটা আগে বুঝিনি। তোমার শ্যেনদৃষ্টিতে আর কিছু ধরা পড়েছে?
—হ্যাঁ, হোমস। তোমার বার্লো নামে এক মক্কেল আছে। কিন্তু তার সমস্যার তুমি সমাধান করতে পারোনি।
—বাব্বা! সেটা কী করে বুঝলে?
—খামের ওপর লোকটার নাম দেখে। খামটা খুলেই তুমি যেন আর্তনাদ করে উঠলে আর তোমার মুখে ভ্রুকুটি দেখলাম।
—দারুণ! সত্যিই অসাধারণ তোমার পর্যবেক্ষণশক্তি! আর কিছু?
—কিছু মনে কোরো না, হোমস—তুমি আজকাল শেয়ার বাজারে ফাটকাবাজি করছ।
—এটা কী করে বুঝলে ওয়াটসন?
—তুমি খবরের কাগজটা খুলেই ব্যবসার পাতায় চলে গেলে আর দেখলাম তোমার মুখে খুশির অভিব্যক্তি।
—সত্যিই খুব বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছ তুমি। আর কিছু?
—হ্যাঁ, হোমস। তুমি এত সকালে ড্রেসিং গাউন না পরে কালো কোট পরে আছ। তার মানে বড়সড় কেউ তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসছে।
—আর কিছু?
—আরও হয়তো অনেক কিছুই বলতে পারতাম। কিন্তু মাত্র এই ক’টি কথা বললাম তোমাকে বোঝানোর জন্য যে, তোমার মতো বুদ্ধিমান লোক আরও আছে।
—তা অবশ্য ঠিক। তবে কম বুদ্ধিমান লোকেরও অভাব নেই, যদিও তারা সংখ্যায় কম। তুমি কিন্তু ওয়াটসন তাদের দলেই।
—মানে? কী বলতে চাও তুমি হোমস?
—বন্ধু, তোমার অনুমান বা সিদ্ধান্তগুলো ঠিক আমার পছন্দমাফিক হয়নি।
—তার মানে? আমি ভুল করেছি?
—একটু ভুল তো হয়েছে-ই! যাক, তোমার সিদ্ধান্তগুলোর ক্রম অনুযায়ী আমি উত্তর দিচ্ছি। প্রথমত, আমি দাড়ি কামাইনি, কেন না আমার ক্ষুরটায় ধার দিতে পাঠিয়েছি। দ্বিতীয়ত, আমি কোট পরে আছি, কেন না আজ ভোরবেলাতেই দাঁতের ডাক্তারের কাছে যেতে হয়েছিল। তৃতীয়ত, দাঁতের ডাক্তারের নাম বার্লো আর চিঠিটায় উনি আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট কনফার্ম করেছিলেন। চতুর্থত, খবরের কাগজে ব্যবসার পাতার মুখোমুখি পাতায় ক্রিকেটের খবর থাকে। দেখছিলাম, কাউন্টি ম্যাচে কেন্টের বিরুদ্ধে আমার প্রিয় টিম সারে এখনও টিকে আছে কিনা। কিন্তু ওয়াটসন—চালিয়ে যাও। পর্যবেক্ষণ করে অনুমানের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত পৌঁছনোর এই খেলাটা একেবারেই সোজা, এতে কোনো গভীরতা নেই। তুমি খুব শিগগিরই এতে এক্সপার্ট হয়ে উঠবে।
