অজানা প্রতিদ্বন্দ্বী – আর্থার কোনান ডয়েল
অজানা প্রতিদ্বন্দ্বী
টম ক্রিব ছিল ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়ন বক্সার। বক্সিং থেকে প্রায় অবসর নিয়ে ও এখন একটা বার-কাম-রেস্টুরেন্ট চালায়। বক্সিং প্রেমীদের আড্ডা ছাড়াও ওখানে আসা যাওয়া করত সতীর্থ মুষ্টিযোদ্ধারা, বিশেষত যাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ। ক্রিব ওদের দুটো সান্ত্বনাবাক্য না শুনিয়ে এবং না খাইয়ে কখনো ছাড়ত না।
একদিন সকালে ক্রিবের নিরিবিলি বার-এ ছিল মাত্র দুজন। একজন ক্রিব, লম্বা চওড়া চেহারা, ওজন প্রায় একশো কুড়ি কিলো, চোখে মুখে চ্যাম্পিয়ন বক্সারের বিজয়ী হাবভাব। তা সত্ত্বেও ওকে দেখে মনে হয় হাসিখুশি, দিলদরিয়া এবং ঘরোয়া প্রকৃতির মানুষ। অন্যজন ক্রিবের থেকে অন্ততঃ পনেরো বছর ছোট, লম্বা, সুগঠিত চেহারা। ওর আশি কিলো ওজনের শরীরটা দেখলেই বোঝা যায় ও-ও একজন বক্সার। ওর নাম টম উইন্টার—যদিও ও নিজেকে টম স্প্রিং বলে পরিচয় দেয়। বেশ কয়েকটা লড়াই জিতে ওর একটু নামডাক হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি পেইন্টার নামের এক বিখ্যাত বক্সারের কাছে হেরে গিয়ে ও আপাতত মনমরা।
ক্রিব ওকে বোঝাচ্ছিল, ‘একটা হারকে এত সিরিয়াসলি নিচ্ছ কেন? আমি হারিনি? হারের পরে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। মনটা শক্ত করো—তুমিও আমার মতো চ্যাম্পিয়ন হবে।’
স্প্রিং বলল, ‘পেইন্টারের কাছে চল্লিশ রাউন্ড পরে হেরে গেলাম। ছো! আমি হব চ্যাম্পিয়ন? জানো আজ আমার পকেটে একটা পয়সাও নেই। কেউ আমাকে ব্যাক করছে না। হাতে কোনো লড়াইয়ের প্রস্তাব নেই।’
‘শোনো, আমি যতদিন আছি তোমার দু’মুঠো খাবার জুটেই যাবে। একটু অপেক্ষা করো। তোমার যা দক্ষতা, তোমাকে কেউ না কেউ ব্যাক করবেই। অন্য কিছুও পেয়ে যেতে পারো। এই তো, আজ সকালেই এক অভিজাত মহিলা তোমার খোঁজ করছিলেন।’
বিস্মিত স্প্রিং বলল, ‘মহিলা! আমাকে চাইছিলেন! কী ব্যাপার বলো তো?’
‘বক্সিং-এর ব্যাপারেই মনে হয়। মহিলা বক্সিং সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানেন। তোমার ওজন, উচ্চতা, দক্ষতা ইত্যাদি নিয়ে অনেক প্রশ্ন করেছিলেন। আমি কিন্তু তোমাকে দারুণ সার্টিফিকেট দিয়েছি।’
একটু পরেই একজন ওয়েটার এসে বলল, ‘মিঃ ক্রিব! ওই মহিলার গাড়িটা আবার ফিরে এসেছে।’
ক্রিব আর স্প্রিং দুজনেই জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল—দামি ও শক্তিশালী দুটো ঘোড়ায় টানা একটা দারুণ গাড়ি। কোচোয়ান, সহিস—সবই টপ ক্লাস। ক্রিব তড়িঘড়ি বাইরে গেল মহিলাকে অভ্যর্থনা করতে।
দুই
গ্রামের ছেলে স্প্রিং, বড় শহরের কাণ্ডকারখানা বোঝে না। স্বভাবতই একটু নার্ভাস। একটু পরেই ঘরে ঢুকলেন একজন মহিলা। দীর্ঘাঙ্গী, পাতলা কাপড়ে মুখ ঢাকা। তাঁর ঠিক পিছনেই ঢুকল ক্রিব। মহিলা হাতের দস্তানা খুলে ধীরে ধীরে মুখের কাপড়টা কপালে তুলে দিয়ে ক্রিবকে জিগ্যেস করলেন, ‘এই কী সেই লোক?’
স্প্রিং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জারিপ করে ওর দেহসৌষ্ঠব দেখে মনে হল উনি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর স্প্রিং দেখছিল মহিলাকে—বছর ত্রিশেক বয়স, রানির মতো চেহারা, সুন্দর মুখশ্রী, ব্যক্তিত্বে, বংশমর্যাদার উদ্ধত প্রকাশ। মহিলার প্রতি মুগ্ধতার সঙ্গে কিন্তু স্প্রিং-এর মনে এল একটু বিতৃষ্ণার ভাব। একটা ঘোড়াকে বা মেশিনকে যেভাবে দ্যাখে একজন ক্রেতা, মহিলার স্প্রিং-এর প্রতি তাকানোও অনেকটা সেই রকম।
মহিলা বললেন, ‘মিঃ ক্রিব, আপনি তো বলছিলেন ও ছ’ফুট লম্বা। সত্যিই কি তাই?’
‘হ্যাঁ ম্যাডাম। ছ’ফুটই! আমিও ছ’ফুট। দেখুন না—আমরা দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছি।’
‘ছাতির মাপ?’
‘তেতাল্লিশ ইঞ্চি, ম্যাডাম।’
‘বেশ শক্তপোক্ত চেহারা। ভালো লড়তেও পারে আশা করি?’
‘ম্যাডাম, তিন সপ্তাহ আগের খেলার পত্রিকায় দেখবেন ও অজ্ঞান না হওয়া পর্যন্ত পেইন্টারের সঙ্গে কী লড়াইটাই না লড়েছিল। মার সহ্য করার ক্ষমতাও অসীম।’
‘কিন্তু ও তো ওই লড়াইয়ে হেরে গেছেল। যা হোক, আমি এখানে এসেছি আমার পরিচয় গোপন করে। তোমরা দুজনে কখনোই জানতে চাইবে না আমি কে। যদি এই প্রতিশ্রুতি না দাও তাইলে ব্যাপারটার এখানেই ইতি।’
‘তাই হবে, ম্যাডাম। প্রতিশ্রুতি দিলাম।’
এবার মহিলা স্প্রিংকে জিগ্যেস করলেন, ‘তুমি নাকি যে-কোনো ওজনের বক্সারের সঙ্গে লড়তে রাজি?’
‘হ্যাঁ ম্যাডাম, দু’পেয়ে হলেই হল।’
‘লড়াইয়ের আগে শারীরিক প্রস্তুতি, ট্রেনিং ইত্যাদিতে তোমার কতদিন দরকার?’
‘তিন থেকে চার সপ্তাহ।’
‘ঠিক আছে। তোমার ট্রেনিং-এর খরচা এবং প্রতি সপ্তাহে দু’পাউন্ড করে ভাতা আমি দেব, আপাতত অগ্রিম হিসেবে পাঁচ পাউন্ড দিচ্ছি। তুমি পুরোপুরি ফিট হয়ে গেলে আমি লড়াইয়ের দিন ঠিক করব। জিতলে পুরস্কার পাবে পঞ্চাশ পাউন্ড। এই লড়াইয়ের ব্যাপারটা কিন্তু সম্পূর্ণভাবে গোপন রাখতে হবে। আর একটা কথা। লড়াইতে পরাজিত হলে কিন্তু তুমি একটা পেনিও পাবে না।’
‘আমার যা বর্তমান অবস্থা, আপনার কথাই শেষ কথা। সব শর্ত মেনে নিলাম। তবে দুটো প্রশ্ন আছে। লড়াইয়ের রিংটা তো বড় হবে? আর লড়াইটা হবে লন্ডন থেকে কত দূরে?’
‘হ্যাঁ, বড় রিং। আর জায়গাটা লন্ডনের একশো মাইলের মধ্যেই।’
ক্রিব জিগ্যেস করল, ‘লড়াইয়ের সময় আমি কী ওর সহায়ক হতে পারি?’
মহিলা কড়াগলায় জবাব দিলেন, ‘না! তুমি খালি ওকে প্রশিক্ষণ দিতে পরো।’ তারপর বিনাবাক্যব্যয়ে মহিলা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। একটু পরেই গাড়িটা চলে যাবার শব্দ শোনা গেল।
ক্রিব বলল, ‘এ তো দেখছি মুরগির লড়াইয়ের বেহদ্দ। তবে হ্যাঁ, পঞ্চাশ পাউন্ডের ব্যাপারটা আছে। তোমার পক্ষে ভালোই।’
তিন
পরের দিন থেকেই শুরু হয়ে গেল ট্রেনিং—হ্যাম্পস্টেড হিথ-এ। কিন্তু লড়াইয়ের তারিখ, প্রতিপক্ষের নাম, লড়াইয়ের স্থান ইত্যাদি জানা না থাকায় ট্রেনিংটা ঠিক জমছিল না। অবিশ্যি ক্রিব বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে, একজন ধনী মহিলার খামখেয়ালিপনার মূল্যে এই লড়াই হলেও টাকার অঙ্কটা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। এইসব কথাবার্তার মধ্যে হয়তো নিরুৎসাহ কাটাতেই, স্প্রিং ট্রেনিং-এর সময় নিষিদ্ধ একটা কাজ করে ফেলল। পাইপ ধরিয়ে ধূমপান।
ঠিক সেই সময়েই হঠাৎ এসে হাজির হলেন সেই মহিলা। ধোঁয়া বেরোনো পাইপ হাতে ওদের দুজনকে দেখে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন মহিলা। দৃষ্টিতে বিতৃষ্ণা। মাটিতে পা ঠুকে বললেন, ‘আচ্ছা, এই হচ্ছে ট্রেনিং!’
দুজনের অবস্থা যেন ক্রুদ্ধ মালকিনের সামনে দুটো শিকারী কুকুর। ক্রিব লজ্জিতভাবে বলতে লাগল, ‘আমরা দুঃখিত ম্যাডাম। একবারও ভাবিনি যে—’
—’যে আমি এখানে এসে পড়ব আমার অর্থের সদ্ব্যবহার হচ্ছে কিনা দেখতে।’ তারপর স্প্রিংয়ের দিকে তাকিয়ে হিসহিসে গলায় বললেন, ‘গাধা কোথাকার! তুমি তো হারবেই।’
স্প্রিং কিন্তু এবার ফোঁস করে উঠল। বলল, ‘আজেবাজে কথা বলবেন না। আমারও মানসম্মান আছে। মানছি ট্রেনিং-এর সময় ধূমপান করা উচিত হয়নি। কিন্তু প্রতিপক্ষের নাম, স্থান, তারিখ ইত্যাদি না জেনে ঠিকভাবে ট্রেনিং নেওয়া কী সম্ভব?’
ক্রিব বলল, ‘কথাটা ঠিক। প্রতিদ্বন্দ্বী কি পেশাদার কেউ? গ্যাসম্যান? বিল নীট? যা হোক, কথা দিচ্ছি লড়াইয়ের দিন ওকে একদম ফিট করে দেব।’
ঘৃণাভারে হেসে মহিলা বললেন, ‘তোমাদের কী ধারণা—পেশাদার বক্সার ছাড়া আর কেউ লড়তে পারে না?’
অবাক হয়ে ক্রিব বলল, ‘অ্যামেচার? শখের বক্সার? তার জন্যে তিন সপ্তাহের ট্রেনিং?’
‘আমি আর কিছুই বলব না। এটুকু বলছি যে, ট্রেনিং ঠিকমতো না করলে তোমাদের ছুড়ে ফেলে দিয়ে অন্য কাউকে খুঁজে নেব। যার সঙ্গে লড়াই হবে তাকে হারাতে গেলে ইংলন্ডের যে-কোনো বক্সারকে পুরো সময় ও শক্তি দিয়ে প্রস্তুত হতে হবে। ভালো কথা, এরপর কোনোদিন বেচাল দেখলে বা ট্রেনিং-এ ফাঁকি দিলে আর ওয়ার্নিং দেব না।’ তীব্র দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকিয়ে চলে গেলেন মহিলা।
কপালের ঘাম মুছে ক্রিব বলল, ‘আজ থেকে কিন্তু আমাদের সিরিয়াস হতে হবে।’
স্প্রিং গম্ভীরভাবে বলল, ‘আজ থেকেই।’
পরের পনেরো দিন মহিলা বিনা নোটিসে কয়েকবার এলেন, কিন্তু স্প্রিং-এর ট্রেনিং-এর বিষয়ে অভিযোগ করার কোনো সুযোগ পেলেন না। দিনে বত্রিশ মাইল দৌড়, আগুনতি স্কিপিং, গ্লাভস পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বালির বস্তায় ঘুষি মারা—এই শরীর নিঙড়োনো ট্রেনিং-এর শেষে একদিন গুরু ক্রিব সগর্বে ঘোষণা করল যে, শিষ্য স্প্রিং-এর শরীরে আর এক আউন্সও বাড়তি চর্বি নেই এবং ও যে-কোনো মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত।
প্র্যাকটিসের দিনগুলোয় একদিনই কেবল মহিলার সঙ্গে একজন এসেছিলেন। অল্পবয়সি এক অভিজাত শ্রেণির ভদ্রলোক, সুঠাম চেহারা। একটাই খুঁত—নাকটা থ্যাবড়া। তিনি চুপচাপ দেখছিলেন প্র্যাকটিসরত স্প্রিং-কে—তার উন্মুক্ত ঊর্ধ্বাঙ্গ যেন পাথরে খোদাই করা। মহিলা ভদ্রলোকটিকে জিগ্যেস করলেন, ‘কী মনে হয় তোমার? একে দিয়ে কাজ চলবে?’
কাঁধ ঝাঁকিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘দ্যাখো, আধুনিক ইংলন্ডে প্রাচীন ইটালির মনোবৃত্তি ঠিক খাপ খায় না। আমার কিন্তু ব্যাপারটা ভালো লাগছে না।’
‘ভালো তোমার লাগতেই হবে জর্জ। একটা শিক্ষা তো দেওয়া দরকার, না কি? আইনি পদ্ধতিতেও কোনো সুবিধা হবে না। তাই আমি ব্যাপারটা নিজের হাতে তুলে নিয়েছি। কোনো বাধাই মানব না।’
‘না, বাধা দেওয়ার কোনো প্রশ্ন নেই। তবে এই ব্যাপারে তোমার কোনো সহায়তাও আমি করতে পারব না। চলো, এবার ফেরা যাক। আমার আবার ওপেরার টিকিট কাটা আছে।’
ওঁরা দুজনেই চলে গেলেন।
চার
এবার এল সেই দিন। ক্রিব মহিলাকে জানাল, ‘ম্যাডাম, আমার আর কিছু করণীয় নেই। স্প্রিং পুরোপুরি ফিট ও প্রস্তুত। আর কিন্তু এক সপ্তাহ দেরি করলেও ওর ফিটনেস কমে যাবে।’
মহিলা সপ্রশংসভাবে স্প্রিংকে জরিপ করে বললেন, ‘আজ মঙ্গলবার। লড়াইটা হবে পরশু। মি. ক্রিব, আপনি বুধবার সকালে ওকে চেয়ারিং ক্রস স্টেশনে পৌঁছে দেবেন। ও ওখান থেকে টানব্রিজ ওয়েলস-এ চলে যাবে এবং উঠবে রয়াল ওক আর্মস হোটেলে। ও ওখানেই অপেক্ষা করবে যতক্ষণ পর্যন্ত বেগুনি রঙের ইউনিফর্ম পরা একজন কোচোয়ান ওর কাছে কোনো মৌখিক বা লিখিত নির্দেশ না নিয়ে আসে। ওই নির্দেশ অনুযায়ী তোমাকে কাজ করতে হবে।’
‘ম্যাডাম, আমি কি কোচ হিসেবে ওর সঙ্গে অন্তত টানব্রিজ ওয়েলস অবধি থাকতে পারি?’
‘অসম্ভব! তোমাকে অনেকেই চেনে। তুমি গেলে ব্যাপারটা চাউর হয়ে যাবে এবং আমার পরিকল্পনা যাবে ভেস্তে। আর স্প্রিং, তুমি কিন্তু বক্সিং-এর শর্টস বা জুতো নেবে না—তোমার পোশাক হবে একজন সাধারণ মেকানিক-এর মতো।’
এই বিচিত্র শর্তাবলী শুনে বেশ রেগে গিয়ে ক্রিব বলল যে, আগে জানা থাকলে এই ধরনের কাজে ও হাত দিত না।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত মহিলার জেদই বজায় থাকল। উনি যা চেয়েছিলেন ঠিক তাই তাই করা হল এবং ঘড়ি ধরে। ট্রানব্রিজ ওয়েলস-এর পথে আসন্ন শরৎঋতুর মনোরম আবহাওয়ায় গ্রামাঞ্চলের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে স্প্রিং একসময় পৌঁছে গেল নির্ধারিত হোটেলে। হোটেলে হালকা কিছু খাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এসে হাজির হল বেগুনি রঙের ইউনিফর্ম পরা একজন লোক। সে জিগ্যেস করল, ‘আপনিই কি মি. স্প্রিং? লণ্ডন থেকে আসছেন?’
‘হ্যাঁ, আমিই টম স্প্রিং।’
‘আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ঠিক একঘণ্টা পর আপনাকে আমার ফিটন গাড়িতে করে সঠিক গন্তব্যস্থানে পৌঁছে দেওয়ার। গাড়ি হোটেলের সামনে রাখা।’
বক্সিং প্রতিযোগিতার সময় দর্শকের ভিড়, সমর্থকদের উল্লাস, প্রতিপক্ষকে দেখে উত্তেজনা—এসব কিছুই নেই এখানে। আছে শুধু একাকীত্ব ও অনিশ্চয়তা। হোটেলের সোফাতেই মনমরা স্প্রিং একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করল, কিন্তু ঘুম এল না। মনে চাপা উত্তেজনা ও অস্থিরতা। ও উঠে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগল। এমন সময় লালমুখো একটা লোক দরজার কোণা থেকে মুখ বাড়িয়ে জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা, আপনি কি টম স্প্রিং?’
স্প্রিং সম্মতিসূচক উত্তর দিতেই লোকটা বলল, ‘আমার নাম কডেরী। আমিই এই হোটেলের মালিক। আমি স্যর বক্সিং ভীষণ ভালোবাসি। আশেপাশের কোনো ম্যাচ দেখতে ছাড়ি না। আপনার লড়াইও দেখেছি আমি। তা আপনি এখানে? আপনার শরীর দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি ম্যাচের জন্যে একদম তৈরি।’
‘আরে না না। একদিনের জন্যে গ্রামাঞ্চলে বেড়াতে এসেছি।’
‘মি. স্প্রিং, আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কিন্তু বলছে অন্য কথা। চলুন না, আমার গাড়িতে করে আপনাকে এখানকার বিখ্যাত পার্কটা দেখিয়ে আনি।’
এমন সময়ে একজন ওয়েটার এসে জানাল যে মি. স্প্রিং-এর জন্যে বাইরে একটা গাড়ি অপেক্ষা করছে। হোটেল মালিক চোখ কপালে তুলে বলল, ‘আপনার বুঝি এখানে চেনাজানা কেউ আছে?’
‘হ্যাঁ, চেনা একজনই আছে। গাড়ি পাঠিয়েছে। আমি বরং বিকেলে ফেরার পথে আপনার সঙ্গে চা খেয়ে যাব।’
পাঁচ
পূর্বপরিচিত সেই কোচোয়ানের ফিটন গাড়িতে বসতেই গাড়ি দ্রুতবেগে চলতে শুরু করল। আর হোটেল মালিক তড়িঘড়ি নিজের ঘোড়ার গাড়িটা বের করে ফিটনের পিছু পিছু চলতে লাগল।
কয়েক মাইল যাওয়ার পর হাইরোড ছেড়ে গাড়ি ঢুকে পড়ল একটা সংকীর্ণ রাস্তায়। দু’ধারে সোনালি হয়ে যাওয়া বীচ গাছের সারি। দীর্ঘাঙ্গী এক মহিলা সেই রাস্তায় হাঁটছিলেন। গাড়ি তাঁর কাছে এসে থেমে গেল। স্প্রিংকে তীক্ষ্মদৃষ্টিতে দেখে উনি বললেন, ‘আশা করি তুমি সম্পূর্ণ ফিট। কেমন লাগছে?’
‘আমি ঠিক আছি ম্যাডাম।’
মহিলা কোচোয়ানের পাশে বসে পথনির্দেশ দিতে থাকলেন। বেশ কয়েকটা নির্জন সংকীর্ণ রাস্তা ঘুরে গাড়ি এসে থামল একটা আবাদি জমিতে। চারদিকে অনেক ফার গাছ, নীচে ঝোপঝাড়। মহিলা স্প্রিংকে গাড়ি থেকে নামতে বলে নিজেও নামলেন। কোচোয়ানকে বললেন একটু দূরে অপেক্ষা করতে।
ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে একটা পায়ে চলার পথ। সেটা দিয়ে বেশ খানিকটা গিয়ে দেখা গেল একটা সুন্দর ঢেউ খেলানো পার্ক। পার্কে প্রচুর ওক গাছ। আর পার্কের শেষপ্রান্তে একটা প্রাসাদের মতো সুন্দর বাড়ি। পার্কের দিক থেকে ঝোপঝাড়ের দিকে হেঁটে আসছে এক ব্যক্তি।
মহিলা স্প্রিং-এর হাত ধরে লোকটিকে দেখিয়ে বললেন, ‘এ-ই হচ্ছে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী।’
লোকটি ওদের দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু এরা দুজনেই ওকে দেখতে পাচ্ছে। লোকটি লম্বা, শক্তপোক্ত চেহারা, পরনে একটা নীল রঙের কোট, কোটের বোতামগুলো সোনালি। স্প্রিং বলল, ‘ম্যাডাম দেখে তো মনে হচ্ছে ইনি বড়লোক, অভিজাত ঘরের মানুষ। ইনি তো আমার কোনো ক্ষতি করেননি। এঁর সঙ্গে আমি কী করব?’
‘লড়বে! প্রচণ্ড মার মারবে!’
ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল স্প্রিং, ‘আমি বক্সিং লড়তে এসেছি। কাউকে মারতে আসেনি।’
‘বুঝেছি। তুমি ওকে দেখে ভয় পেয়েছ। তাই কাপুরুষের মতো পালাতে চাইছ। তুমি জানো ও আমাদের দেশের যে-কোনো অ্যামেচার বক্সারকে হারিয়ে দিতে পারে? তাছাড়া পঞ্চাশ পাউন্ড রোজগারের সুযোগও ছেড়ে দিতে চাও তুমি?’
এবার একটু স্বস্তি পেল স্প্রিং। টাকার ব্যাপারটা তো আছেই, তাছাড়া লোকটা যদি সত্যিই বক্সিং জানে, তাহলে লড়তে ক্ষতি কী? তবুও জিগ্যেস করল, ‘আপনি কী করে জানলেন যে ও ভালো বক্সার?’
‘আমি ওর স্ত্রী।’ বলেই মহিলা জঙ্গলের দিকে চলে গেলেন।
লোকটা অনেকটা কাছে এসে গেছে। ওকে ভালো করে দেখতে পেয়ে স্প্রিং একটু ঘাবড়েই গেল। চওড়া বুক, মুখের ভাব কর্কশ, ওষ্ঠ দৃঢ়বদ্ধ—বয়স ত্রিশের মতো, ওজন অন্তত পঁচানব্বই কিলো। হাঁটাচলা অ্যাথলিটের মতো। লোকটা স্প্রিংকে হঠাৎ দেখতে পেয়ে অত্যন্ত রূঢ়ভাবে জিগ্যেস করল, ‘কী ব্যাপার? তুমি কে? আমার জমিতে এসে কী করছ?’
মাথা গরম হয়ে গেল স্প্রিং-এর। ও বলল, ‘ভদ্রভাবে কথা বলুন।’
হাতের চাবুকটা একবার হাওয়ায় ঘুরিয়ে নিয়ে লোকটা বলল, ‘বদমাস কোথাকার! তোমাকে আমি লাথি মেরে এখান থেকে বের করে দেব।’
‘আস্তে, আস্তে। দেখুন, আমার নাম হয়তো আপনি শুনে থাকবেন। আমি বক্সার টম স্প্রিং।’
‘দেখেই মনে হচ্ছিল ওই প্রজাতিরই জীব তুমি। তোমার মতো কয়েকটার সঙ্গে আগে লড়েছি। কেউই পাঁচ মিনিটও আমার সামনে দাঁড়াতে পারেনি। তুমি লড়বে আমার সঙ্গে?’
‘আপনি যদি আমাকে আঘাত করেন তবেই—’
বলতে বলতেই স্প্রিং-এর কাঁধে সপাং করে পড়ল চাবুক। লোকটা বলল, ‘এবার লড়বে?’
শুকনো ঠোঁট ভিজ দিয়ে কেটে স্প্রিং বলল, ‘আমি লড়তে এসেছি। চাবুকটা ফেলে দিন।’
লোকটার আত্মবিশ্বাস, অসাধারণ শক্তিশালী শারীরিক গঠন, পেশীবহুল রোমশ বাহু—এসব দেখে লড়তে আর কোনো দ্বিধা রইল না স্প্রিং-এর মনে। লোকটার কথামতো দুজনে এল একটা খোলা জায়গায়। লোকটা কোটটা খুলে ঝোপের ওপর রেখে জামার হাত গুটিয়ে দাঁড়াল। স্প্রিং-ও খুলে ফেলল টুপি আর কোট। লোকটা ঠান্ডা গলায় স্প্রিং-কে জিগ্যেস করল, ‘বক্সিং লড়বে নাকি মারপিট করবে?’
‘বক্সিং লড়ব।’
‘বেশ। হাত তুলে দাঁড়াও। দ্যাখো কেমন লাগে।’
দুজনে এখন মুখোমুখি। ঘন ভ্রুর নীচে লোকটার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে, ঠোঁটে উদ্ধত হাসির রেশ। ওর দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখেই বোঝা যায় ও বক্সিং-এ মাস্টার। স্প্রিং একটা আলতো ঘুষি চালাতেই লোকটা হাতুড়ির মতো কয়েকবার স্প্রিং-এর ওপর হাত চালাল। বহুকষ্টে নিজেকে বাঁচাল স্প্রিং। ও আবার তেড়ে গেল, কিন্তু হাড় ও পেশীর মিলিত শক্তিতে ঘুষির যে ঘূর্ণিঝড় স্প্রিং-এর ওপর দিয়ে বয়ে গেল, তার অভিঘাতে ও পড়ে গেল মাটিতে এবং ওর ওপর লোকটা।
দুজনেই আবার উঠে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হল। বোঝাই যাচ্ছিল লোকটার ওজন এবং শক্তি স্প্রিং-এর তুলনায় বেশি। ও আরও দুবার স্প্রিংকে ধরাশায়ী করল—একবার ঘুষির বর্ষণে এবং আর একবার ওকে প্রায় তুলে আছাড় মেরে। অন্য কেউ হলে এতক্ষণে রণে ভঙ্গ দিত। কিন্তু মার খাওয়া তো স্প্রিং-এর পেশার দৈনন্দিন রুটিন। দুবারই উঠে দাঁড়াল ও—আঘাতের স্থানে কালশিটে, মুখের কষ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে।
এতক্ষণে স্প্রিং ধরে ফেলেছে ওর প্রতিপক্ষের তেড়ে এসে মারার পদ্ধতিটা। লোকটা এবার তেড়ে আসতেই ও নিজের জায়গা থেকে না সরে বাঁ-হাতটা চালাল। মারের পেছনে শরীরের সব শক্তি। এত জোরে স্প্রিং মেরেছিল যে ও নিজেই প্রায় মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল। আর ওর প্রতিদ্বন্দ্বী দুহাতে মুখ ঢেকে একটা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে হাঁপাতে লাগল।
স্প্রিং বলল, ‘এবার থামুন। নইলে কিন্তু বিপদ আছে।’
লোকটা মুখের ভেতরের রক্ত থুতুর মতো ফেলে বলল, ‘চলে এসো।’
লোকটা এবার হাত-পায়ের সঙ্গে মাথার বুদ্ধি দিয়ে লড়তে লাগল। দারুণ ডিফেন্স, আঘাত সহ্য করার অসীম ক্ষমতা, বিদ্যুতের বেনো ঘুষির উত্তরে পাল্টা ঘুষি—স্প্রিং ভাবল, লোকটা যদি ট্রেনিং নিয়ে নামত তাহলে ওকে হারানো অসম্ভব হত। কিন্তু ওর সেই ঘুষির প্রভাবে লোকটার ত্বরিতগতি ও মারের জোর দুটোই একটু কমে গেছিল। পেশাদার এবং ঠান্ডা মাথার স্প্রিং-এর উপযুর্পরি আক্রমণে লোকটা ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। অবশেষে সম্পূর্ণ পরিশ্রান্ত হয়ে লোকটা দাঁড়াল—বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে, মুখের যেটুকু অক্ষত তা পরিশ্রমে রক্তবর্ণ।
স্প্রিং স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এবার তো শেষ করুন। আপনার আর লড়ার ক্ষমতা নেই।’
বোধহয় লোকটার পৌরুষে আঘাত লাগল। রাগে অন্ধ হয়ে বক্সিং-এর ব্যাকরণ ভুলে ও উন্মাদের মতো দু’হাতে এলোপাথাড়ি ঘুষি চালাতে চালাতে তেড়ে এল। স্প্রিং দ্রুত পাশে সরে গিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে একটা ঘুষি মারল। লোকটা হাত দুটো তুলে কাটা কলাগাছের মতো চিৎ হয়ে পড়ল মাটিতে, ক্ষতবিক্ষত মুখ আকাশের দিকে।
স্প্রিং তাকিয়েছিল অচৈতন্য ও পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে। এমন সময় ওর বাহুতে পেল উষ্ণ নরম হাতের স্পর্শ। সেই মহিলা! তাঁর চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। বললেন, ‘এই তো সুযোগ! মারো ওকে! মেরে ওর হাড়গোড় ভেঙে দাও। তোমাকে পঞ্চাশ নয়, পঁচাত্তর পাউন্ড দেব।’
ঘৃণামিশ্রিত অবজ্ঞায় স্প্রিং বলল, ‘লড়াই শেষ ম্যাডাম। ওকে আমি এখন স্পর্শও করব না।’
‘ঠিক আছে—একশো পাউন্ড দেব। এবার তো রাজি?’
স্প্রিং হাঁটা দিতেই মহিলা ভূপতিত লোকটিকে লাথি মারার চেষ্টা করলেন। স্প্রিং পিছন ফিরে মহিলাকে টেনে সরিয়ে এনে বলল, ‘পরাজিত আহত একজন মানুষকে আঘাত করতে আপনার লজ্জা করে না?’
আহত লোকটা এবার মুখে গোঙানির মতো শব্দ করতে করতে প্রথমে উঠে বসল। তারপর টলমল করে কোনোক্রমে দাঁড়াল। কাঁধ ঝাঁকিয়ে ও স্প্রিংকে বলল, ‘একদম নিয়ম মেনে লড়াই হয়েছে। আমার কোনো অভিযোগ নেই। তুমিই জিতেছ।’ তারপরেই মহিলাকে দেখতে পেয়ে বলল, ‘তুমি? বুঝেছি ব্যাপারটা।’
মহিলা ব্যঙ্গের সুরে বলল, ‘হ্যাঁ আমিই। এসব কিছু আমিই করিয়েছি। আরো কিছু করানোর ইচ্ছে ছিল। তবে তোমার মুখের যা অবস্থা হয়েছে বেশ কিছুকাল কোনো মহিলা তোমার দিকে ফিরেও তাকাবে না।’
লোকটা রাগে অন্ধ হয়ে হাতের চাবুকটা দিয়ে মহিলাকে মারতে গেল। কিন্তু স্প্রিং একলাফে গিয়ে পড়ল দু’জনের মাঝে।
লোকটা বলল, ‘মেরে যার নাকটা ভেঙে দিয়েছিলাম সেই জর্জের সঙ্গে বুঝি তোমার সম্পর্ক শেষ? এখন এই পেশাদার বক্সারটা কি তোমার বন্ধু? তোমাদের দুজনকে আমি কোর্টে তুলব—অনধিকার প্রবেশ এবং আমাকে মারার জন্য।’ বলেই লোকটা একটা হুইসল বাজাতে বাজাতে বাড়ির দিকে দৌড়ল।
মহিলা পাংশুমুখে বললেন, ‘ও এক্ষুনি এই অঞ্চলের সমস্ত লোককে জড়ো করবে। আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করা যাবে না। চলো, এক্ষুনি পালাতে হবে।’
ফিটন গাড়ির দিকে দৌড়তে দৌড়তে ওরা দেখল বন্দুকধারী একজন গার্ড হুইসলের আওয়াজের দিকে দ্রুতপদে যাচ্ছে। খেতের দুজন শ্রমিক গাঁইতি হাতে ওদের লক্ষ্য করছে।
মহিলা একলাফে ফিটনে উঠে স্প্রিং-এর হাতে ছুড়ে দিলেন পঞ্চাশ পাউন্ডের একটা নোট। কোচোয়ানকে বললেন, ‘জোরে চালাও জনসন।’
‘আমি কোথায় যাব ম্যাডাম?’ স্প্রিং জিগ্যেস করল।
‘তুমি গোল্লায় যাও।’ গাড়ি চলে গেল।
ছয়
স্প্রিং একা। একটু দূরে শোনা যাচ্ছে লোকজনের হইহল্লা, কুকুরের ডাক এবং মুহুর্মুহু হুইসলের আওয়াজ। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত স্প্রিং-এর শরীরে ব্যথা এবং মনে অপমানের জ্বালা। খানিকটা দৌড়ে ঝোপের কাছ থেকে একটা কঞ্চি কুড়িয়ে নিয়ে ও রাস্তার ধারেই বসে পড়ল। কেউ আক্রমণ করলে তখন দেখা যাবে।
কিন্তু শত্রু নয়—এক বন্ধুই এসে পড়ল। রয়াল ওক হোটেলের মালিক একটা ঘোড়ার গাড়ি চালাতে চালাতে চেঁচিয়ে বলল, ‘উঠে আসুন, মিঃ স্প্রিং। চারদিক থেকে মানুষ, কুকুর সব এদিকেই আসছে।’
স্প্রিং গাড়িতে উঠে বসতেই জোরে গাড়ি চালিয়ে দিল লোকটা। আর মুখ খুলল পাক্কা দু’মাইল পরে। লাগামটা ঢিলে করে স্প্রিং-এর পিঠ চাপড়ে ও বলল, ‘অপূর্ব! অসাধারণ!’
বিস্মিত স্প্রিং জিগ্যেস করল, ‘আপনি লড়াইটা দেখেছেন?’
‘প্রত্যেকটা রাউন্ড দেখেছি। দেখে চক্ষু সার্থক করলাম। লর্ড পড়ে গেলেন, লেডি ঝোপের আড়াল থেকে হাততালি দিলেন—সব দেখেছি। আপনাকে এ তল্লাটে দেখেই বুঝেছিলাম যে লড়াই একটা হবেই। তাই আপনাদের অনুসরণ করে এখানে আসি।’
স্প্রিং জিগ্যেস করল, ‘আপনি ”লর্ড” বলতে কাকে বোঝাচ্ছিলেন?’
‘যার সঙ্গে আপনি লড়লেন, উনিই তো ফ্যালকন ব্রিজের লর্ড। খুবই গণ্যমান্য ব্যক্তি। আপনি জানতেন না? ভালোই হয়েছে না জেনে। জানলে অত জোরে মারতে পারতেন না এবং নির্ঘাত হারতেন। এই অঞ্চলে বক্সিং-এ ওঁর সঙ্গে মোকাবিলা করার মতো কেউ নেই। দু-তিনটে চোর-ডাকাতকে তো একা উনিই ঠান্ডা করে দেন। ওঁকে এদিকের সবাই যমের মতো ভয় পায়। তবে আপনি দারুণ লড়েছেন।’
হোটেলে পৌঁছে স্নান খাওয়া সেরে স্প্রিং হোটেল মালিককে নিজের কাহিনিটি সবিস্তারে জানাল। সবটা শুনে হোটেল মালিক গত বছরের স্থানীয় খবরের কাগজের একটা কাটিং এসে স্প্রিংকে পড়তে দিল। খবরটির সারমর্ম এই রকমঃ
ফ্যালকনব্রিজের লর্ড ও লেডির পারস্পরিক সম্পর্কে একটু চিড় ধরেছে বলে সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে। লর্ড বাড়ির গভর্নেস-এর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতান বলে লেডিও জর্জ বলে এক সুপুরুষ ভদ্রলোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন। ব্যাপারটা জানতে পেরে লর্ড একদিন লেডির সামনেই জর্জকে এমনভাবে প্রহার করেন যে তার নাকমুখের চেহারা বদলে যায়। লর্ড চেয়েছিলেন যে, জর্জের দিকে যেন আর কোনো মহিলা ফিরেও না তাকায়। এই ঘটনার পরই লেডি লর্ডকে ছেড়ে লন্ডনে চলে যান সম্ভবত জর্জের শুশ্রূষার জন্যে। অনেকের আশঙ্কা—লর্ড এবং জর্জের মধ্যে হয়তো একটা দ্বন্দ্বযুদ্ধ (ডুয়েল) হতে পারে।
হোটেল মালিক বলল, ‘ডুয়েলটা লেডি ফ্যালকন ব্রিজ আপনাকে দিয়ে লড়ালেন। আপনি এখন হাই সোসাইটির লোক মিঃ স্প্রিং।’
কালশিটে পড়া ফোলা মুখের ওপর হাত বোলাতে বোলাতে স্প্রিং বলল, ‘আমার লো সোসাইটিই ভালো।’
