অতিথি – আর্থার কোনান ডয়েল
অতিথি
জন র্যান্টার ছিল সাদাম্পটনের এক পানশালার প্রাক্তন মালিক। ওর লম্বাচওড়া চেহারা আর উগ্র মেজাজের জন্যে কেউ ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী ছিল না, শত্রুতা তো নয়ই। এই বাহান্ন বছর বয়সেও র্যান্টারের চরিত্রে ও আচরণে কোমলতার লেশমাত্র নেই। ওর জীবনভর দুর্ভাগ্যের কারণ এই বদমেজাজ। বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে ছোটবেলায় বাড়ি ছেড়ে চলে যায় র্যান্টার। তারপর একটু একটু করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ও একটি মেয়েকে বিয়ে করে। মেয়েটি সুশ্রী, কিন্তু স্বভাবে ভীরু ও ব্যক্তিত্বহীন। ওদের একটি ছেলে হয়েছিল, কিন্তু একদিন ছোটখাটো কোনও দুষ্টুমি করার জন্যে র্যান্টার ছেলেটিকে এমন মেরেছিল যে, ছেলেটি বাড়ি ছেড়ে চলে যায় এবং একটি জাহাজে খালাসির কাজ নেয়। পরে খবর আসে যে জাহাজটি নাকি ডুবে গিয়েছিল।
এর পর থেকে র্যান্টারের মেজাজ আরও বিগড়ে যায়। সেই কারণে পানশালার খদ্দেররা পানশালায় আসা কমিয়ে দেয়। তখন বাধ্য হয়েই র্যান্টার তার ব্যবসা বিক্রি করে সেই টাকায় একটা ছোট বাড়ি কিনল—পোর্টসমাউথ-সাদাম্পটন রোডের ওপর, শেষোক্ত শহর থেকে মাইল তিনেক দূরে। শুরু হল স্ত্রীর সঙ্গে ওর নির্জনবাস, মনে সমগ্র মানবজাতির প্রতি বিদ্বেষ।
প্লাস্টারবিহীন ইট দিয়ে তৈরি আর খড় দিয়ে ছাওয়া এই নির্জনতা-ঘেরা কটেজটি সম্বন্ধে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা শোনা যেত। গাড়ির চালকরা বলাবলি করত যে পক্ককেশ, রাগী দেখতে একটা লোক কটেজ সংলগ্ন বাগানে সারাদিন বসে থাকে আর মাঝে মাঝে দরজার ফাঁকে দেখা যায় একটা বিষণ্ণ মুখ। কখনও বা নাকি শোনা যায় রাগে ভরা কণ্ঠস্বর, আঘাতের শব্দ ও নারীকণ্ঠে কান্নার আওয়াজ। বাড়িটাকে কেমন যেন অভিশপ্ত মনে হতো, তাই ঘোড়ার পিঠে চাবুক মেরে তাড়াতাড়ি বাড়িটা পেরিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যেত চালকরা।
শরৎকালের এক ঝকঝকে বিকেলে র্যান্টার তার কটেজের গেটে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল—মুখে পাইপ। তার মনে অনেক চিন্তা। এইভাবেই বাকি জীবনটা কাটবে? নাকি যেটুকু টাকা এখনও হাতে আছে তা দিয়ে নতুন কিছু শুরু করবে? একদিকে সর্বস্বান্ত হয়ে যাবার ভয়, অন্য দিকে এখনও অবশিষ্ট নিজের যুবকসুলভ শক্তি-সামর্থ্য সম্বল করে ভাগ্যের চাকার ঘোরানোর আশা। পনেরো বছর আগে ঘর ছেড়ে যাওয়া নিজের ছেলেটা আজ সঙ্গে থাকলে কাজে লাগত। এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে র্যান্টার দেখল অস্তগামী সূর্যের আলোয় সাদাম্পটনের দিক থেকে লম্বা ধূসর ওভারকোট পরা একটা লোক এদিকেই আসছে।
লোকজন তো মাঝে মাঝেই বাড়ির সামনে দিয়ে যাতাযাত করে, কিন্তু এই লোকটির দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ আকৃষ্ট হল র্যান্টারের। লম্বা, অ্যাথলিটের মতো শরীর, হলদেটে গোঁফজোড়া আর রোদে পোড়া তামাটে রঙের এক যুবক। ওর অদ্ভুত ধরনের টুপি আর ধূসর রঙের কোটটাও নজরে পড়ে। যুবকের পিঠে চামড়ার ফিতে দিয়ে ঝোলানো একটা বড় কালো ব্যাগ।
যুবক র্যান্টারের বাড়ির গেটের কাছে এসে হাঁটার গতি কমাল এবং একটু ইতস্তত করে র্যান্টারকে জিগ্যেস করল—আচ্ছা, পোর্টসমাউথ সকালে পৌঁছোতে গেলে কি সারারাত হাঁটতে হবে? যুবকের কণ্ঠস্বর একটু ধাতব।
র্যান্টার যুবকের বলার ভঙ্গি ও কণ্ঠস্বর নকল করে বলল, তাই তো মনে হয়। এই তো যাত্রার শুরু।
—তাহলে তো সব গন্ডগোল হয়ে গেল। এর থেকে তো সাদাম্পটনের সরাইখানায় একটা রাত থেকে গেলেই হতো!
—সরাইখানায় থাকলে না কেন?
চোখ টিপে বলল আগন্তুক—সরাইখানার মালিক আর চোরের মধ্যে বিশেষ কিছু পার্থক্য নেই। আমার সঙ্গের জিনিসগুলো রক্ষা করার জন্য সরাইখানায় না থাকলেই ভালো।
—ও! তাহলে তোমার কাছে মূল্যবান কিছু আছে? র্যান্টার আড়চোখে যুবকটির বড় ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে নিজের কাঠখোট্টা ভাবটাকে যতটা সম্ভব নরম করে জিগ্যেস করল।
যুবকটি গলা নামিয়ে বলল, দেখুন, আমি আমেরিকায় নেভাডা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় সোনার খনিতে কাজ করতে গেছলাম। প্রাপ্তিযোগ মন্দ হয়নি। তারপর স্যানফ্রান্সিসকো থেকে জাহাজে করে আজই সাদাম্পটনে পৌঁছেছি। কাস্টমস-এর লোকেরা খুব দেরি করিয়ে দিল। পোর্টমাউথে আমার পরিচিতজনরা আছে। কিন্তু জায়গাটা যে এত দূরে তা জানতাম না। আর এরকম একটা ব্যাগ পিঠে নিয়ে ঘুরলে লোকের তো নজরে পড়বেই।
—তোমার চেনা লোকজন কি পোর্টসমাউথে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে?
—আরে, সেটাই তো মজা! আমি কাউকে জানাইনি যে দেশে ফিরছি। ওরা হয়তো খাবার টেবিলে বসে, আর আমি হঠাৎ করে ঘরে ঢুকলাম আর ব্যাগ থেকে সব কিছু বের করে টেবিলের ওপর রেখে দিলাম! কেমন সারপ্রাইজ হবে বলুন তো? ব্যাগটা মাটিতে নামিয়ে হাসতে হাসতে বলল যুবকটি।
—সব কিছু?
—হ্যাঁ, মানে ডলার।
—তোমার সব কিছু বলতে পুরোটাই সোনায় না ডলারে?
—না স্যার, তা নয়। বেশির ভাগটাই ডলারে ও শেয়ারে এবং সেগুলো আলদাভাবে ভালো করে প্যাক করা আছে। খালি আটশো ডলার হাতের কাছে রাখা ওই মজাটুকু করার জন্যে। কিন্তু আজ তো আর তা করা যাবে না। দেখি কোনও সরাইখানা পাই কিনা!
এবার কিছুটা ব্যাকুলভাবে র্যান্টার বলল, না, না, সরাইখানায় যেয়ো না। এই অঞ্চলের সরাইখানাগুলোয় খুব বাজে লোকের আড্ডা। বহু নাবিক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেছে পকেট গড়ের মাঠ। তুমি বরং কোনও ভদ্র বাড়িতে অনুরোধ করে রাতটুকু সেখানে কাটিয়ে দাও।
—দেখুন, আমি তো এ অঞ্চলের কিছুই চিনি না। আপনি যদি একটা থাকার জায়গার সন্ধান দেন, তাহলে খুব ভালো হয়।
—অবশ্য আমার বাড়িতেই একজন রাখার মতো ব্যবস্থা আছে। তুমি রাতটা এখানে কাটালে আমরা খুশিই হব। আমাদের অতি সাধারণ ছোট পরিবার; আমি ও আমার স্ত্রী। তবে বাড়িতে আগুন পোহানোর ও গরম খাবারের ব্যবস্থা আছে।
—বেশ, তাহলে তো সমস্যা মিটেই গেল। এই বলে যুবকটি নুড়ি-বাঁধানো পথটুকু দিয়ে এগিয়ে এল। রাতের ছায়া তখন নেমে আসছিল। দূরে কোথা থেকে একটা প্যাঁচার আওয়াজ শোনা গেল।
মিসেস র্যান্টারের তিরিশ বছর আগেকার চেহারার সঙ্গে আজকের চেহারার কোনও মিল নেই। তার চুল গেছে পেকে, ম্লান মুখে বিষণ্ণতার ছাপ। চলাফেরায় ভীতসন্ত্রস্ত ভাব। যুবকটিকে কষ্টকৃতভাবে অভ্যর্থনা জানাল মহিলা। শুয়োরের মাংসের একটা বড় অংশ ঝুলছিল রান্নাঘরের চালের বরগা থেকে। তার থেকে খানিকটা কেটে নিয়ে পাতলা পাতলা টুকরো করে রান্না শুরু করে দিল মিসেস র্যান্টার। যুবক চেয়ারের নীচে পিঠের ব্যাগটা রেখে তারপর চেয়ারে বসল।
ও পাইপ ধরাতে র্যান্টারও পাইপে তামাক ভরতে ভরতে মোটা ভ্রু-র নীচের থেকে আড়চোখে ওকে দেখতে থাকল।
—তুমি বরং কোটটা খুলেই ফ্যালো। বলল র্যান্টার।
—কিছু মনে করবেন না। ওটা আমি পরেই থাকব। এই কোটটা আমি কখনওই খুলি না।
—ঠিক আছে। আমি ভাবছিলাম কোট গায়ে তোমার গরম লাগবে।
যুবক কোনও উত্তর দিল না। দুজনেই চুপচাপ রান্নার দিকে তাকিয়ে রইল। পাত্রের ওপর মাংস রান্নার ছ্যাঁকছোঁক আওয়াজ।
অনেকক্ষণ পরে র্যান্টার জিগ্যেস করল, তুমি কোন জাহাজে এলে?
—তিন-মাস্তুলের একটা জাহাজ। নাম ‘মারি রোজ’। চামড়া আর কী সব মাল আসছিল জাহাজটায়। ম্যাডাম, আমি কি আপনার যাতায়াতের রাস্তা আটকাচ্ছি?
—না, না। বলে উঠল মিসেস র্যান্টার। যুবক মহিলাকে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে দেখছিল।
যুবক বলল, জাহাজের ক্যাপ্টেন আর কর্মচারীরা হয়তো ভাবছে আমার কী হল। ওদের কোনও কথা না বলেই আমি জাহাজ ছেড়ে এসেছি। অবশ্য আমার বাকি মালপত্তর জাহাজেই রাখা আছে। ওরা বুঝতে পারবে, আমি চিরতরে চলে আসিনি।
র্যান্টার প্রায় আলতোভাবে একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, জাহাজ ছাড়ার পর কারও সঙ্গে কি কথা বলেছিলে তুমি?
—না।
—রান্না তৈরি। চলো, খাওয়া যাক। এই জগে আর ওই বোতলে পানীয় আছে—যেটা ইচ্ছে নিয়ে নাও।
টেবিলে বসে তিনজনে জমিয়ে খেতে লাগল। যুবকের হাসিখুশি মুখের জন্যে আর মজার মজার কথায় মিসেস র্যান্টারও তার বিষণ্ণভাব যেন অনেকটা কাটিয়ে উঠল। একটু-আধটু কথাও বলতে লাগল। পাড়ার পিয়োন কুটিরের জানালা দিয়ে ভেতরে ঝলমলে আলো দেখে আর হাসির আওয়াজ শুনে বেশ অবাক হল।
একটু নজর করলেই যে কেউ বুঝতে পারত যে, জন র্যান্টার যুবকের পরনের ওভারকোটটির ব্যাপারে একটু বেশি মাত্রায় কৌতূহলী। ও শুধু বারবার আড়চোখে যে কোটটা দেখছিল তা-ই নয়, দুবার কোনও ছুতোয় চেয়ার থেকে উঠে যুবকটির কাছে গিয়ে, যেন হঠাৎ হাত লেগে গেছে এমন ভাব করে, বুকের পাশে কোটের ওপর হাত বুলিয়ে নিল। অবশ্য ব্যাপারটা যুবকটির বা মিসেস র্যান্টারের নজরে পড়ল না।
খাওয়ার পর র্যান্টার ও যুবকটি চেয়ার দুটো আগুনের কাছে টেনে নিয়ে বসল। মহিলা বাসনগুলো ধুচ্ছিল। যুবক গল্প করছিল তার ক্যালিফোর্নিয়ায় কাটানো দিনগুলি নিয়ে—কেমন করে সে ধনরত্ন পেয়েছে, ওখানে খনিতে এখনও আরও কত সোনাদানা রয়ে গেছে ইত্যাদি। এসব শুনে র্যান্টারের চোখ দুটো চকচক করে উঠল।
—ওখানে যেতে কীরকম খরচা পড়বে? র্যান্টারের প্রশ্ন।
—একশো পাউন্ডের মতো নিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হবে।
—তেমন বেশি কিছু নয় তো!
—তা-ই তো বলছি। বুঝিই না লোকে কেন ইংল্যান্ডে পড়ে থাকে, যখন ওখানে গেলে অনেক টাকা কামানো যায়। আচ্ছা স্যার, এবার আমায় অনুমতি দিন। আমি আবার তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি আর খুব ভোরে উঠি। ম্যাডাম যদি দয়া করে আমাকে শোওয়ার ঘরটা দেখিয়ে দেন—
—আর একটু পানীয় চলবে না? না! ঠিক আছে, তাহলে শুভরাত্রি। লিজি, তুমি মি…মি…
—মিঃ গুডল, বলল যুবকটি।
—লিজি, তুমি মিঃ গুডলকে ঘরটা দেখিয়ে দাও তো! আশা করি তোমার ঘুম ভালো হবে।
—আমার ঘুম সবসময়ই ভালো হয়। যুবক এবার মাথা নেড়ে ব্যাগ হাতে ধপধপ করে পা ফেলে আলো হাতে মিসেস র্যান্টারের পেছনে পেছনে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে গেল।
যুবকটি ওপরে যেতেই র্যান্টার প্যান্টের দু-পকেটে হাত ঢুকিয়ে পা ছড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট সরু করে গম্ভীরভাবে আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর মাথায় চিন্তার জট। বুঝতেও পারল না ওর স্ত্রী কখন নীচে নেমে এসেছে। স্ত্রী কিছু বলছিল, শুনতেও পেল না। রাত সাড়ে দশটায় ছেলেটি ওপরে শুতে চলে গেছে, অথচ রাত বারোটার সময়েও র্যান্টার ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুনের দিকে তাকিয়ে বসে—মুখে একই রকম চিন্তার ছাপ। অবশেষে মিসেস র্যান্টার যখন শুতে যাবার কথা বলল, তখন র্যান্টারের সম্বিৎ ফিরল।
—না লিজি, আমরা দুজনেই আরও কিছুক্ষণ জেগে থাকব। র্যান্টারের গলার স্বরে লিজিকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।
হেসেই উত্তর দিল মহিলা, ঠিক আছে, জন।
—ছেলেটি ওপরেই শুয়ে আছে তো?
—কে? ও! মিঃ গুডল। হ্যাঁ। আমি তো ওকে আমাদের বাড়তি ঘরটাতে পৌঁছে দিয়ে এলাম।
—কী মনে হয়? ও ঘুমোচ্ছে?
—মনে তো হয় ঘুমোচ্ছে। দেড় ঘণ্টা হল শুতে গেছে।
—দরজায় কি চাবি আছে?
—না। তুমি আজ হাবিজাবি কী সব প্রশ্ন করছ?
খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর আগুন খোঁচানোর লোহার শিকটা হাতে নিয়ে নাড়তে নাড়তে একটু সন্ত্রস্ত স্বরে র্যান্টার বলল, লিজি, পৃথিবীতে কেউ জানে না যে ওই ছেলেটা আজ রাতে আমাদের বাড়িতে এসেছে। ও যদি এ বাড়ি ছেড়ে না যায়, তাহলেও কেউ জানবে না ওর কী হয়েছে, এমনকী ওকে খোঁজার চেষ্টাও করবে না।
লিজি নিরুত্তর, কিন্তু ঠোঁট সমেত ওর মুখ ফ্যাকাশে, রক্তশূন্য।
—ওর ব্যাগে, জানো লিজি, আটশো ডলার আছে। আমাদের হিসেবে প্রায় দেড়শো পাউন্ড। তা ছাড়া, ওর কোটের লাইনিং-এর মধ্যে সেলাই করে রাখা আছে টুকরো টুকরো সোনা। তাই ও কোটটা কিছুতেই খুলছিল না। আমি হাত বুলিয়ে দেখেছি কোটের ওপরটা ফোলা ফোলা গাঁটের মতো। এসব পেলে আমরাও ওর মতো সেই দেশে চলে যেতে পারব—
মিসেস র্যান্টার স্বামীর পায়ের কাছে বসে ওর হাঁটু দুটো ধরে আর্ত স্বরে বলে উঠল, ভগবানের দোহাই! আমার কথা ভেবে, ওই ছেলেটির বয়সি আমাদের গৃহত্যাগী সন্তানের কথা মনে করে, তুমি এসব কথা চিন্তাও কোরো না। আমরা গরিব-বড়লোক যা-ই হই, আমাদের বয়স হয়েছে আগামী কয়েক বছরেই আমরা এ জগতের মায়া কাটাব। হাতে রক্তের চিহ্ন নিয়ে এ জগৎ থেকে যেয়ো না। ওই ছেলেটাকে ছেড়ে দাও।
র্যান্টার কিন্তু একদৃষ্টে আগুনের দিকে তাকিয়ে। ওর গম্ভীর ভাবলেশহীন মুখে এক মুহূর্তের জন্যেও কোনও শিথিলতা দেখা গেল না। ওর চোখে যেন শিকারি জানোয়ারের বীভৎস, হিংস্র দৃষ্টি।
র্যান্টার বলল, দ্যাখো, এমন সুযোগ জীবনে হয়তো আর কখনও আসবে না। এরকম সুযোগ পেলে অনেকেই বর্তে যেত। ব্যাপারটা আর কিছুই নয়—হয় আমার জীবন, নয় ওর। তোমার মনে আছে, আমার যখন মৃগীরোগ ধরা পড়েছিল, ডাক্তার বলেছিল যে আমাদের জীবনে আসবে অনেক দুঃখ, কষ্ট আর হতাশা। আমার হতভাগ্য জীবন ওইসবেই ভরা। কিছু টাকা পেয়ে জীবনটা যদি আবার নতুনভাবে শুরু করি, তাহলে হয়তো সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। আমি কিন্তু এই কাজটা করবই!—বলে লোহার শিকটাকে নিজের বড় বড় হাতে শক্ত করে ধরল র্যান্টার।
—না, এ কাজ তুমি কখনওই করতে পারো না। এ অনুচিত, এ অন্যায়!
র্যান্টার স্ত্রীকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে হাঁটু দুটো ছাড়িয়ে দেখল যে সে অচেতন হয়ে পড়েছে। উঠে দাঁড়িয়ে র্যান্টার শিকটা নেড়েচেড়ে দেখল যে ওটা বড্ড হালকা। তখন রান্নাঘরের পাশে বাসন-মাজার ঘর থেকে ও বের করল একটা ছোট কুড়ুল। কুড়ুলটা দোলাতে দোলাতে ওর চোখ পড়ল মাংস কাটার ছুরিটা, যেটা লিজি একটু আগেই রান্নার সময় ব্যবহার করেছিল। ছুরিটায় হাত বুলিয়ে ও দেখল ওটা ক্ষুরের মতো ধারালো। বিড়বিড় করে আপন মনে ও বলল, এটাই ভালো কাজ দেবে। তারপর এক গ্লাস হুইস্কি ঢকঢক করে খেয়ে জুতোজোড়া খুলে নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে লাগল র্যান্টার।
সব সমেত কুড়ি ধাপ সিঁড়ি। প্রায় আধ ঘণ্টা লাগল বারো ধাপ সিঁড়ি পেরোতে। পুরোনো বাড়ি, সিঁড়ির কাঠ পচা—তাই ওর ভারী শরীরের পদভারে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হচ্ছিল। নিশ্বাস রুদ্ধ করে এক পা-এক পা করে উঠছিল র্যান্টার। আর কোনও শব্দ নেই কোথাও—কেবল একতলার ঘড়িটার টিকটিক আওয়াজ আর দূর থেকে ভেসে আসা একটা প্যাঁচার চিৎকারের শব্দ। সেই ভূতুড়ে আলো-ছায়ায় মনে হচ্ছিল একটা ছায়ামূর্তি যেন সিঁড়ি দিয়ে উঠছে, চলছে, থামছে, গুঁড়ি মেরে এগোচ্ছে, আর অনিবার্যভাবে এগিয়ে চলেছে দোতলার দিকে।
বারো ধাপ সিঁড়ি ভেঙে ল্যান্ডিং-এ পৌঁছে র্যান্টার দেখল, ছেলেটার ঘরের দরজা আধখোলা। ফাঁক দিয়ে সোনালি আলোর ইশারা। তার মানে ঘরে আলো জ্বলছে। ছেলেটা কি এখনও জেগে আছে? কিন্তু ঘর থেকে কোনওরকম নড়াচাড়ার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না তো! ছেলেটা জেগে থাকলে এতক্ষণে পাশ ফেরার কিংবা বিছানার চাদর বা কম্বল ইত্যাদির নড়াচাড়ার আওয়াজ শোনা যেত। কান পেতে বিস্মিত র্যান্টার অনেকক্ষণ ধরে শোনার চেষ্টা করল। কিন্তু নাহ, চারদিক নিস্তব্ধ।
তারপর ও ধীরে ধীরে নিঃশব্দে বাকি আট ধাপ সিঁড়ি ভেঙে ছেলেটির ঘরের বাইরে দাঁড়াল। হয়তো ছেলেটার আলো জ্বালিয়ে ঘুমোনোর অভ্যাস। ও তো বলেছিল, ওর ঘুম খুব গভীর। কিছুটা আশঙ্কিত হয়ে র্যান্টার ভাবল, কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলাই ভালো, না হলে লিজি হঠাৎ জ্ঞান ফিরে পেয়ে চেঁচামেচি শুরু করতে পারে। ছুরিটাকে ডান হাতে নিয়ে বাঁ হাত দিয়ে দরজাটা আর একটু ফাঁক করে মাথাটা ভেতরে ঢোকাল ও। সঙ্গে সঙ্গে ওর কপালের ওপর ঠান্ডা, ধাতব একটা বস্তুর স্পর্শ অনুভব করল ও। একটা রিভলভারের নল।
শান্ত স্বরে অতিথি বলে উঠল, জন র্যান্টার, আসুন। কিন্তু প্রথমে আপনার অস্ত্রটা ফেলে দিন, না হলে আমি গুলি চালাতে বাধ্য হব। আপনার জীবন কিন্তু আমার হাতে।
র্যান্টার দরজার ফাঁকে গলাটা ঢুকিয়ে না পারছিল ঘরে ঢুকতে, না পারছিল বেরিয়ে যেতে, সুতরাং রাগে-হতাশায় ও বিড়বিড় করে কিছু বলল আর ছুরিটা সশব্দে মেঝের ওপর পড়ে গেল। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে গোমড়া মুখে ও বলল, আমি কিন্তু তোমার কোনও ক্ষতি করতে চাইনি।
ডান হাতে উদ্যত রিভলভার ধরে ধূসর কোট পরা যুবক বলল, আমি প্রায় দু-ঘণ্টা ধরে আপনার আসার প্রতীক্ষায় ছিলাম।
ওপরে ওঠার সময় যে পোশাক পরে ছিল যুবকটি, এখনও ও ঠিক সেই পোশাকেই। নিভাঁজ বিছানার ওপর ওর ব্যাগটা রাখা।
ও বলল, আমি জানতাম আপনি আসবেন।
—কী-কী, কেমন করে?
—কারণ আমি আপনাকে চিনি, কারণ বাড়ির গেটে আপনি যখন দাঁড়িয়ে ছিলেন, আমি আপনার চোখে খুনের ইঙ্গিত দেখেছিলাম। কারণ আপনি আমার কোটের ওপর হাত বুলিয়ে ভেতরে সোনার টুকরো আছে কি না, তা দেখেছিলেন। তাই আমি আপনার অপেক্ষায় ছিলাম।
—তোমার কাছে আমার বিরুদ্ধে কী প্রমাণ আছে?
—প্রমাণের দরকার নেই। আপনাকে আমি এক্ষুনি গুলি করতে পারি এবং আইন আমাকেই সমর্থন করবে। বিছানার ওপর রাখা ওই ব্যাগটা দেখুন। বলেছিলাম ওতে টাকা আছে। ইংল্যান্ডে এই টাকা নিয়ে আসার কারণ কী মনে হয় আপনার? আপনাকে ওটা দেব বলে, হ্যাঁ—আপনারই জন্যে। আর আমার এই ধূসর কোটটা? এটার দাম পাঁচশো পাউন্ডের মতো। এটাও আপনার জন্যে। এই তো! এতক্ষণে বুঝতে পারছেন মনে হয়। বুঝতে পারছেন কী ভুলটাই করেছেন?
টলতে টলতে দেয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়াল র্যান্টার। মুখটা একদিকে বেঁকে গেছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, জ্যাক জ্যাক!
—হ্যাঁ, আমি জ্যাক র্যান্টার, তোমার ছেলে, ঠিক তা-ই। বলে যুবক জামার আস্তিন একটু গুটিয়ে বাহুতে একটা নীল রঙের উল্কি দেখাল।
—মানে আছে, আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমার হাতে এই ‘J.R.’ কথাটা এঁকে দেওয়া হয়েছিল? এখন তো আমায় চিনতে পারছ? আমি টাকাপয়সা রোজগার করে তোমাদের কাছেই ফিরে আসছিলাম। আশা ছিল, তোমরা আমাকে এই টাকা ঠিকভাবে খরচ করতে পরামর্শ দেবে। কাছেই একটা সরাইখানার থেকে জেনে নিয়েছিলাম তোমাদের ঠিকানা। তারপর তোমাকে বাড়ির গেটে দেখতে পেয়ে ঠিক করলাম, তোমার আর মা-র পরীক্ষা নেব। দেখব তোমরা আগের মতোই আছ কিনা। আমি তোমাদের জন্যে সুখ এনেছিলাম, কিন্তু তোমরা আমাকে খুন করতে চেয়েছিলে। আমি তোমাদের শাস্তি দেবো না, তবে আমি চিরতরে চলে যাব। আমাকে বা আমার টাকাকে তোমরা আর কখনও দেখতে পাবে না।
জ্যাক যখন এই কথাগুলি বলছিল, তখন জন র্যান্টারের মুখটা বেঁকে, কুঁচকে যাচ্ছিল। ছেলের শেষ কথা শুনে ও মাথার ওপর দু-হাত তুলে এক পা এগিয়ে এল, কিন্তু গলায় একটা ঘড়ঘড়ে আওয়াজ করে ও মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ওর চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল, নিশ্বাসে কেমন যেন নাক-ডাকার আওয়াজ আর ঠোঁটের দুপাশে ফেনা। ও যে মরতে চলেছে তা বোঝার জন্যে ডাক্তারি জ্ঞান লাগে না। জ্যাক ঝুঁকে পড়ে বাবার জামা ও কলারটা ঢিলে করে দিল।
তারপর ও ব্যগ্রভাবে বাবাকে জিগ্যেস করল, আচ্ছা, মা-ও কি এই ব্যাপারে তোমার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল?
জন র্যান্টার এই প্রশ্নের অর্থ বোধহয় বুঝতে পারল, কারণ উত্তরে ও মাথা নাড়ল। এই একটি সৎকাজ করার সঙ্গে সঙ্গে যেন অপরাধের ইহলোক থেকে ওর অভিশপ্ত আত্মা মুক্তি পেল। ডাক্তারের সাবধানবাণী ফলে গেল—মানসিক আবেগের আঘাতে মৃগীরোগের অন্তিম কামড়। জ্যাক বাবার দেহটি সশ্রদ্ধভাবে বিছানার ওপর শুইয়ে দিল এবং এই পরিস্থিতিতে যেটুকু পারলৌকিক ক্রিয়া করা সম্ভব তা করল।
যা হয়েছে তা-ই হয়তো শ্রেয়—আপন মনে এই কথা বলে জ্যাক নীচে মায়ের খোঁজে গেল, এই শোকে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে।
জ্যাক র্যান্টার আমেরিকায় ফিরে গেল। কর্মক্ষমতা ও ব্যবসাবুদ্ধি মিলিয়ে ও ওই অঞ্চলের অতি ধনবান লোক হিসেবে পরিচিতি পেল। ও আর কখনও দেশে ফিরবে না। ওর প্রাসাদোপম বাড়িতে এক বৃদ্ধা মহিলা থাকেন—মাথার চুল সাদা এবং তিনি উদবিগ্ন স্বভাবের। এই বাড়িতে তাঁর প্রতিটি ইচ্ছার মূল্য দেওয়া হয়। বাড়ির সব লোকজন তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ ব্যবহার করে। বলা বাহুল্য, ইনিই মিসেস র্যান্টার। তাঁর ছেলের আশা—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং নতুন পরিচিতদের সংস্পর্শে এসে তিনি হয়তো একদিন সেই ভয়ংকর রাতের কথা ভুলে যাবেন, যে রাতে ধূসর কোট পরা এক অতিথি তাঁদের নির্জন কুটিরে এসেছিল।
