জলদস্যু – আর্থার কোনান ডয়েল
জলদস্যু
অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার কথা। স্পেন সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তা শেষ হয়েছে। যুযুধান দেশগুলির অর্থাৎ ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, অস্ট্রিয়ার সৈন্যদলে ছিল প্রচুর ভাড়াটে সৈন্য। যুদ্ধ শেষ হতেই তারা বেকার হয়ে পড়ল। তারপর ক্রমে ক্রমে কেউ শুরু করল ব্যবসা-বাণিজ্য, কেউ বা চাকরি নিল মাছধরার জাহাজে। আর ওদের মধ্যে যারা ছিল বেপরোয়া ও নৃশংস প্রকৃতির, তারা জাহাজের মাস্তুলে খুলি আর হাড় আঁকা পতাকা লাগিয়ে হয়ে গেল জলদস্যু এবং যুদ্ধ ঘোষণা করল সমগ্র মানবজাতির বিরুদ্ধে।
বিভিন্ন দেশের অধিবাসী এই জলদস্যুদের একটা বিষয়েই ঐক্য ছিল এবং তা হল নৃশংসা। আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং আমেরিকার আশেপাশের জলভাগে তারা হয়ে উঠেছিল বিভীষিকা। এদের না ছিল কোনো শৃঙ্খলা, না কোনো সংযম। পণ্যবাহী বা যাত্রীবাহী জাহাজ দখল করে সেটা লুঠ তো করতই, জাহাজের ক্যাপ্টেন, নাবিক ও যাত্রীদের খুন করত অকল্পনীয় নৃশংসতায়। খুব সাহসী না হলে কোনো ক্যাপ্টেন সেসময় জাহাজ নিয়ে বিশেষত ক্যারিবিয়ান সাগরের দিকে যেতেন না।
এমনই একজন সাহসী ক্যাপ্টেন ছিলেন জন স্ক্যারো। তাঁর জাহাজের নাম ‘মর্নিং স্টার’। চিনি আর গোলমরিচ নিয়ে তাঁর জাহাজ চলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেন্ট কিটস দ্বীপে। অন্তিম গন্তব্য সেটাই। মালপত্র ওখানে নামিয়ে দিয়েই জাহাজ রওনা হবে তাঁর স্বদেশ ইংলন্ডের দিকে। জাহাজের নোঙর ফেলার শব্দ শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন ক্যাপ্টেন। অদূরেই দেখা যাচ্ছে সেন্ট কিটস দ্বীপের বন্দর তথা রাজধানী ব্যাসেটার। জলদস্যু পরিকীর্ণ সুমদ্রে এতদিনের সফরে তিনি পদে পদে আশঙ্কা ও উদ্বেগে অধীর ছিলেন। অন্য কোনো জাহাজের পাল দেখতে পেলেই আশঙ্কা হত—ওটা বোম্বেটেদের জাহাজ নয় তো? এতদিনের যাত্রাপথে যে যে বন্দরে থেমেছিলেন, সেখানেই শুনেছেন জলদস্যুদের হাড়-হিম করা কাহিনি। আজ আপাতত তিনি নিশ্চিন্ত।
বিশ কামানওয়ালা জলদুস্য জাহাজ ‘হ্যাপি ডেলিডারি’-র ক্যাপ্টেন কুখ্যাত শার্কি। এই তল্লাটেই তীরবর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা জাহাজের ভস্মাবশেষ ও নাবিকদের লাশ শার্কির কৃতকর্মের প্রমাণ হিসেবে প্রায়ই দেখা যেত। হত্যার থেকেও ভয়ানক ছিল শার্কির নিষ্ঠুরতা এবং এই সম্বন্ধিত কাহিনি শুনে ক্যাপ্টেন স্ক্যারো প্রচলিত বাণিজ্যপথের থেকে সরে গিয়ে সাবধানে তাঁর জাহাজটাকে গন্তব্যস্থলে এনেছেন। তা সত্ত্বেও শার্কির নিষ্ঠুরতার প্রমাণ তাঁকে পেতে হয়েছিল।
এবারের যাত্রাতেই একদিন সকালে জাহাজ থেকে ক্যাপ্টেন স্ক্যারো ও তাঁর সহকর্মীরা দেখতে পেলেন সমুদ্রের বুকে ভাসমান একটা দাঁড়-বাওয়া নৌকা। নৌকায় যে লোকটি ছিল, সে একজন নাবিক, কিন্তু বিকারগ্রস্ত হয়ে প্রলাপ বকছিল। ক্ষুধা তৃষ্ণায় প্রায় মুমূর্ষু লোকটিকে জাহাজে উঠিয়ে তাকে ক্রমে ক্রমে সুস্থ করে তোলা হল। দেখা গেল লোকটি যেমন শক্তিশালী তেমন বুদ্ধিমান। কুখ্যাত শার্কি ওদের জাহাজটিকে ডুবিয়ে দিয়েছিল এবং সেই জাহাজের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি ছিল এই নাবিক। শার্কি খাদ্য হিসেবে ওকে দিয়েছিল ওদের ক্যাপ্টেনের টুকরো টুকরো করা দেহ। নাবিকটি কিন্তু সেগুলো সমুদ্রে বির্সজন দিয়ে সেই গ্রীষ্মমণ্ডলের উত্তাপ সহ্য করে শুধু নিজের শরীরের সামর্থ্যে বেঁচে ছিল। এই নাবিকটির নাম ইভানসন, আমেরিকার পূর্বকূলের অধিবাসী।
ইভানসনকে পেয়ে ক্যাপ্টেন স্ক্যারো খুশিই হয়েছিলেন। জাহাজে এমনিতেই লোক লশকর কম। ইভানসনের মতো একজন বলবান সুদক্ষ নাবিক তাঁর কাজে লেগে যাবে।
‘মর্নিং স্টার’ এখন ব্যাসেটার দূর্গের কাছে দাঁড়িয়ে। এখানে আর জলদস্যু শার্কির ভয় নেই। ক্যাপ্টেন স্ক্যারো দেখতে পেলেন দূর থেকে তাঁর জাহাজের দিকে এগিয়ে আসছে তাঁদের কোম্পানির এজেন্ট-এর নৌকা।
এজেন্ট-এর কর্মচারী জাহাজের গায়ে নৌকা বেঁধে জাহাজে উঠেই বলল, ‘খবর শুনেছেন স্যর? শার্কি ধরা পড়েছে। ও এখন আছে ব্যাসেটার দূর্গের লক-আপ-এ। গত বুধবার ওর বিচার হয়ে গেছে। কাল সকালে ওর ফাঁসি হবে।’
মূর্তিমান শয়তান শার্কির সাজার কথা শুনে জাহাজের সকলের উল্লাসের সীমা রইল না। ইভানসন তো বলেই উঠল, ‘এই তল্লাটে যদি ফাঁসুড়ে না পাওয়া যায়, আমি ওর ফাঁসি দিতে রাজি।’
জাহাজের এক অফিসার জানতে চাইলেন কী ভাবে শার্কি ধরা পড়ল।
এজেন্ট-এর কর্মচারী বলল, ‘শার্কির আচার-আচরণে ওর দলের লোকেরাই বিক্ষুব্ধ ছিল যে ওরাই ওকে জাহাজ থেকে নামিয়ে একটা ছোট দ্বীপে ছেড়ে দেয়। এক বণিক ওকে ধরে বেঁধে এখানে নিয়ে আসে। প্রথমে কথা হয়েছিল বিচারের জন্য ওকে জ্যামাইকা পাঠানো হবে। কিন্তু স্যর চার্লস ইওয়ান, আমাদের সেন্ট কিটস-এর গভর্নর, সোজাসুজি বললেন, ‘শার্কি আমার খাওয়ার মাংস, এই মাংস আমিই রাঁধব। ক্যাপ্টেন স্ক্যারো, কাল সকাল দশটা পর্যন্ত আমাদের এখানে থাকুন—শার্কির ঝুলন্ত ঠ্যাং দুটোর দোলানি দেখে যান।’
ক্যাপ্টেন বিমর্ষভাবে বললেন, ‘থাকলে তো ভালোই হতো। কিন্তু আজ সন্ধেবেলায় জোয়ার এলেই আমাদের রওনা হতে হবে।’
‘তা কী করে হবে স্যর। আমাদের গভর্নর স্যর চার্লস আপনার জাহাজেই ইংল্যান্ড যাবেন—সরকার থেকে ওঁর জরুরি তলব এসেছে। তাই উনি আপনার জন্যই অপেক্ষা করছেন।’
‘তাই নাকি? এইসব মান্যগণ্য মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যাতায়াত করার কোনো অভিজ্ঞতাই নেই আমার। যাই হোক, ওঁকে আমার কেবিনটায় ছেড়ে দেব। আর জাহাজের একঘেয়ে খাবার ওঁর পছন্দ না হলে উনি নিজের বাবুর্চি আনতে পারেন।’
‘ক্যাপ্টেন, এসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। স্যর চার্লস সবে ভুগে উঠেছেন, খুবই দুর্বল—বেশির ভাগ সময় হয়তো কেবিনেই কাটাবেন। অবিশ্যি, শার্কির ফাঁসির হুকুম শুনে উনি আপাতত কিছুটা চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। তবে একটা কথা বলি। ওঁর কথাবার্তা একটু রুক্ষ, কর্কশ।’
‘তা হোক। তবে উনি যেন জাহাজ চালানোর ব্যাপারে নাক না গলান। উনি সেন্ট কিটস-এর গর্ভনর হতে পারেন, কিন্তু আমিও ‘মর্নিং স্টার’ জাহাজের গভর্নর। উনি যেমন সরকারি আদেশে দেশে ফিরছেন, আমিও কিন্তু আমার কোম্পানির আদেশ অনুযায়ী সন্ধ্যায় রওনা হব।’
‘স্যর, গভর্নর আজ রওনা হতে পারবেন না। তাঁর হাতে কয়েকটা জরুরি কাজ আছে।’
‘ঠিক আছে। তাইলে কাল ভোরে?’
‘তাই হবে স্যর। আমি ওঁর মালপত্র আজ রাতেই আপনার জাহাজে রেখে যাব। আর শার্কির ফাঁসির আগেই ওঁকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আপনার জাহাজে নিয়ে আসব। হয়তো ওঁর সঙ্গে একজন ডাক্তার থাকবেন।’
ক্যাপ্টেনের কেবিনটা গভর্নরের জন্য সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হল। প্রচুর ফল ও কয়েক পিপে মদের ব্যবস্থা করা হল। সন্ধের পর আসতে শুরু করল গভর্নরের লটবহর—বড় বড় লোহার ট্রাঙ্ক, টিনের প্যাকিং বাক্স এবং বিচিত্র আকৃতির প্যাকেজ।
পরের দিন ভোরে যখন আকাশের রঙ ধূসর থেকে লালচে হতে শুরু করেছে। গভর্নর স্যার চার্লস একটা নৌকায় এসে সিঁড়ি দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে জাহাজে উঠলেন। একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। হাতে একটা মোটা বাঁশের ছড়ি। মাথার পরচুলাটি দিয়ে প্রায় ভ্রূ অবধি ঢাকা। চোখে সবুজ রঙের বড় সাইজের চশমা। গভর্নরের নাকটা লম্বা ও পাখির ঠোঁটের মতো তীক্ষ্ম। সবে জ্বর থেকে উঠেছেন বলেই হয়তো থুতনিও একটা স্কার্ফ দিয়ে ঢাকা। পরনে একটা সিল্কের গাউন, কোমরে কর্ড দিয়ে বাঁধা। জাহাজে উঠে নাকটা ওপরের দিকে তুলে প্রায় অন্ধ মানুষের মতো মাথাটা এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে তিনি উচ্চকণ্ঠে অনুযোগের সুরে ক্যাপ্টেনকে জিগ্যেস করলেন, ‘আমার মালপত্র তোমার কাছে?’
‘হ্যাঁ, স্যর চার্লস।’
‘মদ, তামাক ইত্যাদি আছে?’
‘হ্যাঁ, স্যর।’
‘তাস খেলতে পারো?’
‘মোটামুটি স্যর।’
‘তাহলে নোঙর তোলো। স্টার্ট।’
অনুকূল বাতাসে জাহাজ দীপপুঞ্জের আর্ধেকটা পেরিয়ে গেল। তখন কুয়াশার আড়াল থেকে সূর্য উঁকি মারছে।
দুর্বল গভর্নর ডেকের রেলিং-এর ওপর একটা হাত রেখে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘দ্যাখো ক্যাপ্টেন, তুমি এখন সরকারি কাজে। সরকার আমার প্রতীক্ষায় ইংলন্ডে দিন গুনছে। সবকিছু ঠিকঠাক নিয়েছ তো?’
‘হ্যাঁ স্যর।’
‘আমার মতো অসুস্থ ও প্রায় অন্ধ একজন মানুষকে নিয়ে তোমাকে যেতে হচ্ছে বলে আমার খারাপ লাগছে।’
‘কী বলছেন স্যর? আপনার উপস্থিতিতে আমরা সম্মানিত, তবে স্যর, আপনার চোখ দুটো যেন বেশ খারাপ হয়েছে।’
‘আর বলো না! ব্যাসেটারের সাদা সাদা রাস্তার ওপর সূর্যের প্রতিফলন এতদিন দেখে দেখে চোখ দুটো যেন জ্বলে গেছে। তাছাড়া হয়েছিল সাংঘাতিক জ্বর। তাই তো ডাক্তারকেও নিয়ে আসতে হল। ওই শোনো!’ গভর্নর আংটি পরা হাতটি তুলে দূরে নির্দেশ করলেন।
বিস্মিত ক্যাপ্টেন বললেন, ‘দ্বীপ থেকে কামানের আওয়াজ। আমাদের কী ফিরে যেতে বলছে?’
হেসে উঠলেন গভর্নর, ‘আজ সকালে তো শার্কির ফাঁসি হওয়ার কথা। ওদের বলে এসেছিলাম—ফাঁসি হয়ে গেলেই কামান দেগে আমাকে জানাতে। এর মানে, শার্কির ভবলীলা সাঙ্গ হল।’
ক্যাপ্টেন ও জাহাজের কর্মীরা একযোগে হর্ষধ্বনি করে উঠল। শার্কির মৃত্যুসংবাদে যেন এই জাহাজের যাত্রার শুভসূচনা হল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গভর্নর জাহাজের অফিসার ও মাঝিমাল্লাদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। জনপ্রিয়তার কারণ শার্কি নিধনে তাঁর মুখ্য ভূমিকা। ডিনারের শেষে পাইপ খেতে খেতে যখন তিনি ক্যাপ্টেন স্ক্যারো ও ফার্স্ট অফিসার মর্গানকে শার্কির দুস্যবৃত্তি ও নৃশংসতার বিভিন্ন কাহিনি শোনাচ্ছিলেন, ওঁরা দুজনেই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন সেই কাহিনি।
মর্গান জিগ্যেস করল, ‘স্যর, শার্কিকে দেখতে নাকি খুব কুৎসিৎ ছিল? আর শুনেছি ও নাকি সর্বক্ষণ বিদ্রুপ করে কথা বলতেন।’
গভর্নর বললেন, ‘ঠিকই শুনেছ। বেশ কুৎসিত-ই দেখতে ছিল ও।’
ক্যাপ্টেন স্ক্যারো প্রশ্ন করলেন, ‘ওর চোখ দুটো নাকি একবার দেখলে কেউ ভুলতে পারত না? হালকা নীল রঙের মণির চারপাশটি লাল টকটকে?’
‘আমার নিজের চোখের যা অবস্থা শার্কির চোখের ব্যাপারে তেমন কিছু বলতে পারব না। তবে শুনেছি বিচারের সময় ও যখন জুরিদের দিকে তাকাচ্ছিল, জুরিরা সবাই ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। ওর ফাঁসি হয়ে ভালোই হয়েছে—বেঁচে থাকলে জুরিদের যা পরিণতি হতো, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।’ বলে গভর্নর হো হো করে হেসে উঠলেন। ক্যাপ্টেন ও মর্গান দুজনেই যোগ দিলেন ওই হাসির ফোয়ারায়, তবে এত প্রাণ খুলে নয়। শার্কি না থাকলেও এই তল্লাটে জলদস্যুর তো অভাব নেই। দুজনের মনেই ছিল প্রচ্ছন্ন ভীতি।
একটু পরেই ওঁরা দুজন গভর্নরকে শুভরাত্রি জানিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু ঘণ্টা চারেক পরে এইদিকে এসে মর্গান দেখল যে গভর্নর একই ভাবে ওই জায়গায় বসে আছেন, পাশে পড়ে আছে ছ’টি নিঃশেষিত মদের বোতল, আর পাইপ থেকে বেরোচ্ছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী।
প্রায় তিন সপ্তাহ পরে জাহাজ নিরাপদে পৌঁছে গেল ইংলিশ চ্যানেলের কাছে। গভর্নর এখন প্রায় পুরোপুরি সুস্থ, তবে চোখের সমস্যাটা রয়ে গেছে। রাতে অপরিমিত মদ্যপান করেও উনি সকালে থাকতেন একদম ফ্রেশ। ক্যাপ্টেনের অনুমতি নিয়ে তিনি ইভানসনকে (যে নাবিকটিকে উদ্ধার করা হয়ছিল) নিজের পার্শ্বচর করে নিলেন। জাহাজে পায়চারি করার এবং তাস খেলার সময়, ইভানসনই হয়ে উঠল ওঁর চোখ। এই কাজ পেয়ে ইভানসন খুব খুশি, কেন না শার্কিহন্তা গভর্নরের কাজে ও লাগতে পেরেছে। গভর্নরকে হাত ধরে হাঁটতে সাহায্য করা, তাঁর চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে তাস খেলার সময় সঠিক তাসটি তাঁর হাতে ধরিয়ে দেওয়া—এসবই হয়ে দাঁড়াল ওর নিত্যকর্ম।
তাস খেলতে খেলতেই ক্যাপ্টেন ও মর্গান বুঝতে পারলেন যে বদমেজাজি গভর্নরের স্বরূপটা এতদিন প্রকাশ পায়নি। খেলার সময় কোনো কথা কাটাকাটি বা মতপার্থক্য হলেই স্পর্ফের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসত তাঁর থুতনি, উদ্ধত নাকটা উঠত ওপরদিকে এবং উনি হাতের ছড়িটা হাওয়ায় সপাং করে ঘোরাতেন। এরই মধ্যে একদিন জাহাজের এক মিস্ত্রি আনমনে ভুল করে গভর্নরকে আলতো একটু ধাক্কা দিয়েছিল বলে তিনি তার মাথায় তৎক্ষণাৎ মেরেছিলেন ছড়ির এক বাড়ি। আর একদিন জাহাজের মাঝিমল্লারা খাবারের পরিমাণ কম হওয়ার প্রতিবাদে বিদ্রোহের হুমকি দিয়েছিল। গভর্নর ক্যাপ্টেনকে বলেছিলেন, বিদ্রোহ করার আগেই ওদের মেরে ঠান্ডা করে দিতে।
এসব সত্ত্বেও দিনগুলি মন্দ কাটছিল না। তার কারণ গভর্নরের বিচিত্র স্মৃতির ঝাঁপি খুলে গল্প বলার ক্ষমতা।
সমুদ্র যাত্রার শেষ দিনটা অবশেষে এসে গেল। কাল সকালেই পাইলট এসে রাস্তা দেখিয়ে জাহাজকে বন্দরে ভেড়াবে। হয়তো কাল সন্ধেবেলায়ই ওয়েস্ট মিনিস্টারে গভর্নরের সঙ্গে মন্ত্রীদের সাক্ষাৎ হবে।
আজ শেষ দিন শেষবারের মতো তিনজন গভর্নর, ক্যাপ্টেন ও মর্গান—বসলেন তাস খেলতে। যথারীতি গভর্নরের চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে ইভানসন। বেশ বড় বাজি রাখা হয়েছে আজ। হঠাৎ গভর্নর টেবিলে রাখা বাজির সমস্ত টাকা নিজের কাছে দু’হাত দিয়ে টেনে এনে—তাঁর ওয়েস্টকোটের পকেটে ভরলেন এবং বললেন, ‘আমি বাজি জিতেছি।’
চেঁচিয়ে উঠলেন ক্যাপ্টেন স্যারো, ‘স্যর চার্লস, আপনি তো এখনো আপনার চাল-ই দেননি।’
‘মিথ্যাবাদী কোথাকার! আমি চাল দিয়েছি এবং তোমরা হেরেছ’ বলে গভর্নর মাথার পরচুলা ও চশমা একটানে খুলে ফেললেন। দেখা গেল উঁচু কপাল, সামনের দিকে টাক পড়া মাথা এবং ধূর্তামিতে ভরা একজোড়া নীল চোখ, চোখের ভিতরে বৃত্তাকার অংশ বুল টেরিয়র কুকুরের চোখের মতো লাল।
মর্গান বলে উঠল, ‘হায় ভগবান। এ তো শার্কি!’
ক্যাপ্টেন ও মর্গান দুজনেই চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন, কিন্তু তার আগেই কেবিনের দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে গেল বিশালদেহী ইভানসন, তার দু’হাতে দুটি পিস্তল। টেবিলে ছড়ানো তাসের কাছে রাখা আর একটি পিস্তল, তার মালিক জাহাজের ওই সম্মানিত যাত্রী। ঘোড়ার আওয়াজের মতো খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উনি বললেন, ‘ভদ্রমহোদয়গণ, আমার নামই ক্যাপ্টেন শার্কি এবং আপনাদের এই ইভানসন হচ্ছে আসলে নেড গ্যালোওয়ে, আমার জাহাজ ‘হ্যাপি ডেলিভারি’-র অফিসার। ওরা আমাকে নামিয়ে দিয়েছিল একটা দ্বীপে আর নেড-কে একটা দাঁড়ি বিহীন নৌকায়। কুকুরের দল! তোরা এখন আমাদের পিস্তলের মুখোমুখি।’
ক্যাপ্টেন স্ক্যারো নিজের জ্যাকেটের ওপর হাত রেখে বললেন, ‘তোমরা গুলি করো বা না করো, আমি কিন্তু আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বলে যেতে চাই—শার্কি, তুমি দুর্ব,ত্ত, তুমি শয়তান। তোমার পরিণতি হবে ভয়ংকর।’
শার্কি বলল, ‘বাঃ, তুমি বেশ সাহসী তো—আমারই মতো। তোমার মৃত্যুটাও হবে বেশ ঘটা করে। নেড, ডিঙ্গিলোকটা জাহাজের গায় লাগিয়েছে?’
‘হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন।’
‘আর জাহাজের ভিতরে রাখা নৌকাগুলো?’
‘সবক’টা ফুটো করে দিয়েছি।’
‘বেশ। তাহলে ক্যাপ্টেন স্ক্যারো, আপনাকে এখানেই রেখে যাব। কিছু জানতে চান?’
‘সেন্ট কিটস-এর গর্ভনর স্যার চার্লস কোথায়?’
‘মহামান্য গভর্নরকে আমি শেষ যখন দেখি তখন তিনি গলা-কাটা অবস্থায় তাঁর পালঙ্কে শায়িত। ওখানে জেল ভেঙে বেরিয়ে আমার শুভানুধ্যায়ীদের কাছে খবর পাই যে গভর্নর এমন একটা জাহাজে ইংল্যান্ড যাবেন যার ক্যাপ্টেনকে তিনি কখনো দেখেননি। প্রথমেই গভর্নরের প্রাসাদের বারান্দায় উঠে ওঁর ঋণটুকু শোধ করলাম। তারপর চোখদুটো চশমায় ঢেকে এবং পরচুলা মাথায় এসে পড়লাম আপনার জাহাজে। নেড, এবার ওদের নিয়ে যা করবার করো।’
‘হেলপ, হেলপ,’ বলে মর্গান চেঁচাতেই তার মাথায় পড়ল শার্কির পিস্তলের বাঁটের ঘা। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল মর্গান। ক্যাপ্টেন স্ক্যারো কেবিনের দরজার দিকে এগোতেই প্রহরী নেড এক হাতে তাঁর মুখে চাপা দিয়ে অন্য হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল তাঁর কোমর।
শার্কি বলল, ‘কোনো লাভ নেই ক্যাপ্টেন। তুমি বরং নতজানু হয়ে তোমার প্রাণভিক্ষা করো।’
মুখ থেকে নেড-এর হাত সরিয়ে স্ক্যারো বললেন, ‘আমি তোমাকে দেখে নেব—’
শার্কি বলল, ‘নেড, ওর হাত দুটো পিছমোড়া করে বাঁধো। এবার করবে প্রাণভিক্ষা?’
‘না! হাত দুটো মুচড়ে শরীর থেকে আলাদা করে দিলেও না!’
‘ঠিক আছে। ওর শরীরে ছুরিটার এক ইঞ্চি ঢুকিয়ে দাও।’
‘ছ’ইঞ্চি ঢোকালেও প্রাণভিক্ষা করব না।’
শার্কি এবার বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, বুকের পাটা আছে বটে। নেড, ছুরিটা তোমার পকেটে রাখো। স্ক্যারো, তোমার চামড়া তো বেঁচে গেল। তবে তোমার মতো সাহসী মানুষের উচিত জলদস্যুর পেশা নিয়ে দু’পয়সা কামানো। অবশ্যি আজকের এই ঘটনার সাক্ষী হিসেবে তোমাকে তো বাঁচতে দেওয়া যায় না। তোমার জন্য তাই অসাধারণ মৃত্যুর পরিকল্পনা করেছি। নেড, ওকে বেঁধে ফেলো।’
‘চুল্লির সঙ্গে?’
‘না, না। চুল্লিতে তো আগুন আছে। ওকে টেবিলের সঙ্গে বাঁধো।’
‘আমি ভাবছিলাম ওকে ঝলসানো হবে।’
‘নেড, আমি ক্যাপ্টেন আর তুমি কোয়ার্টার মাস্টার। যা বলছি তা করো।’
নেড তক্ষুনি দু’হাতে একটা শিশুর মতো স্ক্যারোকে তুলে ধরে টেবিলের ওপর শুইয়ে দিল। তারপর তাঁর দু-হাত দু-পা টেবিলের সঙ্গে মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে মুখে গুঁজে দিল শার্কির গলার সেই স্কার্ফটা।
শার্কি বলল, ‘ক্যাপ্টেন স্ক্যারো, এবার আমরা বিদায় নেব। আমার সঙ্গে জনা ছয়েক লোক থাকলে মালপত্রসমেত তোমার জাহাজটাই নিয়ে যেতাম। কিন্তু আপাতত নেড ছাড়া তো আর কেউ নেই। একটা ডিঙ্গি নৌকাই নিয়ে নিচ্ছি। জানো তো, ক্যাপ্টেন শার্কি একটা ছোট নৌকা পেলে পালতোলা নৌকা জোগাড় করে নেয়, পালতোলা নৌকা পেলে জোগাড় করে নেয় দু’মাস্তুলের ছোট জাহাজ, সেটা পেলে খুঁজে নেয় পালতোলা ছোট জাহাজ এবং সবশেষে বড় জাহাজ। তাই তাড়াতাড়ি বন্দরে চলে যাও। নাইলে তোমার এই ”মর্নিং স্টার” জাহাজটা নিতে আমি ফিরে আসব।’
ক্যাপ্টেন স্ক্যারো শুনতে পেলেন ওদের চলে যাওয়ার এবং দরজায় চাবি দেওয়ার আওয়াজ। বাঁধন আলগা করার চেষ্টা করতে করতে শুনতে পেলেন জাহাজ থেকে জলের ওপর একটা ডিঙ্গি লাগানোর শব্দ। তারপর পাগলের মতো হাত-পা ব্যবহার করে এবং জখম কবজি ও গোড়ালি নিয়ে অনেক কষ্টে সেই দড়ির বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করলেন তিনি। অবশেষে লাথি মেরে কেবিনের দরজা ভেঙে ডেকের ওপর এসে তারস্বরে চেঁচাতে লাগলেন স্যারোঃ
‘পিটারসন, আর্মিটেজ, উইলসন—কে কোথায় আছ? পিস্তল, ছোরা বের করো। জাহাজে যত নৌকা রাখা আছে সেগুলো নামাও। সেই সামনের ডিঙ্গিতে আছে জলদস্যু শার্কি। সবাই মিলে ওকে ধরতে হবে।’
তক্ষুনি নামানো হল জাহাজের নৌকাগুলো। কিন্তু পরমুহূর্তেই মাঝি মাল্লারা জানাল যে সব ক’টা নৌকা ফুটো করা। কোনোটাই জলে ভাসবে না। হতাশ ক্যাপ্টেন বুঝতে পারলেন—বুদ্ধির খেলায় প্রতিপদেই তাঁকে পরাস্ত করেছে শার্কি।
নির্মেঘ নক্ষত্রখচিত আকাশ। হাওয়া নেই। বহুদূরে দাঁড়িয়ে আছে জেলেদের একটা পালতোলা নৌকা। নৌকার ওপর কয়েকজন জেলে জাল নিয়ে ব্যস্ত।
ঢেউয়ে দোল খেতে খেতে ছোট ডিঙ্গিটা পৌঁছে গেছে জেলেদের নৌকার কাছে।
ক্যাপ্টেন স্ক্যারো চিৎকার করে বললেন, ‘সবাই মিলে চেঁচিয়ে ওদের সাবধান করো। নাইলে শার্কির হাতে ওদের মৃত্যু নিশ্চিত।’
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ডিঙ্গি এখন জেলেদের নৌকার একেবারে কাছে। পর পর দুবার পিস্তল ছোঁড়ার আওয়াজ শোনা গেল। তারপর নিস্তব্ধতা। জেলেদের চিহ্নমাত্র নেই। তারপর যেই একটু বাতাস বইতে শুরু করল, পালতোলা জেলে নৌকাটা তরতর করে এগিয়ে চলল আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে।
The Governor of Saint Kitt’s by Sir Arthur Conan Doyle
