Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    পশারিণী – সমরেশ বসু

    সমরেশ বসু এক পাতা গল্প159 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    উরাতীয়া

    যখন বেলা পড়ে আসত, সারাদিনের রোদজ্বলা আকাশটায় ছড়াত রঙের তীব্র ছটা, জনহীন হয়ে আসত মাঠ ও বন, তখন মনে হত রেললাইনের উঁচু জমিটা আরও উঁচু হয়ে উঠেছে। যেন সারাদিন পরে নুয়ে-পড়া মাথাটা আড়মোড়া ভেঙে তুলে ধরেছে আকাশের দিকে। আর গাঢ় বর্ণের আকাশটা যেন নেমে আসত একটু একটু করে। আকাশটাই ঘিরে থাকত উঁচু জমিটাকে।

    তখন দূর থেকে মনে হত দুটো অতিকায় দানব নেমে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ওই উঁচু জমিতে। বিশ্বসংসারের এ নির্জনতা ও নৈঃশব্দ্যের সুযোগে তারা নেমে এসেছে ধরাতলে। আকাশের অনেকখানি জুড়ে থাকত তাদের বিশাল দেহ। তাদের স্ফীত সুগঠিত মাংসপেশির প্রতিটি সুস্পষ্ট রেখা ঢেউ দিয়ে উঠত আকাশের বুকে। তারপর, যখন তারা হঠাৎ খানিকটা সরে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে দাঁড়াত মুখোমুখি, এবং পরস্পরকে আচমকা আক্রমণ করে উঠত পড়ত, তখন শক্তি প্রয়োগে মাংসপেশিগুলি আরও উদ্দাম হয়ে উঠত। আকাশের বুকে ছিটকে যেত ধুলো মাটি। উঁচু জমিটা যেন থরথর করে কাঁপত তাদের দেহ ও পায়ের চাপে। তখন প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটা ভয়ংকর দৃশ্যের অবতারণা হত সন্ধ্যাকালের এ জমিটার উপরে।

    তারপর এ লড়াই চলতে চলতে, রঙে রঙে আকাশটা যখন কালো হয়ে আসে, জমি আর আকাশ হয়ে যায় একাকার, তখন তারা দুজনেই আকাশমাটির সঙ্গে একাত্ম হয়ে হারিয়ে যায়।

    এমনি ঘটে রোজই। লড়িয়ে দুই মস্ত মল্লবীর। লাখপতি আর ঘামারি। তারা দুজনেই রেলওয়ে গেটম্যান।

    মফস্বল শহর থেকে মাইল সাত আটেক দূরে, স্থানীয় স্টেশন থেকেও প্রায় দু-মাইল দূরে, মাঠের মাঝে এ ক্রসিং গেট। লাইনের পুবদিকের গ্রামটা কিছুটা কাছে। পশ্চিমের গ্রামটা একটা ঝাপসা কালো রেখায় মিশে থাকে আকাশের গায়ে। গেটের দুদিকে দুটো ঢালু সড়ক নেমে গেছে এঁকেবেঁকে, হারিয়ে গেছে মাঠ ও গ্রামের মধ্যে। চওড়া সড়ক। গোরুর গাড়ির চাকার দাগে দু-পাশে গভীর রেখা পড়েছে। আর চারপাশে সবুজ ফসলের ক্ষেত।

    ক্রসিং-এর দু-পাশে ঢালু জমিতেই গেটম্যানদের ঘর। এমনভাবে ঘর দুটো তৈরি হয়েছে, রেললাইনের উপর থেকেই লাফিয়ে ঘরের ছাদে চলে যাওয়া যায়। এপার থেকে ওপারের ঘর দেখা যায় না। ওপার থেকে এপারেরও না।

    কাছাকাছি কোনও বড় গাছপালা নেই। পাখির কলরব বড় একটা শোনা যায় না। এখানে সারাদিন প্রজাপতি ফড়িং রঙিন পাখা মেলে অবাধে উড়ে বেড়ায়। ঝিঁঝির গলা-ফাটানো ডাক আরও ভারী করে তোলে নৈঃশব্দ্যকে।

    সারাদিন লোকেরও যাতায়াত কম এই পথে। সকালে আর বিকালে দেখা যায় কিছু লোককে যেতে। হয়তো যায় কয়েকটা গোরুর গাড়ি সারাদিনে। তাও গোরুর গাড়িগুলোকে অধিকাংশ দিনই বেশ খানিকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, কেননা এই সীমান্তের যারা প্রহরী, লাখপতি আর ঘামারি, তাদের যতক্ষণ দয়া না হবে, ততক্ষণ সীমান্তদ্বার খোলার কোনও উপায় নেই।

    তারা অবশ্য লোক খারাপ নয়। কিন্তু এই নির্জন গ্রামের সীমানায়, চাকরি ছাড়া জীবনধারণের যে আর মাত্র একটি দিক তাদের আছে, তা হল মল্লযুদ্ধ। সেজন্যে দেহ তৈরির কাজটি তাদের সর্বাগ্রে। যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের তৈলমর্দনের সময়, কিংবা সকালের বুকডন বৈঠকের উত্তেজনায় চোখ লাল, মাথাটা অবসাদগ্রস্ত আর দেহের শিরায় শিরায় রক্তপ্রবাহ পাগলা গতিতে থাকে লাফাতে, তখন পাঁচনবাড়ি হাতে কোনও গাড়োয়ানের খোলেন গো পবন-পো শব্দ তাদের কানেই ঢোকে না।

    পবন-পো কথাটি খুব শ্রদ্ধা ও ভয়ের সঙ্গেই গাঁয়ের লোকে তাদের বলে। তারাও সাগ্রহে ও আত্মসন্তোষের সঙ্গে এই সম্মান গ্রহণ করে। কেননা, পবনপুত্র বলতে ভীম এবং হনুমানকেই নাকি বুঝিয়ে থাকে। লাখপতি আর ঘামারি, পরস্পরকে তারা ওই শক্তিমান বীর দু-জনেরই অংশবিশেষ বলে মনে করে। আর, দুই বীরেরই পূজারি তারা। বজরংবলী তাদের দেবতা। অর্থাৎ বীরশ্রেষ্ঠ হনুমান।

    কথাটা মিথ্যে নয়।

    এই নির্জন পরিবেশে, লোকালয়ের বাইরে, দূর প্রান্তরে তারা দুই বন্ধু যেন গহন অরণ্যের দুইটি জীব। এখানে এই পরিবেশে তারা একাত্ম ও মুক্ত।

    লাখপতি এখানে এসেছিল তার বিশ বছর বয়সে। ঘামারি তার চেয়ে বড় বছর দুয়েকের। আজ দশ বছর ধরে তারা একত্র রয়েছে। এই দশ বছরের মধ্যে তারা কখনও ফারাক হয়নি। এই দশ বছরের মধ্যে, পৃথিবীতে হয়েছে অনেক ওলটপালট। অনেক রাজ্য ভেঙেছে গড়েছে। অনেক মানুষ জন্মেছে মরেছে। নদী ভিন্ন পথ ধরেছে, নতুন স্থলভূমি দেখা দিয়েছে, ঘটে গেছে ভৌগোলিক পরিবর্তন। এমনকী, এই দূরের গ্রামগুলিতেও পরিবর্তন হয়েছে কিছু কিছু। কিন্তু এখানে কোনও পরিবর্তন নেই। উদার আকাশের তলায় এই নির্জন লেবেল ক্রসিং-এর দু-পাশে যেন পৃথিবীর কোনও দুর্গম অঞ্চলের প্রাগৈতিহাসিকতা বিরাজমান।

    পরিবর্তন যেটুকু হয়েছে, সেটুকু লাখপতি আর ঘামারির দেহে ও রক্তে। দিনে দিনে তাদের দেহের রূপ বদলেছে। সঞ্চিত হয়েছে রক্ত, স্ফীত হয়েছে মাংসপেশি। এখন ক্রমে বাধাহীন হয়ে উঠেছে যেন তাদের রক্তপ্রবাহ। দেহের মধ্যে সে অস্থির, প্রতি মুহূর্তে একটা ভয়ংকর বন্যতা ফেটে পড়তে চাইছে। ক্রমিক অধ্যবসায়ে একদিন যা ছিল কোমল, সুন্দর ও সুগঠিত, আজ তা বন্য পাহাড়ের মতো খোঁচা খোঁচা পাথর। তাদের প্রেম, ভালবাসা, তাদের হাসিখুশি, আলাপ-আলোচনা সব এই দেহকে ঘিরে। এই দেহ ও পরস্পরের সঙ্গে বন্ধুত্বই মল্লযুদ্ধ। আর দিনে দিনে পরিবর্তিত হয়েছে রেললাইনের তারের বেড়ার বাইরে তাদের মল্লভূমির প্রশস্ত স্থানটুকু। সেই মাটিটুকুকেও তারা দেহের মতো ভালবাসে, দেহের মতোই তার সেবা করে, তার প্রতিটি কণাকে তৈরি করে। এই মাটিতে তাদেরই গায়ের গন্ধ, তাদেরই ঘামে তাদেরই উত্তাপে শুকনো ও ঝুরঝুরে।

    এবেলা, ওবেলা, দিনে ও রাত্রে কয়েকবার করে নিশান দেখানো, দেখানো নীল আলো, তাদের কাছে কোনও কাজই নয়। মাসে তারা একবার করে সাত আট মাইল দূরের জংশন স্টেশনে যায় মাইনে আনতে। খোরাকি ও দরকারি বস্তু কিনে নিয়ে আসে তখনই। বাদবাকি দরকার দিনে একবার করে গাঁয়ে গেলেই মিটে যায়। তাদের দুজনের দুটো গোরু আছে। কিনতে হয়নি, দিয়েছে পুষতে-না-পারা হা-ভাতে গাঁয়ের লোকেরা। গোরু পুষতেও তাদের ভাবতে হয় না। লাইনের ধারে বেঁধে দিলেই জীব দুটির পেট ভরে। রাত্রে কিছু জাব আর জল। তাইতেই দুধটা তাদের লাভ। সকালের দুধটা এসে একজন নিয়ে যায়। বিকালের দুধ তারা তাদের কুস্তির পর, জলের মতো কাঁচাই পান করে। রাঁধে খায় এক সঙ্গে, থাকে সারাদিন এক সঙ্গে, রাত্রে শোয় আলাদা।

    সকাল থেকে রাত্র পর্যন্ত, এই কাজগুলি সামান্য। কিন্তু এই নির্জন পরিবেশে যা একদিন প্রয়োজনের জন্যে তারা আরম্ভ করেছিল, আজ তা দারুণ নেশার মতো জড়িয়ে ধরেছে রক্তের মধ্যে। অসামান্য হল দেহচর্চা। রাত পোহালেই রক্তপ্রবাহে জাগে কলরোল। দেহের মধ্যে আছে তাদেরই অপরিচিত আর একটা খ্যাপা জীব। সময়ের একটু এদিক ওদিক হলে, প্রতিটি ধমনীতে সে পাগলের মতো খোঁচাতে থাকে, ছুটোছুটি করে।

    তখন আর চুপ করে বসে থাকা যায় না। তখনই ল্যাঙট এঁটে, তুলসীমঞ্চের গর্তে সযত্নে রক্ষিত হনুমানের ছোট্ট মূর্তিটিকে নমস্কার করে বুকডন বৈঠকে মেতে যায় তারা। বিকাল না হতেই আবার সেই। বজরংবলীর পূজা, তৈলমর্দন, ব্যায়াম ও মল্লযুদ্ধ।

    মল্লযুদ্ধ শেষে দুধের মধ্যে বাটা সিদ্ধি মিশিয়ে খায়। খেয়ে গরিলার মতো রক্তবর্ণ দুটো চোখে স্নেহ ও সোহাগভরে দেখে শুধু, নিজেদের দেহ। যেন তাদেরই পোষা দুটি অতি স্নেহের জীব এই দেহ দুটি।

    এই সময়ে তাদের অতি ভয়ংকর দেখায়। মাথা আর ঘাড় তাদের সমান হয়ে উঠেছে। কোথাও যেন উঁচুনিচু নেই। কান দুটোও আঘাতে আঘাতে দুমড়ে চেপটে যেন অনেকখানি মিশে গেছে। মল্লবীরদের নিয়ম তাই। কান পিটিয়ে পিটিয়ে একটা ড্যালা ডুমড়ি গোছের করে ফেলতে হয়। সেই কানে আবার অতি যত্নে পরানো আছে সোনার মাকড়ি। নাকগুলি চেপটে এঁকেবেঁকে গেছে। চোখের কোল ও গালের মাংস শক্ত ও ফোলা। চোখ দুটো ঢাকা পড়ে গিয়েছে কোটরে। ঘাড়ের মাংসপেশি যেন নিয়ত আক্রমণোদ্যত ভাল্লুকের মতো ঠেলে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সামনের দিকে।

    তারা বসে থাকে মুখোমুখি। আর তাদের মুখোমুখি হাঁ করে চেয়ে থাকে মাঠ, বন, সর্পিল সড়ক আর আকাশ। তাদেরই ক্লান্তি ও অক্লান্তিতে বিরতি দিয়ে দিয়ে ডাকে ঝিঁঝি।

    তখন ঘামারি হয়তো বলে, আচ্ছা লাখুয়া, ভীমের চেহারাটা কীরকম ছিল বলতে পারিস?

    কথাটার মধ্যে কোনও ঠাট্টার আভাস নেই। লাখপতি একটু ভেবে বলে, ঠিক বলতে পারছি না। তবে শুনেছি দৈত্যের মতো। তা নইলে আর হিড়িম্বা রাক্ষসীকে মেরে ফেলেছিল?

    ঘামারি বলে, হুঁ, ঠিক।

    ভীম হনুমান, এদের নিয়ে প্রায়ই তারা এরকম আলোচনা করে। ইচ্ছে করে নয়। আপনি ও সব কথা তাদের মনে আসে।

    কোনও সময় হয়তো লাখপতি বলে, জানিস ঘামারি, আমার মনে হয় মহাবীর হনুমান আমাদের জরুর দেখভাল করে, আসে এখানে।

    অমনি ঘামারির ভাং নেশাচ্ছন্ন লাল চোখ দুটো ওঠে চকচকিয়ে। বলে, হ্যাঁরে, আমারও শালা এরকম মনে হয়।

    বলতে বলতেই আপনি তাদের বিশাল দেহের মাংসপেশিগুলি নাচতে থাকে।

    তখন ঘামারি বলে, আমার কী মনে হয় জানিস। এ রেললাইনের জমিটা আমি একলাই সিরিফ গদানের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারি। কেন বল তো?

    লাখপতি বলে, কী জানি মাইরি! আমারও শালা ওরকম মনে হয়, মনে হয়, দুনিয়াটা বেমালুম হালকা। ঘাড়ে করে নিতে পারি।

    সত্যি, দেহে তাদের এত শক্তির প্রাচুর্য যে, শুধু নেশা নয়, এমনি একটা অপরিসীম ক্ষমতা অনুভব করে তারা। এই প্রচণ্ড শক্তিটা এক সঙ্গে জমাট হয়ে যেন আগুনের মতো ঠিকরে পড়ে তাদের। চারটে চোখে। দেহ তাদের গৌরব, তাদের সব।

    তখন হয়তো ঘামারি বলে, আয়, আর একবার লড়ি।

    লাখপতি বলে, সেই ভাল।

    কিন্তু আবেগবশত যেদিন লড়ে, সেদিন সময়ের কোনও স্থিরতা থাকে না। অন্ধকারে শুধু দুপদাপ, হঠাৎ চাপা হুংকারের তীক্ষ্ণ শব্দ, জন্তুর নিশ্বাসের ফোঁসফোঁসানি রাত্রিটাকে চমকে দেয়। বিমূঢ় অন্ধকার ও নক্ষত্রখচিত আকাশ চেয়ে থাকে হাঁ করে। আর অন্ধকারেও তাদের ঘর্মাক্ত শরীরে। এমন একটা চমকানি দেখা যায় যেন পাথরের ঘর্ষণে জ্বলে ওঠে আগুনের ঝিলিক। কখনও শুধু মাথা ঠোকাঠুকি করে পরস্পরে। তখন মনে হয়, লেঠেলদের লাঠি ঠোকাঠুকি হচ্ছে।

    এই দৈহিক শক্তির খেলাই তাদের নেশা। তাদের মাতামাতিতে রাত্রিচর বাদুড়গুলিও দূর থেকে উড়ে যায়, জানোয়ারগুলি ফারাক দিয়ে পাশ কাটায়। কারণ প্রকৃতির গড়া ভয়ংকরের মতোই তাদের তখন দেখতে হয়।

    এই দশ বছর কেউ তাদের কোথাও যেতে দেখেনি। গাঁয়ের লোক জানত তাদের কেউ নেই। তারাও সেরকমই জানত বোধ হয়। কেননা, তাদের মুখে কেউ কখনও অন্য কোনও কথা শোনেনি। গাঁয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও কম। কেবল মাঝে মাঝে গাঁয়ের ছেলেরা আসে তাদের কুস্তি দেখতে। তাও ভয়ে ভয়ে। তাদের এই নীরস দেহ সাধনা মানুষের কাছ থেকে তাদের সরিয়ে দিয়েছে। নীল পুজোর দিন, গাঁয়ের মেয়েরাও আসে। আর সপ্তাহে একদিন, শুক্রবার কিছু ভিড় হয়। ওইদিন হাটবার। ক্রসিং পেরিয়ে যেতে হয় হাটে, সেই জন্যেই ভিড়।

    লোকে যেমন জানত, তাদের কেউ নেই, তারাও সেই রকম বিশ্বাস করত। কেননা, ঘামারির বউ মরে গেছে দেশে থাকতেই। তার আর কেউ নেই। তারপর থেকে সে এখানে আছে।

    লাখপতিও পিতৃমাতৃহীন। ভাইবোনও নেই। ভগবান জানে, তার বাপ-মা কী ভরসায় তার নাম রেখেছিল লাখপতি। পাঁচ বছর বয়সে তার বিয়ে দিয়ে দশ বছর বয়সে বাপ মা তাকে সংসারে। একাকী করে রেখে গেছে। না ঘর, না ক্ষেতি গিরস্তি। ভাগ্য ভাল, খুড়ো ছিল শিয়ালদা লোকোর কুলি। সে বেঁচে থাকতেই জুটিয়ে দিয়েছিল কাজটা। পাঁচ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল। নিয়ম হচ্ছে। বর-কনে বড় হলে, জোয়ান হলে গাওনা হয়। ওইটিই আসলে বিয়ে। তখন থেকে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে ঘর করে। কিন্তু লাখপতির ভাগ্যে তা-ও ঘটে ওঠেনি। কী দিয়ে গাওনা হবে, বউ আসবে কোথায়।

    তারপরে কাজ জুটেছে এই বাংলা দেশে। কেউ তাকে দেশে আজ অবধি ডাকেনি, সে-ও যায়নি। বউটাকে হয়তো আর কেউ ঘরে তুলেছে, কিংবা বাপ-মা বিক্রি করে দিয়েছে কাউকে। কিন্তু সে কথা দশ বছরে দশবারও তার মনে পড়েছে কিনা সন্দেহ। এমনকী পাঁচ বছরের সেই স্মৃতির কণাও নেই তার মনে।

    নারী সংক্রান্ত কথাবার্তা তাদের আলোচনায় খুব কম। ওদিক থেকে তারা অনেকটা নির্বিকার ও নির্লিপ্ত। গাঁয়ের কোনও মেয়ের সঙ্গে দেখা করার বা মেশার অবসরও নেই তাদের।

    তারা আছে তাদের কাজ, দেহচর্চা ও মল্লযুদ্ধ নিয়ে। তারা শোনে শহরের মল্লযোদ্ধাদের কথা। তারা শহরে গেলে শহরের লোকেরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে।

    তবু তাদের এই অসীম শক্তি ও বিশাল দেহের মধ্যে কী যেন আটকা পড়ে আছে। যেন একটা খাঁচায় পোরা পাখি ছটফট করছে সব সময়ই মুক্তির জন্যে। কিন্তু এই পরিবেশ ও দেহ ভেদ করে সে কখনওই বাইরে আসতে পারে না। এ যে কীসের বন্ধন, তারা জানে না।

    তবু, একটা দুর্বোধ্য আবেগ আসে তাদের মনে। তা-ও এতই ক্ষণস্থায়ী যে, আবার তারা মল্লভূমিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ক্লান্ত হলে পড়ে ঘুমিয়ে। ঘুম ভেঙেই গর্ব ও আনন্দভরে তাকায় পাহাড়ের বুকের দিকে, নাড়া দেয় মাংসপেশি। যেন পাথর কাঁপছে! তারপর আধঘুমন্ত, আড়-মাতালের মতো কাজে হাত দেয়।

    দেহ প্রধান। মস্তিষ্ক যেন কোনও কুলুপ কাঠি দিয়ে আটকানো, অবসাদগ্রস্ত, নিষ্ক্রিয়। হৃদয়টাও কেমন যেন আবদ্ধ, অন্ধকার। এই তাদের জীবন।

    এমনি অবস্থায় একদিন হেমন্তের মাঝামাঝি এক দুপুরে গাঁয়ের ডাকঘরের পিয়ন এসে ডাকল, কই গো পবন-পো দাদারা।

    জবাব এল, এখুন দরজা নাই খোলা যাবে গো।

    পিয়নটা রীতিমতো অবাক হল। চিঠি দেখে হাঁক দিল আবার, লাখপতি চামারিয়া কে আছেন আপনাদের মধ্যে?

    লাখপতি চামারিয়া? দুই মল্লবীরই উঠে এল দিবানিদ্রা ছেড়ে। তারাও ভারী অবাক।

    লাখপতি বলল, কী হয়েছে?

    আপনার নাম লাখপতি চামারিয়া? গ্রাম্য বাঙালি পিয়নটা চামারিয়া পদবিকে একটা বর্ণহিন্দুর পদবি ঠাউরেছে বোধ হয়।

    লাখপতি বলল, হাঁ হাঁ।

    আপনার একটা চিঠি আছে।

    ইংলিশ চিঠি?

    না। হিন্দি।

    বোঝা গেল আপিসের নয়। লাখপতি আর ঘামারি মুখ চাওয়াচাওয়ি করে, মাটি কাঁপিয়ে গিয়ে চিঠিটা নিল। পড়বে কে? ঘামারি সামান্য পড়তে জানে। তবে দেহাতি অক্ষর। সৌভাগ্যের বিষয় চিঠিটা ধুলোকাদামাখা দোমড়ানো হলেও দেহাতি ভাষায় লেখা।

    পিয়ন বলল, ছ-মাস আগে চিঠিটা আপনাদের হেড আপিসে আসছে, এখানকার ঠিকেনা নাই কি না? তা কী বিত্তান্ত?

    দুজনেই তাড়াতাড়ি খাঁটিয়া পেতে বসল পড়তে। প্রথম অক্ষরটি পড়তে প্রায় পাঁচ মিনিট লাগল। পিয়ন বিদায় হল হতাশ হয়ে।

    বিকালের দিকে চিঠি পড়া শেষ হলে তারা অবগত হল, চিঠিটা দিচ্ছে লাখপতির বিধবা খুড়ি। বক্তব্য, সে এবার মরবে। আশা করছে, এতদিনে লাখপতি গুছিয়ে নিয়েছে। সে যেন তার বউকে এবার নিয়ে যায়। বউ খুড়ির কাছেই আছে। তাই উপদেশ হচ্ছে, জোয়ান আওরত, খর নদীর নৌকো। মাঝি হাল না ধরলে এবার তরী যাবে। অতএব আর দেরি নয়।

    দুজনেই তারা তাদের এবড়ো-খেবড়ো মুখ দুটো আরও ভয়ংকর করে বসে রইল। জীবনে একটা বাধা এসে উপস্থিত হয়েছে। নিতান্ত আচমকা। হোক দেহের মধ্যে সীমিত, তবু জীবন তাদের ওখানেই পরিপূর্ণ। দেহের নানা স্থানে কতগুলি মাংসপেশি ফুলে উঠে অস্বস্তিতে থমকে রইল।

    ঘামারি বলল, অওরত?

    লাখপতি বলল, এখানে?

    একটা ধিক্কার দেখা দিল তাদের চোখে। কিন্তু এদিকে বিকালের অস্থিরতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল তাদের রক্তধারায়। কথা অসমাপ্ত রেখে নেশার ডাকে সাড়া দিতে চলল তারা। দুজনেই ঝাপিয়ে পড়ল নরম মল্লক্ষেত্রে।

    তারপর রাত্রে যখন দুধ সিদ্ধি খেয়ে বসল দুজনে, তখন একই ভাবনা ঘিরে এল আবার তাদের মনে। দেহকে ঘিরে তাদের ঘোর স্বার্থপরতা, পৃথিবীর আর সবদিক থেকে এমনিভাবে বিমুখ করে রেখেছে চোখ ও মন। তাদের দেহ সাধনার যে পরম আনন্দ, তাতে এক নিরানন্দের অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে। এই দেহ থাকলে তার সুখ, পরমায়ু ও ভগবান। আওরত তো তাতে শুধু ক্ষয় ধরিয়ে দেবে।

    অন্ধকারের মধ্যে পরস্পরকে একবার দেখল। তারপর স্থির হল, এটা নিশ্চয়ই মহাবীরের ইচ্ছা। সুতরাং আনতেই হবে। তবে লাখপতি তার এই দেহের ভাগ তাকে একটুও দেবে না। দুই বন্ধু এই স্থির করল। বউ থাকবে নিজের কাজ নিয়ে।

    তারপর ছুটি নিয়ে লাখপতি দেশে গেল। নিয়ে এল বউ।

    ছাব্বিশ বছরের এক মেয়ে, নাম তার উরাতীয়া। খুড়ি শাশুড়ির ঘরে ক্রীতদাসীর মতো খেটে-খাওয়া মেয়ে। স্বাস্থ্য ও যৌবনে পূর্ণ তার সুগঠিত দেহ। বেশ আঁটো, সামান্য খাটো, রংটা আধা ফরসা। রূপসী বলা যায় কি না জানিনে। তার নিরাভরণ শরীরের পুষ্ট হাত-পায়ের গোছায় একটা বিহারি রুক্ষতা, কিন্তু চোখ দুটি ভরা কালো দীঘির মতো ভাসা ভাসা অথচ গভীর। আর, হয়তো প্রথম স্বামী সাক্ষাতের গোপনলীলায় একটা দুর্বোধ্য হাসি তার গালের টোলে।

    একটা হলদে শাড়ির ঘোমটা টেনে সে এল লাখপতির সঙ্গে, হাতে পুঁটলি ঝুলিয়ে। এল নির্জন মাঠের বুকে, লেবেল ক্রসিং-এর ঢালু জমির কোলে গেটম্যানের ঘরে। একদিন যাদের পদক্ষেপে ঘরটা কাঁপত, আজ আর একজনের পদসঞ্চারে সেই ঘর নিঃশব্দ, কিন্তু বিচিত্র শিহরনে, পুলকে ভরে উঠল। মল্লবীরের সাজানো-গোছানো গুমটি ঘরে আলো এল, হাওয়া বইল।

    ঘামারি এসে দাঁড়াল। লাখপতি দু-হাতে জড়িয়ে ধরল তাকে। বুকে বুক ঠেকাল। কয়েকদিনের যন্ত্রণাকাতর চাপা পড়া রক্তধারায় জোয়ার এল আবার। তারপর দুই মল্লবীর চোখ দিয়ে চেটে চেটে দেখল দুজনকে। উজ্জ্বল হয়ে উঠল দু-জোড়া চোখ।

    লাখপতি বলল, চল, একবার দেখা যাক।

    ঘামারি বলল, তুই দেখিসনি?

    লাখপতি বলল, ধু-স্ শালা মনেই হয়নি। চল, এক সঙ্গে দেখি গে।

    ঘামারি বলল, কী আর দেখব? অওরত অওরত।

    লাখপতি উত্তর দিল, তবু একবার

    দুজনে হাত ধরে ঘরে ঢুকল। উরাতীয়া বসে রয়েছে ঘোমটা টেনে। তারা দুজনে বসল অদূরের খাঁটিয়ায়। উরাতীয়াকে দেখে আর চোখাচোখি করে।

    একটু পরে উরাতীয়া ঘোমটা তুলে খুব ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে তাকাল তার কালো চোখে। দুজনের সঙ্গে তার চোখাচোখি হতেই শান্ত অথচ মিঠে হাসি চমকে উঠল তার চোখে ও গালের টোলে। মাথাটি গেল নেমে। রুক্ষ খোঁপাটা ভেঙে পড়ল ঘাড়ের পাশ দিয়ে।

    হাসি দেখে অবাক বিস্ময়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল মল্লবীরেরা। আবার উরাতীয়ার চোখ উঠল, দুর মেঘে যেন হালকা বিদ্যুৎ চমকাল মিঠে হাসির। বিশালদেহ দুই বন্ধু আবার মুখ চাইল পরস্পরের।

    তারপর হেসে উঠল। হাসতেই লাগল উচ্চরোলে। যেন এক রুদ্ধধারা হঠাৎ মুক্ত হয়ে অনর্গল বয়ে চলল অট্টরবে।

    আর সেই অট্টরবের সঙ্গে এক বিচিত্র সুর যোজনা করল নূপুর নিক্কনের মতো চাপা গলার খিলখিল হাসি। থরথর করে কেঁপে উঠল উরাতীয়ার শরীর ও ভাঙা খোঁপা।

    এমনই অভাবনীয়, অচিন্ত্যনীয় এই বিচিত্র হাসির রোল যে, প্রাগৈতিহাসিক যুগের ক্রসিং গেটের এই চারপাশের সীমা, তার বনপালা সড়ক ও আকাশ থমকে রইল এক মুহূর্ত। পরমুহূর্তেই হেমন্তের অপরাহু নেচে উঠল হাওয়ায়। ইতিহাসের যুগ ফিরে এল যেন সমস্ত পরিবেশটায়।

    আর এল মাঠের পাকা আমনের গন্ধ, গভীর হাম্বা রব, মাঠের মানুষের হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি। আর আশ্চর্য! এই কান পেটানো, নাক থ্যাবড়া, চাঁছা মাথা, এবড়ো খেবড়ো মুখ এই পাহাড়ে মানুষ দুটোকে দেখে একটু ভয় পেলে না গেঁয়ো উরাতীয়া। সে সমানতালে হেসে হাসিয়ে এক নতুন রং। ছড়িয়ে দিল এখানে। তারপর খুলে ফেলল তার পুঁটুলি।

    কণ্ঠরোল থামল। কিন্তু যেন যুগ-যুগান্তের চাপা পড়া হাসি কাঁপতে লাগল মল্লবীরদের পেশিতে পেশিতে, হাসতে লাগল গর্তে-ঢোকানো চোখ। নিজেদের হাসিতে তারা নিজেরাই বিস্মিত কৌতূহলিত হয়ে দেখল আবার উরাতীয়াকে।

    উরাতীয়া পুঁটুলি খুলে বার করেছে বাঁকমল। পরেছে পায়ে। এইটুকু তার বাপের বাড়ির সম্বল। লুকিয়ে রেখেছিল খুড়ি শাশুড়ির ঘরে এসে। আসল লোকের ঘরে এসে একদিন সে পরবে, এই ছিল সাধ। আজ তা পূর্ণ হল।

    মল পায়ে উঠে দাঁড়াল সে। অসংকোচে ঘুরল সারাটি ঘর। আপন মনে হেসে হেসে দেখল চারদিক। রাবণের লঙ্কা পোড়ানো, গন্ধমাদন বহন, বুক চিরে দেখানো রাম-সীতা এমনি ছ-সাত রকমের শুধু মহাবীর হনুমানের ছবি টাঙানো আছে ঘরটায়। .

    তারপর বাইরে এসে দাঁড়াল উরাতীয়া। দুই মল্লবীর বন্ধুও উঁকি মেরে দেখতে লাগল এই অদ্ভুত ব্যাপার। উরাতীয়া গিয়ে দাঁড়াল তুলসীমঞ্চের কাছে। নিচু হয়ে দেখল মহাবীর হনুমানের মূর্তি। সেখানে গড় করল। মল্লক্ষেত্রের চারপাশে দুই বন্ধু লাগিয়েছিল বেল ও গাঁদার চারা। সৌন্দর্যের জন্যে নয়। মল্লক্ষেত্রের পবিত্রতার জন্যে। হনুমানজীর পুজোর জন্যে। কয়েকটা গাঁদা ফুল ফুটেছে এর মধ্যেই।

    উরাতীয়া পটাস্ করে ছিড়ল একটি ফুল। আড়চোখে দেখল দুই পুরুষকে। তারপর লাইন পেরিয়ে নেমে গেল ওপারে। গিয়ে খোঁপায় গুঁজে দিল ফুলটি।

    দুই বন্ধু গিয়ে উঁকি দিল। দেখল, উরাতীয়া ঘামারির ঘরটিও দেখছে ঘুরে ঘুরে। তার ঘোমটা গেছে খসে। বাইরে এসে দুজনের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই লজ্জার বিচিত্র রাগে, হেসে মুখ ঘুরিয়ে নিল। আর একটা হাসির উচ্চরোল পড়ল ফেটে। কেন, তারা নিজেরাই তা জানে না। কেবলই হাসি আসছে, হাসি পাচ্ছে। প্রাণ চাইছে, ভাল লাগছে।

    তারপর দেখা গেল, তাদের গায়ে আঁচলের হাওয়া দিয়ে উরাতীয়া দুলে দুলে চলেগেল পুবের সড়কের পাশে ছোট্ট পুকুরটিতে। স্নান করে এসে, কাপড় পরে খুঁজে পেতে বার করল দুধের বালতি। গাইয়ের বাঁট দেখে সে টের পেয়েছে, সময় হয়েছে দুইবার। মরদগুলোর সে খেয়াল নেই। কোনওদিন ছিল নাকি।

    একটা নয়, ঘামারির গোরুরও দুধ দুইল সে। দুয়ে অবাক-মুগ্ধ মল্লবীর পুরুষদের সামনে এসে দাঁড়াল। মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল, উনুন কোথায়? আগুন দেব।

    দুই বন্ধু বিস্ময়ে চোখাচোখি করল। চোখে চোখেই তাদের কথা। পরস্পরের চোখের দিকে তাকালে তারা মনের ভাব বুঝতে পারে। মল্লক্ষেত্রে ওই শিক্ষাটি তারা আয়ত্ত করেছে। তাদের চোখ বোবা জানোয়ারের মত বলাবলি করছিল, এ সব কী হচ্ছে? সত্যিই কি আমাদের জীবনে একটা নতুন কিছু ঘটতে বসেছে? একটা কোনও সর্বনাশ কিংবা সুখের ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে? তবু তাদের মস্ত বুক দুটিতে একটা খুশির বন্যা পাক দিয়ে উঠছে।

    ঘামারি বলল, তোর উনুনটা বার করে দে।

    লাখপতি বলল, কেন? তোরটা কী হল? তোরটাই দে। বলেই আবার কী হল তাদের, তারা হেসে উঠল। এক নাম-না-জানা মদির রসে আকণ্ঠ ভরে উঠেছে তাদের। একটা মাতলামির ঘোর। লেগেছে মনে। শুধু তাদের মাঝে হাসি-উচ্ছল উরাতীয়ার গা বেয়ে যেন একটা মানুষিক মোহের ঝরনা পড়তে লাগল গড়িয়ে গড়িয়ে।

    উনুন ধরল। ঘামারির ঘরে রান্না হত এতদিন দুজনের। এবার তিনজনের রান্না চাপল লাখপতির উঠোনে।

    ঘামারি তেল আর ল্যাঙট নিয়ে এল। লাখপতির চাপা রক্তে লাগল ঢেউ। দুজনে ঝাঁপিয়ে পড়ল মল্লক্ষেত্রে। এতদিন শুধু মল্লযুদ্ধের জন্যে মল্লযুদ্ধ হয়েছে। এতদিন শুধু নানান কায়দা ও চাপা হুঙ্কার উঠেছে ভয়ঙ্কর শক্তির ঘোরে। আর থমকে থেকেছে চারদিকের পরিবেশ। আজকের লড়াই উল্লসিত। আজ প্রাণখোলা উল্লাসের বান ডেকেছে মল্লক্ষেত্রে। রান্না চাপিয়ে থেকে থেকে। এসে দাঁড়াচ্ছে উরাতীয়া। কখনও বাঁকা হয়ে, সোজা দাঁড়িয়ে ঘোমটা তুলে বা খুলে, চোখ বন্ধ করে, নয়তো খিলখিল হাসির বাজনা বাজিয়ে দেখছে। এই সময়ের মধ্যেই অসংকোচে দিয়ে উঠছে। হাততালি।

    মাঝে মাঝে শঙ্কিত হয়ে লক্ষ করছে, কার ক্ষমতা বেশি। আজ কেউ কাউকে আঁটতে পারছে। না। ঘামারিকে ফেলে লাখপতি ঘাড়ে মাটি ফেলছে আর হাঁকাচ্ছে রদ্দা। তারপর বগলের তলায় হাত দিয়ে চেষ্টা করছে উলটে ফেলতে। পারছে না। আবার পালটা লাখপতিকে নিয়ে চলল চেষ্টা। হল না।

    তখন আবার হাসি। তিনজনের হাসি। এতদিন এই সন্ধ্যাবেলা উঁচু জমিটার উপরে, আকাশের কোলে দেখা যেত দুটি দানবের মূর্তি। আজ আর একটি বিচিত্র রূপের দ্যুতি মূর্তি ধরে দাঁড়িয়েছে তার মাঝখানে। আজ তারাও যেন ধরেছে মানুষের মূর্তি। মানুষিক স্বপ্নের ঘোর লেগেছে আজ এখানে।

    তারপর দিন চলে গেল। একটা নতুন যুগের নব রূপায়ণের সুচনা ঘটল এখানে।

    উরাতীয়া ছোট ঘরের মেয়ে ও বউ। ক্রীতদাসী ছিল খুড়ি শাশুড়ির ঘরে। নিষিদ্ধ যৌবনবাসর নিয়ত হাতছানি দিয়ে ডেকেছে তাকে। যেমন ডাকত আরও অনেককে। যেতও অনেকে। সে প্রতীক্ষা করেছিল একজনের জন্যে।

    এখানে এসে তার ছাব্বিশ বছরের পিপাসিত যৌবন প্লাবিত হল। সেই প্লাবনের ধারায় পলি পড়ল এখানকার মাটিতে, দুটি মল্লবীর মানুষের হৃদয়ে। সে একজনকে দিয়ে খুশি, পেয়ে খুশি আর একজনকে। লাখপতি তার ষোলো আনা। জীবন ও যৌবনের দেবতা। যে ষোলো আনার টায়টিকে হিসাবের পর যেটুকু মানুষকে করে নিঃশঙ্ক, বুকে আনে বল, তার সেটুকু হল ঘামারি। ঘামারি তার সহচর। তারা তার প্রেম ও প্রীতি, ভালবাসা ও সৌহার্দ, সুখ ও দুঃখ।

    দেবতা ও সহচর, দুই মল্লবীরের মনে সে বোধ ছিল না। অবোধ খুশিতে রচিত হয়েছে তাদের নতুন জীবন। তারা এতদিন শক্তি অনুভব করেছে মাংসপেশিতে। এবার হৃদয়ে হৃদয়ে। তাদের বিশাল শক্তিশালী শরীরের মধ্যে যে বন্দি বিহঙ্গটা এতদিন ছটফট করেছে, তা অকস্মাৎ মুক্ত হয়ে, ঝাঁপ দিয়ে স্নান করে নিল এক মুক্ত ফল্গুধারায়। জানত না, বন্দির এ মুক্ত ফল্গুধারা হল উরাতীয়া।

    এখন কুস্তির শেষে, যখন তারা দুজন দুধ সিদ্ধি খেয়ে হাওয়ায় বসে দোলে, তখন তাদের মাঝখানে এসে বসে উরাতীয়া। আগে তাদের মস্তিষ্ক থাকত অবসাদগ্রস্ত আর শরীরে বইত রক্ত। এখন মস্তিষ্কে একটা নতুন টংকার অনুভূত হয়।

    উরাতীয়া বলে ঘামারিকে, তারপর, সে কথাটা বলো। তোমার বউ কেমন করে মরল?

    মহাবীর ভীম নয়, কুস্তি কায়দা নয়, বউয়ের কথা। ঘামারি বলল, কী আবার বলব।

    লাখপতি বলে, বল না। আমি তো কোনওদিন শুনিনি?

    উরাতীয়া ব্যথা পায়, অবাক হয়। বলে, সছ! ওমা এত বন্ধুত্ব আর এ কথাটা কোনওদিন বলা কওয়া হয়নি? ঠোঁট ফুলিয়ে, অভিমান ভরে বলে উরাতীয়া, যাও! তোমরা যেন কী!

    বলতে বলতে চোখ ছলছলিয়ে ওঠে তার। আর ওই কথা, ওই জলটুকু তাদের গলায় একটা বিস্মিত ব্যথা ও আনন্দের গোঙানি এনে দেয়। সত্যি, তারা অনেক কথা এতদিন বলেছে, হেসেছে। কিন্তু এমন বিচিত্র হাসি, ব্যথা ও আনন্দ, এত অজানিত সুখ-দুঃখ, হৃদয়ের ছোটখাটো অসামান্য বিষয়ের আদানপ্রদান হয়নি।

    অনেক কথা, অনেক হাসি, এমনকী কোনও কোনও রাতে মোটা ও হেঁড়ে গলায় বেসুরো গান পর্যন্ত শোনা যায় :

    ধোঁকে কে নিউ পর
    ইমারত নেহি বনতে ॥

    অর্থাৎ, মিথ্যার ভিতে সত্য দাঁড়ায় না। এ গানটা লাখপতি শুনেছিল কোনকালে মাইনে আনতে গিয়ে জংশন স্টেশনে। হনুমানের কীর্তি গাথা নয়, হিড়িম্বা বধের কাহিনী নয়, একেবারে অন্য কথা। তাও এতদিন পরে।

    বেসুর ও হেঁড়ে গলার জন্যেও তাদের তিনজনের হাসির অন্ত ছিল না। কখনও ঘামারি সব উদ্ভট হাসির গল্প করে। ছেলেমানুষের মতো উৎকট অঙ্গভঙ্গি করে নাচে। কোনকালে দেখা এক সিনেমার নায়ক-নায়িকার অভিনয় করে দুজনে দেখায় উরাতীয়াকে।

    উরাতীয়া হেসে বাঁচে না। বলে, ছি ছি! দূর দূর! তারপর আদুরে মেয়ের মতো বলে, আবার দেখাও না?

    আর দুই মল্লবীর তাই করে। পবনপোয়েরা যে এত সরল ও হাসি উচ্ছল, তা জানত না গাঁয়ের মানুষেরা। রাক্ষসের মূর্তির মধ্যে মানুষের দেখা পেয়ে, তারাও যাওয়া আসা করতে থাকে।

    কিন্তু তাদের দশ বছরের ঘুনধরা রক্তে লুকিয়েছিল এক ভয়ংকর বিষধর। লুকিয়েছিল নিতান্ত দেহসাধক, সংসার ও ভালবাসাবিমুখ মল্লযোদ্ধাদের মনের অগোচরে। সুযোগ বুঝে সে কুণ্ডলীর পাক খুলতে লাগল।

    এত সুখ, কথা ও হাসি। এত বন্ধুত্ব। তবুও মল্লযোদ্ধাদের কোথায় চাপা ছিল আগুন, সে এবার থেকে থেকে জ্বলে জ্বলে উঠল আড় কটাক্ষে, শুধু চোখে চোখে চোখে চোখে ভাব বিনিময়ে ছিল তারা দুরস্ত ও অভ্যস্ত। আজও তার ব্যতিক্রম হল না।

    যে মুক্ত ফল্গুধারায় স্নান করে তারা দু-দিন হেসেছিল অনর্গল, সে হাসি আড়ষ্ট হয়ে গেল। ওই মুক্ত ফল্গুধারাটা তাদের কাছে শুধু ছাব্বিশ বছর বয়সের একটি যৌবন ঝলকিত দেহ। মুক্ত আনন্দ, পাশব কামনার একটি যন্ত্র। দশ বছর ধরে তারা শুধু দেহের সেবা করেছে, দেহকে ভালবেসেছে। দেহাশ্রিত প্রবৃত্তি বার বার তাদের ওইদিকে অঙ্গুলি সংকেত করল। তাদের বন্ধুত্বের বন্ধন কবে ছিঁড়ে গেছে টেরও পায়নি। যে ভয়ঙ্কর দৈহিক শক্তি তাদের মিলনের সুত্র ছিল, আজ তা পরস্পরকে আক্রমণে উদ্যত করল।

    তারা মুখে কিছু বলল না। কিন্তু একজনের চোখে, খবরদার! এদিকে নয়। আর একজনের, নয় কেন?

    কিন্তু তারা লড়ে রোজ। খায় এক সঙ্গে, গল্প করে। তবু যেন জমে না। হাসিটা যেন ধাক্কা খেয়ে খেয়ে বেরোয় গলা দিয়ে।

    অবাক হয় উরাতীয়া। সব না বুঝলেও এটা বোঝে, অদৃশ্যে কী যেন ঘটছে। ওরা হঠাৎ এমন করছে কেন? জিজ্ঞেস করলে ওরা দুজনেই বোকার মতো হেসে ফেলে। আসর জমে উঠতে চায়। উঠতে পারে না।

    সেই প্রাগৈতিহাসিকতা আরও নিষ্ঠুর রূপে যেন ফুটে উঠেছে। অবাক হয়ে চেয়ে দেখে উরাতীয়া। বোঝে না। বোঝে না, কেবল আড়ালে নিঃশব্দে কেঁদে মরে। ওরা আমার দেবতা ও সহচর। ওরা দু-দিন হাসল। কিন্তু আমি আসার আগেও কি ওরা এমনিই ছিল? মনে হয়নি তো? তবে।

    ঘরের মধ্যে রাত্রে লাখপতির চেহারা বদলে যেতে লাগল। তার সোহাগ হয়ে উঠল নিষ্ঠুর। আদর হয়ে উঠল ভয়ংকর। অসহ্য আদরে সোহাগে উরাতীয়ার দেহটার উপরে একটা ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের আকাঙক্ষা যেন তার।

    আর ঘামারি সেই সময়, অনেক রাত্রে ঢালু সড়কের পাশ থেকে উঠে আসে একটা ক্ষিপ্ত ভাল্লুকের মতো। দাঁড়িয়ে দেখে লাখপতির বন্ধ ঘরটার দিকে। যন্ত্রণাকাতর জানোয়ারের মতো বুক থেকে ফেটে পড়া শব্দটাকে চেপে ধরে কণ্ঠনালিতে। কান পাতে দেয়ালে।

    কোনও শব্দ নেই। মাঘের উত্তরে হাওয়া তার গায়ে ও দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে যায়।

    শুকিয়ে উঠল উরাতীয়া। লাখপতিকে তার কিছু অদেয় ছিল না। ঘামারির একাকী জীবনের বেদনাই ছিল তার প্রীতি সৌহার্দ্যের গৌরব।

    আড়ালে যদি সে জিজ্ঞেস করে লাখপতিকে, কী হয়েছে তোমাদের? লাখপতি শুধু চেয়ে থাকে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে উরাতীয়ার সর্বাঙ্গ, তারপর হঠাৎ খপ করে উরাতীয়াকে ধরে ভয়ংকর আদরে দলা পাকিয়ে ফেলে। সে আদরে শুধু একটা অসহ্য যন্ত্রণা অনুভূত হয় রক্তের মধ্যে। ঘামারি যেন তেমনি। জিজ্ঞেস করলে তেমনি করে চেয়ে থাকে। কিন্তু গায়ে হাত দেয় না। দিতে চায় যেন। উরাতীয়া ভয় পায়।

    একই রকম দুজন। একই চাউনি ও চেহারা। কাছাকাছি থাকলেও এক এক সময় আলাদা করা যায় না ওদের। একই চালে ওরা দুজন চলেছে।

    তবু ওরা লড়ে। শুধু লড়ে। তবে মহাবীরকে প্রণাম করে, হাত মেলায়, তারপর লড়ে। কিন্তু ওদের চোখে চোখ মিললেই, পাথরের ঘর্ষণে যেন আগুন ঠিকরোয়। লড়তে লড়তে ক্ষিপ্ততা দেখা দেয়, মুহুর্মুহু নতুন নতুন আক্রমণ চালিয়ে যায়।

    উরাতীয়া যেন কেমন করে বুঝতে পারে, লড়াইটা অন্য পথ ধরেছে। এই কয়েক মাসের মধ্যেই বুঝেছে। সে বাধা দেয়, থামতে বলে।

    ওরা থামে। ছেড়ে আসে মল্লক্ষেত্র। কিন্তু ওদের ভেতরে দুটো জানোয়ার ফুঁসতে থাকে। উরাতীয়াকে মাঝখানে রেখে অনেকক্ষণ ধরে তারা শান্ত হতে থাকে।

    কিন্তু এ অবস্থাও আর রইল না। হঠাৎ লাখপতি একদিন ঘামারির উনুনটা লাথি মেরে ভেঙে ফেলল।

    ঘামারি বলল, ভাঙলি যে?

    লাখপতি জবাব দিল, ওটা পুরনো হয়ে গেছে।

    ঘামারি খেতে এল না। লাখপতি বলল, খাবিনে?

    ঘামারি জবাব দিল, না। তোদের রান্না আর ভাল লাগে না। নিজে রাঁধব।

    আশ্চর্য শান্ত তাদের কথাবার্তা। বিকেলবেলা দুধ দুইতে গিয়ে উরাতীয়া দেখল ঘামারির গোরু নেই। জিজ্ঞেস করল, গাই কোথায়?

    মাঠে।

    দুইতে হবে না?

    না। বলেই হঠাৎ ঘামারি দু-হাত বাড়িয়ে দিল উরাতীয়ার দিকে। এই প্রথম। উরাতীয়া দেখল রাত্রের বন্ধ ঘরের ক্ষিপ্ত স্বামী লাখপতি যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে। এতদিন ছিল চাপা বেদনা ও অপমান। আজ তার চোখে দেখা দিল রাগ ও ঘৃণা। নিঃশব্দে পালিয়ে এল সে। নইলে ঝাঁপিয়ে পড়বে এখুনি।

    তারপর এপার ওপার হল। দুটো সংসার হল। কেবল দেখা হয় মল্লক্ষেত্রে। এসে দেখে উরাতীয়া। বসে হাসে, কথা বলে কিন্তু একটা রুদ্ধশ্বাস গুমরানি নিয়ে নেমে আসে আকাশটা।

    লড়াইয়ের শেষে উরাতীয়া দেয় দুধ আর সিদ্ধি। ওরা খায়।

    হয়তো লাখপতি বলে, হিড়িম্বাকে কী ভাবে মেরেছিল ভীম?

    ঘামারি বলে, টুটি ছিঁড়ে।

    উরাতীয়া কেঁপে উঠে বলে, ও সব কথা থাক। শঙ্কিত অথচ আদুরে গলায় বলল, গান গাও তোমরা একটু আমি শুনি।

    গান! বিদ্রূপের মতো শোনায় যেন কথাটা। আর উরাতীয়ার দুই চোখ বেয়ে জল পড়ে।

    কিন্তু জগৎবিমুখ দেহাশ্রিত এই মল্লযোদ্ধাদের বুকে জেগেছে যে অজগর, তা ফুঁসছে দিবানিশি। মুক্ত ফল্গুধারা স্নান করেই শেষ হয়েছে। মুক্তিটাকে দেহের মতো লুফে নিতে চাইছে তারা।

    শীত গেছে। বসন্ত এসেছে। রাত এসেছে। ঢালু সড়কে ধুলো উড়ছে। গাছগুলি পাগল হয়েছে।

    সেদিন শেষ গাড়িটা যায়নি তখনও। লড়াই শেষ করে বসেছে দুজন। পরস্পরকে বারবার আক্রমণ করেছে তারা। এমনকী, আইনভঙ্গ করে আঘাত করেছে। যে জন্যে ঘামারির কপালটা উঠেছে ফুলে আর লাখপতির ঠোঁটের কশে রক্ত।

    উরাতীয়া নিয়ে এল দুধ সিদ্ধি। বুক ফেটে যাচ্ছে এই দুই বন্ধুর লড়াই দেখে। তারই জন্যে ওরা আজ পরস্পরকে ঘৃণা করছে, লড়ছে। কিন্তু কেন, কেন? সে ওদের বুক ভরে নিয়েছে, ওরা কেন পারছে না। তবু সে হাসতে চাইল, আর চোখ ফেটে এল জল। ভগবান। ওরা মানুষ চেনে না, ভালবাসে না, হাসে না। আমি হাসতে হাসতে এলাম, ওরাও দু-দিন হাসল। তারপরে এই যন্ত্রণা। সে কি শুধু আমি? তবে ক্রীতদাসী আমি ছিলাম ভাল।

    দুধের পাত্র এগিয়ে দিল সে লাখপতির দিকে। কিন্তু চকিতে কী ঘটে গেল, গেলাসটা নিয়ে লাইনের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিল লাখপতি। মুহূর্তে কীসের এক সংকেত, দুই মল্লযোদ্ধাই চকিতে উঠে দাঁড়াল। পরস্পরকে দেখল কয়েক মুহূর্ত। তারপর দুজনেই, দুদিক থেকে গিয়ে দাঁড়াল মল্লক্ষেত্রে।

    উরাতীয়া ব্যাকুল গলায় বলল, আর না, আর লড়ো না।

    কিন্তু ততক্ষণে একটা আচমকা রদ্দা মেরে ঘামারিকে ছিটকে ফেলেছে লাখপতি। কিন্তু চকিতে ঘামারি লাফ দিয়ে উঠেছে। তারপর পরস্পর ঝুঁকে পড়ে কয়েকবার নিঃশব্দে পাক খেল চারপাশে। অন্ধকারেও তাদের জ্বলন্ত চোখ দেখছিল পরস্পরকে।

    উরাতীয়া ছুটে এল মল্লক্ষেত্রের মাঝখানে, পায়ে পড়ি, ওগো পায়ে পড়ি, থামো।

    কিন্তু তাকে এড়িয়ে বনবেড়ালের মতো নিঃশব্দ উল্লম্ফনে ঘামারি লাখপতির পা দুটো ধরে, তাকে। নিয়ে সশব্দে পড়ল মাটিতে। আর তাদের দেহের ধাক্কায় লাইনের তারের কাছে ছিটকে গেল। উরাতীয়া। চিৎকার করে উঠল, থামো!

    থামবে না। প্রাগৈতিহাসিক সেই জানোয়ার দুটো আজ ইতিহাসের যুগকে ত্বরান্বিত করার জন্যে নিজেদের বোধ হয় শেষ করবে। দেখা গেল, লাখপতির পা ধরে পাক দিচ্ছে ঘামারি, শুন্যে তুলে। আছড়ে ফেলতে চাইছে। কিন্তু লাখপতি আঁকড়ে আছে মাটি। পরমুহূর্তেই আবার দেখা গেল, দুজনেই জাপটা জাপটি করে গড়াগড়ি দিচ্ছে, হুংকার ছাড়ছে, পরস্পরের গলা টিপে ধরার চেষ্টা করছে। তারপর দেখা গেল, একজনকে চিত করে ফেলে গলা টিপে ধরেছে একজন, আর একজন। দুপায়ের মাঝখানে চেপে ধরেছে গদান। আর একটা ভয়ংকর গোঙানি। দূর থেকে একটা আলো এসে পড়েছে মল্লক্ষেত্রে। কিন্তু আমৃত্যু এই হিংস্র লড়াই। সেই আলোয় উরাতীয়া দেখল, পাথরে। পাথরে ঘর্ষণ হচ্ছে। রক্ত ঝরছে পাথরের গায়ে।

    আলোটা ক্রমে তীব্র হচ্ছে। শেষ গাড়িটা আসছে। উরাতীয়া মরিয়া হয়ে ওদের দুজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তার নরম হাতে আঘাত করল, চিৎকার করে উঠল, থামো, থামো বলছি।

    কিন্তু তাদের পরস্পরের পেষণে শুধু তীব্র গোঙানি। ছিটকে যাচ্ছে মাটি, খাদ হয়ে যাচ্ছে। মল্লক্ষেত্র।

    উরাতীয়া অস্থির অসহায়ভাবে উঠে দাঁড়াল। মরবে, হয়তো দুজনেই মরবে তার চোখের সামনে। শুনবে না, কিছুতেই শুনবে না।

    এই ভয়ংকর দৃশ্য থেকে চোখ ফিরিয়ে সে অপলকদীপ্ত চোখে তাকিয়ে রইল দ্রুত এগিয়ে-আসা আলোর দিকে। অসহ্য ঘৃণায়, অপমানে, বেদনায় ও অভিমানে অভিশাপ দিতে চাইল সে। দিতে গিয়ে আরও জোরে কেঁদে উঠল। আর একবার ওদের দিকে দেখে, চোখে হাত দিল। গাড়ির। শব্দটা কানের কাছে বেজে উঠে মাটি কাঁপিয়ে তুলতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল সে লাইনের উপর।

    তারপর একটা তীব্র চিৎকার, এঞ্জিনের গায়ে ধাক্কা খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ মাথাটা নিয়ে সে আবার ছিটকে পড়ল মল্লক্ষেত্রের সামনে। গাড়িটার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেল পেছনের রক্তক্রুদ্ধ চোখের মতো লাল আলোটা।

    হয়তো উরাতীয়ার মৃত্যু-চিৎকারটা তাদের পাশবিক মল্লযুদ্ধের চেয়েও তীব্র ও ভীষণ জোরে বেজে উঠেছিল। হঠাৎ মল্লযোদ্ধাদের দুজনেরই হাত শিথিল হয়ে এল। দুজনেই তারা ছেড়ে দিল পরস্পরকে। দুজনেই উঠল, দুজনেই ফিরে তাকাল উরাতীয়ার শরীরটার দিকে। মুহূর্তে চমকে, দুজনেই টলতে টলতে এসে বসল উরাতীয়ার দুপাশে। তাদের মতো ভয়ংকর মানুষরাও দারুণ আতঙ্কে যেন শিউরে ডুকরে উঠল।

    কে লাখপতি, কে ঘামারি, আর তাদের চেনা যায় না। তারা একরকম দেখতে, একই তাদের কণ্ঠস্বর। একজনেই দুজন।

    একজন যেন দূর থেকে চাপা গলায় ডাকল, উরাতীয়া!

    অন্ধকারে চকচক করছে উরাতীয়ার সর্বাঙ্গের রক্ত। সে নিঃশব্দ, নীরব। সে মারা গেছে।

    আর একজন ডাকল, উরাতীয়া।

    কোনও শব্দ নেই। তারা আবার দেখল পরস্পরকে, আবার উরাতীয়াকে। তারপর ভূমিকম্পের নাড়া খাওয়া পাথরের মতো কেঁপে উঠল তাদের বিশাল শরীর দুটো। বোবা করুণ অসহায় জীবের মতো কাঁপতে লাগল। আর রক্তের ও চোখের জলের নোনা স্বাদে ভরে উঠতে লাগল মুখ। তারা আবার ডাকতে চাইল, উরাতীয়া! কিন্তু পারল না। শুধু বুকে বাজতে লাগল, উরাতীয়া! উরাতীয়া!

    একদিন তারা দেহাশ্রিত বদ্ধ জীবনবোধে আশ্রয় নিয়েছিল এখানে। তারপর মুক্তি এসেছিল, তারা হেসেছিল, গান করেছিল, তাদের ঘাম ঝরেছিল একদিন। আজ রক্ত পড়ল, চোখের জলে ভিজল মাটি।

    শুধু নিথর হয়ে পড়ে রইল সেই মেয়ে উরাতীয়া। বুকে বাজল তার নাম। বাজতে লাগল, বাজতে থাকবে হয়তো চিরদিন, যতদিন না সে আবার এসে হাসবে, কথা বলবে। নামটা তেমনি বাজতে লাগল আর দূর দক্ষিণের পাগল হাওয়া ছুটে এল হা হা করে।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleফুলবর্ষিয়া – সমরেশ বসু
    Next Article ধর্ষিতা – সমরেশ বসু

    Related Articles

    সমরেশ বসু

    প্রজাপতি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    গঙ্গা – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    বিবর – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    অকালবৃষ্টি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    নয়নপুরের মাটি – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    সমরেশ বসু

    শ্রীমতি কাফে – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }