কী ভয়ঙ্কর চাউনি! – অনীশ দাস অপু
কী ভয়ঙ্কর চাউনি!
মার্ক এবং আমার গোরস্তানের ক্লাসট্রিপে যাওয়ার কোন ইচ্ছেই ছিল না। তবে এতে আর ক্লাস করতে হবে না, এটুকুই যা মজা।
গ্রেস্টোন গোরস্তান আমাদের রাস্তার শেষ মাথায়। স্কুলে যাওয়া-আসার একমাত্র রাস্তা ওটা। অনেক দিন আগের প্রাচীন গোরস্তান। কবরগুলোর পাথর অনেক জায়গায় চিড় খেয়েছে, ভেঙে গেছে, উঠে গেছে চলটা। অনেকেই বলে জায়গাটা নাকি ভুতুড়ে।
মার্ক এবং আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। তবে স্কুলে যাওয়ার পথে সবসময় রাস্তার অন্য পাশ দিয়ে যাতায়াত করি। ঝুঁকি নেয়ার দরকারটা কী?
আমি এবং মার্ক যমজ। লোকে মাঝে, মাঝে এমন বোকার মত প্রশ্ন করে, ‘তোমরা কি আইডেন্টিকাল টুইনস?’ হা হা। মার্ক ছেলে আর আমি মেয়ে। আমার নাম লোরেন। যমজ হয়ে জন্মানোর ব্যাপারটা আমি বেশ উপভোগ করি, শুধু আমাদেরকে নিয়ে গাধার মত জোকস বলা ছাড়া।
গত রাতে সারাক্ষণ বরফ পড়েছে। মাটি ঢেকে গেছে পাতলা, পাউডারের মত তুষারে। আমরা, সোশাল স্টাডিজ ক্লাসের ছেলেমেয়েরা মুড়মুড়ে বরফের ওপর হেঁটে হেঁটে পৌঁছে গেলাম গোরস্তানের পুরনো লোহার ফটকের ধারে।
গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে হুঙ্কার ছাড়ছে বাতাস, প্রবল বেগে নড়ে উঠছে ডালপালা, মাথার ওপর তুষার বৃষ্টি ঝরাচ্ছে। আমি পার্কার হুড টেনে দিলাম মাথার ওপর, নতুন হাতমোজাজোড়া গলিয়ে নিলাম হাতে।
নতুন গ্লাভজোড়া খুব প্রিয় আমার। আমার দ্বাদশ জন্মদিনে আমার এক খালা উপহার দিয়েছে। ভারি সুন্দর দেখতে হাতমোজাজোড়া-বাইরেটা নরম বাদামী চামড়ায় মোড়া, ভেতরে পশমী কাপড়। বেশ গরম রাখে হাত।
‘আশা করি সবাই গোস্ট রেপেলেন্ট নিয়ে এসেছ।’ হাঁক ছাড়লেন আমার শিক্ষয়িত্রী মিস অ্যাপলবাম। এরকম উদ্ভট বুদ্ধি কী করে তাঁর মাথায় এল? বছরের শীতলতম দিনে কবরস্তানে গিয়ে কবরের ডিজাইন করা?
‘ভূত দেখলে কী করতে হয় জানো?’ আমার এবং মার্কের মাঝখানে ঢুকে পড়ে জিজ্ঞেস করল র্যাচেল মিলার।
‘জানি। দৌড় দেব তো?’ বলল মার্ক।
‘না। ভুলেও ও কাজটি করবে না,’ র্যাচেল বলল ওকে। ‘আমার দাদীমা আমাকে শিখিয়ে দিয়েছেন। তোমাকে ভূতের দিকে ভুতুড়ে চাউনি দিতে হবে।’
কোটরের ভেতরে চোখের মণি ঘোরালাম আমি। ‘ভুতুড়ে চাউনি? সে আবার কী?’
দাঁড়িয়ে পড়ল র্যাচেল। আমার কাঁধ চেপে ধরে ওর দিকে ঘুরিয়ে নিল। তারপর ভুরু তুলে, চোখ দুটো বড় বড় করে তাকাল। ‘লোরেন, এ-ই হলো ভুতুড়ে চাউনি।’
হেসে উঠল মার্ক। ‘তোমাকে খুবই বিশ্রী লাগছে দেখতে।’
হেসো না,’ দাবড়ি দিল র্যাচেল। ‘এতে তোমার জীবন বাঁচবে। আমার দাদীমা এসব জিনিস খুব ভাল জানেন। তিনি বলেছেন ভূতের কবলে পড়লে কখনো পালাতে নেই। বদলে ভূতের চোখের দিকে কটমট করে তাকিয়ে থাকবে। এমন গভীরভাবে তাকাবে যেন ভূতের আত্মা দেখতে পাচ্ছ।’
র্যাচেল বিস্ফারিত চোখে তাকাল মার্কের দিকে। ‘চোখ পিটপিট করা মানা,’ উপদেশ দিল সে। ‘ভূতের আত্মার দিকে স্থির দৃষ্টি থাকবে তোমার।’
‘এতে কাজ হবে কেন?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘কারণ ভূতেরা মৃত,’ জবাব দিল র্যাচেল, এখনো চক্ষু বড় বড় করে তাকিয়ে আছে মার্কের দিকে। ওদের আত্মা বলে কিছু নেই। তোমার চাউনি সোজা ওদেরকে ভেদ করবে। ওরা এ চাউনির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করতে পারবে না। ওরা ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গিয়ে মিলিয়ে যাবে বাতাসে।’
র্যাচেল মিনিটে এক মাইল সমান কথা বলে। ভাবে পৃথিবীর সবকিছুই তার নখদর্পণে। হেন জিনিস নেই সে নাকি জানে না। র্যাচেলকে আমার পছন্দ হয় না। ও আমার বন্ধু হওয়ার ভান করে। কিন্তু আমি জানি এটা সে করে শুধুমাত্র মার্কের ওপর ক্রাশ খেয়েছে সেই জন্য।
‘আমি তোমার পার্টনার হতে পারি, লোরেন?’ জিজ্ঞেস করল র্যাচেল। ‘মিস অ্যাপলবাম বলেছেন পার্টনার হিসেবে কাজ করতে। তুমি কি ভূত বিশ্বাস কর? আমি করি। আমার দাদীমা বলেছেন তিনি এখানকার পুরনো কবর থেকে ভূত উঠে আসতে দেখেছেন।’
‘ক্লাভানদের কুকুরের কথা মনে আছে?’ বলল মার্ক। ‘ওটা গোরস্তানে ঘুরঘুর করত। একদিন হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। হিলারী ক্লাভান বলেছে কবর থেকে একটা ভূত এসে কুকুরটাকে নিয়ে মাটির নিচে চলে গেছে। হিলারী নাকি নিজের চোখে দেখেছে! তারপর থেকে সে তোতলাতে শুরু করে!’
মার্কের দিকে তাকিয়ে আমি ভ্রুকুটি করলাম। এ গল্প কখনো শুনিনি। আমার ধারণা র্যাচেলকে মুগ্ধ করতে ও গল্পটা বানিয়েছে।
মিস অ্যাপলবাম লোহার গেটটি খুললেন। আমরা তাঁর পেছন পেছন ঢুকে পড়লাম গোরস্তানে। পথের দুই পাশে সারি সারি কালো এবং ধূসর কবর দাঁড়িয়ে আছে গায়ে বরফ মেখে।
পুরনো পাথুরে কবরগুলো জায়গায় জায়গায় ভেঙে গেছে। দেখতে লাগছে ভাঙা দাঁতের মত। বেশিরভাগ কবরই ভাঙা। কয়েকটা চিৎ হয়ে উল্টে রয়েছে। গায়ে পুরু বরফ।
কিছু কবরের গায়ে কোন কিছু লেখা নেই। হয়তো লেখা ছিল, কালের আঁচড়ে মুছে গেছে। বাতাসের সঙ্গে লড়াই করতে করতে মিস অ্যাপলবাম আমাদেরকে নিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠতে লাগলেন। ওদিকে বড় বড় কিছু কবর আছে। কিছু কবর শত শত বছর ধরে বাতাস-ঝড়-বৃষ্টির অত্যাচারে তাদের গায়ের লেখাগুলো হারিয়েছে। আবার কয়েকটির গায়ে প্রতিলিপি রয়েছে।
‘যা ঠাণ্ডা পড়েছে আজ ভূতেরা ঠাণ্ডার ভয়ে কবর ছেড়েই বেরুবে না,’ মজা করলেন মিস অ্যাপলবাম। এখন কাজে লেগে যাও সবাই।’
আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লাম। র্যাচেল এবং আমি পাহাড়ের অন্য পাশটাতে রওনা হলাম। এখানে বাতাসের ঝাপটা হয়তো কম থাকবে। ভুল ভেবেছি। প্রবল দমকা হাওয়া আমার হুড সরিয়ে দিল মাথার ওপর থেকে। আমার লম্বা, লাল চুল বাতাসে পতপত উড়তে লাগল পতাকার মত।
আমরা বরফ মাড়িয়ে সামনে ঝুঁকলাম কবরের গায়ে লেখা পুরনো প্রতিলিপি পড়ার জন্য। কয়েকটি কবর ষোড়শ শতকের।
‘এখানে ইন্টারেস্টিং কিছু নেই,’ অনুযোগের সুরে বলল র্যাচেল। ‘চলো, ওই পুরনো কবরগুলোর ধারে যাই।
প্রথম কবরটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ছোট, পুরনো কবরটির গায়ে কয়েক জায়গায় ফাটল ধরেছে। আমি হাঁটু মুড়ে বসলাম প্রতিলিপিতে চোখ বুলাতে: এবিগেইল উইলি। ১৬৮০-১৬৯২। স্বর্গে গিয়ে বিশ্রাম নাও, সোনা।
‘ওয়াও!’ চেঁচিয়ে উঠলাম আমি, স্থির দৃষ্টি সন-তারিখের দিকে। ‘র্যাচেল-এ মেয়েটি আমাদের বয়সী!’
র্যাচেলও ঝুঁকল লেখাটি পড়তে। ‘ভাবছি মেয়েটি কীভাবে মারা গেল, লোরেন। ওই সময় সবাই খুব অল্প বয়সে মারা যেত।’ র্যাচেল ওর ব্যাকপ্যাক খুলে ট্রেসিং পেপারের প্যাড বের করল। ‘এটার ডিজাইন করা যাক। বেশ ইন্টারেস্টিং।
আমাদের চারপাশে হিমশীতল বাতাস পাক খেল। পাথরের গায়ে ট্রেসিং পেপার ঠেসে ধরে রাখতে গলদঘর্ম হয়ে যাচ্ছে র্যাচেল। ও ট্রেসিং ধরে রাখবে, আমি ঘষে ঘষে ওতে ছবি ফুটিয়ে তুলব। কিন্তু প্রবল বাতাসে ফরফর করে উড়ছে কাগজ।
‘আমি তোমাকে ওটা ধরে রাখতে সাহায্য করছি,’ বললাম আমি। হাত থেকে গ্লাভস খুলে ওজোড়া কবরের ওপর রাখলাম। তারপর উবু হয়ে বসলাম র্যাচেলের পাশে। একসঙ্গে মিলে কাজ শুরু করে দিলাম।
আমাদের কাজ প্রায় শেষ এমন সময় দেখি মিস অ্যাপলবাম দ্রুত নেমে আসছেন পাহাড় বেয়ে, বরফ ভেজা ঘাসে আছাড় খেলেন। ‘আজ আর কাজ করতে হবে না।’ হাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠে বললেন তিনি। ‘আজ এখানে আসাই ঠিক হয়নি। যেমন ঠাণ্ডা তেমনি বাতাস। এখুনি স্কুলে ফিরে না গেলে নির্ঘাত সবাই ফ্রস্টবাইটে আক্রান্ত হব।’
র্যাচেল এবং আমি ডিজাইন করা বন্ধ রাখলাম। মাথার ওপর তুলে দিলাম পার্কা হুড। তারপর শীতে কাঁপতে কাঁপতে, আমার পা জমে প্রায় বরফ, মুখ টনটন করছে, জলদি পা বাড়ালাম অন্যদের সঙ্গে একত্রিত হতে, এখান থেকে বেরুতে পারলে বাঁচি।
.
সেই রাতে ডিনারের পরে আমার মনে পড়ল, আরি। আমি তো আমার গ্লাভস গোরস্তানে ফেলে রেখে এসেছি! বাবা-মা গেছেন তাদের রিডিং ডিসকাশন গ্রুপের কাছে, বাড়িতে শুধু আমি আর মার্ক। আমাদের হোমওয়ার্ক করার কথা। কিন্তু টিভি দেখছি। টিভিতে আবহাওয়ার খবর হচ্ছে।
লাফ মেরে উঠে গায়ের সুয়েটারটা টেনেটুনে ঠিক করলাম। ‘মার্ক, আমি গোরস্তানে যাব আমার গ্লাভস নিয়ে আসতে।’
অ্যালজেব্রার বই থেকে মুখ তুলল মার্ক। ‘ঠাট্টা করছিস?’
‘ওগুলো আমার সবচেয়ে সেরা গ্লাভস!’ বললাম আমি। ‘আর আমার খুব পছন্দের। ওখানে গ্লাভজোড়া ফেলে রাখতে পারি না।’
মার্ক আবার মনোযোগ ফেরাল অ্যালজেব্রার বইতে। ‘কাল সকালে নিয়ে আসব।’
‘প্রশ্নই ওঠে না!’ বললাম আমি। ‘এইমাত্র টিভিতে বলল শুনিসনি রাতে তুষারপাত হবে। আমার গ্লাভসের দফারফা হয়ে যাবে।’ আমি কোট ক্লজিট খুলে পার্কা বের করলাম।
‘আমার সঙ্গে যাবি কিনা বল।’
ইতস্তত করছে মার্ক, চিবাচ্ছে পেন্সিল। শেষে মুখ থেকে বের করল পেন্সিল। ‘ঠিক আছে, চল। তোকে একা যেতে দিতে পারি না।’
আমার সিংহহৃদয় ভাইটি!
এখন পড়ে গেছে বাতাস তবে রাতের হাওয়া ভীষণ শীতল এবং স্যাঁতসেঁতে। কালো কালো ঝোড়ো মেঘের মাঝখানে উঁকি মারছে ছোট্ট, রূপালি চাঁদ। তুষারের পাতলা আস্তরণ শক্ত হয়ে নিরেট আকৃতি পাচ্ছে।
আমরা বরফ পিচ্ছিল রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। কিছুক্ষণ পরে গ্রেস্টোন গোরস্তানের নিচু বেড়াটি নজরে এল।
‘কোথায় তোর হাতমোজা ফেলে রেখে গিয়েছিলি মনে আছে?’ জিজ্ঞেস করল মার্ক। মস্ত পশমী হুডের আড়ালে ওর মুখ। ফ্লাশলাইটের আলো ফেলছে সামনের বরফের ওপর।
শিউরে উঠলাম আমি। ‘একটা মেয়ের কবরের ওপরে। যেতে অল্প সময় লাগবে।’
গোরস্তানের ফটকের হাতল ধরে টান দিলাম। শক্ত বরফে আটকে গেছে গেট। গায়ের জোরে টানতে হলো। ক্যাচকোচ শব্দে খুলল ফটক।
খাড়া পাহাড় বেয়ে আমি আর মার্ক ওপরে উঠছি, ফ্লাশলাইটের হলুদ আলোর বৃত্তগুলো নাচানাচি করতে লাগল কবরগুলোর গায়ে। চাঁদটাকে ঢেকে ফেলল ঝোড়ো মেঘের দল, গাঢ় আঁধার ঘিরে ধরল আমাদেরকে। বাতাসটা যেন আরও নিশ্চল।
নাক ঘষলাম আমি। কোন সাড়া পাচ্ছি না। ‘এ পাহাড়ের ওদিকটায়।’
আমাদের চারপাশে বৃক্ষসারি ককাচ্ছে, গোঙাচ্ছে। বাতাস মানুষের নিঃশ্বাস ফেলার মত ভৌতিক শব্দ করছে।
কঠিন বরফের ওপর দিয়ে পা পিছলে পিছলে অবশেষে পৌঁছে গেলাম এবিগেইল উইলির কবরে। ‘এই তো,’ বললাম আমি।
আলো ফেলল মার্ক। দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি। চোখ কুঁচকে তাকালাম কবরের ওপর। ‘ওগুলো নেই!’ আর্তনাদ করে উঠলাম। ‘গ্লাভজোড়া নেই ওখানে! অথচ এই কবরটার ওপরেই রেখে গিয়েছিলাম!’
মার্ক কবরের সামনে আলো ফেলল। ‘বোধহয় বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। মাটিতে দেখ।’
‘ঠিক আছে। বাতাসে উড়ে গিয়ে মাটিতেও পড়তে পারে।’ বিড়বিড় করলাম আমি। নজর বুলালাম বরফ ঢাকা জমিনের ওপর।
আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল বাতাস। ককিয়ে উঠে গা ঝাড়া দিল বৃক্ষরাজি। দূরে তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার দিল কেউ। সম্ভবত বিড়াল।
নিচু হয়ে কবরের চারপাশটা দেখলাম। ‘কোথায় ওগুলো?’
‘হয়তো উড়ে গিয়ে পাহাড়ের নিচে চলে গেছে,’ মন্তব্য করল মার্ক। পশমী হুডটি মুখের ওপর ভাল করে টেনে নিল। তারপর নামতে শুরু করল পাহাড় বেয়ে, মাটিতে এদিকে ওদিকে ফেলছে ফ্লাশলাইটের আলো।
‘কোথায় ওগুলো? কোথায় ওগুলো?’ আমার অসাড় নাক এবং মুখ ঘষতে ঘষতে বারবার বলছি আমি।
এমন সময়ে প্রায় ধাক্কা লাগল মেয়েটির সঙ্গে।
মেয়েটির লম্বা, কালো চুল মুখখানা ঢেকে রেখেছে। পরনে লম্বা আস্তিনের পাতলা একটি ড্রেস আর মাটি পর্যন্ত ঝুলে থাকা স্কার্ট। কোমরের পেছনে হাত নিয়ে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।
কে তুমি?’ আঁতকে উঠলাম আমি।
এমন সময় একটা দমকা হাওয়া তার মুখের ওপর থেকে সরিয়ে নিল চুল।
আমি তাকালাম-
—তাকালাম তীব্র আতঙ্ক নিয়ে-তার কঙ্কাল মুখটার দিকে। তার গায়ে কোন চামড়া নেই। ভাঙাচোরা দাঁতের ওপর কোন ঠোঁট নেই। কোন চোখ নেই। শুধু শূন্য কোটর। গভীর অন্ধকার কোটর।
‘আমি এবিগেইল,’ ভাঙা, খনখনে, শুকনো গলায় বলল সে।
তারপর সে হাতজোড়া তুলল। তার হাতেও কোন চামড়ার বালাই নেই। শুধু খটখটে হাড়। আর হাড্ডিসার, ধূসর হাতের মাথায় পরে রেখেছে আমার হাতমোজা!
নীরবে এক কদম বাড়ল সে আমার দিকে। আমি ভয়ে নড়াচড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি।
‘আমার খুব ঠাণ্ডা লাগছে,’ ভাঙা দাঁতের ফাঁক দিয়ে ভেসে এল তার কাতর গোঙানি। ‘এখানে বড্ড ঠাণ্ডা, লোরেন…’
‘প-প্লিজ…’ ফিসফিস করলাম আমি, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি আমার গ্লাভজোড়ার দিকে। কঙ্কাল হাতে আমার হাতমোজা…
‘তোমার কোটটা আমাকে দাও!’ গুঙিয়ে উঠে আমার দিকে হাত বাড়াল সে।
গভীর শূন্য কোটর চোখ…কঙ্কাল খুলিতে চুল উড়ছে, মাথাটা একদিকে কাত হয়ে আছে ওর…
‘লোরেন, তোমার কোটটা আমাকে দাও…’
‘না! প্লিজ!’
ঘুরে দাঁড়ালাম আমি। আমার ভাইকে খুঁজছি। ‘মার্ক!’ ডাক দিলাম। এমন সময় দেখতে পেলাম ওকে। জানবাজি
রেখে ছুটে আসছে ও। কালো ওভারকোট পরা লম্বা একটা কঙ্কাল ধাওয়া করেছে ওকে।
ভাগো! আমি আদেশ করলাম নিজেকে। লোরেন—এক্ষুনি ভাগো।
কিন্তু আমার পা থরথরিয়ে কাঁপছে। নড়াতে পারছি না। ‘লোরেন, তোমার সোয়েটারটা আমাকে দাও…
‘না-থামো!’
আমার গ্লাভস পরা নরকঙ্কালের আঙুল আমার শরীর হাতড়াচ্ছে।
‘লোরেন, তোমার জামাকাপড়গুলো আমাকে দাও…লোরেন…এখানে বড্ড ঠাণ্ডা…তোমার কোটটা আমার দরকার…তোমার সোয়েটার আমার দরকার…’
‘না! চলে যাও আমার কাছ থেকে!’ চিৎকার দিলাম।
‘লোরেন, তোমার জুতো আমার দরকার…’ মোজা পরা হাত আমার চুল খামচে ধরল।
‘লোরেন, তোমার গায়ের চামড়া আমি চাই!’
মোজা পরা আঙুলগুলো এবার আমার চুল ধরে টানছে।
‘ছাড়ো! আমাকে ছাড়ো!’
‘লোরেন, ‘তোমার গায়ের চামড়া আমার চাই। লোরেন, তোমার শরীরটা আমার দরকার।’
‘আআআআআ!’ আমার গলা দিয়ে আতঙ্কিত আর্তনাদ বেরিয়ে এল।
আর ঠিক তখন মনে পড়ে গেল র্যাচেলের কথাগুলো। ভুতুড়ে চাউনি।
র্যাচেলের দাদীমা ওকে পরামর্শ দিয়েছিলেন: দৌড়াবে না। ভূতের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে। এমনভাবে তাকাবে যেন তুমি ওর আত্মার সন্ধান করতে চাইছ।
কিন্তু এতে কি কাজ হবে?
আমার অন্য কোন উপায়ও নেই। এবিগেইলের ভূত ক্রমে তার দিকে আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
আমি ঝট করে আমার মাথাটা পেছন দিকে সরিয়ে নিলাম, তাকালাম ওর শূন্য চোখের কোটরে-স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। চোখ বড় বড় করে, চোখের পাতা না ফেলে, পিটপিট না করে রোষষায়িত নয়নে ওই গভীর গর্তদুটোর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। যেন এবিগেইলের আত্মার সন্ধান করছি।
আমাকে ধরে টানাটানি বন্ধ করল সে। দু’জনেই গোরস্তানের পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছি।
ওর কঙ্কাল চোয়াল মট শব্দ করে ভেঙে গেল।
খুলির ওপর উড়ছে শনের মত লম্বা চুল। ‘লোরেন…’ গুঙিয়ে উঠল সে। ‘লোরেন…’
তারপর মোজা পরা হাত দুটো ছেড়ে দিল আমার চুল এবং তার পচা, শীর্ণ কাপড়ের পাশে ওগুলো পড়ে গেল।
আমি এখনো কটমট করে তাকিয়ে আছি, চোখের পলক পড়ছে না আমার। যেখানে একসময় চোখ ছিল সেই শূন্য কোটরে আমার দৃষ্টি স্থিরভাবে নিবদ্ধ।
ভুতুড়ে চাউনি…..
ওর শরীরটা ক্রমে ছোট হয়ে যেতে লাগল…ছোট হয়ে যাচ্ছে…
ওর চুলগুলো আবার ঢেকে দিল কঙ্কাল মুখটা। হাড্ডিসার কাঁধজোড়া মটমট শব্দে ভেঙে গেল। আমি দেখছি ওর দেহ ক্রমে ছোট হয়ে কবরের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে।
‘লোরেন…’ আরেকবার ফিসফিসিয়ে আমার নাম ধরে ডাকল সে।
তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমি মুখ হাঁ করে জোরে জোরে ঠাণ্ডা বাতাস টেনে নিতে লাগলাম ফুসফুসে।
তারপর দিলাম ছুট। একটু পরে মার্কের পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। স্বস্তি নিয়ে টের পেলাম আমার পেছন পেছন আসছে সে। আমরা ছুটতে ছুটতে চলে এলাম বাড়ি। সদর দরজা দিয়ে সবেগে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। আমার পাঁজরে দমাদম বাড়ি খাচ্ছে হৃৎপিণ্ড। একটানা দৌড়ের কারণে ব্যথা করছে বুক।
টলতে টলতে ঢুকলাম লিভিংরুমে। উবু হয়ে হাঁটুতে হাত রাখলাম। হাঁপাচ্ছি বেদম। ‘ওই ভুতুড়ে চাউনি…’ বললাম আমি। ‘বিশ্বাসই হচ্ছে না ওটা কাজে লেগেছে! তুইও বোধহয় তাই করেছিস, না?’
হাঁপাতে হাঁপাতে মার্কের দিকে ফিরলাম আমি।
এবং দিলাম চিৎকার।
ভয়ার্ত চিৎকার বেরিয়ে এসেছে আমার গলা থেকে সামনে ছেঁড়া, কালো ওভারকোট পরা কঙ্কালসার মুখটা দেখে। ওটার মুখ হাঁ করা। দাঁতহীন হাঁ করা মুখে মোটা মোটা বাদামী রঙের পোকা কিলবিল করছে। ওটার মাথা ন্যাড়া, খুলি এবড়ো খেবড়ো, ফাটা। কোটরে চোখ নেই। ওখানে গাঢ় অন্ধকার। ‘মার্ক কোথায়? তুমি মার্কের কী করেছ?’ গলা ফাটালাম আমি। ‘তুমি এখানে কেন এসেছ! কোথায় মার্ক?’
খুলে গেল কঙ্কালের চোয়াল, ভূতটার পচা পেটের ভেতর থেকে বিকট একটা দুর্গন্ধ বেরিয়ে এল ঢেকুর তোলার শব্দে।
‘আমার ভাই কোথায়?’ কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম আমি। ‘ও কি গোরস্তানে? তুমি কী চাও? কী চাও তুমি?’
আমি নড়াচড়া করার আগেই ভূতটা সাঁৎ করে সরে গেল দেয়ালের ধারে। কঙ্কাল একটা হাত বাড়িয়ে নিভিয়ে দিল ‘বাতি।
আমি নিকষ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইলাম।
‘কে-কেন বাতি নেভালে?’ ফিসফিস করলাম আমি।
‘লোরেন, ভুতুড়ে চাউনি দেয়া মোটেও ঠিক কাজ নয়!’ ঘোঁত ঘোঁত করে উঠল ওটা।
তারপর ওটার শক্ত, কঙ্কালসার আঙুলগুলো চেপে ধরল আমার গলা।
‘লোরেন, আমার খুব শীত করছে…’ উখা চালানোর মত ঘ্যাসঘেঁসে গলায় বলে উঠল সে। ‘লোরেন… তোমার সোয়েটারটা আমার দরকার…লোরেন, তোমার চুল আমার দরকার। লোরেন…তোমার গায়ের চামড়া আমার চাই!’
