ডাইনি – ২০
কুড়ি
পরদিন আমি পেট শপে গেলাম। গিয়ে দেখি এক কাস্টমারকে নিয়ে ব্যস্ত জন ডিকসন। পরনে ঢিলা একটা শার্ট, টাইট ব্লু জিনস। তার পেলভিস এবং পাছা দুটোই পুরুষদের মত তবে নড়াচড়া করে মেয়েলি ভঙ্গিতে। তবে ওকে দেখে পুরোপুরি মেয়েদের মত মনে হয় না। আমার কাছে ওকে অদ্ভুত আকর্ষণীয় ঠেকল। কাজ শেষে সে হেসে আমার দিকে এগিয়ে এল।
‘হ্যালো, এলিজাবেথ,’ বলল সে। ‘ভাবছিলাম তুমি হয়তো আসবে। মার্থা তোমাকে মেসেজ দিয়েছে।’
মেসেজটা এখন দেয়া যাবে?’
‘না। আসলে মেসেজটা অসম্পূর্ণ। আমার বাসায় যদি আজ রাতে আসতে পার তাহলে পুরো মেসেজটা দিতে পারব।’
‘পারব,’ বললাম আমি।
‘আসার সময় মার্থার ব্যবহার্য কিছু সঙ্গে নিয়ে এসো।’
‘কখন?’
‘আটটার দিকে?’
‘আচ্ছা। তোমার কার্ডে লেখা ঠিকানাটাই তো?’
‘হুঁ। অন্তত আজ রাত পর্যন্ত।’
সে রাতে বৃষ্টি হলো। ম্যানহাটানের আপার ওয়েস্ট সাইড সন্ধ্যার পরপরই প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ল। আমি সাবওয়ে চেপে চলে এলাম শহরে। জন ডিকসনের ঠিকানা খুঁজে পেতে তেমন কষ্ট হলো না। সে থাকে এইটি ফোর্থ স্ট্রিটের অবহেলিত একটি পিঙ্গলবর্ণ বেলেপাথুরে ভবনে। বাযার সিস্টেমের কোন বালাই নেই, এন্ট্রান্স ডোর খোলা। আমি সিঁড়ি বেয়ে চারতলায় উঠে এলাম। ফ্ল্যাটটা কেমন নিঝুম। লোকজনের কথাবার্তা প্রায় শোনাই যায় না।
জনের দরজায় টোকা দিলাম। ধাতব কিছু একটা সরানোর শব্দ পেলাম, তারপর দরজার পিপহোলে উঁকি দিল তার একটা চক্ষু। এরপর দুটো ছিটকিনি খুলে দরজা মেলে ধরল জন ডিকসন।
ছোট একটি টেবিলের ওপর গোটা তিনেক মোমবাতি জ্বলছে। ঘরে আসবাব বলতে শুধু একটি আলমারি, মেঝেতে পাতা মাদুর এবং তিনখানা পিঠখাড়া চেয়ার। চেয়ারগুলো নগ্ন। জনের গায়ে লম্বা আস্তিনের ধূসর রোব, তাকে এ মুহূর্তে আগের চেয়েও মেয়ে মেয়ে লাগছে।
আমরা টেবিলে মুখোমুখি দু’খানা চেয়ার দখল করলাম। মনে হলো আমি কেন এখানে এসেছি কিংবা সে কেন আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করছে না সে।
‘আমি তোমাকে হিংসা করি,’ বলল সে।
‘কেন?’
‘আমার ক্ষমতা নিষ্ক্রিয়। তোমারটা সক্রিয়।’
‘তবু তোমার কাছে এসেছি কারণ আমার সাহায্য দরকার।’
‘আমি সানন্দে তোমার সহকারী হব। আশা করি মাঝে মধ্যেই আমাদের দেখা হবে।’
সে টেবিলের একটি ড্রয়ার খুলে একজোড়া কাঁচি বের করল এবং হাতলহীন একখানা চালনি। ওগুলো রাখল আমার সামনে। হঠাৎ মনে পড়ল স্বপ্নে আমি এই মিটিংটি দেখেছি। স্বপ্নে ফ্রান্সিস জনের জায়গায় বসা ছিল।
‘তুমি মার্থার কিছু এনেছ?’ জিজ্ঞেস করল জন।
আমি ফ্রেম থেকে ভাঙা আয়নার কয়েক টুকরো কাচ সরিয়ে নিয়েছিলাম। ওগুলো চামড়ার ছোট একটি পার্সে রেখেছি। পার্সটি টেবিলে রাখলাম। জন হাত বাড়িয়ে চালনিটা উল্টে রাখল পার্সের ওপর তারপর কাঁচি খুলে চালনির সামনে রেখে দিল।
‘তুমি কী জানতে চাও?’ জিজ্ঞেস করল সে।
‘আমি জানতে চাই মার্থার কী হয়েছে এবং তাঁর অন্তর্ধানের জন্য দায়ী কে।’
তোমার হাত দেখি,’ বলল সে।
আমি জনের সামনে মেলে ধরলাম হাতজোড়া। আমার ভেতরে অন্যরকম একটা উত্তেজনা হচ্ছিল, অনেকটা যৌন উত্তেজনার মত।
জনের চোখ বোজা, গলা দিয়ে কামার্ত ধ্বনি করতে লাগল, ওটা শেষে পরিণত হলো মন্ত্রোচ্চারণের সুরে: ‘মার্থা, -এসো।’
সে আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে। হঠাৎ হাঁপাতে লাগল। যেন বন্ধ হয়ে আসছে দম। আমার হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের হাতজোড়া মুখের সামনে মেলে ধরল। অকস্মাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল জন, ধাক্কা লেগে পড়ে গেল চেয়ার, সে রুমের মধ্যে টলমল পায়ে কয়েক কদম হাঁটার পরেই ধপাস করে পড়ে গেল।
আমি ছুটে গিয়ে তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসলাম। জোরে জোরে শ্বাস করছে জন, একটা পা বাঁকা হয়ে চাপা হয়ে পড়ে আছে শরীরের নিচে। আমি তার রোব তুলে পাখানা সোজা করে দিলাম। লোমহীন, সুন্দর গঠনের পা।
শীঘ্রি চোখ মেলে চাইল সে, আমি ওকে ধরে ধরে টেবিলের কাছে নিয়ে এলাম। সে চেয়ারে বসল। একটু পরে বলল, ‘মার্থা মারা গেছে।’
‘কীভাবে মারা গেলেন?’
‘তুমি তো নিজেই তা দেখেছ।’
‘কার হাত আমি দেখেছি?’
‘ফ্রান্সিসের হাত।’
‘না,’ বললাম আমি। ‘ওটা কোন পুরুষ মানুষের হাত ছিল।’
‘তোমাকে দেখাচ্ছি আমি,’ বলল জন। সে টেবিলের দেরাজ আবার খুলল, বের করল রুপোর হাতলযুক্ত একখানা আয়না। ওটা নিজের বুকের ওপর রাখল যাতে কাচটি আমার দিকে ফেরানো থাকে। আমি কয়েক সেকেণ্ড ধূসর এবং আবছা দেখতে পেলাম কাচ, তারপর ওতে একটি মুখ ফুটে উঠতে লাগল।
‘এ হলো ফ্রান্সিস,’ বলল জন।
আয়নায় জেমসের মুখ দেখতে পেলাম আমি।
হো হো করে হেসে উঠলাম।
জন আমার দিকে নির্বিকারচিত্তে তাকিয়ে থাকলেও বুঝতে পারলাম আমার হাসিতে সে অপমানিতবোধ করছে।
‘আমি দুঃখিত,’ বললাম আমি। ‘এটি নিয়ে খানিকটা বিভ্রান্তি রয়েছে।’
‘কোন বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। কোন ভুল হয়নি।’
‘আসলে বিভ্রান্ত আমি নিজে,’ বললাম আমি। ‘তুমি যা দেখালে তা আমি পরিষ্কারই দেখতে পাচ্ছি। আমি কৃতজ্ঞ।’
‘তোমাকে সাহায্য করতে পেরেছি বলে আমি খুশি।’ বলল জন। সে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যে চাউনির সঙ্গে আমি ঠিক অভ্যস্ত নই। সে শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে তবে তাতে কোন অধিকার নেই, নেই কোন স্বার্থপরতা। ওর এই চাউনি আমাকে বিব্রত করে তুলল।
অন্য অ্যাপার্টমেন্ট থেকে গান ভেসে আসছে: জোর হাসির আওয়াজ; পুরনো কোন ছায়াছবির সাউণ্ডট্র্যাক। মোমবাতির আলো ঘরের নগ্ন সারফেসে দপদপ করছে। যেন আমরা কোন গির্জায় আছি। আর গির্জায় যেতে আমি পছন্দ করি না।
আমি পকেট থেকে পঞ্চাশ ডলারের একটি নোট বের করে টেরিলে, জনের সামনে রাখলাম। সে হেসে টাকাটা আমার দিকে ঠেলে দিল।
আমার খুব রাগ লাগল। নোটখানা নিয়ে মোমবাতির শিখার ওপর ধরলাম। টাকাটা পুড়তে শুরু করেছে, হা হা করে হেসে উঠল জন। কর্কশ গলার হাসি। তবে আমি হাসছি না দেখে তার হাসি বন্ধ হয়ে গেল। এই প্রথম অনিশ্চিত এবং পরে ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গিতে সে আমার দিকে তাকাল।
‘বৈরাগ্য তোমাকে একদমই মানায় না, জন,’ বললাম আমি। ‘আমার বাড়িতে ফার্নিচারের অভাব নেই। আমাদের বিছানায় স্প্রিং আছে। হয়তো একদিন আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসার ইচ্ছে হবে তোমার।’
আমি ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। জানি আজ রাতে ভাল ঘুম হবে না জনের।
.
পরদিন সকালে জেমস আমার ঘরে এল টলতে টলতে, হাতে প্রায় নিঃশেষিত কনিয়াকের বোতল। আমার কাছে এসেছে স্বস্তি এবং শক্তি পেতে।
আমরা চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম বিছানায়, একে অপরকে আদর করছি। একটু পরে আমি বললাম, ‘জেমস, তুমি কি দাদীমাকে হত্যা করেছ?’
ওর হাত থেমে গেল, তবে এক মুহূর্তের জন্য মাত্র। জবাবে বলল, ‘তুমি কি করেছ, এলিজাবেথ?
.
একুশ
মিস বার্টনের বিশ্বাস জন ডিকসন সত্যটি প্রকাশ করে দিয়েছে সে জেমস হত্যা করেছে দাদীমাকে।
‘জন কিছুই প্রকাশ করেনি,’ বললাম আমি। ‘শুধু বলেছে সে এমন একটি শক্তির অধীনে রয়েছে যাকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তার নেই।’
‘কিন্তু সে তো জেমসকে চিহ্নিত করেছে।’
‘সে তো ফ্রান্সিসের দিকেও অভিযোগের আঙুল তুলেছে। তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করতে বল যে ফ্রান্সিস জেমসের মধ্যে ঢুকে তাকে দিয়ে কাজ করিয়েছে?’
‘না। জেমস নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাজ করেছে। সে চায়নি তোমাকে দূরে কোথাও পাঠানো হোক।
আমি তার সঙ্গে তর্ক করতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ মাথায় এল, আরি, আমি যা চাইছিলাম তা তো পেয়ে গেছি: মিস বার্টন সন্তুষ্ট হওয়ার মত একটা ব্যাখ্যা পেয়ে গেছে। এখন আমার উচিত তার সঙ্গে একমত হওয়া তাহলেই হয়তো সে গোটা ব্যাপারটি ভুলে যাবে।
‘ওটা সত্যি হতেও পারে, অ্যান,’ বললাম আমি। ‘যদি হয়ও, আমাদের কী করার আছে? তুমি কি ওকে অভিযুক্ত করবে নাকি ওর মুখোশ খুলে দেবে?’
জবাব দিতে ইতস্তত করল মিস বার্টন। সে চায় না সংসারে অশান্তি হোক। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ, আমি চাই জেমসের শাস্তি হোক।’
তখন, প্রথমবারের মত, আমার এরকম মনে হলো যে, মিস বার্টন চাইছে জেমস আমাদেরকে ছেড়ে চলে যাক। হয়তো আমিই মহিলাকে খাটো করে দেখেছি। সে ইতিমধ্যে ক্যাথেরিনকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, জেমস চলে গেলে তখন আমার ওপরেও ছড়ি ঘোরাতে পারবে। আচ্ছা, গত রাতে জন ডিকসনের সঙ্গে আমার যে সাক্ষাৎ হলো সেটা মিস বার্টনের যোগসাজশে নয়তো? তার কথাতেই হয়তো ডিকসন আমাকে বোঝাতে চেয়েছে জেমসই অপরাধী। এমনও হতে পারে মিস বার্টন নিজেই দাদীমাকে হত্যা করেছে। আমি তার পেশীবহুল হাতজোড়ার দিকে তাকালাম।
‘ওকে কেন শাস্তি দিতে হবে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘আমরা কেন এভাবে বিষয়টি দেখছি না যে সে যা করেছে বলে ভাবছি তা আগেই করা হয়ে গেছে এবং আমরা যে যার মত করে.জীবনযাপন করতে থাকি?’
‘এটা সরল নৈতিকতার প্রশ্ন। সে যা করেছে তা ভুল।’
‘নৈতিকতা তখনই সরল যখন তুমি কারো কাজের বিচার করছ। তুমি যদি খুন করেই থাক, তুমি কি ঘটনাটি ফাঁস করে দিতে অস্থির হয়ে উঠবে?’
‘তুমি আসলে আমার কথা বুঝতে পারনি, এলিজাবেথ। কেউ ব্যক্তিগতভাবে কোন মন্দ কাজ নিয়ে কী ভাবল তা আসে যায় না। জরুরি হলো মন্দ কাজকে বেড়ে উঠতে দেয়া যাবে না।’
আমার আর এ প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে ভাল্লাগছিল না। জানি এরপরে সে বলবে সে কীভাবে মন্দ কাজ থেকে নিজেকে নিবৃত্ত করেছে।
‘সে যাই হোক,’ বললাম আমি। ‘এমন কোন প্রমাণ নেই যে জেমস কোন অপরাধ করেছে।’
‘প্রমাণ নিশ্চয় আছে। কিন্তু আমরা খুঁজে পাইনি। তুমি খুঁজে পাবে, এলিজাবেথ।’
‘কীভাবে?’
ওকে জেরা করো। ওর ঘর সার্চ করো। ও তোমাকে সন্দেহ করবে না।’
আমি তখন ভাবলাম আমার এখন বোধহয় নতুন একজন টিউটরের দরকার হবে। আমি কী করে এই কুশ্রী মহিলার অসার কথাবার্তা সহ্য করে আসছি? আমার সঙ্গে প্রতারণা করার সুযোগ তাকে কী করে দিলাম?
আমি সেদিন বিকেলে ঘর থেকেই বেরুলাম না। মিস বার্টন দরজায় নক করে আমার নাম ধরে ডাকাডাকি করছিল। সাড়া দিইনি। মি. খামচানি আমার কোলের ওপর বসে আছে, আমি বাঁশি বাজাতে লাগলাম। এ সুরটা শিখেছি ফ্রান্সিসের কাছ থেকে। বাঁশি বাজাতে বাজাতে তার কথা মনে পড়ে গেল। আমি এখন আর তার দেখা পাই না কেন? মিস বার্টন বলেছে তাকে এখন আমার প্রয়োজন নেই বলে নাকি দেখা পাই না। কিন্তু এ কথা সত্য নয়। কারণ আমার মনে হচ্ছিল আমি যেসব বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছি তা একমাত্র ফ্রান্সিসই দূর করতে পারবে।
মিস বার্টন কি কোনভাবে চুপ করিয়ে দিয়েছে ফ্রান্সিসকে? নাকি জন ডিকসনের মত জেমসও এতে জড়িত? হয়তো এ প্রশ্নের জবাব আমি পেয়ে যাব যখন জানতে পারব সে রাতে দাদীমার ঘরে কী ঘটেছিল। দাদীমার গায়ে ফ্রান্সিসের মত চিহ্ন ছিল এবং দু’জনেই একই রাতে অদৃশ্য হয়ে যায়।
সিদ্ধান্ত নিলাম রাতটি দাদীমার ঘরে কাটাব।
ডিনার শেষে পরিবারের সবাই স্টাডি রুমে আড্ডায় বসল। কিথ সোফায়, আমার পাশে বসেছে, কানে কানে নোংরা সব ধাঁধা বলছে। ও ইদানীং আমার কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। সেদিন খুব বেশি দূরে নেই যখন সাপগুলোর চেয়ে আমার সঙ্গ ওর কাছে অনেক আকর্ষণীয় মনে হবে।
ওর বাবা ঈর্ষাকাতর দৃষ্টিতে আমাদেরকে দেখছিল। এবারে সে মিস বার্টনের সঙ্গে খুনসুটি শুরু করে দিল। তার এ আচরণ আমাদের সকলকে একটা বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দিল।
ক্যাথেরিন কিথকে ঘুমাতে যেতে বলল। আমি বললাম আমি ঘরে বসে পড়ব। ওকে নিয়ে ওপরে চলে এলাম। কিথের ঘরের দরজায় ক্ষণকালের জন্য দাঁড়ালাম। ওর পাতলা, শুষ্ক ওষ্ঠে এঁকে দিলাম চুম্বনরেখা। কিথ ঝট করে সরে গেল আমার কাছ থেকে। একদৌড়ে ঢুকে পড়ল বেডরুমে। আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কিচকিচ একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম। জানি কিথ এ মুহূর্তে একটা ইঁদুরের লেজ ধরে তাকে ঝুলিয়ে রেখেছে। ওটা শীঘ্রি সাপের খাদ্যে পরিণত হবে।
আমি দাদীমার ঘরে গেলাম।
গ্যাসবাতি জ্বেলে নিয়ে ঘরের দরজা আটকে দিলাম। এলোমেলো ঘরটিতে হাঁটাহাঁটি করতে লাগলাম। দাদীমাকে কখনো অগোছালো অবস্থায় দেখিনি। সবসময় পরিপাটি পোশাক পরা চেহারায় দেখেছি। কিন্তু তাঁর ঘর এমন এলোমেলো কেন? শুধু ঘরের একটি জায়গা বিশৃঙ্খল লাগল না। ওখানটাতে একটি বড় রোল-টপ ডেস্ক রয়েছে। ডেস্কের ধারে কাচের দরজাঅলা বইয়ের আলমারি, তাতে খতিয়ান বই টাইপের কিছু বইপত্র আছে, প্রতিটির শিরদাঁড়ায় একটি করে সংখ্যা লেখা। মোট এক থেকে চল্লিশ।
আমি বইয়ের আলমারি খুলে প্রথম খণ্ডটি বের করলাম। প্রথম পৃষ্ঠায় হাতে লেখা: ‘The Female Descendants of Frances Williams: Volume 1, 1573-1583’। আরও অনেকগুলো ভলিউম : উল্টেপাল্টে দেখলাম। সবগুলোতেই দশ বছরের একটি গ্যাপ রয়েছে, এবং ক্রম তালিকার সঙ্গে নানান জটিল প্রতীক চিহ্ন আঁকা, সে সঙ্গে তালিকায় উল্লিখিত কোন কোন মহিলার জীবনের নানান কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে।
তবে অবাক লাগল দেখে প্রতিটি ভলিউমে একই সংখ্যক তালিকা। খতিয়ান বইগুলো ঘেঁটেঘুঁটে আমি এই উপসংহারে এলাম যে এখানে যেসব রেকর্ড লিপিবদ্ধ হয়েছে তা সম্পূর্ণ এবং ফ্রান্সিসের বংশধররা খুব বেশি উৎপাদনশীল ছিলেন না।
তালিকায় লেখা কয়েকটি প্রতীক চিহ্নের অর্থ আমি খুঁজে বের করলাম। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চিহ্নটি সহজেই চেনা গেল। এই একই চিহ্ন বা দাগ আমার ঊরুতে রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু নামের পাশে এ চিহ্নটি দেয়া আছে। তবে কয়েক জায়গায় চিহ্নটি উল্লেখ রয়েছে, কতক জায়গায় নেই। আমি সাম্প্রতিক কয়েকটি ভলিউমে চোখ বুলালাম। দেখলাম মার্থা হ্যামিলটন এবং অ্যান বার্টনের নামের সামনে এই চিহ্নগুলো আছে। আর আমার নামের পাশে চিহ্নটি যে অতি সম্প্রতি দেয়া হয়েছে তা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।
বর্ণনামূলক প্যাসেজগুলো দুর্বোধ্য, একটিমাত্র বাক্য থেকে শেষে দীর্ঘ ও বিস্তৃত বর্ণনায় রূপ নিয়েছে। মৃত্যু এবং ভুল বোঝাবুঝির কথা প্রায়ই উল্লেখ করা হয়েছে এখানে। আমার খতিয়ান বইগুলো পড়ে দেখা দরকার। ওগুলো আমার জন্যই যেন লেখা হয়েছে। ওগুলো হবে আমার শিক্ষক।
আমি জামাকাপড় খুলে দাদীমার প্রকাণ্ড মেহগনি খাটে উঠে পড়লাম। বিছানার চাদর সরিয়ে শক্ত ম্যাট্রেসের ওপর এলিয়ে দিলাম দেহ। হয়তো এখানেই আমার বাবা এবং জেমস জন্মগ্রহণ করেছে।
আমি চোখ বুজে ঘরের নানান শব্দ শুনছি। কেউ দরজার সামনে দিয়ে চলে গেল। খিলখিলিয়ে হেসে উঠল ক্যাথেরিন। তারপর একটি শব্দ শুনতে পেলাম, মনে হলো আমার ঘরের মধ্যেই হচ্ছে। আবছা, থেমে থেমে আওয়াজ হচ্ছে। খসখসে একটা শব্দ। তবে শব্দের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে বুঝতে পারলাম কেউ কাউকে ফিসফিস করে ডাকছে। একটু পরে এক মহিলা জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল, ‘জর্জ… জর্জ।’ আমি চোখ মেললাম। তাকালাম ঘরের চারপাশে। কোথাও কেউ নেই। আমি ঘরে একা। অথচ গলার স্বরটি তখনো শোনা যাচ্ছিল। এবং খুব কাছ থেকে।
আবার চোখ বুজলাম আমি। দু’জন মানুষ দেখতে পেলাম। নগ্ন। দাদুর অফিসে লেটার ওপেনারে কী দেখেছিলাম মনে পড়ে গেল। সেই দুই মূর্তিকেই এ মুহূর্তে আবার দেখতে পাচ্ছি। এদের একজন তরুণী বয়সের দাদীমা। আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে রয়েছে শরীর দুটি। আবারও নামটি ফিসফিস করে উচ্চারিত হতে শুনলাম: ‘জর্জ।’
ধীরে ধীরে ওদের শারীরিক কাঠামো আমার চোখের সামনে স্পষ্ট হতে লাগল। লোকটি জর্জ হিউবার্ট, লেক জর্জের কেয়ারটেকার। আমাদের কেবিনের একটি বেডরুমে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা। আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁদেরকে দেখছি। ওরা বিছানায় এগিয়ে গেলেন।
.
পরদিন ভোরের আগেই আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি বিছানায় শুয়ে মি. খামচানিকে আদর করতে করতে যা দেখেছি তার তাৎপর্য নিয়ে ভাবছিলাম। মি. হিউবার্ট ছিলেন দাদীমার প্রেমিক, তিনি জেমস কিংবা আমার বাবার পিতা হতে পারেন। দাদীমা অদৃশ্য হওয়ার আগে তিনি দাদীমার কাছে এসেছিলেন। আমাকে স্কুলে ফিরতে হবে এ কথা ঘোষণা করার আগে। মি. হিউবার্ট হয়তো দাদীমার মন মেজাজ বদলে দিয়েছিলেন। তিনি দাদীমার অন্তর্ধান কিংবা তাঁর মৃত্যুর জন্যেও দায়ী হতে পারেন।
মনে পড়ল জেমস দাদীমার সন্ধানে লেক জর্জে গিয়েছিল। সে কি মি. হিউবার্টের কথা জানত? লেকে কী দেখতে পাবে বলে সে আশা করেছিল? সে ওখানে কী দেখেছিল? ভাবছি জেমসকে নিয়ে একবার লেক থেকে ঘুরে আসব কিনা।
.
বাইশ
নাস্তার টেবিলে সুবোধ, ভদ্র বালিকাটি হয়ে রইলাম আমি।
‘তোমার ভাল ঘুম হয়েছে তো, এলিজাবেথ?’ জিজ্ঞেস করল, জেমস। ও হয়তো ভাবছে আমি কোথায় ঘুমিয়েছি। জেমসের পরনে সুট। লইয়ারদের সঙ্গে দেখা করার কথা থাকলে সে এ ধরনের পোশাক পরে। উকিলদের সে পছন্দ করে না তবে তাদেরকে অসন্তুষ্ট করতেও ভয় পায় কারণ জেমস জানে তারা ওর জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে জেমস আইনের লোকজনদের প্রতি যে বিতৃষ্ণ এটা দেখাতে সে আইনী কোন অনুষ্ঠানে কখনো প্যান্টের নিচে অ্যাণ্ডারওয়্যার পরে যায় না। সে একদিন কথায় কথায় এ কথাটি আমাকে বলেছিল।
‘হুঁ।’ বললাম আমি। ‘খুব ভাল ঘুমিয়েছি। স্বপ্ন দেখেছি আমরা সবাই বেদিং সুট পরে একটা বড় ছাতার নিচে বসে আছি-এ টেবিলের সবাই। বাইরে তখন বরফ পড়ছিল। তবে আমাদের ঠাণ্ডা লাগছিল না, আমাদের চারপাশে ফুটছিল ফুল। ক্যাথেরিন একটি অর্কিড খাচ্ছিল।
ক্যাথেরিন এবং মিস বার্টন হাসল। কাল্পনিক এ দৃশ্যটি বলার আগে দু’জনকেই গম্ভীর দেখাচ্ছিল। আমার ধারণা আগের রাতে জেমস ক্যাথেরিনের সঙ্গে শুয়েছে।
নাশতার পরে-আমি মি. টেলরের পেছন পেছন রান্নাঘরে ঢুকলাম। তার স্ত্রী বাসন মাজছে। আধখাওয়া বেকনের টুকরো আর কুসুম লাগানো প্লেট ধুচ্ছে।
‘হ্যালো,’ মিস টেলর,’ বললাম আমি।
সে আমার দিকে মুখ তুলে চাইল। মৃদু মাথা ঝাঁকিয়ে আবার কাজে লেগে গেল। তার শরীরটি কৃশকায়। জানি না এ মহিলার শরীরের কোন অঙ্গটা একদা উত্তেজিত করে তুলেছিল মি. টেলরকে। হয়তোবা পদযুগল।
‘আপনি কখনো লেক জর্জে গেছেন, মি. টেলর?’
‘না, মিস। ফ্যামিলির সদস্যরা লেকে যাওয়ার সময় আমাদেরকে বাড়ি পাহারা দিতে হত।’
‘দাদীমা কি ঘন ঘন ওখানে যেতেন?’
‘প্রায়ই,’ বলল সে। ‘একদা লেকটি তাঁর খুবই প্রিয় ছিল।’
আমার প্রশ্ন শুনে অস্বস্তি বোধ করলেও গোপন করার চেষ্টা করল না।
‘আপনি বোধহয় দাদীমাকে খুব মিস করছেন।’
‘কেউ তাঁর জায়গা নিতে পারবে না,’ বলল সে। তারপর ঘুরে দাঁড়াল যেন সব কথা বলা হয়ে গেছে।
‘তা তো পারবেই না। তবে উনি ফিরে না আসাতক আমাদেরকে সংসারটি চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’
‘কিন্তু উনি যদি আর ফিরে না আসেন, মিস?’
‘তাতেও যে খুব একটা অসুবিধে হবে এমন নয়। ‘ব্যাখ্যাতীত ঘটনা ঘটলে আমি কদাচিৎ স্বস্তি বোধ করতে পারি।’
‘তাহলে তো আপনাকে প্রায়ই অস্বস্তিতে থাকতে হয়, মি. টেলর।’
‘তা বটে।’
মি. টেলর কি বুঝতে পারে না যে জীবনের কোনকিছুরই সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নেই? সে যেরকম সহজসরল জীবনের প্রত্যাশা করছে তা রীতিমত হাস্যকর। তার কাছে আয়না হলো সরল একটি সারফেস যাকে পালিশ করে রাখলেই চলে। সে দাদীমার জীবনটাকে বুঝত না কিন্তু মৃত্যুটাকে বুঝতে চাইছে।
‘আশা করি একসময় সবকিছুরই ব্যাখ্যা মিলবে, ‘ বললাম আমি। ‘আমরা সকলে তা-ই চাই।
‘জি, মিস।’
মি. টেলর টেবিলে বসে এক টুকরো ত্যানা দিয়ে রুপোর একটি মোমদানি মুছতে লাগল।
.
সকালটা কেটে গেল মিস বার্টনকে নিয়ে দাদীমার খতিয়ান বইগুলোতে চোখ বুলিয়ে। মিস বার্টন এসব বই বহু দেখেছে। যখন বললাম বইগুলো আমি খুঁজে পেয়েছি, তাকে অসন্তুষ্ট দেখাল।
‘ওইসব জিনিস পড়ে তোমার খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না।’ বলল সে। ‘ওগুলোর মধ্যে নাটকীয়তা একদমই নেই-শুধু আছে দুর্ভাগ্য আর দুর্দশার পরিসংখ্যান।’
‘এর মধ্যে তারচেয়েও বেশি কিছু থাকার কথা। তাছাড়া এটা তো আমাদেরই হেরিটেজ, নয় কি?’
‘আমাদের হেরিটেজের দয়া দাক্ষিণ্য পাবার কোন দরকার নেই। তাছাড়া আমি এটিকে প্রত্যাখ্যান করেছি, তুমিও করবে।’
‘আমি কী প্রত্যাখ্যান করছি জানতে পারলে কাজটি আমার জন্য হয়তো সহজ হয়ে উঠত।’
মিস বার্টন চেহারায় সন্দিহান ভাব ফোটাতে চেয়েও ব্যর্থ হলো। আমরা যখন দাদীমার ঘরে ঢুকলাম এবং পুরনো টেবিলের কাছে দু’খানা চেয়ার টেনে নিলাম, ওই সময় অ্যানকে উত্তেজিত দেখাচ্ছিল-এবং সম্ভবত ভীতও।
প্রথম দিনকার রেকর্ডে ফ্রান্সিসের বংশধরদের কথা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সপ্তদশ শতকে এসেক্স কাউন্টিতে ডাইনিদের বিচার বিষয়ক নানান ঘটনা। ফ্রান্সিস উইলিয়ামস হ্যাটফিল্ড পেভেরেলের গাঁয়ে বাস করত। সে কখনো বিয়ে করেনি তবে তার একটি মেয়ে ছিল। এ ছিল অবিবাহিত নারীর অনড় অবস্থানের শুরু, পরবর্তী ‘রেকর্ড জুড়ে শুধু কুমারী কন্যাদের কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার কথা নথিবদ্ধ করা হয়েছে।
এসব এন্ট্রিতে একটি গ্রামীণ সমাজের পরিচয় পাওয়া যায় যেখানে কর্তৃত্ব করত অজ্ঞতা এবং ভয়। মানুষজনকে ধরে ধরে জেলে পুরে দেয়া হত অতি সামান্য সব অভিযোগে।
যেমন পড়শীর গাভীটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এ সন্দেহে কাউকে জেলে যেতে হত। তবে সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে এ ধরনের মামলার পরিমাণ কমে আসে। ১৭৩৬ খ্রিস্টাব্দে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে: ডাকিনী আইন বাতিল করা হয় এবং ফ্রান্সিসের প্রথম বংশধররা এসেক্সের গ্রাম ছেড়ে লণ্ডনে বসবাস শুরু করে। ত্রিশ বছর পরে আরেকটি দল আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে থিতু হয়ে বসে নিউ ইয়র্কে। বংশধরদের তিনটি প্রধান গ্রুপ ছিল: এসেক্স গ্রুপ, লণ্ডন গ্রুপ, যে বংশে মিস বার্টনের জন্ম এবং নিউ ইয়র্ক গ্রুপ, এ দলটি জন্ম দিয়েছে দাদীমা এবং আমাকে।
আমি খতিয়ান বইগুলোর বেশিরভাগ পড়ে ফেললাম। তবে মিস বার্টন শুধু একটি বই পড়ল। সে প্রায়ই ঘরের চারপাশে ইতিউতি তাকাচ্ছিল। হয়তো বইগুলো দেখতে দেখতে তার বিরক্তি লাগছিল। যদিও তার নিঃশ্বাস হয়ে উঠছিল দ্রুত এবং আমার সন্দেহ হেরিটেজ নিয়ে উদাসীনতা মিস বার্টনের ভান মাত্ৰ।
লাঞ্চের সময় সে বলল তার খিদে পায়নি। বরং এখন একটু ঘুমিয়ে নেবে। চলে যাওয়ার আগে তাকে আমি প্রশ্ন করলাম ডাইনি আইনটি কেন বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। সে একটু চিন্তা করল। তারপর জবাব দিল, ‘হতে পারে বুদ্ধিমান মানুষজন ভাবছিল কেউ স্রেফ চিন্তাশক্তি দিয়ে কারো ক্ষতি করতে পারে না।’
‘কিন্তু কথাটি আসলে সত্য নয়, তাই না?’
‘ঠিক তাই, এলিজাবেথ। শুধু চিন্তা দিয়ে কারো যদি ক্ষতি করা যায় তো সেটা শুধু তোমার নিজেকে।’
‘তাহলে ফ্রান্সিসকে ভয় করার কিছু নেই?’
‘অন্যদের জন্য নয়-তোমার জন্য।’
‘আমাদের জন্য।’ বললাম আমি।
.
ডাইনিংরুমে শুধু আমি আর জেমস লাঞ্চ করলাম। মি. টেলর ছোটখাট বুফের ব্যবস্থা করেছে। আমি ঘরে ঢুকে দেখি জেমস সানন্দে প্লেট ভর্তি পনির খাচ্ছে। পনির তার খুব পছন্দের খাদ্য। একটি প্লেটে কাটা পেঁয়াজ এবং এক বোতল ওয়াইনও দেখতে পেলাম। এ ওয়াইন নিয়ে জেমসের খুব গর্ব। সে বলে এটি নাকি গ্রীস দেশের ওয়াইন। পনিরের সঙ্গে নাকি কেবল এই জিনিসটিই পাল্লা দিতে পারে।
জেমস বেশ ফূর্তিতে আছে। আমি ঠাণ্ডা হ্যাম এবং সালাদ নিয়ে তার পাশে বসলাম। জেমস খেতে খেতে প্রস্তাব দিল, ‘চলো কাল রাতে দু’জনে মিলে অপেরা দেখে আসি।’
‘তুমি জানো অপেরা দেখতে আমি মোটেই পছন্দ করি না।’
‘ওরা খুব ভাল নাটক দেখাচ্ছে।’
ভাল নাটকটি হলো ডন গিয়োভানি। জেমস ডন জুয়ানের কিংবদন্তির প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল যেভাবে একজন প্রিস্টের কাছে নিউ টেস্টামেন্টের কদর রয়েছে। অবশ্য একই সঙ্গে আমার মনে হলো ওর সঙ্গে নাটক দেখতে গেলে মন্দ হয় না। তাই বললাম, ‘ঠিক আছে, যাব।’
.
পরদিন সকালে দাদীমার খতিয়ান বই খতিয়ে দেখতে গিয়ে লক্ষ করলাম কুড়ি নম্বর খণ্ডটি নেই। যেখানে ভলিউমটা ছিল সে জায়গাটি খাঁ খাঁ করছে। আমি নিশ্চিত আগের দিনও ওই জায়গাটি খালি ছিল না। মিস বার্টন বাইরে গেছে ঘুরতে। বোধহয় ওই ভলিউমটা সে-ই নিয়েছে। আমি পড়া শুরু করলাম। একুশ নম্বর খণ্ডে এসে দেখি ওতে লেখা: Description of Various Efficacious Formulae and Ceremonies Employed by Frances Williams in her Arts – Continued and Concluded.
এতে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বিশেষ কিছু পরিস্থিতি সৃষ্টিতে কীভাবে আচারবিধি পালন করতে হবে তারই বিস্তারিত তথ্য। বেশিরভাগই ছোট ছোট বিষয় নিয়ে লেখা। যেমন: কীভাবে গরুর দুধ টক করে ফেলা যায় কিংবা বদলানো যায় দুধের রঙ। কীভাবে কোন লোকের গায়ে জডুল কিংবা তিল জন্মানো যায় অথবা কীভাবে কারো হাত অবশ করা যায় ইত্যাদি।
আচার অনুষ্ঠানে অর্থহীন, আজেবাজে কথা থেকে শুরু করে অশ্লীল সব কথাও বলা হয়। এতে সাবজেক্টের প্রস্রাব ব্যবহার করা হয়।
বর্ণনাগুলো চিত্তাকর্ষক হলেও খুব একটা কাজে লাগানোর মত নয়। আমার ধারণা হারানো ভলিউমটির মধ্যে কাজে লাগানোর মত তথ্য রয়েছে। আর আমি নিশ্চিত মিস বার্টনই ভলিউমটি হাতিয়েছে।
.
তেইশ
জেমস এবং আমি সে রাতে অপেরায় গেলাম। আমাদের ফ্যামিলি কার, কালো রঙের পুরনো একটি রোলস রয়েসে চেপে গেলাম নাটক দেখতে। গাড়িটি ভ্রমণ নয়, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যাতায়াতের জন্যই ভাল মানায়, চেহারা দেখে তাই মনে হলো। ওয়েস্ট সাইড ধরে শহরে গেলাম আমরা। শীঘ্রি পৌঁছে গেলাম জেটিতে। একসময় এই জেটি এবং শেডগুলো বিদেশগামী লাইনার এবং ক্রুজ শিপের ভিড়ে গমগম করত। এখন খুব কম ডকই ব্যবহার করা হয়, মাঝে মাঝে রাত্রির নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে যায় জাহাজের হুইসলের শব্দে। হুইসল প্রতিধ্বনি তোলে রাস্তায় এবং আমাদের বাড়িতে।
তবে আজ রাতে জাহাজঘাটায় কোন জাহাজ নোঙর করা নেই। অন্ধকার জেটির কাঠামো যেন ফুটে আছে রাতের আকাশে। শেড বা কুটিরগুলোর বেশিরভাগ পরিত্যক্ত। ওগুলো এখন ভবঘুরেদের নিবাস এবং ইঁদুরদের আশ্রয়স্থান।
জেমস সাঁ সাঁ করে গাড়ি চালিয়ে লিঙ্কন সেন্টারের আণ্ডারগ্রাউণ্ড পার্কিং লটে চলে এল।
‘মাটির তলা থেকে অপেরা হাউসে প্রবেশের চিন্তাটি আমাকে বেশ উত্তেজিত করে তোলে,’ বলল সে। ‘নিজেকে অর্ফিউস বলে মনে হয়।’
আমরা লবি পার হয়ে সিঁড়ি বেয়ে ফার্স্ট লেভেলে চলে এলাম। এখান থেকে দর্শকদের দেখা যায়। জেমস আমার হাত ধরল, যখনই কোন সুন্দরী মেয়েকে প্রবেশ করতে দেখল লবিতে, তার মুঠোর চাপ বাড়ল।
আমিও অবশ্য মহিলাদেরকে লক্ষ করছিলাম। বেশিরভাগই অহেতুক উন্মুক্ত করে রেখেছে তাদের বাহু, কাঁধ এবং বক্ষ। আমি দাদীমার ক্লজিটে পাওয়া একটি ড্রেস পরে এসেছি। এটি কালো রঙের একটি পোশাক, লম্বা আস্তিন, পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢাকা, সামনের দিকে ছোট ছোট সাদা বোতাম, গলা থেকে শুরু হয়ে কোমরে গিয়ে মিশেছে।
আমরা একদম শেষ মুহূর্তে প্রবেশ করলাম অডিটোরিয়ামে, মাত্র আসনে বসেছি, সঙ্গে সঙ্গে অপেরা শুরুর আগের যন্ত্র সঙ্গীত বেজে উঠল। জেমস পকেট থেকে ভাঁজ করা অপেরা গ্লাস বের করে রঙ্গমঞ্চের পর্দা উঠে যাওয়ার দৃশ্য দেখল গভীর মনোযোগে। তবে আমি চোখ বুজেই যেন সবকিছু আরও ভাল দেখতে পাচ্ছিলাম। মঞ্চের লোকজন তাদের যা করা উচিত তা কখনোই করতে পারে না। যে লোকটি ডন গিয়োভান্নির ভূমিকায় অভিনয় করছিল সে নিশ্চয় তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছে কণ্ঠশীলনের পেছনে।
জেমস অবশ্য এ চরিত্রটিকে অন্য যে কারো চেয়ে ভাল বুঝতে পারে। সে ডনের সংঘর্ষ এবং নিবেদন দুটোই বুঝতে পারে। লেপোরেল্লো যখন তার প্রভুর জয়ের স্তুতি নিয়ে গান গাইল, হাসল না জেমস। তাকে শিহরিত এবং ঈর্ষান্বিত লাগছিল।
বিরতির সময় অপেরা গ্লাস চোখে লাগিয়ে মেয়ে দর্শকদের বুকের খাঁজ, খোলা কাঁধ ইত্যাদি খুঁজে বেড়াতে লাগল। বেশিরভাগই অবশ্য শুকনো ত্বকের কাঁধ এবং খাঁজভাঁজগুলো প্রাকৃতিক নয়, কৃত্রিম। সে গ্লাসটি আরেকটু উঁচু করলে দেখতে পেত এই মহিলাদের মুখগুলোর মধ্যে __ছে শূন্যতা ও ক্লান্তি।
নাটকের চূড়ান্ত পর্বের সময় চোখ থেকে চশমা নামিয়ে ফেলল জেমস। ফিসফিসিয়ে বলল, ‘চলো, এখন বেরিয়ে যাই। নইলে ভিড়ের কবলে পড়তে হবে।’ ডন গিয়োভান্নির চেঁচামেচির মধ্যে তার গলা প্রায় শোনাই গেল না। আমি আসন ছেড়ে নড়লাম না।
বাড়ি ফেরার পথে চুপচাপ গাড়ি চালাতে লাগল জেমস। আমি সারাক্ষণ চোখ বুজে রইলাম। গাড়ি থামার পরে চোখ মেলে তাকালাম। বাড়ি নয়, আমরা পার্ক করেছি সেন্ট পল চ্যাপেলের পাশে। এটি অষ্টাদশ শতকের একটি গির্জা এবং গোরস্থান। আমাদের বাড়ি থেকে খানিক দূরে, উত্তরে এটির অবস্থান।
আমি জেমসের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালে সে বলল, ‘চলো, একটু কবরখানায় গিয়ে বসি।’
‘কেন?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। আমার ভয় লাগছিল ও প্রকাশ্যে যা করতে পারেনি কবরস্তানে গিয়ে এখন তা-ই করতে চাইছে।
‘তোমার জন্য একটি উপহার এনেছি,’ বলল সে। ‘ওখানে বসে উপহারটি দিলে তা অনেক স্মৃতিময় হয়ে থাকবে।’
সে গ্লাভ কমপার্টমেন্ট খুলে চকচকে র্যাপিং দিয়ে মোড়ানো একটি বাক্স বের করল। ‘ঠিক আছে,’ বলে আমি গাড়ি থেকে নামলাম। জেমসের প্রস্তাবগুলো প্রায়ই আমার কাছে হাস্যকর বলে মনে হলেও পরে আমি ব্যাপারগুলো সাধারণত উপভোগই করি।
ঝড়জল, বাতাসে ক্ষয়ে যাওয়া গ্রেভ মার্কারগুলোর মাঝ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম আমরা। দিনের বেলাতেও এগুলোর গায়ে লেখা লিপি পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় না। আমি ভাবছিলাম আমাদের কোন আত্মীয়কে এখানে কবর দেয়া হয়েছে কিনা। মনে পড়ছে না দাদীমা কখনো সেন্ট পলের কথা বলেছিলেন কিনা। তবে এটা হওয়া খুবই সম্ভব যে আমাদের কোন পূর্বপুরুষ অন্তত চার্চে আসতেন।
আমরা একটি বেঞ্চিতে বসলাম। ডন গিয়োভান্নি নাটকের গির্জার দৃশ্যটি মনে পড়ে গেল আমার যেখানে ডনের হাতে খুন হওয়া একটি পাথরের মূর্তি প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দেয়।
‘খুব খারাপ এখানে কোন মূর্তি নেই,’ বললাম আমি।
‘কেন?’
‘তাহলে ওদের কেউ আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারত।’
‘ঠিকই বলেছ,’ সায় দিল জেমস। ‘একটা মূৰ্তি থাকা দরকার ছিল।’
সে আমার দিকে ফিরে আমার গলায় হাত রাখল। তারপর আমার ড্রেসের সামনের বোতামগুলো খুলতে লাগল। আমি ভাবলাম ও বোধহয় আমার বুক দেখতে চাইছে। তবে ও শুধু গলার নিচের বোতামগুলো খুলেই ক্ষান্ত দিল। তারপর আমাকে তার উপহারটি দিল। আমি দ্রুত খুলে ফেললাম র্যাপিং পেপার। বাক্সের ভেতরে দেখলাম বারোক মুক্তার একটি মালা। ওটা দেখে গা কেমন ছমছম করে উঠল।
‘এসো, তোমাকে পরিয়ে দিই,’ বলল জেমস।
সে মালাটি আমার গলায় পরিয়ে দিল। শীতল, তেলতেলে মুক্তোগুলো যেন সেঁটে রইল আমার ত্বকের সঙ্গে। কেঁপে উঠলাম আমি। জেমস আমার ঘাড়ে চুমু খেল আর ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে কেউ যেন ভৌতিক গলায় চাপা স্বরে বলে উঠল: ‘ফ্রান্সিস, না।’
তখন বুঝতে পারলাম এ মুক্তোগুলো আমি আগেও দেখেছি। দাদীমাকে শেষবার যখন দেখি, ওইসময় তিনি মালাটি গলায় পরে ছিলেন। জেমস আমার শিউরে ওঠা লক্ষ করেনি অথবা দেখলেও হয়তো ভেবেছে আনন্দে কেঁপে উঠেছি। ‘পছন্দ হয়েছে?’ জানতে চাইল সে।
‘খুব সুন্দর,’ বললাম আমি। ‘এগুলো কোথায় পেলে?’
‘বহু কাল ধরে আমাদের সিন্দুকে ছিল। পারিবারিক সম্পত্তি।’
‘দাদীমা নাকি দাদুর বংশের জিনিস?’
‘দাদীমার। তিনি বলতেন পরিবারের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটিকে এটি পরতে দেয়া হবে। আর সেজন্য তোমাকে এটি দিলাম।’
জেমস জানে দাদীমা আর কোনদিন ফিরবেন না। নইলে তাঁর মুক্তোর মালা আমাকে দেয়ার সাহস তার হত না।
ফ্রান্সিসের সঙ্গে জেমসের সম্পর্ক কী?
এসব বিষয় নিয়ে পরেও ভাবার সময় পেলাম না, বিশেষ করে ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে আমার পাশে যখন শুয়ে ছিল জেমস।
মি. খামচানি কার্পেটে বসে ছোট, চকচকে একটি জিনিস নিয়ে খেলা করছিল: একটি মুক্তো। জেমস আমাকে মালাটি খুলতে মানা করেছিল। কিন্তু এটি ছিঁড়ে গিয়ে মুক্তোগুলো ছড়িয়ে পড়েছে বিছানা ও মেঝেতে।
নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে জেমস। হাঁ করা মুখ। ও কি দাদীমার অন্তর্ধানের জন্য দায়ী? হতেও পারে। যদিও কয়েকদিন আগে মি. হিউবার্টকে আমি দায়ী ভেবেছিলাম। ওদের দু’জনকে যদি একত্র করা যায়, সত্যটা হয়তো জানা যাবে। আর সত্য জানতে পারলে বুঝতে পারব ফ্রান্সিস কেন আর আমাকে দেখা দেয় না।
আমি জেমসের ঊরুর চুল ধরে জোরে টান দিলাম। সে ব্যথায় ‘আউ’ করে উঠে জেগে গেল।
‘আমাকে তুমি লেক জর্জে নিয়ে চলো,’ ফিসফিস করে বললাম আমি।
জেমস বোধহয় ঘুমিয়ে মধুর কোন স্বপ্ন দেখছিল। অকস্মাৎ স্বপ্ন ভঙ্গ হওয়ায় তাকে ক্ষুব্ধ দেখাল। সে একবার আমাকে বলেছিল সে নাকি প্রায়ই স্বপ্নে দেখে একজন মাকড়সা মানবীর সঙ্গে মিলিত হচ্ছে। সেই মহিলার ছয়টি রোমশ হাত, হাঙরের মুখের মত। লোমশূন্য, হাঁ করা, তাতে কিচকিচ করছে ধারাল দাঁতের সারি। এ স্বপ্নটি জেমসকে খুব আনন্দ দেয়।
‘লেক?’
‘হ্যাঁ, শুধু আমরা দু’জন।’
‘লেক আমাদের জন্য নয়, সোনা। এটা ওদের জন্য।’
‘ওরা কারা?’
‘আমাদের শত্রুপক্ষ।’ নিচু গলায় বলল জেমস। তার চোখ আবার বুজে এল, নিঃশ্বাস হয়ে এল ঘন। মুহূর্তের মধ্যে ঘুমরাজ্যে তলিয়ে গেল।
কাল সকালে ওকে চেপে ধরব আমি। তখন দেখব আমার কথা না রেখে কোথায় যায়।
.
চব্বিশ
পরদিন সকালে আমাদের সঙ্গে নাশতার টেবিলে যোগ দিলেন দাদু। পরিবারে ফিরে আসতে পেরে তিনি যে কত খুশি হয়েছেন তারই বয়ান করলেন। আমার পাশে বসলেন তিনি, মাঝে মাঝে আমাকে স্পর্শ করলেন যেন আমি একটি পুরনো, দামী আসবাব।
বললেন তিনি আশা করছেন একদিন তাঁর নাতি পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেবে। তবে আইডিয়াটি মোটেই পছন্দ হলো না কিথের। আমাদের কারোরই মন ভাল নেই। দাদুর খোশমেজাজী, আন্তরিক উপস্থিতি আমাদেরকে সচেতন করে তোলে যে আমরা যে আনকমন পৃথিবীটি গড়ে তুলেছি তার কতটা আসলে মূল্যায়ন করছি। দাদু একটি ভিন্ন জগতের প্রতিনিধিত্ব করছেন যেখানে অসাধারণ মানুষদেরকে স্বাগত জানানো হয় না। তবে তিনি আমাদের জন্য কোন হুমকি নন কারণ তিনি আমাদের জমিনে বসে আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন যেখানে আমাদের শক্তি সুপ্রতিষ্ঠিত। এবং তিনি যতই আমাদেরকে তাঁর পৃথিবীর অংশ করতে চান না কেন, আসলে তিনি আমাদেরই একটি অংশ হয়ে উঠবেন।
দাদু মিস বার্টনের সঙ্গে কথা বলছেন, আমি একটা অজুহাত দেখিয়ে নাশ্তার টেবিল থেকে উঠে পড়লাম। চলে গেলাম মিস বার্টনের ঘরে। তার বিছানা অগোছাল। খাটের ওপর ধূসর রঙের সুতির একটি নাইট গাউন। আমি নাইট গাউনটি তুলে নিয়ে মুখের ওপর চেপে ধরলাম। মিস বার্টন যে সুগন্ধি ব্যবহার করে এটা থেকে সেই একই গন্ধ আসছে। খুব একটা সুঘ্রাণ না হলেও একেবারে খারাপ না। আমি ঘরের চারপাশে তাকালাম। ভাবছি হারানো খতিয়ান বইটি কোথায় থাকতে পারে।
ঘরের কিনারে বইয়ের একটি আলমারির সামনে গেলাম আমি। বইগুলো আমার পরিচিত। মিস বার্টনের সঙ্গে বসে এসব বই পড়েছি। মলিন হয়ে যাওয়া বইয়ের বাঁধাইয়ের দিকে তাকিয়ে মহিলার জন্য আমার একটু মায়া লাগল। একসময় ভাবতাম বইয়ের চেয়ে রহস্যময় এবং উত্তেজক বস্তু পৃথিবীতে আর কিছু নেই। লাইব্রেরি থেকে বই ধার করে আনতাম, পৃষ্ঠাগুলোয় অন্যদের লেখা পড়তাম। কল্পনায় দেখতাম কেউ একজন বিছানায় শুয়ে বইটি পড়ছে, মাঝে মাঝে লাল কালি দিয়ে আণ্ডারলাইন করছে বিশেষ কোন লাইন। আগের পাঠকরা এ বই পড়ার সময় তাদের কীরকম অনুভূতি হত ভাবতাম আমি। কাগজে পেন্সিল মার্ক, শব্দ এবং বাক্যে আণ্ডারলাইন, মার্জিনে চেক মার্ক ইত্যাদি বিষয়গুলো আমার খুব ভাল্লাগে।
আমি ইংরেজি গদ্যের একটি সঙ্কলন নিয়ে পাতা ওল্টাচ্ছি, চোখ আটকে গেল আণ্ডারলাইন করা একটি প্যাসেজে। জন শেলডনের সপ্তদশ শতকে লেখা Table Talk থেকে লেখা উদ্ধৃতি:
ডাইনিদের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে বলেই প্রমাণ হয়ে যায় না এদের অস্তিত্ব রয়েছে। তবে এ আইনের সাহায্যে সেইসব লোককে শাস্তি দেয়া হয় যারা নির্মমভাবে অন্যের জীবন হরণ করে। কেউ যদি তার মাথার হ্যাট তিনবার ঘুরিয়ে চিৎকার করে ‘বায’ শব্দটি উচ্চারণ করে তাহলে সে যে কারো জীবন নাশ করতে পারে। তবে বাস্তবে এটি সম্ভব নয় যদিও আইনে রয়েছে…
বইটি আমি রেখে দিলাম। খতিয়ান বইটি খুঁজছি। প্রায় একদিকের দেয়াল জোড়া মেহগনি কাঠের প্রকাণ্ড ড্রেসার। আমি প্রতিটি ড্রয়ার খুলে চট করে একবার নজর বুলিয়ে নিলাম। আণ্ডারক্লথের নিচে ঘেঁটে দেখলাম। টপ ড্রয়ারে লাল প্লাস্টিকের একটি ট্রে চোখে পড়ল। সস্তা গহনা ভর্তি। এমন জিনিস আমি জীবনেও পরব না। আমি ক্ষয়াটে চেহারার একটি লকেট খুললাম। ভেতরে একগোছা চুল পাকিয়ে রাখা সুন্দর চুল, মহিলাদের কেশ, আমার চুলের মত রঙ।
মিস বার্টনের ক্লজিটের একটি তাকে খতিয়ান বইটি পেয়ে গেলাম। নীল রঙের একটি খড়ের হ্যাটের পাশে। ঘর থেকে বেরুবার আগে আমি হ্যাটটি মাথায় পরে নিলাম, তিনবার ওটা ঘুরিয়ে নিয়ে উচ্চারণ করলাম, ‘বায।’
খতিয়ানটি নিয়ে চলে এলাম নিজের ঘরে। বসলাম পড়ার টেবিলে। চামড়ায় বাঁধানো পুরনো বইটির পৃষ্ঠা ওল্টাতে লাগলাম উত্তেজনা নিয়ে। প্রত্যাশায় ঢিপঢিপ করছে বুকের ভেতরটা। আমি টেবিলে বসে আছি; এমনসময় দরজায় নক করে আমাকে ডাক দিল মিস বার্টন। শুনতে পেলাম সে নিজের ঘরে ঢুকল। একটু পরেই আমার দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
‘এলিজাবেথ,’ বলল সে। ‘বইটি খুলো না। ওটা ক্ষতি করবে-অন্যদের নয়, শুধু তোমার ক্ষতি করবে।’
আমি নিশ্চুপ হয়ে রইলাম।
‘বইটা ধ্বংস করে ফেলো, এলিজাবেথ। নিজেকে ধ্বংস হতে দিয়ো না।’
মিস বার্টন ভুলে গেছে সে নিজেই বইটি ধ্বংস করতে পারত কিন্তু করেনি বা পারেনি। সে খুব ভাল করেই জানে এ বই ধ্বংস করা উচিত হবে না। বইটি তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে, তবে এটি তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। সে আরও কয়েকবার আমার নাম ধরে ডাকল তারপর চলে গেল।
আমি বইটি খুলতেই অস্পষ্ট, দূরাগত একটি গোঙানি শুনতে পেলাম। হয়তো মিস বার্টন নিজের অগোছাল বিছানায় শুয়ে মন খারাপ করছে কিংবা ঈর্ষা বোধ করছে। অথবা অন্য কেউ হতে পারে, অন্য কোন সময় এবং জায়গার।
বইটির কাগজগুলো কালচে, ওপরের ডানদিকের কিনারগুলো মোড়ানো। সেলাই খুলে আলগা হয়ে গেছে বোর্ড, শুকনো আঠা ঝরে পড়ল আমার টেবিলে। অন্য কোন ভলিউম বোধ করি এত বেশিবার ব্যবহার করা হয়নি। টেক্সট ভাগ করা হয়েছে তিনটি প্রধান ভাগে: একটিতে রয়েছে শব্দ চিহ্ন, জাদুবিদ্যা এবং জাদুটোনা বিষয়ক নানান লেখা; আরেক ভাগে বর্ণিত হয়েছে নানা পরিকল্পনা, ফন্দি ও কৌশল। আর একটি অংশে বলা হয়েছে বিশেষ কিছু পূজা-আর্চা এবং তাদের ফলের কথা। শেষ অংশে রয়েছে আত্মা, প্রাণী এবং মানুষ ডাইনি বিদ্যায় কীভাবে প্রভাবিত করা যায় সে সম্পর্কিত বর্ণনা। আমি আত্মা নিয়ে লেখা একটি পৃষ্ঠা ওল্টাতে দেখি ওটার হেডিঙে চেক মার্ক দেয়া। হেড়িঙে লেখা: ‘কীভাবে আত্মার প্রভাব ব্যর্থ করে দেয়া যায়।’ আমি শুরুটা পড়লামঃ
যে ব্যক্তি আত্মা দ্বারা প্রভাবিত রাতের বেলা তার ঘরে যাও। লোকটি ঘুমিয়ে থাকলে কাঁচি দিয়ে তার মাথার এক গোছা চুল কেটে নাও। এবং সেই সঙ্গে বলো, ‘আত্মা, আমি তোমার শক্তি নষ্ট করে দিলাম।’ যতদিন তোমার হাতে চুলের গোছা থাকবে, ওই লোকটির ওপর আত্মার কোন প্রভাব থাকবে না।’
মনে পড়ল সে রাতে আমি মিস বার্টনকে দেখেছিলাম আমার বেডরুম থেকে চলে যেতে। তার পকেটে সদ্য পাওয়া চুলের গোছার কথা ভাবলাম। খতিয়ান বইটি বন্ধ করে মিস বার্টনের ঘরে গেলাম আমি। দরজায় কড়া না নেড়েই ঢুকে পড়লাম ভেতরে। সে শুয়ে ছিল বিছানায়। আমাকে দেখে ধড়মড় করে উঠে বসল। আমি দ্রুত পায়ে তার ড্রেসারের কাছে গিয়ে ড্রয়ার খুলে বের করলাম লকেটটি।
আমাকে বাধা দিল না মিস বার্টন। ‘ওটা তোমার দরকার নেই,’ বলল সে। ‘ওটা ছাড়াই তোমার জীবন ভালভাবে চলতে পারবে।’
‘তোমার মত জীবন?’
‘তুমি যেমন খুশি জীবন চাও, এলিজাবেথ।’
‘যদি অসাধারণ কোন জীবন চাই?’
‘তা পাবার অনেক রাস্তা আছে। আমি তোমাকে সাহায্য করব।’
‘তোমার সাহায্যের আমার দরকার নেই। ফ্রান্সিস আমাকে সাহায্য করবে। সে আমাকে কখনো বলেনি আমাকে কী করতে হবে বা কীসে বিশ্বাস করতে হবে। ঠিক বেঠিক নিয়েও তার কোন মাথা ব্যথা নেই যেমনটি আছে তোমার। আমি যেমন আছি তাতেই সে সন্তুষ্ট। তোমার বুঝতে হবে ব্যাপারটি কত জরুরি। তুমি এখানে তোমার মত করে থাকছ। আমরা কি তোমাকে কিছু বলেছি?’
মিস বার্টন বিছানার কিনারে বসে রইল চুপচাপ।
আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি, চোখের কোণে একটি হালকা নড়াচড়া ধরা পড়ল। আমি আয়নায় তাকালাম। ফ্রান্সিস আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
আমি ঘর থেকে বেরুবার সময় মিস বার্টন বলল, ‘তোমার দাদীমার কথা ভুলে যেয়ো না, এলিজাবেথ।’
আমি চিলেকোঠায় চলে এলাম। ওখানে ফ্রান্সিসকে একা পাওয়া গেল। তাকে খুব খুশি খুশি লাগছে। ‘তুমি আমাকে মিস করছিলে, আমার খরগোশ?’ বলল সে।
‘হ্যাঁ। খুব মিস করছিলাম।’
‘আমি তোমাকে সাবধান করে দিয়েছিলাম ওই মহিলা ‘বিপজ্জনক।’
‘আমি ভাবিনি সে তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’
‘ক্ষমতা শুধু আমাদেরই নেই, এলিজাবেথ। অন্যদের ব্যাপারেও তোমাকে সাবধান থাকতে হবে।’
‘আমার দাদীমার কী হয়েছে তুমি জান?’
‘আমি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর থেকে এ বাড়িতে কী ঘটেছে কিছুই জানি না।’
‘দাদীমা অদৃশ্য হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম আমরাই বোধহয় এ কাজ করেছি।
‘না, আমি মার্থাকে তার ঘরের আয়না থেকে লক্ষ করছিলাম। তোমার আচার অনুষ্ঠান শুরুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এ সময় আমাকে তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া হয়।’
‘তার কী হয়েছে জানতে আমাকে সাহায্য করতে পারবে?’
‘না।’
আমি জন ডিকসনের কথা বললাম ফ্রান্সিসকে। ‘সে বলল এজন্য নাকি তুমি দায়ী। তবে সে আমাকে জেমস চাচার চেহারা দেখিয়েছে। তোমার সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক আছে?’
হাসল ফ্রান্সিস। ‘না। পুরুষদের আমি ছায়াও মাড়াই না।’
‘তাহলে বোধহয় এ বিষয়টি আমার ভুলে যাওয়াই উচিত। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা দরকার।’
‘না। যা ঘটছে তা ভুলে গেলে চলবে না। আমি তোমাকে অন্যদের ব্যাপারে সারধানে থাকতে বলেছি। তুমি তোমার শত্রু এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদেরকে চেন। আত্মরক্ষার ক্ষমতা এখন তোমার আছে। কাজেই এগিয়ে যাও।’
.
