স্নোম্যান – অনীশ দাস অপু
স্নোম্যান
আমার বন্ধু বিলি নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবে। সবসময় আমাদেরকে বলতেই থাকে তার মাথায় কত বুদ্ধি-আর এটাই বিলির সবচেয়ে বিরক্তিকর দিক।
বিলি বড্ড বিরক্তিকর একটি চরিত্র। কেন? এর একটা তালিকা দিতে পারি আমি…..
১. সে খুব দাম্ভিক প্রকৃতির।
২. নিজেকে শো অফ করতে খুব ভালবাসে।
৩. বড্ড বড় বড় বুলি কপচায়।
৪. নিজেকে ভাবে সবজান্তা শমসের। পৃথিবীতে হেন কাজ নেই সে পারে না, এমনই ভাব দেখায়।
৫. নিজেকে আমাদের চেয়ে অনেক চালাক-চতুর মনে করে।
আমরা মানে আমি-রিক বেকার-এবং আমার অন্যান্য বন্ধুরা লোরেন ও ফ্রেড। আমরা চারজন একই মহল্লায় থাকি, কিণ্ডারগার্টেনে পড়ার সময় থেকে আমাদের বন্ধুত্ব।
আমরা সারাক্ষণ বিলির বিরুদ্ধে নালিশ আর অভিযোগ করলেও সারাদিন ওর সঙ্গেই আছি। আমার মনে হয় বিলির সঙ্গে আমাদের প্রধান সমস্যা হলো সে কখনো মুখ বন্ধ করে রাখতে পারে না।
আর সর্বক্ষণ সে একটি বিষয় নিয়েই কথা বলে-মৃত্যু।
‘তোমরা কি জানো একজন লোককে স্পর্শমাত্র না করেও সুড়সুড়ি দিয়ে মেরে ফেলা যায়?’ বলে বিলি।
এরকমই অদ্ভুত বিলি। মাঝে মাঝে মনে হয় ওকে যেন ভূতে পেয়েছে। লোকে কত বিচিত্রভাবে মারা যেতে পারে তা নিয়েই সারাদিন বকবকানি চলে তার।
‘জানো ঘুমের মধ্যে চুলকাতে চুলকাতে তোমরা মারা যেতে পার?’
‘তোমরা কি জানো প্লেন থেকে পড়ে যাওয়া পালকের আঘাতেও মৃত্যু ঘটতে পারে?’
এরকম মৃত্যুর কথা সবসময় শুনতে ভাল লাগে না। এতে মনের মধ্যে কেমন তালগোল পাকিয়ে যায়।
আজ আমরা চারজনে মিলে বাড়ির পাশের পার্কের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ওখানে পৌঁছাবার পরে লোরেন, ফ্রেড এবং আমি ঠিক করলাম বিলির মৃত্যু সম্পর্কিত তথ্য নিয়ে আজ একটা কাণ্ড ঘটাব।
প্রচুর তুষারপাত হচ্ছে বলে আজ স্কুল বন্ধ। তাই আমাদের মনেও অনেক ফূর্তি।
রাস্তায় কমপক্ষে দুই ফুট গভীর বরফ জমে আছে। কোথাও কোথাও কাঁধ পর্যন্ত উঁচু। গোটা পৃথিবী সাদায় সাদাময়। শুধু আকাশটা বাদে। ওটা ঝকঝকে নীল। একটি চমৎকার, চনমনে শীতল দিন।
নিঃশ্বাসের সঙ্গে নাক দিয়ে বাষ্প বেরিয়ে আসছে, বুট জুতোর চাপে মুড়মুড় করে ভাঙছে বরফ। পার্কে গিয়ে বাচ্চাদের সঙ্গে স্লেজে চড়লে মন্দ হয় না।
কিন্তু বিলি এসব কী বলছে?
‘তোমরা কি জানো ভয়ের চোটে তোমরা জমে বরফ
হয়ে যেতে পার?’ বলল সে।
গুঙিয়ে উঠলাম আমি। ‘আরে, ভাই, এসব কথা ছাড়ো তো।’
‘না, সত্যি বলছি,’ বলল সে। ‘তুমি এমন ভয় পাবে তোমার শরীর বরফের মত জমাট বেঁধে যাবে-চিরদিনের জন্য। তুমি কথা বলতে পারবে না। নড়াচড়া করতে পারবে না। এ যেন ভয়ের চোটে মৃত্যু, তবে এখানে তুমি মারা যাচ্ছ না! বেঁচে আছ!’
‘ঠিক আছে, একবার ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখি,’ বললাম আমি।
আমি বিলির কাঁধ চেপে ধরলাম। ‘এটা আমরা পরীক্ষা করে দেখব।’
আমার ধারণা লোরেন এবং ফ্রেডও একই কথা ভাবছিল। বিলির পার্কা এমনভাবে চেপে ধরেছি ও ধস্তাধস্তি করতে লাগল, মোচড় খাচ্ছে নিজেকে ছাড়াবার জন্য। কিন্তু আমরা তিনজনে মিলে ওকে তুলে ধরলাম। প্রথমে পা তুললাম তারপর সবচেয়ে উঁচু বরফের স্তূপের ওপর বসিয়ে দিলাম।
ও নড়াচড়া করার আগেই আমরা ওকে বরফ চাপা দিতে শুরু করলাম। বরফখণ্ডগুলো ছিল ভেজা এবং ভারি।
‘অ্যাই! তোমরা কী করছ?’ চেঁচাল বিলি।
‘তোমাকে স্লেম্যান বানাচ্ছি!’ বলল ফ্রেড।
খুব দ্রুত কাজ করছিলাম আমি। বড় বড় বরফের চাঙড় হাতে নিয়ে ওর গায়ে চাপা দিচ্ছিলাম।
‘আরে আমার কথা একটু শোনো!’ চিৎকার করছে বিলি। ‘আমি বদ্ধ জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না, জানোই তো। আরে-থামো না! এটা ইয়ার্কি নয়। আমার শরীর জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে। আমার ভীষণ ঠাণ্ডা লাগছে। আমাকে ছাড়ো! এখান থেকে বেরুতে দাও!’
আমরা তিনজন হেসে উঠলাম।
ওকে ভয় পেতে দেখে আমাদের বেশ ফূর্তি লাগছে। এরকম একটা মজার ব্যাপারে কেউ ভয় পায়?
‘বুদ্ধিটা তোমার,’ বললাম আমি। ‘তুমি একবার পরীক্ষা করে দেখবে না? তুমি দেখতে চাও না সত্যি ভয়ে বরফের মত জমাট বেঁধে যাও কিনা?’
‘না! না! চাই না!’ কেঁদে ফেলার জোগাড় বিলির।
‘তোমার কোন শেষ ইচ্ছা আছে?’ জিজ্ঞেস করল ফ্রেড।
‘হ্যাঁ। আমাকে এখান থেকে বের করো!’ গলা ফাটাল বিলি।
আমরা বরফ দিয়ে ওর মাথাটা ঢেকে দিলাম।
মাথার ওপরে গর্ত করে দিলাম যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে। লোরেন দুটো চমৎকার গোল পাথর পেয়ে গেল। এ দিয়ে চোখ বানানো যাবে। আর একটা ডাল বাঁকিয়ে নিল নাক বানাতে। ফ্রেড এবং আমি মিলে বরফটাকে এমন আকৃতি দিলাম দেখতে সত্যিকারের স্নোম্যান বা বরফমানরের মত লাগছিল। বরফের গায়ে চেপে চুপে ওটাকে আরও শক্ত করলাম। লোরেন তার স্কার্ফ খুলে বরফমানবের গলায় পরিয়ে দিল।
‘হাই, বিলি, ওখানকার আবহাওয়া এখন কেমন, ভাই?’ হাঁক ছাড়লাম আমি।
বিলি সাড়া দিল না।
আমরা তিনজন একটু পিছিয়ে গিয়ে নিজেদের শিল্পকর্মটি দেখতে লাগলাম মুগ্ধ চোখে।
‘চমৎকার হয়েছে!’ মন্তব্য করল লোরেন। আমরা আমাদের ভেজা, বরফ মাখানো তালু দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ‘হাই ফাইভ’ করলাম।
আমরা ভাবছিলাম বিলি এখুনি বরফের মূর্তি ভেঙে বেরিয়ে আসবে হুঙ্কার ছাড়তে ছাড়তে এবং আমাদের দিকে বরফ ছুঁড়ে মারবে।
কিন্তু সে এল না।
ওখানে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকল স্নোম্যানের মত। পাথুরে দুটো চোখ আমাদের দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
‘হেই, বিলি!’ আমি ডাক দিলাম।
নীরবতা। ‘বিলি? হ্যালো!’
দীর্ঘ, গা ছমছমে নিস্তব্ধতা।
‘বিলি?’ আবার হাঁক ছাড়লাম।
কোন জবাব নেই।
হেসে উঠল ফ্রেড। ‘ও আমাদেরকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে।’ আমার হাত ধরে টানল। ‘এসো, রিক। পাহাড়ে কতগুলো বাচ্চা আছে স্লেজ নিয়ে। চলো খেলি।
আমরা বরফের ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে ছোটার সময় একবার ঘাড় ঘুরিয়ে আমি পেছন ফিরে তাকালাম। বিলি এখনো আগের মতই দাঁড়িয়ে আছে। সে কীসের জন্য অপেক্ষা করছে?
‘হেই-আমেরিকান ফ্লায়ার্স!’ ফ্রেড কতগুলো বাচ্চার উদ্দেশে চেঁচাল। ‘আমাদের একটু খেলতে দেবে?’
.
আমরা কতক্ষণ স্লেজ নিয়ে খেলেছি ঠিক মনে নেই। বিকেলের সূর্য পশ্চিমে ডুব দিতে শুরু করেছে। লম্বা লম্বা নীল ছায়া পড়ছে বরফে। আমরা স্লেজগুলো বাচ্চাদের কাছে ফেরত দিলাম। লোরেন এবং ফ্রেড চলে গেল বাসায়।
হঠাৎ বিলির কথা মনে পড়ল আমার।
বরফে জমে যাওয়া থুতনি ঘষতে ঘষতে পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে লাগলাম আমি। দেখলাম বরফমানব ঠিক আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
ওহ, না! আমি ছুটে গেলাম ওটার কাছে। চিৎকার দিলাম, ‘বিলি? বিলি?’
আমরা ওর কথা একদমই ভুলে গিয়েছিলাম।
আমার নিঃশ্বাস আটকে এল গলায়। গোটা শরীর কেঁপে উঠল।
ও কি জমে বরফ হয়ে গেছে?
আমরা তো স্রেফ মজা করছিলাম। আমরা ওর মস্ত কোন ক্ষতি করে ফেলিনি তো?
না, প্লিজ-না!
আমি বরফমানবের মাথাটা চেপে ধরলাম। ‘বিলি? অ্যাই-আমার কথায় সাড়া দাও। তুমি কথা বলছ না কেন?’
কংক্রিটের মত জমে শক্ত হয়ে আছে বরফ। আমি পাগলের মত বরফের চাঙড় সরাতে শুরু করলাম।
‘বিলি? তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?’
সর্বত্র বরফ ছিটিয়ে ফেলছি আমি, স্নোম্যানের মুখের সামনের বরফ দ্রুত ভাঙছি। খাবলা মেরে বরফ তুলে ছুঁড়ে ফেলতে লাগলাম।
‘বিলি? হেই-বিলি?’
উন্মাদের মত আরও কিছু বরফ ছোটালাম গোলাকার দেহটি থেকে।
কিন্তু ভেতরে বিলি নেই।
টলতে টলতে পিছিয়ে এলাম। কোথায় গেল ও? জিজ্ঞেস করলাম নিজেকে, বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি মাটিতে পড়ে থাকা বরফের চাঙড়ের দিকে। ও স্লোম্যানের শরীর ভেঙে বের হয়নি। আমরা যেভাবে রেখে গিয়েছিলাম সেভাবেই পেয়েছি বরফমানবকে।
বরফ জল নামল আমার শিরদাঁড়া বেয়ে। কোটটা টেনে গায়ে জড়ালাম। কিন্তু কাঁপুনি বন্ধ হলো না তাতে।
ঠিক তখন আমার পেছন থেকে নরম, ফিসফিসে একটি কণ্ঠ ভেসে এল। ‘রিক-তুমি আমাকে জমাট করে ফেলেছ। তুমি আমাকে জমিয়ে বরফ করেছ!
‘না!’ আঁতকে উঠলাম আমি।
পাঁই করে ঘুরলাম। ‘কোথায় তুমি?’ ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলাম। ‘তোমাকে আমি দেখতে পাচ্ছি না!’
কোন শব্দ নেই।
শুধু বাতাসের শব্দ ছাড়া, গাছের ডালে বাতাস ঘষা খেয়ে নরম তুষার ফেলছে।
আবার শোনা গেল সেই ভৌতিক ফিসফিসানি। ‘তুমি আমাকে জমিয়ে বরফ করেছ!’
বিলি বেরিয়ে এল একটি গাছের আড়াল থেকে।
ও নিচু করে রেখেছে মাথা, এগিয়ে আসছে আমার দিকে। শরীরটা এক পাশে কাত হয়ে আছে, অদ্ভুত মন্থর গতিতে টলতে টলতে কদম ফেলছে।
তারপর ধীরে ধীরে ও মুখ তুলল-আমি দেখতে পেলাম ওর চেহারা। সারা মুখে বরফ। চুল, ভুরু সব বরফে মাখা। গাল এবং থুতনিতে ঝুলছে সুচালো বরফখণ্ড।
আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল ভয়ে প্রচণ্ড চিৎকার দেয়ার জন্য।
বিলি একইভাবে টলতে টলতে এগিয়ে আসতে লাগল আমার দিকে, মোজা পরা দুই হাত সামনের দিকে বাড়ানো। যেন আমাকে চেপে ধরবে। *রিক, তুমি আমাকে জমিয়ে বরফ করেছ। তুমি আমাকে বরফে জমিয়ে মেরে ফেলেছ!’
আমার দাঁতে দাঁত লেগে ঠকঠক শব্দ হতে লাগল। গোটা দেহে এবার যেন বরফের স্রোত বইছে। আমি ভয়ে বিস্ফারিত চোখে বিলির দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তারপর কী যেন একটা ভাঙার শব্দ পেলাম। আমার মস্তিষ্কের মধ্যে কিছু একটা ঘটছে। নরম, মৃদু ফট একটা শব্দ।
আমি শরীর নাড়াবার চেষ্টা করলাম। চিৎকার দিতে চাইলাম।
পারলাম না।
আমার পা, আমার হাত-নাড়াতে পারছি না। আমি মুখ খুলতে পারছি না চিৎকার দেয়ার জন্য। এমনকী চোখের পাতাও ফেলতে পারছি না।
আমি শুধু সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছি।
বিলি কাছিয়ে এল। আরও কাছে। ‘রিক-তোমার কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করল সে।
আমি ওকে দেখতে পাচ্ছি। ওর কথা পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু জবাব দিতে পারছি না। আমার ঠোঁট নাড়াতে পারছি না। গলা দিয়ে কোন শব্দ বেরুচ্ছে না।
তখন বিলির সেই কথাগুলো মনে পড়ে গেল…
‘তুমি এমন ভয় পেতে পারো, তোমার শরীর জমাট বরফের মত হয়ে যেতে পারে-চিরদিনের জন্য।
‘কামন রিক।’ বলল বিলি। ‘ঠাট্টা তামাশা অনেক হলো। আমি ঠিক আছি। ভাল করে দেখো। আমি নিজেই গায়ে মুখে বরফ মেখেছিলাম চেহারাটা ভীতিকর করে তোলার জন্য। দেখবে?’
সে গাল থেকে এক খণ্ড বরফ তুলে ফেলল।
‘রিক-রাগ কোরো না।’ বলল ও। ‘আমি ঠিক আছি। তোমরা চলে যাওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করছিলাম। তারপর বরফমানবের শরীর ভেঙে বেরিয়ে আসি। কোন সমস্যাই হয়নি। তোমরা তখন স্লেজ নিয়ে খেলতে ব্যস্ত। তাই দেখতে পাওনি যে আমি বেরিয়ে এসেছি। দেখনি যে স্নোম্যানকে আবার বানিয়েছি।’
‘আমি মূর্তিটা আবার বানাই,’ বলে চলল বিলি।
‘তারপর একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে অপেক্ষা করতে থাকি তোমাদের জন্য।’
সে আমার কাঁধে হাত রাখল। আমি ওর স্পর্শ পাচ্ছি কিন্তু নড়তে পারছি না। সে আমার মুখের সামনে হাত নাড়ল। কিন্তু আমার চোখের পাতা পড়ল না। আমি চোখ পিটপিট করতেও পারছি না। :
‘অ্যাই, রিক-তুমি দুষ্টামি করছ, তাই না?’ জিজ্ঞেস করল ও। ‘আরে, ভাই, কিছু তো বলো। আমার ঠাট্টাটা তোমার পছন্দ হয়নি? আমার কাছে তো দারুণ লেগেছে। আমি কি তোমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছি? কামন, রিক—তুমি কি আমাকে দেখে ভয় পেয়েছ?’
