ডাইনি-বিড়াল – অনীশ দাস অপু
ডাইনি-বিড়াল
টেনেসি পর্বতমালায় শীতের দিনগুলো হয় লম্বা এবং বিষণ্ণ তবে রাতগুলো দীর্ঘতর। পাহাড় ঘেরা গভীর এক উপত্যকার প্রত্যন্ত এক ফার্মে বাস করে ম্যাট। ওদের খামার বাড়িটি যেন আকাশের পটভূমে কুঁজো হয়ে বসে আছে।
এক রাতের বেলা। ম্যাট আর তার বাপ তাদের পড়শী জেব অ্যাডামসের সঙ্গে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে গল্প করছিল। জেব সস্ত্রীক ওদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। ম্যাটের মা এবং মিসেস অ্যাডামস অর্থাৎ জেবের স্ত্রী রান্নাঘরে ব্যস্ত।
‘আবার সেই সময় চলে এসেছে,’ বলল জেব। ‘ডাইনি- বিড়ালটা এ সময়েই শিকার খুঁজতে বেরোয়।
ম্যাট তার চোখের দৃষ্টি আগুন থেকে সরিয়ে নিল। প্রথমে জেব তারপর তার বাবার দিকে তাকাল। লক্ষ করল বাবা জেবকে ইশারায় চুপ করে থাকতে বলছেন।
‘ছেলেটার আসল ঘটনা জানা দরকার,’ বলল জেব।
‘বিশেষ করে আপনি এবং ওর মা যখন আগামী সপ্তাহে সেণ্ট ক্যাপিটালে যাচ্ছেন। ওর জানা উচিত ডাইনি-বিড়াল কী জিনিস।
এমন সময় ম্যাটের মা ঘরে ঢুকলেন মিসেস অ্যাডামসকে সঙ্গে নিয়ে। মহিলা তার ঝকঝকে সবুজ চোখ মেলে যেন ম্যাটের আপাদমস্তক জরিপ করে নিল।
‘বাড়ি যাওয়ার সময় হলো,’ ঘোষণা করল সে। ‘আপনারা রাজধানীতে রওনা হওয়ার দিন আমরা আসব ম্যাটকে নিয়ে যেতে।’
অ্যাডামস দম্পতি চলে যেতে ম্যাট তার বাবার সঙ্গে আস্তাবলে এল। ওর বাবা ওকে একটা নতুন কোল্ট ঘোড়া কিনে দিয়েছেন। ঘোড়াটাকে দানাপানি খাওয়াতে হবে। তাছাড়া ডাইনি-বিড়ালের গল্পটিও সে শুনতে চায়।
‘তোর মা চায় না এ গল্পটা তুই শুনিস, খোকা,’ বললেন ম্যাটের বাপ। ‘তবে জেব হয়তো ঠিকই বলেছে। তোর সব জানা থাকা দরকার। এই পাহাড়ি এলাকায় গড় কুড়ি বছর ধরে ঘুরঘুর করছে ডাইনি-বিড়াল। এটা নানান ছদ্মবেশ নিতে পারে। মহিলা থেকে রূপ নেয় প্রকাণ্ড, কালো বিড়ালে। তবে স্বাভাবিক আকারের বিড়াল নয়, শিকারি কুকুরের সমান বড় কালো বিড়াল। যারা এই ডাইনিটাকে দেখেছে তারা বলেছে রাতের অন্ধকারে ওটার চোখ ফুঁড়ে নাকি হলুদ আলো বেরোয় আর দাঁতগুলো লম্বা লম্বা, সুচালো। ডাইনি-বিড়াল গরু বাছুর হত্যা করে, এমনকী সুযোগ পেলে ঘোড়ার ওপরেও হামলা চালায়।’
ছোটখাট কোল্ট ঘোড়াটির দিকে ম্যাটকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে চুপ করে গেলেন ম্যাটের বাবা।
‘আমরা মাত্র দুইদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি,’ বললেন তিনি। ‘চিন্তা করিস না।’
ম্যাটের বাবা-মা যেদিন রওনা হলেন সেদিন মিসেস অ্যাডামস হাজির হলো। তবে সঙ্গে তার স্বামী নেই। ম্যাট শুনল জেব তার গরু বাছুরের পাল নিয়ে ভয়ানক ব্যস্ততার কারণে আসতে পারেনি। মিসেস অ্যাডামস বলল আজ রাতটা সে ম্যাটদের বাড়িতেই কাটাবে। কাল সে ম্যাটকে নিজেদের বাড়ি নিয়ে যাবে।
আইডিয়াটি পছন্দ হলো না ম্যাটের। কিন্তু বাবা-মা যেহেতু চলে গেছেন কাজেই এ ব্যাপারে কোন আপত্তি করেও লাভ হবে না। সে সারাদিন নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকল। রাতের বেলা ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বেলে নিয়ে তার সামনে বসল। তাকে সঙ্গ দিতে এগিয়ে এল মিসেস অ্যাডামস। মার্চ মাস। প্রবল উত্তুরে হাওয়া বইছে শনশন শব্দে। ভীষণ শীত।
‘ডাইনি-বিড়ালের কথা শুনেছ?’ হঠাৎ বলে উঠল মিসেস অ্যাডামস। ‘আবার ওটা শিকারে নেমেছে।’
‘কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল ম্যাট। আশা করল ওর গলার কাঁপুনিটা টের পায়নি মহিলা।
‘পেপার হিলের ধারে ওটাকে গত রাতে দেখা গেছে, জবাব দিল মিসেস অ্যাডামস। ‘একটা বাছুর মেরেছে।’
শিউরে উঠল ম্যাট, উলের সুয়েটারটা ভাল করে টেনে নিল গলায়। আস্তাবলে ছোট কোল্টটার কথা মনে পড়ছে।
মিসেস অ্যাডামস হাই তুলতে লাগল। হাত পা টানটান করল। বলল তার ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাতে যাবে। কিন্তু মহিলার চোখ দুটো দেখে ম্যাটের মোটেই মনে হলো না তার ঘুম পেয়েছে। ক্লান্ত, নিদ্রালু চক্ষু নয়, বরং চকচক করছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও আগুনের ওম ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ম্যাট। বিছানায় যাবে।
দোতলায় নিজের ঘরে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছে ম্যাট, পেছন থেকে তাকে চোখ দিয়ে অনুসরণ করল মিসেস অ্যাডামস। কিছুক্ষণ পরে ম্যাট শুনতে পেল তার বাবা-মার বেডরুমের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ওখানেই ঘুমাবে মিসেস অ্যাডামস।
অসংখ্য ভেড়া গুনেও ঘুম এল না ম্যাটের চোখে। বাইরে গোঙাচ্ছে শীতের বাতাস, আক্রোশ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে জানালার শার্সিতে, কাঁপিয়ে তুলছে থরথর করে। তারপর রাতের আঁধার চিরে যে শব্দটি শুনতে পেল ম্যাট, ওর রক্ত জমাট করে দিল।
ম্যাও ম্যাও করে ডাকছে বিড়াল। এমনই উচ্চকিত শব্দ বাতাসের আর্তনাদ ছাপিয়েও শোনা যাচ্ছে। ম্যাও __ দিচ্ছে। কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় উঠে বসল ম্যাট কনুইয়ে ভর দিয়ে। গোলাঘরের দিকে মুখ করা কামরার ছোট জানালা দিয়ে তাকাল বাইরে।
চাঁদের আলোয় পরিষ্কার দেখা গেল ইয়া বড় এক কালো বিড়ালের ছায়ামূর্তি। ম্যাট দোতলার ঘর থেকে ওটাকে দেখছে। হয়তো ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা টের পেয়েই ঘাড় ঘুরিয়ে সরাসরি ওর দিকে তাকাল কালো বিড়াল। চাঁদের আলোয় ওটার হলুদ চোখ জ্বলজ্বল করছে। কালো বিড়াল কিছুক্ষণ ম্যাটের দিকে তাকিয়ে থেকে ঘুরল। পা বাড়াল আস্তাবলে।
কোল্ট। ম্যাট সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলল কালো বিড়ালটার মতলব কী। ওটা কোল্ট ঘোড়াটাকে চায়। লাফিয়ে বিছানা ছাড়ল ম্যাট। দ্রুত কাপড় আর বুট পরে নিল। সিঁড়ি দিয়ে হুড়মুড় করে নামার সময় মিসেস অ্যাডামসের নাম ধরে ডাকতে লাগল। কিন্তু মহিলার কোন সাড়াশব্দ নেই।
এমন সময় ম্যাট শুনতে পেল তীক্ষ্ণ স্বরে কিচকিচ করে উঠেছে ডাইনি-বিড়াল। আস্তাবলের অনেক কাছে এসে পড়েছে। ম্যাট গায়ে জ্যাকেট জড়িয়ে বড় হান্টিং নাইফটা দরজার কাছ থেকে তুলে নিল। এই মস্ত শিকারি ছুরিটি ম্যাটের বাবা ওকে দিয়েছেন। ছুরিটি শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে দরজা খুলল ও।
গোলাঘর দিয়ে আস্তাবলের দিকে চলেছে ম্যাট, মার্চের হিমশীতল হাওয়া চাবুক কষাল নাকে মুখে। আরও কয়েক কদম এগোতে সে দেখতে পেল আস্তাবলের দরজা খোলা। গলায় উঠে আসা ভয়ের দলাটি সে জোর করে গিলে ফেলল এবং পা টিপেটিপে ভেতরে প্রবেশ করল।
কোল্টের খোঁয়াড়ে, একটি জানালা দিয়ে উজ্জ্বল চাঁদের আলো আসছে। ম্যাট দেখল ঘোড়াটি এক কোণে কুঁকড়ে __ আছে। তার সামনে বিশালাকার ডাইনি-বিড়াল। ধারাল শ্বদন্ত।
ডাইনি-বিড়াল সামনে লাফ দিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ খেলে গেল ম্যাটের দেহে। সে শিকারি ছুরিটি বাগিয়ে ধরে ঝড়ের গতিতে ছুটে গেল ডাইনি-বিড়ালের দিকে। ঝড়াং করে এক কোপ বসিয়ে দিল ওটার ডান থাবায়। ফিনকি দিয়ে বেরুল রক্ত। ডাইনি-বিড়াল ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল পিছিয়ে এল ম্যাট। ডাইনি-বিড়ালের কাটা থাবা দিয়ে ঝরঝর করে রক্ত ঝরে আস্তাবলের মেঝেয় রক্তের পুকুর তৈরি করছে।
ডাইনি-বিড়াল হিসহিস শব্দ করতে করতে, খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে গেল আস্তাবল থেকে। ওটা চলে যেতে ম্যাট তার প্রিয় ঘোড়াটিকে ঝুঁকে আদর করে দিল। মেঝেয় রক্ত দেখে ঘেন্নায় নাক মুখ কুঁচকে খড় দিয়ে ঢেকে দিল রক্ত।
হঠাৎ ঠাণ্ডা এবং ভয়ে শরীর কেঁপে উঠল ম্যাটের। বাসায় ফিরে লেপের তলায় ঢুকতে খুব মন চাইছে। সে আস্তাবলের দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি লাগিয়ে দিল। তারপর গোলাঘরের ছায়া উপেক্ষা করে ছুট দিল বাড়ির দিকে। রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করার সময় মনে পড়ল সে ভুলে আস্তাবলে হান্টিং নাইফটা রেখে এসেছে।
ফায়ারপ্লেসের কাছ থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ শুনে ওদিকে তাকাল ম্যাট। দেখে মিসেস অ্যাডামস বসে আছে লেলিহান অগ্নিশিখার সামনে। তার মুখ দিয়ে অদ্ভুত হিসহিস আওয়াজ হচ্ছে। আগুনের আলোয় চোখ দুটি মনে হচ্ছে জ্বলজ্বলে হলুদ এক জোড়া বৃত্ত
আর তখন ম্যাটের নজর গেল মিসেস অ্যাডামসের ডান হাতের দিকে। তার ডান হাত দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরে ভিজিয়ে দিচ্ছে খামার বাড়ির মেঝে!
