বাবা – অনীশ দাস অপু
বাবা
বাবা আমাকে কখনোই ছাড়বে না।
বাবা বলে বাবা আমার জন্য আসবে; বলে মা আমাকে তার কাছে চিরদিনের জন্য রেখে দিতে পারবে না। বাবা ফিরে আসবে ক্যাণ্ডি এবং খেলনা নিয়ে। তারপর আমরা দু’জনে মিলে চলে যাব সাগরতীরের জঙ্গলে যেখানে পশুপাখিরা কথা বলে আর করাতিরা তোমার দিকে তাকিয়ে হাসবে কারণ তুমিও ওখানে থাকবে বলে তারা খুব খুশি।
জানি বাবা আর মা কেন আর একে অপরকে দু’চক্ষে দেখতে পারে না। অনেকদিন ধরেই তারা একে অন্যের চোখের বিষ। আমার খুব ছোটবেলায় তাদের মধ্যে অবশ্য ভাব ছিল তবে একটু বড় হওয়ার পরে দেখেছি তারা একজন আরেকজনকে একদমই পছন্দ করে না।
বাবাকে একবার বলতে শুনেছি মা তাকে ঘৃণা করে এবং আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম বাবাও মাকে ঘৃণা করে কিনা, বলল জানে না। তার মানে বাবা মাকে ঘৃণা করে। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি তারা একে অপরকে যখন এতটাই ঘৃণা করে তাহলে আমাকে পছন্দ করে কীভাবে।
আমি এ কথাটা জানতে চাইলে বাবার মুখটা কেমন __ হয়ে যায়। তবে এখনো সে এ প্রশ্নের জবাব দেয়নি আমাকে।
আমার বাবা পেশায় কাঠমিস্ত্রি। বাবা কাঠ দিয়ে কেবিনেট, চেয়ার-টেবিলসহ আরও অনেক কিছুই বানায়। কখনো কাঠের খেলনা তৈরি করে। হাঁস, কুকুর, মুরগির বাচ্চা। ওগুলোর পায়ে চাকা লাগানো। ফলে ঠেলা দিতেই গড়গড় করে চলতে থাকে। আর চাকায় ধাতব একটি জিনিস লাগানো বলে অদ্ভুত একটা শব্দও হয়। বাবা আমাকে এসব জিনিস অনেক বানিয়ে দিয়েছে। খেলনাগুলো নানান রঙে রাঙানো: লাল, নীল, হলুদ এবং সবুজ। গা দিয়ে দারুণ গন্ধ আসে। পাইন গাছের গন্ধ।
মা বলে বাবা নাকি তাকে কোথাও যেতে দেয় না, ঘর বন্দি করে রাখে। মা চাইলে নিজের ইচ্ছে মত কিছু করতে পারে না, মজা করতে পারে না। বাবা চায় মা সবসময় ঘরে থাকবে এবং সারাক্ষণ ঘরকন্না করবে। মা বলে পরিবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু নিজের জীবন বলেও তো একটা কিছু আছে।
মায়ের কথা আমি ঠিক বুঝতে পারি না। তবে মা চোখমুখ শক্ত করে এ ধরনের কথা বলে।
একদিন মা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় বাবা এসে হাজির। মাকে হুকুম দিল মা কোথাও যেতে পারবে না। বন্দুক বের করে গাড়ির সামনে গুলি করল। রেডিয়েটর দিয়ে কেমন অদ্ভুত শব্দ বেরুচ্ছিল। বাবা বলল এখন কেউ আর কোথাও যেতে পারবে না।
কয়েকদিন পরে শুনলাম বাবা আর মায়ের খুব ঝগড়া হচ্ছে। ড্যাডি নিশ্চয় মাকে থাপ্পড় মেরেছিল কারণ মা হাউমাউ করে কাঁদছিল। মাকে মারা বাবার মোটেই উচিত হয়নি। আমি নিজের ঘরে বসে ভান করছিলাম যেন শুনতে পাইনি। আমি কাঠের খেলনাগুলো নিয়ে খেলছিলাম, জোরে জোরে গাড়ি চালাচ্ছিলাম যাতে বেশি বেশি শব্দ হয়।
বছর খানেক আগে মা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তার এক বন্ধু এসে তাকে নিয়ে যায়। তারপর পুলিশ এসে বাবাকে বলে যায় বাবা যেন মাকে আর বিরক্ত না করে।
বাবা পুলিশের লোকটির কথা শুনে হাসছিল। কেন হাসছিল আমি জানি না। কারণ পুলিশম্যান তো কোন হাসির কথা বলেনি।
কিছুক্ষণ পরে মা এবং পুলিশম্যানটি এসে আমাকে নিয়ে যায়। আমি যেতে চাইনি। বাবাও আমাকে ছাড়তে চায়নি। কিন্তু পুলিশম্যান বলে আমাকে যেতেই হবে। তার কাছে নাকি ‘অর্ডার’ আছে। তার মানে সে ওই হুকুম তামিল করতে বাধ্য।
তখন বাবা বলে সে আমার জন্য ফিরে আসবে। বলে যে মা আমাকে তার কাছ থেকে বেশিদিন দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না। বাবা আমাকে কখনোই ছাড়বে না। ওদের কাছে কাঠের অনেক সুন্দর সুন্দর খেলনা ড্যাডি দিয়ে দেয় যেগুলো আমার জন্য তৈরি করা হয়েছিল-খেলনা সিন্দুক, কাঠের হাঁস, কাক, খরগোশ এবং একটি বড়সড়, চকচকে কাঠের কেবিনেট। খুবই সুন্দর জিনিস। ওগুলোর গা থেকে পাইনের ঘ্রাণ আসছিল।
মা প্রথমে ওগুলো নিতে চায় নি। কিন্তু আমি কাকুতি মিনতি করতে জিনিসগুলো নেয়ার অনুমতি মেলে।
মা’র সঙ্গে থাকতে আমার ভাল্লাগছিল না। তার নতুন বন্ধুকে আমার মোটেই পছন্দ হয়নি। লোকটা খুব একটা সুবিধের নয়।
মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি বাবা আমাকে এখান থেকে নিয়ে গেছে, জঙ্গলে কাঠুরেদের সঙ্গে আমরা বাস করছি। তাহলে কত মজা হত।
আমি অনেকদিন ধরেই মা’র বন্ধুর বাড়িতে আছি।
মা ইদানীং বলছে বাবার নাকি কী হয়েছে। খুব খারাপ কিছু। আমি অনেক দিন তার কথার মানে বুঝতেই পারিনি। মা বলে বাবা নাকি তার বন্ধুর দিকে বন্দুক তাক করে ধরেছিল। তারপর বাড়িতে পুলিশ এসেছিল। তারপর আমি মায়ের কথার অর্থ বুঝতে পারলাম।
মা বলল আমার বাবা মারা গেছে।
আমি অনেক কান্নাকাটি করলাম, মন খারাপ করলাম। কারণ আমি জানতাম মা আমাকে মিথ্যা কথা বলছে। বাবার সঙ্গে যাতে আমার আর দেখা না হয় তাই মা ওসব কথা বানিয়ে বানিয়ে বলছে। তবে বাবা আর আমি মা এবং তার বন্ধুর চেয়ে অনেক বেশি চালাক।
তাই তো বাবা আমার সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করতে আসে।
মাঝে মাঝে বাবা ভেতরে ঢোকে না…শোবার ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে আমি ঠিক আছি কিনা। চাঁদের আলোয় তার মুখ চকচক করে।
মাঝে মাঝে আমি আমার কাঠের কেবিনেটটি খুলি। ওখানে বাবা জামাকাপড়ের স্তূপের মত লুকিয়ে থাকে। আমার সাড়া পেয়ে কাপড়ের আড়াল থেকে এমনভাবে উঁকি দেয়, তার চেহারা দেখে সত্যি হাসি পেয়ে যায়।
মাঝে মাঝে বাবাকে দেখি কাঠের কাকটার মধ্যে লুকিয়েছে। আমি কাক গাড়িটাকে ঠেলি, বাবা হাসে।
মাঝে মধ্যে সিন্দুক থেকে লাফ মেরে বেরিয়ে আসে আমার বাবা। আমি প্রথমে দারুণ ভয় পেয়ে যাই। তবে পরক্ষণে বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে।
তার গা থেকে মিষ্টি একটা গন্ধ আসে। পাইন গাছের মত।
মাঝে মাঝে রাতের বেলা কেবিনেট থেকে ফিসফিসিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলে, মা আমাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়ার পরপর। এই সময়টি আমার সবচেয়ে ভাল্লাগে। তার গলার স্বর বাতাসের মত শোনায়, যেন গাছে শনশন হাওয়া বইছে, নড়ে উঠছে পাতা।
মা বলছে সে শীঘ্রি এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাবে। কিন্তু আমি জানি তা কখনোই ঘটবে না। কারণ বাবা আমাকে ছাড়বেই না। আমাকে কোথাও যেতে দেবে না।
প্রথম প্রথম বাবাকে আমি এসব জায়গায় দেখতাম: জানালায়, কেবিনেটে। পরে তাকে আমি সব জায়গায় দেখতে শুরু করি।
তাকে আমি দেখি লিভিংরুমের ঘড়িতে যখন ওটা সন্ধ্যা ছয়টার ঘণ্টা বাজায়। সংখ্যাগুলোয় বাবার চোখ দেখতে পাই আমি।
আমি বাবাকে দেখতে পাই কাপড়চোপড়ের মধ্যে যেগুলো মা লণ্ডিরুম থেকে নিয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে ওখানে আমি বাবার সাদা হাত দেখতে পাই।
বিটের প্লেটের নিচে বাবার লম্বা জিভ দেখতে পাই আমি। বারান্দার ধারে ঝোপের ধারে বাবাকে দেখি আমি: বাবার মাথা।
ক’দিন আগে মা এবং তার বন্ধু বলল আমরা দু’একদিনের মধ্যেই এ বাড়িটি ছেড়ে চলে যাব। কিন্তু আমি জানি বাবা ওদেরকে আমাকে নিয়ে যেতে দেবে না।
মা এবং তার বন্ধু বেসমেন্টে গেল কয়েকটি বাক্স আনতে। ওতে জিনিসপত্র ভরবে। হঠাৎ তাদের তীব্র চিৎকার শুনতে পেলাম। আমি জানি বাবা ওখানে গেছে। মা আর তার বন্ধুকে আর কোনদিন বেসমেন্ট থেকে উপরে উঠে আসতে দেখিনি আমি।
মাঝে মাঝে ভাবি আমি আর বাবা কেন ওই করাতিদের সঙ্গে থাকতে গেলাম না। তাহলে খুব ভাল হত। ড্যাডির পক্ষে হয়তো এখন কাজটি করা সম্ভব নয়।
সবকিছু দিয়েই এখন পাইনের মিষ্টি গন্ধ আসছে।
মাঝে মধ্যে আমার ইচ্ছে করে বাইরে গিয়ে খেলতে। কিন্তু আমি দরজা কিংবা জানালা কোনটাই খুলতে পারি না। বাবা আমাকে খুলতে দেবে না। আর অনেকদিন ধরে আমি না খেয়ে আছি। আমি খুব দুর্বল হয়ে পড়ছি। পাইন গাছের তীব্র গন্ধ আমাকে আরও অসুস্থ করে ফেলছে।
আমার ধারণা বাবা হয়তো ভয় পেয়েছে আমার কিছু হয়ে যাবে। তাই বাবা আমার খুব কাছে কাছে থাকছে এখন। আমি বাড়ির সর্বত্র বাবার কালো জ্বলজ্বলে চোখ আর মুখখানা দেখতে পাই: ওয়ালপেপারে, গাঢ় নীল রঙের কার্পেটে এবং ছাতে। সব জায়গায় বাবা হামাগুড়ি দিচ্ছে। তার গন্ধ পাই আমি সব জায়গায়। বাবা আমাকে অনেক ভালবাসে।
বাবা আমাকে কখনোই ছাড়বে না।
