ফেরা – অনীশ দাস অপু
ফেরা
লণ্ডনে মিসেস ড্রোভারের আজ শেষ দিন। তাই অবরুদ্ধ বাড়িটিতে এসেছেন নিজের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র নিয়ে যেতে। কিছু জিনিস তাঁর নিজের, কিছু পরিবারের। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা এখন গ্রামের বাড়িতে।
আগস্টের শেষাশেষি। সারা দিন আজ থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। বিকেলের হলুদ আলোতে পেভমেন্টের পাশের গাছের পাতা ঝলমল করছে। আকাশের এক কোণে জমতে শুরু করেছে কালো মেঘ, সম্ভবত আবারও বৃষ্টি নামবে।
যে রাস্তা ধরে বাড়িতে ঢুকেছেন মিসেস ড্রোভার, একসময় এখানে নিত্য পদচারণা ছিল তাঁর। বহু বছর পর আবার এসেছেন পরিত্যক্ত বাড়িটিতে। তবে পরিত্যক্ত বলতে একজন পার্টটাইম কেয়ারটেকার বাড়িটির দেখাশোনা করে। সে আজ বাসায় নেই। দরজা ভেজানো ছিল, খুলতেই সোঁদা গন্ধ নিয়ে হাওয়া ধাক্কা দিয়েছে মিসেস ড্রোভারকে। বড় জানালাটি খুলে দিলেন আলো-বাতাসের জন্য।
বাড়ির সবকিছু আগের মতই আছে। সাদা মার্বেল পাথরের ম্যান্টল পিস, লেখার টেবিলের ওপর সেই ফ্লাওয়ার ভাসটা আগের মতই আছে; ওয়াল পেপারের দাগগুলো এখনো অম্লান। তেমন ধুলোটুলো পড়েনি কোনটিতেই। ভেন্টিলেশন বলতে সেই চিমনিটা আছে। ড্রইংরুমটাকে ঠাণ্ডা উনুনের মত মনে হলো মিসেস ড্রোভারের। টেবিলের ওপর পার্সেলগুলো রাখলেন তিনি, পা বাড়ালেন সিঁড়িতে; তাঁর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বেডরুমের সিন্দুকে।
পার্টটাইম কেয়ারটেকার গেছে ছুটিতে, আজও ফেরেনি। তবে লোকটা যে তাঁর বাড়ির যত্ন-টত্ন নেয় না দেখেই বোঝা যায়। দেয়ালের কয়েক জায়গায় ফাটল, সর্বশেষ বোমা বর্ষণের চিহ্ন।
হলঘরে এক ফালি আলো এসে পড়েছে। ওদিক দিয়ে যাবার সময় থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন মিসেস ড্রোভার। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন টেবিলের দিকে। একটা চিঠি। খামের ওপর তাঁর নাম লেখা।
মিসেস ড্রোভার প্রথমেই ভাবলেন কেয়ারটেকার লোকটা হয়তো এসেছিল, চিঠিটি রেখেই গেছে। অবশ্য কেয়ারটেকার জানে না যে তিনি লণ্ডনে আসবেন। সে চিঠিটি তাঁর নামে পোস্ট করতে পারত। তা না করে গাফিলতির চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধুলোর মধ্যে চিঠিটি ফেলে রেখেছে। চরম বিরক্ত হলেন মিসেস ড্রোভার। খামটি তুলে নিলেন। খামের ওপর কোন ডাক টিকেট নেই। ওটা নিয়ে সোজা দোতলায় চলে এলেন তিনি, বেডরুমে। ঘরটা বাগানের দিকে মুখ ফেরানো। সূর্য অস্ত গেছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা বেড়ে গেছে আরও, রীতিমত অন্ধকার হয়ে আসছে। আলো জ্বাললেন মিসেস ড্রোভার। তারপর খামের মুখ ছিঁড়ে বের করলেন চিরকুট। তাঁকে উদ্দেশ্য করেই লেখা। তিনি পড়তে শুরু করলেন:
প্রিয় ক্যাথেলিন,
তুমি নিশ্চয়ই জানো আজ আমাদের অ্যানিভার্সারী ডে। বছরগুলো পেরিয়ে গেছে কখনো দ্রুত, কখনো মন্থর গতিতে। তবু মনে হয় কিছুই বদলায়নি। তুমি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, সে বিশ্বাস আমার ছিল। তুমি লণ্ডন ছেড়ে চলে গেলে খুব দুঃখ পেয়েছিলাম, তবে ঠিক সময়ে ফিরে এসেছ বলে খুশিও হয়েছি। তোমার সাথে আমার দেখা হবে নির্ধারিত সময়েই।
ততক্ষণ পর্যন্ত…..
কে.
তারিখটা লক্ষ করলেন মিসেস ড্রোভার। আজকের তারিখ। বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেললেন তিনি চিঠিটি, তারপর আবার তুলে নিয়ে পড়লেন। তাঁর প্রসাধনী চৰ্চিত ওষ্ঠযুগল সাদা হয়ে গেল। বুঝতে পারছেন চেহারায় ভাঙচুর শুরু হয়ে গেছে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। তাঁর বয়স চুয়াল্লিশ, মাথার হ্যাটটা অবহেলায় কপালের ওপর টানা, গালে পাউডার বোলাতে ভুলে গিয়েছিলেন। সরু গলায় স্বামীর দেয়া মুক্তোর হার ঝুলছে, গলাটা বেশি চিকন লাগছে। পরনে গোলাপি রঙের উলেন জাম্পার, তাঁর বোনের দেয়া। সহজে ভেঙে পড়ার পাত্রী তিনি নন। তবে চিঠিটি তাঁকে দারুণ ভাবিয়ে তুলেছে। আয়নায় নিজের উদ্বিগ্ন চেহারা দেখতে পাচ্ছেন মিসেস ড্রোভার। আয়নার সামনে থেকে সরে এলেন তিনি, সিন্দুকটার দিকে এগোলেন। ওটার ভেতরেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আছে।
সিন্দুক খুলে জিনিসগুলো খুঁজছেন, আবার দৃষ্টি চলে গেল চিঠিটির দিকে। হঠাৎ গির্জার ঘড়ি ঢং ঢং শব্দে দুটো বাজার কথা ঘোষণা করল। এদিকে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আঁতকে উঠলেন মিসেস ড্রোভার। ‘নির্ধারিত সময়…মাই গড়,’ বিড়বিড় করলেন তিনি। ‘কীসের নির্ধারিত সময়? কিন্তু আমি কীভাবে…? পঁচিশ বছর পর…
পঁচিশ বছর আগের ঘটনা। ক্যাথেলিন নামের এক তরুণী প্রেমে পড়ে যায় এক তরুণ সৈনিকের। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। এক সন্ধ্যায় প্রেমিকটি বিদায় নিয়ে যাচ্ছিল তার প্রেমিকার কাছ থেকে। বলছিল, ‘আবার ফিরে আসব আমি। আজ হোক, কাল হোক। তোমার সাথে আবার সাক্ষাৎ হবে আমার। তুমি আমার জন্য অপেক্ষা কোরো।’
কিন্তু সে আর ফিরে আসেনি। অপেক্ষা করেছিল ক্যাথেলিন। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরেও প্রেমিকের দেখা না পেয়ে পরিবারের চাপে বিয়ে করে সে জনৈক উইলিয়াম ড্রোভারকে। ক্যাথেলিন হয়ে যায় মিসেস ড্রোভার। কেনসিংটনের নির্জন এই বাড়িতে একসময় সুখের সংসার গড়ে তোলে ওরা। সন্তানের মুখ দেখে। ছেলেমেয়েরা এখানেই বড় হয়েছে। তারপর শুরু হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সবাই পালিয়ে গেল গ্রামে, বোমার ভয়ে। তারপর আর ফিরে আসার তাগিদ অনুভব করেনি কেউ যুদ্ধবিধ্বস্ত পুরনো বাড়িতে।
.
…আবার বাস্তবে ফিরে এলেন মিসেস ড্রোভার। চোখ বুজে রইলেন কয়েক সেকেণ্ড। চিঠিটি অস্বীকার করতে চাইল মন। ভাবতে চাইলেন ওটা স্রেফ কল্পনা। কিন্তু চোখ মেলে চাইতেই ওটাকে বিছানার ওপর দেখতে পেলেন তিনি।
চিঠিটি পাঠিয়ে কেউ তাঁকে ভয় দেখাতে চেয়েছে। কে সে? কারো তো জানার কথা নয় আজ তিনি এ বাড়িতে আসরেন। কেয়ারটেকার যদি আজ বাসায় আসত, সেও চিঠিটি সে ডাকঘরে নিয়ে মিসেস ড্রোভারকে পোস্ট করে দিত। তবে কেয়ারটেকার যে আসেনি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। তাহলে চিঠিটি হলঘরে এল কী করে? ওটার তো পা বা পাখা নেই যে হেঁটে বা উড়ে এসে টেবিলে বসে থাকবে। নিশ্চয়ই ওটাকে কেউ নিয়ে এসেছে-কিন্তু কেয়ারটেকার ছাড়া আর কারো কাছে চাবি থাকে না। অবশ্য চাবি ছাড়াও ঘরে ঢোকা – যায়, চিন্তাটা আসতে মন খচখচ করতে লাগল। এর মানে এটাই হতে পারে-তিনি আর একা নন। নিচতলায় অপেক্ষা করতে হবে তাঁকে চিঠির মালিকের জন্য। অপেক্ষা করতে হবে—কতক্ষণ? যতক্ষণ না ‘নির্ধারিত সময়’ আসে। তবে সে সময়টা বোধহয় ছ’টা নয়-ছ’টা তো বেজেই গেছে।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন মিসেস ড্রোভার, দরজা বন্ধ করলেন।
এখান থেকে যেতে হবে তাঁকে। ট্রেন ধরতে হবে। আগে ট্যাক্সি ডাকা দরকার। কারণ এত মালামাল নিয়ে হেঁটে রেল স্টেশনে যাওয়া সম্ভব নয়। মনে মনে আওড়ালেন মিসেস ড্রোভার: আমি এখন ফোন করে ট্যাক্সি ডাকব। ট্যাক্সি হয়তো সাথে সাথে আসতে পারবে না। তবে ট্যাক্সির সাড়া না পাওয়া পর্যন্ত হলঘরে পায়চারি করে বেড়াব।
কিন্তু ফোন করতে গিয়ে দেখলেন লাইন কাটা। ঘাম ফুটল মিসেস ড্রোভারের কপালে। বিচলিত বোধ করছেন।
আমি কেন ওর কথা ভাবব, ভাবলেন তিনি। ও তো কখনো আমার প্রতি সদয় ছিল না। মা বলত আমাকে সে কখনোই ভালবাসেনি। সে তার প্রয়োজনে আমাকে ব্যবহার করেছে-ওটাকে ভালবাসা বলে না। আমাকে দিয়ে সে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিল কি? আমার ঠিক মনে পড়ছে না-কিন্তু ঠিকই মনে পড়ছিল তাঁর। তবে মনে পড়লেও তিনি ভুলে থাকতে চাইলেন সেই মুখখানা। সিদ্ধান্ত নিলেন এক্ষুণি বেরিয়ে পড়বেন।
ঘর থেকে ক’পা এগুলেই একটা স্কোয়ার। ওটা মিশেছে মূল রাস্তার সাথে। রাস্তায় নিশ্চয়ই ট্যাক্সি পাওয়া যাবে। আর একবার ট্যাক্সিতে উঠতে পারলে তাঁর আর ভয় করবে না।
দরজা খুললেন মিসেস ড্রোভার, সিঁড়ির ধারে দাঁড়ালেন, কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করছেন।
কিছুই শুনতে পেলেন না তিনি, শুধু এক পশলা শুকনো হাওয়া ঝাপটা মেরে গেল মুখে। শিউরে উঠলেন তিনি। বাতাসটা এসেছে বেযমেণ্ট থেকে; কেউ হয়তো ওখানকার কোন দরজা বা জানালা খুলেছে ঘর থেকে বেরুবার জন্য। ·
থেমে গেছে বৃষ্টি, চকচক করছে পেভমেণ্ট। সদর দরজা দিয়ে সাবধানে শূন্য রাস্তায় পা রাখলেন মিসেস ড্রোভার। বিপরীত দিকের বাড়িগুলোতেও লোকজন থাকে না, খাঁ খাঁ করছে, ভাঙা কাঠামো নিয়ে যেন কটমট করে তাকিয়ে মিসেস ড্রোভারের দিকে।
সামনে পা বাড়ালেন তিনি, পেছন ফিরে তাকাবেন না পণ করেছেন। রাস্তাটা এমন নির্জন, ছমছম করে উঠল গা। যুদ্ধের ভয়ে সবাই পালিয়েছে। স্কোয়ারের শেষ মাথা যেখানে মিলেছে চৌরাস্তার সাথে, দুটো বাস দেখলেন মিসেস ড্রোভার। পাল্লা দিয়ে ছুটছে। রাস্তায় লোকজন দেখা গেল। জীবনের চিহ্ন। ফোঁস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি।
চৌরাস্তার মোড়ে ট্যাক্সি স্ট্যাণ্ড, তবে একটা মাত্র ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারের দিকে তাকালেন না পর্যন্ত, লাফ মেরে উঠে পড়লেন মিসেস ড্রোভার। ঠিক তখন গির্জার ঘড়িতে সাতটা বাজার ঘণ্টা ধ্বনি শোনা গেল। মেইন স্ট্রিটের দিকে মুখ করে ছিল ট্যাক্সিটা, তাঁকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে হলে ঘুরতে হবে-কিন্তু মিসেস ড্রোভার কিছু বলার আগেই চলতে শুরু করল যন্ত্রযান। যাত্রী আর ড্রাইভারকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে যে গ্লাস প্যানেলটা ওটার ওপর ঝুঁকলেন বিরক্ত ড্রোভার, অধৈর্য ভঙ্গিতে টোকা দিয়ে ড্রাইভারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।
প্রায় সাথে সাথে ব্রেক কষল ড্রাইভার, মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। যাত্রী এবং ড্রাইভারের মাঝে বাধা সৃষ্টি করে থাকল গ্লাস প্যানেল, তবে ওরা পরস্পরকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, চোখে চোখে চেয়ে আছে।
মিসেস ড্রোভারের মুখ হাঁ হয়ে গেল, চিৎকার দিতে যাচ্ছেন। গ্লাসের অপর দিকে হিমশীতল দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে তাঁর প্রেমিক, যে মারা গেছে বলেই জানেন মিসেস ড্রোভার।
মিসেস ড্রোভার গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিচ্ছেন, মুখ ঘোরাল ড্রাইভার, ফুল স্পিডে ছুটল ট্যাক্সি। তবে মেইন স্ট্রিটের দিকে নয়। কেনসিংটনে মিসেস ড্রোভারের পরিত্যক্ত বাড়ির দিকে। রাস্তাটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে একটা গভীর খাদে, সেদিকেই তীর বেগে ছুটছে ট্যাক্সি।
