আঁধারের শক্তি – ১
এক
শহরের শেষ প্রান্তে অক্সফোর্ডের পুরনো কলেজ অঞ্চল। এখানে একটি পুরনো বাড়ি আছে। নাম মিনার হাউস। বাড়িটির সর্বাঙ্গে বয়সের ছাপ। বিশাল দরজার পাল্লা দুটি হেলে পড়েছে। বাড়ির খিলানগুলো ভাঙা। আইভিলতার পুরু আস্তরণ ঢেকে ফেলেছে পুরনো বাড়ির মিনার।
নিচতলা থেকে একটা সর্পিল সিঁড়ি উঠে গিয়েছে উপরের দিকে। দোতলা, তিনতলা এবং চারতলায় সিঁড়ির মুখোমুখি দুটি ঘর। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্রের বাস ওখানে। নিরিবিলিতে পড়াশুনা বা গবেষণার জন্য এ __ চমৎকার।
চারতলায় চারতলায় থাকে অ্যাবারক্রোম্বি স্মিথ, এডওয়ার্ড বেলিংহ্যাম, দোতলায় উইলিয়াম মল্কহাউস লী আর. একতলায় বুড়ো চাকর টমাস স্টাইলাস। সে ঘরদোর পরিষ্কার রাখে, উপরের তিন তলার বাসিন্দাদের রান্নাবান্না করে দেয়, ফাইফরমাশ খাটে।
সেদিন রাত প্রায় দশটা। চারতলায় নিজের ঘরে আরাম কেদারায় বসে অ্যাবারক্রোম্বি স্মিথ গল্প করছিল তার বন্ধু জেফ্রো হেস্টির সঙ্গে। হেস্টিও গা এলিয়ে দিয়েছিল আরেকটি আরাম কেদারায়। নদীতে নৌকো চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে ওরা ফিরে এসেছে।
নানান কথা বলতে বলতে হেস্টি একসময় বলল, ‘এঁ বাড়ির অপর দুই বাসিন্দার সঙ্গে তোমার আলাপ আছে?’
‘মোটামুটি আছে,’ স্মিথ বলল।
‘মল্কহাউস লী ছেলেটা বেশ ভাল। তবে…’
‘তবে কী?’ স্মিথ প্রশ্ন করল।
‘মানে বলছিলাম কি এডওয়ার্ড বেলিংহ্যামকে আমার তেমন সুবিধার বলে মনে হয় না।’
‘কেন?’ স্মিথ প্রশ্ন করল।
‘কেন যে বেলিংহ্যামকে পছন্দ করি না ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না। ও চোর ডাকাত বা গুণ্ডা বদমায়েশ নয়। কিন্তু আচার-আচরণ কেমন অদ্ভুত। চালচলন ঠিক স্বাভাবিক মানুষের মত নয়। ওর চোখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখেছ? চাউনিটা কেমন ক্রূর, নিষ্ঠুর আর নারকীয়। ওই চোখ দেখলেই মনে হয় যেন শয়তানের পয়লা নম্বরের সাগরেদ।
স্মিথ হেসে ফেলল। ‘তোমার সব ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি।’
‘মোটেই না,’ প্রতিবাদ করল হেস্টি, ‘অনেকেই বলে বেলিংহ্যাম নাকি নানান তুকতাক জানে। অবশ্য ও একেবারেই বেগুণ তাও বলছি না। প্রাচ্যবিদ্যায় নাকি অসাধারণ পাণ্ডিত্য আছে তার। প্রাচীন মিশরীয় হিব্রু, আরবি, ফার্সী ইত্যাদি ভাষা খুব ভাল জানে।’
‘বেলিংহ্যাম কি তুকতাক করে কারো কোন ক্ষতি করেছে?’ স্মিথ প্রশ্ন করল।
‘না, তা করেনি, বা করলেও আমি ঠিক জানি না।’
‘তাহলে ওকে খারাপ লোক ভাবছ কেন?’
কেন যে ওকে খারাপ ভাবছি ঠিকমত ব্যাখ্যা দিতে পারব না। জানি না কেন লোকটাকে আমি মোটেই সহ্য করতে পারি না। মল্কহাউস লীর বোন ইভেলিনের সঙ্গে যখন বেলিংহ্যামের মত মানুষকে ঘুরে বেড়াতে দেখি তখন আরও খারাপ লাগে। লীদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের অনেক দিনের পরিচয়। ইভেলিনকে ছোটবেলা থেকেই চিনি। সে সুন্দরী। স্বভাবও সহজ-সরল। তার সঙ্গে যখন বেলিংহ্যাম ঘুরে বেড়ায় তখন মনে হয় একটা সুন্দর পাখির সঙ্গে থপ্ থপ্ করে যাচ্ছে একটা কুৎসিত কোলাব্যাঙ।’
‘তোমার ঈর্ষা লাগে?’ তরল সুরে স্মিথ বলল।
‘না না, এর মধ্যে ঈর্ষার কোন ব্যাপার নেই,’ হেস্টি বলল।
‘তাহলে তুমি বেলিংহ্যামের উপর এমন নাখোশ কেন?’
‘শোনো, স্মিথ, তোমাদের এই বেলিংহ্যাম লোকটি খুবই ঝগড়াটে। সবার সঙ্গেই ওর বিবাদ, এই তো সেদিন নর্টনের সঙ্গে ওর একচোট হয়ে গেল। ও নর্টনকে খুব শাসিয়েছে। এরকম লোকের সঙ্গে বেশি মেলামেশা না করাই ভাল।’
‘তুমি কি আমাকে সাবধান করছ?
দ্বিধান্বিত কণ্ঠে হেস্টি বলল, ‘যদি ভাব তবে তাই।’
‘দেখো, এরকম ছোটখাট ব্যাপার দিয়ে একটা মানুষের বিচার চলে না।’
‘তা জানি। কিন্তু লোকটার সঙ্গে একটু চলাফেরা করলেই বুঝতে পারবে ও কত বড় ধূর্ত আর শয়তান।’
ঘড়িতে ঢং ঢং করে এগারোটা বাজল। হেস্টি তড়াক করে লাফিয়ে উঠল আরাম কেদারা থেকে। ‘এইরে! এগারোটা বাজে! আর নয়, এবার আমি উঠি। অনেকটা পথ যেতে হবে। গুডনাইট, স্মিথ।’
‘গুডনাইট, হেস্টি।’
হেস্টি চলে গেল।
.
দুই
হেস্টি যাবার পর স্মিথ টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে পড়ার টেবিলে বসল। বইয়ের তাক থেকে নামিয়ে নিল মোটা মোটা কয়েকটি ডাক্তারী বই। অ্যাবারক্রোম্বি স্মিথ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র। সামনেই পরীক্ষা। এখন ভাল করে পড়াশোনা করা দরকার। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে সবকিছু ভুলে গিয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রের রহস্যের মধ্যে ডুবে গেল।
দেয়াল ঘড়ি ঢং ঢং করে বারোটা বাজার জানান দিল। বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলল স্মিথ। ধূমপানের তেষ্টা লেগেছে। একটা সিগারেট ধরাল সে। হেস্টির কথাগুলো মনে পড়ল। সেই সঙ্গে মনে পড়ল মিনারের অপর বাসিন্দার কথা। উইলিয়াম মল্কহাউস লী সাহিত্যের ছাত্র। লোক হিসেবে তাকে তো ভালই মনে হয়। তেতলার এডওয়ার্ড বেলিংহ্যাম প্রাচীন ইতিহাসের কী একটা বিষয় নিয়ে গবেষণা করছে। যেটুকু পরিচয় হয়েছে তাতে তাকেও তো খারাপ মানুষ বলে মনে হয় না।
কিন্তু হেস্টি ওকে পছন্দ করে না কেন? বেলিংহ্যামের সঙ্গে যতবার দেখা হয়েছে ততবারই সে ভদ্রতা আর সৌজন্যের হাসি হেসেছে। ওকে বেশ ভদ্র আর শান্তিপ্রিয় মানুষ বলেই মনে হয়েছে। অন্তত এ পর্যন্ত ওর আচার- ব্যবহারে খারাপ কিছু দেখেনি স্মিথ। কিন্তু’ হেস্টি বেলিংহ্যাম সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করল কেন? বন্ধু হেস্টিকে সে ভাল করেই চেনে। স্পষ্টবক্তা। কিন্তু কারোর নামে নিন্দা করার মত ছেলে সে নয়। তাহলে? এসব কথা ভাবতে ভাবতে স্মিথ আবার বইয়ের পাতায় মন দিল। আরও কিছুক্ষণ কেটে গেল।
হঠাৎ একটা তীব্র তীক্ষ্ণ আর্তনাদ রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করে দিল। সেই আতঙ্কঘন ভয়াবহ আর্তনাদ শুনলে শরীরের রক্ত জমে যায়। আচমকা এই আর্তনাদে স্মিথ শিউরে উঠল। তার হাত থেকে মোটা ডাক্তারী বইটি ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে। শরীরের ঝাঁকুনিতে পড়ার টেবিলটা কেঁপে উঠল। টেবিলের আলোটা মাটিতে পড়ে নিভে গেল।
ঘর অন্ধকার। নিকষ কালো আঁধার।
সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। কেউ দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে আসছে। এত রাতে কে আসছে? কেন আসছে? পায়ের শব্দটা এসে থামল স্মিথের দরজার বাইরে। তারপর ভেজানো দরজাটা খুলে কে যেন ঢুকল ঘরের মধ্যে।
‘কে? কে?’ স্মিথ চিৎকার করে উঠল
‘আমি…আমি,’ কাঁপা গলায় উত্তর এল।
‘আমি কে?’ বলতে বলতে আলোর সুইচ টিপে দিল স্মিথ।
মল্কহাউস লী এসে দাঁড়িয়েছে ঘরে। আতঙ্কে আর উত্তেজনায় তার শরীর কাঁপছে।
‘কী ব্যাপার, মি. লী?’ স্মিথ জিজ্ঞেস করল।
হাঁফাতে হাঁফাতে মল্কহাউস লী বলল, ‘মি. স্মিথ, আপনি তো ডাক্তারী পড়েন, দয়া করে একবার নিচে আসুন…শিগির আসুন।’
‘কেন? কী হয়েছে?’ স্মিথ উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন করল। ‘বেলিংহ্যাম…বেলিংহ্যাম খুব অসুস্থ…অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। শিগগির তার ঘরে চলুন।’
‘একটু আগে কি মি. বেলিংহ্যামই চিৎকার করে উঠেছিলেন?’ স্মিথ জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ, সে-ই চিৎকার করেছিল। চিৎকার শুনেই আমি ছুটে গিয়ে তার ঘরে ঢুকি। দেখি সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তারপরই আমি ছুটে এসেছি আপনার কাছে।’
আর কোন কথা বলল না স্মিথ। মল্কহাউস লীর পেছন পেছন সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। ঘোরানো সিঁড়িটা সরু। ইচ্ছা থাকলেও তাড়াতাড়ি নামা সম্ভব না। পাশাপাশি দু’জন লোক নামার সুযোগ নেই সরু এ সিঁড়ি দিয়ে। একজনের পিছনে আর একজনকে নামতে হয়। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত লীর সঙ্গে বেলিংহ্যামের ঘরে এসে ঢুকল স্মিথ।
.
তিন
এডওয়ার্ড বেলিংহ্যামের রুম আকারে স্মিথের ঘরেরই মত। ঘরে ঢুকে চমকে উঠল স্মিথ। একে মানুষের থাকার জায়গা না বলে একটা ছোটখাট মিউজিয়াম বললেই চলে। স্মিথ শুনেছিল, বেলিংহ্যাম প্রাচীন ইতিহাসের কী একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে গবেষণা করছে…তাই বলে শোবার ঘরের এই অবস্থা!
ঘরের চারদিকের দেয়ালে প্রাচ্য আর মিশরদেশের প্রাচীনকালের বিভিন্ন যুগের নানা অদ্ভুত আর বিচিত্র নিদর্শন। আরও রয়েছে ছোট-বড় নানান আকারের ভাঙাচোরা মূর্তি, প্রাচীনকালের অস্ত্রশস্ত্র, অনেকগুলি সূক্ষ্ম কারুকার্য করা রাজপোশাক, বিভিন্ন মুখোশ, বড় বড় লাল-নীল পাথর, বিভিন্ন পুঁতির মালা।
প্রাচীন দেবদেবীর মূর্তির মধ্যে রয়েছে প্রাচীন মিশরের হোরাস্, আইসিস্, ওসাইরিস ইত্যাদি দেবতার বড় বড় অদ্ভুত মূর্তি। কড়িকাঠ থেকে ঝুলছে বিরাট একটা কুমিরের চিমসানো দেহ। কুমিরটার মুখ হাঁ-করা।
ঘরের মাঝখানে একটা লম্বা টেবিল। তার উপর টুকিটাকি অসংখ্য জিনিস। ছড়ানো টুকরো কাগজ, নানারকমের গাছের ছাল, শুকনো পাতা। তাছাড়াও টেবিলে রয়েছে প্যাপিরাস গাছ থেকে তৈরি কাগজের একটি পুঁথি। পুঁথিখানা খুবই প্রাচীন। পাতা হলদেটে।
টেবিলের সামনে দেয়ালের দিকে একটা কফিন। কফিনের ডালা খোলা। ভিতরে একটা মমি। সেদিকে তাকিয়ে স্মিথ ভয়ে চমকে উঠল। তার শিরদাঁড়া বেয়ে যেন বয়ে গেল ভয়ের শীতল স্রোত।
দেখেই বোঝা যায় মমিটা বহুদিনের পুরনো। ওটার গায়ের রঙ পোড়া কাঠের মত কুচকুচে কালো। দেহটা শুকিয়ে অস্থিচর্মসার। কফিন থেকে শরীর অনেকখানি বেরিয়ে এসেছে। হাতের সরু সরু অস্থিসার বড় বড় আঙুলগুলো এসে পড়েছে টেবিলটার কাছাকাছি। কী বীভৎস আর ভয়ানক দেখতে!
মমির ঠিক মুখোমুখি একটি চেয়ারে বেলিংহ্যাম পড়ে আছে অজ্ঞান হয়ে। দারুণ আতঙ্কে তার চোখ দুটো যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বোঝা যায় দারুণ ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। তখন ঠোঁট দুটো একটু ফাঁক হয়ে যাচ্ছে।
বেলিংহ্যামের অবস্থা দেখে খুবই ঘাবড়ে গিয়েছে মল্কহাউস লী। সে উদ্বিগ্ন গলায় বলল, ‘এখন কী হবে?’
স্মিথ ঝুঁকে পড়ে পরীক্ষা করতে লাগল বেলিংহ্যামকে।
‘কী বুঝছেন?’ উৎকণ্ঠিতভাবে লী জিজ্ঞেস করল।
‘চিন্তা করবেন না। ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে বেলিংহ্যাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’
মল্কহাউস লী দেখতে বেশ সুদর্শন। লম্বা, ছিপছিপে গড়ন। চোখের মণিদুটি কুচকুচে কালো। গায়ের চামড়া জলপাইয়ের মত মসৃণ।
স্মিথ ঝুঁকে পড়ে নিঃশব্দে বেলিংহ্যামকে পরীক্ষা করছিল। পরীক্ষা শেষ হতে সে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
‘কী হয়েছে ওর?’ ব্যাকুলভাবে প্রশ্ন করল লী।
স্মিথ বলল, ‘মনে হয় কোন কারণে ভীষণ ভয় পেয়ে উনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছেন। একটু শুশ্রূষা করলেই সুস্থ হয়ে উঠবেন। একটা কাজ করি। আসুন, দু’জনে মিলে ওকে ওই সোফায় শুইয়ে দিই। ইস্ সোফাটার উপরে দেখছি রাজ্যের জিনিসপত্তর। দাঁড়ান, আগে গাছ-গাছড়া আর শিকড়বাকড়গুলো এখান থেকে সরাই।’
‘আমি সরিয়ে দিচ্ছি,’ মল্কহাউস লী বলল।
সোফা পরিষ্কার হলে স্মিথ বলল, ‘এবার আপনি মি. বেলিংহ্যামের পায়ের দিকটা ধরুন। আমি মাথার দিকটা ধরছি।’
অচেতন বেলিংহ্যামকে শুইয়ে দেয়া হলো সোফার উপরে।
স্মিথ বলল, ‘আমি ওঁর পোশাকটা ঢিলে করে দিচ্ছি। আপনি একটু ঠাণ্ডা পানি নিয়ে আসুন। আচ্ছা, বেলিংহ্যামের ঠিক কী হয়েছিল জানেন?’
লী জবাব দিল, ‘না, আমি জানি না। বেলিংহ্যামের চিৎকার শুনেই আমি দোতলা থেকে এ ঘরে ছুটে আসি। এসে দেখি ও অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে চারতলায় ছুটলাম আপনাকে ডেকে আনতে।’
‘তাহলে বোধহয় কিছু দেখেই উনি ভীষণ ভয় পেয়েছেন,’ স্মিথ মন্তব্য করল। ঠিক চাRIOIৎ চালায়
অজ্ঞান হবার আগে সত্যিই ভীষণ ভয় পেয়েছিল এডওয়ার্ড বেলিংহ্যাম। জোরে জোরে শ্বাস নেয়া এবং শ্বাস ছাড়বার জন্য তার বুকটা হাপরের মত উঠছে নামছে। মুখখানা রক্তশূন্য-বিবর্ণ। চোখের মণিদুটো যেন দারুণ আতঙ্কে অক্ষিকোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মুখের গড়নও বিকৃত হয়ে কেমন অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। কী দেখে এত ভয় পেয়েছে এডওয়ার্ড বেলিংহ্যাম?
‘বুঝতে পারছি না, কী দেখে মি. বেলিংহ্যাম এত ভয় পেলেন?’ স্মিথ আপন মনেই প্রশ্ন করল।
‘বোধহয় এই মমিটা,’ মল্কহাউস লী বলল।
‘কিন্তু মমিটার মধ্যে এমন কী আছে যা দেখে উনি ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন?’ একটু অবাক হয়েই স্মিথ জানতে চাইল।
‘তা বলতে পারব না। কিন্তু ওই শুকনো লাশটা যেমন কুৎসিত তেমনই ভয়ঙ্কর। ওটাকে দেখলেই গা শিরশির করে।’
‘কিন্তু মমিটা তো এ ঘরে অনেকদিন ধরেই রয়েছে। আজ হঠাৎ ভয় পাবার কারণ কী?’ স্মিথ জিজ্ঞেস করল।
‘না, আজই প্রথম নয়,’ মল্কহাউস লী বলল, ‘গত শীতকালেও ও একদিন ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। তখন মমিটা ছিল ওর টেবিলের সামনে।’
‘কিন্তু মমির সঙ্গে ওঁর ভয় পাবার বা অজ্ঞান হবার কী সম্পর্ক?’ স্মিথ প্রশ্ন করল।
‘তা আপনাকে ঠিকমত বুঝিয়ে বলতে পারব না। এটুকু বলতে পারি বেলিংহ্যাম অদ্ভুত খেয়ালী প্রকৃতির মানুষ। পুরনো আমলের জিনিসপত্রের প্রতি ওর প্রচণ্ড আকর্ষণ। নানা দেশের বহু পুরনো জিনিস সে সংগ্রহ করেছে। শুধু সংগ্রহই নয়, এসব নিয়ে সে প্রচুর পড়াশোনাও করেছে। প্রাচীন লিপির পাঠোদ্ধার করা ওর একটা বড় নেশা। অনেক পুরনো পুঁথিপত্তরের পাঠোদ্ধার করেছে। এ কাজে ওর সমকক্ষ গোটা ইংল্যাণ্ডে খুঁজে পাবেন না। কলেজের অনেকেই ওকে ছিটগ্রস্ত বলে। এসব নেশাই হয়তো একদিন ওর জন্য সাংঘাতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এসব নেশা ছাড়বার জন্য ওকে অনেক বলেছি, কিন্তু শোনেনি। নিজের অদ্ভুত সব খেয়াল ছাড়তে ও মোটেই রাজি নয়। বাঃ! এই তো ওর জ্ঞান ফিরে আসছে!’
সত্যিই বেলিংহ্যামের জ্ঞান ফিরে আসছিল। স্মিথ আর মল্কহাউস লী ঝুঁকে পড়ে তার মুখের দিকে তাকাল।
বেলিংহ্যামের চোখের পাতা ধীরে ধীরে নড়ে উঠল। হাতের শক্ত মুঠো আস্তে আস্তে আলগা হয়ে খুলে গেল। পাণ্ডুর মুখে লাগল রঙের ছোঁয়া। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে উঠল। আরও কয়েকবার থির থির করে কেঁপে ওঠার পর চোখের পাতাদুটো অল্প খুলে গেল।
কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থাকার পর চোখের পাতা পুরো খুলে গেল। আরও খানিক স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকার পর বেলিংহ্যাম অবাক হয়ে ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। হঠাৎ মমিটার দিকে চোখ যেতেই চমকে গেল বেলিংহ্যাম। সঙ্গে সঙ্গে ধড়মড় করে উঠে বসে হুড়মুড় করে সোফা থেকে নামল। প্যাপিরাসের পাতার পুঁথি ঝট্ করে তুলে নিয়ে টেবিলের ড্রয়ারের মধ্যে রেখে ড্রয়ারে তালা মেরে দিল। তারপর স্মিথ আর লীর দিকে তাকিয়ে একটু রুক্ষস্বরেই বলল, ‘কী ব্যাপার, আপনারা হঠাৎ এখানে কেন?’
‘আরে তোমার চিৎকার শুনেই তো আমরা ছুটে এলাম, মল্কহাউস লী বলল, ‘চারতলার এই ভদ্রলোকটি না এলে তুমি যে কী কাণ্ড করে ফেলতে, ভাবতেও ভয় লাগছে।’ কাকত স্মিথের দিকে তাকিয়ে বেলিংহ্যাম বলল, ‘আপনার নাম অ্যাবারক্রোম্বি স্মিথ, না?’
উত্তরে স্মিথ একটু হেসে মাথা দোলাল।।
‘আপনি যে দয়া করে এসেছেন, তাতে আমি খুব খুশি হয়েছি। মামুলি ধন্যবাদ জানিয়ে আপনাকে ছোট করতে চাই না।’
একটু চুপ করে থেকে বেলিংহ্যাম বলল, ‘ইস্, কী বোকা! …কী বিরাট মূর্খ আমি! হ্যাঁ… হ্যাঁ… আমি একটা মহামূর্খ!’
দু’হাতের আঙুল দিয়ে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসল গবেষক বেলিংহ্যাম।
মল্কহাউস লী বলল, ‘শোনো, বেলিংহ্যাম, তোমাকে আগেও মানা করেছি, আবারও বলছি। গভীর রাতে মমি নিয়ে এসব ঘাঁটাঘাঁটি বন্ধ করো। কে জানে কবে কী অঘটন ঘটে যায়!’
‘মি. বেলিংহ্যাম, ওই শুকনো মমিটাকে দেখেই কি আপনি ভয় পেয়েছিলেন?’ স্মিথ প্রশ্ন করল।
‘না না তা নয়…তা নয়…’ মাথা ঝাঁকিয়ে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলল বেলিংহ্যাম। তারপর যোগ করল, ‘আসলে কি জানেন, পর পর কয়েক রাত জেগে পড়াশোনা করার জন্য শরীরটা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। মাথাটা ঘুরে উঠল। কী দেখে যে ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলাম বলতে পারব না। এখন বেশ সুস্থ বোধ করছি।’
‘এবার তাহলে আমি উঠি,’ স্মিথ বলল।
‘না না এক্ষুণি যাবেন না। আর একটু থাকুন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাব। তখন যাবেন।’
স্মিথের মনে হলো বেলিংহ্যাম একলা থাকতে এখনো ভয় পাচ্ছে, তাই ওদেরকে ছাড়তে চাইছে না।
লী বলল, ‘একী অবস্থা করে রেখেছ ঘরের। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে যাবে। দাঁড়াও আগে জানালাটা খুলে দিই।
লী জানালাটা খুলতেই ঘরের গুমোট ভাবটা চলে গেল। বাইরে থেকে এক ঝলক মিষ্টি ঠাণ্ডা হাওয়া এসে ঢুকল।
বলতে বেলিংহ্যাম বলল, ‘দাঁড়ান, আপনাদেরকে একটা আশ্চর্য জিনিস দেখাই। সে উঠে ড্রয়ারের ভিতর থেকে গাছের ছালের মত একটা শুকনো পাতা বের করল। তারপর সেই পাতাটাকে ধরল লণ্ঠনের চিমনির উপর। পাতাটা পুড়ে কালো হয়ে কুঁকড়ে গেল। ধোঁয়ায় ভরে গেল সমস্ত ঘর। কিছুক্ষণের মধ্যেই ধোঁয়া কেটে গেল। ঘরে রইল দামী ধূপের মত একটি অপূর্ব মিষ্টি সৌরভ।
স্মিথ আর লী দু’জনেই অবাক। ওদেরকে আশ্চর্য হতে দেখে বেলিংহ্যাম যেন খুশিই হলো। গম্ভীরকণ্ঠে বলল, ‘এটা একটা পবিত্র গাছের পাতা। এ গাছ খুব দুষ্প্রাপ্য। অনেক কষ্টে এ পাতা সংগ্রহ করেছি। এরকম নানান জিনিস আমার কাছে আছে, একদিন সময় করে দেখার আপনাদের। …আচ্ছা, মি. স্মিথ, আমি কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম?’
স্মিথ বলল, ‘বেশিক্ষণ নয়। মিনিট পাঁচ-ছয়।’
‘আমারও তাই মনে হয়। খুব বেশিক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম না আমি। কিন্তু অজ্ঞান হয়ে যাওয়াটা যে কী অদ্ভুত ব্যাপার তা কল্পনাও করতে পারবেন না, মি. স্মিথ। যে লোক চেতনা হারিয়ে ফেলে তার কাছে অচেতন অবস্থাটুকুর সময়ের মাপ থাকে না। সে নিজে বলতে পারে না কতক্ষণের জন্য সে অজ্ঞান হয়ে ছিল। আমি বলতে পারব না কতক্ষণের জন্য অজ্ঞান হয়ে ছিলাম-এক মুহূর্তের জন্য, না একদিনের জন্য, নাকি এক সপ্তাহের জন্য।’
দম নেবার জন্য একটু থামল বেলিংহ্যাম। তারপর আবার শুরু করল: ‘কাচের কফিনের মধ্যে ওই যে মমিটিকে দেখছেন, উনি হলেন চার হাজার বছর আগের একজন মহামান্য সম্রাট। আজ যদি উনি কথা বলতে পারতেন, তাহলে বোধহয় বলতেন, ‘আমি তো একটু আগেই জেগে ছিলাম। চার হাজার বছর তো আমার কাছে একটা মুহূর্ত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ …মি. স্মিথ, মমিটা কিন্তু সত্যিই খুব অদ্ভুত, তাই না?’
কৌতূহলী হয়ে মমিটার দিকে তাকাল স্মিথ। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ওটাকে। বহুকালের পুরনো একটা দেহ। কালের কবলে পড়ে দেহটা দুমড়ে গিয়েছে। তার ফলে মূর্তিটা ভয়ঙ্করদর্শন হয়ে উঠেছে। চোখের জায়গায় দুটো অন্ধকার গর্ত। কিন্তু সেই গর্ত দুটোর মধ্যে যেন জ্বলছে লালচে আগুন। সেই আগুনের রক্তিম আভা যেন ফিনকি দিয়ে ঠিকরে বেরোচ্ছে বাইরে।
চামড়া কালো হয়ে হাড়ের সঙ্গে লেগে রয়েছে। মমির মাথার খুলিতে কোঁকড়ানো কালো চুল। একটু ফাঁক হয়ে থাকা ঠোঁটের মধ্যে ছোট ছোট ঝকঝকে সাদা দাঁতের সারি দেখা যাচ্ছে। দাঁতগুলি ছোট এবং তীক্ষ্ণ। মমিটার গলার নিচ থেকে পা পর্যন্ত জড়ানো হলুদ রঙের কাপড় দিয়ে। সেই কাপড় কোন অজানা নির্যাস অথবা আঠার মত জিনিস দিয়ে ভেজানো। মমিটাকে দেখে স্মিথের মোটেই ভাল লাগল না। ওটার ভঙ্গিটাই অদ্ভুত। যেন শিকারি পশুর মতই শিকারের অপেক্ষায় ওঁৎ পেতে রয়েছে। মনে হচ্ছে এক্ষুণি কারো ঘাড়ে লাফিয়ে পড়বে।
বেলিংহ্যাম বলল, ‘জীবিতকালে এই মমিটার নাম কী ছিল জানি না। নামটি হয়তো ওর মাথায় লেখা ছিল। তবে সে লেখা আমার চোখে পড়েনি। সেটা বোধহয় বহুকাল আগেই হারিয়ে গিয়েছে। এখন মমিটার মাথায় একটা সংখ্যা লেখা আছে। সংখ্যাটা হলো ২৪৯। যে নিলাম থেকে আমি মমিটা কিনেছি, সংখ্যাটা তাদেরই দেয়া।’
মল্কহাউস লী বলল, ‘লোকটার অদ্ভুত চেহারা আর মোটা মোটা হাড় দেখে মনে হচ্ছে জীবিতকালে ও একটা ছোটখাট দৈত্য ছিল। হয়তো একসময় একা নিজের হাতেই কোন পিরামিড গেঁথে তুলেছিল।’
ভুল বললে, লী। এটি এক মহামান্য ফারাও-এর মমি। কোন শ্রমিকের মমি নয়, উনি যদি পিরামিড তৈরি করেও থাকেন তবে তা ক্রীতদাসদের দিয়েই করিয়েছেন, নিজের হাতে পাথর সাজিয়ে পিরামিড তোলেননি।’
মল্কহাউস লী হেসে ফেলে বলল, ‘চার হাজার বছর আগে তো আর পৃথিবীর আলো দেখিনি। তবু যা বলছ হয়তো তা-ই ঠিক।’
‘আপনার কি আগের চেয়ে এখন একটু সুস্থ লাগছে, মি. বেলিংহ্যাম?’ স্মিথ প্রশ্ন করল।
‘হ্যাঁ, আগের চেয়ে অনেকটাই সুস্থ বোধ করছি।’
‘তাহলে আমি এখন চলি।
স্মিথ যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল। বেলিংহ্যাম সোফা থেকে উঠে এসে তার হাত ধরে আন্তরিকভাবে বলল, ‘ধন্যবাদ…অশেষ ধন্যবাদ, মি. স্মিথ। আবার দেখা হবে। শুভরাত্রি।’
বেলিংহ্যাম আর লীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে স্মিথ উপরে উঠে গেল। নিজের ঘরে গিয়ে সে চিকিৎসাশাস্ত্রের একটা মোটা বই খুলে তাতে মনোনিবেশ করল।
.
চার
সে রাতের ঘটনার পর থেকে মিনার হাউসের দুই বাসিন্দা, এডওয়ার্ড বেলিংহ্যাম আর মল্কহাউস লীর সঙ্গে অ্যাবারক্রোম্বি স্মিথের বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তাদের সম্পর্ক ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’-তে নেমে এল। তবে বেশি খাতির জমল বেলিংহ্যামের সঙ্গে। সে রাতের ঘটনার পর বেলিংহ্যাম স্মিথকে দু’বার ধন্যবাদ জানাতে গিয়েছিল। কথা প্রসঙ্গে বেলিংহ্যাম একদিন স্মিথকে বলল, ‘তোমার যদি কখনো মনে হয় আমি তোমার কোন কাজে আসতে পারি তাহলে কোনরকম দ্বিধা বা সঙ্কোচ না করে আমাকে বলবে। আমি সাধ্যমত তোমাকে সাহায্য করব।’
বেলিংহ্যামের আচরণে কিছুটা আপাত রুক্ষতা থাকলেও তাকে খারাপ লোক মনে হলো না স্মিথের। হেস্টি যে কেন ওর উপর বিরূপ তা বুঝতে পারল না স্মিথ। বেলিংহ্যামের চরিত্রের কতগুলি বৈশিষ্ট্য স্মিথকে মুগ্ধ করেছিল। সে অসাধারণ পরিশ্রমী, নানা বিষয়ের ওপর তার প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য, দারুণ তার স্মৃতিশক্তি। বন্ধু হিসেবে সে মোটেই বাজে নয়। তার সঙ্গ স্মিথের খারাপ লাগে না।
সময়ে-অসময়ে যখন-তখন স্মিথের ঘরে চলে আসে বেলিংহ্যাম। কিছুক্ষণ এটা ওটা নিয়ে কথা বলে। তারপর হঠাৎ উঠে পড়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। লোকটা যে অত্যন্ত খেয়ালী তা বেশ বোঝা যায়। কিন্তু দুনিয়ার সব জ্ঞানই যেন ওর মগজের মধ্যে ঢুকে আছে। এমন কোন বিষয় নেই যা ও জানে না। মাঝে মাঝে কেমন সব অদ্ভুত কথাবার্তা বলে বেলিংহ্যাম। যেমন একদিন বলল, ‘কে কী ভাবছে তা জানাতে পারে এমন কোন যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারলে খুবই মজা হত, তাই না, স্মিথ?’
কোনদিন হয়তো বলল, ‘পৃথিবীতে নানা রকমের কত রহস্য রয়েছে, কিন্তু আমরা তার কোন খবরই রাখি না। এই আত্মার কথাই ধরো না কেন, ভাল-মন্দ, শুভ-অশুভ আত্মার উপর মানুষ যদি নিজের প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বিস্তার করতে পারত তাহলে বিষয়টা কী রকম হত একবার ভেবে দেখ। তাহলে মানুষের ক্ষমতা খুব বেড়ে যেত। বিশ্বাস করো, স্মিথ, মানুষের মধ্যে সত্যিই অসীম ক্ষমতার সম্ভাবনা রয়েছে।’
মাঝে মাঝে বেলিংহ্যাম বলে, ‘দু’জন মানুষের যদি একরকম মন হত অথবা একটি মন যদি আরও একটি দুটি মনের উপর আধিপত্য স্থাপন করতে পারত তাহলে কী বিরাট ব্যাপারই না হত!’
স্মিথের ঘরে এসে এই রকম সব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে বেলিংহ্যাম। অনেক সময় সে আপন মনেই অনর্গল বকে যায়। স্মিথ চুপচাপ পাইপ টানতে টানতে তার কথা শোনে। মাঝে মাঝে কেবল হুঁ হাঁ, তাই নাকি বলে। সে কখনো বেলিংহ্যামের অদ্ভুত এবং উদ্ভট কথাগুলোকে সমর্থন করে না। আবার সরাসরি বিরোধিতাও করে না। সে বুঝতে পেরেছে বেলিংহ্যাম খুব মেজাজী প্রকৃতির। এরকম লোকের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা খুবই শক্ত। সমর্থন অসমর্থন কিছুই না করলেও বেলিংহ্যামের অদ্ভুত এবং উদ্ভট কথাগুলো শুনতে স্মিথের ভালই লাগে। সে মজাও পায়।
বেলিংহ্যামের একটা অদ্ভূত অভ্যাস স্মিথ লক্ষ করেছে— সে আপন মনে কথা বলে। স্মিথ নিজে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে পড়াশোনা করে। মাঝে মাঝে নিঝুম রাতে নিচে বেলিংহ্যামের ঘর থেকে চাপাগলার আওয়াজ ভেসে আসে। কার সঙ্গে যেন ফিসফিস করে কথা বলছে বেলিংহ্যাম। কিন্তু এত রাতে তার ঘরে কে আসবে? সমস্ত তল্লাটই তো নিঝুম- নিস্তব্ধ। অনেক ভেবে স্মিথ এই সিদ্ধান্তে এল বেলিংহ্যামের নিশ্চয়ই আপন মনে কথা বলার বদভ্যাস আছে।
স্মিথের ধারণা যে সত্যি, ক’দিন পরেই প্রমাণ পাওয়া গেল।
টমাস স্টাইলাস মিনার হাউসের বহুদিনের পুরনো চাকর। এ বাড়ির
এ বাড়ির বাসিন্দাদের দেখাশোনা করে সে। বার্ধক্যের ছাপ তার দেহে। মাথার চুল ধূসর। লোকটি সহজ- সরল, মুখে হাসিটি লেগেই আছে। মিনার হাউসের বাসিন্দাদের সেবা-যত্নের ত্রুটি করে না সে।
একদিন সকালে চারতলায় স্মিথের ঘরে এসে একথা সেকথার পর টমাস একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল। সে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যর, মি. বেলিংহ্যামের শরীর ভাল আছে তো?’
প্রশ্ন শুনে অবাক অ্যাবারক্রোম্বি স্মিথ। টমাসের দিকে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, ‘হঠাৎ এ প্রশ্ন?
‘না, মানে আমার মনে হয়…’ কী বলতে গিয়েও টমাস থেমে গেল।
তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে স্মিথ বলল, ‘আমি যদ্দূর জানি বেলিংহ্যাম সুস্থই আছে। আমি ডাক্তারীর ছাত্র। অসুস্থ হলে সে নিশ্চয়ই আমাকে বলত।’
‘স্যর, বলছিলাম কি…মানে…মি. বেলিংহ্যামের মাথা খারাপ হয়ে যায়নি তো?’ সমস্ত সঙ্কোচ ঝেড়ে ফেলে বুড়ো টমাস প্রশ্নটা করেই ফেলল।
‘এরকম চিন্তা তোমার মনে আসার কারণ?’ স্মিথ জিজ্ঞেস করল।
‘তাহলে বলি, স্যর। কিছুদিন ধরেই দেখছি মি. বেলিংহ্যাম যেন কেমন পাল্টে গিয়েছেন। গভীর রাতে আপন মনে কথা বলেন। কখনো হাসেন, কখনো বা কাউকে খুব বকাবকি করেন। আপনার ঘর ওঁর কামরার ঠিক উপরে। আপনিও হয়তো কিছু শুনেছেন। এতে নিশ্চয়ই আপনার পড়াশোনার ক্ষতি হয়।
‘না না, আমার কোন ক্ষতি হয় না। দুশ্চিন্তা কোরো না। মি. বেলিংহ্যাম সুস্থই আছেন।
‘দুশ্চিন্তা করতাম না, স্যর, কিন্তু আরও একটা ব্যাপার আছে,’ ঘর গোছাতে গোছাতে টমাস বলল।
‘কী ব্যাপার?’
‘কিছু দিন থেকে দেখছি মি. বেলিংহ্যাম যখন ঘরে থাকেন না এবং ঘর যখন বাইরে থেকে তালা বন্ধ থাকে, তখনো কে যেন ঘরের মধ্যে পায়চারি করে। আমি নিজের কানে বন্ধ ঘরে পায়ের শব্দ শুনেছি।’
‘বলছ কী তুমি!’ স্মিথের কণ্ঠে বিস্ময়।
‘ঠিকই বলছি, স্যর। বুড়ো হতে পারি, কিন্তু এখনো কানে ভালই শুনি।
একটু থামল টমাস। তারপর বাধো বাধো গলায় বলল, ‘মি. বেলিংহ্যাম এখন ঘরে নেই। এইমাত্র কোথায় যেন বেরিয়ে গেলেন। তাঁর ঘরের সামনে একবার যাবেন, স্যর? দেখি পায়ের শব্দটা এখন শোনা যায় কিনা।’
টমাসের কথা শুনে স্মিথের কৌতূহল বাড়ল। ‘বেশ, চল।’
বুড়ো টমাসের পিছু পিছু নিচে নেমে এল স্মিথ। বেলিংহ্যামের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল দু’জনে। দরজা বন্ধ। একটা বিরাট ভারি তালা ঝুলছে দরজায়। টমাস কান পাতল। কী যেন শুনল। তারপর স্মিথকেও ইশারা করল কান পাতার জন্য। তার ইঙ্গিতে বন্ধ দরজায় কান ঠেকাল স্মিথ।
কী আশ্চর্য! বন্ধ ঘরের ভিতরে সত্যি পায়ের আওয়াজ! কেউ পা টেনে টেনে হাঁটছে। হ্যাঁ, ঘরের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত কেউ পায়চারি করছে তাতে কোন ভুল নেই। পায়ের শব্দ স্পষ্টই শোনা যাচ্ছে। টমাস ঠিক কথাই বলেছে।
বিমূঢ় দৃষ্টিতে টমাসের দিকে তাকাল স্মিথ। একটু পরে বেলিংহ্যামের ঘরের সামনে থেকে দু’জনেই চলে এল।
স্মিথের সঙ্গে তার ঘরে এল টমাস। ঘরের দরজা বন্ধ করে স্মিথ জিজ্ঞেস করল, ‘কবে তুমি প্রথম বন্ধ ঘরে পায়ের শব্দ শুনেছ, টমাস?’
‘দু’দিন আগে রাতের বেলা আপনার ঘরে খাবার দিতে আসার সময় আমি প্রথম পায়ের শব্দটা শুনতে পাই। মনে হয়েছিল, কেউ অস্থিরভাবে ঘরের মধ্যে চলাফেরা করছে। সিঁড়ি থেকেই আমি জিজ্ঞেস করি, ‘কে?’ কেউ সাড়া দেয় না। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, আমার গলার আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গেই পায়চারির শব্দটা থেমে যায়। স্যর, মি. বেলিংহ্যামের ঘরে নিশ্চয়ই আরও লোক আছে। এ নিয়ে একটু খোঁজ-খবর করা দরকার।
স্মিথের কপালে চিন্তার রেখা ফুটল। সে বলল, ‘ঠিক আছে, টমাস। তুমি এ নিয়ে কারো সঙ্গে কোন কথা বলতে যেয়ো না। ব্যাপারটা আপাতত গোপনই থাক। বিষয়টি নিয়ে আমি একটু চিন্তা করে দেখি। দরকার পড়লে আমি নিজেই তোমাকে জানাব-তোমার সাহায্য নেব।’
‘ঠিক আছে, স্যর। দরকার পড়লেই আমাকে বলবেন। এখন তবে আসি।’
‘এসো।’
বুড়ো টমাস বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
