আঁধারের শক্তি – ৫
পাঁচ
বেলিংহ্যামের ঘরের পায়ের শব্দরহস্য নিয়ে খানিকটা চিন্তা করলেও স্মিথ শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা নিয়ে আর বেশি মাথা ঘামায়নি। তবে দিনকয়েক পরে এমন একটা ব্যাপার ঘটল যাতে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল। স্মিথ আর ব্যাপারটাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারল না।
ব্যাপারটা বলা যাক।
তখন গভীর রাত। চারদিক নিঝুম-নিস্তব্ধ। স্মিথ নিজের ঘরে পড়াশোনা করছিল। হঠাৎ বেলিংহ্যাম ঢুকল তার ঘরে। তার চোখ-মুখ থেকে খুশি যেন উপচে পড়ছিল। ঘরে ঢুকেই সে বলল, ‘জানো, স্মিথ, আজ একটা দারুণ জিনিস আবিষ্কার করেছি। প্রাচীন মিশরের সম্রাট বেনি হাসানকে কোথায় কবর দেয়া হয়েছিল তা জানতে পেরেছি। এ খবর জানতে পারলে ঐতিহাসিকেরা চমকে যাবেন।’
কী করে আবিষ্কারটা করা গেল সেকথা বেলিংহ্যাম বেশ বিস্তারিতভাবে বলতে শুরু করল। স্মিথ মন দিয়ে শুনতে লাগল। হঠাৎ একটা শব্দ শুনতে পেয়ে উৎকর্ণ হয়ে উঠল। কেউ বেলিংহ্যামের ঘরের দরজাটা খুলেছে।
‘ওহে, বেলিংহ্যাম, কেউ বোধহয় তোমার ঘরের দরজাটা খুলে ঢুকল কিংবা বেরুল।’
স্মিথের কথা শুনে বেলিংহ্যাম চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। কিছুক্ষণ সে কোন কথাই বলতে পারল না। ভয় আর বিস্ময় যেন তাকে একেবারে আচ্ছন্ন করে ফেলল। তারপর স্খলিত স্বরে সে বলল, ‘না না…তা হতে পারে না। তা কী করে সম্ভব? আমি…আমি…আমি যে নিজের হাতে দরজা বন্ধ করে এসেছি। তুমি…তুমি ভুল শুনেছ, স্মিথ।’
‘না, আমি ঠিকই শুনেছি। ওই তো সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সিঁড়ি ভেঙে কে যেন উঠে আসছে উপরে। ধুপ্ ধুপ্ শব্দ শুনতে পাচ্ছ না?’
বেলিংহ্যামের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ঝোড়ো হাওয়ার মত সে এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দড়াম করে স্মিথের ঘরের দরজার কপাট বন্ধ করে দিয়ে সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। কিন্তু সিঁড়ির অর্ধেকটা যাবার পরই বেলিংহ্যামের পায়ের শব্দ থেমে গেল। থেমে গেল ধুপ্ ধুপ্ শব্দটাও।
স্মিথ শুনতে পেল বেলিংহ্যাম ক্রুদ্ধ চাপা গলায় কাউকে ধমকাল। একটু পরেই শোনা গেল বেলিংহ্যামের ঘরের দরজা খোলা এবং বন্ধ করার শব্দ। কিছুক্ষণ পর সে আবার ফিরে এল স্মিথের ঘরে। তার মুখখানা শুকনো-ফ্যাকাসে। কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। যেন একটা বিরাট ঝামেলা কোন রকমে কাটিয়ে এসেছে।
স্মিথ কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল বেলিংহ্যামের দিকে। বেলিংহ্যাম বলল, ‘না না, তেমন কোন ব্যাপার নয়। তোমার কথা শুনে আমি তো প্রথমটায় খুবই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমার ঘরে অনেক মূল্যবান জিনিসপত্তর আছে, ভাবলাম চোরটোর এল কিনা।’
‘কিন্তু চোর এলে তো জিনিস নিয়ে পালিয়েই যেত। সে আবার সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে আসবে কেন? আমার ঘরে -তো আলো জ্বলছিল। চোর কি ধরা দেবার জন্য এখানে আসবে? সে কি এত বোকা?’
‘আরে না না, চোরটোর কিছু নয়। আসলে আমার কুকুরটা। ও বুঝতে পেরেছে যে আমি এখানে আছি। তাই দরজা ঠেলে বেরিয়ে উপরে উঠে আসছিল। আসলে ঘরের দরজাটা আমি ভেজিয়ে দিয়ে এসেছিলাম, তালা বন্ধ করে আসিনি-ভুলে গিয়েছিলাম।’
স্মিথ অবাক হয়ে বলল, ‘তোমার কুকুর আছে নাকি? কই কোন দিন তো তোমার সঙ্গে কোন কুকুর দেখিনি।’
‘দেখবে কী করে? কুকুরটাকে এক বন্ধুর কাছ থেকে সবে এনেছি। ভীষণ পাজী জানোয়ার। কিছুতেই ঘরের মধ্যে বন্ধ থাকতে চায় না। কিন্তু যতদিন পোষ না মানে ততদিন ওটাকে বাইরে ছাড়তেও ভরসা পাচ্ছি না। কী জানি কখন কাকে কামড়ে দেয়।’
‘টমাসকে বলো না কেন, সে তোমার কুকুরটাকে ঠিক পোষ মানিয়ে দেবে।’
‘না, টমাসকে আমি আপাতত কুকুরটার কথা জানাতে চাই না। সে হয়তো আপত্তি করবে। কিন্তু আমার ঘরে অনেক মূল্যবান এবং দুষ্প্রাপ্য জিনিসপত্র রয়েছে সেগুলি পাহারা দেবার জন্য একটা কুকুর আমার সত্যিই দরকার।’
স্মিথ পরিষ্কার বুঝতে পারল বেলিংহ্যাম মিথ্যে বলছে। বেলিংহ্যামকে একটু পরীক্ষা করবার জন্য সে বলল, ‘জানো, আমারও কুকুর খুব ভাল লাগে। আমাদের বাড়িতে বেশ কয়েকটা ভাল জাতের কুকুর আছে। চল, নিচে গিয়ে তোমার কুকুরটা দেখে আসি।
স্মিথের কথা শুনে বেলিংহ্যাম কেমন হকচকিয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকবার পর স্বাভাবিক দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘নিশ্চয়ই দেখবে-নিশ্চয়ই দেখবে। তবে আজ হবে না। আজ আমার একটা খুব দরকারি কাজ আছে। রাত হলেও আমাকে এক্ষুণি বেরোতে হবে। আমি চলি। পরে একদিন কুকুরটা দেখো। আমি নিজেই নিয়ে গিয়ে তোমাকে দেখাব।’
টুপিটা হাতে নিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল বেলিংহ্যাম। তার ঘরের দরজা খোলা এবং ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করবার শব্দ শোনা গেল। বেলিংহ্যাম মিনার বাড়ির বাইরে যায়নি। নিজের ঘরে ঢুকেছে। আবার মিথ্যে কথা বলল। কিন্তু কেন?
ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে লাগল স্মিথ। চেষ্টা সত্ত্বেও ডাক্তারী কেতাবে আর মন বসল না। বেলিংহ্যাম এরকম মিথ্যের জাল বুনে চলেছে কেন? স্মিথ খুব ভাল করেই জানে বেলিংহ্যামের ঘরে কোন কুকুর নেই। সে কুকুর পোষেনি। যদি কুকুর পুষত তবে দিনে বা রাতে কোন না কোন সময়ে কুকুরের ডাক শোনা যেতই। কিন্তু স্মিথ কোন ডাক শোনেনি। তাহলে?
তাছাড়া সিঁড়িতে যে পায়ের শব্দ শোনা গিয়েছে, তা মোটেই কুকুর বা কোন জীবজন্তুর পায়ের শব্দ নয়। তাহলে পায়ের শব্দটা কার? শব্দ শুনে তো মনে হয়েছে কোন মানুষ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসছে। বেলিংহ্যামের বন্ধ ঘরে কারো চলাফেরা করার শব্দ স্মিথ নিজের কানেই শুনেছে। যে ব্যাপারটিকে সে বেলিংহ্যামের আপন মনে কথা বলা ভেবেছে, তা না-ও হতে পারে। অন্য কারো সঙ্গে সে হয়তো কথা বলছিল। বুড়ো টমাসও সে রকমই শুনেছে। তারা দু’জনেই কি ভুল শুনল? না…না, তা হতে পারে না। তবে?
ধাঁ করে একটা কথা স্মিথের মাথায় এসে গেল। তবে কি বেলিংহ্যাম তার ঘরে কোন মেয়েকে লুকিয়ে রেখেছে? অর মত ছেলের পক্ষে এটা অসম্ভব নয়। কিন্তু সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে এভাবে একটি মেয়েকে লুকিয়ে রাখা আদৌ সম্ভব? অনেক ভেবেচিন্তেও সে পদশব্দ রহস্যের কোন সমাধান করতে পারল না।
কিন্তু চিন্তার হাত থেকে মুক্তি পেল না স্মিথ। পায়ের আওয়াজ কার হতে পারে এই চিন্তাটা ঘুরে ফিরে বারবার তার মনে হানা দিতে লাগল। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে স্মিথ ভাবল, ‘বেলিংহ্যামের বন্ধ ঘরে কে চলাফেরা করে তা নিয়ে আমারই বা এত মাথাব্যথা কীসের? এটা ঠিক যে, ওকে ঘিরে একটা অদৃশ্য রহস্যের জাল রয়েছে কিন্তু সেই জাল কর্তন আমার কাজ নয়। আমি বরং ওর সঙ্গে আর বেশি মেলামেশাই করব না। এর পর বেলিংহ্যাম আমার ঘরে এলে পাবে উদাসীন এবং নিরুত্তাপ অভ্যর্থনা।’
পড়ায় মন দেবার চেষ্টা করল স্মিথ। কিন্তু মন বসল না! ‘ধুত্তোর বেলিংহ্যাম!’ বলে অসীম বিরক্তির সঙ্গে স্মিথ বইয়ের পাতা বন্ধ করল।
.
ছয়
সারা রাত ঘুম হয়নি স্মিথের। ভোরের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু প্রচণ্ড কড়া নাড়ার শব্দে তার ঘুমটা ভেঙে গেল। শেষ রাতের তরল অন্ধকার কেটে গিয়ে তখনো ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। এ সময় কে আবার এল? বেশ বিরক্তভাবেই সে দরজা খুলল। হেস্টি। সে বোধহয় ছুটতে ছুটতে এসেছে, হাঁপাচ্ছে।
‘কী ব্যাপার, হেস্টি, এত সকালে?’
‘কাল রাতে একটা সাংঘাতিক ব্যাপার ঘটেছে,’ হেস্টি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
‘বাইরে দাঁড়িয়ে রইলে কেন? ভিতরে এসো।’ হেস্টি স্মিথের ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসল।
স্মিথ বলল, ‘এইবার বলো, কী হয়েছে?’
‘কাল রাতে লং নর্টনকে কে যেন খুন করতে চেয়েছে।’
‘খুন! কী বলছ তুমি?’
‘ঠিকই বলছি। কাল রাতে হাই স্ট্রীট থেকে ও পুরনো কলেজের গেটের কাছে আসার পরেই ঘটে ঘটনাটা। জায়গাটা কী রকম অন্ধকার জানোই তো। সেই অন্ধকারে কেউ নর্টনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দু’হাতে তার গলা টিপে ধরেছিল।’
‘কিন্তু লং নর্টনকে আবার কে খুন করতে যাবে?’ স্মিথ অবাক।
‘সেটাই তো বুঝতে পারছি না,’ হেস্টি বলল, ‘নটনের মত ছেলের এরকম শত্রু থাকতে পারে, ভাবিনি কখনো।’
‘কিন্তু কে নটনকে আক্রমণ করেছে তা জানতে পেরেছ?’
‘না। তবে নর্টনের ধারণা, তাকে যে আক্রমণ করেছিল সে মানুষ নয়। আমি নিজেও লং নর্টনের গলায় আঙুলের দাগ আর নখের আঁচড় দেখেছি। দেখে আমারও মনে হয়েছে এ হামলা কোন মানুষের কাজ নয়।
‘তাহলে কে হামলা করল?’ স্মিথ একটু বিমূঢ়ভাবেই প্রশ্ন করল।
‘সেটা ঠিক করে বলা শক্ত। তবে আমার মনে হয় সার্কাস দল থেকে পালিয়ে যাওয়া কোন গরিলা কিংবা শিম্পাঞ্জি নর্টনকে আক্রমণ করেছিল। পুরনো কলেজের গেটের সামনে কিছু ঝোপঝাড় আছে। তাছাড়া পাশের বাগান থেকে বিরাট একটা এলম্ গাছের একটা ঝুপসি ডাল এসে পড়েছে গেটের মাথায়। নর্টনের ধারণা ওই এলম্ গাছের ডাল থেকেই রহস্যময় জীবটা তার উপর আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। জীবটা এত জোরে তার গলা টিপে ধরেছিল, নটনের মনে হচ্ছিল লোহার সাঁড়াশি দিয়ে কেউ তার গলাটাকে চেপে ধরেছে। সে প্রাণপণে নিজেকে মুক্ত করবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু জীবটার সরু সরু বাঁকানো আঙুলগুলো এমনভাবে তার গলা টিপে ধরেছিল যে নর্টন কিছুই করার শক্তি পায়নি। তাছাড়া অন্ধকারে কিছু দেখাও যাচ্ছিল না। গলা থেকে হামলাকারীর হাত টেনে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছিল ও। তখন বুঝতে পারে হাত দুটো খুব সরু এবং রোমশ। নর্টনের বিশ্বাস হাত জোড়া কোন পশুর।
বহু চেষ্টা করেও সে হাতের বাঁধন আলগা করতে পারছিল না। প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিল। ভাগ্যিস তখন সেখানে দু’জন লোক এসে পড়ে। জীবটা তখন নটনকে ছেড়ে দিয়ে এক লাফে পাঁচিলের উপর উঠে ছুটে পালায়। ভয়ে, আতঙ্কে নর্টন এখন ঘরে লুকিয়ে রয়েছে-একবার বাইরে বেরোয়নি। বেচারা নর্টন! বিরাট একটা ফাঁড়া গিয়েছে ওর।’
‘আশ্চর্য!’ আপন মনেই স্মিথ মন্তব্য করল।
‘বটেই তো। কিন্তু, স্মিথ, তোমার নতুন বন্ধু এডওয়ার্ড বেলিংহ্যাম লং নর্টনের দুরবস্থার কথা শুনলে খুব খুশিই হবে।’
‘কেন?’ স্মিথ প্রশ্ন করল।
তোমাকে তো বলেছিলাম ক’দিন আগে নর্টনের সঙ্গে বেলিংহ্যামের খুব ঝগড়া হয়। কথাটা ভুলে গেলে?’
‘না ভুলিনি তবে…’
স্মিথকে কথা শেষ করতে না দিয়েই হেস্টি বলল, ‘তোমার বেলিংহ্যামকে বোধহয় আর কষ্ট করে নর্টনের পিছনে লাগতে হবে না। তার দুর্দশার খবর শুনলে সে বোধহয় খুশি হয়েই আর কোন অ্যাকশনে যাবে না।’
স্মিথ চুপ করে রইল।
প্রসঙ্গ বদলাল হেস্টি। ‘স্মিথ, আজ বিকেলে নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতা হবে। সময় করে যাবে কিন্তু।’
‘চেষ্টা করব,’ স্মিথ বলল।
হেস্টি বিদায় নিল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্মিথ চিন্তা করতে লাগল। দুটো রহস্যের মুখোমুখি হয়েছে সে। একটা রহস্য হলো সিঁড়িতে পায়ের শব্দ আর দ্বিতীয় রহস্যটা হলো লং নর্টনের উপর আচমকা আক্রমণ। অনেক ভাবনাচিন্তা করেও স্মিথ রহস্য সমাধানের কোন সূত্র খুঁজে পেল না।
একবার মনে হলো দুটো রহস্যের মধ্যে হয়তো কোন যোগসূত্র আছে, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো সেটা কী করে সম্ভব?
একটার পর একটা চিন্তা তার মাথায় এসে পাক খেতে খেতে জটের পর জট সৃষ্টি করতে লাগল।
চিন্তা করে করে স্মিথের মাথা গরম হয়ে উঠল। এ অবস্থায় কিছুতেই বইয়ের পাতায় মন বসবে না। বরং কিছুক্ষণ বাইরে থেকে ঘুরে এলে মাথা ঠাণ্ডা হবে। তখন হয়তো পড়াশোনায় মন বসবে।
মুখে-চোখে জল দিয়ে বাইরে যাবার পোশাক পরে স্মিথ বেরিয়ে পড়ল।
.
সাত
স্মিথ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে, দেখে বেলিংহ্যামের ঘরের দরজাটা খোলা। একটু অবাকই হলো সে। বেলিংহ্যামের ঘরের দরজা তো কখনো খোলা থাকে না। হয় ভিতর থেকে না হয় বাইরে থেকে বন্ধ থাকে। স্মিথ ভাবল এই সুযোগে বেলিংহ্যামের ঘরে ঢুকে দেখে আসা যাক সত্যিই সেখানে কোন কুকুর আছে কিনা। কিন্তু তার আগেই একটা ব্যাপার ঘটল।
বেলিংহ্যামের ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল মল্কহাউস লী। তার মাথার চুল এলোমেলো, দারুণ রাগে মুখ লাল, চোখের কালো মণিদুটো যেন অসহ্য ক্রোধে জ্বলছে।
দরজার মুখে দাঁড়িয়ে এডওয়ার্ড বেলিংহ্যাম। দারুণ রাগে তার চেহারা বিকৃত। সে চিৎকার করে বলল, ‘মনে রেখো, লী, এর জন্য তোমাকে ভবিষ্যতে পস্তাতে হবে; তখন কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবে না। আমি এ অপমান মুখ বুজে সহ্য করব না।’
ক্রুদ্ধ কণ্ঠে মল্কহাউস লী বলল, ‘ঠিক আছে, তুমি যা পারো করোগে। তবে আমাকে ভয় দেখিয়ে কোন লাভ নেই। আমারও এক কথা। আমি যা বলি তা-ই করি। আমার- বোনের সঙ্গে কিছুতেই তোমার বিয়ে দেব না। তোমার মত জঘন্য প্রকৃতির লোকের সঙ্গে ইভেলিনের মত একটি মিষ্টি মেয়ের বিয়ে দেয়ার অর্থ হলো তাকে জেনে-শুনে নরকে পাঠানো। এ আমি কিছুতেই হতে দেব না।’
‘বিয়ের প্রস্তাব তাহলে ভেঙে গেল? কর্কশ কণ্ঠে বেলিংহ্যাম বলল।
‘হ্যাঁ…হ্যাঁ,’ ক্রুদ্ধ কণ্ঠে মল্কহাউস লী বলল।
‘ভুল করলে…মহা ভুল করলে, লী। এর ফলে তোমার যে কী মারাত্মক ক্ষতি হবে, তা তোমার কল্পনাতেও নেই।’
‘বেলিংহ্যাম, তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ? বললাম না আমাকে ভয় দেখিয়ে কোন লাভ হবে না।’
‘লী, তুমি তো জান আমার হাতে কী অসাধারণ ক্ষমতা আছে। আমি শেষ বারের মত তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি।’
‘কোন দরকার নেই। তোমার সঙ্গে আমি আর কোন সম্পর্কই রাখতে চাই না।’
‘তোমার প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে যেয়ো না, লী। মনে আছে তো কি প্রতিজ্ঞা করেছিলে?’
‘হ্যাঁ, প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, কাউকে কিছু বলব না। আমার প্রতিজ্ঞা আমি রাখব। কিন্তু সব জেনে-শুনে আমি কিছুতেই আমার বোনকে কবরে পাঠাতে পারব না। ইভেলিনের সঙ্গে তোমার আর দেখা হবে না।’
‘তুমি বললেই তো হবে না, ইভেলিনের নিজের মত অন্যরকম হতে পারে।’
‘তা নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না, বেলিংহ্যাম। আমি বারণ করলে ইভেলিন তোমার ধারে-কাছেও ঘেঁষবে না-সম্পর্ক রাখা দূরে থাক।
আর কিছু না বলে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে গেল মল্কহাউস লী।
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ওদের ঝগড়া শুনছিল স্মিথ। আড়ি পাতা বা অন্যের কথায় নাক গলাবার বদ অভ্যাস তার নেই। নেহায়েত ওদের ঝগড়ার সময় এখানে চলে এসেছিল বলেই লী আর বেলিংহ্যামের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় শুনতে পেয়েছে। তাও ওদের ঝগড়ার প্রথম দিকটা সে শুনতে পায়নি। যেটুকু কানে এসেছে তাতে বোঝা যায় ঝগড়ার কারণ হলো বেলিংহ্যামের সঙ্গে ইভেলিনের বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে দেয়া।
কিন্তু কেন সম্বন্ধ ভেঙে দিল লী? হতে পারে ইভেলিন সুশ্রী আর বেলিংহ্যাম দেখতে সুদর্শন নয়। কিন্তু দু’জনের মেলামেশায় এতদিন তো কোন আপত্তি করেনি। তবে আজ তার মন বদলে গেল কেন? বেলিংহ্যামের চরিত্রের কোন নেতিবাচক দিকের কথা সে জেনে গেছে? আর সেজন্যই কি বেলিংহ্যামের ব্যাপারে বিতৃষ্ণার সৃষ্টি হয়েছে?
তবে একটা ব্যাপার বুঝতে পেরেছে স্মিথ। ওরা একে অপরকে ভয় পায়। লী বেলিংহ্যামের এমন কোন গুপ্ত কথা জানে যা প্রকাশ হয়ে যাবার ভয়ে বেলিংহ্যাম শঙ্কিত। তবে লী-ও বেলিংহ্যামের কোন এক ‘অসাধারণ ক্ষমতার’ জন্য বেশ সন্ত্রস্ত। সেও বেলিংহ্যামকে ভয় পায়।
অথচ ক’দিন আগেও ওদের সম্পর্ক ছিল অন্যরকম। সে রাতে বেলিংহ্যাম ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলে মল্কহাউস লী-ই ছুটে এসে স্মিথকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। অচেতন বেলিংহ্যামকে পরীক্ষা করবার সময় লীর চোখে-মুখে কী উৎকণ্ঠা আর ব্যাকুলতাই না ফুটে উঠেছিল!
তাহলে এ ক’দিনের মধ্যে এমন কী ঘটল যাতে বিয়ের সম্বন্ধই শুধু ভাঙল না, দু’জনের সম্পর্কও একেবারে ছিন্ন হয়ে গেল? এ যে আরেক সমস্যা।
.
আট
বিকেলে নৌকা বাইচ দেখতে গেল স্মিথ। হেস্টিদের দল এবং অন্য একটা দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা। না গেলে হেস্টি মনঃক্ষুণ্ণ হবে। তাই সময় করে যেতেই হলো। বাইচ দেখতে নদীর দু’পাড়ে অনেক লোকের ভিড়। আবহাওয়াও বেশ সুন্দর। বসন্তের ঝকঝকে রোদে ঝলমল করছে চারদিক। সূর্যের আলোয় নদীর জল তরল রুপোর মত দেখাচ্ছে।
প্রতিযোগিতা শুরু হতে তখনো একটু দেরি আছে। কিন্তু অতি উৎসাহী মানুষদের চিৎকার আর চেঁচামেচিতে কান পাতা দায়। ভিড় থেকে একটু দূরে একটা ফাঁকা জায়গায় স্মিথ দাঁড়িয়েছিল। অন্যমনস্কভাবে কিছু ভাবছিল। আচমকা তার পিঠে কে যেন হাত দিল। স্মিথ চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়াল। দেখল মল্কহাউস লী তার পাশে দাঁড়ানো।
লী বলল, ‘তোমাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। অনেকক্ষণ ধরেই তোমাকে খুঁজছি। তোমাকে কয়েকটা কথা বলতে চাই। খুবই জরুরি। শুনবে?’
‘অবশ্যই। কিন্তু বিষয় কী?’
‘এসো, ওদিকটায় যেতে যেতে বলছি।’
‘চলো। কিন্তু বেশি সময় লাগবে না তো? প্রতিযোগিতার পর আমার দেখা না পেলে হেস্টি আমার উপর খুব রেগে যাবে। সে আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার কথাতেই পড়াশোনার প্রচণ্ড চাপ থাকা সত্ত্বেও আমি বাইচ দেখতে এসেছি।’
‘তুমি বোধহয় জান না হেস্টি আমারও বন্ধু। শুধু তাই নয়, আমাদের পরিবারের সঙ্গেও ওর দীর্ঘকালের পরিচয় এবং যোগাযোগ রয়েছে। আমাদের বাড়ির সবাইকেই ও চেনে। আমি বেশিক্ষণ সময় নেব না। প্রতিযোগিতা শেষ হবার আগেই তোমাকে ছেড়ে দেব। এই তো আমরা এসে গিয়েছি, চলো ওই বাড়িতে গিয়ে বসা যাক।’
নদীর পাড়ে একখানা ছোট দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে সুন্দর বাগান। দরজা-জানালার রঙ সবুজ। বন্ধ দরজা খুলে সুন্দর সাজানো গোছানো একটি কামরায় স্মিথকে বসালো লী।
ঘরে একটি খাট, একটি টেবিল আর খানকয়েক চেয়ার। এপাশের দেয়ালের তাকে অনেক বইপত্র, অন্যদিকের দেয়ালেও কয়েকটা তাক। সেখানে রয়েছে কেটলি, কাপ, ডিশ এবং আরও কিছু টুকিটাকি জিনিসপত্তর। ঘরটি স্মিথের বেশ পছন্দ হলো। জানতে চাইল, ‘এটি কার ঘর?’
লী বলল, ‘আমার বন্ধু হ্যারিংটনের। নির্জনে পড়াশোনা করার জন্য সে এ ঘর ভাড়া নিয়েছে। এখানে আমার অবাধ যাতায়াত। হ্যারিংটনের অনুপস্থিতিতেও এ ঘরে এসে আমার কিছুটা সময় কাটিয়ে যেতে কোন অসুবিধা নেই। তুমি পাইপ ধরাও, আমি একটু চা বানাই।’
পাইপে তামাক ভরল স্মিথ। দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালা হলেও তামাকে আগুন দেয়া হলো না। সে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে রইল জ্বলন্ত কাঠির দিকে।
কাঠি পুড়ে গেল। আঙুলে আগুনের ছ্যাঁকা লাগতেই স্মিথ ওটা ফেলে দিল। দু’কাপ ধূমায়িত চা নিয়ে স্মিথের সামনে হাজির হলো মল্কহাউস লী।
স্মিথের সামনের চেয়ারে বসে লী বলল, ‘এইবার কথাটা বলি। বলছিলাম কি, তুমি মিনার হাউসের ঘরটা ছেড়ে দাও।’
‘কেন?’ স্মিথ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
প্রশ্নের জবাব না দিয়ে লী বলল, ‘যত তাড়াতাড়ি ঘর ছাড়বে ততই মঙ্গল।’
‘কিন্তু কেন ঘর ছাড়ব তাই বল।’
‘তোমার কেন’-র উত্তর আমি দিতে পারব না, ‘ অসহায় ভঙ্গিতে লী বলল।
‘কেন পারবে না?’
‘কারণ এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বলব না বলে আমি একজনের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি। সে কথা আমাকে রাখতে হবে। তবে তোমাকে মিনার হাউস ছাড়তে বলার পিছনে বিশেষ কারণ রয়েছে। যদিও কারণটা বলতে পারছি না, আমি; আর পারলেও তুমি আমার কথা বিশ্বাস করবে না।’
‘কিন্তু কিছুই না জেনে অমন চমৎকার ঘরটা ছেড়ে দেব?’ স্মিথ বিস্ময় প্রকাশ করল।
লী বলল, ‘প্রতিজ্ঞা আমার মুখ আটকে দিয়েছে। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি যে বেলিংহ্যামের মত মানুষের কাছ থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল। আমি তার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। সম্ভব হলে আজই ওই ঘর ছেড়ে দাও তুমি।’
‘আজ সকালে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তোমাদের দু’জনের ঝগড়া শুনেছিলাম। তোমাদের কথা কাটাকাটি থেকে ঝগড়ার আসল কারণও বুঝতে পেরেছি। তোমার সঙ্গে বেলিংহ্যামের বিবাদের জন্যই কি তুমি আমাকে মিনার হাউস ছাড়তে বলছ?’
‘না না…মোটেই তা নয়,’ মল্কহাউস লী মাথা নাড়ল। ‘তুমি জান না বেলিংহ্যাম কী ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক মানুষ। ও বিরাট এক ক্ষমতার অধিকারী। ইচ্ছে করলে ও যে কোন লোকের সর্বনাশ করতে পারে। তাই বলছি ওর কাছ থেকে দূরে থাক।’
একটু থেমে মল্কহাউস লী যোগ করল, ‘যে রাতে বেলিংহ্যাম অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সে রাতের কথা মনে আছে?’
‘অবশ্যই মনে আছে। এই তো ক’দিন আগের ব্যাপার,’ স্মিথ উত্তর দিল।
তুমি বলেছিলে ‘মনে হয় কোন কারণে ভীষণ ভয় পেয়ে বেলিংহ্যাম অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে।’ কি, মনে আছে?’
‘আছে,’ স্মিথ উত্তর দিল।
‘সে রাতেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। আজ আমি ওকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলাম। উত্তরে ও যা বলল তাতে আমার আত্মা খাঁচা ছাড়া হওয়ার জোগাড়। বেলিংহ্যামকে অনেক অনুরোধ করলাম, কিন্তু কোন ফল হলো না। ওকে বকাবকি করলাম-গালাগালি দিলাম, কিন্তু তাও নিষ্ফল হলো। ও আমার কোন কথাই শুনতে রাজি নয়। শেষে বাধ্য হয়েই ইভেলিনের সঙ্গে ওর বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে দেয়ার হুমকি দিলাম। আর তাতেই শুরু হলো প্রচণ্ড ঝগড়া। সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে সেসব কথা তো তুমি শুনেছ।
‘শুনেছি,’ মাথা ঝাঁকাল স্মিথ
লী বলল, ‘বেলিংহ্যাম হয়তো স্বেচ্ছায় তোমার কোন ক্ষতি করবে না। কিন্তু ওর অজান্তেও তোমার মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই বলছিলাম মিনার হাউস ছেড়ে দেয়াই ভাল। আবার বলি, বেলিংহ্যামের সঙ্গ মোটেই নিরাপদ নয়। যে কোন মুহূর্তে তুমি কোন ভয়ঙ্কর বিপদে পড়ে যেতে পার। সে বিপদ কী সাংঘাতিক, কল্পনাও করতে পারবে না।’
‘কিন্তু বিপদটা যে কী তাই তো জানতে পারলাম না, স্মিথ বলল।
‘এর বেশি আর কিছু, আমি বলতে পারব না। আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’
‘তোমার সাবধানবাণীর জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু অকারণে ভয় পেয়ে অমন সুন্দর নির্জন পরিবেশ ছাড়তে আমি রাজি নই। শহরের হট্টগোলের বাইরে অমন শান্ত পরিবেশে লেখাপড়া করার খুব সুবিধা। ওরকম জায়গা সহজে পাওয়া যায় না।’
‘স্মিথ, আমি অকারণে তোমাকে সাবধান করিনি। আমার কথাগুলো একটু ভেবে দেখো।’
এ কথার কোন উত্তর না দিয়ে স্মিথ বলল, ‘এবার আমি উঠি, লী। বাইচ শেষ হবার বোধহয় আর বেশি দেরি নেই। বাইচের শেষে আমাকে দেখতে না পেলে হেস্টি নিশ্চয়ই রেগে যাবে আমার উপর। চলি।’
মল্কহাউস লীকে আর কোন কথা বলতে না দিয়ে স্মিথ ঘর থেকে বেরিয়ে পথে নেমে হাঁটতে শুরু করল।
স্মিথ ঠিক করেছিল, নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে যাবার পর ডাক্তার প্যাটারসনের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। ডাক্তার প্যাটারসন স্মিথের চাইতে বয়সে বড় হলেও তাঁর সঙ্গে স্মিথের খুবই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। ডাক্তারের বাড়ি অক্সফোর্ড থেকে খানিকটা দূরে ফলিংফোর্ড নামের একটি জায়গায়। তাঁর সুন্দর করে সাজানো লাইব্রেরিতে ডাক্তারীসহ বিভিন্ন বিষয়ের অনেক বই রয়েছে। সপ্তাহে অন্তত একদিন ডাক্তারের বাড়ি গিয়ে তাঁর লাইব্রেরিতে বসে স্মিথ নানা বিষয়ে গল্পগুজব করে কিছুটা সময় কাটায়। আজ সেখানে যেতেও ইচ্ছে করল না। এমন কি বাইচ শেষ হওয়া পর্যন্তও সে অপেক্ষা করল না। হেস্টির সঙ্গে দেখা না করেই গন্তব্যে পা চালাল। মল্কহাউস লীর কথাগুলো তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
.
নয়
আপন মনে একথা-সেকথা ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণ রাস্তায় ঘুরে বেড়াল স্মিথ। তারপর সন্ধ্যা নাগাদ এসে পৌঁছল মিনার হাউসের সামনে। ঘোরানো সিঁড়িটা অন্ধকার। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু এখনো সিঁড়ির আলোটা জ্বালা হয়নি। টমাস স্টাইলাস কি আলো জ্বালতে ভুলে গিয়েছে? এ রকম ভুল তো তার হয় না কখনো। নাকি বাতিই নষ্ট?
অন্ধকার চোখে সয়ে গেলে স্মিথ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগল। চেনা সিঁড়ি, ধাপগুলি মুখস্থ কাজেই, অন্ধকারেও সিঁড়ি বাইতে কোন অসুবিধা হলো না।
বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি বাইবার পরে মনে হলো পাশ দিয়ে কেউ যেন চলে গেল। খুব দ্রুতগতিতে কেউ নেমে গেছে নিচে। স্মিথ কেবল তার পায়ের শব্দই শোনেনি, কনুইতে মৃদু একটা ধাক্কাও খেয়েছে। চমকে উঠে থমকে দাঁড়াল স্মিথ। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিচের দিকে তাকাল। কিন্তু ঘন অন্ধকারে কিছুই ঠাহর হয় না। স্মিথ কান পাতল। কিন্তু পায়ের শব্দ আর শোনা গেল না। কানে এল বাতাসে আন্দোলিত আইভিলতার মৃদু ঝির ঝির।
কে নিচে নামল? টমাস স্টাইলাস? স্মিথ চেঁচাল, ‘কে? টমাস?’
কিন্তু কোন সাড়া মিলল না। সন্ধ্যার অন্ধকারে মিনার হাউস নিঝুম-নিস্তব্ধ।
স্মিথ ভাবল হয়তো সে ভুল শুনেছে। পুরনো মিনার হাউসের কোন ফাঁক বা ফাটলের মধ্য দিয়ে আসা বাতাসের ঝাপটাকেই সে হয়তো পায়ের শব্দ বলে ভুল করেছে। কিন্তু মৃদু ধাক্কাটা? সেটা কী? সেটাও কি বাতাসের ঝাপটা?
এ ব্যাখ্যায় সে নিজেই সন্তুষ্ট হতে পারল না। মন খুঁত খুঁত করছে। মনে হচ্ছে, না, এ কেবল বাতাসের ঝাপটা নয়, এ আরও কিছু। কিন্তু সেটা কী? চোরটোর আসেনি তো?
সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগল স্মিথ। অবাক হয়ে দেখল বেলিংহ্যামের ঘরের দরজা হাট করে খোলা। অবাক কাণ্ড! দরজাটা তো সবসময়ই বন্ধ থাকে। টেবিলের উপর একটা বাতি জ্বলছে। কিন্তু বেলিংহ্যামের ঘরের ভিতরে কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
কৌতূহল নিয়ে ঘরে উঁকি দিল স্মিথ। কফিনে চোখ পড়তেই চমকে উঠল। সেখানে মমিটা নেই! শবাধারে শব নেই। মমিটাকে কি অন্য কোথাও নিয়ে গিয়েছে বেলিংহ্যাম? তাই হবে। কিন্তু এভাবে দরজা খোলা রেখে বেলিংহ্যাম গেল কোথায়? তার যদি সত্যিই পোষা কুকুর থেকে থাকে সেটাই বা কই?
এসব কথা ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরে চলে এল স্মিথ i তবে ঘরের আলো জ্বালল না। বাইরের পোশাক না ছেড়েই অন্ধকারে চুপচাপ চেয়ারে বসে রইল।
কিছুক্ষণ কেটে গেল এইভাবে। একটু পরেই সিঁড়ির উপরে দুমদাম পায়ের শব্দ শুনে স্মিথ চমকে উঠল।
‘স্মিথ! স্মিথ!’ বলে চিৎকার করতে করতে ঘরে ঢুকল হেস্টি।
‘আরে, হেস্টি, কী ব্যাপার?
‘ব্যাপার সাংঘাতিক,’ হাঁপাতে হাঁপাতে হেস্টি বলল, ‘তোমাকে এক্ষুণি যেতে হবে আমার সঙ্গে।’
‘কেন, কী হয়েছে?’
‘মল্কহাউস লী নদীতে ডুবে গিয়েছিল। কাছাকাছি কোন ডাক্তার পেলাম না, তাই ছুটতে ছুটতে এলাম তোমার কাছে। এক্ষুণি চলো। চেষ্টা করলে হয়তো এখনো লী-কে বাঁচানো যাবে।’
‘কী করে নদীতে পড়ল লী?’ স্মিথ প্রশ্ন করল।
‘তা বলতে পারব না,’ হেস্টি উত্তর দিল।
‘সে এখন কোথায়?’
‘তাকে তার বন্ধু হ্যারিংটনের বাসায় শুইয়ে রেখে এসেছি। তুমি আর দেরি কোরো না।’
‘না না, দেরি করব কেন, একটু দাঁড়াও ওষুধের বাক্সটা গুছিয়ে নিই।’
ঘরের দরজা বন্ধ করে স্মিথ আর হেস্টি দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল।
নামার সময় দেখা গেল বেলিংহ্যামের ঘরের দরজা আগের মতই খোলা। মমির কফিনটার দিকে চোখ পড়তেই স্মিথের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মাথা ঝিম ঝিম করছে। তারপর, মুহূর্তের জন্য তার দেহমন অসাড় হয়ে গেল।
মমিটা কফিনের মধ্যেই রয়েছে! শবাধারে রয়েছে শব! অথচ একটু আগেও ওটা কফিনে ছিল না।
তবে কি বেলিংহ্যাম ওটাকে নিয়ে কোথাও গিয়েছিল? সে কি ফিরে এসেছে?
ঘরে উঁকি দিল স্মিথ। না, কেউ নেই। বেলিংহ্যাম এখনো ফেরেনি। তাহলে মমিটা ফিরে এল কী করে? লণ্ঠনের আলোয় মমিটাকে যেন আরও বীভৎস এবং ভয়ঙ্কর লাগছে। স্মিথের মনে হলো চার হাজার বছরের পুরনো শুকনো মড়াটা যেন নিষ্ঠুর জিঘাংসায় তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। মমিটার দু’চোখের কোটরের পুঞ্জীভূত অন্ধকারের মধ্য দিয়ে দুটো রক্তাক্ত আভা যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে! মমির দেহ নিষ্প্রাণ হলেও কোটরাগত চোখদুটি যেন প্রাণহীন নয়!
আচ্ছন্নের মত মমিটার দিকে তাকিয়ে রইল স্মিথ। তবে বিস্ময় বিমূঢ় ভাবটা কেটে গেল হেস্টির চিৎকারে। সে আগেই নিচে নেমে গিয়েছে। সেখান থেকে চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী ব্যাপার, স্মিথ? লীর এখন-তখন অবস্থা, তুমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করছ কেন? এক্ষুণি নেমে এসো…দেরি করলে ওকে আর বাঁচানো যাবে না।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ…এক্ষুণি যাচ্ছি আমি। হেস্টি, তুমি বরং এগিয়ে কোন গাড়ি ধরার চেষ্টা কর।’
কপাল খারাপ। গাড়ি পাওয়া গেল না। অন্ধকারে ছুটতে ছুটতে স্মিথ আর হেস্টি নদীর ধারে হ্যারিংটনের বাসায় হাজির হলো।
.
ভেজা গাছের গুঁড়ির মত বিছানায় পড়ে আছে অচেতন মল্কহাউস লী। তার পোশাক ভিজে ঢোল। এখনো জল গড়িয়ে পড়ছে গা দিয়ে। কালো কোঁকড়ানো চুলে আটকে রয়েছে সবুজ শেওলা। চোখের কালো মণিদুটো উল্টে গিয়েছে উপরের দিকে। শূন্য দৃষ্টি। ঠোঁটদুটি নীল। ঠোঁটের দু’কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে সাদা ফেনা। শ্বাস নেয়ার সময় তার সমস্ত শরীর থর থর করে কেঁপে উঠছে।
অচেতন লীর পাশে হাঁটু মুড়ে বসে আছে তার বন্ধু হ্যারিংটন। সে লীর ঠাণ্ডা শরীরটাকে গরম করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।
স্মিথ আর হেস্টিকে ঘরে ঢুকতে দেখে হ্যারিংটন তাদের দিকে তাকাল। কোন কথা না বলে দ্রুত এগিয়ে এসে স্মিথ লীর পালস পরীক্ষা করল। তারপর বলল, ‘নাড়ির গতি অস্বাভাবিক নয়। ওকে দেখে অবস্থা যত খারাপ মনে হচ্ছে, আসলে তত সঙ্গীন নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ও সুস্থ হয়ে উঠবে। হেস্টি, এসো… ধরো…লী-কে উপুড় করে শোয়াব। মিস্টার হ্যারিংটন, শুকনো তোয়ালে দরকার। হবে?’
‘হ্যাঁ, আছে। এক্ষুণি এনে দিচ্ছি।’
লীর পাশ থেকে উঠল হ্যারিংটন।
সে একটু দূরে যেতেই চুপি চুপি স্মিথ হেস্টিকে বলল, ‘একটা ব্যাপার দেখে কিন্তু খুব অবাক লাগছে। লী পানিতে ডুবে গেলেও ওর পেটে কিন্তু এক ফোঁটা পানিও যায়নি। আমার মনে হয় পানিতে ডোবার আগেই ও ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল।’
স্মিথের কথা শুনে হেস্টি বিস্মিত। বলল, ‘তাহলে ওর পেটের ভিতর থেকে পানি বের করতে হবে না??
‘না, কিছুক্ষণ বিশেষ কায়দায় ম্যাসেজ করলেই লী সুস্থ হয়ে উঠবে।’
‘কিন্তু কী দেখে লী ভয় পেল? এখানে ভয় পাবার মত কী আছে? হেস্টি যেন নিজেকেই প্রশ্ন করল।
‘সেটা লীর জ্ঞান ফিরে এলেই জানা যাবে,’ গম্ভীরভাবে স্মিথ বলল। ‘আপাতত জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করি।’
একটি শুকনো তোয়ালে নিয়ে ফিরে এল হ্যারিংটন। ওটা দিয়ে মল্কহাউস লীর সমস্ত শরীর ভাল করে মুছে দিল স্মিথ। তারপর ডাক্তারী কায়দায় লীর দেহটা ভাল করে ম্যাসেজ করে দিতে লাগল।
কিছুক্ষণ ম্যাসেজ করবার পরই লীর জলে ডোবা ঠাণ্ডা শরীরটা অনেকটা গরম হয়ে উঠল। তার নিঃশ্বাস-প্ৰশ্বাস ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে এল, ঠোঁটদুটো কাঁপতে লাগল। তারপর একসময় ধীরে ধীরে তার চোখের পাতা খুলে গেল।
চিন্তার মেঘ কেটে গিয়ে তিনজনের মনেই খুশির আলো জ্বলে উঠল। কয়েক মুহূর্ত ঘরের সবাই চুপচাপ
হ্যারিংটনই প্রথম নিস্তব্ধতা ভাঙল। সে বলল, ‘উফ! কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম!’
স্মিথ বলল, ‘মি. হ্যারিংটন, একটা পেয়ালা দিন।’
‘হ্যাঁ…হ্যাঁ, এই যে দিচ্ছি।
হ্যারিংটন পেয়ালা নিয়ে এলে স্মিথ ডাক্তারী ব্যাগের ভেতর থেকে একটা ব্রাণ্ডির শিশি বের করে ওতে খানিক ব্রাণ্ডি ঢালল। তারপর পেয়ালাটাকে লীর মুখের সামনে এগিয়ে ধরে বলল, ‘এটুকু খেয়ে নাও।’
পলকহীন চোখে চারদিকে চোখ বুলাল লী। তার মুখ ভাবলেশহীন। তারপর চোখ ফেরাল স্মিথের দিকে।
কোমল গলায় বলল স্মিথ, ‘তুমি সুস্থ হয়ে উঠেছ লী, আর কোন ভয় নেই। এই ব্রাণ্ডিটুকু খেয়ে নাও। দেখবে ভাল বোধ করবে।’
ব্রাণ্ডি পান করল লী
চেয়ারে বসতে বসতে হ্যারিংটন বলল, ‘ইস! কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম! সত্যি বলতে কি ব্যাপারটা যে কীভাবে ঘটল, এখনো বুঝতে পারছি না। আমি আর লী এ ঘরে বসে কিছুক্ষণ গল্প-গুজব করলাম। তারপর লী বলল, ‘আমি নদীর ধার থেকে একটু ঘুরে আসছি।’ সে বেরিয়ে যাবার পর আমি একটি বই খুলে বসলাম। পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে আমার চোখ চলে যাচ্ছিল নদীর দিকে। দেখছিলাম লী পায়চারি করছে নদীর ধারে। হঠাৎ একটা তীব্র আর্তনাদ শুনতে পেলাম, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শুনলাম নদীতে ঝপ্ করে কোন ভারি জিনিস পড়বার শব্দ।
‘চমকে উঠে জানালা দিয়ে নদীর দিকে তাকালাম। কিন্তু লী-কে দেখতে পেলাম না। এক ছুটে নদীর পাড়ে চলে গেলাম। কিন্তু নদীর ধারে জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই। তবে কি…তবে কি লী পানিতে পড়ে গেছে? চিন্তাটা মনে আসতেই আমার মেরুদণ্ডের মধ্য দিয়ে আতঙ্কের একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। লী সাঁতার জানে না!
শেষ পর্যন্ত পানির তলা থেকে লী-কে যখন খুঁজে পেলাম তখন ওর শোচনীয় অবস্থা। মনে হলো ওকে বোধহয় আর বাঁচানো যাবে না। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। সৌভাগ্যক্রমে হেস্টির সঙ্গে দেখা। আপনারা সময়মত না এলে যে কী হত, ভাবতেও গা শিউরে উঠছে।’
এতক্ষণ একনাগাড়ে কথা বলে হ্যারিংটন থামল।
ততক্ষণে মল্কহাউস লী অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে। সে বিছানায় উঠে বসবার চেষ্টা করতেই তিনজনে ধরাধরি করে তাকে বসিয়ে দিল।
‘তুমি হঠাৎ কীভাবে নদীতে পড়ে গেলে, লী?’ হ্যারিংটন জিজ্ঞেস করল।
‘আমি তো পড়ে যাইনি,’ লী বলল।
‘তবে?’
‘আমাকে…আমাকে ঠেলে পানিতে ফেলে দেয়া
হয়েছিল।’
‘সেকী! কে তোমাকে ঠেলে পানিতে ফেলবে?’ হ্যারিংটন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘তা জানি না। নদীর দিকে মুখ করে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন আমাকে শূন্যে তুলে নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দিল। পানিতে পড়বার আগেই বোধহয় দারুণ আতঙ্কে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। যে আমাকে হামলা করেছিল তাকে আমি দেখিনি। কিন্তু সে কে বা কী তা অনুমান করতে পারছি। তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করেছ কিনা জানি না। তবে আমি যা বললাম তার প্রতিটি বর্ণ সত্যি।’
লীর কানের কাছে মুখ এনে স্মিথ বলল, ‘আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি, লী।’
অবাক হয়ে লী মুখ তুলল। স্মিথের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সে মৃদুস্বরে বলল, ‘তুমি বিশ্বাস করো?’
অদ্ভুত দৃষ্টিতে লীর দিকে তাকিয়ে স্মিথ বলল, ‘হ্যাঁ, বিশ্বাস করি।’
অধৈর্য গলায় হেস্টি বলল, ‘তোমাদের কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। স্মিথ, তুমি তো ডাক্তার। লী এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি। ওকে এত বকাচ্ছ কেন? এখন ওকে বিশ্রাম করতে দাও। ও শুয়ে পড়ুক। পরে গল্প করার অনেক সময় পাওয়া যাবে। এবার আমাকে উঠতে হচ্ছে। অনেকটা পথ যেতে হবে। আমি চললাম।’
স্মিথ বলল, ‘একটু দাঁড়াও। আমিও বাসায় ফিরব। তোমার সঙ্গেই এগোই। তবে, লী, তোমার চিন্তার কোন কারণ নেই। কেউ তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আজকের রাতটা তুমি বরং এখানেই থেকে যাও।’
স্মিথ আর হেস্টি একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ল।
