আঁধারের শক্তি – ১০
দশ
হেস্টি আর স্মিথ অনেকটা পথ একসঙ্গে গেলেও স্মিথ কিন্তু চুপচাপই ছিল। তার মনে কতগুলো ঘটনা কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছিল। অন্ধকার সিঁড়িতে পায়ের শব্দ, কফিন থেকে মমির অন্তর্ধান, মমির প্রত্যাবর্তন, মল্কহাউস লীর উপর হামলা, লং নটনকে হত্যার চেষ্টা-এ সবকিছুর মধ্যেই যেন একটা যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব এবং অবিশ্বাস্য মনে হলেও একটা সন্দেহ ধীরে ধীরে স্মিথের মনে দানা বেঁধে উঠছিল। এসবের পিছনে যে বেলিংহ্যামের নোংরা হাত রয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশই নেই। বেলিংহ্যাম ‘নিঃসন্দেহে অপরাধী। কিন্তু তার অপরাধ প্রমাণ করা যাবে না। নরহত্যা করবার জন্য সে এমন এক অস্ত্রের আশ্রয় নিয়েছে, যা আগে কেউ কোনদিন নেয়নি। এরকম অস্ত্রের কথা কেউ বোধহয় কোনদিন স্বপ্নেও ভাবেনি।
হেস্টির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের বাসার দিকে যেতে যেতে স্মিথ ভাবল, লীর কথাই ঠিক। বেলিংহ্যামের কাছ থেকে দূরে থাকাই ভাল। লীর পরামর্শ মেনে চলবে সে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মিনার হাউস ছেড়ে দেবে। ওরকম বাড়ি হয়তো আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু ঘর না ছেড়ে উপায় কী? সারারাত ধরে রহস্যময় পদশব্দ শুনতে হলে তার পড়াশোনা শিকেয় উঠবে। মন অন্যদিকে চলে গেলে সে লেখাপড়া করবে কী করে?
সদর দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকবার আগেই রাস্তা থেকে স্মিথ দেখল বেলিংহ্যামের ঘরে আলো জ্বলছে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার সময় দেখল বেলিংহ্যাম তার ঘরের খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। উত্তেজিত চেহারা।
স্মিথকে দেখে বেলিংহ্যাম বলল, ‘এই যে, স্মিথ, মাত্রই ফিরলে?’
‘হুঁ,’ স্মিথের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
‘ফিরতে দেরি হলো যে! কোথায় গিয়েছিলে?’
‘আড্ডা দিতে নয়, কাজে গিয়েছিলাম,’ রাগতস্বরে স্মিথ জবাব দিল।
এসো আমার ঘরে। কিছুক্ষণ গল্প করি।’
‘সময় নেই,’ স্মিথ চড়া গলায় বলল। মনের ভিতরের প্রচণ্ড রাগ কিছুতেই চেপে রাখতে পারছে না।
‘খুব ব্যস্ত?’ বেলিংহ্যাম প্রশ্ন করল।
স্মিথ কোন উত্তর দিল না।
‘শুনলাম মল্কহাউস লী নাকি নদীতে ডুবে গিয়েছিল? কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটল কী করে? খবরটা শুনে মনটা বড় খারাপ হয়ে গেছে। ঝগড়া-ঝাঁটি যাই হোক না কেন, ওর সঙ্গে তো আমার অনেক দিনের পরিচয়।’
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল স্মিথ। এত তাড়াতাড়ি বেলিংহ্যাম খবরটা জানল কীভাবে?
বেলিংহ্যামের মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল স্মিথ। দেখল, তার চোখদুটো শয়তানী আর ধূর্তামিতে ভরা। বেলিংহ্যামের ঠোঁটের কোণের চাপা বিদ্রূপের হাসিও স্মিথের নজর এড়াল না। নিজেকে আর সামলাতে পারল না স্মিথ বেলিংহ্যামের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ, লী পানিতে ডুবে গিয়েছিল। কিন্তু এখন সে ভালই আছে। আপাতত তার বিপদের কোন সম্ভাবনা নেই। আমার কথাগুলো শুনে তুমি নিশ্চয়ই খুশি হচ্ছ না। না হবারই কথা। কারণ আমি ভাল করেই জানি, মল্কহাউস লীর দুর্ঘটনার পিছনে তোমার মদত ছিল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে তোমার শয়তানী-তোমার হত্যার চেষ্টা এবারও সফল হয়নি। না না-অবাক হবার অভিনয় করে তুমি আমাকে ভোলাতে পারবে না। আমি সব জেনে গেছি। তোমার আসল রূপ চিনতে পেরেছি।’
‘তোমার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি কি ভাবছ লীর দুর্ঘটনার জন্য আমিই দায়ী? আমি লী-কে পানিতে ফেলে দিয়েছি?’
‘হ্যাঁ, তুমিই,’ স্মিথ গর্জে উঠল, ‘তোমার ওই মমিটাকে জাগিয়ে তুলে তুমি সেটাকে মল্কহাউস লীর পিছনে লেলিয়ে দিয়েছিলে। শুধু তাই নয়, লং নর্টনকেও আক্রমণ করেছিল তোমার মমিটা।’
বেলিংহ্যাম প্রতিবাদ করল, ‘তা কী করে সম্ভব? মড়াকে কি কেউ জাগাতে পারে? কেমন করে জাগাবে?’
‘তা জানি না। কিন্তু এক্ষেত্রে সেই অসম্ভবই সম্ভব হয়েছে।’
‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে, স্মিথ?’
‘মোটেই পাগল হইনি। যা বলছি তা সুস্থ মাথায় ভাল করে জেনে-শুনেই বলছি। শোনো, বেলিংহ্যাম, তোমাকে শেষ বারের মত সাবধান করছি। তুমি এখানে থাকাকালীন কলেজের বন্ধুদের যদি কারো কোন ক্ষতি হয়, তবে আমি তোমাকে ছাড়ব না। উচিত শিক্ষা দেব তোমাকে। আর তার জন্য দায়ী হবে তুমি নিজেই। তোমার ওই মিশরীয় মন্তর- তন্তর আর তুকতাক এখানে চলবে না।’
‘অ্যাবারক্রোম্বি স্মিথ, তোমার মাথাটা দেখছি সত্যিই খারাপ হয়ে গিয়েছে,’ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল বেলিংহ্যাম।
‘হতে পারে। কিন্তু আমার কথাগুলো মনে রেখো। পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিয়ো না।’
তোমার এখন ওষুধের দরকার, অদ্ভুত গলায় বেলিংহ্যাম বলল।
‘সে আমি বুঝব।’
আর কথা না বাড়িয়ে স্মিথ সোজা চলে এল নিজের ঘরে। বেলিংহ্যাম থমথমে মুখে নিজের ঘরের খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
ঘরে এসে দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিল স্মিথ। বুনো গোলাপ কাঠের পাইপে তামাক ভরে ধূমপান করতে করতে গোটা ব্যাপারটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ভাবতে লাগল।
একটু পরেই দড়াম্ করে একটা শব্দ হলো। বেলিংহ্যাম তার ঘরের দরজা বন্ধ করেছে।
সে রাতে স্মিথ আর পড়ায় মন বসাতে পারল না।
.
এগারো
পরের দিন সকালে বেলিংহ্যামের ঘর থেকে কোন পায়ের শব্দ বা গলার আওয়াজ পাওয়া গেল না। বেলিংহ্যামকে দেখতেও পেল না স্মিথ। অবশ্য দেখতে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহও ছিল না। দেখা হলে বরং সে এড়িয়েই যেত বেলিংহ্যামকে।
সামনে পরীক্ষা। কিন্তু কয়েকদিন ধরে পড়াশোনা মোটেই হচ্ছে না। বেলিংহ্যামের ব্যাপারের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছে যে বইয়ের পাতায় মোটেই মন বসছে না।
বেলিংহ্যাম সংক্রান্ত সমস্ত চিন্তা জোর করে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে স্মিথ সারাটা দিন পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকল। সন্ধ্যার দিকে ভাবল, ডাক্তার প্যাটারসনের বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসবে। গতকাল যাবে ঠিক করেও যেতে পারেনি।
বাইরে যাবার পোশাক পরে স্মিথ ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় দেখল বেলিংহ্যামের ঘরের দরজা যথারীতি বন্ধ। সদর দরজা পেরিয়ে রাস্তায় নেমে স্মিথ দেখল বেলিংহ্যাম জানালা দিয়ে ঝুঁকে কী যেন দেখছে। সম্ভবত স্মিথকে দেখতে পায়নি সে।
অক্সফোর্ডশায়ার লেন দিয়ে স্মিথ এগিয়ে চলল। রাস্তাটা বেশ নির্জন। এ রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়ার চলাচল খুবই কম। রাস্তার দু’পাশে বড় বড় ঝাঁকড়া গাছ। রাস্তার আলোগুলোও অনেকটা দূরে দূরে। ঝিরি ঝিরি শান্ত বাতাস বইছে। বেশ মিঠে বাতাস। দেহমন জুড়িয়ে দেয়। খণ্ড খণ্ড মেঘ ভেসে চলেছে আকাশ পথে। মাথার ওপরে চাঁদ ম্লান জ্যোৎস্না বিলোচ্ছে। দু’পাশে গাছের সারি মাঝখানের রাস্তাটাকে পুরোপুরি আলোকিত করে তুলতে পারেনি। আলো আর ছায়ার লুকোচুরি খেলা চলছে সেখানে। আলো-আঁধারির এ পরিবেশে সবকিছুই কেমন রহস্যময় এবং অপার্থিব লাগছে।
রাস্তা একদম নির্জন। কাছাকাছি কোন মানুষজন আছে বলেও মনে হয় না।
স্মিথ দ্রুত কদমে সামনে এগিয়ে চলল।
সামনেই একটা বড় পার্ক। পার্কের ওপারেই ডাক্তার প্যাটারসনের বাড়ি। জানালায় আলো জ্বলছে। রাস্তা দিয়ে না গিয়ে পার্কের ভেতর দিয়ে গেলে পথটা অনেক সংক্ষেপ হয়। সময়ও বাঁচে। অনেকেই ফার্লিংফোর্ডে যেতে হলে পার্কের ভেতর দিয়েই যায়।
লোহার গেটটা খুলে স্মিথ পার্কের ভেতরে ঢুকল। পিছন ফিরে গেট বন্ধ করতে গিয়ে দেখল যে রাস্তা দিয়ে সে এসেছে সেদিক দিয়ে একটা দীর্ঘ অপচ্ছায়া সবেগে এগিয়ে আসছে পার্কটার দিকে। আলো-আঁধারে ছায়ামূর্তিটাকে স্পষ্ট চেনা না গেলেও স্মিথ অনুমান করতে পারল, কে ছুটে আসছে। মূর্তিটার চোখের ভেতর দিয়ে লাল আগুনের আভা ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।
দারুণ আতঙ্কে স্মিথের সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। তীব্র . তীক্ষ্ণ আর্তনাদ করে সে প্রাণপণে ছুটতে লাগল। ডাক্তার প্যাটারসনের বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে। কোনরকমে একবার পার্কটা পেরোতে পারলেই নিরাপদ আশ্রয় পাওয়া যাবে। কিন্তু মৃত্যুদূত সেখানেও হানা দেবে কিনা, কে জানে?
পার্কের পুরো পথটাতেই পাথরের ছোট ছোট নুড়ি বিছানো বলে যত জোরে ছোটা দরকার তত জোরে স্মিথ ছুটতে পারল না। বার বার পা আটকে যাচ্ছে। স্মিথ স্পষ্টই বুঝতে পারল তার আর ভয়াল ভয়ঙ্কর মৃত্যুদূতের মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই কমে আসছে। একবার হোঁচট খেয়ে পড়তে গিয়ে সে কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। আর একটু…আর একটু গেলেই পার্ক পেরিয়ে ফার্লিংফোর্ডে পৌঁছানো যাবে।
রক্তলোলুপ হিংস্র নেকড়ের মত মূর্তিমান আতঙ্ক ছুটে আসছে ঝড়ের গতিতে। তার চোখদুটো নিষ্ঠুর জিঘাংসায় জ্বলজ্বল করছে রক্ত-রাঙা চুনির মত। শোনা যাচ্ছে হাড়ের খট্খট্ শব্দ। মূর্তিটা অস্থিসার কুচকুচে কালো একটা হাত বাড়াল স্মিথের দিকে। স্মিথ আর তার হাতের মধ্যে ব্যবধান খুবই সামান্য। এক্ষুণি জিন্দালাশের মৃত্যু-শীতল বাহু হতভাগ্য স্মিথকে বেঁধে ফেলবে মরণ আলিঙ্গনে। আর নিস্তার নেই-আর উপায় নেই!
বাঁচার অদম্য ইচ্ছায় স্মিথের দৌড়ের গতি বেড়ে গেল। সামনেই পার্কের রেলিং। এক লাফে রেলিংটা পেরিয়ে ফার্লিংফোর্ডে এসে পড়ল স্মিথ।
সামনে ডাক্তার প্যাটারসনের বাড়ি। ভাগ্য ভাল, বাড়ির সদর দরজাটা খোলা। দমকা হাওয়ার মত খোলা দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকল স্মিথ। দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আটকে দিল খিল। তারপর অস্ফুট আর্তনাদ করে অর্ধ- অচেতনের মত শুয়ে পড়ল। তার বুক হাপরের মত ওঠা-নামা করছে।
দরজা বন্ধ হবার শব্দে লাইব্রেরি ঘর থেকে ছুটে এলেন ডাক্তার প্যাটারসন। স্মিথকে অমন অবস্থায় দেখে চমকে গেলেন, ‘কী ব্যাপার, স্মিথ? তোমার কী হয়েছে? এরকম করছ কেন?’
‘বলব-সব বলব, আগে একটু পানি খেতে দিন,’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল স্মিথ।
ডাক্তার প্যাটারসন ছুটে গিয়ে পাশের ঘর থেকে জল, ব্রাণ্ডি আর কাচের গ্লাস নিয়ে এলেন।
জল আর ব্রাণ্ডি খেয়ে স্মিথ একটু সুস্থ হলো। তার মুখের ফ্যাকাসে ভাবটা কেটে গিয়ে স্বাভাবিক রঙ ফিরে এল। কিন্তু আতঙ্কের রেশ তখনো কাটেনি। বুকটা এখনো হাপরের মত ওঠা-নামা করছে। নিদারুণ আতঙ্কে চোখের মণিদুটো নিশ্চল।
হাঁপাতে হাঁপাতে স্মিথ বলল, ‘বরাত জোরে খুব বেঁচে গিয়েছি। আজ রাতে আপনার বাড়িতেই আমি থাকব, প্যাটারসন। আমি ভীতু, আমার অতি বড় শত্রুও আমাকে এ অপবাদ দিতে পারবে না. আপনি জানেন। তবে যে মহাবিপদে পড়েছিলাম-যে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে তাতে ভোরের আগে আর রাস্তায় বেরুবার সাহস নেই।’
অবাক হয়ে স্মিথের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার প্যাটারসন বললেন, ‘তুমি আমার বাড়িতে থাকলে আমার কোন অসুবিধা নেই। বরং তুমি সুস্থ হয়ে উঠলে অনেক রাত পর্যন্ত তোমার সঙ্গে গল্প করে আনন্দই পাব। কিন্তু তুমি কী জন্য এত ভয় পেয়েছ সেটাই বুঝতে পারছি না।’
স্মিথ প্যাটারসনকে রাস্তার দিকের জানালাটার কাছে নিয়ে এল। বাইরেটা আলো-আঁধারিতে রহস্যময়। চারদিক নিঝুম-নিস্তব্ধ। রাস্তায় জনপ্রাণী নেই। পার্কের ভেতরেও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। বাড়ির গেটের সামনে ঝোপঝাড়। সেখানে অন্ধকার আরও গাঢ়। সেদিকে চোখ পড়তেই স্মিথ শিউরে উঠে জোরে ডাক্তার প্যাটারসনের হাত চেপে ধরল।
অন্ধকারের মধ্যে কালো একটি সুদীর্ঘ এবং শীর্ণ মূর্তির কাঠামো চেনা যায়। ছায়ামূর্তির চোখদুটো যেন আগুনের গোলার মত ধক ধক করে জ্বলছে।
‘দেখেছেন!’ আতঙ্কে আর উত্তেজনায় স্মিথের গলা কেঁপে গেল।
‘হ্যাঁ, দেখেছি। আমার হাতটা ছাড়ো। লাগছে।’ ‘কী দেখলেন?’ স্মিথ প্রশ্ন করল।
‘দেখলাম একটা খুব লম্বা আর রোগা মূর্তি। আমরা ওকে লক্ষ করেছি, এটা বুঝতে পেরেই ও গাছপালার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। ও কে?’
‘ও হলো মূর্তিমান মৃত্যু। খুব অল্পের জন্য ওর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি।’
‘তুমি এখনো কাঁপছ। ব্যাপারটা যে কী তাই তো এখনো জানতে পারলাম না। ওই লম্বা আর রোগা লোকটার সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক? আমাকে সব কথা খুলে বলো।’
‘আপনাকে সব কথাই খুলে বলব, প্যাটারসন,’ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে স্মিথ বলল, ‘কিন্তু আমার কথা বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না। এ কাহিনী যেমন অলৌকিক, তেমনই অবিশ্বাস্য।’
‘বিশ্বাস করব কিনা, পরের কথা। আগে তোমার কাহিনী শোনা যাক,’ ডাক্তার প্যাটারসন বললেন।
‘চলুন, লাইব্রেরি ঘরে যাই। সেখানে বসে সব কথা বলব। শুনলে বুঝতে পারবেন আমি অকারণে ভয় পাইনি। অবশ্য আমার কথা যদি আপনার বিশ্বাস হয় তাহলেই বুঝবেন কী ভয়ানক বিপদে আমি পড়েছিলাম।’
ডাক্তার প্যাটারসনের সঙ্গে তাঁর লাইব্রেরি ঘরে এসে বসল অ্যাবারক্রোম্বি স্মিথ।
ডাক্তার বললেন, ‘এখন তোমার গল্প বলো শুনি।’
স্মিথ তার বুনোগোলাপ কাঠের পাইপে তামাক ভরল, তারপর ধূমপান করতে করতে বেলিংহ্যামের অজ্ঞান হয়ে যাবার রাত থেকে ডাক্তার প্যাটারসনের বাড়িতে তার আসা পর্যন্ত সমস্ত ঘটনাই এক এক করে বলে গেল।
শুনে ডাক্তার প্যাটারসন স্তম্ভিত। কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারলেন না। তারপর যেন বাকশক্তি ফিরে পেয়ে বললেন, ‘এসব তুমি কী বলছ, স্মিথ? এ কি সম্ভব?’
‘হ্যাঁ, প্যাটারসন,’ স্মিথ বলল, ‘আমার প্রতিটি কথা সত্যি। পুরনো পুঁথি থেকে প্রাচীন মন্ত্র উদ্ধার করে তার সাহায্যে মমিকে সাময়িকভাবে জীবন্ত করে শত্রুর উপরে প্রতিশোধ নেবার পৈশাচিক পথ পৃথিবীতে বোধহয় আজ পর্যন্ত কেউ গ্রহণ করেনি। ভবিষ্যতেও এই নারকীয় পদ্ধতি কেউ অনুসরণ করবে বলে মনে হয় না। শয়তানের অবতার বেলিংহ্যামের শয়তানী আমি চিরতরে খতম করে দেব। হ্যাঁ, আমিও প্রতিশোধ নেব। নেবই। বন্ধুবান্ধবদের জন্য, মানবিকতার জন্য, নিজেকে বাঁচাবার জন্য আমাকে প্রতিশোধ নিতেই হবে। আমিও যে খুব সহজ মানুষ নই, তা বেলিংহ্যামকে বেশ ভাল করেই বুঝিয়ে দিতে হবে।’
‘কিন্তু কী করে প্রতিশোধ নেবে?’ ডাক্তার প্যাটারসন প্রশ্ন করলেন।
স্মিথের ঠোঁটে ফুটল বিচিত্র হাসি। সে হাসি কেবল বিচিত্র নয়, রহস্যময় এবং অদ্ভুতও বটে। ডাক্তার প্যাটারসনের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘তা এখন বলব না। পরে বলব। কাল আমার অনেক কাজ। আজ রাতে আমি একটু ভাল করে ঘুমিয়ে নিতে চাই।’
ডাক্তার প্যাটারসন ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, মিসেস বার্নিকে তোমার খাওয়া আর শোবার ব্যবস্থা করবার জন্য এক্ষুণি বলে আসছি।’
সে রাতটা ডাক্তার প্যাটারসনের বাড়িতেই কাটাল স্মিথ।
.
বারো
অ্যাবারক্রোম্বি স্মিথ ধীর স্থির স্বভাবের মানুষ। উত্তেজিত হয়ে বা হঠাৎ রেগে গিয়ে কোন কিছু করে ফেলা তার স্বভাববিরুদ্ধ। অনেক ভেবেচিন্তে, অনেক বিচার-বিবেচনা করেই সে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। তারপর সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করে। কোন ব্যাপারে একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজে অগ্রসর হলে তাকে সেখান থেকে সরানো খুবই শক্ত। স্মিথ মনে মনে সঙ্কল্প করল আজকের দিনটার সে পুরো সদ্ব্যবহার করবে। কিছুতেই দিনটাকে নষ্ট হতে দেবে না সে। বেলিংহ্যামের শয়তানীর ইতি টানতে হবে আজকেই।
সকালে ডাক্তার প্যাটারসনের কাছে নিজের পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু না বলেই স্মিথ বিদায় নিল
প্রথমেই সে গেল ক্লিফোর্ডের বন্দুকের দোকানে। সেখান থেকে একটা ভারি রিভলবার আর কিছু কার্তুজ কিনল স্মিথ। রিভলবারে কার্তুজ ভরে অস্ত্রটাকে কোটের পকেটে রাখল। তারপর দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলল মিনার হাউসের দিকে।
বেলিংহ্যামের ঘরের দরজা খোলা। নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল স্মিথ। টেবিলে বসে মাথা নিচু করে এক মনে কী যেন লিখছে বেলিংহ্যাম। টেবিলের উপর নানা জিনিসপত্র ছড়ানো আর রয়েছে একখানা বড় এবং ধারাল ছুরি। কফিনের মধ্যে মমিটা আগের মতই নিষ্প্রাণ এবং নিস্পন্দ হয়ে পড়ে আছে। চারদিক ভাল করে দেখে নিয়ে স্মিথ দরজাটা বন্ধ করে দিল।
দরজা বন্ধ হবার শব্দে চমকে মুখ তুলল বেলিংহ্যাম। স্মিথকে দেখে সে আরও চমকে গেল। কিছুক্ষণ তার মুখে কোন কথা ফুটল না। সে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল স্মিথের মুখের দিকে। জীবিত স্মিথকে দেখার আশা সে মোটেই করেনি।
‘স্মিথ? ব্যাপার কী? হঠাৎ যে?’
বেলিংহ্যামের প্রশ্নের জবাব দিল না স্মিথ। ফায়ারপ্লেসে আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছে। সে লোহার শিক দিয়ে আগুনটাকে ভাল করে উসকে দিল। তারপর বসল বেলিংহ্যামের মুখোমুখি চেয়ারে। হাত থেকে ঘড়িটা খুলে টেবিলের উপরে রাখল। কোটের পাশ পকেটে হাত ঢুকিয়ে সদ্যকেনা রিভলভারটি স্পর্শ করল। যে কোন মুহূর্তেই এটার প্রয়োজন হতে পারে।
বেলিংহ্যাম স্মিথের কার্যকলাপ লক্ষ করছিল। এবার সে ধীরকণ্ঠে বলল, ‘কী ব্যাপার, স্মিথ? তুমি কী চাও?
‘আমি চাই তুমি টেবিলের উপর থেকে ওই ধারাল ছুরিটা তুলে নেবে।’
‘কেন? ছুরি তুলব কেন? ছুরি দিয়ে কী হবে?’ বিস্মিতভাবে বেলিংহ্যাম প্রশ্ন করল।
‘তোমার ওই মমিটাকে কেটে ফেলতে হবে,’ দৃঢ়কণ্ঠে স্মিথ বলল।
‘কী বলছ তুমি! মমিটাকে কেটে ফেলব কেন? জানো, এটার দাম কত?’
‘আমার জানার প্রয়োজন নেই। যা বললাম তাই করো,’ গম্ভীর গলায় স্মিথ বলল।
‘কিন্তু কেন? আমার এই মহামূল্যবান সংগ্রহটিকে আমি নষ্ট করব কেন?’.
‘কারণ আছে বলেই নষ্ট করবে। বেলিংহ্যাম, তোমার শয়তানী আমি ভাল করেই বুঝতে পেরেছি। মমির রহস্যও আমার অজানা নয়। বহুযুগ আগের ওই বাসি মড়াকে জাগিয়ে তুমি শত্রুর পিছনে লেলিয়ে দাও। আমার পিছনেও লেলিয়ে দিয়েছিলে। কী, তোমার চেহারা এমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল কেন?’
‘এসব তুমি কী বলছ, স্মিথ?’ অস্ফুট স্বরে বেলিংহ্যাম প্রশ্ন করল।
‘আমি ঠিকই বলছি। আর ঠিক যে বলছি একথা তুমি বেশ ভাল করেই জান। মানুষ খুনের জন্য তুমি এমন উপায় বেছে নিয়েছ যে আইন তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। কিন্তু, বেলিংহ্যাম, আমার নিজের আইন তোমাকে সাজা দেবে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে তুমি যদি মমিটাকে কাটতে শুরু না কর, তবে রিভলভারের গুলিতে তোমার মাথার খুলি উড়িয়ে দেব।’
‘তুমি…তুমি আমাকে খুন করবে?’ আতঙ্কিত গলায় বলল বেলিংহ্যাম।
‘হ্যাঁ, তোমার মত মূর্তিমান শয়তানকে খুন করতে আমি একটুও দ্বিধা করব না। তোমার বুক লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে আমার হাত একটুও কাঁপবে না।’
‘কিন্তু মমিটাকে কেন কেটে ফেলব তা-ই তো বুঝতে পারলাম না,’ ভীরু গলা বেলিংহ্যামের।
‘আবার ন্যাকামি,’ স্মিথ গর্জন করে উঠল, ‘তোমার শয়তানী বন্ধ করার জন্যই মমিটাকে নষ্ট করে ফেলতে হবে।’
‘কিন্তু আমি কী করেছি?’
‘সে কথা খুলে বলতে হবে? তা তুমিও জান, আমিও জানি,’ ব্যঙ্গের সুরে স্মিথ বলল।
‘তুমি যে কী বলছ, তাই মাথায় ঢুকছে না,’ বেলিংহ্যাম বলল।
‘আর কথা বলে সময় নষ্ট করব না। আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তোমাকে কাজ শুরু করতে হবে।’
‘স্মিথ… স্মিথ …তুমি…তুমি অন্যায় আবদার করছ। তুমি যা করতে বলছ, তা একবার ভাল করে ভেবে দেখ। তুমিই বল যে মমিটাকে আমি এত দাম দিয়ে কিনেছি, সেটাকে কেটে ফেলা কি আমার পক্ষে সম্ভব? আজ না হোক, দু’দিন আগেও তো তুমি আমার বন্ধু ছিলে, সেই বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে বলছি, মমিটাকে নষ্ট করার কথা তুমি বোলো না।’
এক মিনিট চলে গেছে!’ স্মিথ গম্ভীরভাবে বলল।
‘শোনো, স্মিথ, আমার কথাটা শোনো। এসো, আমরা দু’জনে একটা খোলাখুলি আলোচনা করি। এতে তোমার মত পাল্টেও যেতে পারে। আচ্ছা, আগে ওই মমিটার ইতিহাস শোনো। নিলাম থেকে কেনা ওই মমিটার সময়কাল কীভাবে ঠিক করলাম শুনলে অবাক হয়ে যাবে।’
‘দু’মিনিট শেষ,’ গম্ভীর কণ্ঠে স্মিথ বলল।
‘স্মিথ…স্মিথ, তুমি কি পাগল হয়ে গিয়েছ? কোন সুস্থ মস্তিষ্কের লোক এভাবে একটা প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শনকে নষ্ট করতে বলতে পারে না। তুমি কেবল পাগলই নও, তুমি একটা ভয়ঙ্কর খুনি-আমাকে খুন করতে এসেছ!’
‘তিন মিনিট গেছে,’ কঠিন গলায় স্মিথ বলল।
‘বিনা কারণে আমাকে মমিটাকে কেটে ফেলতে হবে?’ করুণ স্বরে বেলিংহ্যাম বলল, ‘তুমি জানো না, স্মিথ, কত কষ্ট করে—কত অর্থ ব্যয় করে আমি এই মমিটাকে সংগ্রহ করেছি। এ কোন সাধারণ লোকের মমি নয়, এ হলো প্রাচীন মিশরের একজন ফারাওর মমি।’
‘মমিটাকে টুকরো টুকরো করে কেটে তারপর পুড়িয়ে ছাই করবে তুমি,’ কঠিন গলায় স্মিথ বলল।
বেলিংহ্যামের চোখদুটো ছলছল করে উঠল। কান্না- ভেজা গলায় সে বলল, ‘আমি তা পারব না, স্মিথ-কিছুতেই পারব না। তুমি…তুমি আমাকে বরং মেরেই ফেল।’
‘চার মিনিট শেষ.’ গম্ভীর গলায় বলল স্মিথ।
‘স্মিথ, দয়া করো। এ কাজ করতে আমাকে বোলো না।
বেলিংহ্যামের মাথা লক্ষ্য করে রিভলবার তুলে স্মিথ বলল, ‘ভাবছ আমি রসিকতা করছি। পাঁচ মিনিট গেলেই আমি গুলি ছুঁড়ব।’
‘সত্যিই তুমি মানুষ খুন করবে?’
‘না, মানুষ খুন করব না, মানুষরূপী পিশাচ হত্যা করব। আর তিরিশ সেকেণ্ড আছে।
দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বেলিংহ্যাম বলল, ‘ঠিক আছে। তুমি যা চাইছ, তাই হবে। তবে তুমি কিন্তু খুব অন্যায় করলে, স্মিথ।’
টেবিল থেকে ধারাল ছুরিটি তুলে নিয়ে স্খলিত পদে বেলিংহ্যাম এগোল মমির কফিনটার দিকে।
কিন্তু খোলা কফিনটার কাছে গিয়ে সে ইতস্তত করতে লাগল।
স্মিথ খেঁকিয়ে উঠল, ‘কী হলো, দাঁড়িয়ে রইলে কেন? কাজ শুরু করো।
‘সত্যিই আমাকে কাজটা করতে হবে? এর কি সত্যিই কোন প্রয়োজন আছে?’ হতাশভাবে বেলিংহ্যাম বলল।
‘আর কোন কথা নয়,’ হুঙ্কার ছাড়ল স্মিথ।
তার ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখে বেলিংহ্যাম আর কিছু বলার সাহস পেল না। কফিন থেকে সাবধানে মমিটাকে বের করে আনল। গভীর মমতার সঙ্গে এক মুহূর্ত মমিটার দিকে তাকিয়ে রইল বেলিংহ্যাম। তারপর পাগলের মত মমিটার বুকে ছুরি বসিয়ে দিল।
আঘাতের পর আঘাতে মমির হাড়-পাঁজরা খসে খসে পড়তে লাগল। ধুলোর মেঘে আর গন্ধে ভরে গেল সমস্ত ঘর। বেলিংহ্যাম পাগলের মত মমির দেহে ছুরি চালাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত মমির কঙ্কালটা ভেঙে গিয়ে হুড়মুড় করে ঘরের মেঝেতে পড়ে গেল। স্মিথের মনে হলো অক্ষিকোটরের অন্ধকার গহ্বরে মমির · চোখদুটো যেন তখনো জ্বলজ্বল করছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মমির দেহের ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি ঘরের মেঝেতে একটা স্তূপে পরিণত হলো।
হতাশভাবে উঠে দাঁড়াল এডওয়ার্ড বেলিংহ্যাম। স্মিথের দিকে ফিরে তীব্র ব্যঙ্গের সুরে সে বলল, ‘কি, সাধ মিটেছে?’
‘না, এখনো মেটেনি। আরও একটা কাজ বাকি আছে।’
‘আবার কী কাজ?’ বেলিংহ্যাম খেঁকিয়ে উঠল, ‘আমার আর কোন্ সর্বনাশ করতে চাও তুমি?’
‘এবার ভাঙা টুকরোগুলো ফায়ারপ্লেসে ফেলে দাও,’ কঠিন গলায় স্মিথ নির্দেশ দিল।
কোন কথা না বলে বেলিংহ্যাম মমির টুকরো শরীর আগুনের মধ্যে ফেলতে লাগল। শুকনো লতাপাতার মতই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল শুকনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো। চামড়া- পোড়ার বিশ্রী দুর্গন্ধে ঘর ভরে গেল। বিকট গন্ধে স্মিথের গা গুলিয়ে উঠল। বমি এল। কিন্তু একটুও নড়ল না সে। অসহ্য গন্ধের মধ্যে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থেকেই বেলিংহ্যামের উপর কড়া নজর রাখল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই অভিশপ্ত মমিটার ছাই ছাড়া আর কোন চিহ্নই রইল না।
ঘর্মাক্ত দেহে স্মিথের দিকে ফিরল বেলিংহ্যাম। ঘৃণা- ভরা গলায় বলল, ‘মি. অ্যাবারক্রোম্বি স্মিথ, আশা করি এবার আপনি খুশি হয়েছেন।
‘না, এখনো আমি খুশি হইনি, কেননা কাজ এখনো শেষ হয়নি।
‘মানে?’ ভুরু কপালে তুলল বেলিংহ্যাম।
কঠিন গলায় স্মিথ বলল, ‘তোমার মত নরপিশাচকে আমি আর শয়তানী করার কোন সুযোগ দেব না। ওই মিশরীয় মমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুই তোমাকে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
‘বেশ…বেশ…তাই হবে…তাই হবে,’ বলে বেলিংহ্যাম টেবিলের উপর থেকে গাছের ছালের মত শুকনো পাতাগুলো তুলে আগুনের মধ্যে ছুঁড়ে দিল। তীব্র গলায় সে বলল, ‘এবার কাজ শেষ তো?’
স্মিথ কোন জবাব দিল না। তার চোখের সামনে শুকনো পাতাগুলো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। পুড়তে পুড়তে কুঁকড়ে ছোট হয়ে গেল। বেলিংহ্যামের ঘর ভরে গেল ধোঁয়ায়। তবে একটু পরেই ধোঁয়া কেটে গেল। একটা অচেনা আশ্চর্য মিষ্টি গন্ধে ভরে গেল ঘরখানা। এ যেন কোন অন্যভুবনের অজানা সুরভি।
স্মিথ বলল, ‘ঠিক আছে। এবার পুঁথিটি বের করো।’
‘পুঁথি! কোন্ পুঁথি? কীসের পুঁথি?
বেলিংহ্যাম এমন ভান করল যেন সে স্মিথের কথা শুনে খুবই অবাক।
‘বুঝতে পারছ না!’ ব্যঙ্গের সুরে স্মিথ বলল, ‘বেশ আমি তাহলে বুঝিয়েই বলছি। আমি প্যাপিরাস পাতার হলদে রঙের পুঁথিটা বের করতে বলছি। বইটা তুমি টেবিলের ড্রয়ারের মধ্যে চাবি দিয়ে বন্ধ করে রেখেছ।’
স্মিথের কথা শুনে বেলিংহ্যাম আঁতকে উঠল, ‘স্মিথ…স্মিথ, দয়া করো। ও বই তুমি নষ্ট করতে বোলো না। ওটা পুড়িয়ে তোমার কোন লাভ হবে না।’
‘যা বলছি, তাই করো,’ রিভলভার উঁচিয়ে বলল স্মিথ।
বেলিংহ্যাম এখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া একজন মানুষ। কাতর কণ্ঠে সে বলল, ‘তুমি জানো না, স্মিথ, ও পুঁথি মহা মূল্যবান। সারা পৃথিবী খুঁজলেও ওরকম আর একখানা পুঁথি পাওয়া যাবে না। ও পুঁথি সন্ধান দেয় নতুন এক জগতের, উন্মুক্ত করে দেয় জ্ঞানের এক দিগন্তকে। কুয়াশার অন্তরালের সেই রহস্যময় জগৎকে আমি জানতে চাই-চিনতে চাই। এতে তুমি বাধা দিয়ো না, স্মিথ!’
‘আমি কোন কথা শুনতে চাই না। তুমি পুঁথি বের করো…হ্যাঁ, এক্ষুণি বের করো। নইলে রিভলভারের গুলিতে তোমাকে এই মুহূর্তেই ঝাঁঝরা করে দেব।’
‘আমার কথাটা একবার শোনো, স্মিথ…দয়া করে শোনো। আচ্ছা…আচ্ছা ঠিক আছে, ওই পুঁথির মধ্যে যা আছে, আমি তোমাকে তা শিখিয়ে দেব। ওর মধ্যে কি আছে জানো? আছে এক অনন্ত ও অলৌকিক রহস্যের পথের সন্ধান। এ জ্ঞান আজ বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছে। স্মিথ, আমি তোমাকে শিখিয়ে দেব কী করে মৃতদের বিদেহী আত্মা রাতের বেলা জাগিয়ে তুলতে হয়…কীভাবে তাদের সক্রিয় করে তুলতে হয়… কেমন করেই বা বিদেহী আত্মাদেরকে জাগরণকারীর বশে রাখতে হয়।’
কঠিন কণ্ঠে স্মিথ বলল, ‘তোমার বক্তৃতা শোনার সময় আমার নেই। তুমি থামো। এক্ষুণি পুঁথিটি বের করে আগুনে ছুঁড়ে ফেলো।
‘বেশ, তাই করব। কিন্তু আগুনে ফেলার আগে পুঁথির কয়েকটি পাতা আমাকে নকল করে নিতে দাও।
‘না,’ স্মিথ বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল।
‘আমার নকল করতে বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। আমি চট করে নকল করে নিচ্ছি। আমাকে অন্তত এটুকু দয়া করো, স্মিথ।’
বেলিংহ্যামের কথার উত্তর না দিয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ স্মিথ ড্রয়ারের চাবি খুলে গোল করে পাকানো পুঁথি বের করে আনল। বেলিংহ্যাম বাধা দেবার জন্য ছুটে এলে স্মিথ তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল ঘরের এক কোণে। তারপর পুঁথি ছুঁড়ে দিল অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে। পুঁথি পুড়ে ছাই হয়ে গেল।
বেলিংহ্যাম তখন উঠে বসেছে। তার মুখে সব হারানোর বেদনা। তার দিকে তাকিয়ে স্মিথ বলল, ‘আমার কাজ শেষ। আশা করি আর কোন শয়তানীর খেলা খেলতে পারবে না তুমি। তোমার বিষদাঁত আমি ভেঙে দিলাম। এখন ছোবল মেরেও তুমি কারো কোন ক্ষতি করতে পারবে না। বিদায়, বেলিংহ্যাম।’
টেবিলের উপর থেকে ঘড়ি আর টুপি তুলে নিয়ে স্মিথ দ্রুত বেলিংহ্যামের ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বেলিংহ্যাম হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল খোলা দরজার দিকে।
.
উপসংহার
পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। উল্লেখযোগ্য আর কোন ঘটনা ঘটেনি। অক্সফোর্ডের পুরনো কলেজ বা তার আশপাশের এলাকায় নির্জনতা বা অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে কোন রহস্যময় ছায়ামূর্তি আর কাউকে আক্রমণ করেনি। মমি আর পুঁথি ছাই হয়ে যাবার কয়েকদিন পরেই বেলিংহ্যাম তার পড়া শেষ না করেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যায়। শোনা যায় সে নাকি সুদানের দিকে গিয়েছে।
বেলিংহ্যাম বিশ্বাস করে মানুষের জ্ঞান সীমিত, কিন্তু প্রকৃতির রহস্য অসীম। আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে মানুষ সেই সীমাহীন অনন্ত রহস্যের রাজ্যে প্রবেশ করার পথ একদিন খুঁজে পাবেই। রহস্যলোকের বন্ধ তোরণ খুলবার চাবিকাঠি একদিন সত্যি সত্যিই এসে যাবে মানুষের কাছে। প্রকৃতির অনন্ত রহস্যের মধ্যে যেতে চায় প্রাচীন ইতিহাস আর পুরাতত্ত্বের ছাত্র এডওয়ার্ড বেলিংহ্যাম। জানতে চায়-বুঝতে চায় সেই মহা রহস্যের স্বরূপ আর প্রকৃতি।
প্রকৃতির অজানা রহস্যালোকে প্রবেশ করার পথের সন্ধান করে চলেছে বেলিংহ্যাম। কিন্তু আজও বোধহয় সে প্রবেশপথ খুঁজে পায়নি। পেলে কোন না কোনভাবে সে খবর জানা যেত।
