ডাইনি – ১
পূর্বাভাস
এলিজাবেথের দাদীমা যেদিন অদৃশ্য হয়ে গেলেন সেদিন তাঁর বেডরুমের বড়, সুন্দর আয়নাটি দেখা গেল ভেঙে টুকরো হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। ছোট ছোট ভাঙা কাচ ছড়িয়ে রয়েছে মোজাইক করা মেঝেতে।
আপনি কি আয়না নিয়ে কখনো ভেবেছেন? হয়তো চিন্তা করেছেন। আপনার বেডরুমে, হয়তো রোববারের কোন নির্জন রাতে যখন একান্ত ব্যক্তিগত কিছু কাজ করার জন্য বাথরুমে যেতে হয়েছে আপনাকে। যেসব কাজের কথা অন্যদেরকে বলা যায় না। হয়তো নাকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা লোম ছাঁটতে গেছেন। তখন শুধু শোনা গেছে আপনার ছোট্ট কাঁচিটির লোম কাটার কচকচ শব্দ।
কখনো কি এ ভাবনা মাথায় এসেছে যে আয়নার ওপর আপনি কতটা নির্ভরশীল? প্রতিদিন যদি আয়না আপনাকে না বলে যে আপনি দেখতে সুন্দরী তাহলে কী করে বুঝবেন যে আপনি আকর্ষণীয়া? আপনার বয়স বেড়ে যাচ্ছে, চোখের কোণে ভাঁজ পড়েছে, এসবও তো আয়নাই বলে দেয়, নাকি?
আয়না নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবলে আপনি ওদের রহস্য বুঝতে পারবেন। আজ রাতে যখন বিছানায় যাবেন-ঘরের বাতি নিভিয়ে মোমের আলো জ্বেলে চুপচাপ বসে বড় আয়নাটির দিকে তাকাবেন, এলিজাবেথ যা দেখেছে আপনিও হয়তো তা-ই দেখতে পাবেন।
ধৈর্য নিয়ে শান্ত হয়ে বসুন, নিজের দিকে কিংবা আয়নার দিকে তাকাবেন না। তাহলে হয়তো দেখতে পাবেন আয়নায় যে প্রতিচ্ছবিটি ফুটে উঠেছে তা আপনার নয়, অন্য কারো। অন্য ভুবন থেকে আসা অন্য একজন।
.
এক
আমার নাম এলিজাবেথ হ্যামিলটন। বয়স পনেরো। আমার বয়স যদি এর দ্বিগুণ বা তিনগুণ হত তাহলে হয়তো আপনি আমার গল্প শুনতে আরও বেশি আগ্রহবোধ করতেন। তবে আপনাকে মনে করার জন্য অনুরোধ করছি পনেরো বছর বয়সে আপনি কেমন দেখতে ছিলেন স্মরণ করুন তো। এখনকার চেয়ে তখনকার উপলব্ধি ক্ষমতা কি আপনার বেশি ছিল? তখন আপনি নিশ্চয় কোনকিছুর প্রতি তীব্র আবেগ দিয়ে অনুভব করতেন, আগ্রহবোধ করতেন। এখন আপনি কী নিয়ে তীব্র আবেগ অনুভব করেন?
এ কথা স্বীকার করতে লজ্জা নেই যে অনেক বিষয়েই আমার জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। তবে অনেক বিষয় আবার ভালই জানি। আমার মনে হয় পৃথিবীটি আপনার কাছে কেমন লাগছে তা আমি জানি। দুই বছর আগে অবশ্য এসব জানতাম না। কারণ তখন বালিকা ছিলাম মাত্র। আর এখন তো আমি নারী। আপনার ভেতরে যে অনুভূতিগুলো আছে সেগুলো এখন আমার মধ্যেও আছে। আমি এমন সব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি যা হয়তো আপনি করেননি। আমার মনে হয় আমার কথা আপনি বিশ্বাস করবেন।
দাদীমার বাড়িতে আমি থাকতে আসি বছরখানেক আগে, আমার বাবা-মাকে হত্যা করার পরে। ভাববেন না যেন আমি উদাস হয়ে কথাগুলো বলছি। বিষয়টি ব্যাখ্যা করছি।
.
দুই
আমার বাবা-মা আমাকে ছুটি কাটাতে নিয়ে গিয়েছিল নিউ ইয়র্কের লেক জর্জের ফ্যামিলি কেবিনে। এ কেবিনটি আমার কাছে সবসময়ই রহস্যময় এবং মনোমুগ্ধকর মনে হয়েছে। আমার সবচেয়ে কৌতূহল ছিল কেবিনে আগেরবার বাস করা লোকজনের ফেলে যাওয়া নানান চিহ্ন আবিষ্কারে; বাথরুমের দেয়ালে ফুটো, হলদে হয়ে যাওয়া টিস্যু, বার্নিশ করা পাইন টেবিলের কিনারে সিগারেট পোড়ার দাগ ইত্যাদি।
রাতের বেলা আমি অর্ধজাগ্রত অবস্থায় শুনি পাথরের গায়ে লেকের ঢেউয়ের বাড়ি খাওয়ার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। মাঝে মাঝে শব্দটাকে মনে হয় কারো যেন গলা টিপে ধরা হয়েছে।
সেদিন সকালে বাবা-মাকে অবাক করে দিতে আমি নিজেই তাদের ঘরে নাশ্তা নিয়ে যাব ঠিক করলাম। তারা তখনো পাতলা তোষকের বিছানায় শুয়ে ঘুমাচ্ছে। খুব ভোরে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। আমি ঠাণ্ডা মেঝেতে পা রাখলাম। পালিশ উঠে গিয়ে কর্কশ হয়ে উঠছে কাঠের মেঝে। আমি ধীর পায়ে হেঁটে এগোলাম। ঘরের ধূসর আলোতে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো কী যেন একটা নড়ে উঠল। ভয়ানক চমকে গিয়েছিলাম। পরক্ষণে বুঝতে পারলাম মুভমেন্টটা অন্য কিছুর নয়, আমারই। ড্রেসারের ওপর রাখা পুরনো একটা আয়নায় আমার ছায়া পড়েছে।
এমনসময় একটা কণ্ঠ শুনতে পেলাম। এ কণ্ঠটি পরে আমার খুব চেনা হয়ে যায়। তবে গলার স্বরটি মনে হচ্ছিল ভেসে আসছে অনেক দূর থেকে। আমি ভাবলাম ভুল শুনছি। কারণ ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পাখিদের কলকাকলী শুরু হয়ে গেছে। হয়তো পাখির ডাক শুনে ভেবেছি মনুষ্য কণ্ঠ।
আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালাম। আমার চোখ আধখোলা, আয়নার বাইরের অংশটা হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলাম। ধুলো পড়ে গেছে। আমি এবারে নাইট গাউনটা মাথার ওপর দিয়ে নামিয়ে খুলে ফেললাম। আবার তাকালাম আয়নায়। শিরশির করে উঠল গা। কেউ যেন আয়নার ভেতর থেকে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তাড়াতাড়ি সরে এলাম আয়নার সামনে থেকে। পরে ফেললাম গাউন।
‘নাস্তা। আমি নাশতা নিয়ে এসেছি।’
আমার বাবা-মাকে দেখলাম জেগেই আছে। তারা. আমাকে না তা নিয়ে আসতে দেখে অবাক। একই সঙ্গে একটু বিরক্তও। বাবা হাত দিয়ে তার ফ্যাকাসে গাল ঘষল। বুকে খামচির দাগ। দু’জনেই নগ্ন।
মা তাড়াতাড়ি বিছানার চাদর দিয়ে বুক ঢাকল। বাবা-মা অবশ্য আমাকে বলে মানুষের শরীর নিয়ে লজ্জা পাবার কিছু নেই। যদিও আমরা আপনজনের সামনেও ন্যাংটো হতে লজ্জা পাই।
আমি খাবারের ট্রেটি ওদের উরুর ওপর রাখলাম। বসলাম বাবার পাশে গিয়ে। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে গিজগিজে দাড়িঅলা মুখ ঘষল আমার গালে। আমাকে চুমু খেল। আমি বাবার বুকের আঁচড়ের দাগে আঙুল বুলালাম। বাবার মুখ দিয়ে দুর্গন্ধ আসছে। মদের গন্ধ। বাবা খুব মদ খায়। মা বহুবার মানা করেছে। শোনে না।
মা ট্রে থেকে এক টুকরো টোস্ট নিয়ে ডিমের কুসুমের মধ্যে গুঁতো দিতেই পোচ করা ডিমটা ফেটে গিয়ে বেরিয়ে পড়ল হলুদ পদার্থটা। আমরা সবাই হাসলাম তবে কেউ কোন কথা বললাম না। পাখির ডাক থেমে গেছে। শনশন হাওয়া বইতে শুরু করেছে।
সেদিন সকালে আমি জঙ্গলে ঘুরতে বেরুলাম। আমি নির্জনতা খুব পছন্দ করি। যেখানে মানুষজন নেই সেসব জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা। আমি জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর সময় শুধু আপনাদের মত কাঠবেড়ালি কিংবা ডেইজি ফুল দেখি না। আমার চোখ ছুঁচো কিংবা ব্যাঙের ছাতা কিছুই এড়িয়ে যায় না। আজ দেখলাম ছুঁচোটা মরে গেছে। ওটার ফুরফুরে লোম ছেঁকে ধরেছে লাখ লাখ পিঁপড়ে। আর উজ্জ্বল কমলা রঙের ব্যাঙের ছাতাগুলো ঝলমল করছে ভোরের প্রথম আলোয়।
এ জঙ্গলে র্যাটলকে আছে এবং সাপের কামড় থেকে কীভাবে রক্ষা পাওয়া যাবে সে বিষয়ে সাইনবোর্ডেও লিখে দিয়েছে। আমি একটা সাইনবোর্ড পড়লাম। ভাবলাম আমি যে পাথরটার ওপর বসে আছি, এখন যদি উঠে দাঁড়িয়ে দেখি ওটার নিচে কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছে একটা সাপ তখন কী করব?
কেবিন থেকে খুব দূরে আসিনি আমি। কেবিনের শব্দটব্দগুলো ভেসে আসছে কানে। জানি মা এখন নাস্তার কাপপ্লেটগুলো ধুচ্ছে আর বাবা ঢুকেছে বাথরুমে গোসল করতে। কিচেন সিঙ্কের সঙ্গে সস্তা কাপপ্লেটগুলো বাড়ি খাচ্ছে, বাথরুমের পাতলা ধাতব দেয়ালে লেগে শব্দ তুলছে শাওয়ারের পানির ধারা।
আমার বাবা-মা দু’জনেই গান গাইছে। আমার সন্দেহ আছে এদের কেউই পুরো একটা গান জানে কিনা। এরা অসংখ্য গানের প্রথম দু’একটা লাইন জানে মাত্র আর সেগুলো সব রোমান্টিক সঙ্গীত। যদিও আমি জানি আমার বাবা-মা কেউ কাউকে ভালবাসে না। যদিও বহু লোকের মত তারা মনে করে একে অন্যকে ভালবাসা প্রয়োজন। আমার কাছে অবশ্য ভালবাসা কখনো প্রয়োজনীয় মনে হয়নি।
আমি কেবিনের দিকে রওনা হয়েছি, এমন সময় সামনে, মাটিতে কী যেন নড়ে উঠল। থমকে দাঁড়ালাম। স্যাঁতসেঁতে, পচা পাতার গন্ধ আসা মাটির দিকে তাকালাম। আবারও কী যেন নড়ে উঠল বিদ্যুৎগতিতে। এবং তখন আমার পায়ের কাছে দেখতে পেলাম অতি কুৎসিত একটি প্রাণী। একটা ব্যাঙ। গায়ের রং পচা মাংসের মত, শরীর ভর্তি কালচে সবুজ জঙুল।
আমি উবু হয়ে ওটাকে তুলে নিলাম। মনে হলো কোন মরা বামনের হাত ধরে আছি। ব্যাঙটা ধস্তাধস্তি করল না, নড়াচড়া করল না, খোসাছাড়ানো আঙুরের মত চোখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আমার দিকে।
আমরা একে অপরকে যেন লক্ষ করলাম কয়েক মুহূর্ত। ওটার হৃৎপিণ্ড ধড়াস ধড়াস বাড়ি খাচ্ছে আমার হাতে। আমার কলজেও লাফাচ্ছে উত্তেজনায় এবং ভয়ে। তবে প্রাণীটাকে চুপচাপ হাতের ওপর শুয়ে থাকতে দেখে ভয়টা চলে গেল। আমি ওটাকে আমার বুকে হালকাভাবে চেপে ধরলাম। আমাকে দু’জনের হৃৎপিণ্ড যেন একই গতিতে স্পন্দিত হতে লাগল।
ব্যাঙটা দেখতে বিশ্রী হলেও ওটাকে আমি ফেলে দিলাম না। ও-ও অবশ্য আমার কাছ থেকে পালানোর চেষ্টা করল না দেখে ঠিক করলাম এটাকে আমি কেবিনে নিয়ে যাব।
.
বাবাকে দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। চোখ টাং মাউন্টেনের লেকের দিকে। পরনে বেদিং ট্রাঙ্কস, হাতে হুইস্কির গ্লাস। পাহাড় ঢেকে রাখা কুয়াশা আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে। ঠাণ্ডা বাতাস, ধূসর আকাশে ফুটল কালো কালো মেঘ। বাবা কেমন শিউরে উঠল। তার গায়ের চামড়া হলদেটে, নিষ্প্রাণ। পা জোড়া সরু সরু, ট্রাঙ্কসের ওপরে ফুলে আছে ভুঁড়ি। বাবা কি জানে সে দেখতে কত বিশ্রী?
বাবা আমাকে দেখে হাসল। ‘ক্যানু চড়তে যাবি?’ জিজ্ঞেস করল।
‘যাব। তবে আগে এটার একটা ব্যবস্থা করতে হবে, হাত বাড়িয়ে ব্যাঙটা দেখালাম বাবাকে। বাবা হেঁটে এল দেখতে আমার হাতে কী। দেখে ভয় পেল। জানতাম ভয় পাবে। হুইস্কির গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘ব্যাঙের গায়ের জঙুল দেখে তোর গা ঘিনঘিন করে না?’
‘না। আমি এটাকে পুষব।’
বাবা গম্ভীর মুখে আমার দিকে তাকাল। সে কী চিন্তা করছে ভাবার চেষ্টা করলাম আমি। প্রায়ই এ কাজটা করতে হয় আমাকে কারণ বাবা তার ভাবনাগুলো সবসময় গোপন রাখে। বলে না কাউকে। আমার বাবা পেশায় স্টক ব্রোকার। একবার আমাকে বাবা বলেছিল স্টক বিক্রির গোপন রহস্য হলো কাস্টমারকে অপ্রীতিকর সত্যটি জানতে না দেয়া। বাবা বেশ ভালই কামাই করে। মেয়েদের প্রতি তার ছোঁকছোঁক ভাব আছে। আমার বান্ধবী মিরাণ্ডার গায়ে বাবাকে হাত দিতে দেখেছি।
স্ক্রিনডোর ঠেলে আবির্ভূত হলো মা। ‘তোমরা দু’জনে কী করছ?’
মা’র পায়ে চপ্পল। মা’র শরীরের সবচেয়ে অনাকর্ষণীয় অঙ্গ হলো তার পদযুগল। সে আমার হাতে ব্যাঙটি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। ‘ভারি সুন্দর তো!’ বলল মা। ‘এটাকে দিয়ে কী করবি?’
‘ও একা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে,’ বলল বাবা। ‘তারপর ওটাকে চুমু খাবে এই আশায় যে ওটা ব্যাঙ রাজকুমার হয়ে যাবে।’
আমি কিন্তু এসব কথা একদমই ভাবিনি। কিন্তু বাবা যখন বলছে ব্যাঙটাকে চুমু খাওয়া যায়। যদিও ব্যাঙ রাজকুমার হয়ে যাবে বলে আশা করি না।
‘দারুণ তো।’ বলল মা। সে ব্যাঙটার মুখের কাছে মুখ নিয়ে এল। ‘তুই নিশ্চয় এটার ভাগ আমাকে দিবি না।’
বিরক্ত হলো বাবা। ‘সুন্দরী মহিলারা যে কেন সবসময় কুৎসিত জিনিসগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয় বুঝি না।’
মা তার দিকে তাকিয়ে হাসল। ‘এ কারণে কি নিজেকে তোমার সৌভাগ্যবান বলে মনে হয় না?’
মা তার প্রিয় খেলাটি খেলছে। হাসিমুখে সে খুব নিষ্ঠুর কোন কথা বলবে। বাবা যদি অপমানিত বোধ করে, এটাকে জোক হিসেবে না নেয় তো হেরে গেল।
বাবা জানে খেলায় জিততে হলে তাকেও হাসিমুখে অপমানের জবাব দিতে হবে। ‘ওহ্, আমি তোমাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলিনি, ডিয়ার।’ বলল সে। ‘আমি শুধু সুন্দরী মহিলাদের কথা বলছিলাম।’
বাবা খেলায় কখনোই জিততে পারে না কারণ সে যা বলে তা বিশ্বাসও করে। এবারে মায়ের পালা। সে বাবাকে মাতলামি ও মদের নেশা নিয়ে তির্যক একটি মন্তব্য করল। বাবা সে মন্তব্যের জবাব দিতে না পেরে হেসে উঠল। তার মানে সে হেরে গেল। মাকে আমার ঘেন্না লাগে খেলাটা শুরু করার জন্য আর বাবার ওপর রাগ হয় সে বারবার হেরে যায় বলে।
‘আমরা কি এখন ক্যানু চড়তে যেতে পারি?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
প্রসঙ্গ বদলে যেতে মনে মনে খুশিই হলো বাবা। লেকের দিকে তাকাল। হ্রদে বড় বড় ঢেউ উঠেছে। ঢেউয়ের মাথায় সাদা ফেনা। ‘এখন না যাওয়াই মঙ্গল, এলিজাবেথ। বিকেলে যাওয়া যাবে।’
‘পাঁচ মিনিট আগেও কিন্তু তুমি মঙ্গল-অমঙ্গলের কথা ভাবনি।’
‘এখন লেকের অবস্থা আগের থেকেও খারাপ।’
আসলে লেকের অবস্থা খারাপ নয়। একটু জোর বাতাস বইছে বলে বড় বড় ঢেউ উঠেছে হ্রদে। আসল ব্যাপার হলো মা’র কাছে খেলায় হেরে গিয়ে মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে বাবারি। সে এখন বসে বসে মদ গিলবে। ‘ঘরে যাই। জামাটামা গায়ে দিই। শীত লাগছে।’ বলে গ্লাসের বাকি তরলটুকু গলাধঃকরণ করে সে কেবিনে ঢুকে গেল।
মা হাসিমুখে বাবার প্রস্থান দেখল। তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, ‘তুই বরং তোর ব্যাঙটার জন্য একটা আস্তানা বানিয়ে নে। ক্লজিটে অনেক খালি বাক্স আছে। আমি ঘাটে গেলাম!!’
আমার ধারণা মা আসলে ক্যানু চড়তে যাবে।
.
কেবিনের ভেতরটা অন্ধকার। বাবা বাথরুমে। আমি নিজের রুমে চললাম। দরজা বন্ধ করে দিয়ে ব্যাটাকে ড্রেসারের ওপর রাখলাম। ওটা এখন পর্যন্ত একটুও নড়াচড়া করেনি। বাইরে বাতাসের বেগ এখন একটু কমেছে তবে গাছের গায়ে বাড়ি খাওয়ার সময় মনে হচ্ছে কেউ ভারি নিঃশ্বাস ফেলছে।
আমি ব্যাঙটির দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে বললাম, ‘তোমার কোন নাম আছে? আমি তোমাকে চুমু খেলে কি তুমি নাম পাবে?’ কিন্তু ওটা নট নড়নচড়নই রইল। আমি ব্যাঙটাকে তুলে নিয়ে নিজের গালে চেপে ধরলাম। ঠাণ্ডা, খসখসে চামড়া। ওটার মুখে ঠোঁট ছোঁয়ালাম।
এমনসময় বাতাসের গতিবেগ বেড়ে গেল, হাঁ হাঁ শব্দ করতে লাগল। আমি ব্যাঙটার পেটে হালকাভাবে চেপে ধরলাম ঠোঁট। ফিসফিসিয়ে একটা নাম উচ্চারিত হতে শুনলাম। গোর? গোর? হ্যাঁ, গোর।
আমার বুকের ভেতরটা লাফাতে শুরু করল। ব্যাঙটিকে বুকের মধ্যে আবার চেপে ধরার তীব্র ইচ্ছে জাগল মনে। এবারে ব্লাউজের বোতাম খুলে প্রাণীটাকে দুই বুকের মাঝখানে চেপে ধরলাম। ওটার ছোট ছোট পায়ের স্পর্শ পাচ্ছি আমার ত্বকে। আয়নায় মুখ তুলে চাইলাম। মিটমিটে আলোয় ওখানে একটি মুখ দেখতে পেলাম। তবে মুখখানা আমার নয়। চোখ বুজলাম আমি। শুনতে পেলাম কেউ ফিসফিস করে আমার নাম ধরে ডাকছে।
‘এলিজাবেথ। আমার দিকে তাকাও, এলিজাবেথ।’
চোখ খুললাম আমি। আয়নার ছবিটি তেমন পরিষ্কার নয় তবে আমি নিশ্চিত ওটা আমি নই। আমি কয়েক মুহূর্ত বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম ওদিকে, ধীরে ধীরে আতঙ্কের একটা ঢেউ গ্রাস করল আমাকে। আমার সামনের মুখটি হাসছে মুখ টিপে। তবে কোন তরুণীর মুখচ্ছবি নয় ওটা, আমার মায়ের বয়সী কেউ। মাথাভর্তি কালো চুল, কপালের মাঝখান দিয়ে সিঁথি। মুখখানার চারপাশটা ছায়াময়, শরীর চেনা যাচ্ছে না। সম্ভবত সে কালো কোন রোব পরে আছে।
আবার তার কণ্ঠ শুনতে পেলাম আমি, যদিও ঠোঁট নড়তে দেখলাম না। ‘আমাকে ভয় পেয়ো না, এলিজাবেথ। আমি তোমাকে সাহায্য করতে এসেছি। তুমি কি আমার কথাটা বিশ্বাস করছ?’
‘জি।’
‘আমার নাম ফ্রান্সিস।’
‘হ্যাঁ, ফ্রান্সিস।’
কণ্ঠটির প্রশ্নের জবাব দেয়ার সময় আমি কী ভেবেছি জানি না। তবে যা-ই বলি না কেন ভয় লাগছিল আমার। শিউরে উঠলাম আমি। ব্যাঙটার কথা মনে পড়ে গেল। আমি ওটাকে ড্রেসারের ওপর নামিয়ে রাখলাম। তারপর ব্লাউজের বোতামগুলো এঁটে নিলাম। তখন আয়নায় ছবিটি মিলিয়ে গিয়ে ওখানে আমার চেহারা ফুটে উঠল।
কণ্ঠটিও মিলিয়ে গিয়েছিল। তবু যেন আমি শুনতে পাচ্ছিলাম ওটা ফিসফিস করছে, ‘এলিজাবেথ, আমাকে প্রত্যাখ্যান কোরো না।’
আমি আয়নার কাছ থেকে সরে আসতেই কণ্ঠটি আর শোনা গেল না।
.
আমি এতক্ষণ যা বললাম তা বোধহয় আপনাদের বিশ্বাস হলো না, না? এসব আমার কল্পনা যদি আপনারা ভেবে থাকেন তো আমি কিচ্ছু মনে করব না। কারণ আমি জানি আপনাদের মনের একটি অংশ, যদি চায় তো ঠিকই আমার কথা বিশ্বাস করবে।
.
তিন
‘বাড়িতে কেউ আছে?’
জেমসের গলা। আমার বাবার ভাই। জেমসের শরীর বেশ সুগঠিত, পেশীবহুল। তার চোখে আমি কখনো অনিশ্চয়তার ছাপ দেখিনি। সে আমার লাভার।
আমি বসার ঘরে গেলাম। বাবা নেই ওখানে। বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে আছে জেমস। আশঙ্কিত ছিলাম ওর স্ত্রী এবং ছেলে সঙ্গে থাকে কিনা ভেবে। স্ক্রিনডোর আমাদের দু’জনকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে যদিও ওকে আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। তবে কেবিনের অন্ধকারের জন্য ও আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। আমি স্ক্রিনডোরের সামনে গিয়ে ফিসফিসিয়ে ডাকলাম, ‘জেমস।’
এখনো জোর বেগে বইছে হাওয়া তাই ও আমার মৃদু কণ্ঠ শুনতে পেল না। আবার হাঁক ছাড়ল সে, ‘বাড়িতে আছ নাকি কেউ?’
‘জেমস,’ আবার ফিসফিস করলাম আমি। সে দরজার দিকে তাকাল। মুখে ফুটল হাসি।
আমি স্ক্রিনের গায়ে হাত রাখলাম।
‘তুমি কি একা?’ জানতে চাইল জেমস।
‘মা-বাবা সম্ভবত ঘাটে গেছে।’
একটি ছিটকিনি লাগানো দরজার এক ধারে। ছিটকিনি তুলে ঠেলা দিলাম দরজায়।
জেমস দরজার হাতল ধরে টানল। ‘এটা বন্ধ।’ বলল সে। ‘খোলো। আমি তোমাকে স্পর্শ করব।’
আমি দরজার কাছ থেকে পিছিয়ে গেলাম। জেমস কী করে দেখব। আপনারা হয়তো ভাবছেন আমি ছেলেমানুষী করছি। কিন্তু জেমস এসব বেশ পছন্দ করে। সে সুযোগ পেলেই ছোটখাট দু’একটা বেপরোয়া কাজকারবার করে ফেলে। আসলে ওর জীবনটা বড্ড জোলো তাই সে মাঝে মাঝে দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। এতে ও খুশি হয় আর ওর খুশি দেখতে আমার ভাল লাগে।
জেমস পা তুলে দরজার মাঝামাঝি থাকা একটা ফোকরে ঝড়াং করে লাথি বসিয়ে দিল। লাথি খেয়ে দরজার ফাটল ভেঙে আরেকটু প্রসারিত হলো। গর্তের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে সে দরজা খুলে ফেলল। ও কেবিনে ঢুকতেই আমি ওর দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ালাম। ও আমার পেছনে এসে বাম হাতটা চালিয়ে দিল আমার বুকে এবং ঘাড়ে কামড় বসাল। আমি সুখ অনুভব করলাম।
.
জাহাজঘাটে বাবা-মাকে পেয়ে গেলাম আমরা। বাবা রাগরাগ চেহারা নিয়ে একটি বোটশেডের নিচ দিয়ে একটি ক্যানু বের করছে।
জেমস চেঁচিয়ে বলল, ‘হাই।’ বাবা আমাকে এ শব্দটি ব্যবহার করতে মানা করেছে। বলেছে টিভির বিজ্ঞাপনচিত্রের মহিলাদের মুখেই নাকি শুধু এ শব্দটি মানায়। বাবা চায় আমি কেষ্টবিষ্টু ধরনের কিছু হই।
‘জিম,’ বলল বাবা। ‘এখানে কী করছ তুমি?’ তাকে আরও রাগান্বিত দেখাল।
মা একটি বিচ চেয়ারে বসেছিল, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, নীল শিরাযুক্ত একখানা পা আরেকটি পায়ের ওপর তুলে হাসল।
জেমস মা’র উরুর দিকে এক ঝলক তাকিয়ে চোখে চোখ চাইল। ‘আমি ক্যাথেরিন আর বাচ্চাটাকে আমার শাশুড়ির বাড়িতে রেখে এসেছি। বুড়ি আমাকে সহ্য করতে পারে না জানোই তো। ভাবলাম তোমাদের সঙ্গে একবার দেখা করে যাই। আমি পিকনিক করার জন্য কিছু জিনিসপত্র নিয়ে এসেছি।
বাবা আমাদের দিকে পেছন ফিরে নৌকা ধরে টানাটানি করতে লাগল। ক্যানুর ধাতব দেহ জাহাজঘাটার উঁচিয়ে থাকা পেরেকগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষে বিশ্রী আওয়াজ তুলল।
মা ভুরু কুঁচকে একবার বাবাকে দেখল তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে হেঁটে গেল জেমসের কাছে। ‘বাহ্, চমৎকার বুদ্ধি করেছ তো, জিম। আমরা ক্যানু নিয়ে কোন দ্বীপে গিয়ে পিকনিক করব।’
‘এমন আবহাওয়ায় অত দূরে যাওয়া যাবে না,’ বলল বাবা।
মা জেমসের হাত ধরল। ‘জিম এবং আমি খাবার রেডি করতে গেলাম। তুমি তোমার বাবাকে ক্যানু রেডি করতে সাহায্য করো, এলিজাবেথ।’ সে জেমসকে নিয়ে রওনা হয়ে গেল কেবিনের পথে।
আমি বসে বসে দেখতে লাগলাম বাবা নৌকাটা নিয়ে কীরকম ধস্তাধস্তি করছে। দূর থেকে ভেসে এল মায়ের খিলখিল হাসি। আমি জানি জেমস মা’র হাসি পছন্দ করে না এবং হাসার সময় তার মুখের চামড়া কুঁচকে গিয়ে যে ভাঁজ পড়ে তা-ও জেমসের খুবই অপছন্দ।
‘তোকে এখানে আমার দরকার নেই,’ বলল বাবা। ‘তুই বরং তোর মাকে গিয়ে সাহায্য কর।’
বাবা বোধহয় চায় না মা জেমসের সঙ্গে একা থাকুক। অথবা সে নিজেই এখন একটু একা থাকতে চাইছে। লক্ষ করেছি আমার সঙ্গ কেমন যেন আড়ষ্ট করে তোলে বাবাকে। বিশেষ করে আমি নারী হয়ে ওঠার পর থেকে। বাবা তখন কী মনে করে যখন আমি তার পাশে হাঁটার সময় তার একটি হাত আমার হাতে তুলে নিই যাতে হাতটি আমার বুকে ঘষতে পারি? আমার ধারণা বাবা তখন জেমসের মত উত্তেজনা অনুভব করে এবং আমার স্কুলের ছেলেদের মত ভীত হয়ে ওঠে। আমার স্কুলের ছেলেরা আমাকে বিচিত্র কোন কারণে খুব ভয় পায়। কাছ ঘেঁষতে চায় না।
মা হয়তো এখন জেমসের হাত ধরে আছে। মা ইচ্ছে করেই হয়তো জোরে জোরে হাসে কারণ সে বুঝতে পারছে তার নারীত্বের শক্তি তাকে ধীরে ধীরে ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে। তার শক্তি বলতে শুধু এটুকুই ছিল।
আমি মায়ের মত ভুল করব না। আয়নার কথা মনে পড়ল আমার, ফ্রান্সিসের আবছা চেহারাটি স্মরণ হলো। ও বলেছিল আমাকে সাহায্য করবে।
বাবা ঠেলাধাক্কা দিয়ে জলে ভাসাল নৌকা।
‘আমরা পিকনিক করতে কোথায় যাব?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি
‘তুমি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছ না, লিজ।’ বাবা রেগে গেলে আমাকে তুমি করে এবং ‘লিজ’ বলে ডাকে।
‘তুমি আমার ওপর রাগ করছ কেন?
‘আমি রাগ করছি না। এটা একটা বিপজ্জনক যাত্রা। আর তুই সাঁতার জানিস না।’
‘তুমি আর মাও তো সাঁতার জানো না।’
‘তোর চেয়ে নৌকা চড়ার অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক বেশি।’
‘তুমি রেগে গেছ কারণ জেমস চাচা এসেছে।’
রাগে বাবার গা কাঁপছে। ‘তুমি আমাদের সঙ্গে আসছ না, লিজ। তুমি কেবিনে বসে বই পড়।’
একবার বাবা আমার বেডরুমে এসেছিল। তখন আমি কাপড় দিয়ে বাইণ্ডিং করা একটি বই পড়ছিলাম। বইটির কাপড় ছিল সাদা, টাইটেলটি সোনার জলে লেখা। বাবা বইটি আমার হাত থেকে নিয়ে আমার ডান হাতটি তার হাতের ওপর রেখেছিল। তার হাতের উল্টোপিঠের লোমে আমার আঙুলের ডগা বুলাতে বুলাতে বলছিল, ‘তুই বড্ড বই পড়িস।’ মার কাছে শুনেছিলাম বাবা ওই রাতে তাস খেলতে গিয়েছিল। বাবাকে খুব হতাশ লাগছিল।
বাবা বোধহয় দুর্দশা, যন্ত্রণা ইত্যাদি বিষয়গুলো পছন্দ করে। সে ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে, নৌকা থেকে ছিটে আসা জলে ভিজে গেছে জুতো। বাবা যদি এখন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলত সে আমাকে নিয়ে কোন দ্বীপে যাবে, আমি বিবর্ণ পা জোড়া টিপে দিতাম, কুঞ্চিত ত্বক ঘষে দিতাম, নখের মধ্যে লেগে থাকা ময়লা দেখেও না দেখার ভান করতাম। যেহেতু বাবা এখন যন্ত্রণাক্লিষ্ট তাই আমি চাই তার যন্ত্রণা আরও বাড়ুক। আমি তার কাছ থেকে সরে এলাম।
কেবিনে ফেরার পথে মনে পড়ল ব্যাঙটিকে আমার ড্রেসারে ফেলে এসেছি। গোর। ও কি এখনো ওখানে আছে? আমি ভাঙা স্ক্রিনডোর খুললাম। জেমস ভাঙা দরজার কী ব্যাখ্যা দিয়েছে মাকে?
ওরা এখন কিচেনে। কথা বলছে খাবারদাবার নিয়ে। তবে আমি নিশ্চিত ওরা অন্য কিছু নিয়ে ভাবছে। আমার দিকে পেছন ফেরা, দু’জনেই। মা সারডিন স্যাণ্ডউইচ বানাচ্ছে। তেল মেখে চকচক করছে হাত, রুটির ওপর সাবধানে বসাচ্ছে মুণ্ডুহীন শরীরগুলো। একটা আঙুল মুখে পুরে চুষল মা। জেমসের প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে সে। মা অশ্লীল, অমার্জিত, ডেসপারেট টাইপের মহিলা। তার বেপরোয়া, মরিয়া প্রবৃত্তিটি আমি আরও বাড়িয়ে দিতে চাই।
.
চার
গোর আগের জায়গাতেই আছে। আমি ওকে হাতে নিয়ে বিছানার কিনারে বসলাম। আয়নার মুখোমুখি বসেছি তবে তাকাচ্ছি না ওদিকে। একটু পরে ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলাম, তারপর ফিসফিস: এলিজাবেথ, তাকাও আমার দিকে।
চোখ তুলে তাকালাম। ফ্রান্সিসকে এই প্রথম পরিষ্কার দেখতে পেলাম। প্রথমে যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে বয়সে তরুণীই লাগছে তাকে: আটাশ/ঊনত্রিশ হবে বোধহয়। চুল এবং চোখের রঙ কালো তবে গায়ের চামড়া কেমন ফ্যাকাসে। মুখখানা কঠোর। পরনে মোটা সুতোর লিনেন ড্রেস।
‘তুমি কি আমাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছ, সোনা?’
‘পাচ্ছি।’
‘তুমি আমাকে কেন দেখতে পারছ তা বুঝতে পারছ?’
জবাব দিতে পারলাম না। চেহারাটা হঠাৎ কেমন কমনীয় হয়ে উঠল, বেশ আকর্ষণীয়া লাগছিল ফ্রান্সিসকে। ওকে আমার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে।
‘তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছ কারণ আমাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে,’ বলল সে। ‘আমি তোমাকে তোমার নিজের ব্যাপারে কিছু জিনিস শেখাতে এসেছি। তোমাকে আমি ক্ষমতা দিতে এসেছি। তুমি কি নেবে?’
‘নেব, ফ্রান্সিস।’
‘তোমার চারপাশের মানুষজন তোমার এই শক্তি বা ক্ষমতাকে বুঝতে পারবে না। ভুল বুঝবে। আমার শরীর কেটেকুটে দেখা হয়েছিল। আমার শরীরটার অমর্যাদা করা হয়েছিল। তোমাকে নিয়েও তা করা হতে পারে। তবে তুমি একে স্বাগত জানিয়ো।
ফ্রান্সিসের কণ্ঠ কোমল হয়ে উঠল। ব্রিটিশ উচ্চারণে সে কথা বলছে তবে এরকম উচ্চারণে কাউকে কথা বলতে আমি আগে কখনো শুনিনি। ‘আমার চিহ্ন গ্রহণ করো।’
অনুভব করলাম কিছু একটা আমাকে স্পর্শ করছে। নিচের দিকে তাকালাম। পরনের খাটো স্কার্টটি আমার উরুর ওপর উঠে আছে, ডান হাঁটুতে বসে আছে একটি মাকড়সা। কুচকুচে কালো। ওটা গা বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। ঝটকা মেরে ওটা ফেলে দিতে চাইলেও পারলাম না কারণ আমি দু’হাতে ধরে আছি গোরকে।
‘তোমাকে নির্বাচিত করা হয়েছে,’ বলল ফ্রান্সিস।.
দাঁড়িয়ে পড়ল মাকড়সা। তীব্র একটা জ্বলুনি অনুভব করলাম যেখানে থেমে রয়েছে মাকড়সাটি সেখানে। আমি হাত নিয়ে গেলাম ওটার দিকে, ব্যাঙটার মুখ থেকে সড়াৎ করে বেরিয়ে এল লম্বা জিভ। পরমুহূর্তে মাকড়সা নেই হয়ে গেল। ওটাকে গিলে ফেলেছে গোর। জ্বলুনির জায়গাটায় লাল ছোট একটা দাগ দেখতে পেলাম আমি। যেন বিচিত্র কোন ভাষার একটি অক্ষরের ছাপ মেরে গেছে কেউ।
.
‘এলিজাবেথ?’ পাশের ঘর থেকে ডাকছে মা।
আয়নায় তাকালাম আমি। ফ্রান্সিস মৃদু হাসছে, তবে চেহারা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। ‘গোর তোমাকে হুকুম দেবে,’ বলেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল। আয়নায় শুধু আমার মুখ। আমিও হাসছি।
‘এলিজাবেথ, তুই ঘরে আছিস?’ খুলে গেল দরজা। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে মা। ‘কী করছিস?’ জিজ্ঞেস করল সে। ‘তোকে কীরকম যেন লাগছে!’
‘কীরকম আবার লাগবে? আমি আমার ব্যাঙটাকে মাকড়সা খাওয়াচ্ছি।’
মা’র কপালের ভাঁজ প্রকট হলো। জেমস তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। আমার উরুতে তার দৃষ্টি।
‘তুই তোর ছোট বন্ধুর সঙ্গে খেলা কর,’ বলল মা। ‘আমরা পিকনিকে গেলাম।’
‘আমাকে নেবে না?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘না, যাত্রাটা বিপজ্জনক।’
‘ওকে সঙ্গে নিলেই পারো, শিলা,’ বলল জেমস। ‘আমি খুব ভাল সাঁতার জানি। নৌকা ডুবে গেলে ওকে বাঁচাতে পারব।’
জেমস আসলে জলের মধ্যে আমার সঙ্গে থাকতে চায়, আমাদের জামাকাপড় শরীরে সেঁটে থাকবে, কালো জলের নিচে আমাদের হাত হাতড়াবে একে অন্যের দেহ। ‘তুমি বরং আমার দিকে লক্ষ রেখো,’ মা বলল জেমসকে। কথাটা তার বলা উচিত হয়নি।
‘তবু তোমাদের সঙ্গে আমি জাহাজঘাটায় যাব।’ গোরকে আমার ব্লাউজের মধ্যে ঢুকিয়ে ওদের পেছনে হাঁটা দিলাম। চলার পথে ছড়িয়ে আছে গাছের শিকড়, যেন মাটি ফুঁড়ে বেরিয়েছে বড় বড় শিরা। মা এবং জেমস ছোট কফিনের মত পিকনিকের ঝুড়িটি ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে। গোরের ঠাণ্ডা শরীর লেপ্টে আছে আমার পেটে। জঙ্গলটাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ছায়াময় লাগছে।
ঘাটে পৌঁছে দেখি বাবা ক্যানুতে বসে আছে, হাতে মদের বোতল। আমাদেরকে দেখে হাসল।
‘তোমরা লাইফ জ্যাকেট নিচ্ছ না?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘না। শুধু ছাতা।’
‘দ্বীপে পৌঁছাতে পারলেই আর চিন্তা নেই,’ বলল মা। ওখানে দু’দণ্ড বসার মত ছাতাঅলা জায়গা আছে।’
ক্যানুতে মালপত্র তুলতে সাহায্য করল বাবা। আমি ঘাটের কিনারে গিয়ে ব্লাউজের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ব্যাঙটিকে বের করে আনলাম। তারপর নৌকার সামনে রেখে দেয়ার সময় ফিসফিসিয়ে বললাম, ‘জেমসের যেন ক্ষতি না হয়।’
বাবা এবং জেমস ক্যানুতে উঠল। মাকে নৌকায় চড়তে সাহায্য করল দু’জনেই। মা নৌকায় ওঠায় সময় খুব হাসাহাসি করছিল। বাবা এবং জেমস নৌকার দু’মাথায় বসল। মা জায়গা নিল মাঝখানে, জেমসের মুখোমুখি।
ক্যানু চলে যাচ্ছে, শুধু জেমস আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলাম কী ঘটতে চলেছে। মা আবার খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করেছে। খুব আনন্দে আছে। জীবনের শেষ আনন্দ।
ধূসর জলে ঝাঁকি খেয়ে, দুলতে দুলতে ক্যানু চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখছি, হঠাৎ মনে হলো কেউ বুঝি আমাকে দেখছে। আমি জঙ্গলের দিকে ঘুরে তাকালাম। মি. হিউবার্ট। লোকে মি. হিউবার্টকে পছন্দ করে না। তিনি জানেন বসন্তে কখন বরফ গলতে শুরু করবে কিংবা তাঁর স্ত্রী চেঁচিয়ে উঠবে রাতের বেলা। মি. হিউবার্ট আমার দাদীর বয়সী। তবে তাঁকে আমার ঠিক বুড়ো বলে মনে হয় না। মনে হয় এক তরুণ যার চেহারাটা বুড়িয়ে গেছে। ইনি খুব কম গোসল করেন। এ লোকটিকে আমার বেশ পছন্দ হয়।
‘হ্যালো, মিস এলিজাবেথ।’
আমি হাত নাড়লাম।
‘এমন আবহাওয়ায় বেরিয়ে তোমরা ঠিক করনি,’ শান্ত গলায় বললেন তিনি। ‘ভুল করেছ।’
‘জানি আমি। ওরা অবশ্য জেনে-শুনেই ভুল করে।’
‘তোমার জেমস চাচাকেও ওদের সঙ্গে দেখলাম মনে হলো।
‘জি।’
‘ওকে তো সাবধানী লোক বলেই জানতাম।’
‘আমার অবশ্য তা মনে হয় না। তবে চাচা ভাল সাঁতার জানে।’
সায় দেয়ার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন মি. হিউবার্ট। নোংরা ঘাড় ঘষতে ঘষতে বললেন, ‘তোমাদের স্ক্রিনডোরটা আমি ঠিক করে দেব।’
আমি আর কিছু না বলে ঘুরে হাঁটা দিলাম কেবিনের দিকে।
.
বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছি আমি। অপেক্ষা করছি কেউ এসে বলবে আমার জীবনটা হঠাৎ বদলে গেছে। আমার পেছনে, কেবিনে আয়নায় ফুটে আছে মরাটে পাইন কাঠের দেয়াল। লেক থেকে উঠে আসা ঝড়ো বাতাস আছড়ে পড়ছে আমার গায়ে। আমি আমার পায়ের লাল দাগটা দেখতে পেলাম। আমার গা কাঁপতে শুরু করল।
.
অনেকক্ষণ বাদে যখন মুখ তুলে তাকালাম, দেখি সামনে দাঁড়িয়ে আছে জেমস এবং মি. হিউবার্ট। আমি চেয়ারের হাতল চেপে ধরলাম। মি. হিউবার্ট এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। তাঁর চাউনিতে অভিযোগ নাকি সহানুভূতি ঠিক বুঝতে পারলাম না। জেমসের ভেজা কাপড় তার শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। জট পাকানো চুল দিয়ে এক ফোঁটা জল পড়ল, কপাল বেয়ে, গাল হয়ে মুখের কিনারে চলে গেল। হাসছে জেমস।
.
