ডাইনি – ৫
পাঁচ
এভাবেই দাদীমার বাড়িতে থাকতে আসতে হলো আমাকে। বাড়িটি তৈরি হয়েছিল ১৮৩৬ সালে। এখানে তেইশটি আয়না আছে। আমার সবচেয়ে পছন্দের আয়নাটি রয়েছে চিলেকোঠায়, বহু বছর আগে ইংল্যাণ্ডে এটি বানানো হয়।
জেমসও দাদীমার বাড়িতে থাকছে। আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে প্রায়ই চিলেকোঠায় আসে। আমরা আয়নার সামনে, আধ পেঁচানো একটি কম্বলের ওপর শুয়ে পড়ি। আমি জেমসকে ফ্রান্সিসের কথা কিছু বলিনি। সে জানে না ফ্রান্সিস আমাদেরকে দেখে এবং নানান অপ্রীতিকর কথা বলে।
আমি মাঝে মাঝে জেমসের স্ত্রী এবং তার ছেলের কথা ভাবি। ওরা চিলেকোঠার ঠিক নিচের ঘরটিতেই থাকে। ওরা নিশ্চয় আমাকে নিয়ে বিব্রত হয় তবে আমাকে একজন নতুন কন্যা এবং বোন হিসেবে মেনে নেয়ার চেষ্টাও করছে।
.
দাদীমাকে শুধু ডিনারের সময় দেখা যায়। তিনি তাঁর জন্মের আগের ঘটনা নিয়েই কেবল কথা বলেন। অনেক বছর আগে তিনি এমন কিছু একটা করেছিলেন যে কারণে তাঁর স্বামী রাগে দুঃখে তাঁকে ছেড়ে চলে যান। তারপর থেকে তিনি দাদীমার সঙ্গে কথা বলেননি বা দেখাও করেননি। কিন্তু দাদী তাঁর স্বামীর পদবীটি এখনো বহন করে চলেছেন, ভোগ করছেন তাঁর সহায়-সম্পত্তিও। তাঁর নাম জোনাথন হ্যামিলটন। তাঁর অফিসভবনটি আমাদের বাড়ির সঙ্গেই তবে তিনি কখনো আমাদের বাসায় আসেননি।
অষ্টাদশ শতকে আমেরিকা আসার পর থেকে হ্যামিলটনরা জাহাজের কারবার করে আসছে। তারা জাহাজের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাম্বিস-কাপড়, রশিসহ নানান জিনিসের ব্যবসা করে। সওদাগরদের কাছে এসব জিনিস বংশ পরম্পরায় তারা বিক্রি করে আসছে। এ লোকগুলোর জীবনধারণ সম্পর্কে অবগত জেমস। সে রাতের বেলা জেগে থাকত, কালো জলের স্রোতের বিরুদ্ধে ইস্পাতের প্লেটের লড়াই দেখেছে। গ্যালির গ্রিজের বাসি গন্ধ তার নাকে এসে ধাক্কা মারত, রাঁধুনিকে দেখত কাশতে কাশতে মুখ থেকে রক্ত বের করে ফেলেছে। সে বলে জাহাজীরা যেরকম অমানুষিক পরিশ্রম করে তা কোন মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়।
আমাদের ঠিকানা হলো ৪৬ কোয়েন্টিস স্লিপ, আমাদের কোন পড়শী নেই, সে অর্থে নেই। দিনের বেলা রাস্তাঘাট সরগরম থাকে শ্রমিক, রপ্তানিকারক, শিপ ব্রোকারসহ কয়েক ব্লক দূরের চারতলা ভবনের অফিসকর্মীদের পদচারণায়। প্রতি বছরই ফিনানশিয়াল ডিস্ট্রিক্টের স্কাইস্ক্রাপারগুলো হাত বাড়িয়ে ক্রমাগত আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে আর আমরা ওয়াটারফ্রন্টে, কাচ এবং ধাতব দিয়ে ঘেরা চল্লিশতলা সমান পর্দার দিকে ক্রমে কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছি।
তবে রাতের বেলা ওই ভবনগুলোতে আর প্রাণের সাড়া থাকে না। শ্রমিকরা চলে যায় ম্যানহাটান কিংবা নদীর ওপারে, জেটিতে একলা থাকে হ্যামিলটনরা আর আঁধার রাস্তায় চোরের মত ঢুকে পড়া বেড়ালগুলো।
.
আমাদের নৈশভোজের বর্ণনা দিলে আপনারা আমাদের জীবনযাত্রার ধরন সম্পর্কে মোটামুটি একটি চিত্র পাবেন। সাতটার সময় পরিবেশন করা হয় ডিনার। ততক্ষণে রাস্তাঘাট চুপচাপ হয়ে আসে, বাড়িটি নিজেও। আমরা এমনিতেই চুপচাপ স্বভাবের মানুষ, জেমসের সাত বছর বয়সী ছেলে কিথও। তার শখ সাপ সংগ্ৰহ।
মি. এবং মিসেস টেলর বেসমেন্টে থাকে। তারা ঘরদোর ঝাঁট দেয়, রান্না করে। ওদের চেহারায় কেমন নিষ্পাপ একটা ভাব আছে। এদের সম্পর্কে আমি বেশি কিছু জানি না তবে জানতে হবে।
ডিনারের আগে আমি স্টাডিরুমে বসে থাকি। এটি ডাইনিংরুমের পাশেই। নিচের কিচেন থেকে নানান শব্দ ভেসে আসে। মিসেস টেলর ছোট ছোট জন্তুগুলোকে রোস্ট করছে। আর বড়গুলোর মাংস কেটে টুকরো করছে।
ওপরতলায় জেমসের আরছা গলা শুনতে পাই আমি, সে তার স্ত্রী ক্যাথেরিনের সঙ্গে কথা বলছে। জেমস তার বউকে কী বলছে তা নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই। জেমসের ধারণা আমি ক্যাথেরিনকে হিংসা করি। এরকমটি ভাবার কারণ জেমস ভাবছে সে যেমন আমার প্রেমে পড়েছে আমিও বুঝি তার প্রেমে পড়েছি।
দাদীমা প্রতিদিন কাঁটায় কাঁটায় সন্ধ্যা সাতটায় ডাইনিংরুমে প্রবেশ করেন। তাঁর পরনে সবসময়ই মেঝেতে লুটানো কালো পোশাক থাকে। তাঁর শরীর ছিপছিপে এবং দৃঢ়। আমার ভেবে অবাক লাগে দাদীমা সারাদিন ঘরের মধ্যে নিজেকে আটকে রেখেও কী করে গায়ের চামড়া এবং স্বাস্থ্য এমন চকচকে রেখেছেন। আমার খুব ইচ্ছে করে দাদীমা ঘরে ঢুকতে। কিন্তু তাঁর অনুমতি ছাড়া ওখানে যাওয়া নিষেধ।
জেমস বসে দাদীমার ডান ধারে, তার স্ত্রী তার বিপরীতে। আমি বসি জেমসের পাশে, কিথের মুখোমুখি। সে ছোকরা খাবার প্লেট থেকে খুব কমই মুখ তুলে তাকায়। আমার পেছনে, ফায়ারপ্লেসের ওপরে গিল্টি করা বাঁধানো একটি আয়না আছে। কিথ বোধহয় ওদিকে তাকাতে ভয় পায় তাই খাওয়ার সময় মুখ তুলে চায় না।
খাবার পরিবেশন করে মি. টেলর। সে খুব সাবধানে চিনেমাটির পুরনো বাসনকোসনগুলো সামাল দেয় আর ঘন ঘন তাকায় দাদীমার দিকে। খাওয়া শুরুর আগে দাদীমা সবার দিকে তাকান যেন এই প্রথম তিনি আমাদেরকে দেখছেন। তিনি কথা খুব কমই বলেন, শুধু নিজের পূর্বপুরুষদের জীবনের গল্প বলা ছাড়া। আমার ধারণা ওই গল্পগুলো মিথ্যায় ভরপুর তবু আমি মনোযোগ দিয়ে শুনি কারণ তিনি প্রায়ই অপ্রাকৃত কাহিনী শোনান।
দাদীমা বলেন ষোড়শ শতকে এসেক্সে তাঁর ইংরেজ পূর্বপুরুষদের একটি বাড়ি ছিল। তিনি মাঝেমধ্যেই ‘ধূর্ত লোক’দের কথা বলেন যারা আশপাশেই নাকি বাস করত।
জেমস বলে সে নাকি দাদীমাকে কখনো একই গল্প দুইবার বলতে শোনেনি। তার ধারণা দাদীমা সারাদিন ঘরে বসে গল্প বানান এবং সন্ধ্যাবেলা সেগুলো আমাদের কাছে উগরে দেন। কথা বলার সময় তাঁর পাতলা ঠোঁটের ফাঁকে চিবানো খাদ্যদ্রব্য দেখা যায়।
.
একদিন ডিনারের সময় জেমস আমাকে বলল বাইরের কোন্ এক লোক নাকি আসবে আমাদের বাড়িতে। আমি জানি ও আমাকে এমন কোন কথা বলতে চাইছে যার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই ডিনারের পুরোটা সময়ই সে আমাকে লক্ষ করছিল, আমার মূড বুঝবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু ও কোনদিনই বুঝতে পারবে না যে আমার শুধু একটিই মূড আছে।
ডেজার্ট পরিবেশনের সময় সে বলল, ‘এলিজাবেথ, তোমার জন্য একটি সুখবর আছে।’ তার মানে দুঃসংবাদ। ‘তোমার জন্য একজন টিউটর নিয়োগ দিয়েছি। সে আমাদের সঙ্গেই থাকবে, তুমি আবার স্কুলে না যাওয়া পর্যন্ত তোমাকে পড়াবে।’
আমি দাদীমার বাড়ি আসার পর থেকে আর স্কুলে যাইনি। আসলে যেতে চাইনি। স্কুল আমার ভাল লাগে না যদিও সবসময় পরীক্ষায় ভাল মার্কসই পেয়েছি। শিক্ষক কিংবা পড়াশোনা নিয়ে আমার কোন নালিশ নেই। তবে সহপাঠীদেরকে আমার ভাল লাগত না। তাদের গুজুর গুজুর, ফুসুর ফুসুর, ঋতুস্রাব আর বেসবল নিয়ে মুখ টিপে হাসাহাসি আমার অসহ্য লাগে।
জেমস উৎকণ্ঠিত ভঙ্গিতে হাসছিল। সে দুশ্চিন্তা করছিল আমরা যখন একা হব তখন তাকে না জানি কত ঝাড়ি দিই।
‘এসবের প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না,’ বললাম আমি। ‘আর স্কুলে যাওয়ার কোন ইচ্ছেই আমার নেই।’
ক্যাথেরিন সস্নেহে তাকাল আমার দিকে।’ কিন্তু তুমি তো খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে। তোমার প্রতিভা আমরা এভাবে নষ্ট হতে দিতে পারি না। আমি নিশ্চিত তুমি শীঘ্রি তোমার মত বদলাবে।’
বুঝতে পারলাম সবকিছু ক্যাথেরিনই ঠিকঠাক করেছে। কিথ বিশ্রী ভঙ্গিতে হাসছিল। তাকে প্রাইভেট একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। স্কুলটা তার ভাল লাগে না এবং সে ওখানে রেজাল্টও খুব একটা ভাল করছে না।
এ বন্দোবস্ত প্রত্যাখ্যান করার কোন ব্যাখ্যা আমি পেলাম না। আমি জানি আমার শিক্ষককে ঠিকই ঢিট করে পরিস্থিতি নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসতে পারব। আশা করি টিউটরটি পুরুষ হবে।
‘টিউটটি কে?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘তার নাম মিস বার্টন।’ বলল ক্যাথেরিন। ‘খুব ভাল শিক্ষক, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইতিহাস দারুণ পড়ান। আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়া তিনি। তোমার দাদীমা তার সঙ্গে পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে অনেক গল্প করেছেন।’
‘বুড়ো মানুষ নাকি?’
‘না, না, বুড়ো মানুষ না! যদিও বয়সে তোমার থেকে অনেক বড়। ধরো ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ।’
আমি জেমসের দিকে তাকালাম। হয়তো ক্যাথেরিনের ব্যাপারে ভুল ভেবেছিলাম আমি। জেমসই এই শিক্ষয়িত্রীকে জোগাড় করেছে আরেকজন নারী সঙ্গী বাড়িতে তার দরকার বলে। মেয়েদের মনোযোগ এবং আকর্ষণ পেতে সে খুব __ করে। কোন মহিলা যখন তার শরীরের দিকে তাকায় সে খুব খুশি হয়ে ওঠে। মিসেস টেলর রান্নাঘর থেকে মুখ তুলে যদি দেখে সামনে খোলা রোব পরে দাঁড়িয়ে আছে জেমস, অবাক হব না মোটেই। তখন চমকে গিয়ে তার হাড্ডিসার হাত থেকে ছুরিটা খসে পড়ে যাবে মেঝেতে।
‘মিস বার্টনের সঙ্গে তোমার জলদি খাতির হয়ে যাবে,’ আমাকে বলল জেমস। ‘খুব কল্পনাবিলাসী মহিলা।’
আমার ধারণা কল্পনাবিলাসী মানুষরাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সমস্যার সৃষ্টি করে। আমি বললাম, ‘তোমরা যখন টিউটর ঠিক করেই ফেলেছ তখন আমার আর কী বলার থাকতে পারে?’
‘তুমি কয়েকদিন ওনার সঙ্গে একটু বসেই দেখ না।’ বলল ক্যাথেরিন। ‘মিস বার্টন আগামী হপ্তায় আসছেন আমাদের বাড়িতে। কিছুদিন ট্রায়াল দেবেন। দোতলায় অতিরিক্ত বেডরুমে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
কনিয়াকের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে কান খাড়া করে আমাদের কথা শুনছিলেন দাদীমা। তিনি ডিনার শেষে সবসময় কনিয়াক পান করেন। তিনি কোন মন্তব্য করলেন না তবে জেমসের দিকে কটমট করে তাকালেন, আমি নিশ্চিত একদিন সেইদিন আসবে যখন দাদীমা তাঁর ঘরে আমাকে যেতে বলবেন। একে অপরকে বলার মত অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা রয়েছে আমাদের।
খাওয়া শেষে চিলেকোঠায় চলে এলাম আমি। জেমস অপেরায় যাচ্ছে। এখন আর আসবে না আমার কাছে। জেমস অপেরা বেশ পছন্দ করে তবে আমার কাছে খুব অশ্লীল লাগে।
আমি কার্পেটের ওপর বসে তাকালাম আয়নায়, অপেক্ষা করছি আমার গোপন আনন্দের জন্য। হাজির হওয়ার আগে ফ্রান্সিস আমার সঙ্গে কথা বলে, মৃদু গলায় সে শুরু করে, ক্রমে তার কণ্ঠ চড়া এবং পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
‘আমার এলিজাবেথকে আজ বড় মনোরম লাগছে।’ বলল সে। আমি তার বিচিত্র কথাবার্তায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সে যে সব অদ্ভুত শব্দ ব্যবহার করে তা শুনতে ভালই লাগে। ‘কুমারী থাকাকালীন আমিও মনোরম ছিলাম দেখতে। আর তোমার জেমসের মত পুরুষরা তাতে পুলকবোধ করত। ফিটফাট বাবুরা আমাকে তাদের শয়নকক্ষে আমন্ত্রণ জানাত। তুমি আমার কিশোরকালের চেহারাটি দেখনি। দেখছ কি?’
‘না, ফ্রান্সিস। দেখতে পারি?’ আমার বেশ সময় লেগেছে বুঝে উঠতে যে ফ্রান্সিস একেক সময় একেক বয়স নিয়ে হাজির হয়। প্রথমে ভেবেছিলাম আয়নার কাচে টোল খাওয়ার কারণে হয়তো তার চেহারাটা ভাঙাচোরা দেখাচ্ছে, পরে বুঝতে পেরেছি সময়ের নিষ্ঠুর থাবা পড়েছে তার অবয়বে। তবে পঁচিশের বেশি বয়সে তাকে কখনোই দেখেনি আমি।
‘দেখো, আমার খরগোশ,’ বলল সে। ‘তোমার বয়সে আমি এমনই ছিলাম দেখতে।’
ধীরে ধীরে একটি চেহারা আকৃতি পেতে লাগল। সে এখন আমার খুব কাছাকাছি। সে এর আগে সবসময়ই দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়েছে ফলে তার পুরো কাঠামোটি দেখেছি। সে রাতে শুধু কোমরের ওপরের অংশ দেখতে পেলাম।
ফ্রান্সিসকে বড় হয়ে ওঠার পরের চেহারায় আমি দেখেছি। তাতে তাকে খুব একটা সুন্দর লাগেনি আমার। তবে কমবয়েসী ফ্রান্সিসকে দেখে স্বীকার করতেই হলো সে খুব সুন্দরী ছিল। জানি না প্রৌঢ়া বয়সে তার সৌন্দর্য কীভাবে ক্ষয়ে গেল।
‘তুমি খুশি হয়েছ তো?’ জিজ্ঞেস করল সে। তাকে এমন নম্র স্বরে কথা বলতে শুনিনি কখনো।
‘হ্যাঁ, ফ্রান্সিস।’
‘আমার তখন একমাত্র ক্ষমতা ছিল, আবির্ভূত হওয়া। ওই শক্তি অর্জনের জন্য আমার চেহারার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়, সোনা।’ ফ্রান্সিসের পরনে লোকাট গাউন। এমনিতে সে সবসময় হাইনেকড ড্রেস পরে। আমি তার বুকের দুধসাদা চামড়া দেখতে পেলাম। ‘ভাল মত লক্ষ করো।’ বলল সে।
কথাটি বলার পরপরই তার চেহারায় রদবদল শুরু হয়ে গেল। ছোট ছোট পেশীগুলো যেগুলো তার চেহারায় এনে দিয়েছে সজীবতা এবং নমনীয়তা তা নরম হয়ে কেমন ঝুলে যেতে লাগল। চোখ এবং মুখে উদয় হলো বলিরেখা। ফ্যাকাসে রঙের গলায় তৈরি হলো অসংখ্য ভাঁজ, সেখানে ফুটল আমার ঊরুর মত একটি লাল টকটকে চিহ্ন। লাল চিহ্নটি ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিসের চেহারার ভাঙচুর থেমে গেল। তবে এখন আর তাকে সুন্দর লাগছে না। খুবই কুৎসিত লাগছে।
ফ্রান্সিসের সঙ্গ লাভের আনন্দ অকস্মাৎ উবে গেল আমার মন থেকে। আয়নায় ওকে দেখার চেয়ে নিজেকেই বরং দেখতে ইচ্ছে করছিল।
‘তোমার যেমন ইচ্ছে, এলিজাবেথ,’ বলল সে, যদিও আমার চিন্তাটি প্রকাশ করিনি মুখে। তার জায়গায় স্থান করে নিল আমার চেহারা, না, বরং বলা উচিত আমার একটা ক্যারিকেচার। ত্রিশ বছর বয়সী নিজেকে দেখতে পাচ্ছি আমি আয়নায়। আমার চামড়া বিশ্রীভাবে কুঁচকে আছে। কী ভয়ঙ্কর!
এমন ভয় পেলাম যে একছুটে বেরিয়ে এলাম চিলেকোঠা থেকে। পেছন থেকে ভেসে এল ফ্রান্সিসের খনখনে হাসি।
হলওয়েতে ঝড়ের বেগে পাশ কাটালাম কিথকে। তার হাতে গাঢ় সবুজ রঙের সাপ। আমাকে দেখে তার মুখ হাঁ হয়ে গেল ভয়ে-বিস্ময়ে। ও আমার মধ্যে এমন কী দেখল যে অমন ভয় পেল?
আমি দ্বিতীয়বার আর ওর দিকে তাকালাম না। ছুটতে ছুটতে ঢুকে পড়লাম নিজের ঘরে। সেখান থেকে সোজা বাথরুমে। উজ্জ্বল আলো জ্বেলে দিলাম। তাকালাম আয়নায়। আমি যা তাই দেখতে পেলাম ওখানে: সুন্দরী, কিশোরী একটি মেয়ে যার মুখে কোন দাগ নেই। ফোঁস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। নিজেকে ওইসময় বড্ড ছেলেমানুষ মনে হচ্ছিল। তবে ওই-ই শেষবার।
.
ছয়
তিনদিন বাদে হাজির হলো মিস বার্টন। সেদিন সকালে আমার ঘরে এল জেমস। প্রায়ই সে আসে। ক্যাথেরিনকে বলেছে আমাকে ঘুম থেকে জাগাতে যাচ্ছে। তবে সে ঘরে ঢোকামাত্র আমি ঘুম থেকে জেগে যাই। আমি নগ্ন হয়ে ঘুমাই। জেমস দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ক্যাথেরিনকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, ‘ওঠার সময় হলো, এলিজাবেথ।’ আমি তখন হাসি এবং গায়ে চাদরটা টেনে নিই। জেমস আমার বিছানার পাশে বসে চাদর সরিয়ে দিয়ে আমার উরুতে সেই চিহ্নটির ওপর চুম্বন করে।
জেমস ঘর থেকে বেরুবার সময় মনে করিয়ে দিল নাশতার টেবিলে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে মিস বার্টনের আমি আয়নার দিকে ফিরলাম। আমি ততদিনে বুঝতে পেরেছি ফ্রান্সিস শুধু তখনই আয়নায় হাজির হয় যখন আমার তাকে দেখতে ইচ্ছে করে কিংবা আমার জন্য যদি কোন মেসেজ থাকে।
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম ওকে ডাকব কিনা, এমন সময় সে আবির্ভূত হলো। ভোরের আলোয় তার চেহারা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে তবে সে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে, দোরগোড়ায়। কথা বলছে না। আমি কিছুক্ষণ তাকে লক্ষ করলাম। তার আজকের চেহারাটা যেন একটু অন্যরকম লাগছিল। তারপর বুঝতে পারলাম সে আধুনিক পোশাক পরে আছে; হাঁটু পর্যন্ত লম্বা, ধূসর রঙের স্কার্ট এবং লং স্লিভড বেগুনি রঙা ব্লাউজ।
সে শুধু একটিমাত্র শব্দ উচ্চারণ করল: ‘সাবধান।’ তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি তার নাম ধরে ডাকলাম। কিন্তু আয়নায় শুধু আমার প্রতিচ্ছবি ফুটে আছে। আমার তখন খুব ভয় লাগছিল।
মিস বার্টনের সঙ্গে সাক্ষাতে আমার মোটেই আগ্রহ নেই। আমি ধীরে সুস্থে গোসল সারলাম তবে কোন সাবান ব্যবহার করলাম না। পুরনো মার্বেল পাথরের মেঝেতে শুয়ে আবার জলসিক্ত শরীরটা দেখলাম। আমি ভাবছিলাম আমি সুখী কিনা।
জামাকাপড় পরা শেষ হয়েছে, এমন সময় নক হলো দরজায়। দরজা খুললাম। ক্যাথেরিন।
‘এলিজাবেথ,’ বলল সে। ‘এসো, মিস বার্টনের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দিই।’
একপাশে সরে দাঁড়াল ক্যাথেরিন, দোরগোড়ায় আত্মপ্রকাশ করল এক মহিলা। পরনে ধূসর রঙের স্কার্ট আর বেগুনি ব্লাউজ। এ তো ফ্রান্সিস!
‘হ্যালো, এলিজাবেথ,’ বলল সে।
আমি এমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম যে একমুহূর্ত কথা জোগাল না মুখে। তবে মহিলার চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে বুঝতে পারলাম এ ফ্রান্সিস হতে পারে না।
হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠলাম দ্রুত। মনে পড়ল ফ্রান্সিস বিপদ সম্পর্কে আমাকে সাবধান করে দিয়েছিল। আমি আমার নতুন শক্তি ব্যবহারের সুযোগটা নিয়ে হেসে বললাম, ‘কেমন আছেন, মিস বার্টন? আপনার ফার্স্ট নেম ফ্রান্সিস, তাই না?’
বিস্মিত দেখাল মহিলাকে। ‘না।’ বলল সে। ‘আমার নাম অ্যান। তবে তুমি আমাকে মিস বার্টন বলে ডাকতে পার।’
‘জি, আচ্ছা।’
আমি নিশ্চিত এমন একদিন আসবে যেদিন সে আমাকে অনুনয় করে বলবে যাতে আমি তাকে অ্যান বলে ডাকি। তবে সেদিন আমি তার অনুরোধ রক্ষা করব না।
নাশ্তা খেতে যাওয়ার সময় মহিলার ঘরের সামনে দিয়ে যেতে হলো। এক ঝলক দেখতে পেলাম অন্ধকার ক্লজিটে তার গোটা চারেক পুরনো আমলের ড্রেস অবহেলায় ঝুলছে। তার অনাকর্ষণীয় শরীরের মতই কেমন টকটক গন্ধ আসছে ওগুলো-থেকে।
কিথ গেছে স্কুলে, জেমস তার কাজে। ক্যাথেরিন, মিস বার্টন এবং আমি বসলাম ডাইনিংরুমে। আমি টোস্ট আর বিশ্রী স্বাদের চা খেলাম। ওরা দু’জন নার্ভাস ভঙ্গিতে কথা বলছিল, মাঝে মাঝে একে অন্যের শরীর স্পর্শ করছিল। শীঘ্রি ভুলে গেল আমার কথা।
দুই অবহেলিত নারী, একজন অপরজনের কাছে এখুনি তার দুঃখের কাহিনী বলে সান্ত্বনা পেতে চাইছে। মিস বার্টনের মত মহিলা আমার জন্য কোন হুমকি হতে পারে ঠিক বিশ্বাস হলো না।
নাশতা সেরে ক্যাথেরিন মিস বার্টনকে নিয়ে বেরুল বাড়িটি ঘুরিয়ে দেখাতে। ক্যাথেরিন এ প্রাচীন বাড়ির প্রতিটি কার্পেট, কিউরিও, পেইণ্টিং এবং আসবাবের ইতিহাস জানে। নিজেকে সে ইতিহাসবিদ ভাবে। আমাদের ডাইনিংরুমে ম্যান্টেলের ওপর দড়ির ফাঁস আলগা করার জন্য একটি লোহার কাঁটা আছে। মাঝে মাঝে ওটা আমি হাতে নিই, শক্ত করে ধরে রাখি। দেখতে পাই জাহাজের ডেক থেকে মুমূর্ষু মানুষ পড়ে যাচ্ছে সাগরে।
এ বাড়িতে আরও অনেক জিনিসপত্র আছে যা আমাকে অতীতের দৃশ্য দেখায়। সেসব মোটেই দৃষ্টিনন্দন নয়। আমি এ বাড়িটি ভালবাসি। আশা করি এটি ছেড়ে আমাকে কখনো চলে যেতে হবে না।
আমি আমার বেডরুমে গেলাম। দুই মহিলা তখন বাড়িঘর ঘুরে দেখছে, নিচু গলায় কথা বলছে, হাসছে। বেডরুমে ফ্রান্সিস আমার জন্য অপেক্ষা করছিল 1
‘মিস বার্টনকে ছোট করে দেখ না।’ বলল সে।
‘কিন্তু তাকে দেখে তো আমার কোন হুমকি বলে মনে হলো না।’
‘ও যে আমার বেশ ধরে আছে দেখতেই পাচ্ছ।’
‘তা দেখেছি। কিন্তু তোমার মত শক্তি তো আর ওর নেই।’
‘ও আমার বংশধর। আমার পূর্বপুরুষরা আমাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেছিল। আবারও বলছি, সারধানে থেকো।
এই প্রথমবার ভাবলাম ফ্রান্সিসের চেয়েও কি আমার শক্তি বেশি হবে?
‘আমি সাবধানে থাকব,’ বললাম আমি। ‘তুমি এখন বিশ্রাম নাও।’
ফ্রান্সিসের ছবি ঝাপসা হয়ে গেল। আমি নিচতলায় স্টাডি রুমে গেলাম। অপেক্ষা করছি মিস বার্টনের জন্য। সে এলে পড়াশোনা শুরু করব।
.
সে রাতে, ডিনারে বসে দাদীমার সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিল জেমস যা আমি আগে কখনো ঘটতে দেখিনি। বাড়িতে এক অদ্ভুত মহিলার আগমন তাকে উত্তেজিত করে তুলেছে। এবং আমি জানি চিলেকোঠায় সে আমার সঙ্গ কামনা করছে ভীষণভাবে।
‘মিস বার্টন,’ বললাম আমি। ‘ডিনার শেষে আপনাকে আমি আমাদের মহল্লা ঘুরিয়ে দেখাব।’
জেমসের চেহারা কেমন ফ্যাকাসে মেরে গেল। ‘কাজটা সকালে করলে ভাল হয় না?’
‘রাতের বেলায় ঘুরে বেড়াতেই বেশি মজা।’
‘তাহলে তোমাদের সঙ্গে আমি যাব,’ বলল সে।
‘আমার মনে হয় ওরা দু’জনেই দিব্যি ঘুরে বেড়াতে পারবে,’ বলল ক্যাথেরিন। ‘তুমি ছিনতাইকারীদের ভয় পাচ্ছ তো? ওরা থাকে শহরের ভেতরের দিকে।’
জেমস আর কিছু না বলে মদের গ্লাসে চুমুক দিল।
‘একদা এ বাড়ির দরজার বাইরে নোঙর করত জাহাজ,’ বললেন দাদীমা। ‘ট্রাকের গর্জনের বদলে হ্যামিলটনরা কাঠের ক্যাচকোচ শব্দ শুনত। জাহাজের ঘণ্টি বাজত সারারাত ধরে।’
.
মিস বার্টন এবং আমি ব্যাটারি পার্কের দিকে সরু, জনশূন্য রাস্তা ধরে হাঁটছি। আমাদের মুখগুলো ফ্যাকাসে, অফিসভবন থেকে ছিটকে আসা আলোর দু’একটি রেখা পড়ছে গায়ে। ওখানে ময়লার ঝুড়ি পরিষ্কার করা হচ্ছে। আমি ভাবছিলাম যারা দিনের বেলায় ময়লার ঝুড়ি ভরে রাখে তাদের বিষয়ে নৈশশ্রমিকদের কোন আগ্রহ আছে কিনা।
দাদীমার বলা কথাটা মনে পড়ছে আমার। এ মুহূর্তে যে রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছি তা একসময় ছিল জেটির অংশ। জমিন বৃদ্ধি করেছে শহরের আয়তন; বর্তমান সরিয়ে দিয়েছে অতীত।
‘আপনি কি কখনো অন্যসময়ে বাস করতে চাইবেন, মিস বার্টন?’
‘অন্যসময়ে বাস করার ব্যাপারটিই তো আমার কাছে হাস্যকর লাগে, বলল মিস বার্টন। একটু থেমে যোগ করল, ‘তোমাকে একটা কথা বলি? আমি তোমার সমস্ত প্রশ্নের সহজসরল জবাব দিতে চাই। চাই তোমার সঙ্গে আমার একটি বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠুক। আশা করি তুমিও আমার সঙ্গে সরল ব্যবহার করবে, সৎ থাকবে।
‘নিশ্চয়,’ এ মহিলার সঙ্গে সৎ থাকার কোন ইচ্ছেই আমার নেই।
আমরা ফ্রান্সিস ট্যাভার্নের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম। এখানে, ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে জর্জ ওয়াশিংটন তাঁর অফিসারদের উদ্দেশে বিদায় বক্তৃতা করেছিলেন।
‘বিল্ডিংটা দারুণ তো,’ মন্তব্য করল মিস বার্টন। আমি তাকে বলতে পারতাম এ ভবনটি আসলে ১৯০৭ সালে তৈরি করা হয় এবং জনৈক সমালোচক এর নামকরণ করেছিলেন ‘উইশফুল আর্কিওলজি’। এর উদ্দেশ্য ছিল আমার বাবার মত লোকজন যেন তাদের মক্কেলদেরকে লাঞ্চ করানোর জন্য এখানে নিয়ে আসতে পারে। তবে আমি কিছুই বললাম না।
‘নিউ ইয়র্কে এরকম অতীতকালের বেশ কিছু নিদর্শন রয়েছে,’ বলে চলল সে। ‘পুরনো জিনিসপত্র খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওগুলো হলো আয়নার মত যেখানে প্রাক্তন জীবনের প্রতিচ্ছবি আমরা দেখতে পাই।
কথাটা কি ইচ্ছে করে বলা হলো নাকি মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে? হয়তো কোনকিছু না ভেবেই কথাটা বলেছে মহিলা। আমি ব্যাপারটা অগ্রাহ্য করলাম। ব্যাটারি পার্কে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। জলের ওপর থেকে ভেসে এল একটা দমকা হাওয়া। বাতাসে কীসের যেন গন্ধ ধরতে পারলাম না।
পার্ক প্রায় খালি, ক্যাসল ক্লিনটনের বিরাট শরীর আমাদের মাথার ওপর ঝুঁকে আছে। এটি ঊনবিংশ শতকের প্রথম দিকে তৈরি একটি প্রাসাদ। গোলাকার, ছাদবিহীন। ওখানে কোন মানুষজন মারা গেছে কিনা জানি না আমি।
আমরা বেবী ক্যারিজ উওম্যান-এর মূর্তির পাশ কাটালাম। একটা ফেরিকে দেখলাম স্টানটন আইল্যাণ্ডে যাচ্ছে। মিস বার্টন ওটার আলোর দিকে কেমন ব্যাকুল হয়ে তাকিয়ে আছে। মনে হয় সে অন্ধকার পছন্দ করে না।
আমরা জলের ধারে রেইলিং-এ ঝুঁকে জেটির দিকে তাকিয়ে আছি। মিস বার্টন স্ট্যাচু অভ লিবার্টি দেখছে। আমি আমার বাবা-মা এবং লেক জর্জের কথা ভাবছিলাম। জেমস বলেছে আমার বাবা-মা জলে পড়ার পরে হাত পা ছোড়াছুঁড়ি করেনি, যেন শীতল, চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলা জলের দেয়ালটাকে স্বাগত জানাচ্ছিল। আচ্ছা, মিস বার্টন কি সাঁতার জানে?
আমরা বাড়ি ফেরার পথে কেউ কোন কথা বললাম না।
.
সে রাতে জেমস এল চিলেকোঠায়। আমরা দু’জনে মিলে সেসব কাজ করলাম যা প্রায়ই করে থাকি। এ কাজগুলো জেমসকে শারীরিক ব্যথা দেয়। আমি চাইছিলাম ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠুক জেমস যাতে আমাদের ঠিক নিচের ঘরে শুয়ে থাকা মিস বার্টন চিৎকার শুনে ভাবতে থাকে সে কেন মরতে এ বাড়িতে থাকতে এল।
চিলেকোঠা থেকে আমি এবং জেমস বেরিয়ে এলাম। দাঁড়িয়ে পড়লাম সিঁড়িগোড়ায়। জেমসের হাতজোড়া বড্ড অস্থির। কখনো থামতে চায় না। সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি তার কাঁধের ওপর দিয়ে নিচে, হলওয়ের মিটমিটে আলোর দিকে তাকালাম।
হঠাৎ মিস বার্টনের ঘরের দরজা খুলে গেল। উদয় হলো জেমসের স্ত্রী। সে দ্রুত হলওয়ে পার হয়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে গেল নিজের বেডরুমে। ঘরে ঢোকার সময় আমার দিকে এমন এক ভঙ্গিতে তাকাল যার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না। তার পা খালি এবং পরনে কালো চামড়ার কোট।
.
সাত
পরদিন সকালে নাশতার টেবিলে আমরা একটু পরপর একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হাসলাম, নানান অবান্তর কথা বললাম। আমরা নিজেদের অনুভূতি খুব একটা প্রকাশ করি না। চেপে রাখি মনের মাঝে।
মিস বার্টন ওইদিন সকাল থেকে আমাকে পড়াতে শুরু করল। আরম্ভটা হলো একদম ফরমালভাবে।
‘তোমার চাচার সঙ্গে তোমার সম্পর্কটি খুব ঘনিষ্ঠ, না?’ জানতে চাইল মিস বার্টন।
‘আমি ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করি। তবে মনে হয় না সে কিশোরীদেরকে খুব একটা পছন্দ করে। তবে ক্যাথেরিন চাচীকে আমি বেশি পছন্দ করি। খুব আন্তরিক স্বভাবের মহিলা, না?’
ভারি মেকআপের কারণে মিস বার্টনের মুখটা গোলাপী হয়ে আছে। কেউ ভাবতে পারে মহিলা বোধকরি সাজগোজের পেছনে খুব একটা সময় ব্যয় করে না। তবে তার বাথরুম আমারটির সঙ্গেই এবং আমি আজ সকালেই দেয়ালে কান পেতে শুনি সে বিড়বিড় করে কী যেন বলছে আর নিজের শরীর দলাইমলাই করছে। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে সে মেকআপ চড়ায়। ফ্রান্সিসের সঙ্গে তার চেহারার মিল এবং সূক্ষ্ম মিলের কথা ভাবলাম আমি। দুই মহিলাই জানে না তারা দেখতে তেমন সুন্দর নয়। তবে ফ্রান্সিস নিজের ব্যাপারে উদাসীন আর মিস বার্টন জানেই না কীভাবে সাজতে হয়।
আমরা ইউরোপীয় ইতিহাস, ইংরেজি সাহিত্য, জীব বিজ্ঞান, ফরাসী এবং সঙ্গীত নিয়ে পড়াশোনা করব। সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি ভাল একজন ছাত্রী হব। মিস বার্টন আমাকে খুব একটা ভাল পড়াতে পারবে বলে মনে হয় না। আমি জানি সে আমাকে ক্যাথেরিন দ্য গ্রেটের অস্বাভাবিক ঘোড়াপ্রেম কিংবা আর্ল অভ রচেস্টারের ‘দ্য হ্যাপি মিনিট উদযাপন বিষয়ে কিছুই বলবে না। তবু আমি কিছু জিনিস শিখতে চাই যেমন ফ্রান্সিস এবং তার চিত্রকলাকে অন্যরা কীরকম দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখত সেসব।
স্টাডি রুমের আয়নাটি গোল এবং উত্তল। সেদিন সকালে ওখানে বসে আয়নায় ফ্রান্সিসের বিকৃত চেহারাটি দেখতে পেলাম। সে কটমট করে তাকিয়ে আছে মিস বার্টনের দিকে। একবার তাকে বলতে শুনলাম, ‘ফুটকিমুখো বেশ্যা।’ ফ্রান্সিস যখন শব্দটি উচ্চারণ করল, মিস বার্টন তখন ব্যাখ্যা করছিল বইয়ের দোকানে আমাদের কেন যাওয়া দরকার, হঠাৎ থেমে গেল এবং ঘরের চারপাশে অস্বস্তি নিয়ে চোখ বুলাল। এরকম মুহূর্ত তার জীবনে আরও অনেক আসবে।
.
নতুন রুটিনের সঙ্গে দ্রুত সবাই মানিয়ে নিল। মিস বার্টন এবং আমি সকাল ন’টা থেকে দুপুর পর্যন্ত পড়াশোনা করি। বিকেলে বই পড়ি কিংবা অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করি।
মিস বার্টনের সঙ্গে ক্যাথেরিনের খুব ভাব হয়ে গেছে। ক্যাথেরিনকে দেখে মনে হয় প্রতিদিনই সে একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। তার চেহারাসুরতে কেমন একটা পরিবর্তন আসছে। আগে তার চুল ছিল মোটা মোটা, কোঁকড়ানো। মিস বার্টন আসার পরে সে তার চুল ছোট করে ছেঁটে ফেলেছে। এতে অবশ্য তাকে আরও হাস্যকর লাগছে। আগে তার গা থেকে কোন গন্ধ আসত না। এখন সে কী সেন্ট মাখে যীশু জানেন, ভুরভুর করে গন্ধ বেরোয়। মনে হয় দামী কোন সুগন্ধি। মিস বার্টনের গা থেকেও মাঝে মাঝে হালকা এ গন্ধটা পাই আমি।
জেমস ইদানীং খুব চটে থাকে। অভিযোগ করে ক্যাথেরিন মিস বার্টনের প্রেমে পড়েছে এবং রাগ করার ভান করে। আসলে তার বউ আরেকটি মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এ ভাবনাটি বরং তাকে উত্তেজিত করে তোলে। সে ইদানীং আমার সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়ে একটু বেশিই খোলামেলা হতে শুরু করেছে, রাখঢাক করে কথা বলছে না। সেদিন ক্যাথেরিন মিস বার্টনকে নিয়ে শহরে গেছে শপিং-এ, জেমস আমাকে তার স্ত্রীর বিছানায় টেনে নিয়ে গিয়ে বলল, ‘তুমি হবে ক্যাথেরিন এবং আমি মিস বার্টন।’
মাঝে মধ্যে বাড়িতে দাদীমা ছাড়া কেউ থাকে না। ওইসময় আমি বাড়ির বাসিন্দাদের ঘরগুলোতে ঢুঁ মারি। আর এ কাজটা করতে আমার দারুণ লাগে। চরম উত্তেজনা বোধ করি। ও সময়ে ফ্রান্সিস আমার সঙ্গে থাকে। আমি যখন অন্যদের ড্রয়ার খুলি টের পাই পেছন থেকে ফ্রান্সিস আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সেদিন মিস বার্টনের ড্রয়ার খুলে ভাঁজ করা আণ্ডারওয়ারের নিচে তিনটি ছবির বই আর এক প্যাকেট লম্বা বাঁকানো সুঁই পেলাম।
কিথের রুমে দেখলাম একটি কাচের ট্যাঙ্কে পাথরের মধ্যে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে তার সাপগুলো। এক কোনায় একটা খাঁচাভর্তি ইঁদুর। কিচমিচ করছে। ওগুলো সাপের খাদ্য।
টেলরদের ঘরে আমি অল্পক্ষণ থাকলাম। ওদের ক্লজিটের মধ্যে অনেকগুলো নানান সাইজের জুতো দেখতে পেলাম। এর মধ্যে কয়েকটি জুতো কেবল বাচ্চাদের পরার উপযোগী।
.
আট
আমি এবং মিস বার্টন স্টাডি রুমে। ওয়ালনাট কাঠের খোলা শাটার দিয়ে সকালের ঝকঝকে রোদ এসে পড়েছে পুরনো টার্কিশ কার্পেটে। মিস বার্টন যখন লেকচার দিতে শুরু করে, কার্পেটের জটিল নকশা আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকি। কী নিয়ে বক্তৃতা করছে মাঝে মাঝে সে খেই হারিয়ে ফেলে, আমি চোখ তুলে তাকালে দেখতে পাই কেমন স্নেহমাখা দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে আছে। এই মহিলার অন্তরে আমার জন্য প্রশংসা ছাড়া অন্য কিছু আছে তা বিশ্বাস করতে সায় দেয় না মন।
‘ইংল্যাণ্ডে আপনি কোথায় থাকতেন, মিস বার্টন? ‘
হাসল সে। এই প্রথম কোন ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলাম তাকে।
‘আমার জন্ম চেমসফোর্ডে। জায়গাটার নাম শুনেছ?’
‘না।’
‘এটি এসেক্স কাউন্টিতে, লণ্ডনের ঠিক উত্তর-পুবে। ওই এলাকায় বাটর্নরা কমপক্ষে চারশো বছর ধরে বাস করে আসছে।
দাদীমা এসেক্সের নাম বলেছিলেন মনে পড়ল। ‘ওই জায়গার কোন ইন্টারেস্টিং ইতিহাস নেই?’
‘না। সেরকমভাবে নেই। উল্লেখ করার মত বলা যায় ষষ্ঠদশ এবং সপ্তদশ শতকে ওখানে ডাকিনীচর্চা হত। শুনেছি আমার এক পূর্বপুরুষকে নাকি ডাকিনীচর্চার অপরাধে হত্যা করা হয়েছে।’
‘আপনি বোধহয় অতিপ্রাকৃত বিষয়ে বিশ্বাস করেন না, না?’
শরতের শুরুর সূর্যের আলো পড়েছে মিস বার্টনের পেছনে, ঘন কালো কোঁকড়া চুল দুই গাল ঢেকে রেখে আড়াল করে রেখেছে তার অভিব্যক্তি। ‘দুম করে যদি বলি বিশ্বাস করি না তাহলে ঠিক হবে না। অনেক লোকই বিশ্বাস করে তাদেরকে জাদুটোনা করা হয়েছে, মৃত্যুভয় থাকা সত্ত্বেও অনেকে নিজেদেরকে ডাকিনী বলে পরিচয় দিতেও ভয় পায়নি। এত গভীর বিশ্বাস নিয়ে যারা এসব কথা বলে তাদের কথা হুট করে ফেলে দেয়া যায় না।’
ফ্রান্সিস হাজির হলো উজ্জ্বল আয়নাটিতে। তার কাছে আমার পড়াশোনার বিষয়টি খুবই বিরক্তিকর মনে হয়। মাঝে সাঝে যখন তার আবির্ভাব ঘটে দেখি মিস বার্টনের দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে এবং এ সময় কথা সে প্রায় বলেই না।
ওকে তোমার চিহ্নটি দেখাও,’ ফ্রান্সিস হুকুম করল আমাকে।
আমি চেয়ার সরিয়ে নিলাম যাতে শরীরের নিম্নাংশ সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তারপর ধীরে সুস্থে পায়ের ওপর পা তুলে দিলাম, ভান করলাম যেন হাত লেগে স্কার্টটি উরুর ওপর উঠে গেছে।
মিস বার্টন জানে, সব মেয়েই জানে, ঘটনাক্রমে এরকম ঘটনা ঘটে না। আমি একটু হাই তুললাম, চোখ বুজে আবার খুলে ফেললাম ঝট করে। মিস বার্টন চোখ বড় বড় করে আমার ঊরুর দিকে তাকিয়ে আছে। নিচের ঠোঁট কামড়াচ্ছে। রোদ পড়ে লালচে দাগটা চকচক করছে।
মিস বার্টন আমার নাম ধরে ডাকল, তার ছায়া ঢাকা মুখে ভয় নাকি কামনার ছাপ ফুটল ঠিক বুঝলাম না। হেসে উঠল ফ্রান্সিস।
দরজায় নক করল কেউ। ভেতরে ঢুকল জেমস। সে ব্যবসার কাজে শহরে যাওয়ার আগে প্রায়ই আমাদের রুমে একবার ঢু মেরে যায়।
আমার ধারণা মিস বার্টন ভয় পায় জেমসকে। ওকে ভয় করার কী আছে আমি জানি না। জেমস প্রায়ই মিস বার্টনের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টির চেষ্টা করে। মহিলাকে অস্বস্তিতে পড়তে দেখলে দাঁত বের করে হাসে।
‘হ্যালো, লেডিস। শহর থেকে তোমাদের জন্য কিছু আনতে হবে? তোমার জন্য লং স্কার্ট আনব, এলিজাবেথ?’
ও আসলে ঈর্ষায় পড়ে গেছে।
‘লং স্কার্ট পরার বয়স কি আমার হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘বিনয়ী হতে শেখার জন্য খুব বেশি বয়স লাগে না, কী বলেন, মিস বার্টন?’ বলল জেমস।
মিস বার্টনের কপালে ভাঁজ পড়ল, সম্ভবত রাগেই। ‘আমি বিনয়ী হওয়ার চেয়ে নিষ্পাপতাকেই বেশি মূল্য দিই।’
‘সে আমরা সবাই করি,’ বলল জেমস। ‘তবে নিষ্পাপতা হাতে ধরে শিখিয়ে দেয়া যায় না, যায় কি?’
‘বোধকরি নয়,’ বলল মিস বার্টন। ‘তবে এ বিষয়টি আমি শিক্ষাও দিই না।’
সে রিল্যাক্স বোধ করতে লাগল। জেমসকে সে অপছন্দ করে তবে তার প্রশ্নটি মিস বার্টনকে এক লহমার জন্য অপ্রস্তুত করে দিয়েছিল। তার এই ব্যাপারটি আমি সদ্য আবিষ্কার করেছি। সে আমার সঙ্গে রেগে গেলে তার কোন প্রিয় বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করলেই তার রাগ পড়ে যায়। কারণ জবাবের মধ্যে ডুবে যায় সে তখন। আমি লক্ষ করেছি লোকে অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে যা দিয়ে তাদের চরিত্রের প্রকৃতি বোঝা দায়। মিস বার্টনের কথা শুনে যদি তাকে আমি বুঝতে পারি তাহলে বলব সে একজন সৎ মহিলা, কোন ঘোরপ্যাঁচ নেই তার মধ্যে।
‘শয়তানকে কি জানা যায়?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
জবাবে হাসল শুধু ফ্রান্সিস।
.
মিস বার্টন আমাদের সঙ্গে থাকতে আসার পর থেকে নৈশভোজগুলো যেন কেমন একটু অদ্ভুত হয়ে উঠেছে। মিস বার্টন আমাদের পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে কী জানে সে ব্যাপারেই যত আগ্রহ দাদীমার। তিনি কোন একটি বিষয়ের অবতারণা করেন এবং ওই বিষয় সম্পর্কে মিস বার্টন তখন ভাষণ দেয়।
এক রাতে দাদীমা বললেন, ‘১৫৯২ খ্রিস্টাব্দে, চেমসফোর্ডের কাছে হ্যাটফিল্ড পেভেরেলের বাসিন্দা ফ্রান্সিস বার্টনের বিরুদ্ধে ডাকিনীবিদ্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল।’
আমরা ভেড়ার মাংসের বড়া খাচ্ছিলাম। তবে মিসেস টেলর ঠিকমত ভাজতে পারেনি চপ। কেমন কাঁচা লাগছিল। বড়ার গায়ের রক্তে প্লেট ছিল মাখামাখি। আমরা মিস বার্টনের বক্তব্যের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
‘ফ্রান্সিস বার্টনের বিরুদ্ধে ডাকিনীচর্চার সন্দেহ দীর্ঘদিন ধরেই ছিল,’ একটু ইতস্তত করে, আমার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিয়ে শুরু করল সে। ‘বিচারে তার শরীর পরীক্ষা করা হয় এবং বুকের ওপর একটি লালচিহ্ন পাওয়া যায়। সে স্বীকার করে এক পড়শীর বাড়ির সামনে বসে সে মাটিতে একটি বৃত্ত এঁকেছিল। বৃত্তের মধ্যে পড়শী মহিলাকে একটি ব্যাঙ নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। এর কয়েকদিন পরেই পড়শীর বাচ্চাটি জলে ডুবে মারা যায়। এ মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয় ফ্রান্সিসকে। সে জেলখানায় বসে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।’
মিস বার্টন যখন ডাইনির চিহ্নের কথা বলছিল, জেমস তখন মাংসের বড়া কাটছিল ছুরি দিয়ে, থেমে গেল সে, মুখ তুলে তাকাল আমার দিকে।
আমি তার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলাম।
.
সেই রাতে আমি আমার বিছানায় একটি সাপ দেখতে পেলাম।
আমি নিজের ঘরে গিয়েছিলাম মিউজিক শিখতে। মিস বার্টন আমাকে বাঁশি শেখাচ্ছে। আমি সপ্তাহে দুই/তিন রাত ঘণ্টাখানেক এ বাদ্যযন্ত্রটি বাজানোর চেষ্টা করি। তবে বাঁশিতে বেসুরো সুর বের হয়। মিউজিক শিখে কী লাভ হবে বুঝতে পারি না আমি। তবে একটি সুর অন্তত আমি শিখেছি। এটি ফ্রান্সিস আমাকে শিখিয়েছে। এটি মাইনর কি’তে বাজাতে হয়। মিস বার্টনকে প্রথম দিন সুরটি বাজিয়ে শোনানোর সময় সে বেশ প্রশংসা করেছিল। আসলে ভান করেছিল। কারণ তার কপালে আমি বেশ কয়েকটি ভাঁজ পড়তে দেখেছি।
আমি বাঁশিটি বিছানায় ফেলে রেখে গিয়েছিলাম। ঘরে ঢুকে দেখি চকমকে বাঁশিটির গায়ে কালো রঙের একটি ব্যাণ্ড পেঁচানো রয়েছে। প্রথমে ভাবলাম কালো কোন ফিতা।
কিন্তু দেখলাম ফিতেটি নড়তে শুরু করেছে, ওটা কুণ্ডলী পাকিয়ে রেখেছিল। কাছে গিয়ে ভাল করে লক্ষ করতেই শক্ত পেশীর নিচে আঁশযুক্ত চকচকে চামড়া দেখতে পেলাম। সাপটা বাঁশির গায়ে ক্রমে শরীর পেঁচিয়ে যাচ্ছে। কিথ নিশ্চয় ওটা এখানে রেখে গেছে। হয় আমাকে ভয় দেখাতে নতুবা উপহার দিতে।
এমন সময় ফ্রান্সিসের গলা ভেসে এল: ‘তুমি একটি শয়তানের ছানা পেলে। আমার পোষা।’
আয়নার দিকে ঘুরে তাকালাম। আমার দিকে সস্নেহে তাকিয়ে আছে ফ্রান্সিস। তার চুলের রঙ ধূসর, মুখখানা জ্বলজ্বল করছে। কারাগারের শেষ সময়ের ফ্রান্সিসকে দেখতে পাচ্ছি আমি। বুঝতে পারলাম তার এবং মিস বার্টনের মধ্যে চেহারার মিলটুকু আসলে ভাসাভাসা। তাদের চোখের ভাষা একদমই ভিন্ন। তারা দু’জন বিষয়গুলোকে একদমই আলাদাভাবে দেখে। আমাকে আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ফ্রান্সিসের কাছ থেকেই শিখতে হবে, সর্বদা কাজে ব্যস্ত মিস বার্টনের কাছ থেকে নয়।
‘ওকে স্পর্শ করো, এলিজাবেথ।’
বিছানায় বসে হাত বাড়ালাম সাপটির দিকে। ওটার ত্রিভুজাকৃতির মস্তক স্পর্শ করলাম, শীতল এবং শক্ত শরীরে হাত বুলিয়ে দিলাম। আমার হাতের মধ্যে ওটা মোচড় খেতে লাগল, শেষে ওকে পেঁচিয়ে নিলাম গলায়। সাপটা আমার ব্লাউজের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল মাথা, আমার শরীরের উষ্ণতা খুঁজছে।
আমি সাপটার নাম দিলাম ইমপ। ইমপ মানে শয়তানের বাচ্চা। ইমপকে নিয়ে আমি প্রতিদিন ঘুমাতে শুরু করলাম।
.
নয়
আমার ধারণা আমি প্রীতিময় একজন মানুষ। জানি না আমি কেন তা হতে যাব কারণ আমি কাউকে ভালবাসা বিলোতে যাইনি কিংবা ভালবাসা খুঁজতেও যাইনি। তবে কেউ ভালবাসা দিতে এলে তা প্রত্যাখ্যানও করিনি। ভালবাসা আমার কাছে মনে হয় মন্দ। ভালবাসার আড়াল নিয়ে অনেক খারাপ খারাপ কাজ হয়। মিস বার্টন অনেক শ্রদ্ধাভরে ভালবাসার কথা বলে এবং ইতিহাস ও সাহিত্যে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করে। তবে তার রোমান্টিক থিওরির বিষয়ে আমার কোনই আগ্রহ নেই। হেনরি যে অ্যান বোলেনকে ভালবাসে তার চেয়ে আমার বেশি আগ্রহ অ্যানের একটি হাতের ছয়টি আঙুল নিয়ে।
জেমসই একমাত্র ব্যক্তি নয় যে আমাকে ভালবাসে কিংবা যাকে আমি সুখ দিয়েছি।
আমি কিথের একমাত্র বন্ধু। সে আমার সঙ্গে তার সাপগুলোকে নিয়ে গল্প করে, আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে আমি তাকে সেইসব জিনিস দেখিয়ে দিই যার কথা সে বইতে পড়েছে কিংবা যা নিয়ে অন্যান্য ছেলেরা ক্লাসে ফিসফিস করে কথা বলে। কিথ অবশ্য অমন কিছু আমাকে বলেনি তবে ও যে আমাকে ভালবাসে তা আমি জানি।
ক্যাথেরিন কেমন যেন খেপাটে টাইপের মহিলা। সে এ বাড়ির একটি অংশ হয়ে উঠতে চায়। সে বাড়ির বৃত্তাকার সিঁড়িগুলোতে চুপচাপ হেঁটে বেড়ায়, করিডোরে ঘুরতে থাকে, মেমেন্টোগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে। আমার জন্য ক্যাথেরিনের ভালবাসায় খুব বেশি গভীরতা নেই।
মিস বার্টন আমাকে বদলে ফেলতে চায়, কিন্তু একজন শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও জানে না কাজটা কীভাবে করবে। এবং কেন করবে তাও তার জানা নেই। সে আমাকে ভালবাসে, সর্বদা আমার মঙ্গল কামনা করে। জানি বেশিরভাগ মানুষই মিস বার্টনকে বিনয়ী, বুদ্ধিমতী এবং প্রশংসনীয় একজন নারী হিসেবেই দেখবে।
জেমসের প্রশংসা অবশ্য কম মানুষই করে। তার শরীরটা সুগঠিত হলেও মনটা কেমন এলোমেলো। বিক্ষিপ্ত। জেমস এবং ক্যাথেরিন আমাকে তাদের দত্তক কন্যা হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু জেমস তার দত্তক কন্যার সামনে বাঁশির সুরে ন্যাংটো হয়ে নাচতে দ্বিধা করবে না।
তবে আমাদের এ ছোট পরিবারের সবাই ভান করি যেন সকলেই সুখে আছি। অন্যদের ধারণা একমাত্র ভালবাসার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু একমাত্র আমি জানি আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করছে অন্য আরেকটি শক্তি-যে শক্তিটি কেবল আমিই দেখতে পাই। আশা করি এটির কখনো পরিবর্তন ঘটবে না। জানি আমাদের সুখের দিনগুলো হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে তবে আমি যেভাবেই হোক এ হুমকি ঠেকাতে বদ্ধপরিকর।
একটি হুমকি শুরু হলো যখন দাদীমার সঙ্গে এক লোক দেখা করতে এল। বহু বছর বাইরের কারো সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করেন না দাদীমা। দাদুর সঙ্গে ডিভোর্স হওয়ার পর থেকে তাঁর সামাজিক জীবনের অবসান ঘটেছে এবং লোকে দাদীমার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে দেখা করতে এলে জেমস তাদেরকে ঠেকিয়ে রাখে।
ওই লোকটি যেদিন বাড়িতে এসেছিল সেদিন আমি ফোরটি সেকেণ্ড স্ট্রিটে, পাবলিক লাইব্রেরির মূল শাখায় গিয়েছিলাম। আমি বাড়ি থেকে খুব কমই বের হই আর বেরুলে কখনোই ক্যানাল স্ট্রিট কিংবা চায়নাটাউনে যাই না। বেশিরভাগ সময় জরাজীর্ণ জাহাজঘাটার পাশ দিয়ে হাঁটাহাঁটি করি, নাকে ভেসে আসে কটু গন্ধ, জলের রঙ কুচকুচে কালো। ওখানে স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে আধ ডুবন্ত নানান জিনিস।
ম্যানহাটানের মিডটাউনে এলে আমার কেমন অস্বস্তি লাগে। এখানকার নদীগুলোকে আপন বলে মনে হয় না, নতুন নতুন ভবনগুলো আকারহীন সমাধি ফলকের মত মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। মাথার ওপর উড়তে থাকা, চিৎকাররত চিলগুলোর দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না।
লাইব্রেরিতে ঢোকার পরে আমি খানিকটা রিল্যাক্স বোধ করতে থাকি। এ ভবনটিতে দেখার মত অনেক কিছুই আছে: খাঁজকাটা কাঠ, নকশা করা দামী মার্বেল পাথর, সোনালী রঙে গিলটি করা ছাত, ম্যুরাল। মূল পাঠকক্ষে সেই বই দুটি পেয়ে গেলাম যার কথা ফ্রান্সিস বলেছিল আমাকে। ১৫৯০ খ্রিস্টাব্দে রেকর্ড করা সেই অভিযোগপত্র যাতে ফ্রান্সিস বার্টনকে মহিলা জাদুকর বলে উল্লেখ করা হয় এবং অভিযোগ আনা হয় তার সঙ্গে এক ধূর্তলোকের সম্পর্ক ছিল যে কিনা হারানো জিনিস খুঁজে দিতে পারত। ১৫৯২ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সিসকে নোংরা ঘৃণিত চরিত্রের মেয়ে মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, একটি শিশুকে জাদুটোনা করে মৃত্যুর অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
আমি বই দুটি বন্ধ করে প্রকাণ্ড পাঠকক্ষটিতে চোখ বুলালাম। ভারি ওক টেবিলগুলো ঘিরে অনেক লোক বই পড়ছে। এদেরকে নিতান্তই নিরীহ এবং ক্ষমতাহীন মনে হচ্ছে। ফ্রান্সিস যেমন তার সময়ে ছিল, তেমন আমি এখন। তবু ফ্রান্সিসকে ভুগতে হয়েছে তার ক্ষমতার জন্য এবং জানি একদিন আমাকেও ঈর্ষাকাতর কিছু মানুষের মুখোমুখি হতে হবে।
.
সেদিন বিকেলে বাড়িতে ঢুকছি, বিল্ডিঙের দোরগোড়ায় এক লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম।
‘এলিজাবেথ?’
‘জি।’
‘আমি তোমার দাদু।’
‘মি. হ্যামিলটন?’
‘জেমস বলল তুমি নাকি ওদের সঙ্গে থাকছ। তুমি কি একবার আমার অফিসে আসবে তাহলে দু’জনে কথা বলতে পারতাম।’
জবাবে আমি কিছু বললাম না। লোকটি কেমন ধরনের জানার খুব আগ্রহ হচ্ছিল আমার। তবে এ মানুষটির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুললে দাদীমার সঙ্গে অবিশ্বস্ততা করা হবে।
‘সময় থাকলে কয়েক মিনিটের জন্য এসো না,’ বললেন তিনি।
‘কিন্তু আমি বেশিক্ষণ বসতে পারব না।’
‘সে আশাও করি না। এসো, একটুক্ষণই কথা বলি।’
তিনি দরজা খুলে ধরে একপাশে সরে দাঁড়ালেন। আমার বাবার মতই হাসিখুশি এবং রুচিবান মানুষ মনে হলো তাঁকে। আমি দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে আরও আগে। অফিসে কোন লোকজন চোখে পড়ল না।
আমার পেছনে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ভবনের নীরবতার মাঝে মি. হ্যামিলটনের শ্লেষ্মাজনিত ঘড়ঘড়ে নিঃশ্বাসের আওয়াজ শুনতে পেলাম। মুখ হাঁ করে শ্বাস ফেলছেন তিনি। মাঝে মাঝে মুখ বন্ধ করে ঢোক গিলে জিভ বের করে ভিজিয়ে নিচ্ছেন ঠোঁট। এরকম একটা মানুষের সঙ্গে দাদীমা কীভাবে বাস করতেন ভেবে অবাকই লাগল।
‘তোমাদের বিল্ডিঙের মত এটি সুন্দর নয়,’ বললেন তিনি। ‘বাণিজ্যিক প্রয়োজনের কথা ভেবে কিছু ছাড় দিতে হয়েছে।’
আমার সামনে একটি এলিভেটর ডোর। প্রবেশকক্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাঠের প্যানেল বসানো হয়েছে এতে। দেয়ালভর্তি জাহাজের ছবি আর খোদাই করা চিত্র।
মি. হ্যামিলটনের অফিস তিন তলায়, পাশের ভবনে দাদীমার কামরা থেকে কয়েক ইঞ্চি দূরে, ইট আর প্লাস্টারের দেয়াল দুটি কক্ষকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। আমরা বসে কথা বললাম। বাবা-মা’র মৃত্যু, জেমসদের সঙ্গে থাকতে আসা ইত্যাদি নিয়ে কথা হলো। তবে অনেক সত্য কথাই এড়িয়ে গেলাম। মি. হ্যামিলটন আমার কথা শুনে খুশিই হলেন। তিনি তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে কথা বললেন। জানালেন কাজই তাঁর জীবন। আমি ভাবছিলাম কোন্ সত্যটি তিনি আমার কাছে গোপন করে গেলেন।
তিনি কথা বলছেন, আমি তাঁর টেবিল থেকে একটি লেটার ওপেনার তুলে নিলাম। ওটার হাতল হাতির দাঁতের তৈরি। হাতলে মি. হ্যামিলটনের মুখচ্ছবি আছে। দাদীমার একটি আবছা ছবির ওপর তাঁর ছবিটি সুপার ইমপোজ করা।
দাদীমা নগ্ন হয়ে এক লোকের বাহুডোরে বাঁধা পড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তবে এখনকার দাদীমা নন, তরুণী বয়সের। ছবিতে তাঁর চুল সাদা নয়, চোখে বর্তমানকে দেখার চাউনি। তবে যে লোকটি দাদীমাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে তাকে ঠিক চিনতে পারলাম না। তবে মনে হচ্ছিল, একে আগে কোথাও দেখেছি
আমি লেটার ওপেনারটি রেখে দিলাম। আমার দাদু বললেন, ‘আশা করি আমরা বন্ধু হতে পারব। আর তোমার যখন ইচ্ছা এখানে চলে আসবে।’
বেরিয়ে আসার সময় মনে পড়ল এই ভবনটির কোথাও একটিও আয়না চোখে পড়েনি আমার।
.
সে রাতে ডিনারের সময় দাদীমার চেয়ারখানা খালি দেখতে পেলাম। জেমস জানাল দাদীমার সঙ্গে কে নাকি দেখা করতে এসেছে। আমরা নীরবে খানা খেলাম। মনে মনে বোধহয় সবাই ভাবছিলাম কে এমন লোক এল যার জন্য দাদীমা তাঁর এতদিনকার রুটিনে ব্যত্যয় ঘটালেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বোধকরি জীবনে এই প্রথম উপলব্ধি করল তাদের জীবনে দাদীমা কী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই না রেখে চলেছেন। তিনি শুধু বাড়ি এবং টাকা দিয়েই তাদেরকে ধরে রাখেননি, নিজের উদাসীন উপস্থিতি এবং পারিবারিক ইতিহাসের গল্প বলেও জমিয়ে রাখতেন সকলকে। তাঁর উপস্থিতিতে কেমন খালি খালি লাগছিল। সবাই একটু পরপর অস্বস্তি নিয়ে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে তাকাচ্ছিল দাদীমার খালি আসনটির দিকে। আমি অবশ্য চেয়ারের দিকে তাকাচ্ছিলাম না। লক্ষ করলাম ওরা শূন্য আসন থেকে __ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে। বুঝতে পারলাম দীপানার অনুপস্থিতিতে আমি হয়ে উঠেছি টেবিলের প্রধান ব্যক্তিটি।
আমার ধারণা মিস বার্টন প্রথমে বুঝতে পারল কী ঘটছে। সে অতীতের গল্প বলতে লাগল যেন দাদীমার শূন্য জায়গাটি পূরণ করবে। তবে কিথ খিকখিক করে হেসে উঠতে সে থেমে গেল। ক্যাথেরিন তার ছেলের এহেন আচরণে খুব লজ্জা পেল। ঘরটি আবার নীরব হয়ে গেল। শুধু খাওয়ার অশ্লীল চাকুম চুকুম শব্দ
ডিনার শেষে আমি আমার ঘরে গেলাম। ফ্রান্সিস আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।
‘আজ রাতে জেমস তোমার ঘরে আর আসবে না,’ বলল সে।
মাঝে মাঝে এমন কিছু রাত আসে যখন আমার সঙ্গে তার একাকী থাকার দরকার হয়ে পড়ে। তখন সে জেমসকে আমার ঘরে আসতে বাধা দেয়। আমি নাইটগাউন পরে আয়নার সামনে এসে বসলাম। আমাদের বাড়িটি আশ্চর্যরকম নিস্তব্ধ, জেটির অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলা কোন জাহাজের ইঞ্জিনের অস্পষ্ট ধুকপুকুনি যেন শুনতে পেলাম আমি।
‘বাড়িতে এক লোক এসেছে,’ বলল ফ্রান্সিস।
‘হুঁ। তুমি তাকে দেখেছ?’
‘অয়ি। সে মৃত্যুর কথা বলছে।’
‘আমি কি তাকে দেখতে পারি?’
‘আমি তাকে তোমার কাছে নিয়ে আসতে পারব না। তবে মাঝরাতে, সে যখন চলে যাবে তখন সিঁড়িগোড়ায় দাঁড়িয়ে থেকো।’
.
মাঝরাতের ঠিক আগে আগে আমি সিঁড়ির ধারে গিয়ে লুকিয়ে রইলাম অন্ধকারে। এখান থেকে দাদীমার ঘরের দরজা দেখা যায়। কয়েক মিনিট পরে খুলে গেল ঘরের দরজা। এক লোককে দেখতে পেলাম। লোকটি আমার দিকে পেছন ফিরে আছে। তার কাঠামোটি শুধু দেখতে পাচ্ছি। কেমন চেনা চেনা লাগল।
মি. হ্যামিলটনের অফিসের ছবিটির কথা মনে পড়ে গেল। দাদীমাকে, যে লোকটি জড়িয়ে ধরে রেখেছিল সেই একই লোককে এ মুহূর্তে আমার সামনে দেখতে পাচ্ছি। দ্রুত বন্ধ হয়ে গেল দরজা। লোকটি চলে যেতে ঘুরে দাঁড়াল। আরি, এ তো মি. হিউবার্ট! লেক জর্জে আমাদের কেবিনের কেয়ারটেকার।
এ লোক মৃত্যুর কথা বলে, ফ্রান্সিস বলেছিল। সেদিন সকালে লেকের ধারে আমার সামনে মি. হিউবার্ট এবং জেমস দাঁড়িয়ে ছিল। লোকটির চেহারার অভিব্যক্তির আড়ালে যে জিনিসটি লুকিয়ে ছিল তা হলো অবাঞ্ছিত জ্ঞান।
সে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল সিঁড়ি থেকে, বাতাস দূষিত করে দিয়ে গেল ঘামের উৎকট গন্ধে।
.
