ডাইনি – ১০
দশ
পরদিন সকালে নাশতার টেবিলে বসে আমরা ভান করতে লাগলাম যেন কেটে গেছে বিপদ।
‘আরেকটু কফি দিই, ক্যাথেরিন?’ মিস বার্টন সাইড বোর্ড থেকে কফির বড় সিলভার পটটি নিয়ে এল। ক্যাথেরিনের পাশে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে ভারি ঊরু ঠেকিয়ে রেখে কাপটি ভরে দিল সে।
জেমস ওদের দিকে তাকিয়ে আবছা হাসল। ‘আমাকেও একটু দেবে, অ্যান?’
মিস বার্টন তার পাশে চলে এল, কফি ঢালছে, জেমস তার হাত চালিয়ে দিল মহিলার আঁটসাঁট স্কার্টের পেছনে। মিস বার্টনের হাত কেঁপে উঠল, কফি ছলকে পড়ল জেমসের পিরিচে।
জেমসের প্রকৃতিই হলো জটিল সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং আমি জানি সে মিস বার্টনকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসার চেষ্টা করবেই। তবে মিস বার্টনের মনকে প্রভাবিত করার মত বুদ্ধি কিংবা সূক্ষ্মতা কোনটাই নেই জেমসের। তাকে শুধু শারীরিকভাবেই এগোতে হবে।
জেমস বিপজ্জনক কিনা আমি বলতে পারব না। আমার কাছে তো ওকে কখনো ক্ষতিকর মনে হয়নি, হতে পারে দু’জনে একসঙ্গে আমাদের কামনা-বাসনাগুলো ভাগ করে নিই বলে।
দাদীমাকে সবার আগে আমার চোখে পড়ল। ডাইনিংরুমের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন, অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রয়েছেন আমাদের দিকে, অমন চাউনি জীবনে দেখিনি।
শুধু ক্রোধ নয়, দৃষ্টিতে ফুটে আছে তীব্র বিতৃষ্ণা এবং রায় ঘোষণার অভিব্যক্তি। তাঁর পরনে সাদা ব্লাউজ, ধূসর রঙের টুইড স্কার্ট, লাল কার্ডিগান এবং গলায় ধূসর রঙের বারোক মুক্তোর মালা।
মিস বার্টন বসার পরে দাদীমা টেবিল-প্রধানের আসনটি দখল করলেন। ‘আমি তোমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই তোমরা সকলে এখানে আমার অনুমতি সাপেক্ষে উপস্থিত রয়েছ,’ বললেন তিনি। ‘আমি নিশ্চিত বিষয়টি তোমরা বুঝতে পারছ। এবং তোমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই তোমরা আসলে সবাই শিশু। আশা করি তোমরা এ ব্যাপারটিও বুঝতে পারছ। কেউ কি আমার কথা অগ্রাহ্য করতে পারবে
দাদীমা এসব আবোল তাবোল কী বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। মি. হিউবার্ট দাদীমাকে গতরাতে কী বলে গেছেন খোদা মালুম। তবে দাদীমার প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগ্রহ হলো না কারো। ক্যাথেরিন এবং মিস বার্টন এমনভাবে তাদের প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল যেন ওগুলো সত্যি শিশু, আর জেমস ফিচফিচ করে হাসতে লাগল।
‘আমি কিন্তু শিশু নই, মিসেস হ্যামিলটন,’ বললাম আমি।
‘তুমি অ্যাডাল্ট বলে তোমার মাথায় দুষ্টবুদ্ধি ভর করতে পারে, এলিজাবেথ।’
‘মা, এসব তুমি কী বলছ?’ বলল জেমস। ‘তোমার মেহমান আসলে তোমার মাথাটাই গুবলেট করে দিয়েছে। ডিনারে না হয় আমরা এসব নিয়ে কথা বলব। তুমি বরং এখন একটু বিশ্রাম নাওগে, যাও।’
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। দাদীমার কাছে গিয়ে তাঁর একটি হাত ধরে বললাম, ‘হ্যাঁ, দাদীমা। চলো, তোমাকে তোমার ঘরে নিয়ে যাই। পরে কথা বলব’খন।
দাদীমা আমার হাতের দিকে তাকালেন। তাঁকে কেমন বিভ্রান্ত লাগছিল। ‘শয়তান,’ বললেন তিনি। ‘ফ্রান্সিস অপরাধী। ফ্রান্সিসের মুখোশ খুলে দিতেই হবে।’ তিনি তাঁর লাল সোয়েটারের দিকে তাকালেন। ওটাতে রোদ পড়েছে। ওদিকে তাকিয়ে তিনি ফুঁপিয়ে উঠলেন।
জেমস দাদীমার পেছন ছিল। সে এতক্ষণ বেশ মজাই পাচ্ছিল। তবে দাদীমাকে কাঁদতে দেখে ভয় পেয়ে গেল। ‘আমাদের সঙ্গে চলো,’ বলল সে। আমরা দাদীমাকে নিয়ে তাঁর ঘরের দিকে রওনা হলাম। তিনি নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলেন।
বন্ধ জানালার ওপর ভারি পর্দা ফেলা, ঘর আলোকিত হয়ে আছে কেবল দপদপ করে জ্বলতে থাকা গ্যাস বাতিতে। এ বাড়ির বেশিরভাগ কক্ষে গ্যাসবাতি আছে তবে এগুলো দিয়ে এখনো কাজ চালানো যায় জানতাম না। ঘর অন্ধকার বলে অনেক কিছুই পরিষ্কার দেখতে পেলাম না তবে লক্ষ করলাম প্রকাণ্ড একটি ড্রেসারের ওপর কাঠের ফ্রেমে খোদাই করা বেশ বড়সড় একখানা গোল আয়না রয়েছে। ফ্রান্সিস আমাদেরকে দেখছে।
দাদীমা আমার হাত থেকে তাঁর হাতখানা টেনে নিলেন, বসলেন বিছানায়। তাঁর কান্নাকাটি থেমে গেছে।
‘তুমি এখন যাও, এলিজাবেথ,’ বললেন তিনি। ‘তোমার চাচার সঙ্গে আমার কথা আছে।’
বুঝতে পারলাম দাদীমা তাঁর হারানো শক্তি ফিরে পাচ্ছেন। জেমসের কাছে তাঁকে রেখে যেতে ইচ্ছে করছিল না। তবে জেমস আমাকে বলল, ‘কোন সমস্যা হবে না। তুমি যেতে পার।’
স্যাঁতসেঁতে ঘরটি থেকে বেরুবার সময় একবার পেছন ফিরে দেখলাম। দাদীমাকে আবার দৃঢ় এবং আত্মবিশ্বাসী লাগছে, যে চেহারা নিয়ে তিনি ডাইনিংরুমে প্রবেশ করেছিলেন। জেমস বিরাট একটি চামড়ার চেয়ারে বসেছে। তাকে ক্ষুদ্রকায় এবং দুর্বল লাগছিল। আমি জানি ওরা যে বিষয় নিয়েই কথা বলুক না কেন শেষে জয় হবে দাদীমারই। তিনি জেমসকে মোটেই ভয় পান না।
আমি নিজের রুমে গিয়ে বন্ধ করে দিলাম জানালা। গ্যাস বাতিটির ভালব ধরে মোচড় দিতেই হিসস শব্দ হলো। ড্রেসার খুঁজে একটি ম্যাচবক্স পেয়ে গেলাম। জেমস রেখে গিয়েছিল। গ্যাস লাইটটি জ্বেলে দিলাম। দাদীমা বিদ্যুৎ বাতির চেয়ে গ্যাস বাতি জ্বেলে রাখতে কেন পছন্দ করেন বুঝতে পারলাম। এতে ঘরের অন্ধকার পুরোপুরি দূর হয় না, রহস্যময়তা তৈরি হয়।
এখন দাদীমার ঘরে বসে আঁধার কোণে লুকানো জিনিসগুলো আবিষ্কার করতে করতে অতীতের গল্প শুনতে কত না মজা লাগত। কিন্তু তা এখন আর সম্ভব নয়। কারণ দাদীমা দূষিত হয়ে পড়েছেন, শীঘ্রি তাঁর ঘরে আলো প্রবেশ করে অন্ধকার দিয়ে তৈরি তাঁর পৃথিবী ভেঙে গুড়িয়ে দেবে।
‘আমাদের কিছু কাজ করতে হবে,’ বলল ফ্রান্সিস। ‘তোমাকে আজ রাতে বলে দেব কী করতে হবে।’
.
এগারো
স্টাডি রুমে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল মিস বার্টন। খাড়া পিঠের চেয়ারে শক্ত হয়ে বসে আছে। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার দাদীমার সঙ্গে কথা বললে?’
‘না, জেমস তাঁর সঙ্গে কথা বলছে।’
‘আশা করি উনি অসুস্থ নন। ব্যক্তিত্বের আকস্মিক পরিবর্তন কখনো কখনো সুলক্ষণের চিহ্ন।’
‘পরিবর্তন অপরিহার্য তাই না, মিস বার্টন? আমাদের সঙ্গে থাকতে গিয়ে আপনারও কি খানিক পরিবর্তন হয়নি?’
‘মৌলিক তেমন পরিবর্তন হয়নি। আমার কিছু নতুন বন্ধু হয়েছে তাদের সঙ্গে আমাকে মানিয়ে চলতে হয়েছে, ব্যস এই-ই। তবে আমার কাজ হলো তোমার মাঝে পরিবর্তন আনা, আমার নিজেকে বদলানো নয়।’
‘আপনি কি আপনার কাজটি করতে পেরেছেন?’
‘মানে?’
‘আপনি কি আমাকে বদলাতে পেরেছেন?
‘না, এলিজাবেথ, এখনো পারিনি। তবে আমার ধারণা অবশেষে আমি সফল হব, যখন তুমি চাইবে।’
আমার ধারণা মিস বার্টন নিজেকে সৎ ও শুদ্ধ নারী বলে ভাবে। সম্ভবত সে ভাবে সে নিজে কী তা বড় ব্যাপার নয়, সততা বা শুদ্ধতা লুকিয়ে আছে তার বিশ্বাসের মধ্যে।
জেমস স্টাডিতে ঢুকল। জেমস সম্পর্কে আমার সবসময়েই ধারণা সে জানে সে কী এবং কোনরকম প্রশ্ন ছাড়াই নিজের প্রকৃতিটি সে মেনে নিয়েছে। তবে এ মুহূর্তে তার চেহারা বেশ দুঃখভারাক্রান্ত দেখাচ্ছিল। যেন কেউ তাকে মেরেছে এবং সে নীরবে মারটা সহ্য করেছে।
‘মা তোমাকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠাতে চান, এলিজাবেথ। এক্ষুণি। আর, অ্যান, তোমাকে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে।’
‘আশ্চর্য!’ বলল মিস বার্টন। ‘তিনি কেন এমন কথা বললেন তার কোন ব্যাখ্যা দিয়েছেন?’
‘না, কোন ব্যাখ্যা দেননি। তবে বিড়বিড় করে কীসব শয়তানের কথা বললেন আমি ঠিক বুঝতে পারিনি।’
জেমস সত্যি কথা বলছে কিনা ভেবে আমার সন্দেহ হলো।
‘উনি যা বললেন আমাদেরকে তাই করতে হবে?’ জিজ্ঞেস করল মিস বার্টন।
‘হয়তোবা। এটা তাঁর বাড়ি এবং তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন কে এ বাড়িতে থাকবে, বা থাকবে না।’
‘আমরা অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে পারি না?’ বললাম আমি।
‘তার বোধহয় প্রয়োজন হবে না,’ বলল জেমস। ‘এসব আবোল তাবোল চিন্তা তাঁর মাথা থেকে দূর করতে হবে। কেউ নিশ্চয় তাঁর মাথায় এ চিন্তাটা ঢুকিয়ে দিয়েছে।’
‘ফ্রান্সিস কে?’ প্রশ্ন করল মিস বার্টন। ‘উনি বললেন ফ্রান্সিস অপরাধী।’
‘তাঁর মনগড়া কেউ,’ জবাব দিল জেমস। ‘উনি এটার কথা ভুলে যাবেন। আমরাও।’
.
সে রাতে দাদীমা নৈশভোজে এলেন না। মি. টেলর বলল দাদীমা নাকি তাঁর খাবার তাঁর ঘরে পাঠিয়ে দিতে বলেছেন। ঘরের প্রতিদিনকার বাঁধাধরা রুটিনের এ আকস্মিক ব্যত্যয় মিসেস টেলরকে বিচলিত করে তুলল।
কিথ অবশ্য বেশ খুশি। সে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে খিলখিল করে হাসতে হাসতে ছুটে বেড়াল। জেমস প্রয়োজনের অতিরিক্ত মদ্যপান করে ফেলল। মিস বার্টনের হাত কাঁপছিল, ক্যাথেরিন টেবিলের নিচে তার পা দিয়ে আমার পা স্পর্শ করল।
ডিনার শেষে আমি নিজের ঘরে ফিরে এলাম। ইমপ নামে আমার সাপটিকে যে বাক্সে রেখেছিলাম সেটা খুললাম। হাত বাড়ালাম ওটাকে তুলে নিতে। সরীসৃপটি তার কালো চকচকে শরীর নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত পেঁচিয়ে ধরল। আমি আয়নার সামনে গেলাম। ওখানে ফ্রান্সিস আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।
‘দাদীমা বলছেন তুমি অপরাধী। তিনি চান আমি এ বাড়ি থেকে চলে যাই।’
‘তুমি কোথাও যাচ্ছ না। আমার কথা শোনো। কাছেই বৃত্তাকার একটি কাঠামো আছে। একটি ছোট কাচের গ্লাস এবং ইমপকে নিয়ে ওখানে চলে যাবে। তারপর কী করতে হবে তা জানতে পারবে। এখন বিশ্রাম নাও।’
ফ্রান্সিসের চেহারা মিলিয়ে যাওয়ার পরে নিজেকে বড্ড বিধ্বস্ত লাগল আর কেমন ঝিমঝিম করতে লাগল মাথা। আমি বিছানায় গিয়ে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। সামনে আমার জন্য কী অপেক্ষা করছে জানি না তবে মনে হচ্ছিল আজকের রাতটি হতে যাচ্ছে আমার জন্য একটি অবিস্মরণীয় রাত। কয়েক মিনিটের মধ্যে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
কীসের একটা শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল আমার। খুব কাছ থেকে হয়েছে শব্দটা। আমি ধীরে ধীরে চোখ মেলে চাইলাম। কেউ একজন বেরিয়ে যাচ্ছে ঘর থেকে।
মিস বার্টন। হাতে এক জোড়া কাঁচি। কাঁচি দেখে বুঝতে পারলাম, আসলে চুল কাটার শব্দে আমি জেগে উঠেছি। নিজের কাঁধের দিকে তাকালাম। এক গোছা চুল লুটিয়ে আছে ওখানে। তবে গোছাটার মাথা কাটা। কয়েকটি কাটা চুল পড়ে আছে আমার ব্লাউজের ওপর
মিস বার্টন আমার চুল কাটল কেন? আমি তাকে ধাওয়া করতে যাচ্ছিলাম এমন সময় মনে পড়ল এরচেয়েও জরুরি কাজ পড়ে আছে। বাড়ি থেকে বেরুবার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিলাম।
রাতটি পরিষ্কার এবং শীতল। জেটির ওপরে পূর্ণিমার চাঁদ হাসছে, হলুদ আলো বিছিয়ে দিয়েছে নদীতে চলাচল করা জাহাজ আর দূরবর্তী তীরের আলোকমালার গায়ে। ক্যাসল ক্লিনটনের চৌকোনা, মোটা প্রাচীর ঝুঁকে আছে আমার ওপর।
একদা ভবনটি মেইনল্যাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, দেখতে লাগত অভেদ্য এবং বিপজ্জনক। এখন ম্যানহাটান শহরের বড় বড় অফিস বিল্ডিংগুলো ওটাকে অর্ধবৃত্তাকারে ঘিরে রেখে বামন করে রেখেছে। ফ্রান্সিস এই দুর্গে আমাকে ঢুকতে নির্দেশ দিয়েছে। এমনিতে রাতের বেলা দুর্গের দরজায় তালা ঝুলিয়ে রাখা হয় তবে আজ শুধু ভারি একটি ছিটকিনি আটকানো দেখলাম। আমি ছিটকিনি টেনে খুলে ফেললাম।
দুর্গের ভেতরে ঢুকে বন্ধ করে দিলাম দরজা। হাঁপাচ্ছিলাম বলে একটু বিশ্রাম নিলাম। ছাদহীন দেয়ালের ওপরে শুধু আকাশ দেখা যাচ্ছে। এছাড়া শহুরে উপস্থিতি থেকে আমি বিচ্ছিন্ন।
গোলাকার উঠনের দিকে কদম বাড়ালাম নুড়ি পাথরের রাস্তা মাড়িয়ে। ক্যানভাসের ব্যাগের ভেতরে ইমপের নড়াচড়া টের পাচ্ছি। আমি ব্যাগ খুলে সাপটাকে ছেড়ে দিলাম। ওটা এঁকেবেঁকে আমার আগে আগে চলতে লাগল। জায়গাটার ঠিক মাঝখানে এসে কুণ্ডলী পাকিয়ে রইল।
সাপটার দিকে এগোলাম আমি, ব্যাগ থেকে ছোট একখানা আয়না বের করে ইমপের কুণ্ডলী পাকানো দেহের ওপর রাখলাম।
‘মার্থা,’ নিজেকে বলতে শুনলাম আমি, ‘আমার উপহার এবং শক্তি দিয়ে আমি তোমার নিবৃত হওয়ার হুকুম করছি। মার্থা হ্যামিলটন, আমি হুকুম করছি তুমি অদৃশ্য হয়ে যাও! তিনবার আমি বলছি মার্থা হ্যামিলটন, আমার উপহার এবং শক্তি দিয়ে হুকুম করছি তুমি অদৃশ্য হয়ে যাও।’
তারপর নেমে এল নীরবতা। দুর্গের দেয়ালের ওপর উঁকি দিল চাঁদ। আমি পারিপার্শ্বিকতা সব ভুলে ওদিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলাম। চাঁদটি ধীরে ধীরে তার পূর্ণ আকার নিয়ে উদ্ভাসিত হলো। ওটার শেষ আলোক রেখা যখন আলোকিত করে তুলল দেয়াল, পায়ের কাছে কাচ ভাঙার শব্দ শুনে নিচে তাকিয়ে দেখি আয়নাটি ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে এবং ইমপ অদৃশ্য।
যখন মাথা তুলে চাইলাম ওই মুহূর্তে ঘন কালো একটি মেঘ চাঁদের দিকে সাঁ সাঁ করে এগোচ্ছিল ওটাকে গ্রাস করতে। আমার হঠাৎ হাত পা কাঁপতে লাগল। দিলাম ছুট। নির্জন রাস্তা ধরে ছুটতে লাগলাম। ভয়ের সঙ্গে কেমন একটা উল্লাসও বোধ করছিলাম।
কোয়েন্টিস স্লিপের কোন ভবনে আলো জ্বলছে না। হ্রস্ব দৈর্ঘ্যের রাস্তাটি জনশূন্য। শুধু জেমসের গাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বাড়ির সামনে। আমি মোড়ে এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ভাবছিলাম আমি যাওয়ার পরে কিছু ঘটেছে কিনা।
আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে কোন অস্বাভাবিক দৃশ্য চোখে পড়ল না বা কোন শব্দ শোনা গেল না। তবে দরজার দিকে এগোতে মৃদু ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ ভেসে এল কানে। আবার থমকে গেলাম। শব্দটা আমাদের বাড়ি থেকে আসছে না, আসছে মি. হ্যামিলটনের অফিস থৈকে। তিনতলার জানালায় অস্পষ্ট একটা কাঠামো চোখে পড়ল, হয়তো ওটা কারো মুখ হবে-যে মুখ সহ্য করা যায় না এমন কিছু দেখেছে।
আমি আমার ঘরে ঢুকতে জলের শব্দ পেলাম। বাথরুমের দরজাটি ভেজানো, এক চিলতে আলো এসে পড়েছে অন্ধকার বেডরুমে, ওখানে জেমসের জামাকাপড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমি তার নাম ধরে ডাকলাম। পরমুহূর্তে সে তার ভেজা শরীর নিয়ে আমাকে চেপে ধরল। কানের পাশে ফিসফিসিয়ে ইটালিয়ান সুরে গাইতে লাগল গান। মোৎসার্টের ডন গিওভান্নি। গান শেষ করে সে নিচু গলায় বলল, ‘তোমার কাপড় খোলো। ও আবার হাসিখুশি মূড়ে ফিরে এসেছে।
.
বারো
‘তোমাকে ছেড়ে চলে যেতে হলে আমার মনটাই ভেঙে যাবে,’ বলল মিস বার্টন। ‘তবে স্কুলে আবার ফিরে গেলে তোমার জন্য ভাল বৈ মন্দ হবে না।’
আমরা স্টাডি রুমে, কবিতা পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। সকালে নাস্তার টেবিলে দাদীমাকে নিয়ে কোন কথা হয়নি। অন্যদেরকে প্রথমে উৎকণ্ঠিত মন হচ্ছিল, যেন আশা করছিল বুড়ো মানুষটা হাজির হয়ে গতকাল সকালের মত সবাইকে বকাবকি করবেন। তবে আমি তাদেরকে আশ্বস্ত করি, ভীতি দূর করে ভবিষ্যতের আনন্দময় দিনগুলোর কথা বলতে থাকি। অবশেষে তাদের মুখে হাসি ফোটে এবং যে যার স্বার্থপর ফ্যান্টাসির রাজ্যে ডুবে যায়।
আর এখন, আমরা যখন কবিতা পড়ার তোড়জোড় করছি, মিস বার্টনকে দেখলাম এখনো তার ফ্যান্টাসির মধ্যে নিমজ্জিত।
‘তোমার বয়সীদের সঙ্গ কি তুমি মিস করছ?’ জিজ্ঞেস করল সে।
মিস বার্টন আসলে চাইছে আমি যেন তাকে বলি আমার বয়সী যে কোন ছেলেমেয়ের চেয়ে তার প্রতি আমার আকর্ষণ বেশি।
‘কাউকে কাউকে মিস তো করিই,’ বললাম আমি। ‘মিরাণ্ডার কথা প্রায়ই মনে পড়ে আমার।’
‘মিরাণ্ডা? এর নাম আগে কখনো শুনিনি তো!’
‘একসময়ে আমাদের দু’জনের মধ্যে খুব দোস্তী ছিল। তবে আমার আগেই ও মহিলায় রূপান্তরিত হয়। তাছাড়া ও আমাকে এমন সব কাজ করতে বলত যার মানে ঠিক বুঝতে পারতাম না।’
একটা ভুরু ঈষৎ কপালে তুলল মিস বার্টন। ‘কী ধরনের কাজ?’
‘ব্যক্তিগত কাজ। একবার সে আমাকে আমার এক গোছা চুল কেটে দিতে বলেছিল।’
‘তাতে তো আমি কোন সমস্যা দেখতে পাচ্ছি না,’ বলল মিস বার্টন। কপালে তোলা ভুরুটি নেমে গেল, তাকে খানিকটা বিব্রত মনে হলো।
‘এতে আমিও কোন সমস্যা দেখতে পাই না। তবে চুল দিয়ে সে যেসব কাজ করতে চাইত তা আমার পছন্দ হত না।’
সেইসব কাজ কী আর জানতে চাইল না মিস বার্টন। জিজ্ঞেস করলে কী জবাব দিতাম জানি না। আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে, বোধকরি ভাবছে গতরাতে আমার ঘর থেকে তাকে বেরিয়ে যেতে দেখেছি কিনা।
মিস বার্টনকে আমার দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রসঙ্গ বদলাতে বললাম, ‘এখন কি আমরা কবিতা পড়ব?’
আমাদের কবিতা পড়ার স্টাইলটি ভালই লাগে আমার। মিস বার্টন জোরে জোরে কবিতা পড়ে, তারপর দু’জনে মিলে কবিতার বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করি। সে বিভিন্ন সময়ের কবিদেরকে বেছে নেয়। কবিতা নিয়ে আলোচনা শুরু না করা পর্যন্ত কবির নাম বলে না। কোন কোন কবিতা লেখার সময়কালের ব্যবধান শত বছর হলেও দুটি কবিতার মধ্যে মিল খুঁজে পেলে আমার বেশ মজাই লাগে।
‘বেশিরভাগ কবিই কি পাগল?’ প্রশ্ন করলাম।
আমার প্রশ্ন শুনে খুশিই মনে হলো মিস বার্টনকে। সম্ভবত তার শিক্ষকতার জীবনে আমাকেই একমাত্র ছাত্রী পেয়েছে যে কবিতা ভালবাসে। ‘হতে পারে,’ জবাব দিল সে। ‘বেশিরভাগ কবিই তো অস্বাভাবিক চরিত্রের ছিলেন। এ কারণেই আমরা তাঁদেরকে মূল্যায়ন করি।’
‘আপনার কি মনে হয় আমি একজন অস্বাভাবিক মানুষ?’
সিরিয়াস ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকাল মিস বার্টন। ‘হ্যাঁ। তবে তুমি নিজেকে যতটা অস্বাভাবিক ভাবছ ততটা নয়। প্রতিটি মানুষই কোন না কোনভাবে অদ্ভুত।’
‘তাহলে তো আপনিও অদ্ভুত।’
‘হুঁ,’ আমার হাত ধরল মিস বার্টন। ‘তবে আমি কারো ক্ষতি করি না। তোমারও কারো ক্ষতি করা উচিত হবে না, .. এলিজাবেথ।’
বেশিরভাগ শক্তিহীন মানুষের মত মিস বার্টন তার একটা দুর্বলতার কথা প্রকাশ করে দিল। আমি তার হাত ধরে বললাম, ‘আমাকে যারা ভালবাসে আমি কখনো তাদের ক্ষতি করব না।’
.
সেই রাতে দাদীমাকে নৈশভোজে না দেখে জেমস মি. টেলরকে বলল দাদীমাকে যেন সে জিজ্ঞেস করে রাতের খাবারটা তাঁর ঘরে দিয়ে আসবে কিনা। আমার ধারণা মি. টেলর দাদীমার একান্ত অনুগত কর্মচারী। সে বহু আগে থেকে দাদীমার সেবা করে আসছে। লক্ষ করলাম সে জুতা পালিশ করেছে। চকচক করছে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে চোখ বুজে সে হাসছিল।
তবে সে রাতে ডাইনিংরুমে ফিরে আসার পরে তার মুখে হাসিটি ছিল না। সামনে ঝুঁকে জেমসের কানে কানে কী যেন বলল।
আমার দিকে তাকাল জেমস। ‘মাকে কেউ দেখেছে? মা তাঁর ঘরে নেই।’
কেউ জবাব দিল না।
জেমস মি. টেলরকে বলল, ‘উনি বাইরে যেতে পারবেন না। আমাদের একবার রাড়িটি ভাল করে খুঁজে দেখা উচিত।’
‘আমি তোমাকে সাহায্য করব,’ বললাম আমি। দাদীমার ঘরটি আরেকবার দেখা দরকার আমার।
.
ভাঙা আয়নার কাচের টুকরো পড়ে আছে মেঝেতে এবং ড্রেসারের ওপর। গ্যাসবাতির আলোর প্রতিফলন হচ্ছে টুকরোগুলোয়। জেমস এবং মি. টেলর ভাঙা, ছিটানো কাচখণ্ডগুলো দেখল তবে কোন মন্তব্য করল না। আমার ধারণা দাদীমার অনুপস্থিতির চেয়েও ভাঙা আয়না তাদেরকে বেশি ভীত করে তুলেছে। এটি একটি অশুভ সঙ্কেত। ওদেরকে শেখানো হয়েছে বাড়িতে আয়না ভাঙলে দুর্ভাগ্য বয়ে আনে।
জেমস দেয়ালের একটি সুইচ টিপে দিতেই উজ্জ্বল আলোয় ভেসে গেল ঘর। উঁচু ছাত থেকে কাটগ্লাসের ছোট একটি ঝাড়বাতি ঝুলছে। তাতে অনেকগুলো শক্তিশালী বাল্ব বসানো। আয়নার ভাঙা কাচ আর ঝাড়বাতি থেকে ঠিকরে পড়া আলো নাচছে দেয়াল এবং সিলিং-এ। যে ঘরটি আগে উত্তেজক এবং রহস্যময় মনে হত সেটি এখন খুবই করুণ এবং অবহেলিত লাগছে।
.
বাড়িতে খোঁজ চালানো শেষে সকলে স্টাডি রুমে সমবেত হলাম। বলাবাহুল্য দাদীমার কোন সন্ধান মেলেনি, কেউ জানে না তাঁর কী হয়েছে।
যদিও জানি দাদীমার অন্তর্ধানের জন্য আমিই দায়ী তবু কোনরকম অপরাধবোধ হচ্ছিল না আমার। আমি তো আর তাঁকে খুন করিনি। তাঁর গলা টিপে ধরিনি, জলে ডুবিয়ে মারিনি, দাদীমা বলা নেই কওয়া নেই দুম করে হাওয়া হয়ে গেছেন। নিজের কর্মফল ভোগ করেছেন তিনি।
জেমস দাঁড়িয়ে আছে ফায়ারপ্লেসের সামনে। ‘ধস্তাধস্তি কিংবা মারামারির কোন চিহ্ন নেই ঘরে, কেবল ভাঙা আয়না ছাড়া।’ বলল সে। ‘তবে মনে হয় না এখনো দুশ্চিন্তার কিছু আছে।’
ক্যাথেরিন একটা সোফায় আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে কিথকে জড়িয়ে ধরে, জিজ্ঞেস করল, ‘ওনাকে শেষ কখন দেখা গেছে?’
‘মি. টেলর গতরাতে তাঁর ঘরে খাবার নিয়ে গিয়েছিল। ন’টার দিকে সে ট্রে নিয়ে আসে। তারপর কেউ তাঁকে দেখেছে?’
কেউ জবাব দিল না।
‘হয়তো উনি বাইরে কোথাও গেছেন,’ বলল ক্যাথেরিন।
‘তাঁর কাছে যে একজন লোক এসেছিল?’ জানতে চাইল মিস বার্টন। ‘কেউ কি বলতে পারবে লোকটি কে ছিল কিংবা কখন সে চলে যায়?’
‘টেলর তাকে ঘরে ঢুকতে দেয়,’ বলল জেমস। ‘তবে লোকটিকে সে চিনতে পারেনি। সে টেলরকে একটি চিঠি দেয় মাকে দেয়ার জন্য, মা লোকটির সঙ্গে নিজের ঘরে দেখা করবে বলে। জানি না কখন সে চলে গিয়েছিল তবে টেলর বলেছে ন’টার সময়ও লোকটা মা’র ঘরে ছিল।’
দাদীমার অন্তর্ধান নিয়ে ওরা টেলিভিশন নাটকের মত একটি রহস্য তৈরি করতে চায়। আমি অবশ্য ওদেরকে বলব
যে মি. হিউবার্টকে দেখেছিলাম। সে রাতে দাদীমার সঙ্গে তোন কী কথা বলেছিলেন তা তাঁর সিক্রেট। আমরা সবাই গোপনীয়তা পছন্দ করি, সবারই জীবনে কিছু না কিছু সিক্রেট থাকে। গোপনীয়তা আছে বলেই পৃথিবীটা এত মজার।
‘উনি কোথায় যেতে পারেন?’ প্রশ্ন করল ক্যাথেরিন।
‘বহুদিন পরে উনি বাসার বাইরে গেলেন। লেক জর্জের পরে আর কোথাও তাঁকে যেতে দেখিনি।
‘হয়তো ওখানেই তিনি গেছেন,’ বলল জেমস। ‘মাঝে মাঝেই তো ওদিকে বেরিয়ে পড়তেন।’
ওরা আসলে চিন্তিত হওয়ার ভান করছে। দাদীমার অন্তর্ধানে যে খুশি হয়েছে তা স্বীকার করতে লজ্জা পাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত জেমস। একটু পরপরই সে জিভ বের করে ভিজিয়ে নিচ্ছে শুকনো ঠোঁট।
‘আজ রাতে তো আর কিছু করা যাবে না। কাল সকাল নাগাদ উনি না ফিরলে আমি গাড়ি নিয়ে চলে যাব লেকে। ওখানে ওঁকে না পেলে কাউকে তাঁর কথা জিজ্ঞেস করব। তবে এ মুহূর্তে কিছু করা যাচ্ছে না।’
কিথ নিজের ঘরে চলে গেল, বাকিরা চুপচাপ বসে রইলাম। বাড়িটি নীরব তবে বাইরে জোরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।
মিস বার্টন গিয়ে ক্যাথেরিনের পাশে বসল। জেমস সবার জন্য গ্লাসে কনিয়াক ঢালল। ‘টু মাই লেডিস,’ বলল সে।
সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় দাদীমার ঘরে গেলাম আমি। ঝাড়বাতির আলোগুলো নিভিয়ে দিলাম, গ্যাসলাইটের আলো মিটমিট করে জ্বেলে রাখলাম। ঘর হয়ে উঠল অন্ধকার। তারপর দরজা বন্ধ করে চলে এলাম নিজের ঘরে।
ভেবেছিলাম ফ্রান্সিসের দেখা পাব। তবে সে আসেনি। আমি আয়নার সামনে বসে তাকে ডাকলাম। কিন্তু আয়নায় শুধু নিজের চেহারাই দেখতে পেলাম। আমার কপালে কুঞ্চন। এ লম্বা রেখাটি আগে লক্ষ করিনি। আমার ভেতরে এমন একটা অনুভূতি কাজ করছিল যা আগে কখনো অনুভব করিনি: ভয় পাচ্ছিলাম আমি আমার প্রিয় একজন মানুষকে আর কোনদিন দেখতে পাব না।
.
তেরো
পরদিন সকালে নিজের ছোট লাল গাড়িটি চড়ে লেক জর্জে চলে গেল জেমস। ভেবেছিলাম আমাকেও বুঝি সঙ্গে নেবে। ও আমাকে নিয়ে গাড়িতে ঘুরতে বেশ মজা পায়। বিশেষ করে গাড়িটি যদি আমি চালাই। ‘আরও জোরে, আরও জোরে,’ গাড়ি চালানোর সময় কানের কাছে ফিসফিস করে সে। আমার কেন জানি মনে হয় মৃত্যুর প্রতি ওর একটা ঔদাসীন্য রয়েছে।
সেদিন সকালে শুধু আমি বাড়িতে রইলাম। কিথ স্কুলে যাওয়ার পরে ক্যাথেরিন মিস বার্টনকে তার সঙ্গে শহরে যেতে অনুরোধ করল। কিছু কেনাকাটা করবে। ফিফথ এভিন্যুর ছোট ছোট পোশাকের দোকানগুলোতে সে ঘুরে বেড়াতে ভালবাসে। ক্যাথেরিন ওখান থেকে ড্রেস কেনে।
মিস বার্টন যেতে রাজি হলো না। তবে ক্যাথেরিন চলে যাওয়ার পরে সে প্রস্তাব দিল দু’জনে মিলে বাইরে থেকে একটু তাজা হাওয়া খেয়ে আসব। আমরা ব্যাটারি পার্কের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। দিনের বেলা সরু সরু রাস্তাগুলোয় হেঁটে বেড়াতে মোটেই ভাল্লাগে না আমার। কারণ তখন মানুষের ভিড় আর চড়া রোদে রাস্তাগুলো তাদের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে।
আমরা পার্কে প্রবেশ করার পরে আকাশের দিকে তাকালাম। ম্যানহাটানে আকাশ দেখতে পাবার মত, স্বল্প কয়েকটি জায়গার মধ্যে ব্যাটারি পার্ক অন্যতম। গত রাতে ঝড় হয়েছে। নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া কালো মেঘগুলো জোরালো বাতাসের ধাক্কায় হটে যাচ্ছে। ক্যাসল ক্লিনটনের গোলাপি-হলুদ রঙের বেলেপাথরগুলো সূর্যালোকে লহমার জন্য উজ্জ্বল হয়ে উঠল। পরক্ষণে মেঘের ধূসর ছায়া পড়ল গায়ের ওপর।
‘আমি কখনো স্টাটেন আইল্যাণ্ড ফেরিতে উঠিনি,’ বলল মিস বার্টন। ‘অনেক দূর?
‘আসতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে।’
‘তুমি আমার সঙ্গে এখন যাবে?’
আমার অবশ্য বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল, দাদীমার ঘরে ঢুকে তার ক্লজিট ঘেঁটে দেখব, হাত দিয়ে ছোঁব তাঁর পুরনো জিনিসপত্র। কিন্তু মিস বার্টন আমাকে একা ছাড়বে না জেনেই তার সঙ্গে ফেরিতে যেতে রাজি হলাম।
ফেরি ছাড়তে আরও খানিক দেরি আছে। তাই আমরা ওয়েটিংরুমে ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম। ঠাণ্ডা, জোর হাওয়া বইছে। তবু ফেরিবোটের স্টার্নে গিয়ে দাঁড়ালাম। একটু বাদে ছেড়ে দিল জাহাজ। আমাদের বাড়িটি দেখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। আমাদের বাড়ির চারপাশে উঁচু উঁচু দালান। এতদূর থেকে দেখা যাচ্ছে না!
জাহাজের মূল ছাউনিতে চলে গেলাম দু’জনে। একটা জানালার ধারের কাঠের একখানা বেঞ্চি দখল করলাম। আমরা এ মুহূর্তে স্ট্যাচু অভ লিবার্টির সামনে দিয়ে যাচ্ছি। মিস বার্টন মূর্তিটির প্রশংসা করার ভান করল। আমি জানি সে ভান করছে কারণ আমরা শিল্পকলা নিয়ে বহুবার আলোচনা করেছি এবং স্থাপত্য বিদ্যাটি মিস বার্টন ভালই বোঝে।
আমি বললাম, ‘আমার মনে হয় এটার প্রকাণ্ড সাইজই মানুষকে মুগ্ধ করে। আকারে ছোট হলে এটার দিকে লোকে খুব একটা নজর দিত বলে মনে হয় না।’
হাসল সে। ‘হয়তো বা। তবু এটাকে দেখে আমি মুগ্ধ হই। বিশেষ করে এর সিম্বলিজম আমাকে সবচেয়ে আকর্ষণ করে। উনিশ শতকে যেসব মানুষ এখানে এসেছিল, আমার আত্মীয়স্বজনসহ, সবার কাছেই এটি বিশেষ অর্থ বহন করে।
আমি এলিস আইল্যাণ্ডের দিকে হাত তুলে দেখালাম। বর্তমানে পরিত্যক্ত, অন্ধকার এবং পুরনো জাহাজের মত জলে অনেকটা ডুবে আছে। ওটার ভবনগুলো এখন ইঁদুর আর গুবরেপোকাদের আস্তানা।
‘ওই দ্বীপটির জন্যও আমার একইরকম অনুভূতি হয়। বললাম আমি। ‘প্রথম যেদিন দ্বীপটাকে দেখি আমি, মনে হচ্ছিল জলের ওপর দিয়ে মানুষের গলা ভেসে আসছে ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর।
শিউরে উঠল মিস বার্টন। জানালা থেকে সরিয়ে নিল মুখ। আমি জিজ্ঞেস করলাম দাদীমাকে সে মিস করবে কিনা। ‘তুমি এমনভাবে কথা বলছ যেন উনি আর ফিরে আসবেন না।’ বলল সে।
‘উনি আর ফিরবেন না।
মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল মিস বার্টনের। তুমি তাহলে জানো উনি কোথায়?’
‘না।’
‘তাহলে তুমি নিশ্চিত নও, তাই না? তুমি আসলে কল্পনা করছ যে তুমি জানো।’
মনে পড়ল জেমস একবার বলেছিল মিস বার্টন কল্পনাবিলাসী মানুষ। অবশ্য এর ছোটখাট কিছু প্রমাণও পেয়েছি। সে বড় বড় মানুষদের কথা জানে তবে বুঝতে পারে কেবল একান্ত সাধারণ লোকদের।
‘আপনি কি বিশ্বাস করেন না যে কল্পনা করা এক ধরনের জানবার সামিল?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
মিস বার্টন আমার দিকে শিক্ষকসুলভ চাউনি দিল। ‘কল্পনা করা আর কল্পনার মধ্যে পার্থক্য আছে। তুমি ব্যাপারটি যে জানো সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।’
ফেরার পথে মি. হ্যামিলটনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। . আমরা ফেরির বো-তে দাঁড়িয়ে ছিলাম, প্রকাণ্ড জাহাজটি জেটিতে ভিড়বার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন সময় পেছন থেকে ভেসে এল তাঁর কর্কশ কণ্ঠস্বর।
‘হ্যালো, এলিজাবেথ।’
তাঁর ডাক শুনেও না শোনার ভান করলাম কিন্তু তিনি আমার সামনে চলে এলেন। ‘তোমরা এ জাহাজে আছ জানতাম না,’ বললেন তিনি। ‘তাহলে তোমাদেরকে ব্রিজে নিয়ে যেতাম। আমি ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলছিলাম।’
আমি মিস বার্টনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিলাম। তিনি মিস বার্টনের হাত ধরলেন, একই সঙ্গে আমার কাঁধ জড়িয়ে ধরলেন আরেক হাতে। আমি জানতাম তিনি একটু একাকী মানুষ তবে তাঁর একাকীত্ব আমার ওপর চাপিয়ে দেয়ার কোন অধিকার তাঁর নেই। মনে পড়ল জেমস বলেছিল দাদীমার কথা শুনলে দাদু বিরক্ত হতেন।
‘দাদীমা হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে গেছেন,’ বললাম আমি। ‘আপনার সঙ্গে কি তাঁর দেখা হয়েছে?
আমার কাঁধ থেকে হাতটি নামিয়ে কদম হটলেন তিনি। এখন আর হাসছেন না, তাঁর নিচের ঠোঁটটি ঝুলে পড়েছে। তবে তাঁকে বিচলিত দেখালেও সত্যি তিনি ভেতরে ভেতরে এতটা বিচলিত কিনা সন্দেহ হচ্ছিল আমার।
‘তোমার দাদীমার সঙ্গে আমার দেখা সাক্ষাৎ নেই বহু বছর,’ বললেন তিনি।
আমি ভাবছিলাম তিনি দাদীমাকে এখনো ভালবাসেন কিনা অথবা আদৌ ভালবাসতেন কিনা। আমি তাঁর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি, জাহাজের সিঁড়ি ফেলা হলে লোকে পিলপিল করে নামতে শুরু করল। আমি সামনে পা বাড়ালাম।
মি. হ্যামিলটন বাড়ি পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে হেঁটে এলেন, দাদীমাকে নিয়ে প্রশ্ন করলেন, সেই সঙ্গে মিস বার্টনকে খুশি করার চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। আমার ধারণা ওরা দু’জন দু’জনকে পছন্দ করতে শুরু করেছেন।
মি. হ্যামিলটন বললেন ডিনারের পরে তিনি আমাদের বাসায় একবার ঢুঁ মারতে পারেন। আমার কিন্তু মনে হলো না দাদীমার অন্তর্ধানের এ ঘটনায় তিনি পরিবারের সঙ্গে আবার সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইবেন। অবশ্য আমাদের বাড়িতে তাঁর জন্য কোন জায়গাও নেই। তাছাড়া জেমস এ বুড়ো লোকটিকে দেখার পরে কীরকম প্রতিক্রিয়া দেখাবে তাও ভাবছিলাম।
বিকেলে লেক থেকে ফোন করল জেমস। বলল দাদীমার কোন ট্রেস খুঁজে পায়নি, রাতটা সে কেবিনেই থাকবে।
সে রাতে আমাদের বাড়িতে পুরুষ মানুষ বলতে শুধু রইল মি. টেলর। আমি তাকে নির্দেশ দিলাম বহিরাগত কাউকে যেন বাড়িতে ঢুকতে না দেয়। ক্যাথেরিনকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করবে কিনা প্রশ্ন করলে বললাম কোন প্রয়োজন নেই। ডিনারের পরে আমার ঘরে তাকে আসতে বললাম ড্রেসারের ড্রয়ারটি মেরামত করার জন্য। ওটা কোথাও আটকে গেছে। খুলছে না। ভেবেছিলাম মি. টেলর হয়তো বলবে কাল সকালে সে আসবে। কিন্তু গম্ভীর মুখে আমার দিকে তাকিয়ে রাজি হয়ে গেল।
নতুন পোশাক পরে ডিনারে অংশ নিল ক্যাথেরিন। শর্ট স্লিভ ড্রেস, বাহুর কাছটা লাল কাপড়ে মোড়া। আমি পরেছি কালো ড্রেস।
ডিনার শেষে চলে এলাম নিজের ঘরে। কয়েক মিনিট বসে রইলাম এ আশায় যে ফ্রান্সিসকে দেখতে পাব। কিন্তু ও আর আসবে না বুঝতে পেরে ড্রেসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।
টান মেরে খুললাম ড্রয়ার। এর ভেতরে আমি অন্তর্বাস রাখি। আমি একটি কালো প্যান্টি বের করে ড্রয়ার এবং ড্রেসারের মাঝখানের পাশের ফাঁকা জায়গাটিতে রাখলাম। তারপর ড্রয়ার ধরে ঠেলতে লাগলাম যতক্ষণ পর্যন্ত না ওটা আটকে যায়। এরপরে বাঁশি বের করে বাজাতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর মৃদু নক হলো দরজায়।
মি. টেলর টুলবক্স নিয়ে এসেছে। বেডরুমের দরজা খোলা রেখে সে ড্রেসারের সামনে গিয়ে যন্ত্রপাতির বাক্সটি মেঝেতে রাখল। কোন্ ড্রয়ারটি জ্যাম হয়ে আছে দেখালাম তাকে। সে ওটা ধরে সাবধানে টানাটানি করছে, আমি প্রায় তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকলাম। হঠাৎ খুলে গেল ড্রয়ার। মি. টেলর ড্রয়ারটি ড্রেসার থেকে টেনে বের করল, সে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল আমার কালো প্যান্টি। ভেবেছিলাম প্যান্টি দেখে সে লজ্জা পাবে কিন্তু শান্ত গলায় বলল, ‘তোমাকে সেই ছোট্টবেলা থেকে আমি দেখে আসছি, এলিজাবেথ। তখনো আমি বয়সে বুড়োই ছিলাম।’
টুলবক্স খুলল সে। ভেতরে সুন্দরভাবে সাজানো যন্ত্রপাতি, হালকা তেলের গন্ধ আসছে। এই প্রথম তার মুখে স্নেহের একটি ভাব ফুটে উঠতে দেখলাম আমি, সে মোমের মত একটি লুব্রিকান্ট নিয়ে ড্রয়ারের চাকায় ঘষতে লাগল। ‘এখন আর কোন সমস্যা হবে না,’ বলল সে।
‘ছোটবেলায় আমি কেমন ছিলাম?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘তুমি উল্টোপাল্টা সব কাজ করতে।’
‘খুব দুষ্টু ছিলাম, না?’
‘তুমি দুষ্টামির মধ্যে কোন ফারাকই বুঝতে পারতে না। এমন সব কাণ্ড করতে যা সাধারণ বাচ্চারা করে না।’
.
চোদ্দ
জেমস পরদিন বিকেলে ফিরে এল। লেক জর্জে দাদীমার কোন হদিশ না পেয়ে ঠিক করেছে পুলিশে জানাবে।
মিসিং পার্সনস ব্যুরো থেকে দুই গোয়েন্দা এল ডিনারের পরে। তারা আমাদের গল্প শুনল এমন অভিব্যক্তি নিয়ে যেন কোন সুন্দরী, হাস্যমুখীর কথা শুনছে বটে তবে একটি শব্দও বুঝতে পারছে না। মাঝে মাঝে সায় দেয়ার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল যদিও নিজেদের বিরক্তি এক মুহূর্তের জন্যও প্রকাশ করল না।
দাদীমার ভাঙা আয়নাটি দেখল তারা, তবে ঘরের অন্যান্য জিনিসগুলোর প্রতি তাদের মনোযোগ অধিক লক্ষ করা গেল। আমাদেরকে নিশ্চিত করল এই বলে দুই- একদিনের মধ্যেই দাদীমার খোঁজ মিলবে। হয়তো তিনি কোন বান্ধবীর বাড়ি গেছেন বেড়াতে। তবু তারা একবার চেক করে দেখবে।
.
ফ্রান্সিস সে রাতেও আমাকে দেখা দিল না। আমার আশঙ্কা জাগল হয়তো তার সঙ্গে আর দেখা হবে না। যদিও তার সঙ্গে আমি দেখা করতে চাইছি কিন্তু এও জানি ওকে আর আমার প্রয়োজন নেই। হয়তো তার শক্তিতে যা কুলোয় বা আমাকে যা দেয়ার সবই দিয়ে গেছে।
চিলেকোঠায় জেমসের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগে কিথের ঘরে গেলাম আমি।
‘তোমার সাপগুলো দেখতে এলাম।’ বললাম আমি।
কিথ খুব খুশি। ‘আমার স্কারলেট কিং খোলস ছাড়তে শুরু করেছে।’ বলল সে। কিথের গলার স্বর খসখসে। হয়তো উত্তেজনায় কিংবা বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছার ইঙ্গিত।
সে আমাকে লাল, কালো এবং হলুদ ছোপঅলা একটি সাপ দেখাল। সাপটির মাথার দিককার চামড়া আলগা হয়ে ঝুলে পড়েছে। কিথ কাগজের মত পাতলা চামড়াটি দু’আঙুলে চেপে ধরে টান মেরে খুলে আনল। তাকে খুব আনন্দিত দেখাচ্ছে।
‘তুমি তোমার সাপদের নাম রেখেছ?’ জানতে চাইলাম।
‘হুঁ।’
‘এটার নাম কী?’
‘মার্থা।’
মার্থা আমার দাদীমার নাম।
‘দাদীমাকে তুমি মিস কর?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘দাদীমাকে আমার ভয় লাগত। উনি কি ফিরে আসবেন?’
‘না, কিথ।’
সে হেসে তার মসৃণ, সরু হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরল। ওর ড্রেসারের একটি বাক্সে অনেকগুলো সাপের খোলস দেখতে পেলাম।
.
পরের কয়েকটি দিন আমাদের ভালই কাটল। কেউ দাদীমার প্রসঙ্গই তুললাম না। তারপর একদিন সকালে মিস বার্টন আমাকে বলল, ‘গতকাল তোমার দাদুর সঙ্গে আমি লাঞ্চ করেছি।’
আমি ভাব দেখালাম যেন এসব শোনার প্রতি কোন আগ্রহই বোধ করছি না।
মিস বার্টন বলে চলল: ‘তিনি তোমার দাদীমাকে নিয়ে খুব চিন্তায় আছেন। তাঁর ধারণা তোমার দাদীমার জন্য আমরা যথেষ্ট পরিমাণ খোঁজ-খবর করছি না।’
‘আমি তো ভাবতাম তিনি দাদীমার চেহারাই কোনদিন দেখতে চাইতেন না।’
‘আমারও তাই মনে হয়। তবে তিনি সত্যি জানতে চান দাদীমা কোথায় আছেন।’
‘আমার দাদু কেমন যেন অদ্ভুত মানুষ।’
‘ঠিক তা নয়। তোমার দাদীমা এমন কিছু করেছিলেন যে জন্য তিনি কখনো তাঁকে ক্ষমা করতে পারবেন না। তবে তাঁরা একত্রে বেশ কয়েক বছর সুখেই কাটিয়েছেন। সেসব স্মৃতি তিনি ভোলেনওনি। মানুষটা তিনি ভাল, সত্যি।’
মিস বার্টন পুরুষদের সম্পর্কে কিছু জানে বলে মনে হয় না আমার। সে শারীরিকভাবে পুরুষদেরকে ভয় পায় এবং বিশ্বাস করে পুরুষ শ্রেণীর মধ্যে এমন একটি শক্তি আছে যা তার বোধগম্যের বাইরে।
‘দাদীমার অন্তর্ধানের পেছনে দাদুর হয়তো হাত আছে,’ মন্তব্য করলাম আমি।
‘তোমার এরকম মনে হওয়ার কারণ?
‘এটা হতে পারে, তাই না? আমি তাঁকে রাতের বেলা অন্ধকারে একাকী জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।’
‘তাতে তো কোন সমস্যা নেই। তোমার যদি মনে হয় এটা তাঁর খেয়ালী মনের পরিচয়, এজন্য তাঁকে দোষ দিতে পার না। তোমাকে আগেও বলেছি, এলিজাবেথ, তোমার একটু ধৈর্যশীল হওয়া উচিত।’
মিস বার্টনের বোধকরি ধারণা আমাকে নৈতিক উপদেশ বর্ষণও তার চাকরির একটি অংশ। তবে সে যেসব পার্থক্য তৈরি করে তা আমি বুঝতে পারি না। জেমস যে আমার ঘরে আসে কিংবা ক্যাথেরিন যে তার রুমে যায়, এ নিয়ে তাকে কখনো টু শব্দটি করতে দেখিনি। যেন গোপন কর্মকাণ্ড খুব স্বাভাবিক ব্যাপার, একে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই। মাঝে মাঝে ভাবি ফ্রান্সিসের কথা তাকে বললে সে কী বলবে। হয়তো একদিন তাকে আমি বলব।
‘মিসেস হ্যামিলটনের কী হয়েছে সে সম্পর্কে কি তুমি কিছু জানো, এলিজাবেথ? এমন কোন কথা যা তুমি আমাদেরকে বলছ না?’
‘উনি কোথায় আছেন সে সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না,’ বললাম আমি।
‘তুমি কি চাও না আমরা তাঁকে খুঁজে বের করি?
‘তিনি হয়তো চান না কেউ তাঁর খোঁজ পেয়ে যাক।’
মিস বার্টনকে খুব বিরক্ত দেখাল। ‘হয়তো কেউ তোমার দাদীমাকে আহত করেছে। সে লোকটির কি শাস্তি হওয়া উচিত নয়?’
নাহ্, এ প্রসঙ্গটির এখনই সমাপ্তি টানা দরকার। ‘হ্যাঁ, আমি চাই। তবে এ ব্যাপারে আমি কোন সাহায্য করতে পারব বলে মনে হয় না।’ আমি মিস বার্টনের হাত স্পর্শ করলাম। ‘আমি কোন সাহায্যে আসতে পারনে। আমাকে জানাবেন,’ বললাম আমি। ‘এখন মন খারাপ করে থাকার কোন দরকার নেই।
‘আমি মন খারাপ করছি না।’ বলল সে। আমরা আমাদের পড়াশোনার জগতে ফিরে গেলাম। সে শিশুদের ক্রুসেড নিয়ে কথা বলতে লাগল। হাজার হাজার শিশুকে হলিল্যাণ্ডে পাঠানো হয়েছিল এ বিশ্বাসে যে অন্য শক্তিগুলো যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, নিষ্পাপ শিশুরা সেখানে সফল হবে। কিন্তু সকল শিশু এ যুদ্ধে মারা যায়।
.
জেমস আজকাল খুব ব্যস্ত। দাদু এবং আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনাতেই তার দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। সে আমার সঙ্গে আগের চেয়ে কম কথা বলছে। এতে অবশ্য আমি খুশি। কারণ তার চিন্তাভাবনা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। আমার বাবার মত তাকেও শুধু নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ডুবে থাকার শিক্ষা দেয়া হয়েছে।
লেক থেকে ফেরার কয়েকদিন বাদে জেমস ঘোষণা করল আমাদের ধরে নিতে হবে যে দাদীমা আর ফিরছেন না। নানান আইনী জটিলতা এর মধ্যে জড়িয়ে আছে বটে, বলল সে, তবে আমরা কেন আগের মত জীবনযাপন করব না তারও কোন যুক্তি সে দেখতে পাচ্ছে না।
পরে, যখন সে আমার সঙ্গে একা, মিনতি করল আমি যেন কখনো তাকে ফেলে চলে না যাই। আমি নিশ্চিত এই একই কথা সে তার স্ত্রীকেও একবার বলেছিল যখন তার যুবতী শরীরটি ছিল আঁটসাঁট, যৌবনের জোয়ারে ভরপুর। ‘আশা করি আমার কখনো চলে যেতে হবে না,’ বললাম আমি। মন থেকেই কথাটি বলেছি কিন্তু, তবে জেমস নয়, বাড়িটিকে ইঙ্গিত করেছি। আমি এ বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না।
.
যদিও জানি ফ্রান্সিসকে আর দরকার নেই তবু ওকে ছাড়া কেমন অস্বস্তি লাগে আমার এবং প্রতি রাতে কিছুক্ষণ আয়নার সামনে বসে থাকি আমি এ আশায় যদি তার দেখা পাই। ফ্রান্সিসের সঙ্গে চেহারায় মিল আছে বলে আজকাল মিস বার্টনের সঙ্গে সন্ধ্যায় বেশি সময় কাটাতে লাগলাম।
.
