ডাইনি – ১৫
পনেরো
এক রাতে ভাল ঘুম হলো না আমার। অস্বস্তি নিয়ে জেগে গেলাম। মনে পড়ল ফ্রান্সিসকে স্বপ্ন দেখেছিলাম। স্বপ্নে আমি চিলেকোঠায় ছিলাম, ধুলোপড়া পুরনো আয়নায় ফ্রান্সিসকে লক্ষ করেছিলাম। তার হাতে একটি চালনি এবং একটি কাঁচি। একটি টেবিলে, এক লোকের সামনে বসে আছে। লোকটির হাতে চামড়ার পার্স। পার্সটি খুলে লোকটি কয়েকটি ছোট ছোট চকচকে জিনিস ঢেলে দিল টেবিলের ওপর। ফ্রান্সিস কথা বলছিল তবে আমি তার কথা বুঝতে পারছিলাম না। তার চোখ বুজে আছে, ঠোঁট নড়ছে, বিড়বিড় করে কী একটা কথা বারবার বলে যাচ্ছে। যেন একটিমাত্র শব্দই পুনরাবৃত্তি করে চলেছে। যদিও শব্দটির মানে বোধগম্য হচ্ছিল না, তবে মনে হচ্ছিল ওটা কোন লোকের নাম হবে।
ঘুম ভাঙার পরে বুঝতে পারলাম টেবিলে, ফ্রান্সিসের সামনে যে লোকটি বসেছিল তার সঙ্গে আমার চেহারায় অনেক মিল আছে। ফ্রান্সিসকে দেখতে বড্ড ইচ্ছে করছিল আমার।
আমি অন্ধকারে বসে রইলাম। মিস বার্টনের ঘর থেকে নানান শব্দ আসছে। আমার মনে হয় সে খুব কমই ঘুমায়। প্রায়ই তাকে তার ঘরে হাঁটাহাঁটি করতে শুনি। কখনো গলাখাঁকারির আওয়াজ শোনা যায়, কখনোবা জল পড়ার শব্দ।
চিলেকোঠার আয়নাটি কথা মনে পড়ল, মনে পড়ল ফ্রান্সিসের সঙ্গে ওখানে সময় কাটানোর কথা। আমি বিছানা থেকে উঠে গায়ে একটি নাইটগাউন চাপালাম। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলাম ওপরে।
ঘরের কার্পেটটি কে যেন সরিয়ে রেখেছে। আমি ওটাকে টেনে আগের জায়গায় নিয়ে এসে আয়নার সামনে বসলাম।
‘ফ্রান্সিস,’ বললাম আমি। ‘কোথায় গেলে তুমি?’
কোন জবাব নেই। আয়নায় শুধু আমার নিজের প্রতিচ্ছবি ফুটে আছে।
‘তুমি আমার ওপর খুশি হওনি, আমি দাদীমার কবল থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করেছি, যেভাবে তুমি নির্দেশ দিয়েছিলে। এখন আমরা এখানে সুখী। তুমি আমাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছ না কেন?
দোরগোড়া থেকে ভেসে এল একটি কণ্ঠ। ‘এলিজাবেথ? তুমি কী করেছ?’
ওখানে দাঁড়ানো মূর্তিটির দিকে আমি তাকালাম। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো ওটা ফ্রান্সিস। কিন্তু তা নয়। ওটা মিস বার্টন। ‘তুমি তোমার দাদীমার কী করেছ? আর ফ্রান্সিস কে?’
আমি চুপ করে রইলাম।
‘আমার কথার জবাব দাও, এলিজাবেথ।’
‘চলে যান। আমি তো আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাই না। আমার বিষয়েও আপনি নাক গলাতে আসবেন না।’
মিস বার্টন দরজা বন্ধ করে এগিয়ে এল আমার দিকে।
‘আমার ব্যক্তিগত বিষয়গুলো খুবই তুচ্ছ।’ আমি যা-ই করি, তা অকিঞ্চিৎকর, নগণ্য,’ বলল সে। ‘তবে তা একটা গুণ হতে পারে, মাই ডিয়ার। এর মানে হলো আমি যা করি তা কারো জন্য ক্ষতিকর নয়।’
সে, এসে আমার পাশে বসল, আমার মাথার চুল পেছনের দিকে ঠেলে ঘাড়ের পেছনে রাখল। ‘ফ্রান্সিস কে?’ প্রশ্ন করল সে।
আমি ওকে সত্যি কথাটা বলব কিনা ভাবছিলাম। মিস বার্টন যখন আমাদের সঙ্গে থাকতে এল, আমি তাকে হুমকি মনে করেছিলাম, তবে এখন জানি এ ক্ষতিকর নয়। তার সঙ্গে ফ্রান্সিসের শারীরিক মিল থাকতে পারে তবে আমার জন্য তাকে আমি হুমকি মনে করি না। আমার কাছে শক্তি আছে। প্রয়োজনে দাদীমার মত মিস বার্টনেরও একই দশা করে ছাড়ব। অবশ্য এরচেয়েও সহজ রাস্তা আছে: জেমসকে বলে ওকে চাকরিচ্যুত করতে পারি অথবা মৃদু হেসে তার হাত আমার বুকের ওপর রাখতে পারি। মিস বার্টনকে সামাল দেয়া খুবই সোজা। ওকে আমার গোপন কথাগুলো বলে দিলেও ভারি মজা হবে।
‘আপনি কি আমাকে ভালবাসেন, মিস বার্টন?’ জানতে চাইলাম আমি। আমার ঘাড়ের ওপর হাতখানা নড়ে উঠল। আমি তার পবিত্র শব্দটি উচ্চারণ করেছি।
‘আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি, এলিজাবেথ,’ তার হাত অল্প অল্প কাঁপছে, টের পাচ্ছি।
‘আপনি আমাকে যে প্রশ্নগুলো করেছেন তার জবাব পেতে হলে আপনার বিশ্বাস এবং আস্থা আমাকে অর্জন করতে হবে। শুধু তোমাকে সাহায্য করতে চাই, যদি পারি?’
‘বেশ,’ বললাম আমি।
আমি আমার ঘাড়ের ওপর থেকে তার হাতখানা সরিয়ে দিলাম, পা মুড়ে তার মুখোমুখি বসলাম। নিজেকে মনে হলো কোন শামান, যে উপজাতিদের ক্যাম্পফায়ারে বসে খুব গোপন একটি কথা প্রকাশ করতে চলেছে। মিস বার্টন পায়ের ওপর পা তুলে বসে আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
বাড়িটি এখন ভীষণ নীরব, আমি মৃদু গলায় কথা বলতে লাগলাম। বললাম কীভাবে প্রথম ফ্রান্সিসকে দেখেছি, আমার বাবা-মা’র কথা, আমার দাদীমার অন্তর্ধান। মিস বার্টন বাধা না দিয়ে চুপচাপ শুনে যেতে লাগল আমার গল্প কথা বলা শেষ করার পরে দু’জনে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইলাম। মিস বার্টন কথা বলার চেষ্টা করল বটে তবে গলা দিয়ে শুধু ভাঙা ফিসফিসানির আওয়াজ বেরিয়ে এল। সে কেশে গলা পরিষ্কার করে নিল। তারপর শান্ত স্বরে বলল, ‘বেচারী। তুমি কি আমাকে এ কথা বিশ্বাস করতে বলছ যে তুমি একটা ডাইনি?’
‘যারা আমার শক্তির মাজেজা বুঝতে পারবে না তারা আমাকে হয়তো তাই বলবে, তবে আমি ওই শব্দটি ব্যবহার করতে চাই না। ভয় এবং ভুল বোঝাবুঝি থেকে এ শব্দ ব্যবহার করা হয়।
‘ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার অন্যরকম ব্যাখ্যা থাকতে পারে না? তোমার বাবা-মা’র পানিতে ডুবে মরার ঘটনাটি হয়তো অ্যাক্সিডেন্ট ছিল এবং তোমার দাদীমার জীবনে কী ঘটেছে তুমি আসলে জান না?’
‘আপনার কি ধারণা ফ্রান্সিস আমার কল্পনা?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘হওয়া অসম্ভব নয়।’
‘তবে আমি প্রমাণ করে দিতে পারি আমি কিছু কল্পনা করিনি,’ বললাম আমি। ‘সে আমাকে তার চিহ্ন দিয়েছে।
আমি আমার নাইটগাউন তুলে উরুর লাল দাগটা মিস বার্টনকে দেখালাম। সে ওদিকে অনেকক্ষণ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। তারপর ঘুরিয়ে নিল মুখ। পিটপিট করছে চোখ। তার চোখে জল। আমি তার হাত ধরে চিহ্নটির ওপর রাখলাম। ‘এটা সত্যি, তাই না, মিস বার্টন?’
সে তার মোটা মোটা আঙুল বুলাতে লাগল লাল দাগটির ওপর। ‘তুমি আমাকে অ্যান বলে ডাকবে।’
‘আমি আপনাকে তুমি করে বলতে পারব না,’ বললাম আমি। তার হাত সরিয়ে দিয়ে গাউন নামিয়ে ফেললাম।
‘তোমার গল্পটা বিশ্বাস করিনি বলে রাগ করেছ?’ জিজ্ঞেস করল সে।
‘না, আমি সে আশাও করিনি। অন্তত এ মুহূর্তে নয়। তবে অবশেষে আমার কথা আপনাকে বিশ্বাস করতেই হবে।
‘আমি তোমার কথা বিশ্বাস করতে পারব কিনা জানি না। তুমি আমাকে বিশ্বাস করাতে চাইছ যে তুমি দানবীয় কর্মকাণ্ড করেছ?’
‘আমি শুধু চেয়েছি কয়েকজন মানুষের চেহারা যেন আমাকে আর দেখতে না হয়। এরকম অনেকেই চায়-আপনিও চান। এর মধ্যে দানবীয় কী আছে?’
‘তুমি যদি ভেবে থাক বা বিশ্বাস কর যে তোমার দানবীয় শক্তি আছে যা দিয়ে তুমি তোমার ইচ্ছেগুলো পূরণ করতে পারবে, তাহলে তো অবশ্যই তা দানবীয়।
মহিলার সঙ্গে আমার আর তর্ক করতে ইচ্ছা করল না। যাদের শক্তি বা ক্ষমতা নেই তারা অন্যের শক্তিকে সবসময় শয়তানের শক্তি বলে মনে করে। আমি সিধে হলাম। একটা হাত বাড়িয়ে দিলাম মিস বার্টনকে। সে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে হাতটি ধরল। আমার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাল যেভাবে কখনো তাকে তাকাতে দেখিনি। তার অভিব্যক্তিতে ফুটে আছে নতুন উপাদান: ভয়।
‘তুমি কি আমার সঙ্গে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হবে?’ জিজ্ঞেস করল সে!
‘নিশ্চয়,’ জবাব দিলাম আমি। যারা অনির্দিষ্ট সঙ্কল্পের কথা বলে তারা আশা করে না যে তাদের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা হবে।
‘আমি যদি এই সম্ভাব্যতা স্বীকার করি যে তোমার গল্প সত্যি?’ বলল সে, ‘তাহলে কি তুমি এ সম্ভাব্যতা স্বীকার করতে রাজি আছ যে এটি আসলে পুরোপুরি সত্য নয়?’
‘তা স্বীকার করতে আমার কোন দ্বিধা নেই।’
‘আমি যদি এর বিপরীতে কোন প্রমাণ বা হাইপোথেসিস হাজির করি তাহলে তুমি একে সিরিয়াসলি বিবেচনা করবে তো?’
‘করব।’
মিস বার্টনের প্রথাগত বিশ্বাসে একটা বড় ধাক্কা লেগেছে বলে আমার গল্প হজম করতে তার কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারলাম। এ যা খুশি বিশ্বাস করুক আমি তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াব না।
আমরা সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম নিচে। নিজের ঘরের দরজার সামনে এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়াল মিস বার্টন। আমি তাকে নিচু গলায় বললাম, ‘আপনার সঙ্গে ফ্রান্সিসের অপূর্ব মিল রয়েছে।’
.
ষোলো
পরদিন সকালে নাশ্তার টেবিলে অস্থির লাগছিল ক্যাথেরিনকে। মিস বার্টন যে আমাকে নিয়ে খুব চিন্তা করছে তা তার চাহনি দেখেই বুঝতে পারলাম। সে ক্যাথেরিনের দিকে আগে বারবার তাকাত। এখন আমাকে আড়চোখে দেখছে।
‘মিস বার্টন,’ বললাম আমি। ‘ভাবছি আজ পড়াশোনা করব না।’
‘কেন করবে না?’ অসন্তুষ্ট দেখাল মিস বার্টনকে। সে দিনের বেলা বেশিরভাগ সময় আমার সঙ্গে কাটাতে চায় যাতে আগের রাতের কাণ্ডকারখানা নিয়ে গল্পগুজব করা যায়।
কিথ আমার দিকে ঈর্ষান্বিত দৃষ্টিতে তাকাল।
প্রস্তাব মনে ধরল ক্যাথেরিনের। ‘তোমরা বড্ড বেশি পড়াশোনা কর,’ বলল সে। ‘চলো, তুমি আর আমি শহর থেকে একটু ঘুরে আসি, অ্যান। তোমার কোন কেনাকাটা থাকলে সেরে ফেলবে। তারপর দু’জনে মিলে লাঞ্চ করে সিনেমা দেখব’খন।’
ক্যাথেরিনের সঙ্গে বিবাদে জড়ানোর ঝুঁকিতে যাবে না মিস বার্টন। সে তার পুরনো কোন কাপড় পরে ক্যাথেরিনের পেছন পেছন ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোতে ঘুরে বেড়াবে। হয়তো কয়েকজোড়া প্যান্টি কিনবে।
‘আমি কোন খারাপ নজির স্থাপন করতে চাই না,’ বলল সে।
‘কী আবোল তাবোল বলছ,’ বলল জেমস। ‘সবারই মাঝে মধ্যে কাজ থেকে ছুটি নেয়া দরকার। আজ আমরা সবাই ছুটি নিই না কেন? আমি আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যান্সেল করে বাচ্চাদেরকে নিয়ে কোথাও বেরিয়ে আসতে পারি।’
‘আমার পরীক্ষা আছে,’ বলল কিথ। ‘যেতে পারব না।’
বাপের সঙ্গে একটা দুপুর কাটানোর কোন আগ্রহই নেই কিথের। জেমস তার ছেলেকে অপছন্দ করে তা বলব না তবে সন্তানের প্রতি খুব একটা মনোযোগীও নয়। সেক্সুয়ালি ম্যাচিওর নয় এমন কারো প্রতি সিরিয়াস নয় জেমস।
‘তোমার কী পরিকল্পনা, এলিজাবেথ?’ জানতে চাইল মিস বার্টন।
‘বিশেষ কোন পরিকল্পনা নেই। আমি শুধু একটু বাইরে ঘুরতে যেতে চাইছিলাম।
মুখ কালো হয়ে গেল মিস বার্টনের আমি তার কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইছি বুঝতে পেরে। বুঝতে পেরেছে সে আমাকে যেসব কথা বলবে বা প্রশ্ন করবে তা আমি এড়িয়ে যেতে চাইছি।
জেমস মিস বার্টনকে বলল, ‘তুমি আর ক্যাথেরিন মিলে মজা করো না? আমি না হয় এলিজাবেথকে নিয়ে ন্যাশনাল হিস্টোরির মিউজিয়াম থেকে ঘুরে আসর? তুই সত্যি আমাদের সঙ্গে যাবি না, কিথ? তোকে সাপের কঙ্কাল দেখাতাম।’
কিথ ঘুরতে যাবে না, স্কুলে যাবে। ক্যাথেরিন এবং মিস বার্টন তাদের দুপুরের অভিযানে বেরিয়ে পড়ল।
জেমসের সঙ্গে সময় কাটানোর তেমন ইচ্ছে আমার নেই। বিশেষ করে জাদুঘরে যেতে মোটেই আগ্রহবোধ করছি না। আমরা অবশ্য বাইরে কোথাও গেলাম না। সারাটা সকাল বেডরুমেই কাটল দু’জনের। আমরা মিস বার্টনের মেডিসিন কেবিনেট ঘেঁটে দেখলাম। জেমস আমাকে ক্যাথেরিনের বিয়ের দিনের কিছু ছবি দেখাল। নিঃসন্দেহে ওটি ছিল ক্যাথেরিনের সেরা সুখের রাতগুলোর একটি।
আমরা লাঞ্চ করলাম সেন্ট্রাল পার্ক জু’র টেরাসে বসে। তবে কোন জন্তুজানোয়ার দেখতে গেলাম না। আমি বুঝি না লোকে এসব জীবজন্তু দেখে কী মজা পায়।
‘তুমি কি সুখী?’ জেমস জিজ্ঞেস করল আমাকে।
‘সুখী হওয়াটা কি জরুরি?’
‘অবশ্যই। তোমাকে আমি সুখী করতে চাইছি। তাই তো জানতে চাইছি সফল হয়েছি কিনা।’
‘আমি আমার জীবনটাকে পছন্দ করি, জেমস। খুব পছন্দ করি।’ আমি এ কথা আর বললাম না ওকে যে সে ছাড়াও আমার জীবন খুব ভাল কাটবে। ও না থাকলেও সমস্যা নেই। আমি আরেকটি বাড়ি খুঁজে নেব, খুঁজে নেব নিবেদিত প্রাণ কোন পুরুষকে। তবে এ কথা অস্বীকার করার জো নেই জেমসের অনুরাগও প্রবল, অসাধারণ। তবে সে অনুরাগ শুধু নিজের আনন্দ উপভোগ করার জন্য, আমার জন্য নয়।
‘তুমি আমাকে ভালবাস, এলিজাবেথ?’
‘না।’
আমার প্রত্যাখ্যান তাকে যেন আনন্দিত করল মনে হলো।
‘তুমি যদি আমাকে ভালবাসতে বেশ হত,’ বলল সে।
‘না, বেশ হত না। লাভাররা অস্থির প্রকৃতির এবং বিপজ্জনক।’
‘কিন্তু আমি তোমাকে ভালবাসি। এজন্য কি আমি বিপজ্জনক?’
‘হ্যাঁ।’
সে এ কথাটি নিয়ে ভাবতে লাগল। আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল। প্রখর রোদ, বাচ্চাদের চেঁচামেচি আর জানোয়ারদের গায়ের বোটকা গন্ধ আমার ভাল লাগছিল না।
জেমস বলল সে ন্যাচারাল হিস্টোরির জাদুঘরে যাবে। আমার যেতে ইচ্ছে করছিল না। তবু ওর পীড়াপীড়িতে যেতেই হলো। আমরা পাথর, হাড় এবং স্টাফ করা জন্তুজানোয়ারগুলোকে দ্রুত পাশ কাটালাম। তবে আর্টিফ্যাক্ট দেখার জন্য মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়লাম। রুপোর তৈরি একটি র্যাটল স্নেক দেখে আমি বেশ মুগ্ধ হলাম। এটি আসলে একটি আয়না। কুণ্ডলী পাকানো সাপটির মাঝখানে ব্রোঞ্জের আয়নাটি বসানো।
‘র্যাটল স্নেক দেখে মুগ্ধ হবার বয়স তুমি পেরিয়ে এসেছ,’ বলল জেমস।
‘ওই র্যাটলটি নিশ্চয় মানুষ খুন করেছে,’ মন্তব্য করলাম আমি।
‘ননসেন্স। লেজ দিয়ে ঝুমঝুমি বাজানোর শব্দ শুনিয়ে মানুষ খুন করা যায় না। খুলি গুঁড়ো করে মানুষ হত্যা করতে হয়।’
‘এটাই শুধু একমাত্র উপায় নয় নিশ্চয়।’
‘তা নয়। তবে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় তো বটেই।’
‘তোমার কি ধারণা দাদীমাকেও কেউ খুলি গুঁড়ো করে হত্যা করেছে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
সারাদিনে এই প্রথম বেজার মুখ করতে দেখলাম জেমসকে।
‘তাঁর কী হয়েছে আমরা কেউ জানি না। জানি কি?’
দাদীমার অন্তর্ধান নিয়ে জেমস কী ভাবছে আমি জানি না। একটা মানুষ গায়েব হয়ে গেল এতে যেন তার কোন বিকারই নেই। বরং দিব্যি সে সংসারের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। অবশ্য এমনও হতে পারে দাদীমাকে সে পছন্দই করত।
‘তুমি তোমার মাকে ভালবাসতে?’
‘না। মা এসব ভালবাসাবাসি প্রকাশের মধ্যে ছিল না। তবে যখন একা থাকতাম তখন মাঝে মধ্যে আমাকে সে স্পর্শ করত। তবে তাকে স্পর্শ করতে দিত না। আমার গালে আঙুলের ডগা ঠেকিয়ে অতীতের কথা বলত। জানতাম মাকে আমি ভালবাসতে পারব না। তবে দু’জনের মধ্যে একটি বিশেষ বন্ধন ছিল।’
আমি হাত বাড়িয়ে আঙুলের ডগা ছোঁয়ালাম জেমসের গালে।
.
বাড়ি ফিরে দেখি ক্যাথেরিন এবং মিস বার্টন স্টাডি রুমে। মিস বার্টনের পা খালি। চোখমুখ জ্বলজ্বল করছে। ক্যাথেরিন মি. টেলরকে চা দিতে বলল। আমরা চারজন চুপচাপ বসে রইলাম। মাঝে মাঝে হাসলাম। ধোঁয়ার গন্ধঅলা চা ঢালল ক্যাথেরিন অস্বচ্ছ কাপে। আমরা সূর্যাস্ত দেখার জন্য বসে রইলাম।
কিছক্ষণ পরে পুনরাবির্ভাব ঘটল মি. টেলরের। আমার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে জেমসকে বলল, ‘মি. হ্যামিলটন আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তিনি বৈঠকখানায় আছেন।’
চমকে গেল জেমস। ‘আমার বাবা?’
‘ওনাকেও চা খেতে ডাকি?’ বলল ক্যাথেরিন।
‘বাবা চা খেতে এসেছেন বলে মনে হয় না,’ বলল জেমস। ‘শৈশবে তাঁকে শেষ এ বাড়িতে দেখেছি। দেখি উনি কী চান।’
জেমস এবং মি. টেলর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। জেমস তার বাবার আগমনে কী ভাবছে জানি না। ওরা দু’জনে কয়েক বছর একসঙ্গে কাজ করেছে। জেমস বলেছে শেষতক তার বাবা তাকে হ্যামিলটনদের কিছু ব্যবসা তুলে দেন। তবে আমার মনে হয় না ওরা নিজেদের পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে খুব একটা কথা বলত।
একটু পরে জেমস মি. হ্যামিলটনকে নিয়ে এ ঘরে ঢুকল। তার মুখে কৃত্রিম হাসি।
‘বাবা জানতে চাইছেন মা’র কোন খবর আছে কিনা, ‘ বলল জেমস। ‘আমরা চা খেতে খেতে এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারি।’
মি. হ্যামিলটন আমাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন তবে তাঁকে অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। ঘরটির পুরনো ভারি আসবাব, বইপত্র ইত্যাদি বোধকরি তাঁকে স্মৃতিকাতর করে তুলছিল।
‘এ ঘরের তো কোন রদবদল করা হয়নি দেখছি।’ বললেন তিনি। ‘একদমই নয়।’
‘না। আমরা এ ঘরের কোন রদবদল ঘটাইনি’ বলল জেমস।
‘আবার কোনদিন এ বাড়িতে আসা হবে ভাবিনি, বললেন মি. হ্যামিলটন।
মি. হ্যামিলটন তার কথা শুনছিলেন না। কেউই কারো কথা শুনছিল না। আমরা সবাই ভাবছিলাম দাদু এ বাড়ির মালিকানা দাবি করতে এলেন কিনা। তাহলে কাজটা মোটেই ঠিক হবে না।
তিনি ঘরের মধ্যে ধীর পায়ে হাঁটাহাঁটি করতে লাগলেন। ‘মানুষ বড্ড দ্রুত বদলে যায়,’ বললেন তিনি। ‘তাদের মধ্যে স্থায়িত্ব বলে কিছু নেই।’ তিনি দেয়ালের কাছে গিয়ে একটি আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। জাহাজের পোর্টহোলের হার্ডওয়ারের মধ্যে আয়নাটি বসানো। ‘ও ডিনারে যাওয়ার আগে আয়নায় নিজেকে দেখত। চুল আঁচড়াত।’
আমি বুঝতে পারছিলাম দাদু একজন লোভী মানুষ। লোভ কি সেইসব বিশ্বাস থেকে জন্মায় যে কোন জিনিসের মালিক হতে পারলে, যেসব জিনিসের স্থায়িত্ব মানুষের চেয়ে বেশি, ওই জিনিসগুলোর মধ্যে এক ধরনের অমরত্ব রয়েছে? দাদু হয়তো এ ব্যাপারটি ভাল বলতে পারবেন। তিনি একজন ক্রিশ্চিয়ান। তাঁকে নিশ্চয় শেখানো হয়েছে আত্মা অবিনশ্বর। তিনি টেবিল সাজানোর জন্য ব্যবহৃত এক টুকরো মসৃণ, পালিশ করা সবুজ পাথর তুলে নিয়ে পকেটে পুরলেন। তারপর চলে গেলেন।
.
সে রাতে জেমস আমার ঘর থেকে যাওয়ার পরে মিস বার্টন নক করল দরজায়। দিনের বেলা পরা পোশাকটি এখনো তার গায়ে। বগলে শুকিয়ে আছে ঘাম।
‘তুমি ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটা কথা বলতে এলাম,’ বলল সে। সারাদিন এড়িয়ে গেছি বলে মিস বার্টন হয়তো আমার ওপর রাগ করে আছে, ভাবলাম আমি। কিন্তু সে আমার দিকে তাকিয়ে আন্তরিক হাসি দিল। আমি তাকে ঘরে আসতে বললাম। সে এসে বিছানায় বসল। ‘ফ্রান্সিসের ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি।’
‘তার অস্তিত্ব নেই এ কথা আপনি আমাকে বিশ্বাস করাতে পারবেন না।
‘না, আমি সে চেষ্টা করছিও না। আমি শুধু তোমাকে বলতে এসেছি আমি তার সম্পর্কে কিছু কথা জানি। গত রাতে তোমাকে সত্য কথা বলিনি তবে এখন ভাবছি তোমাকে সাহায্য করা দরকার। আমার সঙ্গে এসো।’
মিস বার্টন আমাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে আয়নার সামনে নিয়ে গেল। ‘কী দেখছ?’
যা দেখলাম তাতে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। আয়নায় শুধু একটি ছবি দেখতে পাচ্ছি: আমার নিজের প্রতিবিম্ব। আমাকে যে শরীরটি চেপে ধরে আছে তার কোন .চিহ্নই নেই ওখানে।
মিস বার্টনের হাত থেকে জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম আমি, দেয়ালের দিকে পিছু হটলাম। মিস বার্টন আমার দিকে শান্ত ভঙ্গিতে তাকাল।
‘বলো, কার সঙ্গে আমার চেহারার মিল আছে,’ বলল সে।
আমার মুখে রা ফুটল না।
‘তুমি ব্যাপারটি বুঝতে পারনি, তাই না? আমরা দু’জনে একই বংশের মেয়ে, এলিজাবেথ। আমরা ফ্রান্সিসের মেয়ে। তবে এই উত্তরাধিকারকে তোমার অস্বীকার করতে শিখতে হবে যেমন তোমার দাদীমা এবং আমি করেছি।
‘না, আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি না।’
‘বিশ্বাস তুমি করবেই,’ বলে সে পোশাক খুলতে লাগল। ব্লাউজ খুলে ব্রা থেকে মুক্ত করল নিজের বক্ষ। তার দুই বুকের মাঝখানে আমি লাল একটা চিহ্ন দেখতে পেলাম। আমার ঊরুর দাগটির মত।
এ সত্যি হতে পারে না,’ বললাম আমি। ‘হলে আমি জানতাম।’
‘তুমি নিজের মধ্যে বড্ড ডুবে ছিলে, ডিয়ার; নিজের সীমিত জ্ঞান নিয়েই তুমি ব্যস্ত ছিলে।’
এ মহিলাকে খুব সাধারণ এবং দুর্বল নারী ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারি না আমি। সে চতুর হতে পারে তবে এরকম চালাকচতুর অনেকেই হয়। আমার সামনে অর্ধনগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে, চাইছে এতদিন ধরে আমি যা জানি সব যেন অস্বীকার করি। কিন্তু যখন সে বুঝতে পারল তার উত্তেজনার আনন্দ আমি ভাগ করে নিতে পারছি না, আবার জামাকাপড় পরে নিল।
‘সকালে কথা হবে।’ বলল সে। ‘যা দেখলে তা নিয়ে ভাবো, মাই ডিয়ার। এবং এ কথাটি মনে রেখো: আমার বিরুদ্ধে তুমি কোন ক্ষমতাই খাটাতে পারবে না, দাদীমার কাছেও যেমন শক্তিহীন ছিলে।’
সে পুরনো ব্রাটি হাতে ঝোলাতে ঝোলাতে চলে গেল।
আমি একটি লিপস্টিক নিয়ে আয়নায় সাবধানে এবং সযত্নে গোল একটি বৃত্ত আঁকলাম। বৃত্তের মাঝখানে লিখলাম: ‘অ্যান বার্টন।’
.
সতেরো
‘গুড মর্নিং, এলিজাবেথ।’
নাশতার টেবিলে হাসিমুখে বসে আছে মিস বার্টন। আমার বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করছিল তবু তার দিকে তাকিয়ে ফিরিয়ে দিলাম হাসি। সে মুখের মধ্যে ভিটামিন ট্যাবলেট ফেলে দিয়ে কমলার রস দিয়ে গিলে নিল। ঠোঁটের কিনারে শাঁস লেগে রইল। ক্যাথেরিন হাত বাড়িয়ে ন্যাপকিন দিয়ে মুছে দিল ঠোঁট। দৃশ্যটা দেখে আমার খিদে নষ্ট হয়ে গেল।
আমি পড়ার ঘরে গেলাম। মিস বার্টনের জন্য অপেক্ষা করছি। সে যতই অপ্রীতিকর এবং বিরক্তির কথা বলুক না কেন, শোনার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছি। আমি নিশ্চিত তার মধ্যে কোন না কোন খুঁত ঠিকই খুঁজে পাব। ওটা কাজে লাগিয়ে দু’জনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করব।
নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল সে। মুখে বোকা বোকা হাসিটি আর নেই। ‘জানি তুমি আঘাত পেয়েছ,’ বলল সে। ‘আমি তোমাকে আঘাত দিতে চাইনি। আমি শুধু তোমাকে জানাতে চেয়েছিলাম কীভাবে আমি এখানে এসেছি। তোমার দাদীমার কী হলো তা দু’জনে আবিষ্কারও করতে চাই।’
সে স্বেচ্ছায় উচ্চাসন থেকে নেমে আসতে চাইছে কিনা ঠিক বুঝতে পারলাম না। তবে মনে হলো সেরকম কিছু।
মিস বার্টন বলে চলল: ‘ষোড়শ শতকে ফ্রান্সিসের মৃত্যুর পর থেকে তার শক্তির উত্তরাধিকার নিয়ে আমাদের পরিবারের মেয়েদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছে। এ ক্ষমতা যারা প্রতিহত করেনি তাদের জন্য এটি শুধু যন্ত্রণা এবং ধ্বংসই নিয়ে এসেছিল। যারা একে গ্রহণ করেছিল তাদেরকেও পোহাতে হয়েছে দুর্ভোগ। ওকে সহজেই অস্বীকার করা যায়, যেভাবে আমি করেছিলাম কিংবা তোমার দাদীমা। তিনি জানতেন তুমি দুর্বলচিত্ত তাই তিনি আমাকে এখানে ডেকে আনেন তুমি যাতে নিজেকে রক্ষা করতে পার সেজন্য সাহায্য করতে। আশা করি তুমি এ সাহায্যটি গ্রহণ করতে পারবে।’
‘আমি কেন এটা গ্রহণ করতে যাব?’ বললাম আমি। ‘আমি কেন দুর্বলের সঙ্গে সবলের বিনিময় করব?’
‘তুমি সবল নও,’ বলল সে। ‘শক্তিটি তোমারও নয়। ওই শক্তির মালিক ফ্রান্সিস। সে তোমাকে ব্যবহার করবে এবং সম্ভবত তোমাকে ধ্বংস করে দেবে।’
‘ফ্রান্সিস এখন আর কেন আমার সঙ্গে দেখা করছে না বলতে পারবেন?’
‘হয়তো অবচেতনভাবে তুমি তাকে প্রত্যাখ্যান করেছ। সে যা রিপ্রেজেন্ট করছে সেসব কিছু যদি তুমি গ্রহণ করতে রাজি হও তখন আবার সে হাজির হবে। যারা তোমার আপনজন ছিল’ কিংবা তোমাকে ভালবাসত তাদের মৃত্যুর কথা চিন্তা করে তোমার কি সত্যি কোন লজ্জাবোধ অথবা অনুতাপ হয় না?’
‘আমি কখনো কারো মৃত্যু কামনা করিনি। আমি শুধু তাদেরকে ফ্রান্সিসের শক্তির হাতে তুলে দিয়েছি।’
‘ফ্রান্সিস তোমার দাদীমার ক্ষতি করতে পারে না।’
‘তাহলে তাঁর কী হয়েছে?’
‘সেটাই আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। সেই রাতে কে কী দেখেছে সবাইকে প্রশ্ন করব।’
মিস বার্টন গোয়েন্দার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চায়। সে সত্যকে ভয় পাচ্ছে এবং প্রথাগত ব্যাখ্যা খুঁজছে। সেটা যতই অপর্যাপ্ত হোক না কেন।
মিস বার্টন আমার হাত ধরল। ‘আরেকটি উপায় আছে। তোমাকে কোনরকম ভায়োলেন্সের দৃশ্য দেখানো হয়েছে?’
‘কিছু জিনিস আছে যা আমাকে নানান দৃশ্য দেখায়।’
‘তুমি দাদীমার ঘরের কোনকিছুতে হাত দিয়েছ?’
‘না।’
‘আমার সঙ্গে এসো।’
আমরা ওপরে গেলাম। দাদীমার ঘরের দরজা ভেজানো, জানালা খোলা। ভোরের উজ্জ্বল আলোয় বৃদ্ধার ঘরের অনেক জিনিসপত্র দেখা যাচ্ছে। মি. টেলর ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটি লম্বা, কালো রঙের নেট স্টকিং, আমাদেরকে দেখে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল মুখ।
‘আমি ঘরদোর পরিষ্কার করছিলাম।’
ভাঙা কাচের টুকরোগুলো নেই।
আমি মি. টেলরকে বললাম, ‘আপনি পরে না হয় একবার আসুন।’
‘আচ্ছা,’ বলল সে। ‘ঠিক আছে।’ চারপাশে একবার চোখ বুলাল স্টকিংটি রাখার জন্য। আমি ওটা তার কাছ থেকে নিয়ে নিলাম। বিব্রত চেহারা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মি. টেলর।
মিস বার্টন বিছানায় বসল। আমি জানালা বন্ধ করে জ্বেলে দিলাম গ্যাসবাতি। ধীরে সুস্থে তাকালাম রুমের চারপাশে। ঘরের এমন কোন জায়গা নেই যেখান নানান জিনিস রাখা নেই। সবকিছুই দাদীমার অস্তিত্ব প্রকাশ করছে। এ ঘরের প্রাক্তন বাসিন্দাটি কেমন ছিলেন তা জিনিসপত্রের বহর দেখেই বোঝা যায়।
বই, চিঠি, নিউজপেপার ক্লিপিং গাদা করে ঘরময় ছড়ানো। এগুলোর চাপে অন্যান্য জিনিসগুলো প্রায় আড়াল পড়ে গেছে: ধূসর রঙের ছেঁড়া একটি স্কার্ফ; আধ বোতল বাদামী ক্যাপসুল; একটি রাইডিং ক্রপ, চাবুকটির চামড়ার হাতল ঘামে ভেজা হাতে ধরার কারণে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে; হলুদ হয়ে যাওয়া তামাক খাওয়ার পাইপ; মুক্তো বসানো হাতলঅলা পকেট নাইফ, ফলাটা ক্ষয়ে গেছে; ছোট্ট একটি জন্তুর কঙ্কাল।
আয়নাটি যে ফ্রেমে বাঁধানো ছিল আমি সেখানে গেলাম। ভেতরের দিকে এখনো কয়েক খণ্ড রুপোলি কাচ লেগে রয়েছে। এক টুকরো কাচ নিয়ে আমার ডান হাতের তালুতে রাখলাম।
এক মুহূর্ত বাদে আমার হাতটি কাঁপতে লাগল, ঘরটি কেমন অন্ধকার হয়ে এল। আমি দাদীমার মুখ দেখতে পেলাম। চোখ ভয়ে বিস্ফারিত, তিনি হাত তুললেন, যেন কাউকে ঠেকিয়ে রাখতে চাইছেন। আরেকটি হাত, আকারে বড় এবং শক্তিশালী, হঠাৎ দাদীমার কব্জি চেপে ধরে সরিয়ে দিল হাত। কাচের টুকরো থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল দাদীমার চেহারা, আমি এক ঝলকের জন্য দেখতে পেলাম রুপোর একটি মোমদানি নেমে আসছে। ঠক করে একটা শব্দ হলো, তারপর হাড় ভেঙে যাওয়ার আওয়াজ এবং গলা টিপে ধরলে যেমন গোঁ গোঁ আওয়াজ বের হয়, সেরকম শব্দ শুনতে পেলাম।
‘এলিজাবেথ?’’মিস বার্টন এসে দাঁড়াল আমার পাশে। ‘তুমি ঠিক আছ তো?’
আমার ডান হাতে তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করলাম। দেখি আমি মুঠো চেপে আছি এবং আমার আঙুল বেয়ে রক্ত পড়ছে। মিস বার্টন আমার হাত থেকে কাচের টুকরোটা সরিয়ে নিল। ওটা আমার তালুতে বিঁধে গিয়েছিল। সে আমাকে দাদীমার বাথরুমে নিয়ে গিয়ে হাত ধুইয়ে ছোট্ট ক্ষতটি ব্যাণ্ডেজ করে দিল। ‘তুমি কী দেখেছ?’ জিজ্ঞেস করল সে।
‘ঠিক বুঝতে পারলাম না। দাদীমাকে কেউ হামলা করেছিল। রুপোর মোমদানি দিয়ে মেরেছে।’
‘কে মেরেছে?’
‘লোকটাকে দেখতে পাইনি।’
‘তুমি নিশ্চিত ওটা একটা লোক ছিল?’
‘আমি শুধু একটি হাত দেখেছি। তবে মনে হলো কোন পুরুষের হাত।’
‘কিন্তু লোকটা কে বুঝতে পারনি?’
‘না।’
আমরা বেডরুমে ফিরে এলাম। বিছানার ধারে বসলাম দু’জনে।
‘তুমি কি ভয় পেয়েছ?’ জিজ্ঞেস করল মিস বার্টন। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে।
‘না।’ বললাম আমি। আমি ভয় পাইনি তবে বিভ্রান্ত লাগছে। আমি যা দেখেছি তা সত্যি, এবং নিঃসন্দেহে ওটা ছিল একটা মৃত্যু দৃশ্য।
‘আবার দেখো,’ বলল মিস বার্টন।
সে ইতস্তত ভঙ্গিতে আমার হাতে কাচের টুকরোটা তুলে দিল। আমি দু’আঙুলের মাঝখানে ওটা আটকালাম ধারাল কিনারাগুলো এড়িয়ে, সঙ্গে সঙ্গে সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যটি আবারও ভেসে উঠল চোখের সামনে।
আমার দিকে উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মিস বার্টন। আমি কাচের টুকরোটা ফেলে দিলাম।
‘একই দৃশ্য দেখলে?’ জানতে চাইল সে।
‘হ্যাঁ।’
‘লোকটাকে চিনতে পারনি?’
‘না।’
আমরা চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। আমার এখন একটু একা থাকতে ইচ্ছা করছে। একা একা বসে ভাবব যা দেখেছি। এটা কি সত্যি হতে পারে যে দাদীমার অন্তর্ধানের জন্য আমি দায়ী নই? মিস বার্টনের ঊরু আমার ঊরুর সঙ্গে ঘষা খাচ্ছিল। আমি তার দিকে তাকালাম। মৃদু আলোয় ফ্রান্সিসের সঙ্গে তার চেহারার মিলটা আরও প্রকট লাগল, মনে হলো ও যদি ফ্রান্সিস হত তাহলে এখন ওকে প্রশ্ন করা যেত।
মিস বার্টন আমাকে নিয়ে সচেতন নয়। সে ঘরের চারপাশে চোখ বুলাচ্ছে। ‘আমি তো কোন রুপোর মোমদানি দেখতে পাচ্ছি না।’
‘না। তবে বেশিরভাগ ঘরেই অন্তত একটা করে মোমদানি থাকার কথা।’ বললাম আমি।
‘হুঁ। এখানেই তো দেখেছিলাম মনে পড়ছে-ড্রেসারের ওপর। কিন্তু ওটা কেউ সরিয়ে ফেলেছে।
‘হয়তো বা,’ তার গোয়েন্দগিরি আমার ভেতরে বিন্দুমাত্র আগ্রহ তৈরি করল না। ‘আমি এখন আমার ঘরে যাব। একটু রেস্ট নেব।’
আমরা ওপরে চলে এলাম। মিস বার্টন নিজের ঘরে ঢুকছে, তার বিছানার পাশের টেবিলের ওপর আমি রুপোর তৈরি একটি ভারি মোমদানি দেখতে পেলাম।
.
আঠারো
আমি বিছানায় শুয়ে রাস্তা থেকে ভেসে আসা নানান আওয়াজ শুনছিলাম। ট্রাক, গাড়ি চলছে তারপরও লোকের গলা, হাঁটাহাঁটির শব্দ শোনা যাচ্ছে। ওরা সরু রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছে, নিজেদের কাজের কথা বলছে অথবা সকালে পড়া খবরের কাগজ নিয়ে আলোচনা করছে। দিনের বেলা মানুষকে সত্যিকারের প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কথা বলতে আমি খুব কমই দেখেছি। যারা রাস্তা ধরে একা হেঁটে বেড়ায়, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে চিন্তা করে না, এমন কিছু নিয়ে ভাবে যা অন্যদের কাছে কখনো বলতে পারবে না, এই লোকগুলোর মনের কথা যদি জানতে পারতাম!
মাঝে মাঝে চিন্তা করি দাদীমার ঘরে কী দেখেছিলাম। যে হাতটি তাঁর কব্জি চেপে ধরেছিল সেটি চিনবার চেষ্টা করি। ওটা কি জেমসের হাত হতে পারে? শক্তিশালী, আঙুলে সোনার আংটি পরা, লোমশূন্য হাত? নাকি মি. টেলরের? মোটামোটা, হাতের ওপর জড়ল? অথবা মি. হ্যামিলটনের নীল শিরা ওঠা আড়ষ্ট হাত? কিংবা মি. হিউবার্টের ঝড়জল বৃষ্টি সহ্য করা, নখের ডগায় ময়লা জমে থাকা হাত? আমি জানি না। হাতটি পুরুষালী ছিল তবে অচেনা। মিস বার্টনের হাতের গঠনও বাচ্চা ছেলেদের মত।
এসব চিন্তা করতে গিয়ে নিজের ওপর রাগ লাগল আমার, রাগ হলো মিস বার্টনের ওপরেও। সে-ই এসব চিন্তা আমার মাথায় ঢুকিয়েছে। ঘরে শান্তি এবং ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে এই মহিলাকে বাগে আনতে হবে। ক্ষমতা প্রত্যাখ্যান করেছে বলে মহিলা নিজেকে খুব সৎ এবং পবিত্র ভাবে। ফ্রান্সিসের জন্য আমার তখন মন কেমন করতে লাগল।
আমি বিছানা থেকে উঠলাম। নিচে গেলাম। ওখানে ক্যাথেরিনের সঙ্গে দেখা হলো। আমাদের দু’জনের মধ্যে খুব কমই কথা হয়। তবে জানি ঘরে টেনশন বা উৎকণ্ঠা বেড়ে উঠছে দেখে সে খুবই বিচলিত বোধ করছে। আমি ওকে একটু সান্ত্বনা দিতে চাইছিলাম। ওর সরলতা আমার পছন্দ নয় কারণ এই সারল্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উপলব্ধি করার ক্ষমতার অভাবের ওপর ভিত্তি করে। তবে মাঝে মাঝে ওর সহজসরল আচরণ আবার একেবারে মন্দও লাগে না।
‘আমি হাঁটতে গেলাম,’ বললাম আমি। ‘তুমি আমার সঙ্গে যাবে, মা?’
ওরা আমাকে দত্তক কন্যা হিসেবে নিয়েছে। তবু ‘মা’ বলে ডাকলে কেমন অস্বস্তিতে পড়ে যায় ক্যাথেরিন। কারণ জানে আমি উপহাস করে ওকে ‘মা’ ডাকি।
‘ওহ্ হ্যাঁ, নিশ্চয়, ডিয়ার। আমি এখুনি আসছি।’ সে নিজের ঘরে গেল। কিছুক্ষণ পরে অত্যন্ত দামী একটি পার্স নিয়ে বেরিয়ে এল। খুব দুর্লভ কোন জন্তুর চামড়া দিয়ে তৈরি পার্স। হাতে হালকা নীল রঙের গ্লাভ।
আমরা বাইরে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে ক্যাথেরিনের আচরণ বদলে গেল। সে বাড়ির চেয়ে রাস্তায়, পথচারীদের মধ্যে অধিকতর রিল্যাক্স বোধ করে। কারণ রাস্তার লোকজন তো আর তাকে তেমন লক্ষ করে না।
‘কোথায় যাবে?’ জানতে চাইল ক্যাথেরিন।
কোথাও একখানে গেলেই হলো,’ জবাব দিলাম আমি।
‘আমার কিছু মুদি সদাই কেনার দরকার ছিল।’
আমরা একটি ছোট দোকানের দিকে অগ্রসর হলাম। এখানে কফি, চাসহ কিছু আমদানীকৃত খাবার পাওয়া যায়। খাবারের প্রতি আমার কোনকালেই আগ্রহ ছিল না। কিন্তু ক্যাথেরিন নতুন ধরনের খাবার কিনতে খুবই পছন্দ করে। ওকে কিচেনে দেখেছি মিসেস টেলরের সঙ্গে মিলে স্কুইড এবং গরুর ভুঁড়ি রান্না করতে। এ খাবার দুটি তার খুব প্রিয়।
‘তুমি কি আমাদের সঙ্গে থেকে সুখী?’ আমাকে জিজ্ঞেস করল ক্যাথেরিন।
‘আমি তো অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি না,’ বললাম আমি। ব্যাণ্ডেজের নিচে আমার হাতের তালু অল্প অল্প ব্যথা করছে।
‘আমরা তোমাকে পেয়ে অনেক সুখী। মা’র এই ঘটনাটা না ঘটলে আমরা তো বেশ ভালই ছিলাম। সুখী পরিবার হিসেবে সবাই আমাদেরকে ঈর্ষা করত। আশা করি মা ভালই আছেন।’
‘ওনার কী হয়েছে বলে তোমার কোন ধারণা আছে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘একদমই নেই। আমি অবশ্য ওনাকে তেমন বুঝতে পারতাম না তবে উনি আমাদেরকে ছেড়ে যাবেন তা কল্পনাও করিনি। ভাবিনি তিনি তোমাকে স্কুলে পাঠিয়ে দিতে চাইবেন।’
‘আমিও কোথাও যেতে চাইতাম না,’ বললাম আমি। ‘মিস বার্টনের সঙ্গে আমার খুব খাতির হয়ে গেছে। তিনি আমাকে তাঁর নিজের বোনের মত দেখেন।’
ক্যাথেরিনের গালে হালকা রঙ ধরল, আড়চোখে দেখল আমাকে। ‘তুমি ওভাবে ভাবছ দেখে আমি আনন্দবোধ করছি।’ সে আসলে মিস বার্টন এবং দাদীমা কাউকে নিয়েই কথা বলতে আগ্রহী নয়। তার চরিত্রের একটি বিচিত্র দিক হলো সে কাউকে নিয়েই কথা বলতে পছন্দ করে না।
দোকানটি থেকে কফির কড়া গন্ধ আসছিল-তবে গন্ধটা ঠিক সব্জি মেশানো গন্ধ নয়, চিড়িয়াখানার খাঁচাবন্ধ ছোট ছোট জানোয়ারের গায়ের ঘ্রাণের মত।
ক্যাথেরিন ক্লার্ককে তার জিনিসের অর্ডার দিচ্ছে। এক কোনায় আধ শুয়ে থাকা সাদা-কালো রঙের ছোট একটি বিড়াল মাথা তুলে আমার দিকে স্থির ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল। ওটা চট করে আমার কাছে এসে, গরগর শব্দ করতে করতে আমার পায়ের সঙ্গে গা ঘষতে লাগল।
‘তুমি বিড়াল পছন্দ কর?’ জানতে চাইল ক্যাথেরিন।
‘জানি না ঠিক।’ জবাব দিলাম আমি। ‘কখনো তো বিড়ালের সঙ্গে বসবাস করিনি।’
‘মিস বার্টন পছন্দ করে। গত সপ্তাহে সে এখানে আমার সঙ্গে এসেছিল। ওই একই বিড়ালটা তার পায়েও গা লাগিয়ে ঘষছিল। মিস বার্টন মজাই পাচ্ছিল।
ক্যাথেরিন আরও কিছু জিনিসের অর্ডার দিচ্ছে, আমি ঝুঁকে বিড়ালটির সরু, হাড্ডিসার তালুতে আদর করে হাত বুলিয়ে দিলাম। বেশ ভাল লাগল।
‘দেখে মনে হচ্ছে তোমরা দু’জন সই বনে গেছ,’ বলল ক্যাথেরিন। সে মোজাপরা হাতে বিড়ালটাকে ধরতে যাচ্ছিল, চট করে ওটা সরে গেল। বিরক্ত দেখাল ক্যাথেরিনকে। আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি বিড়াল পুষবে?’
বিড়াল পোষার আগ্রহ আমার নেই তবে ক্যাথেরিনের চেহারা দেখে মনে হলো একটি বিড়াল কেনার ইচ্ছা তার ষোলো আনা। নতুন কিছু কেনার উত্তেজনায় উত্তেজিত।
‘পুষতে পারি,’ বললাম আমি।
‘তাহলে চলো এখুনি একটা বিড়াল কিনে ফেলি। এখান থেকে কয়েক ব্লক দূরেই একটা চমৎকার পেট শপ আছে। অনেকদিন ওখানে যাওয়া হয় না।’
পেট শপটি বেশ বড়, কোলাহলপূর্ণ এবং নোংরা। অপ্রশস্ত খাঁচায় আটকে থাকা গোমড়ামুখো এবং অস্বাস্থ্যকর জানোয়ার এবং পাখিগুলো আমাদের দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে। পালক ঝরে পড়া একটা ম্যাকাও দাঁড়ে বসে দুলছে। একটা তরুণ শিম্পাঞ্জি, রাগে জ্বলছে চোখ, ধাতব একটি কাপ হাতে তার খাঁচার গরাদেতে দুমদাম বাড়ি মেরেই চলেছে।
ভয় পেয়ে গেল ক্যাথেরিন। সে হয়তো আমার মতই ভাবছে রাতের বেলা দোকানটির অবস্থা কীরকম হয়ে ওঠে জানালায় লাল নিয়ন সাইন জ্বলছে, কয়েকটি জন্তু তাদের খাঁচার তলে খবরের কাগজ দিয়ে তৈরি গর্তের মধ্যে ঢুকে আছে, ওদিকে অন্যগুলো অন্ধকারে ক্ষুধার্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে রয়েছে।
এক তরুণ, দেখে বোঝা যায় না সে পুরুষ নাকি মহিলা, জানতে চাইল আমাদের কোন সাহায্যে আসতে পারে কিনা। ধরে নিলাম এ পুরুষই হবে। ছেলেটি নিগ্রো, ছিপছিপে, শ্যামলা গায়ের রঙ, লম্বা, কালো চুল মাথায়। সে আমাদেরকে বেশ কয়েকটি বিড়াল দেখাল। বেশিরভাগই শিশু বয়সী, ডরপুক স্বভাবের এবং বিশ্রীরকম দামী। ক্যাথেরিন তিনটি আবিসিনিয়ান বিড়ালের একটি দলকে পছন্দ করে ফেলল। অন্যদের চেয়ে এগুলো অপেক্ষাকৃত শান্ত এবং অভিজাত হলেও এদেরকে আমার নীরস এবং আত্মকেন্দ্রিক বলে মনে হলো।
আমি ক্যাথেরিনের ওপরে পছন্দটা প্রায় ছেড়েই দিচ্ছিলাম, এমন সময় একটি খাঁচায় চোখ আটকে গেল। ওটাকে প্রথমে খালিই ভেবেছিলাম। এখন দেখছি ছায়ায় বসে আছে প্রকাণ্ড আকৃতির লালচে, লম্বা লোমের একটি বিড়াল। ধীরে ধীরে লেজ নাড়ছে, হালকা সবুজ চোখ মেলে সরাসরি আমার দিকে তাকাল। আমার শিরদাঁড়ায় যেন কেউ শীতল, ধাতব কিছু একটা চেপে ধরল।
‘ইয়াং লেডি বোধকরি জিনিস পছন্দ করে ফেলেছেন,’ বলল নিগ্রো দোকানি।
‘হ্যাঁ,’ সায় দিলাম আমি।
ছেলেটা খাঁচার দোর খুলল, আমি ব্যাণ্ডেজ বাঁধা হাত ঢুকিয়ে দিলাম ভেতরে। বিড়ালটি তার একটি থাবা রাখল ব্যাণ্ডেজের ওপর, তারপর টেনে খুলে ফেলল ব্যাণ্ডেজ। উন্মুক্ত হয়ে গেল তালুর ক্ষত।
‘হ্যাঁ,’ পুনরাবৃত্তি করলাম আমি। ‘এটিকে আমার পছন্দ হয়েছে।’
আমি আবার ব্যাণ্ডেজ বেঁধে বিড়ালটির ঘন লোমে হাত বুলাতে লাগরাম। ওটা চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। আমি ওর পেটে সুড়সুড়ি দিলাম। বিড়ালটি পুরুষ প্রজাতির।
দোকান থেকে বের হয়ে আসছি, দোকানি আমাকে একটি বিজনেস কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘কোনরকম সাহায্যের দরকার হলে দয়া করে বলবেন।’ কার্ডে একটি নাম, ঠিকানা এবং টেলিফোন নম্বর আছে। তরুণের নাম জন ডিকসন।
আমরা প্লাস্টিকের একটি ঝুড়িতে বিড়ালটিকে ভরে নিয়ে বাড়িতে রওনা হলাম। আমার হাতেই থাকল ঝুড়িটি। মাঝে মাঝে বিড়ালটির দিকে তাকাচ্ছি। সে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে চুপচাপ। মাঝে মাঝে গরগর করছে। ওর মৃদু ডাকেই ঝুড়ির হাতলে কম্পনের সৃষ্টি হচ্ছে।
‘এর নাম দেবে কী?’ প্রশ্ন করল ক্যাথেরিন।
‘এখনো ঠিক করিনি-খামচানি দিতে পারি?’
‘এটা একটা নাম হলো? তাছাড়া বিড়ালটা তো কাউকে খামচাচ্ছে না। কী সুন্দর শান্ত বিড়াল।’
‘ওটার তো থাবা আছে তাই ভারছি ওকে মি. খামচানি বলে ডাকব।’
বাড়ি পৌঁছে ঝুড়ি খুলতেই খামচানি এক ছুটে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আমার বেডরুমের দরজার সামনে গিয়ে বসল। আমি ওর পেছন পেছন গেলাম। ওকে ঘরে ঢুকতে দিলাম। ওটা লাফ মেরে ড্রেসারের ওপর উঠে গেল, বসল আয়নার সামনে। ওর পিঠের ওপর রোদ পড়েছে, কমলা রঙের লোমে যেন আগুন লেগেছে। ওটা ডানে বামে মাথা নাড়তে লাগল, গলা দিয়ে নিচু লয়ের আওয়াজ বেরিয়ে আসছে, যেন গোঙাচ্ছে কোন মহিলা।
‘চুপ, সোনা। বললাম আমি।
কিন্তু ও শব্দ করে যেতেই লাগল। আমি বিড়ালটিকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় বসলাম। ওর মৃদু গোঙানি ক্রমে বন্ধ হয়ে গেল। ঘন লোমের নিচে বিড়ালটির ছিপছিপে, বলিষ্ঠ শরীরের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। ওর উষ্ণ শরীরের স্পর্শ ভাল লাগছিল আমার।
‘আমরা দু’জনে খুব মজা করব,’ বললাম আমি।
জবাবে গরগর করে উঠল মি. খামচানি।
.
বিড়ালটিকে প্রথম দর্শনেই অপছন্দ করে ফেলল জেমস। বলল আমরা একসঙ্গে থাকার সময় বিড়াল-টিড়াল থাকা চলবে না। বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা অবশ্য কদাচিৎ ওকে দেখতে পায় কারণ বেশিরভাগ সময় সে আমার ঘরে, বিছানার ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে, ভঙ্গিটি আয়েশী হলেও তার ভেতরে রয়েছে সতর্কতা, মাঝে মধ্যে চোখ খুলে এমনভাবে তাকায় যেন কারো কাছ থেকে জরুরি কোন খবর পাওয়ার প্রত্যাশা করছে। মিস বার্টন চায় না আমি কোন জন্তুজানোয়ার পুষি তবে খামচানি তাকে পছন্দ করে এবং সে-ও বিড়ালটিকে স্পর্শ না করে পারে না।
.
উনিশ
সংসার আবার একটি রুটিনে থিতু হলো। আমরা সবাই বেশ ভালই থাকতে পারতাম যদি না মিস বার্টন দাদীমার অন্তর্ধান নিয়ে বাড়াবাড়ি না করত। সে প্রতিদিন ডিনার এবং আমার পড়ার সময় দাদীমার কথা তুলবেই। মি. টেলরের কাছে সে জানতে পেরেছে দাদীমার ঘরে রুপোর একটি মোমদানি ছিল এবং সেটি এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
দাদীমা অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার রাতে আমি বাড়ি ছিলাম না এবং জানি মি. হ্যামিলটন তাঁর অফিসেই ছিলেন।
মিস বার্টন নিয়মিত লাঞ্চ করছে মি. হ্যামিলটনের সঙ্গে। আমার ধারণা স্থূলবুদ্ধি মি. হ্যামিলটন ভাবছেন মিস বার্টন তাঁর প্রতি আকৃষ্ট। একদিন তাদের সঙ্গে লাঞ্চে যোগ দিলাম আমি। ফুলটন ফিশ মার্কেটের কাছে একটি সি ফুড রেস্টুরেন্টে গেলাম তিনজনে মিলে। প্রথমে বাজার পার হতে হলো। দুপুরে এ এলাকাটি প্রায় জনশূন্য থাকে, শুধু বাতাসে মাছের গন্ধ আর কাটা মাথাগুলো ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। বিড়াল আর সিগালগুলো ওইসব আবর্জনা খুঁটে খায়। হাঁটার সময় মি. হ্যামিলটনের হাত প্রায়ই মিস বার্টনের নিতম্বে ঘষা খেল।
রেস্টুরেন্টে বসে গলদা চিংড়ির অর্ডার দিলেন মি. হ্যামিলটন। তারপর খাদ্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মিস বার্টন মাঝে মাঝে তাঁকে তাঁর জীবন এবং দাদীমাকে নিয়ে প্রশ্ন করল। বেশিরভাগ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেলেন তিনি মিস বার্টন সতর্কতার সঙ্গে বাছাই করছিল প্রশ্ন। যে কথাটি সে জিজ্ঞেস করতে পারছিল না সেটি আমি সরাসরি জানতে চাইলাম মি. হ্যামিলটনের কাছে: ‘দাদু, তুমি দাদীমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে কেন?’
মি. হ্যামিলটনের হাতে চিংড়ির একটি ঠ্যাং, মাঝপথে থেমে গেলেন। ‘আমি এ নিয়ে কথা বলতে চাই না।’
‘জানি আমি। তবে সবাই বিষয়টি নিয়ে বলাবলি করছে। সত্যটা নিশ্চয় সকলের অনুমানের চেয়ে খারাপ হবে না।
আমি ভেবেছিলাম দাদু আমাকে বলবেন চুপচাপ খাওয়ায় মন দিতে। কিন্তু তিনি আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। তাঁর চোয়াল ঝুলে পড়েছে, জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। বোধহয় বুঝতে পেরেছেন দু’জনের মধ্যে বয়সের বিস্তর ফারাক সত্ত্বেও আমি এখন আর শিশুটি নই, আমি এখন নারী-যে নারীকে তিনি সন্তুষ্ট করতে চান।
‘সবার ধারণা দাদীমার জীবনে আরেকজন পুরুষ এসেছিল,’ বললাম আমি।
লাল হয়ে গেল দাদুর মুখ। রাগের চোটে তিনি না আবার আমার গায়ে চিংড়িটা ছুঁড়ে ফেলেন। কিন্তু বললেন, ‘সেই আরেকজন পুরুষটি কে হতে পারে বলে সকলের ধারণা?’
‘সে কথা ওরা জানে না,’ বললাম আমি। ‘তবে আমি জানি।’
মিস বার্টন আমার দিকে একই সঙ্গে বিরাগ এবং অনুরাগ নিয়ে তাকাল। ‘তুমি এ কথা জানলে কী করে?’
‘আমি তাকে দেখেছি,’ বললাম আমি।
‘দাদীমার সঙ্গে সে দেখা করতে এসেছিল।’
‘লোকটাকে চেন তুমি?’
‘অবশ্যই।’
‘তাহলে আমাদেরকে বললে না কেন?’
‘কারণ কেউ জানতে চায়নি। কেউ আগ্রহ দেখায়নি। আমিও বলার আগ্রহ বোধ করিনি। দাদু জানতে না চাইলে আমি বলবও না।’
দাদু অন্যরকম দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। সম্ভ্রম অথবা ভয়। তারপর হাসতে শুরু করলেন। তাঁর হাত থেকে চিংড়ির ঠ্যাং পড়ে গেল। তিনি হো হো করে হেসেই চললেন। আমাদের চারপাশের লোকজন বিরক্ত হয়ে তাঁর দিকে তাকাল। মি. হিউবার্টের গম্ভীর, কঠিন চেহারাটি মনে পড়ে গেল আমার যখন তিনি দাদীমার ঘর থেকে চলে যাচ্ছিলেন। তিনি নিশ্চয় সারাজীবনে একবারও উন্মাদের মত হাসেননি, জানি আমি, দাদীমাও জানতেন, কারণ তিনি মি. হ্যামিলটনের চেয়ে তুলনামূলকভাবে শ্রেয়তর ছিলেন।
‘এটা আমাদের সিক্রেট হয়ে থাকবে,’ দাদুর হাসি থামলে বললাম আমি তাঁকে। তাঁর অনধিকার চর্চা নিয়ে আমার আর কোন দুশ্চিন্তা থাকছে না। তিনি আমার বন্ধু হতে চলেছেন।
.
লাঞ্চ শেষে বিকেলটা মিস বার্টনের সঙ্গে স্টাডি রুমে কাটল আমার। তার ‘তদন্তের’ খবর আমার কাছে আছে অথচ আমি তাকে এ ব্যাপারে কিছু বলিনি বলে খানিকটা ক্ষুব্ধ। বারবারই দাদীমার মেহমানটির নাম জানতে চাইছিল আমার কাছে। তার কারণে বিকেলটা আমার ভাল কাটল না। মিস বার্টনের নাকের ফুটো বারবার স্ফীত হচ্ছিল এবং চক্ষুজোড়া সরু হয়ে উঠছিল।
আমি ফ্রান্সিস এবং তার বংশধরদের নিয়ে কথা বলতে চাইছিলাম। তবে বুঝতে পারছিলাম দাদীমার অন্তর্ধান নিয়ে মিস বার্টনের উৎকণ্ঠা দূর করতে না পারলে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও কোন ফায়দা হবে না। ঘটনার পরিসমাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত ফ্রান্সিসকে আবার দেখতে পাব কিনা তাও জানি না।
‘অ্যান,’ ডাকলাম আমি।
মিস বার্টন কথা বলায় বিরতি দিল, তাকে এক মুহূর্তের জন্য বিস্মিত দেখাল। তারপর সে হাসল। আমি তার ডাক নাম ধরে ডেকেছি।
‘অ্যান, আর কোন লোক কি নেই-আমাদের মত মানুষজন-যারা সত্যটাকে প্রকাশ করতে পারে? এবং এরকম কোন মানুষের সাহায্য প্রার্থনা করা কি উচিত নয়?’
‘এরকম মানুষজন নিশ্চয় আছে। ষোড়শ শতকে এদেরকে ‘ধূর্ত লোক’ বলে সম্বোধন করা হত। তবে এসব কৌশল অবলম্বন করার প্রয়োজন নেই।
‘এই ধূর্ত লোকেরা কী করত? ‘
‘তারা হারানো জিনিসের সন্ধান দিতে পারত, মানুষের অসুখ সারাত।’
‘এদেরকে কি ডাইনি বলত?’
‘সেভাবে নয়। তাদের ক্ষমতা ছিল অতিপ্রাকৃত। তবে সেসব শক্তি শয়তানের কাছ থেকে আহরণের প্রয়োজন হত না তাদের। তারা ব্ল্যাক আর্টের বদলে হোয়াইট উইচক্রাফট চর্চা করত বলে অভিযোগ আছে।’ এ বিষয়টি নিয়ে মিস বার্টন বেশ আগ্রহ নিয়ে কথা বলছে।
ওরা কি কোন পূজা-আর্চা করত?’
ওরা জাদুর মন্ত্র বলত, নানান ফর্মুলা ব্যবহার করত এবং তাতে নানান জিনিসের ব্যবহার হত। যেমন: আয়না, কাঁচি কিংবা চালনি।
‘ওসব করতে পারে এমন কাউকে তুমি চেন?’ আমার ধারণা সে চেনে তবে স্বীকার করবে বলে মনে হয় না।
‘না।’ বলল সে। ‘ইংল্যাণ্ডে এরকম মানুষজনকে চিনতাম, তবে এখানে নয়।’
এরকম কাউকে আমার খুঁজে বের করতে হবে।
আমরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর সে বলল, ‘ধন্যবাদ।’
‘ধন্যবাদ কীসের জন্য?
‘আমাকে তুমি করে বলার জন্য।’
মিস বার্টনকে বেশ খুশি খুশি লাগছে।
.
পরদিন আমার কাছে একটি ফোন এল। সেই পেট শপের দোকানদার ফোন করেছে।
‘আমি জন ডিকসন বলছি,’ বলল সে। সেক্সি কণ্ঠ ‘সেদিন যে বিড়ালটি কিনলেন সেটি কোন সমস্যা দিচ্ছে কিনা জানার জন্য ফোন করলাম। আমরা আমাদের কাস্টমারদের পূৰ্ণ সন্তুষ্টি চাই।
‘ধন্যবাদ,’ বললাম আমি। ‘আমার কোন অভিযোগ নেই। আপনাদের বিড়ালটি খুব ভাল।
‘শুনে খুশি হলাম। যাকগে, আপনাকে আর বিরক্ত করব না। যদি কোন প্রশ্ন থাকে অথবা কোন তথ্যের প্রয়োজন হয়-যে কোন সময়ে আমাকে ফোন করবেন।
‘আচ্ছা করব।’
আমি ফোন রেখে দিলাম। ফোনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় জেমস পেছন থেকে এসে আমার কাঁধে হাত রাখল। ‘চলো, ওপরে যাই,’ বলল সে।
.
