ডাইনি – ২৫
পঁচিশ
জেমস কিছুক্ষণ পরে চিলেকোঠায় এল। আমাকে ভাল মূডে দেখে খুশি হলো। চলে যাওয়ার আগে বলল সে আমাকে নিয়ে লেক জর্জে যাবে। সকালেই আমরা রওনা হতে পারব।
ঘরে এসে দেখি কিথ আমার বিছানায় শুয়ে ঘুমাচ্ছে। তার পাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে মার্থা নামের স্কারলেট কিং সাপটি।
বাথরুমের দরজা বন্ধ, ভেতর থেকে শিশুর কান্নাধ্বনির মত একটি শব্দ শুনলাম যেন। আমি দরজা খুললাম। মি. খামচানি। মোজাইক করা দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে, তার চোখে বেডরুমের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। আমাকে দেখে পিঠ বাঁকিয়ে গরগর করে উঠল। আমি বাথরুমের আলো জ্বেলে দিয়ে বন্ধ করে দিলাম দরজা।
বিছানায় এসে ধাক্কা মেরে জাগালাম কিথকে। সে চোখ মেলে বোকা বোকা চাউনি নিয়ে তাকাল আমার দিকে। ‘কিথ,’ বললাম আমি। ‘সাপটাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। আমার বিড়ালটা ওকে দেখে ভয় পাচ্ছে।’
‘ও বিড়ালটার কোন ক্ষতি করবে না,’ বলল কিথ।
‘কিন্তু তুমি এখানে কী করছ?’
‘মা বলছে তোমার সঙ্গে আমি লেকে বেড়াতে যেতে পারব না। তুমি মাকে একটু বলে দেবে?’
‘তোমার স্কুল আছে।’
‘দু’একদিন স্কুলে না গেলে কিচ্ছু হবে না। আমি সাপ খুঁজতে যাব।’
‘তুমি এখানেই তোমার মায়ের সঙ্গে থাকবে। আমি তোমার জন্য একটা সাপ নিয়ে আসব।
‘তুমি তো জান না কোথায় সাপ পাওয়া যাবে।’
‘মি. হিউবার্টের সাহায্য নেব। অন্যরকম কোন সাপ তোমার জন্য আমরা খুঁজে নিয়ে আসব। বিশ্বাস কর।’
কিথকে বয়সের তুলনায় অনেক কম দেখায়। বাচ্চাদের মত অভিমানে নিচের ঠোঁট ফোলাল সে। আমার মেজাজ খারাপ হলেও ওকে কোলে টেনে নিলাম। ‘এখন বিছানায় যাও,’ বিড়ালটা বাথরুমে বসে এখনো কুঁইকুঁই করছে। শিশুদের কান্নার মত শব্দ। কিথের চেয়ে ওর আমার সঙ্গ বেশি প্রয়োজন।
আমি সাপটার গায়ে হাত রাখলাম। ওটা বিরক্ত হয়ে নড়ে উঠল। ফোলা পেট দেখে মনে হলো ভালই উদর পূর্তি হয়েছে তার। আমি ওটাকে কিথের গলায় ঝুলিয়ে দিলাম। ছেলেটার হাত ধরে পৌঁছে দিলাম দোরগোড়া পর্যন্ত।
‘কাল সকালে কথা হবে,’ বললাম আমি।
ও চলে যাওয়ার পরে বাথরুমের দরজা খুলে মি. খামচানিকে কোলে তুলে নিলাম। ‘চলো,’ বললাম আমি। ‘ফ্রান্সিসকে দেখবে।’ ওটাকে আয়নার সামনে আনতেই শান্ত হয়ে গেল বিড়াল।
ফ্রান্সিস আমাদেরকে লক্ষ করছিল। ‘তুমি ওকে পছন্দ কর?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘করি, ডিয়ার। ও খুব সংবেদনশীল প্রাণী। আমাদের মিত্র।’
বিড়ালটাকে বিছানার ওপর রাখলাম। তবে সাপটা যেখানে শুয়ে ছিল সেখানে নয়। সে আমার পাশের বালিশের দিকে এগিয়ে গেল। আমি জামাকাপড় ছাড়ছি, আড়মোড়া ভেঙে আমাকে দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস আমাকে শুভরাত্রি জানাল। আয়না থেকে মিলিয়ে গেল তার চেহারা।
আমার ঘুম আসছিল না। সন্দেহ এবং বিভ্রান্তির দোলাচল যা একধরনের দুর্বলতা, যাতে সম্প্রতি ভুগছিলাম আমি-এ মুহূর্তে ওসব থেকে মুক্ত আমি। শরীর এবং মনে আমি শক্তিশালী এবং আত্মবিশ্বাসী। এ যেন ঢেউয়ের মত আমার ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছিল। অতিরিক্ত মদ্যপানের পরে মাথা যেমন ঝিমঝিম করে, সেরকম একটা ভাব এখন আমার মধ্যে। শৈশবের এক রাতের কথা মনে পড়ছে।
বাবা এবং আমি একা ছিলাম বাড়িতে। সে এত বেশি, মদ খেয়েছিল যে আমি যে একটা ছোট মেয়ে তা বিস্মৃত হয়েছিল বেমালুম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সে কেন এত মদ খাচ্ছে। সে আমার হাতে হুইস্কির বড় একটি গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘এটা খেলে তুমি নিজেই বুঝতে পারবে।’
আমি মদের গ্লাসে চুমুক দিই। বাবা তার ফোনোগ্রাফ রেকর্ড চাপিয়ে দিয়ে নাচতে শুরু করে। সম্ভবত র্যাভেলের Lavalse বাজছিল রেকর্ডে। আমি মদ পান করতে করতে মিউজিক শুনছিলাম।
শুনছিলাম। অন্যরকম একটা আনন্দবোধ করছিলাম। বুঝতে পারছিলাম এ আনন্দের মধ্যে একই সঙ্গে দুর্বলতা এবং অসহায়ত্ব রয়েছে।
বাবা নাচতে নাচতে ধপাস করে পড়ে যায় মেঝেতে। শুয়ে গোঙাতে থাকে আর মোচড় খাচ্ছিল তার শরীর। মিউজিক শেষ হয়ে নিডলটি রেকর্ড লেবেলের ওপর আগুপিছু করছিল। এমন সময় মা ঘরে ঢোকে। আমাদেরকে এ অবস্থায় দেখে তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। ঠোঁট কাঁপছিল রাগে। মনে আছে সে রাতে লাল টুকটুকে লিপস্টিক পরে মা বাইরে গিয়েছিল।
সে আমাকে থাপ্পড় মেরে বাকি হুইস্কিটুকু ঢেলে দেয় বাবার মুখের ওপর।
ওটা ছিল আমার জন্য একটি শিক্ষামূলক সন্ধ্যা। ওই দিন আমার বাবা-মাকে আমি চিনতে পারি এবং বুঝতে পারি সচেতনতা কখনো বদলানো যায় না, এটি নানান আকারে জন্ম নেয়। পরে শিখে যাই কিছু সচেতনতা শক্তি প্রদান করে।
আমি ভোরের জন্য অপেক্ষা করছি, এ মুহূর্তে সেই শক্তি নিজের মধ্যে অনুভব করছি। আমি বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। ড্রেসার খুলে একটি লিপস্টিক বের করে সযত্নে আয়নায় একটি বৃত্ত আঁকলাম। বৃত্তের ভেতরে বড় বড় অক্ষরে লিখলাম: ‘মার্থা’। কিথের সাপের নাম।
.
পরদিন সকালে নাশতার টেবিলে কারো সঙ্গে কথা বলল না কিথ। মার্থা, তার স্কারলেট কিং সাপ, গত রাতে মারা গেছে।
মিস বার্টনের লকেটটি স্পর্শ করলাম, ওটা আমি গলায় পরে আছি। মুখ টিপে রইলাম যাতে হাসি না আসে।
মিস বার্টন আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। সে ভাল করেই জানে তাকে আমি আর কোনদিন বিশ্বাস করতে পারব না। আমাদের সঙ্গে থাকার তার আর কোন প্রয়োজন নেই। সে চলে গেলে নিদারুণ মন খারাপ করবে ক্যাথেরিন কারণ আমার চেয়ে অনেক বেশি সে শিখেছে মহিলার কাছ থেকে। তবে ক্যাথেরিন নতুন বন্ধু খুঁজে পাবে। এবং সে জানে কোথায় খুঁজতে হবে তাদেরকে।
ব্যাগট্যাগ আনতে জেমস ওপরে গেছে, আমি মিস বার্টনের সঙ্গে স্টাডি রুমে রইলাম।
‘তোমরা লেকে কতদিন থাকবে?’ জিজ্ঞেস করল সে।
‘দু’একদিন,’ জবাব দিলাম আমি। ‘আমি ফিরে আসার পরে হয়তো আপনাকে আর এখানে দেখতে পাব না।’
বিস্মিত দেখাল তাকে। ‘এ কথা কেন বলছ?’
‘এ বাড়িতে অনেক বিপদ আছে, তাই না?’
‘হ্যাঁ। তবে সে বিপদ শুধু আমার নয়।’
‘প্রাথমিকভাবে আপনার জন্য। আমি চাই না আপনার কিছু হোক, মিস বার্টন।
‘তুমি কিন্তু আমাকে একবার ‘তুমি’ করে বলেছ।’
‘সেবার ভেবেছিলাম আপনি আমার সঙ্গে সৎ রয়েছেন।’ কাঁদতে লাগল মিস বার্টন। তার চোখের জল হলুদ। সে হয়তো ভাবছে আমার জন্য তার ভালবাসা আমি দেখেও না দেখার ভান করছি। না, আমি তা করছি না। তার ভালবাসার মধ্যে আমি ভাল কিছু দেখতে পাইনি। তার ভালবাসায় রয়েছে আমাকে ধ্বংস করে দেয়ার ইঙ্গিত।
.
ছাব্বিশ
জেমসের লাল স্পোর্টস কারে চেপে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। মি. খামচানি আমার কোলে। জেমস ওয়েস্ট সাইড হাইওয়ে ধরে যেতে চাইছিল কিন্তু আমি নিউ জার্সির রাস্তা ধরতে বাধ্য করলাম যাতে হল্যাণ্ড টানেল হয়ে যাওয়া যায়। আমরা হাডসন নদীর ধূসর জলের তলা দিয়ে যাচ্ছি, টানেলে কোন আলো জ্বলছে না, ভাবলেই কেমন রোমাঞ্চ জাগে। মূল রাস্তার জটে চলে এসেছি, নদীর দু’পাশে আবর্জনা বোঝাই জলা, আমি বললাম, ‘মিস বার্টন বোধহয় শিগগিরি চলে যাবেন।’
‘চলে যাবে কেন?’ জিজ্ঞেস করল জেমস। ভান করল এ ব্যাপারে তার তেমন কোন আগ্রহ নেই, আসলে ঠিকই আছে। ‘দাদীমা চলে যাওয়ার পর থেকে তাঁর মন মেজাজ খুব একটা ভাল দেখছি না। তাঁর ধারণা দাদীমা খুন হয়েছেন। আর এ ভাবনাটাই তাঁকে পেয়ে বসেছে।’
জেমস সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করল না। সে দাদীমার কথা ভাবছে কিনা কে জানে। না, ভাবছে না। বলল, ‘সেক্ষেত্রে তোমার জন্য আবার নতুন টিউটর খুঁজতে হবে, তাই না?’
‘হুঁ,’ বললাম আমি। ‘তবে এবারে কমবয়েসী কেউ।’
জেমস এই প্রথম হাসল। পা দিয়ে চেপে ধরল অ্যাকসিলেরেটর।
আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে সবুজ, শ্যামল গ্রামাঞ্চলে প্রবেশ করলাম। আমার বাঁশিটি গাড়ির পেছনে রাখা। ওটা নিয়ে বাজাতে শুরু করলাম। ফ্রান্সিসের সুরটি বাজাচ্ছি, জেমস একটি হাত রাখল আমার ঊরুতে।
আমরা বেশ খুশিতেই আছি। নিউ ইয়র্ক স্টেটে আবার প্রবেশ করেছি, পার হয়ে যাচ্ছি দু’পাশের পাহাড়ি, জঙ্গুলে এলাকা, ওখানে ওৎ পেতে থাকা জন্তুজানোয়ারগুলোর কথা মনে পড়ল। অপেক্ষা করছে অন্য প্রাণীগুলো একটু অসতর্ক হলেই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। হ্রদের তীর ধরে জঙ্গলে হাঁটবার খুব ইচ্ছে হলো। আমার কোলে বসা মি. খামচানি অস্থির ভঙ্গিতে নড়েচড়ে উঠল। আমাদের পারিপার্শ্বিকতা বদলে যাওয়ার বিষয়টি সেও টের পেয়েছে। সামনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে ও হয়তো সচেতন যেগুলোর বিষয়ে আমি জানি না।
আলবানির কাছাকাছি এসেছি, একটি সার্ভিস স্টেশনের সামনে গাড়ি থামাল জেমস। গ্যাসোলিন কিনবে। গাড়ির ট্যাঙ্ক ভর্তি করা হচ্ছে, সে গেল রেস্টরুমে। আমি গাড়িতেই বসে রইলাম। জেমস জানে প্রস্রাবের বেগ খুব বেশি না চাপলে আমি বাথরুমে যাই না। ব্লাডার ভর্তি হয়ে যে চাপটা পড়ে ওটা আমি বেশ উপভোগ করি। আমার এ কথা শুনে আমোদিত হয়েছে জেমস, বলেছে তার নাকি উত্তেজনা বেড়ে যাচ্ছে। গাড়ি থেকে নামার সময় আমার তলপেটে জোরে একটা চাপ দিয়ে হেসেছে সে।
জেমস ওর ওয়ালেট আমাকে দিয়ে গেছে। বলেছে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে যেন গ্যাসোলিনের দাম চুকিয়ে দিই। আমি কার্ড বের করে পড়তে লাগলাম। একটু পরে চলে এল অ্যাটেনডেন্ট, দেখল বিমূঢ় দৃষ্টিতে আমি তাকিয়ে আছি কার্ডের দিকে। জানি না কতক্ষণ সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি শুধু কার্ডটির কথাই ভাবছিলাম। ওতে লেখা: জেমস ফ্রাঞ্চিস হ্যামিলটন।
জন ডিকসনের কথা মনে পড়ছে আমার: ‘ওটা ফ্রান্সিসের হাত।’ আসলে ও বলেছিল, ‘ফ্রাঞ্চিসের হাত। এবং জেমসের ছবি দেখানোর সময় তাকে ফ্রাঞ্চিস সম্বোধন করেছিল। আমি ঠিকমত খেয়াল করিনি। তার মানে জেমস দাদীমাকে হত্যা করেছে। সে রাতে আমি ক্যাসল ক্লিনটনে যে উদ্দেশ্যে গিয়েছিলাম ঠিক একই কারণে সে এ কাজ করেছে। সে চায়নি দাদীমা আমাকে স্কুলে পাঠিয়ে দিক। সে তার ফূর্তির উপকরণ হাতছাড়া করতে চায়নি। নাকি সে ভেবেছে আমাকে ভালবাসে বলে কাজটা করেছে।
‘কী হলো?’
জেমস গাড়িতে এসে আমার পাশে বসল।
‘আমি জানতাম না তোমার মিডলনেম ফ্রাঞ্চিস।’
‘এ নিয়ে আমি মোটেই গর্ববোধ করি না। ছোটবেলায় মা আমাকে এ নামে ডাকতেন। এটা কোন পুরুষের নাম হতে পারে না।’
আমরা আবার হাইওয়েতে ফিরে এলাম। দাদীমার বলা কথাটা মনে পড়ল: ‘ফ্রান্সিস অপরাধী।’ আসলে তিনি ‘ফ্রাঞ্চিস’ বলেছিলেন। জেমসকে তাঁর অপরাধী মনে করার কারণ কী?
যাত্রার বাকি সময়টুকু আমি ভাবছিলাম এই যে নতুন একটি তথ্য জানতে পারলাম, এখন আমার করণীয় কী? কেবিনে পৌঁছার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম জেমসকেই ঠিক করতে দেব আমার করণীয় কী।
কেবিন স্যাঁতসেঁতে এবং শীতল। কেবিনের চারপাশটা ঘিরে গজিয়ে ওঠা ঘন পর্ণরাজির কারণে, ভেতরে রোদ প্রবেশের প্রায় কোন সুযোগই পায় না, শুধু শুকনো, উষ্ণ বাতাসের দুর্লভ দিনগুলো ছাড়া। ফলে কেবিনটাকে মনে হয় কাঠ নয়, মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি। এমন ঠাণ্ডা। এখানে প্রায়ই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে মনে হত মাটিতে শুয়ে আছি।
আমার বাবা-মায়ের মৃত্যুর পরে আর লেকের ধারে আসা হয়নি। আমি অবশ্য বাবা-মা’র কথা তেমন ভাবিও না। ফ্রান্সিসকেই এখন আমার বাবা-মা মনে হয়। আমরা একে অপরকে বেছে নিয়েছি এবং একটি উত্তরাধিকার শেয়ার করে চলেছি। আমি যদি কোনদিন কন্যা সন্তানের মা হতে পারি, আমার চেয়ে ফ্রান্সিসই হয়ে উঠবে তার বাবা-মা।
মনে হয় জেমস বাবা-মায়ের মৃত্যু দিনের কথা ভাবছে।
‘চলো, সাঁতার কেটে আসি,’ প্রস্তাব দিল সে।
‘তুমি জান আমি সাঁতার জানি না।’
‘শিখিয়ে দেব।’
সে জামা-কাপড় খুলে আয়নায় নিজের শরীর দেখতে লাগল। এ আয়নাতেই আমি প্রথম ফ্রান্সিসকে দেখতে পাই। সে এ মুহূর্তে এখানে আছে, হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি সোয়েটার খুলে, স্কার্টও খুলে ফেললাম। জেমস আমার ব্রা ও প্যান্টি খুলতে সাহায্য করল।
‘আমি তোমাকে ভীষণ ভালবাসি,’ বলল সে।
‘তুমি আমার জন্য কী করতে পারবে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘সবকিছু।’
‘তুমি আমার জন্য কাউকে আঘাত করতে পারবে?’
‘যে কাউকে পারব।’
‘তুমি আমার জন্য নিজেকে আঘাত করতে পারবে?’
জেমস কখনোই আমার ব্যাপারে সিরিয়াস ছিল না কিন্তু আজ আমি তার সাহসকে চ্যালেঞ্জ করেছি। জানি সে পারবে। হঠাৎ তাকে আত্ম-সচেতন দেখাল। সে ঘরের চারপাশে একবার চোখ বুলাল তারপর ড্রেসারের কাছে গিয়ে একটি দেরাজ খুলে একটি মোমবাতি বের করল। লম্বা লাল রঙের সরু মোমবাতি। এ জিনিস এ কেবিনে আগে কখনো দেখিনি। এ ধরনের মোমবাতি আমাদের শহরের বাড়িতে ব্যবহার করা হয়।
জেমস মোমবাতি জ্বেলে বাম হাতে ধরল। ডান হাতটা নিয়ে এল শিখার এক ফুট ওপরে। তারপর ধীরে ধীরে হাতখানা নামাতে লাগল নিচে। আমার দিকে তাকিয়ে সে হাসছে। ‘তুমি সন্তুষ্ট হলে পরে বোলো।’ তার কণ্ঠ অবিচল শোনাল।
জ্বলন্ত শিখার ওপর নামিয়ে আনছে হাত, চোখের কোণ কুঁচকে উঠল জেমসের। তারপর জল গড়াতে লাগল। ওকে থামতে বলার কোন ইচ্ছেই আমার নেই। যখন শিখা থেকে দুই-তিন ইঞ্চি দূরে জেমসের হাত, সে ইতস্তত করতে লাগল। কাঁপছে।
‘সন্তুষ্ট?’ জানতে চাইল সে।
আমি হেসে ডানে বামে মাথা নাড়লাম। চোখ বুজল জেমস, শক্ত হয়ে গেল চোয়ালের পেশী।
ঝাপটা মেরে মোমবাতিটি মেঝেয় ফেলে দিল সে। দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, ‘মাগী।’
‘আমার ধারণা ছিল তুমি আমাকে ভালবাস।’
‘বাসি, ইউ বীচ। আমি কি মাত্রই তার প্রমাণ দিইনি?’
হাতের তালু মেলে ধরল সে আমার সামনে। ইতিমধ্যে ফোসকা পড়ে গেছে। সে কী প্রমাণ করল জানি না তবে সন্দেহ আছে এটা ভালবাসা কিনা। আমরা বাথরুমে গেলাম। ওর হাতে অ্যারোসোল অ্যানেসথেটিক স্প্রে করলাম। ওর মুখখানা এখনো কঠিন, বোধ করি হাতের ব্যথায়।
ওই মোমবাতি কোথায় পেলে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘তুমি আমার কথা ভাব। ওই ফালতু মোমবাতির কথা চিন্তা করতে হবে না।’
সে তার বাঁ হাত দিয়ে আমার ডান হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল কেবিনের বাইরে। ‘আমরা এখন সাঁতার কাটব।’
ভাবছিলাম গাছের আড়াল দিয়ে মি. হিউবার্ট আমাদেরকে দেখছেন কিনা। আমাদেরকে ন্যাংটো দেখে উনি কী ভাবছেন কে জানে।
আমরা যখন কেবিনে ছিলাম তখনই আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল, মাঝে মধ্যেই চমকাচ্ছে বিদ্যুৎ, তবে বহুদূরে বজ্রপাত হলেও এখান থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম না। বাতাস থম মেরে আছে, লেক শান্ত। শুধু এক জোড়া সোয়ালো পাখি লেকের ওপর পাক খেতে খেতে কিচির মিচির করছিল। এছাড়া আর কোন শব্দ নেই।
জেমস এক ছুটে নেমে পড়ল জলে। জোরে জোরে সাঁতার কাটতে লাগল। আমি হেঁটে এগোলাম, শীতল জলে ঊরু পর্যন্ত ডুবে যেতে থেমে গেলাম। আরও একটু নামলাম। তারপর চিৎ হয়ে ভাসতে লাগলাম। বিদ্যুৎ চমকানি এখন আগের চেয়ে বেড়ে গেছে, দূর থেকে বাজ পড়ার শব্দও শুনতে পাচ্ছি। বাবা-মা’র কথা আবার মনে পড়ল আমার। লেকের জলে যখন ডুবে যাচ্ছিল তখন কেমন লাগছিল ওদের? আমি ডুব দিলাম। যতক্ষণ পারি বন্ধ করে রইলাম নিঃশ্বাস।
অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম প্রথম কয়েক মুহূর্ত জল নয়, আমি আমার শরীর নিয়ে ভাবছিলাম। হৃৎপিণ্ডের ধুকধুক শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম না। আমার ফুসফুসে যেন বরফ ভরে দেয়া হয়েছে। মনে হচ্ছিল ফুসফুস জোড়া সামনে ভাসতে দেখছি। আমার হাত-পা কেমন ধাতব মনে হচ্ছিল; শীতল এবং ভারি।
যখন আর সহ্য করতে পারলাম না, ভুস করে মাথা তুললাম জলের ওপর। মুখ হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছি। জেমসকে দেখলাম সাঁতার কেটে আমার দিকেই আসছে। চারপাশের জগৎ মনে হলো আশ্চর্য শান্ত, সুসমাহিত। জলের নিচের পৃথিবী আমাকে দারুণভাবে টানছিল। আমি আবার ডুব দিলাম। ডুবে মরা বেশ মজার অভিজ্ঞতা, ভাবছিলাম আমি।
দ্বিতীয়বার ডুব দেয়ার আগে বুক ভরে বাতাস নিয়েছি। ফলে প্রথমবারের চেয়ে বেশিক্ষণ জলের তলায় ডুবে থাকতে পারলাম। মাথা তুলতে যাচ্ছি, গলায় কীসের চাপ পড়ল।
একটা হাত, খুব শক্ত করে জড়িয়ে নেই আমার ঘাড় তবে আমাকে জলের নিচে ডুবিয়ে রাখার মত যথেষ্ট শক্তি রাখে হাতখানা। তবে আতঙ্কিত হয়ে ওঠার আগেই হাতটি আমার গলা ছেড়ে দিল, কাঁধ ধরে আমাকে তুলে দিল জলের ওপর। জেমস। সে তার ফোসকা পড়া হাতে আমাকে ধরে রেখেছিল।
‘সন্তুষ্ট?’ জিজ্ঞেস করল সে আমাকে।
ঝলসে উঠল বিদ্যুৎ, একই সঙ্গে গুরগুর আওয়াজ ডাকল মেঘ। আমরা ছুটলাম কেবিনের দিকে। বাজের আওয়াজ তখন লেকের চারপাশের পাহাড়ে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলেছে।
কেবিনের গ্যাস হিটার জ্বেলে দিল জেমস। ওদিকে শুরু হয়ে গেছে বৃষ্টি। পাইনের পাতার ফাঁকে হিসহিস শব্দে বৃষ্টি পড়ছে। আমরা তোয়ালে পেঁচিয়ে নিয়েছি গায়ে, জেমসের হাত ব্যাণ্ডেজ করে দিলাম। তারপর শুয়ে পড়লাম বিছানায়। তবে কেউ কাউকে স্পর্শ করলাম না। বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে তার নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এল। প্রায় ঘুমিয়ে পড়ল।
আমাকে যখন জলের নিচে চুবিয়ে ধরেছিল জেমস তখন তার চেহারা কেমন ছিল? কল্পনা করার চেষ্টা করলাম আমি। ও কি খেলাচ্ছলে ওভাবে আমার ঘাড় চেপে ধরেছিল নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল? ওর কাছে প্রেম ভালবাসা কিছু নয়, শক্তিটাই মুখ্য। শক্তি এবং ক্ষমতাই শুধু ভাল বুঝতে পারে জেমস, অন্য কিছু নয়। ও যখন আমার ঘাড় চেপে ধরেছিল তখন আমি সত্যি খুব অসহায় বোধ করছিলাম।
এখন নিরীহ চেহারা নিয়ে আমার পাশে শুয়ে আছে জেমস। আমি অবশ্য শুধু আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই ওকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব, জানি।
‘জেমস,’ ডাকলাম আমি।
‘উমম?’
‘তুমি আমাকে কিছুক্ষণ আগে বলেছ আমার জন্য যে কাউকে আঘাত করতে পারবে। তুমি কি মানুষকে আঘাত করে মজা পাও?’
‘আমি খুব বেশি মানুষকে আঘাত করিনি।’
‘দাদীমাকে আঘাত করে মজা পেয়েছিলে?’
নড়ল না জেমস এবং তার নিঃশ্বাস প্রশ্বাসও শান্তই রইল। হয়তো আমার কথা শুনতেই পায়নি। ‘তুমি দাদীমাকে খুন করেছ, তাই না?’ প্রশ্ন করলাম আমি।
‘তুমি যদি তাই ভেবে থাক আমি কিছু মনে করব না।’ বলল সে। তার কণ্ঠ নিরুত্তাপ।
‘তুমি কি আমাকেও হত্যা করবে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘আমি কেন তা করতে যাব?’
‘তোমার গোপন কথাটা যে জেনে ফেললাম।
‘আমিও তোমার গোপন কথা জানি, এলিজাবেথ।’
‘কোন্ গোপন কথা?’
‘আমি এ ব্যাপারটি জানি,’ সে আমার ঊরুর লাল দাগের ওপর হাত রাখল। ‘জানি তুমি দাদীমাকে দুনিয়ার বুক থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলে। তিনি এখন নেই বলে তুমি অপরাধবোধে ভুগছ। অপরাধবোধে ভুগতে হবে না। যেসব অসাধারণ বিষয় বিশ্বাস করতে চাও ওগুলো বিশ্বাস করো। তুমি সাধারণ মেয়ে হলে আমি তোমাকে ভালবাসতাম না।’
জেমস আমাকে চুমু খেতে লাগল। সম্ভবত এই প্রথম তার চুম্বন আমাকে আনন্দিত করল না। তবে ওকে আমি বাধাও দিলাম না। সে আমার শরীর নিয়ে খেলছে, আমি গাছের গায়ে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে ওর এইমাত্র বলা কথাগুলোর মাজেজা বুঝবার চেষ্টা করতে লাগলাম।
তার কি ধারণা দাদীমার অন্তর্ধানের জন্য আমি দায়ী নাকি নিজের দোষ আমার ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে? ফ্রান্সিস এবং মিস বার্টন বলেছে আমার কোন দায়ভার নেই। হয়তো তারা ভুল বলেছে। কারণ আমি অপরাধবোধে জর্জরিত না হলেও এজন্য নিজেকে দায়ী ভাবছিলাম।
কেমন জানি রাগ হচ্ছিল আমার, বোধকরি অনুতাপ হচ্ছিল। যদিও আমি অনুতপ্ত কিনা তাও বুঝতে পারছিলাম না। আমি শুধু জানি আমি সেই ধরনের মানুষ যার জীবনে অনেক নিশ্চয়তার প্রয়োজন, কিন্তু মনে হচ্ছিল আমার চারপাশের লোকজন আমার ভেতরে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে চাইছে।
জেমস এখনো ঘুমাচ্ছে না কেন, তাহলে আমি ফ্রান্সিসের সঙ্গে কথা বলতে পারতাম। আমি জেমসের প্রতি মনোযোগ ফেরালাম। শীঘ্রি সে তার খেলায় ব্যথা পেতে লাগল এবং গোঙানি দিয়ে বুঝিয়ে দিল মজাও পাচ্ছে।
জেমস ঘুমালে আমি চুপচাপ নেমে পড়লাম বিছানা থেকে। জামাকাপড় পরলাম। থেমে গেছে ঝড়, দূরে কোথাও বজ্রপাত হচ্ছে। আমি অপর বেডরুমটিতে ঢুকলাম। এখানে আমার বাবা-মা তাদের জীবনের শেষ রাতটি কাটিয়েছে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। একটু পরেই ওখানে ফুটল ফ্রান্সিসের প্রতিচ্ছবি। তাকে কেমন বিধ্বস্ত তবে উদগ্র লাগছে। তার শক্তির প্রবলতা আগে কখনো এমনভাবে অনুভব করিনি।
‘আমি এখন কী করব?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘তোমার শক্তি আছে, সোনা। এখন সেটি ব্যবহার করার সময়।’
‘ব্যবহার করাটা কি খুবই দরকার?’
‘হ্যাঁ। তোমাকে অভিযোগ করা হয়েছে। জবাব তো দিতেই হবে।’
মি. খামচানি ড্রেসারের ওপর লাফিয়ে পড়ল। তার মুখে ধূসর চামড়ার একটি ছোট প্রাণী-ইঁদুরটিদুর হবে বোধহয়। দুর্বল ভঙ্গিতে ছটফট করছে ইঁদুরটা। মি. খামচানি ওটাকে প্রবল একটা ঝটকানি মেরে ফেলে দিল। ইঁদুরটা উপুড় হয়ে পড়ে রইল, দ্রুত ওঠানামা করছে পিঠ। বিড়ালটাকে এক মুহূর্ত দেখল ইঁদুর তারপর টলমল পায়ে ড্রেসার ধরে হাঁটতে লাগল। মি. খামচানি থাবা মেরে ধরল ওটাকে, ইঁদুরটা দুর্বল গলায় কিচকিচ করে উঠল।
বিড়ালটা ইঁদুরটাকে মুখে পুরে নিয়ে এক কামড়ে ওটার ভবলীলা সাঙ্গ করে দিল। লাশটাকে আমার সামনে ফেলে দিয়ে আমার চোখের দিকে তাকাল। আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম। তিরতির করে কাঁপছে শরীর।
আয়নায় তাকালাম আমি। হালকা আলোয় দেখলাম ফ্রান্সিসের হাসিমুখ ক্রমে আবছা হয়ে যাচ্ছে।
.
সাতাশ
নিজেকে খুব শান্ত লাগছে আমার, সেই সঙ্গে খিদে পেয়েছে খুব। একটা পিকনিক বাস্কেটে কিছু খাবার নিয়ে এসেছি। কিন্তু সেগুলো রয়ে গেছে গাড়িতে। বাস্কেটটি নিয়ে এলাম। এক পিস ফ্রেঞ্চ ব্রেড খেলাম পনিরের সঙ্গে। পান করার জন্য শুধু মদ নিয়ে এসেছি। যেটুকু খেতে অভ্যস্ত তার চেয়ে বেশিই পান করে ফেললাম ওয়াইন।
কেবিনটি অস্বাভাবিক নীরব ঠেকছে আমার কাছে তবে আস্তে আস্তে ব্যাকগ্রাউণ্ড থেকে ভেসে আসা ছোট ছোট শব্দগুলো নিয়ে সচেতন হয়ে উঠলাম। বেডরুমে তুমুল নাক ডাকছে জেমস-ঠিক নাক ডাকা নয়, যেন আহত কোন জানোয়ার মুখ হাঁ করে শ্বাস টানছে। হাওয়া দোলা দিয়ে গেল বৃষ্টিভেজা বৃক্ষের শাখায়। বাতাস ছাপিয়ে দূরে শুনতে পেলাম ঠকঠক আওয়াজ।
বারান্দায় গিয়ে কান পাতলাম। লেকের কাছ থেকে শব্দটা আসছে। ওদিকটাতে মি. হিউবার্টের বাড়ি। আমি শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে গেলাম। মাঝে মাঝে গা ঝাড়া দিয়ে উঠল গাছ, ঠাণ্ডা বৃষ্টির জলের ফোঁটা লাগল শরীরে। লেকের ধারে এসে দেখি মি. হিউবার্ট পাড়ে দাঁড়িয়ে একটি গাছ কাটছেন দ্বিধার কুঠার দিয়ে। ঝড়ে মাটিতে পড়ে গেছে ওটা। আমার দিকে ফিরে গাছের ডাল কাটছিলেন তিনি। আমাকে দেখতে পেয়ে নামিয়ে রাখলেন কুঠার।
আমি তাঁর দিকে এগোতে এগোতে অবাক হয়ে ভাবছিলাম এ লোকটির মধ্যে দাদীমা কী দেখেছিলেন যে জন্য একে প্রেমিক নির্বাচন করেছিলেন। হয়তো লোকটার সুঠাম শরীরের জন্য। বুড়ো বয়সেও দিব্যি শক্তপোক্ত গড়ন। মসৃণ চামড়ার পুরুষ দেখে অভ্যস্ত কোন নারী পেশীবহুল দেহের, গায়ে অসংখ্য কাটা ছেঁড়ার দাগ, এরকম কোন লোকের প্রতি আকৃষ্ট হতেই পারে।
মি. হিউবার্ট আমাকে দেখে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাঁর চোখ জোড়া ছিল চঞ্চল। আমি তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তাঁর মুখভর্তি কয়েকদিনের খেংরামুড়া দাড়ি।
‘হ্যালো, মি. হিউবার্ট।’
‘হ্যালো, এলিজাবেথ।’ লক্ষ করলাম তিনি ‘মিস’ বলে সম্বোধন করলেন না, যেটা সাধারণত করে থাকেন। ‘মাত্রই এখানে এলে, তাই না?’
‘জি। জেমস চাচা আর আমি এসেছি।’
‘হুঁ,’ সংক্ষেপে বললেন তিনি। আমি মাটিতে পড়া গাছটির গুঁড়ির ওপর বসলাম। মি. হিউবার্ট চুপ করে আছেন দেখে বললাম, ‘দাদীমার কাছে আপনাকে যেতে দেখে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম।’
কপালে ভাঁজ পড়ল তাঁর, কেশে পরিষ্কার করে নিলেন গলা।
‘তিনি তোমাকে বলেছেন নাকি আমি গিয়েছিলাম? ‘না। আমি আপনাকে দেখেছি।’
‘উনি তোমার সঙ্গে কথা বলেছেন?’
‘না।’
তাঁর কপালের ভাঁজ গভীর হলো।
‘দাদীমা গায়েব হয়ে গেছে,’ বললাম আমি।
তাঁর চক্ষু বিস্ফারিত হয়ে উঠল, চারপাশে কেমন উদ্ভ্রান্তের মত একবার দেখলেন যেন বুঝতে পারছেন না কে কথা বলল। আবার আমার দিকে তাকালেন। ‘গায়েব হয়ে গেছে মানে?’
‘আপনি জানেন না?’
‘আমি কী করে জানব?’
‘জেমস দাদীমার খোঁজে এখানে এসেছিল। ভাবলাম সে বোধহয় বিষয়টি নিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলেছে।’
মি. হিউবার্ট আমার পাশে বসলেন। ‘গায়েব হয়ে গেছে মানে কী?’ পুনরাবৃত্তি করলেন তিনি।
‘এ নিয়ে বেশি কিছু বলার নেই। আপনি যেদিন দাদীমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন তার পরের রাতেই তিনি নেই হয়ে যান। আমরা জানি না কীভাবে।’
মি. হিউবার্ট হঠাৎ ঝট করে সিধে হলেন। হাত বাড়িয়ে তুলে নিলেন কুঠার। ধাঁই করে মস্ত কোপ বসিয়ে দিলেন গাছের গুঁড়িতে। জেমসের মধ্যেও এরকম রাগের অভিব্যক্তি দেখেছি। আমি বুঝতে পারলাম মি. হিউবার্ট দাদীমা অন্তর্ধানের কথা সত্যি জানেন না।
‘আপনি দাদীমাকে কী বলেছিলেন?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘ছেলেটা সম্পর্কে,’ বললেন তিনি।
‘কোন্ ছেলেটা?’
বুড়ো লোকটি আবার আমার পাশে বসে পড়লেন এবং অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মাটিতে। পাঁচ মিনিট চলে গেল। অবশেষে তিনি বললেন, ‘তুমি এখন আর শিশু নও, বলো?’
‘অবশ্যই আমি এখন শিশু নই।’
‘তাহলে তোমার ওপর আস্থা রাখা যায়। অন্য কারো ওপর নয়।’
আমি তাঁর হাতে হাত রাখলাম। তিনি হাতটি মুঠো করে আবার সরিয়ে দিলেন।
‘তোমার জেমস চাচা সম্পর্কে তোমার ধারণা কী?’
‘আমার প্রতি তার আচরণ খুবই ভাল।’
‘কিন্তু সে ভাল লোক নয়। তোমার উচিত তার সঙ্গে মেলামেশা না করা।’
‘আপনি কি দাদীমাকে এ কথাই বলেছিলেন?’
তিনি মাথা ঝাঁকালেন, জমিনের দিকে এখনো স্থির চাউনি।
জেমস ভাল কি মন্দ আপনি কী করে জানেন? আপনি তো ওকে খুব কম দেখেছেন।’
‘আমি ওকে যখন দেখেছি তখন ও জানত না যে ওকে লক্ষ করছি। তোমার বাবা-মা মারা যাওয়ার সময় সে ওদের সঙ্গে লেকে ছিল। সে সঙ্গে না থাকলে তাঁরা এখনো বেঁচে থাকতেন।’
‘আপনার কি ধারণা জেমস আমার বাবা-মাকে মেরেছে?’
‘সে তাঁদেরকে মরতে দিয়েছে। ওঁদের মৃত্যুতে সহায়তা করেছে।’
‘সে সময় আপনি কিছু বলেননি কেন?’
‘একজন পিতা তার পুত্রের বিরুদ্ধে সহজে কিছু বলতে পারে না।’
‘জেমস আপনার ছেলে?’
‘আমি তা-ই শুনেছি। এতে সন্দেহ করারও কিছু নেই।’
আমিও সন্দেহ করছি না। দু’জনের শরীরের গঠনে অপূর্ব মিল দেখলেই তা বোঝা যায়। তবে মি. হিউবার্ট আমার বাবা-মা এবং জেমস সম্পর্কে যা বলছেন তা ভুল।
জেমস কেন আমার বাবা-মাকে হত্যা করতে চাইবে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘এ প্রশ্নের জবাব তুমি যে কারো চেয়ে ভাল জান। সে তোমাকে চেয়েছিল।’
‘জেমস আমার বাবা-মাকে মারেনি। আমি ঠিক জানি।’
‘ভুল জান, এলিজাবেথ। জেমস ভাল লোক নয়।’
‘আপনি ভুল জানেন,’ বললাম আমি।
এটা বুঝতে পারা কঠিন নয় যে মি. হিউবার্ট তাঁর ছেলে জেমসের প্রতি কতটা অসন্তোষ বোধ করছেন। আমি তাঁর দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকালাম। এ মানুষটি প্রাকৃতিক সহিংসতাভরা একটি পৃথিবী দেখতে দেখতে বুড়িয়ে গেছেন। বজ্রপাতে গাছ দু’ভাগ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য তিনি দেখেছেন, রাতে জন্তুজানোয়ারের চিৎকার চেঁচামেচি শুনেছেন আবার ভোরে তাদের রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখেছেন গাছের ফাঁকে।
‘আপনি আমাকে এসব কেন বলছেন?’ শুধাই আমি।
‘আর কেউ নেই যে বলবার মত। আমি ওকে আর কারো ক্ষতি করতে দেব না। একটু আগেও আমি ভাবিনি-সে তোমার কোন ক্ষতি করবে। শুধু ভেবেছি ওর কাছ থেকে দূরে থাকাই তোমার জন্য মঙ্গল হবে। আমি ওকে শাস্তি দিতে চাইনি। ওর মাকে বলেছিলাম তোমাকে যেন স্কুলে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু সে যদি তার মাকে আঘাত করতে পারে তাহলে সে পারবে না এমন কিছু নেই।
জেমস জলের নিচে আমার মাথা ঠেসে ধরেছিল মনে পড়ে গেল। ‘আপনি আমাকে কী করতে বলেন?’
‘আমার সঙ্গে থাকো,’ বললেন তিনি। ‘আমার বাড়িতে থাকো। অন্তত আজকের দিনটা। এই ফাঁকে আমি জেমসের সঙ্গে দেখা করে আসি।’
‘আপনি তাকে কী বলবেন?’
‘সে তার মায়ের কী করেছে জানার চেষ্টা করব।’
‘আগে আমি তার সঙ্গে কথা বলি,’ বললাম আমি। ‘অনেক কথা আছে যা সে আপনাকে বলবে না কিন্তু আমাকে বলবে। আমি কাল এসে আপনাকে বলব কী জানতে পারলাম। তারপর দু’জনে মিলে ঠিক করব পরবর্তী করণীয়।
মি. হিউবার্ট কাঁপছিলেন। আমি তাঁর কাঁধে হাত রেখে চুম্বন করলাম গালে। আমি নিশ্চিত বহুদিন পরে তিনি কোন কিশোরী মেয়ের এত কাছাকাছি হলেন।
‘মার্থা,’ ফিসফিসিয়ে বললেন তিনি।
তিনি দাদীমার কথা ভাবছেন। আমি তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে মাথাটা আমার বুকে চেপে ধরলাম। তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে ওই রকম অদ্ভুত ভঙ্গিতে আমার বুকে মাথা রেখে বসে রইলেন। তিনি খুব দুর্বল মানুষ। জেমসকে শায়েস্তা করার ক্ষমতা তাঁর নেই।
পাহাড় চুড়োর নিচে ডুব দিল সূর্য। ঘনিয়ে আসছে আঁধার। অনেকক্ষণ পরে মি. হিউবার্টের শরীরের কাঁপুনি থেমে গেল। আমার বুক থেকে মাথা তুললেন তিনি। আমি তাঁকে ওখানে রেখে এগোলাম কেবিন অভিমুখে।
.
কেবিনে ফিরে দেখি জেমস কিচেনে। এক হাতে হুইস্কির গ্লাস, অন্য হাতে আধ খাওয়া একটি পেঁয়াজ। তার নগ্ন বুকের লোমে লেগে আছে টুকরো।
‘কোথায় গিয়েছিলে তুমি?’ জিজ্ঞেস করল সে আমাকে।
‘এমনি হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। সূর্যাস্ত দেখলাম।’
‘ভাবলাম তোমার পূর্ণিমা রাতের কোন আচার-অনুষ্ঠান করতে বেরুলে কিনা।’
‘হাঁটতে গিয়ে মি. হিউবার্টের সঙ্গে দেখা হলো,’ বললাম আমি
জেমস শুনেও না শোনার ভান করল। কামড় দিল পেঁয়াজে। চিবানোর সময় ঝাঁজে জল এসে গেল চোখে। ‘তাঁর সঙ্গে কিছু ইন্টারেস্টিং কথাবার্তা হলো।’
‘ওই লোক কথা বলতে পারে তাই তো জানতাম না। ইন্টারেস্টিং কথা দূরে থাক।’
‘মানুষটাকে দেখে তোমার মায়া হয় না?’
‘বরং বিরক্তি লাগে। যদিও লোকটার ব্যাপারে মা’র আগ্রহ ছিল।’
‘উনি দাদীমার অন্তর্ধানের কথা কিছুই জানেন না। শুনে খুব মন খারাপ করলেন।’
‘তুমি কি ওকে বলেছ যে এজন্য আমি দায়ী?’
‘বলার দরকার হয়নি। উনি সব বুঝতে পারেন।’
‘উনি মানুষ বুঝতে পারেন না। বুঝতে পারেন শুধু ঝড়-বৃষ্টি, সাপ ইত্যাদি।’
গ্লাসের মদটুকু শেষ করে আবার ভরে নিল জেমস।
‘কিথ ওর জন্য একটা সাপ নিয়ে যেতে বলেছে, বললাম আমি। ‘মি. হিউবার্ট হয়তো একটা জোগাড় করে দিতে পারবেন।’
‘আমি জোগাড় করে দেব’খন।’
‘ওর কাছে নেই এমন কোন সাপ চাইছে।’
‘ওর কাছে র্যাটল স্নেক-আছে?’
‘না। থাকা উচিত?’
‘ও তো খুব সাবধানী ছেলে। আর র্যাটল স্নেকের অভাব নেই পাহাড়ে। আমরা কাল সকালে একটা ধরে নিয়ে আসব।’
‘তুমি নিয়ে এসো। আমি যাব না।’ বললাম আমি।
.
আটাশ
পরদিন সকালে বারান্দায় দেখলাম জেমসকে, লম্বা, দ্বিধাবিভক্ত একটি লাঠি থেকে ছাল ছাড়াচ্ছে। ‘আমি এখন বিষাক্ত সাপ ধরতে তৈরি।’ বলল সে। ‘তুমি যাবে?’
‘না, ধন্যবাদ।’
আমি যাব না শুনে যেন খুশিই হলো জেমস। ও কিছু বললে আমি ভয় বা বিতৃষ্ণা খুবই কম প্রকাশ করি। এতে নিজেকে শ্রেয়তর ভাবতে থাকে জেমস, নিজের সাহস দেখানোর একটা সুযোগ পেয়ে যায়। সে পকেটে কিছু চকোলেট ভরে নিয়ে বালিশের একটি কাভার নিল। ওতে সাপ রাখবে। যাওয়ার জন্য সম্পন্ন হলো প্রস্তুতি, আমার কাছে এল জেমস, হাত রাখল আমার কাঁধে। আমাকে চুমু খাওয়ার ইচ্ছা। শুধু বলল, ‘আচ্ছা।’ তারপর লাঠিটি নিয়ে এগোল পাহাড়ের দিকে। মি. খামচানি তাকে অনুসরণ করল। আমি গেলাম বেডরুমে। ওখানে ফ্রান্সিস আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।
আমি আয়নার সামনে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে রইলাম। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি ফ্রান্সিসের দিকে। নিজের ভেতরে একটা শক্তি গজিয়ে উঠছে টের পেলাম। তার ভেতরে একটা অকৃত্রিম ব্যাপার রয়েছে যা আর কারো মধ্যে খুঁজে পাইনি। আফসোস লাগল ভেবে ফ্রান্সিসের সঙ্গে সারাক্ষণ থাকতে পারি না। তবে শীঘ্রি আরও ঘনিষ্ঠ হব। কোয়েন্টিস স্লিপের ওই বাড়িতে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি হব আমি। তখন আমার সমস্ত সময় উৎসর্গ করতে পারব ফ্রান্সিসকে। হয়তো ওকে স্পর্শ করতে শিখতে পারব। হয়তো গভীর রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে তার দেহের স্পর্শ পাব আমার শরীরের সঙ্গে। তার ত্বক থাকবে শীতল এবং শুষ্ক।
‘এখন বৃত্ত আঁকবার সময়,’ বলল ফ্রান্সিস।
আমি হাত বাড়িয়ে আয়নার সারফেস স্পর্শ করলাম। কাচটি সমতল নয়, তার ছবিটা সামান্য একটু টোল খেয়ে গেছে। আমি কাচের গায়ে আঙুল চেপে ধরলাম। মনে হলো কী যেন একটা সরে গেল আমার হাতের ফাঁক দিয়ে।
‘বৃত্ত, সোনা,’ বলল সে। ‘স্পর্শ করার সময় অনেক পাবে।’
তার ছবি সামান্য ঝাপসা দেখাল। আমার চোখে জল এসে গেল।
.
আমি লেকের পাড় ধরে ছোট, বৃত্তাকার খোলা একটি ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। ঘরটি একটি পাহাড়ের ওপর। দেখলেই বোঝা যায় বহুদিন কেউ এটি ব্যবহার করে না। এর টালির ছাদ জায়গায় জায়গায় খসে পড়েছে, বর্ণহীন কাঠের মেঝের চলটা উঠে গেছে। পচা মেঝেতে সাবধানে পা ফেললাম, ব্যাসার্ধে ছয় ফুট হবে।
আমি প্লাস্টিকের বালতি নিয়ে এসেছি বালু ভরে। আমি মেঝের ঠিক মাঝখানটায় এসে দাঁড়ালাম তারপর এক মুঠো বালু নিয়ে হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়তে দিলাম।
কাজটা আবার করলাম, ধীরে ধীরে ঘুরে আমার চারপাশে বালুর একটি বৃত্ত বানিয়ে ফেললাম। তারপর বৃত্তের মধ্যে বালু দিয়ে লিখলাম একটি নাম: ‘জেমস ফ্রাঞ্চিস হ্যামিলটন’। কাজ শেষে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম ওখানে। জেমসের কথা ভাবছি। কল্পনায় দেখলাম সে জঙ্গল ঠেঙিয়ে এগোচ্ছে, পাথরের নিচে, গর্তের মধ্যে সাপ খুঁজছে।
আমি ভয়ানক কাঁপতে শুরু করলাম। আমার মুখ দিয়ে দুর্বোধ্য কয়েকটি শব্দ বেরিয়ে এল। ঠিক বুঝতে পারলাম না শব্দগুলো। আমার কণ্ঠস্বর ক্রমে উচ্চকিত হয়ে উঠল, আমি ঘামতে লাগলাম। আমার ত্বক চুলকাতে লাগল, আকাশ হঠাৎ কালো হয়ে এল।
জ্ঞান হারানোর পূর্ব মুহূর্তে আমার শেষ যে কথাটি মনে আছে তা হলো আমি ফাঁপা, হাহাকারের মত একটি বিলাপ ধ্বনি শুনতে পেলাম, যেন যৌন উত্তেজিত কোন বিড়াল ওরকম শব্দ করছে।
.
আমি এক মুহূর্তের জন্য চোখ খুলেই বুজে ফেললাম তীব্র আলো সইতে না পেরে। পচা কাঠের গন্ধ আসছে নাকে মুখভর্তি বালু। আবার চোখ মেলে তাকিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসলাম মেঝেতে। তারপর সিধে হলাম। হেলান দিলাম একটা থামের গায়ে। পশ্চিমে, পাহাড়ের গায়ে ডুব দিতে যাচ্ছে সূর্য। আমি সাবধানে নেমে পড়লাম খোলা ঘরটি থেকে। পা বাড়ালাম কেবিন অভিমুখে।
মি. হিউবার্টকে দেখলাম বসে আছেন বারান্দায়। আমাকে দেখেও উঠে দাঁড়ালেন না। তবে আমাকে দেখতে পেয়ে যেন স্বস্তি পেয়েছেন মনে হলো। তিনি শেভ করেছেন তবে গতকালের পুরনো জামাটাই গায়ে।
‘আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম,’ বললাম আমি।
‘ও কোথায়?’
‘জেমস? এখনো ফেরেনি? ও তো কিথের জন্য সাপ ধরতে টাং মাউণ্টেনে গেছে।’
‘কখন গেছে?’
‘আজ সকালে। ভোরের দিকে।’
উঠে দাঁড়ালেন মি. হিউবার্ট। ওর খোঁজ নিয়ে আসি।’
‘কিন্তু একটু পরেই তো সন্ধ্যা হয়ে যাবে।’
‘আমি আলো নিয়ে যাব। ওখানে ওকে আমরা সারারাত পড়ে থাকতে দিতে পারি না।’
‘আমরা ওকে কোথায় খুঁজব?’
‘তুমি এখানেই থাক। আমি আজ রাতে মেইন ট্রেইলে চুঁ মারব। ওখানে আলো আছে। আজ রাতে যদি ওর সন্ধান না পাই, কাল লোক নিয়ে খুঁজতে যাব।’
‘আপনার কী ধারণা সে হারিয়ে গেছে?’
‘ভাগ্যবান হলে হারিয়ে যাবে। তবে সাপের কামড়ও খেতে পারে।
‘সাপের কামড় খেলে কী হবে?’
‘চিকিৎসা পেলে সেরে যাবে। সাপের কামড়ে অবশ্য কম মানুষই মারা যায়। গাছের ওপর এবং ট্রেইলের রাস্তায় কিছু স্নেকবাইট কিট আছে। পোলাপান ওখান থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র নিয়ে নেয়।’ তিনি আমার দিকে ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকালেন। ‘তোমার ঘুমিয়ে পড়া ঠিক হয়নি।’
আমি জবাবে কিছু বললাম না দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি এখানে থাকবে নাকি আমার বাড়িতে যাবে?’
‘আপনার সঙ্গে যাব।’
আশ্চর্য হলেও সত্যি এ নিয়ে আর তর্ক করলেন না মি. হিউবার্ট। ‘জায়গাটা আরামপ্রদ নয়,’ বললেন তিনি। ‘তাছাড়া তোমার উঁচু বুটও লাগবে।’
কেবিনে দু’এক জোড়া হাইবুট দেখেছি। মনে হয় আমার পায়ে ঠিক লেগে যাবে। খুব ভারি রাবার।
তিনি নিজের কেবিনের দিকে পা বাড়ালেন। ‘আমি এক্ষুণি ফিরে আসছি।’
.
মি. হিউবার্ট চামড়ার হাইবুট পরেছেন। হাতে ব্যাটারি চালিত বড়সড় একটি লণ্ঠন, লাল-সাদা একটি বাক্স, এবং সাপ ধরার একটি লাঠি। এরকম একটি লাঠিই জেমসকে নিয়ে যেতে দেখেছি। বাক্সটি আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটি একটি ফার্স্ট এইড কিট। আর সবসময় আমার কাছ থেকে অন্তত একগজ দূরে থাকবে।’
আমরা দ্রুত ঢুকে পড়লাম অন্ধকার জঙ্গলে। লণ্ঠনটি জোরালো নীলচে আলো ছড়াচ্ছে। চওড়া ট্রেইলটি প্রথমে আমার কাছে চেনা চেনা লাগল। তবে ক্রমেই ওটি খাড়া এবং সরু হয়ে উঠল। শেষে ট্রেইলে কোন মানুষের পদচিহ্নই দেখতে পেলাম না। দেখে মনে হয় না এদিকে কেউ কখনো এসেছে।
মি. হিউবার্ট লণ্ঠনটি ওপরের দিকে কাত করে ধরলেন, গাছের সঙ্গে আটকানো ধাতব, চকচকে ট্যাগ খুলে নিতে লাগলেন। হাইবুট পরে হাঁটতে অভ্যস্ত নই বলে প্রায়ই হোঁচট খেয়ে পড়ছি আমি, ঝোপঝাড় এবং গাছের ডালের বাড়ি লেগে ছিলে গেল মুখের চামড়া। চোখ বাঁচাতে মাথার সামনে ঢালের মত তুলে ধরলাম হাত। আমার চারপাশে গুঞ্জন তুলছে নানা পোকা মাকড়। ঘাড়ে চাপড় মেরে একটা মশার দফারফা করলাম। টকটকে লাল রক্তে ভরে গেল হাত।
একটা পাহাড়ের ধারে, খোলা একটি জায়গায় অকস্মাৎ হাজির হলাম আমরা। পুরোপুরি নেমেছে আঁধার, আমাদের বহু নিচে থেকে লেকের জলের শব্দ শুনতে পেলাম। ঢেউ ভাঙছে পাথরের গায়ে। তারই শব্দ। মি. হিউবার্ট বসে পড়লেন। নিভিয়ে দিলেন লণ্ঠন।
‘ও কি এদিক থেকে এসেছে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘কেউ এসেছে। আমার মনে হয় ও ট্রেইল ছেড়ে এগোচ্ছিল। আমরা বোধহয় ওকে ছেড়ে এসেছি।
আমরা কিছুক্ষণ বসে রইলাম চুপচাপ। তারপর মি. হিউবার্ট আবার জ্বেলে দিলেন লণ্ঠন। ‘কোন অস্বাভাবিক শব্দ শুনতে পেলে?’
আমি কান খাড়া করলাম। কিন্তু জলের ছলাৎছল, বাতাসের সাঁই সাঁই আর লেক ধরে যেতে থাকা মোটর বোটের ইঞ্জিনের অস্পষ্ট ধকধক ছাড়া আর কোন আওয়াজ শুনতে পেলাম না। এরপর আরেকটি শব্দ শুনতে পেলাম। ক্ষীণতর শব্দ।
‘হ্যাঁ,’ বললাম আমি। ‘কীসের শব্দ ওটা?’
বেড়াল। পোষা বেড়াল, সম্ভবত।’
উঠে দাঁড়ালেন তিনি, শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে চললেন। আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়ে। শব্দের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই ছোট, খোলা ঘরটিতে বসে যে হাহাকারের আওয়াজ শুনেছিলাম, এ শব্দটা অবিকল সেরকম। আমি নিশ্চিত মি. খামচানির গলার আওয়াজ এটা।
আমরা এখনো ট্রেইল ধরেই এগিয়ে চলেছি, অনুমান করলাম পাহাড়চুড়োর কাছাকাছি এসে পড়েছি। পাহাড়টি তেমন বড় না হলেও আমি ওপরে উঠতে উঠতে হাঁপিয়ে গেলাম। ঘামে ভিজে গেছে পরিচ্ছদ।
দাঁড়িয়ে পড়লেন মি. হিউবার্ট। সামনে তুলে ধরলেন আলো। একজোড়া উজ্জ্বল হলুদ সবুজ চোখ এক মুহূর্তের জন্য ঝিঁকিয়ে উঠেই অদৃশ্য হয়ে গেল। আলোর বৃত্তের মাঝে লালচে লোমের একটা ঝলক দেখলাম। তারপর আরেকটি জিনিস চোখে পড়ল। একটা পাথর খণ্ডের আড়াল থেকে বেরিয়ে আছে একটি হাত।
আমরা মন্থর গতিতে আগ বাড়লাম, উঁচু ভূমিতে পৌঁছানোর পরে পরিষ্কার দেখতে পেলাম হাতের মালিককে। ফুলে ঢোল হয়ে গেছে মুখ, ভীষণ বিকৃত চেহারা। ওটা জেমস। পড়ে আছে নিষ্প্রাণ।
তার চোখ খোলা, মুখটা কেমন বেঁকে আছে, যেন কাঁদছিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল ডুবন্ত একজন মানুষ, ডুবে মরার হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে, হাত বাড়িয়ে যেন শেষবারের মত বাতাসের স্পর্শ নিতে চাইছে। ওর সঙ্গে দেখা অপেরার কথা মনে পড়ে গেল। লণ্ঠনের আলো পড়েছে ওর মুখের ওপর, জেমসকে লাগছে স্পটলাইটের আলো পড়া ডন গিয়োভান্নির মত, যাকে পাতালপুরীতে তার অমোঘ মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
সামনে বাড়লেন মি. হিউবার্ট। আমি মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালাম। তাঁর ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছি। আমার হাতে ঝুলছে ফার্স্ট এইড কিট কিন্তু জানি এ ওষুধের আর প্রয়োজন হবে না। কানে ভেসে এল মি. হিউবার্ট লাশটাকে টেনে আনার চেষ্টা করছেন। দশ মিনিট বাদে তিনি ফিরে এসে আমার পাশে দাঁড়ালেন।
‘এখন ফিরে যাওয়াই ভাল। কাল সকালে লাশ বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোক নিয়ে আসব।’
আমরা পাহাড় বেয়ে নামতে লাগলাম। ফেরার পথে কেউ একটি কথাও বললাম না। হয়তো আমাদের মাথার ওপরে তখন কৌতূহলী নিশাচর প্রাণীরা জেমসের শীতল, ফুলে ওঠা দেহের গন্ধ শুঁকছে।
.
ঊনত্রিশ
বিকেলে স্বামীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় একটুও কাঁদেনি ক্যাথেরিন, তবে সেদিন রাতে যখন সে, কিথ এবং আমি কোয়েন্টিস স্লিপের ডাইনিংরুমে বসে আছি, মিস বার্টনের খালি চেয়ারের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। গাল গড়িয়ে অশ্রু পড়তে লাগল খাবারের ওপর।
আমি আর জেমস যখন লেকে গেছি, ওই সময় মিস বার্টন তার জরাজীর্ণ সুটকেস গুছিয়ে নিয়ে চলে গেছে বাড়ি থেকে। কোথায় গেছে কাউকে বলে যায়নি। গেছে ভালই হয়েছে। মহিলার অনধিকার চর্চার কবল থেকে রক্ষা পেয়েছি। ক্যাথেরিন এখন হা-হুতাশ করলেও শীঘ্রি আবিষ্কার করবে মিস বার্টনের মধ্যে যেসব চিত্তাকর্ষক জিনিস দেখেছিল তা আমার মধ্যেও আছে। আমাকে আবিষ্কার করার সুযোগ ক্যাথেরিনকে আমি দেব।
রাতগুলো বেশ উত্তেজক ছিল। আমি ফ্রান্সিসের সঙ্গে সময় কাটাতে পারছি। ওর সঙ্গে আমার জীবন নিয়ে কথা বলি না। ওর এবং ওর অনুসারীদের জীবন নিয়ে আলোচনা করি। প্রতিরাতে ফ্রান্সিস আমার কাছে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। ও কথা বলার সময় আমি আয়নায় হাত বুলাই। যেন ফ্রান্সিসের স্পর্শ পাই আঙুলে।
মি. হ্যামিলটন এখন প্রায়ই আমাদের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেন। তিনি আমাদের ব্যাপারে আগ্রহী হলেও আমাদেরকে ঠিক ভালবাসেন না, এ কথাটি বেশ বুঝতে পারি। সন্দেহ জাগে আদৌ তিনি কাউকে কোনদিন ভালবেসেছেন কিনা। অবশ্য এ কারণেই লোকটিকে আমি পছন্দ করি বেশি। তিনি ব্যক্তির চেয়ে বস্তুকেই বেশি ভালবাসেন। এতে দোষের কিছু নেই।
কিথ তার সাপগুলো বিক্রি করে দিয়েছে। সম্ভবত তার বাবা সাপের কামড়ে মারা গেছে জেনেই। ওর চাওয়াগুলো দিন দিন জটিলতর হয়ে উঠছে। সেদিন আমাকে অনুরোধ করল গোসল করার সময় আমি বাথরুমের দরজা যেন ভেজিয়ে রাখি। আমাকে গোসলরত অবস্থায় দেখার খুব শখ তার। সে এখন ডন গিওভান্নির সুর গুনগুন করে গায়। তার সরু, ভাঙা কণ্ঠস্বর প্রতি সপ্তাহেই ভারি হয়ে উঠছে।
আমি জন ডিকসন এবং তার প্রায় আসবাববিহীন অ্যাপার্টমেন্টের কথা মাঝে মাঝে ভাবি। চিন্তা করি কোয়েন্টিস স্লিপের জাঁকজমকপূর্ণ বাড়িতে খাওয়ার ইচ্ছে তার হবে কিনা।
তবে জেমসের কথা খুব একটা ভাবি না।
ঠিক জানি না কবে থেকে আমি স্বপ্নটি দেখতে শুরু করেছি। তবে স্বপ্নটি আমাকে তেমন বিচলিত করে না কারণ এরকম স্বপ্ন আমি বহু দেখেছি। ছেলেবেলায় ঘুম থেকে জেগে রাতে কী স্বপ্ন দেখেছি তা নিয়ে ভাবতে খুব ভাল লাগত।
নতুন স্বপ্নটি সবসময় একই রকমের। দেখি আমি নিতান্তই একটি শিশু: খুদে, নগ্ন, সেক্সলেস, আড়ষ্ট, পুরনো আমলের পুতুলের মত। আমি কালো একটি ঝোপের ওপর শুয়ে আছি। আমার চোখ এবং মাথা নাড়াতে পারছি না, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি মাথার ওপরের আকাশের দিকে। স্বচ্ছ তবে ভারি আকাশ।
আমি একটা কর্কশ শব্দ শুনতে পাই, জানোয়ারের মত কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে, আমার ঝোপের পাশে খসখস আওয়াজ। ধীরে ধীরে আমার সামনে ফুটে ওঠে দুটো মাথা। সরীসৃপ একটি শরীরের সঙ্গে জোড়া লাগানো মাথাদুটি ফ্রান্সিস এবং মিস বার্টনের।
প্রাণীটা আমার দুই পা ফাঁক করে ফেলে, মাথাদুটো নিচের দিকে নামতে থাকে, মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে শুকনো, নির্জীব জিভ। জিভজোড়া চাটতে শুরু করে আমার দেহ, ফোঁসফোঁস শব্দে আমার শরীরে ঘষতে থাকে। জিভজোড়ার ছন্দবদ্ধ নড়াচড়ায় আমার শরীর কেমন ছোট হতে থাকে, যেন ইস্পাতের দাঁতের নিচে পড়ে কেটে টুকরো হয়ে যাচ্ছে শক্ত পনির।
আমার হাত-পা সব কেটে ছোট হতে হতে শেষে আমি একেবারেই সঙ্কুচিত হয়ে যাই, আমি যেন শূন্যে মিলিয়ে যাই, নামে অন্ধকার। সে অন্ধকার প্রাণীটার চারটে জ্বলজ্বলে চোখ গ্রাস করে ফেলে।
আমি এ স্বপ্নের কথা কাউকে, এমনকী ফ্রান্সিসকেও বলিনি। এ স্বপ্নের মানে কী আমি জানি না। এর কোন অর্থ না-ও থাকতে পারে কারণ স্বপ্ন স্বপ্নচারীদের জন্য কোন অর্থ বয়ে আনে না। অন্যরাই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেয় এবং তাতে অর্থ খুঁজে পায়।
তবে চেহারাদুটো আমাকে বিচলিত করে তুলছিল। প্রতিরাতেই এদের আবির্ভাব ঘটে, এমনকী দিনের বেলা আমি যখন চুপচাপ বসে থাকি, হাঁপানোর শব্দ শুনি, কানে ভেসে আসে খসখস আওয়াজ। মিস বার্টনের অনুপস্থিতি নিয়ে যদিও আমি মোটেও ভাবিত নই তবু মাঝে মাঝে মনে পড়ে সে থাকাকালীন আমার সকাল এবং দুপুরগুলো কী দ্রুত কেটে যেত।
সন্ধ্যার পরের সময়টা এখন আমার সবচেয়ে প্রিয়। ডিনারের পরপরই সরাসরি আমি নিজের ঘরে চলে যাই ফ্রান্সিসের সঙ্গে কথা বলতে। আমার ঘুমের মাত্রা ক্রমে কমে আসছে। আমি আয়না এবং ফ্রান্সিসের সামনে বসে থাকি। বসে থাকতে থাকতে অজ্ঞান হয়ে যাই এবং তখন ওই স্বপ্নটা দেখি। স্বপ্ন দেখার পরে আমি কয়েক মিনিটের জন্য চোখ মেলে তাকাই। তারপর আবার স্বপ্নটা শুরু হয়ে যায়।
একরাতে স্বপ্ন দেখার পরে জেগে উঠলে আমার জীবনটা বদলে যায়।
আমি চোখ মেলে আবছা আলোয় দেখতে পেলাম ড্রেসারের সামনে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। মনে হলো ফ্রান্সিস। আমার শরীরে আনন্দময় উত্তেজনার ঢেউ বইতে লাগল। অবশেষে কি সে আয়না থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছে?
খুশিতে আমি আত্মহারা। কিন্তু মূর্তিটির কাছে গিয়ে দেখি ওটি ফ্রান্সিস নয়। মিস বার্টন। লকেটটি হাতে ধরে আছে-যে লকেট দিয়ে সে আমার শক্তি খর্ব করত। লকেটটির মধ্যে এখনো আমার চুল। আমি জানি ওকে আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে দেয়া মোটেই উচিত হবে না। কিন্তু আমার শরীর অসাড় হয়ে গিয়েছিল। আমি নড়াচড়া করতেই পারছিলাম না। সে আমার দিকে ক্ষণিকের জন্য তাকাল। চাউনিতে সহানুভূতি এবং বিতৃষ্ণা। তারপর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
কয়েক মুহূর্ত পরে আমার শরীরের অসাড় ভাবটা চলে গেল। বুঝতে পারছিলাম ওই লকেট উদ্ধার করতে না পারলে আমি আমার উত্তরাধিকার থেকে চিরকালের জন্য বঞ্চিত হব। হয়তো ফ্রান্সিসের সঙ্গে আর কোনদিন দেখাও হবে না। আমি আয়নার কাছে গেলাম। ফ্রান্সিস ওখানে নেই।
আমি দৌড়ে চলে গেলাম হলওয়েতে।
‘মিস বার্টন? অ্যান? ফিরে এসো…প্লিজ, ফিরে এসো।’ আমি উন্মাদের মত চিৎকার করতে লাগলাম।
আমি মিস বার্টনের পুরনো ঘরে ঢুকে জ্বেলে দিলাম আলো। ঘর খালি। শীতল। আমি ঘরের আয়নার দিকে তাকালাম। শুধু নিজের অশ্রুসিক্ত চেহারা ছাড়া আর কাউকে দেখতে পেলাম না।
‘ফ্রান্সিস? আমাকে ছেড়ে চলে যেয়ো না।’
আমি মিস বার্টনের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে একছুটে চলে এলাম চিলেকোঠায়। এ ঘর পুরনো, ভারি আসবাবে বোঝাই। ডাস্ট কাভার টেনে সরিয়ে উঁকি দিলাম আসবাবের কোনাকাঞ্চিতে মিস বার্টন লুকিয়ে আছে কিনা দেখতে। আমার চারপাশে ধুলোর মেঘ উড়তে লাগল। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। ধুলোর চোটে চোখেও কিছু দেখতে পাচ্ছি না। পুরনো আয়নাটি আমার সামনে জ্বলজ্বল করে উঠল। ওদিকে তাকাতেই এক ভয়ঙ্কর চিৎকার শুনতে পেলাম। পরক্ষণে আয়নার কাচ ফেটে চৌচির হয়ে গেল।
.
আমি ধুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, পায়ের কাছে পড়ে আছে ভাঙা কাচের টুকরো। ওতে প্রতিফলিত হচ্ছে চিলেকোঠার সিলিং বিম, একটি চেয়ারের অনুজ্জ্বল ট্যাপেস্ট্রি কাভার, আমার নাইটগাউনের ভাঁজ ইত্যাদি।
আয়নার বড় একটি টুকরোয় একটা নড়াচড়া চোখে পড়ল। ওখানে ফুটে উঠল একটি মুখ। ক্যাথেরিন। ‘এলিজাবেথ,’ বলল সে, ‘কী হয়েছে?’
আমি দরজার দিকে ফিরলাম। ওখানে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাথেরিন। ভয়ে ফ্যাকাসে মুখ। কোন বেগতিক দেখলেই ছুট দেবে।
‘তুমি মিস বার্টনকে দেখেছ?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘না তো! ও কি এখানে এসেছিল?’
আমি দরজায় পা বাড়ালাম। এক কদম পিছিয়ে গেল ক্যাথেরিন। ‘আমি ঘর সার্চ করে দেখছি,’ বলল সে।
আমি জানি ও কিছুই পাবে না। ওকে অগ্রাহ্য করে নিজের ঘরে চলে এলাম। দরজা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলাম আয়নার সামনে। গাউন খুলে ফেলে দিলাম মেঝেতে। ড্রেসারের ওপর ঝুঁকে ভারি আয়নাটি দেয়ালের হুক থেকে খসিয়ে আনলাম, সাবধানে নিয়ে এলাম বিছানায়। ওটার পাশে শুয়ে পড়লাম আমি। আমার ভেজা গাল থেকে গড়িয়ে পড়া জল কাচে মেখে গেল, ওটার শীতল পরশ অনুভব করতে লাগলাম আমার নগ্ন দেহে। ‘ফ্রান্সিস,’ ফিসফিসিয়ে বললাম আমি।
.
কিছুক্ষণ পরে ক্যাথেরিন দরজায় নক করে আমার নাম ধরে ডাকল। আমি জবাব দিলাম না। পরদিনও দোর খুললাম না। অবশেষে শুনতে পেলাম সে বলছে, ‘এলিজাবেথ, একজন ডাক্তার এসেছেন তোমাকে দেখতে।’
.
বেডরুমের দরজার তালায় ধাতব কিছু ঘষার শব্দ শুনলাম। ওরা তালা খুলে বা ভেঙে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করছে। আমি আয়নাটি আমার শরীরের সঙ্গে চেপে ধরলাম।
.
