ভূতের উকিল – অনীশ দাস অপু
ভূতের উকিল
ভোঁতা রিঙের শব্দ শুনেই কামবারটন বুঝতে পারলেন দুটো টেলিফোনের কোটি তাঁকে তুলতে হবে। তবু ইতস্তত করছেন তিনি। এই গোপন ফোন নম্বরে এত রাতে কে তাঁকে ফোন করল?
তাঁর মাত্র ছয়জন আণ্ডারওয়ার্ল্ড মক্কেল এ নম্বরটি জানে। এ ভদ্রলোকদের দু’জন এদেশে নেই, দু’জন আছে ইউরোপে, আরেকজন কারাগারে। ষষ্ঠজন বার্ক হটিন। কিন্তু-বার্ক হটিন মারা গেছে।
আবার বাজল ফোন। কামবারটন তাঁর মোটা হাতখানা বাড়িয়ে দিয়ে তুলে নিলেন রিসিভার। কানে লাগালেন। তবে বললেন না কিছুই। এ নম্বরের লাইনে তিনি কখনো আগে কথা বলেন না। নম্বরটি যে জানে সে নিশ্চয়ই এও জানে আগে কোড ওয়ার্ডটি বলতে হবে, তারপর সাড়া দেবে কামবারটন।
শব্দটি উচ্চারণ করা হলো: ‘রেফারেন্স রুম।’ গলার স্বর নিচু এবং অপরিচিত।
‘কে আপনি?’· রুক্ষ, ঘষা গলায় বলে উঠলেন কামবারটন। তাঁর গোলাকার, পাণ্ডুর বদনখানা নির্বিকার, চর্বিঘেরা কুঁতকুঁতে চোখে জমে আছে রাজ্যের সন্দেহ।
‘হটিনের এক বন্ধু,’ অচেনা লোকটি জবাব দিল ফিসফিসে সুরে। ‘সে আমাকে এ নম্বরটি দিয়েছে। বলেছে কোন বিপদে পড়লে আপনাকে যেন ফোন করি।’
‘কী নাম আপনার?’
‘স্মিথ। জন স্মি—’
‘এ নামের কাউকে আমি চিনি না,’ বললেন কামবারটন।
“দাঁড়ান, দাঁড়ান। আমাকে দেখলেই চিনতে পারবেন।’
‘আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে কেন?’
‘কারণ আইনী পরামর্শের জন্য আমি প্রচুর পয়সা দিতে প্রস্তুত। আপনি কি একা আছেন?’
‘আছি।’ কামবারটন উদাস গলায় জবাব দিলেন। যদিও তাঁর শুয়োরের মত চোখে ফুটে ওঠা লোভ প্রকাশ পেল না কণ্ঠস্বরে। ‘আমার ডেরা চেনেন?’
‘চিনি। হটিন আপনার সম্পর্কে সব বলেছে। আমি দশ মিনিটের মধ্যে আসছি।’
ক্রিমিনাল ল-ইয়ার হোরেস এল. কামবারটন ফোন নামিয়ে রেখে হেলান দিলেন চেয়ারে। মনোযোগ ফেরালেন খবরের কাগজে। ফোন বেজে ওঠার আগে কাগজ পড়ছিলেন তিনি। কাগজে লিখেছে আজ সকালে শিকাগোর শহরতলী উইলো রিজের ফার্স্ট ইণ্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাঙ্কে ডাকাতি করতে গিয়ে বার্ক হটিন এবং তার দুই সঙ্গী পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছে। হটিনের লাশ সনাক্ত করেছে পুলিশ। অপর দু’জন স্রেফ সাধারণ ভাড়াটে গুণ্ডা বলে তাদের ধারণা। তবে এ দু’জনের নাম-পরিচয় এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি।
খবরটি পড়ে কামবারটনের একটু খারাপ লাগল শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দিকটির কথা চিন্তা করে। হটিন তার শাঁসালো একজন মক্কেল ছিল, ভালই টাকা-পয়সা দিত। যদিও গত এক বছর ধরে হটিন তাঁর কাছ থেকে কোন আইনী পরামর্শ নেয়নি, তবু কামবারটনের একটা বাঁধা মাসোহারা পাঠিয়ে দিতে ভুল করেনি।
হয়তো, ভাবছেন আইনজীবীটি, এইমাত্র ফোন করল যে লোকটি, সে মৃত মানুষটার জায়গা দখল করতেও পারে। টাকা-পয়সা আয়ের একটা সূত্র হয়ে উঠতে পারে আগন্তুক। তবে একে যেহেতু চেনেন না কামবারটন, কাজেই সাবধানের মার নেই ভেবে তাঁর প্রস্তুত থাকা উচিত।
.
লাইব্রেরি টেবিল থেকে গুলি ভরা একটি রিভলভার বের করে তিনি ডান কোটের পকেটে রাখলেন। তারপর শোবার ঘরে গিয়ে ব্যুরোর টপ ড্রয়ারটি খুললেন। ওখান থেকে আরেকটি গুলি ভরা রিভলভার নিয়ে বাম কোটের পকেটে ঢোকালেন।
.
ক্লার্ক স্ট্রিটের পুবে, ডাইভারসে পার্কওয়ের আকাশছোঁয়া আভর আর্মস হোটেলের দুই কক্ষ বিশিষ্ট রুমে তিনি অধৈর্য ভঙ্গিতে হাঁটাহাঁটি করতে লাগলেন। এ হোটেলে যতরাজ্যের মতলববাজ উকিল, বেআইনী কারবারী এবং ধোপদুরস্ত পোশাকে সজ্জিত গুণ্ডাপাণ্ডাদের বাস। এমনিতে এ ধরনের পরিবেশে তিনি বেশ স্বচ্ছন্দবোধই করেন, তবে আজ রাতে কেন জানি তাঁর অস্বস্তি হচ্ছে। এর আগে কখনো তাঁর মনে এভাবে কুডাক ডাকেনি। তিনি তাঁর নিশাচর অতিথির জন্য অপেক্ষা করছেন, তবে মনে আশঙ্কা জাগছে কিছু একটা ভজকট হতে চলেছে।
নিজে গিয়ে দরজা খুলে আগন্তুকের কয়েক ইঞ্চি সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে তিনি দরজার ছিটকিনি নামিয়ে খাড়া পিঠের চেয়ারটিতে গিয়ে বসলেন প্রবেশপথের মুখোমুখি হয়ে। তাঁর দুটি হাতই পকেটে ঢোকানো, চেপে ধরে আছেন আগ্নেয়াস্ত্র।
‘এখন,’ মনে-মনে বললেন তিনি, ‘তোমার চেহারাসুরত যদি আমার পছন্দ না হয়, মি. স্মিথ, সে তুমি যে-ই হও না কেন, তোমাকে চলে যেতে বাধ্য করব। হোরেসের চেয়ে কেউ দ্রুত অস্ত্র চালাতে পারে না।’
.
দরজায় টোকা মারার শব্দটি হলো অত্যন্ত আস্তে, প্ৰায় নিঃশব্দে। তবে সাড়া মিলল সজোরে।
‘ভেতরে আসুন!’ হাঁক ছাড়লেন কামবারটন।
নীরবে খুলে গেল দরজা। টাইট জ্যাকেট পরা চওড়া কাঁধের, পেশীবহুল শরীরের লোকটি ঘরে ঢুকে বন্ধ করে দিল কপাট। তার ডান হাতখানা পকেটে ঢোকানো থাকল যেন সে নিজেও বহন করছে অস্ত্র। অপর হাতে সামার ফেল্ট হ্যাটের কিনারা স্পর্শ করল।
‘ডারনাক!’ চেঁচিয়ে উঠলেন কামবারটন। এক লাফে উঠে দাঁড়িয়েছেন। এ লোককে চিনতে না পারার প্রশ্নই নেই। প্রায় প্রতিটি দৈনিকের পাতায় ছাপা হয়েছে এর ছবি। এর পুরো নাম অ্যান্টন (টনি) ডারনাক, আমেরিকার এক নম্বর গণশত্রু হিসেবে সে পরিচিত।
‘তাহলে চিনতে পেরেছেন আমাকে, ঘোঁতঘোঁত করল আগন্তুক। ‘এবং আপনি জানেন আমার চামড়ার মূল্য ধরা হয়েছে পঁচিশ হাজার ডলার। তবে-’ তার পকেটে ঢোকানো হাতটি সামান্য নড়ে উঠল-’ভাববেন না যে আপনি টাকাটা সংগ্রহ করতে পারবেন। তাছাড়া আমি টাকার অঙ্কটা দ্বিগুণ করে দিতে পারি-যদি আপনি আমার পক্ষ হয়ে কাজ করেন।’
কামবারটনের মোটা, লোভী মুখখানা ভেংচি কাটল যেটিকে তিনি আন্তরিক হাসি বলে বিবেচনা করেন। ‘এসো, বন্ধু হই।’ বলে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
হাতুড়ির মত মুঠোয় আইনজীবীর মোটা-মোটা আঙুলগুলো চেপে ধরে ঠোঁটের কিনারায় মৃদু হাসি ফোটাল ডারনাক। ‘ঠিক আছে। এখন থেকে আপনি আমার মুখপাত্র এবং আশা করি দায়িত্বটি ভালভাবেই পালন করবেন। সেটাই আমার দরকার।’
‘তোমার নিশ্চয়ই তেষ্টা পেয়েছে। এসো, ড্রিঙ্ক করো, মাই বয়।’
দু’জনে মুখোমুখি বসে কথা বলতে লাগলেন। আসলে কথা বলল ডারনাক, চুপচাপ শুনে গেলেন কামবারটন এবং অতিথিকে ম্যাগাজিন টেবিলের ওপর রাখা হুইস্কির বোতল থেকে মদ ঢেলে দিতে-দিতে লক্ষ করতে লাগলেন। সেই সঙ্গে সহানুভূতির ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে গেলেন।
ডারনাক তার বোঝা হালকা করতে আইনজীবীকে অকপটে সব কথা বলতে লাগল। খুব কঠিন স্বভাবের মানুষ বলে খ্যাতি থাকলেও এ মুহূর্তে তাকে বেশ ভয়ার্ত লাগছিল। মনের শান্তি বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার মত অনেক কুকাজ সে করেছে। সারাক্ষণ পিস্তল আর বন্দুকের মাঝে যার বাস সে নিজেই আগ্নেয়াস্ত্রের কারণে মৃত্যুভয়ে ভীত। সবাই তার বিরুদ্ধে চলে গেছে। সে গ্লাসে আরেকটি ড্রিঙ্ক ঢেলে নিয়ে বলল:
‘মাস ছয় আগে মিনিয়াপলিসে হটিনের সঙ্গে আমার পরিচয়। সে আমার দলে যোগ দিয়েছিল এবং আমরা একসঙ্গে অনেক কাজ করেছি। সেন্ট লুই-এ ডাকাতি করেছি। তবে শেষের কাজটিতে ঝামেলা হয়ে যায়। আমার দলের তিনজন মারা যায়।
‘আমি ঘটনাটি কাগজে পড়েছি,’ মন্তব্য করলেন কামবারটন। ‘তবে জানতাম না হটিন ওটার সঙ্গে জড়িত ছিল-কিংবা তুমি।’
‘এখন পর্যন্ত কেউ ব্যাপারটা জানে না। আজ সকালে হটিনসহ দু’জন মারা গেছে। দস্যু সর্দার ঠোঁট ভেজাল জিভ দিয়ে। ‘আমিও প্রায় ধরা পড়তে যাচ্ছিলাম-তবে সতর্কতার কারণে বেঁচে গেছি। তাছাড়া, এক লাখ ডলার নিয়ে কেটে পড়ার সুযোগ পেলে ভাগব না কেন? এর মধ্যে হটিনেরও ভাগ ছিল। কিন্তু সে মারা গেছে এবং দলের বাকিরা, যারা মারা যায়নি, তারা জেলে। কাজেই এ টাকার ভাগ আমার আর কাউকে দিতে হচ্ছে না-শুধু আপনি ছাড়া। আমাকে দেশ ত্যাগে সাহায্য করতে আপনাকে কত দিতে হবে?’
.
শূকরতুল্য চোখ দুটো সরু করে অতিথির দিকে তাকালেন কামবারটন। সত্যি এ ডাকাতটা এত টাকা ডাকাতি করেছে? নিজের চামড়া বাঁচাতে সে ওই টাকার তিন ভাগের এক ভাগ সত্যি খরচ করবে? আইনজীবীর দৃঢ় ধারণা দুটি প্রশ্নের জবাবই হবে ইতিবাচক।
‘কাজটা কঠিন হবে,’ বললেন তিনি। ‘তুমি যে মহিলাকে ছ্যাঁকা দিয়ে চলে গিয়েছিলে, সে তোমার ছবি পুলিশকে দিয়েছে এবং তোমার সেই খোমা হামেশাই পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে এবং তোমাকে এখন লোকে বেবি রুথের মতই চেনে। প্রতিটি পুলিশ চিফের অফিসে তোমার চেহারার বর্ণনা দেয়া আছে, প্রতিটি গোয়েন্দা অফিস এবং ডাকঘরে তোমার ছবি ঝুলছে।’
‘জানি আমি। এমনকী আমার মত দেখতে লোকজন ও গ্রেপ্তার হয়ে যাচ্ছে, গুলি খাচ্ছে!’ চেঁচিয়ে উঠল ডারনাক। ‘কিন্তু আমার পালাবার সুযোগ আছে কি নেই?’
‘আছে,’ বললেন কামবারটন, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করছেন তাঁর মক্কেলকে। ‘কিন্তু বললামই তো কাজটা কঠিন-এবং ব্যয়বহুল। বেশ খরচা হবে তোমার। সবার আগে আমার একজনকে ভাড়া করতে হবে যে তোমার সুপরিচিত চেহারাটির ওপর ছুরি-কাঁচি চালাবে। প্লাস্টিক সার্জারির পরে যে রাস্তা দিয়ে তোমায় পাঠাব সেজন্যও আলাদা খরচ রয়েছে–’
‘দুত্তোর!’ চেঁচাল ডারনাক। ‘আপনি ভাবছেন আমি বোধহয় খরচ দিতে পারব না-এই রাখুন টোকেন মানি হিসেবে পঁচিশ হাজার ডলার।’ সে ব্রেস্ট পকেটে হাত ঢুকিয়ে নোটের একটি তাড়া বের করে উকিলের কোলে ছুঁড়ে মারল। ‘আর মনে রাখবেন আরও একশ’ হাজার ডলারেরও বেশি আছে আমার কাছে।-এখান থেকে কয়েক ব্লক দূরে আইডিয়াল শূ রিপেয়ার শপ-এর মেঝের নিচে টাকাটা রাখা আছে।’ বলেই থতমত খেয়ে গেল সে। আরেক ঢোক হুইস্কি গিলে নিয়ে গমগম করে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি আইডিয়াল শূ রিপেয়ার শপের মালিক। বুড়ো মুচিটাকে সবাই মালিক ভাবলেও আসলে ও আমার কর্মচারী মাত্র। সে জেলখানায় বসে জুতো সেলাইয়ের কাজ শিখেছে।’
‘সে কি জানে টাকাটা ওখানে আছে?’
‘হা-হা! প্রশ্নই ওঠে না! বুড়ো ফ্রেড মিলার ভোঁতা বুদ্ধির লোক। সে আমার কাজের গুরুত্বপূর্ণ কোন ব্যাপারেই খোঁজখবর রাখে না। শুধু জানে মাঝেমধ্যে আমি হটিন আর -ছেলেদের সঙ্গে দোকানের পেছনের ঘরে বসে ব্যবসায়িক আলাপ করি। ওই সময় মিলারকে আমি মদের দোকানে পাঠিয়ে দিতাম মদ খেতে। বাকি সময়টা সে ওখানেই ঘুমায়। আজ রাতে অবশ্য ওকে বাইরে যেতে বলেছি। ভেবেছি আপনি আর আমি দোকানে বসে মিটিং করব।’
ক্রিমিনাল ল-ইয়ারের লোভী চোখ নোটের তাড়া ছুঁয়ে চলে গেল ডারনাকের দিকে। ঝড়ো গতিতে চিন্তা করছেন। তাঁর মক্কেলকে আমেরিকা থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কতটুকু যদি কোথাও কোন ঝামেলা হয়ে যায়? ধরা খেলে বার অ্যাসোসিয়েশন থেকে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হয়ে যেতে পারে, তিনি আর ওকালতি করতে পারবেন না। আর জেলে যাওয়ার সম্ভাবনা তো রয়েইছে। সমস্যার কথা ভেবে তাঁর গোল, নির্বিকার চেহারায় ভাঁজ পড়ল।
তবে বিদ্যুদ্গতিতে এর সমাধানও তাঁর মাথায় চলে এল। তিনি আড়চোখে ডারনাককে দেখলেন। তাঁর চাউনিতে এমন অশুভ কিছু ছিল যে রীতিমত চমকে গিয়ে ডারনাক তার আগ্নেয়াস্ত্রের জন্য পকেটে হাত ঢোকাল। কিন্তু আইনজীবীটি, বেঢপ মোটা এবং থলথলে হওয়া সত্ত্বেও, অবিশ্বাস্য দ্রুত তাঁর গতি, অপরজন লক্ষ্য স্থির করার আগেই পকেট থেকে অস্ত্র বের করে টিপে দিলেন ট্রিগার।
এক নম্বর গণশত্রুটি কপালের মাঝখানে বুলেট নিয়ে গড়িয়ে পড়ল চেয়ার থেকে।
বাতাসে বারুদের গন্ধ, তৃপ্তির সঙ্গে গভীর শ্বাস নিলেন কামবারটন, সন্তুষ্ট চোখে দেখছেন তাঁর ভিক্টিমের প্রাণহীন দেহ পড়ে রয়েছে মেঝেতে, হাতে অস্ত্র। এতে আত্মরক্ষার গল্পটিকে আরও নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা যাবে। তিনি চেয়ার ছাড়লেন, নোটের তাড়াটি দ্রুত দেয়াল আলমারিতে রেখে দিলেন, ঘরের দরজা খোলাই থাকল, হুইস্কি এবং গ্লাস সরিয়ে ফেলে হাত বাড়িয়ে তুলে নিলেন টেলিফোন-এটি হোটেলের সুইচবোর্ডের সঙ্গে সংযুক্ত।
‘পুলিশ পাঠান,’ শান্ত গলায় বললেন তিনি। ‘আমি এইমাত্র একটা চোরকে গুলি করেছি। তাকে দেখতে টনি ডারনাকের মত।’
.
পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং হোটেলের লোকজন সবাই কামবারটনের সুইটে ভিড় করল তাঁর রোমাঞ্চকর বর্ণনা শুনতে, যে তিনি হাঁটাহাঁটি করে হোটেলে ফেরার পরে কীভাবে ডারনাককে হাতেনাতে ধরে ফেলেন; সে দেয়াল আলমারি ভেঙে টাকা-পয়সা হাতানোর চেষ্টাকালে।
‘সে আমার দিকে ছুটে আসে, বুক বরাবর উঁচিয়ে ধরে পিস্তল। তবে তার আগেই আমি টিপে দিই ট্রিগার।’
‘ওকে আগে কখনো দেখেছেন?’ জিজ্ঞেস করল একজন পুলিশ সার্জেন্ট।
‘কখনো না। খবরের কাগজে শুধু ছবি দেখেছিলাম। তা থেকেই অনুমান করি সে কে।’
‘ওয়াও, মি. কামবারটন,’ বিড়বিড় করে বলল একজন সাংবাদিক। ‘আপনি পঁচিশ হাজার ডলার পুরস্কার পাবেন!
‘তা হয়তো পাব। তবে পুরস্কারের কথা আমার মাথায় ছিল না। আমি শুধু আত্মরক্ষা করতে চেয়েছি। যদিও এক বিপজ্জনক খুনের হাত থেকে সমাজকে রক্ষার জন্য আমি পুরস্কার পাবার যোগ্যতা অর্জন করতেই পারি।’
নিজের ওপর বেজায় খুশি আইনজীবীটি এরপর খবরের কাগজের জন্য অসংখ্য ছবির পোজ দিলেন। হাতে রিভলভার নিয়ে ক্যামেরায় তাকিয়ে পোজ মারলেন, দেয়াল আলমারির দিকে আঙুল নির্দেশ করা অবস্থায় ছবি তুললেন, সার্জেন্টের সঙ্গে হাত মেলানোর ফটো তোলা হলো, হোটেল ম্যানেজারের সঙ্গে হ্যাণ্ডশেকের ছবি তুললেন, ছবি তোলা হলো হোটেলের ছোকরা চাকর, আয়া সহ প্রায় সবার সঙ্গেই, শুধু তাঁর মৃত ভিক্টিম ছাড়া। ক্যামেরাম্যানরা তাঁকে অনুরোধ করেছিল দস্যু সর্দারের লাশের বুকের ওপর এক পা রেখে ব্যাঘ্র শিকারীর মত পোজ মেরে ছবি তুলতে। কিন্তু রাজি হলেন না আইনজীবী। বললেন এতে তাঁর সম্মান ভূলুণ্ঠিত হবে।
ভোর হতে তখনো ঘণ্টাখানেক বাকি, তারপর ছাড়া পেলেন কামবারটন। সবাই চলে গেলে তিনি তাড়াতাড়ি টেলিফোন ডাইরেক্টরির পাতা ওল্টাতে লাগলেন। খুঁজছেন আইডিয়াল শূ রিপেয়ার শপের ঠিকানা। পেয়েও গেলেন। ৬৯২ এলওয়েল কোর্ট। মাত্র চার ব্লক দূরে। তিনি পকেটে পোরা রিভলভারে একবার চাপড় মেরে, ব্যুরোর দেরাজ খুলে একটি ইলেকট্রিক টর্চ নিয়ে, মাথায় হ্যাট চাপিয়ে হোটেলের পেছনের সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেন রাস্তায়।
.
ক্লার্ক অ্যাণ্ড ব্রডওয়ের আলোকিত মোড় থেকে অল্প কয়েক ব্লক দূরে হলেও এলওয়েল কোর্ট কতগুলো নোংরা, ভাঙা এবং জীর্ণ কুটির নিয়ে গড়ে ওঠা একটা ঘিঞ্জি গলি। এর মধ্যে একেবারেই ভগ্নদশার দোকানটি হলো ৬৯২ নং যার সামনের দরজায় কাচের ওপর আঁকাবাঁকা হস্তাক্ষরে লেখা: ‘এখানে জুতো মেরামত করা হয়। এরকম একটি জায়গায় এক লাখ ডলার লুকিয়ে রাখা হয়েছে তা কল্পনা করাও শক্ত। তবে কামবারটন নিশ্চিত তিনি টাকাটা এখানে পাবেন। তিনি ডারনাককে দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন লোকটা স্থূলবুদ্ধির। বোকাটা এমনকী দরজায় আধুনিক এবং শক্ত কোন তালা পর্যন্ত লাগায়নি। স্কেলিটন কী দিয়ে তিনি সহজেই খুলে ফেললেন তালা!
ভেতরে ঢুকে লক্ষ করলেন দূরের রাস্তার বাতির আলো দোকানের সামনের ধুলোমাখা কাচের জানালা দিয়ে প্রবেশ করছে। ভৌতিক এবং আবছা। তবে এ আলোতেও দোকানের ভেতরের যন্ত্রপাতি, আসবাবের কাঠামো দেখা যাচ্ছিল। আলো পড়ে ঘরে ভুতুড়ে ছায়া ফেলেছে ওগুলো। তিনি সামনে পা বাড়ালেন। অন্ধকারে তাঁর থুতনি কীসের সঙ্গে যেন ধাক্কা খেল আর ওটা লাফিয়ে উঠে হিসহিস শব্দ করল। দুটো হলুদ চোখ হিংস্র আক্রোশে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকল। তিনি টর্চের আলো মারলেন বিড়ালটার গায়ে। দাঁতে দাঁত চেপে একটা গালি দিলেন। আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যেতে পিছু হঠল জন্তুটা। তিনি টর্চের আলো ঘুরিয়ে দেখলেন ঘরের চারপাশ।
দোকানের পেছন দিকে একটি দরজা আছে। কামবারটন ওদিকে একবার তাকিয়ে নিভিয়ে দিলেন টর্চ। ডারনাক বলেছিল বুড়ো মিলার দোকানের পেছনের ঘরে ঘুমায়। সে যদি ফিরে এসে থাকে? এই ভয়ে টর্চ নিভিয়েছেন তিনি। সিদ্ধান্ত নিলেন লুঠের মাল খোঁজার আগে একবার পেছনের ঘরটা দেখে নেবেন।
পা টিপে-টিপে এগোলেন তিনি। হাত রাখলেন দরজার হাতলে। ওটা ধরে নিঃশব্দে এবং ধীরে মোচড় দিতে যেতেই অদ্ভুত একটা ভয় পেয়ে বসল তাঁকে। বিষয়টি অস্বাভাবিক; তিনি বিশ্বের সবচেয়ে সাহসী মানুষটি হতে না পারেন, তাই বলে আঁধারে বিড়ালের জ্বলজ্বলে চোখ দেখে ভয় খাওয়ার মত লোক মোটেই নন। আতঙ্কের কারণ অন্য কিছু যেটি তিনি বুঝতে পারছেন না। আর এ কারণে তাঁর নিজের ওপরেই খুব রাগ হলো।
সাবধানতা অবলম্বনের গুষ্টি কিলিয়ে তিনি ধাক্কা মেরে খুলে ফেললেন দরজা। সঙ্গে-সঙ্গে হিমঠাণ্ডা একটা বাতাস তাঁকে ঝাপটা মারল। এমন কনকনে হাওয়া যে রীতিমত শীত লাগল। জুলাইয়ের এমন উত্তপ্ত রাতে এরকম বরফ শীতল বাতাসের প্রবাহ খুব একটা স্বাভাবিক বলা যাবে না। মাংসল দেহে জেগে ওঠা শিরশিরানির ভাবটি দমন করতে আইনজীবীকে নিজের সমস্ত ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করতে হলো। তারপর তিনি ঘরের দিকে তাকাতে পারলেন। এখানে আলোর পরিমাণ একটু বেশি মনে হলো। এ আলোর উৎস পাশের বাড়ির পেছনের বারান্দায় জ্বলতে থাকা বৈদ্যুতিক আলো। ওখান থেকে আলো ঢুকছে দোকানের জানালা দিয়ে।
কামবারটন নার্ভাস ভঙ্গিতে ঘরের চারপাশ জরিপ করছিলেন, তাঁর চাউনি নিবদ্ধ হলো ঘরের অন্ধকারতম কোনায় একটি বস্তুর ওপর। মনে হচ্ছে কেউ একজন শুয়ে আছে খাটিয়ায়। তাহলে বুড়ো মুচি মিলার মাতাল হয়ে ফিরে এসে এখানে ঘুম দিয়েছে। তবে কামবারটনের নাকে যে গন্ধটি ধাক্কা মারছে সেটি মদের গন্ধ নয়। কেমন চেনা গন্ধ যেটি এ ভাঙাচোরা দোকানের সঙ্গে যায় না। জোরে নাক টানলেন তিনি এবং একই সঙ্গে তাঁর হাত খামচে ধরল পকেটের রিভলভার। তিনি অর্ধশায়িত মূর্তিটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, মাঝপথে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বরফের মত জমে গেছেন। ভয়ে বিস্ফারিত চোখ।
খাটিয়ায় শোয়া মূর্তিটি উঠে বসেছে-আর ওটা কোন বুড়ো মানুষ নয়। ওখানে দেখা যাচ্ছে চওড়া কাঁধের বিশালদেহী টনি ডারনাককে। আমেরিকার এক নম্বর গণশত্রু। টনি ডারনাক, যার লাশ এ মুহূর্তে শহরের মর্গের স্ল্যাবে শোয়ানো রয়েছে, সে এখন উঠে বসছে! মুখটা দিয়ে সবুজ একটা আভা বেরুচ্ছে। তাতে তাকে আরও ভয়ঙ্কর লাগছে দেখতে। লোকটার কপালে বুলেটের গর্ত। আর এতক্ষণ কামবারটন যে গন্ধটা পাচ্ছিলেন সেটা কীসের গন্ধ এখন বুঝতে পারছেন। বারুদের গন্ধ!
তাঁর গোল মুখটা বিবর্ণ এবং ফ্যাকাসে হয়ে গেল। মাংসল, ফুলো-ফুলো অক্ষিকোটর থেকে চোখ জোড়া ঠিকরে বেরিয়ে আসার দাখিল। তিনি ঠোঁট নাড়লেন তবে কোন শব্দ বেরুল না মুখ থেকে।
‘তুমি!’ অবশেষে ব্যাঙের কর্কশ ডাক তুলল তাঁর কণ্ঠ; ‘তুমি—ডারনাক, তোমাকে আমি একবার খুন করেছি এবং আবারও করব।’
অশরীরীর দিকে পিস্তল তাক করলেন কামবারটন। বারবার গুলির আওয়াজে কুটির যেন কেঁপে-কেঁপে উঠল। গুলিগুলো মূর্তিটার শরীর ভেদ করে চলে যাচ্ছে। ওটা ধীরে সুস্থে খাটিয়া থেকে নেমে পায়ে-পায়ে এগিয়ে আসতে লাগল আইনজীবীর দিকে। গুলি করতে-করতে তিনি পিছিয়ে যেতে লাগলেন। ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করেও পারছেন না। ঘুরে দাঁড়াতে পারলেই পালিয়ে যাবেন। তাঁর চোখ আঠার মত সেঁটে আছে সামনের মূর্তিটির দিকে। তাঁকে যেন সম্মোহন করা হয়েছে, অদৃশ্য এক জোড়া হাত বেঁধে রেখেছে, পিছু হঠতে-হঠতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল। কিন্তু অশরীরী আতঙ্ক তাঁর দিকে এগিয়ে আসতেই থাকল।
.
ফোঁপাতে-ফোঁপাতে কামবারটন তাঁর অপর আগ্নেয়াস্ত্রটি বের করে সেটির গুলিও শেষ করলেন প্রেতাত্মার গায়ে। খালি হয়ে যাওয়া রিভলভারের ট্রিগারে আপনা-আপনি তাঁর আঙুল বারবার চাপ দিয়ে গেল।
পুলিশ স্কোয়াড কারের লোকজন এসে তাঁকে এ অবস্থাতেই দেখল। তিনি খালি দুটি রিভলভারের ঘোড়া টিপেই চলেছেন। গুলির শব্দে পড়শীদের ঘুম ভেঙে যায় এবং তারা পুলিশে খবর দিলে টহলদার পুলিশের গাড়ি প্রথম গুলি হওয়ার তিন মিনিটের মাথায় ৬৯২ নং দোকানে হাজির হয়।
বুড়ো ফ্রেড মিলারের প্রাণহীন লাশ নিথর পড়ে ছিল খাটিয়ায়। আইনজীবীর আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে ঝাঁঝরা দেহ। আর প্রখ্যাত ক্রিমিনাল অ্যাটর্নি হোরেস এল. কামবারটন স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিভলভারের ট্রিগার পাগলের মত টিপেই চলেছিলেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তাঁর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
বুড়ো মুচিকে হত্যার দায়ে কখনো তাঁর বিচার হবে বলে মনে হয় না। কারণ তিনি কী কাণ্ড ঘটিয়েছেন সেটাই জানেন না। পাগল ক্রিমিনালদের পাগলাগারদে তাঁর ঠাঁই হলো। তিনি নিজের প্রকোষ্ঠে হামাগুড়ি দিয়ে বসে বারবার বলতে লাগলেন ৬৯২ নং দোকানের পেছনের ঘরে সেদিন তিনি আর ডারনাক ছাড়া কেউ ছিল না।
মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া আইনজীবীর সঙ্গে খুব কম মানুষকেই দেখা করতে দেয়া হলো। অবশ্য যারা দেখা করতে গিয়েছিল, জেল কর্তৃপক্ষের মতে,
মতে, তারা কামবারটনের চেহারায় নগ্ন আতঙ্ক এমন বীভৎসভাবে ফুটে উঠতে দেখেছে যে দ্বিতীয়বার ওদিকে আর তাকানোর সাহস পায়নি। তিনি একটু পরপরই কী যেন দেখে চমকে ওঠেন। ভয়ে আর্তনাদ করেন। তাঁর মস্তিষ্কবিকৃতি এমনই ঘটেছে যে কৃত অপরাধকর্মের জন্য তাঁকে হয়তো কোন শাস্তিই দেয়া হবে না। বাকি জীবনটা হোরেস এল. কামবারটনকে পাগলাগারদেই কাটাতে হবে।
