লুলু – অনীশ দাস অপু
লুলু
শুনে তাক ধিন নাচতে ইচ্ছা করল যখন মা বললেন ল্যারি এবং মেরিজোরা চলে যাবে। আমার বোন কোর্টনিও খুব খুশি। হ্যাঁ, ওরা আমাদের পড়শী বলে মা বলেছেন ওদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করতে। আমি আর কোর্টনি অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু…
এই বাচ্চাগুলোকে পাজি বললেও কম বলা হয়, এরা দুষ্টের শিরোমণি। আর পেটুকের পেটুক।
আমার রুমে সেদিন ল্যারি পটেটো চিপসের প্যাকেট পেয়েছিল। ওটা আমি পরে খাব বলে রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু সে নাকিসুরে ঘ্যানঘ্যান করতে লাগল ওটা খাবে। বাধ্য হয়ে দিতে হলো। সারা মুখে, চিবুকে আলুর তেল চকচক করছিল ল্যারির। আর প্যাকেটটা সাবাড় করে ও দাঁত বের করে হাসছিল।
তারপর সে ঢেঁকুর তোলে। ঢেঁকুরের সে কী আওয়াজ! আমাদের বয়স বারো। ঢেঁকুর তোলার অভ্যাস খুবই খারাপ এটা আমরা দশ বছর বয়স থেকেই জানি।
আমার কুকুর মার্টলি পটেটো চিপের ব্যাগটি শুঁকছিল। ওটা ল্যারি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল মেঝেতে। মার্টলি ওটার ওপর লাফিয়ে পড়ে চিবুতে শুরু করে।
আমার প্রকাণ্ড কুকুরটা যা পায় তাতেই মুখ দেয়। চিপসের প্যাকেট ওর মুখ থেকে ছুটিয়ে আনতে রীতিমত কুস্তি করতে হচ্ছিল আমাকে। আর তখন মার্টলি আমাকে কামড়ে দেয়!
আর তাই দেখে ল্যারির কী হাসি!
পরে ল্যারিকে আমি আমার নতুন প্লে স্টেশন রেসিং গেম দেখাতে গিয়েছি। ‘আমাকে ওটা দাও, ম্যাথিউ,’ বলে এমন জোরে টান মারল কন্ট্রোলার ধরে, কর্ডটা ছিঁড়ে দু’টুকরো!
ও কি এজন্য ‘সরি’ বলেছিল? না। সে হাসতে-হাসতে মেঝেয় চিৎ হয়ে পড়ে গিয়েছিল। যেন কর্ড ছেঁড়ার মত হাসির ব্যাপার পৃথিবীতে নেই। পাজি আর কাকে বলে!
শুনলাম আমার বোন হলঘরে মেরিজোর সঙ্গে তর্ক করছে। ওরা একসঙ্গে থাকলেই ঝগড়া করে। এবারে কী নিয়ে কথা কাটাকাটির সূত্রপাত জানি না আমি, তবে শুনলাম কোর্টনি চিৎকার করে বলছে, ‘মানুষের নাম ধরে ওভাবে ডাকতে নেই, গাধী!’
মেরিজো আশপাশে থাকলে কোর্টনির সঙ্গে ওর ঝগড়া হবেই। মেরিজোর খড়খড়ে গলার স্বর আর ছিঁচকাঁদুনে স্বভাবটাকে সহ্য করতে পারে না ও মোটেই। আর মেরিজো যে সারাক্ষণ, এমনকী ডাইনিং টেবিলে বসেও তার লম্বা, সোনালি চুল আঁচড়াতে থাকে, এটিও কোর্টনির দু’চোখের বিষ।
কাজেই মা যখন সবাইকে একত্র করে বললেন, ‘পার্টি শেষ করার জন্য দুঃখিত। তবে ল্যারি এবং মেরিজোকে এখন বাসায় ফিরতে হবে। আমি মলে যাচ্ছি তোমাদের বাবার সঙ্গে দেখা করতে। নতুন বেবি সিটার যে কোন সময় চলে আসবে।’
‘যাওয়ার আগে কিছু পান করতে পারি?’ জিজ্ঞেস করল ল্যারি। বাসায় ফেরার আগে তার কিছু না কিছু পান করা চাই। যেন পান না করলে তেষ্টায় মরে যাবে।
‘আমিও খাব,’ তার পাজি বোনটা ঘ্যানঘ্যানে সুর তুলল।
মা দ্রুত ওদের হাতে ফলের রসের প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন। তারপর ওদেরকে বিদায় দিলাম বৃষ্টির মধ্যে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। আমি দরজা লাগিয়ে দিলাম।
‘আমাদের বেবি সিটারের কী দরকার?’ জিজ্ঞেস করলাম মাকে। ‘আমার বারো বছর বয়স। দিব্যি নিজের দেখভাল করতে পারি।’
‘তোমার বোনের বয়স মাত্র আট,’ বললেন মা। ‘তুমি ওর দেখভাল করতে পারবে?’
আমি কোর্টনির দিকে তাকালাম। তার মুখে ফুটল শয়তানী হাসি। মা ঠিকই বলেছেন। কোর্টনি একটা ঝামেলার নাম।
কোর্টনি নিজেকে জিমন্যাস্ট ভাবে। সবসময় কাউচের ওপর দাপাদাপি করছে অথবা সিঁড়ির রেইলিং ধরে ঝুলছে, লাফ মেরে মেঝেয় নামছে।
সে সিঁড়ি বাইতেও বেশ পছন্দ করে। যেমন বাড়ির পাশে বৃষ্টির ঝাঁঝরি বেয়ে সে ওপরে উঠে যায়। গেল বসন্তে ও আমাদের গ্যারাজের ছাদে উঠে পড়েছিল। ছয়জন দমকল কর্মী লেগেছে ওকে নিচে নামিয়ে আনতে।
‘কোর্টনির বেবি সিটারের দরকার নেই,’ ঘোঁতঘোঁত করে বললাম আমি। ‘ওর দরকার একজন রক্ষী।’
‘মিসেস ক্রাভের কেন আসছেন না?’ জানতে চাইল কোর্টনি।
‘উনি অসুস্থ,’ জবাব দিলেন মা। ‘তাঁর জায়গায় আরেকজনকে পাঠাচ্ছেন।’
‘তাহলেই হয়েছে,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলি আমি। ‘হয়তো কোন বুড়ি মহিলা আসবে যে সারারাত উনো খেলতে চাইবে।’
বেজে উঠল ডোরবেল। ‘ওই তো এসে পড়েছে, বললেন মা। ‘আগে তো দেখো নতুন বেবি সিটার কেমন, ম্যাট।’
‘ঠিক আছে।’
আমি সদর দরজা খুলতেই হাওয়া এবং বৃষ্টির ঝাপটা খেলাম। হুড়মুড়িয়ে পিছিয়ে গেলাম। আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বেগুনি বর্ষাতি পরা একটি মেয়ে।
‘আমি লুলু,’ বলল সে। ‘তুমি কি ম্যাথিউ?’
আমার জবাবের অপেক্ষা করল না মেয়েটি। ঢুকে পড়ল ঘরে। কুকুরের মত গা ঝাড়া দিতেই বর্ষাতি থেকে পানি ছিটকে পড়ল কার্পেটে।
‘হাই, লুলু,’ বললেন মা। ‘তোমার ভেজা জিনিসগুলো আমাকে দাও।’
লুলু মা’র হাতে তার ছাতা এবং বর্ষাতি দিল। মা দ্রুত ওগুলো ক্লজিটে ঝুলিয়ে রাখলেন।
আবার গা ঝাড়া দিল লুলু। ‘আজ রাত ভয়ে কেঁপে ওঠার রাত,’ কোর্টনি এবং আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। ‘আমার পছন্দের রাত।’
সে দু’হাতে তার ঢেউ খেলানো কালো চুলগুলো এলোমেলো করে দিল। মেয়েটির বয়স হবে পনেরো- ষোলো। গোল-গোল কালো চোখ, ফ্যাকাসে ত্বক, মুখে কড়া বেগুনি লিপস্টিক, তার বর্ষাতির রঙের।
লুলু তার কালো সোয়েটারের পেছনে ঠেলে দিল কালো চুলগুলো। পরনে টাইট কালো জিন্স এবং কালো চামড়ার বুটজুতো। ‘হেই, গাইজ,’ বলল সে। ‘ইট’স নাইস টু মিট ইউ বোথ।’ নরম ফিসফিসে কণ্ঠ তার।
হেব্বি মেয়ে! মনে-মনে বললাম আমি। ওয়াও!
এরকম বেবি সিটার বেবি সিটিং দিলে মন্দ হয় না।
কাউচে বসল লুলু। মার্টলি এসে দরজার কাছে জমে থাকা পানিতে নাক শুঁকল। কিন্তু ওখানে খাওয়ার মত কিছু না পেয়ে লুলুর বুটজুতো শুঁকে দেখল এক মুহূর্ত।
‘কুকুররা আমাকে পছন্দ করে,’ বলল লুলু। হাত বাড়াল মার্টলির ধূসর, বিরাট মাথায় আদর করার জন্য। ‘ওরা জানে আমি ওদের মনের কথা বুঝতে পারি।
সে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল মার্টলির চোখে। ‘জানি ও এখন কী ভাবছে,’ বলল লুলু। ‘ওর খিদে পেয়েছে।’
আমি আর কোর্টনি একসঙ্গে হেসে উঠলাম। ‘ওর সারাক্ষণই খিদে পায়।’ কোর্টনি বলল, ‘ও যা পায় তা-ই খায়।’
মা গায়ে লম্বা রেইনকোট এবং মাথায় বাবার বেসবল ক্যাপ চাপিয়ে ছুটতে ছুটতে এলেন। ‘আমি গেলাম,’ বললেন তিনি আমাদেরকে। ফিরলেন লুলুর দিকে। ‘নিজের বাড়ির মত করে থাকো। আর ওদেরকে বেশি লাই দিয়ো না। তাহলে মাথায় চড়বে।
‘ও নিয়ে ভাববেন না,’ বলল লুলু। ‘আমি এসব সামাল দিতে জানি। আমি ওদের সম্মোহন করে ঘুম পাড়িয়ে দেব।’
মা ততক্ষণে দরজার কাছে প্রায় পৌঁছে গেছেন। মনে হয় না লুলুর কথা শুনতে পেয়েছেন। ‘বেশ,’ বললেন মা। তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন।
আমি লুলুকে দেখছি। সে আবারও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মার্টলির চোখে। লুলু ভালই রসিকতা জানে, ভাবলাম, আমি।
সে এমন জোরে হাততালি দিয়ে উঠল যে চমকে গেল মার্টলি। ‘আমরা আজ রাতে কী করছি?’ জিজ্ঞেস করল সে। আলোতে জ্বলজ্বল করছে তার কালো চোখ।
‘তুমি ভিডিও গেম পছন্দ কর?’ জানতে চাই আমি। ‘আমার কাছে প্লে স্টেশন টু আছে।
‘বো-রিং,’ গুঙিয়ে উঠল কোর্টনি। ‘তুমি আমাকে চিয়ারলিডার কীভাবে হয় শিখিয়ে দেবে? সোমবার থার্ড গ্রেড স্কোয়াডে চান্স পাবার সুযোগ খুঁজছি আমি।
‘আমাদের স্কুলে কোন চিয়ারলিডার নেই,’ ফিসফিসে কণ্ঠে বলল লুলু। ‘এ ব্যাপারে তোমাকে তেমন সাহায্য করতে পারব বলে মনে হয় না।’
‘তুমি শুধু দেখবে আমি কেমন করছি,’ বলল কোর্টনি।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুব হয়েছে,’ বললাম আমি।
তোমাদের বাসা থেকে দুটো বাচ্চাকে চলে যেতে দেখলাম,’ বলল লুলু। ‘কারা ওরা?’
‘ওরা বাচ্চা নয়—বদের হাড্ডি,’ জবাব দিলাম আমি।
‘ওরা আমাদের পড়শী,’ বলল কোর্টনি। ‘প্রায় রোজই আমাদের বাসায় আসে। কিন্তু আমরা ওদেরকে দেখতে পারি না, ওরাও আমাদেরকে পছন্দ করে না। খুবই বিরক্তিকর চরিত্র।’
ল্যারি এবং মেরিজো কেমন বিরক্তিকর সব খুলে বললাম লুলুকে।
লাফিয়ে উঠল লুলু। ‘আমার মাথায় দারুণ একটা বুদ্ধি এসেছে। তোমরা কি প্রতিশোধ নিতে চাও?’
আমি চোখ কুঁচকে তাকালাম ওর দিকে। ‘মানে?’ খিলখিলিয়ে হাসল লুলু। ‘তোমরা ঠিকই বুঝতে পেরেছ। তোমাদেরকে ওরা এত যন্ত্রণা দেয়! এর শোধ নিতে মন চায় না?’
‘একশোবার চায়!’ আমি আর কোর্টনি বলে উঠলাম সমস্বরে।
‘তাহলে চলো মাটির কিছু বিস্কিট বানাই,’ বলল লুলু। কোর্টনি এবং আমি ওর দিকে হাঁ হয়ে তাকালাম। ‘মাটি দিয়ে বিস্কিট বানাবার কথা বলছ?’
মাথা ঝাঁকাল লুলু। চোখ টিপল আমাকে উদ্দেশ্য করে। ‘ব্যাপারটা খুব ছেলেমানুষী হয়ে যাবে না?’ বললাম আমি। ‘আমার বয়স বারো। তিন বছর বয়সে আমি মাটির পাই বানিয়েছিলাম।’
‘তবে এরকম মাটির পাই কখনো বানাওনি,’ ফিসফিস করল লুলু। হাসি ছড়িয়ে পড়ল সারা মুখে। ‘এগুলো বিশেষ জিনিস। আর এ জিনিস বানাবার জন্য পারফেক্ট দিন আজ।’
‘মানে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে।
লুলুর মুখের হাসি চওড়া হলো। ‘ঠিক তাই। এসময়ই তো মাটি থাকে নরম।’
.
কোর্টনি আর আমি উঠনের জলের মধ্যে ছপছপিয়ে গেলাম গ্যারাজে। ফিরে এলাম বেলচা আর ঝুড়ি নিয়ে। কুঁজো হয়ে আছি, তবু বাতাসের ঝাপটায় শীতল বৃষ্টি আছড়ে পড়ছে মুখে।
‘এসব করছি নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না,’ মাথায় বর্ষাতির হুড তুলে দিতে-দিতে অসন্তোষ প্রকাশ করলাম আমি।
আমরা চলে এসেছি বাবার সবজি বাগানে। আমার হাতে বালতি। কোর্টনি বেলচা দিয়ে ভেজা মাটি তুলে বালতিতে ফেলতে লাগল।
‘এই রে-মার্টলিকে কে বেরুতে দিল?’ চেঁচিয়ে উঠল কোর্টনি।
বিশালদেহী কুকুরটা কাদামাটি পেরিয়ে আমার গায়ে লাফিয়ে পড়ল। ‘অ্যাই-নাম! নাম বলছি!’ চেঁচালাম আমি। ওর বড়-বড় থাবায় লেগে থাকা কাদায় মাখামাখি হয়ে গেল আমার বর্ষাতি।
‘বালতি নিয়ে যা!’ কাউমাউ করে উঠল কোর্টনি। ‘বালতি নিয়ে যা! ও মাটি খাচ্ছে!’
মিনিট কয়েক পরে আমি আমার কাদামাখা বুট ঝাড়তে-ঝাড়তে লুলুর হাতে তুলে দিলাম ভেজা মাটি ভর্তি বালতি। কোর্টনি এবং আমি গা থেকে খুলে ফেললাম নোংরা পোশাক।
হাসল লুলু। ‘তোমাদেরকে আমি খানিক কাদামাটি জোগাড় করে আনতে বলেছি। কাদার মধ্যে গড়াগড়ি খেতে বলিনি!”
ভেজা রেইনকোট নিয়ে দু’জনে মিলে চলে গেলাম লণ্ডি রুমে। তারপর কিচেনে ঢুকলাম। ওখানে লুলু আছে। সে বিস্কিটের দুটি ট্রে বের করল। ‘তোমাদের কাছে পোস্টার পেইণ্ট আছে?’ জানতে চাইল সে। ‘আমাদের রঙ দরকার হবে।’
কোর্টনি এক ছুটে নিজের ঘরে গিয়ে পেইন্টের বাক্স নিয়ে এল।
‘এসো, কাজ শুরু করা যাক, বলল লুলু।
সে বালতির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ভেজা মাটির একটা দলা তুলে নিল এবং ওটা বেকিং ট্রেতে রাখল। ‘এটা তোমার জন্য, কোর্টনি।’
কোর্টনি চোখ গোল গোল করে তাকাল মাটির ঢেলার দিকে। ‘আমি এ দিয়ে কী করব?’
‘এটাকে কাদামাটির আকার দাও,’ বলল লুলু। ‘মানুষের একটা আকৃতি বানাবে। যেমন ধরো জিঞ্জারব্রেড ম্যান।’ তার মুখে ফুটল হাসি। ‘মেরিজোর চেহারা দেবে।
খিলখিলিয়ে হাসল কোর্টনি। ‘কাদামাটিতে ওকে যা লাগবে না!’
‘তারপর আমি ল্যারির মূর্তি বানাব,’ বললাম আমি। ওর মুখে মোটাসোটা একটা নাক বসিয়ে দেব।’ লুলু আমার ট্রেতে আরেক দলা মাটি দিল। আমি কাজে নেমে গেলাম।
চামচ এবং আঙুলের সাহায্যে আমরা মাটি দিয়ে আমাদের বন্ধুদের মূর্তি বানাতে লাগলাম। লুলু রঙের জার খুলল। আমরা ওদের গায়ে রঙ মাখালাম। কোর্টনি হলুদ রঙ করল মেরিজোর লম্বা চুলে। আমি ল্যারির মুখ রাঙিয়ে দিলাম লাল রঙে। ওকে এখন দেখতে মোটাসোটা শুয়োরের মত লাগছে।
‘আমরা কি এখন ওদের ওভেনে পোড়াব?’ জিজ্ঞেস করল কোর্টনি।
মাথা নাড়ল লুলু। ‘আরেকটু কাজ বাকি আছে।’ মৃদু গলায় বলল সে। ‘তোমাদের বন্ধুদের কোন জিনিস মূর্তির সঙ্গে জুড়ে দিতে হবে।’
‘যেমন?’ জানতে চাই আমি।
যেমন হাতের নখ বা এরকম কিছু,’ জবাব দিল লুলু। ‘এটা কুকির সঙ্গে লাগিয়ে দিতে হবে।’
‘আমার কাছে মেরিজোর চুল আছে,’ বলল কোর্টনি, রওনা হয়ে গেল দরজার দিকে। ‘ও আমার চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়িয়েছে।
‘আর ওর ভাই ল্যারি?’ লুলু জিজ্ঞেস করল আমাকে। সে আমার কুকি বা বিস্কিটের একটা ঠ্যাং টিপেটুপে ঠিক করে দিচ্ছে। ‘তোমার কাছে ওর মাথার চুলটুল নেই?’
‘না, চুল নেই,’ দ্রুত চিন্তা করছি আমি। ‘তবে বাঁদরটা মেঝেতে পটেটো চিপসের অনেক গুঁড়ো ফেলেছে। এখনো আছে ওগুলো। এ দিয়ে কাজ হবে?’
লুলু একটু ভেবে বলল, ‘ওগুলো কি সে মুখ থেকে থুতু দিয়ে ফেলেছে? তাহলে চলবে। যাও, নিয়ে এসো।’
আমি আর আমার বোন এক ছুটে চলে এলাম দোতলায়। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই ল্যারি এবং মেরিজোকে দিয়ে মাটির বিস্কিট বানাতে বেশ মজা পেয়েছি। আমরা চুল এবং চিপসের ফেলে দেয়া থুতুমাখা গুঁড়ো নিয়ে ফিরে এলাম জলদি। লুলু সযত্নে ওগুলো কুকির ঠিক মাঝখানে সেঁটে দিল।
.
বিস্কিট পোড়ানো হচ্ছে এই ফাঁকে আমরা রান্নাঘর সাফসুতরো করে ফেললাম। ওভেন থেকে বিশ্রী গন্ধ আসছে।
তবে কুকিজ যখন বের করা হলো ওভেন থেকে, দারুণ লাগল দেখতে।
মেরিজোর মুখটা গোল এবং সবুজ, মাথায় হলুদ চুলের স্তূপ। ল্যারির ছোট-ছোট কালো চোখ, লাল টকটকে নাক। পরনের বড়সড় জিন্স প্যান্ট ঢলঢলে, একদম আসলের মত দেখতে।
‘গুড ওয়ার্ক,’ হাততালি দিল লুলু। ‘ভেরি গুড ওয়ার্ক।’
‘এগুলো দিয়ে এখন কী করব?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘নিরাপদ কোন জায়গায় লুকিয়ে রাখো। তারপর ওদের ব্যবহার করবে,’ জবাব দিল লুলু।।
‘হাহ্?’ বিস্ময়ে বড়-বড় হয়ে গেল আমার চোখ। ‘ওদের ব্যবহার করব? মানে?’
এমন সময় কিচেনের দরজা খুলে গেল। বাবা-মা ঢুকলেন ঘরে, ছাতা ঝাঁকাচ্ছেন। তাঁদের রেইনকোট থেকে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে। ‘ওহ! কী বিষম রাত!’ বললেন বাবা। বৃষ্টির পানিতে তাঁর চশমার কাঁচ পুরো ঝাপসা।
মা ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন আমাদের বিস্কিটের ট্রের দিকে। এসব কী? ‘
‘আমরা মাটির কুকিজ বানিয়েছি,’ লুলু বলল তাঁকে। ‘সময় কাটাতে সৃজনশীল কর্মকাণ্ড আর কী।’
‘এহ, কী বিকট গন্ধ রে, বাবা!’ নাক চেপে ধরলেন মা। কোর্টনি এবং আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘বানিয়েছ তো ভালই। তবে দয়া করে এগুলো কিচেন থেকে নিয়ে যাবে?’
আমি এবং আমার বোন সাবধানে বিস্কিটগুলো তুলে নিলাম ট্রে থেকে। তারপর শুভ রাত্রি বললাম লুলুকে। সে রেইনকোট পরতে ব্যস্ত।
‘ওগুলো নিরাপদ কোন জায়গায় লুকিয়ে রাখতে ভুলো না,’ ফিসফিস করল সে। ‘তোমাদের সঙ্গে আবার দেখা হবে। শীঘ্রি।’
‘তুমি তো বেশ মেয়ে! ওদেরকে দিয়ে সৃজনশীল কাজ করিয়েছ!’ মা লুলুকে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে-দিতে বললেন। ‘ওরা এসব কাজ মোটেই পছন্দ করে না।’
ল্যারির আকারে তৈরি বিস্কিট নিয়ে আমি দোতলায় চলে গেলাম। ঘরের চারপাশে একবার চোখ বুলালাম কোথায় রাখা যায় এটা। শেষে ড্রেসারের ওপরের দেরাজ পছন্দ হলো। ল্যারি আবার এলে দেখাব ওকে। বলব- এটা দেখতে অবিকল ওর মত।
ওটা ড্রেসারের ড্রয়ারের হাতলে বাড়ি খেল রাখতে গিয়ে। ‘ওহ, না!’ চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। পুতুলের ডান হাতখানা ভেঙে পড়ে গেছে মেঝেতে।
কুকিটি নামিয়ে রাখলাম মেঝেতে। তারপর ছোট গোলাপি হাতটি তুলে শক্ত করে চেপে ধরলাম ভাঙা বাহুতে। কিন্তু মাটি গেছে শুকিয়ে। হাতটা লাগল না।
গ্লু দিয়ে হয়তো লাগানো যাবে, ভাবলাম আমি।
‘অ্যাই, তোমরা শুতে যাও!’ নিচতলা থেকে ভেসে এল বাবার গলা।
আমি হাতটি ড্রেসারের ওপরে বাকি কুকির পাশে রেখে ওটার কথা ভুলে গেলাম।
অন্তত পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়া পর্যন্ত মনে পড়ল না।
ল্যারি ক্লাসে এল এক ঘণ্টা দেরিতে। আমার পাশে বসল শুকনো মুখে। ডান হাতটা তুলে দেখাল।
হাতে প্লাস্টার করা দেখে আমি খাবি খেলাম। ‘ল্যারি -কী হয়েছে?’
‘আমার হাত ভেঙে ফেলেছি,’ বিড়বিড় করল ও।
আমি বিস্ফারিত চোখে হাতের দিকে তাকিয়ে আছি। ‘কীভাবে?’
কাঁধ ঝাঁকাল ল্যারি। ‘বুঝতে পারলাম না কীভাবে এটা ঘটল। গত রাতে পাজামা পরছি, হঠাৎ মনে হলো হাতটা মচকে গেল। ডা. ওয়েনসও মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারেননি। আজ সারা সকাল তাঁর চেম্বারেই ছিলাম।’
‘দরজা কিংবা অন্য কিছুতে বাড়ি-টাড়ি খাওনি তো?’
মাথা নাড়ল ল্যারি। ‘না। এমনি-এমনি ভেঙে গেল।’
চোখে ভেসে উঠল আমার ড্রেসারে রাখা মাটির ভাঙা কুকি। সঙ্গে-সঙ্গে শিরদাঁড়া বেয়ে নামল বরফ জল। ল্যারির হাতের কথা কোর্টনিকে না বলা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছি না।
‘এটা স্রেফ একটা কাকতালীয় ঘটনা,’ স্কুল শেষে ওকে ঘটনাটি বলার পরে মন্তব্য করল কোর্টনি। ‘মাটির কুকির সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই।’ হাসল ও। ‘বেচারা ল্যারি। ও বাম হাতে কী করে খাবে? সবসময় দুই হাত দিয়ে ও খায়!’
আমরা হেঁটে বাড়ি ফিরছি। রৌদ্রকরোজ্জ্বল শীতল একটি দিন। ফুটপাতে মোটা-মোটা বাদামী পাতা বাতাসের ঝাপটায় নাচানাচি করছে। ‘কুকিগুলোর যদি কোন শক্তি থেকে থাকে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘আমিই যদি ল্যারির হাত ভাঙার জন্য দায়ী হই?’
‘কী যা-তা বলছিস!’ বিরক্ত হলো কোর্টনি। ‘কুকিগুলো তো স্রেফ মাটি। আমি তোকে প্রমাণ করে দেব। মেরিজোর কুকি নিয়ে কিছু একটা করব। দেখবি ওর কিছুই হবে না।’
কোর্টনি এবং আমি দ্রুত ওর ঘরে গেলাম। ড্রেসারের ড্রয়ারে ও মেরিজোর কুকি লুকিয়ে রেখেছিল। ওখান থেকে ওটা বের করে এনে পড়ার টেবিলে রাখল। ‘দেখি কী করা যায়।’ বলল ও।
একটি কাঁচি দিয়ে ঘ্যাঁচঘ্যাঁচ করে মেরিজোর সোনালি চুলগুলো কেটে ফেলল কোর্টনি।
আমি চোখ ট্যারা করে তাকিয়ে থাকলাম ন্যাড়া মাথাটির দিকে। তারপর বোনের হাতে ফোন গুঁজে দিয়ে বললাম, ‘নে, ওকে ফোন কর।’
কোর্টনির চোখ বিস্ফারিত হলো। ‘মেরিজোকে ফোন করব?’
‘হ্যাঁ, ওকে ফোন কর!’ বললাম আমি। ‘দ্যাখ কিছু হলো কিনা।
কোর্টনি মেরিজোর নম্বর টিপল। ‘হাই, মিসেস রলিন্স। কোর্টনি বলছি। মেরিজো আছে?’
ও-প্রান্তের জবাব শুনে চোয়াল ঝুলে পড়ল কোর্টনির। মুখটা রক্তশূন্য হয়ে গেছে। ‘ওহ, আচ্ছা,’ বলল ও। ‘ঠিক আছে…নো প্রবলেম। না, জরুরি কিছু নয়। আশা করি মেরিজো ঠিক আছে।’ ফোন রেখে দিল ও।
‘কী? কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
কোর্টনি ধপ করে বসে পড়ল বিছানার এক কোণে। ফিসফিসে শোনাল কণ্ঠস্বর। ‘আ-আমি শুনলাম চিৎকার করছে মেরিজো। ওর মা বললেন ও ফোন ধরতে পারবে না। ওর চুলে যেন কী সমস্যা হয়েছে।’
ঢোক গিললাম আমি। ‘তুই ওকে চিৎকার করতে শুনেছিস?’
মাথা ঝাঁকাল কোর্টনি। “আমার চুল পড়ে যাচ্ছে-আমার চুল পড়ে যাচ্ছে! বাঁচাও!” বলে কান্নাকাটি করছিল ও।’
টেবিলে রাখা ন্যাড়া মাথার কুকির দিকে তাকালাম আমি। হঠাৎ কেমন অসুস্থ বোধ করলাম। কাঁপছে পা। ‘আমরা-আমাদের উচিত মাকে সব খুলে বলা, বললাম আমি।
ঘুরে রওনা হলাম বেডরুমের দরজায়। নিচতলা থেকে শোনা গেল মা’র গলা। ‘আমি গেলাম, বাচ্চারা। তোমাদের বাবার সঙ্গে শহরে ডিনার করে ফিরব। লুলু চলে এসেছে। তোমরা নিচে নেমে এসে ওকে “হাই” বলো।”
লুলু?
কোর্টনি আর আমি দু’জনেই যেন জমে গেলাম। ‘আমি নিচে যাব না,’
‘নিচু গলায় বলল ও। ‘মেয়েটাকে দেখলেই কেমন ছমছম করে গা। ও জাদু জানে। আমাদেরকে দিয়ে ভয়ঙ্কর কাজ করিয়ে নেয়।’
‘নিচে যাওয়া উচিত আমাদের,’ বললাম আমি। ‘সত্যি কথাটি বলব লুলুকে। বলব আমরা আমাদের বন্ধুদের আঘাত করতে চাই না।’
তোমাদের সাড়া পাচ্ছি ওপরে!’ নিচতলা থেকে চেঁচাল লুলু। ‘নিচে চলে এসো দু’জনে।’
কোর্টনি এবং আমি সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলাম। লুলু দাঁড়িয়ে আছে লিভিং রুমে বুকে হাত বেঁধে। অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
আবারও কালো পোশাক পরে এসেছে ও, কালো শার্টের ওপর চাপিয়েছে কালো সোয়েটার। গলা ঢেকে রেখেছে লম্বা, বেগুনি রঙের স্কার্ফে। ওর ঠোঁটের লিপস্টিকের সঙ্গে ম্যাচ করা রঙ।
‘এসেছ!’ হাসল লুলু।
‘মাটির কুকির রহস্যটা আমরা জানি,’ কাঁপা-কাঁপা গলায় অস্ফুটে বললাম আমি। ‘মানুষকে আঘাত দেয়া উচিত না।’-
লুলুর মুখে ছড়িয়ে পড়ল হাসি। ‘উচিত না-তবে ব্যাপারটা মজার না?”
‘না,’ বলল কোর্টনি। ‘এতে কোন মজা নেই। আমরা বাবা-মাকে কথাটা বলে দেব ওঁরা বাড়ি ফিরলেই।’
‘না, বলবে না,’ মৃদু গলায় বলল লুলু। ধীরে-ধীরে মুছে গেল হাসি। ‘তোমরা কাউকে কিছু বলবে না। কেন বলবে না তা দেখাচ্ছি।’
সে কফি টেবিলে রাখা সাদা একটি বাক্সের ঢাকনি খুলল। ওখান থেকে দুটি মাটির কুকি বের করল, দুই হাতে দুটো নিল।
জ্বলজ্বল করছে লুলুর চোখ। ‘দেখলে? আমি ম্যাথিউ এবং কোর্টনির কুকিজ বানিয়েছি!
‘ওহ্, না!’ আঁতকে উঠলাম আমি। ম্যাথিউর কুকির মাথায় কালো চুল, হাড্ডিসার দেহ। অবিকল আমার মত। কোর্টনির কুকি রোগাপাতলা, মাথায় কোঁকড়া চুল, একদম ওর মত।
‘কাউকে কিছু বলে দেয়ার হুমকি আমাকে আর দিতে এসো না। এসো, কাজে নামি।’ বলল লুলু, সামনে ধরে রেখেছে কুকিজ। ‘আমাদের মাটি লাগবে। আজ আরও কিছু স্পেশাল কুকিজ বানাব।’
‘প্রশ্নই ওঠে না!’ আপত্তি করলাম আমি। ‘তুমি আমাদের বাধ্য করতে পারো না–’
লুলু কাউচের বালিশ থেকে সাদা একটি পালক বের করল। পালকের সরু ডগাটা মুচকি হেসে ধীরে-ধীরে তুলল ম্যাথিউ কুকির মাঝ বরাবর-তারপর ওটা দিয়ে ঘাই মারল।
‘আউ!’ আর্তনাদ করে উঠলাম আমি পেটে হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যথা পেয়ে। ‘লুলু-থামো!’ হাঁপাতে-হাঁপাতে বললাম আমি।
সে কুকির গায়ে পালকটা দিয়ে মোচড়াতে লাগল।
আমার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল প্রচণ্ড ব্যথা। শরীর ভাঁজ হয়ে পড়ে গেলাম মেঝেতে। ‘প্লিজ,’ ফিসফিস করে বললাম। ‘প্লিজ-ওটা সরিয়ে নাও।’
কুকির গা থেকে পালক সরিয়ে নিল লুলু। আস্তে-আস্তে আমার শরীরের ব্যথা চলে গেল।
লুলু এবার আমার বোনের কুকি, হাতে নিল। ‘তোমাকেও একটা শিক্ষা দেব নাকি?’
‘না, না। তুমি যা বলবে আমি তাই করব,’ কম্পিত কণ্ঠে বলল কোর্টনি।
‘বেশ, তাহলে কাজে লেগে যাও,’ বলল লুলু। ‘আর আমি যা-যা বলব ঠিক তাই করবে। নইলে তোমাদের কুকিজ ফুটন্ত জলে ফেলে দেব। তখন বুঝবে মজা!”
কোর্টনি এবং আমার করার কিছু নেই। আমি টলতে- টলতে উঠে দাঁড়ালাম। এখনো ব্যথা করছে পেট। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।
আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে কোর্টনি ডিগবাজি খেল। কাউচের ওপর ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। লুলু লাফ মেরে উঠল। কোর্টনি সিধে হয়ে কাপড়ের ধুলো ঝাড়তে লাগল।
‘কোন চালাকি নয়,’ ওকে সাবধান করে দিল লুলু। হাতে আমাদের কুকি দুটো শক্ত করে ধরে আছে। ‘আমি বাচ্চাদের নির্যাতন করতে খুব ভালবাসি।’ শয়তানি হাসি ফুটল তার মুখে। ‘তবে বড়দের টর্চার করতে আমি আরও বেশি আনন্দ পাই। চলো। আজ তোমাদের বাবা-মা’র কুকিজ বানাব।’
আমি আর কোর্টনি মিলে বাড়ির পেছনের উঠনে গেলাম মাটি খুঁড়তে। সবজি বাগানে উবু হয়ে মাটি খুঁড়তে লাগলাম।
‘তুই তখন ডিগবাজি খেতে গেলি কেন?’ ফিসফিসিয়ে জানতে চাইলাম আমি। ‘হঠাৎ মাথাটা বিগড়ে যায়নি তো?’
রান্নাঘরের জানালায় একবার ফিরে তাকাল কোর্টনি। তারপর হাত ঢুকিয়ে দিল শার্টের পকেটে। ‘এটা দ্যাখ।’ অনুচ্চ গলায় বলল ও।
ওর হাতে লম্বা, কালো একটি চুল। ‘এটা কার্পেটে পড়ে ছিল। ডিগবাজি খাওয়ার ছলে এটা তুলে নিয়েছি।’
আমার বোনের পরিকল্পনাটি আমি অনুমান করতে পারছিলাম। ‘মাটির কুকিতে এটা ব্যবহার করবি, তাই না?’
মাথা দোলাল কোর্টনি। ‘মায়ের বদলে আমি লুলুর ব্যবস্থা করব।’
.
পরিকল্পনা মাফিক কাজ হলো। কোর্টনি এবং আমি মিলে কাজটি করলাম। আমার বোন লুলুর কুকি বানাল। আমি তখন লুলুকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলাম কিচেনের অন্য পাশে। ভাব করলাম আমার আঙুলে ভাঙা কাচ ঢুকে গেছে। লুলু আঙুল টিপে-টিপে ভাঙা কাচ বের করার চেষ্টা করছিল।
কোর্টনি ওভেনে কুকি ঢুকিয়ে ফেলল পোড়াতে। কুকিজ ঠাণ্ডা করার সময় আমি লুলুকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম কিচেন থেকে। ওকে নিয়ে দোতলায় চলে গেলাম দেখাতে আমরা ল্যারি এবং মেরিজোর কুকির কী দশা করেছি।
‘চমৎকার কাজ,’ হাসল লুলু। ‘ওদের বাঁদরামির জবাব বেশ ভালই দিয়েছ তোমরা।’
কিচেনে যখন ফিরে এলাম ততক্ষণে কোর্টনির সারপ্রাইজ রেডি। কিচেন কাউন্টারের মাটির কুকিটির দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল লুলু। ওটার ঠোঁট উজ্জ্বল বেগুনি রঙে রঙিন, গলায় বেগুনি রঙের স্কার্ফ। লুলুর লম্বা কালো চুলটি ওটার মাথায় আটকে আছে।
‘না আ আ আ আ আ!’ আর্তনাদ করল লুলু। ‘তোমরা এটা করতে পার না!’ সে ছুট দিল কুকির দিকে।
কিন্তু কোর্টনি ঝট করে তুলে নিল কুকি। নাগাল পেল না লুলু!
‘ওটা আমাকে দাও! ওটা আমাকে দাও!’ চেঁচাচ্ছে লুলু। আবারও কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করল।
কোর্টনি কুকিটা আমার দিকে ছুঁড়ে মারল। চমকে গিয়ে আমি ওটা এক হাতে ধরে ফেললাম।
ওটার মাথাটা ভেঙে পড়ে গেল।
আবার আর্তনাদ করল লুলু। দুই হাতে কুকিটাকে ধরার ।চেষ্টা করল।
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ওর মাথাটা খসে পড়ল ঘাড় থেকে। রান্নাঘরের মেঝেতে বার দুই ড্রপ খেল।
মাথাটা চিৎকার করেই চলেছে। ওটার আঙ্কভরা চোখ দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে, গড়াতে-গড়াতে ঠোকর খেল কিচেন কাউন্টারে। ‘আমাকে কুকিটা দাও! আমাকে কুকিটা দাও!’ কিচকিচ করে উঠল কাটা মুণ্ডু।
লুলুর মস্তকবিহীন শরীরটা টলতে-টলতে এগিয়ে এল আমার দিকে। হাত দুটো সামনে ছড়ানো। এগোতে গিয়ে বেগুনি স্কার্ফটা পড়ে গেল, উন্মুক্ত হলো নিখুঁতভাবে কাটা – গলা।
ওর বাড়ানো হাত বাতাস খামচাচ্ছে। অন্ধের মত পা ফেলে এগিয়ে আসছে লুলু।
আর ঘরের অন্যপাশ দিয়ে ওর কাটা মাথা চেঁচাচ্ছে, কিচকিচ করছে, ‘আমাকে ওটা দাও! আমাকে ওটা দাও!’
মাটির কুকিটা হাতে নিয়ে আমি দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালাম।
মুণ্ডহীন লুলু, সামনে ছড়ানো হাত, বাতাস খামচে- খামচে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আমাকে ধরবে বলে।
আমি দেয়ালের সঙ্গে মিশে যেতে চাইলাম। ভয়ে ধড়ফড় বুক।
সাঁৎ করে সরে যেতে চাইলাম ওর নাগালের বাইরে। আর তখন আমার হাত থেকে পড়ে গেল কুকি।
মেঝেতে পড়ল ওটা। আমি ওটার দিকে তাকালাম। ভেবেছিলাম ভেঙে যাবে, কিন্তু ভাঙল না।
লুলুর হাত ঝাপটা খেল আমার সামনে। আমি চট করে সরে দাঁড়ালাম একপাশে। এখন আমি ফাঁদে পড়ে গেছি। রান্নাঘরের কিনারে আটকা পড়েছি।
মুণ্ডহীন মেয়েটা আবারও থাবা চালাল। তারপর…থেমে গেল। প্রস্তর মূর্তি হয়ে গেল সে
আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল ওর ডান কাঁধ ভেঙে চুরচুর হয়ে গেছে দেখে। তারপর স্কার্ফটা অদৃশ্য হলো। সেই সঙ্গে হাত।
‘অ্যাই-মার্টলি!’ আমার বোনের গলা ভেসে এল ঘরের ওধার থেকে।
ঘুরলাম আমি। আমাদের প্রকাণ্ড কুকুরটা মাথা নিচু করে কী যেন চিবুচ্ছে।
লুলুর কুকি ওর মুখে!
একটু পরে লুলুর শরীর নেই হয়ে গেল। তারপর খণ্ডিত মস্তকও।
আনন্দে লাফাতে লাগলাম আমরা। দু’জনে মিলে মার্টলির গলা জড়িয়ে ধরলাম। ‘তুই একটা হিরো, মার্টলি! রিয়েল হিরো!’
‘ভাগ্যিস ওর সবকিছু খেয়ে ফেলার অভ্যাস ছিল!’ বলল কোর্টনি।
‘ওকে আজ রাতে বড়সড় একটা স্টেক খাওয়াব,’ বললাম আমি। ‘ও একটা হিরো! হিরো!” আমি আবারও আলিঙ্গন করলাম মার্টলিকে।
সিধে হলো কোর্টনি। ‘চল, ভাই, বাবা-মা ফেরার আগেই কিচেন পরিষ্কার করে ফেলি।’
‘না, থাক,’ বললাম আমি। ‘কোন কিছু স্পর্শ করার দরকার নেই। বাবা-মাকে দেখাব এসব। তাঁদেরকে সব কথা খুলে বলব।’
‘ঠিক আছে,’ আমার কথায় সম্মতি দিল কোর্টনি। সে কিচেনের চারপাশে চোখ বুলাচ্ছে। ‘লুলু যে কুকি দুটো নিয়ে এসেছিল সেগুলো কোথায়? তোর আর আমার কুকি? লুলু ওগুলো কোথায় রেখেছে?’
‘এখানেই তো নিয়ে এসেছিল,’ বললাম আমি। ‘তারপর-ওহ্, না!’
কোর্টনি আর আমি সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘মার্টলি-না! ফেলে দে! ফেলে দে! মার্টলি! ফেলে দে! প্লিজ-খাস না! ফেলে দে!”
