স্বর্ণকেশিনী – অনীশ দাস অপু
স্বর্ণকেশিনী
মার্গারেট ডিলাণ্ডর যখন ব্রেন্ট’স রকে বসবাস করতে গেল গোটা মহল্লা খুশিতে বাগবাগ হয়ে উঠল নতুন একটি স্ক্যাণ্ডালের আশায়। ডিলাণ্ডর কিংবা ব্রেন্ট’স রকের ব্রেন্ট পরিবারের স্ক্যাণ্ডালের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। কাউন্টির গোপন ইতিহাস যদি লেখা হত দুই পরিবারের নামই সেখানে সসম্মানে স্থান পেত। দুটি পরিবারের স্ট্যাটাসই এতটা আলাদা এবং ভিন্ন যেন তারা অন্য কোন মহাদেশের মানুষ-কিংবা ভিন্ন কোন পৃথিবীর-যদিও এখন তক তাদের কক্ষপথ একটি অপরটিকে অতিক্রম করেনি বা দুটোর মধ্যে কোনরকম সংঘর্ষ ঘটেনি। ব্রেন্ট পরিবার দেশের বেশ গণ্যমান্য পরিবার, সমাজের ওপর তাদের প্রতিপত্তিও প্রচুর। নিজেদের তারা নীল রক্তের বা অভিজাত শ্রেণীর মানুষ মনে করে। যদিও তারা কৃষিজীবী, ডিলাররাও তাই। এ পরিবারটির যে প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে তা নিয়ে তারা গর্ববোধ করে, যদিও পরিবারটি কখনো ক্ষুদ্র কৃষক শ্রেণীর ওপরে নিজেদের তুলতে পারেনি। ব্রেন্ট পরিবারও নিজেদের জমিতে নিজেরাই চাষবাস করে। ডিলাণ্ডর পরিবার পুরনো বিদেশী যুদ্ধের সময়ে একসময় বেশ ভালই আয় উপার্জন করেছিল। তবে একটি সময় নানা কারণে পরিবারটি গরিব হতে শুরু করে। পুরুষরা সারাক্ষণ অসন্তোষ প্রকাশ করতে থাকে, মদের মধ্যে ডুবিয়ে রাখে নিজেদের এবং মহিলারা ঘরকন্নার একঘেয়ে ক্লান্তিকর কাজগুলো করতে থাকে, কেউ- কেউ তাদের চেয়ে নিচু পদ মর্যাদার পুরুষদের বিয়ে করে ভেগে যায়। একটা সময় দেখা যায় পরিবারে সদস্য বলতে রয়েছে মাত্র তিনজন—ক্রফট, উইকহ্যাম ডিলার এবং তার বোন মার্গারেট। ভাই-বোন দু’জনেই বংশানুক্রমে শারীরিক সৌষ্ঠব এবং সৌন্দর্য পেয়েছে। তবে ক্রফট কিছুদিনের মধ্যেই মারা যান।
ব্রেন্টদের ইতিহাসও প্রায় একইরকম। ডিলাওর পরিবারের মত তারাও তাদের লোকজন যুদ্ধে পাঠাত তবে তাদের অবস্থান ছিল ভিন্ন। ডিলাওর পরিবার সৈনিক কিংবা নাবিক হিসেবে যুদ্ধে যোগ দিত। সার্ভিসে খুব একটা সম্মানজনক অবস্থান তাদের ছিল না। ওদিকে ব্রেন্ট পরিবার যুদ্ধে সম্মান অর্জন করে। তারা ‘বীর’ হিসেবে পরিচিতি ও পায়।
ব্রেন্ট পরিবারের বর্তমান কর্তা জিওফ্রে ব্রেন্ট। সে দেখতে বেশ সুদর্শন। তার চেহারায় এমন কর্তৃত্বসুলভ একটি ভাব রয়েছে যা নারীদের সহজেই আকৃষ্ট করে। পুরুষদের সঙ্গে তার আচরণ দূরবর্তী . এবং শীতল। তবে এটি মেয়েদেরকে মোটেই নিরুৎসাহিত করে না। ব্রেন্ট’স রকের চৌহদ্দির মধ্যে এমন কোন নারী মিলবে না যে এই সুদর্শন অকালকুষ্মাণ্ডটিকে পছন্দ করে না এবং গোপনে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ নয়।
ব্রেন্টস রক একটি পাহাড়ের মাথায়। এখানে রয়েছে উঁচু-উঁচু প্রাচীন টাওয়ার এবং ম্যানশন। যতদিন তক জিওফ্রে ব্রেন্ট তার নিরাবেগ বজায় রাখল লণ্ডন, প্যারিস এবং ভিয়েনায়–মোদ্দাকথা তার বাড়ির চৌহদ্দি থেকে অনেক দূরে-তার বিষয়ে, লোকে ছিল নীরব। দূর থেকে অনেক কিছুই শোনা যায়। অনেকেই তা পাত্তা দেয় না। তবে স্ক্যাণ্ডাল যখন বাড়ির কাছেই ঘটে সেটি তখন ভিন্ন বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ তখন নিন্দা শুরু করে। তবু অনেকে বাকসংযমের পরিচয় দিয়েছিল, এবং ঘটনা ঘটার পরেও সেদিকে কেউ খেয়াল দেয়নি। মার্গারেট ডিলাণ্ডর এমন অকুতোভয় এবং খোলামেলা যে জিওফ্রে ব্রেন্টের সঙ্গিনী হিসেবে তার যে অবস্থান তুলে ধরা হয়েছিল সে তা মেনে নেয়, এমন সহজভাবে যে লোকে বিশ্বাস করতে থাকে তার সঙ্গে ব্রেন্টের গোপনে বিয়ে হয়ে গেছে। নিন্দুকেরা তাদের জিভ সংযত রাখাই শ্রেয় মনে করে। তারা ভাবে মহিলাকে আরও পর্যবেক্ষণ করা দরকার এবং উল্টোপাল্টা কিছু বলে তারা মার্গারেটকে সক্রিয় শত্রু তৈরি করতে চায়নি।
তবে একজন মানুষ এর মধ্যে নাক গলিয়ে.. সব সন্দেহের অবসান ঘটাতে পারত। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা তাকে এ থেকে বিরত রাখে। উইকহ্যাম ডিলার তার বোনের সঙ্গে কলহে লিপ্ত হয়েছিল-কিংবা এমনও হতে পারে মার্গারেট নিজেই তার ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করেছিল। পরস্পরের প্রতি তিক্ত ঘৃণা থেকেই এর সূত্রপাত। ব্রেন্ট’স রকে মার্গারেট কেন যেত তা নিয়ে কথা কাটাকাটি থেকে দুই ভাই-বোনে প্রায় হাতাহাতির জোগাড়। দুই পক্ষই একে অপরকে হুমকি দিচ্ছিল এবং শেষমেশ উইকহ্যাম প্রচণ্ড খেপে গিয়ে বোনকে গৃহত্যাগের আদেশ দেয়। মার্গারেট সঙ্গে-সঙ্গে সিধে হয় এবং নিজের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র পর্যন্ত না নিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে উইকহ্যামকে শাসায় আজকের ঘটনার জন্য তার ভাইকে আজীবন পস্তাতে হবে।
এরপরে কয়েক সপ্তাহ কেটে গিয়েছিল। পড়শীরা অনুমান করে মার্গারেট লণ্ডন চলে গেছে, সেখানে জিওফ্রে ব্রেন্টের সঙ্গে তাকে আকস্মিক ঘুরতে দেখা যেতে থাকে এবং রাত ঘনাবার আগেই গোটা মহল্লা জেনে যায় ব্রেন্ট’স রকে আবাস গেড়েছে মার্গারেট। ব্রেন্ট যখন তার স্বাভাবিক সময়ের আগেই বাড়িতে ফিরে এসেছিল এতে কেউই বিস্মিত হয়নি। এমনকী তার ভৃত্যরাও জানত না কখন তার দেখা মিলবে। কারণ জিওফ্রের বাড়িতে ঢোকা বা বেরুনোর জন্য একটি ব্যক্তিগত দরজা ছিল যেটির চাবি সবসময় তার কাছেই থাকত। সে বাড়ির কাউকে জানান না দিয়ে ওই দরজা দিয়ে মাঝে-মাঝে আসা-যাওয়া করত। দীর্ঘদিন বাইরে থাকার পরে সাধারণত এরকমই ছিল তার আগমন।
খবর শুনে মহাক্ষিপ্ত উইকহ্যাম ডিলার। সে প্রতিশোধের শপথ নিল-মন ঠিক রাখতে তার মদ্যপানের পরিমাণ বেড়ে গেল আরও। বেশ কয়েকবারই চেষ্টা করল বোনের সঙ্গে দেখা করতে, কিন্তু মার্গারেট ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করল সাক্ষাতের প্রস্তাব। সে ব্রেন্টের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও প্রত্যাখ্যাত হলো। ব্রেন্টকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে কথা বলতে চাইল। তাতেও ফায়দা হলো না। জিওফ্রের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ তাকে থামাতে পারে না। দুই পুরুষের মধ্যে বেশ কয়েকবারই মুখোমুখি সাক্ষাৎ হলো এবং উভয়পক্ষ থেকে হুমকি-ধমকির বন্যা বয়ে গেল। তারা পরস্পরকে এড়িয়েও গেল। শেষে মুখ গোমড়া করে পরিস্থিতি মেনে নিতেই হলো উইকহ্যাম ডিলারকে।
মার্গারেট কিংবা জিওফ্রে কেউই শান্তিপ্রিয় স্বভাবের নয়, দু’জনেরই মেজাজ চড়া। ফলে শীঘ্রি দু’জনের মধ্যে শুরু হয়ে গেল ঝগড়াঝাঁটি। একটি বিষয় থেকে ঝগড়া আরেকটি বিষয়ে মোড় নিল এবং ব্রেন্টস রকে মদের ফোয়ারা বইতে লাগল। মাঝে-মধ্যেই ঝগড়া অত্যন্ত তিক্ততায় মোড় নিল, ভৃত্যরা শুনে ফেলতে পারে তার তোয়াক্কা না করে দু’জনে অশ্লীল গালিগালাজ এবং তর্জন-গর্জন চালিয়ে গেল নির্বিবাদে। তবে এ ধরনের সাংসারিক কলহে যেমন হয়-বিবাদ শেষে দু’জনের মিলমিশ হয়ে যায়। ওদের ক্ষেত্রে দেখা গেল জিওফ্রে এবং মার্গারেট মাঝে-মাঝেই ব্রেন্ট’স রক থেকে কোথাও যাচ্ছে। আর তখন উইকহ্যাম ডিলারকেও তার বাড়িতে অনুপস্থিত লক্ষ করা যায়। তবে প্রতিবারই সে মেজাজ খারাপ করে বাড়ি ফেরে।
অবশেষে একটা সময় দেখা গেল ব্রেন্ট’স রকে মার্গারেট এবং জিওফ্রের অনুপস্থিতির মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি। কয়েক দিন আগে দু’জনের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল, আগেকার যে-কোন কলহের চেয়ে অনেক বেশি তিক্ত ছিল এবারকার বিবাদ; তবে এ ঝগড়াটিও মিটে যায় এবং ভৃত্যদের জানানো হয় ওরা দু’জন কণ্টিনেন্টে বেড়াতে যাচ্ছে।
দিন কয়েক বাদে উইকহ্যাম ডিলাণ্ডরও বাইরে গেল এবং কয়েক দিন বাদে ফিরেও এল। এবারে তার মুখ গোমড়া নয় বরং বেশ সন্তুষ্টি এবং উল্লাসের একটি ছাপ আছে চেহারায়। উইকহ্যাম সরাসরি চলে এল ব্রেন্ট’স রকে। জিওফ্রে ব্রেন্টের সঙ্গে দেখা করতে চাইল। সাহেব তখনো ফেরেননি, জানিয়ে দিল ভৃত্যরা। থমথমে চেহারা নিয়ে উইকহ্যাম মন্তব্য করল, ‘আমি আবার আসব! আমার খবরটি পাকা-পরে বললেও চলবে।’ তারপর সে চলে গেল।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে গেল। মাসের পর মাস। একটি গুজব শোনা গেল যারমাট ভ্যালিতে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। একটি ঘোড়ার গাড়ি একটি বিপজ্জনক মোড়ে বাঁক নিতে যায় এবং তার আরোহী একজন ইংরেজ ভদ্রমহিলা এবং গাড়িটির চালক খাদে পড়ে যায়। মি. জিওফ্রে ব্রেষ্ট ঘোড়াগুলোকে স্বছন্দে চলতে দেয়ার জন্য গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে এগোচ্ছিলেন বলে সৌভাগ্যক্রমে তিনি প্রাণে রক্ষা পান। তিনিই দুর্ঘটনার খবরটি জানান এবং সার্চ শুরু হয়। ভাঙা রেইল, রাস্তা, যেখানে ঘোড়াগুলো নদীতে পড়ে যাওয়ার আগে ধস্তাধস্তি করেছিল, তার চিহ্ন করুণ ঘটনাটির প্রমাণ দেয়। ভেজা ঋতু, শীতকালে প্রচুর তুষারপাত হয়েছিল, তাই ফুলেফেঁপে উঠেছিল নদী এবং বরফে পূর্ণ ছিল ঘূর্ণিপাক। সন্ধান করে অবশেষে ঘোড়ার গাড়িটির ধ্বংসাবশেষের খোঁজ মেলে এবং নদীর জলাবর্তের ধারে একটি ঘোড়ার লাশ পাওয়া যায়। পরে টাশের কাছে, বালুকাময়, আবর্জনায় ভরা জলধারায় সন্ধান মেলে গাড়িচালকের। কিন্তু অপর ঘোড়াটির মত ভদ্রমহিলার কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি যেটুকু ধ্বংসাবশেষ ছিল তা রোনের ঘূর্ণাবর্তে পাক খেতে-খেতে লেক অভ জেনেভার দিকে ছুটেছিল।
সম্ভাব্য সমস্ত রকম অনুসন্ধান চালাল উইকহ্যাম ডিলাওর। কিন্তু নিখোঁজ নারীটির কোন খোঁজ মিলল না। সে বিভিন্ন হোটেলের খাতায় ‘মি. এবং মিসেস জিওফ্রে ব্রেন্ট’ নাম দুটি দেখতে পেল। সে যারমাটে তার বোনের স্মৃতির উদ্দেশে একখানা ফলক খাড়া করল বিবাহিত নামেই এবং একটি ট্যাবলেট বসানো হলো ব্রেটনের চার্চে যেখানে ব্রেন্ট’স রক এবং ড্যাণ্ডারসে ক্রফটের গির্জার অবস্থান।
প্রায় এক বছর কেটে গেল। উত্তেজনা থিতিয়ে এসেছে। মহল্লার মানুষজন ব্যস্ত যে যার কাজে। এক বছর আগের কথা কে মনে রাখে? ব্রেন্ট তখনো ফিরে আসেনি। ডিলারকে মদে আরও পেয়ে বসেছে, সে আগের চেয়ে আরও বেশি খিটখিটে এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছে।
তারপর একদিন নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হলো। নতুন মিস্ট্রেসের জন্য সাজানো হলো ব্রেন্ট’স রক। জিওফ্রে ভিকারের কাছে লেখা এক চিঠিতে ঘোষণা করল সে মাস কয়েক আগে এক ইতালীয় ভদ্রমহিলাকে বিয়ে করেছে এবং দু’জনে মিলে বাড়ি ফিরছে।
একদল শ্রমিক নিয়োগ করা হলো বাড়ি ঠিকঠাক করার জন্য। হাতুড়ির দুমদাম আর রাদার ঘর্ষণের শব্দ ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। বাড়িটির একটি অংশ, দক্ষিণ উইংটি পুরোটাই নতুনভাবে নির্মাণ করতে হলো। তারপর শ্রমিকের দল বিদায় নিল যন্ত্রপাতি ফেলে রেখে। পুরনো হলঘরটির কাজকর্ম কিছু বাকি থাকল। কারণ জিওফ্রে ব্রেন্ট ফিরে এসে নিজেই ডেকোরেশনের কাজ তদারক করবে বলেছে। সে সঙ্গে তার শ্বশুরের বাড়ির হলঘরের ড্রয়িং বা ছবিগুলো নিয়ে আসবে। তার ইচ্ছা বাপের বাড়িতে যেমন থেকেছে বধূ, সেরকম ঘরের আশ্বাস যেন সে পায় স্বামীর বাড়ি এসে। যেহেতু হলঘর নতুন করে তৈরি করা হবে সে জন্য কিছু ভারা বাঁধার খুঁটি, তক্তা ইত্যাদি প্রকাণ্ড হলঘরের এক পাশে রেখে দেয়া হয়েছে। সঙ্গে কাঠের একটি প্রকাণ্ড ট্রাঙ্ক বা বাক্সও আছে চুন মেশানোর জন্য। পাশে চুন ভর্তি ব্যাগ।
ব্রেন্ট’স রকের নতুন বউটির আগমন ঘোষণা করা হলো গির্জার ঘণ্টা বাজিয়ে এবং সাধারণ লোকের হর্ষধ্বনির মাধ্যমে। মেয়েটি দেখতে ভারি সুন্দর, যেন পটে আঁকা ছবি। তার মধ্যে আগুনের উত্তাপ আছে, রয়েছে কবিতার স্নিগ্ধতা। অল্প ক’টি ইংরেজি বাক্য শিখে এসেছে ইতালিয়ান বধূ। তাই যখন ভাঙা-ভাঙা উচ্চারণে, সুমিষ্ট গলায় বলল, জিতে নিল মানুষের হৃদয়, তার কাজলকালো আঁখির গলে পড়া সৌন্দর্যও মুগ্ধ করল সবাইকে।
জিওফ্রে ব্রেন্টকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুখী লাগছিল। তবে তাকে যারা অনেক দিন ধরে চেনে তাদের কাছে জিওফ্রের চেহারায় শঙ্কা এবং ভীতির ছাপ নতুনই মনে হবে। মাঝে-মাঝে সে কোন শব্দ শুনে চমকে উঠল যা অন্যদের কানে যায়নি।
দিন বয়ে যায়। ফিসফিসানি শোনা যেতে লাগল ব্রেন্ট’স রকে উত্তরাধিকারী আসছে। জিওফ্রে তার বউয়ের প্রতি খুবই কোমল এবং দু’জনের মাঝের বন্ধন তাকে অনেক নরম করে তুলেছে। সে প্রজাদের দেখভাল করছে, তাদের প্রয়োজনের কথা শুনছে যা আগে কখনো করেনি। তার তরুণী স্ত্রী এবং সে মিলে কিছু চ্যারিটির কাজও করছে। দেখে মনে হয় আসন্ন সন্তানটির ওপরেই সে সমস্ত আশা-ভরসা করে রেখেছে। সে ভবিষ্যতের দিকে যত গভীর দৃষ্টিপাত করছে ততই তার মুখ থেকে অন্ধকারের ছায়াটি ক্রমে হ্রাস পেতে চলেছে।
এদিকে উইকহ্যাম ডিলাণ্ডর কিন্তু তার প্রতিহিংসা পুষে রেখেছে। সুযোগের অপেক্ষায় আছে কখন শোধ নেয়া যায়। ব্রেন্টের স্ত্রীর ওপর প্রতিশোধের চাবুক চালানোর ইচ্ছা তার। কারণ জানে জিওফ্রেকে সবচেয়ে বড় আঘাত করা যাবে যদি তার ভালবাসার মানুষটির কোন ক্ষতি করা যায়। তার মনে হচ্ছে শোধ নেয়ার সুযোগটি পেতে আর বেশি দেরি করতে হবে না।
এক রাতে বাড়ির লিভিংরুমে একাকী বসে আছে উইকহ্যাম ডিলাণ্ডর। একসময় ঘরটি দেখতে বেশ পরিপাটি এবং ছিমছাম ছিল কিন্তু সময়ের কশাঘাতে এবং অযত্ন- অবহেলার কামড়ে কামরাটির বর্তমানে বেহাল দশা। সৌন্দর্যের ছিটেফোঁটাও নেই ঘরটায়। আজ প্রচুর মদ পান করছে উইকহ্যাম, বোধবুদ্ধি প্রায় লোপ পাবার দশা। সে দরজায় কীসের যেন শব্দ শুনে মুখ তুলে চাইল। মনে হচ্ছে কেউ দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। কর্কশ গলায় আগন্তুককে ভেতরে আসতে বলল উইকহ্যাম। কেউ সাড়া দিল না। বিড়বিড় করে একটা গালি দিয়ে আবার গলায় মদ ঢালতে লাগল সে। অল্পক্ষণেই আশপাশের সবকিছু বিস্মৃত হলো সে, একটা ঘোরের মধ্যে যেন চলে গেল, তবে অকস্মাৎ সচেতন হয়ে উঠল সামনে দাঁড়ানো বিধ্বস্ত চেহারার মানুষটিকে নিয়ে, তার বোনের ভৌতিক সংস্করণের মত লাগছে যাকে দেখতে।
কয়েক মুহূর্তের জন্য একটা ভয় জেঁকে ধরল উইকহ্যামকে। তার সামনে দাঁড়ানো নারীটি, বিকৃত চেহারা এবং ধকধক জ্বলতে থাকা চোখ দেখে যাকে মানুষ বলেই চেনা দায়। শুধু একটি দিকেই তার বোনের সঙ্গে মিল আছে বলে মনে হচ্ছে, তা তার একসময়ের সম্পদ সোনালি কেশরাজি যা এখন ধূসর বর্ণ ধারণ করেছে। মহিলা তার ভাইয়ের দিকে শীতল চাউনি মেলে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল; এবং উইকহ্যামও, তাকিয়ে থেকে বুঝতে পেরেছে সত্যি তার বোন এসে উপস্থিত, লক্ষ করল বোনের প্রতি একসময়কার ঘৃণা এ মুহূর্তে তার বুকের মধ্যে দলা পাকিয়ে উঠছে। সে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এখানে কেন? তুমি তো মারা গেছ এবং তোমাকে কবর দেয়া হয়েছে।’
‘আমি এখানে এসেছি, উইকহ্যাম ডিলাণ্ডর, তোমাকে ভালবাসা দেখাতে নয়, বরং তোমার চেয়ে আরেকজনকে আমি অনেক বেশি ঘৃণা করি।’ তার চোখ ঝিকিয়ে উঠল।
‘ওকে?’ জিজ্ঞেস করল উইকহ্যাম, এমন ভয়ঙ্কর জোরে যে মহিলাটি চমকে গেল, পরক্ষণে যদিও সামলে নিল নিজেকে।
‘হ্যাঁ, ওকে,’ জবাব দিল সে। ‘তবে ভুল কোরো না, আমার প্রতিশোধ আমাকেই নিতে দাও। আর এ ব্যাপারে তোমার সাহায্যের প্রয়োজন আমার নেই বললেই চলে।
উইকহ্যাম হঠাৎ প্রশ্ন করল, “ও কি তোমাকে বিয়ে করেছিল?”
মহিলার বিকৃত চেহারা ভৌতিক হাসিতে বিস্তৃত হলো। বীভৎস লাগছে দেখতে। কারণ তার নাক-মুখ সব ভাঙা, চেহারায় অসংখ্য কাটাকুটির দাগ, গায়ের রঙটাও ফ্যাকাসে, অনেক সাদা-সাদা শুকনো ক্ষতচিহ্ন শরীর জুড়ে।
‘তোমার তাহলে জানতে ইচ্ছে করছে! তোমার অহংবোধে আনন্দের পরশ বইবে যদি জানতে পার তোমার বোনের সত্যি বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু তোমাকে আমি তা বলব না। তোমার ওপর এটাই আমার প্রতিশোধ। আজ রাতে এসেছি তোমাকে শুধু জানাতে যে আমি বেঁচে আছি। কাজেই যেখানে আমি যাচ্ছি সেখানে আমার ওপর যদি কোন হামলা হয় তুমি তার সাক্ষী থাকবে।’
‘তুমি যাচ্ছ কোথায়?’ জানতে চাইল তার ভাই।
‘সে আমার ব্যাপার! তোমাকে জানাবার কোন ইচ্ছেই আমার নেই!’
সিধে হলো উইকহ্যাম তবে এত বেশি মদ খেয়েছে যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ঘুরে পড়ে গেল। মেঝেতে চিৎপাত থেকেই সে ঘোষণা করল বোনের পিছু নেবে। বোন যেখানেই যাক না কেন সে তাকে অনুসরণ করবে আঁধারেও তার চুলের আলো আর রূপের ছটা দেখে, হাসতে হাসতে বলল উইকহ্যাম।
এ কথা শুনে ঘুরে দাঁড়াল তার বোন। বলল তার ভাই ছাড়া আরও কেউ-কেউ আছে যারা তার চুল এবং রূপ নিয়ে অনুতাপ করবে।
‘রূপ চলে গেলেও চুল থাকবে,’ হিসিয়ে উঠল সে।
‘সে যখন গাড়ির চাকার লোহার খিলটা খুলে দিয়ে আমাদেরকে খাদের নিচে নদীতে ফেলে দিয়েছিল ওইসময় সে আমার রূপ-সৌন্দর্যের কথা ভাবেনি। হয়তো তার চেহারাও আমার মত ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাবে ভিসতোর পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ে আমার যেমনটি হয়েছে এবং নদীর ভাসমান বরফখণ্ডে যেভাবে আমার দেহ ঠাণ্ডায় জমাট বেঁধে গিয়েছিল, তারও তেমন হবে। ওকে সাবধান করে দিয়ো। ওর সময় কিন্তু ঘনিয়ে আসছে!’ বলে সে একটানে দরজা খুলে রাতের আঁধারে মিলিয়ে গেল।
.
দুই
সেই রাতে আধঘুমন্ত মিসেস ব্রেন্ট হঠাৎ জেগে উঠে তার স্বামীকে বলল, “ওগো, শুনছ? আমাদের জানালার নিচে খুট করে কীসের যেন শব্দ হলো!’
মিসেস ব্রেন্টের যদিও ধারণা শব্দটি শুনে জিওফ্রেও চমকে উঠেছিল-কিন্তু মনে হলো গভীরভাবে ঘুমাচ্ছে সে, জোরে-জোরে শ্বাস নিচ্ছে। আবার ঝিমুনি এসে গেল মিসেস ব্রেন্টের; তবে এবারে জাগল সে স্বামীকে বিছানা ছেড়ে উঠে জামাকাপড় পরতে দেখে। জিওফ্রের চেহারা একদম ফ্যাকাসে, তার হাতে ধরা বাতির আলো মুখে পড়তেই তার চোখ দেখে রীতিমত ভয় পেয়ে গেল মিসেস ব্রেন্ট।
‘কী হলো, জিওফ্রে? কী করছ?’ জিজ্ঞেস করল সে।
‘চুপ করো!’ অদ্ভুত খসখসে গলায় জবাব দিল জিওফ্রে। ‘ঘুমাও। আমার একটু অস্থির লাগছে। অর্ধসমাপ্ত একটি কাজ শেষ করা দরকার।
‘কিন্তু একা-একা আমার ভয় লাগবে তো,’ বলল মিসেস ব্ৰেণ্ট।
প্রত্যুত্তরে জিওফ্রে তার গালে চুমো খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল পেছনে দরজা বন্ধ করে। মিসেস ব্রেন্ট কিছুক্ষণ জেগে থাকল তারপর এমন ঘুম চেপে এল সে আর চোখ মেলে তাকিয়ে থাকতে পারল না। ঘুমিয়ে পড়ল।
হঠাৎ একটা চিৎকার শুনে ঘুম টুটে গেল তার। কাছেপিঠেই কেউ চিৎকার দিয়েছে। লাফিয়ে বিছানায় উঠে বসল সে, এক ছুটে চলে গেল দরজায়। কান পাতল। নাহ্, কোন শব্দ শোনা যাচ্ছে না। স্বামীর জন্য শঙ্কাবোধ করল সে। হাঁক দিল: ‘জিওফ্রে! জিওফ্রে!’
একটু বাদে প্রকাণ্ড হলঘরের দরজা খুলে গেল। উদয় হলো জিওফ্রে। তবে হাতে বাতিটি নেই।
‘হাশ্!” ফিসফিস করল সে তবে গলার স্বর কর্কশ এবং কঠিন। ‘হাশ্। বিছানায় যাও! আমি কাজ করছি এবং একদম বিরক্ত কোরো না। ঘুমাতে যাও। চিৎকার-চেঁচামেচি করে গোটা বাড়ি মাথায় তুলো না!”
স্বামীর কণ্ঠের রূঢ়তা মিসেস ব্রেন্টের বুক হিমশীতল করে দিয়েছে-এরকম আচরণের সঙ্গে অপরিচিত সে-পা টিপে-টিপে ফিরে গেল বিছানায় এবং ওখানে শুয়ে কাঁপতে লাগল। এমন ভয় পেয়েছে কাঁদতেও পারছে না। প্রতিটি শব্দ শুনতে থাকল সে।
দীর্ঘ নৈঃশব্দ শেষে লোহা দিয়ে কিছুতে বাড়ি মারার ভোঁতা আওয়াজ কানে ভেসে এল মিসেস ব্রেন্টের! তারপর ভারি কোন পাথর পড়ল দুড়ুম করে, কেউ গালি দিয়ে উঠল। তবে আওয়াজটা চাপা শোনাল। এরপরে কিছু টেনে নেয়ার শব্দ, তারপরে আরও পাথরের দুড়ুম-দাড়ুম আওয়াজ। ভয়ে কাঠ হয়ে শুয়ে রইল মিসেস ব্রেন্ট। দমাদম পিটছে হৃৎপিণ্ড কোন কিছু ঘষার অদ্ভুত শব্দ শুনল সে। তারপর সব চুপচাপ একটু পরেই খুলে গেল দরজা। উদয় হলো জিওফ্রে। তার স্ত্রী ঘুমের ভান করে মটকা মেরে শুয়ে থাকল তবে চোখের পাতা সামান্য ফাঁক করে দেখল তার স্বামী হাত ধুচ্ছে। সাদা চুনের মত কী যেন লেগে রয়েছে হাতে।
পরদিন সকালে সে গতরাতের ঘটনা উল্লেখ করল না দেখে মিসেস ব্রেন্টও ভয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারল না।
ওই দিন থেকে মনে হলো জিওফ্রে ব্রেন্টের ওপর কিছু একটা ছায়া যেন পড়েছে। সে আগে যেভাবে নিয়ম করে খাওয়া-দাওয়া করত তা বাদ দিল। ঘুমাচ্ছেও না ঠিকমত। সেই পুরনো অভ্যাসগুলো আবার ফিরে এল তার মধ্যে যেন কেউ পেছন থেকে তাকে ওগুলো অনুসরণ করতে বলছে। পুরনো হলঘরটির নেশায় যেন পেয়ে বসল তাকে। দিনের বেলা বহুবার সে ওখানে যায় তবে যে কেউ ও ঘরে প্রবেশ করলে, এমনকী তার স্ত্রীও, অধৈর্য ও বিরক্ত হয়ে ওঠে জিওফ্রে। ভবন নির্মাতার ফোরম্যান তার অসমাপ্ত কাজ করতে এল একদিন। জিওফ্রে তখন বাইরে। সে ফিরে এসে ভৃত্যের কাছে যে-ই শুনল ফোরম্যান হলঘরে এসেছে মেরামতির কাজে, চাকরটাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে ছুটল ওদিকে। হলঘরের দরজায় ফোরম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো জিওফ্রের। সবেগে ঘরে ঢোকায় লোকটার সঙ্গে সে বাড়ি খেল। ফোরম্যান ক্ষমাপ্রার্থনার স্বরে বলল, ‘মাফ করবেন, স্যর। আমি একটু ইনকুয়ারির কাজে এসেছিলাম। বারো বস্তা চুন রেখে দিয়েছিলাম এখানে। কিন্তু এখন দেখছি দশ বস্তা আছে।’
‘রাখো তোমার বস্তা!’ খেঁকিয়ে উঠল জিওফ্রে।
ধমক খেয়ে বিস্মিত ফোরম্যান। তবু সে বলল, ‘এখানে একটা ঝামেলা হয়েছে, স্যর। আমাদের লোকদেরই বোধহয় কাজ ওটা। তবে কাজটা আবার করাতে আপনাকেই গাঁটের পয়সা খরচ করতে হবে।’
‘মানে?’
‘কোন গর্দভ ফায়ারপ্লেসের পাথরের ওপর ভারা বাঁধতে গিয়ে ওটার মাঝখান থেকে চিড় ধরিয়ে দিয়েছে, স্যর। তবে অনেক মজবুত চুল্লি বলে এখনো খাড়া হয়ে আছে
শুনে এক মুহূর্ত চুপ থাকল জিওফ্রে। তারপর টানটান গলায় তবে ভদ্রভাবে বলল, ‘তোমার লোকদের বলো গিয়ে হলঘরে এখন কোন কাজ করতে হবে না। ওটা কিছুদিন এরকমই পড়ে থাকবে।
‘ঠিক আছে, স্যর। আমি কয়েকজন লোক পাঠিয়ে দেব খুঁটি, তক্তা আর চুনের বস্তাগুলো নিয়ে গিয়ে. হলঘরটি পরিষ্কার করে দিতে।’
‘না! না!” বলল জিওফ্রে। ‘যা যেমন আছে তেমনই * থাকবে। কখন কাজ শুরু করবে আমি তোমাকে খবর পাঠাব।’
ফোরম্যান চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল আগেকার কাজের বিল সে পাঠিয়ে দেবে।
ডিলার বার দুই ব্রেন্টকে রাস্তায় থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে শেষে একদিন হেঁকে বলল, ‘আমার বোনের তুমি কী করেছ, তোমার স্ত্রী?’
জিওফ্রে প্রত্যুত্তরে তার ঘোড়ার পিঠে চাবুক মেরে আরও জোরে ছুটিয়ে দিল গাড়ি। আর ডিলাণ্ডর জিওফ্রের সাদা হয়ে যাওয়া মুখ এবং প্রায় অজ্ঞান মিসেস ব্রেন্টকে দেখে খুব মজা পেয়ে কর্কশ হাসিতে ফেটে পড়ল।
সেই রাতে জিওফ্রে হলঘরে ঢুকে ফায়ারপ্লেসের সামনে গেল। তার গলা চিরে বেরিয়ে এল আর্তচিৎকার। পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে একটি বাতি নিয়ে এল সে। ঝুঁকল ফায়ারপ্লেসের ভাঙা পাথরের ওপর। জানালা দিয়ে ভেসে আসা জোসনার আলো তার দৃষ্টিশক্তির সঙ্গে বেঈমানি করছে কিনা দেখতে। ক্রুদ্ধ গাঁকগাঁক শব্দ করে হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল জিওফ্রে।
ভাঙা পাথরের ফাটল বা চিড় দিয়ে বেরিয়ে আসা সোনালি কেশরাজির সঙ্গে মিশে আছে ধূসর চুল!
দরজায় শব্দ হতেই সচকিত হয়ে উঠল সে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তার স্ত্রী দাঁড়িয়ে আছে দোরগোড়ায়। আবিষ্কারটি আড়াল করার বেপরোয়া চেষ্টায় সে দেশলাই দিয়ে বাতিতে আগুন ধরিয়ে উবু হলো এবং ভাঙা পাথর থেকে বেরিয়ে আসা চুলের গোছা পুড়িয়ে ফেলল। তারপর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে খাড়া হলো সে এবং স্ত্রীকে তার পেছনে দেখে অবাক হওয়ার ভান করল।
পরবর্তী এক হপ্তা তীব্র বেদনা আর যন্ত্রণায় কাটল তার। হলঘরে ‘সে বেশিক্ষণ একা থাকার সাহসই পেল না। যখনই ওখানে গেল জিওফ্রে দেখতে পেল ফাটল থেকে বেরিয়ে আছে নতুন গজানো সোনালি চুল। খুন হওয়া মহিলার লাশ কী করে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া যায় তার পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করল সে। কিন্তু প্রতিবারই সে বাধাপ্রাপ্ত হলো। একবার সে তার গোপন বা ব্যক্তিগত দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় স্ত্রীর মুখোমুখি হয়ে গেল। মিসেস ব্রেন্ট তাকে জেরা করতে লাগল। এবং গোপন দরজার চাবিটি স্ত্রীকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও দেখাতে বাধ্য হলো।
জিওফ্রে তার স্ত্রীকে ভীষণ ভালবাসে। তাই নিজের ভয়ঙ্কর গোপন ব্যাপারটি তার স্ত্রী জেনে যেতে পারে কিংবা তাকে কোন কারণে সন্দেহ করতে পারে এ ভাবনা তার জন্য ভয়ানক মর্মপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়াল। তবে কয়েকদিন পরে সে ঠিকই বুঝতে পারল তার বউ তাকে সন্দেহের চোখে দেখছে।
সেদিন সন্ধ্যায় সান্ধ্যভ্রমণ শেষে মিসেস ব্রেন্ট বাড়ি ফিরে দেখে তার স্বামী পরিত্যক্ত ফায়ারপ্লেসের সামনে গম্ভীরভাবে বসে আছে। সে সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলল।
‘জিওফ্রে, আমি ওই ডিলার লোকটির সঙ্গে কথা বলেছি। সে ভয়ঙ্কর কিছু কথা বলেছে। বলল সপ্তাহখানেক আগে নাকি তার বোন তার সঙ্গে দেখা করেছিল। খুবই বিধ্বস্ত এবং বিপর্যস্ত চেহারা, শুধু সোনালি চুলগুলো আগের অবস্থায় রয়েছে। সে তার ভাইকে তার কিছু ইচ্ছের কথা শুনিয়েছে। ডিলার আমাকে জিজ্ঞেস করেছে তার বোন কোথায় আছে-কিন্তু, জিওফ্রে, সে তো মারা গেছে। সে মৃত! তাহলে সে কী করে ফিরে আসে? আমার ভীষণ ভয় করছে, গো! কী করব বুঝতে পারছি না!’
জবাবে বিশ্রী ভাষায় গালাগাল করে উঠল জিওফ্রে। কুৎসিত সেই গালাগালের স্রোত কুঁকড়ে দিল মিসেস ব্রেন্টকে। সে ডিলাণ্ডর, তার বোন এবং তার চোদ্দ গোষ্ঠীর সবাইকে অভিসম্পাত দিতে লাগল, বিশেষ করে ডিলাওরের বোনের সোনালি চুল নিয়ে সবচেয়ে বেশি গালিগালাজ করল।
“ওহ, চুপ করো! চুপ করো!” বলল মিসেস ব্রেন্ট। তারপর স্বামী তাকে আবার কী বলে বসে সেই ভয়ে নিজেই নিশ্চুপ হলো। রাগের চোটে খাড়া হলো জিওফ্রে, সরে এল চুল্লির সামনে থেকে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল স্ত্রীর চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠতে দেখে। তার চাউনি অনুসরণ করল জিওফ্রে এবং স্ত্রীর মত সে-ও কেঁপে উঠল চুল্লির ফাটল থেকে এক গোছা সোনালি চুল বেরিয়ে আছে দেখে।
‘দেখো! দেখো!’ চিৎকার দিল মিসেস ব্রেন্ট। ‘ওটা নিশ্চয়ই ভূতের চুল। সরে এসো সরে এসো!’ সে উন্মাদিনীর মত স্বামীর হাত ধরে টানতে-টানতে কামরা থেকে বেরিয়ে পড়ল।
সেই রাতে প্রবল জ্বর এল মিসেস ব্রেন্টের। জেলার ডাক্তার খবর পেয়ে সঙ্গে-সঙ্গে ওকে দেখতে এলেন। লণ্ডনে টেলিগ্রাম পাঠানো হলো বিশেষ সাহায্য পাঠানোর জন্য। তরুণী স্ত্রীর অসুস্থতায় হতাশায় মুষড়ে পড়েছে জিওফ্রে। ভুলে গেছে নিজের অপরাধ এবং তার পরিণাম সম্বন্ধে। সন্ধ্যা নাগাদ বিদায় নিলেন ডাক্তার কারণ তাঁকে আরও রোগী দেখতে যেতে হবে। তবে যাওয়ার আগে জিওফ্রেকে বললেন, ‘তোমার স্ত্রীর ঠিকমত দেখভাল কোরো। তাকে খোশমেজাজে রাখার চেষ্টা করবে। আমি কাল সকালে আবার আসব। আর লণ্ডন থেকে কেউ এসে গেলে তো ভালই। খেয়াল রেখো তোমার স্ত্রী যেন কোনরকম মানসিক আঘাত না পায় কিংবা উত্তেজিত হয়ে না ওঠে। ওকে ফূর্তিতে রাখতে হবে। আপাতত এটিই চিকিৎসা।’
সেই রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, জিওফ্রের স্ত্রী বিছানায় উঠে বসে তার স্বামীকে ডাকল, “ওঠো! চলো, হলঘরে একবার যাই। আমি জানি সোনা কোথা থেকে আসছে! আমি দেখতে চাই ওটা কীভাবে বাড়ছে!”
জিওফ্রে জানে স্ত্রীকে বাধা দেয়ার চেষ্টা বৃথা কারণ তাতে সে উত্তেজিত হলে হিতে বিপরীত হবে। হয়তো চিৎকার- চেঁচামেচি করে নিজের সন্দেহের কথা প্রকাশ করে দিতে পারে তার স্ত্রী। অগত্যা সে স্ত্রীর গায়ে কম্বল মুড়িয়ে দিয়ে তাকে নিয়ে পুরনো হলঘরে চলল। হলঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল মিসেস বেণ্ট।
‘আজ রাতে আমাদের তিনজনের মধ্যে অন্য কাউকে আমি চাই না,’ ফ্যাকাসে হেসে ফিসফিস করল সে।
‘তিনজন! বলো দু’জন,’ কেঁপে উঠল জিওফ্রে। এর বেশি কিছু বলার সাহস পেল না।
‘বসো।’ বলল তার স্ত্রী। নিভিয়ে দিল বাতি। ‘চুল্লির ধারে বসো এবং দেখো কীভাবে বেড়ে ওঠে সোনা। রুপোলি চাঁদের আলোও তাকে হিংসে করবে। দেখো, আলোটা কীভাবে মেঝে বেয়ে সোনার দিকে এগোচ্ছে-আমাদের স্বর্ণ!’-
নির্জলা আতঙ্ক নিয়ে দেখল জিওফ্রে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকল সে সম্মোহিতের মত। দেখল চুল্লির ফাটল দিয়ে একটু-একটু করে বেরিয়ে আসছে সোনালি কেশরাজি। যেন সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে একবার চেষ্টা করেছিল ফাটলে পা দিয়ে গর্তটা আড়াল করতে। কিন্তু পাশের চেয়ারে বসা তার স্ত্রী তাকে বাধা দিয়েছে। স্বামীর কাঁধে মাথা রেখে বলেছে, ‘নড়াচড়া কোরো না, গো। চুপচাপ বসে দেখো। আমরা স্বর্ণবৃদ্ধির গোপন রহস্য দেখব। জিওফ্রে তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ বসে রইল। চাঁদের আলো মেঝে বেয়ে-বেয়ে একটু-একটু করে এগোচ্ছে, মিসেস ব্রেন্ট ঘুমিয়ে পড়ল।
স্ত্রীকে জাগানোর সাহস হলো না জিওফ্রের। তাই সে দুঃখী চেহারা নিয়ে পাথরের মত বসে থাকল এবং অসহ্য সময়গুলো পেরোতে লাগল।
জিওফ্রের আতঙ্ক ভরা চোখের সামনে ভাঙা চুল্লির ফাটলের মাঝে সোনালি চুল লম্বায় ক্রমে বাড়তেই থাকল। ওটা যত দীর্ঘ হচ্ছে আকারে, জিওফ্রের বুক ততই হিমশীতল হয়ে আসছে। একটা সময় সে নড়াচড়ার শক্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলল, শুধু ত্রাস নিয়ে দেখল তার নিয়তি।
.
পরদিন সকালে লণ্ডন থেকে ডাক্তার এসে হাজির হলেন। কিন্তু জিওফ্রে কিংবা তার স্ত্রীর কোথাও হদিস মিলল না। সব কামরায় চলল বৃথা তল্লাশি। শেষে পুরনো হলঘরের প্রকাণ্ড দরজা ভেঙে ফেলার পরে মর্মান্তিক একটি দৃশ্য চোখে পড়ল সবার।
ওখানে, পরিত্যক্ত প্রকাণ্ড চুল্লির সামনে ঠাণ্ডায় জমে মারা গেছে জিওফ্রে এবং তার স্ত্রী। দু’জনেরই মুখ সাদা। তবে মিসেস ব্রেন্টের চেহারায় শান্তির ছাপ, চোখ বোজা, যেন ঘুমের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে সে। কিন্তু জিওফ্রেকে দেখে ভয় পেল সবাই। তার চেহারা দেখেই বোঝা যায় কিছু একটা দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে মারা গেছে সে। তার চোখ খোলা, চকচক করছে, তাকিয়ে আছে নিজের পায়ের দিকে। ওখানে পাকিয়ে আছে কয়েক গোছা সোনালি চুল, তাতে ধূসর কেশেরও আভাস রয়েছে, চুলগুলো বেরিয়ে এসেছে ভাঙা ফায়ারপ্লেসের একটা ফাটল বা গর্ত দিয়ে।
