বাঁশি – অনীশ দাস অপু
বাঁশি
‘আপনার কাজ তো শেষ, প্রফেসর,’ অক্টোগ্রাফির প্রফেসরকে উদ্দেশ্য করে বলল একজন। ‘আপনার বোধহয় যাওয়ার সময় হয়ে এল।’
যাকে উদ্দেশ্য করে বলা সে বয়সে তরুণ, নাম পারকিন্স। সেন্ট জেমস কলেজে ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। সে এখানে একজন আমন্ত্রিত অতিথি। সে বলল, ‘হ্যাঁ। আমার বন্ধুরা গলফ খেলার দাওয়াত দিয়েছে। আমি বোধহয় ইস্ট কোস্টে যাব-বার্নস্টোতে। এক সপ্তাহ বা দশ দিনের জন্য। চর্চাটা একটু ঝালিয়ে নিয়ে আসব। কালই রওনা হব ভাবছি।’
‘বার্নস্টো গেলে একবার টেম্পলারের প্রিসেপ্টরিতে ঘুরে এসো। ওখানে দেখার মত অনেক কিছু আছে। খোঁড়াখুঁড়িও করতে পারবে।’ টেবিলের একপাশ থেকে পরামর্শ দিল পারকিন্সের এক পড়শী।
‘নিশ্চয়,’ সায় দেয়ার ভঙ্গিতে বলল পারকিন্স।
‘ওটা গ্লোব ইন হোটেল থেকে পৌনে এক মাইল দূরে, ‘ বলল পড়শী। ‘ম্যাপে বিস্তারিত পাবে। আমার ইচ্ছে আছে সপরিবারে একবার ওখান থেকে ঘুরে আসব। আচ্ছা, তুমি ওখানে উঠছ কোথায়?”
‘কেন, গ্লোব ইনে,’ জবাব দিল তরুণ প্রফেসর। ‘ওখানে একটা রুম ভাড়া করেছি আমি। কোন লজিং হাউস পাইনি। শীতের সময় বেশিরভাগ লজিং হাউসই বন্ধ থাকে। ওখানে ডাবল বেডের একটা রুম পেয়েছি। একদিক থেকে ভালই হলো। আমার বড় রুমই দরকার ছিল। বেশ কিছু বইপত্র নিয়ে যাব সঙ্গে। পড়াশোনা করব।’
‘তবে ডাবল বেডের রুমে তোমার একা থাকতে ভাল না লাগলে বোলো আমি চলে আসব,’ বলল পারকিন্সের এক বন্ধু
হাসল পারকিন্স। ‘তুমি এলে ভালই হবে, রজার্স, কিন্তু তুমি তো গলফ খেলো না। তোমার নিশ্চয় বিরক্তি লাগবে।’
‘তা অবশ্য লাগবে,’ মাথা ঝাঁকাল রজার্স।
‘আর লেখালেখির সময়টুকু ছাড়া আমি হয়তো গলফ নিয়ে ব্যস্ত থাকব। তুমি তখন একা একা বিরক্তই হবে।’
‘বুঝতে পারছি, পারকিন্স। তুমি আসলে চাইছ না আমি যাই। সত্যি কথাটা বলে ফেলো, ভাই। আমি একটুও মাইণ্ড করব না।’
পারকিন্স খুব বিনয়ী স্বভাবের মানুষ। তার বন্ধু রজার্স অন্যদের ওপর মাঝে মাঝে মাতব্বরি ফলায় এবং এ জিনিসটি তার ঠিক পছন্দ নয়। তবে সে বলল, ‘তোমাকে সত্যি বলছি, রজার্স, আমার ভাড়া করা রুমটি দু’জনে আরাম করে থাকার মত বড়সড় কিনা আমি ঠিক জানি না। তবে তুমি আমার কাজে যদি কোন বাগড়া না দাও তাহলে আসতে পার।’
হো হো করে হাসল রজার্স। ‘বেশ, পারকিন্স! কথা দিচ্ছি তোমার কাজে কোনরকম বিরক্ত করব না। তবে তুমি না চাইলে আমি যাচ্ছিও না। তবে ভাবলাম তুমি আবার ভূতের ভয়টয় পাও কিনা। তাই তোমাকে সঙ্গ দিতে চাওয়া আর কী!’ সে পাশের লোকটির দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। পারকিন্সের মুখ লাল হয়ে গেছে দেখে তাড়াতাড়ি যোগ করল, ‘দুঃখিত, পারকিন্স। আমার কথাটা বলা উচিত হয়নি। ভুলেই গিয়েছিলাম তুমি এসব লঘু বিষয় নিয়ে কথা বলতে মোটেই ‘পছন্দ কর না।’
‘আমি ভূত প্রেত বিশ্বাস করি না তাই এসব আজেবাজে বিষয় নিয়ে কথা বলতেও চাই না,’ বলল পারকিন্স। তার গলার স্বর একটু চড়ে গেল।
পারকিন্স চটে যাচ্ছে দেখে আবারও ক্ষমাপ্রার্থনা করল রজার্স। তাই এ বিষয়টি নিয়ে তর্কের পরিসমাপ্তি ওখানেই ঘটল। খেতে খেতে মামুলি বিষয় নিয়ে গল্প চলল। তবে বাকি সময়টুকু পারকিন্স চুপ করেই থাকল।
.
দুই
পরদিন ট্রেনে চেপে বার্নস্টো চলে এল পারকিন্স। উঠল গ্লোব ইন হোটেলে, ডাবল বেডের কামরায়। রুমটি বেশ বড়সড়। সমুদ্রের দিকে মুখ ফেরানো জানালা রয়েছে রুমের তিনদিকে। মাঝখানের জানালাটি যেন সোজা তাকিয়ে আছে সাগর পানে। বাম এবং ডানের জানালা দিয়ে উত্তর ও দক্ষিণের সমুদ্র সৈকত চোখে পড়ে। দক্ষিণে বার্নস্টো গ্রাম। উত্তর দিকে কোন বাড়িঘর নেই, শুধু সাগর সৈকত আর নিচু নিচু পাহাড়। পাহাড়গুলোর সামনে ঘাস জমি, পুরনো নোঙর, নোঙর বাঁধার খুঁটি ইত্যাদি রয়েছে। তারপর চওড়া একটি পথ। ওই পথ ধরে গেলে সৈকত। গ্লোব ইন থেকে সাগরের দূরত্ব যাই মনে হোক না কেন, আসলে ষাট গজের বেশি নয়।
গ্লোব ইনে পারকিন্স ছাড়া আরও যেসব বাসিন্দা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে আছেন গলফ খেলোয়াড়, সামরিক বাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল যিনি বাজখাই গলায় কথা বলেন। তাঁর নাম কর্নেল উইলসন। গোঁফঅলা এই ভদ্রলোক বেশ আলাপী এবং পারকিন্সের সঙ্গে তাঁর খাতির হতে বেশি সময় লাগল না।
বার্নস্টোতে আসার দিন দুই পরে রজাসের বর্ণিত টেম্পলারে ঘুরতে গেল পারকিন্স। এদিকে উঁচু নিচু অনেক মাটির ঢিবি আছে। ওর আবছা মনে পড়ে এদিকটাতে গোলাকার অনেক চার্চ ছিল। ঢিবিগুলোও গোলাকার। এসব জায়গায় এলে অপেশাদার মানুষজনের মনেও খোঁড়াখুঁড়ির ইচ্ছে জাগে।
উঁচু, আয়তাকার একটি জায়গা নজর কাড়ল পারকিন্সের। ওটি বৃত্তাকার জায়গাটির ঠিক মাঝখানে। দেখে মনে হয় কোন পাটাতন কিংবা বেদীর ভিত। ওটার উত্তর পাশে ঘাস জমি অদৃশ্য। ওখানকার মাটি খুঁড়লে হয়তো ইটপাথরের কোন নির্মাণ কাজ চোখে পড়তে পারে। সে একটা ছুরি নিয়ে ওখানকার মাটি খুঁড়তে লাগল। খুঁড়তে গিয়ে ভেতরের দিকে অনেকটা মাটি পড়ে গেল ঝুরঝুর করে উন্মোচিত হলো ছোট একটি গর্ত বা ফোকর। দেশলাই জ্বালল পারকিন্স, গর্তের ভেতরে কী আছে দেখবে। কিন্তু প্রবল বাতাসে একটার পর একটা দেশলাই নিভে গেল। পারকিন্স ছুরি দিয়ে আরও খুঁড়তে লাগল গর্ত। তার মনে হচ্ছে এটি প্রাকৃতিক নয়, মনুষ্য নির্মিত কোন কৃত্রিম গর্ত। গর্তটা চৌকোনা তবে ভেতরে কিছুই নেই।
হতাশ হয়ে হাতের ছুরিটি বের করে আনছে পারকিন্স, ধাতব কিছুর গায়ে লেগে ঠুন করে শব্দ হলো। গর্তের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিল ও। গর্তের মেঝেতে সিলিণ্ডারের মত কিছু একটার স্পর্শ পেল। জিনিসটা তুলে আনল পারকিন্স গোধূলির আবছা আলোয় পরখ করল। ধাতব একটি টিউব, ইঞ্চি চারেক লম্বা, দেখেই বোঝা যায় বহুকাল আগের জিনিস।
ওখানে দেখার মত আর কিছু নেই। তাই খোঁজাখুঁজি বাদ দিল পারকিন্স। অবশ্য সন্ধ্যাও হয়ে এসেছে। চাইলেও আর কিছুর খোঁজ করতে পারত না সে। ধাতব জিনিসটি পকেটে ফেলে হোটেলের পথ ধরল পারকিন্স। তবে কিছুদূর যেতে মনে হলো কেউ তার পেছন পেছন আসছে।
ঘাড় ফেরাল পারকিন্স। সত্যি একটা লোক আসছে। বেশ দূরে আছে লোকটা। সে কি পারকিন্সের সঙ্গী হতে চায়? কিন্তু ওকে তো পারকিন্স চেনে না। কাজেই তার জন্য অপেক্ষা করার মানেও হয় না। অত দূর থেকে লোকটার চেহারা চেনার প্রশ্নই নেই। কালো একটা মূর্তির মত লাগছে।
‘কী করব আমি?’ ভাবছে পারকিন্স। ‘আমি যদি ওই লোকটার জন্য দাঁড়াই আর যদি দেখি হলুদ আকাশের পটভূমিকায় তার মাথায় দুটো শিং আর কাঁধে ডানা ফুটে আছে, তাহলে কী হবে? ওই লোকের জন্য আমার অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। কারণ সে যে গতিতে হাঁটছে তাতে নির্ঘাত ডিনার মিস করবে। আমিও ওর জন্য অপেক্ষা করলে একই ঘটনা ঘটবে। ডিনারের সময়ও বেশি নেই। কাজেই ভাগো!”
পারকিন্স জোর কদমে পা চালাল এবং আর পিছু ফিরে দেখল না। সে অবশ্য ডিনারের আগেই হোটেলে ফিরতে পারল। কর্নেলের সঙ্গে ডিনার করল সে। তারপর রুমে ফিরল।
সে প্যাসেজ ধরে হাঁটছে, হোটেলের এক বেয়ারা তার সামনে এসে বলল, ‘মাফ করবেন, স্যর। আজ আপনার কোট ব্রাশ করতে গিয়ে একটা জিনিস পড়ে যায় পকেট থেকে। আমি ওটা আপনার রুমের চেস্ট অভ ড্রয়ারে রেখে দিয়েছি। জিনিসটা বাঁশির মত, স্যর। ধন্যবাদ, স্যর। জিনিসটা আপনার চেস্ট অভ ড্রয়ারে পাবেন, স্যর। জি, স্যর। গুড নাইট, স্যর।’
বেয়ারার কথা শুনে বিকেলের আবিষ্কারের কথা মনে পড়ে গেল পারকিন্সের। সে নিজের ঘরে এসে জিনিসটা চেস্ট অভ ড্রয়ার থেকে বের করল। কৌতূহল নিয়ে ওটা মোমবাতির আলোয় দেখতে লাগল।
ব্রোঞ্জের তৈরি জিনিস। আধুনিক যুগের ডগ হুইসলের মত দেখতে যে বাঁশি বাজিয়ে কুকুরদের ডাকে তাদের মালিক বা ট্রেনাররা। আসলে এটা একটা হুইসলই বটে। সে ওটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে এল। কিন্তু বাঁশির গায়ে বালু এবং মাটি লেগে রয়েছে। ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে বালু আর শক্ত মাটি পরিষ্কার করল পারকিন্স। ময়লা আবর্জনাগুলো রাখল এক টুকরো কাগজে। ওগুলো ফেলতে এগিয়ে গেল জানালার ধারে। বাইরের আকাশ নির্মল এবং উজ্জ্বল। জানালা খুলল পারকিন্স
সাগরের দিকে তাকাতে দেখতে পেল সরাইখানার সামনে এক লোক হাঁটাহাঁটি করছে। সে ময়লাগুলো বাইরে ফেলে দিয়ে বন্ধ করল জানালা। অবাক লাগছে ভেবে এত রাতেও বার্নস্টোর মানুষজন রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে। সে হুইসলটি নিয়ে আবার বাতির কাছে গেল। পরীক্ষা করে দেখল। ব্রোঞ্জের বাঁশির গায়ে নানারকম চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। না, চিহ্ন কোথায়—এগুলো তো অক্ষর! এক ধরনের ইন্সক্রিপশন। হুইসলের সামনে এবং পেছনে উভয় জায়গায় লেখাগুলো রয়েছে:
FLA
FVR BIS
FLE
পেছনে লেখা:
QUIS EST ISTE QUI UENIT
আর ল্যাটিন লেখাগুলোর সামনে পেছনে রয়েছে স্বস্তিকা চিহ্ন।
ল্যাটিন ভাষা মোটামুটি জানে পারকিন্স। তাই লেখার মর্মোদ্ধার করতে পারল। ওপরের লেখাগুলোর অর্থ হলো: “কে ও আসছে?”
পারকিন্স মনে মনে বলল, ‘কে আসছে? বাঁশিটা বাজিয়েই দেখা যাক।’
সে বাঁশিতে ফুঁ দিল এবং চমকে গেল। একটা অদ্ভুত শিসের সুর বেরিয়ে এসেছে বাঁশি থেকে। সুরটা যেন ভেসে ভেসে অনেক দূরে চলে গেল। শিসটার মধ্যে এমন কোন শক্তি যেন লুকিয়ে ছিল যা পারকিন্সের মস্তিষ্কে এক মুহূর্তের জন্য কতগুলো ছবি তৈরি করল। সে রাতের একটি দৃশ্য দেখতে পেল।
শোঁ শোঁ বাতাস বইছে। একা একটি লোক রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। তবে দৃশ্যটি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না মস্তিষ্কে। জানালা দিয়ে প্রবল ঝোড়ো একটা হাওয়া এসে চমক ভাঙাল পারকিন্সের। সে মুখ তুলে তাকাল। সামুদ্রিক একটা পাখির সাদা ডানা এক সেকেণ্ডের জন্য দেখতে পেল অন্ধকার শার্সির ওপাশে।
হুইসলের শিস এমনই মুগ্ধ করেছে পারকিন্সকে সে আরেকবার বাজানোর লোভ সামলাতে পারল না। এবারে আরও জোরে বাজল বাঁশি তবে সুর বেশিক্ষণ স্থায়ী রইল না। কিন্তু কোন ছবি দেখা গেল না যদিও মনে মনে তেমনটাই আশা করছিল সে।
‘কিন্তু এটা কী জিনিস?’ ভাবছে পারকিন্স। ‘হুইসল বাজানোর পরপরই কী জোরে বাতাস এল যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে।’
বাতাসে মোমবাতি নিভে গেছে। কিন্তু বাইরে এখনো তীব্র বাতাস বইছে। জানালা বন্ধ করা যাচ্ছে না বাতাসের চাপে। অনেক কসরত করে জানালা বন্ধ করল পারকিন্স। বাতাসের সঙ্গে রীতিমত ধস্তাধস্তি করতে হলো ওকে। বিকট শব্দে বন্ধ হলো জানালা। আওয়াজে ওপরতলার কর্নেলের বোধহয় ঘুম ভেঙে গেছে। তিনি মেঝেতে পা ঠুকে বিরক্তি প্রকাশ করলেন।
আলো জ্বালল পারকিন্স। না, জানালার কাচটাচ ভাঙেনি। তবে বাইরে বাতাসের তাণ্ডব থামেনি। গর্জন করছে, হুঙ্কার ছাড়ছে। চিৎকারের শব্দ তুলছে। এমন ঝোড়ো বাতাসে ঘুমাবে কার সাধ্য? তবে ঘুমাতে গেল পারকিন্স।
কিন্তু ঘুম এল না তার। চোখ বুজলেই নানান ছবি দেখতে পাচ্ছে সে, আবার চোখ মেললেই ছবিগুলো অদৃশ্য। সে সমুদ্র সৈকতের ছবি দেখে। লম্বা সৈকত। জনমনিষ্যির চিহ্ন নেই কোথাও। আবছা আলো চারপাশে। থমথম করছে প্রকৃতি। যেন ঝড় আসবে। তারপর দেখা যায় দূরে একটা ফুটকির মত জিনিস। একটু পরে বোঝা যায় ওটা কোন মানুষ। ছুটছে, লাফাচ্ছে, সৈকতের তীরে বাঁধের ওপর উঠছে এবং প্রতি সেকেণ্ডে সে পেছন ফিরে দেখছে।
তবে লোকটা যতই কাছিয়ে এল বোঝা গেল সে কেবল উৎকণ্ঠিত এবং উদ্বিগ্নই নয়, কোন কারণে মারাত্মক ভয়ও পেয়েছে। যদিও তাকে চেনা যাচ্ছে না। দেখে মনে হচ্ছে তার শক্তি প্রায় নিঃশেষিত। সে একটার পর একটা উঁচু পাথর টপকাচ্ছে। তারপর সে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। যেন আর উঠতে পারবে না, বাঁধের নিচে উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
লোকটা কেন ভয় পেয়েছে বোঝা যাচ্ছে না। তবে এবারে তার ভয়ের কারণ উন্মোচিত হলো। দূর সৈকতে কিছু একটা দপদপ করে জ্বলে উঠল। ধূসর রঙের কিছু একটা দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল। ওটা ক্রমে আকারে বড় হচ্ছে। একটা মূর্তি, গায়ে চাদর, বাতাসে পতপত করে উড়ছে।
ওটার নড়াচড়ার মধ্যে এমন অশুভ কিছু আছে যে ওকে কাছ থেকে দেখতে ইচ্ছে করল না পারকিন্সের। ওটা থামল, হাত তুলল, বালুর উদ্দেশে বোউ করল তারপর ছুটে গেল জলের কিনারে। তারপর ফিরে এল আবার। এবারে শরীর খাড়া করে তীব্র গতিতে ছুটে আসতে লাগল। এমন ভয়ঙ্কর লাগছে দেখতে, শুকিয়ে যায় আত্মা। ওটা চলে এল বাঁধের কাছে যেখানে লুকিয়ে আছে লোকটা। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে ওটা। তারপর থাবা বাগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। এরপর ধেয়ে গেল বাঁধের দিকে।
এই পর্যায়ে পারকিন্স কিছুতেই তার চোখ বন্ধ করে রাখতে পারে না। সে চোখ মেলে তাকায়। বুঝতে পারে আজ আর ঘুমাতে পারবে না। বৃথা চেষ্টা না করে মোমবাতি জ্বেলে নিয়ে একটা বই পড়লেও ভাল। তাহলে অন্তত চোখ বুজে ওই মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হবে না।
দেশলাই কাঠির খসখস কিংবা আলোর ঝলকানি যা-ই হোক, রাতের কোন প্রাণীকে নিশ্চয় চমকে দিয়েছিল-হতে পারে ওটা বাদুড় কিংবা অন্য কিছু-বিছানার ধারে মেঝেতে খসখস শব্দ শুনতে পেল পারকিন্স। প্রথম কাঠিটি জ্বলতে না জ্বলতেই শেষ। দ্বিতীয় কাঠিটি দিয়ে ও মোমবাতি জ্বেলে নিতে পারল। তারপর একটা বই টেনে নিল। জীবনে এই প্রথম সে মোমবাতি নেভাল না।
বই পড়তে পড়তে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। পরদিন সকাল আটটায় যখন তাকে ডেকে তোলা হলো, তখনো মিটমিট জ্বলছে মোমবাতি এবং ছোট টেবিলটার ওপর মোমের গাদ জমে আছে।
নাশ্তা সেরে নিজের রুমে ফিরল পারকিন্স। গলফ খেলার কস্টিউম পরছে-কর্নেলের সঙ্গে আজ আবার পার্টনার হয়ে খেলতে হবে-এমন সময় হোটেল পরিচারিকা এসে ঢুকল ঘরে।
‘আপনার জন্য কি এক্সট্রা একটা ব্ল্যাঙ্কেট দেব, স্যর?’ জিজ্ঞেস করল সে।
‘হ্যাঁ, দিলে ভালই হয়,’ বলল পারকিন্স। ‘রাতে বেশ ঠাণ্ডা পড়েছিল।’
একটু পরেই কম্বল নিয়ে ফিরে এল মেইড।
‘কোন্ বিছানায় এটা রাখব, স্যর?’
‘কেন? আমি গত রাতে যে বিছানায় শুয়েছি।’ আঙুল তুলে নিজের খাটটি দেখাল পারকিন্স।
‘হ্যাঁ, ঠিক আছে, স্যর। তবে ভাবলাম আপনি বোধহয় দুটো বিছানাই ব্যবহার করেছেন। আজ সকালে দুটো বিছানাই আমাদের গোছগাছ করতে হয়েছে।’
‘তাই নাকি? অদ্ভুত তো!’ বলল পারকিন্স। ‘আমি ওই বিছানাটি স্পর্শ করিনি মাত্র, শুধু খানকয়েক জিনিস রেখেছিলাম ওর ওপর। ওই বিছানায় সত্যি কেউ শুয়েছিল বলে তোমার মনে হয়?’
‘জি, স্যর,’ জবাব দিল পরিচারিকা। ‘পুরো বিছানাই অগোছালো ছিল, চাদর কোঁচকানো ছিল।’
‘আশ্চর্য!” বলল পারকিন্স। ‘আমি একটু অগোছালো স্বভাবের বটে। কিন্তু আমি তো ওই বিছানায় শুইইনি-যাকগে, শোনো। আমার এক বন্ধু আসবে। কেমব্রিজের ছাত্র। এখানে দু’এক রাত থাকবে। কোন অসুবিধে নেই তো?’
‘না, না, স্যর। অসুবিধে কেন হবে?’ হাসল মেইড।
পারকিন্স গলফ খেলার মাঠে গেল কর্নেলের সঙ্গে খেলতে। ‘কাল রাতে হঠাৎ করেই ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করল,’ বললেন তিনি। ‘আমাদের গ্রামে এরকম আকস্মিক বাতাস হলে লোকে বলে কেউ শিস দিয়ে ডেকে এনেছে বাতাস।
‘আপনাদের গাঁয়ে এসব কুসংস্কারে মানুষ বিশ্বাস করে নাকি?’ বলল পারকিন্স।
‘কুসংস্কার কিনা জানি না,’ বললেন কর্নেল। তবে গোটা ডেনমার্ক এবং নরওয়ে জুড়ে লোকে এসবে বিশ্বাস করে। ইয়র্কশায়ার উপকূলের লোকজনও তাই। তবে আমার অভিজ্ঞতা বলে যা রটে তার কিছু ঘটে। গাঁয়ের মানুষজন যুগযুগ ধরে এসব বিশ্বাস করে আসছে। নাও, এবার তোমার ড্রাইভ।’
গর্তে বল ফেলল পারকিন্স। কিছুক্ষণ চুপচাপ চলল খেলা। তারপর সে বলল, ‘কর্নেল আমি এসব অতিপ্রাকৃত বিষয় বিশ্বাস করি না।’
‘কী!’ বললেন কর্নেল। ‘ভূত প্রেতে তোমার বিশ্বাস নেই?’
‘একদমই না, দৃঢ় গলায় বলল পারকিন্স। শুনেছি কোন কোন মানুষ নাকি সাগর তীরে ঘুরতে গিয়ে শিসের শব্দ শুনেছে। তার পরপরই বেদম বাতাস উঠেছে। কিন্তু যার কাছে ব্যারোমিটার আছে সে ঠিক বলে দিতে পারবে আবহাওয়া কখন কেমন যাবে, কখন ঝড় উঠবে, কখন শান্ত থাকবে প্রকৃতি। সরলমনা, সাধারণ জেলেদের কাছে ব্যারোমিটার থাকে না। তারা বাতাসের মতিগতি দেখে বুঝতে পারে আবহাওয়া। এর মধ্যে অতিপ্রাকৃত কিছু নেই। আর কাল রাতের ঝোড়ো বাতাসের কথা বলছেন? আমি নিজেই শিস বাজিয়েছিলাম। একটা বাঁশি আছে আমার কাছে। ওতে বার দুই শিস বাজাই আমি। মনে হয় বাঁশির শিসের সুরে আকৃষ্ট হয়ে বাতাসটা এসেছিল—’ হাসল সে।
‘বাঁশি বাজাচ্ছিলে নাকি তুমি?’ জিজ্ঞেস করলেন কর্নেল। ‘কী ধরনের বাঁশি? আগে এই স্ট্রোকটা খেলো, তারপর বলো।’
‘আপনি যে শিসের কথা বলছেন সেরকম বাঁশি, কর্নেল। ভারি অদ্ভুত একটা বাঁশি। বাঁশি ঠিক না, হুইসল। ওটা আমার কাছে আছে-না, আমি ওটা আমার ঘরে রেখে এসেছি। গতকালই পেলাম।’
কীভাবে হুইসলটি পেয়েছে জানাল পারকিন্স। শুনে ঘোঁতঘোঁত করে উঠলেন কর্নেল। বললেন পারকিন্সের জায়গায় হলে তিনি ওই ধরনের হুইসল বাজানোর ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক থাকতেন।
ওরা দু’জন দুপুর পর্যন্ত খেলল। তারপর ফিরে এল হোটেলে। কিন্তু হোটেলে ঢোকার মুহূর্তে একটা কিশোর ছেলের সঙ্গে এমন ধাক্কা লাগল কর্নেলের যে তিনি প্রায় ছিটকে পড়ে যাচ্ছিলেন। ছেলেটি উন্মাদের মত ছুটে আসছিল। রক্তশূন্য চেহারা। আর বেদম হাঁপাচ্ছে। দম ফিরে পেয়ে সে হাউমাউ করে কী সব বলতে লাগল ওরা বুঝতে পারল না। ভয়ে কাঁপছে বেচারা।
‘তোমার হয়েছেটা কী?’ জিজ্ঞেস করলেন কর্নেল। ‘এরকম করছ কেন! কিছু দেখে ভয় পেয়েছ?’
‘ওই জানালা দিয়ে ওটা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, কাঁইমাই করে বলল সে।
কে কোন্ জানালা দিয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে ছিল?’ বললেন কর্নেল। ‘আর কেনইবা ভয় পেলে?’
‘হোটেলের সামনের জানালা, স্যর,’ বলল ছেলেটা।
ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল সে তার বন্ধুদের সঙ্গে হোটেল গ্লোব ইনের সামনে খেলা করছিল। খেলা শেষে বন্ধুরা বাড়ি চলে যায়। ছেলেটাও যাচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ে যায় হোটেলের সামনের জানালায়। ওখানে সাদা পোশাক পরা, মাথায় ঘোমটা দেয়া একটা মূর্তি ওকে হাত নেড়ে ডাকছিল। দেখে পিলে চমকে যায় ছেলেটার। ভয়ের চোটে সে ছুটতে শুরু করে এবং হোটেলের প্রবেশ মুখে ধাক্কা খায় কর্নেলের সঙ্গে।
‘ঠিক আছে, খোকা,’ বললেন কর্নেল। ‘তুমি এখন বাড়ি যাও। তোমাকে বোধহয় কেউ একটু ভয় দেখাতে চেয়েছে। আবার কেউ অমন করলে সরাসরি তার গায়ে পাথর ছুঁড়ে মারবে, ভয়ে পালাবে না। না, থাক, পাথর ছুঁড়তে হবে না। তুমি ওয়েটারকে গিয়ে বলবে কিংবা বাড়িঅলা মি. সিম্পসনকে। আর হ্যাঁ, বলবে, আমি তোমাকে বলতে বলেছি।’
ছেলেটির চেহারায় সন্দেহ ফুটল মি. সিম্পসন তার কথা বিশ্বাস করবেন কিনা। তবে ব্যাপারটা লক্ষ করলেন না কর্নেল। বলে চললেন:
‘এই নাও ছয় পেন্স-না, এক শিলিংই নাও-এবং সোজা বাড়ি যাও। এ ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দাও।’
ছেলেটা কর্নেলকে উত্তেজিত কণ্ঠে ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হলো। কর্নেল এবং পারকিন্স হোটেলের সামনে চলে এলেন। ছেলেটার বর্ণনা অনুযায়ী এদিক থেকে মাত্র একটি জানালা দেখা যাচ্ছে।
‘ওটা তো আমার ঘরের জানালা,’ বলল পারকিন্স। ‘আপনি কি একবার ওপরে আসবেন, কর্নেল উইলসন? দেখি তো কেউ আমার ঘরে ঢুকেছে কিনা।’
ওরা ওপরে চলে এল। পারকিন্স তার ঘরের দরজায় তালা মেরে রেখেছে। তালা খুলে ঘরে ঢুকল দু’জনে। মোম জ্বালল পারকিন্স। ‘ঘরের সবকিছুই ঠিকঠাক আছে দেখছি,’ বলল সে।
‘শুধু তোমার বিছানাটা ছাড়া,’ বললেন কর্নেল।
‘ওটা আমার বিছানা নয়,’ বলল পারকিন্স। ‘ওটা আমি ব্যবহার করি না। তবে দেখে মনে হচ্ছে কেউ ওখানে শুয়েছে।’
ঠিক তাই। একদম অগোছালো বিছানা। কুঁচকে আছে বিছানার চাদর। বালিশগুলো এলোমেলো।
‘গত রাতে আমি ব্যাগ খুলে কিছু জিনিসপত্র বের করেছিলাম,’ বলল পারকিন্স। ‘বিছানাটার ওপর রেখেছিলাম। ওরা তারপর আর বিছানা গোছায়নি। সম্ভবত কিছুক্ষণ আগে ওরা এসেছিল রুম পরিষ্কার করতে এবং ওদের কাউকে জানালা দিয়ে দেখে ভয় পেয়েছে ছেলেটা। ওরা কাজ সেরে দরজায় তালা মেরে চলে গেছে। এছাড়া অন্য কিছু ঘটেনি বলেই আমার ধারণা।’
‘ঠিক আছে। বেল বাজাও এবং ওদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করো।’
চলে এল পরিচারিকা। সে গৌরচন্দ্রিকা বাদ দিয়ে জানাল সকালে সে এ রুমে এসেছিল বিছানা গোছাতে। তখন পারকিন্স সাহেব ঘরেই ছিলেন। তারপর সে আর এ কামরায় ঢোকেনি। না, তার কাছে এ রুমের অতিরিক্ত কোন চাবি নেই। মি. সিম্পসনের কাছে নকল চাবি থাকে। তিনিই বলতে পারবেন অন্য কেউ পারকিন্স সাহেবের রুমে ঢুকেছিল কিনা।
বিষয়টি বিস্ময়করই বটে। গোটা কামরায় সতর্ক নজর বুলিয়ে দেখা গেল কোন কিছু খোয়া যায়নি। ছোটখাট যেসব জিনিস টেবিলে ছিল তা যথাস্থানেই রয়েছে। মি. এবং মিসেস সিম্পসন উভয়েই জানালেন তাঁরা কাউকে পারকিন্স সাহেবের রুমের ডুপ্লিকেট চাবি দেননি। পারকিন্সের দৃঢ় বিশ্বাস ওই ছেলেটা মিছে কথা বলেছে কর্নেলকে।
সেই রাতে সারাক্ষণ গম্ভীর হয়ে থাকলেন কর্নেল। ডিনারের সময়ও কোন কথা বললেন না। শুধু ঘুমাতে যাওয়ার আগে পারকিন্সকে বললেন, “তুমি তো জানোই আমি কোন্ রুমে থাকি। কোন দরকার হলে ডাক দিয়ো।’
‘ধন্যবাদ, কর্নেল। তবে মনে হয় না আপনাকে বিরক্ত করার দরকার হবে। ভাল কথা, আপনাকে কি আমি হুইসলটা দেখিয়েছি যেটার কথা বলেছিলাম? দেখাইনি? আচ্ছা, তাহলে দেখুন।
কর্নেল নিঃশব্দে মোমবাতির আলোয় উল্টেপাল্টে দেখলেন হুইসলটি।
‘ইন্সক্রিপশনটার কোন অর্থ বের করতে পারলেন?’ জিনিসটা কর্নেলের কাছ থেকে নিল পারকিন্স।
‘এই আলোতে অক্ষরগুলো পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না।’ বললেন কর্নেল। ‘তুমি এটা দিয়ে কী করবে?’
‘কেমব্রিজে ফিরে কোন আর্কিওলজিস্টকে এটা দেব। দেখি ওঁরা কী বলেন। যদি মূল্যবান কিছু হয় জাদুঘরে দান করে দিতে পারি।’
‘তবে এটা আমার জিনিস হলে সোজা সমুদ্রে ফেলে দিতাম,’ বললেন কর্নেল। ‘যাকগে, এ নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। চলি তাহলে। গুড নাইট।’
প্রফেসর পারকিন্সের জানালায় কোন খড়খড়ি কিংবা পর্দা নেই। গত রাতে সে এ নিয়ে বিশেষ চিন্তা করেনি। তবে আজ রাতে ফকফকা জোছনার আলো মুখে পড়ে যখন ঘুম ভাঙিয়ে দিল, বেশ বিরক্তই বোধ করল পারকিন্স। সে বিছানা থেকে উঠে একটা কম্বল, কিছু সেফটি পিন, একটি লাঠি, একখানা ছাতা এবং একটি পর্দা দিয়ে জানালা ঢেকে দিল যাতে চাঁদের আলো ঘরে ঢুকতে না পারে। তারপর মোমবাতি নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়।
.
তিন
বোধকরি ঘণ্টাখানেক নিরুপদ্রবে ঘুমিয়েছিল পারকিন্স, হঠাৎ দুড়ুম শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। এক মুহূর্তেই বুঝতে পারল কী ঘটেছে। এত কষ্ট করে টানানো পর্দা সবকিছু সুদ্ধ পড়ে গেছে মেঝেতে। আবার তীব্র উজ্জ্বল জোছনা সরাসরি পড়ছে তার মুখে। আবার উঠে ও পর্দা লাগাবে? নাকি শুয়ে থেকে ঘুমাবার চেষ্টা করবে?
কিছুক্ষণ চিৎ হয়ে শুয়ে থেকে পারকিন্স ভাবছিল কী করা যায়। তারপর সে হঠাৎ পাশ ফিরল। চোখ মেলে তাকাল। দম বন্ধ করে শুনছে। একটা নড়াচড়ার শব্দ পেয়েছে সে বিপরীত দিকের বিছানা থেকে। কাল সে খাটটা ওখান থেকে সরাবে। দেখবে খাটের নিচে ইঁদুর বাসা বেঁধেছে কিনা। হয়তো খাটের নিচে খেলছে। হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল আওয়াজ। না! আবার শব্দ হচ্ছে। খসখস শব্দ হচ্ছে সেই সঙ্গে নড়ছে খাট। নাহ্, ইঁদুরের পক্ষে খাট নাড়ানো সম্ভব নয়। ওখানে অন্য কিছু আছে।
পারকিন্স ভয়ে বিস্ফারিত চোখে দেখল বিপরীত দিকের খালি বিছানায় চাদর মুড়ি দেয়া অবস্থায় কেউ একজন উঠে বসছে। পরমুহূর্তে এক লাফে নিজের বিছানা থেকে নেমে এল পারকিন্স এবং দৌড় দিল জানালায়। ওখানে তার একমাত্র অস্ত্র লাঠিখানা রয়েছে। ওটা দিয়ে সে জানালায় পর্দা ঠেক দিয়ে রেখেছিল। তবে সে জানালায় পৌঁছার আগেই বিছানায় উঠে বসা মূর্তিটা পিছলে নেমে এল খাট থেকে এবং দুটি খাটের মাঝখানে এবং দরজার ঠিক সামনে থাবার মত হাতজোড়া বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
ভীষণ ভয়ে কাঠ হয়ে গেল পারকিন্স। দরজা খুলে পালাবে ভেবেছিল। সে পথও বন্ধ। দরজায় যেতে হলে ওটার গা ঘেঁষে যেতে হবে। আর বিকট দর্শন মূর্তিটার, যদিও ওটার চেহারা এখনো দেখেনি পারকিন্স, শরীরের স্পর্শ লাগার কথা ভাবতেই গা ঘিনঘিন করে ওঠে ওর। আর ওটা যদি ওকে ধরতে আসে পারকিন্স তাহলে নির্ঘাত জানালা গলে লাফ দিয়ে পড়বে নিচে।
ভয়ঙ্কর মূর্তিটা অন্ধকারে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর নড়ে উঠল। টলতে টলতে সামনে এগিয়ে আসছে। ভয় এবং খানিকটা স্বস্তি নিয়ে পারকিন্স বুঝতে পারল ওটা যেই হোক চোখে দেখে না। অন্ধ। কারণ হাত জোড়া সামনে বাগিয়ে দৃষ্টিহীনের মতই হাতড়ে হাতড়ে এগোচ্ছে।
পারকিন্সের কাছ থেকে আধাআধি দূরত্বে থাকতে ওটা যেন পারকিন্সের বিছানার অস্তিত্ব টের পেয়ে গেল। বিছানার দিকে এগোল ভৌতিক মূর্তি, ঝুঁকল। বালিশগুলোর গায়ে এমনভাবে হাতড়াচ্ছে দেখে শরীরের সমস্ত রোম খাড়া হয়ে গেল পারকিন্সের। ওটা বুঝতে পারল বিছানা খালি। তারপর এগিয়ে গেল জানালার দিকে। ওখানে চাঁদের আলো থইথই। সেই আলোয় এই প্রথম ওটার চেহারা দেখতে পেল পারকিন্স।
ওটার কোন মুখ বা চেহারা নেই! মুখটা আসলে ভাঁজ করা কতগুলো লিনেন কাপড়। এবং বড়ই ভয়ঙ্কর এবং বীভৎস সেই লিনেনের মুখ! ভয়ে গায়ের রক্ত জমে বরফ হয়ে গেল পারকিন্সের।
তবে বিকট চেহারাটা বেশিক্ষণ দেখার অবকাশ হলো না। ওটা ঝড়ের গতিতে ঘরের মাঝখানে চলে এল। হাত বাড়িয়ে হাতড়াচ্ছে, অন্ধ চোখে খুঁজছে পারকিন্সকে। ওটার শতচ্ছিন্ন কাপড়ের ঘষা লাগল পারকিন্সের মুখে। শব্দ করা বিপজ্জনক জেনেও নিজেকে সামাল দিতে পারল না সে। গলা চিরে বেরিয়ে এল ভয়ার্ত আর্তনাদ। আর তাতেই পৈশাচিক মূর্তি বুঝে ফেলল কোথায় আছে তার শিকার
লাফ দিল সে সামনে। সঙ্গে সঙ্গে জানালার দিকে হেলে গেল পারকিন্স। প্রায় অর্ধেক শরীর বেরিয়ে গেল জানালা দিয়ে। তার গলা দিয়ে একের পর এক চিৎকার বেরিয়ে আসছে। লিনেনের ভীষণ মুখটা এগিয়ে আসছে তার দিকে। আর রক্ষা নেই পারকিন্সের!
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন কর্নেল। দেখতে পেলেন জানালায় ঝুলে আছে পারকিন্স আর তার ওপর ঝুঁকে আছে সাদা চাদর গায়ে একটা মূর্তি।
তিনি ছুটে গেলেন ওদের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে গেল ভৌতিক মূর্তি। আর পারকিন্স জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে স্তূপ হয়ে পড়ে থাকা বিছানার চাদরের ওপর।
কর্নেল উইলসন কোন প্রশ্ন করলেন না। যারা চিৎকার শুনে ছুটে এসেছিল তাদেরকে যার যার ঘরে পাঠিয়ে দিলেন। পারকিন্সকে কোলে করে শুইয়ে দিলেন বিছানায়। নিজে গায়ে একটি কম্বল জড়িয়ে অপর খাটটিতে শুয়ে পড়লেন। তবে ঘুমালেন না। জেগে থাকলেন।
পরদিন সকালে এসে হাজির রজার্স। তাকে সুস্বাগতম জানানো হলো। আগের দিন এলে অতটা অভ্যর্থনা হয়তো পেত না। তিনজনে মিলে পারকিন্সের রুমে অনেকক্ষণ আলাপ আলোচনা চলল। তারপর কর্নেল হোটেল থেকে বেরিয়ে গেলেন তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের মধ্যে একটি জিনিস আটকে নিয়ে। সাগরে গিয়ে ওটা সজোরে ছুঁড়ে মারলেন জলে। তারপর ফিরলেন হোটেলে।
কর্নেল যদি যথাসময়ে পারকিন্সের রুমে না ঢুকতেন তাহলে তার ভাগ্যে কী ছিল বোঝাই যায়। ভৌতিক মূর্তিটা নির্ঘাত তাকে ঠেলে ফেলে দিত জানালা দিয়ে। তবে যে পারকিন্স কখনো ভূত বিশ্বাস করত না বলে গর্ব করত, ওই রাতের ঘটনা তার স্নায়ুকে এমন নাড়া দিয়ে যায় যে এখন শীতকালে মাঠে কাকতাড়ুয়া দেখলেও রাত কাটে তার নির্ঘুমে!
