দুঃস্বপ্ন – অনীশ দাস অপু
দুঃস্বপ্ন
ঘুমাতে যাওয়ার আগে পরদিনের প্ল্যান প্রোগ্রাম নিয়ে চিন্তা করছিল ক্রিস। অত্যন্ত গোছানো স্বভাবের মেয়ে সে। তাই সব কাজ গুছিয়ে, প্ল্যানমাফিক করতে পছন্দ করে। একটা মুহূর্তও ফালতু কোন কাজে ব্যয় করে না।
কাল শনিবার। ক্রিস প্ল্যান করে রেখেছে কী করবে। সকালে তাকে বেবি সিটিং করতে হবে। দুপুরে বাবা-মার সঙ্গে বাগানের কাজে হাত লাগাতে হবে। রাতের বেলা বান্ধবী জেনের বাসায় যাওয়ার কথা। কাল রাতটি দু’জনে একসঙ্গে কাটাবে। জেনদের বাড়ি নদীর ধারে। পুরনো একটি বাংলো বাড়ি। ওই বাড়ির কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল ক্রিস।
সেই রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল ও। দেখে একটি সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আছে সে, তাকিয়ে রয়েছে উপরের দিকে। সিঁড়িগুলো সরু এবং খাড়া, আঁকাবাঁকা হয়ে সৰ্পিল গতিতে ওপরপানে উঠে গেছে। ক্রিস সিঁড়ি বাইতে লাগল। মোটা কার্পেটে ঢাকা সিঁড়ি। ও সিঁড়ি বাইছে তো বাইছেই। হঠাৎ একটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল ক্রিস। দরজাটি আকারে ছোট হলেও ওটাকে দেখে গা কেমন ছমছম করে ওঠে ক্রিসের। সে ধাক্কা দিতেই খুলে গেল দরজা। ভেতরে ঢুকল ও।
ঘরের ভেতরে প্রথমেই নজর কাড়ল জানালাগুলো, কালো কালো শাটার নামানো। শাটারের ফাঁক দিয়ে অল্প চাঁদের আলো আসছে, এছাড়া ঘরটি অন্ধকার। বিছানার ধারে, একটি মোমবাতিদানের ওপর একটি মোম জ্বলছে। দপদপ করছে বাতির শিখা, ভুতুড়ে ছায়া ফেলছে দেয়ালে।
ক্রিস টের পেল তার পা জোড়া তাকে ঘরের আরও ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। শুনতে পেল পেছনে সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল দরজা।
তারপরই দরজায় নক করার শব্দ এবং এক অদ্ভুত মহিলা কপাট ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। মহিলার মুখ হাড়ের মত সাদা, চোখ জোড়া যেন মিশমিশে কয়লা। তার মুখের ওপর আলুথালু কেশ পড়ে আছে। মহিলা এগিয়ে আসতে লাগল ক্রিসের দিকে। মুখে ঘুমপাড়ানি গানের সুরে বলছে, ‘ঘুমাও, মেয়ে…ঘুমিয়ে পড়ো…’ তারপর সে ঝট করে দু’হাত বাড়িয়ে দিল ক্রিসের দিকে এবং…
.
একটা ঝাঁকি খেয়ে জেগে গেল ক্রিস, বিছানায় উঠে বসেছে সটান, বিস্ফারিত চক্ষু। দ্রুত দম ফেলছে। বেড স্ট্যাণ্ডের বাতি জ্বালল সে সুইচ টিপে, তাকাল নিজের চারপাশে। কালো চোখ আর তারের মত চুলঅলা কোন মহিলা নেই ঘরে। রুমের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। আগের মতই নিরাপদ এবং উষ্ণ। কিন্তু দুঃস্বপ্নটা এমন বাস্তব! এখনো চোখের সামনে ভাসছে মহিলা ওর গলা টিপে ধরতে আসছে!
চোখ বুজল ক্রিস এক সেকেণ্ডের জন্য। মহিলার মুখ আবার ভেসে উঠল। চোখ মেলে ঘড়ি দেখল ও। ভোর চারটা বাজে। ক্রিস জানে আজ আর ওর ঘুম আসবে না। ঘুমালেই যদি আবার ওই ঘরটা ফিরে আসে স্বপ্নে! ওই মহিলার চেহারা ইহজীবনে, দেখতে চায় না ক্রিস। সে লেপের তলায় ঢুকে পড়ল। চোখ মেলে তাকিয়ে রইল দেয়ালের দিকে। ভোর হয়ে অ্যালার্ম ঘড়ির অ্যালার্ম বাজা পর্যন্ত ওভাবেই চেয়ে রইল সে।
.
পরিকল্পনা মাফিক সকালে বেবি সিটিঙের কাজটি করল ক্রিস। দুপুরে বাগানে আগাছা সাফে সাহায্য করল বাবা-মাকে। কিন্তু মাথা থেকে আগের রাতের দুঃস্বপ্নটা দূর হলো না। আজ রাতে জেনের বাসায় আদৌ ঘুমাতে যাবে কিনা তা নিয়ে ভাবছে ও। ঘুমাবার আগে তো ও জেনদের বাসার কথাই চিন্তা করছিল। হয়তো ওই জরাজীর্ণ বাংলোতে গোপন কোন সিঁড়ি আছে…এমন কোন সিঁড়ি যা চলে গেছে স্বপ্নে দেখা কামরা বরাবর।
বাবা-মাকে কিছু না জানিয়ে, ডিনারের আগে আগে সে জেনকে ফোন করে বলল আজ রাতে সে ওদের বাড়িতে যেতে পারবে না। ফোনটা করার পরে একটু স্বস্তি বোধ করতে লাগল ক্রিস। আজ রাতে সে জেনের বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষবে না…পাছে ওই স্বপ্নটা সত্যি হয়ে যায়।
বাবা-মার সঙ্গে খেতে বসে নিজের পরিবর্তিত পরিকল্পনার কথা তাঁদেরকে বলল ও। ভেবেছিল এ কথা শুনলে বাবা-মা খুশিই হবেন কারণ তাঁরা সর্বদা অভিযোগ করেন সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে তাঁরা তাঁদের মেয়েকে খুব একটা কাছে পান না। কিন্তু ক্রিস আজ রাতে বাড়িতে থাকছে শুনে তাঁদের চোয়াল ঝুলে পড়ল।
‘কিন্তু, ক্রিস, আমরা তো বাইরে যাওয়ার প্ল্যান করে ফেলেছি,’ বললেন ওর মা। ‘জানতাম আজ রাতে তুই জেনদের বাসায় থাকবি। তাই আমরা ঠিক করেছিলাম লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়ব। তারপর নাটক দেখে রাতটা কোন হোটেলে কাটিয়ে কাল ফিরে আসব। নাটকের টিকিটও কাটা হয়ে গেছে। এখন না গেলেই নয়। তুই বরং জেনকে ফোন করে বলে দে ওদের বাসায় যাচ্ছিস।’
ক্রিসের চোখের সামনে ভেসে উঠল কাল রাতে স্বপ্নে দেখা মহিলার ভয়ঙ্কর মুখ। সে শিউরে উঠে মাথা নাড়ল। ‘না, মা, আমি পারব না। আমি ওকে ফোন করতে পারব না।
বাবা-মা পরস্পরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করে মেয়ের দিকে তাকালেন।
‘কিন্তু রাতে তোকে একা থাকতে দেব না আমি,’ বললেন ক্রিসের বাবা। ‘একটু যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা কর ব্যাপারটা। যা তোর বন্ধু জেনকে…’
ক্রিরিরিং শব্দে ফোন বেজে উঠে বাবার কথায় ব্যাঘাত ঘটাল। ক্রিস দৌড়ে গিয়ে ফোন তুলল। ফোন করেছে এমিলি, শহরে নতুন এসেছে। ক্রিসের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতে চায়।
‘তুমি চাইছ আজ রাতে যেন আমি তোমার বাসায় গিয়ে থাকি?’ ক্রিস কথা বলছে, লক্ষ করল তার কথা শুনে বাবা- মার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ‘ঠিক আছে…আমারও তাই মনে হয়। মা-বাবা যেতে দেবেন বলেছেন। রাত সাতটার দিকে ওরা আমাকে তোমার বাসার সামনে নামিয়ে দেবেন। হুঁ, আমি আমার স্লিপিং ব্যাগ এবং বালিশ নিয়ে আসব। ওকে, বাই।’
ক্রিস ফোন রেখে খাবার টেবিলে ফিরে এল। মেয়েকে আজ রাতে বাসায় থাকতে হচ্ছে না জেনে তাঁরা আনন্দিত। কিন্তু ক্রিস আজ কোথাও যেতে চাইছে না, নিজের ঘরে, চার দেয়ালের মাঝেই সে নিরাপদ থাকবে। তবে যেতে যদি হয়ই তো এমিলির বাড়িতে যাবে সে, জেনের বাড়ি নয়। নদীর ধারের ওই পুরনো বাংলোয় আজ রাতে যাওয়ার কোন ইচ্ছাই নেই ক্রিসের।
.
কাঁটায় কাঁটায় সাতটায় এমিলির বাড়ির সামনে জেনকে নামিয়ে দিলেন ওর বাবা-মা। এমিলি কোথায় থাকে জানত না ক্রিস। তবে তার বাসা জেনের বাসার এত কাছে দেখে সে অবাক হয়ে গেল। নদীর তীরে সেই একই কাঠামোর বাংলো বাড়ি। দরজার বেল টিপতেই এমিলি এবং তাঁর বাবা সাড়া দিলেন এবং ওকে ভেতরে যেতে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। এমিলি বলল তার মা বাইরে গেছেন। ওরা ঘুমাবার আগে আগেই চলে আসবেন।
রাতটি কেটে যেতে লাগল দ্রুত। এমিলিকে বেশ পছন্দই হলো ক্রিসের। ঘড়িতে রাত বারোটার ঘণ্টা বাজার শব্দেও দু’জনের গল্প আর হাসাহাসি থামে না। শেষে এমিলির বাবা সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে হাঁক ছেড়ে বললেন, এখন ওদের ঘুমাবার সময় হয়েছে।
তিন তলায় এমিলির বেডরুম। ক্রিস ওর পেছন পেছন সরু এবং খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। পায়ের নিচে নরম কার্পেটের স্পর্শ পেল। ও সিঁড়ি বেয়ে উঠছে সেই সঙ্গে ভয়ের একটা অনুভূতি ওকে গ্রাস করার চেষ্টা করছে। ও ভয়টাকে অগ্রাহ্যের চেষ্টা করল।
হঠাৎ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পড়ল এমিলি, ঘুরল। ‘আমি একটা জরুরি জিনিস ফেলে এসেছি,’ বলল সে ক্রিসকে। ‘তুমি ওপরে যাও। আমি আসছি এখুনি।’
ক্রিস কিছু বলার আগেই এমিলি দ্রুত পায়ে নিচে নামতে লাগল। কী করবে বুঝতে না পেরে সিঁড়ি বাইতে থাকল ক্রিস। এমিলিকে ওর পছন্দ হয়েছে, ওর বাবাকেও। দু’জনেই চমৎকার মানুষ। তবে ওকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে এই সিঁড়ি…
সিঁড়ির ধাপে একটা বাঁক ঘুরতেই ক্রিস দেখে সে সিঁড়ির মাথায় চলে এসেছে। দাঁড়িয়ে আছে ছোট একটি দরজার সামনে। অকস্মাৎ তার খুব ক্লান্ত লাগল, প্রচণ্ড শ্রান্তিতে ভেঙে আসতে চাইছে শরীর। সে হাত বাড়াল দরজার নবে। হাত কাঁপছে। নব ধরে মোচড় দিতেই খুলে গেল দরজা। নিশি পাওয়া মানুষের মত সে ভেতরে ঢুকল, যদিও জানে এখানে ওকে কী দেখতে হবে।
ঘরের জানালায় কালো রঙের শাটার ফেলা। বেডস্ট্যাণ্ডে দপদপিয়ে জ্বলছে একটি মোমবাতি। ক্রিস ঘরের ভেতরে ঢুকে দুই কদম এগোতেই শুনতে পেল পেছনে বন্ধ হয়ে গেছে দরজা।
তারপর দরজায় টুকটুক আওয়াজ শুনতে পেল, মন্থর গতিতে ঘুরে দাঁড়াল ক্রিস। এক মহিলা ঘরে প্রবেশ করল। মহিলার মুখ হাড়ের মত সাদা, চোখ কয়লা কালো। তার আলুথালু চুল তারের মত। হলুদ, ভাঙা, এবড়ো খেবড়ো দাঁত বের করে সে ক্রিসের দিকে তাকিয়ে হাসল।
‘তুমি এসেছ খুব খুশি হয়েছি, সোনা। আমি এমিলির মা।’
ক্রিস পিছিয়ে যেতে লাগল মহিলার কাছ থেকে, ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল বিছানায়।
কিন্তু মহিলা ওর দিকে এগিয়েই আসতে থাকল, হলুদ দাঁত বের করে হাসছে আর বিড়বিড় করে বলছে, ‘ঘুমাও, মেয়ে…ঘুমিয়ে পড়ো…সুইট, সুইট…ড্রিমস ….
মহিলা আরও কাছিয়ে এল। আরও কাছে। তারপর সে দুই হাত বাড়িয়ে দিল ক্রিসের দিকে এবং…
