রাতের বিভীষিকা – অনীশ দাস অপু
রাতের বিভীষিকা
জ্বলন্ত ক্যাম্পফায়ারের কাছে, আরামদায়ক উষ্ণতায় বসে ছিল কার্টার, হিম ভাব দূর করতে হাতে হাত ঘষছে। ঠাণ্ডাও পড়েছে বেজায়। অক্টোবর মাসের তুলনায় অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা স্কাউট দলের কেউই সঙ্গে তেমন গরম জামা কাপড় নিয়ে আসেনি। কে জানত জঙ্গলে এমন শীত লাগবে? কার্টার আগুনের কাছে জবুথুবু হয়ে বসল। আহা, এখন যদি বাড়ি থাকা যেত!
‘কার্টার,’ খেঁকিয়ে উঠল স্কাউট মাস্টার। ‘আজ রাতে আগুন জ্বেলে রাখতে আরও লাকড়ি লাগবে। শীঘ্রি সন্ধ্যা নামবে। তুমি বরং কিছু লাকড়ি নিয়ে এসো। মরা ডালপালা, ভাঙা কাঠের টুকরো যা পাও নিয়ে এসো।
শিউরে উঠল কার্টার। আগুনের আরও ধারে এগিয়ে গেল। লাকড়ি জোগাড় করতে যেতে তাকেই কেন বলল স্কাউট মাস্টার? এর কারণ কি এই যে সে দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হওয়ার কারণে অন্যরা যে কাজ করতে চায় না তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়?
‘কার্টার!’ আবার ঘেউ করল স্কাউট মাস্টার। ‘রওনা হও।’
লাফ মেরে সিধে হলো কার্টার, কদম বাড়াল।
স্কাউট দলে তার একমাত্র বন্ধু জশ এগিয়ে এল। নিজের জ্যাকেটটা খুলে ওর হাতে দিল।
‘নাও, এটা পরো।’ বলল সে কার্টারকে। আর আমাদের জন্য লাকড়ি আনতে যাওয়ার জন্য ধন্যবাদ।’
কার্টার মৃদু হেসে গরম জ্যাকেটটি গায়ে চড়াল। তারপর রওনা হলো জঙ্গল অভিমুখে। ক্যাম্পসাইটের ধারে তেমন লাকড়ি পাবে না, জানে কার্টার। বিকেলে ক্যাম্প করার সময় অন্যান্যরা আশপাশের সমস্ত কাঠকুটো জোগাড় করে নিয়েছে। কার্টার একটা ট্রেইল ধরে এগোল। এই রাস্তা ধরে হাঁটলে ফার গাছের ঘন সারি পড়বে খানিক দূরেই।
এদিকটাতে গাছগুলো একটার গায়ে আরেকটা ঘেঁষে বড় হয়ে উঠেছে, সরু কাণ্ড সটান উঠে গেছে আকাশ পানে। মাটিতে শুকনো, মরা ডালপালা খুঁজছিল কার্টার। তবে গাছের মগডালগুলো মাথার ওপরে সূর্যের ছোট্ট আলোটাকে আটকে দিচ্ছিল। গাছের নিচে বেশ অন্ধকার। সে ট্রেইলের এপাশ- ওপাশ ঘুরে বেড়াল। দু’একটা মরা ডালও পেল। হঠাৎ করেই ও দিক হারিয়ে ফেলল। যে রাস্তা ধরে এসেছে সেটা আর খুঁজে পাচ্ছে না।
কার্টারের গায়ে কাঁপুনি উঠে গেল। জশের জ্যাকেট আরও ভাল করে পেঁচাল গায়ে। মুখ তুলে চাইল আকাশে। কালচে নীল আকাশের রঙ। ফার গাছগুলো তাদের সবুজ রঙ হারিয়েছে, গোধূলি বেলার আকাশের গায়ে কালো কালো ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কার্টার জানে আর কয়েক মিনিট বাদেই অস্ত যাবে সূর্য অন্ধকারে ও কিছুই দেখতে পাবে না। হাতে লাকড়ির বোঝাটা ফেলে দিয়ে সে গাছপালার ভেতর দিয়ে দৌড়াতে লাগল। আবছা আলোয় মনে হলো ক্যাম্পের সেই হারানো ট্রেইলটা দেখতে পেয়েছে। ওর ছোটার বেগ বেড়ে গেল। বুকের ভেতরে জমতে থাকা ভয়টাকে প্রাণপণে দূর করতে চাইছে।
ট্রেইল ক্রমে চওড়া হয়ে উঠল। আসার সময় রাস্তাটা তো এত চওড়া লাগেনি। আকাশে গোল থালার মত একখানা চাঁদ উঠেছে, বিলোচ্ছে অকৃপণ হলদে আলো। সেই আলোয় আঁধার জঙ্গলে রাস্তাটা যেন রুপোলি এক টুকরো ফিতে।
অকস্মাৎ সামনে ক্যাম্পফায়ারের হলদেটে আলো চোখে পড়ল কার্টারের। স্বস্তির ফল্গুধারা বইল দেহে। যাক, বাবা বাঁচা গেল! আর দৌড়াচ্ছে না কার্টার, পায়ে হেঁটে হরিদ্রাভ আলোর দিকে এগোল। নিঃশ্বাস হয়ে উঠল স্বাভাবিক। তবে আগুনটার কাছাকাছি আসতে কার্টার দেখে ওখানে মাত্র একজন লোক বসে আছে, তার দিকে পেছন ফেরা। ভুল হয়ে গেছে, বুঝতে পেরেছে কার্টার। এ তার স্কাউট দলের ক্যাম্পফায়ার নয়। আর সামনের লোকটা ওর মোটেই চেনা নয়।
লোকটার কাছ থেকে, কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে পড়ল কার্টার। তার ভয় লাগছে তবে আগুনের উষ্ণতা তাকে যেন হাত বাড়িয়ে ডাকছে। কার্টার আরও দু’কদম এগিয়ে গেল। ‘আমি রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি,’ অস্ফুটে বলল সে।
ওর সামনে বসা লোকটা ধীরে ধীরে ঘুরল। কার্টার লোকটার মুখের দিকে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকাল। অদ্ভুত একটা চেহারা। লম্বা চোয়াল। প্রকাণ্ড মুখ। হাঁ করল লোকটা। সভয়ে পিছিয়ে গেল কার্টার। লোকটার মুখভর্তি লম্বা, সুচালো দাঁতের সারি। এমন লম্বা লম্বা দাঁত জীবনে দেখেনি কার্টার! আর দাঁতের ফাঁক দিয়ে রক্ত ঝরে পড়ছে!
জঙ্গলের ভুতুড়ে নৈঃশব্দ্য ফালাফালা হয়ে গেল কার্টারের তীক্ষ্ণ, ভয়ার্ত চিৎকারে। লোকটাকে কচড় মচড় করে কী চিবুতে দেখে পিছু হঠতে গিয়ে হোঁচট খেল কার্টার। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে দিল ছুট। ট্রেইল ছেড়ে ছুটল ঘন জঙ্গলের মধ্যে।
কার্টার শুনতে পেল ঝোপঝাড় ভেঙে থপথপ শব্দে এগিয়ে আসছে একজোড়া ভারি পা। দৌড়াতে লাগল কার্টার। জান বাজি রেখে ছুটল। কিন্তু দৌড়াতে দৌড়াতে বেদম ক্লান্ত হয়ে পড়ল সে। শ্বাস উঠে গেছে বুকে। শুয়ে পড়ল মাটিতে। শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল মাটিতে পড়ে থাকা মস্ত একটা গাছের গুঁড়ির আড়ালে।
ভারি পদশব্দ ক্রমে কাছিয়ে আসছে। এত কাছে যে লোকটার ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাসের আওয়াজ পর্যন্ত শুনতে পেল কার্টার। শরীরটাকে গুটিয়ে একটা বল বানিয়ে গাছের গুঁড়ির আড়ালে গুটিসুটি মেরে পড়ে রইল কার্টার। ওই ভয়ঙ্কর, লম্বা দাঁতগুলোর কথা ভুলে থাকতে চাইছে।
অবশেষে ভারি পায়ের আওয়াজ জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেল। লুকানো জায়গা ছেড়ে সিধে হলো কার্টার এবং লোকটার ক্যাম্পফায়ার থেকে বিপরীত দিকে দৌড় দিল।
জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ছুটছে তো ছুটছেই কার্টার। জানে না কোথায় কিংবা কোনদিকে যাচ্ছে। ক্লান্তি, অবসাদ আর ঠাণ্ডায় শরীর যখন আর চলে না, এমন সময় রাতের আঁধার ফুঁড়ে হলুদ একটা আলো দেখতে পেল ও সামনে। ছোট একটা কাঠের কেবিন। গরাদেঅলা খোলা জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে হলুদ আলো। কেবিনটা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকল কার্টারকে-আয়, আয়!
স্বস্তিতে ফুঁপিয়ে উঠল কার্টার। এক ছুটে পৌঁছে গেল কেবিনের সামনে। শরীরের অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে ঘুসি মারল কেবিনের দরজায়। এক মিনিট বাদে ক্যাচ কোচ শব্দে খুলে গেল দোর। এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে চৌকাঠে, তাকিয়ে আছে কার্টারের দিকে।
‘আমাকে বাঁচান!’ হাঁপিয়ে ওঠার মত শব্দ করল কার্টার, হোঁচট খেল দোরগোড়ায়।
বৃদ্ধা একপাশে সরে দাঁড়াল কার্টারকে ভেতরে যাবার জায়গা করে দিতে। কার্টারের হাত ধরে, আগুনের সামনে একটি চেয়ারে বসিয়ে দিল সে।
‘আমি জঙ্গলে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিলাম,’ কার্টার বলল তাকে, ‘তারপর একটা ভয়ঙ্কর লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় আমার। তার দাঁতগুলো…তার দাঁতগুলো…’
অগ্নিকুণ্ডের আলোয় বুড়ি ঝুঁকল কার্টারের সামনে।
‘এরকম দাঁত কী?’ বলল সে এবং হাসল।
কার্টার দেখল বুড়ির মুখ ভর্তি লম্বা-লম্বা সুচালো ধারাল দাঁত। আর দাঁত বেয়ে রক্ত পড়ছে!
তখন, কার্টার চিৎকার দেয়ার আগেই থপথপ ভারি পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল সে কেরিনের বাইরে। এবং কেবিনের দরজাটি বন্ধ হয়ে গেল চিরতরে।
