রাক্ষস – অনীশ দাস অপু
রাক্ষস
অনেক বছর আগে জাপানে একটি বড় সমভূমি ছিল। লোকে বলত ওখানে এক মানুষখেকো রাক্ষস থাকে। ওই সমভূমিতে কেউ গেলে আর ফিরে আসত না। কাছেপিঠের গাঁয়ের মানুষজন ফিসফিসিয়ে নিখোঁজ মানুষগুলোকে নিয়ে ভয়ঙ্কর সব গল্প বলত। বলত রাক্ষসটা পথহারা পথিকদের ভুলিয়ে- ভালিয়ে নিয়ে খেয়ে ফেলে।
একদিন রাতের বেলা ওয়াতানাবি নামে এক সাহসী নাইট ঘোড়ায় চেপে ওই সমভূমিতে এলেন। তখন ঝড়বাদল শুরু হয়ে গেছে। মুষলধারে ঝরছে বৃষ্টি আর পাহাড়ি নেকড়েদের মত গর্জাচ্ছে বাতাস। দূরে কতগুলো গাছের আড়ালে একটি বাতি জ্বলছে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন ঝড়ে বিপর্যস্ত নাইট।
ওখানে রাতের মত আশ্রয় মিলতে পারে ভেবে ওয়াতানাবি আলো লক্ষ্য করে এগিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখলেন একটা জরাজীর্ণ ছোট্ট কুটির। কুটিরের বাঁশের বেড়া ভেঙে পড়েছে, ফাঁকা জায়গাটায় গজিয়ে উঠেছে ঘাস আর আগাছা। জানালায় কাগজের পর্দাগুলোয় বড়-বড় ফুটো। খড় দিয়ে ছাওয়া বাড়ির ছাদ হেলে পড়েছে।
কুটিরের দরজা খোলা। দরজায় টোকা দিলেন নাইট। এক যুবক, পোশাক দেখে মনে হয় চাষাভুষা, ঘরে বসে ভাত খাচ্ছিল। টোকার শব্দে মুখ তুলে তাকাল। নাইটের পোশাক পরা ওয়াতানাবিকে দেখে সে খুব অবাক হয়ে গেল।
‘শুভ সন্ধ্যা, স্যর,’ বললেন নাইট। ‘আজ রাতের জন্য আপনার বাড়িতে একটু আশ্রয় চাইছি।’
‘নিশ্চয়ই,’ বলল কৃষক। ‘আপনাকে আপ্যায়ন করার মত কিছুই নেই আমার। তবু আসুন দয়া করে। আপনার জন্য আমি আগুনের ব্যবস্থা করছি। একটু গরম করে নেবেন গা।’
নাইটকে সে আস্তাবলে ঘোড়াটিকে বেঁধে রেখে আসতে বলল। সে আস্তাবলেরও বাড়ির মতই ভগ্নদশা। ওয়াতানাবি আস্তাবলে ঘোড়া রেখে পায়ের বুটজুতো খুলে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। যুবক তাঁকে এক কাপ চা দিয়ে বলল, ‘ঘরে লাকড়ি বেশি নেই। কিছু লাকড়ির ব্যবস্থা করা দরকার। আমি যাই। জঙ্গল থেকে কিছু লাকড়ি নিয়ে আসি।’ তবে যাওয়ার আগে সে নাইটকে সাবধান করে দিল, ‘যেখানে আছেন সেখানেই বসে থাকুন। ভুলেও পেছনের ঘরে যাবেন না।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে,’ বললেন নাইট। কৃষকের এই সাবধান বাণী তাঁকে খানিকটা বিস্মিত করল।
চলে গেল কৃষক। একটু পরেই চুল্লির আগুন নিভে গেল। আলো বলতে রইল শুধু একটি টিমটিমে লণ্ঠন। পেছনের ঘরে যেতে মানা করে গেছে কৃষক যুবক, কিন্তু তার কথার সুরটা ওয়াতানাবির মধ্যে কেমন অস্বস্তি এবং সে সঙ্গে কৌতূহলও বাড়িয়ে তুলছিল।
অবশেষে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন পেছনের ঘরে একবার উঁকি দিয়ে দেখবেন। ঘরের মালিক তো আর কিছু জানতে পারছে না। ওয়াতানাবি পা টিপে-টিপে পেছনের ঘরে গেলেন। ধাক্কা মেরে খুলে ফেললেন দরজা। যা দেখলেন তাতে তাঁর বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। মেঝে বোঝাই মানুষের হাড়গোড়, ঘরের এক কোণে স্তূপ করে রাখা মরা মানুষের খুলি। সেই খুলির পাহাড় মেঝে থেকে ছাদে গিয়ে ঠেকেছে।
ওয়াতানাবি দ্রুত তাঁর বুটজুতো পরে আস্তাবলের দিকে রওনা হলেন। কারণ ঘোড়ার পিঠে তিনি অস্ত্রশস্ত্র রেখে গেছেন।
কিন্তু আস্তাবলে ঢুকে যেই তরবারির দিকে হাত বাড়িয়েছেন, মনে হলো কেউ একজন তাঁর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। পেছন থেকে ভেসে এল কৃষকের কণ্ঠ, ‘প্রিয় অতিথি, এই ঝড়জলের রাত্রে চলে যাবার এত তাড়া কীসের? আপনাকে যেখানে উঁকি দিতে নিষেধ করা হয়েছিল সেখানে কি উঁকি মেরেছিলেন? হায়! আমরা তো ভালভাবে কথাই বলতে পারলাম না।’
এ কথা বলার পরপরই একটা হাত চেপে ধরল ওয়াতানাবির মাথার শিরস্ত্রাণ। পাঁই করে ঘুরলেন নাইট, চট করে মাথায় হাত দিলেন দেখতে কে তাঁর মাথা চেপে ধরেছে। তবে যে হাতটির স্পর্শ তিনি পেলেন সেটি কোন মানুষের হাত নয়। হাতে বড়-বড় শক্ত-শক্ত লোম। আর হাতটিও গাছের গুঁড়ির মত প্রকাণ্ড।
গা মুচড়ে নিজেকে মুক্ত করে নিলেন ওয়াতানাবি এবং পাঁই করে ঘুরে দাঁড়ালেন। দেখলেন সেই চাষা তার মানুষের রূপ বদল করে এখন রাক্ষসের চেহারা ধরেছে। এটাই তার আসল রূপ। উচ্চতায় সে দুই মানুষ সমান লম্বা। ভাঁটার মত জ্বলজ্বলে চোখ, লম্বা-লম্বা চুলগুলো যেন ফণাতোলা সাপ, মুখভর্তি টকটকে লাল দাঁত।
রাক্ষসটা আবার তাঁকে ধরার জন্য থাবা চালাল। ওয়াতানাবি রাক্ষসের হাত লক্ষ্য করে প্রচণ্ড জোরে তরবারি চালিয়ে দিলেন। ব্যথায় হাউমাউ করে উঠল রাক্ষস, পিছিয়ে গেল। এবারে নাইট তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে আক্রমণ করলেন রাক্ষসকে। দানবটা নিরীহ পথচারীদের পথ ভুলিয়ে নিজের ডেরায় নিয়ে আসতে পটু হলেও মারামারিতে মোটেই দক্ষ নয়। সে নাইটের সঙ্গে লড়াইতে না পেরে রণে ভঙ্গ দিল।
পলায়নপর রাক্ষসের পিছু ধাওয়া করলেন ওয়াতানাবি, তবে ওটা গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে দ্রুত হারিয়ে গেল। আস্তাবলে ফিরে এলেন ওয়াতানাবি। পায়ে কী একটা ঠেকল। ঝুঁকে দেখেন রাক্ষসের কাটা হাত। মারামারির সময় নাইটের তরবারির আঘাতে কাটা পড়েছে হাতটি।
ওটাকে কাপড়ে মুড়ে নিয়ে কোয়োটোতে, নিজের বাড়ির পথ ধরলেন ওয়াতানাবি। রাক্ষসের কাটা হাত নিয়ে যাচ্ছেন বিজয়ের স্মারক হিসেবে দেখাতে। বন্ধুদেরকে কাটা হাতটি দেখানোর পরে তারা সবাই তাঁকে ‘হিরো’ বলে সম্বোধন করল এবং তাঁর সম্মানে বিরাট ভূরিভোজের আয়োজন করল। ওয়াতানাবি রাক্ষসের হাত কেটে এনেছেন, এ খবর শীঘ্রি ছড়িয়ে পড়ল। দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসতে লাগল কাটা হাতখানা দেখার আশায়।
কিন্তু ওয়াতানাবি জানতেন রাক্ষসটা এখনো বেঁচে আছে এবং তার হাত চুরির চেষ্টা করতে পারে। তাই তিনি খুব শক্ত কাঠ দিয়ে একটি বাক্স বানালেন, চারপাশটা মুড়ে দিলেন লোহায়। সেখানে হাতটি রাখলেন এবং কাউকেই ওটা দেখতে দিলেন না। নিজের ঘরে নিয়ে এলেন বাক্সটি যাতে ওটি কখনো চোখের আড়াল না হয়।
কয়েকদিন পরে, এক রাতের বেলা ওয়াতানাবির কাছে এল এক দর্শনার্থী। বৃদ্ধা মহিলাকে দেখামাত্র তিনি চিনতে পারলেন: এ তার শিশুকালের দাইমা। মহিলা ওয়াতানাবিকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে। তিনি দাইমাকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেন। যদিও অবাক লাগছিল ভেবে এত রাতে তাঁর কাছে কেন এসেছে বুড়ি।
দু’জনে মিলে চা পান করার পরে বৃদ্ধা বলল, ‘প্ৰভু, রাক্ষসের সঙ্গে আপনার সাহসী লড়াইয়ের কথা এতদূর ছড়িয়েছে যে আমার মত বুড়ো মানুষের কানেও তা এসেছে। এ কথা কি সত্যি আপনি এক রাক্ষসের হাত কেটে নিয়েছেন? ঘটনা সত্যি হলে শতমুখে আপনার প্রশংসা করতে হয়।’
‘হ্যাঁ, ঘটনা সত্যি,’ স্বীকার করলেন ওয়াতানাবি। ‘তবে লজ্জার ব্যাপারই বলতে হবে রাক্ষসটাকে আমি হত্যা করতে পারিনি। দানবটা তার কাটা হাত ফেলে রেখেই পালিয়ে যায়।’
‘ওহ্! সত্যি আপনার সাহসের কোন তুলনাই নেই! দয়া করে আমাকে হাতটি দেখতে দিন!’ অনুনয় করল সে।
‘আমি দুঃখিত,’ বললেন ওয়াতানাবি। ‘আমি তা পারব না। রাক্ষসরা খুব প্রতিহিংসাপরায়ণ। আমি যদি বাক্সটি এক মুহূর্তের জন্যও খুলি, রাক্ষস হঠাৎ উদয় হয়ে হাতটা কেড়ে নিয়ে যেতে পারে। তাই আমি ওই হাত কাউকে দেখাই না।’
‘আপনার সাবধান হওয়ার পেছনে যুক্তি আছে,’ বলল বৃদ্ধা। ‘কিন্তু আমি আপনার পুরানো দাইমা। আমাকে হাতখানা দেখতে দিতে অসুবিধে কোথায়? এতখানি পথ বয়ে এলাম শুধু হাতটি দেখতে। আপনি আমাকে ফিরিয়ে দেবেন, প্ৰভু?’
বৃদ্ধার কাতর অনুনয় এবং হতাশ চেহারা নাইটকে বিচলিত করে তুলল। তবু তিনি তাকে প্রত্যাখ্যান করলেন।
এবারে রেগে গেল বৃদ্ধা। ‘আপনার কি ধারণা আমি রাক্ষসের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করতে এসেছি?’
‘না, আমি অবশ্যই তা ভাবছি না।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন ওয়াতানাবি। ‘আপনি আমার বুড়ি দাইমা।’
‘তাহলে এই বুড়ো মানুষটার মনের ইচ্ছাটা একবার পূরণ করুন,’ কাতর গলায় বলল বুড়ি। তার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে।
স্নেহ এবং ভালবাসার কাছে পরাজয় মানতেই হলো নাইটকে। বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি আপনাকে রাক্ষসের হাত দেখাব। আসুন আমার সঙ্গে।’
তিনি বৃদ্ধাকে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলেন। সাবধানে বন্ধ করলেন দরজা, তারপর ঘরের কোণে রাখা বাক্সের লোহায় মোড়ানো ভারী ঢাকনিটা খুলে ধরলেন।
‘দেখি, আমাকে একবার দেখতে দিন,’ আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল বৃদ্ধা। সে জ্বলজ্বলে মুখে এগিয়ে আসতে লাগল।
বাক্সের সামনে এসেই সে হাত ঢুকিয়ে দিল ‘ভেতরে, চেপে ধরল রাক্ষসের কাটা হাত। তারপর এমন ভয়ঙ্কর জোরে চেঁচিয়ে উঠল যে গোটা ঘর কেঁপে উঠল থরথর করে। ‘আমি আমার হাত ফিরে পেয়েছি!’
চোখের পলকে বুড়ি ধাত্রী সেই ভয়ানক রাক্ষসে পরিণত হলো। ছাদে গিয়ে ঠেকল তার মাথা। ওয়াতানাবি সবসময় সঙ্গে তরবারি রাখেন, সাঁৎ করে কোমরের কোষ থেকে মুক্ত করলেন ধারাল অস্ত্রটি। রাক্ষস জানে ওয়াতানাবি অস্ত্র চালনায় কতটা দক্ষ। সে আর মারপিটের দিকে না গিয়ে ছাদ ভেদ করে দিল লাফ। এক লাফে ছাদ ফুটো করে মিলিয়ে গেল রাতের আকাশে।
লোকে যদিও ওয়াতানাবি এবং রাক্ষসের কাটা হাতের গল্প বলত গর্ব ভরে কিন্তু নাইটটি রাক্ষসের ওপরে ভয়ানক চটে গিয়েছিলেন তাঁকে এভাবে কাঁচকলা দেখানোর কারণে। রাগের চোটে তিনি চলে গেলেন সেই ভুতুড়ে সমভূমিতে দানবটার সঙ্গে লড়াই করতে। কিন্তু ঝড়ের কবলে পড়ে চাষার কুটির ততদিনে ধসে গেছে এবং বাতাস ও বৃষ্টিতে সেই হাড়গোড় ও খুলিগুলো মাটির সঙ্গে মিলিয়ে গিয়েছে।
অদৃশ্য রাক্ষসকে উদ্দেশ্য করে তরবারি বাগিয়ে তাঁর মুখোমুখি হওয়ার জন্য একের পর এক চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যেতে লাগলেন ওয়াতানাবি। কিন্তু জবাবে শুধু উপহাসের মত হাসির শব্দ শোনা গেল। এতই হালকা সে আওয়াজ যা পাইন গাছের ডালে বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দ বলেই মনে হয়।
