দশম অধ্যায় – ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন : সৃষ্টিতত্ত্বের বিবর্তন
অভিজিৎ রায় এবং বন্যা আহমেদ
ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত আবারও কোর্ট কাচারি পর্যন্তই গড়ালো, যদিও আমেরিকার জন্য সেটা নতুন কোন ব্যাপারই নয়। ২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ডোভার শহরের সরকারী স্কুল বোর্ড বিজ্ঞানের পাঠ্যসূচীতে বিবর্তনবাদের পাশাপাশি সৃষ্টির বুদ্ধিদীপ্ত অনুকল্প বা ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন (আইডি) পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে সেখানকার আভিভাবকেরা তার বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য হন। কোর্টের জজ জন ই. জোন্স বিস্তারিতভাবে আইডির প্রবক্তা এবং আইডির বিপক্ষে দাঁড়ানো প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানীদের বক্তব্য শোনার পর ২০০৫ সালের ডিসেম্বর মাসে রায় দিলেন – আদালতের সাক্ষী থেকে দেখা যাচ্ছে যে আইডি ধর্ম এবং সৃষ্টিতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে তৈরি একটি মতবাদ, তাই সরকারী কোন স্কুলের পাঠ্যসুচীতে একে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তটি পরিষ্কারভাবে আমেরিকার সাংবিধানিক আইনকে ( Establishment Clause, আমেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর এই অংশটিতে পরিষ্কারভাবে লেখা আছে যে, সরকার কোনভাবেই কোন ধর্মের পক্ষে বা তা প্রতিষ্ঠা করার পক্ষে বা বিপক্ষে কোন আইন তৈরি করবে না) লংঘন করে। জজ সাহেব আরও বললেন, এই মামলা থেকে এও পরিষ্কারভাবে বোঝা গেছে যে, বিবর্তনবাদ একটি যথার্থ বিজ্ঞান এবং তা বৈজ্ঞানিক মহলে বহুলভাবে সমর্থিত, এই তত্ত্বের সাথে কোন আলৌকিক স্রষ্টা আদৌ আছে কি নেই তার কোন দ্বন্দ্ব নেই।
ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন (আইডি)বলতে কি বুঝায়?
আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট ১৯৮৭ সালে এক ঐতিহাসিক রায়ে “ক্রিয়েশন সায়েন্স’ বা ধর্মীয় সৃষ্টিতত্তকে “অবৈজ্ঞানিক” এবং “রিলিজিয়াস ডগমা’ হিসেবে চিহ্নিত করে দেওয়ার পর পরই সৃষ্টিবাদীরাও বুঝে গিয়েছিলেন যে সেই পুরনো সৃষ্টিতত্ত্ব দিয়ে বোধ হয় আর জনসাধারণকে বোকা বানিয়ে রাখা যাবে না। ফলে বিবর্তনবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য মূলতঃ তখন থেকেই তাদের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো আরেকটু ‘সফিসটিকেটেড’ তত্ত্বের। সম্প্রতি তাদের পক্ষ থেকে নতুন কিছু যুক্তির অবতারণা করে নতুন মোড়কে ‘সেই একই পুরোন সৃষ্টিতত্ত্ব’কে হাজির করা হয়েছে, যার নাম হচ্ছে সৃষ্টির ‘বুদ্ধিদীপ্ত অনুকল্প’ (Intelligent Design argument), বা সংক্ষেপে আইডি। মাইকেল বিহে, উইলিয়াম ডেম্বস্কি, ফিলিপ জনসন, জোনাথন ওয়েলসসহ প্রবক্তাদের সকলেই মোটা অঙ্কের অর্থপুষ্ট রক্ষণশীল খ্রীষ্টান সংগঠন ডিস্কভারি ইন্সটিটিউটের (Discovery Institute) সাথে যুক্ত। এঁদের যুক্তি হল, আমাদের বিশ্বব্রহ্মান্ড এবং সর্বোপরি জৈব জীবন এতই জটিল এবং অনন্যসাধারণ যে প্রাকৃতিক উপায়ে সেগুলো উদ্ভুত হতে পারে না, এবং এর পেছনে এক বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনাকারীর পরিকল্পনার ছাপ আছে। এই তত্ত্বের প্রবক্তারা মহাবিশ্ব এবং পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির পিছনে খ্রীষ্টিয় ঈশ্বর জড়িত থাকবার ব্যাপারটা মুখ ফুটে সরাসরি না বললেও তাদের বিভিন্ন লেখালখিতে তা সুষ্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তারা বলেন, বৈজ্ঞানিক ডেটা বা উপাত্তগুলো শুধু প্রাকৃতিক নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয় কিংবা উচিৎ ও নয়, এগুলোকে সঠিকভাবে বোঝা যাবে তখনই, যখন এক সৃজনশীল সজ্ঞাত সত্ত্বার (intelligent agent) সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যের আলোকে এগুলোকে দেখার চেষ্টা এবং বিশ্লেষণ করা হবে। এই ‘আইডি’ ইদানিংকালে কারো কারো কাছে এতটাই গুরুত্ব পেয়েছে যে, তাঁরা অনেকেই এই তত্ত্বটিকে বিজ্ঞানের আওতাভুক্ত করে (মুলতঃ ডারউইনীয় বিবর্তনের বিকল্প হিসেবে) স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করতে চান, এবং এ নিয়ে আমারিকায় আন্দোলনও শুরু করেছেন।
কিন্তু জজ সাহেব বললে কি হবে, আজকে আমেরিকার অত্যন্ত রক্ষণশীল কিন্তু ক্ষমতাবান খ্রীষ্টান মৌলবাদী অংশ এবং সরকার তো তা বলছে না। এই তো সেদিনও তাদের প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ দিব্যি বলে দিলেন যে, স্কুলে আইডি এবং বিবর্তন দুটোই নাকি সমানভাবে পড়ানো উচিত। সাইন্টিফিক আমেরিকান জার্নালের অকটোবর, ২০০৬ সংখ্যার এক জরিপে দেখা যাচ্ছে যে. এদেশের রক্ষণশীল রিপাবলিকান দলের ৬০%ই হচ্ছে সৃষ্টিতত্ত্ববাদী এবং মাত্র ১১% বিবর্তনবাদে আস্থা রাখে, আর ওদিকে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ২৯% সৃষ্টিতত্ত্ববাদী এবং ৪৪% বিবর্তনবাদকে সঠিক বলে স্বীকার করে। উদারনৈতিক (liberal) প্রগতিশীল আমেরিকানদের মধ্যে ৬৩%, কিন্তু রক্ষণশীল অংশের মাত্র ৩৭% বিবর্তনবাদকে মেনে নিয়েছে। বিজ্ঞানের সঠিকতা কি তবে রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চেই নির্ধারিত হবে? কিন্তু অন্য কোন বৈজ্ঞানিক আবিস্কার যেমন বিদ্যুৎ, চুম্বকত্ব, টেলিস্কোপ থেকে শুরু করে মাধ্যাকর্ষণ, আপেক্ষিক তত্ত্ব কিংবা বিগ ব্যাং- কোনটিকে প্রতিষ্ঠিত করতেই কিন্তু রাজনৈতিক দলের কিংবা ধর্মীয় গোষ্ঠীর করুণা বা সম্মতির দরকার পড়েনি! সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে আমেরিকার জনগণের ৮২ শতাংশ সত্যিকারের স্বর্গে বিশ্বাস করে, এমনকি শতকরা ৫১ ভাগ ভুতে পর্যন্ত বিশ্বাস করে, আর সে তুলনায় বিবর্তনের মত বৈজ্ঞানিক একটি তত্ত্বে বিশ্বাস করে মাত্র শতকরা ২৮ ভাগ লোক `। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের নভেম্বর, ২০০৪ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘Was Darwin Wrong?’ প্রবন্ধ থেকে দেখা যায় যে, ৪৫% আমেরিকান এখনও মনে করে যে, সৃষ্টিকর্তা গত ১০ হাজার বছরে কোন এক সময়ে মানুষকে এভাবেই বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বিজ্ঞানী ডগলাস ফুটুইমা তার ‘Evolution’ বইয়ে লিখেছেন যে, শতকরা ৪০ ভাগেরও বেশী আমেরিকান এখনও মানুষের বিবর্তনে বিশ্বাস করে না, অথচ ওদিকে ইউরোপের বেশিরভাগ মানুষ বিবর্তনবাদকে সঠিক বলে মেনে নিয়েছে। জ্ঞান বিজ্ঞানে এত অগ্রসর বলে কথিত আমেরিকানদের বিবর্তন সম্পর্কে আস্থার অবস্থা দেখে ইউরোপবাসীর অনেকেই নাকি বিস্মিত না হয়ে পারে না ৩। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সামন্ততান্ত্রিক রক্ষণশীল চার্চের সাথে বিজ্ঞানের দন্দ্ব, শিল্প বিপ্লব, ফরাসী বিপ্লব, দু’টি বিশ্বযুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী উপনিবেশের অবসান ইত্যাদি থেকে পাওয়া শিক্ষার কারণেই হয়তো ইউরোপবাসীরা আজকে জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই অগ্রসর ভূমিকা নিতে সক্ষম হয়েছে। নিউ সাইন্টিস্ট মাগাজিনে বক্তব্য দিতে গিয়ে মিশিগান ইউনিভারসিটির শিক্ষক জন মিলার বলেন যে, (উন্নত দেশগুলোর মধ্যে) আমেরিকাই মনে হয় একমাত্র দেশ যেখানে বিবর্তনবাদ নিয়ে এই রক্ষণশীল ক্ষমতাশালী অংশ রাজনৈতিক খেলায় মেতেছে, পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশেই এটা আর কোন ইস্যুই নয় ৪। বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে যে, জেনেটিক্সসহ আধুনিক জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার নিত্য নতুন আবিষ্কারের ফলে যেখানে সারা পৃথিবীতে ক্রমশঃ মানুষের মধ্যে বিবর্তনের পক্ষে সমর্থন বাড়ছে সেখানে এই রাজনৈতিক খেলার শিকার হয়ে আমেরিকায় তা কমতির দিকে। খুবই আবাক লাগতে ভাবতে যে, আজকে যদি আমেরিকার সরকার এবং ক্ষমতাশালী অংশের এই অবস্থা হয় তাহলে প্রায় দু’শ বছর আগে এ দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাজনীতিবিদেরা কি করে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করতে পেরেছিলো? এখন তো মনে হচ্ছে এদেশের পূর্বসুরীদের অগ্রসর দৃষ্টিভঙ্গীর কারণেই হয়তো এখনও আমেরিকার স্কুল কলেজে বিজ্ঞান টিকে আছে! তাহলে কি আমরা বলব যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হওয়ার সাথে সাথে আমেরিকা ক্রমাগতভাবে উদারনৈতিক অগ্রসরতা থেকে পিছিয়ে পড়ছে? হতেই পারে। তবে আরো একটা জিনিস এখান থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, কোন দেশে বিজ্ঞানের বড় বড় আবিষ্কার ঘটলেই সেখানে বিজ্ঞানমনষ্ক জাতি গড়ে ওঠে না, বিজ্ঞানমনষ্কতার জন্য চাই এমন এক সমাজ, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং সচেতন জনগোষ্ঠী যাদের মাধ্যমে রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীকে জনসাধারণের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলার প্রচেষ্টা নেওয়া হবে।
এতক্ষণ তো দেখলাম আমেরিকার মত উন্নত দেশে বিবর্তনবাদের কি অবস্থা। ইদানিং কালে শুধু তো আমরিকায়ই নয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হারুন ইয়াহিয়াদের (তুর্কী দেশীয়) মত স্বঘোষিত ‘বিজ্ঞানী’রাও আবার আইডি সমর্থন করতে শুরু করেছেন। তারা আইডির সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে নিজেদের সৃষ্টিতত্ত্ব মিলিয়ে বিবর্তনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছেন। আর ওদিকে আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কথা বোধ হয় আর না বলাই ভাল। দৈনিক সমকালে কালস্রোত বিভাগে এ বছর (২০০৬ সাল) মাসাধিক কাল ধরে প্রকাশিত হচ্ছে হুমায়ুন রশীদের লেখা ‘বাংলাদেশে কি বিবর্তন পড়ানো হচ্ছে?’ নামের একটি সিরিজ। ওই সিরিজে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার যে করুণ ছবি ফুটে উঠেছে তা সত্যই ভয়াবহ। স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা তো বটেই, এমনকি জীববিজ্ঞানের স্বনামধন্য শিক্ষক শিক্ষিকারাও বিবর্তনকে ধর্মবিরোধী আজগুবি ধ্যান ধারণা বলে মনে করেন। তারা মনে করেন পরীক্ষা পাশের জন্য এসব ‘হাবি জাবি’ জিনিস পড়া যেতে পারে, কখনই ওগুলো সত্য বলে মেনে নেওয়া যাবে না!
বিবর্তনবাদ নিয়ে রক্ষণশীল মহলে এত হৈ চৈ কেনো?
বিবর্তনবিরোধীরা ডারউইনিজমকে শুধু প্রত্যাখ্যান করেই ক্ষান্ত হয়নি, সমস্ত “শয়তানির চাবিকাঠি’ হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছে। আমেরিকার রক্ষণশীল অংশের মদদপুষ্ট ডিস্কভারি ইন্সটিউটের পুরোধা ব্যক্তিত্ব এবং ইন্টেইলজেন্ট ডিজাইনের অন্যতম প্রবক্তা ফিলিপ জনসনের মতে, যেহেতু অবিশ্বাসীরা ডারউইনের মতানুসারে মনে করে মানুষ বানর থেকে উদ্ভূত হয়েছে, সেহেতু তারা যে কোন ধরনের ‘নাফরমানি করতে পারে – সমকামিতা, গর্ভপাত, পর্ণোগ্রাফি, তালাক, গণহত্যা সবকিছু! এমন একটা ভাব, ডারউইন আসার আগ পর্যন্ত সারা পৃথিবী যেন এগুলো থেকে একেবারেই মুক্ত ছিল! “আনসারিং জেনেসিস’ নামে একটা মৌলবাদী খ্রীষ্টান ওয়েবসাইট আছে, যারা এখনো মনে করে পৃথিবীর বয়স ছ’হাজার বছরের বেশী নয়। এ ওয়েবসাইটের উদ্দেশ্যই হচ্ছে যে কোন উপায়ে বিবর্তনকে ঠেকানো আর ‘প্রমাণ করা’ বিজ্ঞান যাই বলুক না কেন, বাইবেলে যা লেখা আছে তাই ঠিক’। তারা খুব সুন্দর করে চার্ট বানিয়ে দেখিয়েছে বিবর্তন মানলে পাওয়া যাবে রেসিজম, ফ্যাসিজম, কমিউনিজম, নাজিজম আর জেনেসিস মানলে এ পৃথিবীতে থাকবে প্রেম ভালবাসা, স্নেহ, মায়া আর মমতা! ওদিকে হারুন ইয়াহিয়ার মত ব্যক্তিরা আবার দিব্যি বলে বেড়াচ্ছেন যে, বিবর্তনবাদ পশ্চিমা আধিপত্যবাদী শক্তির দ্বারা সৃষ্ট একধরণের ‘প্রতারণা’ ছাড়া নাকি আর কিছুই নয়!
স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে সব ছেড়ে ছুড়ে বিবর্তন তত্ত্বের উপর এই বিশেষ মহলটির এতো আক্রোশ কেন? বিজ্ঞানের তো আরো হাজারটা শাখা আছে, কই সেগুলো নিয়ে তো এমন ‘উদ্দেশ্যমূলক’ ভাবে বিতর্ক তৈরী করা হচ্ছে না? এমনকি জীববিজ্ঞানের ভিতরেও তো আছে কোষবিদ্যা, বংশগতিবিদ্যা, সাইটোজেনেটিক্স কিংবা আণবিক জীববিদ্যা ইত্যাদি। ওগুলো নিয়েও বিশেষ মহলটির কোন মাথাব্যথা নেই, বিতর্কও নেই। তাহলে নিশ্চয়ই ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের মধ্যে তারা এমন কিছু খুঁজে পেয়েছে যা তাদের গায়ে ভিষণ জ্বালা ধরানোর জন্য যথেষ্ট। কি সেটি? আসলে সত্যি বলতে কি, বিবর্তনতত্ত্ব সমস্ত পুরোন সৃষ্টিতাত্ত্বিক ধ্যান ধারণা আর কুসংস্কারের বুকে তীব্র আঘাত হেনেছে। পৃথিবীর অধিকাংশ ধর্মের মূল ভিত্তি সৃষ্টিতত্ত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে বিবর্তনবাদ।
সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই নিজের জন্ম রহস্য নিয়ে মানুষ বিভিন্নভাবে প্রশ্ন করে এসেছে। যুগে যুগে, বিভিন্ন জাতির মধ্যে তাই জন্ম হয়েছে নানা ধরণের ধর্মের এবং সৃষ্টিতত্ত্বের। তবে পশ্চিমা বিশ্বে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে উইলিয়াম প্যালের কল্যাণে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে সৃষ্টির পরিকল্প যুক্তি (Design argument) প্রবলভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল। ডারউইনের বিবর্তনবাদী তত্ত্বই ১৮৫৯ সালে প্রথমবারের মতো একে শক্তিশালীভাবে চ্যালেঞ্জ করে ভুল প্রমাণিত করলো। বিবর্তনবাদ খুব পরিস্কার ভাবেই দেখিয়ে দিল যে, মানুষসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিবর্তন এবং উদ্ভবের পেছনে কোন স্বর্গীয় কারণ খোঁজার দরকার নেই। অন্যান্য পশুপাখি, গাছপালা যে পদ্ধতিতে পৃথিবীতে এসেছে, মানুষ নামের ‘দ্বিপদী প্রাণীটিও ঠিক একই বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এ পৃথিবীতে এসেছে। অর্থাৎ জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষ আসলে প্রাণীজগতের অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়, তা সে নিজেকে যতই ‘অনন্য সাধারণ’ মনে করুক না কেন! দার্শনিক ডেনিয়েল ডেনেট এজন্যই বিবর্তনতত্ত্বকে ‘ইউনিভার্সাল এসিড’ (universal acid) বা রাজাম্ল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ইউনিভার্সাল এসিড যেমন তার বিধ্বংসী ক্ষমতায় সকল পদার্থকে পুড়িয়ে-গলিয়ে ছারখার করে দিতে পারে, তেমনি ডারউইনের বিবর্তনবাদী তত্ত্ব সমস্ত প্রথাগত সৃষ্টিতাত্ত্বিক ধ্যান ধারণা আর কুসংস্কারকে একেবারে দুর করে দিতে পারে। অধ্যাপক ডেনেট তার বিখ্যাত বইটিতে” বিবর্তন তত্ত্বকে ‘ডারউইনের বিপজ্জনক প্রস্তাব’ (Darwin’s dangerous idea) বলে উল্লেখ করেছেন। এটি ‘বিপজ্জনক’ কারণ এটি বলে যে, মানুষ এবং অন্যান্য জীব কোন সৃষ্টিকর্তার নির্দেশনা ছাড়াই শুধুমাত্র প্রাকৃতিক পদ্ধতির মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত সরল প্রাণ থেকে ক্রমান্বয়ে উদ্ভুত হতে পারে। নিঃসন্দেহে এটি সৃষ্টিবাদীদের জন্য বিপদের কথা। অক্সফোর্ডের বিশপ স্যামুয়েল উইলবারফোর্স (Samuel Wilberforce), যিনি ডারউইনের বন্ধু বিজ্ঞানী হাক্সলির সাথে ঝগড়া-ঝাটির কারণে বিখ্যাত হয়ে আছেন (২য় অধ্যায় দ্রষ্টব্য), সঙ্গত কারণেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ঘটা বিবর্তনকে অস্বীকার করেন এই বলে”: ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন নামের তত্ত্বটি ঈশ্বরের বাণীর সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এটি বরং ঈশ্বরের সৃষ্টির সাথে ঈশ্বরের প্রেরিত বাণীর বিরোধ ঘটায়।
সে যাই হোক, চলুন এবার দেখা যাক আজকের রক্ষণশীল আমেরিকাবাসীদের কাছে ‘হট্ কেক’ ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন তত্ত্বটি আসলে কি বলতে চাইছে, এই তত্ত্বটিকে জনপ্রিয় করে তোলার প্রচেষ্টার পিছনে আসলে কি উদ্দেশ্য কাজ করছে। এর মুলে যেতে হলে আমাদেরকে আইডি তত্ত্বের আস্তানা ডিস্কভারি ইনস্টিটিউটে একবার ঢুঁ মেরে আসতে হবে। ওখানে কারা কালকাঠি নাড়ছেন, কি বলছেন এবং কেন বলছেন তা একটু খতিয়ে দেখলেও বোধ হয় ডোভার শহরের জজ সাহেবের দেওয়া সাম্প্রতিক রায়ের অর্থ পরিস্কার হয়ে যাবে। কিন্তু আইডি প্রবক্তাদের জন্ম রহস্যটা ঠিকমত বুঝতে হলে আমাদেরকে আরেকটু দুরে যেতে হবে, চোখ রাখতে হবে সেই আঠারো শতকে, উইলিয়াম প্যালের কালে। সৃষ্টিতত্ত্বের ইতিহাসের বইটার সে সময়কার পাতাগুলো একটু ভালোমত উলটে পালটে দেখতে হবে কারণ তাদেরই উত্তরসুরি হিসেবে জন্ম হয়েছে এই নব্য আইডি প্রবক্তাদের!
উইলিয়াম প্যালে এবং তার পরিকল্পিত সৃষ্টির যুক্তি
উইলিয়াম প্যালে (১৭৪৩-১৮০৫)’র বিখ্যাত বই ‘Natural Theology, or Evidence of Existence and Attributes of the Deity, collected from the Appearences of Nature’ প্রকাশিত হয় ১৮০২ সালে। ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বই। জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়েও প্যালে ভেবেছিলেন বিস্তর, কিন্তু নিজেই শেষ পর্যন্ত বলেছিলেন ‘বুদ্ধিদীপ্ত স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞান উপযুক্ত মাধ্যম নয়’ ১০; এ ক্ষেত্রে প্যালের ‘উপযুক্ত মাধ্যম’ মনে হয়েছিল বরং জীববিজ্ঞানকে। আর পূর্ববর্তী অন্যান্য ন্যাচারাল থিওলিজিয়ানদের মতই প্যালেও জীবজগতকে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে জীবের অভিযোজনের ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। প্যালে লক্ষ্য করেছিলেন যে, প্রতিটি জীবদেহে নির্দিষ্ট কাজ করবার জন্য নির্দিষ্ট অংগ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে, যা জীবটিকে একটি নির্দিষ্ট কোন পরিবেশে টিকে থাকতে সহায়তা করে। তিনি জটিল জীবদেহকে ঘড়ির কাঠামোর সাথে তুলনীয় মনে করেছিলেন, আর তার মধ্যেই দেখেছিলেন স্রষ্টার সুমহান পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য আর নিপুণ তুলির আঁচর। প্যালের ভাষাতেই :
‘ধরা যাক ঝোপঝারের মধ্য দিয়ে চলতে গিয়ে হঠাৎ আমার পা একটা পাথরে লেগে গেল। আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম, এই পাথরটা কোত্থেকে এলো? আমার মনে উত্তর আসবে- প্রকৃতির অন্য অনেক কিছুর মত পাথরটাও হয়ত সবসময়ই এখানে ছিল। …..কিন্তু ধরা যাক আমি পথ চলতে গিয়ে একটা ঘড়ি কুড়িয়ে পেলাম। এবার কিন্তু আমার কখনই মনে হবে না যে ঘড়িটিও সব সময়ই এখানে পড়ে ছিল।’
নিঃসন্দেহে ঘড়ির গঠন পাথরের মত সরল নয়। একটি ঘড়ি দেখলে বোঝা যায়- ঘড়ির ভিতরের বিভিন্ন ছোট ছোট অংশগুলো কোন এক কারিগর এমনভাবে তৈরী করেছেন যেন সেগুলো সঠিকভাবে সমন্বিত হয়ে কাঁটাগুলোকে ডায়ালের চারপাশে মাপমত ঘুরিয়ে ঠিক ঠাক মত সময়ের হিসেব রাখতে পারে। কাজেই পথে ঘড়ি কুড়িয়ে পেলে যে কেউ ভাবতে বাধ্য যে ওখানে আপনা আপনি ঘড়ির জন্ম হয়নি বরং এর পেছনে একজন কারিগর রয়েছেন যিনি অতি যত্ন করে একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ঘড়িটি তৈরী করেছেন*। একই যুক্তিমালার পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে প্যালে বেছে নিয়েছিলেন আমাদের জীবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংগ চোখকে। চোখ নামের এই অংগটিকে প্যালে ঘড়ির মতই এক ধরনের জটিল যন্ত্র হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন, কারণ তার মতে, ‘ঘড়ির মতই এটি (চোখ) বহু ছোট-খাট গতিশীল কলকব্জা সমন্বিত এক ধরণের জটিল যন্ত্র হিসেবে আমাদের কাছে আবির্ভূত হয়, যেগুলোর প্রত্যেকটি একসাথে কাজ করে অংগটিকে কমক্ষম করে তুলে।’।
চোখকে প্যালে অনেকটা জৈব-টেলিস্কোপ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, ঘড়ি কিংবা টেলিস্কোপ তৈরী করার জন্য যেহেতু একজন কারিগর দরকার, চোখ ‘সৃষ্টি করার জন্য’ও প্রয়োজন একজন অনুরূপ কোন কারিগরের। সেই কারিগর যে একজন ‘ব্যক্তি ঈশ্বর’ (Personal God)ই হতে হবে তা প্যালে খুব পরিস্কার করেই বলেন :
‘কোন পরিকল্পনাকারী (Designer) ছাড়া কোন পরিকল্পনা (Design) হতে পারে না, যেমনি আবিস্কর্তা ছাড়া কোন আবিস্কার হতে পারে না।… …পরিকল্পনার ছাপ এতোই প্রবল যে একে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। এই পরিকল্পনাকারীকে অবশ্যই একজন ব্যক্তি হতে হবে। সেই ব্যক্তিই হচ্ছেন ঈশ্বর।
[* প্যালের এই ‘ঘড়ির কারিগরের যুক্তি’ দর্শনশাস্ত্রে পরিচিত হয়ে আছে ‘পরিকল্প যুক্তি’ বা ‘Argument from Design হিসেবে। শুধু জীব বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নয়, জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও তথা মহাবিশ্বের উৎপত্তির পেছনে ঈশ্বর নামক ‘কারিগরের’ অস্তিত্বের পক্ষে অত্যন্ত জোড়ালো যুক্তি হিসেবে অনেককাল ধরে প্যালের এই যুক্তিমালা ব্যবহৃত হয়েছে। একটি ঘড়ি যেমন নিজে থেকে সৃষ্ট হয়ে পথে পড়ে থাকতে পারে না, ঠিক তেমনি মহাবিশ্বও নিজ থেকে সৃষ্ট হয়ে এমনি অবস্থায় চলে আসতে পারে না। ঘড়ি তৈরীর পেছনে যেমন ঘড়ির কারিগরের ভুমিকা আছে, তেমনি মহাবিশ্ব তৈরীর পেছনেও ঈশ্বর জাতীয় কোন কারিগরের হাত থাকতেই হবে, এই ধারণাটি এক সময় সৃষ্টিবাদীদের মধ্যে অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হত। জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্যালের যুক্তমালা নিয়ে আলোচনা এবং খন্ডন এই অধ্যায়ের পরিসরের বাইরে। উৎসাহী পাঠকেরা এর জন্য অঙ্কুর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত অভিজিৎ রায়ের ‘আলোহাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ (২০০৫, ২০০৬) বইটি দেখতে পারেন।]
পরিকল্পনাবিহীনভাবে প্রাকৃতিক উপায়ে চোখের উৎপত্তির সম্ভাবনাকে এক্কেবারে উড়িয়ে দিয়ে প্যালে বলেছেন : “মানবদেহে স্রেফ দৈবাৎ প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ কোন ধরনের পরিকল্পনা (Design) বিহীন ক্রিয়া-কলাপের মাধ্যমে হয়তো আঁচিল, আঁব, জরুল, তিল, ব্রণের মত জিনিসপত্র তৈরী হতে পারে কিন্তু কোনভাবেই চোখ নয়।’ কোথাও কোন উদ্দেশ্য বা অভিপ্রায় ছাড়া কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকতে পারে না।
ডারউইন নিঃসন্দেহে প্যালের উক্তিগুলো পড়েছিলেন এবং এর একটি যোগ্য জবাবও মনে মনে ঠিক করেছিলেন যা তিনি দিয়েছিলেন পরে তার ‘প্রজাতির উদ্ভব’ বইয়ের মাধ্যমে। ডারউইন প্রস্তাব করলেন জীবদেহকে কেবল ঘড়ির মত যন্ত্রের মত কিছু ভেবে বসে থাকলে চলবে না। জীবজগৎ যন্ত্র নয়; কাজেই যন্ত্র হিসেবে চিন্তা করা বাদ দিতে পারলে এর পেছনে আর কোন কোন ডিজাইন বা পরিকল্পনার মত ‘উদ্দেশ্য’ খোঁজার দরকার নেই। জীবজগতে চোখের উদ্ভব ও বিবর্তনের পেছনে ডারউইন প্রস্তাব করলেন এক ‘অন্ধ কারিগরের’, নাম প্রাকৃতিক নির্বাচন- যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লাখ লাখ বছর ধরে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা পরিবর্তনের ফলে চোখের মত অত্যন্ত জটিল অংগ-প্রত্যংগ গড়ে ওঠা সম্ভব। এ প্রক্রিয়াটির নাম ক্রমবর্ধমান নির্বাচন (cumulative selection)। একাধিক ধাপের এই ক্রমবর্ধমান নির্বাচনের মাধ্যমে যে ধাপে ধাপে যে জটিল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উদ্ভুত হতে পারে তা ইতোমধ্যেই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত হয়েছে শুধু তাই নয়, এ পদ্ধতিতে আংশিকভাবে চোখের উৎপত্তি ও বিকাশ যে সম্ভব এবং তা বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে যে একটি জীবের টিকে থাকার সম্ভাবনাকে অনেকাংশে বাড়িয়ে তুলতে পারে তারও অজস্র উদাহরণ রয়েছে আমাদের চারপাশে। ডারউইন তার ‘প্রজাতির উৎপত্তি’ (১৮৫৯) বইয়ে বলেন:
‘চোখের আছে কিছু অনুকরণীয় উপকরণ, যা দিয়ে এটি বিভিন্ন দূরত্বের সাথে ফোকাস করতে পারে, বিভিন্ন মাত্রার আলো এর ভিতরে ঢুকতে দিতে পারে, এবং গোলাকার ও বর্ণীয় অপেরণকে সংশোধন করতে পারে, সেটি প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে উদ্ভুত হয়েছে মনে করা হয়ত অসম্ভব ব্যাপার বলেই মনে হতে পারে। তবুও যুক্তি আমাকে বলে যে, যদি অত্যন্ত অসম্পূর্ণ ও সরল চোখ থেকে নিঁখুত ও জটিল চোখ পর্যন্ত অনেক কয়েকটি স্তর থেকে থাকে এবং প্রতিটি স্তর তার ধারকের জন্য উপকারী হয় বলে দেখানো যায়; আর যদি চোখগুলো সামান্য পরিমানেও পরিবর্তনশীল হয়, এবং বিভিন্নতাগুলো বংশানুসৃত হয় (যা অবশ্যই সম্ভব), আর যদি অঙ্গের বিভিন্নতাগুলো বা পরিবর্তনগুলো জীবনের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে প্রাণীর জন্য উপকারী বলে বিবেচিত হয়, তাহলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে নিখুঁত ও জটিল চোখের উদ্ভব যতই অবাস্তব শোনাক না কেন, না ঘটার কোন কারণ নেই।’
বিবর্তন বা প্রাকৃতিক নির্বাচন লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ধাপে ধাপে ঘটে। আজকে আমরা চোখের যে পূৰ্ণাংগ গঠন দেখে মুগ্ধ হই তা একদিনে তৈরি হয়নি, তা বহুকাল ধরে ক্রমান্বয়ে ঘটতে থাকা ছোট ছোট পরিবর্তনের ফলশ্রুতি হিসেবে বিকাশ লাভ করেছে। ডারউইনের পরে গত দেড়শো বছরে আমরা চোখসহ বিভিন্ন অঙ্গের বিবর্তন সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে পেরেছি। বিবর্তনের ইতিহাসে, খুব সম্ভবত, বেশ কয়েকবারই আলাদা আলাদাভাবে চোখের বিকাশ ঘটেছে- কখনও মাকড়সা, কাঁকড়া, বিভিন্ন পোকার মত সন্ধিবদ্ধ (arthropod) প্রানীদের মধ্যে, আবার কখনও অক্টোপাস, শামুক, ঝিনুক জাতীয় মলাস্ক (Mollusk) প্রাণীদের মধ্যে এবং কখনও বা আমাদের মত মেরুদন্ডী (Vertebrates) প্রাণীদের মধ্যে। এই তিনটি গ্রুপের মধ্যেই আলাদা আলাদাভাবে চোখের সৃষ্টি এবং বিকাশ ঘটেছে – এই বিভিন্ন ধরনের চোখগুলো একেটা একেক রকম পদ্ধতিতে কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত এরা সবাই চোখের ভূমিকাই পালন করে। খুব সম্ভবত আলোর প্রতি সংবেদনশীল একধরণের স্নায়বিক কোষ থেকে প্রথম চোখের বিকাশ শুরু হয়। তারপর হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত এবং পরিবর্ধিত হতে হতে আজকে তারা এই রূপ গ্রহন করেছে। কতগুলো সংবেদনশীল কোষকে কাপের মত অবতলে যদি ঠিকমতভাবে সাজানো যায় তাহলে যে নতুন একটি আদি-চোখের উদ্ভব হয় তার পক্ষে আলোর দিক নির্ণয় করা সম্ভব হয়ে উঠে।
চিত্র ১০.৯ : চোখের বিবর্তন চোখের মত একটি জটিল প্রত্যঙ্গ সহজেই আলোর প্রতি সংবেদনশীল খুব সরল স্নায়বিক কোষ বিশিষ্ট ‘আই-স্পট থেকে বিভিন্ন ধাপে ধাপে পরিমিত স্ক্রিতার মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হতে পারে। যখনই এ ধরনের কোন পরিবর্তন – যা কিছুটা হলেও বাড়তি সুবিধা প্রদান করে, অ ধীরে ধীরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জনপুঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে।
(সৌজন্যে: http://www.millerandlevine.com/km/evol/lgd/index.html)
এখন যদি এই কাপটির ধারগুলোকে কোনভাবে বন্ধ করা যায় তাহলে আধুনিক pin-hole camera-এর মত চোখের উৎপত্তি ঘটবে। তারপর একসময় গতি নির্ধারণ করতে পারে এমন একটি অক্ষিপট (Retina) বা রং বুঝতে পারে কোনের (cone) মত এমন একটি অঙ্গ বিকাশ লাভ করে তাহলে আরও উন্নত একটি চোখের সৃষ্টি হবে। এরপর যদি বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইরিস ডায়াফ্রামের (Iris diaphragm) উৎপত্তি ঘটে তাহলে চোখের ভিতরে কতখানি আলো ঢুকবে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এরপর আস্তে আস্তে যদি লেন্সের (lens) উদ্ভব ঘটে তা তাকে আলোর সমন্বয় এবং ফোকাস করতে সহযোগিতা করবে আর এর ফলে চোখের উপযোগীতা আরও বাড়বে। এইভাবেই সময়ের সাথে সাথে মিউটেশনের মাধ্যমে চোখের ক্রমান্বয়িক পরিবর্তন ঘটেছে। আমরা এখনও আমাদের চারপাশে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত বিভিন্ন ধাপের চোখের অস্তিত্ব দেখতে পাই, অনেক আদিম প্রাণীর মধ্যে এখনও বিভিন্ন রকমের এবং স্তরের আদি-চোখের অস্তিত্ব দেখা যায়। কিছু এককোষী জীবে একটা আলোক-সংবেদনশীল জায়গা আছে যা দিয়ে সে আলোর দিক সম্পর্কে খুব সামান্যই ধারণা করতে পারে, আবার কিছু কৃমির মধ্যে এই আলোক-সংবেদনশীল কোষগুলি একটি ছোট অবতল কাপের মধ্যে বসানো থাকে যা দিয়ে সে আরেকটু ভালোভাবে দিক নির্ণয় করতে সক্ষম হয়। সমতলের উপর বসানো নামমাত্র আলোক সংবেদনশীলতা থেকে শুরু করে পিনহোল ক্যামেরার মত মেরুদন্ডী প্রাণীদের অত্যন্ত উন্নত চোখ পর্যন্ত সব ধাপের চোখই দেখা যায় আমাদের চারপাশে, এবং তা দিয়েই বিবর্তন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তর ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
ক)
খ)
গ)
বিবর্তনবাদ : একইউনিভার্সাল এসিড
পৃথিবীতে বৈজ্ঞানিক ধ্যন ধারণার কোন কমতি নেই, কিন্তু খুব কম বৈজ্ঞানিক ধারণাই জনসাধারণের মানসপটে স্থায়ীভাবে বিপ্লব ঘটাতে পেরেছে। বিখ্যাত বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক থমাস কুন (Thomas Kuhn) এ ধরনের যুগান্তকারী বিপ্লবাত্মক ধারণাকে ‘প্যারাডিম শিফট’ (Paradigm Shift) নামে অভিহিত করতেন ১৫। প্যারাডিম শিফট্কিন্তু হর-হামেশা ঘটে না। মানব সভ্যতার ইতিহাস তামা তামা করে খুঁজলেও দু’একটির বেশি প্যারাডিম শিফটের উদাহরণ পাওয়া যাবে না। পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কোপার্নিকাসের সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্ব ছিল একটি প্যারাডিম শিফট, যা আমাদের চিরচেনা বিশ্বব্রহ্মান্ডের ছবিটাই দিয়েছিল আমূল বদলে। ঠিক একই ভাবে জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্যারাডিম শিফটের উদাহরণ হল বিবর্তনতত্ত্ব এই বিবর্তন তত্ত্বই আমাদের শিখিয়েছে যে, কোন প্রজাতিই চিরন্তন বা স্থির নয়, বরং আদিম এক কোষী প্রাণী থেকে শুরু করে এক প্রজাতি থেকে পরিবর্তিত হতে হতে আরেক প্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে, আর মানুষ সহ পৃথিবীর সব প্রাণীই আসলে কোটি কোটি বছর ধরে তাদের পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হতে হতে এখানে এসে পৌঁছেছে। ডারউইন শুধু এ ধরনের একটি বিপ্লবাত্মক ধারণা প্রস্তাব করেই ক্ষান্ত হননি, বিবর্তনের এই প্রক্রিয়াটি (প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে) কিভাবে কাজ করে তার পদ্ধতিও বর্ণনা করেছেন সবিস্তারে ১৭. প্রথমবারের মত ১৮৫৯ সালে ‘প্রজাতির উদ্ভব’ বা অরিজিন অব স্পিশিজ’ বইয়ে। খুব অবাক হতে হয় এই ভেবে, যে সময়টাতে সৃষ্টি রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে প্রায় সকল বিজ্ঞানী আর দার্শনিকই সবে ধন নীল-মনি ওই বাইবেলের জেনেসিস অধ্যায়ে মুখ থুবরে পড়ে ছিলেন আর বাইবেলীয় গণনায় ভেবে নিয়েছিলেন পৃথিবীর বয়স সর্বসাকুল্যে মাত্র ছ’হাজার বছর আর মানুষ হচ্ছে বিধাতার এক ‘বিশেষ সৃষ্টি’, সে সময়টাতে জন্ম নিয়েও ডারউইনের মাথা থেকে এমনি একটি যুগান্তকারী ধারণা বেরিয়ে এসেছিলো যা শুধু বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকেই তরান্বিত করেনি, সেই সাথে চাবুক হেনেছিলো আমাদের ঘারে সিন্দাবাদের ভুতের মত সওয়ার হওয়া সমস্ত ধর্মীয় সংস্কারের বুকে। দার্শনিক ডেনিয়েল ডেনেট এজন্যই বোধ হয় বলেছিলেন, “আমাকে যদি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধারণাটির জন্য কাউকে পুরষ্কৃত করতে বলা হয়, আমি নিউটন, আইনস্টাইনদের কথা মনে রেখেও নির্দ্বিধায় ডারউইনকেই বেছে নেব।’ ‘ডারউইনের বুলডগ’ বলে কথিত বিজ্ঞানী টি এইচ হাক্সলি ডারউইনের ‘প্রজাতির উদ্ভব’ বইটিকে নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়ার’ পর জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী ‘মহাস্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন; আবার সেই সাথে আবার দুঃখও করেছিলেন এই ভেবে – ‘এতোই নির্বোধ আমি যে এত সহজ ব্যাপারটা আগে আমার মাথায় আসেনি। ১৯ বিজ্ঞানী আর্নেস্ট মায়ার বলেছেন, ‘ডারউইনিয়ীয় বিপ্লব যে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ধারণা – এটি যে কারো পক্ষে খন্ডন করা কঠিনই হবে।’।’ ২০ স্টিফেন জে গুল্ড মনে করতেন তাবৎ পশ্চিমা বিশ্বের আধা ডজন বাছা বাছা তত্ত্বের মধ্যে ডারউইনের তত্ত্ব থাকবে শীর্ষস্থানে। ২১ আর অধ্যাপক রিচার্ড ডকিন্স তো মনেই করেন যে, শুধু পৃথিবী নয় সমগ্র মহাবিশ্বে কোথাও প্রাণের বিকাশ ঘটলে তা হয়ত ডারউইনীয় পদ্ধতিতেই ঘটবে, কারণ ডারউইনীয় বিবর্তন সম্ভবতঃ একটি ‘সার্বজনীন সত্য’ (universal truth)। ২২ সমগ্র মহাবিশ্বের প্রেক্ষাপটে ‘সার্বজনীন সত্য’ কিনা তা এখনো প্রমাণিত না হলেও স্বীকার করে নিতেই হবে পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব আর এর নান্দনিক বিকাশকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের চেয়ে ভাল কোন তত্ত্ব এ মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই। আমরা চতুর্থ অধ্যায়ে বলেছি পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব যেমন একটি সফল তত্ত্ব, জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ডারউইনের তত্ত্ব তেমনি একটি অত্যন্ত সার্থক তত্ত্ব।
দার্শনিক ডেনিয়েল ডেনেট বিবর্তনতত্ত্বকে ‘ইউনিভার্সাল এসিড’ (universal acid) বা রাজাম্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ৮। ইউনিভার্সাল এসিড যেমন তার বিধ্বংসী ক্ষমতায় সকল পদার্থকে পুড়িয়ে-গলিয়ে ছারখার করে দিতে পারে, তেমনি ডারউইনের বিবর্তনবাদী তত্ত্ব সমস্ত প্রথাগত ধর্মীয় ধ্যান ধারণা আর কুসংস্কারকে একেবারে দুর করে দিতে পারে। অধ্যাপক ডেনেট তার বিখ্যাত বইটিতে * বিবর্তন তত্ত্বকে ‘ডারউইনের বিপজ্জনক প্রস্তাব’ (Darwin’s dangerous idea ) বলে উল্লেখ করেছেন। এটি ‘বিপজ্জনক’ কারণ এটি বলে যে, মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণী কোন উপরওয়ালার নির্দেশনা ছাড়াই শুধুমাত্র প্রাকৃতিক পদ্ধতির মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত সরল জীব থেকে ক্রমান্বয়ে উদ্ভূত হতে পারে।
সৃষ্টিতত্ত্বের বিবর্তন
ভিক্টোরিয়ান যুগের শেষ নাগাদ ব্রিটেনসহ সারা ইউরোপের শিক্ষিত মহলেই ডারউইনীয় বিবর্তনবাদ গ্রহনযোগ্য হয়ে ওঠে, বিজ্ঞানীদের মধ্যে তো বটেই, এমনকি চার্চের পাদ্রীদের মধ্যেও ১৬। কিন্তু ইউরোপের অবস্থা যতখানি না ভাল হতে থাকল, আমেরিকার অবস্থা হতে লাগলো পাল্লা দিয়ে ততটাই খারাপ। তার কারণ, সেখানে বিবর্তনের ব্যাপারটি শিক্ষাঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তা কোনরকম সচেতনতা জাগাতে ব্যর্থ হয়। আর মানুষকে অসচেতন রাখতে পুরোমাত্রায় ইন্ধন যুগিয়ে চলে সেখানকার খ্রীষ্টিয় চার্চ এবং আমেরিকার রক্ষণশীল সরকারগুলো। ফলে দেখা গেল, জামানা পাল্টে গেলেও বেশিরভাগ আমেরিকানই বাইবেল বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্বকেই ‘শিরোধার্য’ করে বসে আছেন**। সারা দুনিয়া জুড়ে শিক্ষাঙ্গনে যে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে তার ছোঁয়া যেন আমেরিকানরা লাগাতেই চাইলেন না গায়ে। ধীরে ধীরে আমেরিকার প্রেস এবং মিডিয়ারও চোখেও বিবর্তন বনাম সৃষ্টিতত্ত্বের অলিখিত দ্বন্দ্বের ব্যাপারটা নজরে পড়ল এবং তাদের দৌলতেই ১৮৯০ সালের পর থেকে এই বিতর্ককে ‘জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া শুরু হল। এখনও আমেরিকায় জনগণের মধ্যে বিবর্তন এবং সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়ে বিতর্কের কোন শেষ নেই। অনেকেই হয়ত জানেন না যে, আমেরিকা পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রধান ধর্মপ্রাণ দেশ (ভারতের পরই)। অথচ ইউরোপে কিন্তু পরিস্থিতি একদমই অন্যরকম, সেখানে ইউরোপের বেশীরভাগ মানুষই আজকে বিবর্তনবাদকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে মেনে নিয়েছেন।
[** ‘দ্য ক্রিয়েশনিস্টস’ (১৯৯২) বইয়ের লেখক রোনাল্ড নাম্বারসের মতে প্রথম দিকে সৃষ্টিবাদ (creationism) শব্দটি ‘বিবর্তন- বিরোধী’ সকল ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হত না; কারণ, বিবর্তন বিরোধীদের সে সময় কোন সৃষ্টির কোন বিশেষ মতবাদ বা দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে ঐকমত ছিল না। কিন্তু ১৯২০ সালের পর থেকে আমেরিকায় বাইবেলীয় সৃষ্টিতত্ত্ব বিবর্তন-বিরোধী মহলে বিবর্তনতত্ত্বের বিকল্প মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।]
একটি জিনিস এখানে পরিস্কার করা দরকার। আমেরিকার সাধারণ মানুষ বা রক্ষণশীল রাজনীতিবিদ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যাই বিশ্বাস করুক না কেন আজকের দিনে জীববিজ্ঞানীদের সকলেই কিন্তু বিবর্তনবাদী। বিবর্তনবাদের স্বীকৃতি ছাড়া আজকে জীববিজ্ঞানের সব শাখাই অচল। কোন বৈজ্ঞানিক জার্নালেই বিবর্তনের মুল বিষয়টির সমালোচনা বা বিরোধিতা করা হয় না; সেখানে হয়তো বিবর্তনটা কিভাবে ঘটছে তার পদ্ধতি নিয়ে (যেমন ধীর গতিতে ঘটছে নাকি উল্লম্ফন ঘটছে) মতানৈক্য হতে পারে, বিতর্ক হতে পারে বিবর্তনের পদ্ধতি কি ফাইলেটিক (phyletic), স্যালটেশন (saltation) নাকি কোয়ান্টাম (quantum) এ নিয়ে; কিন্তু বিবর্তন যে ঘটছেই সে ব্যাপারে জীববিজ্ঞানী এবং প্রাণরসায়নবিদদের মধ্যে এখন কোনো সংশয়ই নেই।
প্রায় অর্ধ শতকেরও বেশী হতে চললো শিক্ষায়তনে (academia) বিবর্তন নিয়ে কোন বিতর্ক নেই, যা বিতর্ক সবই ওই রাজনৈতিক মহলে, আইন-আদালতে, মিডিয়া, স্কুল বোর্ডে কিংবা ইন্টারনেটের বিভিন্ন ফোরাম এবং ওয়েব সাইটে। বোঝা কষ্টকর নয় ‘সীতার অগ্নিপরীক্ষার’ মত ডারউইনীয় বিবর্তন তত্ত্বকে কেন বার বার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে, কেন টেনে হিঁচড়ে এমনকি আদালতের কাঠগড়াতেও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বারবার; কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই ডারউইনবাদ অত্যন্ত সাফল্যের সাথেই বিপদকে সামাল দিতে পেরেছে। ইতিহাসের যে আইনী লড়াইগুলো বিগত শতাব্দীর আশির দশক পযর্ন্ত আমেরিকার জনগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সাড়া জাগাতে সমর্থ হয়েছে সেগুলো হল : টেনিসির স্কোপস ‘মাঙ্কি’ ট্রায়াল (Scopes Trial, 1925), আরকানসাসের ভারসাম্যমূলক বিচারের ধারা (Arkansas Balanced Treatment Act, 1981), লুইজিয়ানার সৃষ্টিবাদী ধারা (The Louisiana Creationism Act, 1987)২৩। এর মধ্যে স্কোপস ট্রায়ালের রায় বিবর্তনবাদীদের বিপক্ষে গেলেও এতে তাদের ‘নৈতিক বিজয়’ অর্জিত হয়, আর বাকিগুলোর ক্ষেত্রে সৃষ্টিতাত্ত্বিকদের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। লুজিয়ানার আইনী লড়াই তো একেবারে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। শেষপর্যন্ত আরকানসাস এবং লুজিয়ানা -দু জায়গার আদালতই তথাকথিত ‘সৃষ্টিবিজ্ঞান’ (Creation science) কে “বিজ্ঞানের ছদ্মবেশধারী এক ধর্মীয় মতবাদ’ (Religious dogma) হিসেবে আখ্যায়িত করে ‘অসাংবিধানিক’ হিসেবে বাতিল করে দেয়।
স্কোপস ট্রায়ালের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ১৯২৫ সালে জীববিজ্ঞানের শিক্ষক জন স্কোপসকে টেনেসীর ডেটন থেকে গ্রেফতার করা হয় স্কুলের ছাত্রদের ‘বিবর্তন পড়ানোর অজুহাতে’। আজকের দিনের পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ব্যাপারটা শুনতে খুব অদ্ভুত শোনাবে, কিন্তু সেসময় সেটাই ছিল রূঢ় বাস্তবতা। মুলতঃ ১৮৯৫ সালে নাইজেরিয়ায় বাইবেল বিশ্বাসীদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়, যাকে ‘নাইজেরিয়া বাইবেল কনফারেন্স’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত থেকেই আমেরিকার ‘মৌলবাদীরা’ (fundamentalists) বিভিন্ন প্রদেশে ‘বিবর্তন-বিরোধী আইন’ বলবৎ করার জন্য সরকারের উপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে। সৃষ্টিবাদীদের দৌরাত্ম সেসময় এতোই বেশি ছিল যে টেনিসি, মিসিসিপি এবং আরকানসাসের মত প্রদেশগুলোতে স্কুল কলেজে বিবর্তন পড়ানোই ছিল অপরাধ। ওকলাহামার পাঠ্যপুস্তক থেকে বিবর্তন উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আর ফ্লোরিডায় ডারউইনবাদকে ‘ধ্বংসাত্মক’ হিসেবে চিহ্নিত করে হেয় করা হয়েছিল”। এমন এক পরিস্থিতিতে ছাত্রদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা সৃষ্টি করবার লক্ষ্যে জন টি স্কোপস নামের টেনিসির এক হাইস্কুল শিক্ষক ছাত্রদের বিবর্তন পড়িয়ে সেখানকার বিবর্তন-বিরোধী আইনের বলি হবার সিদ্ধান্ত নিলেন। যথারীতি স্কোপসকে গ্রেফতার করা হল এবং আদালতের হাতে সোপর্দ করা হল। স্কোপসের পক্ষে লড়েছিলেন বিখ্যাত আইনবিদ ক্লেরেন্স ড্যারো (Clarence Darrow)। আর উল্টো পক্ষে ছিলেন তিন তিনবার (ব্যর্থ) প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী এবং তার্কিক উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান (Willium Jennings Bryan )। দুর্ভাগ্যক্রমে আদালত বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের সাক্ষ্য গ্রহণে অপারগতা দেখায়, যা চার্লস ড্যারোকে হতাশ করে দেয়। তারপরও চার্লস ড্যারোর জেরায় জর্জরিত হয়ে ব্রায়ান জেনিংস একটা সময় স্বীকার করতে বাধ্য হন যে পৃথিবীর বয়স বাইবেল বর্ণিত ৬০০০ বছরের ঢের বেশি ২৩। পুরো কোর্ট পরিণত হয় যেন এক জলজ্যান্ত সার্কাসে।
যা হোক, শেষ পর্যন্ত স্কোপসকে বিবর্তন পড়িয়ে টেনেসির আইন ভাঙার অপরাধে (যা তিনি সত্যই করেছিলেন) একশ ডলার জরিমানা করা হয়। পরবর্তীতে অবশ্য স্কোপস আপিল করায় সে দন্ডও মওকুফ হয়ে যায়। কিন্তু এখানে পুরো ব্যাপারটিতে আসলে বিবর্তনবাদীদের নৈতিক বিজয় ঘটে। টেনিসির আদালত সারা আমেরিকাতেই এক ঠাট্টা তামাসার পাত্র হয়ে ওঠে। বিশেষ করে এইচ এল মেনকেন (H.L. Mencken) নামের এক পত্রিকার রিপোর্টার তার ক্ষুরধার লেখনীতে মৌলবাদী সৃষ্টিতাত্ত্বিকদের একেবারে তুলোধুনো করে ছাড়েন। দীর্ঘদিন ধরে মামলা মোকদ্দমার চাপ আর দেশ জুড়ে ঠাট্টা তামাসা সহ্য করতে না পেরে রায় প্রদানের দিন কয়েকের মধ্যেই ব্রায়ান জেনিংসের অকাল মৃত্যু ঘটে। ১৯৬০ সালে স্কোপস ট্রায়ালকে ভিত্তি করে স্ট্যানলি ক্রামারের (Stanley Kramer) নির্দেশনায় একটি বিখ্যাত চলচিত্র নির্মিত হয় -’Inherit the wind’। সেটিতে ড্যারোর ভূমিকায় আভিনয় করেন বিখ্যাত অভিনেতা স্পেনসার ট্রেসি (Spencer Tracy), ব্রায়ান জেনিংসের ভূমিকায় ছিলেন ফ্রেডরিক মার্চ (Fredric March), আর মেনকেনের ভুমিকায় ছিলেন জীন কেলি (Gene Kelley)। ছবিটি সে সময় দর্শকদের মধ্যে দারুন জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং এখন পর্যন্ত তা ইতিহাসের অন্যতম ‘ক্লাসিক’ ছবি হিসেবে বিবেচিত।
সৃষ্টিবাদীরা স্কোপস ট্রায়ালের পর থেকে নতুন উদ্যমে এবং নতুন ধারায় নিজেদের মতবাদ প্রচারে তৎপর হয়ে ওঠে। বাইবেলে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্বের কোন কিছুই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সাথে মিলছে না দেখে, ১৯৬১ সালে জন হুইটকম্ব (John Whitcomb) এবং হেনরী মরিস (Henry Moris) ‘The Genesis Flood’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। লেখকেরা দাবী করেন যে সাদা চোখে যতই বেমানান লাগুক না কেন, বাইবেলের সৃষ্টি তত্ত্ব আসলে বিজ্ঞানের সাথে সংগতিপূর্ণ। বৈজ্ঞানিক মহলে বইটি কোন গ্রহনযোগ্যতা না পেলেও ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা এই বইটির মধ্যে ডারউইনীয় বিবর্তনবাদকে ঠেকানোর অভিনব কিছু পন্থা খুঁজে পায়। ১৯৬৩ সালে হেনরী মরিস Creation Research Society (CRS ) এবং সত্তর দশকের দিকে ‘Institute of Creation Research’ (ICR) প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল স্কুল কলেজগুলোতে এ নতুন সৃষ্টিতত্ত্বকে ‘বৈজ্ঞানিকভাবে’ পড়ানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা। মরিস এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা পরিস্কার করেই বলেন :
‘আমরা যে চেষ্টাকে মহিমান্বিত করি তা হল প্রথমে এটি বোঝা যে ঈশ্বরের বাণী হচ্ছে ঈশ্বরের বাণী; এবং ঈশ্বরের অভিপ্রায় ঈশ্বর পরিস্কার করেই বলতে সক্ষম, এবং যা বলেন তা সঠিকভাবেই নির্দেশ করেন। বাইবেলে ঠিক তাই রয়েছে, যা আমাদের মূলমন্ত্র। এটা আমরা মেনে নেই, আর তারপর বৈজ্ঞানিক উপাত্তগুলোকে সেই (বাইবেলীয়) কাঠামোর ভিতরে ফেলে ব্যাখ্যা করি।’
ICR এর ওয়েব সাইটেও লেখা আছে ২৫
‘The Bible is the written word of God To the student of nature this means that the account of origins in Genesis is a factual presentation of simple historical truth.’
এ ধরনের ‘রিসার্চ’ কতটা ‘বৈজ্ঞানিক’ তা নিয়ে সব সময়ই সংশয় তো থেকেছেই, তা হাসির ও খোরাক হয়েছে পুরোমাত্রায়। গবেষণা করার সময় বিজ্ঞানীরা খোলা মনে ‘রিসার্চ করবেন’ এটাই ধরে নেওয়া হয়। বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত নেন নিরপেক্ষভাবে করা পরীক্ষণের ফলাফলের ভিত্তিতে। কিন্তু বাইবেল বিশ্বাসী ‘বিজ্ঞানীরা’ তা করেন না। তারা বাইবেল যে ‘অভ্রান্ত’ সে সিদ্ধান্তেই সব সময় অটল থাকেন। আর আধুনিক বিজ্ঞানের তথ্যের আলোকে বাইবেলকে ‘পুনর্ব্যাখ্যা’ করেন। যখন ‘পুনর্ব্যাখ্যা’ করতে পারেন না, কিংবা ধর্মগ্রন্থের সাথে তাদের সৃষ্টির গল্পগুলোর এতটাই পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়, তখন তারা খোদ বিজ্ঞানের সাক্ষ্য-প্রমাণগুলোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকেন। নীচের কার্টুনটি দেখলেই বোঝা যাবে সৃষ্টিবাদীদের বিজ্ঞান ‘Creation Sceince’ কিভাবে কাজ করে। বলা বাহুল্য, কোন বৈজ্ঞানিক জার্নালে কখনই এই ‘সৃষ্টি-বিজ্ঞানী দের কোন প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়নি। ডঃ ইউজিন স্কট (Eugenie Scott) এবং ডঃ হেনরী কোল (Henry Cole) একবার একটি সমীক্ষায় দেখিয়েছিলেন যে, এই সৃষ্টিবিজ্ঞানীরা আটষট্টিটি জার্নালে তাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল পাঠাতে পারতেন, কিন্তু নিজেরাই বুঝেছিলেন যে সেগুলো এতই নিম্নমানের যে পাঠানোর উপযুক্ত নয়, কিংবা যদিও বা কিছু পাঠিয়েছিলেন, সঙ্গত কারণেই সেগুলো প্রত্যাখ্যাতও হয়েছিলো।
